সুরে সুরে বাঁশি পুরে (Sure Sure Banshi pure)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমার প্রিয় কবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের জীবন বাঁশির সুরে আপ্লুতা তাঁর প্রাণ মন সর্বদাই সেই সুর ধারায় যেন সিক্ত হয়ে থাকে। রাধাভাবে বিভোর সাধক – গায়ক বৈষ্ণব কাব্যকারের মতন তাই কখনো গেয়ে ওঠেন – “মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে”।

আবার কখনো একাকী বসে উদাস প্রাণে ভাবতে থাকেন, “বাঁশি কি আশায় ভাষা দেয় আকাশেতে, সেকি কেহ বোঝে। সব কথা সবাই বোঝে না, কিন্তু অনুভব করে, তাই গভীর তত্ত্ব কথা, অসীম কালের চিরন্তন সত্য জ্ঞান কবির মনে যখন প্রতিভাত হয়, তখন তিনি লেখেন, – “নিত্যকালের গোপন কথা বিশ্ব প্রাণের ব্যাকুলতা আমার বাঁশি দেয় এনে দেয় আমার কানে”। আর সেই বাঁশির সুর – সুমধুর অপার্থিব ধুন কানের ভিতর দিয়ে যখন তাঁর মরমে প্রবেশ করে – তখন তিনি তাঁর জীবন দেবতাকে প্রশ্ন করেন, – “কেন শুধু বাঁশরীর সুরে ভুলায়ে লয়ে যাও দূরে?

কার আহ্বানে দূরে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্ত্তে আবার মনে বোধ হয় সংশয় জাগে, দিশাহারা কবি তাই দ্বিধা ভরা কণ্ঠে কাকে শুধান – “সখি ওই বুঝি বাঁশি বাজে বনমাঝে”। কিন্তু একটু পরেই তার উপলব্ধি হয়, – যে না বনে নয়, মনেই বেজেছে বাঁশি, তখন ভক্তি প্রেমের রসধারায় স্নাত হয়ে সাধক কবি গেয়ে ওঠেন, –

“পরানে বাজে বাঁশি, নয়নে বহে ধারা, দুঃখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা”।

অপুরূপা এই মধুময় পৃথিবীর রূপ রস গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়ে এই বংশী ধ্বনি বার বার ধ্বনিত করে এক মোহময় আনন্দ সংগীত। শ্রী রাধার মতন আকুল হয়ে মুগ্ধ কবি তখন সেই আনন্দ গানের তানে লীন হয়ে যান, – আর প্রিয় জনকে ডেকে বলেন, – “ওগো শোনো কে বজায়, – বনফুলের গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়। অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি, চুরি করে হাসি খানি, কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে, বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে।

এখানে ভক্ত প্রাণের আকুলতা, ঈশ্বর প্রেম সবই যেন ওই বাঁশের ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলির মধ্যে অবলীলায় খেলা করে। বাদকের অঙ্গুলি স্পন্দনে, মুখ নিঃসৃত ফুঁ এর হওয়ার কারণে অনুরণিত ধ্বনি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভাবনার দ্যোতনা জাগায়। তাই দেখি যখন শরৎকালের ধান ক্ষেতে রোদ্রছায়া লুকোচুরি খেলায় মত্ত তখন ফসল ফলানোর আনন্দে অধীর ধরণী মায়ের বুকে গানও বাজে বাঁশির সুরে। দূর দেশী কোন রাখাল যখন বটের ছায়ায় বসে সারাবেলা খেলা করে, বাঁশি বজায় তখনো সে মগ্ন হয়ে শোনে মাঠের গান। ঘরে তার যেমন মন টেঁকে না, কবিও তেমনি ধান ক্ষেতের ধারে শোনেন পৃথিবীর গান, বাঁশরীর ধুনে, “মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশি হলো ঘরেতে আজ কে রবে গো”? অথবা – “যেথায় তরু তৃণ যত, মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতন, তখন আমরা বুঝতে পারি যে এই বাঁশি শুধু এক বাঁশ গাছের ডাল কেটে বানানো বাদ্যযন্ত্র নয়, এখানে প্রকৃতি প্রেমিক কবি বলতে চেয়েছেন অন্য গভীর কথা।

মাটি তার বুকের অমৃত সুধা বৃক্ষের মধ্যে স্ফুরিত প্রাণশক্তি জাগরিত করে, তাঁর অপার আনন্দ সংগীত তথা আত্মার বাণী ঘোষিত হয় এই অপূর্ব ধ্বনি সম্বলিত বাঁশরীর মাধ্যমে কবিগুরু নিভৃতে বসে যখন সাধনারতো – আত্মার শান্তি, প্রাণের আরাম ও চিরন্তন মিলনে জাগে একান্ত আকৃতি। তিনি গান ধরেন –

“দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলেম অনেক সুরে –

গানের পরশ এল আপনি তুমি রইলে দূরে।

শুধাই যত পথের লোকে, এই বাঁশিটি বাজালো কে –

নানান নামে ভোলায় তারা নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে”।

তাঁর ঈষ্টদেবতা বাহির ছেড়ে যখন ভেতরেতে আসন পেতে বসেন তখন কবি শান্ত সমাহিত চিত্তে তদ্গত হয়ে বলতে থাকেন, – “তোমার বাঁশি বাজাও আসি আমার প্রাণের অন্তঃপুরে”।

যখন তাঁর ধ্যান ভগ্ন হয়, ধ্যানী যোগী ত্যাগী সাধক তখন শোনেন পথের আহ্বান সাধক ফকির বাউল তাঁর প্রাণের মানুষ যে প্রাণেই আছেন একথা জানলেও বার বার বাহির পেইন পা বাড়িয়ে দেন। সন্ন্যাসীর ব্রত উদযাপনে আল্লাতালার নাম শোনার মন্ত্র গ্রহনে তিনি চির পথিক। আর মাঠে ঘুরতে ঘুরতে তিনি স্বগতোক্তি করেন, “বেলা কখন যায় গো বয়ে, আলো আসে, মলিন হয়ে, পথের বাঁশি যায় কি কয়ে, বিকালবেলায় মুলতানে।

আমরা জানি এবং মানি, যে সেই পথে পথে থাকে পাথর ছড়ানো। আর তাতে ঈশ্বরের বাণী বাজে ঝর্ণা ধারার মতন। তাই তিনি পরম আনন্দে কবিতা রচনা করেন, – “আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো, তাই তো তোমার বাণী বাজে ঝর্ণা ঝরানো।

আমার বাঁশি তোমার হাতে, ফুটোর পরে ফুটো তাতে, তাই শুনি সুর এমন মধুর পড়ান ভরানো”।

পথ চলার আনন্দে, বাঁশরীর লয় তাল সুর ছন্দে তিনি সর্বদাই মাতোয়ারা। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে শ্রীরাধা যেমন উন্মনা, পাগলিনী প্রায় পথের বাধা না মেনে ছুটে চলেন অভিসারে, আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথও তাঁর জীবন দেবতা ব্রহ্ম-ঈশ্বরের প্রতি অহরহ ধাবমান, তার অভিসার অন্তহীন। তাই সর্বদা স্বীকার করেন, – “পথিকেরা বাঁশি ভরে সুর আনে সঙ্গে করে, তাই যে আমার দিবানিশি সকল লয় রে কাড়ি।

এখানে শুধু পথ নয় পথের সাথী যাত্রীদের কথাও শোনা যায় কারণ বাঁশির মধ্যে থেকে নিঃসৃত ভিন্ন ভিন্ন রাগ রাগিণীর মধ্যে বাজে মানুষের জীবনের ছোট ছোট হাসি গান, তুচ্ছ মান অভিমান, প্রেম প্রীতি, সুখ দুঃখের কথা তাই তখন বাঁশি শোনায় মানবতার গাথা। আমাদের বাঙালীর কবি তখন হয়ে ওঠেন বংশীবাদক বিশ্বকছব, যার সুরে, গানে, কোথায়, ভাবে ও আবেগে আজ সারা জগৎ প্লাবিত। কিন্তু গুরুদেবেরও গুরু যিনি প্রতি শুভ মুহুর্ত্তে তাঁকে সুরের দীক্ষা দিতে থাকেন তিনি মনুষ্য দেবতা বা অলৌকিক সত্তা নন, তিনি হলেন এক পৃথিবী তথা প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন শক্তির মধ্যে যে অনন্ত আনন্দের কথা দিন রাত ব্যক্ত হচ্ছে তা আমরা শুনতে পাই কবির গানের মধ্যে, বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি সে কি সহজ গান, সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান।

সেই কান তৈরী হয়ে গেলে কবির সাথে এই অতি নির্বোধ, ভাষা ছন্দহীন জ্ঞান হারা লেখক স্বীকারোক্তি করেন কবিরই গানে হৃদয় আমার প্রকাশ হল, অনন্ত আকাশে বেদন বাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে।

বাঁশি আনন্দ গান শোনাতে শোনাতে আবার করুন সুরে বিষাদ পূর্ন ধুন তোলে মাঝে মাঝে। কারণ যে অন্তরের ধনকে কবি পেতে চান, তা তো সহজে ধরা দেয় না। তাই শূন্য ভবনে বিরহী হিয়া কখনও কখনও কেঁদে ওঠে।

“প্রত্যাগমন” (Protyagomon)(ঘরে ফেরার গান)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
বনের পাখীর সঙ্গ পেয়ে, উড়ে উড়ে চলল দূরে।
মন চায় না, ফিরতে যে তার ঘরে।
এখানে নয়, ওখানে নয়, অন্য কোথাও -
অন্য কোন সমৃদ্ধ শহরে।
বাঁধলো বাসা, সুপ্ত আশা জমিয়ে রাখে -
কত যে তার অন্তরে।
হঠাৎ এল, মহামারীর মার,
করোনা নামে দানবীটা
দেয় দুয়ারে, আঘাত যে বার বার।।
 
কেউ চেনে না তারে, -
না চাইলেও সাড়া দিল, হাজারে হাজারে -
অজুৎ, নিজুৎ, লক্ষ, কোটি
গুনতে কে আর পারে !
ধরল চেপে, মারল টিপে, উকুন যেমন মারে,
বোনের পাখী কাঁদছে যে তাই, ব্যর্থ হাহাকারে, -
তারা হেথায় লাগবে না আর কোনই দরকারে।
প্রবাস হতে চলে যেতে হবে আবার এবারে, -
উল্টো পানে, দেবে পাড়ি, - ভারত মহাসাগরে।।
 
মন কাঁদে আজ গ্রামের তরে, -
ফিরতে সে চায় নিজের ঘরে,
তাহার তরে আসন পাতা, হয়তো ধুলার, -
পথের পরে।
সেথায় নেইতো সুখের সজ্জা -
সাজিয়ে রাখা আড়ম্বরে, -
কিন্তু সেথায় পিতা মাতার স্নেহের সুধা সদাই ঝরে।
আছে অবাধ স্বাধীনতা,
ব্যক্ত করতে মনের কথা, -
মাথাটি সে নুইয়ে দেবে -
পুন্য দেশের মাটির পরে।
 
"বন্দে ভারত" উড়ো জাহাজ আনল তারে -
বুকে ধরে।
শুভ্র যেন - বলাকা সে, মায়ের মতন ভালোবেসে,
উড়লো, আকাশ পারে।
চোখের জলে বিদায় নিল, কর্মভূমি ছেড়ে -
শুনতে পেল মধুর স্বরে -
কে যেন আজ ডাকছে তারে -!
আনন্দেতে হৃদয় উঠল ভরে।
ভাঙ্গাচোরা মরচেধরা - লোহার খাঁচার পরে,
প্রবাস হতে বনের পাখী
আজকে এল ফিরে।
পথভোলা সেই হারানো ভাই
স্বজন বন্ধু প্রতিবেশীর আনন্দাশ্রু ঝরে।
পুরানো সেই ফেলে যাওয়া -
খড়ের কুঁড়ে ঘরে -
ধন্য হ'ল, জীবন যে তার মায়ের চরণ ধরে।।

নয়া দোস্ত (Naya Dost)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তিন বছরের আফিফকে আব্বু একটা কাঠের ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। সেটার ওপর বসে দুলে দুলে সে, খাবার খায়। পাশে বসে, আম্মি তাঁকে বইয়ের ছবি দেখায়। পশু, পাখী, কীটপতঙ্গ ও মাছের সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে গেছে। এখন সে আরও অনেক নতুন নতুন বন্ধুর সঙ্গে মুলাকাৎ ও দোস্তী করতে চাই।

নানাজী সেদিন এসে তাকে যখন কোলে তুলে আদর করতে চাইলেন, তখন সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল – “দেখছো না, আমি একন কত্তো বলো হয়ে গেছি। ঘোলার পিতে চলে বেলাই”। ‘ড়’ কে স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারে না কিন্তু তার ভাবখানা এমন যেন বিশ্ব জয় করে ফেলবে।

ঘোড়া যখন আব্বু আনেন ঘরে,
আফিফবাবু হাততালি দেয়, আনন্দ না ধরে।
মনে মনে জাল বোনে সে, কল্পনার –
স্বপ্নপরী চোখের পাতা ভরে।
টগবগ-টগবগ-টগবগ করে
দোস্ত ঘোড়াটার পিঠে চড়ে
ছোট্ট খোকা বেড়াতে যায়
বিশাল নদী পদ্মা পারে।
আম্মা তাকে চেনান কত,
হাতি, হরিণ, জেব্রা শত,
বনে থাকে বাঘ, ভাল্লুক, গন্ডার আর জিরাফ যত, –
সবাইকে সে চেনে।
জলে থাকে, ঝাঁকে-ঝাঁকে, সাঁতার কাটে
নদীর বাঁকে, –
রুই, কাতলা, মাগুর পাঁকে,
নাম তাহাদের জানে।
এখন ঘোড়া চলছে ছুটে,
ফুলের থোকা আছে ফুটে, –
মৌমাছি আর প্রজাপতি ছুটছে তাদের পানে।
এখন সে তো আঁকতে পারে, –
উড়ছে যারা অনেক দূরে –
মেঘের কোলে সারে সারে সেই পাখীদের ছবি।
নৌকা যেমন বেড়ায় ভেসে, –
মাছ পাখীরা অনায়াসে, –
জলের মধ্যে হওয়ার দেশে –
ঘুরে বেড়ায় দেখেছে সে, –
তাদের অনেক ছবি।
বালির ধারে নদীর পাড়ে, থামলো ঘোড়া এসে।
হঠাৎ সেথায় কে যেন এক ছোট্ট প্রাণী তারে
ডাকলো ভীষণ মোটা স্বরে –
গলাটা ফ্যাঁস ফ্যাঁসে।
“গ্যাঙোর, ঘ্যাঙর গ্যাঙ – আমরা কোলা ব্যাঙ, –
জলেও থাকি, ডাঙায় ঘুরি,
সরু সরু ঠ্যাঙ।
দোস্ত হতে চাও মোদের তুমি”?
বলল ভালোবেসে।
তোমাদেরকে কি নাম দেব,
ডাকবো গো কি বলে?
ঘোড়া থেকে নামল আফিফ
বেজায় কৌতূহলে।
আমাদেরকে “উভয়চর” যে বলেই সবাই জানে।
মোদের মধ্যে দীর্ঘজীবী ‘কচ্ছপ’কেই মানে।
ঐ দেখো সে এসে গেছে, –
ভাব করতে তোমার সনে, –
ঐ যে গো এই খানে।
বললে আফিফ ঘাবড়ে গিয়ে, –
“ওরে বাব্বা ! তুমি আবার কে গো?
তোমার পিঠে শক্ত এমন, খোলায় ঢাকা দেহ কেমন !
দেখে আমার ভয় লাগছে –
পালাই, আমি মাগো।
কচ্ছপটা বলল ডেকে তাকে –
মোটা গলায় হেঁকে, –
“সোনা ছেলে, বন্ধু পেলে ভয়টা কিসের
ওগো?
তোমায় আমি কামড়াবো না –
ঘোড়াটাকেও তড়পাবো না,
আমার সঙ্গে হেথায় এসে একটু কাজে
লাগো”।
আফিফ শুধায় তাকে –
“কি কাজ করছো গো তুমি?
অমন করে খুঁজছো কাকে
বালির মধ্যে কাদার ফাঁকে
জলেও যাচ্ছো নামি”?
কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল কচ্ছপটি, –
“গর্ত্তে আমি ডিম পেড়েছি চার
পাচ্ছি না তা, দেখছি যে বার বার”।

আফিফ তার ছোট ছোট হাত দিয়ে মাটি সরিয়ে খুঁজতে লাগল, নতুন বন্ধু মা কাছিমের ডিম। ঘোড়াও তার পায়ের খুর দিয়ে পাথর বালি সরিয়ে দেখতে দেখতে, – দেখতে পেল সেই ডিমগুলো। কচ্ছপ তাকে অনেক অনেক সুকরিয়া ও সেলাম জানালো। আমার ভালো করে বালি দিয়ে ঢেকে রাখলো তাদের। আমার এই খোলাটা আছে বলে, কেউ আমাকে সহজে মারতে পারে না। আমি ঐ খোলার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। এই জন্য অনেকদিন বাঁচবার সুযোগও পাই। কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বড় আর একটা উভয়চর প্রাণী আছে। দাঁত তার কোর্টের মত। জলেও থাকে, ডুব সাঁতারে এধার থেকে যায় ওধারে, আর ডাঙায় উঠে চুপিসাড়ে যাকে পায় তার ঠ্যাঙ ধরে টেনে নিয়ে যায় জলে, তারপর খুব আরাম করে খেয়ে আবার নদীর কাদায় শুয়ে সূর্যের রোদ পোহায় চোখ বুজে। ভীষণ চালাক সে।

হঠাৎ ঐ দিকে দেখি সত্যি সত্যিই একটা কুমীর বেরিয়ে আছে চার পায়ে। কাঁটা কাঁটা দাগ তার গায়ে আর মুখে কত দাঁত।

“ওরে বাবারে আফিফ, পালাও পালাও ভাগো”।

এক নিমেষে কচ্ছপ আর ব্যাঙেদের দল জলে ঝাঁপ দিল। আর আফিফ ও তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুট লাগলো বাড়ির দিকে।

খোলা চিঠি

চন্দনা সেনগুপ্ত

কারো মৃত্যু হয়ে গেলে কি তাকে আর ‘চিঠি’ লেখা যায় না? মন কে জিজ্ঞেস করলাম বারে বারে। কেন যায় না, সে তো এখন অদৃশ্যভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে কাগজ বা কলমে লেখার পরে তাকে সরকার তৈরী এক মাধ্যমের দ্বারা অর্থাৎ পোস্টাপিসের টিকিট লাগিয়ে পিয়ন বন্ধুর দ্বারা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতাম। পরে সে ভাবে পত্র পাঠানোর রেওয়াজ আজকাল উঠে গেল, কম্পিউটার, মোবাইলের বিশেষ কম্যুনিকেশন-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট-এর সুবাদে ‘ই-মেলে’ মেসেজে পাঠানোর পদ্ধতি চালু হল। সেখানে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করার খুব সুবিধা। চিঠিটি তো দুটি মনের সংযোগ সেতু। কিন্তু মানুষ মরে গেলে আর চিঠির কি দরকার! কারণ সেই অন্য মানুষটি তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না, – এটাই তোমাদের সকলের – অর্থাৎ যে কোন মানুষের ধারণা।

আমার হৃদয় ও আত্মা বলে অন্য কথা। আত্মা তো মরেনি, তাহলে সেই অবিনাশী বিদেহী তো আমার জীবাত্মার একেবারে খুব নিকটে আসতে পারেন। তাকে ছুঁতে হয়ত পারবে না আমার পার্থিব সত্তা, কিন্তু তিনি যদি আমার অন্তরের ভাষা বুঝতে পারেন, আমার আকুল আবেগ – ভাবনাকে জানতে পারেন, তাঁর সম্বন্ধে আমার কতটা শ্রদ্ধা – ভালোবাসা – স্নেহ – প্রীতি সর্বদা প্রবাহিত হয়ে চলছে, তাকে ‘অনুভব’ করতে পারেন, তাহলে তো আমার স্বার্থকতা।

কেউ কেউ হাসবেন। Critic এর দল বিনা বিচারেই মতামত দেবেন – অনুভব আর উপলব্ধি তো জীবন্ত মানুষ করে – মৃত্যুর পরে সে তো অনন্তে বিলীন হয়ে গেল, তোমার কথা শুনে তার লাভ?

আমি বলব – লাভ ক্ষতির হিসাব তো করিনি, শুধু ব্যক্ত করতে চেয়েছি আমার ব্যাকুল বেদনা। তাই এই পত্র রচনা। তার হয়ত আর কোন ফারাক পড়বে না, তিনি হয়ত আমাকে ফিরে উত্তর দিতেও আসবেন না, কিন্তু আমার আত্মা শান্তি পাবে, মুক্তি পাবে আমার অন্তঃ নিহিত সত্য বোধ। –

এই কয়েকমাসে ‘করোনার’ প্রবল প্রতাপে বহু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। প্রথমেই তাঁদের প্রতি আমার প্রণাম জ্ঞাপন করি। চীন দেশে জন্মগ্রহণ করে এই ভয়ানক রোগের দানব প্রথমে সেখানে অসংখ্য লোককে আক্রমণ করে মৃত্যু লোকে পাঠালো। তারপর সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেল, আমেরিকা, ইতালি, ব্রাজিল, ইউরোপে এবং ধীরে ধীরে আমাদের ভারতবর্ষের প্রতিটি শহরে – নগরে – গ্রামে-গঞ্জে। আফ্রিকার জঙ্গলে আদিবাসীদের মধ্যে ও ছড়িয়ে গেল সেই অদ্ভুত কোভিড-১৯। প্রায় একবছর পূর্ন হল, এখনও তার মুখের শিকার হয়ে চলেছে কত যে বৃদ্ধ – শিশু – নর-নারী বিশেষ করে যাঁরা – বিভিন্ন হাসপাতালে সেবারত ডাক্তার, নার্স, গবেষক এই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার ‘ভ্যাকসিন’ বানাবার চেষ্টা করছেন, – যাঁরা অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন, মৃত্যু পথ যাত্রীদের অন্তিম সংস্কার করছেন, তাঁরা শত সাবধানতা নেওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুলোকে যেতে বাধ্য হচ্ছে ঐ ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণু সংক্রমিত হয়ে। তাঁদের পরিবারের মানুষ প্রিয়জনদের সহকর্মীদের স্বান্তনা জানিয়ে – সাহস জুগিয়ে পত্র রচনা করে চলেছি – মনের খাতায়।

এছাড়াও অনেকে যাঁরা কোভিড ১৯ এর জন্য নয় কিন্তু পরোক্ষোভাবে – তার প্রতাপে Lockdown হওয়ার জন্য সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় – সু-চিকিৎসা, ওষুধ পথ্যের অভাবে অসময়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন – তাঁদের উদ্দেশ্যেও সমবেদনার বার্তা পাঠাই আমার অলিখিত সব চিঠির মাধ্যমে। –

আজ মনে হল, আমরা সবাই তো এখন মহা শ্মসানের ধারে মোহনার কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময় অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে যেসব মানুষের চলে যাওয়া হৃদয়কে মুচড়ে দিয়ে গেল, সেই কয়েকজন ব্যক্তিকে লেখা চিঠিগুলি যদি লিপিবদ্ধ করে যাই তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা জানবে এই সময়টা আমাদের এই যুগের সব দেশের, সব জাতের সাধারণ মানুষকে কতটা আলোড়িত করে তুলেছিল। তাদেরকে লেখা পত্র লেখনী এটি।

১) প্রথমে একজন দিল্লীর বন্ধু শিবানন্দ গুপ্ত, ২) নিজের দেশের সমাজ সুধারক আর্য্যসমাজের সন্ন্যাসী “ভাপা শ্যাম রাও”, ৩) সুদূর আফ্রিকার ডাক্তার সোমালিয়া বাসী ডঃ হাওয়া আবেদি, ৪) আমার প্রিয় পরিবারের সদস্য পার্থ গুপ্ত, ৫) আমার প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শেষে ৬) ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদা।

 

প্রথম চিঠি শিবানন্দ গুপ্ত মহাশয়কে

প্রিয় শিবানন্দ,

সুন্দর, সতেজ, হাস্যোজ্জ্বল, সহৃদয় এক বুদ্ধিমান বিচক্ষণ মানুষ ছিলে তুমি। এখনো প্রৌঢ়ত্বের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা দিয়ে মা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে টাটা কোম্পানির সুদক্ষ কর্মবীরের দায়িত্ব পালন করে চলেছিলে তুমি। এতো আনন্দ শান্তি নিরাপত্তা ছিল তোমার সংসারে যার কোন তুলনা করা যায় না। শত্রু ছিল না কোন মিত্র স্বজন তোমার প্রেম প্রীতি ভালোবাসা সিক্ত হয়ে সর্বদা তোমার ও তোমার পরিবারের দিকে তাকিয়ে থাকতো। মা, কন্যা ও পত্নীকে কোনদিন বুঝতেই দাওনি দুঃখ কাকে বলে।

কিন্তু একদিন হল ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট,এটাকে অন্য লোক কোন দুর্ঘটনা মনেই করবে না কিন্তু তোমার জীবনে মোটর সাইকেল সরাতে গিয়ে কোমরে আঘাত পাওয়া একটা বিরাট বড় চাবুকের আঘাত আনলো জানি। ওই ব্যাথার উপশম করতে গিয়ে ধরা পড়ল সেই মারণ রোগের অত্যাচার ও বিস্তারের কথা, – তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত।

পৃথিবীতে তখন সেই ভয়ঙ্কর দানবের চেয়েও এক দুর্দমনীয় পিশাচী রোগ ‘করোনা’ ভাইরাস তার তান্ডবলীলা দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। তাই হাসপাতালে ডাক্তার নার্সরা ল্যাবের পরীক্ষকের সামনে শুধু ঐ ভীষণ কোভিড ১৯ এর রুগীদের ভিড়। অন্য যে কোন রুগী হলেন একেবারে উপেক্ষিত।

শিবানন্দ তুমিও সুচিকিৎসা অর্থাৎ ঠিক সময়ে Ray বা Chemotherapy কিছুই পেলে না। অসহায় প্রিয়জনের চোখের সামনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে। বহু কষ্টে অর্জিত ধন সম্পত্তি এবং সেবা করার মতন তিনজন মমতাময়ীর ছয়খানা হাত ও ছয়খানা ব্যাকুল নয়ন সর্বদা তোমাকে আগলে রাখলেও শেষ রক্ষা হল না তোমার। লকডাউন-এর মধ্যে গৃহবন্দী নির্ভেজাল খাঁটি, সৎ সাহসী এক মানুষের দেহের শক্তি ক্রমশঃ শুষে নিতে লাগল ঐ ক্যান্সারের রক্তবীজ দানব। তুমি সকলকে ছেড়ে চলে গেলে সেই অনন্ত লোকে। তোমার মা পুত্র শোক সহ্য করতে না পারায় তার কিছুদিনের মধ্যেই তোমার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন, তাঁর আত্মাও মিলিত হল সেই শান্তিময় পরমাত্মার সঙ্গে।

নিজের লোকের শোক প্রশমিত হয় যখন আরও অনেকের তরতাজা প্রাণ ভালোভাবে ওষুধ পথ্য অপারেশন এর সুযোগ না পেয়ে চলে গেছে এই ২০২০ সালে তাদের কথা জানতে পারলে। তোমার ও তোমার পরিবারের নিকট ও দূরের আত্মীয়স্বজন, অফিস বা সব প্রিয় প্রতিবেশীদের সমবেদনা জানাবার উপায় না পেয়ে আমার এই খোলা চিঠির অবতারণা। স্বান্তনা দেবার ভাষা নেই, তোমার স্নেহধন্যা কন্যাকে। শুধু বলব সে তো তবুও সময় পেয়েছিল, তাকে পিতা প্রস্তুত না করলেও নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতন শিক্ষা, দীক্ষা ও যোগ্যতা দিতে পেরেছেন, – কিন্তু সুদূর সোমালিয়ার চাকুরীরত একজন অত্যন্ত উৎসাহী প্রাণবন্ত যুবকের হঠাৎ চলে যাওয়ার কথা ভাবো তো – তা হলে তোমার পরিবারের মানুষের মনের চাঞ্চল্য কমতে পারে।  আমার কাকা আশীষ গুপ্তের পুত্রের কথা তোমায় স্মরণ করতে বলি।

জীবিকার প্রয়োজনে তরুণী পত্নী ও এক শিশুপুত্র ও বৃদ্ধ মা বাবাকে দেশে ফেলে রেখে সেই রাজন গুপ্ত আফ্রিকায় অফিসে চলে গিয়েছিল। সেখানে নানাভাবে সে কাজে ব্যস্ত রাখতো নিজেকে। রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামীজীদের কাছে গিয়ে নানান সমাজসেবা মূলক কাজে মেতে থাকতো। স্ফূর্তিতে ভরপুর ছিল সে। যখন সুদূর চীন দেশের কোভিড ১৯ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আফ্রিকার ঘন অরণ্য ভেদ করে আদিবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেখানের মানুষেরাও রেহাই পেলেন না। মাত্র কয়দিনের জ্বরে শ্বাস কষ্টে সে বিনা চিকিৎসায় স্বজন বান্ধব হারা অবস্থায় একাকী মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েও নিজের অবিনাশী অচ্ছেদ্য আত্মাকে তার সুন্দর সুঠাম যৌবনের সমস্ত শক্তি সমৃদ্ধ দেহের খাঁচায় আর আটকে রাখতে পারল না। সে বিনা কোনও ভূমিকায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক অভিমুন্যর মতন মৃত্যুর দেবতার সামনে আত্মসমর্পণ করল। তাঁর পরিবারের মানুষ জানতেও পারল না কখন কেমন করে তার জীবন নাট্যমঞ্চের যবনিকা পতন হয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্যে দশরথ রাজার তীরে বিদ্ধ ‘শ্রবণ কুমারের’ জন্য অন্ধ পিতা মাতা যেভাবে স্বান্তনা লাভ করেছিলেন, আমরাও সেই ভাবে কবিগুরুর ভাষায় বলব – “যাও রে অনন্ত ধামে – মোহ মায়া পাসরি দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি”। তার পরিবারের অসহায়তা বৃদ্ধ মা বাবা, তরুণী স্ত্রী ও কিশোর পুত্রের কথা ভাবলে তোমার স্ত্রী ও কন্যা হয়তো মনে জোর পাবেন। ভাববেন তাদের জীবন তো পিতা শিবানন্দ অনেক সুরক্ষিত করে গেছেন।

 

অন্ধ্র প্রদেশের Vepa Shyam Rao ২১শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। Law এবং management পাশ করে কলকাতায় প্রফেসর হয়ে কাজে যোগ দেন। আর্য্য সমাজের দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাবধারায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন নাম হল স্বামী অগ্নিবেশ। আজকের পত্র আমি তাঁকে লিখতে উদ্যত হয়েছি কারণ ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি স্বর্গ লাভ করেছেন দিল্লীতে।

 

দ্বিতীয় চিঠি স্বামী অগ্নিবেশকে

শ্রদ্ধেয় স্বামীজী,

প্রথমেই আপনার চরণে শতকোটি প্রণাম জানাই। আপনি আর ইহজগতে নেই, আমার মতন হাজার হাজার নর-নারীর মনে কিন্তু আপনি অমর হয়ে আছেন। শত সহস্র শিশু শ্রমিককে আপনার কৃপা লাভে ধন্য করেছেন, সে কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি। তাদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে মানুষ হবার সুযোগ পেল, যারা হরিয়ানার ‘Stone Quaries’ মাত্র পাঁচ টাকার Bonded Lebourer ছিল, তোমার হাতের ছোঁওয়ায় তারা মুক্তি পেল, তারা তোমাকে ভগবান মনে করে। সিল্ক ফ্যাক্টরিতে বা Tannery তে বিষাক্ত ক্যামিক্যাল এর মধ্যে কাজ করতে করতে মালিকের মার খেতে খেতে Beast of Burden এর মতন জীবন কাটিয়েছে তাদের হৃদয় মন্দিরে তোমার মূর্ত্তি আজ জ্বল জ্বল করে কারণ তুমি তাদের উদ্ধার কর্ত্তা।

আমরা তখন গৃহবধূ, শিক্ষিকা, মা হয়ে তোমায় প্রণাম জানাচ্ছি দূর থেকে। লক্ষ্ণৌতে কার্পেট ফ্যাক্টরিতে যে পাঁচ থেকে আট বছরের শিশুগুলির হাত পা বেঁকে গিয়েছিল, দিনরাত ছোট ছোট হাতে তারা কার্পেট বুনে যেত। শিশুদের সঙ্গে পিতামাতারাও ছিল বন্দি। সেই সব দলিত শ্রমিকদের অভিশপ্ত অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য তুমি যে কত সংগ্রাম করেছো – তার পরোক্ষ দর্শক আমরা।

‘দাসত্ব প্রথার’ মতন আমাদের স্বাধীন ভারতেও যে বহু শিশু এখনো ছোট ছোট আঙুলে বিড়ির কারখানায় দিনরাত কাজ করে তাদের আঙুলে ঘা করে ফেলেছিল, কেউ তা লক্ষ্য রাখেনি। তুমি নিজে উকিল ছিলে তাই আইনের দরজায় হাজির হয়েছো, তর্ক-বিতর্কের দ্বারা বিচারকদের মনে দয়ার সঞ্চার করতে, সমস্ত দেশবাসীকে, ওই সব ভূমিহীন বন্দি শ্রমিকদের জাগ্রত ও সচেতন করতে। উঁচু জাতির ধনী লোকেদের কাছে তাই তুমি ছিলে চরম শত্রু আর গরিবদের পরম বন্ধু, তুমি সক্রিয় হয়েছিলে আমাদের মতন মধ্যবিত্ত ছা পোষা, গৃহী মানুষের কাছে এক আদর্শ সন্ন্যাসী। হিন্দু ধর্মের সবরকম কুসংস্কার বর্জিত এক দরদী আর্যপুত্র।

১৯৮১ সালে একদিন কচি ছেলেটি কে বুকে জড়িয়ে আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে ভাবছি যে আমরা যদি এই শহরে না জন্মে ঐ গ্রামের দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করতাম, তাহলে তো আমাদের অবস্থাও ঐ রকম হতো। দূরদর্শনে তো তখন এখনকার মতন এতো খবর পাওয়া যেত না, সাংবাদিকেরাও এত সাহসী বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি। সব সত্য তথ্য আমরা জানতেও পারতাম না। কিন্তু সেদিন যখন খবর কাগজে বা টিভি তে সংবাদ বেরুলো তোমার জয়লাভের তখন আনন্দে চোখে জল এসে গেল। আমরা জানতে পারলাম স্বামী অগ্নিবেশ ‘The Bonded Labourer – Liberation Front তৈরী করে, অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করেছেন এবং জমি ফ্যাক্টরিতে বন্দি শ্রমিকদের উদ্ধার করতে উদ্দ্যত হয়েছেন, কোর্টের কেসেও তিনি জয়ী হয়ে প্রায় ১,৭৮,০০০ লোকের জীবনে মুক্তির আলো দেখাতে সফল হয়েছেন তখন আনন্দে এই তরুণী মায়ের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। এই এক লক্ষ আঠাত্তর হাজারের মধ্যে ছাব্বিশ হাজার ছিল শিশু ও কিশোর যাদের স্কুলে যাওয়ার বা নতুন ধরনের সব প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হল। তারপর থেকে নতুন আশায় আনন্দে তারা নতুন করে বাঁচবার পথ খুঁজে পেল।

স্বামীজী, তুমি ব্রাহ্মণদের মতন কোন দেব-দেবীকে মানতে না বলে হিন্দু পন্ডিতদের কাছে ছিলে অবজ্ঞার পাত্র-ব্রাত্য। অহিংসার পূজারী গান্ধিজী, ও সাম্যের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী কার্লমার্ক্স এর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে Vedic – Socialism আনতে চেয়েছিলে আমাদের ভেদাভেদপূর্ন সমাজে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই তোমার ভালোবাসার পাত্র ছিল।

আমার মনে পড়ে ছত্তিশগড়ের সেই জঙ্গল রাজের হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নকশালদের কার্যকলাপের একটি ঘটনা। একবার তারা যখন কিছু পুলিশ কর্মীকে ধরে নিয়ে যায়, তখন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে তুমি সেই গভীর অরণ্যে তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং ২০ মাইল দূরের গভীর জঙ্গলে উগ্রবাদীদের সঙ্গে বসে বার্ত্তালাপ করে তাদের মধ্যে শান্তির বাণী শুনিয়ে পাঁচজন পুলিশ কর্মচারীকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলে। পুতুল পুজোর বিরোধী রাজা রামমোহন দয়ানন্দের মতন নিরাকারবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই বহু গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে।

‘নবেল শান্তি’ পুরষ্কার পাওয়ার জন্য সেদিন কিন্তু আমাদের দেশের নেতারা কখনো তোমার নাম পাঠায়নি। দেশের সর্বোচ্চ যে সব সম্মানীয় উপাধি আছে – ‘পদ্মভূষণ’, ‘ভারতরত্ন’ দেবার কথাও কেউ ভাবতে পারেনি, কারণ তুমি কোন দলের অন্যায়কে মেনে নিয়ে বা নিজের স্বার্থে যশের লোভে কোন কাজ করোনি। দেশের উচ্চবিত্ত – উচ্চবর্ণের – ক্ষমতাশালী বহু মানুষের তুমি শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। গুন্ডা দিয়ে তোমার কাজ ভন্ডুল করা হয়েছে। তোমাকে এবং তোমার অনুগামীদের মারধর করে রাস্তা বন্ধ করে উদ্ধার কার্য বন্ধ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা এই পৃথিবী থেকে সরাতে চেয়েছে। হতাশ হলেও, দুঃখ পেলেও হাল ছাড়োনি তুমি। এই ৮০ বছর বয়সে বহু অভিমান, অভিযোগ, নৈরাশ্য বুকে নিয়ে এই কোভিড-এর সময় দিল্লীর ‘লিভর হাসপাতালে’ তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে। বিদেশের ম্যাগাজিনে তোমার খবর পড়ে গভীর শোকাচ্ছন্ন মন শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফেলে প্রার্থনা করল, আবার যেন দুঃখী ও অসহায়ের মাঝে ফিরে আসো তুমি, জন্ম নাও আমার সন্তানের ঘরে। স্বামী অগ্নিবেশ প্রণাম তোমায়। –

“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে

তুমি ধরায় আসো, সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো

পাগল ওগো, ধরায় আসো।”

স্বামীজী,

তোমাকে আমার বিবেকানন্দের আর এক প্রতিনিধি মনে হত, যদিও তুমি রামকৃষ্ণ মিশনের মতন কালীপুজো, দুর্গাপুজো করোনি, তাদের মতাদর্শের বা গোষ্ঠী পরিচালনার সঙ্গে তোমার সম্পূর্ণ অমিল ছিল, কিন্তু তবুও মনে হয় – বিবেকানন্দ – নেতাজিরা – ভবিষ্যৎ ভারতে তোমার মতন নেতা – সৎ সাহসী, নিঃস্বার্থ কর্মবীরদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। আমি ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মা এবং স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত হয়েও মনে করি এখন তোমার মতন হাজার হাজার ত্যাগী, নির্লোভী সন্ন্যাসীদের বড় প্রয়োজন। দুঃস্থ, পতিত, দলিত তথা যে কোনও অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য নরেন তাঁর গুরুভাই ও ভক্তদের উদ্বুদ্ধ করতেন। ঘটা করে পুজোর ঘন্টা শঙ্খ ধ্বনি নয় এবার “মানব পূজারীদের” আহ্বান জানাতেন তাঁরা। বড় বড় মন্দির মসজিদ গুরুদ্বারে অথবা তার তোরণ নির্মাণ, পাথর কিম্বা সুবৃহৎ ধাতব মূর্ত্তি বানিয়ে অর্থ নষ্ট না করে এই চরম দুঃসময়ের দিনে হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক, হস্তশিল্পী, জমাদার-ঝাড়ুদার, ঘরের কাজের চাকর, পথে পথে ফল সব্জি বিক্রেতা, সব নিম্ন মধ্যবিত্ত বা অভাবগ্রস্থ অনাহারে বিনা চিকিৎসায় জীর্ণ শীর্ণ হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য তরুণ সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতেন বিবেকানন্দ। আশীর্বাদ করতেন ‘স্বামী অগ্নিবেশ’-এর মতন দরদী ব্যক্তিদের কারণ তাঁর মতে –

“বহু মুখে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা

খুঁজিছ ঈশ্বর –

জীবে প্রেম করে যেই জন,

সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”

 

তৃতীয় চিঠি এক বিদেশিনী কে

পরম শ্রদ্ধেয়, Respected Late ‘Hawa Abdi’- আফ্রিকার ‘সোমালিয়ায় মোগাদিস্যুতে’ ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে জন্ম লাভ করেছিলে তুমি নিজের দেশের এক অসম্ভব দুঃসময়ে। মাত্র তেরো বছর বয়সে অন্তঃসত্তা হয়েছিলে child marriage এর শিকার হয়ে। আর কিশোরী শরীরের ওপর পাশবিকতার লালসার অত্যাচার সহ্য করতে পারোনি তুমি, তাই সন্তানের মৃত্যু হয় তোমার জঠরে। নিজের মা কেও তুমি দেখেছো অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। অন্তঃস্বত্তা নারীর প্রসব যন্ত্রনা ভোগ করা বা পৃথিবীতে পুত্র কন্যাকে নিয়ে আসার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে সোমালিয়ার হাজার হাজার মায়ের জীবনে আনন্দ ও শান্তির বার্ত্তা বহন করে আনতে চেয়েছো তুমি। তাই স্বামী পরিত্যক্ত (মুসলমান সমাজের কন্যা) হয়েও তুমি অসীম সাহস দেখাতে পেরেছো মাত্র ১৭ বছর বয়সে। পিতার অনুমতি নিয়ে ‘রাশিয়ায়’ ডাক্তারি পড়তে গেছো বহু বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। শুধু সাধারণ ডাক্তার নয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হবার মতন উচ্চতর শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে নিজের দেশে ফিরে এসেছো।

ডাক্তার মা, এরপরে তুমি শুধু বাচ্চা প্রসবের দায়িত্ব নাওনি সমাজ সুধারকের ভূমিকাতেও কাজ করতে শুরু করেছো।

আমরা যারা তোমার থেকে অনেক দূরে, সুদূর ভারতবর্ষে বাস করি তারা তোমার কথা অনেক পরে জানতে পেরেছি। আর যতই জানছি মুগ্ধ, বিস্মৃত, হতবাক হচ্ছি।

মা গো, –

তোমার অসীম কৃপায় ধন্য হয়েছেন তৎকালীন বহু বিপ্লবী, সোমালিয়ার সমাজ ও রাজনীতিতে গৃহহীন জঙ্গলে আশ্রয়কারী বহু আহত গুলিবিদ্ধ তরুণ যুবককে তোমার ছোট্ট হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সাহসের ভরে অপারেশন করে গুলি বের করে, রক্তপাত বন্ধ করে প্রাণ বাঁচিয়েছো তুমি। তখন কেউ কেউ অবাক হয়ে গিয়েছিল তোমার কুশলতা ও দক্ষতা দেখে। মেয়ের প্রসব করার হাসপাতালে শত শত সৈনিক তোমার হাতের সেবা পেয়ে পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।

জঙ্গলের মধ্যে একটি পুরো গ্রামকে ঘর বানিয়েছো তুমি। ৯০,০০০ মহিলা থাকেন সেখানে, তাঁদের পুরুষেরা বেশির ভাগই মারা গেছেন বা উগ্রবাদী হয়ে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

সেই সময় তোমার দুটি কন্যা রত্ন জন্মায়। তাদেরও তুমি তোমার পথের অনুগামিনী করেছো। তোমার সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারাও ডাক্তারি পাশ করে সুচিকিৎসক হয়ে যোগ দিয়েছেন তোমার হাসপাতালে। গ্রামের মেয়েরা পড়াশোনা শিখে নার্স হয়ে সেবাকর্মের যজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ধন্য তোমার শিক্ষা। এখানে তুমি সবাইকে শেখাতে পেরেছো “Sitting is empty, Working is plenty” তোমার ঠাকুমার এই বাক্যটি সর্বদা মনে রেখে কর্মযোগীর মতন কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলে তুমি।

তোমার প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা জানাই। ১৯৯০ সালে কত যোদ্ধাকে পথ থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে তুমি, সে কথা পড়েছিলাম কোন পত্র বা পত্রিকায়। ২০১১ সালের চরম দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে উদ্দ্যত হয়েছিলে তুমি। পুষ্টি যুক্ত “শরগুন ঘাসের” বা মিলেটের রুটি খাওয়াতে দেখা গেছে তখন তোমায় অভুক্ত মানুষদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে। কারন তুমি জানতে শরগুন ঘাসে অনেকরকম নিউট্রিয়েন্ট থাকে।

তোমার গ্রামে নারী ও শিশুরা নির্ভয়ে বাস করে। মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী হলেও কোনরকম গোড়ামি বা কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দাওনি তুমি। তাই ২০১০-এ একবার  এক Islamic Militantsরা তোমার ওপরে ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায় এবং তোমার ঐ সুন্দর সাজানো বহু কষ্টের তৈরী হাসপাতালে আক্রমণ চালিয়ে ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় সব যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটর।

কোন পুরুষ সেই গ্রামে নারী নির্যাতন করতে সাহস পান না। তাহলে তাকে সব মেয়েরা মিলে বন্দি করে রাখে এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। এটা তোমার নিয়ম তৈরী করা আছে ওখানে। ৭৩ বছর বয়েসে ৫ই আগস্ট কোভিড-এর দুঃসময়ে তুমি ইহলোক ছেড়ে চলে গেলে। অত্যন্ত দুঃখে ভেঙে পড়েছে সমস্ত ‘মোগাদিস্যুর’ মানুষ, আমরাও তোমায় প্রণাম, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই।

 

চতুর্থ চিঠি নিজের ভাইকে

স্নেহের ভাই বাচ্চু, –

কোভিড ১৯ আক্রমণের ২ মাস আগে আমার স্বর্গীয় পিতা ডঃ কল্যাণী প্রসাদ গুপ্তের শতবর্ষ জন্ম উৎসব উদযাপনের জন্য বাঁকুড়ায় গিয়েছিলাম, তখনই তোর সাথে আমার শেষ দেখা।

আকাশ ভরা সূর্য্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ – আমাদের মনে এক অপূর্ব আনন্দ ও উন্মাদনা জাগিয়েছিল, আমার মন নেচে উঠেছিল তোর গানের তালে। সেই ছোটবেলার দিনগুলোকে আবার ফিরে পেয়েছিলাম আমরা।

তুই শান্তিনিকেতন থেকে আসতিস এবং আমি বেথুন স্কুলের হোস্টেল থেকে। গরমের ছুটিতে, পুজোর ও বড়দিনের সময়ে আমাদের পূর্ন ভবনের গোল ঘর নাচে, গানে, নাটকে, আবৃত্তিতে মুখর হয়ে যেত – সঙ্গে থাকতো মায়ের উদ্দাত্ত কণ্ঠস্বর ও হারমোনিয়াম বাজনা।

ছোট ভাই সিদ্ধার্থ তখনও গিটার বাজাতে বা গান গাইতে শুরু করেনি। সুর লহরীতে ভাসতেন বাবা, গনুদাদা বা আগত অনেক আত্মীয় স্বজন। কখনও ‘বাল্মীকি প্রতিভার’ সব গানগুলো ছাড়া গলায় একাই গাইতে পারতিস তুই।

ডাকাতদের অভিনয়  দেখাতিস নেচে নেচে –

“প্রাণ নিয়ে তো সঠকে ছি রে – – –

ওরে বরা – – – ।

মোহরদী, নীলিমাদির গল্প শুনতাম আমরা তোর কাছে। সলিল চৌধুরী সবিতা চৌধুরীর গান শুনতে কেমন করে হোস্টেলের পাঁচিল ডিঙিয়ে তোরা বীরেন দা, কণিকা দি (মোহর দি)র বাড়ির আসে পাশে ঘুরে বেড়াতিস – সেই সব গল্পে মোহিত হয়ে থাকতো তোর এই ছোড়দি ভাই।

আমার খুব মনে হত সুযোগ পেলে তুইও ‘দেবব্রত বিশ্বাসের’ মত বড় শিল্পী হবি। তোর গলার ভরাট আওয়াজ ও গায়কী ঢঙটা ঠিক ওনার মতোই ছিল।

স্কুল পাশ করে ‘সংগীতভবনে’ কিম্বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকের জগতে যদি ভর্তি করা হত তোকে তাহলে হয়ত বড় একজন গায়ক বা অভিনেতা রূপে তোর আত্মপ্রকাশ ঘটতো। কিন্তু তা হয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে একটি গান শুধু পূর্ববঙ্গ নয় পশ্চিমবঙ্গেও ভীষণ ভাবে গাইতে শোনা যেত। “শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে – – -” সেই গান তোর গলায় শুনে গায়ে কাঁটা দিতো আমার। মনে হত সব ছেড়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিতে চলে যাই। বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে একটা নতুন দেশ গঠনের ঘটনা, তাজা তাজা প্রাণের বলিদান ও হাজার হাজার মানুষের গৃহ ত্যাগের খবর নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠতাম আমরা দুই ভাই বোন। ভাবতাম আমরাও এই সমাজের জন্য কিছু কাজ করব – শিল্প, সাহিত্য, সংগীতের সাধনায় নিজেদের প্রাণ মন ঢেলে দেব। কিন্তু না, অদৃষ্টের চাকা আমাদের অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। তুই ওষুধের দোকানি ছা পোষা মধ্যবিত্ত ও আমি সংগ্রামী এই প্রবাসিনী গৃহবধূ হয়ে দুই বিপরীত ধর্মী পরিবেশে খুবই সাদামাটা জীবনে বন্দি হয়ে গেলাম।

থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় —- দোকানে দোকানে ওষুধ বেচা, বাজার করা, ছেলেকে স্কুলে এবং সে ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পরও মেডিকেল কলেজে পৌঁছানো। স্নেহশীল পিতা – দায়িত্বশীল স্বামীরূপে, সহৃদয় পিতা রূপে দিনের পর দিন একই গতে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার আবর্তে ঘূর্ণায়মান তোর সময় কেটে যেতে লাগল। সেই সব বয়ে চলা সময় যখন একই ঢেউয়ের তালে তাল মেলায় তখন তবুও একটা ছন্দ হয়ত থাকে কিন্তু স্ত্রীর – জীবন সঙ্গিনীর অসুস্থ হওয়া এবং বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ায় সেই মন্দাক্রান্তা ছন্দের লয় হঠাৎ সব ওলোট পালট করে দেয়। সবাই ভাবে ঐ ছা পোষা নির্ভেজাল সাদাসিধা মানুষটি এবারে একেবারে ভেঙে পড়বে। কিন্তু তোর হৃদয়ের প্রেমিক শিল্পী সত্ত্বা যেন একটা কাজ খুঁজে পায়। একজন মহিলা নার্সের মতন ঐ রুগ্ন পত্নীর পাশে বসে সেবায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্রতকে বুকে চেপে ধরলি তুই ভাইটি।  তাও তো তাকে রক্ষা করতে পারলি না।

বাচ্চু, তোর দিনগুলো কিন্তু এক অসাধারন অন্য অনুভবে উপলব্দ্ধিতে এরপর থেকে – অন্য এক জগতে উন্নীত করে দেয় তোকে। ওষুধের ব্যবসা তোর লাটে উঠেছে, নিজস্ব পুঁজি শেষ হয়ে গেছে – কিন্তু ছেলের মাইনের টাকায় সংসার চলতে আরম্ভ হলে আর্থিক স্বাধীনতা হারিয়ে ছেলের অধীনস্থ হতে হতে ক্রমশঃ নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়ে গেলি তুই। স্ত্রী বিয়োগে পুত্রের প্রতি মোহ আরও বাড়তে শুরু হল। হীনমন্যতা ও হতাশায় ভুগতে লাগলি তুই।

সর্বদা পাশে থাকার, কথা বলার মানুষটিকে হারিয়ে দিশাহারা একাকী একেবারে অসহায় হয়ে গেলি তুই। আমরা ভাই বোনেরা তোর ছোট বেলার সঙ্গী বন্ধুরা কেউ কিছুই করতে পারলাম না।

জীবনের সংগ্রাম একদিকে মানুষ চিনতে শেখালো আমাদের। বাস্তব জগতের নানা সমস্যার সমাধা করতে গিয়ে আমরা হয়ত দৈহিক – মানসিক ও আবেগের ভারসাম্য ক্রমশঃ হারিয়ে ফেলতাম, কিন্তু সমস্ত দুঃখ আবার ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতাম। প্রবাসে বাস করে আমার একটা সুবিধা ছিল, নানা জাতের, নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষের প্রভাব। কিন্তু কূয়োর ব্যাঙের মতন শুধু বাঁকুড়ার গন্ডিবদ্ধ জীবনে তুই আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলতে লাগলি তোর সাহস তথা মনের জোর। নানান ‘সাইকোসোমাটিক’ রোগে ধরল তোকে। শিশির বিন্দুর মতন অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালো লাগা, ইচ্ছেগুলোও দ্বন্দ্ব – দায়বদ্ধতা এবং প্রকাশ করতে না পারা ক্রোধের উত্তাপে শুকিয়ে গেল, উবে গেল। অনেকবারই –

তোর ছোড়দিভাই সর্বদা তোকে বাঁচাতে, ঐ নৈরাশ্য থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছে, নিয়ে আসতে চেয়েছে নিজের বাড়িতে – নিজের সুন্দর শান্তিময় স্নেহছায়ায় – গল্প কথা গানে এবং ভ্রমণের লোভ দেখিয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। সেই হানিমুনের নামে একবার স্বস্ত্রীক তুই এসে হরিদ্বার, হৃষিকেশ ঘুরে গেলি, পরে কিশোর পুত্র কে নিয়েও একবার এসে ঘুরে গেলি দিল্লী। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় খুব তাড়াতাড়ি বার্দ্ধক্য এসে গেল তোর মধ্যে। যখনই কথা বলি শুধু হতাশা, হাহাকার ও নৈরাশ্য ভরা দীর্ঘশ্বাস, আমাকে বড্ড ব্যথিত করতো।

একবার ভাইফোঁটায় বাচ্চু ভাইকে ফোঁটা দেব – আনন্দে রাখব – কিছুদিন মনের সুখে সেবা করব – যা খেতে ভালোবাসে বা শরীরের প্রয়োজনীয় সেই সব ফল/মূল/মাছ/মাংস খাওয়াব এই আশা বুকে নিয়ে খুব জোর লাগলাম। ট্রেনের টিকিটও কাটা হল। কিন্তু পারিবারিক ও শারীরিক সমস্যা তোকে বাধ সাধল। শেষ দিনে টিকিট ক্যানসেল করে দিলি তুই।

খুব দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি। আবার উঠে পড়ে লেগেছিলাম আমাদের বাবার জন্ম শতবর্ষের উৎসব উদযাপনের বাহানায় আবার আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে একত্রিত করে একটা আনন্দ সমারোহ করতে।

২০১৯ সালের ২০শে অক্টোবর সেই অনুষ্ঠানে তোকে দিয়ে গান গাওয়ালাম। আত্মীয় বন্ধু শহরের ১০০ জন বিদগ্ধ দর্শক, বাবার ছাত্র ছাত্রী ও পরে আমাদের ছেলে বৌমারাও শুনলো সেই গান। তোকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তোর আত্মবিশ্বাস জাগানোর জন্য ৭০ বছরের ছোড়দি সেই পার্থ গুপ্তের গানে নাচও করে ফেললো আনন্দের তোড়ে ভেসে গিয়ে। তোর বাড়ি গিয়ে জামাইবাবু নির্মলদা ও আমি অনেক counselling করলাম। কথা দিলি আবার তুই গান-বাজনা ভ্রমণের আনন্দে জুটে যাবি। কোভিড ১৯ এর করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরু হল তার মাত্র ২/৩ মাসের মধ্যেই।

গৃহবন্দী হয়ে বন্ধু-বান্ধব – বাইরের খোলা হাওয়া – দ্বারকেশ্বর নদীর ধার, রাজগ্রামের তাঁতীপাড়ার সহজ সরল মানুষ, বাড়ির অনতি দূরের ভৈরব স্থান – স্টেশনে ছেলের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় প্লাটফর্মে কুলিদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠা – চা চপ খাওয়া – প্রতিবেশী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাড়ি গিয়ে ঘরেলু আড্ডায় সময় কাটানো সব বন্ধ হয়ে গেল তোর। ভাগ্যলক্ষী যখন মানুষকে ত্যাগ করেন, তখন বোধহয়, ধন দৌলতের চেয়ে বেশী মানুষ তার নিরাপত্তা ও শান্তি কে হারিয়ে ফেলে।

কেউ অবজ্ঞা না করলেও সর্বদা মনে হয় – আমাকে এরা বোধহয় আর সহ্য করতে পারছে না। আমি চলে গেলেই ভালো হয়। বাঁচার ইচ্ছে হারিয়ে যাওয়ায় ঠাকুরও হয়তো তোর মিনতি শুনলেন। অতিরিক্ত ডায়াবিটিস, আর্থারাইটিস, রক্তের উচ্চ চাপ তো ছিলই তার সঙ্গে যুক্ত হল নার্ভের রোগ, হাত পা কাঁপা। বিষাদ ভাবনা তোকে মাত্র ৬৫/৬৬ তেই ৮০/৮৫ র মতন বার্ধক্য যন্ত্রনায় অস্থির করে মৃত্যু দেবতাকে খুব তাড়াতাড়ি ডেকে আনলো। তারওপর দুই চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে এলো তোর। তাই এই পরপারের অন্তিম যাত্রা তোকে সব ব্যাথা বেদনা ক্লেশ এবং নৈরাশ্য থেকে মুক্তি দিল – তা জেনে হয়ত আমি মনকে স্বান্তনা দিলাম সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে। কিন্তু কোভিড দানবের অত্যাচার না হলে হয়তো আমাদের আবার দেখা হতো। তাই পরোক্ষভাবে এবারেও সারা দোষ ঐ গৃহবন্দী দশা সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসের ওপর ন্যস্ত হল।

আমি তোকে গতবছরে অনুরোধ করেছিলাম বন্ধ ওষুধের দোকানটি পরিষ্কার করে ওখানে একটি সংগীত বিদ্যালয় খুলতে। তুই বসে বসে শুনবি। অন্যান্য গানের নাচের বা গিটার তবলার মাস্টারমশাইরা এসে সময় ধরে শেখাবেন। নতুন নতুন ছাত্র-ছাত্রী-শিশুদের-কিশোর-কিশোরীর কলকাকলিতে ভরে উঠবে তোর গৃহের অঙ্গন। সংগীতের মূর্ছনায় তোর রোগ ও শোক উপশম হবে।

কিন্তু সে ইচ্ছে আর পূর্ণ হল না। “তোমার অসীমে” গানটা প্রায় গাইতিস, আমিও আজ তাই গুরুদেবের কথা শুনিয়ে তোর চিঠিটার ইতি টানছি। এই ভারতবর্ষের ঘরে বসে এখন যদি ইন্টারনেটের সুবাদে কানাডা আমেরিকার মানুষের সঙ্গে চাক্ষুস দেখে বার্তালাপ করতে পারা যায়, তাহলে এই চিরন্তন আত্মা এখন যেখানেই থাকুক না কেন ঠিক এই চিঠির শব্দ অনুধাবন করতে পারবে। আমার জীবাত্মা তোমার পরমাত্মায় লীন হওয়া বিদেহী সত্ত্বাকে নিশ্চয়ই পরশ করতে পারবে। কারন তুমি তো এখন সেই অনন্তধামে দেবলোকে বিচরণ করছো। তাই মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে।

বাচ্চু ভাই – আত্মা অবিনাশী, আমরাও তাই বলি – “হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, যাহা কিছু সব আছে আছে আছে, নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারি নিশিদিন কাঁদি তাই।” কিন্তু এখন সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসায় তরণী এ কর্ণধার।

 

পঞ্চম চিঠি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে লেখা_ _ _

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সমীপেষু –

সামনে থেকে কখনও কি দেখেছি তোমায়? আলাপ পরিচয় হয়েছিল আমাদের? না বোধহয়। কিন্তু বাড়ির একজন প্রিয় সদস্যের মতন অত্যন্ত চেনা, অত্যন্ত প্রিয় ছিলে তুমি।

অপুর সংসার থেকে বেলাশেষে, হীরক রাজার দেশে, ফেলুদা কোনটাতেই তুমি অভিনয় করো নি এমন একাত্ম হয়ে গিয়েছিলে, যে ওরা সবাই আমাদের মনের মানুষ হয়ে গিয়েছে। তোমার শেষরক্ষা নাটকের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার কিশোরী মন। ‘ঝিন্দের বন্দির’ ময়ূর বাহনের সঙ্গে ‘তিন ভুবনের পারে’ নায়কের কোন মিল ছিল না, কিন্তু তোমার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, চরিত্র রূপায়ণের ক্ষমতা – প্রতিভা – সমস্ত বাঙালীর মনকে আপ্লুত করেছে। ৮৫ বছর কম নয়। জীবনের এই যাত্রা কালে কত মানুষের সম্পর্কে এসেছো তুমি, আমি ‘লক্ষ্মীপুরুষ’ গল্পটি লেখার পর থেকেই ভেবেছি যদি কখনও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই গল্পে বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন।

ও হ্যাঁ মনে পড়েছে সামনে থেকে কবে কোথায় তোমার চেহারা দেখেছি। ১৯৭৩ সালে যখন শান্তিনিকেতনে এম এ পড়ি তখন সত্যজিৎ রায়ের “অশনি সংকেত” এর শুটিং চলছিল কাছেই একটি গ্রামে। আমরা ক্লাস কেটে সেখানে পালাতাম, শুধু তোমায় দেখবো বলে। যেমন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালন ক্ষমতা ও কৌশল তেমনি এক বাচ্চা ছেলের মতন – বাধ্য ছাত্রের মতন তোমার তাঁকে অনুসরণ করা।

ভীষণ ভাল লেগেছিল আমাদের। বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতাকে দেখে হিংসে হত – ও তো আমাদের মতন এক সাধারণ মেয়ে, ও কি করে চান্স পেল, তোমার সঙ্গে নায়িকার রোল করতে – – – আহা আমাকেও যদি নিতেন জীবন ধন্য হয়ে যেত। সত্যজিৎ রায়ের সেট এর আসে পাশে ঘুরে বেড়াতাম সেই জন্য। তখন দেখেছি তোমার কাজের কি নিষ্ঠা। ‘কোভিড’ এর আক্রমণেও আক্রান্ত হলে তুমি সেই অভিনয়ের শুটিং করতে গিয়ে। এই বয়সে গৃহবন্দী থাকতে পারলে না। কাজের নেশা ও অর্থের প্রয়োজন তোমাকে বাধ্য করল। সারা জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী পত্নী ক্যান্সারে ভুগছেন, এবং এই রোগ যার পরিবারে আসে তাদের অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে যান। যে নাতি তোমায় সুখময় সাচ্ছন্দপূর্ণ জীবন দিতে সমর্থ হত সেই নাতি সেই কবে মোটর বাইক দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। তার চিকিৎসার দায়িত্বও তোমার ওপর ছিল, তাই তোমার মনের মধ্যে কত বড় ঝড় চলছিল, তা হয়তো তোমার সহকর্মীরা বুঝতে পারেনি।

সংগ্রামের মধ্যেও অটুট থাকার শিক্ষা দিয়ে গেলে বাঙালী জাতটাকে। কমিউনিস্ট মানসিকতার ছিলে বলে অনেকেই তোমার নিন্দায় সোচ্চার হত। কিন্তু ঐ সাম্যবাদী মন তোমাকে কোন আদর্শের কাছে মাথা নত করতে দেয়নি। কোন অন্যায় দেখলেই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছ, মিছিলে হেঁটেছ সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তোমার শেষ যাত্রায় তাই সব রকম লোকেরাই যোগ দিয়েছে, কোভিড-এর ভয় উপেক্ষা করে। আমরা প্রণাম জানিয়েছি সুদূর প্রবাসে থেকে।

তিন ভুবনের পারে, কোন স্বর্গের দ্বারে

প্রতীক্ষামান তুমি এখন !

জানি না আমরা কেউ।

শুধু মানি ‘কোভিড দানবটা’ যতই অত্যাচার –

উৎপীড়ণ করুক, জব্দ করতে পারেনি,

স্তব্ধ হয়ে গেছে তোমার যুদ্ধ ক্ষমতা দেখে।

সারা পৃথিবীর করোনায় আক্রান্ত

মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তুমি পাঞ্জা লড়ে

মৃত্যুকে চল্লিশ দিন ধরে

ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছো।

আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম – অবাক হয়ে

সেই রণক্ষেত্রের দিকে।

ভাবছিলাম এই বুঝি খবর আসবে –

তুমি ছাড়া পেয়েছো হাসপাতাল থেকে।

একটা রোগ দমন করলেও আর এক

রক্ত-বীজ দানব যে তোমার দেহ পিঞ্জর

কে একেবারে জীর্ন করে ফেলেছিল, তা

জানতাম না আমরা।

আত্মা অবিনাশী – সে তাই আর থাকতে পারল না,

আবার ফিরে গেল পরমাত্মার সঙ্গে

মিলনের আনন্দে স্বর্গ লোকে।

তোমার মন মাতানো হাসি, প্রাণ জুড়ানো

কথা ও বাচিক শিল্পীর অসাধারন

প্রভাব বুকে নিয়ে বাঙালী বেঁচে রইল।

অমরত্ব পেলে তুমি আমাদের মনে।

শ্রদ্ধায় আপ্লুত স্মৃতি শুধু ধরা রইল

আমাদের প্রাণে।

 

ষষ্ঠ ও শেষ চিঠি ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদাকে

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

দাদা, আপনার কোভিড-এ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাইনি আমরা, শেষ দিনে যে সে আপনাকে মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে একবারে পরাস্ত করবে, সে খবর যখন পেলাম তখন ভীষণ দুঃখ, ক্রোধ, অভিমান জন্মালো ভগবানের ওপর। কেন যে তিনি ঐ করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯ কে দমন করতে পারছেন না, বুঝতে পারছি না। ঈশ্বরের নিষ্ঠূরতার শিকার হচ্ছে কতশত ভালো ভালো প্রাণ। সারা বিশ্ব আজ কাঁপছে, কাঁদছে ও হাহাকার করে উঠছে। ভ্যাকসিন বেরিয়েছে শুনেছি কিন্তু কত দিনে সেই ওষুধ ইঞ্জেকশনে বিষে বিষে বিষক্ষয় করতে সমর্থ হবে জানি না। মানুষ বড়ই অসহায়, নিরুপায়। তার ক্ষমতা কোথায় এই বিশাল শক্তিশালী রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করার। দুর্গাপূজায় হিন্দুরা আকুলভাবে ডেকেছিল মা কে। ঈদের দিন মুসলমান জনতা তাদের আল্লাহর দুয়া মেগেছিল, ২৫শে ডিসেম্বর সারা রাত খৃষ্টানেরা খ্রিষ্টকে স্মরণ করে ঈশ্বরের কাছে একান্তভাবে প্রার্থনা করেছিল, এইবার তো তুমি এই ধরার মানুষকে রক্ষা করো প্রভু। কিন্তু কারো মনোকামনা, ব্যাকুল মিনতি, আকুল আবেগে ঐ ভগবানের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সারাটি বছর ধরে যে তান্ডবলীলা চলেছে তৃতীয়বার সারা আমেরিকা, ইউরোপে আবার তার প্রচন্ড প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে তা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শেষ দিনে ‘পাপিয়ার’ আর্তনাদ শুনতে পেলাম আমেরিকার থেকে – “বাবাকে নিয়ে গেল কোভিড। মা ও হাসপাতালে।”

 

 

 

শ্রীচরণেষু

দাদা, ১৯৭৪ সালে বিয়ে হয়ে প্রথম যখন সেনগুপ্ত পরিবারে এলাম তখন আপনার মাসি আমার মা (শাশুড়ী মাতা) আমায় জানালেন তাঁর পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, সহজ সরল সদস্য মন্টু। অর্থাৎ আমার “ভাসুর” প্রিয় বিজ্ঞানী, নিরাহংকারী স্নেহশীল ‘ডঃ অমলেশ চৌধুরী’ – আমার জীবনে একজন বিশেষ অনুপ্রেরণা উৎসাহ ও স্নেহ প্রদানকারী ব্যক্তি।

যখনই সোদপুরে সেই বিরাট বাগানঘেরা বাড়িতে গেছি, আপনার নিচের তলার আলমারীতে থরে থরে সাজানো নানান সামুদ্রিক জীব এবং মানুষের ভ্রূণ, হাড় কঙ্কাল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি আমি। আমার বিজ্ঞেনের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ও কৌতূহল, নানান প্রশ্ন আপনাকে খুব আনন্দ দিতো। অন্যদিকে দিদিভাই দীপ্তি চৌধুরীর আপ্রাণ চেষ্টায় গড়ে তোলা একটি ‘শিশুপাঠশালা’। কত সুন্দর করে দেওয়ালে দেওয়ালে রকমারী জন্তু জানোয়ারের ছবি, ফুল, পাখি আঁকা – নানান চার্ট পেপারে ছোট ছোট অক্ষরে বা A B C D র সঙ্গে লেখা নানান সব ছড়া, রঙের আঁকিবুকি আমার মনকে বিশেষভাবে আকর্ষিত করত। আমি দমদমে থাকলে হয়তো আপনার ঐ পাঠশালার একজন সক্রিয় শিক্ষিকা হয়ে উঠতাম। নাচে, গানে, নাট্য খেলায় আপনার গৃহের আঙ্গনটি মুখরিত করে দিতে পারতাম। কিন্তু আপনার প্রিয় ভাই “মঙ্গল” (শ্রী নির্মল প্রসাদ সেনগুপ্ত) দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রান্সফার হয়ে দিল্লী চলে এসেছেন তাই সোদপুরের বাড়ি আপনার ও দিদিভাইয়ের স্নেহচ্ছায়া থেকে দূরেই থাকতে হল আমাকে। কিন্তু দুই ছেলেকে নিয়ে বার বার গেছি আমি আপনার কাছে, যাতে সেখানে গিয়ে আপনার কাছে আমার ছেলেরা বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শেখে। পড়াশোনাকে ভালোবেসে জীবনে আপনার মত যশস্বী কিন্তু নিরাভিমানী শান্ত স্নিগ্ধ হতে পারে। তারাও আমার মতন নানান কথা গল্পে প্রশ্নে আপনার গবেষণার কাহিনী শুনতে আপনাকে অতিষ্ঠ করে তুলতো। তাদের আপনি আপনার গবেষণারত ছাত্রদের সঙ্গে একবার সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে পাঠালেন। ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে তারা গভীর জঙ্গলে ছোট ছোট নদীর খালে বিলে ঘুরে মাছ – কচ্ছপ কুমীরের দেখা পেয়ে ভীষণ আনন্দে বিগলিত হয়ে গিয়েছিল।

ছোট ছেলে তো বায়োলজি তে প্রাকটিক্যাল প্রজেক্ট করবার জন্য কোথায় কোন বাজারে গিয়ে দুটো কচ্ছপের ছোট ছোট বাচ্চা কিনে আনলো। আপনি নিজে সঙ্গে গিয়ে সেগুলি কিনতে সাহায্য করেছিলেন। ওরা সারা রাতদিন খট খট করে ঘরে ঘুরে বেড়াতো। ওদের প্রত্যেকটি movement নিয়ে study করতে এবং project বানাতে আপনি ওর বন্ধু, শিক্ষকের মতন সাহায্য করেছিলেন। আপনি যখন ঐ ১৬ বছরের ছেলের সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করতেন ‘মেরিন বায়োলজি’ সম্পর্কে ওকে অনেক প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিতেন তখন ও ভীষণ খুশি হত, এবং আপনাকেও ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু মনে হত। রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে আমি বারে বারে দেখতে থাকতাম আপনার সঙ্গে আমার ছেলের ঐ আন্তরিক খোলা মেলামেশা, হাসি ঠাট্টা – ঐ সব সামুদ্রিক জন্তু জানোয়ারদের গল্প অক্টোপাসের camoflage – আট হাত পা ও রঙের বাহার নিয়ে সমুদ্রের জগৎকে তোলপাড় করার কথা, shark বা whale এর পার্থক্য monitor lizard বা house lizard এর তফাৎ নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হত আবার আমি যদি পড়তে পারতাম। আপনার ক্লাশে zoology অনার্সে ভর্তি হতে পারতাম।

আপনার দুই মেয়েই বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল। ভীষণ বুদ্ধিমতী ও শান্ত স্বভাব তাদের। পরবর্তীকালে ‘পাপিয়া’ আমেরিকার (কলম্বিয়া) ইউনিভার্সিটিতে সায়েন্টিস্ট হল তখন আমি আপনার ভাই আপনি ও দিদিভাই চারজনে মিলে নিউইয়র্কের ঐ ল্যাব-এ তার কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। আনন্দে আমাদের সকলের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরে ছিল। আমি কবিতা লিখে রেখে এসেছিলাম তার টেবিলের ওপরের এক নোটিস বোর্ডে। গর্বিত হয়েছিলাম আমরা। সেই সময়কার আরও একটি বিশেষ “ঘটনা” আপনার প্রতি আমার মনকে আরও শ্রদ্ধায় আপ্লুত করে দিয়েছিল। আজকের খোলা চিঠিতে সেই কথা ব্যক্ত করার জন্যই লেখা।

পাপিয়া আবিরের (পাপিয়ার স্বামী) staten Island এর ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিউইয়র্কের কাছে নতুন গৃহে প্রবেশ করেছে। আপনারা দুজনে সোদপুর থেকে এসেছেন, আমরাও ক্যালিফোর্নিয়ায় ছেলেদের বাড়ি থেকে পৌঁছে গেছি সেখানে। নাতি দেবায়নকে নিয়ে খুব আনন্দে হৈ চৈ করে সময় কাটাচ্ছি চার জনে। নানারকম রান্না করে খাওয়াচ্ছি আমি আপনাদেরকে। একদিন ওদের ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে বাড়ি- গাড়ি – টাকা – পয়সা – চাকরি ইত্যাদির আলোচনায় মশগুল আমরা, হটাৎ দেখলাম আপনি উঠে চলে গেলেন। বাগানের বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কান পেতে কার যেন ডাক শুনতে লাগলেন। আমিও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি, সেদিকে লক্ষ্য নেই আপনার। কাকে যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গাছের ডালে ডালে পাতার ফাঁকে। পড়ন্ত সূর্যের রৌদ্রের কিরণ আপনার শিশুর মতন সরল মুখে এক ঝলক রক্তিম আভা মেখে দিয়েছে। আপনি আপন মনে খুঁজে চলেছেন একটা ‘পোকাকে’, যার নাম “শিকাডা”। যার ডাক শুনে ঐ আরাম কেদারা সরস আলোচনা ছেড়ে আপনি একা বাগানে বেরিয়ে এসেছেন। আমি তার সম্বন্ধে একটু কৌতহল প্রকাশ করায় কী খুশি আপনি।

“শিকাডা” পোকার সম্বন্ধে কত information যে আমাকে বিস্তারিত ভাবে দিতে লাগলেন, তার যেন কোন শেষ নেই – আমি যেন এক রিসার্চ স্টুডেন্ট, – zoology এর ছাত্রী। ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। একটা পোকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে চান আপনি India তে। ওখানের রিসার্চে ব্যস্ত গবেষক ছাত্রদের দেখাবেন ভারতীয় পোকা ও আমেরিকার পোকাদের মধ্যে কি কি পার্থক্য। কখন কখন কিভাবে ওরা একমাস ধরে নিজেদের বন্ধু খুঁজতে ঐ ভাবে অনেকটা ঝিঁ – ঝিঁ পোকার মতন এক নাগাড়ে ডাক ছাড়ে।

আমি বুঝেছিলাম আসল জীব বিজ্ঞানীর রূপ ও মনোভাব কেমন হয়। সাগরদ্বীপের গবেষণাগারটি যখন এবারে আমফানের ঝড়ে ভেঙে গেছিল, তখন ক্ষতিগ্রস্থ সেই গৃহের জন্যে আমি ডোনেশন ও অর্থ সংগ্রহ করার পর আপনার সে কী আনন্দময় শিশু সুলভ হাসি দেখেছি – যা ভোলবার নয়। দাদা, আপনি হাজার হাজার ছাত্রের মধ্যে আপনার প্রভাব ও অনুপ্রেরণা রেখে গেছেন। আপনাকে স্বর্গের ঠিকানায় চিঠি লিখে শত সহস্র প্রণাম নিবেদন করি।

ত্রিনয়নী ( Trinoyoni )

চন্দনা সেনগুপ্ত

কলকাতার এক সরকারী হাসপাতালের লেবার রুম। একটা ঘরে একগাদা মহিলা, প্রসব বেদনায় কাতর। তাঁদের সঙ্গে আগত মা, বৌদি, মাসী, দিদিরা সব বাইরের বেঞ্চে বসে আছেন। যাদের যন্ত্রনা ঘন ঘন আসছে, ঢেউয়ের মতন ওপর পেট থেকে নীচে সমস্ত শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে বা মেমব্রেন রাপচার মানে জলের থলি ভেঙে ঝর ঝর করে জল বেরিয়ে পড়ছে, তাদের অবস্থা বুঝে একেক করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – প্রসূতি ঘরে। ডাক্তার – নার্সরা ছুটে যাচ্ছেন তার পাশে।

নিজের জন্মের সময়কালে কি কি ঘটনা ঘটেছিল তা আমার জানার কথা নয়, কিন্তু মা এতবার আমাকে সেই গল্পটা করেছেন, যে মনে হয় আমি চোখের সামনে দৃশ্যটা খুবই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি। সেই প্রথম দিন থেকেই তো আমার জীবনে চমকের পর শুধু চমক দেখা দিয়েছে। ভাগ্যদেবীর ছলনা কি বুঝতে পারি আমরা? না, আমার মাও তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু আমাকে আজ তা ব্যক্ত করতেই হবে। না হলে মরেও শান্তি পাবো না আমি।

মায়ের সঙ্গে সেদিন কেউ ছিলেন না, শুধু বাবা শুকনো মুখে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। মা কে বার বার পরীক্ষা করার পর যখন নার্স দেখলেন সে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে কিন্তু অন্য মেয়েদের মতন চিৎকার করছে না, মুখ দাঁত চিপে ওঃ মা, ও বাবাঃ করতে আরম্ভ করেছেন, তখন তাঁকে নিয়ে গেল – লেবার রুমে, টেবিলে শুতেই একজন মাথার দিকে এসে দাঁড়ালেন। আরও দুজন এসে চেপে ধরলেন হাত দুটি, পায়ের কাছে ডাক্তার ম্যাডাম সাহস দিলেন, – কোন ভয় নেই, জোর দাও, বাচ্চার মাথা এসে গেছে।

আপ্রাণ চেষ্টায় জঠর বন্দি শিশুটিকে বাইরে আনতে হবে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্যে; যে বাচ্চাদানীর মুখে মাথা কুটছে শুধু মায়ের শক্তি ও চেষ্টাই তাকে ঠেলা দিয়ে নীচে নামাতে পারে। আঃ মা গো চিৎকারে ভীষণভাবে জোর লাগাতেই মাথা বেরিয়ে এলো, ডাক্তারের হাতে। হ্যাঁ এরচেয়েও বেশি force লাগাতে হবে কাঁধটা বেরুতে পারছে না, হাল ছাড়বেন না, জোর দিন – আরো – না আসছে না ঐ শিশুর দেহ। ফোরসেপ দিয়ে বেশ খানিকটা কেটে দিলেন; ডাক্তার ম্যাডাম ইউট্রাসের মুখ। একরাশ ময়লা জল, রক্ত ঠেলে বাইরে এল সেই শিশুটি এবারে। প্রথমে কাঁদছে না, এই দেখে ডাক্তার তাকে ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে দিতেই ক্যাঁ – করে কান্নার আওয়াজ বের করলো সে। মা ক্লান্ত শ্রান্ত হলেও আনন্দের ঝংকার শুনতে পেলেন, বুকের মধ্যে – যাক – বেঁচে আছে বাচ্চাটা। তাঁর প্রথম সন্তান, ধন্য হলেন তিনি, কিন্তু লেবার রুমে প্রত্যেকটি নার্স, আয়া, ডাক্তার নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি, গুঞ্জন করছে – একটা ঘরের মধ্যে থাকলেও তিনি শুনতে পেলেন – “এ মা, এ কী গো, এ তো ছেলেও নয়, মেয়েও নয়।” হাসপাতালে বোধহয় একমুহূর্ত্তে খবরটা রটে গেল। সবচেয়ে বড় সার্জেনও এসে দেখে গেলেন, বললেন, কোনরকম অপারেশন করেও কিছু করা যাবে না। এটি Third Gender – “হিজড়ে”। বাচ্চাকে মায়ের কোলের কাছে দিয়ে গেলেন একজন নার্স দিদি। বুকের নীচে ধরে স্তন পান করাতে শুরু করলেন মা। তাঁর স্নেহের অমৃত ধারায় ধন্য হল শিশুটি। সন্তান প্রাণে বেঁচে আছে, তাঁর দুধ পান করছে চকচক করে, সুন্দর দুটি চোখ মেলে অবলোকন করছে তার জন্মদায়িনীর অপূর্ব করুন মুখখানি। সে যে ছেলে বা মেয়ে নয় – কোন অদ্ভুত এক অজানা তৃতীয় সত্তা – সে কথা মা’র মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা জাগাচ্ছে না বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়।

বাবাকে বাইরে গিয়ে একজন ছোকরা জমাদার, (যে লেবার রুমের ময়লা নিতে এসেছিল এবং শুনেছে বাচ্চাটি নরমাল নয়,) বলে দিল – “তোমার ‘ছে-মে’ হয়েছে গো দাদা। এইরকম ঘটনা আমাদের এই হাসপাতালে এই প্রথম, হৈ চৈ পড়ে গেছে”।

চব্বিশ বছরের সাধারণ একজন কেরানী, কথাটা শুনে ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। এখন কি করবেন তিনি? স্ত্রী নমিতা এই সংবাদে কতটা বিচলিত, পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনকেই বা কি খবর দেবেন? ঘরে তাঁর বৃদ্ধা মা, এক ভাই ও আইবুড়ো বোন অপেক্ষা করে আছে, ঘর আলো করা শিশুর আগমনের জন্য। কেমন করে এই “তৃতীয় সত্তা”কে গ্রহণ করবে তারা – কিছুই ভেবে পেলেন না। মাথাটা ঘুরে গেল।

ইউট্রাসে অনেকগুলি সেলাই পড়েছিল, তার দু-একটি পেকেও গেছে, প্রচন্ড যন্ত্রনা, জ্বর এসে গেছে সদ্য – সন্তান প্রসবের পরে তরুণী মায়ের। অনেক দাইমা’রা এটাকে সুতিকা জ্বর বলেন। এখন সেপটিক জ্বর বলা হয়। ডাক্তার ম্যাডাম এন্টিবায়োটিক দিয়ে দু-দিন আরও রাখতে চাইলেন, হাসপাতালে। চার পাঁচজন আরও নবজাতকের সঙ্গে শিশুটি রইল। বাচ্চাকে পরিষ্কার করতে গিয়ে একজন নার্স চমকে উঠলেন, বললেন, “আমি পারবোনা একে ডাইপার চেঞ্জ করতে”। মেট্রন দিদি ধমকালেন তাঁকে, – “কেন এই শিশুটি কি মানুষ নয়, সেবা ধর্মে দীক্ষিত হয়ে, এই জীবিকায় এসে তুমি এসব কি বলছো। আমি তোমার নামে নালিশ জানাবো হাসপাতাল কতৃপক্ষের কাছে”। তবুও সে শুনলো না। অন্য একজন আয়া তার ভার নিল, কিন্তু একবারে বিরক্ত মুখ এনে। মা আচ্ছন্ন হয়ে জ্বরের মধ্যেও বুঝতে পারলেন সব। রাত্রে ডাক্তার ম্যাডাম যখন জানালেন যে আগামীকাল তার ছুটি হয়ে যাবে, তখন আর থাকতে পারলো না মা। ম্যাডামের হাত দুটি ধরে কেঁদে ফেললো একটা বাচ্চা মেয়ের মতন। “এখন কি করে একে বাঁচাবো বলুন তো দিদি, আমাদের এই নিষ্ঠূর সমাজের কাছে তো তার কোন মর্যাদা নেই। আবার এদের গোষ্ঠীর – মানে হিজড়ে সম্প্রদায়ের লোকেরা জানতে পারলেই নিয়ে চলে যাবে কেড়ে। আমি আমার প্রথম সন্তানকে হারাতে চাই না। কি করি আমায় বলে দাও তোমরা”।

ডাক্তার দিদি ও মেট্রন ম্যাডাম পাশে বসলেন তাঁর স্নেহভরে। তাঁরাও তো সন্তানের মা। এই তরুণী মায়ের বেদনা তাঁরা অনুভব করতে পারছেন। মেট্রন বা চিফ নার্স তারপর ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পরামর্শ দিলেন – “হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তুমি বাড়ি যেও না। অন্য কোথাও চলে যাও বাচ্চাটি নিয়ে, যদি ওকে বাঁচাতে চাও, নিজের কাছে রাখতে চাও, তাহলে আজ সকালের মধ্যেই ট্রেনে করে চলে যাও, পালাও এখন থেকে। বাড়ি গেলেই এই হাসপাতালের ছেলেরা রেজিস্ট্রার দেখে ওদের মানে ঐ সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেবে তোমাদের ঠিকানা। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউই তখন তোমার সাহায্য করতে আসবে না।” এবার ডাক্তার ম্যাডাম তার বাচ্চাকে আদর করে কোলে তুলে নিলেন। কী সুন্দর ফুটফুটে বেবী – “তুমি মা, বাঁচাও ওকে। ওর বাবাকে ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার নাম করে ডাকছি আমি। তোমরা দুজনে মিলে ঠিক করো কোথায় যাবে। বাড়ি থেকে খুব জরুরী জিনিসপত্র টাকাকড়ি নিয়ে মা কে জানিয়ে চলে এসো। বলো বাচ্চা অসুস্থ এখন ওকে অন্য জায়গায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হবে। একদিনও দেরী করো না, পালাও বাচ্চা নিয়ে, একেবারে অন্য শহরে যেখানে তোমাদের কেউ জানতে বা চিনতে পারবে না। বড় করো একে, দেখো কিভাবে কতদিন লুকিয়ে রাখতে পারো”।

দিশাহারা মা-বাবা আমাকে নিয়ে ভোর রাত্রে ট্রেন ধরলেন শিয়ালদহ থেকে। পাঁচটায় ছাড়লো লোকাল ট্রেন। তাতেই চড়ে বসলেন তাঁরা। আপাতত বনগাঁ। তারপর দরকার পড়লে, অন্য কোথাও বসতি বাঁধবেন। কিছুতেই তো ছাড়তে পারবেন না, কাউকে কাড়তেও দিতে পারবেন না, তাঁর নাড়ি ছেঁড়া এই বুকের ধন। সুন্দরভাবে কেটে গেল, আমাকে নিয়ে মা বাবার দিনগুলো। ভাই বোনেদের বিয়ে হয়ে গেলে সেই শহরের নিরিবিলি সংসারে ঠাকুমাও এসে গেলেন। স্কুলে ভর্তি হলাম আমি। কন্যা রূপে, নাম রাখা হল “ত্রিনয়নী”, মা, বাবা ও ঠাম্মা আদর করে ডাকেন “তিন্নি” বলে।

দিদিমনিরা খুব ভালোবাসেন, চঞ্চল বুদ্ধিমতী মেয়েটিকে। চতুর্থ শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি অর্থাৎ ‘জলপানি’ পেয়ে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করলাম, বলে প্রাইজ পেলাম অনেক।

ক্লাস ফাইভ থেকে খেলাধুলাতেও বিশেষ আগ্রহী ছিলাম। তখন আমার বয়স দশ। স্কুলের স্পোর্টসে দেখা গেল সব বিষয়েই প্রথম ‘ত্রিনয়নী’। পনের / ষোল বছরের মেয়েরাও দৌড়ে হেরে যায় আমার কাছে। খেলার দিদিমনি আমাকে নিয়ে গেলেন Inter School Competition গুলোতে। সব জায়গাতেই মেয়েরা হেরে যেত আমার কাছে। ভীষণ আনন্দ উৎসাহে কেটে গেল কয়েকটা বছর। আমি একেবারেই যখন খেলাধুলায় মেতে উঠেছি তখনই একদিন ঘটলো ঘটনাটা।

কাবাড্ডি বা হাডুডু আমাদের চলতি ভাষায় ‘কিতকিত’ খেলছি স্কুলের মাঠে, আমি তখন ১২/১৩ বছরের, ভীষণ জোর আমার গায়ে, কেউ আটকাতে পারে না। – “চু — কিত, কিত, কিত, কিত একবার দম ভরে নিয়ে, ঢুকে পড়েছি, বিপক্ষীদের কোর্টে। তার আগে মেরে পালিয়ে এসেছি, প্রায় চারজনকে, একসঙ্গে আউট করে। – এবার বাকিরা সবাই মিলে চেপে ধরল আমাকে। কিছুতেই ছাড়বে না। আমি প্রানপন চেষ্টায় দম না ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছি ঐ দাগটা ছোঁবার জন্য। আর একটু – আর একটু – শুয়ে পড়ে – পা হাত ছিচঁড়ে যাচ্ছে, তবুও ওরা পাঁচজনে আমাকে চেপে ধরে অপরদিকে টানছে। এবার আমার জামা টেনে ছিঁড়ে দিল, তবুও আমি চিৎ হয়ে শুয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, মুখে কি- – -ৎ – – – কি- – -ৎ, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। জোর দিয়ে সবাইকে ফেলে দিয়ে আর একটু এগুতে যাব, একজন প্যান্টটা ধরে টান দিল, আমার সেটাও ওদের টানাটানিতে নেমে গেল, কোমর থেকে। আমি তখন দাগ ছুঁয়ে পড়ে গেছি আমার কোর্টে, – সেখানে সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে – জিতে গেছি, জিতে গেছি – ওদিকে অন্য মেয়েরা স্পোর্টের দিদিমনিকে ডেকে এনে শুরু করে দিয়েছে আমার নিম্নাঙ্গ দেখে অদ্ভুত আলোচনা। আমি মেয়ে নই। তবে কি? তৃতীয় সত্তা! মা বাবা কেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানাননি, আমার ভভিষ্যৎ সেদিনিই হয়ে গেল অনিশ্চিত। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, কেন বুঝতে পারলাম না। বাবা, মা, ঠাকুমা আমাকে নিয়ে আবার চললেন, নতুন ঠিকানার সন্ধানে। এবার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আমরা এসে উপস্থিত হলাম কানপুরে, গঙ্গার ধরে, এক ছোট্ট অজানা আস্তানায়। ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে লাগলেন বাবা। পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেল আমার। চেহারাতে হাবে ভাবে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। মনে মনে মেয়ের মতন কোমলতা, কিন্তু চেহারায় পুরুষের কাঠিন্য। আমি বয়ঃসন্ধিকালে অন্যান্য ছেলে ও মেয়েদের মতনই কখনও হঠাৎ (adult) বড় হয়ে উঠতে চাইছি। সব সমাজব্যবস্থা – মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক ভেদাভেদ, জাতপাত, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-নির্ধনের বৈষম্য নিয়ে ভাবতে মা বাবাদের সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করেছি। মানতে চাইছি না কোনও ছেলে, মেয়ে, হিজড়ে বাধা নিষেধের গন্ডি।

আবার কখনও মায়ের কোলের কাছে ছোট্ট মেয়ে হয়ে চুপ করে বসে বসে তাঁর রান্না করা দেখছি। মা একটা একটা করে বেগুনি ভেজে খাওয়াচ্ছেন। রাত্রে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি, অজানা এক আতঙ্ক গ্রাস করে – আমায় এদের ছেড়ে যদি কোন দিন চলে যেতে হয়; কি হবে তাহলে? ভয় পাই। কাঁদি হাপুস নয়নে। আমার বয়সী অন্য মেয়েরা কত লাবণ্যময়ী তাদের বুকে, মুখে, হাসিতে ছেলেরা আকৃষ্ট হয়, – আর আমার যে সবই অন্যরকম। কোনদিনই কেউ কি আমায় নিজের বলে গ্রহণ করতে পারবে? ঠাকুমা ছোট থেকেই রামায়ণ, মহাভারত, পূরণের গল্প শোনান, আমি তাঁকে সেই একই গল্প বারবার বলতে পীড়াপীড়ি করি। খুবই জ্বালাতন করি। – যেখানে অজ্ঞাতবাসের শেষ পর্যায়ে অর্জুন বিরাট রাজার বাড়িতে “বৃহন্নলা” সেজে নাচ শেখাতে গেছেন।

আমার কোনদিন “মাসিক ঋতুস্রাব” হবে না, সন্তানের মা হবার সম্ভাবনা থাকবে না, এসব কথা এখন আসতে আসতে বুঝতে পারছি। আমার নামটা স্বার্থক হয়েছে, তৃতীয় নয়নের দৃষ্টি খুলে গেছে। – ঠিক এই সময়েই আমার মা আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। মাঝে বছর পাঁচেক আগেও একবার তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন, কিন্তু বাথরুমে পড়ে গিয়ে তাঁর সেই বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। বাবা খুবই হতাশায় আচ্ছন্ন থাকতেন। এবারে মাকে আমি ও ঠাকুমা খুবই সাবধানে যত্নে রাখলাম। বাবা ভাল ভাল ওষুধপত্র, ফল, দুধ খাওয়াতে লাগলেন। আমার তেরো বছর বয়সে সুন্দর দেবশিশুর মতন একটা ভাই জন্ম নিল। আনন্দের যেন বন্যা বয়ে গেল বাড়িতে, হঠাৎ একদিন ঠাকুমা হার্ট এ্যাটাকে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। মাও ঠাকুমার সেবায় ভীষণ ব্যস্ত, ওদের এই ‘তিন্নি’ তখন ঘরের কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিল। বাড়িতে একদিন ডাক্তারবাবুকে ডাকা হল, ঠাকুমার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায়। তিনি বেশ কিছুক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন আমায়। খুব খুশি হয়ে বাবাকে বললেন, – “এর মধ্যে এতো সেবা ভাব – এই মেয়েকে নার্স করুন আপনি। তবে মনে হয় এর একটু ‘হরমোনাল প্রবলেম’ আছে।” আমার স্ত্রী গাইনোকোলজিস্ট একদিন নিয়ে আসুন, আমাদের নার্সিং হোমে, উনি চেক করে বলে দেবেন কি Treatment করতে হবে। কিন্তু সে সুযোগ আর এলো না। বাবা তাঁর কাছে গিয়ে আমার ‘তৃতীয় সত্তার’ কথা প্রকাশ করতে চাইলেন না। ঠাকুমা মারা গেলেন, তাঁকে জড়িয়ে থাকার আনন্দ আমার চিরতরের জন্য যে হারিয়ে গেল, তা বুঝতে পারলাম।

ঠিক এই সময়েই বাবা জানতে পারলেন তাঁর প্রমোশন ও ট্রান্সফারের কথা। খুব খুশি মনে অফিস থেকে এসে জানালেন, এই কানপুরের ফ্যাক্টরির মালিক নতুন কারখানা খুলছেন ‘সোদপুরে’ গঙ্গার ধারে, সুন্দর বাগান ঘেরা কোয়াটার দিচ্ছে। আবার তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের বাঙালি পরিবেশে ফিরে যাবেন এবং মাইনেও খুব ভাল হবে জেনে মা বাবা ভীষণ আনন্দিত। আমার মনটাও খুব চঞ্চল হল, হয়ত আবার নতুন করে বাংলা স্কুলে যাব। ভাইটা আমাদের খুব পয়মন্ত ভাবলাম আমি।

শোবার সময় অন্য ঘরে মাকে জল দিতে গিয়ে বাবা-মায়ের কিছু কথাবার্তা কানে এল, – তাতে যেন সমস্ত পৃথিবীটা এক রাত্রের মধ্যে ভীষণ অচেনা মনে হল আমার। বাবা বলছেন মাকে – “যাবো তো সোদপুরে, কিন্তু চারপাশে আরও অনেক কোয়াটার থাকবে। তারা মেলামেশা করতে চাইবে আমাদের সঙ্গে। এই ছেলেটাও বড় হবে. তাকেও স্কুলে দিতে হবে, কিন্তু তোমার এই তিন্নি “ত্রিনয়নী” যে ক্রমশঃ ‘হিড়িম্বার’ মতন লম্বা ধিঙ্গি পুরুষালি ভাব নিয়ে বড় হচ্ছে – একে এবারে তুমি লুকাবে কোথায়”? – বাবার উক্তি।

মা বেশ জোর দেখিয়েই উত্তর দিলেন – “কেন লোকের বাড়ি আইবুড়ো বা বিধবা মেয়েরা কি বাবা মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে না? আমার সন্তান, আমি এতদিন যখন বড় করেছি, – তখন যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আমার কাছেই থাকবে”।

– “তারপর? তারপর ওর ভবিষ্যৎ কি হবে ভেবে দেখেছো একবার”।

– কি আবার ভাববার আছে? জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। ওর ভাগ্য ওকে যেভাবে রাখবে সেই ভাবেই থাকবে।

– ভীষণ গম্ভীর গলায় বাবার রায় শোনা গেল, – “না আর আমি ওকে সঙ্গে রাখতে পারব না, এই ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। একটু বড় হলেই সবাই ওকে নানান প্রশ্ন করবে, ও লজ্জায় পড়ে যাবে”।

– তাহলে কি করবে? মা রাগত ভাবে বললেন, – “গলা টিপে মেরে ফেলবো এই সুন্দর পেটের সন্তানকে”?

