স্বর্ণপদক প্রাপ্ত এক ধেড়ে ইঁদুরের অসাধারণ কীর্তি ( Swarnapadak prapto ek dhere indurer asadharon kirti )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ওরা নাকি মানুষ? ওদের আছে মান আর হুঁশ।

ওরা ধর্ম – কর্ম – ঘর্ম বেঁচে রকমারী অস্ত্র বানায়।

ওরা চাঁদ ধরতে চায়,

কিন্তু সুন্দর সৃষ্টির বিনাশ ঘটায়,

নানা ধরণের বোমা বানায়, –

ধ্বংস তথা বিনাশের  উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ায়,

কত রকম উপায়  !

শান্তির আকাশ ভরে দেয় কালো ধোঁয়ায়,

 কি সুখ যে ওরা পায়?

 

আমার মতন অতি ক্ষুদ্র একটা

আফ্রিকার ইঁদুরকে এইসব তথ্য –

বড় কাঁদায় আর ভাবায়।

নামটি আমার ‘ম্যাগামা’।

বাড়ি তানজানিয়ায়।

ছোট্ট একটা গ্রামে নগন্য এক অরণ্যে

মাঠে ঘাটে বনে বনে, মা বাবার সঙ্গে

আমার মতন শত শত প্রাণীরা

ঘুরে বেড়ায়।

ঠিক এইসময় সুদূর বেলজিয়াম থেকে

কে যেন আমাদের ডাক দেয় –

কী  এক মোহনীয় কাজের আহ্বান শোনায়,

এখন আমার মন তোমাদের সেই

কাহিনীটি জানাতে চাই।

 

তানজানিয়ার জঙ্গলে, বনে, মাঠে, ঘাটে মা, বাবা, ঠাকুমা, দাদু ও বন্ধু-বান্ধব ভাই বোনদের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতাম, আমরা আফ্রিকার দৈত্য ইঁদুরের দল।

অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্যাঙ্গারুর’ মতন আমার মায়ের পেটেও থলি আছে। তাই আমাদের ‘Pouched – Rat’ ও বলা হয়। ভীষণ আনন্দে নিজেদের জগতে মত্ত হয়ে ছিলাম, হটাৎ একদিন একদল লোক এসে খাঁচায় পুরে বন্দী বানালেন, আমাদের মতন বেশ কিছু ছোট ছোট ইঁদুরদের। মা বাবার থেকে আলাদা হয়ে খুব দুঃখ হল, কান্নাকাটিও করলাম, একনাগাড়ে কয়েকদিন ধরে। কিন্তু ওরা আমাদের কোনো ক্ষতি করল না। খুব ভালোভাবে আমাদের প্রিয় খাদ্য বাদাম (Peanuts) আর কলা খেতে দিল। অনেক রকম ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর সব ইঁদুরের মধ্যে থেকে আমাকে আলাদা করে দিল, আমার নাকি ঘ্রান (Sniffing ) শক্তি ভীষণ প্রবল। ওদের মনে হল, আমি খুব চটপটে আর বুদ্ধিমান তাই ওরা আমাকে একটা অদ্ভুত ধরনের গন্ধ শুঁকিয়ে বার বার করে কিছু বোঝাতে চাইল। নতুন শিক্ষন প্রণালীতে আমার খুব মজা লাগল।

আমার নাম “ম্যাগামা” (Magama) ওদের সংস্থার নাম – এপোপো (APOPO) ‘বেলজিয়াম’ নামে একটি ভারী সুন্দর দেশে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। একটা মাঠে সারাদিন ধরে চলল, আমার নতুন প্রশিক্ষণ। আমার চোখের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, তাই মাঠের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু খুঁজে বের করবার ট্রেনিং দিতে লাগলেন ওরা। ওগুলো কি প্রথমে আমি জানতাম না। পরে শুনলাম, ওগুলোকে ভূমিজ বোমা (Landmine) বলা হয়। আমার কাজ হল, জমিতে লুক্কায়িত আছে ঐরকম যেসব বোমা সেগুলো গন্ধ শুঁকে শুঁকে তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বের করে দেওযা, তাহলে ওরা আমাকে আরও অনেক বাদাম ও কলা পুরুস্কার দেবে। বেশ কিছুদিন ট্রেনিং এর পর ওরা আমাকে নিয়ে গেল কম্বোডিয়ায়।

সেখানে ভিয়েতনামের সীমান্তে এক বিশাল জায়গাজুড়ে এই সব ‘ল্যান্ড মাইন পোঁতা আছে। এটা যে কত সাংঘাতিক সেটা আমি জানতাম না, একদিন যখন একটা জায়গায় একদল মানব শিশু খেলা করছিল, তখ্ন  ওদের সামনে একটি বোমা ফাটল। আমরা একটু দূরে থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলাম, কিন্তু ওই বাচ্চাগুলির ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত দেহ, যন্ত্রনাকাতর মানুষের ক্রন্দন, চিৎকার অসহায় মর্মান্তিক অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি।

কে, কারা, কিসের জন্য এইরকম ‘মারণাস্ত্র’ মাটির নীচে পুঁতে রেখেছে, বুঝতে পারলাম না। তারা কি সব পাগল? রাক্ষস? কোনো  দানবের দল!

