চন্দনা সেনগুপ্ত

রোজই ট্রেন লুট হয়, রাস্তায় ডাকাত পড়ে, এসব কথা পেপারে পড়ি, টিভিতে দেখি। কিন্তু আমার নিজের জীবনেও যে এরকম এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ঘটবে তা কখনো ভাবতেও পারিনি।
অফিসের কাজে মধ্যপ্রদেশের এক অত্যন্ত ছোট শহরের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এ যেতে হবে। সঙ্গে একজন পিয়ন কাম সিকিউরিটি ম্যান যাচ্ছেন, তিনি ঐ অঞ্চলেরই লোক, তাই জঙ্গলের রাস্তাও সব চেনেন। আমি ফার্স্ট ক্লাশে যাচ্ছি। মাত্র দুজন মহিলা আমরা একটা কূপে। ৯টা বাজতেই ডিনার খেয়ে শোবার ব্যবস্থা করলাম। রাত্রি প্রায় ১১টা নাগাদ ট্রেনটা একটা স্টেশনে থেমে আছে মনে হলো, ভাবলাম ওয়াশরুমে ঘুরে আসি। বাথরুম থেকে বেরুতেই দেখি এই স্টেশনে বেশ কয়েকজন লোক উঠেছে। কেমন যেন অস্বস্তি লাগলো। প্রথম শ্রেণীর গার্ড, টিকিট চেকার কি নেই, এদের দেখে তো কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। নিজের কূপে আসতেই পেছন থেকে এসে ধরলো একজন, গলার হার, দুল টেনে খুলে নিলো, ব্যাগগুলো ধরে বাইরে বাথরুমের সামনে দরজার কাছে নিয়ে ফেলতে লাগলো। চেঁচামেচি, হৈ চৈ, লুটপাট শুরু হলো। মার ধর, ধাক্কা ধাক্কি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওদের কাজ সারা। পাশের কূপেও সেই একই অবস্থা। প্যাসেন্জারদের যথা সর্বস্য কেড়ে নিয়ে ওরা চেন টানলো এক অতি অন্ধকার ছোট্ট স্টেশনের কাছে। ট্রেন থামতেই ওরা ঝপাঝপ করে নেমে পড়লো, কিন্তু নামার আগে এক বৃহৎ পাগড়ীওয়ালা, মুখ বাঁধা, লম্বা চওড়া লোক কি ভেবে জানিনা আমার হাত ধরে টানতে লাগলো। প্রানপনে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারলাম না। ঐ সব ব্যাগ, সুটকেস, টাকা, গহনার সঙ্গে ওরা আমাকেও ওদের দলভুক্ত করে মাটিতে পা দিলো। ছুটতে লাগলো মাঠের মধ্যে দিয়ে। কিছুক্ষন পরেই ট্রেনটি ছেড়ে দেবার আওয়াজ পেলাম। ওদের একটি জিপ দাঁড়িয়েছিল গ্রামের কাঁচা রাস্তায়। তাতে ওঠালো আমায়। তারপর জিপ ছুটলো বড় রাস্তার দিকে। একটা লোক আমার মুখ মাথা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে, যে নড়তেও পারছিনা। যন্ত্রনায় সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। বেশ কয়েক ঘন্টা চলার পর, ওরা থামলো একটা ধাবার সামনে। আমার কোমরে ঠেকিয়ে রেখেছে একটা চাকু, একটু শব্দ করলেই যে সেটা আমার পেটের ভেতরে প্রবেশ করবে তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।
এখানে আগেই বেশ কয়েকটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ড্রাইভাররা কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ পিছনে দড়ির খাটিয়াতে নিদ্রা যাচ্ছে। একজন খাবার ও মদের অর্ডার দিল, আমাকে পিছনের দিকে রাখা একটা খাটে এনে বসালো, একটা ছেলেকে ডেকে বললো - ভালো মাল পেয়েছি আজ, পিছনের ছোট ঘরটা খালি করে দে। পনেরো কি ষোলো বছরের ছোটু। এতো রাত্রে কাজ করতে হচ্ছে বলে, বিরক্ত হয়ে সে ঘর পরিষ্কার করতে চললো। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে সাহস সঞ্চয় করলাম, বললাম - 'বাথরুম যাবো'।