-“মারবো কেন ওকে …..” কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি, হটাৎ আমার ছায়া দেখে।

সেদিন সকালটা ভীষণ সুন্দর রৌদ্রে ঝলমল, শরৎ কালে পুজোর গন্ধ বাতাসে। ভাইকে বারান্দায় বসিয়ে তেল মালিশ করছেন মা, বাবা বাজারে। আমি রান্না ঘরে ভাতের চাল ছাড়ছি। বাইরে করা যেন ঢোলক বাজিয়ে গান করছে। আওয়াজটা আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই। দরজার কড়া নড়ে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলতেই – হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লেন “তাঁরা”। একজন মায়ের কোল থেকে তুলে নিলেন ভাইকে ছোঁ মেরে। তারপর শুরু করলেন, গান ও নাচ। আমরা একেবারে হতবুদ্ধি। ওদের যিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ্য মানুষটি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে ওদের গানের সঙ্গে সঙ্গে তালি বাজাচ্ছিলেন, তিনি হঠাৎ মুখ ঘোরালেন। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। একটু থমকে গেলেন, ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগলেন আমায়। আমারও সারা শিরা ধমনীতে যেন একটা শিহরণ বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। এতো বছর কেটেছে এমন করে তো কাউকে দেখে আকর্ষণ অনুভব করিনি। অন্যের নাচ, ভাইটির কান্না, মায়ের নার্ভাস হয়ে চিৎকার করে ওঠা, কিছুই যেন দেখতে বা শুনতেও পাচ্ছিনা আমি। ওনার দিকে চেয়েই আছি তাই এক দৃষ্টিতে। আর উনিও ঠিক তাই। যেন জহুরি জহর চিনে ফেলেছে – এক মূহুর্ত্তের মধ্যে। মনে হল এতদিনে খুঁজে পেলাম আমি আমার আপনজনকে।

বাবা মা সব জিনিসপত্র বেঁধে ছেঁদে ভাইকে ও আমাকে এবং নিজেদের সমস্ত টাকা-পয়সা নিয়ে স্টেশনে এসে উপস্থিত হলেন। ট্রেনের বেঞ্চে বসে সব জিনিসপত্র সিটের তলায় গুছিয়ে রাখলেন বাবা। জল আনতে নামলেন সামনের দরজা দিয়ে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল, – “তোর বাবা কি চড়েছেন, দেখতো তিন্নি জানলা দিয়ে”। মায়ের কথায় জানলা দিয়ে মুখ বার করতেই চোখে পড়লো আবার ওই দলটিকে। সেই বয়স্ক মানুষটিও আমাকে হঠাৎ দেখতে পেয়েছেন। বাবা সামনের দরজা দিয়ে উঠলেন, কিন্তু ট্রেন চলতে শুরু করে দিল। আমি আর দেরী করলাম না। অন্য দিকের দরজায় ছুটে গেলাম যাতে বাবা আমায় আটকাতে না পারেন। লাফ দিলাম ট্রেন থেকে। সেই দলটি ছুটে এসে তুললো আমায়। মায়ের গলাটা শুনতে পেলাম একবার তিন্নি – তিন্নি রে। রেলগাড়ির ঝমঝমানিতে মিলিয়ে গেল সেই আওয়াজ। ট্রেন স্পীড নিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে – আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন ওদের ঐ ‘গুরুমা’, সবাই তাঁকে “কমলা আম্মা” বলে জানে। হিজড়েদের সমাজে সবাই তাঁকে খুব সম্মান করে ভালোবাসে।

বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, – “ইতনে দিন কাঁহা থে বচ্চে”? “বহুচারা” মাতা নে তুঝে মিলায়া। ইস লড়কা লড়কীকে বীচ মে তুম কাঁহা ফাঁস গয়ে থে। আও মেরে পাশ আও। ওহ দুনিয়া তেরে লিয়ে নহি হ্যায়”।

তাদের সঙ্গে হিজড়েদের আড্ডায় এসে বুঝতে পারলাম আমার ঐ মা আমায় জন্ম দিয়েছেন, স্নেহ মমতায় পালন করেছেন, আর এই “মা” আমাকে আজ নতুন ‘জীবন’ দান করলেন।

 

দ্বিতীয় অধ্যায় (বৃহন্নলা)

শুরু হ’ল বাস্তব জীবনে “বৃহন্নলার” চরিত্র রূপায়ণ। প্রথম দিন থেকেই কমলা আম্মাজী বুঝতে পেরেছিলেন, আমি বাঙালী ঘরের এক লাজুক কন্যা হিসাবে বড় হয়েছি। বাড়ি বাড়ি নাচ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা ট্রেনে বাসে উঠে টাকা চাইতে, গালাগাল দিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাব, অসভ্য ব্যবহার, কদর্য ইঙ্গিতও পছন্দ করতে, সহ্য করতে পারব না, তাই সবাইকে তিনি সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন আমাকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না করে। আমাকে হারমোনিয়াম বাজাতে, লক্ষ্ণৌ ঘরানার একজন মাষ্টারমশাইকে দিয়ে কত্থক শেখাতে শুরু করলেন। পড়াশুনো করতে আমার ভীষণ আগ্রহ দেখে হিন্দিতে বই কিনে দিলেন, বললেন টীচার রেখে দেব। তুই প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিবি। তিনবছরের মধ্যেই আমি পারদর্শী হয়ে উঠলাম নানা বিষয়ে। সব সময় বলতে লাগলেন, – “হম লোগো কো সরকার বুদ্ধু বানাকে রাখ দিয়া হ্যায়। পড় লিখকর তেরে কো আওয়াজ উঠানে হ্যায়। হামারে বারে মে লেখ লিখনা হ্যায়, হমে ভোট দেনে কি অধিকার দিলওনা হ্যায়”। আমি একজন শিক্ষিত মানুষ হবার চেষ্টায় প্রাণ মন সোঁপে দিলাম।

আমাকে আমার মা উল বোনা, সেলাই ফোঁড়ায় সব কাজ শিখিয়েছিলেন। রান্নাতেও ঠাকুমা একেবারে ওস্তাদ বানিয়ে দিয়েছিলেন, তাই এখানে এই নতুন সম্প্রদায়ে এসে সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে দেরী হল না আমার। কিন্তু হিংসাতে জ্বলতো অন্য দু একজন, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যাতে কমলা আম্মার থেকে দূর করা যায়, সেই চেষ্টাও চালাতে থাকতো তারা। দুটি ছেলে ছিল এ দলে, বাজনা বাজানো, বাজার করা, হাসপাতালে গিয়ে গিয়ে কোথায় কোন বাড়িতে বাচ্চা হয়েছে, কোন ঠিকানায় যেতে হবে সে সব কাজ করবার জন্য। তাদের একজন প্রথম দিন থেকেই পিছনে পড়েছে আমার। একটু সুযোগ পেলেই চেপে ধরছে, ওর সঙ্গে শুতে বলছে, আমার রুক্ষ ব্যবহারে একটু ভয় পাচ্ছে এবং হতাশও হয়ে পড়েছে। যখন দেখলো আমি ওদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ক্রমশঃ গুরুমার কাছের জন হয়ে উঠছি, তখন একদিন টাকা চুরির দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করল, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে অপমান করল। আমি তখন দরজা বন্ধ করে ভাবলাম জীবনটা শেষ করে দেব। আমার জন্য কোথাও কি শান্তির জায়গা নেই? এখানে বেশিরভাগ সময়ই সালোয়ার কামিজ পরতাম তাই চুনরি বা ওড়নিটা নিয়ে ঠিক যখন পাখার সঙ্গে লাগিয়েছি, চিৎকার শুনতে পেলাম কমলা আম্মার।

“বেটা দরওয়াজা খোল, ম্যায় ইনলোগোকে বাত বিশওয়াশ নেহি কিয়া, কোই অনর্থ নেহি কর না, খোল দে রানী, ইয়ে মা কো রুলানা নেহি”।

দরজা খুলতেই গভীর আবেগে কেঁদে উঠলেন তিনি। তারপর চিৎকার করে সবাইকে একত্র করলেন, ধমক দিয়ে সাবধান করে দিলেন, যে আমার দিকে নজর দেবে তাকে দলত্যাগ করতে হবে, এ কথাও জানালেন। রাত্রে আমাকে নিজের পাশে শোয়ালেন তিনি, ঠিক মা ও ঠাকুমার মতন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানালেন, প্রথমদিন আমাদের বাড়িতে দেখার পর থেকেই তিনি আমাকে কতটা নিজের করে নিতে চেয়েছিলেন। সেদিন যে ঐভাবে আবার ট্রেনের জানলায় আমায় দেখতে পাবেন বা আমি ঐভাবে লাফিয়ে নেমে আসবো বাবা মাকে ছেড়ে – তা উনি ভাবতে পারেননি। এখন কয়েক বছর কানপুরে থেকে হিন্দিটা আমার ভালোই রপ্ত হয়েছে। তাই তাঁর কথাগুলো বুঝতে পারছিলাম। এবার খুব কাছে টেনে ‘কমলা আম্মা’ বললেন যে এদের সবাইকে পরীক্ষা করবার জন্য কিছু টাকা তিনি টেবিলের ওপর ইচ্ছে করেই ফেলে রেখেছিলেন এবং নিজে বাথরুম থেকে লক্ষ্য করছিলেন, কে নেয়। আমি ঘরে ঢুকে ঘর পরিষ্কার করে চলে এসেছি; ঐ ছেলেটি ওটি চুরি করে আমার ব্যাগে রেখে দিয়েছে। আর পরে সবাইকে ডেকে এনে আমাকে হাতে নাতে ধরার অপবাদ দিতে চেয়েছে। ছি ছি কি করে ওরা সবাই আমাকে ঘিরে ধরেছে। কমলা আম্মা ঠিক সেই সময়টিতে স্নান সেরে ‘বহুচারা’ মায়ের পুজোয় বসেছেন। আমার মনে হয়েছে যে তিনি হয়তো আমায় ভুল বুঝবেন, এবং তাড়িয়ে দেবেন এই নিরাপদ আশ্রয় থেকে। এই দুনিয়ায় তো আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই কোথাও। তাই হটাৎ আবেগের বশে নিজের জীবনটি শেষ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুইসাইড করার জন্য যে সাহসের দরকার আমার মতন ১৫/১৬ বছরের একজন Teen Age-এর পক্ষে আনা সহজ নয়। তাই কাঁদতে কাঁদতে আবার দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি আমি।

আম্মাজী আমাকে শপথ করালেন, এইরকম ‘গলদ’ ভাবনার বশবর্তী আমি যেন আর কখনও না হই। আরো বললেন, – “জিন্দেগী খুবসুরৎ হ্যায়, হম লড়কা হ্যায়, কি লড়কি হ্যায়, আমীর ইয়া গরীব হ্যায়; হিন্দু ইয়া মুসলমান হ্যায় – ইয়ে সব বাতে বেকার হ্যায়। হম ইনসান হ্যায়। জানোয়ার, কীড়ে মকোড়ে নেহী হ্যায় – ইয়ে হামেশা ইয়াদ রাখনা”। – তারপর ওনার ছোটবেলাকার দেখা একটি হিন্দি সিনেমার গান গাইতে লাগলেন, – ” এ মালিক তেরে বন্দে হম”। আমি খুব আনন্দ ও শান্তি-সুখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম।

পরের দিন থেকে আমার নানা ধরণের পড়াশোনার তালিম শুরু হল। প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষাও দিয়ে দিলাম, হিন্দি মিডিয়ামে। এবার ছুটি, পড়াশুনো নেই। গুরুমা বললেন, তিনি তীর্থ করতে যাবেন গুজরাটে বহুচারা মাতার মন্দিরে। এই শক্তিরূপিণী মাকে এঁরা খুব মানেন। আমার কমলা আম্মা – গুরুমা আমাকে তাঁর গল্প-গাঁথা শোনাতে খুব ভালোবাসেন। অনেকটা সন্তোষী মা বা জগদ্ধাত্রীর মতন তিনি চার হাত নিয়ে, নানা অলংকারে ভূষিতা হয়ে মোরগের পিঠে চড়ে অধিষ্ঠাত্রী। প্রত্যেক হিজড়ে কলোনীতে তাঁর ছবি বা মূর্ত্তি দেখতে পাওয়া যায়। মোরগ ভোরে সকালে উঠে যেমনভাবে মানুষকে জাগায়। মায়ের এই বাহনও তেমনি করে লোভ, মোহ ভঙ্গ করে মানবকে জাগাতে এসেছে – বলে তারা মনে করেন। মায়ের চার হাতের মধ্যে একটি হাত (ওপরের দিকের বাম হাতটি) অভয় মুদ্রা দেখায় এবং অন্য তিনটিতে থাকে বই, ত্রিশূল ও তলোয়ার।

আমাকে উদাস হয়ে বসে থাকতে দেখে গুরুমা কাছে এসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, – “পড় লিখকর এক অচ্ছে ইনসান বননা। ফির কলকাত্তা যা কে মিলকর আনা তেরী পিতা মাতা কে সাথ। মুঝে পতা হ্যায় হম কিতনা ভী প্যায়ার করে তেরা মন উনকে লিয়ে দুঃখী হ্যায়”। আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল টপ টপ করে।

কেননা হাজার চেষ্টা করলেও আমার এখানের ওই ভাই বোনদের মতন তালি বাজিয়ে ভিক্ষে বা জোর করে কাপড় তুলে দিয়ে পয়সা আদায় আমি তো করতে পারবো না, এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেহ বিক্রিও করছে এবং যেটা খুবই স্বাভাবিক, বেঁচে থাকার জন্যে ‘Sex Worker’ এর ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়েছে। সমাজই এইসব অসহায় হিজড়ে কন্যাগুলিকে বাধ্য করেছে পুরুষের লালসার শিকার হতে। কেউ আবার বিবাহিত স্বামী স্ত্রী হয়ে কোন ছোট কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাকে মানুষ করছেন, তাঁদের স্নেহ মমতা ও আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু পড়াশুনো শেখানোর ইচ্ছে থাকলেও আমাদের বাচ্চাদের জন্যে আলাদা স্কুল কলেজ নেই, আমার মতন কেউ কেউ জোর করেই প্রাইভেটে ওপেন স্কুল থেকে থেকে পরীক্ষা দিতে আরম্ভ করেছে, গুরুমা সেটা জানতে পেরেই আমাকে খুব উৎসাহ দিতে চেষ্টা করছেন। ক্লাস VI পর্যন্ত আমি তো শুধু রবীন্দ্রনাথের পদ্য, বিবেকানন্দের বাণী, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল পড়ে একটা সম্পূর্ণ আলাদা জগতে বড় হয়েছি, এখন এই অস্তিত্ব রক্ষা করতে, অর্থাৎ বাঁচবার তাগিদে নিজের আপনজনকে খুঁজে, নিজেকে একটা গোষ্ঠীবদ্ধ করে এই আস্তানায় আমি নিরাপত্তা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু এদের ভাষা, কালচার, আদব-কায়দা, ধর্ম, কিছুই আমাকে টানতে বা আকৃষ্ট করতে পারছে না। এরাও আমাকে বুঝতে ও মেনে নিতে পারবে কিনা, সেই সংশয়ের দোলায় দুলছি আমি।

 

তৃতীয় অধ্যায়

এইসময় একদিন শহরের এক খুব নাম করা উকিলের বাড়ি থেকে খবর এল, পুত্র সন্তান জন্ম লাভের। সেদিন আমাদের গোষ্ঠীর মেয়েরা অন্যত্র কোথাও গেছে। সেখান থেকে ফিরতে তাদের দেরী হবে। গুরুমা আমাকে অনুরোধ করলেন, আমার এক গুরু ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐ বাড়িতে যেতে। আমি মাথা গুঁজে বসে আছি দেখে নিজে তৈরী হলেন এবং ঐ ছেলেটিও ঢোলক নিয়ে বেরুবার আগে বহুচারা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনাতে রত হলেন। আমার মনে হল, আমি কি এটা ঠিক করছি? “গুরুমা” আমাকে এতরকম ভাবে স্নেহ ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাঁর আশ্রিত হয়ে আমি তাঁকে অমান্য করছি। তাড়াতাড়ি একটা ভাল শাড়ি পরে কাজল, টিপ ও লিপস্টিক লাগিয়ে তৈরী হয়ে গেলাম। তাই দেখে গুরুমার কি আনন্দ। বললেন, “দেখ মনুয়া – মেরে তিন্নি কো আজ কিতনি সুন্দর লগ রহি হ্যায়। দে এক কালা টিকা লগা দূঁ, তাকি নজর না লগ জায় মেরে বাচ্চো কো”।

আমি কমলা আম্মার সঙ্গে এসে হাজির হলাম শ্রী বিনোদ রঞ্জন বোসের বিশাল ভবনে। চারিদিকে বাগান ঘেরা বাড়িতে ঢুকেই মনটা ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। গেট দিয়ে ঢুকলাম আমরা তিনজনে। মনুয়ার ঢোলকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ছুটে এল চাকর বাকরেরা। একজন বোধয় ম্যানেজার বাবু, চ্যাঁচাতে লাগলেন, “চৌকিদার শম্ভূ কোথায় গেল, এদের বাড়ির ভেতরে আসতে দিল কেন”? গুরুমা তালি বাজিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “অরে ভাইয়া গুসসা কিউ করতে হো? হম তো বাচ্চে কো আশীর্বাদ, দুয়া দেনে আয়া হুঁ। বুলাও মালকিন কো। বাচ্চা ভী সাথ লানা”।

কিন্তু ততক্ষনে চৌকিদার এসে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। ইট সুড়কির লাল রাস্তা ঐ বিশাল প্রাসাদের বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। দুই সারিতে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা ও বাগানের কোনায় লাল – হলুদ – সাদা জবা। আমার মন সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে উঠল, ঠাকুমার সুরে। এক অচেনা ব্যাথায় বুকটা ভরে গেল, আমি ঐ ঢোলকের তালে হাতে তালি দিতে লাগলাম। গুরুমাও অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে, – “গাও না বেটা গাও জো গানা তুমহে আতা হ্যায়”।

আমি এই প্রথম হিজড়ে গোষ্ঠীর দুজন সদস্যের সামনে গলা ছাড়লাম। – “আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন, তার গন্ধ না থাক, যা আছে তার নয় তো ভুয়ো আবরণ”। – গানের কথাগুলো কানে যাওয়ার জন্যে কিনা জানি না – বারান্দায় বেরিয়ে এলেন সেই বাড়ির ‘মা’, পরণে সাদা শাড়ি। কপালে চন্দনের টিপ – কী সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ ও মমতায় ভরা তাঁর দুটি চোখের দৃষ্টি। কোন কথা না বলে ইশারায় ঐ চৌকিদারদের আদেশ দিলেন, আমাদের পথ না আগলাতে। হাতছানি দিয়ে ডাকলেন গুরুমাকে। তিনজনে এগিয়ে গিয়ে উঠলাম ঐ বারান্দায়। সেখানে অনেকগুলি বেতের চেয়ার ও একটা গোল টেবিল পাতা। বসতে নির্দেশ দিলেন আমাদের। আমার যে কী হল আমি জানিনা। ঠিক আগেকার মতন তাঁর দুই পায়ে হাত দিয়ে হাতটা নিজের মাথায় ছুঁয়ে প্রণাম করলাম তাঁকে। গুরু শিষ্য পরম্পরাতে ‘হিজড়ে’ সম্প্রদায়ের লোকেরাও সর্বদা বড়দের পা ছোঁয়, কিন্তু ঠিক আমার কায়দায় নয়। সেই মা জিজ্ঞাসা করলেন ধীর স্থির ভাবে, – “তুমি বাঙালী”?

– “হ্যাঁ মা, কলকাতায় বাঙালী পরিবারে জন্মেছি”। এবার তিনিও একটা আশ্চর্য কান্ড করে বসলেন, আমার কাছে এসে ‘চিবুকটি’ ধরে মুখটি তুলে নিজের ঠোঁটে ঠেকালেন। এমনভাবে চুমু খেলেই আমি ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরতাম। হাতটা টেনে নিয়ে বলতাম – “আর একবার খাও না ঠাম্মা – বেশি করে আশীর্বাদ দাও যাতে আমি এবারেও ফার্স্ট হতে পারি”। চোখে জল চিক চিক করে উঠল। মায়ের ডাকে তাঁর বৌমা বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। গুরুমাকে সাদরে আহ্বান করলেন – ঐ মামনি। বললেন – “আপ বৈঠিয়ে না, খড়ে কিউ হো”? কমলা আম্মা এগিয়ে গেলেন বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আশীষ দিতে। –

হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। মানসিক ভারসাম্যহীন, একটু বেশি স্থুলকায়, বড় সরল হাসি, ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। ঢোলকের তালে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে গেল, আমার গুরুভাই মনুয়ার দিকে হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই ওর বাজনাটিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, মনুয়া জোর করে ধরে রেখেছে ও ছাড়বে না। অদ্ভুত গলার আওয়াজে চিৎকার করছে ওটিকে কেড়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় ধাক্কা দিল তাকে। মনুয়া বারান্দা থেকে ছিটকে পড়ল নিচে। সবুজ ঘাস ভরা মাটিতে, আর মেয়েটি উল্টোদিকে, ঠিক আমাদের পায়ের কাছে। আমি তাড়াতাড়ি তুলে ধরলাম ওকে, ঢোলকের কথা এক সেকেন্ডে ভুলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল, লজ্জিত ঠাকুমা ছাড়াবার চেষ্টা করলেন। “ছাড়ো সোনামনি, লক্ষী মেয়ে, ছাড়ো ওকে – চলো ভেতরে চলো” – কিন্তু সে আরও আঁকড়ে ধরেছে আমায়। আমি বললাম, – ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি ওকে সামলাচ্ছি”।

আদর করে ঘরের ভেতরে ওর খেলা ঘরে নিয়ে গেল সে আমায়। মা তার বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়ালেন। মাকে দেখে ঐ মেয়েটি অদ্ভুত আদো আদো সুরে জানতে চাইলো, – “এ তা কে? এ তা কে”? – মা তাকে শান্ত করবার জন্য বললেন, – “দিদি – তোমার দি দি”। আমার মনের বীণায় কেউ যেন ঝংকার তুললো। আমিও বলতে লাগলাম, – “হ্যাঁ সোনামনি, আমি তোমার দিদি”।

মেয়েটি নানান খেলনা তুলে তুলে দেখাতে লাগলো। তারপরই – ‘মা – আগু – আগু – আগু দাবো’ – বলে চেঁচাতে লাগল। মা বাচ্চাকে রাখতে অন্য ঘরে গেলেন, ততক্ষনে ঘরের মাঝেই পেচ্ছাব ও পায়খানা করে ফেললো মেয়েটি এবং হাসতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বাচ্চা কাঁদছে জোরে জোরে মা তাকে ছেড়ে আসতে পারছেন না, ওর ঠাকুমা তখন আমাদের গুরুমায়ের সঙ্গে কথা বলে, তাঁকে চাল, ডাল, তেল, ফল-মূল, টাকা ও একটি সুন্দর শাড়ি দিয়ে বিদেয় করতে ব্যস্ত। আমার বড় মায়া হল। ঐ অসহায় মানসিক ও শারীরিকভাবে ভারসাম্য হারানো কিশোরীর ওপরে। ওকে হাত ধরে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। পরিষ্কার করিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে পাশের ঘরে এনে বসলাম। ঠাকুমা যখন বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন অনেকবার তাঁকে বিছানাতে bedpan দিয়েছি, বিছানা নোংরা হয়ে গেলে পরিষ্কারও করেছি, তাই এসব কাজে কখন ঘেন্না লাগেনি। তাছাড়া ও আমাকে ‘দিদি’ বলে ডেকেছে, ছোট্ট একটা বোনের মতন মনে হচ্ছে ওকে আমার।

ততক্ষনে ওর মা যিনি পরে আমার ‘পিসিমনি’ হয়ে যান, কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন, লজ্জিত হয়ে sorry বলছেন বারবার। তিনি আরও জানাতে চাইছেন, “ও ইচ্ছে করে করেনি, তুমি কিছু মনে করো না, আসলে ওকে যে দেখাশোনা করে সে বাড়ি গেছে এবং চিকেন পক্স হওয়ায় এখন ২/৩ সপ্তাহ আসতে পারবে না। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম – “না না আমি এসব কাজ করতে কিছু মনে করি না। কাছে থাকলে রোজ চলে আসতাম। ঠাকুমা ও পিসিমনি নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করে গুরুমার কাছে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন, হিন্দিতে তাঁর সাথে কথা বলতে লাগল বিনীত ভাবে।

আমি বোনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। গুরুমা কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যদি কিছুদিন এঁদের কাছে মেয়েটিকে দেখাশোনা করি ওঁরা ভাল মাইনে দেবেন, আমি রাজী আছি কি না। আমি তো যেন আনন্দে আত্মহারা একটা কাজ পেয়ে। ভিক্ষে করে বা রাস্তায় পুরুষ মানুষদের সঙ্গে ন্যাকামি করে টাকা রোজগার নয়। নার্সের ভূমিকা হবে আমার। আমিও গুরুমার হাতে অন্যদের মতন কিছু অর্থ এনে দিতে পারব। খুব আনন্দ ও আগ্রহের সঙ্গেই রাজী হয়ে গেলাম। সেই দিন থেকে শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়। বোস বাবুদের বাড়িতে আমি যে চাকরি পেলাম তাতে অবাক হল তাঁর সমাজ। প্রতিবেশীরাও নানা আলোচনা শুরু করে দিলেন, স্থানীয় ছোকরাগুলো প্রথম প্রথম টিটকেরি মারার চেষ্টা করতো, ঘরের দারোয়ান ও চাকর বাকরও পেছনে লাগতে ছাড়েনি। কিন্তু রাসভারী উকিলবাবু ও ঠাকুমার ভয়ে কেউ আমার দিকে তাকাতে সাহস করতো না। পিসিমনি ভীষণ মমতাময়ী। সোনা রানী তো দিদিকে পেয়ে যেন মনে হয় হাতে চাঁদ পেয়েছে। বাংলায় কথা বলতে পেরে, বাঙালী সুতীর ছাপা শাড়ি, শান্তিপুরী, টাঙ্গাইল পরে ম্যাচ করা টিপ ব্যাগ হাতে কাজে যেতে শুরু করলাম।

সমাজে অন্ততঃ একটা পরিবার একজন হিজড়ে কন্যাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। উকিলবাবুকে একদিন ফোনে কথা বলতে শুনলাম, – Yes, I have appointed on eunuch third gender to look after my mentaly physically disabled daughter. Our society must “accept” them. They are aslo humanbeing. They have also different talents ability. What is other’s problem? I don’t care, what people think. I know I have done right thing”. 

ঐ ‘accept’ করা মেনে নেওয়া আমার গুরুমায়ের ভাষায় হিন্দিতে, – “তেরে কো উনহনে স্বুইকার কিয়া, আপনায়া. ইস সে খুশী অউর ক্যা হো সাকতা হ্যায়”?

আমাদের গোষ্ঠীতেও আমাকে পক্ষপাতিত্ব করা নিয়ে কানা ঘুঁষো চলছে, কিন্তু কমলা আম্মাকে সবাই ভালো যেমন বাসে, ভয়ও তেমনি করে। এই হিজড়ে সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষে হল বড়দের সম্মান করা। গুরু শিষ্য পরম্পরা, তাঁর কথার অমান্য না করা। যা কিছু কামাই, বিনা সংকোচে, কোন লোভের বশে নিজেদের কাছে না রেখে গুরুমাকে অর্পণ করা। আমাদের সমাজে মা-বাবা, শিক্ষক, অন্নদাতা সবই তিনি। গুরুর সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে সবাই চেষ্টা করে। তাই আমি এখনো পর্যন্ত কাউকে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তর্ক করে, তাঁকে অসম্মান, অনাদর করতে দেখিনি। আজ আমার তাই ঐ নতুন জীবিকা গ্রহণ, পড়াশোনা, বাংলায় কথা বলা সবাই এরা মেনে নিয়েছে।

এখানে দু বছরের মধ্যে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ভালোভাবে পড়াশোনা করে নিজেকে “ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে হাইয়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার জন্য তৈরী করছি। ‘সোনামনি’কে পরিষ্কার করে স্নান করিয়ে, খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর পর অনেকটা সময় থাকতো, বইপত্র পড়ার। একদিন পিসিমনি এসে আমাকে কম্পিউটার চালাতে শেখালেন। কি করে ইন্টারনেট থেকে সার্চ করে জ্ঞানের ভান্ডারকে বাড়ানো যায় তাও জানালেন। আমার পরিবারের কথা সবই ওনাকে জানিয়েছিলাম, তাই একদিন আমার সঙ্গে বসে Google Search করে বাবার কানপুরের কোম্পানী এবং তারপর তাদের সোদপুর ফ্যাক্টরীর ঠিকানা খুঁজে বার করলেন। E-mail করলেন সেখানে বড় বাবু বা ম্যানেজার কে। তারপর তাঁর ফোন নাম্বার জেনে একদিন কথা বলালেন, আমার সঙ্গে, – সেই মানুষটি তো তখন বিস্ময়ে হতবাক। পিসিমনি সুন্দর নম্রভাবে আগেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। – “দেখুন তো এখন আপনার মেয়ে তিন্নির গলা চিনতে পারছেন কিনা”। – আমি বাবার আওয়াজ শুনেই তাঁর গলা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু মুখ দিয়ে স্বর বার হচ্ছে না। হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো কি হল কে বলছেন? পিসিমনি ঠেলা দিয়ে বললেন, – ‘কি হল কথা বলো’। এবার আবেগরুদ্ধ কান্না ভেজা গলায় শুধু বললাম – “বাবা আমি তোমার তিন্নি”।

“তুই বেঁচে আছিস মা, তুই কোথায়, কেমন আছিস, কেমন করে আমায় পেলি?” এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন কিছুই দিতে পারলাম না। শুধু মা ও ভাইয়ের খবর নিয়ে ফোন ছেড়ে পিসিমনিকে ধরে কেঁদে ফেললাম বাচ্চা মেয়ের মতন।

এই সময় বোস বাবুরা সবাই কলকাতা ঘুরতে চলে গেলেন, আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গুরুমা আমাকে তাঁর কাছ থেকে এতদূরে এতদিনের জন্য ছাড়তে চাইলেন না। আমিও এই গোষ্ঠীদের ছেড়ে থাকতে ইচ্ছুক নই এখন।

গুরুমা এবার হিজড়ে সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ তীর্থ ক্ষেত্র গুজরাটের “বহুচারা” মাতার মন্দিরে তীর্থ দর্শন করতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। আমি প্রত্যেক মাসে যে মাইনে পাচ্ছিলাম সেটি তিনি খরচা করেননি। আমাদের চারজনকে নিয়ে তিনি “চৈত্র পূর্ণিমার” কয়েকদিন আগে আমেদাবাদের ট্রেনে চড়ে বসলেন। আমাদের শোনাতে লাগলেন বহুচারা মাতার কাহিনী। আমেদাবাদের থেকে প্রায় ২০০কি.মি. দূরে “মেহসানা জেলায় এই মন্দিরটি স্থাপিত হয় – ১৮৮৩ সালে। এই অঞ্চলে এক ধরণের লোক থাকতেন, যাঁরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন, তাই তাদের ‘চারণ’ বা যাযাবর শ্রেণী বলা হত। তাদেরই একজন দল নেতা যাকে ওরা রাজার মতন মানতো, তাঁর নাম ছিল চারণ বাপন ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন দেথা। তাঁদের কন্যা ছিলেন ভীষণ সুন্দরী। এই উপজাতিদের দলটিকে একবার পথ দস্যু আক্রমণ করে। শত্রুর হাতে নিজেকে সোঁপে দিয়ে সম্মান হারাবার আগে সেই কন্যা ও তার বোন নিজেদের ‘স্তন’ কেটে ফেলেন, এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য মারা যান। তাঁদের এই মৃত্যুবরণ যাতে বৃথা না যায় এবং তারা চিরদিন নমস্য হয়ে থাকেন তাই এই মন্দির স্থাপনা করা হয়। ঐ দস্যু ব্যাপিয়া শাপগ্রস্ত হয়। ঐ দুষ্টু – দস্যু কে শাপ দেওয়া হয় – যেন সে তার পুরুষত্ব হারায় এবং কোনোদিনও যেন কোন নারীকে ভোগ করতে না পারে। শাপমুক্ত হবার জন্য সে বহুচারা মায়ের কাছে মেয়ের রূপ ধরে এসে ধর্ণা দেবে। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলে বন্ধা নারীও সন্তান ধারণের ক্ষমতা ফিরে পাবে। তাই সন্তানহীন মা-বাবাদের ভীড় এখানে।

“ভাবনা নগরে” নেমে ঐ মন্দিরে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন তো আমরা সেখানে হাজার হাজার ভক্তের আনাগোনা, উৎসব অনুষ্ঠান, প্রসাদ বন্টন ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খলভাবে লোকেদের লাইন করে পুজো দেওয়া দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। শ্বেতপাথরের সুন্দর কারুকার্য খচিত মন্দির ঐ ইংরেজদের সময় কি করে এখানকার রাজারা স্থাপনা ও নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ভাবতে অবাক লাগে। কারণ এই ব্রিটিশ সরকার ভারতে এই হিজড়ে জাতির সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কদর্য ব্যবহার করেছে – এসব কথা আমি পিসিমনির কম্পিউটারে ইন্টারনেটে Indian Eunuch দের History পড়তে গিয়ে জেনেছি। তাদের সবসময় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে তুলনা করা হত, নানান ছুতোয় শাস্তি দেওয়া, কারাগারে বন্দি করা যেন তাদের খেলা ছিল। অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় তাঁরা দিন কাটাতেন। হিন্দু ধর্মে প্রতিটি শুভ কাজে বিয়ে বা সন্তানের জন্মকালে তাঁরা যেতেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ নেওয়া আমাদের সামাজিক জীবনে সেই প্রাচীনকাল থেকে এই আধুনিক কালেও শুভ বলে মানা হয়। কিন্তু ইংরেজ সরকারের অত্যাচারে অনেক হিজড়ে গোষ্ঠী তখন চারণ বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

এখানে পুজো দেওয়ার পর যাঁদের বাচ্চা হয় তাঁরা পুজো দিতে আসেন এবং বাচ্চাকে বা তার ছবি এনে ‘গুরুমা’কে দেখান। এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না যে, আমার সমাজও শুধু তালি বাজিয়ে, নেচে, গান করে পেট চালান না। আমাদেরও একটা বিশেষ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্ম ও সুশৃঙ্খল জীবন ধারণের পদ্ধতি – রীতি নীতি আছে। আমাদের মা কে “তৃতীয় প্রকৃতি” বলা হলেও তিনিও মা দুর্গারই এক অবতার রূপে পূজ্য। এখানে Transgender কে “কিন্নর” বলা হয়। গুরুমা এখানে মহামহিমা মন্ডলীর প্রধানা “লক্ষী নারায়ণ ত্রিবেদী কে” দেখালেন আমাদের। তিনি উজ্জয়িনীতে হিজড়েদের জন্য এক সুন্দর আশ্রম বানিয়েছেন। গুজরাটের মুরারি বাপু একজন ‘মহাত্মা’ যাঁকে এঁরা শ্রী শ্রী রামচন্দ্রের মতন মনে করেন। কারণ তিনিই প্রথম কিন্নরদের এই ‘আখড়া’ দিয়ে লক্ষীনারায়ণ মা কে কিন্নরদের প্রধান গুরু রূপে বরণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, যেন অহল্যাকে পাষান মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই মুরারীবাপুকে কিন্নর সম্প্রদায় ভীষণ ভাবে শ্রদ্ধা করে। তাই এখন এলাহাবাদের ও উজ্জয়নীর কুম্ভ মেলায় অন্যান্য সাধুদের সঙ্গে এই কিন্নর মাতাও মিছিল করে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন। এই তীর্থেই “মধু কিন্নর” কে দেখলাম যিনি প্রথম মেয়র হবার যোগ্যতা পেয়েছেন। এঁরা সবাই আমার চোখ খুলে দিলেন। বাড়ি ফিরে এলাম আনন্দিত চিত্তে।

এরপর হাইয়ার সেকেন্ডারীতে প্রথম বিভাগে পাশ করলাম আমি। ‘গুরুমা’ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এবার তীর্থ করতে নিয়ে গেলেন আমায় ম্যাড্রাস তথা চেন্নাই থেকে ২০০ কি.মি. দূরে ‘কুভা গাম’ গ্রামে পরের চৈত্র পূর্ণিমাতে। সেখানে হিজড়াদের এক দেবী “বিষ্ণুর” অবতার “মোহিনীর” মন্দির আছে। মহাভারতের গল্পে অর্জুনের পুত্র ‘আরাভানম’ শত্রু অর্থাৎ কৌরবদের নাশ করবার জন্য “জীবন দান” করতে রাজী হয়েছেন, কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি একদিনের জন্য হলেও বিয়ে করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু যে যুদ্ধে “মৃত্যুবরণ” করতে যাবে তাকে কোন মেয়েই বিয়ে করতে রাজী হলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন পাণ্ডবদের একমাত্র উপদেশ দাতা এবং উদ্ধার কর্ত্তা তিনিই এই সংসারে ইন্ধন যোগান দিয়েছেন, অর্জুনের মিত্র সারথি উদ্ধার কর্ত্তা তো শ্রী বিষ্ণু ভগবানেরই রূপ তাই এবারে অর্জুন পুত্রের সামনে এসে দাঁড়ালেন “মোহিনী” রূপে। বিয়ে করলেন আরাকানকে। তরুণ রাজপুত্র প্রাণ ভরে সম্ভোগ করলেন সেই মায়াময়ী দেবী নারী কে – সেই নারী রূপই এখানে পূজিতা হন। গুরুমায়ের সঙ্গে আমি আর একজন হিজড়াদের দেবী “রেণুকা” কেও দর্শন করতে গেলাম। দক্ষিণ ভারতে হিজড়ে সমাজে “অর্দ্ধনারীশ্বর” – অর্থাৎ অর্ধেক শিব অর্ধেক পার্বতী মূর্ত্তির পুজো হচ্ছে খুব ধুমধামের সঙ্গে। অভয় দান করছেন সেই দেবী শত শত হাজার হাজার “তৃতীয় প্রকৃতির” মানুষকে। হয়তো ধর্মের ভয় দেখিয়ে মূল্যবোধকে ধরে রাখা।

দুবছর ধরে এতো তীর্থ ভ্রমণ, ঠাকুর দেবতা বা ধর্মের কাহিনী আমার ভাল লাগলেও – কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা থেকে গেল আমার মনের মধ্যে। আমি গুরুমাকে অনুরোধ করলাম – ‘এতো দূর যখন এসেছি তখন একবার কন্যাকুমারী ‘বিবেকানন্দ’ রক দেখতে যাওয়ার জন্যে। সেখানে গিয়ে মন ভরে গেল অপার শান্তি ও আনন্দে। কিন্তু সাধারণ দর্শক তো আমাদের মতন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ নাম দেওয়া লোকদের মানুষ বলে মনে করেন না। ট্রেনে, বাসে, প্রসাদের বা টিকিটের লাইনে, বাজারে, দোকানে, হোটেলে যেখানেই যাই সব জায়গাতেই শুধু অবজ্ঞা – অবহেলার ও ঘৃণার প্রকাশ। আমাদের দূরে দূরে আলাদা আলাদা রাখা, ধমকি, মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলা এবং মাঝে মাঝে পুলিশের ভয় দেখানো, – যেন এই নিরীহ হিজড়ের দল কোন সংক্রামক রোগে ভুগছে, – যেন এরা কুকুর, বেড়াল, গাধা, গরু – এদের মনে দুঃখ – অভিমান, রাগ, অপমান নেই। কেউ কেউ তো ভাবেন এরা রক্ত মাংসের মানুষই নয়, কোন দানবী পিশাচ। এদের এই পুরুষালি দেহ, কর্কশ কণ্ঠস্বর এবং মেয়েদের মতন হাবভাব – গান নাচ করা ভীষণ হাস্যকর, লজ্জাজনক।

সেদিন ‘বিবেকানন্দ রকে’ যেতে গিয়ে যে ঘটনাটি ঘটে সে কথা মনে করলে এখনও আমার শরীরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। এখনও আমি আমার গুরুমাকে যারা অসম্মান করেছে, গুরু বোনের শ্লীলতাহানি করেছে তাদের ক্ষমা করতে পারি না।

ঐ বিবেকানন্দের বিরাট নিস্তব্ধ হ’লে বসে চুপ করে অনেকক্ষণ কাটিয়ে যখন বাইরে এসেছি, একদল ছেলে আমাদের এক গুরুবোনের পেছনে লেগে গেল। তাদের ভাষা আমরা বুঝতে পারছি না, কিন্তু হাবে ভাবে ইঙ্গিতে সব ধরতে পারা যাচ্ছে কি তাদের উদ্দেশ্য। পুলিশ বা গার্ড দাদারাও হ্যা হ্যা করে হাসছে, যেন কোন হাসির নাটক দেখছে তারা। নানাভাবে তাদের আমরা উপেক্ষা করে যাচ্ছি। গুরুমা আমাদের সাবধান করেছেন যে, আমরা যেন ওদের সঙ্গে ঝগড়া করতে না যাই। আমার অন্য গুরুবোনটি দেখতে খুবই সুন্দর। প্রয়াগের মেলায় আজ থেকে ২০ বছর আগে তাকে এঁরা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সে কোথাও শুনে এসেছে হিজড়েদেরও বিউটি কন্টেস্ট হয় আজকাল। তার ইচ্ছে সে তাতে নাম দেবে। তাই সবসময় একটু বেশি সেজেগুজে ভালো শাড়ি পরে থাকে সে। ভীষণ হাসি খুশি সরল। একটু চঞ্চল মতিও বলা যায়। ছেলেরা ওর প্রতি খুব তাড়াতাড়ি আকৃষ্ট হয়, আবার ওকে বারণ করা সত্ত্বেও ও বারবার ওদের দিকেই তাকায়। এখানে একটি খুব সাধারণ ধর্মশালায় উঠেছি আমরা। অটো করে তাড়াতাড়ি রওনা হবার পরে লক্ষ্য করলাম, পেছনে দুটি মোটরসাইকেল আমাদের অনুসরণ করে ঠিক ঐ আস্তানায় এসে হাজির হল।

সন্ধ্যে গড়িয়ে এসেছে, আমরা কন্যাকুমারী মন্দিরে আরতি দেখতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময় আবার ঐ চারটি গুন্ডা মতন ছেলে এসে আমাদের পান্থশালার ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে কথা বলতে লাগল নিজেদের ভাষায়। ব্যাপারটি গুরুমা ভাল চোখে নিলেন না। এবার সোজাসুজি ওদের সামনে অফিসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গলায় জোর এনে ঐ ছেলেগুলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, – “ক্যায়া বাত হ্যায় বেটা আপলোগোকো ক্যায়া চাহিয়ে”?

হিন্দি সিনেমা দেখে দেখে ভারতবর্ষের সর্বত্রই অর্থাৎ যে কোন প্রদেশের লোকেরাই এখন হিন্দি ভালোই বোঝে বা বলতে পারে। কিন্তু এরা বলতে চায় না। তবু সামনাসামনি স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়ায় একজন একটা কুৎসিৎ অঙ্গ ভঙ্গি করে উত্তর দিল – “তেরে কো নেহি রে বুড়িয়া উসকো চাহিয়ে”। একজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। “নেহী বিলকুল নেহী। হম ইঁহা তীর্থ করনে কে লিয়ে আয়ে হ্যায়। হম কোই sex worker নেহী হ্যায়”।

হো হো করে হেসে উঠলো তারা। বিনা দ্বিধায় এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে। আমাদের গুরুভাই বাধা দিতে গিয়ে এক থাপ্পড় খেল, একটা দৈত্যের মতন লম্বা চওড়া লোকের হাতে। এবার গুরুমা ভীষণ জোরে চিৎকার করে ঐ লোকগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, – “হারামজাদা ভাগ ইধর সে, নেহী তো হম পুলিশ বুলায়েঙ্গে” –

“পুলিশ? পুলিশ কাঁহা? হম হী তেরা পুলিশ কে বাপ হ্যায়। বুড়িয়া, আ জা, পহলে তু। তেরে জ্যায়সা হিজড়া বহৎ দেখা হ্যায়”। বলে এমন একটা ধাক্কা মারলো যে গুরুমা ছিটকে পড়ে গেলেন। পাশেই একটা লোহার চেয়ারে মাথাটা লাগল ভীষণ জোরে। আমি তখন আর থাকতে পারলাম না, ঝাঁপিয়ে পড়লাম হিংস্র বাঘিনীর মতন ঐ লোকটির ওপরে – রাগে আমার শরীর কাঁপছে। আঁচড়ে, কামড়ে, লাথি, কিল, ঘুষি চালাচ্ছি লোকটার ওপরে। ম্যানেজারটা ও তার চাকর বাকর এসে আমায় ধরল এবং কমলা আম্মাকে তুলে শোয়ালো, জল দিয়ে জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করতে লাগল। কেউ একজন আমার মারের ছবি তুলে নিয়েছে ততক্ষনে, পুলিশেও ফোন করে দিয়েছে। লোকগুলো গালি দিতে দিতে সেই সময়ের জন্য চলে গেল বটে কিন্তু শাসিয়ে গেল যে আবার আসবে তারা আমাদের সর্বনাশ করতে। ‘কমলা আম্মাকে’ অ্যাম্বুলেন্স-এ করে হাসপাতালে এবং আমাকে ওরা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেল। ধর্মশালায় রইল আমাদের বাকী দুই গুরুবোন, গুলাবী আর কুসুম।

সেদিন কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি ঐ দুষ্টু লোকগুলোর অভিপ্রায়, গুরুমায়ের সঙ্গে ঝগড়াটা ছিল, ওদের সাজানো নিছক একটা drama আমাদের আলাদা করার উদ্দেশ্যে।

পুলিশ স্টেশনে কেউ আমার কথা বোঝে না। মার পড়ল ভালো রকম, এমনভাব করছে যেন কোন চোর, ডাকাত কিম্বা উগ্রবাদী, টেরোরিস্ট ধরেছে। সারারাত ওদের নোংরা ‘লক আপে’ কাটলো। সকালে অফিসার এলে, হাত জোর করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বোঝালাম, সমস্ত ব্যাপারটা। তিনি কিছুটা নরম প্রকৃতির। আর আমি এরকম মারামারি করব না লিখিয়ে – একটা কাগজে সই করিয়ে আমাকে ছাড়লেন। আমি আমার কষ্ট যন্ত্রণাতে কাতর হইনি, শুধু গুরুমায়ের চিন্তায় কাঁদছি তখন।

তিনি জানতে চাইলেন ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও আমি কাঁদছি কেন ! আমি বললাম, আমার গুরুমাকে কোথায় কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কি করে তাঁর কাছে পৌঁছাবো, আমার কাছে তো কোন পয়সা কড়িও নেই। তিনি একজন সেপাইকে ডেকে বললেন – আমায় একটা আটো রিকসায় বসিয়ে সেই ড্রাইভেরকে আমরা যেখানে উঠেছি সেই ধর্মশালার নাম বলে দিতে। আমি বসে আছি অটোর অপেক্ষায়, ঠিক তখন একজন ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে থানায় প্রবেশ করলেন। ইংরেজীতে বললেন দারোগাবাবুকে যে তাঁর গাড়িটি রাত্রে চুরি হয়ে গেছে। ধর্মশালার পাশেই তাঁর ক্লিনিক, সেখানে রেখেছিলেন তিনি। ভোর বেলায় তাঁর ড্রাইভার জানায়, গাড়িটি সেখানে নেই। এতক্ষন ঐ অঞ্চলের দোকানদার ও রাত্রের চোকিদারদের কাছে জানা গেল চার পাঁচটি ছেলে একটি মেয়েকে ধর্মশালা থেকে নিয়ে ঐ গাড়িতে করে কোথাও নিয়ে গেছে। অনেকেই তাদেরকে ঐভাবে যেতে দেখেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর তখনই চারিদিকে ফোন করতে শুরু করলেন। আমার শরীরের রক্ত তখন ভয়ে হিম হয়ে গেছে। কোনোরকমে ইংরেজীতে বললাম – “oh my God! Gulabi, She is my Sister”, – ভদ্রলোক চমকে উঠে তাকালেন আমার দিকে। এরকম মার খাওয়া বিদ্ধস্ত চেহারার একজন হিজড়ে যে ইংরেজীতে কথা বলতে পারবে, এটা তিনি হয়ত আশা করতে পারেননি। ইন্সপেক্টরবাবু রাত্রে ধর্মশালার মারপিটের ঘটনাটি জানালেন ওনাকে। আমি তখন সম্ভ্রান্ত চেহারার ঐ মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের পায়ের কাছে বসে পড়ে বার বার বলে চলেছি – “Sir, Please help us, Save my Sister’s life।

আমার জন্য অটোটি এসে গিয়েছিল। ঐ ডাক্তারবাবু বললেন, – “আমি তো ওখানেই ক্লিনিকে যাচ্ছি – চলো তুমি আমার সঙ্গে। আর পুলিশ ইন্সপেক্টরকে বললেন, যত শীঘ্র পারেন গাড়ি ও ঐ মেয়েটির খোঁজ করুন”। শান্ত হয়ে বসে একটা ডাইরীও লিখলেন তিনি, শুধু তাই নয়, আমার হয়েও একটা বড় নালিশ ও ডাইরী লেখা শেষ করে আমাকে সই করতে বললেন।

ধর্মশালায় ফিরে দেখলাম কুসুম একা বসে হাউ হাউ করে কাঁদছে। বাইরে নানান রকমের লোকের ভিড়। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল সে। ডাক্তারবাবু এবার সেখানকার চাকর বাকরদের সবাইকে ডাকলেন, ধমকের সুরে নিজেদের ভাষায় কি সব বললেন, তারপর আমাকে ও কুসুমকে সঙ্গে করে – একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে গেলেন গুরুমায়ের খবর নিতে। সঙ্গে ধর্মশালার কর্মচারী, যাঁরা তাঁকে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছে।

‘কমলা আম্মা’ অর্থাৎ আমার গুরুমায়ের মাথায় ভীষণ আঘাত লেগেছে, তাঁর জ্ঞান ফেরত এলেও যন্ত্রনায় কাতর হয়ে গেছেন তিনি। ছোট্ট একটা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিশেষ পরীক্ষা নিরীক্ষারও ব্যবস্থা নেই। ডাক্তারবাবু ওনাকে অ্যাম্বুলেন্স-এ নিজের নার্সিংহোমে – ক্লিনিক সেন্টারে পাঠাবার জন্য অনুরোধ করলেন সরকারী ডাক্তারকে, আর আমাদের বললেন – ‘গুলাবীর’ কিডন্যাপ হওয়ার কথা যেন ওনাকে জানানো না হয়। চোখ খুলে আমাদের দুজনকে একবার দেখতে পেয়ে গুরুমা যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার চোখ বুজলেন। ডাক্তারবাবুকে আমাদের ভগবান মনে হল। আমরা তাঁর সঙ্গে তাঁর নার্সিং হোমে এলাম এবং ওখানে বসে ডাকতে লাগলাম আমাদের দেবী ‘বহুচারা’ ও ‘রেণুকা’ মাতাকে। পুলিশের সঙ্গে বারবার কথা বলছেন ডাক্তারবাবু এবং তাঁর স্ত্রী, গাড়ির জন্য নয়, ঐ মেয়েটির খোঁজ করবার জন্য নানা জায়গায় ফোন করছেন তাঁরা। বিকেল বেলায় খবর এল গাড়িটি একটি জঙ্গলে পাওয়া গেছে, এবং গুলাবীর ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেহ দূরে এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে পাওয়া গেছে। যখনই আমার কানে এল, – “Her body is found”- আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, কুসুম আমাকে চেপে ধরে কী যেন বলেই অজ্ঞান হয়ে গেল। নার্স দিদিরা তাকে চোখে মুখে জল দিচ্ছে – আমি যে কখনও কাউকে মুখে একটা খারাপ কথা বলতে পারি না – বাংলা, হিন্দি, ইংরাজী যে ভাবে যত খারাপ ভাষায় বলা যায় শাপ-শাপান্ত গালি দিয়ে যাচ্ছি ঐ নিষ্ঠূর নৃসংশ হত্যাকারী দানবদের।

এতো সুন্দর ফুলের মতন মেয়েটাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে কি লাভ পেল ওরা? ভগবান কি অন্ধ? কি হল ঐসব তীর্থে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেব-দেবীর দরবারে মাথা কুটে?