আমার শিক্ষকেরা খুব দয়ালু। আস্তে আস্তে তাঁদের সম্পর্কে অনেক জ্ঞান হল আমার।

“Anti Personnel Landmines Detection product Development On Wikkenling – Apopo জানতে পেরেছে যে আমার দ্বারা এইসব পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনগুলি বের করা সম্ভব হলে বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবেন তাঁরা।

কম্বোডিয়ায় তৎকালীন কম্যুনিস্ট গর্ভমেন্ট Khmer Rouge এবং আমেরিকা নামক সবচেয়ে উন্নত দেশের সাহায্য প্রাপ্ত ‘ভিয়েতনামের’ মানুষের কান্ড এটি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত নিজের দেশের মানুষের হত্যাকারী সরকারের নিষ্ঠূর ক্রিয়াকর্ম দেখে আমার মতন ছোট্ট একটি জন্তুও চোখে জল রাখতে পারল না l

মাওবাদী/স্টালিনবাদীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী দল এতো জঘন্য হত্যালীলা চালিয়েছে, যার বর্ণনা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। কত নিরীহ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী শান্তিকামীর  প্রাণ যায়, ঐসময় ওদের হাতে। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য ৭৫০ কিমি সীমান্তে হাতে করে এই সব ছোট ছোট একধরণের নিউক্লিয়ার বোমা পুঁতে দিয়েছিল তারা। পড়ে আরও শত শত বোমা ঠিক ঐরকম ভাবে মাটিতে পুঁতে মৃত্যু ফাঁদ বানিয়ে রাখতে কি যে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল ভিয়েতনামের মানুষ, আমার মতন রোডেন্ট ইঁদুরের চোদ্দ পুরুষেরও সাধ্য নেই তা বোঝবার।

১৯৮০ থেকে ৯০ পর্যন্ত কত যে বোমা ফাটে এবং সাধারণ গরীব শান্তিকামী মানুষের বিনাশ হয়, তার হিসেবে নেই, পাঁচ বছর ধরে কাজ করে করে একাই আমি ৭০টি ঐরকম ল্যান্ডমাইন খুঁড়ে বের করলাম। বিস্ফোরণের আগে তাদের আবিষ্কার, কত হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। আরও ৩৮টি জায়গায় ওদের লুকিয়ে রাখা মারণাস্ত্রও উদ্ধার করতে সক্ষম হলাম আমি।

ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ার যুদ্ধে চল্লিশ (৪০) হাজার লোক মারা যায় এবং ৬০ হাজার আহত হয়। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য কম্বোডিয়া হাজার হাজার ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখে তাদের প্রশস্ত সীমান্তে। ওদিকে অন্য দলও কম যায় না, তারাও আমদানী করে বহু পোর্টেবল নিউক্লিয়ার বোম! যেগুলি হাতে করে গর্ত খুঁজে খুঁজে জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা হয়। যাতে কেউ সীমান্তের এ পারে আসতে না পারে।

সেই হাত বোমাগুলি ফাটতে থাকে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত। কত হাজার গ্রাম্য শিশু, কৃষক, শ্রমিক মাঠে কাজ করতে গিয়ে মাটি খুড়বার সময় ঐসব বোমা ফেটে প্রাণ হারায়। নিরীহ মানুষ নিধনের এই গুপ্ত অস্ত্র এখনও কখনো কখনো কোনো কৃষকের লাঙ্গল লেগে মাটির ভেতর থেকে মুখ বাড়ায় এবং প্রচন্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসের মৃত্যুর লীলা খেলা দেখায়।

১৯৭৯ সালে ভিয়েতনাম এই কম্বোডিয়ার দখল নেয এবং যুদ্ধের বিভীষিকায় ভীত ত্রস্ত ক্লান্ত দেশবাসী এই ল্যান্ডমাইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। একটি সংস্থা Peace Tree পুঁতে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে প্রচেষ্ট হয়। তাদের স্লোগান হল – যেখানে যেখানে ঐ ল্যান্ডমাইনগুলি ছিল সেখানে একটি একটি করে বৃক্ষ রোপন করা। ১৫০০ জায়গায় অনেক ল্যান্ডমাইন বের করে ৮০০০ গাছ লাগানো হয়। এই উদ্যোগ অসামান্য প্রচেষ্টায় ঐ দেশের রূপ বদলাতে থাকে।

আমাকে ‘লন্ডনে’ নিয়ে গিয়ে গলায় সোনার মেডেল দেওয়া হল, অলিম্পিকের খেলোয়াড়দের মতন। আসলে এটি আমার APOPO শিক্ষক ট্রেনারদের প্রাপ্য। একদল মানুষ এখনও আছেন, যাঁরা ধ্বংস নয় সৃষ্টিতে বিশ্বাস করেন। পৃথিবীটাকে সুন্দর শান্তিপূর্ন যুদ্ধ হিংসা বিদ্বেষ হীন এক আনন্দময় জগতে পরিণত করতে চাইছেন। আমার মতন ক্ষুদ্র প্রাণীর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবেন তাঁরা কথা দিলেন আমায়। আমার জীবন ধন্য হল স্বার্থক হল।

নয়া দোস্ত (Naya Dost)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তিন বছরের আফিফকে আব্বু একটা কাঠের ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। সেটার ওপর বসে দুলে দুলে সে, খাবার খায়। পাশে বসে, আম্মি তাঁকে বইয়ের ছবি দেখায়। পশু, পাখী, কীটপতঙ্গ ও মাছের সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে গেছে। এখন সে আরও অনেক নতুন নতুন বন্ধুর সঙ্গে মুলাকাৎ ও দোস্তী করতে চাই।

নানাজী সেদিন এসে তাকে যখন কোলে তুলে আদর করতে চাইলেন, তখন সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল – “দেখছো না, আমি একন কত্তো বলো হয়ে গেছি। ঘোলার পিতে চলে বেলাই”। ‘ড়’ কে স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারে না কিন্তু তার ভাবখানা এমন যেন বিশ্ব জয় করে ফেলবে।