লোকটা নোংরা ইঙ্গিত করে মুখ ভেঙ্গালো - পালাবার চেষ্টা করবি না, এই চাকু চালিয়ে দিয়ে পেট ফাঁসিয়ে দেব। কিন্তু আমার এই একটাই সুযোগ। ঐ খোলা বাথরুমের পিছনেই অন্ধকার খোলা মাঠ। ওটার ওপাশে একটা ঘরের মতন দেখা যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি হয় ওখানে পৌঁছাতে হবে আমায়। খুব সম্ভব কাঠ, কয়লা, ভাঙা বাক্স ইত্যাদি রাখা আছে ঐ ঘরটায়। বাথরুমের কল খুলে দিলাম, জলের শব্দ হবে বলে, তারপর সন্তর্পনে পিছনের রাস্তা দিয়ে ঐ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ইঁদুর, টিক্টিকিদের সঙ্গে ঘুঁটে, কয়লা ও কাঠের বোঝার পিছনে লুকিয়ে রইলাম আমি। কিছুক্ষন পড়ে হৈ চৈ, খোঁজা খুঁজি শুরু হলেও এদিকে কেউ এলোনা। ওরা  ভাবলো মাঠ পেরিয়ে শিকার পালিয়েছে। একজন আবার ওদের মধ্যে লুঠ করা জিনিসপত্র ভাগাভাগি করতে শুরু করেছিল। তাই নিয়ে মনে হয় তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লো, বেশ কিছুক্ষন সব চুপচাপ। হটাৎ কেউ যেন এই ঘরের দরজাটা খুললো। টর্চের আলো ফেলে খুঁজছিলো কাঠ, ঘুঁটে বা কয়লা। অনেক চেপে চুপে একেবারে নিচু হয়ে থাকা সত্ত্বেও শরীরের কোনো অংশে পড়লো আলোর ঝলক। চমকে উঠলো সে, অস্পষ্ট আওয়াজ বের হলো তার মুখ দিয়ে। আমিও তাকে দেখতে পেলাম - ছোটু, ভয় পেয়ে সে ডাকতে যাচ্ছিলো তার মালিককে। এবার এক সেকেন্ড দেরি না করে লাফিয়ে উঠে চেপে ধরলাম তাকে। অন্ধকারে তাকে জড়িয়ে শুধু বলতে পারলাম "বেটা ম্যায় তেরা মা জ্যাসা হু, মুঝে বাঁচালে"। আমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে পারলে সে হয়তো ভালো বকশিস পেত। কয়েকটা মুহূর্ত কি যেন ভাবলো সে, তারপর ঘরের কোণে রাখা বড় বড় দুটো প্যাকিং বাক্স খালি করে আমাকে তার মধ্যে বসতে বললো, উপর থেকে ঢেকে দিল কাঠ খড় দিয়ে। বুঝলাম তার মতন অন্য কেউ এই ঘরের থেকে জিনিস বের করতে এলেও যেন আমায় দেখতে না পায়।
সারারাত ধরে এই ধাবায় ট্রাক, গাড়ি দাঁড়ায়, লোকেরা হৈ চৈ করে, ভোর রাত্রে ছোটু আবার এলো এক গেলাস গরম চা নিয়ে। বললো চারটের সময় একটা বাস আসবে। যাত্রীরা সবাই নেমে হাত মুখ ধুয়ে চা খাবে, তখন তুমি ঐ বাসে চড়ে যেও। সকালে তোমায় এখানে দেখলে আমার মালিকও সহজে ছেড়ে দেবে না, আটকে রাখবে, টাকা চাইবে - বা তোমার সঙ্গে আরো অনেক কিছুই হতে পারে। এসো আমার সঙ্গে, বাথরুমে চলে যাও। ঐ বাসটি এলে লেডিস প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে মিশে যেও, কেউ বুঝতে পারবে না।
বাসের পিছনের সিটে বসে ভাবছি কেমন করে ঋণ শোধ করবো এই ছোট ছেলেটার। ওকে যখন আমার চোখ দুটো ব্যাকুলভাবে খুঁজছে - তখন জানালা দিয়ে টুপ করে একটা জলের বোতল ও বিস্কুটের প্যাকেট পড়লো কোলে। মুখ বাড়িয়ে দেখলাম সেই ছোটুকে। বললো -"রাস্তায় এটা খেয়ো"। আমি চোখে জল নিয়ে ভাবছি - "কি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমায়"। আমার মাকে তো বাঁচাতে পারিনি তোমায় বাঁচাতে পারলে মনে হবে - প্যাসেঞ্জারদের হৈ হৈ, বাসের হর্ন কন্ডাক্টারের হাঁকা-হাঁকিতে আর কোনো কথাই শোনা বা বলার সুযোগ হলো না আমার।
সকালে বড় শহরে বাস থামলে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছালাম। বাড়িতে খবর পাঠানো হলো, লেডি অফিসারকে বললাম ঐ ছোটু কে ওখান থেকে নিয়ে আসতে চাই, আমি পড়াশুনো করিয়ে মানুষ করতে চাই, নইলে ওর ঋণ শোধ করবো কি করে।
কোথায় কোন ধাবায় খুঁজবেন আপনি ওকে? ওরকম শত শত ছোটু রাতের পর রাত জেগে নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে কত গ্রামে, শহরে, রাস্তায়। নিজে বেঁচে ফিরে এসেছেন আপনার খুব ভাগ্য ভালো তাই। ও অবাস্তব চিন্তা ছেড়ে বাড়ি যান। বড় অপরাধী মনে হলো নিজেকে। সত্যিই তো কোনো গ্রাম, কোনো ধাবা, কি সেই ঠিকানা - কিছুই তো জানা হয়নি আমার। কোন স্টেশনে যে ওরা আমাকে নামিয়েছিল অন্ধকারে তাও বুঝতে বা দেখতে পায়নি। বাসে আসতে আসতে বড় রাস্তার দুধারে এই রকম অসংখ্য ধাবা ও কত শত ছোটুদের দেখলাম খাবারের থালা হাতে ছোটাছুটি করতে - আমার উদ্ধার কর্তা সেই দয়ালু সাহসী ছোটুকে কোথায় খুঁজে পাবো। - ভগবান, তুমি আমায় ঐ ছোট্ট - কিশোরের কাছে চির ঋনী করে দিলে।

Leave a comment