স্থানীয় লোকেরাও বিস্ময়ে ভয়ে সব স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সেখানকার মহিলা উকিল, সাংবাদিক, activists রা আমাদের ঘিরে ধরেছেন, তাঁদের কথা প্রশ্ন কিছুই আমার কানে যাচ্ছে না শুধু – গুলাবী রে — গুলাবী তু বাপিস আ – – শরীরে কোন রোগ হলে তাকে নিয়ে কত চিন্তা থাকে, আর যখন সেটা প্রাণহীন তাকে শুধু দেহটা বা Body বলে ধপাস করে এনে মাটিতে ফেলে দিতে কারুরই কোন দ্বিধা হয় না। আমাকে সেই “দেহ” যখন সনাক্ত করতে বলা হল। তখন আছড়ে পড়লাম সেই ধর্ষিতা গুরুবোনের বুকের ওপরে।

দিল্লীতে এই ধরণের গণ ধর্ষণ ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা শোনা গেছে। সারা দেশের মানুষ তার জন্য মোমবাতি জ্বেলে, মিছিল করে, শোক সভা করেছে। আমি রোজ খবরের কাগজ থেকে পড়ে শুনিয়েছি আমার গুরুমা কে। তাঁর চোখে জল পড়েছে। আর আজ তাঁরই ঘরের একজন সদস্য এইভাবে পশু মানবের লালসার শিকার হবে, এমন শোচনীয় ও ভয়াবহ মৃত্যু বরণ করবে আমরা কি কেউ ভাবতে পেরেছিলাম ! ডাক্তারবাবুর তোড়জোড়ের চেষ্টায় বোন গুলাবীর পোষ্টমর্টেম ও সৎকার করা হল। মুখাগ্নি করার সময় মনে হচ্ছিল যে ঐ জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে আমি সামনের সব পুরুষের পুরুষাঙ্গ জ্বালিয়ে দিই। সারা শহরের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে চলে যাই। গুরুমা ও কুসুমের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা ছাড়া আর কিছুই করবার মতন শক্তি সঞ্চয় করতে পারিনি সেদিন। পরে শুনেছিলাম ঐ ছেলেগুলি ধরা পড়ে আবার ছাড়া পেয়ে গেছে, কারণ স্থানীয় কোন রাজনৈতিক দলের নেতার পুত্র আছে সেই ঘৃণ্য পাষণ্ডদের মধ্যে, অতএব জামিনে খালাস পেয়ে আবার শহরের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। Activist সাংবাদিক এবং উকিল দিদিরা আমাদের হয়ে কেস করে হতাশ হয়েছেন। একে তো অন্য প্রদেশের লোক তায় আবার “হিজড়ে”! কে তাদের হয়ে সাক্ষী দেবে? কেউ সাহস করে এগিয়ে আসতে চাইছে না। সুতরাং কে তাদের বিচার করবে, শাস্তি দেবে? অতএব বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

কানপুরে এসেই গুরুমা দেখা করলেন আমার মালিক উকিল বোস বাবুর সঙ্গে। তিনি গুলাবীর কেস নিয়ে অনেক লেখালেখি শুরু করে দিলেন। ঐ পশুদানবদের প্রথম ছোট কোর্টে – যাবৎজীবন সাজা হলেও তারা আবার আপিল করল হাইকোর্টে। সব জায়গাতেই তাদের টাকার জোর খাটাতে লাগল। রক্ষক যেখানে ভক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করে সেখানে কে কি ভাবে সুবিচার পাবে? আমরা সবাই খুব বিমর্ষ মনমরা হয়ে পড়লাম।

এইসময়ই হঠাৎ আমার কলকাতা যাওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল। পিসিমনির ভাইয়ের বিয়েতে তাঁরা কলকাতা যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। সোনামনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল। পিসিমনি আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। সোনামনির দেখাশোনাও হবে, আবার আমি আমার মা বাবার সাথেও একবার দেখা করে আসতে পারব। আমি তো আনন্দের সঙ্গে এই সুযোগ গ্রহণ করলাম, অবশ্যই গুরুমায়ের অনুমতি নিয়ে।

হাওড়া স্টেশনে নামতেই মনটা যেন ময়ূরের মতন নেচে উঠল। ট্রাম, বাস, রিকশা – সবাই শাড়ি পরে, বাংলায় কথাবার্তা – একটা অদ্ভুত অন্য জগৎ, যার সঙ্গে আমার প্রাণের টান অনুভব করতে লাগলাম। পিসিমাদের বাড়িতে খুব ভিড় তাই আমাদের জন্য খুব সুন্দর এক Guest House এ থাকার ব্যবস্থা হল, ঐরকম মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ মেয়েকে নিয়ে তো সকলের মধ্যে থাকা যাবে না। আমারও খুব সুবিধে হল। পিসিমনি মা বাবাকে ফোন করে ডাকলেন সেই গেস্ট হাউসে। ভাইও এল। আমি যে কি করব তা ভেবে পাচ্ছি না। একবার মা কে জড়িয়ে ধরে – কাঁদছি, তো একবার বাবাকে প্রণাম করছি। কখনও ভাইয়ের মুখটা বুকে চেপে ধরে কাঁদছি। সেও দিদিকে পেয়ে অবাক হয়ে চেয়ে আছে – এ এক অপূর্ব মিলন মেলা যেন। হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে পেয়ে এমন আবেগে আপ্লুত হতে দেখে ঐ ঠাকুমা, পিসিমা এমন কি রাসভারী বোস বাবুরও চোখে জল এসে গেল। আনন্দ অশ্রু যে এতো পবিত্র হয়, মনকে এমন ভাবে সিক্ত করে, ধৌত করে স্নিগ্ধ করে দেয় – তা আগে কখনও অনুভব করিনি। ওঁদের জন্য পিসিমনি অনেক উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, মা বাবা ও আমার জন্য খুব সুন্দর শাড়ি এবং মায়ের গলার একটি চেন, কানের ঝুমকো ‘তিন্নি’ লেখা একটি আংটি দিলেন – আমায়। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আরও পড়াশুনো করার প্রতিজ্ঞা করলাম তাঁদের সামনে। ভীষণ খুশি হলেন তাঁরা। বাবা পিসিমনির কাছে অনুরোধ করলেন যাওয়ার আগে একবার যেন তাঁদের বাড়ি যাই আমরা সবাই মিলে। ঠাকুমা প্রশ্ন করলেন “আপনাদের ওখানের প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবরা আমাদের তিন্নিকে অন্য চোখে দেখবে না তো? ওর অসম্মান হোক এমনটা কিন্তু হতে দেওয়া চলবে না”। –

এবার হাত জোড় করে বাবা বললেন – “মা আপনারা ওকে আপন করতে পেরেছেন, সুন্দর জীবনের রাস্তা দেখিয়েছেন, আর আমরা আপন বাবা মা ওকে কোন সাহসে দূরে ফেলে রাখব? ওর অপমান তো আমরাই আগে করেছি, ওর মনে আঘাত দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা কর মা, তিন্নি মা আমার একবার বাড়ি চল”।

বাড়ি গিয়ে সারাদিন প্রানখুলে গান, গল্প – সুক্ত, মাছের ঝোল, চাটনি, পায়েস, খেয়ে সারাক্ষন ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করে এক অবাধ ভালোবাসার স্বাদ ও পরিতৃপ্তিতে ভরে ফিরে এলাম, এক নতুন উৎসাহ, আনন্দ ও প্রেরণা নিয়ে।

কলকাতা থেকে ফেরার সময় যেন আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। ট্রেনে সবাইকার এক জায়গায় সীট পাওয়া যায়নি। আমি বললাম – ‘আমি পাশের কামরায় একা বসছি। যখন তখন এসে সোনামনিকে দেখে যাব, বাথরুম করিয়ে দেব। পিসিমনি তো এবার আমাকে একটা মোবাইল ফোনও উপহার দিয়েছেন। সেটিতেই তো সর্বদা যোগাযোগ থাকবে। অন্য কামরায় এসে একা একটি কোণে জানলার ধারে মুখ করে বসে রইলাম। বাংলাকে যে এতো ভালোবাসে, বাংলা ভাষায়, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে খাওয়া পরায় যার এতো আসক্তি ও অনুরাগ তাকে বাংলা পরিবেশ ছেড়ে কেন যে বারবার চলে যেতে হয়, – দূরের পানে চেয়ে আঁখি – কেবল আমি চেয়ে থাকি, মনটা মোচড় দিতে থাকে, কান্নায় বুকের মধ্যে একটা ঠেলা উপলব্ধি করতে পারছি। বাইরে সবুজ মাঠ ছুটে যাচ্ছে – – – রাখাল, গরু, নদী, পুকুর, হাঁসের দল – কী সুন্দর অনুভূতি – হটাৎ কে যেন ডাকল, – “Excuse me, May I know your seat number”? চমকে উঠে মুখ ফেরালাম আমি, যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম, প্রথমে মুখে কথা সরল না, বোধহয় অন্য জগতে বিচরণ করছিলাম। আবার তাঁর সুন্দর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে বাজলো – “আপনার সীট টা বোধহয় ঐদিকে – এটা আমার জায়গা – ১২ নাম্বার – দেখুন টিকিটটা একবার”।

চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। এক সেকেন্ডে আমার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল, – এতো সুন্দর প্রগাঢ় দৃষ্টি – এতো সম্মানজনক ভঙ্গি – এমন সুঠাম লম্বা পুরুষ ! আমার সঙ্গে একজন হিজড়ে, বৃহন্নলা – কিন্নরের সঙ্গে এইভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন – একি কোন দেবদূত নাকি? লজ্জিত মুখে উঠে দাঁড়ালাম – উত্তর দিলাম। “Yes, I know, this is not my seat । জানলার ধারে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আপনি বসুন এখানে, আমি ওদিকে চলে যাচ্ছি”।

কিন্তু তাঁর চোখে হয়তো কিছু ধরা পড়ে গেল, – “একী আপনি কাঁদছিলেন? Any bad news, না আপনার শরীর খারাপ”?

বুঝতে পারলাম না কি জবাব দেব। – কিন্তু আমার “তৃতীয় নয়ন” বা অন্য একটা সত্তা বলে দিল এটাই বোধহয় “- – – Love at first sight” – প্রেমের আকর্ষণ এটাকেই বলে কিনা জানি না। আমার বুক কাঁপতে লাগল অকারণে। ঠিক এই সময়ে আমার ফোনটা বেজে উঠল, আমি ছুটে গেলাম পাশের কামরায় সোনামনিকে attend করতে। কি মনে হল যাওয়ার আগে ঐ attractive খুব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষটিকে ইশারা করে শুধু আমার স্যুটকেশটা দেখিয়ে বললাম – “Please একটু দেখবেন – আমি পাশের কামরায় আমার বোনকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আসছি”।

তিনি মাথা নাড়লেন – ‘OK No Problem! প্রায় এক ঘন্টা লাগল, সোনামনিকে বাথরুম করাতে, খাওয়াতে ও শোয়াতে। এসে দেখলাম, চা, বিস্কুট, চপ দিয়ে গেছে, আমাদের টেবিলে। আমারগুলি আগলে উনি বসে আছেন। আমি স্মিত হাসি হেসে – ধন্যবাদ জানালাম। ট্রেনের আওয়াজে ভালো করে কথা বলা বা শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ছোট্ট কাগজে কিছু লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ঐ যুবক। লেখা – “Can’t – talk, Please Give me your Whatsapp Number”।

আমার বুকের মধ্যে তখন শত শত দামামা তবলা, খোল, মৃদঙ্গ বাজতে শুরু করেছে। হাত কাঁপছে তবুও ওনার পেন ও কাগজে লিখে দিলাম আমার নাম – ‘ত্রিনয়নী’ এবং ফোন নাম্বার।

শুরু হল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। সামনে যেন খুলে গেল স্বর্গের দ্বার। হৃদয়ের মন্দিরে যেন চার্চের বেল বাজছে, দূর থেকে মসজিদের আজান ও গুরুদ্বারার শব্দ কীর্তনের ধ্বনি ভেসে আসছে ভাবছি, – “সখী ভালোবাসা কারে কয়? সে কী – – – -?

‘ধানবাদ’ স্টেশনে উঠলেন দুজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা প্রায় ৭০/৮০ হবেন। যাঁরা চড়িয়ে দিতে এসেছিলেন তাঁরা জিনিসপত্র গুছিয়ে ওনাদের প্রণাম করে নামার আগে ঐ ভদ্রলোক ও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, – “দাদা, – বৌদি, Please একটু সীট চেঞ্জ করে দেবেন, ভুল করে ওপরের বার্থ দিয়েছে ওঁদের। আমরা বলেছি, জ্যেঠুকে ট্রেনে কোন ভাল লোককে অনুরোধ করে বদলে নেবেন। জ্যেঠিমা খুব অসুস্থ”। তাড়াতাড়িতে নেমে গেলেন তাঁরা, কারণ ট্রেন এখানে খুব অল্প সময়ের জন্য থামে। আমি বললাম, “ঠিক আছে কোন চিন্তা করবেন না, আমি ঐ মায়ের বার্থে উঠে যাব”। খুব খুশি হলেন ঐ বুড়ো বুড়ি জ্যেঠু-জ্যাঠিমা আমাদের পেয়ে। গল্প জুড়ে দিলেন ঐ ছেলেটির সঙ্গে জোরে জোরে। আমিও শুনতে লাগলাম চুপ করে।

উনি একজন – প্রাকৃতিক উর্জা বিশেষজ্ঞ, মানে Sustainable – Energy – Consultant, বিদেশে পড়াশোনা করে এসেছেন। আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় অর্থাৎ ৩০ বছরের বিবাহিত ব্যক্তি! একটি ছেলেও আছে তাঁর ৩ বছরের। পুনে, মহারাষ্ট্রতে থাকেন, নিজের বাবা মায়ের বাড়িতে। বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এই সুন্দর শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার আমার মনকে যেমন আবেগে আপ্লুত করল তেমনই আবার যেন একটা চাবুকও খেলাম আমি। সমস্ত প্রেমিক সত্তা আমার প্রথম এবং হয়তো এই শেষ প্রেমের প্রবল স্রোতে বাধাপ্রাপ্ত হল। ও হো উনি বিবাহিত? না, না, কারোর সংসার ভাঙতে চাই না আমি। রাত্রে ‘ডিনার’ খেয়ে আর একবার দেখে এলাম ঐ কামরায় পিসিমনিদের। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে একটু যেন ধাতস্ত হলাম। ভেতরে যে অদ্ভুত একটা আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাৎ হচ্ছে তাকে শান্ত করার জন্য অনেক মেঘ কান্নার বৃষ্টি চাই। ঐ মায়ের পাশে বসে অনেকটা জল খেলাম নিজের সীল করা বিসলারির বোতলটা থেকে, উনি আমায় লক্ষ্য করছিলেন এতক্ষন, বোধহয় একজন ‘হিজড়ে’র পাশে বসে ওনার একটু সংকোচও হচ্ছিল, কিন্তু আমাকে এতটা জল একসঙ্গে ঢক ঢক করে পান করতে দেখে মাতৃ সুলভ প্রশ্নটা স্নেহময়ীর কণ্ঠে শোনা গেল।

“ও মা ! কত জল তেষ্টা পেয়েছিল গো। কতক্ষন জল খাওয়া হয়নি তোমার”?

আমি শুধু বললাম, – “অনেকক্ষন – – -“। মনে হচ্ছিল আমার এই তৃষ্ণা বোধহয় আর কোনদিন মিটবে না। ঐ মায়ের বিছানাটা করে দিয়ে চাদর বালিশ কম্বলে ঢেকে, ওনার পা দুটি সুন্দর করে মুড়ে দিয়ে বললাম, – “এবার শুয়ে পড়ুন, আমি ওপরে উঠে যাচ্ছি”। – সালোয়ার কামিজ পরেছি – ট্রেনের সফরে সুবিধে হল। তাড়াতাড়ি ঐ ওপরের বার্থে উঠে শুয়ে পড়বার আগে হাত জোড় করে ঠাকুমার শেখানো প্রার্থনাটা করলাম, যেটা ছোট থেকেই করি, – “শরণাগত পরি – – – । তারপর ওনার দিকে কোনরকমে তাকিয়ে শুধু Good Night বলে শুয়ে পড়লাম।

মুখটা অন্য দিকে করে ফোনটা বুকের কাছে ধরে শুয়ে আছি। যদি হটাৎ পিসিমনি ডাকেন সোনামনির বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনে। ঠিক তখনই মেসেজ আসতে শুরু করলো একের পর এক। প্রথমে ভাবলাম বোধহয় কোন বিজ্ঞাপন কোম্পানীর মেসেজ, কিন্তু বেশ কয়েকটা আসার পর খুলতেই হল, ফোনের আলোয় জ্বল জ্বল করে উঠল কয়েকটা লাইন।

তিনি কে বুঝতে দেরী হল না –

– ঘুমিয়ে পড়লেন? আপনার নামটা বড় সুন্দর। একটু কথা বলতে চাই !

উত্তর দিচ্ছি না দেখে আবার মেসেজ, –

– Are you sleeping?

– No

– Please turn this side , look at me

– Sorry I am very tired

– I know you are upset also

– বাবা, মা ভাইকে ছেড়ে এসেছি।

– কোথায় যাচ্ছেন?

– কানপুর। এক এক word এ reply দিচ্ছি।

– আমি দিল্লী, পরের সপ্তাহে পুনে চলে যাব, ওখানে আমার মা ও ছেলে আছে।

– নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হচ্ছে না।

– কানপুরে আপনার কে আছে? ঐ বোনটি কি আপনার নিজের?

– না, আমি ওর নার্স দিদি, ওদের বাড়িতে কাজ করি। মেয়েটি মানসিক দৈহিক ভারসাম্যহীন।

– এইরকম একটি অসুস্থ বাচ্চাকে সেবা করতে কষ্ট হয় না আপনার?

– না খুব ভালো লাগে, আনন্দের সঙ্গেই করি। তাছাড়া ভদ্রভাবে বাঁচার জন্য টাকা রোজগারেরও দরকার।

– খুব ভাল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভীষণ খুশি হলাম।

– Thank You

– আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন Please

– কেন? আমাদের গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়ম নেই, বাইরের লোকের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করার।

– আপনার ওখানে গার্জেন, মানে অভিভাবক কে?

– আমার গুরুমা – কমলা আম্মা।

– ওনাকে আপনি খুব ভালোবাসেন মনে হচ্ছে।

– হ্যাঁ, বাবা মা বাঙালি, জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু উনিই আমাকে জীবন দান করেছেন, নতুন ভাবে।

– Very Interesting

– আমাদের হিজড়ে মানে থার্ড জেন্ডার-দের কে সবাই খুব ইন্টারেস্টিং মনে করে।

– না না আমি কিন্তু সেভাবে বলিনি। কিছু মনে করবেন না please

– মনে করার কিছু নেই। আপনাদের সমাজ আমাদের সম্মানের চোখে কোন দিনিই দেখে না।

– কে বলেছে আপনাকে? কত থার্ড জেন্ডার-এর ব্যক্তি এখন অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন।

– তাই নাকি? একটু ব্যঙ্গ করে বলে উঠলাম।

– আপনি গৌরী শাওনের নাম শোনেননি।

– না, কে তিনি? কোথায় থাকেন?

– পুনে তে। মহারাষ্ট্রের মেয়ে – মানে জন্মগত ভাবে নন, প্রথমে ছেলে ছিলেন পরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে তাঁর এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি Eunuch “ইউনাক” গোষ্ঠী ভুক্ত হন।

একসঙ্গে এতো বড় মেসেজটা পাঠিয়ে একটু উঠে বসলেন তিনি নিজের বার্থে। জল খেলেন বোতল থেকে।

আমি ওনার দিকে ফিরে তাকিয়ে আছি হাঁ করে। কত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ত তাঁর ব্যবহার। যেন কত চেনা কোনো এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন।

অদ্ভুত একটা ভাল লাগায় মনটা যেন আপ্লুত হয়ে গেল।

আমার দিকে হাত বাড়িয়ে নিজের বড় ফোনটা মনে হয়  I-Pad এগিয়ে দিয়ে বললেন, Google Search করে গৌরী শাওনের ‘Ted Talk’, Proctor and Gamble-এর অফিসে, বিভিন্ন স্কুল, কলেজে দেওয়া কথাগুলো শুনুন। আমি একটু নিচে নামি। washroom যেতে হবে।

আমি পড়তে লাগলাম গৌরী দেবীর কথা মন দিয়ে, মুগ্ধ হয়ে – মগ্ন হয়ে শুনতে লাগলাম তাঁর অপূর্ব ভাষণ, True Story। চেহারাটা ঠিক যেন বাঙালি মেয়ের মতন। কপালে “উষা উত্থুপের” মতন বড় টিপ।

মেরুন রঙের শাড়িতে তাঁর অসম্ভব উজ্জ্বল শ্যামলী চেহারা যেন জ্বল জ্বল করছে, স্টেজের ওপরে। দাঁড়িয়ে এক মিনিটেই আমাকে সম্মোহিত করে দিলেন তিনি।

পুনের এক বড় পুলিশ অফিসারের পুত্র, – খুব ভাল ইংরেজী স্কুলে পড়তেন। বিরাট বাংলো বাড়িতে থাকতেন। অনেক চাকর বাকর, এক দিদি – মা – বাবা – সুখের জগতে বিলাসিতার মধ্যে বড় হচ্ছিলেন। হটাৎ তাঁর ‘মা’ অকালে মারা গেলেন। দিদির বিয়ে হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকেই পুরুষের সমস্ত লক্ষণ নিয়ে জন্মালেও মানসিক ভাবে মেয়ের গুণগুলি লক্ষ্য করা যেত তার মধ্যে। পুতুল খেলতে, মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রান্না বাড়ি খেলতে পছন্দ ছিল তাঁর। ধীরে ধীরে চেহারায় পরিবর্তন এসে গেল। ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী, থেরাপিস্ট কেউই তাঁর পুরুষত্ব প্রমান করতে বা অক্ষুন্ন রাখতে পারল না। বাবা কথা বলতেন না, অপমানে, গ্লানিতে, লজ্জায়, ঘৃনায় ও ভগবানের ওপর – পৃথিবীর মানুষের ওপর রাগে – অভিমানে সেই গণেশ নামের ছেলেটি যখন সম্পূর্ণ লালিত্য নিয়ে কন্যা তথা কিন্নরীর রূপ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করল, তখন একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিল মুম্বাইয়ের হিজড়ে সম্প্রদায়ের আড্ডায়। ইংরাজী সাহিত্য জানা ছিল, আর মনে ছিল অদম্য উৎসাহ, তাই যুবতী গৌরী হয়ে সে প্রথমে ‘গায়েত্রী’ নামে এক sex worker এর কন্যাকে adopt করে ‘মা’ ডাক শুনে নিজেকে ধন্য করল। পরে ওই রকমই আরও অসহায় পতিত দুঃখী পথ শিশুদের নিয়ে তৈরী করল ‘NGO’ “নানী কা ঘর”। সেখানে তাঁর মাতৃত্বে স্নেহে লালিত পালিত হচ্ছে কত শিশু দুঃখী পরিত্যক্ত বাচ্চারা।

ফোনে গৌরী শাওনের জীবনী পড়তে পড়তে আনন্দে আশায় আবেগে উঠে বসলাম এবং ঐ ভদ্রলোকের – হাতে সেটি ফেরত দিয়ে, নিজের মোবাইলে আবার আমাদের নীরব বার্তালাপ – গল্প কথা শুরু হল। এবার আমিই প্রথম মেসেজটা করলাম।

– অনেক অনেক অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমার আজ পথ প্রদর্শক গুরু হলেন। আপনাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

– তাহলে এসো না, আমরা দুজনে মিলে একটা নতুন জীবন, আলোকোজ্জ্বল পবিত্র স্নেহ সেবা, ভালোবাসায় গড়া পরিবার তৈরী করি।

– না না সে কী করে হয়? আপনার স্ত্রী পুত্র কি ভাববে? কত আঘাত পাবে।

– আমার পুত্রটি অন্ধ। আর স্ত্রী? একটু স্মিথ হাসি হেসে থেমে কেটে কেটে শুধু বললেন, তিনি বাচ্চা প্রসব করেই চিরতরে এই পৃথিবী থেকে স্বর্গের পথে চলে গেছেন।

– ওঃ হো, I am very sorry।

– ঐ বাচ্চা ও আমার বুড়ি মায়ের ভার যদি শেয়ার করে নাও, I will be grateful, কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চাই “ত্রিনয়নী” তোমাকে।

– আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এই রাত্রের ট্রেন জার্নিতে মা বহুচারা, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী সারদা মা – বিবেকানন্দ কি তোমার মধ্যে আমার সামনে প্রকট হয়েছেন।

– তোমাকে আমার পুত্রের ‘মা’ বলে আমি মর্যাদা দিতে চাই, সুযোগ দেবে তুমি?

– হে ভগবান, এ আমি কি শুনছি ! আমি কি এর যোগ্য হতে পারব?

– হ্যাঁ নিশ্চয় পারবে। – আমরা দুজন স্বর্গ খেলনা গড়িব এ ধরণীতে।

কানপুরে সোনামনি, পিসিমনি, ঠাকুমা ও বোস বাবুর সঙ্গে স্যুটকেশ হাতে করে যখন নেমে পড়লাম, তখন ঐ নাম না জানা দেবদূত হটাৎ বিদায় সম্ভাষণ জানাতে আমাদের পিছনে এসে দাঁড়ালেন।

কি ভাবে যে কি কথা বলা উচিৎ এখন বুঝতে পারলাম না। শুধু দু চোখে জল নিয়ে অদ্ভুত আবেশে ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, আমি ধরা গলায় বললাম, –

– আমি রাজী।

সোনামনি খুব আনন্দে উৎসাহে স্টেশনের মাটিতে পা দিয়ে হেসে উঠল খল খল করে। কলকাতায় গিয়ে মামার বিয়ে দেখে সে এখন “বৌ – বর – বর” খেলতে ভালোবাসে।

আমি ওকে একহাতে চেপে ধরে অন্য হাতে স্যুটকেশ নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমার জীবনের প্রিয় মানুষগুলির সঙ্গে।

বাইরে দুটি বড় বড় গাড়ি অপেক্ষা করছে। ঠাকুমা ও আমি সোনামনিকে নিয়ে একটা গাড়িতে বসে পড়লাম। পিছনে হুইশেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার শব্দ ক্রমশঃ মিলিয়ে যেতে লাগল। বুকের ভিতরে ঐ আওয়াজটা যেন “শেল” বিঁধিয়ে দিচ্ছে। কে জানে কখন কেমনে তার সঙ্গে আবার দেখা হবে? আর ঠিক তখনই আমার বোনটি হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল – “দিদি দিদি বল, তোল বল এসেছে, – বল? কোথায় আবার বল পেলে তুমি? ঐ যে বল, বল, বল, আয়, আয়। জানলার বাইরে দেখি সত্যি তো আমার বর দাঁড়িয়ে আছেন – তিনি বললেন – “চলো তোমার গুরুমাকে প্রণাম করে আসি”।

 

চতুর্থ অধ্যায়

গুরুমা বললেন, –

“আজ মেরে জিন্দগীকে সব সে আচ্ছা দিন হ্যায়। হামারা বরাদ্রিকে কিসিকো এক সাচ্ছা ইনসান নে জীবন সাথী বানানে কে লিয়ে তৈয়ার হুয়া। ঈশ্বর তুম দোনো কো সদা সুখী রাখেঙ্গে।”

বোসবাবুদের বাড়ির লনে সুন্দর করে আম পল্লব, গাঁদা ফুলের মালা সাজিয়ে প্যান্ডেল বানানো হল এবং মা বাবার উপস্থিতিতে আমাদের সম্প্রদায়ের সব সদস্যদের মাঝে বিবাহ মণ্ডপ তৈরী করা হল। আমার স্বামীর মা ও পুত্রও যোগ দিলেন সেই অনুষ্ঠানে। সম্পূর্ণ বাঙালিদের নিয়ম কানুন অর্থাৎ আইবুড়ো ভাত ও গায়ে হলুদ ইত্যাদি সমাধা হলে, কন্যাকে সম্প্রদানের জন্য পিতার ডাক পড়ল।

কিন্তু বাবা দুই হাত জড়ো করে বললেন, – “আমি এর যোগ্য নই, ‘কমলা আম্মাই’ একে মেয়ের যথার্থ মর্যাদা দিয়েছেন, তিনিই সম্প্রদান করুন।” কিন্তু পুরোহিত মহাশয় রাজী নন। তিনি বললেন “তা কি করে হয়, গোত্র চাই, এর গোত্রান্তর হবে। নারায়ণ স্বাক্ষী করে এসব অনাচার তো হতে দেওয়া চলবে না।”

এবার বরের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বর – স্বামী “দেবমাল্য সাহা।” – “তাহলে দক্ষিণাটার টাকা নিয়ে আপনি এখন থেকে বিদায় গ্রহণ করুন।” তারপরে আমার হাত ধরে টেনে তুললেন – বিয়ের পিঁড়ি থেকে। – “এসো তিন্নি আমরা আজ এক নতুন ধরণের বিবাহ বন্ধনে যুক্ত হই।” প্রথমে তাঁর নিজের মা ও পরে আমার মা, বাবা, গুরুমা, ঠাকুমা, পিসিমনি, ও বোসকাকুকে প্রণাম করে তিনি তাঁর ছোট্ট শিশুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমাদের দুজনের হাত তার ছোট্ট হাতে সঁপে দিয়ে বলে উঠলেন, কান্না জড়িত গলায়, – “হে শিশুরুপী নারায়ণ, তুমি আমাদের এই বিবাহ বন্ধনকে স্বীকার করো, অনুমতি দাও তোমাকে ও সমগ্র জগতের দুঃখীজনের সেবায় যেন আমরা দুজন লাগতে পারি।” – সেই ছোট্ট পুত্র প্রথমে আমার হাতটি পরশ করে, পরখ করে দেখতে লাগল। আমি ওর কাছে নিচু হয়ে বসে পড়েছি। মালাটি নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলো সে, তারপর আমার মুখে চোখে হাত বুলিয়ে মাথার চুলে তার আঙুল ছোঁয়ালো। আমার শরীর আনন্দে, আবেগে শিহরিত হয়ে কাঁপছে – আমি আর থাকতে পারলাম না। মাটিতে বসে ওকে বুকে টেনে নিলাম। সে ও আমায় জড়িয়ে ধরে বলল – “আমার মা! বাবা তুমি আমার জন্য ‘মা’ কিনে এনেছো? কি সুন্দর গন্ধ”, – আমার মতন বিবাহ বাসরে আনন্দ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিতদের আসরে সবাইকার চোখে জল এসে গেল।

বোসকাকু রেজিস্ট্রি অফিসের লোকদের আগেই নিয়ে এসেছিলেন। আইনসম্মতভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে গেলাম। –

ওদিকে আমার বোন সোনামনি তখন একটু দূরে ঠাকুমার পাশে বসে হাততালি দিচ্ছে। ওকেও আমি চন্দনের ফোঁটা, লাল ছোট্ট বেনারসী পরিয়ে ‘নিৎ কনে’ সাজিয়ে দিয়েছি আগেই। এবার সে আমায় ডাকাডাকি শুরু করেছে। “দিদি দিদি আয় আয়, বল বল আয় আয়।” – বুঝলাম আমার বরকে নিয়ে সে তার কাছে যেতে বলছে। আমরা এগিয়ে গেলাম তার দিকে। ক’দিন ধরেই তার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। পিসিমনি তাকে ধরে আছেন। যেমন করে শিশু নারায়ণের কাছে নতজানু হয়েছিলাম, এবার আমার স্বামী ‘দেবমাল্য সাহা’ ঠিক সেইভাবে সোনামনির কাছে গিয়ে বসলেন, – “এইতো সোনামনি বল এসে গেছে” বলে তার হাতটি ধরল। সোনামনি তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো তারপর আমাকে কাছে পেতেই হটাৎ কেন জানিনা, ঢোলে পড়ল আমার কোলে। হাসি মুখে আমাদের আশীর্বাদ দিতে দিতে ঐ শুদ্ধ সরল প্রাণ আজকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিল স্বর্গলোকে।

ফুলে সাজানো যে গাড়িতে বর – তার বল এসেছিল তাতে ফুলের মালা চন্দনে চর্চিত ফুটফুটে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হল, অন্তিম যাত্রায়। ডাক্তার আগেই তার বাবা মা কে জানিয়েছিলেন, কিডনী ফেল হওয়ার কথা, কিন্তু বিয়ে যাতে বন্ধ না হয়, তাই আমাকে বলেননি তাঁরা। জানা ছিল সে চলে যাবে কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি ভাবতে পারিনি।

পুনে শহরে এসে প্রথমে মা ও ছেলের দেখাশুনোর সঙ্গে সঙ্গে B.A. পড়া শুরু করলাম। প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলে ‘দেবমাল্য’ আমাকে বললেন Law পড়তে। ব্রেল লিপিতে তখন পুত্রের লেখা পড়া শুরু হয়েছে।

দেবমাল্য সূর্য্যপ্রদীপ জ্বালাতে অর্থাৎ সোলার প্যানেল লাগাতে উড়িষ্যা গেলেন। খুব ভাল লাগল তার সেখানে একটি গ্রাম। ফিরে এসে বললেন এবার তোমায় নতুন কিছু করার কথা ভাবতে হবে। তোমাদের তৃতীয় সত্তার মানুষগুলির উন্নতির জন্য একটা এমন সংস্থা তৈরী করব যেখানে ওদের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। –

আমি বললাম, আমাদের একার পক্ষে তা কি করে সম্ভব? তিনি বললেন অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো প্রকৃত মানুষের কাজ। এখন ইন্টারনেট-এর যুগ। অন্য দেশের ট্রান্স জেন্ডারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি Organisation গড়ে তুলতে হবে যেখানে আশার আলো দেখবে তারা।

আনন্দে, উৎসাহে, আবেগে ভরে উঠল আমার মন। শুধু ভোটের অধিকার বা উজ্জয়িনী প্রয়াগের কুম্ভমেলায় প্রবেশাধিকার আমাদের জন্য সবকিছু নয়। এমন প্রশিক্ষণের দ্বারা তাদের আত্মনির্ভর করে তুলতে হবে যাতে তাঁদের মধ্যে থেকে সমাজ পায় অনেক দক্ষ কুশল কর্মীর দল।

বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা বলা, আলোচনা শুরু হল। কি কাজে লাগবেন এরা? এতদিন তো শুধু হাতে তালি আর মুখে গালি নিয়ে জীবন কেটেছে এদের।

প্রথম কাজ – নিরাপত্তা বাহিনী অর্থাৎ পুলিশের মধ্যেই Male, Female-এর সঙ্গে একটি কিন্নর সুরক্ষা বাহিনী তৈরী। যারা পুলিশ সৈনিক বা কমান্ডোদের মতন নানা ধরণের দৈহিক শক্তি বাড়াবে। Excercise জুডো, ক্যারাটে-এর ট্রেনিং নিয়ে মহিলাদের সুরক্ষায় নিযুক্ত হতে পারবেন।

আমরা জেনেছি – ‘Eunachs are casterated male since 9th century B.C…. The World derives from the Greek – “The keeper of Bed”, because those castrated men where in populer demand to guard royal harems”।

এঁরা বহু দেশে বহু রাজার – সম্রাটের বাড়িতে অন্দরমহলে তাঁদের রানী ও রাজকন্যাদের “সুরক্ষা কাজে” নিযুক্ত হতেন। গ্রীক, রোমান, হিন্দুদের পর মুসলমানদের বেগমদের রক্ষা কার্য্যেও তাঁদের অর্থাৎ এই হিজড়ে ট্রান্স জেন্ডারদের ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ইংরেজ সরকার তাঁদের ওপর অত্যাচার করেছে, অকারণে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে, – উল্লেখ মনিপুরের ঘটনা – শিশুদের সঙ্গে দেখলেই ছেলে ধরা বলে তাড়া করে গ্রেপ্তার করেছে – সে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অন্য জগতে বন্দি করে। ‘বহুচারা মাতার’ কল্পনা তাদের ধর্মবোধ জাগায় এবং নানাভাবে তারা একত্রিত হতে থাকে, কিন্তু তাদের মধ্যেও সেরকম কোন মানুষ নেতৃত্ব করতে বা তাদের সাহস এক করে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সক্ষম হয়নি।

বর্তমানে অনেক NGO হয়েছে। কলকাতায় ৪০/৫০ বছর আগে কোন ইউনাক বা হিজড়েকে কোথাও ভিক্ষে করতে দেখা যেত না এখন পথে ঘাটে রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রায় প্রত্যেক ট্রাফিক লাইটে, বাস স্ট্যান্ডে এবং ট্রেনে, বাসে এদের উপদ্রপ বাড়তে শুরু হল। এতো হিজড়ের সংখ্যা আচমকা কেন বেড়ে গেল সে বিষয়ে গবেষণা করে সমাজ বিজ্ঞানী তথা সাংবাদিকরা জানতে পারলেন যে কিছু গুরুমা তাঁদের আশীর্বাদ দানের অর্থাৎ বিয়ে বাড়িতে বর কনে দম্পতিকে ও সদ্য জন্মানো নবজাতককে স্নেহাশিস দিতে যাওয়ার ব্যবসাটাকে একচেটিয়া করে রেখেছেন তাদের অবস্থা বেশ ভালো। এখনও মানুষের আবেগে – ধর্মীয় ভাবনায় – দেবী মাতার দোহাই দিয়ে, কোথাও বা অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তাঁরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। বিশেষতঃ যাঁদের অনেক ধর্ণা দিয়ে অনেক দেব-দেবীর কাছে মানত করে বাচ্ছা হয়, তারা এবং কিছু অন্ধবিশ্বাসী ধনী পরিবারের লোকেদের বদান্যতায় এরা তাদের এই blessing দেবার জীবিকাটা ধরে রেখেছে। কিন্তু বাকিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়; হয় তারা Sexworker নয় Begger। আরেকটি চাঞ্চল্যপূর্ন খবর (ত্রিনয়নীর) আমার কানে এলো। –

কিছু গরিব ছেলে যারা চাকরি পাচ্ছেন না কিন্তু বড় পরিবারের সদস্যরা তাদের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল, তারা ছদ্মবেশী হিজড়ে সেজে টাকা রোজগারের এক অভিনব নতুন উপায় খুঁজে বের করেছেন।

এইরকম একটি দলের সঙ্গে আমার যে সত্যি সত্যি দেখা হয়ে যাবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। বিয়ের চার বছর পরের ঘটনা। “নির্মাল্য” আমার ছেলে, এখন দশ বছরের। তাকে বার বার চোখ পরীক্ষা করতে হয়। এখানে একজন চক্ষু বিশারদ বললেন ওকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ধরণের পরীক্ষা করাতে ও সেখানে ডাক্তারের মতামত নিতে। বাবা দেবমাল্য ও ছেলে নির্মাল্য খুব সহজে পাসপোর্ট ভিসা পেয়ে গেলেও আমি কিছুতেই যাওয়ার অনুমতিপত্র জোগাড় করতে পারলাম না। কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশন-এ জানা গেল আমার নামে তামিলনাড়ু পুলিশের খাতায় মারপিট করার কেস লিপিবদ্ধ করা আছে। বুঝতে পারলাম গুলাবীর রেপ ও মার্ডারের সময়কার ঘটনার জন্য আমার বাইরে যাওয়ার ছাড়পত্র মিললো না। অতএব ছেলে ও বাবা গেলেন তার চোখের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নতুন এক আলোর সন্ধ্যানে সিঙ্গাপুরে।

আমাকে আমার শাশুড়ি মা বললেন, – “তিন্নি চলো মা এই কয়েকদিন আমরা কলকাতা ঘুরে আসি। আমার ভাই বোনদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি, তোমারও বাপের বাড়ি যাওয়া হবে।”

আমার এই প্রস্তাবটা খুব ভাল লাগল। ওখানে শুনেছি এখন অনেকগুলি NGO আছে এই ট্রান্স জেন্ডারদের  জন্য, তাদের সঙ্গেও দেখা হবে।

দিল্লীর (Sangini 1997) সঙ্গিনী, নাজারিয়া (Nazariya), আশীর্বাদ (Ashirwad in Pune) পুনেতে প্রান্তিক প্রভৃতি নানা নাম নানা রকম বেসরকারি সংস্থা পথ শিশু নারী বা হিজড়ে, লেসবিয়ান, গে অর্থাৎ সমাজের অবহেলিতদের সাহায্য করবার জন্য অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন। কিন্তু আরও নানা দিক থেকে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত পুরুষ, নারী তথা হিজড়ে – সকলকেই জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজন আছে। সাধারণ মানুষ ঐসব গোষ্ঠীর মানুষকে যেমন সমদৃষ্টিতে দেখেন না, তাদের সহানুভূতি যেমন বাড়ানো দরকার ঠিক তেমনি আমাদের নিজেদের গোষ্ঠীরও দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে হবে। তাদের যত কুসংস্কার ছাড়তে হবে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, উত্যক্ত-জ্বালাতন করে টাকা রোজগারের পন্থাও পাল্টাতে হবে।

দেবমাল্য ও নির্মাল্যকে বিদেশ যাত্রায় পাঠিয়ে আমি ও মা চেপে বসলাম কলকাতার ট্রেনে। অনেক জায়গাতেই দেখলাম স্টেশনে আমাদের গোষ্ঠীর সদস্যদের ভিক্ষে করতে। কলকাতার কাছাকাছি আসতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমাদের সামনের সীটে একজন মধ্যবয়স্ক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছিলেন। প্রথমে মায়ের সঙ্গে আলাপ করলেন পরে আমার প্রতি কৌতূহল দেখে আমিও কথা বলতে শুরু করলাম। মনে হল উনি খুব অবাক হয়েছেন, তবে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেশের সমস্যা ও রাজনীতি আলোচনা করতে লাগলেন আমার সঙ্গে।

খড়গপুর স্টেশন এল, স্টেশনে নেমে চপ, সিঙ্গারা জিলেপী কেনার লোভটা সামলাতে পারলাম না। মায়ের জন্যে গরম চা হাতে নিয়ে কামরার জানলা দিয়ে তাঁকে দিতে যাব এমন সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে একদল আমারই গোষ্ঠীর হিজড়ে সম্প্রদায় হৈ হৈ করে উঠে পড়ল আমাদের ঐ রিজার্ভ কম্পার্টমেন্টে। ট্রেন ছেড়ে দিল, আমরা যারা নেমেছিলাম তারা সবাই উঠে নিজের সীটে বসতে গেলাম। কিন্তু তারা ততক্ষণে নানা অসভ্য ভাষায় গালি গালাজ দিয়ে লোকেদের কাছে টাকা/পয়সা আদায় করতে শুরু করেছে।

ভীষণ রাগ হল আমার। ঐ বয়স্ক ভদ্রলোকও বেশ জোরে বলে উঠলেন – “কি হচ্ছে এসব? সরো আমাদের বসতে দাও।” তারা ঐ ভদ্রলোক কে বললো – “আগে টাকা ছাড় – – – শা – – – ব – – – পরে বসতে পারবি, নয়তো এই আমার কাপড় তুল – – – ” কথাটা শেষ হল না, লজ্জায় ঘেন্নায় মুখ সরিয়ে নিলেন ঐ ভদ্রলোক। এবার মায়ের কাছে একজন মুখ ঝামটা দিল – “এ্যাই বুড়িয়া তালি বাজাচ্ছি তুই নিজের ব্যাগ খোল।”

এবার আর আমি থাকতে পারলাম না। আমাদের হিজড়েদের মধ্যে আমরা ফারসি, উর্দু এবং হিন্দি মেশানো যে বিশেষ ভাষায় আমরা কথা বলি, সে ভাষায় বললাম চিৎকার করে, “একদম চুপ কর নয়তো এমন শাস্তি দেব যে” ওরা হো হো করে হেসে উঠলো। আমার হিজড়ে সম্প্রদায়ের ভাষা ওদের বোধগম্য হল না। প্রথমে ভাবলাম পশ্চিমবঙ্গে ওরা হয়ত এখন ঐ ভাষায় আর বার্তালাপ করে না। তাই একজনের শাড়িতে টান দিয়ে বললাম “সাৎলা (শাড়িকে আমরা বলি) উঠায়েগা তো এক থাপ্পড় খায়েগা – তেরে গুরুমা কোন হ্যায়?”

আমাকে ধাক্কা দিয়ে সে আর একটা অশ্রাব্য গালি দিতেই আমি দাঁড়িয়ে উঠে ওদের চুলের মুঠি ধরে টান দিলাম। আমার হাতে ওদের লম্বা পরচুল্লা এসে গেল। অনেক্ষন থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল, এবার প্রমান পেয়ে গেলাম এরা হিজড়ে সেজে এসেছে। শাড়ি ধরে টান দিতেই সে ঘুরে পড়ল বেঞ্চের উপর। ব্লাউজে টান দিতেই অন্যরা হৈ হৈ করে উঠলো। কিন্তু ততক্ষণে আমি ওকে বে-আব্রু করে কাচ্ছা বনিয়ানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। সবাই বুঝতে পারল যে কিছু ছেলে “হিজড়ের” পোশাক ও বেশ ধরে এসে এক নতুন ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেছে। ঐ ভদ্রলোক এবং আরও দু চারজন যুবক তরুণ ততক্ষণে ভিড় জমিয়ে ওকে কিল চড় মারতে শুরু করেছে। ছেলেটি হাউ মাউ করে কেঁদে আমার পায়ে পড়ল। আমার বড্ডো মায়া লাগল, মারের হাত থেকে রক্ষা করে জিজ্ঞাসা করলাম – ‘সারাদিন কি করো?’