ঘোড়া যখন আব্বু আনেন ঘরে,
আফিফবাবু হাততালি দেয়, আনন্দ না ধরে।
মনে মনে জাল বোনে সে, কল্পনার –
স্বপ্নপরী চোখের পাতা ভরে।
টগবগ-টগবগ-টগবগ করে
দোস্ত ঘোড়াটার পিঠে চড়ে
ছোট্ট খোকা বেড়াতে যায়
বিশাল নদী পদ্মা পারে।
আম্মা তাকে চেনান কত,
হাতি, হরিণ, জেব্রা শত,
বনে থাকে বাঘ, ভাল্লুক, গন্ডার আর জিরাফ যত, –
সবাইকে সে চেনে।
জলে থাকে, ঝাঁকে-ঝাঁকে, সাঁতার কাটে
নদীর বাঁকে, –
রুই, কাতলা, মাগুর পাঁকে,
নাম তাহাদের জানে।
এখন ঘোড়া চলছে ছুটে,
ফুলের থোকা আছে ফুটে, –
মৌমাছি আর প্রজাপতি ছুটছে তাদের পানে।
এখন সে তো আঁকতে পারে, –
উড়ছে যারা অনেক দূরে –
মেঘের কোলে সারে সারে সেই পাখীদের ছবি।
নৌকা যেমন বেড়ায় ভেসে, –
মাছ পাখীরা অনায়াসে, –
জলের মধ্যে হওয়ার দেশে –
ঘুরে বেড়ায় দেখেছে সে, –
তাদের অনেক ছবি।
বালির ধারে নদীর পাড়ে, থামলো ঘোড়া এসে।
হঠাৎ সেথায় কে যেন এক ছোট্ট প্রাণী তারে
ডাকলো ভীষণ মোটা স্বরে –
গলাটা ফ্যাঁস ফ্যাঁসে।
“গ্যাঙোর, ঘ্যাঙর গ্যাঙ – আমরা কোলা ব্যাঙ, –
জলেও থাকি, ডাঙায় ঘুরি,
সরু সরু ঠ্যাঙ।
দোস্ত হতে চাও মোদের তুমি”?
বলল ভালোবেসে।
তোমাদেরকে কি নাম দেব,
ডাকবো গো কি বলে?
ঘোড়া থেকে নামল আফিফ
বেজায় কৌতূহলে।
আমাদেরকে “উভয়চর” যে বলেই সবাই জানে।
মোদের মধ্যে দীর্ঘজীবী ‘কচ্ছপ’কেই মানে।
ঐ দেখো সে এসে গেছে, –
ভাব করতে তোমার সনে, –
ঐ যে গো এই খানে।
বললে আফিফ ঘাবড়ে গিয়ে, –
“ওরে বাব্বা ! তুমি আবার কে গো?
তোমার পিঠে শক্ত এমন, খোলায় ঢাকা দেহ কেমন !
দেখে আমার ভয় লাগছে –
পালাই, আমি মাগো।
কচ্ছপটা বলল ডেকে তাকে –
মোটা গলায় হেঁকে, –
“সোনা ছেলে, বন্ধু পেলে ভয়টা কিসের
ওগো?
তোমায় আমি কামড়াবো না –
ঘোড়াটাকেও তড়পাবো না,
আমার সঙ্গে হেথায় এসে একটু কাজে
লাগো”।
আফিফ শুধায় তাকে –
“কি কাজ করছো গো তুমি?
অমন করে খুঁজছো কাকে
বালির মধ্যে কাদার ফাঁকে
জলেও যাচ্ছো নামি”?
কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল কচ্ছপটি, –
“গর্ত্তে আমি ডিম পেড়েছি চার
পাচ্ছি না তা, দেখছি যে বার বার”।

আফিফ তার ছোট ছোট হাত দিয়ে মাটি সরিয়ে খুঁজতে লাগল, নতুন বন্ধু মা কাছিমের ডিম। ঘোড়াও তার পায়ের খুর দিয়ে পাথর বালি সরিয়ে দেখতে দেখতে, – দেখতে পেল সেই ডিমগুলো। কচ্ছপ তাকে অনেক অনেক সুকরিয়া ও সেলাম জানালো। আমার ভালো করে বালি দিয়ে ঢেকে রাখলো তাদের। আমার এই খোলাটা আছে বলে, কেউ আমাকে সহজে মারতে পারে না। আমি ঐ খোলার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। এই জন্য অনেকদিন বাঁচবার সুযোগও পাই। কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বড় আর একটা উভয়চর প্রাণী আছে। দাঁত তার কোর্টের মত। জলেও থাকে, ডুব সাঁতারে এধার থেকে যায় ওধারে, আর ডাঙায় উঠে চুপিসাড়ে যাকে পায় তার ঠ্যাঙ ধরে টেনে নিয়ে যায় জলে, তারপর খুব আরাম করে খেয়ে আবার নদীর কাদায় শুয়ে সূর্যের রোদ পোহায় চোখ বুজে। ভীষণ চালাক সে।

হঠাৎ ঐ দিকে দেখি সত্যি সত্যিই একটা কুমীর বেরিয়ে আছে চার পায়ে। কাঁটা কাঁটা দাগ তার গায়ে আর মুখে কত দাঁত।

“ওরে বাবারে আফিফ, পালাও পালাও ভাগো”।

এক নিমেষে কচ্ছপ আর ব্যাঙেদের দল জলে ঝাঁপ দিল। আর আফিফ ও তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুট লাগলো বাড়ির দিকে।

মনস্টারদের সঙ্গে (Monsterder Songe)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মাল্লু একদিন দুপুর বেলায় খেলার ঘরে নিজের ডাইনোসরদের নিয়ে একা একা খেলায় মেতে আছে। কখনও তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, কখনও খাবার খুঁজে খুঁজে বেড়ায়। মা কয়েকদিন আগে মাল্লুকে একটা বই পড়ে শুনিয়েছেন কেমন করে মহা প্রলয়ে তারা সব পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে। সে কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমে তার চোখটা জুড়ে এল। এই সময় বিছানায় শোয়ার কথা সে ভাবতে পারে না। ঘুমোলেই তো খেলার সময়টা কমে যাবে। কিন্তু খুব ভোর থেকে উঠে সে বাবার সঙ্গে মাঠে ছুটতে গিয়েছিল, তাই এখন খুব ক্লান্ত লাগছে। একটা ব্যাঙ আর সাপকে ডাইনোসরের মাথায় উঠিয়ে নাচাতে নাচাতে হাতটা স্থির হয়ে গেল তার। মনে হল সেই বহু যুগ আগের ঐ মহা বিশাল জানোয়ারদের কাছে পৌঁছে গেছে সে। চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত স্টেগোসরাস, একজন মাল্লুকে বললে, –

