চন্দনা সেনগুপ্ত

এতো তাড়াতাড়ি স্বর্গ থেকে রথ
তাদের নিতে আসবে -
তা জানতো না তারা।
ইন্দ্রের সভায় তাঁর প্রিয়
বাহন ঐরাবত ও নৃত্যপটীয়সী
অপ্সরা উর্বশীর বন্ধুত্ব হয়েছিল,
সবার অলক্ষ্যে।
দুজনে ঘুরতে যায়, নদী তীরে উদ্যানে,
একজন নাচে, অন্যজন শুঁড় দুলায়।
একজন স্নান সারে - সাঁতার কাটে
অন্যজন ফোয়ারায়
হিল্লোল তোলে।
হাসে খেলে, আনন্দে মাতে।
দেবতাদের রাজার সভায় আসতে
দেরী হয়ে যায় তাদের।
শাস্তিপায় তারা, একজন ৬ মাসের
অন্যজন ৮ মাসের জন্য।
কেরালার হস্তিনী মায়ের গর্ভে -
স্থান পায় ঐরাবত।
আর
উর্বশী দিল্লীর পাশে নয়ডা
শহরে এক রমণীর জঠরে।
পৃথিবী নাকি স্বর্গের চেয়েও সবুজ,
ধরিত্রী মায়ের কোমল ঘাসে
শীতল নীল জলে নাকি
অপরিসীম শান্তি -
শুনেছিলো সে, জন্ম নেবার -
না না জন্ম তো সে
নিতেই পারেনি -
ভ্রূণ হবার আগে -
স্বর্গবাসী দেবকন্যাদের মুখে।
আর ঐ নৃত্যশীলা সুন্দরী নারী
জেনেছিল এখানে ভারতবর্ষের
ঘরে ঘরে রাগিনী, পদ্মিনী
বৈজয়ন্তীমালা, কিম্বা
মাধুরী দীক্ষিত, হেলেন প্রমুখ
কত শত রমণী নাচের তালে -
সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়।
উর্বশীও মানুষের কাছে নতুন নাচ
শিখে আসবে, স্বর্গসভাকে
চমকিত করতে।
কিন্তু দুজনেরই মায়ের আর্তনাদ
বুকফাটা চিৎকার -
যন্ত্রনা, হতাশা, সন্তানকে -
রক্ষা করতে না পারার
হাহাকার শুনেছে
ওরা পেটের মধ্যে বসে।
"এ" কোথায় এসেছে তারা
এ তো এক অভিশপ্ত
ঘৃণ্য নিষ্ঠূর জগৎ।
এখানে ঐরাবতের ছয় মাসের জীবন
আনারস বোমে জ্বলে
পুড়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়।
অন্যদিকে নয়ডায় করোনা
আক্রান্ত - কোভিডের রুগী ভেবে
তার মা হাসপাতালের
দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়ান,
চিৎকার করে বলেন -
আমাকে নিশ্বাস বন্ধ
করে শেষ করে দিলে -
ক্ষতি নেই, শুধু আমার
৮ মাসের তরতাজা নিরীহ
সন্তানকে জঠর মুক্ত করো।
বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দাও।
ওগো নিঠুর স্বার্থপর -
মান আর হুঁশ খোয়া নো মানুষ,
তোমাদের নির্দয়তার আর কত জঘন্য
দৃষ্টান্ত রেখে যাবে তোমরা?
একটু দয়া করো।
কিন্তু গরীব মা এক দোর থেকে অন্য দোরে
এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে
শুধু ছোট ছুটি করাই
সার হয়েছে তাঁর।
উর্বশী আর সুযোগ পেলো না
বাইরে আসবার।
ঐরাবতের মা যেমন এক বুক
জলে তাঁর চোখের অশ্রু
মিশিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন
জঠরের পুত্রের কাছে -
মানুষের মাতাও তেমনি
নিষ্ফল আক্রোশে -
ভগবানকে নালিশ জানিয়েছেন।
- "এই কী তোমার
সুবিচার প্রভু ?
এখন আমরা দুই বন্ধু গর্ভাশয়ে মৃত্যু
বরণ করে ফিরে যাচ্ছি আবার
স্বর্গের পথে।
পৃথিবীতে আর কখনো না আসবার
শপথ মনে নিয়ে।

One thought on “স্বর্গের পথে (Swarger Pothe)

Leave a reply to Sushil Rudra Cancel reply