– ট্রেনে পেন, চিরুনি, আমলকি চূর্ণ বিক্রি করি, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। তাই যখন দেখলাম হিজড়েদের দলটি কেমন ‘তালি’ আর ‘গালি’ দিয়ে টাকা আদায় করছে – প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে, শাপ-শাপান্তর ভয়ে, অসভ্যতামী, নির্লজ্য অঙ্গভঙ্গি এবং অকথ্য ভাষা শুনে পুলিশ তাদের ভয় করে চলে এবং গাড়ি বাবুরা টাকাও দিয়ে দেয়। তখন ভাবলাম সন্ধ্যে বেলায় এইভাবে ভিক্ষা করতে পারলে ভালো উপার্জন হবে।

– আমার চোখে জল এসে গেল। দারিদ্রতা অসহায়তা সমাজের বৈষম্য আজ আমাদের তরুণদের কত নিচে নামতে বাধ্য করেছে। প্যাসেঞ্জেরদের মধ্যে আলোচনা শুরু হল। হিজড়ে সম্প্রদায়ের এইভাবে ঘৃণ্য উপায়ে জোর করে টাকা আদায়ের পন্থাকে সরকার কি বন্ধ করতে পারে না? তাদের জন্য যদি কাজের বা নানা ধরণের ‘প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার ব্যবস্থা হয় তাহলে তো তারাও এইভাবে পথে বেরুবে না।

আজকাল বড় বড় এপার্টমেন্টে তারা বাচ্চাকে আশীর্বাদ করতেও ঢুকতে পারে না। বিয়েতেও কেউ সহজে তাদের আসতে বা আশীর্বাদ করতে দেয় না। কারণ মানুষ আর বিশ্বাসও করে না যে শুভ কাজে ঐ তৃতীয় সত্তার কোন প্রয়োজন আছে।

সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যেমন গুন্ডা পালন করা হচ্ছে। এই গোষ্ঠীর মধ্যেও এখন তেমনি সব দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষ জুট গেছে। তারা বড় বড় ব্যবসাদারদের বাড়ি গিয়ে পুত্রকে দেখবার জন্য হাজির হয়ে যায় নার্সিংহোমে, হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে। যাত্রীদের মধ্যে এখন নানা গুঞ্জন শোনা গেল। একজন সাংবাদিকও যোগ দিলেন সেই আলোচনায়। কয়েকদিন আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন তিনি।

বর্দ্ধমান জেলার একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাচ্চা হওয়ার খবর শুনে একদল হিজড়ে এসে বাচ্চাটিকে কোলে নিতে চাইল। মা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। বাড়ির মালিকও টাকার অঙ্ক শুনে আঁতকে উঠলেন, বললেন, – “মগের মুলুক নাকি? এত টাকা কোথায় পাবো?” বাড়িতে তাঁর দুই ভাই ছিলেন, তাঁরাও রুখে উঠলেন। “পারবো না এত টাকা দিতে আমরা – পুলিশ ডাকবো।”

তারা এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে মায়ের কোল থেকে টেনে নিতে গেল। গালির সঙ্গে শাপ দেওয়ার অমঙ্গলের ভয় দেখানো চলতে লাগল।

মায়ের কোলে কচি বাচ্চা কেঁদে উঠল। যে ঢোলক বাজাচ্ছিল তার সঙ্গে বড় ভাইয়ের ধাক্কা ধাক্কি হাতাপাই শুরু হল। আর তখনই একজন ছিনিয়ে নিয়ে বাচ্চাটিকে দোলাতে লাগল জোরে জোরে। নবজাত শিশুটি পড়ে গেল তার হাত থেকে। তারপরের বর্ণনা শোনার আর আমাদের প্রবৃত্তি হল না।

সত্যিই এরা দিনে দিনে কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছে, কেন এমন ভাবে সমাজে নিজেদের কলঙ্কিত করছে তা ভাবতে ভাবতে আমার ও মনে ভীষণ ভীষণ হতাশা নৈরাশ্য এসে ঘিরে ধরল।

কলকাতায় গিয়ে অনেক বুদ্ধিমান সমাজসেবীদের, Activist দের সঙ্গে, পুলিশ অফিসার এমন কি মন্ত্রীদের কাজে যারা সাহায্য করেন সেই সব বড় বড় অফিসারদের সঙ্গে কথা বললাম। সকলেই সমালোচনা করেন, নিন্দাতে সোচ্চার হন, কিন্তু প্রতিকারের উপায় কেউ বলছেন না।

আমি নিজে ট্রান্স জেন্ডার তাই তাদের দুঃখ-কষ্ট শোচনীয় অবস্থায় যেমন ব্যথিত হই, তেমনি তাদের অসামাজিক কার্যকলাপকে বন্ধ করে ভদ্র জীবন যাপনের উপায় বের করতে সচেষ্ট হই।

যতক্ষণ না আমার ভারতবর্ষের সব প্রদেশের হিজড়ে গোষ্ঠীকে এক করতে পারব, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান না জাগাতে পারব ততক্ষণ কোন লাভ হবে না।

 

পঞ্চম অধ্যায় (আলোকাশ্রম)

পুনে ফিরে এসে দেবমাল্য ও আমি উঠে পড়ে লাগলাম একটি NGO তৈরী করবার জন্য। এখন তো আমরা ভোটের অধিকার পেয়েছি, তাহলে সরকারকে সজাগ করতে হবে। আমাদের সমাজের উন্নতি না ঘটলে, আমাদের পুলিশ বাহিনীতে আলাদা প্রশিক্ষণ দিয়ে সুরক্ষা দলে কাজ না দিলে, শিক্ষার জন্যে আলাদা বিদ্যালয়, নার্সিং কলেজে সীট রিজার্ভ না করলে, আমরা তাদের ভোট দেব না। “ভোট ব্যাঙ্ক” মন্ত্রীদের কাজে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট তাই এবার ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে নিজেদের স্বনির্ভর করার চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। এমনকি ট্যাক্সি চালক হবার জন্য মোটর ট্রেনিং স্কুলে হিজড়েরা যদি গাড়ি চালানো শেখেন তাহলে রাত্রে মেয়েদের জন্যে ট্যাক্সি চালকের কাজ দিলে সমাজে মেয়েদের প্রতি অত্যাচার এমনকি রাত্রে ধর্ষণের কেসও কমে যাবে। মহিলা এম.পি, এম.এল.এ-দের সাথেও দেখা করলাম। কিন্তু তেমন সাড়া পেলাম না। হটাৎ একদিন কাগজে পড়লাম উড়িষ্যা সরকারের কথা। তারাই প্রথম প্রদেশ যারা এই হিজড়ে গোষ্ঠীকে নানারকম সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ছুটলাম সেখানে।

সত্যিই তাদের এই প্রথম কেউ সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখলো। তাদের জন্যে ‘পেনশন’ ভাতা দেওয়ার কথা শুনে মনটা আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। উড়িষ্যার এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে নিরিবিলি জায়গাতে আমাদের এক অফিস তথা আশ্রম গৃহ বানানো হল। নাম দিলাম আলোকাশ্রম।

সেখানে প্রথমেই একটি গাড়ি কিনে মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং এর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। যে হিজড়েরা একটু আত্মবিশ্বাসী এবং রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন। প্রথমে মাত্র দশ জন হিজড়ে ভাই বোন এসে ওখানে আশ্রয় নিলেন। পরে কয়েকমাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা বেড়ে ২০ হয়ে গেল। অনেকেই গুরুমা কে ছেড়ে আসতে ভয় পায় তাই এবার আমাদের গুরুমা কে অর্থাৎ কমলা আম্মাও আমার সব গুরু ভাই বোনদের নিয়ে এলাম এখানে। এবার জমে উঠল এক নতুন আনন্দালয়।

১৯৯৪ তে ভোট দেওয়ার ‘অধিকার’ পেয়েছি আমরা “শাবানা মৌসী” মধ্যপ্রদেশের বিধায়ক হন ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। রায়গড়ে মধু কিন্নরও অনেক কাজ করছেন। কিন্তু সারা ভারতে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক জাগরণ আনার জন্যে একজোট হয়ে কিভাবে আমরা কাজ করব – আন্দোলনে গিয়ে আমাদের মর্যাদা – সুবিধা Basic Need গুলো পূরণের দাবি করব – তা ভেবে পাচ্ছি না। অনেক কিন্নর ধর্মকে – নাচ-গানকে উপজীব্য করেই থাকতে চান। হিন্দি সিনেমার প্রভাব একদলকে সাজ-সজ্জা বিলাস-বাহুল্য ও অতি জাঁক জমকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখছে সেই সব মানুষের প্রতি অন্যান্য পুরুষেরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন – জমাচ্ছেন তাঁদের পাশে কিন্তু সাধারণ গরীব হিজড়েরা আরও গরীব হয়ে যাচ্ছেন – এই বৈষম্য সমাজের প্রতিটি স্তরে এই ধনী নির্ধনের বিভেদ ক্রমশঃ বাড়ছে। এর যে প্রতিকার কী ভাবে হবে তা কে জানে।

আমাদের ‘আলোকাশ্রমে’ ধীরে ধীরে অনেক সদস্য বাড়তে লাগলো – প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাল শিক্ষক – ট্রেনার জোগাড় করা বিদেশের ইউনাকদের ভারতের হিজড়েদের এই শোচনীয় দুর্দশার কথা অবগত করিয়ে ‘দান’ – funding তথা সবরকমের সহযোগিতার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। আশা ও উৎসাহ আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। একদিন আমাদের জীবনের অন্ধকার দূর হবেই যদি সবাই এগিয়ে আসেন।

জীবন বড় মূল্যবান তার রক্ষার দায়িত্বও আমাদের। যখন বেঁচে আছি তখন ডাক্তার, ওষুধপত্র, সুচিকিৎসায় স্বাস্থকর পরিবেশ সৃষ্টি করে শরীরকে অক্ষত নীরোগ করার দায়িত্ব যেমন আমাদের তেমনি মৃত্যুর পরও যে এই দেহ অন্যের কাজে আসতে পারে সে সম্পর্কেও সজাগ হবার দিন এসেছে।

আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল চোখ। আমাদের দেশে চোখের চিকিৎসাও এখন খুব ভালোভাবে হচ্ছে। একটি NGO এসে আমাদের আলোকাশ্রমের কিন্নরদের কাছে অনুরোধ করলেন ‘চক্ষুদানের’ জন্য।

“ত্রিনয়নী” নাম যখন পেয়েছি তখন এই জীবনের নয়ন যদি আরও কারো চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে তার চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে।

বিশেষ করে আমাদের পুত্র দৃষ্টিহীন নির্মাল্য কে নিয়ে বিভিন্ন চক্ষু চিকিৎসালয়ে ঘোরাঘুরি করতে করতে আরও অনেক কিছু জানতে পারলাম। বিজ্ঞানের এই বিশেষ অবদান অপারেশনের দ্বারা চক্ষুদান। নির্মাল্যের চোখ পরীক্ষা করে জানা গেছে, তার কর্নিয়ার মধ্যে সমস্যা আছে। কোনো সুস্থ ব্যক্তির কর্নিয়ার টিস্যু যদি পাওয়া যায় তাহলে তার অপারেশন করা হবে। অর্থাৎ Healthy Donner চাই। এই অপারেশনকে বলা হয় ‘Keratoplasty ‘ – ‘A cornea transplant operation is possible to restore vission ‘ – এই খবর আমাদের মনে ভীষণ আলোড়ন তুললো। Healthy donated Tissue ঐ diseased cornea র damaged portion কে বাদ দিয়ে ডোনারের টিস্যু লাগিয়ে দিলেই আমাদের ছেলে নির্মাল্য দেখতে পাবে, অতএব এবার চলল ডোনারের অপেক্ষা। দিল্লী – মুম্বাই – চেন্নাই সব জায়গায় এখন বড় বড় চোখের হাসপাতাল, আমাদের দেশেই এখন এত ভালো চিকিৎসা হয়। ছেলেকে নিয়ে স্বামী দেবমাল্য ব্যস্ত আছেন। এদিকে আমার গুরুমা কমলা আম্মা খুব অসুস্থ। কিছুদিনের মধ্যেই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের মাতৃ পিতৃ হারা করল। প্রচন্ড শোকে ভেঙে পড়লেন আমার আশ্রমের গুরু বোনেরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আম্মার দেহ আগলে বসে রইলেন। শুধু চক্ষু দান নয় পুরো দেহ দান করে গেছেন তিনি। কিন্তু আমাদের গোষ্ঠীর কেউই তাঁর দেহতে হাত লাগাতে দিল না হাসপাতাল থেকে আগত ডাক্তারদের। তাদের ধারণা চোখ খুলে নেবে – চোখের কোটোর থেকে এবং তাঁর দেহ সৎকার হবে না। পরের জন্মে তিনি অঙ্গহীন চক্ষুহীন হয়ে জন্মাবেন। অতএব তাঁকে পোড়ানো হোক।

আমার বোঝানো, আম্মার শেষ ইচ্ছে পূরণ করার চেষ্টা বৃথা গেল। তাঁদের কান্নাকাটি, হৈ চৈ – তর্ক বিতর্কে সময় পার হয়ে গেল। এখানে তিন্নি একা তো তাঁর শিষ্যা তথা সন্তান নন। সমস্ত গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠল।

কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ মানুষগুলির ধর্মান্ধকার – ইহকাল – পরকালের ভুল ধারণা একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে দিল না। আমি ও দেবমাল্য ভীষণ বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। কমলা আম্মার শোকে আচ্ছন্ন হলেও তাঁর শ্রাদ্ধ শান্তি অবাস্তব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রবৃত্তি আর রইলো না আমাদের। অন্ধ পুত্র কে নিয়ে কখনও Shroft Eye Centre কখনও Shankar Netralay কখনও অন্য কোনো চোখের হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম এক তরুণ মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে দিল্লীর রাজপথে। বাবা মাকে খবর দেওয়া হলে তাঁরা যখন তাকে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছালেন তখন জানতে পারলেন সেই তরুনের শরীরের নিচের অংশ ট্রাকের তলায় ঢুকে যাওয়া দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু ওপর দিকের ভাগ সম্পূর্ণ অক্ষত আছে। মৃত পুত্রের সামনে তার পিতা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পাথরের মতন দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে দিয়ে নিয়ে গেল আরও কয়েকটি যুবক রুগীকে – কেউ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাতরাচ্ছে যন্ত্রনায়। কয়েকজন তরুণ ডাক্তার নার্স সেই ছেলেগুলিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একজন লেডি ডাক্তার এসে সেই পিতার হাত ধরে অনুরোধ জানালেন – “Uncle আপনার ছেলে তো চলে গেছেন, আর ফিরে আসবেন না, এই ছেলেগুলির অবস্থা দেখুন – একজনের একটি চোখ নেই, দুজনের পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে – আপনার ছেলের শরীর থেকে আমরা – – -” কথাটা শেষ করতে দিলেন না সেই বাবা। বললেন আমার ছেলের দেহ আপনারা নিয়ে যান, যদি কোন যন্ত্র এখনও তাজা থাকে লাগিয়ে দিন অন্যকে – আমি জানব তার জীবন ধন্য হ’ল।

দেবমাল্যর মোবাইলটা বেজে উঠল – “আপনার ছেলের ডোনার পাওয়া গেছে। শীঘ্র Eye Centre এসে যোগাযোগ করুন।”

নির্মাল্য তার দৃষ্টি ফিরে পেল, ভগবানের অশেষ কৃপা ও ডাক্তারদের অপরিসীম প্রচেষ্টায়। আমি আবার লেগে পড়লাম আমার কিন্নর গোষ্ঠী কে শিক্ষিত করার, জাগ্রত করার, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে।

 

সমাপ্ত

মুক্তির স্বাদ (Muktir Shad)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ছোটবেলা থেকেই বন্দি ছিলাম আমি
সোনার খাঁচায়।
বৃদ্ধ বয়সে অন্তিম অধ্যায়ে এসে,
বুঝতে পারলাম, -
এ জগৎ টা এক বিশাল বড় - হ্রদ।
এখানে এসে মিলিত হয়েছে,
আবার উৎপন্নও হয়েছে, -
অনেক নদী ও নদ।
 
আত্মীয় পরিজন বন্ধু স্বজন
সহকর্মীর ভালোবাসা, -
আত্ম-তৃপ্তি, নিরাপত্তা, নানান রঙিন আশা -
সেই গভীর জলের তলায় -
থরে থরে সাজানো।
চুনী-পান্না, হীরে মাণিক্য -
মুক্ত ভরা সুক্তি দিয়ে ঠাসা।
এরই মধ্যে ডুবিয়ে রেখে, -
ঠাকুর যে নেন, নিত্য
আমার পরীক্ষা।
 
এতোগুলো দিন তো ছিল,
হিসেবে করে চলা, -
গুনে গুনে, ধীরে ধীরে, মেপে মেপে
পা ফেলা,
অকারণে কাজে কথায়
সময়ের প্রতি অবহেলা,
শ্রী শ্রী মা দেন
মোহ লোভ ও চঞ্চলতা জয়ের -
'লক্ষ্মী শ্রী' বাড়িয়ে তুলে,
নিন্দাবান্দা লয়ের
অভিনব এক দীক্ষা,
অন্যদিকে স্বামীজী দেন, কর্ম যোগের শিক্ষা।
 
তাঁদের বাণী কার্যকরী করে -
জীব প্রেমের সেবার মন্ত্র ধরে -
জীবন এখন করছে শুধু তোমারই অপেক্ষা।
এসো প্রভু তুমি এসে,
অকারণে ভালোবেসে, -
তলিয়ে গিয়ে গভীর জলে,
দাও আমারে মুক্তির স্বাদ -
বন্দি হবার ভয় হতে আজ
করিও গো রক্ষা।।

জীবনের অতিথি (Jiboner Otithi)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মানুষের জীবন যেন এক চলমান স্রোতের মতন। সেখানে ভেসে আসে কত প্রিয়, স্নেহময়, শ্রদ্ধেয় লোকের নৌকা একের পর এক। আজ স্মৃতির খেয়া বাইতে বসে তাঁদের কথা খুব মনে পড়ছে, তাই হয়ত নিজের মুখোমুখি হতে গিয়ে প্রথমে তাদের স্মরণ গাঁথা গাইতে বসেছি। আপন গর্ভধারিনীর স্বর্গীয়া চিন্ময়ী গুপ্তার  প্রতি ভক্তিপূ্র্ণ প্রণাম জানিয়ে এই লেখাটি আরম্ভ করছি।

 

প্রথম অধ্যায়

 

ধাত্রী মা

চন্দনা সেনগুপ্ত

“কী পাইনি তারই হিসাব মেলাতে

মন মোর নহে রাজি।”

কী পেয়েছি তার খোঁজ করতে করতে –

গুচ্ছ গুচ্ছ শুভ্র রঙিন পুষ্পে

ভরিয়ে নিতে চাই, আমার “স্মরণ সাজি”।

পেছন ফিরে দেখলাম একা একা বসে ঘরে – এই সত্তরটি বসন্তের দ্বারে শুধু একটা তো নয় ‘সাজিরা’ লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে থরে থরে। সেগুলি কোনটা বেতের বুনুনিতে অদ্ভুত এক কৌশলে বানানো এতগুলো বছর পরেও ছিঁড়ে যায়নি ফুলের পাঁপড়িগুলি শুকিয়ে প্রজাপতির পাখা হয়ে গেছে, কিন্তু অপূর্ব তার গন্ধ, ঠাকুর ঘরের মতন পবিত্র তার রূপ।

কিছু সাজি পিতলের পিলসুজের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। তারা যেন অনেকরকম বনফুল সংগ্রহ করে রেখেছিল। জালির ফাঁক দিয়ে অনেকগুলি পড়েও গেছে সেখান থেকে।

আবার সোনা রূপোয় তৈরী কিছু জালি না বানানো কারুকার্য খচিত আমার ‘সাজির’ কাজ করেছে – সেখানে ফুল নয় হীরে-মুক্ত, রত্ন, নীলা, পলার মতন মনি মানিক্য উঁকি দিচ্ছে। নানা সময়ের নানা মানুষের নানা ধরনের উপহার সম্ভার।

‘চন্দন ঘষতে ঘষতে সুগন্ধ বের হয়’। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ বার বার বলতেন। তাই চন্দনার জীবন কাষ্ঠেরও ঘর্ষণ দরকার। ঠিক করে ফেললাম এবার ঘরে ফেরার পালা। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

‘মন চলো নিজ নিকেতনে’ গাইতে গাইতে স্মৃতির খেয়া বাইতে বাইতে একটু উল্টো স্রোতে চলা যাক।

প্রথমেই বড় ঢেউ এর এই ধাক্কাতে পৌঁছে গেলাম একবারে শৈশবের কিনারে। যেখানে জন্মদায়িনী জননীর গলায় শুনতে পেলাম রবীন্দ্রনাথকে আর পিতার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো – কথামৃতের বাণী। প্রিয় জ্যাঠামশাই, পিশিমাদের মুখে ‘হরি নামের’ বোল আবার মামাবাড়ির দাদু ডঃ অনাথ বন্ধু রায়ের অপারেশন থিয়েটার থেকে ভেসে আসা ক্লোরোফর্মের গন্ধ।

শৈশব যে বৈভব – ঐশ্বর্যময়, সুন্দর সুন্দর স্বপ্নে ভরা তার কোনো তুলনা নেই। সব মানুষকেই তা সে গরীব বা বড়োলোক হোক না কেন, এই অপরূপ সময়ের পথ ধরেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। আবার এই পথেই ছেড়ে এসেছে তার সবচেয়ে সুখকর নিশ্চিন্ত জীবনের একান্ত প্রিয় অধ্যায়টিকে।

আমার ছেলেবেলা বইতে ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর পদ্মাপারের অসামান্য শৈশবকে ধরে রাখতে পেরেছেন। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের স্নেহপূর্ণ আবেষ্টনীতে হয়তো সেরকম দিনের কাহিনী বর্ণনা করতে পারবো না, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় নানান বিচিত্র ঘটনা ও মানুষের পরিচয় পেয়ে আমরাও ধন্য হয়েছি – এ কথা অনস্বীকার্য। সেখানেও একটা নদী আছে, পদ্মা বা গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের মতন মহিমা তার নেই, সব সময় জলে পরিপূর্ণও থাকে না সে, কিন্তু তার সাদা বালির মধ্যে যে অভ্র চিক চিক করত তাকে খুঁজতে গিয়ে এই বার্ধক্যের সীমায় এসে আমি যেন ভাবে বিভোর হয়ে পড়েছি। হাতের আঙুলগুলি এখনও অবশ হয়নি, তাই তাদের কথা লিপিবদ্ধ করতে কলম ধরলাম।

পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া জেলার এক অতি সুন্দর ছোট্ট শহরের তাঁতি পাড়া। মাঝে তার বিষ্ণু মন্দির, কলকে, টগরের গাছ, দু চারটে কাঁচা মাটির গোয়াল আর প্রত্যেক বাড়ির মধ্যেই রয়েছে কাঠের তাঁতশাল। সকাল থেকেই সেখানে বাড়ির কর্তা, বাবা, দাদু ও ছেলে বসে যান, খালি গায়ে দুটো দড়ি ধরে টানতে। আওয়াজ উঠতো খট খটা খট খট খট। বোনা হতো চাদর, গামছা, লুঙ্গি, আট হাতি ডুরে শাড়ী – ট্যানা বাচ্চা মেয়েদের জন্যে। হ্যাঁ, সেটা হলো গোপীনাথ পুরের তাঁতীপাড়া।

একটু দূরের জেলখানার বাগান, যেখানে জেলখানার কয়েদীরা চাষ করে কপি – আলু ফলায়। অন্যদিকে পুলিশ থানা। সেই বিশাল পাঁচিলে ঢাকা জেলখানাটি ইংরেজ আমলে বোস্টেল ছিল, তাই তার পাশের মাঠটির নাম বোস্টেল মাঠ। সেখানে একদিকে যেমন বড়োরা অন্যদিকে সেরকম ছোট ছেলেরা ফুটবল খেলে। মাঠের মাঝখান দিয়ে পথ চলার রাস্তাও আছে। সেখান দিয়ে জজ কোর্টের দিকে বা ‘মাচানতলায়’ কিম্বা বাজারের দিকে যায় লোকেরা। ঠিক গ্রামও নয় আবার একেবারে শহরও নয় – বাঁকুড়ার এই অঞ্চলটা অদ্ভুত এক নিজস্ব রূপ নিয়ে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছে। তাঁতিরাও বেশ বর্ধিষ্ণু, সকলের বাড়িতে হাঁস, মুরগি, গরু পোষা আছে। জামবাটিতে পান্তা ভাত আর সাদা ধবধবে সজনে ফুলে ঢাকা সারি সারি গাছ। তাঁতিবৌরা খালি গামছা জড়িয়ে কোমরে আঁচল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বসে, পুকুরে বাসন মাজে ও চান করে, ছেলেদের সাঁতার কাটা, দাপাদাপি লেগেই থাকে। তাঁতীপাড়ার মাঝে মাঝে দু-চার জন উকিলবাবু বাড়ি করেছেন বোধহয় কোর্ট কাচারী, বাজার দোকান, ফিডার রোডের বড় রাস্তা কাছাকাছি বলে। সেখানে একটি সাদা দোতালা বাড়িতে নতুন ভাড়া এসেছেন বড় ডাক্তার অনাথবন্ধু রায় মহাশয়ে্র জামাই কল্যানী প্রসাদ। নতুন বিয়ে হয়েছে তাঁর ঐ কাটা ছেড়ার (শল্য চিকিৎসক) ডাক্তারের বড় মেয়ের সঙ্গে। এই যুবকটিও ডাক্তার, সব রকমের রুগী দেখেন (জেনারেল ফিজিসিওন) আবার মল-মূত্র-রক্ত পরীক্ষাও করেন। অতি সুদর্শন, শান্ত, হাস্যময় ছেলে।

তাঁতীপাড়ার লোকেরা ভীষণ খুশি, রাত বিরেতে যখন তখন অসুখে বিসুখে এই তরুণ ডাক্তারবাবুকে তারা কাছে পায়। টাকা পয়সার লোভও তাঁর নেই, জ্বর জ্বালায় নিজে হাতে মিক্সচার বানিয়ে দেন, খোস পাঁচড়ায় লাগিয়ে দেন নিজের হাতের তৈরী মলম। ডাক্তার গিন্নি বড় মানুষের বিটি, খুব সুন্দর লম্বা চুল, সন্ধ্যেবেলায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন, পাড়াটা বেশ গম গম করে। সেই শান্ত সুন্দর পরিবেশে ডাক্তারবাবুর প্রথম পুত্র বাপি (অশোক গুপ্ত) জন্ম নিল, পরে দু-বছর যেতেই আরেকটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হলো, নাম বকুল (মালবিকা)। কিন্তু তার ছ মাস পরে আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন জননী চিন্ময়ী। এবার কিন্তু অনেকটা unwanted এতো তাড়াতাড়ি তিনটি শিশুকে কি করে সামলাবেন সেই তরুণী মা, সকলেই বিশেষভাবে চিন্তিত। ১৯৪৯ সালে মাঘ মাসের রাত্রে যন্ত্রনা উঠলো মায়ের। ডাক পড়লো সেই সময়কার সবচেয়ে প্রিয় ‘স্বান্তনা’দি কে। তিনি ছিলেন বাঁকুড়া জেলার সবচেয়ে সুদক্ষা স্নেহময়ী “ধাত্রী”, কোথায় কেমনভাবে তিনি এই নার্সের ট্রেনিং নিয়েছিলেন জানি না, অসামান্য কৌশলে অতি স্বচ্ছন্দে তিনি বাঁকুড়ার শত শত মায়ের প্রসবকালে যখনি ডেকেছে গিয়ে হাজির হয়েছেন এবং বাচ্চা প্রসব করিয়েছেন। বাড়ি তার নিকটেই। তাই রাত্রের খাওয়া দাওয়া সেরে এসে গেলেন। গরম জল তুলো ও পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো – তার যা যা দরকার সব ঠিক আছে কিনা দেখে নিলেন, মায়ের পেট টিপে, ইউট্রাসের মুখ পরীক্ষা করে বললেন নাঃ সকালের আগে বাচ্চা বেরোবে না। এখনও জল ভাঙেনি। ঠিক ভোর পাঁচটায় যখন বাইরের রাস্তা দিয়ে ২৩শে জানুয়ারী উপলক্ষে পাড়ার ছেলেরা প্রভাত ফেরী নিয়ে বেরিয়েছে, তাদের ‘দেশাত্মবোধক’ গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে শীতের বাতাস। জানালা দরজা খুলে সবাই বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, শাল গায়ে জড়িয়ে তখনি তাঁতীপাড়ায় ডাক্তারবাবুর নিচের তলার ঘরে একটি শিশু কন্যা জন্ম নিল। আবার মেয়ে! কে যেন বললো। ধাত্রী স্বান্তনাদি ধমক দিয়ে উঠলেন তাকে, মেয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে? মেয়েরাই তো সংসারের লক্ষী, এরাই তো সংসারের শ্রী বর্ধন করে।

সেদিনের সেই মেয়েটি আজকের ‘আমি’, নাম দেওয়া হয়েছিল আমার দিদি বকুলের সঙ্গে মিলিয়ে “মুকুল”। মাত্র দেড়বছর স্বাধীনতা হয়েছে কিন্তু দেশের অবস্থা তখনও তেমন মজবুত হয়নি। ডঃ আম্বেদকরের তত্ত্বাবধানে নানা গুনীজনেরা বসেছেন দেশের কনস্টিটিউশন অর্থাৎ দেশ পরিচালনার জন্য আইন কানুন, কার্যপদ্ধতি নীতি, নিয়মপত্র বানাতে। একবছর আগে গুলিবিদ্ধ করে মারা হয়েছে জাতির জনককে। হিন্দি, ইংরেজি, আঞ্চলিক কোন ভাষায় আমাদের লেখাপড়া শেখানো হবে কেউ জানে না, তখনও কিন্তু বাঁকুড়ায় মিশন স্কুলে, কালিতলা স্কুলে, খ্রিস্টান কলেজে খুব জোর শোর দিয়ে পড়াশুনো চলছে। নাচ, গান, খেলাধূলা সবই শেখানো হচ্ছে। নিজের প্রথম পাঁচবছরের স্মৃতি মানুষের খুবই অস্পষ্ট থাকে। তবে মা, দিদিমাদের মুখে শুনে শুনে হয়ত কিছুটা রূপায়ন করা যায়। আমিও সেই প্রচেষ্টা করে যাব। কারণ এই লেখনী তো শুধু আমার নিজের মনের কথা বলার জন্যে নয়।

(ক্রমশ)

দ্বিতীয় অধ্যায়

“এক থেকে পাঁচে প্রথম দুর্ঘটনা” —

আমরা তিন ভাই বোন মাকে খুব জ্বালাতন করতাম, আর মায়ের শরীরও খুব খারাপ হয়ে যায় তাই আমাদের জন্য নিয়ে আসা হয় কোন এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কামিনী মাসীকে, তাঁর মুখ আমার মনে পড়ে না কিন্তু ঘোমটা ঢাকা সাদা থান পরা সেই ভদ্রমহিলার অবয়ব এক এক সময় চোখে ভেসে ওঠে। এত স্নেহ ও আন্তরিকতা ছিল সেই যত্নে, যার কোন তুলনা নেই। পরবর্তীকালে নার্সারি টিচার্স ট্রেনিং করার সময় চাইল্ড সাইকোলজি পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম, একেবারে শিশু অবস্থায় শিশু যদি নিরাপদ স্নেহপূর্ন কোমল কোল পায় তাহলে পরবর্তীকালে সে কখনও নিরাপত্তার অভাববোধ করে না। আমার জীবনে মানুষের মিছিলে – যাঁরা সামিল হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ হল, এই – কাজের মাসী, দিদি, ক্ষেন্তি, কুন্তী, শ্যামা, মায়ার দল। এঁদের অবদান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবনের প্রতিটি দিন, অধ্যায়কে কিভাবে সমৃদ্ধ করেছে, তা মুখে তো নয়ই, ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না। তাঁরা অভাবের জন্য তাঁদের বাড়ি ঘর সংসার ছেড়ে আমাদের মতন পরিবারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতেন, প্রাণ দিয়ে এই পরিবারের সব ভার বহন করতেন, আপন সন্তানের মতন করে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মানুষ করতেন, কিন্তু বড় হয়ে কি তাঁরা কি কেউ তাঁদের মনে রাখতো? কামিনী মাসী ঝিনুকে করে আমায় দুধ খাওয়াতেন, কুঁয়ো তলায় নিয়ে গিয়ে চান করাতেন। রাত্রে আমাদের দু বোনকে পাশে নিয়ে ভূতের গল্প বলতেন। রান্না ঘরে থাকতেন ঠাকুর মশাই। আমি নাকি সেই ছোট্ট বয়সেও নিজের কোন জিনিষের প্রতি বিশেষ প্রীতি দেখতাম না। কেউ কিছু দিলে তা অন্যদের বিলিয়ে দিতাম। তিনি তাই আমার নাম দিয়েছিলেন – বিদ্যাসাগরের মা – ভগবতী দেবী। ঠাকুর মশাইয়ের রান্নার স্বাদ আমার মনে নেই – কিন্তু তাঁর বাড়ির গল্প পড়াকু ছেলে ‘কালাচাঁদের’ কথা শোনার জন্য রান্না ঘরের দাওয়াতে বসে থাকার দৃশ্যটা এখন চোখে ভাসছে। ঠাকুর মশাইয়ের দেওয়া নামটা আমার খুব পছন্দের ছিল। তখনও ঈশ্বর চন্দ্রের মা বা অন্য কোন মহিয়সী নারীর কথা আমি জানতাম না, কিন্তু এটা বুঝেছিলাম যে যেকোন জিনিষ – সে খেলনা হোক বা খাদ্য হোক ভাগ করে নিলে অন্যকে খুশি করা যায়। অন্য কোন মানুষের হাসি ফোটাতে ভাল লাগত। সে সময় আমাদের বাড়ির অন্যান্য কাজের জন্য আসতেন গুণী মাসী। সঙ্গে থাকত তাঁর আধখ্যাপা handicapped ছেলেটি। তার ভাল নাম ছিল অশ্বিনী – কিন্তু আমরা সবাই তাকে (বড়কা) বলে ডাকতাম। আমার চার বছর বয়সের একটা স্মৃতি মনে পড়ে – বড়কাকে আমার ভাগের থেকে দুটি বিস্কুট দিচ্ছি আর সে আনন্দে হেসে ছুটে পালাচ্ছে। আমার সবচেয়ে আশ্চর্য্য লাগত যখন ওই খ্যাপা ছেলেটি আমাদের প্রথম ভাগের বই পড়ে দিত এবং দাদার দ্বিতীয় ভাগ থেকে মানি–ক্য – বানানও উচ্চারণ করতে পারত। গুণী মাসী বলেছিল – ও পাঠশালা যেত, খুব ভাল ছিল, হটাৎ কি এক অসুখে এরকম হয়ে গেছে। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় ছিল সে, কিন্তু বাচ্চার মতন ব্যবহার দেখে আমরা তাকে ছোট ভাইয়ের মত মনে করতাম। তখন থেকেই handicapped বাচ্চাদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার বীজ বপন হয় ছোট্ট মুকুলের মধ্যে।

এক থেকে পাঁচের একটি বিশেষ ঘটনা আমার মনে আছে, তা হল, আমার হাত ভেঙ্গে যাওয়া। বারান্দা থেকে হটাৎ কিভাবে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমি। আমার গনু দাদা (আমার ছোট পিসিমার ছেলে) আমাকে কোলে তুলতেই দেখতে পান যে বাঁ হাতের কনুই-এর হাঁড় সরে গেছে। আমাকে নিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছোটেন আমাদের মামা দাদু তৎকালীন বিখ্যাত সার্জেন ডাক্তার “অনাথ বন্ধু রায়” -এর চেম্বার-এ। দাদু অপারেশন শেষ করে বেরিয়ে আসছিলেন, আমার কান্নার আওয়াজ শুনেই ছুটে এলেন। আমাকে টেবিলে শুইয়ে ক্লোরোফর্ম দেওয়া শুরু করলেন, তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট পশুপতি বাবু। হাতটির খণ্ডিত হাঁড়গুলিকে ঠিকমত বসিয়ে তিনি যখন নিশ্চিন্ত হলেন আমি তখন যন্ত্রনায় কাতর। হাঁড় ভাঙ্গার যন্ত্রনা বোধহয় ভাবলেও ভয় হয়। তখন আমার পাঁচ বছর বয়স, কামিনী মাসী চলে গেলেন এবং আমাদের দেখাশোনার ভার নিলেন চারু মাসী; অত্যন্ত শান্ত, লাজুক, বাবার সামনে এক গলা ঘোমটা টেনে হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করেন। তখন আমাদের খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিল ছিল না। বারান্দা ভাল করে মুছে সুন্দর সুন্দর লাল নীল উল দিয়ে বোনা আসন পেতে আমরা বসতাম। আসনগুলি দিদিমা তৈরী করে পাঠাতেন –  অপূর্ব তার নকশা। ঠাকুর মশাই কাঁসার থালায় গরম ভাত, শাক ভাজা, ডাল, মাছের ঝোল দিয়ে গেলেই – চারু মাসীর হাওয়া করা শুরু হত। জ্যাড়তুতো দাদা শ্যামল দা (মেজদা), গনু দাদা, আমরা তিন ভাই বোন সবাই বসে পড়তাম। আমাদের ভাত মেখে গোল গোল বল বানিয়ে দেওয়া হত, প্রতিটি বলের উপর মাছের একটু করে টুকরো, শেষ পাতে টক। আমার হাত ভাঙ্গার জন্য আমার ভাগ্যে সর্বদা বেশি বেশি আদর জুটত। কখনও মা খাইয়ে দিতেন, কখনও গনু দাদা। আমার দাদা দিদি কিন্তু এইজন্য কখনও হিংসা করতনা একটুও। ওদের মধ্যে সেই ছোটবেলা থেকে আজ সত্তর বছর অবধি আমি সেই একই রকম ভালোবাসা পেয়ে আসছি। কখন কোনো খেলনা, টফি, চকলেট কিছু নিয়েই আমাদের ঝগড়া হয়নি। দাদা মামা বাড়ির প্রথম নাতি ছিলেন বলে দাদু দিদিমা মামা মাসীদের খুব প্রিয় পাত্র ছিলেন। দাদুর সঙ্গে সে বেড়াতেও যেতেন দূরে দূরে। দেখতেও যেমন attractive ছিলেন তিনি, খেলাধুলো কথাবার্তাতেও তেমনি স্মার্ট। নানা ধরণের ইনোভেটিভ খেলা খেলতেন তিনি, তাঁর সামনের বাড়ির বন্ধু ভোম্বল, গোম্বোল ও দুর্গাদাসের সঙ্গে। নানা ধরণের সার্কাস দেখাতেন তাঁরা। একবার “তামলী বাঁধের মাঠে” একজন লোক মৃত্যু ঝাঁপ দেখিয়ে খুব পয়সা রোজগার করেন। মই দিয়ে অনেক উপরে উঠে তার কাপড়ে আগুন ধরিয়ে নিচে রাখা একটি জলের কুন্ডে ঝাঁপ দিতেন তিনি। ভয়ে লোকেরা নিশ্বাস বন্ধ করে দিত, চিৎকার করে উঠত। আমার আট বছরের দাদা ও তাঁর বন্ধুরা একটি পুতুলের গায়ে আগুন দিয়ে উপর থেকে নিচে রাখা বালতির জলে ফেলতেন। আমি দিদি, বুড়ি ও আমার তাঁতি পাড়ার বন্ধুরা, ভোম্বলের বোন কুটুনি সবাই দর্শক ছিলাম তাঁদের। আমাদের হাততালি ও চিৎকারে পাড়া মেতে উঠত।

পাঁচ বছর বয়সের আর একটি বড় ঘটনা, আমার ভাই বাচ্চুর জন্ম। আমার ভাই হয়েছে, ভাই হয়েছে বলে আমরা সব প্রতিবেশীর বাড়িতেই ছুটে ছুটে খবর পৌঁছাচ্ছি। সে কি আনন্দ। চারু মাসী শাঁখ বাজাচ্ছে, ঠাকুর মশাই মিষ্টি আনতে ছুটছেন, গনু দাদা বাজার যাচ্ছেন, কি একটা ওষুধ আনতে। ঘরে কাঠকয়লা জ্বেলে আগুনের উত্তাপ দেওয়া হচ্ছে। সাদা কাপড়ে মুড়ে স্মিত হাস্যে বাইরে এসে যখন স্বান্তনা মাসী – আঁতুড় ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন, তখন আমার আর দিদির লাফালাফি শুরু হয়ে গেল, তাকে কোলে নেওয়ার জন্য। স্বান্তনা মাসীদের মতন যাঁরা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা বোধহয় জানতেন – কি করে বাচ্চাদের ভোলাতে হয়; বললেন বাবু হয়ে বস। তারপর আমাদের কোলে ঠেকিয়ে তুলে নিলেন। যা আবার ‘আটকলাই’ অনুষ্ঠানের দিনে দেব। আমরা ওতেই সন্তুষ্ট। ভাই তো পালিয়ে যাচ্ছে না। ছুটলাম আবার তাঁতীপাড়ায়। গর্বিত দুই ক্ষুদ্র দিদিকে কিন্তু ওরা কেউ অসমাদর করল না। এক বান্ধবীর মা সুন্দর সুন্দর চারটে কাঁথা দিয়ে বললেন – যাও তোমার মাকে গিয়ে দিও। গিন্নি মায়ের জন্য এই ‘ভেট’ পাঠাতে পেরেই তাঁদের কি আত্ম তৃপ্তি। একজন তার দিদিকে বললো – “তুই কখন বানালি লো এগুলো”? ডাক্তার গিন্নির যবে থেকে পেট দেখেছি তখন থেকেই বানিয়ে রেখেছি। আমরা দুই বোনে খুশিতে ডগমগ। আটদিনের দিন আমরা পাড়ার যত ছেলে মেয়েদের ডেকে নিয়ে এলাম, উঠোনে একটা কুলোকে সবাই মিলে সরু সরু কাঠি দিয়ে, পিটাতে লাগলাম আর বলতে লাগলাম, আটকলাইয়া, বাটকলাইয়া, ছেলে পোয়াতি ভাল। তারপর বেতের ডোনায় করে খৈ, মুড়কি, বাতাসা ও পয়সা দিয়ে বাচ্ছাদের বিদায় দেওয়া হল। এইসব অনাবিল আনন্দ এখন আর পাওয়া যায় না। ছ’মাসে হল আবার অনুষ্ঠান। অন্নপ্রাশন, নানান মানুষের ভিড়। কত রকমের আত্মীয় স্বজন এলেন আমাদের বাড়িতে। প্রথম দেখলাম হরেকৃষ্ণ দাদু (বাবার কাকা), জব্বলপুরের পিসিমা, মালিয়ানের ঠাকুমা, মায়ের পিসতুতো দাদা সুধী মামাদের। ছোট বয়সের যাঁদের স্মৃতি এখনও মনের মণি কোঠায় জ্বল জ্বল করছে, কারণ তখন থেকেই আমি মানুষ দেখতে; হা করে তাঁদের মুখের কথা গিলতে খুব ভাল বাসতাম। আমাদের দুই কাকা আসতেন সবসময় বাবার কাছে। তাঁরা ভীষণ রসিক ছিলেন, তাঁদের হাস্যরসের রসাস্বাদন করার বয়স তো তখন হয়নি, কিন্তু সবাইকে তাঁরা হাসাচ্ছেন দেখে তাঁদের আমার ভীষণ ভাল লাগত। ভক্ত কাকা আর ধর্ম কাকা তাই আমাদের প্রিয় ছিলেন। তাঁদের বাবা সর্বদা মুখে হরে কিষ্ট – হরে কিষ্ট বলতেন, তাঁর নামও আমরা তাই দিয়েছিলাম। নিজেরা তাঁরা কত উদাসীন সহজ সরল মানুষ ছিলেন, যে আমরা শিশুরা ওই বয়সেও – তাঁর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতাম। মনে হতো এইসব লোকেরা যেন আমাদের বাড়িতেই থেকে যান। একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম না হয়েও সব সময় আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া লেগেই থাকত, আমাদের পরিবারে। দাদু বড় সার্জেন, বাবা বড় ডাক্তার, বদ্যি সমাজে তাঁরা ছিলেন গর্ব। কেউ দাদুর কাছে আসতেন ‘এপেন্ডিসাইটিস’ অপারেশন করতে তো – কেউ হাইড্রোসিল। কেউ বা হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো কারও পেটের ব্যামো। তবে সবচেয়ে মজার যে রোগটা আমাদের বিশেষ আকৃষ্ট করত তা হল – গোদ।

আমার পাঁচ থেকে দশের অধ্যায়ে এরকম লোকের দেখা অনেক পেয়েছি আমরা। যাদের পা ফোলা হাতির পায়ের মতন, তাই ইংরাজিতে এর নাম দেওয়া হয় এলিফ্যান্ট লেগ, Filariasis। মশা কামড়ালে যে এই রোগ হয়, তাও আমরা তখন জেনেছি। মশার নাম – কিউলেক্স। গ্রামে মাঠে, ঘটে, বাটে কোথায় যে তারা ওৎ পেতে থাকে কে জানে। যার হতো তিনি খুব লজ্জা পেতেন, লোকের বাড়ি যেতে, ধুতির নিচে পা টি বেরিয়ে গেলে ঢাকবার চেষ্টা করতেন তখনি। জ্বর ও আসত এই রোগে, গ্রামের মানুষগুলোকে একদিকে তখন এনোফিলিস মশার কামড়ে – ম্যালেরিয়ায় ধরত, অন্যদিকে বাঁকুড়ায় এই কিউলেক্স মশার উপদ্রপে অনেকেই আক্রান্ত ছিলেন। আমাদের বাড়ি আশুড়িয়া, হাড়মাসরা, মালিয়ান, লক্ষীসোল, মালিয়ারা, সুপুর, ছাতনা, খাতড়া – যে যেখানেই থাকুন না কেন কোনো না কোনো কারণে তাঁরা হয় বাবা, নয় দাদুর কাছে ছুটে আসতেন। তাই আমাদের বৈঠকখানার ঘরে সবসময়ই চৌকি ও বিছানা পাতা থাকত। তাঁরা আশ্রয় গ্রহণ করতেন, গরম ডাল ভাত পোস্ত খেয়ে তৃপ্ত হতেন, কাঁসার গেলাসে চা খেয়ে আমাদের বাবা মাকে, কত আশীর্বাদ দিতেন। ছোট থেকেই রোগ বা রোগী কাউকেই আমাদের ভয় বা ঘেন্না করত না। দাদুর বাড়িতে অপেরেশনের রুগীদের পুঁজ রক্ত – ব্যাণ্ডেজ – দেখতে দেখতে বড় হয়েছি – বলে কোন ভাবেই রোগ বালাইকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কোন কাকা, জ্যাঠা মনে নেই হেতমপুর বা সিউড়ি থেকে এসে অনেকদিন ছিলেন একবার। তখন তাকে হাতের কাছে জল, ফল, ওষুধ দেওয়া – ছোট খাটো কাজগুলি করতে আমার সাত আট বছরের শিশু মন খুব খুশি হত। মানুষের সেবা যে পরম ধর্ম তা তো হাতে কলমেও শেখা যায়, ওই ছোট বয়সেই তা অনুভব করেছিলাম। সেবা করার অদম্য ইচ্ছেটা তখনি বীজ বুনে দিয়েছিল এই চিকিৎসক পরিবারের সংস্কার। পরবর্তী জীবনে স্কুলে বা হোস্টেলে, কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শ্বশুরবাড়িতে কেউ অসুস্থ হলেই ছুটে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াবার ইচ্ছেটা কখনও দমন করতে পারিনি। নার্স সাজতে, প্র্যাক্টিক্যাল জীবনে কাউকে একটু সেবা করতে পারলে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। অনেক লোক এটাকে বাড়াবাড়ি, শো অফ মনে করেছে, অনেকে ভাল বলেছে, আমি তাদের কথা কানে নিইনি, কারণ এটাই আমার স্বাভাবিক নেচার।

পাঁচ বছর বয়সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বা স্মরণীয় ঘটনা হল – আমার “হাতে খড়ি”। সরস্বতী পুজোর দিন ঠাকুরের সামনে সকাল বেলায় স্নান করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে মা আমায় বসলেন, পন্ডিত মশাইয়ের সামনে। মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে একটা শ্লেটে খড়ি কি যেন লেখালেন ভট্টাচার্য মশাই, খুব যত্ন করে আমার ডান হাতটি ধরে। অদ্ভুত আনন্দ জাগল মনে। এবার তবে স্কুলে যাওয়ার ছাড়পত্র মিলবে আমার। দিদি দাদার সঙ্গে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তাহলে আমিও স্কুলে যাব। নতুন নাম খোঁজা শুরু হল তখুনি। দিদির ভাল নাম দেওয়া হয়েছিল মালবিকা। ওর সঙ্গে আমার নাম দিলেন মাসী ‘মালঞ্চিকা’ কি সুন্দর নাম। কিন্তু আমার পছন্দ নয়। আমি আমাদের বাড়ির সবুজ রঙের গলায় লাল দাগ দেওয়া পাখীটাকে খুব ভালোবাসতাম, তাই ওর সঙ্গে একান্ত হয়ে নিজের ভাল নাম নিজে নিজেই রাখলাম – ‘চন্দনা’। এবারেও কিন্তু আমি স্কুলে ভর্তি হতে পারলাম না। কারণ আমার হাত তখনও পুরোপুরি সারেনি, আর তার সঙ্গে শুরু হয়েছে সেপটিক টন্সিল, কানে পুঁজ। প্রায় জ্বর আসত ১০৪/১০৫ ডিগ্রি। সুশীল কাকা বাবার কম্পাউন্ডার ছিলেন। তিনি এসে লাগিয়ে দিতেন – পেনিসিলিন ইনজেকশন। বিস্কুট, দুধ অথবা মুড়ি খেয়ে দিন কাটতো ছোট্ট মুকুলের। আর বরাদ্দ ছিল সাবু সেদ্দ, আমি কিন্তু বিরক্ত হতাম না তাতে। কান্নাকাটিও করতাম না বিশেষ। সবাই বলতেন মেয়ের সহ্য শক্তি আছে বটে। বুজতাম, সহ্য করা একটা বিশেষ বড় গুন, সেটা থাকলে অনেক শান্ত থাকা যায়। ছোট পিসিমা মানে গনু দাদার মা প্রায় আসতেন, আশুড়িয়া থেকে। বারান্দায় তোলা উনুন ধরিয়ে দেওয়া হত, নিজে ভাতে ভাত করে আলু কুমড়ো সেদ্দ দিয়ে একবেলা খেতেন তিনি। সবসময় সাদা থান পরে হাতে হরি নামের মালাটি নিয়ে জপ – করে যেতেন আমার কাছে বসে। বড় পিসিমার বেলাতেও তাই। বারান্দায় স্বহস্তে রান্না, দুধ কলা চটকে আতপ চালের ভাত খাওয়া চলত। তার সঙ্গে উপরি পাওয়া ছিল “গিরিধারীর” পুজো। এক সুন্দর কালো চকচকে পাথরের ঠাকুর। চন্দনে চর্চিত তুলসী পাতায় ফুলের মালয় সজ্জিত সিংহাসনে বসানো – এই ঠাকুর জীবন্ত হয়ে উঠতেন আমাদের কাছে। গঙ্গা মাটি দিয়ে তার চোখ মুখ আঁকা, সামনে প্রসাদ রেখে আমার সাধিকা পিসিমা যখন পুজো করতেন তখন ভীষণ সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হত বাড়িতে। সন্ধ্যে বেলায় সেই পবিত্র স্থানে বসে আমরা তিন ভাই বোন শুনতাম – মীরাবাঈ এর কাহিনী। সেই – গোপালের গল্প। যার বাবা ছিলনা, মা বলেছিলেন, মধুসূদন দাদার কাছে যা চাইবে তাই পাবে। তাই পাঠশালায় মাষ্টারমশাই – তাকে একবার যখন দই আনতে বলেন, তখন সে কেঁদে কেঁদে তার মধুসূদন দাদাকে ডাকে এবং তিনি – তার সামনে অবতীর্ণ হয়ে তাকে একটি দই পূর্ণ ছোট্ট ভাঁড় দেন। সে ওই ভাঁড় নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের কাছে গেলে, তিনি কিন্তু খুশি হন না, বলেন – “গোপাল এইটুকু দই দিয়ে কি হবে রে”? সে উত্তর দেয়, – “মধুসূদন দাদা বলেছে – ওই দই তে হবে”। বলে সে যখন ওই ভাঁড় উপুড় করে [- কাউকে দেয় পাত্রটি আবার দই দিয়ে ভোরে যায়। সমস্ত ছাত্র, মাষ্টারমশাই ও গ্রামের লোকেরা খেয়েও তা শেষ করতে পারে না। – গল্পটা আমার মনকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিত। মধুসূদন তথা ভগবানের প্রতি একটা অদ্ভুত আস্থা – বিশ্বাস ও ভক্তি ভাব পিসিমার গল্প আমার শিশু মনকে ভরে দেয়। আমি রাত্রে শুয়েও শুনতে পেতাম – “মধুসূদন দাদা বলেছেন – ওই দই তে হবে”। এখনও এই সত্তর বছর বয়সে, সেই ছোট্ট বালিকাটির মতন ঈস্বরে বিশ্বাস প্রগাঢ় ভক্তি ভাব – একটা আধ্যাত্মিক চেতনা – আমার মনকে স্নিগ্ধ করে রাখতে চাই। সর্বদা আমার কানে কানে কে যেন বলে – ‘শরণাগত হয়েই সব পাওয়া যায়’। তিনি যে সর্বত্র বিরাজমান, যে কোন বিপদেই তাঁকে ডাকলেই, তাঁকে কাছে পাওয়া যায় এবং তিনি কৃপাভরে যেটুকু দান দেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকলে, ভরসা রাখলে তা কখনও অপূর্ণ থাকে না।