– “এস গলাটা ধরে আমার পিঠে বসো, আমি তোমাকে থান্ডার মনস্টার-এর গল্প বলব”।

মাল্লু জানতে চাইলে, – “কোথায় থাকে সে? আমাকে দেখাতে পারো?”

– “ঐ মেঘেদের পিছনে ওর বাড়ি। ভীষণ শক্তিশালী, মাঝে মাঝে চোখ রাঙায় আর ভীষণ গর্জন করে, শুনে বড় ভয় করে আমার, পৃথিবীটা যেন কাঁপতে থাকে।”

মাল্লু ভীষণ অবাক হল, – “তুমি এত শক্তিশালী সে তোমার চেয়েও বড়?”

– ‘ওরে বাবা সেতো একা নয়, কত শত তার সৈন্য আর বিদ্যুৎ নামে তার এক এমন অস্ত্র আছে তা একবার কারো ঘাড়ে পড়লে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।’ দুজনে মিলে চললো পাহাড়ের দিকে। ওকে বজ্র দানবও বলে। সেখানে একটা বিরাট বড় বাজ পাখি ডাইনোসরের পিঠ থেকে মাল্লুকে নিয়ে বসালো নিজের ডানার ওপরে। – “ও তো কবে চলে গেছে পৃথিবী থেকে। ওটা ডাইনোসরের ‘ঘোস্ট’ মানে ভূত ছিল। তুমি ওদের নিয়ে খেলতে ভালোবাসো। তাই তোমায় এখানে পৌঁছে দিল। চলো আমি এবার তোমায় পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘেদের সঙ্গে কথা বলাবো। ওখানেই ‘থান্ডার মনস্টার’ থাকে। ওকে তো এদেশে বজ্র দানব বলে।”

মাল্লু উড়ে উড়ে চললো তার সঙ্গে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল ঘন কালো মেঘের দল যেন শত শত ড্রাম বাজাচ্ছে কেউ, বাজ পাখিটা মাল্লুকে নিয়ে লুকালো একটা বিরাট বড় বট গাছে। আসে পাশের তাল, নারকেল গাছগুলোও দুলছে ভীষণ জোরে।

 

এবার হাওয়ার দৈত্য নেমে আসছে। বজ্র দানবও তান্ডব শুরু করলো। ভয়ে তো মাল্লুর বুক কাঁপছে। ওদিকে বিদ্যুতের ঝলক চমকে দিচ্ছে, ঝলসে দিচ্ছে চোখ দুটো। কড় কড় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল অর্থাৎ বিদ্যুতের আগুন পড়ে একটা মস্ত লম্বা তাল গাছ একেবারে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল।

মাল্লুর খুব রাগ হল ঐ থান্ডার মন্সটারটার ওপরে।

মেঘের মধ্যে থেকে কটমটিয়ে তারদিকে তাকালো ঐ ‘বজ্র দানব’, তারপর গম্ভীর ভীষণ কর্কশ গলায় বললে, – “আমার ওপরে তুমি রাগ করছো জানি, আমি মানুষদের ওপরে ভীষণ বিরক্ত হয়েছি। গাছ কেটে কেটে তারা পৃথিবীর কি হাল করেছে দেখেছো? আগে এখানে কত জঙ্গল ছিল, জঙ্গল দৈত্যরা, শুকনো পাতা ফুল খেয়ে, ঝর্ণার জল পান করে শান্তিতে থাকতো, এখন সব শেষ।”

মাল্লু বললে – “কিন্তু তুমিও এত ধংসাত্বক ভাবে আসছো, ধ্বংস করে দিচ্ছ কত গ্রাম।” – না এর পরেই আমি বৃষ্টি রানীকে পাঠাব, সে পৃথিবীতে আবার শীতলতা, স্নিগ্ধতা নিয়ে আসবে। বৃষ্টি থামতেই বাজ পাখিটা মাল্লুকে পিঠে চাপিয়ে একটা মাঠে নামিয়ে দিল। সেখানে লোকেরা মাটি কেটে কেটে গর্ত বানিয়ে রেখেছে। আসে পাশে গাছপালাও নেই। মাল্লু হঠাৎ মাটির ভিতরে প্রবেশ করতে লাগলো। গভীর খাদে ক্রমশ সে সেঁধিয়ে যেতে থাকল। পাশে পাশে ইঁদুরের গর্ত, নেউল, সাপ সবাই অবাক। “তুমি এখানে কোথায় যাচ্ছো?” – একটা আর্থ ওয়ার্ম খুব মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস করল।

– “মাটির ভিতরে কোন Earth Monster – মিট্টি দানব থাকে – মাটি কাঁপায়, ভূমিকম্প আনে তাকে দেখতে যাচ্ছি।” বললো মাল্লু। ওর কথা শুনতে পেয়ে সত্যি সত্যিই একটা মাটির ভেতরকার দানব যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। গমগমে গলায় বললো – “কে রে কে? আমার রাজ্যে? কে এমন করে চলে আসছে? দম বন্ধ হয়ে যাবে তোমার।”

