চন্দনা সেনগুপ্ত

"মুখার্জী দা" কোন নাম নয় ।
কোনো ব্যক্তির নিছক উপাধি -
যদি হয়,
তাহলে আমাদের মনে সূর্যের মতন উদয়,
এক অত্যন্ত খাঁটি,
স্নেহশীল মানুষের মুখ,
প্রকৃত দয়াবান, দায়িত্ব সম্পন্ন -
দরদী সেই উদার মানুষের পাই
অপূর্ব পরিচয় ।
বন্ধু - স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী,
বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শিশু ও যুবক -
তরুণ তরুণী কিশোরী -
পুরুষ কি নারী, - সবাইকে
আপন করে নিয়ে, এক করে দিয়ে -
অসীম কৌশলে যিনি
করেছেন, সকলের মন জয় ।।
 
সেই ডি পি মুখার্জী দাদা কে -
প্রথম দেখি ঈশ্বর সুব্রত সেনের বাড়িতে ।
আমাদের 'মা' ভিলায় ।
স্মিত হাস্যে, অবলীলায়,
একেবারে ছোট বোনের মতন
নিজের করে নিতে -
ত্রিশ বছর আগে,
এখনও জ্বল জ্বল করছে সেই দিনটি
আমার স্মৃতিতে ।
মোহর ও পলা, -
তাঁর দুই কন্যা, মন মাতিয়ে দিয়েছিল, -
সারা ঘরের আবহাওয়া বদলে দিয়ে -
তাদের অপূর্ব কণ্ঠের
রবীন্দ্র সংগীতে ।
মৃদু মৃদু হাস্যে - অনাড়ম্বর আন্তরিক -
ভাষ্যে, তাঁর স্ত্রী অলোকা দিদিভাইকে
শুনেছিলাম কথা বলতে ।
চশমার আড়ালে তাঁদের দুজনেরই উজ্জ্বল দৃষ্টি
দেখেছি, সারল্যে ঝলমল ও স্নেহে টলমল করতে ।
পুরো পরিবারটিকেই এক মুহূর্তে -
বড় ভালো লেগে গিয়েছিল ।
বাঁকুড়া নিবাসী এই 'চন্দনা' সেদিন
বাড়ি ফিরেছিল, আবেগে আপ্লুত হয়ে -
তাঁদের কথা ভাবতে ভাবতে ।।
 
বেথুন শান্তিনিকেতনের থেকে আগত
এই মেয়েটির একসময়
সব পেয়েছির দেশে, রাজধানীতে এসে,
বড় একা লাগতো, কেন কে জানে ।
নিজের আত্মীয়, স্বামী, সন্তান, স্কুলের চাকরী
সব সাফল্যের পরশ পেয়েও
একটু বোধহয় অভাববোধ থেকে গিয়েছিল,
তার কর্মমুখর ব্যস্ত জীবনে ।
বাংলা সংগীত, নাটক, সাহিত্য থেকে দূরে
যেতে যেতে ফাঁকা ফাঁকা লাগত
কখনও কখনও, মনে মনে ।
ছাত্র ছাত্রী, সন্তান, বন্ধু কিম্বা
কাজের লোক, প্রতিবেশী
নতুন প্রজন্মের বঙ্গ প্রবাসী
সকলের সঙ্গে হিন্দি, ইংরাজীতে
অহরহ কথা বলার প্রাধান্যে -
প্রাণ যেন হাঁপিয়ে উঠতো ।
 
এলাম আমি এ কোন এক
রাজধানীতে, মানব অরণ্যে !
জগাখিচুড়ি ভাষার উদ্যানে -
জীবনের সেই ঠিক সন্ধিক্ষণে,
আমাদের মতন ঐতিহ্য ও কালচার
সচেতন কিছু মানুষকে একত্রিত করলেন,
তিনি ঋতুরঙ্গের অনুষ্ঠানে ।
'বাহার' এসে গেল, সেদিন আমাদের
মতন কিছু খেতে খাওয়া সংগ্রামী সংসারী
বাঙালী নর-নারীর জীবনে ।।
 