তাই আমার ওই দুই সাধিকা পিসিমা যাঁরা বাল্য বিধবা ছিলেন পূজা অর্চনায়, ভগবৎ সাধনায়, সাত্ত্বিক জীবন কাটিয়েছেন, তাঁদের প্রভাব বেশি পড়েছিল। ঐ আতপ চালের গন্ধ এখনও আমার মনে একটা পবিত্র ভাব এনে দেয়। তাঁদের কথা ভাবলে শ্রদ্ধায় আমার হৃদয় আপ্লুত হয়ে যায়। এই ছোট পিসিমারই গনু দাদা, যাঁর প্রভাব এই মুকুলের জীবনকে, সেই শৈশবকে – ঋদ্ধ করেছে নানাভাবে। তাঁর কথা পুরো একটা বই লিখেও শেষ করতে পারব না। পরে সেই গল্প বিস্তারিত ভাবে বলে যাবে।

(ক্রমশ)

তৃতীয় অধ্যায়

‘আমার দাদুর কথা’

এখন যে সব মানুষের মিছিল আমাকে আকৃষ্ট করে রেখেছিল তাঁদের কথা জানাই। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন আমার দাদু। মায়ের বাবা ‘ডঃ অনাথ বন্ধু বায়’ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার হালিশহরের লোক। কালীভক্ত রামপ্রসাদ সেনের ভিটে সেখানে। পরে তাঁর পিতা যোগেশচন্দ্র রায় উড়িষ্যার কটকে চাকরি করতে যান। সেখানে তাঁর পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার ছিল। মনে প্রাণে কালীভক্ত ছিলেন তিনি। ছেলে কটকের বিখ্যাত স্কুলে ভর্ত্তি হন, যেখানে তখনকার বিখ্যাত ব্যক্তি জানকীরাম বসুর পুত্র সুভাষ চন্দ্র বোস তাঁর চেয়ে দু ক্লাস উঁচুতে পড়তেন। দেশাত্ববোধের বীজ, দেশের মানুষকে সেবা করার আগ্রহ তাঁর তখন থেকেই জন্মায়। পড়াশুনোতেও তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তাঁদের পারিবারিক জীবনে অস্বাভাবিক দুটি ঘটনা ঘটে, যা তাঁর জীবনের ধারাকে বিঘ্নিত করে। বিচলিত হয়ে যান তরুণ অনাথ বন্ধু। তিনি তখন ডাক্তারি পড়ছেন স্কুলের পাঠ শেষ করে, কলকাতাতে। ঘটনার কথা, সাল, তারিখ জানবার কোনো উপায় নেই, কারণ দাদুর বাবা, দিদি অর্থাৎ মায়ের পিসিমার গল্প আমরা পূর্বে মায়ের মুখে যেভাবে শুনেছি তাই ব্যক্ত করছি। দাদুর দিদির তিনটি কন্যা ও একজন পুত্র জন্মায়, তারপর বিনামেঘে বজ্রপাত হয়। হঠাৎ তাঁর স্বামী মারা যান, তার মাত্র সাত দিনের মধ্যেই গত হন মায়ের ঠাকুমা। যুবক অনাথ বন্ধু তাঁদের সকলের ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁদের নিজের বাবাকে বাঁকুড়ায় এনে রাখেন। মায়ের একজন জ্যাঠামশাই ছিলেন যাঁর পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র জন্মায়। তিনি অকালে পরলোক গমন করেন। মায়ের দাদু তাঁর ভায়ের ঐ পরিবারকে অর্থাৎ সাতজন পুত্র কন্যা সহ বাঁকুড়ায় নিয়ে আসেন। অনাথ বন্ধু তাঁদেরও পিতার মতন হয়ে অতি সযতনে লালন পালন করেন। পরে তাঁর বিবাহ হয়, বর্ধমানের মল্লিক বাড়ির কন্যা ‘অন্নপূর্ণা দেবীর’ সঙ্গে। ঐ একান্নবর্তী পরিবারের সকলকে সমানভাবে ভালোবাসায় বেঁধে তিনি সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তাঁর নিজেরও চার কন্যা ও তিন পুত্র জন্মায়। সুতরাং মায়ের পিসিমার ছেলে সুধা মামাদের চার ভাই বোন + সন্তু মামাদের সাত এবং মায়েরা নিজেদের সাতজন ভাই বোন অর্থাৎ আঠারোটি সন্তানের লেখা পড়া, ভরণ পোষণ – বিবাহের আয়োজন করা, ভিন্ন ভিন্ন বাড়ি ঘর করে, তাঁদের সুপ্রতিষ্ঠিত করার সমস্ত দায়িত্ব অক্লেশে নিজের কাঁধে তুলে নেন, যোগেশ চন্দ্রের – সুযোগ্য পুত্র। অসামান্য তাঁর ব্যাক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও সততা দেখে সেই সময়কার বহু বিখ্যাত লোক মুগ্ধ হয়ে যেতেন। ইংল্যান্ড এ FRCS পড়বার সুযোগও পান তিনি, কিন্তু পিতার একান্ত অনুরোধে তাঁকে পড়া শেষ না করেই ফিরে আসতে হয়। কিন্তু পারিবারিক দায় দায়িত্ব, শৈল্য চিকিৎসার জন্য ‘ঘন্টার পর ঘন্টা’ নিজের অপারেশন থিয়েটার এ কাটানো, ভাগ্নে ভাগ্নি, ভাইপো ভাইজিদের পড়া – চাকরির ও বিবাহের ব্যবস্থা নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকা – সত্ত্বেও তিনি কিন্তু রাত্রি ছাড়া কোনো সময়ের জন্য একটুও বিশ্রাম নিতেন না। তার ওপরে কংগ্রেস পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, পরে বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে তিনি ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং বাঁকুড়ার কোতুলপুর অঞ্চল থেকে ইলেকশনে জিতে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন। তাঁর সেই সময়ের কাজ ও সততার জন্য তিনি সকলের প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। এতো বছর পরে আনন্দ বাজার পত্রিকাতে ৫০ বছর আগের মন্ত্রীর খবর পড়ে ও দাদুর ছবি দেখে আমার মন শ্রদ্ধায়, আনন্দে, ভরে গেল। গর্ববোধ হল তাঁর নাতনী হতে পেরে। প্রণাম জানালাম তাকে বারে বারে। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি কত বড় বড় ‘লিডার’ আসতেন দাদুর কাছে।

শৈশবে আমার এক উজ্জ্বল স্মৃতি – তৎকালীন বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ও বিখ্যাত ডাক্তার ‘বিধান চন্দ্র রায়ের’ দাদুর বাড়িতে আগমন। গৌরীপুরের কুষ্ঠাশ্রম, নবজীবনপুরে কুষ্ঠ রোগীদের বাসস্থান, বাঁকুড়ার মতন এক অনুন্নত শহরে সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ তৈরী – সরকারি হাসপাতালকে সব রকমভাবে সাহায্য করা, তাঁর প্রধান কাজ ছিল। একবার সেই সময়কার রাজ্যপাল ‘পদ্মজা নাইডু’ এলেন বাঁকুড়া পরিদর্শনে। হয়তো সব সরকারি অফিসারদের সঙ্গে সার্কিট হাউসে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু দাদুর সঙ্গে বিধান চন্দ্রের মতন তাঁরও হৃদ্যতা এতো সুদৃঢ় ছিল, তিনি আমাদের মামা বাড়িতে দিদিমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ও বেশ অনেক্ষন নানাধরণের আলাপ আলোচনায় যোগ দেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী কবি। গান্ধীজির প্রিয় পাত্রী ভারতের Night Angel “সরোজনী নাইডুর কন্যা”। সরোজনী বঙ্গ ললনা ছিলেন, তাঁর ভাষণ, কাব্য পাঠ তখনকার বিদগ্ধ জনকে মুগ্ধ করত। পদ্মজা নাইডু যেদিন আমাদের বাড়ি আসেন সেদিন আমাদের দাদুর গৃহ এক নতুন ধরণের উৎসবে আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। বাঁকুড়ার পুরোনো আমলের বিদগ্ধজন, স্কুল কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকা, ‘উমা মাসী’, উদয় ভানুদের মতন দেশপ্রেমী সব মানুষ নিমন্ত্রিত ছিলেন “ও-বাড়ি”, মানে আমাদের মামা বাড়িতে। আমাদের মা ছিলেন দাদু দিদিমার বড় মেয়ে, অত্যন্ত প্রতিভাময়ী, খুব ভালো গানের গলা ছিল তাঁর। পদ্মজা নাইডুর আগমনে মা আমাদের সব বাচ্চাদের দেশাত্মবোধক গান শেখালেন। উদ্বোধনী সংগীত গাওয়া হল, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্য সুন্দর”। তারপর মাঝে দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের গান ও শেষে – “যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ”, – গানগুলির মানে হৃদয়োঙ্গম করার মতন ক্ষমতা সাত/আট বছরের মুকুল, বকুল, বুড়ি, খোকন কারোরই তখন হয়তো ছিল না, কিন্তু দেশাত্ম প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, আনন্দময় এই পৃথিবীর মাটিতে – ধন্য আমাদের জন্ম, পুন্য আমাদের আত্মা – এটা কি ভাবে যেন বুঝতে শুরু করেছিলাম। ভালোবাসতে আরম্ভ করেছিলাম সেইসব নিত্য প্রণম্য মানুষদের। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদকে চিনতে আরম্ভ করেছিলাম। বিশেষতঃ দ্বিজেন্দ্রলালের দেশাত্মবোধক নাটক – যেগুলি আমার বড় মামা অভিনয় করে দেখাতেন, ক্ষুদিরাম, চিত্তরঞ্জন, শহীদ ভগৎ সিং প্রমুখের গল্প আমাদের বড়রা সুন্দর করে শোনাতেন আমাদের।

পদ্মজা নাইডু বিধানরায়ের পর যাঁকে দেখে আমাদের খুব ভাল লেগেছিল, তিনি হলেন, – দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। তখন তিনি অতি সুদর্শন এক যুবক ব্যারিষ্টার। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মায়া রায়ও এসেছিলেন। কী অপরূপ সেই শিক্ষিত অপূর্ব সুন্দরী তিনি। কি কথা বলছিলেন, কি নিয়ে যে আলোচনা যে চলছিল কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু মনের মনিকোঠায় এইরকম মানুষের ছবি গাঁথা হয়ে গেছে। তাঁর নামে আমার সবচেয়ে ছোট ভাই ছোটনের নামও দেওয়া হয়েছিল, সিদ্ধার্থ। অনেক পরে এই সিদ্ধার্থ রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন, পরে পাঞ্জাবের গভর্নর। যাঁরা ঐসময়ের মন্ত্রী স্বান্ত্রীরা আসতেন, তাঁদের সঙ্গে আসতো তাঁদের ADC – PA নিরাপত্তাবাহিনী। তাঁদের দেখে আমাদের খুব আকর্ষণীয় লাগতো। ছোট ছোট খোকন, বুড়ি, মুকুল, বকুলেরা ওদের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াতো।

দাদু স্বাস্থ্য মন্ত্রী হওয়ার পর একবার লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে চাকরের ছদ্মবেশ নিয়ে মেডিকেল কলেজের পেছন দিকের গেট দিয়ে ঢুকে ওষুধের দোকানে সরকারী ওষুধ পাচারকারী চোর ও তাদের সহযোগী হাসপাতাল কর্মীদের হাতে নাতে ধরেছিলেন। ভীষণ সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন তিনি। সরকারের কাজে এত ব্যস্ত থাকতেন যে নিজের রুগী দেখার বা অপারেশন করার সময় পেতেন না।

সংসারে তাঁর অর্থাভাব হয়ে যায়, দিদিমাকে দেখেছি ঐসময় ধার করে টাকা এনে পরিবার পালন করতেন। ভাগ্নে, ভাগ্নি, ভাসুর পো, ভাসুর ঝি, এবং নিজের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে তাঁর শ্বশুর মশাই যোগেশ চন্দ্র রায়ের পালিত বাঁদর, কুকুর, ময়ূর, মুরগি, হাঁস, গরু, বাছুরের পোষা জানোয়ার ভরা এক বিরাট যোগেশ ভবন। আর তাদের দেখাশোনার করার জন্য গ্রাম থেকে আগত বিভিন্ন ধরণের দাস দাসী। ঐসব কাজের লোক, কিংবা কম্পাউন্ডার শল্য চিকিৎসার সাহায্যকারী সব ব্যক্তি পশুপতিবাবু ডঃ গৌরী শঙ্কর – সকলেই ছিল, অন্নপূর্ণা দেবীর প্রিয় পাত্র। ভেতর বাড়িতে সবার ছিল অবাধ বিচরণ। বিশাল এক রান্না ঘরে বড় বড় ঐ উনুন জ্বলতো, খুব বড় বড় কড়াই হাঁড়ি। দিদিমা রান্না করছেন আর সহযোগী ঠাকুর কমলমামা, বিমলা মাসী, বাঁকু মামা, নিতাই মামা সবাই সাহায্য করছে। কেউ মশলা বাটছে, কেউ মাছ কাটছে, কেউ বা নারকেল ছাড়াচ্ছে উঠোনে বসে। – সে এক এলাহী ব্যাপার।

মামাবাড়িকে আমরাও বাড়ি বলতাম এবং ঐসব চাকর বাকর কর্মচারীরা সবাই ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সম্মানীয় মামা, মাসী। ছোটদের মনে তখন থেকেই বড়দের সে কোন কাজ করুন না কেন, আর যে কোন জাত ধর্মের বিশ্বাসী হন না কেন, আমরা তাদের নিজেদের আপনজন মনে করতাম। সব সম্প্রদায়ের গরীব-দুঃখী, উঁচু নিচুর বিচার না করে মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র পেয়েছিলাম ঐ বাড়িতে।

সেই পরিবেশ ছেড়ে দাদুর সঙ্গে গ্রেষ্ট্রীটের হাতিবাগানের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পত্নী হয়ে ঘরের কোনায় বসে থাকতে তাঁর ভাল লাগত না। বাঁকুড়ার বাড়িতে নাতি নাতনিদের সঙ্গে কাজী দা মানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের গল্প করতেন। কাজীদার স্ত্রী তাঁর বান্ধবী ছিলেন, সেই বৈদ্য কন্যা ও মসুলমান যুবকের প্রেম কাহিনীর একজন সাক্ষী ছিলেন তিনি।

মুকুলের তো সেই নজরুলের কথা বারেবারে শোনবার জন্য দিদিমার জন্য মন কেমন করত। কিন্তু হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন খবর এলো, তাঁদের দিদিমা জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে মাত্র পাঁচ মিনিটের কষ্টে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে ৪৯ বছর বয়সে দাদুর কোলে মাথা রেখে হাতিবাগানের বাড়িতে মারা গেছেন। দাদু আরও ১৪/১৫ বছর পরে বাঁকুড়ায় রুগীর বাড়িতে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভাঙলেন। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি বিছানার পাশে টেবিল রেখে রুগীদের হাইড্রোসিল, হার্নিয়া, এপেন্ডিসাইটিস ইত্যাদি অপারেশন থেকে বিরত থাকেনি।

এরকম অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য আমার শৈশব – কৈশোর ও তরুণী জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল। যদি ছেলে হয়ে জন্মাতাম তা হলে হয়তো সে যুগেও রাজনীতি, সমাজ সেবায় যুক্ত হতাম দাদুকে অনুসরণ করে। কিন্তু নারী জন্ম কি শুধু বিয়ে আর সংসার বা সন্তান পালনের জন্যই বিধাতা বানিয়েছিলেন?

১৯৭৪ সালে আমার বিয়ের পর স্বামীসহ দাদুর ঘরে গিয়ে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে যখন প্রণাম করি তখন তাঁর বাণী – তাঁর মুখ নিঃসৃত উপদেশ – এখনও আমার কানে গুঞ্জরিত হতে থাকে। – – –

“সংসারে সবাইকে মানিয়ে চলবে। সেবা দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকের মন জয় করবে। – মুকুল মালা, আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার মাথার ওপর থাকবে জেনো”।

এক সকালে দিল্লীতে ইংরেজি পেপারে খবর পড়ে জানতে পারলাম, প্রাক্তন স্বাস্থ্য মন্ত্রী পরলোক গমন করেছেন। – একটা যুগ শেষ হয়ে গেল।

(ক্রমশ)

চতুর্থ অধ্যায়

তাই আমরা আমাদের মামাতো ভাই বোনেরা যেন সর্বদা অন্য একটা জগতে বাস করতাম। মেজো মামা ছিলেন অত্যন্ত সুদক্ষ সেতার বাদক ও বাঁশুরি শিল্পী। তিনি যখন চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে বাজাতেন বা বাঁশির সুরে নিজেকে ও বাড়ির অন্য সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতেন, তখন আমরা হলদে বারান্দায় বসে সেই সুরের মূর্ছনাতে ভেসে যেতে যেতে নাচ প্রাকটিস করতাম। হ্যাঁ, নাচ ছিল আমার – সেই ছোট মুকুলের মজ্জায় মজ্জায়। গান, বাজনা – সুর তাল আমাকে ভীষণ – ভাবেই আকর্ষণ করত। ঐ সময়, আমাদের বীণাপানি সিনেমা হলে কেউ ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’ ও ‘নাগিন’ সিনেমা দেখিয়েছিল। সেই থেকে বৈজয়ন্তী মালার মতন, পদ্মিনীর মতন আমার পা চলতো – নাচের তালে, হাতের মুদ্রা চোখ সব নকল করত ঐ সুন্দরী নৃত্য শিল্পীদেরকে। নাচের কায়দা কানুন রপ্ত করায় আমি সবাইকার কাছে খুব প্রিয় ছিলাম। মেজো মাসী নাচ শিখিয়েছিলেন, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’। ছোট মাসী শিখিয়েছিলেন – “মম চিত্তে নীতি নৃত্যে কে যে নাচে তা তা থৈ থৈ”। নাচ আমার জীবনে সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা একাই আমি যে ভাবে নাচ করতাম, তখনকার ছেলেমেয়েরা দেখলে হয়ত হাঁসত। তখন বাঁকুড়ায় ভাল নাচ গানের স্কুল ছিল না। কিন্তু যেহেতু মা বিষ্ণুপুর ঘরানার “গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়” মশায়ের ছাত্রী ছিলেন এবং নানা ধরণের উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর অপরিসীম দক্ষতা ছিল তাই প্রথমে দিদির জন্য একজন গানের মাষ্টারমশাই ও আমার জন্য নাচের শিক্ষক ঠিক করলেন। দিদির গানের গলা খুবই মিষ্টি ছিল, সে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করল সেই ছোট্ট বয়সে। আমার মাষ্টারমশায়ের নাম ছিল “দ্বিজ” বাবু। তাঁতি পাড়ার যাত্রা দলের সুদক্ষ শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁতি পাড়াতেই থাকতেন। আমার প্রথম নাচটি ভরতনাট্যম এর কায়দায় কম্পোজ করেন তিনি। গানটি আমার সত্তর বছর বয়সেও মনে আছে। – “দেবতার মন্দিরে দেবদাসী গো আমি পূজারিণী”।

আমাদের ছেলেবেলা মানেই নাচ, গান আর নাটক। সে কথাই পরে আসছি, প্রথম দিনের স্কুলের অভিজ্ঞতাটি আগে ব্যক্ত করি।

বাড়িতে খ্রিষ্টান মাষ্টারমশাই আমায় আগেই একটু একটু করে পড়াশুনো ব্যাপারটার সঙ্গে আমাকে পরিচিত করিয়েছেন। তিনি প্রথমে তিনটি রেখা দিয়ে লেখা আঁকতে সেখান। বলতেন হাত বোলায় – বাবুর “ব” তারপর র, ক, য, য়, খ – ইত্যাদি আসে। অ, আ, ই, ঈ দের কথা পরে জানতে পারি। অক্ষরগুলোর প্রতি আকর্ষণ, অক্ষরদের নিয়ে খেলা করা তিনিই আমার মধ্যে জাগিয়ে তোলেন। শরীর একটু দুর্বল থাকায় পাঁচের জায়গায় ছয় বছরে বুড়ি (মামাতো বোন সুদেষ্ণা) আরতি চ্যাটার্জী, প্রতিমা সেন, মন্দিরা সেনগুপ্ত – শুভেন্দু হালদার, তুফান এরা আমার সহপাঠী হন। প্রথমের অভিজ্ঞতায় বড় দিদিমনি, ময়নাদির দিদি টিয়াদি আমাকে নিজে হাত ধরে KG-1 ক্লাসে নিয়ে গেলেন। মিশন গার্লস স্কুলের হলে – একপাশে আমাদের পড়ার ঘর। প্রথমেই বোর্ডে একটা C “সি” মতন আঁচড় কেটে জিজ্ঞেস করলেন – এটা কি বলতো? কেউ বলতে পারল না তখন ওটাকে একটা নৌকা বানিয়ে সবাইকে শ্লেটে Boat বানাতে বললেন। আমার খুব আনন্দ হল। নৌকার দুপাশে দিদিমনি হাল, পাল ও নিচে নীল চক দিয়ে জল বানিয়ে দিতেই আমাদের কল্পনা আমাদের এক নদীর দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর ছড়া শেখা এবং ‘যীশুর’ ছবির সামনে নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা করতে শেখানো হল। শিব, গণেশ, কৃষ্ণদের মতন যীশুও এক দেবতা। হিন্দু বা খ্রিষ্টান বলে কিছু জানিনা। ভেদ বুদ্ধি মনে দানা বাঁধেনি। সারেঙ্গা, শুশুনিয়া প্রভৃতি জঙ্গলের থেকে অনেক সাঁওতাল, বা অন্য আদিবাসীরা তাঁদের মেয়েদের পড়তে পাঠিয়েছেন আমাদের সঙ্গে। তারা স্কুলের হোস্টেলে থাকত। আমার সঙ্গে সেখানে একটি মেয়ে তরঙ্গিণী – ও ছেলে ফিলিপের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল প্রথম দিনেই। দাদা দিদির বই দেখতে দেখতে বোধহয় বেশি পোক্ত হয়ে উঠেছিলাম তাই – প্রথম বছরেই ক্লাসে ‘প্রথম’ হলাম। প্রাইজ পেলাম একটি সুন্দর মেডেল ও বই। বইটার নাম ছিল ‘সাঁঝের বাতি’ তিনটি গল্প ছিল সেখানে। একটি রাজা-রানী ও তাদের তিন অপরূপা কন্যাদের। রাজকন্যাদের একজনের মুখে পদ্ম ফুলের আর একজনের গোলাপ ও ছোটজনের জুঁই ফুলের গন্ধ। একবার এক দৈত্য তাদের মন্ত্র বলে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেয়। তখন এক রাজপুত্র কি ভাবে মৌমাছিদের সাহায্যে তাদের চিহ্নিত করে এবং আবার জাগিয়ে তোলে, সেই গল্পটি ভীষণ ভাল লাগত আমার। কারণ সেই রাজপুত্র মৌচাকটি ভাঙ্গতে দেয়নি, তাই মৌমাছিরা তাকে সাহায্য করে। পোকামাকড় – ও এই গল্পে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভালোবাসার, রক্ষাকর্তার উপকারের দাম দিতে ভোলে না। আমার কাছে পশু পাখির প্রতি এক অপার মায়া ছিল, বাড়ির গরু ও চন্দনা পাখির সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার জন্য। এবার প্রজাপতি, মৌমাছি, গুবরে পোকারাও আমার কাছে এক বিশেষ সম্মান পেতে আরম্ভ করল। কল্পনার জগতে বিচরণ করতে করতে, নিজেকে হারিয়ে ফেলার এক প্রবণতা জেগেছিল ছোট মুকুলের সেই ছোট থেকেই। এই সময়ে বাঁকুড়ার ভুবন গড়াইয়ের গ্যারেজে নানান রকমের প্রোগ্রাম করা হত। আর কোন হল ছিল না। আন্তঃ স্কুল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা আয়োজন করত বিভিন্ন সংস্থা। তাই মা আমাদের মুখস্থ – করাতেন – বীরপুরুষ, বিজ্ঞ, সমব্যাথী, কাগজের নৌকা বা সবচেয়ে প্রিয় কবিতা – “একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু চেয়ে দেখ, চেয়ে দেখ বলে যেন বিনু”। কলকাতা শহরের এমন আজব – সুন্দর – বর্ণনা আর কোন কবিতা গল্পে পূর্বে বা পরে শিশুদের জন্যে কেউ লিখেছেন – বলে আমার জানা নেই। সেখানে হাওড়ার ব্রিজকে মনে হয় মস্ত সে বিছে, আর হ্যারিসন রোড চলে তারই পিছে পিছে। আমাদের সকলের মনে ঝংকার তুলত। ভালো করে তখনও পড়তে শিখিনি, কিন্তু বড় বড় কবিতা শুনে নিয়ে মুখস্ত করে ফেলত সেই ছোট্ট বুড়ি, আরতি ও মুকুল। হাত পা নেড়ে অ্যাকশন করে আবৃত্তি করে আমরা প্রাইজও আনতাম খুব। কখনও বুড়ি প্রথম হত আমি দ্বিতীয়, কখনও আমি প্রথম তো আরতি দ্বিতীয়, বুড়ি তৃতীয়। আমাদের তিনটি শিশু বান্ধবীর মধ্যে কোন হিংসা ভাব ছিল না। প্রাইজগুলি আনলে দাদু আবার আমাদের উপহার দিতেন। খুব উৎসাহ পেতাম সবার কাছে। দর্শকের সামনে মাইক ধরে কথা বলতে, নিজের নাম বলার পর আবৃত্তি করতে ভীষণ ভাল লাগত। পরবর্তীকালে চল্লিশ বছর পর পাড়ার পুজোবাড়িতে আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারক পদে বসে ছোটবেলার সেই ভাব প্রবন দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটু ভুল বললাম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের লিচু চোর ইত্যাদি সব কবিতা মুখস্ত করার আগেই আমাদের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়েছিল সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল-এর সঙ্গে। তাঁর ওই আজব কবিতাগুলি – আমাদের শৈশবকে সরল সরস ও কল্পনাপ্রবণ করে তুলেছিল। কুমড়োপটাস, হাঁসজারুরা আমার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। রাত্রিবেলায় আমি তাদের সাথে কথা বলতাম। এখনও এই বুড়ো বয়সে একলা ঘরে যদি কোন কারণে মন খারাপ লাগে বর্তমান যুগের মূল্যবোধহীন এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের উন্নাসিকতা যথেচ্ছাচার শিশু কন্যাদের প্রতি দৈহিক অত্যাচারের কথা শুনে, টিভিতে দেখে মনটা তিক্ত হয়ে উঠে, তখন আবোল তাবোল খুলে বসে যাই। অনেক কবিতাই এখনও মুখস্ত বলতে পারি, কারুকে হঠাৎ রেগে মেগে ক্ষেপে গেলে ‘হেড অফিসের বড় বাবুকে’ মনে পরে, তার গোঁফ চুরির ঘটনা মনে এক অনাবিল আনন্দ দেয়। মন হতাশ-নিরাশ হলে – হুঁকো মুখো হ্যাংলা বা ‘সৎপাত্র’-এর গঙ্গারামের গুণগুলি ভেবে ভেবে নিজেকে হালকা করতে চেষ্টা করি। হাস্যরস যেন উবে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে – সমাজ থেকে, মানুষের জীবন থেকে। অন্যকে নিয়ে মজা করা, ব্যঙ্গ করা তখন শিশু মন একেবারেই জানত না। তাই তারা স্বপ্রতিভ। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রাণখোলা সেই হাসি কোথায় হারাল!

মামাবাড়ির ছাদটি ভীষণ বড়। যেন একটা ছোট খাটো খেলার মাঠ। সেখানেই আমাদের জন্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। সে এক ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার মতন উত্তেজনা। পাড়ার যত শিশু দল বেঁধে জড়ো হলাম সেই ছাদে। দাদা খোকনদের জন্যে সব আলাদা খেলা, আমাদের মেয়েদের জন্যে আলাদা। শরীর খুব দুর্বল থাকায় আমি খেলাধুলায় বিশেষ পাত্তা পেতাম না। প্রাইজও নেওয়া হত না। কমলা, বুড়ি ও আরতি সবগুলো নিয়ে চলে যেত। গনু দাদা সব বাচ্চাদেরকে লজেন্স বা চকলেট, নিমকি, সিঙ্গারা খাওয়াতেন। আমাদের জগতে এই গনু দাদা এক দেবদূত ছিলেন, কেউ পড়ে গেলে তাকে ওষুধ লাগনো, কাউকে অকারণে বা প্রাইজ না পাওয়ার জন্যে কাঁদতে দেখলে তিনি তাকে যত্ন করে নিজের কাছে বসিয়ে গল্প করে ভুলিয়ে রাখতেন। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মেটালারজী নিয়ে পড়ছেন তিনি। ছুটিতে বাড়ি এলে বন্ধু বুলা মামা, অসীমদা, সলিলদা দের নিয়ে হৈ হৈ করে বেড়াতেন। সবচেয়ে মজা হত লক্ষ্মী পুজোর দিন। মামাবাড়িতে খুব বড় করে লক্ষ্মী পুজো হত। নিচের বড় বারান্দায় চৌকি লাগিয়ে চাদরের পর্দা টাঙ্গিয়ে স্টেজ বাঁধা হত। আমরা ক্ষুদে ক্ষুদেশিল্পীরা একমাস আগে থেকেই নাটকের মহড়া শুরু করে দিতাম। আমি বেশ হুঁশিয়ার হয়ে উঠেছি তখন। নিজেদের পাঠ্য বইতে “বীরবলের প্রভু ভক্তি” গল্পের প্রতি ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছি এবং ক্লাস থ্রীতে পড়লেও তার নাট্যরূপ বানিয়েছি। আমি-বীরবল, বুড়ি-সম্রাট – আকবর- আরতি, মা-কালী। ছোট্ট বোন থুপুন আমার ছেলে। বীরবলকে পরীক্ষা করার জন্য সম্রাট একবার বলেন, তার ভালোর জন্য মাকালীর সামনে ছেলেকে বলি দিতে। খুব সিরিয়াস ঘটনা। বীরবল খড়গ তুললে মাকালীর দর্শন পান এবং স্বয়ং মা এসে তার হাত ধরেন। এদিকে আড়াল থেকে সম্রাট আকবর বীরবলকে লক্ষ্য করেন এবং তার সেই বিস্বস্ত নবরত্নের এক রত্নকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বাড়ির বড়রা সবাই চেয়ার নিয়ে পিছনে বসে আছেন, সামনে শতরঞ্জিতে পাড়ার লাইন ধারের বাগদি, বাউরি, খয়রাদের ছেলেমেয়েদের দল। মুগ্ধ চোখে তারা আমাদের পিজবোর্ড ও রাংতা দিয়ে তৈরী খড়গটির দিকে হা করে তাকিয়ে আছে – ভাবছে এই বুঝি বীরবল তার ছেলেকে বলি দেবে – সে কি উত্তেজনা। তারপর নাটক শেষে সকলের কী হাততালি। মেজোমামা তাঁর পাওয়া মেডেলগুলি এনে আমাদের গলায় পরিয়ে দিয়ে আমাদের অভিনয়ের ও নাট্য পরিচালনার প্রশংসায় মুখর হলেন। পরের বছর হল নৃত্য নাট্যের পরিবেশন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা “সামান্য ক্ষতি” কে নাট্যরূপ দিয়ে গানে নাচে একটি অপূর্ব অনুষ্ঠান করেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ নৃত্য শিল্পী উদয় শঙ্করের স্ত্রী আমলা শঙ্কর। মা কলকাতার মহাজাতি সদনে সেটি দেখে এসেছেন।

আমাদের মনেও তখন নৃত্যনাট্যের মধ্যে দিয়ে মনোরঞ্জন করার ইচ্ছা প্রবল হল। বুড়ি রাজা সাজলো। সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা ছিল। কাঁধের উপর কোঁকড়া কোঁকড়া চুলে তাকে রাজার বেশে খুব সুন্দর দেখাত। আমি রানী – কাশীর মহিষী করুণা। প্রতিমা আরতি। ভারতী, ডলি অন্যান্য বান্ধবীরা সব প্রজা। কাশীর মহিষী করুণা নদীতে স্নান করে উঠলে শীতে ধরে তাঁকে। সংসারে অভিজ্ঞতা রিক্ত রানী তখন তাঁর সখীদের বলেন যে, প্রজাদের পর্ণ কুটির জ্বালিয়ে দিতে, সেই আগুনে তিনি উত্তাপ গ্রহণ করবেন। গরীব মানুষগুলির গৃহ জ্বালিয়ে আনন্দ করতে করতে তিনি রাজবাড়িতে ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে যখন রাজা দরবারে বসে আছেন তখন ক্রন্দনরত প্রজারা এসে নালিশ জানালেন রাজার কাছে। প্রজাবৎসল ন্যায় পরায়ণ রাজা ভীষণ ক্রূদ্ধ হয়ে ডেকে পাঠালেন রানীকে। আদেশ দিলেন রানীর রাজ বেশ খুলে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাকে নিরাভরণ করে রাজ্যের বাইরে চলে যেতে। যে কুটিরগুলি তিনি নষ্ট করেছেন আগুন লাগিয়ে সেগুলি আবার তৈরী করার নির্দেশ দিলেন তিনি। মাথা নত করে রানী চলে গেলেন রাজসভা থেকে। বিদায় দৃশ্যে ছোট্ট মুকুল তার বড় বড় চোখে যতটা ভাব ফুটিয়ে তুলল, ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে বুড়ি যেভাবে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করল তাতে বাড়ির ও পাড়াপ্রতিবেশীদের, দর্শকের আসনে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। হাততালিতে ফেটে পড়লেন তারা। এইরকম উৎসাহ প্রদানকারী নাটকের শিশুশিল্পীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া দর্শকবৃন্দ আমাদের আত্মবিশ্বাস ও অভিনয় প্রতিভাকে বাড়িয়ে তুলল।

(ক্রমশ)

পঞ্চম অধ্যায়

বড় হয়ে বেথুন স্কুলে শান্তিনিকেতন এবং বিয়ের পরে Teacher’s Training এই ক্ষমতা আমাকে একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছে দেয়। বেথুনে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাড়াটে চাই নাটকে অভিনয় করে আমি প্রথম পুরস্কার পাই। আমার পাগলের ভূমিকায় অসামান্য এক চরিত্র ফুটিয়ে তোলার পর বড় ক্লাসের মেয়েদের প্রিয় পাত্রী হয়ে যাই আমি । যখন তখন সবাই বলে ঐ অভিনয়টা আর একবার করে দেখা। শান্তিনিকেতনে চিরকুমার সভাতেও অভিনয় করে খুব আনন্দ পাই। পরে নার্সারী Teacher’s Training এ গিয়ে দিল্লীতে সব প্রতিযোগিতাতে অংশ গ্রহণ করি। আমার তখন দুই ছেলে একজন তিন এ একজন আট বছরের। তারা আমাদের প্রিয় মিলনদিদি র সাথে দর্শকের আসনে বসে। আমি ছোটবেলার মুকুল হয়ে যাই সেদিন ৩৫ বছর বয়সেও। আত্ম বিস্মৃত হয়ে কখন Mono Acting দেখতে “চোরের” মূকাভিনয় করি, সেই সময়কার বিখ্যাত মূকাভিনেতা যোগেশ দত্তের অনুকরণে। প্রথম পুরস্কার আসে হাতে। পরে নৃত্যনাট্য পরিচালনা করি , “একতার বল”। পায়রার রাজা হয়ে নাচের মধ্যে দিয়ে অভিনয় , জাল উড়িয়ে একসঙ্গে শিকারীর হাত থেকে বাঁচার উপায় বের করে। এ সমস্তো শিক্ষা র সুত্র্ পাত ওই শৈশবে ই l

পরিণত বয়সে ওই পুরোনো দিনের কথা  ভুলে ‘ চন্দনা ম্যাডাম’  হয়ে  যখন স্কুলে দিদিমণি হয়েছি , তখনও ঐ সব স্কুলের ‘Holy Child বা Assisi Convent – এর স্টুডেন্টদের নিয়ে  নানা ধরণের একটিভিটি করেছি , Annual Day প্রোগ্রামে নাচ, গান, নাটকের মহড়া দিতে গিয়ে অনুভব করেছে মুকুল নাম শিশুর কাছে সে কৃতজ্ঞ। ‘মুকুল’ ঐ সময়ের মানুষগুলোর থেকে যে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল, যে আত্মবিশ্বাসের শক্তি আহরণ করে, নিজের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ,মনের মনিকোঠায় সঞ্চিত রেখেছিল,- তারই ফল ফলেছে তার কর্মক্ষেত্রে, একান্তবর্তী বৃহৎ পরিবারে।

শৈশবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এক গুরুত্ত্বপূর্ণ ঘটনা আমার দাদুর রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ। সমাজ কল্যানে নিয়োজিত প্রাণ ডাক্তার অনাথবন্ধু রায় কে  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরু অত্যন্ত স্নেহ করতেন, আর তৎকালীন  মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের অনুরোধে এবার ১৯৫৭ সালে (মুকুল যখন ৮ বছরের মেয়ে) ভোটে contest করতে দেখা যায়।কোতুলপুর (জয়রামবাটি, কামার পুকুরের পাশে) constituency থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ বিধান সভায় যুক্ত হন। তাঁকে বানানো হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ভোটপর্ব আমাদের সকলের মনে একটা অদ্ভুত ছাপ ছেড়ে যায়। ভোটের সময়  মা মাসী, মামারা জীপে করে গ্রামে গ্রামে যেতেন, দাদুর জন্য ক্যাম্পেন করতে। আমরাও সঙ্গে যেতাম অনেক সময়। কত গ্রামের মানুষ কত আদর সম্মানের সঙ্গে ঘরে নিয়ে যেতেন আমাদের। মা দেশাত্মবোধক উক্তি স্মরণ করে কংগ্রেসের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা উল্লেখ করে খুব সুন্দর করে লোকজনদের বোঝাতেন, কেন তারা কংগ্রেসকে – দাদুকে ভোট দেবেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। পূরবী মুখার্জী, আভা মাইতি, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, এবং অতুল্য চন্দ্র ঘোষেরাও বিভিন্ন স্থানে যেতেন ভাষণ দিতে। ছোট্ট মুকুল তাদের বক্তৃতা মন দিযে  শুনতো। তারপর হুবহু সেই কায়দায় নকল করতো তাদের কণ্ঠস্বর, ভাষা। খুব মজা লাগতো তার। সবাই তাকে ডেকে ডেকে শোনাতে বলতো। বিশেষ করে টিচাররা স্টাফ রুমে ডেকে নিয়ে যেতেন এবং মুকুল সেখানে  পূরবী মুখার্জী, বা  আভা মাইতি হয়ে গলার স্বর কখনও বাড়িয়ে কখনও খুব নামিয়ে ভাষণ দিত। ছোট্ট মেয়ের মুখে খাদ্য মন্ত্রী, পূর্ত মন্ত্রী, মৎস্য মন্ত্রীর ভাষণ শুনে, এক্টিং করার কায়দা দেখে সকলে খুব আনন্দ পেতেন। এরপর মুকুলের জীবনে প্রথম কঠিন পরীক্ষা। ক্লাস IV – এর বৃত্তি পরীক্ষা। জেলার education board সব স্কুলের জন্য একরকম প্রশ্ন পত্র বানাতেন। দিদি বকুল পড়াশুনোতে খুব ভাল ছিল, সে গান আর পড়া নিয়ে সারাদিন কাটাতো। আগের বছর বকুল অর্থাৎ তার দিদি যেহেতু বৃত্তি পেয়েছে, এবার মুকুলকেও পেতেই হবে।

 

গৃহ শিক্ষক অজিত কুমার সরকার

এই ঘটনা প্রসঙ্গে যার কথা সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে পড়ে ,তিনি আমাদের গৃহ শিক্ষক  অজিত সরকার মশাই। মামাবাড়ির ভাইবোনদের পড়াতে আসতেন, গোপাল মাস্টারমশাই। তিনি লম্বা লম্বা চুল রাখতেন, গোল গোল চোখ করে কড়া কড়া ধমক লাগাতেন। তাঁর গলার স্বরটা আবার ছিল মেয়েদের মতন সরু। আমাকে খুব ভালোবাসতেন, নাটক দেখে ডাইরেক্টর নামও দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি তাঁর ধারে  কাছে যেতে চাইতাম না। কারণ একদিন মামাতো ভাই খোকন পড়া না বোলতে পারায় , তাকে ভীষণ শাস্তি দেন। আমাদের চোখের সামনে তার হাত দুটো ধরে ঝুলিয়ে ভয় দেখান, যেন  তিনি তাকে উপরের বারান্দা থেকে ফেলে  দিচ্ছেন। দেখে তো আমি সেখান থেকে ছুট। বাবাকে গিয়ে বললাম – ‘আমি কিছুতেই ওনার কাছে পড়বো না। ওনার মেয়েলি গলার আওয়াজে আমার খুব হাসি পায়, তাই ওনার সামনে বসে ফিক করে হেসে ফেললে হয়তো আমাকেও ঐরকম ভয় দেখবেন, উপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার। বাবা আমাদের নতুন মাস্টারমশাইকে একদিন পরিচয় করালেন। বাংলাদেশ থেকে ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে আগত মানুষটির ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ সুন্দর। ফর্সা লম্বা গোলগাল চেহারা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, তখনকার পূর্ববঙ্গের বগুড়া, পাবনা জেলার লোক তিনি। বাড়ি ঘর – জমি-জমা, পুকুর – বাগান সব – এক কথায় ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিলেন দেশ ভাগের সময়। পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলেন। ম্যাটট্রিকে খুব ভাল রেজাল্ট থাকায় এখানের কোর্টে কেরানীর চাকরীতে জয়েন করেছেন। ছা – পোষা, নিরীহ-শান্ত মানুষটি ছিলেন অপার জ্ঞানের আধার। তাঁর নিজের আমাদের বয়সী ছেলে মেয়ে  ছিল, তাদের নামও আমার মনে আছে, অশোক, অরুন, কৃষ্ণা। মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী অত্যন্ত লজ্জাশীলা নরম প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। মাঝে মাঝে আমাদের পিঠে, পাটিসাপ্টা খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। আমার এই লেখনী আত্ম কথাকে ব্যক্ত করার তাগিদে লেখা হচ্ছে না। ঐ মহান  গৃহ শিক্ষকের  উদ্দেশ্যে প্রণাম জানানোর একটা মাধ্যম হিসেবে এই খাতার পাতা ব্যবহার করতে চেয়েছি। মুকুলের জীবনে ‘অজিত মাস্টারমশাইয়ের’ অবদান কতখানি তা বহু-বছর পরে স্কুলে পড়াতে গিয়ে সে উপলব্ধি করেছে। মাস্টারমশাইয়ের অত সুন্দর করে সহজ সরল উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর কায়দা, অংকে ও সাহিত্যে মনোনিবেশ করে ইতিহাস, ভূগোলকে গোগ্রাসে গিলে ফেলবার আগ্রহ তিনি জাগিয়ে দিয়েছিলেন সেই ছোট্ট থেকে। আর বিজ্ঞান যে এক বিশেষ জগৎকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে, সে কথা মর্মে মর্মে অনুভব করার অগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে সফল হয়েছিলেন তিনি। হাতের লেখা খারাপ করার জন্য কত বকুনি খেতে হয়েছে তাঁর কাছে। তিনি বললেন – ‘হাতের লেখা  তো – তোমার মনের মুকুর অর্থাৎ আয়না অর্থাৎ দর্পন। তার মধ্যে দিয়ে তোমার ব্যক্তিত্ব, চরিত্র প্রকটিত হয়। স্বভাবটি ফুলের মতন সুন্দর, স্বচ্ছ ও সততাপূর্ণ করতে  হবে। শুধু  পড়াশুনোতে জলপানি, বৃত্তি, স্কলারশিপ পেলে তো চলবে না। পূর্ব বঙ্গ থেকে আগত অনেক ব্যক্তি তখন কার দিনে এই ভাবে টিউশন করে সংসার চালাতেন , এবং তাঁদের ভাবনা ও প্রচেষ্টা  ছাত্র ছাত্রী দের জীবনের মান উন্নত করে তুলতে এক  বিশেষ ভূমিকা নিত l

বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, নিবেদিতার মতন দয়ালু সেবাপরায়ন হতে হবে, আর অনেক মানুষের উপকার করার জন্য সর্বদা যে প্রস্তুত থাকতে হবে, এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। পড়াশুনোকে প্রাণমন দিয়ে ভালোবাসা, ‘বই ‘ অর্থাৎ ভালো গ্রন্থ কে জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করার ইচ্ছাটা তিনি অত ছোটবয়সেও তাঁর শিশু ছাত্রীর মনে জাগিয়ে দিতে চাইতেন। ক্লাশ ফোর এর পরীক্ষায় ‘বৃত্তি’ পাওয়াতে মুকুলের জীবনে যে সাফল্য লাভ হয়েছে, তাঁর চেয়ে হাজার গুণ সফলতা পেয়েছে সে “চন্দনা ম্যাম” হয়ে এই মানুষ টির শিক্ষা গ্রহণ করে l পরবর্তী কালে সেই মুকুল যখন সংসার সংগ্রামে বিব্রত ,তখন তার জীবনে টিচার হবার ইচ্ছা সে কার্যকরী করযে সফল হয় l

 দিল্লীত সে বাড়িতে ‘কোচিং ক্লাশ’ খুলে অনেককে টিউশন দিতে আরম্ভ করে। নিজের দুই পুত্রের মধ্যেও সেই একই জ্ঞানের পিপাসা বাড়িয়ে তুলতে সে সামর্থ হয়। বাড়িতেই দুরকমের ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে শুরু করে। একদল যারা এয়ারলাইনসের হাউসিং সোসাইটি তে থাকেন আর্থিক অবস্থা ভালো । বাবা মা রা যারা পাইলট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চাদের সময় দিতে পারে না ,কিন্তু টিউশন দিদিমনিকে ভাল দক্ষিনা দিতে প্রস্তুত তাঁদের ছেলে-মেয়েরা। অন্যদিকে অসহায় কাজের বৌ যারা তাদের পুত্র কন্যাকে টাকা দিয়ে কোথাও পড়াতে না, তাদের সন্তানকে ভালোভাবে শিক্ষা দানের চেষ্টায় এই ম্যাডামকে অনুরোধ জানায়, চন্দনা তাঁর maid এর তিন কন্যা ও এক পুত্রের সঙ্গে অন্যান্য maid দের “ঝুগ্গির” আরও কিছু বাচ্চা ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে আর একটি ফ্রি গ্রূপ করে। দুই দলকেই সমানভাবে শিক্ষা দিতে চায় সে। বড়লোকের ছেলে মেয়ে দের  কাছ থেকে পাওয়া টাকায় সে কাজের মেয়েদের শিশুদের সাহায্য করতে পারে। এক গ্রূপ কে উদ্বুদ্ধ করে আর এক দল অসহায়কে খাতা, পেন, পেন্সিল, রং বা ব্যাগ – জুতো জামা দিয়ে সাহায্য করতে। অন্য দলটিকে হাসি মজাকের মধ্যে দিয়ে উৎসাহ দিতে ও তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে। জীবনের শৈশবের অধ্যায় এই মেয়েটিকে উদার হবার শিক্ষা দিয়েছিলেন  সেই   পাব্নার’ অজিতবাবু ‘, পরিণত বয়সে তাই সে বারবার তার গৃহ শিক্ষককে স্মরণ করে। দিল্লি যে অনেক বন্ধু স্বজন যখন তাকে বিদ্রুপ করে , স্কুল ছেড়ে ‘টিউশন টিচার ‘হবার জন্যে তখন সে  ওই  মাস্টার মশাই এর গলা শুনতে পায়, মনের ভিতরে, সংগ্রামে আর্থিক অসাচ্ছল্যে সে ভেঙে পড়ে না। যে কোনো সাংসারিক বিপর্যয়ে সে যেন শক্ত হাতে হাল ধরতে পারে, একথাই সর্বদা মনে ভাবে। স্বর্গীয় মাস্টারমশায় তাঁর জীবনে চিরনমস্য।

বাঁকুড়ায় কোনদিন বন্যা হয়নি, খরা অল্প স্বল্প হলেও  গ্রাম, শহর, বাড়ি, ঘর ছেড়ে কাউ কে পালিয়ে যেতে হয়নি, পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বলে সেখানে লোকজনকে partition, দেশভাগের দুঃসহ ক্লেশ, পীড়ন ও সহ্য করতে হয়নি। জেলাটি সীমান্ত রেখা থেকে অনেক দূরে, তাই এখান্ কার বাসিন্দারা উদ্বাস্তুদের দলে দলে ঘর পরিবার ধন-সম্পদ, আত্মীয় বন্ধু প্রিযজন হারিয়ে লাইন করে চলে আসতে দেখেনি, এই ছোট্ট  শহরের মানুষেরা তাই খুব শান্তিপ্রিয ,  এখানে হিন্দু মুসলমান – খ্রিষ্টান, মন্দির-মসজিদ-গির্জা ঘরে একসঙ্গে উৎসব মানিয়েছে। রাঢ় মাটির লাল পাথরে মোড়া রুক্ষ দেশের মানুষগুলো কিন্তু রুগ্ন হলেও রুক্ষ নিরস নন। ঝগড়া ঝাটি, দাঙ্গা হলে ভারতের অন্য শহরগুলোর লোক যখন হিংসায় ফুঁসছে, ষাট সত্তর বছর আগেকার বাঁকুড়ায় আমাদের শৈশব  কিন্তু এরকম কোন ঘটনা ভায়োলেন্সের সাক্ষী হয়নি। বড়লোক গরীবলোক, জাতপাতের ভেদাভেদ করতেও দেখিনি কাউকে। আমাদের পরিচিত ডাক্তার, উকিল প্রফেসরদের পরিবার নিঃসংশয়ে, নিঃসংকোচে ছেলে মেয়েদের বাউরি পাড়ায়, বাগ্দী ঘরে মনসা পুজো দেখতে, মেলায় চড়ক গাজনের ভিড়ে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁদের মনে বাচ্চা কিডন্যাপ হওয়ার ভয় ছিল না। বাচ্চারা আমরা স্বাধীনভাবে তিলি পাড়ায় মুড়ি খেতে, তাঁতি পাড়ায় কুলের চাটনি খেতে, যখন তখন চলে যেতে পারতাম। এক পয়সার কুল কিনতে পাওয়া যেত, কিন্তু সে ছেড়ে দিয়ে আমরা নদী পেরিয়ে দল বেঁধে পৌঁছে যেতাম, ‘বাঁশি’ বা ‘তোড়া’ গ্রামে   কুল পাড়তে। গরমকালে প্রায় কুয়োর জল শুকিয়ে যেত, কলেও জল আসত না সব সময়। বুড়ি,খোকন বকুল, মুকুলের বাড়ির কাজের মাসিদের সঙ্গে চলে যেত, “দ্বারকেশ্বর” নদীর বালিতে। সেখানে গিয়ে ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হত তাকে বলা হত “চূঁয়ো” কুয়োর ছোট ভাই মনে হয়। সেখানে নদী গর্ভের শুদ্ধ জল বাটি বা ছোট ঘটিতে করে কলসীতে ঢালা হত। কলসীর মুখটি কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকতো যাতে জল ছেঁকে নেওয়া যায়। আমাদের জন্যেও কেনা হয়েছিল ছোট ছোট পিতলের ঘড়া। গামছা পরে নদীতে স্নান সেরে আমরা বাড়ি আসতাম নাচতে নাচতে। জীবন সহজ ছন্দে বহে যেত। নদী পাড়ে বড় বড় গাছ ছিল শাল, সেগুন, চালতা, আম জাম, কাঁঠাল। সন্ধ্যে বেলায় সবচেয়ে মোহময় ছিল শেয়ালের ডাক। পুকুরপাড়ে ঝোপে ঝাড়ে, নদীর ধরে গর্তে গর্তে লুকিয়ে থাকতো তারা। কোনোদিন চোখে দেখা যেতোনা, কিন্তু সন্ধ্যে হলেই শোনা যেত তাদের গান। হুক্কা হুয়া, হুয়া হুয়া। আমাদের একটু ভয় ভয় লাগত, সেই ডাক শুনে। তখনকার দিনে টিভি ছিল না, রেডিও শুনতাম আমরা রবিবার সকাল ৯টায় – “শিশুমহল”।