মাল্লু বললে – “ইচ্ছে করে এসেছি নাকি? বজ্র দানব, হাওয়া দানব, অরণ্য দানবের পর তোমার খোঁজ করতেই ওরাই তো এমন ধাক্কা দিল যে – আমি গর্তে পড়ে গেলাম।” – এখন বেরুবার উপায় খুঁজতেই ঐ মাটির দানব এবার তাকে নিয়ে গেল, লাভা দৈত্যের (Lava Monster) এর কাছে।

মাল্লুর গায়ে ভালো করে মিট্টি লেপে দিয়েছিল ঐ মিট্টি দানব, তাই গলিত গরম ঐ লাভা মনস্টার কোনো ক্ষতি করতে পারলো না মাল্লুর। এরপর তাকে ভীষণ জোরে ঠেলা দিয়ে একটা বিরাট আগ্নেয়গিরি মুখ থেকে খুব জোরে বাইরে বার করল ঐ লাভা দৈত্যটা।

মাটিতে পড়ে মাল্লু যেন নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। ঐ লাভার সঙ্গে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সে কিছুটা, হঠাৎ সাদা ছাই এসে ঢেকে দিল তার শরীর।

মাল্লুর মনে হল সে ছাই মনস্টার হয়ে গেছে। সাদা ভস্ম মাখা ছোট্ট দেহটা দেখে আকাশের একখণ্ড সাদা মেঘের খুব দয়া হল, সে তখন নিচু হয়ে মাল্লুকে তার ভেলায় তুলে নিয়ে ভাসতে ভাসতে চলল সেই সুদূর আলাস্কার দিকে। উত্তর মেরুর প্রায় কাছাকাছি এসে মাল্লু দেখা পেল স্নো মনস্টারের। সেও ধবধবে সাদা, বরফের ওপরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মাল্লু বললে, এত ঠান্ডায় তুমি কি করে থাক? খুব নরম সুরে সে বললে, – “আমার ঠান্ডা লাগে না, একটুও গরম তাপ সহ্য করতেই পারি না। তাহলেই গলে যাবো যে।”

– “কি খাও তুমি?” – মাল্লুর প্রশ্ন। “পোলার বেয়ার? রেন ডিয়ার? সিলভার ফক্স?”

না না শুধু স্নো খাই। তাই তো আমার নাম তুষার দানব। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে একটা কথা শুনেছ তোমরা? বিশ্ব উষ্ণায়ন? নির্বোধ মানুষ এত অরণ্য, জঙ্গল মানে গাছপালা কেটে ফেলেছে যে সারা বিশ্ব – এ তোমাদের সবুজ ধরণী গরমের তাপে পুড়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়া নেই, বৃষ্টি নেই তাই ধীরে ধীরে আমার শরীরও তো গলে যাচ্ছে। আমি যদি আরও সব গ্লেসিয়ার, আইসবার্গদের নিয়ে সাগরে পড়ি তাহলে ভীষণ বন্যায় ডুবে যাবে এই সুন্দর পৃথিবীটা। মাল্লু তুমি যাও, বোঝাও সবাইকে। বরফ জমা পাহাড়েরা ভয় পাচ্ছে আজ।”

এবার মাল্লু দেখলে এটা তার একার দ্বারা সম্ভব হবে না। মাল্লু চিৎকার করে সবাই কে সাবধান করতে করতে ছুটল বাড়ির দিকে, – ঘুম ভেঙ্গে গেল তার।