'মুখার্জী দার' বদান্যতায়
সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা হল 'মিলনী' ক্লাব ।
তাঁর কল্যানে - ও
স্বভাবের উষ্ণ প্রসবনে, নির্ঝরের মতন উদ্বীপ্ত
আবেগে আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা ।
ধন্য হল, ময়ূর বিহারের পূর্ব ও
পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী সন্তানেরা -
তাঁরই অবদানে ।
এ জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ ।
এতদিন মহালয়া সঙ্গেতালেখ্য শুধু
বেতারেই শুনতাম আমরা -
এবারে - যারা ছিলাম
সংস্কৃত উচ্চারণে অপটু বা কোনরকম
পূজাপাঠে অনভিজ্ঞ,
তারাও গুটি গুটি পায়ে দাদার ঐ
'সুপ্রিম' এনক্লেভের আলোকোজ্জ্বল
ড্রয়িং রুমে গিয়ে হাজির হতাম,-
তালিম নিতে ছিলাম অজ্ঞ ।
তবুও গান ধরতাম - "জাগো দূর্গা,
জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী" ।
মা দূর্গা ঐ সমবেত কণ্ঠস্বরে
কতটা জাগ্রত হতেন জানিনা, -
আমাদের মতন অনেক ঘরোয়া
কন্যা, বধূ, মা ও শ্বাশুড়ির মনে কিন্তু
জেগে উঠতো অপারআনন্দ - রোশনী
বড়োই উপভোগ্য ।
যেন আমাদের অন্তর হতে তুবড়ির মতন
আচমকা ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে আসা
জ্বলন্ত বারুদের ফুলকি -
সেদিনের সেই অপরিমেয়
আনন্দ ও উৎসাহের কথা ভাষায় ব্যক্ত
করতে আমি অযোগ্য ।
ষষ্ঠীর দিন থেকে বিজয়ের দূর্গাপূজার
উৎসবে দাদা ছিলেন কান্ডারী ।
সব আয়োজন ব্যবস্থা,
ভোগরান্না, প্রসাদবন্টন, শেষে বিজয়া
সম্মেলনে মাংস ভাত। কেটে যেত প্রভাত থেকে
রাত। সে এক বিরাট মহাযজ্ঞ ।
গীতায় পড়েছিলাম - লোভ, ক্রোধ, ক্ষোভ ভয়শূন্য
অভিমান অহংকার বর্জিত মানুষকে
বলে, - "স্থিতপ্রজ্ঞ" ।
আমাদের মুখার্জী দাদা ছিলেন, সেই দলে
জ্ঞানী, মোহমুক্ত, অভিজ্ঞ ।।
 
সেই সঙ্গে শুরু হল আরো
নানান ব্যাপার ।
স্থানীয় শিশুদের নিয়ে নানা খেলাধুলা
নাচ গানের প্রতিযোগিতা ।
কিশোরী তরুণদের গীতি নাট্য ।
বুড়ো ও যুবক তরুনের মিলিত প্রয়াসে
অভিনীত নাটক প্রহসন ।
কিশোর বালকদের মনোরঞ্জন করতে
ম্যাজিক প্রদর্শন ।
কলকাতা থেকে নিমন্ত্রিত শিল্পীদের দ্বারা
আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান, -
যা হতো ভীষণই মনোজ্ঞ ।।
 
তারপর এতগুলো বছর গেছে কেটে ।
দেশে বিদেশে, কাজে বা অবকাশে
ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি, কখনও যানবাহনে চড়ে -
কখনও পায়ে হেঁটে ।
বহু মানুষের মিছিলে সামিল হলে
নানা রকমের মানব চরিত্রের
সন্ধান মিলেছে, পুরোনো ও নতুন
পথে ঘাটে ।
কিন্তু চোখে পড়েনি আমার, কোনও তল্লাটে -
মুখার্জী দার সমতুল্য,
অসাধারণ নির্ভেজাল ব্যক্তিত্ব ।
আইনের দাড়িপাল্লায় যাঁর মাপ হয় না ।
এ কথাটি স্বীকার করে যাব আমি, -
আজ অকপটে ।
যাঁরা সর্বদা সৎ পথে চলেন,
ভিড়ের মধ্যেও সতত
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন,
দূর থেকেও যাঁকে চেনা যায় স্বভাবের মাধুর্য্যে -
তাঁরা তো চির নমস্য । তাঁদের সহজে -
খুঁজে পাই না আমরা, প্রতিদিনের জীবন যাত্রায়
আজকের - এই মূল্যবোধহীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের
হাটে - মাঠে বা বাটে ।।
 
কোভেট ১৯ এর আক্রমণে, বিশ্বের এই চরম দুর্দিনে, -
যখন সারা পৃথিবীর লোক কাঁপছে ঘরে বসে, -
তখন তাঁর পরিবারে না পৌঁছাতে পারার -আফশোষে,
কাঁদছে শত শত মানুষ ।
ময়ূর বিহারের বঙ্গ সমাজ আজ -
শ্রদ্ধা সম্মান ও হৃদয় উজাড়
শত শত বার
প্রণাম জানাচ্ছে
মুখার্জী দার মতন দেব-তুল্য
মহান প্রাণের মহাপ্রয়াণে ।।

Leave a comment