‘ছোট্ট সোনা বন্ধুরা সব, কি ভালো আছো তো সব? তোমাদের ইন্দিরাদি বলছি” – এই ইন্দিরাদিকে আমাদের কোনোদিন সামনে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাঁর গল্প ,প্রশ্ন উত্তর জ্ঞানের আলোচনা ছোটদের এতো প্রিয় ছিল যে, কোনো ব্যক্তিত্ব হয়তো সেই সময় আর দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না।

শুশুনিয়া পাহাড়ে             

শৈশবে স্মৃতির খেলায় ভাসতে ভাসতে মুকুল পৌঁছে গেল, একেবারে শুশুনিয়া পাহাড়ের উপরে। প্রত্যেক বছর আমাদের বাবা ,মা ,মামা ,মাসির রা তাঁদের সব বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয়স্বজন মিলে শীতকালে  চরুই ভাতি অর্থাৎ পিকনিক করতে যেতেন। সবাই মিলে অনেকেগুলি গাড়িতে বাচ্চা বুড়ো, যুবক তরুণ ভরে রান্নার লোক, বড় বড় হাঁড়ি কড়াই নিয়ে হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়তেন। গাছ-পালা, পাহাড়, ঝর্ণা – সব মিলিয়ে বাঁকুড়া শহরের মাত্র আট দশ মাইল দূরের এই ছাতনা গ্রামের পাশে হাতির আকারের সুন্দর সবুজ পাহাড়টির নিচে বহু পরিবার একসঙ্গে রান্না করতে, শালপাতার ওপর গরম গরম মাংস ভাত ও চাটনি খেতে খেতে আনন্দের সঙ্গে হাত চাটতেন। এইধরনের বাইরে গিয়ে খাওয়ার নাম যে চড়ুইভাতি কেন হল তাই নিয়ে আমাদের বাচ্চাদের মধ্যে গবেষণা চলল। অনেক ভেবে আমি বললাম, আমরা সবাই খাওয়া দাওয়া করে চলে গেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাতগুলি চড়াই পাখিরা এসে খাবে। তাই এরকম বাইরে এসে রান্না খাওয়ার নাম চড়ুইভাতি। শুশুনিয়া পাহাড়ের নিচে নানানরকম বনফুলের গাছ ছিল এবং ওপরে অনেক পলাশ, শিমুল গাছ। পাহাড়ের ঝর্ণা দিয়ে অবিশ্রান্ত কাল ধরে জল পড়ছে। ভারী মিষ্টি তার স্বাদ। চৈত্র মাসে অর্থাৎ বসন্তকালে এখানে একটি বিরাট মেলা বসে। দূর দূর থেকে বহু আদিবাসী সাঁওতালরা এখানে আসেন তাদের শাড়ি, চুড়ি, মালা, বেতের ঝুড়ি মাদুর ইত্যাদি কিনতে। মাদুরকে এরা বলেন ‘চাটাই’। মহুয়ার মদ খেয়ে মেয়ে পুরুষে ঢোল বাজিয়ে তালে তালে নাচ করে। তেলে ভাজা, পাঁপড় ভাজার গন্ধে সারা জায়গা ম ম করে। আমাদের সবাই কে নিয়ে সেই “ধারা”র মেলায় আমার একবার যাওয়া হয়েছিল। সারা পাহাড়ের গায়ে তখন অপূর্ব লালের সমারোহ। শিমুল – পলাশের রূপে সেদিন এই শিশুমন মোহিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অনেকদিন পরে সম্ভবত কুড়ি – পঁচিশ বছর হবে, একবার স্বামী ও নিজের ছেলেদের নিয়ে বাঁকুড়ায় গিয়েছিলাম দিল্লী থেকে। তখন দেখলাম পাহাড় প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। কে বা করা কখন বা কেন শাল পিয়ালের মাথা ভেঙে শিমুল পলাশকে কেটে ফেলে সবুজ পাহাড় তা কে একেবারে  নেড়া করে দিয়েছে জানিনা,  আমার কিন্তু খুব কান্না পেয়েছিল, বনানী উজাড়ের এরকম ঘটনা চাক্ষুষ করে। 

শুনলাম, এখন আবার গাছ লাগানো শুরু হয়েছে, পাহাড়ের নিচে বহু দোকান বাজার বসেছে, ঝর্ণার জল বোতলে ভরে বিক্রি হচ্ছে ,ঐ পাহাড়ের পাথর দিয়ে নানারকমের মূর্ত্তি, খেলনা বা ঘর সাজানোর জিনিস তৈরী হচ্ছে। সেখানে শান্ত পরিবেশে পিকনিক করতে গিয়ে এখন এমন  মাইক বাজে, হৈ চৈ হয়, যে মাটির নিচের কেঁচো, গুবরে পোকা বা কাঠবিড়ালীরাও সব ভয়ে পালিয়ে যায়, গাছের পাখিরা গান করা ভুলে কান বন্ধ করে দেয়। শৈশবের সেই পরিবেশকে কেন যে মানুষ এমনভাবে দূষিত করে ফেলছে, কে জানে! আরও কয়েকটি জায়গায় আমরা পিকনিক করতে গিয়েছিলাম, আমরা সে সব স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না। ‘ফুলকুসমার’ ঘন  জঙ্গলে, ক্ষুদিরাম বোস ও তাঁর বন্ধুরা বোমা তৈরী করতেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। সেখানে তখন  হাতি, হরিণ, খরগোশ ছাড়াও কখনও কখনও ভালুক, নেকড়ে, হায়নার দেখাও পাওয়া যায়।  পিকনিকের পরে এক্ বার আমরা রাস্তা হারিয়ে ফেলি, আমাদের গাড়ি ক্রমশঃ ঘোর জঙ্গলের দিকে চলে যেতে থাকে, সন্ধ্যে হয়ে যায়, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সবাই ভয়ে অস্থির। মায়েরা ঠাকুরের নাম করছেন। আমি গাড়ির জানলা দিয়ে দেখছি, এক অপূর্ব দৃশ্য। হাজার হাজার জোনাকি। পাতায় পাতায় ছোট ছোট তারা বা নক্ষত্রের মতন তাদের সেই ঝিকমিক করা আলো জীবনে আর কখনও কোথাও দেখিনি। শৈশবের সঙ্গে সঙ্গে সেই অপূর্ব জ্বলন্ত পোকারাও সব কোথায় হারিয়ে গেল। অনেক রাত্রে প্রাণ নিয়ে যখন সবাই ফিরে এলেম আমরা তখন গভীর ঘুমে অচেতন।    

 মামাবাড়ি র কথা —যোগেশ ভবন , বাড়ি টি  মায়ের দাদু র নামে ,  বিশাল সেই  লাল প্রাসাদপম বাড়িটির কোন কোন কত ইতিহাস , কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে. জীবনের প্রথম অধ্যাযের   ১২ বছর টি এখানে কেটেছে, খুব নিশ্চিন্তে ও আনন্দে, সে কথা আজ বারে  বারে  মনে পরে,তার পর ছয় টি  যুগ কেটে গেছে , অর্থাৎ ৭২  বছর বয়সে এসে স্মৃতির  সম্ভার উজাড় করতে গিয়ে, আমি আবেগ প্রবন হয়ে পড়ছি l কারণ আমার প্রিয় মামা , মামীমা  মাসি রা শুধু নয় , খেলার সাথী রা ,যারা আমারই সম বয়সের তারাও সব একে একে ছলে যাচ্ছেন l

আমার ছেলেবেলার সব চেয়ে প্রিয় চার বন্ধু ছিল.আমার  মামাতো ভাই খোকন  , বোন বুড়ি , আরতি ও বোবা দুলু .সারাদিন পেয়ারা গাছে ওঠা , লুকোচুরি খেলা , মাইমার কাছে বসে হালিশহর গঙ্গার গল্প শোনা  আমাদের কারো মধ্যে ছিল না কোনো হিংসা ভাব ,ঝগড়া ঝাটি , সব খাবার ভাগ করে খাওয়া  নাড়ু বাবু দের পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে চান করা কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোতে বারান্দায় স্টেজ বানিয়ে নাটক করা , সে এক অনাবিল আনন্দ, মামাবাড়ির আদর কি মধুময় তা এখন বলে বোঝানো যাবে না ,খোকন ছিল সব চেয়ে সহজ সরল , দিদি বকুল ভীষণ লাজুক , বুড়ি খুব সাহসী , আমি কি ছিলাম ! জানি না , কিন্তু সবাই কে ই খুব ভালোবাসতাম , মায়া করতাম l  আমার  মামা খুব দয়ালু ছিলেন , গরিব ভিখারি কে একবার নিজের গায়ের কোর্ট খুলে দিতে দেখে আমার মনে হতো যে মন টি এমনি নরম রাখলে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়l

মামাবাড়ি কে আমরা ‘ও বাড়ি ‘ বলতাম , সেখানে অনেক গরু ছিল  দাদুর , আমরা খুব দুধ খেয়েছি তাদের , ভীষণ তেজি কুকুর ছিল টুসি তাকে ও খুব ভালো বাসতাম সবাই, পশু পাখি , কাজের লোক দের আপন করে নেবার মন্ত্র পেয়েছি আমরা সেখানে l 

(ক্রমশ)

ষষ্ঠ  অধ্যায়

আমার প্রিয় বাঁকুড়া ভাষার ছন্দে মশগুল মুকুল

বাঁকুড়ার মানুষ, প্রকৃতি, জল হাওয়া সবকিছুর ওপর আরেকটি বিশেষ ব্যাপারের কথা  না বললে আমার কথা অসম্পূর্ন থেকে যাবে। তা হল আমার অতি প্রিয় “বাঁকড়ী” ভাষা। এর মাধুর্য্য  ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। মুখে বলতে হয়। আমাদের বাড়ির কাজের লোকেরা শুধু নন, বহু আত্মীয় স্বজন, গ্রামের দাদু, জেঠা, কাকা, মাসী, পিসি সবাই এই ভাষাতেই কথা বলতেন। প্রায় প্রত্যেক শব্দের সঙ্গে ‘ক’ লাগিয়ে এক অদ্ভুত সুরে  টান দিয়ে কথা বলা হয়, এই আঞ্চলিক ভাষায়। কারুর বাড়ি গেলে, তারা আদরের সঙ্গে বলতেন, – ‘‘ডাগটর বাবুর বিটি আইচে লো, উয়াকে মুড়ি মুড়কি খ্যাত্যে দ্যে লো, এত্য তাড়াতাড়ি কুথা যাবেক  গো, অখন য্যাতে হবেক নাই। অমন কর়্যে ভ্যালে আছ্যো ক্যানে গো? আমাদের খানে একটুকুন  বসত্যেই  হবেক’l

                                                                   আমরা বাড়িতে যতই ভালোভাবে কথা বলতাম না কেন, খেলার মাঠে, পুকুর ঘাটে, জজ কোর্টের লম্বা বারান্দায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে প্রায় এই মধুর বাঁকড়ী ভাষার টানে ডাকা-ডাকি, হাঁকা-হাঁকি করতে ভালোবাসতাম। বড় হয়ে যখন সাধারণ মানুষের কথা আমার কাহিনী তে বা গল্প কবিতায় বলতে চেয়েছি তখনই মুখে শুধু নয় আমার আঙ্গুলের  কলমে ও  বাঁকড়ী বুলি বেরিয়েছে। একবার মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে সিডিউল কাস্ট জনজাতি, আদিবাসীদের জন্য চাকরিতে রিজার্ভেশন / সংরক্ষণ প্রস্তাব আনা হয় এবং তাঁর জন্য বিল পাশও করা হয়। সারা দেশ জুড়ে সমস্ত জেনারেল ক্যাটাগরি, মধ্যবিত্ত জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তাতে। এইসময়ে রাজনীতিবিদরা উল্টো প্রতিবাদ মিছিলেরও ডাক দেন জায়গায় জায়গায়। গ্রাম থেকে নানান জাতের গরিব শ্রমিক সম্প্রদায়কে জড়ো করে ভাষণ দেওয়া বা সরকারি অফিসের সামনে প্রতিবাদের জন্য জনতা কে উত্তেজিত করা হয়। কয়েক জায়গাতেই ছত্রভঙ্গ করার জন্য দিল্লীতে লাঠি চার্জ কাঁদানে গ্যাস ছোড়া চলে। একদিন হিংসা দমন করে সোচ্চার লোকদের স্তব্ধ করবার জন্য গুলি চালানো হয়। তাতে এক অতি নিরীহ অসহায় অত্যন্ত দরিদ্র মায়ের ছেলে প্রাণ হারায়। তাদের পরিবারের দুঃখে আপ্লুত আবেগপ্রবণ চন্দনা যখন কবিতা লেখে, তখন মায়ের মুখে কেবলমাত্র বাঁকুড়ার ভাষা এসে যায়। কবিতাটির শুরু অনেকটা এরকম ছিল। –

শুশুনিয়ার পাহাড় কোলে – চাঁদড়া গাঁয়ে বাগান তলে

ঘর ছেল্য গো বড় সুক্যের।

ডিঙলা লতায় – বাঁশের বাতায় – মহুয়া ফুল জমতো যে ঢের।

কনড্যাক্টর বাবু অ্যাস্যে বললেক কথা হ্যাস্যে হ্যাস্যে –

চলরে বুধি ডিল্লী যাব্যি, অনেক ট্যাকা পইস্যা পাবি

ম্যেয়া মরদে খুব কামাবি, মাটি কাটার রোজগারে  l

মরদ আমার বেবাক বোকা, কথাডা উয়ার লাগে ব্যাঁকা,

হাত কচলায়, প্যাট চুলকায় – কানে গুঁজ্যা পুড়া বিড়ি।

জঙ্গলে শাল পাতা কুড়িয়ে আসে পাশে গ্রামের বড় লোকদের জমিতে  ধান কেটে, পুকুরের গুগলি তুলে, ওল সেদ্দ কচু পোড়া, শুকনো কুলের চাটনি, কিম্বা সজনে ফুল ভাজা, মোটা চালের ভাত খেয়ে, পরবে পার্বনে মাদল বাজিয়ে, মাথায় পলাশ ফুল গুঁজে – তাদের দিন তো খুব আনন্দেই কেটে যেত। নিজেদের ধর্ম কালচার ও ভাষা কিছুই তারা হারায়নি। কিন্তু শহরে বাবু নেতা বা দাদারা তাদের ছাড়লো না। নানান লোভ দেখিয়ে, বাস্তুছাড়া করে ধরে নিয়ে গেল শহরে। বুধি ও মদনা তাদের আদরের ছেলে ডাবকা ও মগনুকে নিয়ে দিল্লীতে এসেছে। সামিল হল মন্ডল কমিশনের প্রতিবাদ মিছিলে। ‘সংরক্ষণ দিতে হবে দিতে হবে’ , বলতে বলতে শহরের বড় রাস্তার গাড়ি ঘোড়া বাস অটোরিক্সার পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতে লাগল তারা। ইন্ডিয়া গেটে সেদিন কোন বিদেশী ডেলিগেশনও আসছে, তাই মাঝ রাস্তায় বাধা পেল মিছিল। গুলি চলল ছত্রভঙ্গ করতে। ‘কালু সোনা’ বলে ডাকে বুধি তার মগরু ব্যাটাকে, মরদের সঙ্গে ওকে ওই ভিড়ে পাঠানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তার। কিন্তু বাবুকে লোক জোগাড় করতে হবে। তাই ছাড়ান পেল না সেও। বিকাল বেলায মরদটা বলছে ,-

আসনটা কি বট্যে, সিটা

দ্যেখতে তো মুই পেল্যম নাই

“আসন চাই, আসন চাই”, –

ভকভকায়ে বক্যে গেল্যম, –

চাকরি ঠাঁয়ে জায়গা নাই ,

“ছিলা” আমার গুলি খেলেক, বুজত্যে লারলম আমি তবু –

মিছিল বাগে, খালি প্যাটে, হ্যাঁট্যে হ্যাঁট্যে হলাম কাবু।

বাঁকুড়ার ভাষা আমার রক্তের স্রোতে মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে। আমার বাবা মা কখনও এই ভাষায় কথা বলতেন না, কিন্তু ‘হাট- আশুরিয়াতে’ আমাদের দেশের বাড়ির পুজো দেখতে গিয়ে, চণ্ডীমণ্ডপে সমবেত সবাইকে ‘ক’ এর অনুপ্রাস দিয়ে ‘’হবেক নাই, খাবেক নাই, যেত্যে হবেক; দিব্যে নাই? পড়বেক লাই, কি বলছ্যে?  উটি চৈলবেক নাই, আমাক তু চিনিস নাই, এমন বাখান দিল্যেক, যে থাকত্যে লারলম,  উয়াকে কাপড়টি পরাই দিত্যে  দিবেক, হ, হ, বাবা আমি জেস্যে লোক লই,  আমার সঙে লাগতে আস্যো না বাপ, তুমাক খেসারত দিতে হবেক – হঃ বলে দিলাম, বাছাধন বাকচাতুরি করলে চলবেক নাই – – -’’। ইত্যাদি কথা আমাদের কানে সব সময় বাজত। তখন লাইন ধারে, নদীর পারে যেসব মানুষগুলো থাকত তারা লোকের বাড়ি কাজ করতেন, বিড়ি বাঁধতেন, তালপাতার চাটাই বুনতেন, গামছা দিয়ে পুঁটি মাছ, শামুক-গুগলি তুলতেন পুকুরে – ডোবায় নেবে। তাদের বাড়ির মেয়েরা স্কুলে যেতেন না। পুরুষেরা সমাজে সম্মানীয় স্থান পেতেন না। মুকুল ছোট বয়স থেকেই ওদের কথা ভাবে। তার বন্ধুদের তালিকায় বাউরি, বাগদি, মুচি, কামার, কুমোর আর ডোমদের বাড়ির মেয়েরাও ছিল। তাদের পান্তাভাত, তরকারি মেখে কাঁচালঙ্কা ঘষে মুড়ি ও মূলো খাওয়া, সহজ সরল জীবনযাত্রা মুকুলকে টানত। মাঝে মাঝে তাই সে বোবা দুলুর হাত টি  ধরে ঐসব লোকের বাড়ি গিয়ে বসে থাকত তাদের উঠোনে। অন্যান্য ভাই বোনেরা ও বন্ধুরা সাথে  যাবে না, তাই ডলির ভাই ঐ  বোবা দুলু ছিল তার প্রিয় সাথী। ইশারায় কথা হত তাদের। তাঁতের গামছাকে শাড়ি করে পরে ঘোমটা দিয়ে বোবা দুলু নাচ দেখাতো বাগদি বৌকে। আমি ওকে উৎসাহ দিতাম। ওর মধ্যে একজন বড় শিল্পী লুকিয়ে ছিল, অনেক কথায় সে আমায় বোঝাবার চেষ্টা করত, বড় লোকের বাড়ির বন্ধুরা তাকে কেউ পাত্তা দেয় না, তাই এদের মাঝে এসে উপস্থিত হত, তারা ঐ সরল ছেলে মেয়েদের অনাবিল আনন্দ দিতে অথবা একরাশ আনন্দের পসরা ভরে নিয়ে মুকুল নামের সেই ছোট ভাবুক মেয়েটি নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে নিয়ে আসত। তাদের গাছের নারকেল কুল, টোপা কুল, কুসুম বীজ মেশানো মুড়ি ঠোঙায় ভরে খেত সে। কোঁচড়ে ভরে দিত তারা বাগানের কচি শশা, কাঁচালঙ্কা, তালের ফোফরা। হ্যাঁ বাঁকুড়া তখন প্রায় সব বাড়িতেই সজনে গাছ, পুকুরের পাড়ে পাড়ে তালগাছ। পাকা তাল খাওয়ার পরে সেটি মাটিতে পুঁতে দিলে সাদা সাদা অঙ্কুর বেরুত। তাকেই বলা হত তালের ফোফরা। গরমকালে ঝুড়ি মাথায় করে তাল শাঁস বিক্রি করতে আসতেন, তার জলটি ভেঙে খেতে বড্ডো ভালোবাসতাম আমরা। 

আমাদের ঝি চাকরদের আমরা কখনও নাম ধরে ডাকতাম না। মাসী, পিসি, মামা, কাকা বা দাদা দিদি বলে সম্মানের সঙ্গে ডাকতাম, বাউরি  বৌকে বলতাম বৌ মাসী, খুব ছোট বয়সে সে শাশুড়ির সঙ্গে এসেছিল আমাদের বাড়ির কাজের সাহায্য করতে তারপর পঞ্চাশ বছর ধরে সে আমাদের সেবা করেছে। আমি মনে করি আমরা তাদের উপকার করিনি, তারা আমাদের কাছে চিরতরে প্রণম্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো সুযোগও তারা আমাদের কোনোদিন দেন নি। ধন্যবাদ কথাটা ব্যবহার করা বিশেষতঃ domestic helpদের জন্য আমাদের জাতির চরিত্রে হয়ত ছিল না। মুকুল নামের সেই ছোট্ট আত্মাটি কিন্তু তাদের জন্য কাঁদত। তাদের ছেলে মেয়েরা কেন স্কুলে যায় না, সে কথার উত্তর খুঁজে পেত না সে। এদের সমাজে অতি ছোট বয়সেই বিয়ে দেওয়া হত ঢাক ঢোল বাজিয়ে, একটাই সুখের কথা জেনে ভাল লাগত, এদের মধ্যে পণ প্রথাটা উল্টো রকম ছিল। মেয়ের বাবাকে বিশেষ কষ্ট করতে হত না। মেয়েরা যত সুন্দর, সুঠাম, স্বাস্থবতী কাজের এবং অল্প বয়সী হত তত বেশি পণ পেত বরপক্ষের কাছে। ওদের বিয়েতে গিয়ে খুব মজা করতাম আমরা। কিন্তু মেয়েটির শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কান্না দেখে ভীষণ কষ্ট হত। একবার দুগ্যি নাম একটি মেয়ে বিদ্রোহ করে বসে, কিছুতেই সে শ্বশুরবাড়ি যাবে না। কিন্তু ধরে বেঁধে যখন তাকে পাঠানো হল, তখন রগে দুঃখে মুকুলের চোখে জল এসে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল সে। চল্লিশ বছর পরে বাঁকুড়ায় গিয়ে দেখলাম অনেক মেয়েই এখন বাউরি  বাগদি পাড়ার থেকে পড়াশুনো করছে, বিয়ে না করে চাকরী করছে। ওই বউ এর নাতনি ও স্কুলে যায় , সে mid day meal খাবার  লোভে ই হোক , আর লোকের বাড়ি বাসন মজা র হাত থেকে মুক্তি পেতেই হোক, বাউরিপাড়ার সব মেয়েরা এখন স্কুল যাচ্ছে ,এটা দেখে এখনকার চন্দনা খুশি হল। একদিন একটি মা বললেন, তার বিটির জেদের কথা। কেমন করে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁকুড়া শহরে স্কুলে ভর্তি হয়েছে তার মায়ের উৎসাহে। এবার মুকুলের পরিণত ব্যক্তিত্ব বাঁকুড়ার ভাষায় সেই মেয়েটির হয়ে একটি কবিতা লিখে ফেলল, আঞ্চলিক ভাষায়। –

দুগ্গি বিটি

হে মাই, তোর পায়ে পড়ু, আমাক তুই পড়ত্যে দে গো,

ইস্কুল টার ঘন্টা বাজ্যে, বললেক কে জাগো জাগো।

বড় লোকের বিটি ছা টা, হাসত্যে হাসত্যে চলে যাবেক,

আর তুয়ার ঘরকে চোকের জল্যে এই বিটিটা বুক ভিজাবেক ?

দুখ লাগে না তোদের কাঁন্যে , ঠাকমা বুড়ি কোঁকাই মরে,

বাপ দাদা আর খুড়্যা, জেঠ্যা বিয়া দিবার জুগার করে ,

তোর জীবন তো ঘুচাইছস গো, গোপর ল্যাপে, কাদ্যা ঘেঁট্যে

আমাক হবেক  বাঁচত্যে যে মা, যাবো নাই আর ঘাট্যে মাঠ্যে,

বন বাদাড়ে ধুমস্যা মরদ ভ্যাল-ভ্যালায়ে তাকাই থাক্য  ; –

পাঠাস না মা একলা আমায়, পাঠাস না আর ঘাস কাটত্যে  l

লিখ্যা পড়া শিখার ল্যাগে, হ্যাঁ করে  যে বস্যে থাকি।

খাঁচা খুলে উড়াই দে গো, তোর বিটি যে বনের পাখী।

 

শৈশবের মুকুল তার সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে ,এইরকম দুগ্গি রানীদের কথা লিখতে চাইতো, বড় হয়ে। জানতো না বড় হয়ে সে কি  হবে!  ডাক্তার বা নার্স হয়ে রোগীদের সেবা না কি শিক্ষিকা হয়ে এইরকম অসহায় কন্যাদের শিক্ষাদানে জীবন কাটাবে। দুগ্গিরানীর মায়ের পাশে দাঁড়াতে চায় সে। চন্দনাকে দিয়ে তাই সে সেই মায়ের কোথাও ব্যক্ত করে সে, কারন এখন তো সেও একজন মা, যে তার সন্তানকে বিশেষ করে কন্যাকে আর আটকে রাখতে, বেঁধে রাখতে, বিবাহের শেকলে জড়িয়ে পরাধীন করে রাখতে চায় না। তাই সে বলে –

– আয় না রে মা দুগ্গিরানী চুল বেঁধে দি যতন করে,

পড়ত্যে তোখে যেতেই হবেক, সাদা জামা ইসকাট পরে।

বই খাতা আর কলম লিবি জেদটা তুয়ার রাখবি ধরে।

ফাস্টো তোকে হত্যেই হবেক, চেষ্ঠা থাকলে কেউ কি হরে?

দশ হাত তোর নাই বা হল্য, কাজ করবি মনের জোরে।

দশের কাছে নাম কুড়াবি গব্বে বুকটা উঠবে ভরে।

চোখ থাকতেও নিরক্ষর পড়ে আছি , অন্ধকারে –

লিখা পড়া শিখে তোখে, যেত্যে হবেক আলোর পারে।

‘ই’ বাগ ছেড়্যে ওই উধারে যেতে তোখে হবেক ইবারে।

ইয়াদিগকে সামলাই লিব, যা পালায়ে যা ইসকুল ঘরে।

থাকতে তোখে হবেক নারে, বাবা, দাদা, খুড়ার ডরে,

নিজের পায়ে দাঁড়াই যাবি, বুকে ত্যাখন রাখবে ধরে।

মুকুলের বাঁকড়ী ভাষার ওপর কতখানি টান আছে তা সবসময় এই চন্দনা টের পায়।

মুকুলের ভাই ছোটনের জন্ম হয় যেদিন, সেদিন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় যিনি চিত্তরঞ্জন দাসের নাতি ও পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন, দাদুর বাড়ি এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী মায়া রায়কে সঙ্গে নিয়ে। ভাইটির নাম দেওয়া হয় সিদ্ধার্থ। এ প্রসঙ্গে দিদিমা অন্নপূর্ণা রায়ের কথাও এসে যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্মার্ট, সাহসী ও অতিথিবৎসল। তাঁর গ্রামের দাদা ছিলেন নজরুল ইসলাম। কবির স্ত্রী ছিলেন হিন্দু এবং দিদিমার বন্ধুস্থানীয়া। তাঁদের নিয়ে নানান গল্প করতে শুনেছেন সেই সময়কার বাচ্চারা। বাড়িতে নানান ধরনের এইসব লোকের আনাগোনা, আলোচনাসভা বাড়ির শিশুদেরও মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। মামাবাড়ির পরিবেশ পরোক্ষভাবে তাই মুকুলের শৈশবকে নানান রঙে রঞ্জিত করেছে।

(ক্রমশ)

সপ্তম অধ্যায়

“ঠাকুরদা ডঃ পূর্ণচন্দ্র বিশ্বাসের পরিবার”

এবার বাবাদের পরিবারের কথা স্মরণ করা যাক। বাবার বাবা ডঃ পূর্নচন্দ্রকে আমাদের চাক্ষুস দেখার সুযোগ হয়নি। তিনি ছিলেন সাঁকতোড়িয়াতে কোলিয়ারির হাসপাতালের ডাক্তার। খুব স্বাত্বিক মানুষ ছিলেন তিনি, সাধু সন্গ , জপ ,পুজা অর্চনা তে মগ্ন থাকতেন,  আমাদের ঠাকুমা মারা গিয়েছিলেন বহু আগে, বাবার তখন মাত্র আড়াই বছর বয়স। বড় জ্যাঠামশাইও ডাক্তার ছিলেন, হরিহর নামটি তাঁর সার্থক ছিল। তিনি হরি কীর্তনে মেতে উঠতেন, খোল কীর্তনের সঙ্গে। দ্শ জন দাদা, দিদি ছিল, সেই পরিবারে, সবাই মিলে এক সন্গে বসে, খাওযার খেতাম সবাই আমরা, মেজো জ্যেঠামশাই  মাইন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। চিনাকুড়ির রাধানগরে বিরাট এক বাংলো বাড়িতে অনেক বাগান সার্ভেন্ট কোয়াটার, চাকর বাকর, ৭জন পুত্র কন্যা নিয়ে বাস করতেন। তাঁর পাঁচ পুত্র -ই ছিলেন বুদ্ধিমান ও গান বাজনায় দক্ষ। দুই মেযে খুব ভালো  নর্তকী  ছিলেন, বড় জেঠ্যামশাইয়ের আট পুত্র, দুই কন্যা – বড় পরিবার। আমাদের সাধিকা বড় পিসিমা ঠাকুর ঘরে নানা নিয়ম নিষ্ঠা মেনে শুদ্ধাচারে জীবন কাটাতেন। প্রত্যেক গরমের ছুটিতে মা আমাদের সব ভাই বোনদের নিয়ে সাঁকতোড়িয়া, চিনাকুড়ি যেতেন। সেখানে যেন চাঁদের হাট বসে যেত। নানারকমের হাসি ঠাট্টা, নাচ-গান – সে এক আলাদা আনন্দময় পরিবেশ। বকুল, মুকুল, বনু ও খুকু অর্থাৎ বনদেবী, সুদেবী সবাই প্রায় একই বয়সের চার বালিকা। ভীষণ খুশি হত, একসঙ্গে শুয়ে গল্প করে সময় কাটত তাদের। নানাধরনের বিজ্ঞান বা সাহিত্যের আলোচনা, জোকস বা হাস্যকৌতুক তাদের মনের সহজ, সরস, সাবলীল বিকাশকে সুষম রূপ দিতে সাহায্য করত। মুকুলের শৈশবের প্রিয় জায়গা ছিল এই বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার দুটি। একের পর এক বড় দাদাদের দিদিদের বিয়ে পৈতের অনুষ্ঠান এসে পড়ল। বড়দি ছোড়দিরা শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেন, নতুন নতুন বৌদিরা আসতে লাগলেন। ৮ + ৫ + ৩ = ১৬ জন ভাইদের মাঝে আমরা চার বোন, একটা বিশেষ আদরের জায়গা করে নিলাম, পড়াশোনা ও নৃত্যকলায় বেশ পারদর্শী ছিলাম আমরা। বনু খুকু দিকে যিনি নাচ শেখাতে আসতেন তিনি খুব প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। নানাধরনের নাচের গবেষণা (experiment) করতেন। কখনও মনিপুরী নৃত্য কখনও বা হাতে বর্শা নিয়ে নাগা ডান্স। কখনও ভরতনাট্যম তো কখনও কত্থক। বাইরের প্রোগ্রামও করতো আমার ঐ দুই দিদি। মুকুল সাপের নাচ, সঙ্গে সাপুড়ের কাহিনী জুড়ে নতুন শৈলীতে নৃত্যনাট্য করে দেখাত সবাইকে। শৈশবের এই নাচগুলি তাকে এমনভাবে মুগ্ধ করে রাখত যে বাঁকুড়া ফিরে এসে স্বপ্নেও সে নাচ করত আপনমনে। পরবর্তীকালে চন্দনা যখন দিল্লীর হোলি চাইল্ড স্কুলে চাকরী পেয়েছে, তখন ছাত্রীদের সে ঐ স্মৃতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের প্রোগ্রাম করতে স্বার্থক হয়েছে। স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে নাগানৃত্য, কোলাটেম রূপায়ন করতে শৈশবের বনু খুকু দিদির নাচ মনে এসেছে,সেই সব তাল ও মুদ্রা শৈলী তাকে অনেকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। কোন বিশেষ নৃত্য শিক্ষা বা ট্রেনিং তার ছিল না, কিন্তু স্কুলে নাচের দিদিমনি হয়ে বেশ নাম কামিয়েছে এবং পরে বাড়িতেও ছোট ছোট মেয়েদের নাচ শিখিয়ে অর্থ উপার্জন করেছে সংসারের আয় বাড়াতে। নাচ তার passion, – আগ্রহ ও আনন্দ দুটো যখন মিলে মিশে এক হয়ে যায়, তখন সে যে কোন  বিদ্যা, কলা বা শিল্প হোক না কেন ,মানুষ তাতে অদ্ভুতভাবে পারদর্শিতা লাভ করে, কোন ট্রেনিং ছাড়াই।

এর আর একটি রূপায়ন তার ধনুচি নাচের মধ্যে। মুকুলের confidence পরে চন্দনাকে দুর্গা- পুজো বাড়িতে, যমুনায় মূর্ত্তি ভাসানোর সময়, মনের আনন্দে চারটে ধনুচি নিয়ে আপনমনে নাচ আরতি নৃত্য করতে সাহস জুগিয়েছে। নাচই তার পূজা, সাধনা ছিল।

“বাঁকুড়া রামকৃষ্ণ মিশন”

মুকুলের বাবা অনেকগুলি সেবা প্রতিষ্ঠানে শ্রমদান করতেন। সরকারী অনাথ আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম,, নিত্যানন্দ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশনে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি বৃদ্ধ শিশু নির্বিশেষে চিকিৎসা করতেন। সন্যাসী মহারাজদের সেবা তাঁর জীবনের আদর্শ ছিল। বাঁকুড়ার রামকৃষ্ণ মিশনটি খুবই পুরোনো। শ্রী শ্রী মা বেঁচে থাকতেই এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয় এবং নানাধরনের সেবামূলক কাজ আশ্রমের সাধুরা বাঁকুড়া বাসীর মন জয় করতেন। তখনকার একজন মহারাজকে বাবা ডাক্তার মহারাজ বলতেন, তাঁর নাম ছিল বৈকুন্ঠ মহারাজ, যিনি শ্রী শ্রী সারদা মায়ের দীক্ষিত ছিলেন, এবং মা একবার রাধুকে নিয়ে জয়রামবাটি থেকে বাঁকুড়া এসে মহারাজের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন, খুব সম্ভব ‘রাধু’র চিকিৎসার জন্য। রাধু যে কে, ‘মা’ তাঁকে কেন এত ভালোবাসতেন, সে সব কথা কিছুই তখনকার মুকুলের জানা ছিল না। কিন্তু একবার কাশি সর্দ্দি সারাবার জন্য তার কাছে মিষ্টি মিষ্টি হোমিওপ্যাথি গুলি খেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম – একথা বেশ মনে আছে। মহারাজ বলতেন তোর বাবা আমার শরীর সারায়, আয় আমি তোদের ঠিক করে দিই। সেখানে কখনও কখনও সন্ধ্যারতি শুনতাম। “খণ্ডনভব বন্ধন, জগ বন্দন বন্দি তোমায়” – আরাত্রিক ভজনের মানে বোঝার বয়স তখন মুকুলের হয়নি, কিন্তু এর সুর, তাল ও ব্রহ্মচারী, মহারাজদের চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে – গানটি গাইবার ভঙ্গি আমার শিশুমনকে মুগ্ধ করে দিত। আমরা দুই বোন তখন থেকেই শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও মা ও বিবেকানন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতার গল্প আমরা আমাদের পাঠ্য পুস্তকেই পেয়েছিলাম। একটি খুব সুন্দর বই একবার উপহার পেয়েছিলাম – “বাংলার মনিষী” একপাতায় তাঁদের ছবি ও অন্য পাতায় তাঁদের জীবনী গল্প কাহিনী লেখা থাকত। তখন থেকেই জীবনী গ্রন্থ পড়বার ইচ্ছে ও আগ্রহ আমার প্রবল হয়। ঠাকুরের ও মায়ের ছবি তো সব ক্যালেন্ডারেই থাকত তাঁদের বাণীও স্কুলে বা পথে ঘটে অনেক জায়গাতে লেখা থাকত। তাঁর কথা “যত মত তত পথ” কথাটি যেন মনের মন্দিরে বার বার শঙ্খ ধ্বনির মত গুঞ্জিত হত। ক্লাস V থেকে আমাদের দুই বোনকে কলকাতায় পড়তে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছিল ‘দুজনই’ বৃত্তি পেয়েছি। মাসে তিন টাকা (তখনকার দিনে অনেক টাকা) করে জলপানি আসে কলকাতার বিদ্যালয়ে আরও ভাল পড়াশুনো হয় বলে, সেখানে ভর্তির চেষ্টা চলছে। আমাদের শিশুমনে খুব ভয় সৃষ্টি হয়েছে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য। তখন একদিন বললেন, শ্রী শ্রী মায়ের বাণী সব সময় মনে রাখবে, তাহলে ‘কখনও কোথাও কোন সমস্যা হবে না।’ তাঁর সেই তিনটি উপদেশ মুকুলের জীবনকে সদা ধন্য করেছে। জ্ঞানে অজ্ঞানে শৈশব থেকেই সে এই মহান বাণীকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করছে।

যখন যেমন তখন তেমন,

যার সাথে যেমন তার সঙ্গে তেমন। 

অর্থাৎ যে “সময়ে” যে ভাবে চলা উচিৎ সেইভাবেই চলো। ছোটবেলায় ভাবতাম যখন শীতকাল তখন সেরকম পোষাক পরতে হবে, যখন গরমকাল তখন বার বার স্নান করতে হবে। মাষ্টারমশাই অজিতবাবু আরো পরিষ্কার ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করতেন – ‘Time ‘ অর্থাৎ সময় সবচেয়ে দামী, তাকে কখনও নষ্ট করো না। এখন তোমাদের পড়াশোনা করে জ্ঞান বাড়াবার সময়। খেলাধুলো করে শরীর স্বাস্থ্য খুব মজবুত করার কালে অন্য কাজে – বাজে কথায়, বড়দের ব্যাপারে নাক গলিয়ে “সময়”কে বইয়ে দিওনা। যখন তোমার কাছে কম পয়সা, কম খাবার বা বিলাস ব্যসনের আয়োজন মা বাবা করতে পারেননি, তখন ঐ অবস্থাকে মেনে নেওয়াই সময়ের তালে চলা। তিনি আরও বোঝাতেন শিশুর মনের উপযোগী উদাহরণ দিয়ে – ‘ধরো তোমার অসুখ করেছে, তখন কি তুমি মাছ-মাংস, রসগোল্লা খাবার জেদ করলে চলবে। তখন তোমাকে তেতো ওষুধ খেতে হবে।’ তাই যখন যেমন তখন তেমন অবস্থাকে মেনে নেওয়ার কথাই যে “মা” বোঝাতে চেয়েছেন, সে সমন্ধে আমাদের মনে একটা সুস্পষ্ট ধারণা এনে দিতে পারেন তিনি। এরপর “যেথায়” কথাটির ওপর জোর দেন শ্রীশ্রী মায়ের মতন আমার মা ও। কারন আমাদের বাঁকুড়ার বাড়ির আরাম, মা, বাবা ঝি চাকর – পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে হোস্টেলে গিয়ে থাকতে হবে। ঘড়ির কাঁটা ধরে, বিভিন্ন রুল, নিয়ম নীতি মেনে সুপার দিদিমণিদের কথা শুনে চলতে হবে। রান্না খাওয়ার ধরণ সময় বা স্বাদও ভিন্ন হবে। তাই যেখানে যাচ্ছি সেখানের মতন হয়ে যেতে পারলেই ভাল। নিজেদের খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা (adaptability) adjust করার শিক্ষা ঐ একটা লাইনের মধ্যেই পায় আমরা। জীবনে উন্নতি করতে গেলে ভাল স্কুলে ভাল রেজাল্ট করতে গেলে সেখানকার মতন হতে হবে। পরবর্তীকালে শশুড়বাড়িতেও সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের পরিবার – পরিবেশ পেলে মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়, না নিলেই সংসারে অশান্তি নেমে আসে। অত ছোট বয়সেই নানাধরনের প্রাকটিক্যাল বুদ্ধিতে পরিণত করার চেষ্টা চলতো আমাদের। কারন আমরা যে কন্যা সন্তান, পরের ঘরে যেতে হবে আমাদের। এরপর তিন নম্বরের সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশটির মানে বোঝবার চেষ্টা করতাম আমরা।

যার সঙ্গে যেমন তার সঙ্গে তেমন। যে শান্ত শিষ্ট ভাল মানুষ তার সঙ্গে বাস করতে মানুষের অসুবিধা হয় না, কিন্তু একটু অন্যরকম লোকের সঙ্গে থাকতে গেলে যদি তার মেজাজের মত না থাকা যায়, অন্যের মেজাজ বা মুড (mood, attitude) বুঝে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। একবার আমার ছোট পিসিমার কাছে জোর আপত্তি, প্রতিবাদ জানালাম আমি। “কেন সবসময় মেনে নেব অন্যের কথা? খারাপ ব্যবহার করলে কেন আড়ি করবো না ঐ দুষ্ট বন্ধুর সঙ্গে?” রাগী, বকুনি দেওয়া, সর্বদায় মাথায় চাটি, গায়ে টোকা মেরে, চিমটি কেটে কথা বলা মাস্টারমশাইয়ের কাছে কেন পড়া করব? যে আত্মীয়স্বজন বাড়ি এলেই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয় কেন মেনে নেব সহ্য করব তাদের?

আমার প্রশ্ন শুনে প্রথমে পিসিমা একটু যেন থমকে গেলেন। তারপর নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে সুন্দর করে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, confused বালিকাকে। বললেন, – “দেখ মা, আমি এক বাল্য বিধবা। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ৫ বছরের এক কন্যা ও দু মাসের পুত্র কোলে নিয়ে খবর পেয়েছি আমার তরুণ ডাক্তার স্বামী কোন এক কোলিয়ারির হাসপাতালে ডিউটি করতে গিয়ে মাথার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়ির লোকের সেবা না পেয়ে বা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। আমি তখন কি করতে পারি বল? সব শোক সম্বরণ করে দুটি অসহায় দুধের শিশু নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে সবাইকে মানিয়ে নিয়ে সকলের কথার বাধ্য হয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। যার অতবড় ছেলে এমনভাবে হটাৎ মারা গেল সে মাও তো কতবড় শোক দুঃখ সামলে আমাকে বুকে টেনে নিয়েছেন, তার সঙ্গে তার মনের মতন হয়ে তার বা সেই সময়কার সমাজের নিয়মনীতি মেনে, সাদা থান পরে নিরামিষী একবেলা খাবার খেয়ে আমাকে থাকতে হয়েছে। কিন্তু যদি আমি তখন তাদের সঙ্গে তাদের মতন হয়ে না থাকতাম, তাহলে কি ভাল হত? আমার মা নেই। ঐ বাড়িতে বড় দিদি বিধবা হয়ে ঠাকুরঘরে আশ্রয় নিয়েছেন, ভাইদের অনেকগুলি ছেলেমেয়ে – বড় সংসার, বাবা বৃদ্ধ হয়েছেন তাই বাপের বাড়ি গিয়েও সুবিধে ছিল না। দেখ – আমাদের একশ বছর আগে বিধবাদের সতী হবার জন্য স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হত। রাজা রামমোহন রায় এসে তা বন্ধ করলেন। তারপর গৌরীদানের নামে বাল্যবিবাহ দানে, অল্প বয়সী পাঁচ – সাত বছর বয়সের মেয়েকে কুলোয় বা কোলে বসিয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রথা ছিল। আমাদের দরদী মনিষী বিদ্যাসাগর আইন করিয়ে ইংরেজ সরকারের দ্বারা তাও বন্ধ করাতে সক্ষম হন। তোরা যখন বড় হবি তখন হয়ত বাঙালি – ভারতীয় স্বামী হারাদের জন্য এত কঠিন কঠিন নিয়মনীতিও আর থাকবে না। স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে সে দাঁড়াতে পারবে – যার সঙ্গে তার থাকতে ভাল না লাগবে তার থেকে দূরে সরে যেতে সে সামর্থ হবে। কিন্তু যার সঙ্গে যেমন তার সঙ্গে তেমন ভাবে না চললে ঘরে – সমাজে – পরিবারের শান্তি যে বিনষ্ট হবে। দেখো, পাগলা কুকুর দেখলে তুমি দূরে পালাবে না? যে গরুটা অনেক দুধ দেয়, তাকে সময়মতন যত্ন না করলে, ভাল খাবার না দিলে, সেকি তোমায় দুধ দেবে?”