বহুরূপী (Bohurupi)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমার নাম গিরগিটি। ইংরেজিতে বলে "চ্যামেলিয়ন", অনেকটা তোমাদের লিজার্ড - টিকটিকির মতোই দেখতে। হিন্দিতে ওদের বেশ সুন্দর একটা নাম আছে "ছিপকলী"। আমার এতো সুন্দর চেহারা, কিন্তু আমি তো জঙ্গলে থাকি, তাই হয়তো আমার কথা বড় একটা ঠিক জানে না। তবে আমার একটা বিশেষ গুণ আছে, যা ভগবানেরই সৃষ্টি, তার জন্য আমার নাম দেওয়া হয়েছে 'বহুরূপী'। কেননা আমি রং বদলাতে পারি যখন ইচ্ছে। আমার যারা খাদ্য তারা এই জন্য একদম পছন্দ করে না।
আমি যখন যেখানে থাকি ঠিক তার মতন রং এসে যায় আমার চামড়ায়। ঘন সবুজ ঝোপে লতা পাতার আড়ালে, যখন পোকা ধরতে যাই তখন একেবারে সবুজ হয়ে যাই। আবার শুকনো পাতার মাঝে শুকনো বাদামী, হলদে রঙের ঘাসে বা ধান ক্ষেতে গিয়ে যখন লুকাই, তখন ঠিক তারই মতন রং এসে যায় শরীরে। পোকা মাকড়েরা দেখতেই পায় না আমায়। তাই ওদের খুবই রাগ আমার ওপরে।
আবার আমায় যদি কেউ ঝাপ্টা মারে, ধরতে আসে, ইঁদুর, ছুঁচো, সাপ আমি একলাফে পালিয়ে গাছের মধ্যে একদম লেপ্টে থাকি। রং বদলে যায় আমার। কেউ দেখতেই পায় না আর। সুতরাং ওদের পেটে যাওয়ার সুযোগও কম থাকে তখন। আমি বেঁচে যাই। রক্ষা পাই অপমৃত্যুর হাত থেকে।
একলা একলা ঘুরে বেড়ালে খুব একটা বন্ধু পাওয়া যায় না। কিন্তু বিশেষ দল বানিয়ে আমরা ঘুরে বেড়ায় না। আলাদা আলাদা গাছে অনেক রকমের পোকা পতঙ্গ পাওয়া যায়, তাই খেয়ে বেড়ায়।
কয়েকদিন ধরেই ভাবছি, শুধু নিজের পেট ভরার জন্য, বেঁচে থাকা, - এটা কি রকম হচ্ছে! অন্যের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা হঠাৎ খুব প্রবল হয়ে উঠল।
সামনেই চোখে পড়ল একটা মেঠো ইঁদুরের গর্ত্ত। চার পাঁচটা ছোট ছোট বাচ্চা ইঁদুর সেখানে খেলা করছে। হঠাৎ একটা বিরাট সাপ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। আমার মনে হল কিছু একটা করা দরকার। মেঠো ইঁদুরগুলোর মা বাবা একটু দূরে চলে গিয়েছিল। তাদের খুঁজে বের করে সাবধান করে দিলাম। তারা তাড়াতাড়ি করে গর্ত্তে ঢুকেই তার মুখটা বন্ধ করে দিল মাটি দিয়ে। সাপের মুখ থেকে বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে পেরে মনে বড়োই আনন্দ হল।
সাপটি  এবার গাছে চড়ছে কাঠবিড়ালির বাসা থেকে ডিম ও ছোট বাচ্চা খাওয়ার জন্য। এক সেকেন্ড দেরী করে ফেললে সে পৌঁছে যাবে ওই বাসায়। আমি সর সর করে গাছের ছালের মতন বাদামী রঙের দেহ নিয়ে ঐ হিংস্র সাপটার একেবারে পাশ দিয়ে উঠে গেলাম ওপরে। আমার সরু ল্যাজটা দিয়ে এক ঝাপ্টা মারলাম ঐ সাপটার চোখে। সে তো অবাক, কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, অথচ ক্রমশঃ খোঁচা মারছে চোখের ওপরে, কে হতে পারে। সাপ ঘাবড়ে গিয়ে নেমে আসতে লাগল গাছ থেকে। কাঠবিড়ালির দল ততক্ষনে চি চি আওয়াজে শোর গোল তুলে সচকিত করে দিয়েছে - তার সব জ্ঞাতি ভাইকে। অনেক কাঠবিড়ালী একত্রিত হয়ে গেছে ডালে ডালে। সাপটা পালিয়ে গেল সেখান থেকে।
আমাকে একবারে দেখতে না পেলেও ওরা আমার গন্ধ পেয়েছে। একজন চিৎকার করে বলল, "ধন্যবাদ বহুরূপী"। তুমি নিশ্চয় ঐ সাপটাকে পালতে বাধ্য করেছ। ভগবানের প্রদত্ত তোমার রং বদলের গুনের জন্য সবচেয়ে আগে তাঁকে প্রণাম জানাই। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। আমার মনে বড় খুশি ও সন্তুষ্টি হল। ভাবলাম বুড়ো হয়ে গেছি, এখন থেকে যতদিন বাচঁব, এইভাবে পরের উপকার করে যাব।
কয়েকমাস সুযোগ পাইনি, কারো কোন ভালো কিছু করবার। একদিন বট গাছের প্রায় মগডালে চড়ে দূরে উড়ন্ত চিলের ডানা মেলা দেখছি চুপ করে বসে। বড় বড় - বটের পাতার মাঝে আমার ঘন সবুজ রঙের শরীরটা আড়াল করে রেখেছি। একটা বিশাল বড় ঈগল এসে বসল, আমার পাশের ডালে। ওরে বাবা, কী বিশাল তার চেহারা। ধারালো ঠোঁট। একবার বুঝতে পারলে খপ করে খেয়ে ফেলবে আমায়। না, আমার দিকে ওর নজর নেই। ও একটা বিরাট বড় পোকাকে ধরেছে আর আমাকে সেই সঙ্গে টান মেরেছে বেশ জোরে। পোকাটা তো গেল ওর মুখে আর আমি পাতা সহ আটকে গেলাম ওর বিশাল ডানার পালকে। ঈগলটা এবার গাছ থেকে মারল ঝাঁপ, আর উড়তে শুরু করল আমাকে নিয়ে।
সব সময় মাটিতে আর গাছে গাছে ঘুরেছি, এমন আকাশে ভ্রমণ এই প্রথম। আমাদের বহুরূপী বংশের কেউ এরকম ভাবে কখনও ওড়ার আনন্দ নিতে পারেনি।
যাই হোক একটা বিরাট জলাশয় দেখা যাচ্ছে নিচে। তারপাশে সাদা বালির উঁচু ঢিপি। সেখানে অনেক নারকেল গাছের সারি। সেখানে সবচেয়ে লম্বা ডালে গিয়ে বসল সে। তাড়াতাড়ি ঐ গাছে কচি কচি ডাবের সবুজ রঙের সঙ্গে মিশে চুপ করে বসে রইলাম। ধড়ে যেন প্রাণ এল।
ধীরে ধীরে সেখান থেকে নেমে এসে দেখি এত এক নতুন দেশ। সমুদ্রের ধারে সাদা বালির মধ্যে ধপ করে পড়লাম। কত রকমের পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। টপাটপ ধরে মুখে দিচ্ছি। এমন সময় একটা রাগী ক্যাকড়া তাড়া করল আমায়। বালির মধ্যে ঢুকে পড়লাম আমি, সাদা রং হয়ে গেল আমার। বুঝলাম এটা ওদের জায়গা এখান থেকে মানে মানে পালানোয় ভালো।
বেশ আনন্দেই দিন কাটিয়ে দিলাম পাশের ঝোপে। একজন সঙ্গিনীও জুটে গেল। কিন্তু বয়স তো কমে না ক্রমশঃ বাড়ে। তাই একদিন বুড়ো হয়ে চুপচাপ বসে আছি, হঠাৎ মনে হল কে যেন যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠলাম। জঙ্গলের ভেতর দিকে চলে এলাম। দেখলাম একজন বৃদ্ধ শেয়াল, একটা পা তার কেউ কেটে নিয়েছে। একটা কাঠের ওপর বসেছি, আমার রংটাও ঠিক শুকনো কাঠের মতন বাদামী তাই সে দেখতে পাচ্ছে না আমায়। জিজ্ঞাসা করলাম,
- কী হয়েছে ভাই তোমার?
- কুমিরে পা টা কামড়ে ধরেছিল। বহু কষ্টে জল থেকে উঠে তো এসেছি কিন্তু পা টা চলে গেছে।
এখন সারাক্ষণ এখানে বসে থাকি, যদি কোন শিকার কাছে আসে। কিন্তু তুমি কে ভাই, তোমায় তো আমি দেখতে পাচ্ছি না।
আমি "বহুরূপী" "চ্যামেলিয়ান" গিরগিটি। দাঁড়াও দেখি তোমার জন্যে খাবার পাই কিনা। কিছুদূরে গিয়ে দেখি একটা বিরাট জন্তুকে মেরে বাঘ সিংহ অর্ধেকটা খেয়ে রেখে গেছে, এখন হায়নারা খাচ্ছে। আমি ওখান থেকে কিছুটা মাংস নাড়িভুড়ি তুলে নিয়ে এলাম। আমার রং ঐ লাল রক্তের পাশে লাল হয়ে গেল, ওরা বুঝতেও পারল না। নাড়িভুড়িগুলো টেনে টেনে এনে যখন ঐ পা খোঁড়া শেয়ালটাকে দিলাম, তখন সে কী খুশি। কত যে আশীর্বাদ দিল আমায়। তারপর তার গর্ত্তের ঠিকানা নিয়ে আমি চললাম তার বৌ বাচ্চাদেরকে খবর দিতে। তারা এসে সবাই মিলে আনন্দে গান ধরল -
                              "হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া -
                               বহুরূপীর জয় হোক
                               আমরা দিলাম দুয়া।"