শিশু মুকুলের মনে এই তিনটি বাণী এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে সে পরবর্তী জীবনে তার counterpart ‘চন্দনাকে’ ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। জীবনের নদী তার আপন গতিতে তাকে অনেকরকমভাবে ঘুরিয়েছে, নানানদিকে বয়ে নিয়ে গেছে, নানান মানুষের ভীড়ে ভাল খারাপ – আনন্দ মুখর বা সংঘাতময় সময়ের মধ্যে দিয়ে পার করে এনেছে “সত্তরের” কোঠায়। পৃথিবীর নানা শহরের নানান বিচিত্র মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। কখনও অভাব অনটনে – অসুখ বিসুখে চিন্তামগ্ন হয়ে সে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে গিয়ে নানারকম দুঃখপূর্ণ অভিজ্ঞতায় নিজের ঝুলি ভরেছে, কিন্তু ঘাবড়ে যায়নি। শ্রীশ্রী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সে কবিতা রচনা করতেও সফল হয়েছে।

স্থান, কাল আর পাত্র

যেথায় যেমন, সেথায় তেমন, যে দেশের যা আচার,

অনুকরণ করতে হবে তাদের ব্যবহার।

অন্যরকম খাওয়া দাওয়া, পোষাক পরিধান,

ভাষা ও চাল শিখতে হবে, অন্য সুরে গান।

যখন যেমন তখন তেমন, না হয় যেন ভুল,

সব বয়সে, অবস্থাতে, তুলব জ্ঞানের ফুল।

যে কালেতে যেমন ফসল, সব কাজে চাই পরিশ্রম,

কালের তালে চলতে হবে, করতে হবে সংযম।

যার সঙ্গে যার যেমনটি ভাব, তার সঙ্গে তেমনটি লাভ,

করলে পরেই মঙ্গল, সাধুর সঙ্গে তীর্থ যাত্রা, পশুর সঙ্গে জঙ্গল,

ভাল মানুষ সুবাস ছড়ায়, দয়া ক্ষমায় ভরা,

ডাকাত মাতাল তেমনটি নয়, পালাও দূরে ত্বরা।

শ্রীশ্রী মায়ের তিন উপদেশ নিলাম গেঁথে মালায় –

আনন্দেতে কাটছে যে কাল, সকাল সন্ধ্যে বেলায়।

বরফের দেশ মরু প্রদেশ, ছুটে ছুটে যায় তবু –

কোথাও গিয়ে অসুবিধায় পড়তে হয়নি কভু।

ধনী নির্ধন, সুখী দুঃখী জন ভাল খারাপের সঙ্গে,

তাদের মতই হয়ে থাকি যে রসে বশে ও রঙ্গে।

এ জীবনে যা সাফল্য সবই তাদের দান,

ঠাকুর ও মা’র আশীর্বাদে ভরল যে মন প্রাণ।

মুকুলের আরেকটি প্রিয় জায়গা ছিল “অনাথ আশ্রম”। সমবয়সী অসহায় শিশুগুলির বাবা মা নেই, কেমন করে তাদের দিন কাটে, কে যে তাদের আদর করে, কোথায় তারা অসুখ করলে একা একা শুয়ে কাঁদে। ভাবলেই তার দুঃখে – হৃদয় কাতর হয়ে যেত। ভাবতো কবে সে বড় হবে – এইসব অনাথদের জন্য আশ্রম খুলবে, বাবার মতন ডাক্তার হয়ে ওদের চিকিৎসা করবে, অনেক টফি মিষ্টি নিয়ে গিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু সব ইচ্ছে তো মানুষের পূরণ হয় না। তবে একথাও সত্যি প্রকৃত আন্তরিকতা থাকলে হয়ত কিছু ইচ্ছে পূরণের উপায়ও করে দেন আমাদের আরাধ্য দেবতা। অনেক পরে সংসারের দায়-দায়িত্ত্ব মোটামুটি ভাবে সম্পন্ন করে ছেলেদের বিদেশ যাত্রায় উচ্চ শিক্ষার্থের জন্য পাঠিয়ে চন্দনা যখন বসে আছে তখন ‘আনন্দবাজার পত্রিকায়’ এক অনাথ আশ্রমের খবর পায়, শেষ জীবনের মুকুলের ইচ্ছা মত যুক্ত করে নিজেকে সেখানকার শিশুদের সঙ্গে। সেই “অন্ত্যদ্বয় অনাথ আশ্রমের” কথা পরে আবার আলোচনা করা যাবে।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উৎসব পালন করা হয় উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে। তখনকার অত্যন্ত সুদক্ষ জেলা শাসক আয়েঙ্গার সাহেব তার ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠিতে খুব সুন্দর একটি স্টেজ করেন। সেখানে বেশ একসপ্তাহ ধরে চলে নানান অনুষ্ঠান। আমরাও তাতে অংশগ্রহন করি এবং রবীন্দ্রনাথকে সেই ছোট বয়স থেকেই চেনবার, জানবার ও বোঝবার চেষ্টা করতে প্রবৃত্ত হই। ১৯৬২তে মুকুল ক্লাস সিক্স এ ভর্তি হয় কলকাতার বেথুন স্কুলে। নতুন জীবন, নতুন অধ্যায় শুরু হয় সেই ছোট্ট বালিকার। বাঁকুড়া ছিল যেন এক দীঘির শান্ত জল আর কলকাতার স্কুল এক বিশাল নদীর মতন। এক এক ক্লাসের বহু সেকশন, বহু ছাত্রী শিক্ষিকা, চারিদিকে বড় বড় দেবদারু গাছ। মস্তবড় পুরোনো দালানবাড়িতে, বিশাল চাতালের পাশে পাশে আমাদের শ্রেণী কক্ষ। বড় বড় থাম্বা সাদা সাদা পায়রা ও লক্ষী পেঁচার বাস সেখানে। অন্য দিকে সায়েন্স বিল্ডিং, উপরে সারি সারি ল্যাবরেটরি। অন্যদিকে একটি গানের ক্লাস। রেনু দিদিমনির কাছে লাইন করে একের পর এক ক্লাস পৌঁছে যায় গানের পিরিয়ডে। কুঁয়োর ব্যাঙ যেন সাগরে এসে পড়েছে। দিশাহারা বা বলা যায় আনন্দে আত্মহারা মুকুল এক অন্য জগতে এসে অবাক বিস্ময়ে সবার সঙ্গে সবরকম ভাবে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করতে থাকে। হোস্টেল জীবন সম্পূর্ণ অন্যরকম।

(ক্রমশ)

অষ্টম অধ্যায়

“বেথুন কলেজিয়েট স্কুল”

John Elliot Drink Water Bethune জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮০১ সালে এবং জীবিত ছিলেন ১৮৫১ পর্যন্ত। তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁহার লেখা History of Seige of Gibraltor বইটি বিখ্যাত ছিল। বেথুন সাহেব বাবার মতন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথমে তিনি ব্যারিস্টার হন Law member হয়ে পার্লামেন্টে যোগ দেন। তিনি প্রথমে Westminster School, Wrangler, CambridgeTrinity School এ পড়াশুনো করেন। বিভিন্ন ভাষা লেখার প্রতি তাঁর অধীর আগ্রহের জন্য তিনি গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মানি এবং ইটালিয়ান ভাষায় বিশেষ ব্যৎপুত্তি লাভ করেন। তিনি একজন কবিও ছিলেন। পরে তাঁকে Law Member of Indian Governor General এর কাউন্সিলর হয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। পরে Education officer হয়ে তিনি তৎকালীন স্কুলগুলি পরিদর্শন করতে যান। কলকাতার কাছে বারাসাত নামে জায়গাতে পিয়ারী চরণ সরকার ও কালী কৃষ্ণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত Girls School (১৮৪৭) টি পরিদর্শন করতে গিয়ে বেথুন কলকাতায় এই ধরনের একটি secular বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে উদ্যোগী হন। যাঁরা তাঁকে এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তাঁরা হলেন – ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদন মোহন তর্কালঙ্কার, রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণাচরণ মুখার্জী প্রমুখ সমাজ সেবক। বেথুন ছিলেন, President of Education, ১৮৪৯ সালে এই স্কুল স্থাপনা হয়। নিজের স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি সরকারি মাইনে সব তিনি লাগিয়ে দেন এই বিদ্যালয়ের পিছনে বাংলার কন্যা রত্নকে ধন্য করে। ১৮৫৬ সালে এটি সরকার গ্রহণ করেন। এর আগে যে সমস্ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হত, সবই Church এর অধীনে মিশনারী দ্বারা পরিচালিত ছিল। সে ইতিহাস এর কথাও কিছুটা আলোচনা করা যাক। নর্থ কলকাতার ‘গৌরীবাড়ি’ তে ১৮১৯ অর্থাৎ বেথুন সাহেবের ও ৩০ বছর আগে একটি মেয়েদের স্কুলও স্থাপন করেন Calcutta Baptist Mission Society ১৮২০ সালে Mrs. Gogerly মেয়েদের স্কুলে Reading, Writing, Geography and Needlework শেখাতেন। এখানে Lower Cast Hindu বা Converted Christan মেয়েরা পড়তেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাঙ্গালীদের স্কুল স্থাপনের আগে প্রথমে মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন করেন – মহারাষ্ট্রের পুনের Bhinde Wade জায়গাতে। গোবিন্দ রাও ফুলে ও তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী ফুলের দ্বারা এই স্কুলটি স্থাপিত হয়।

বেথুন সাহেব Calcutta Public Library তে Translation Activity-র সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজেদের ভাষায় শিক্ষা দেওয়ানো তে জোর দেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৪৯ সালে ইংরেজিতে প্রথম কাব্যগ্রন্থ Captive Lady প্রকাশ করেন। বেথুন সাহেব তাঁকে বাংলাতে নিজের মাতৃ ভাষায় লিখতে নিজের প্রতিভার বিকাশে উদ্বুদ্ধ হতে অনুরোধ করেন। মাইকেল তাতে সাফল্যও লাভ করেন। ‘বিদ্যাসাগরের বিশিষ্ট বন্ধু এই বেথুন সাহেবের জন্য বঙ্গ ললনা আজ ধর্ম নিরেপেক্ষ স্বাধীন চিন্তা ধারায় জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে নিজেদের জীবনকে উন্নত করার – বিকশিত করার – সার্থক করার সুযোগ পেয়েছে। পরে, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দের বা তৎকালীন সব নাম করা প্রসিদ্ধ পরিবারের কন্যাগন এখানে পড়বার সুযোগ লাভ করে ধন্য হন। ১৮৮৮ সালে ১৩৩ জন মেয়েদের মধ্যে ৮৭ জন ব্রাহ্ম, ৪৪ জন হিন্দু ও ৫ জন খ্রিষ্টান ধর্মের মেয়ে পড়ত। এরপর কলকাতায় ভিক্টোরিয়া ১৮৮৬ সালে এবং ১৮৯০ সালে ব্রহ্মসমাজের ব্রাহ্ম স্কুল ও Christ Church স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় – তখন দেখা যায় ১৮৯৪ তে ১৩৮ জন মেয়ের মধ্যে – ৭০ জন হিন্দু, ৩৩ জন ব্রাহ্ম ও ১৩ জন খ্রিষ্টান মেয়ে পড়ত বেথুন স্কুলে।সেই সময় ছাত্রীরা দেশের ও দশের কাছে যথেষ্ট নাম কামাতে সক্ষম হন।

বেথুন স্কুলের হলে বেথুন সাহেবের একটি সুন্দর স্ট্যাচু এবং সেই সময়কার পুরোনো ছাত্রীদের অনেক তৈল চিত্র অঙ্কিত ও টাঙানো আছে। ৭ই মে বেথুন দিবস (ফাউন্ডার ডে) এবং ১২ই অগাস্ট বেথুন সাহেবের মৃত্যু দিন – দুটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। এই স্কুলে ভর্তি হতে পেরে, মুকুল নিজেকে ধন্য মনে করে। কিন্তু এখানে এসেই সে শুধু মুকুল নামটি তার হারিয়ে ফেলে, সবাইকার কাছে “চন্দনা গুপ্ত” নামে পরিচিত হয়। ছোট্ট শহর থেকে এসে প্রথমে সে হতচকিত হয়ে যায়, বাঁকুড়ায় সে “শেয়াল রাজার” মতন ছিল। সব কিছুতেই প্রথম হত অনেক প্রাইজ পেত। দুবার অলরাউন্ডার বেস্ট গার্ল এর প্রাইজ ও জিতেছে, কিন্তু এখানে তার চেয়ে অনেক অনেক পড়াশুনোয়, নাচে-গানে, নাটকে, খেলা-ধুলোয় ভালো মেয়ে আছে। চন্দনার কথাতে এখনও গ্রাম্য টান। হোস্টেলে একা একা টেবিলের এক কোনে বসে অন্য মেয়েদের সঙ্গে পড়া অর্থিত হোম ওয়ার্ক করতে হয় তাকে। মাষ্টারমশাই নেই, দাদা-দিদি নেই, বুড়ি, আরতি, প্রতিমার মতন বন্ধুরা তখন অত ক্লোজ হয়নি, ওরা মুকুলের কত আন্তরিক ছিল, একটা তেঁতুল কুড়িয়ে পেলেও মুকুলের জন্য একটুকরো নিয়ে আসত। এখানে গাড়ি, বাড়ি, ভাল রেজাল্টের, কে কত বেশি নাম্বার পেল তার গল্প করে – আমি কাউকে জানতেও দিই নি যে আমের দাদু মন্ত্রী – আমার বাবাও নাম করা ডাক্তার, সারা শহর তাঁকে দেবতা মানে। আমার মাও খুব বড় গায়িকা, ম্যাট্রিকে, খ্রিস্টান কলেজের খুব প্রতিভাময়ী ছাত্রী ছিলেন, ঝর ঝর করে ইংরেজিও বলতে পারেন। এখানে চন্দনা যেন নিজেকে গুটিয়ে নিল প্রথম বছরটাতে। পরে আসতে আসতে এখানকার জীবনযাত্রা ভাল লাগত তার। বাড়িতে সব অন্যেরা করে দেয়। এখানে নিজের কাপড় নিজেদের কাঁচতে হয় – বাইরে মেলবার সময় হোস্টেল ওয়াডের্ন মাসিমা সেগুলি যদি ময়লা দেখেন তো সকলের সামনে বকুনি খেতে হয়। ভোর বেলায় ঘন্টা বাজলে উঠে নিজের বিছানা না তুলে প্রার্থনা সভায় গেলেও শাস্তি পেতে হবে। সব কিছু ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পা ফেলে চলার অভ্যেস করতে করতে নিজের উপর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল, ছোট মেয়েটির। ভাত খেতে বসে থালায় কিছু পরে থাকলে শুনতে হয় – ও বড় লোকের ঘরের দুলালী, মা ঠিক করে খেতেও শেখায়নি। তখন নিজের জন্য নয় মাকে কথা বলেছে বলে চন্দনার খুব রাগ হয় – কান্না পায়। নিজের সব কাজ খুব তাড়াতাড়ি এবং ভালভাবে করার অভ্যেস হয়ে যায়, তার আস্তে আস্তে। একেই বলা হয় ‘স্বাবলম্বী’। স্বাবলম্বনের উপর রচনা লিখতে গিয়ে এইটা সে আরো ভালভাবে অনুভব করেছে। একদিন মাসিমার জ্বর শরীর খারাপ, খাওয়ার টেবিলে তদারক করতে আসেননি। সব মেয়েরা খেয়েদেয়ে চলে গেল। রবিবারের দিন, লাইব্রেরি, সেলাই ক্লাস, গানের চর্চা – সবাই যে যার অবসর বিনোদনে চলে গেল। চন্দনাকে মুকুল কিন্তু কানে কানে কি যেন মন্ত্র দিল। সে গুটি গুটি পায়ে চলল মাসিমার ঘরের দিকে। তার মাথায় জল পট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, রান্না ঘরের মাসিদের কাছ থেকে দুধ সাবু এনে তাঁকে খেতে দেওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সুপার দিদি সেদিন ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন। বিকেলে এসে চন্দনার ব্যবহারে ভীষণ খুশি হলেন। পরে রাত্রে খাওয়ার টেবিলে সব মেয়েদের সামনে তাকে প্রশংসাও করে ফেললেন তিনি। ব্যাস আর যাবে কোথায়। সবাই চন্দনার পিছনে লাগা শুরু করে দিল। কেউ বলে, “মাসিমাকে মস্কা দিচ্ছিস?” কেউ বলে ব্যঙ্গ করে – “কি করে – তোকে দেখলে তো মনে হয় ভিজে বেড়াল, কিছুই বুঝিস না”। আর এক দিদি তার সঙ্গে যোগ দিলেন যেন চন্দনা কত দোষ করেছে। 

 “হ্যাঁ, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না যেন”, ভেতরে ভেতরে কত চালাক দেখ, মাসিমার আদর কাড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চন্দনা ঝগড়া করাটা একেবারেই পছন্দ করে না। অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। এইসময় গোপাদি যার মধ্যে একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল, কাছে এসে দাঁড়ালো, তার পাশে। বলল, “ওর পেছনে কেন লেগেছ তোমরা। আমাদেরও তো এটাই করা উচিত ছিল, মাসিমা আমাদের মায়ের মতন কত যত্ন করেন, উনিও তো নিজের বাড়ি-ঘর, ছেলে মেয়েদের ছেড়ে আমাদের কাছে এসে আছেন, আমরা তাঁর জ্বর হয়েছে শুনে চুপ করে নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেছি। আর এই বাচ্চা মেয়েটা গেছে ওনার কাছে, আমাদের সবার কর্ত্তব্য পালন করেছে, আর তোরা এসব কি বলছিস?” এবার আমার চোখে জল এসে গেল। গোপাদি আমার হাত ধরে লাইব্রেরীতে নিয়ে গেল এবং একটা হাসির বই পড়তে দিল।

হোস্টেলের মেয়েদের মাঝে মাঝে ছুটির দিনে স্কুলবাসে করে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত, প্রথমবার, তারা গেল কলকাতার “পরেশনাথের” মন্দির। মাড়োয়ারী জৈনদের ধর্ম গুরু যে আলাদা তাঁদের মন্দির – উপাসনা গৃহটি এত সুন্দর তারা মাছ – মাংস – ডিম খান না, তাই পুকুরে নানা রঙের মাছ পালন করে রেখেছেন তাঁরা। চন্দনার মন আনন্দে ভরে গেল। এরপরে তাদের নিয়ে যাওয়া হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। বড় সুন্দর সেই শ্বেত পাথরের সুন্দর প্রাসাদ ইংরেজদের নিদর্শন ছেড়ে গেছেন। চন্দনা অবাক বিস্ময়ে দেখতে থেকে সেগুলি। তারপর সেই বিখ্যাত জাদুঘর – মিউজিয়াম, কত বড় বড় জন্তুদের কঙ্কাল, কত পুরোনোদিনের নমুনা, জ্ঞানের ভান্ডার। চন্দনা ভাবে এতদিন সে তো সত্যি কুঁয়োর ব্যাঙ হয়ে পড়েছিল, এ জগতে কতকিছু জানার ও শেখার আছে। ছ্য় ক্লাশের 

 (VI B) এর ক্লাস টিচার তখন ছিলেন সুমতি দি। খুব ভালবাসতেন ছাত্রীদের। যোগমায়া দিদি ইতিহাস পড়াতেন গল্পের মতন করে, খুব ভাল লাগত তার। একদিন একটু দেরী হয়ে গেল তার ক্লাসে আসতে, ছুটতে ছুটতে এসে নিজের চেয়ারে বসে হাপাঁচ্ছেন তিনি, একটি মেয়ে বলল, “দিদি আপনি রিকশা করেন না কেন ! রোজ আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসেন।” দিদি উত্তর দিলেন, “ওই গরিব লোকগুলোর ঘাড়ে চড়ে আমার কখনও ভাল লাগে না রে। ওরা হাতে টেনে কত কষ্ট করে সব মানুষদের ভার বয়ে নিয়ে যায়।” চন্দনা কলকাতায় এই হাতে টানা রিক্সাওয়ালাদের দেখেছে, একবার হাতি বাগান থেকে ওতে চেপে হোস্টেলেও এসেছে, কিন্তু আজ যেন তার চোখ খুলে গেল, তার দরদী মন বলে উঠলো – ঠিক তো একজন মানুষের কাঁধে চড়ে আরেকজন মানুষ কেন যাবে। আর কোনদিন ওই ধরনের রিক্সাতে চড়বে না সে।

(ক্রমশ)

নবম অধ্যায়

“বেলুড় মঠের প্রভাব”

এরপরে তার দর্শনীয় স্থান হল “বেলুড় মঠ”। ১৯৬৩ সাল, বিবেকানন্দের শতবার্ষিকীতে – কয়েকদিন আগেই চন্দনা নিবেদিতা স্কুলে গিয়ে – “হে ভারত ভুলিয়ো না দরিদ্র ভারতবাসী তোমার ভাই . . . .”, বক্তৃতাটি মুখুস্থ করে অন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় ভাগ নিতে গিয়েছিল। সেখানে সে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। হোস্টেলের লাইব্রেরীতে নরেন্দ্রনাথ – বিলের বিবিষানন্দ থেকে বিবেকানন্দ হবার গল্পও পড়েছে, – মন প্রাণ তার তেজস্বী বাণী ও তেজময় জীবনীর প্রতি আকৃষ্ট। সপ্তম শ্রেণীর কিশোরীর মনে তখন অদ্ভুত একটা আবেগ – ভালোবাসা শ্রদ্ধা জেগেছে তাঁর প্রতি। তাঁর প্রিয় শিষ্যা মার্গারেট নোবেল – নিবেদিতার – আদর্শে চন্দনা তখন অনুপ্রাণিত। সেও চাই তার মতন সন্ন্যাসিনী জীবন যাপন করতে। শ্রীশ্রী মা ও ঠাকুর রামকৃষ্ণ – যারা বাঙালির জীবনের পথ প্রদর্শক – গুরু – তাদের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ প্রচারক – ভাবধারার বাহক, সংঘ স্থাপক রামকৃষ্ণ মিশন সেবা ব্রতের পরিচালক – বিবেকানন্দ, – এক কথাই সকলের প্রিয় ‘স্বামীজী’ ছিল ত্রয়োদর্শী চন্দনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তাই বেলুড়ে বিবেকানন্দের গৃহ, বিশেষতঃ সমাধি স্থান যেখানে তাঁকে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ বিদায় জানিয়ে দাহ করেছে – সেখানে গিয়ে সে ভীষণ ভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সেখানকার মাটি মাথায় ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলল কিশোরী চন্দনা। বন্ধুরা গঙ্গার ধরে গোল হয়ে বসে বাদাম ভাজা খাচ্ছে। যুথিকা দি তখনকার সুপারিন্টেন্ডেন্ট দিদি সবাইকে বলছেন, – ‘কেউ বাদামের খোসা ঘাসে ফেলবে না এই বড় থলিতে ভর’ – চন্দনা কিন্তু সে সব কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। শুধু কানে বাজছে একটি বাণী, –

“বহু রূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুজিছো ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেই জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর”।

কবিতাটি কোন কবিতা থেকে গৃহীত তা তখন সে জানতো না, পরে যখন বিবেকানন্দ গ্রন্থাবলী কিনে, রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ গ্রন্থাবলীর পাশে সাজিয়ে রাখা হয় তখন তার আরও অনেক সুন্দর সুন্দর কবিতা স্তোত্র পড়তে গিয়ে “সখার প্রতি” কবিতাটি খুঁজে পায় সে। এবং ওই পদ্যটির শেষ দুটি লাইন হলো এই বিখ্যাত উক্তিটি। চন্দনার মনে হত যদি তিনি সন্ন্যাসী হতেন তাহলে হয়তো কাব্য – গদ্য – পুরান – উপনিষদ – বেদ বা গীতার ভাষ্যকার রূপে তিনি বাংলা সাহিত্যে তার বিশেষ স্থান করে নিতেন। চলতি ভাষায় লেখা তার চিঠি পত্রগুলি এত সুন্দর যে পরিণত বয়সে বারবার করে পড়ে মুকুল তথা – প্রৌঢ়া – বৃদ্ধা চন্দনা বিশেষ আনন্দ পেয়েছে। সেদিন কিশোরী চন্দনা কে বেলুড়ের মন্দিরে ক্রন্দনরত দেখে বন্ধুরা অবাক হয়ে যায়। হয়ত তার বাড়ির জন্য মন কেমন করছে – এইভেবে তাকে তারা স্বান্তনা দেয়, – “কাঁদছিস কেন? কয়েকদিন পরেই তো গরমের ছুটি হবে, বাড়ি যাবি, মন খারাপ করিস না।” – কিশোরী বালিকা সেদিন কাউকে বোঝাতে পারেনি বা চাইনি যে সে কেন কাঁদছে। কিন্তু তার জীবনের মধ্যে এক নতুন ভাব ভক্তি রসে সিক্ত উপলব্ধি – একটা বোধ মনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল – এ কথা আজ সে অনুভব করতে পারে। প্রত্যেক মানুষ ছোট থেকেই তার জীবনে কিছু কিছু জিনিষ জমাতে চায়। কেউ ধন, কেউ সম্পদ, কেউ বিদ্যা বা জ্ঞান ধীরে ধীরে সংগ্রহ করে শেষ জীবনে এসে দেখে যে সে কতটা সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছে। আবার কিছু কিছু মানুষ তার Emotional Capital collect করে – সেখানে হয়তো শৈল্পিক সত্তা, কবিত্ব প্রতিভা, অঙ্কন কলা, সঙ্গীত – সুর সৃজনের ক্ষমতা অথবা একটা spiritual অনুভূতির বীজ বপন হয় কোন এক বিশেষ ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, আর সেই আবেগ প্রবাহ তাকে চালনা করে – এগিয়ে নিয়ে যায় – জীবনের আসল মানে খুঁজে দেয়। শেষ অধ্যায়ের যাত্রা তখন তার সুখময়, শান্তিময় আনন্দপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রামকৃষ্ণ মিশনের বাঁকুড়ার মাটিকে ধন্য করে দেওয়া জয়রামবাটির নাম, মা, ঠাকুর ও স্বামীজীর প্রভাব চন্দনাকে শুদ্ধ করেছিল, চন্দনার সেদিনের আনন্দাশ্রু তার প্রমান। পরে, এই ভাবধারায় সে দীক্ষা লাভ করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট (২০১৮/১৯) শ্রীমদ স্বামী স্মরণানন্দজীর কাছে সংসার ধর্ম পালন করেও তাই সে বারেবারে ছুটে যায় ঐ শ্রেষ্ঠ তীর্থ বেলুড়ে। সেখান থেকে তার প্রিয় জায়গা জয়রামবাটি, কামারপুকুর, ভুবনেশ্বরের তপোবন বা অখণ্ডানন্দ প্রতিষ্ঠিত ‘সারগাছিতে’ যেখানে মিশনের প্রথম সেবামূলক কাজ শুরু হয় বিবেকানন্দের অর্থানুকূল্যে। ছুটে যায় চন্ডিপুরে, কাঁথির রামকৃষ্ণ মিশনে।

বিদেশে বক্তৃতা দিয়ে হিন্দুধর্ম ভারতীয় Tradition ও Spirituality নিয়ে ভাষণ দিয়ে তিনি যে সমস্ত টাকা পয়সা রোজগার করে ঐসব আশ্রমে সেবামূলক কাজে তা সবই লাগাতেন স্বামী বিজ্ঞানানন্দের তত্ত্বাবধানে এই বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীশ্রী মায়ের নামে ঐ জমিটিতে ভূমি পূজন হয়। মাঝে একবার প্লেগ রোগের চিকিৎসায় ওষুধ পথ্য কেনার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ এই জায়গাটি বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভাবেন কেননা তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, মানুষের দুঃখ দেখলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কিন্তু শ্রীশ্রী মা তা হতে দেননি। তিনি চাইতেন ঠাকুরের নামে একটা সংঘ হোক যেখানে তাঁর সন্ন্যাসী সন্তানেরা একসঙ্গে থাকতে পারবে, জপ ধ্যান জ্ঞানের আলোচনা করে জীবন কাটাবে। বেলুড় মঠটির ভবনের মধ্যে ঠাকুরের সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের ভাবধারাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে – মন্দির মসজিদ গুরুদ্বারা, গির্জার আদলে মন্দির গৃহকে বানানোর মধ্যে। বেলুড়ের মন্দিরে বসে নিজের মনে যে স্বপ্ন চন্দনা দেখে সেটি হয়ত তার পূরণ হয়নি নার্স – ডাক্তার – সন্ন্যাসী হয়ে মানুষের সেবা সে বড় হয়ে করবার সুযোগ পায়নি, জীবনের নদী তাকে অন্যখাতে অন্য পথে বহে নিয়ে যেতে বাধ্য করে কিন্তু হৃদয় থেকে ঐ ভাবধারার Emotional Capital অমূল্য সম্পদকে সে কোন ভাবেই হারিয়ে যেতে দেয়নি। তার মধ্যে অঙ্কুরিত হওয়া নতুন বীজটি সে সযতনে রক্ষা করতে পেরেছে। এজন্য “বেলুড় মঠের” কাছে সে চির কৃতজ্ঞ।

অষ্টম শ্রেণীতে নানারকম activity তে ভাগ নিয়ে স্কুলে শিক্ষিকা প্রধান অধ্যাপিকা অনিমা হালদার, প্রতিভা দি, প্রীতি দি, বাণী দি, রেবেকা দি, টুটুল দি, রমাদি সকলের প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠে সে। হোস্টেলের মেয়েদের নিয়ে নানা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে। বেথুন সাহেবের মৃত্যুদিন ১২ই আগস্টে বিরাট বিরাট মালা গেঁথে তারা পার্ক সার্কাসে কবরে গিয়ে গান গাইতে যেত –

“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো

সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো, ধরায় আসো।”

৭ই মে ছিল ফাউন্ডেশন ডে। সেদিনও স্কুলে নানান অনুষ্ঠান হত। বেথুনের স্কুলের পোশাক ছিল ক্লাস VIII পর্যন্ত সাদা জামা, লাল বেল্ট, লাল ফিতে, সাদা মোজা। আর ক্লাস IX থেকে সাদা লাল পাড় শাড়ি। যেদিন চন্দনা প্রথম নবম শ্রেণীতে উঠল, তার সে কি আনন্দ। সাদা ব্লাউজ, সাদা শাড়ি, কালো জুতো পরে প্রথম যেদিন স্কুলে গেল রত্না, পান্না, রিনা, রিতা, শিপ্রাদের সঙ্গে সেদিন তার মনে হল, অনেক বড় হয়ে গেছে সে। প্রথম ক্লাস IX, X ও XI এই তিন বছরের জন্য আলাদা স্ট্রিম অর্থাৎ বিভাগ করা ছিল। চন্দনা ভর্তি হল বিজ্ঞান শাখায়। Physics, Chemistry, Biology ও অঙ্ক নিয়ে পড়তে আরম্ভ করল সে। ভীষণ উৎসাহ সব বিষয়েই আগ্রহী, অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্রী। বেথুন স্কুলে বাঁকুড়ার মতন কখনও প্রথম স্থান অধিকার করতে পারতো না সে, এজন্য একটু দুঃখ থাকলেও প্রথম দশজনের মধ্যে সবসময়েই তার স্থান থাকত। সর্বদা বই পোকা হয়ে বসে থাকতে ভালোবাসতোনা সে, স্কুলের সব কাজেই সরস্বতী পুজো, স্পোর্ট, বেথুন ডে বা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আয়োজনে, স্কুলের চৌকিদার, জমাদার, পিওনদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ায় সাহায্য করায়, স্কুল এক্সিবিশন, টিচার্স ডে বা চিলড্রেন ডে প্রোগ্রামে দিদিমণিদের ও উৎসাহী বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করতে সবসময়েই ব্যস্ত থাকতো সে। বিশেষ করে ১৫ই অগাস্ট, ২৬শে জানুয়ারী ইত্যাদিতে তাকে ভীষণ ছুটে ছুটে কাজ করতে দেখতো সবাই। ম্যাগাজিনে কবিতা বেরোতো তার প্রত্যেকবার। ছোট কবি নামও পেয়েছে স্কুলে।

(ক্রমশ)

“বুদু-মামা” (Budhu Mama)

চন্দনা সেনগুপ্ত

স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের
প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

ছোটবেলায় চিনাকুড়ির বাড়ীতে
বসতো চাঁদের হাট ।
সেই আনন্দমেলায় মেজ জ্যাঠামশাই
দিতেন মোদের মূল্যবোধের পাঠ ।
মেজ জ্যেঠিমার সারল্যে মাখা -
ছিল সেথায় বাগান ঘেরা -
অপূর্ব এক বাট ।
সেই খানেতে আসতে যেতে -
দেখেছিলেম তাঁরে -
গভীর বোদ্ধা জ্ঞানের ভারে, অবনত -
বিনয়ী এক ঋষি ।
নেই কোন তাঁর অহংকার -
নকল বাবুর ঠাঁট ।।
 
জ্যেঠিমারই ভাই যে তিনি,
মোদের বুদু মামা, -
বিষ্ণুপুরের শিক্ষক এক -
গবেষক খ্যাতনামা ।
শিশুসুলভ মুখে তাঁহার -
সদাই থাকতো হাসি,
প্রাচীন গ্রন্থ পেলেই যেন,
আনন্দেতে ভাসি, -
মোহিত হয়ে টেরাকোটা মন্দিরেরই কথা, -
বলতে বলতে ভুলে যেতেন,
নিজের দুঃখ ব্যাথা ।
খুঁজে বেড়ান, পুরাণ পুঁথি, -
ছোটেন হেথা - হোথা, -
দিন রাত্তির সে সব তথ্যে -
ঘামিয়ে যেতেন মাথা।।
 
পঞ্চাশটি বছর পরে আবার গেলাম বিষ্ণুপুরে -
তাঁর দর্শন পেলাম আমি, -
পুস্তকেতে ঠাসা ঘরে ।
মামা মামীর যুগল মূর্ত্তি, দেখতে পেলাম -
খাটের পরে ।
মনে হল, জীবন্ত দুই দেব দেবীর রূপ ধরে
বসে আছেন, দুইটি শিশু
শান্তি সুখে হৃদয় ভরে ।
এমন মানুষ বিরল অতি -
এই জগতে একেবারে ।
হৃদয় সেদিন ধন্য হল, যুগল মূর্ত্তি
প্রণাম করে ।।
 
"মল্লভূমের" চিত্তজয়ী চিত্ত করেন রঞ্জন,
তাঁহার মতন "স্থিতপ্রজ্ঞ" ব্যক্তি
আজি মেলে ক'জন?
সবার প্রতি স্নেহের সুধা নিত্য করিয়া বর্ষণ
মুগ্ধ করে রেখেছিলেন -
আছেন যত প্রিয়জন ।
রত্ন-তুল্য-সন্তান তাঁর, "বাপ্পা"
প্রবাসে, - করে ক্রন্দন, -
সমবেদনার পুষ্প পাঠায় -
শোকাচ্ছন্ন সব পরিজন ।
গৃহলক্ষ্মী বড় মামীমার
হারিয়ে গেল যে নারায়ণ, -
স্বামীর স্মৃতি - শোনায় গীতি -
'আত্মা অমর নেই তো মরণ' ।
নশ্বর এই দেহ ছাড়ি - অন্যলোকে বিচরণ,
পঁচানব্বই পরে তিনি -
পেলেন ঈশ্বর দর্শন ।।

শ্রদ্ধাঞ্জলি (Shroddhanjali)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"মুখার্জী দা" কোন নাম নয় ।
কোনো ব্যক্তির নিছক উপাধি -
যদি হয়,
তাহলে আমাদের মনে সূর্যের মতন উদয়,
এক অত্যন্ত খাঁটি,
স্নেহশীল মানুষের মুখ,
প্রকৃত দয়াবান, দায়িত্ব সম্পন্ন -
দরদী সেই উদার মানুষের পাই
অপূর্ব পরিচয় ।
বন্ধু - স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী,
বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শিশু ও যুবক -
তরুণ তরুণী কিশোরী -
পুরুষ কি নারী, - সবাইকে
আপন করে নিয়ে, এক করে দিয়ে -
অসীম কৌশলে যিনি
করেছেন, সকলের মন জয় ।।
 
সেই ডি পি মুখার্জী দাদা কে -
প্রথম দেখি ঈশ্বর সুব্রত সেনের বাড়িতে ।
আমাদের 'মা' ভিলায় ।
স্মিত হাস্যে, অবলীলায়,
একেবারে ছোট বোনের মতন
নিজের করে নিতে -
ত্রিশ বছর আগে,
এখনও জ্বল জ্বল করছে সেই দিনটি
আমার স্মৃতিতে ।
মোহর ও পলা, -
তাঁর দুই কন্যা, মন মাতিয়ে দিয়েছিল, -
সারা ঘরের আবহাওয়া বদলে দিয়ে -
তাদের অপূর্ব কণ্ঠের
রবীন্দ্র সংগীতে ।
মৃদু মৃদু হাস্যে - অনাড়ম্বর আন্তরিক -
ভাষ্যে, তাঁর স্ত্রী অলোকা দিদিভাইকে
শুনেছিলাম কথা বলতে ।
চশমার আড়ালে তাঁদের দুজনেরই উজ্জ্বল দৃষ্টি
দেখেছি, সারল্যে ঝলমল ও স্নেহে টলমল করতে ।
পুরো পরিবারটিকেই এক মুহূর্তে -
বড় ভালো লেগে গিয়েছিল ।
বাঁকুড়া নিবাসী এই 'চন্দনা' সেদিন
বাড়ি ফিরেছিল, আবেগে আপ্লুত হয়ে -
তাঁদের কথা ভাবতে ভাবতে ।।
 
বেথুন শান্তিনিকেতনের থেকে আগত
এই মেয়েটির একসময়
সব পেয়েছির দেশে, রাজধানীতে এসে,
বড় একা লাগতো, কেন কে জানে ।
নিজের আত্মীয়, স্বামী, সন্তান, স্কুলের চাকরী
সব সাফল্যের পরশ পেয়েও
একটু বোধহয় অভাববোধ থেকে গিয়েছিল,
তার কর্মমুখর ব্যস্ত জীবনে ।
বাংলা সংগীত, নাটক, সাহিত্য থেকে দূরে
যেতে যেতে ফাঁকা ফাঁকা লাগত
কখনও কখনও, মনে মনে ।
ছাত্র ছাত্রী, সন্তান, বন্ধু কিম্বা
কাজের লোক, প্রতিবেশী
নতুন প্রজন্মের বঙ্গ প্রবাসী
সকলের সঙ্গে হিন্দি, ইংরাজীতে
অহরহ কথা বলার প্রাধান্যে -
প্রাণ যেন হাঁপিয়ে উঠতো ।
 
এলাম আমি এ কোন এক
রাজধানীতে, মানব অরণ্যে !
জগাখিচুড়ি ভাষার উদ্যানে -
জীবনের সেই ঠিক সন্ধিক্ষণে,
আমাদের মতন ঐতিহ্য ও কালচার
সচেতন কিছু মানুষকে একত্রিত করলেন,
তিনি ঋতুরঙ্গের অনুষ্ঠানে ।
'বাহার' এসে গেল, সেদিন আমাদের
মতন কিছু খেতে খাওয়া সংগ্রামী সংসারী
বাঙালী নর-নারীর জীবনে ।।
 
'মুখার্জী দার' বদান্যতায়
সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা হল 'মিলনী' ক্লাব ।
তাঁর কল্যানে - ও
স্বভাবের উষ্ণ প্রসবনে, নির্ঝরের মতন উদ্বীপ্ত
আবেগে আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা ।
ধন্য হল, ময়ূর বিহারের পূর্ব ও
পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী সন্তানেরা -
তাঁরই অবদানে ।
এ জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ ।
এতদিন মহালয়া সঙ্গেতালেখ্য শুধু
বেতারেই শুনতাম আমরা -
এবারে - যারা ছিলাম
সংস্কৃত উচ্চারণে অপটু বা কোনরকম
পূজাপাঠে অনভিজ্ঞ,
তারাও গুটি গুটি পায়ে দাদার ঐ
'সুপ্রিম' এনক্লেভের আলোকোজ্জ্বল
ড্রয়িং রুমে গিয়ে হাজির হতাম,-
তালিম নিতে ছিলাম অজ্ঞ ।
তবুও গান ধরতাম - "জাগো দূর্গা,
জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী" ।
মা দূর্গা ঐ সমবেত কণ্ঠস্বরে
কতটা জাগ্রত হতেন জানিনা, -
আমাদের মতন অনেক ঘরোয়া
কন্যা, বধূ, মা ও শ্বাশুড়ির মনে কিন্তু
জেগে উঠতো অপারআনন্দ - রোশনী
বড়োই উপভোগ্য ।
যেন আমাদের অন্তর হতে তুবড়ির মতন
আচমকা ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে আসা
জ্বলন্ত বারুদের ফুলকি -
সেদিনের সেই অপরিমেয়
আনন্দ ও উৎসাহের কথা ভাষায় ব্যক্ত
করতে আমি অযোগ্য ।
ষষ্ঠীর দিন থেকে বিজয়ের দূর্গাপূজার
উৎসবে দাদা ছিলেন কান্ডারী ।
সব আয়োজন ব্যবস্থা,
ভোগরান্না, প্রসাদবন্টন, শেষে বিজয়া
সম্মেলনে মাংস ভাত। কেটে যেত প্রভাত থেকে
রাত। সে এক বিরাট মহাযজ্ঞ ।
গীতায় পড়েছিলাম - লোভ, ক্রোধ, ক্ষোভ ভয়শূন্য
অভিমান অহংকার বর্জিত মানুষকে
বলে, - "স্থিতপ্রজ্ঞ" ।
আমাদের মুখার্জী দাদা ছিলেন, সেই দলে
জ্ঞানী, মোহমুক্ত, অভিজ্ঞ ।।
 
সেই সঙ্গে শুরু হল আরো
নানান ব্যাপার ।
স্থানীয় শিশুদের নিয়ে নানা খেলাধুলা
নাচ গানের প্রতিযোগিতা ।
কিশোরী তরুণদের গীতি নাট্য ।
বুড়ো ও যুবক তরুনের মিলিত প্রয়াসে
অভিনীত নাটক প্রহসন ।
কিশোর বালকদের মনোরঞ্জন করতে
ম্যাজিক প্রদর্শন ।
কলকাতা থেকে নিমন্ত্রিত শিল্পীদের দ্বারা
আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান, -
যা হতো ভীষণই মনোজ্ঞ ।।
 
তারপর এতগুলো বছর গেছে কেটে ।
দেশে বিদেশে, কাজে বা অবকাশে
ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি, কখনও যানবাহনে চড়ে -
কখনও পায়ে হেঁটে ।
বহু মানুষের মিছিলে সামিল হলে
নানা রকমের মানব চরিত্রের
সন্ধান মিলেছে, পুরোনো ও নতুন
পথে ঘাটে ।
কিন্তু চোখে পড়েনি আমার, কোনও তল্লাটে -
মুখার্জী দার সমতুল্য,
অসাধারণ নির্ভেজাল ব্যক্তিত্ব ।
আইনের দাড়িপাল্লায় যাঁর মাপ হয় না ।
এ কথাটি স্বীকার করে যাব আমি, -
আজ অকপটে ।
যাঁরা সর্বদা সৎ পথে চলেন,
ভিড়ের মধ্যেও সতত
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন,
দূর থেকেও যাঁকে চেনা যায় স্বভাবের মাধুর্য্যে -
তাঁরা তো চির নমস্য । তাঁদের সহজে -
খুঁজে পাই না আমরা, প্রতিদিনের জীবন যাত্রায়
আজকের - এই মূল্যবোধহীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের
হাটে - মাঠে বা বাটে ।।
 
কোভেট ১৯ এর আক্রমণে, বিশ্বের এই চরম দুর্দিনে, -
যখন সারা পৃথিবীর লোক কাঁপছে ঘরে বসে, -
তখন তাঁর পরিবারে না পৌঁছাতে পারার -আফশোষে,
কাঁদছে শত শত মানুষ ।
ময়ূর বিহারের বঙ্গ সমাজ আজ -
শ্রদ্ধা সম্মান ও হৃদয় উজাড়
শত শত বার
প্রণাম জানাচ্ছে
মুখার্জী দার মতন দেব-তুল্য
মহান প্রাণের মহাপ্রয়াণে ।।

মনস্টারদের সঙ্গে (Monsterder Songe)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মাল্লু একদিন দুপুর বেলায় খেলার ঘরে নিজের ডাইনোসরদের নিয়ে একা একা খেলায় মেতে আছে। কখনও তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, কখনও খাবার খুঁজে খুঁজে বেড়ায়। মা কয়েকদিন আগে মাল্লুকে একটা বই পড়ে শুনিয়েছেন কেমন করে মহা প্রলয়ে তারা সব পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে। সে কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমে তার চোখটা জুড়ে এল। এই সময় বিছানায় শোয়ার কথা সে ভাবতে পারে না। ঘুমোলেই তো খেলার সময়টা কমে যাবে। কিন্তু খুব ভোর থেকে উঠে সে বাবার সঙ্গে মাঠে ছুটতে গিয়েছিল, তাই এখন খুব ক্লান্ত লাগছে। একটা ব্যাঙ আর সাপকে ডাইনোসরের মাথায় উঠিয়ে নাচাতে নাচাতে হাতটা স্থির হয়ে গেল তার। মনে হল সেই বহু যুগ আগের ঐ মহা বিশাল জানোয়ারদের কাছে পৌঁছে গেছে সে। চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত স্টেগোসরাস, একজন মাল্লুকে বললে, –

– “এস গলাটা ধরে আমার পিঠে বসো, আমি তোমাকে থান্ডার মনস্টার-এর গল্প বলব”।

মাল্লু জানতে চাইলে, – “কোথায় থাকে সে? আমাকে দেখাতে পারো?”

– “ঐ মেঘেদের পিছনে ওর বাড়ি। ভীষণ শক্তিশালী, মাঝে মাঝে চোখ রাঙায় আর ভীষণ গর্জন করে, শুনে বড় ভয় করে আমার, পৃথিবীটা যেন কাঁপতে থাকে।”

মাল্লু ভীষণ অবাক হল, – “তুমি এত শক্তিশালী সে তোমার চেয়েও বড়?”

– ‘ওরে বাবা সেতো একা নয়, কত শত তার সৈন্য আর বিদ্যুৎ নামে তার এক এমন অস্ত্র আছে তা একবার কারো ঘাড়ে পড়লে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।’ দুজনে মিলে চললো পাহাড়ের দিকে। ওকে বজ্র দানবও বলে। সেখানে একটা বিরাট বড় বাজ পাখি ডাইনোসরের পিঠ থেকে মাল্লুকে নিয়ে বসালো নিজের ডানার ওপরে। – “ও তো কবে চলে গেছে পৃথিবী থেকে। ওটা ডাইনোসরের ‘ঘোস্ট’ মানে ভূত ছিল। তুমি ওদের নিয়ে খেলতে ভালোবাসো। তাই তোমায় এখানে পৌঁছে দিল। চলো আমি এবার তোমায় পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘেদের সঙ্গে কথা বলাবো। ওখানেই ‘থান্ডার মনস্টার’ থাকে। ওকে তো এদেশে বজ্র দানব বলে।”

মাল্লু উড়ে উড়ে চললো তার সঙ্গে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল ঘন কালো মেঘের দল যেন শত শত ড্রাম বাজাচ্ছে কেউ, বাজ পাখিটা মাল্লুকে নিয়ে লুকালো একটা বিরাট বড় বট গাছে। আসে পাশের তাল, নারকেল গাছগুলোও দুলছে ভীষণ জোরে।

 

এবার হাওয়ার দৈত্য নেমে আসছে। বজ্র দানবও তান্ডব শুরু করলো। ভয়ে তো মাল্লুর বুক কাঁপছে। ওদিকে বিদ্যুতের ঝলক চমকে দিচ্ছে, ঝলসে দিচ্ছে চোখ দুটো। কড় কড় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল অর্থাৎ বিদ্যুতের আগুন পড়ে একটা মস্ত লম্বা তাল গাছ একেবারে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল।

মাল্লুর খুব রাগ হল ঐ থান্ডার মন্সটারটার ওপরে।

মেঘের মধ্যে থেকে কটমটিয়ে তারদিকে তাকালো ঐ ‘বজ্র দানব’, তারপর গম্ভীর ভীষণ কর্কশ গলায় বললে, – “আমার ওপরে তুমি রাগ করছো জানি, আমি মানুষদের ওপরে ভীষণ বিরক্ত হয়েছি। গাছ কেটে কেটে তারা পৃথিবীর কি হাল করেছে দেখেছো? আগে এখানে কত জঙ্গল ছিল, জঙ্গল দৈত্যরা, শুকনো পাতা ফুল খেয়ে, ঝর্ণার জল পান করে শান্তিতে থাকতো, এখন সব শেষ।”

মাল্লু বললে – “কিন্তু তুমিও এত ধংসাত্বক ভাবে আসছো, ধ্বংস করে দিচ্ছ কত গ্রাম।” – না এর পরেই আমি বৃষ্টি রানীকে পাঠাব, সে পৃথিবীতে আবার শীতলতা, স্নিগ্ধতা নিয়ে আসবে। বৃষ্টি থামতেই বাজ পাখিটা মাল্লুকে পিঠে চাপিয়ে একটা মাঠে নামিয়ে দিল। সেখানে লোকেরা মাটি কেটে কেটে গর্ত বানিয়ে রেখেছে। আসে পাশে গাছপালাও নেই। মাল্লু হঠাৎ মাটির ভিতরে প্রবেশ করতে লাগলো। গভীর খাদে ক্রমশ সে সেঁধিয়ে যেতে থাকল। পাশে পাশে ইঁদুরের গর্ত, নেউল, সাপ সবাই অবাক। “তুমি এখানে কোথায় যাচ্ছো?” – একটা আর্থ ওয়ার্ম খুব মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস করল।

– “মাটির ভিতরে কোন Earth Monster – মিট্টি দানব থাকে – মাটি কাঁপায়, ভূমিকম্প আনে তাকে দেখতে যাচ্ছি।” বললো মাল্লু। ওর কথা শুনতে পেয়ে সত্যি সত্যিই একটা মাটির ভেতরকার দানব যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। গমগমে গলায় বললো – “কে রে কে? আমার রাজ্যে? কে এমন করে চলে আসছে? দম বন্ধ হয়ে যাবে তোমার।”

মাল্লু বললে – “ইচ্ছে করে এসেছি নাকি? বজ্র দানব, হাওয়া দানব, অরণ্য দানবের পর তোমার খোঁজ করতেই ওরাই তো এমন ধাক্কা দিল যে – আমি গর্তে পড়ে গেলাম।” – এখন বেরুবার উপায় খুঁজতেই ঐ মাটির দানব এবার তাকে নিয়ে গেল, লাভা দৈত্যের (Lava Monster) এর কাছে।

মাল্লুর গায়ে ভালো করে মিট্টি লেপে দিয়েছিল ঐ মিট্টি দানব, তাই গলিত গরম ঐ লাভা মনস্টার কোনো ক্ষতি করতে পারলো না মাল্লুর। এরপর তাকে ভীষণ জোরে ঠেলা দিয়ে একটা বিরাট আগ্নেয়গিরি মুখ থেকে খুব জোরে বাইরে বার করল ঐ লাভা দৈত্যটা।

মাটিতে পড়ে মাল্লু যেন নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। ঐ লাভার সঙ্গে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সে কিছুটা, হঠাৎ সাদা ছাই এসে ঢেকে দিল তার শরীর।

মাল্লুর মনে হল সে ছাই মনস্টার হয়ে গেছে। সাদা ভস্ম মাখা ছোট্ট দেহটা দেখে আকাশের একখণ্ড সাদা মেঘের খুব দয়া হল, সে তখন নিচু হয়ে মাল্লুকে তার ভেলায় তুলে নিয়ে ভাসতে ভাসতে চলল সেই সুদূর আলাস্কার দিকে। উত্তর মেরুর প্রায় কাছাকাছি এসে মাল্লু দেখা পেল স্নো মনস্টারের। সেও ধবধবে সাদা, বরফের ওপরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মাল্লু বললে, এত ঠান্ডায় তুমি কি করে থাক? খুব নরম সুরে সে বললে, – “আমার ঠান্ডা লাগে না, একটুও গরম তাপ সহ্য করতেই পারি না। তাহলেই গলে যাবো যে।”

– “কি খাও তুমি?” – মাল্লুর প্রশ্ন। “পোলার বেয়ার? রেন ডিয়ার? সিলভার ফক্স?”

না না শুধু স্নো খাই। তাই তো আমার নাম তুষার দানব। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে একটা কথা শুনেছ তোমরা? বিশ্ব উষ্ণায়ন? নির্বোধ মানুষ এত অরণ্য, জঙ্গল মানে গাছপালা কেটে ফেলেছে যে সারা বিশ্ব – এ তোমাদের সবুজ ধরণী গরমের তাপে পুড়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়া নেই, বৃষ্টি নেই তাই ধীরে ধীরে আমার শরীরও তো গলে যাচ্ছে। আমি যদি আরও সব গ্লেসিয়ার, আইসবার্গদের নিয়ে সাগরে পড়ি তাহলে ভীষণ বন্যায় ডুবে যাবে এই সুন্দর পৃথিবীটা। মাল্লু তুমি যাও, বোঝাও সবাইকে। বরফ জমা পাহাড়েরা ভয় পাচ্ছে আজ।”

এবার মাল্লু দেখলে এটা তার একার দ্বারা সম্ভব হবে না। মাল্লু চিৎকার করে সবাই কে সাবধান করতে করতে ছুটল বাড়ির দিকে, – ঘুম ভেঙ্গে গেল তার।