প্রতিদান (Protidan)

Protidan , a children story on two tribal boys and an elephant.

মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করতে ভিন্দু আর ভিসা দুই ভাই জঙ্গলের একেবারে গভীরে পৌঁছে গেল সেদিন। ভিন্দু ১৬ বছরেই খুব তাড়াতাড়ি গাছে চড়তে পারে, তাই ভিসা কে ঠিক নিচে দাঁড় করিয়ে পৌঁছে গেল গাছের একেবারে মগডালে। মৌচাকটা নিচে থেকে খুব ভালো দেখা যাচ্ছিলো – এখন পাতার আড়ালে ডালের পেছনে ঠিক ঠাওর করতে পারছে না সে। হটাৎ দেখলো দূরে গাছপালা ডাল কাটতে কাটতে কিছু বন্দুকধারী লোক এই জঙ্গলে ঢুকছে। নিশ্চয় এরা পশুচোর, মৌচাক পাড়া ছেড়ে সে এবার বেশ উঁচু থেকে দেখবার চেষ্টা করল, কোন দিকে যাচ্ছে তারা। ওই তো ওদের লক্ষ্য ঐ হাতিদের দিকে। সুন্দর সুন্দর সাদা সাদা দাঁতের দিকে তাদের নজর। ভয়ে বিস্ময়ে প্রথমটা সে কিংকর্ত্ত্যব বিমূঢ় হয়ে পড়ল। তারপর ভিসাকে নিচে চিৎকার করে বলল – ভাই তাড়াতাড়ি ছুটে যা, বাবা, কাকা আর বনরক্ষী দাদাদের ডেকে আন। জঙ্গলে পশুচোর এসেছে। বন্ধুকধারী লোকগুলো ধীরে ধীরে এই বড় গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালো। বন্দুক বাগিয়ে ধরে আর একটু এগোলেই তারা ঐ হাতির দলকে পেয়ে যাবে। আপন মনে ওরা গায়ে ধুলো কাদা মাখছে। যতই দেহ ওদের বড় হোক, যতই শক্তিশালী হোক ওরা ভিন্দু জানে বন্দুকের ঐ গুলি ঢুকলে মৃত্যু অবধারিত। একটা কিছু তাকে করতেই হবে। সে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে এবার মৌচাকটা দেখতে পেল। এক নিমেষে একটা বুদ্ধি খেলে গেল, সে তার হাতের লাঠিটা দিয়ে মৌচাকটাতে একটা খোঁচা মারল। ফেলে দিল সেটি ঐ লোকগুলোর মাথায়। আর সঙ্গে সঙ্গে মৌমাছিদের তীব্র দংশনে  ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল তারা। ততক্ষনে ভিসা তার ছোট ভাই এক ছুটে গিয়ে তার বাবা, দাদু, কাকা, জ্যাঠা ও বনরক্ষক বাহিনীকে ডেকে এনেছে। সবাই মিলে ধরে ফেলল পশুচোরদের। ওদিকে হাতির দলটি বেঁচে গেল সেবারের মতন।

পরদিন আবার নতুন মৌচাকের সন্ধানে জঙ্গলে গিয়ে হাজির হল। ঠিক যখন চাক ভেঙে মধু নিচ্ছে তখন মধুর গন্ধে সেখানে হাজির হল এক বিরাট কালো ভালুক তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে। গাছের ওপর থেকে দাদা চিৎকার করে বলে – “ভাই ভালুক পালিয়ে যা।” কিন্তু তখন আর পালাবার সময় নেই, ভিসা লুকিয়ে গেলো ঝোপের মধ্যে। ভালুকটি তার বাচ্চাদের চাকভাঙা মধু পেট ভরে খাওয়ালো, তারপর কি ভেবে ঝোপের আশেপাশে গন্ধ শুঁকতে লাগল। ছোট ভাই ভিসা ভাবছে “আজ বুঝি আমার শেষ দিন, ভালুকের পেটেই যাব এবার।” ঠিক তখনই একটা হাতির চিৎকার শোনা গেল গাছের পিছন দিকটায়। ভালুকটা ভয় পেয়ে বাচ্চাদের নিয়ে পালালো সেখান থেকে। ভিন্দু নেমে এলো গাছ থেকে, ভিসাও ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে চেপে ধরলো দাদাকে। ঠিক তখনই গাছের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলো এক হাতি। প্রথমে দুজনে খুব ভয় পেল, বন্য হাতির পাল পেছনেই আছে ভেবে। কিন্তু না এটি তো নেহাৎই ছোট্ট এক হাতির বাচ্চা। জোরে জোরে আওয়াজ করে মাকে খুঁজছে সে। দল ছাড়া হয়ে গেছে। চোখে তার জল দেখে দুই ভাইয়ের খুব দুঃখ হল। তারা তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে শুঁড় ধরে আদর করতে লাগল, গায়ে পিঠে হাত বোলাতে লাগল। গতকাল পশুচোরদের তাড়া খেয়ে এই বাচ্চাটা দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বনরক্ষী ও জঙ্গলের আদিবাসীদের শোরগোলে বড় হাতিরা অন্য বনে চলে গেছে। এ যেতে পারেনি। ভিসা আর তার দাদা সেই বাচ্চা হাতিটিকে বাড়ি নিয়ে এল। যত্ন করে বোতলে ভরে ভেড়ার দুধ খাওয়ালো। নিজেদের কাছে খড়ের ঘরের ভেতরেই একপাশে আশ্রয় দিল তাকে। বাবা মাও খুব খুশি হলেন হাতিটির জীবন বাঁচানোর জন্য। ঘরের চারিদিকে শক্ত করে বেড়া দেওয়া হল। দুই ভাইয়ের সাথে হাতি পরম আনন্দে বাস করতে লাগল তাদের বাড়িতে।

একটু বড় হতেই মাঝে মাঝে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় তাকে, যদি সে নিজের জাতের কোনো বন্ধু খুঁজে পায়। একদিন সকালে গিয়ে আর সে ফিরে আসে না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তাদের।

বেশ কয়েকবছর কেটে গেছে, দুই ভাই এখন বড় হয়ে জঙ্গল রক্ষকদের কাজে নিযুক্ত হয়েছে। সরকার থেকে মাইনে পায় তারা। খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ পত্র কিছু জামা কাপড় সবই আছে তাদের। ঘরে ছাউনি, মাটির দেওয়াল অনেক পোক্ত হয়েছে। আদিবাসী সবাই এখন আগেরমতন একসঙ্গেই থাকে। গান-বাজনা, পুজো অর্চনা সবই আগের মতন করে, তাদের আর শুধু মৌচাক ভেঙে, কাঠ কুড়িয়ে জীবন কাটাতে হয় না।

সেদিন ভীষণ গরম, সকাল থেকেই গায়ে জামা কাপড় রাখা যাচ্ছে না। রিজার্ভ ফরেস্টে এখন তাদের অনেক রকম কাজে লেগে থাকতে হয়। কখনো নতুন গাছের চারা লাগায়, কখনো ঝড়ে পরে যাওয়া গাছ কেটে কাঠগুলো পাঠাতে হয় সরকারের গুদামে। দুই ভাই একসঙ্গে থাকে সবসময়। হটাৎ শুনতে পেল জঙ্গলে আগুন লেগেছে, পালাও সবাই। কোথায় কোনদিকে আগুন লাগল? কেমন করে পালাবে এই সুন্দর শান্তিপ্রিয় পরিবেশ ছেড়ে? ঘরে বুড়ি ঠাকুমা, একেবারেই চলতে পারে না। বাবা মায়েরও বয়স হয়েছে। তবু ছুটে গিয়ে সবাইকে কুটির থেকে বের করে পালাবার রাস্তা খোঁজে। জানোয়ারদের চিৎকার। বাঁদর পাখিদের গাছ পালা ডাল ভেঙে এধার থেকে ওধারে ঝাঁপানো – চারিদিকে এক বিশৃঙ্খলা, ভয়াবহ দৃশ্য।

আগুন ক্রমশ এগিয়ে এসে গ্রাস করে নিচ্ছে তাদের জঙ্গল, ঘরবাড়ি। মুরগি, ভেড়াগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, তারা যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।

ঠাকুমাকে ভিন্দু পিঠেতে বেঁধে নিয়েছে। মা বাবার সঙ্গে কিছুটা এগিয়ে গেছে ভিসা, হাতে তার একটা কুঠার। ডাল পালা কাটতে কাটতে পথ করতে হচ্ছে তাকে। হটাৎ পিছনে ভীষণ একটা হুঙ্কার। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। ওরাও ভীত, কিন্তু পেছন ফিরে ওদের দেখবার আগেই ঠাকুমাকে কে যেন তার পিঠ থেকে টেনে তুলে নিল। শুঁড়ে পেঁচিয়ে রাখা ঠাকুমার ঝুলন্ত চেহারা দেখে ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠলো ভিন্দু। কিন্তু কি আশ্চর্য হাতিটা অত্যন্ত সাবধানে যত্নের সঙ্গে তাকে পিঠে বসালো। এরপর ভিন্দুকে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরতেই সে বুঝতে পারলো এতো তার সেই পুরোনো বন্ধু। তাকে আদর করতে করতে চোখে জল এসে গেল তার। পিঠে বসিয়ে অন্য একদিকে ছুটতে লাগল ঐ হাতিটি। ওরা জানে জঙ্গলের কোন দিক থেকে আগুনের ঝলক আসছে। বাইরে একেবারে গ্রামের কাছে যখন দাঁড়ালো তারা, তখন সমস্ত বনটা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ভিন্দুকে হাতির পিঠে চড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে আদিবাসীদের পরিবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। জঙ্গলের আশ্রয় হারিয়ে হাতিও এসে গেল তাদের গ্রামের বাড়িতে।

– চন্দনা সেনগুপ্ত