চন্দনা সেনগুপ্ত

প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের সামনে বেশ রোমান্টিক কায়দায় সেলফি তুলছে মিতা আর উদয়ন, ভারী সুন্দর মূহুর্ত্ত। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সোনালী আভায় সব যেন ঝলমল করছে। ঠান্ডা হাওয়ায় মন স্নিগ্ধ হয়ে গেছে। উদয়ন একজন প্রফেসর। প্যারিসের বিখ্যাত MBA কলেজ "NSEAD"-এ পড়ায়। আর মিতা আরেকটি কলেজে পি এইচ ডি করছে। জীবাণুদের ওপরে রিসার্চ করে সে। আর কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানী হবে, 'ডক্টরেট' আখ্যা পাবে। মনের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দর দেশে, এতো মনোরম পরিবেশে, বিশ্বের নানা ধরণের লোকের মাঝে বসে থাকতে - দু জনেরই খুব ভালো লাগছে। হঠাৎ কাছে এসে দাঁড়ালো একটি ছেলে। হাতে তার অনেক ফুলের গুচ্ছ। উদয়নের দিকে এগিয়ে দিলো একটা। টিউলিপের তোড়া, ইশারায় একটু দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে দেখালো মিতাকে। অর্থাৎ ফুলের তোড়া কিনে বৌকে উপহার দেওয়ার একটা উপযুক্ত সময়, এটাই বোধহয় ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলো সে। উদয়ন পকেটে হাত রাখলো। মিতাকে জিজ্ঞেস করল, - "তোমার কাছে দেখতো খোলা 'ইউরো' আছে কিছু"? ছেলেটি এক মুখ হেসে প্রশ্ন করলো - "আপনারা বাঙালি"? হ্যাঁ, তোমার বাড়ি কোথায়? মিশুকে মেয়ে মিতা কথা আগে বাড়ালো। "আমাগো দ্যাস চিটাগাং, ইন্শাল্লাহ, আপনাগো দেইখ্যা বড় আনন্দ হইতাসে, আপা"। "এই বিদেশে এতো কস্টলি জায়গায় শুধু ফুল বেচে তোমার চলে কি করে"? মিতার কথার সুরে খুব আন্তরিকতা ছিল। ছেলেটি উৎসাহিত হয়ে আবেগ প্রবন হয়ে বসে পড়লো কাছের বেঞ্চে। "না গো আপা, এই এক কামে চলুম না, সকালে পেপার বিলি, পরে পিজজা ফ্যাক্টরী, বেকারির কাম, আর সন্ধ্যের পরে রেস্টুরেন্টে" - কথাটা শেষ করতে না দিয়েই উদয়ন প্রশ্ন ছুড়ে দিল, - "তাহলে ফুল কখন আনো"? যেহেতু বিকেল ৪টা থেকে ৭টা বিশেষ কাজ থাকে না, তাই তার ঐ রেস্টুরেন্টের মালিক ফুল এনে দেন বিক্রি করবার জন্য। কমিশন পায় সে। এ কথা জানালো, ছেলেটি। অন্যদিকে আরো বিদেশী লোকের ভীড় দেখে, ছুটলো সে ফুল বেচতে। যাবার সময় বলে গেল - যে তার নাম "আবু সৈয়দ", আপা যেন তাকে ভুলে না যায়।এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জানুয়ারী মাস। ভীষণ শীত। কিন্তু সেদিন উজ্জ্বল রোদ উঠেছে। তাই উদয়ন ও মিতা বেশ ভালো করে ওভার কোর্ট ও টুপিতে শরীর ও মাথা ঢেকে আবার এসে হাজির হলো ঐ "আইফেল টাওয়ারের" সামনে। মিতা এদিকে ওদিকে খুঁজছে তার নতুন ভাই "আবু" কে। একটু পরেই এক মুখ হাসি নিয়ে সে এসে হাজির। পরনে কোর্টটি খুবই পুরোনো। ভালো কান ঢাকা টুপিও নেই তার মাথায়। কোনোরকমে মাফলার দিয়ে জড়ানো। এই ঠান্ডায় বেশি লোকও নেই, ফুলের বিক্রিও তেমন হচ্ছে না। আবুকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মিতার কাছে এসে সে বললো, - "আপনার লেইগ্যে মনডা খারাপ করতাছিল আপা। ফোন নাম্বারটা একবার লইয়া যামু। কখনও সখনও বাংলায় কথা কইবার লিগ্যা মনডা কাঁদে"। মিতা এবার ব্যাগ থেকে বের করল একটা প্যাকেট, ওর দিকে সেটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো, - -"আমারও তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল। এই নাও এটা তোমার জন্য এনেছি খেয়ে দেখো"। "আমার লাইগ্যা আপা খাবার জিনিষ আনতাছেন, ইনশাল্লাহ আপনারে কি কইরা সালাম দুয়া জানামু, কওনের ভাষা নাই"। কলকাতা গিয়েছিলাম খ্রিস্টমাসের ছুটিতে। ওখান থেকে খেজুর গুড় এনেছি। তাই তোমার জন্যে খানিকটা দিলাম খেয়ো"। - মিতা সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। আবু আনন্দে একেবারে গদ গদ হয়ে গেল। উদয়ন জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কে কে আছেন? কতদিন পরে পরে সে দেশে যায়? কত টাকা সে জমাতে পারে ইত্যাদি নানা ঘরোয়া কথা পরম আত্মীয়ের মত। আবু জানালো সে দুবছর হলো চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। ঐ রেস্তোরায় আরও দুজন চীন দেশের কুক, পাকিস্তানী মিস্ত্রি, ইন্ডিয়ান অফিসের কর্মীদের সঙ্গে ডরমেটরিতে থাকে। ঘরে আব্বু, খালাম্মা ও আরও দুই বোন ও এক ভাই আছে তার। মা ছোটবেলায় মারা গেছেন। বাবার সঙ্গে খালাম্মা অর্থাৎ মাসির বিয়ে হয়েছে এবং তিনিই নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি যত্নে ও স্নেহে তাকে মানুষ করেছেন। তাই তাঁকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তিনি আবার এই বিদেশে আসা নিয়ে খুব আপত্তি ও কান্নাকাটি করেছেন, কিন্তু বোনেদের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে - পাড়ার একজন চাচার সঙ্গে সে এসেছে এখানে। পানীর জাহাজে সমুদ্র পথে। মন তার সবসময় পরে থাকে বাড়ির দিকে। এই বছর আর একটু পয়সা জমলেই বাড়ি চলে যাবে, আর আসবে না। খালাম্মার কথার অবাধ্য হবে না।
উদয়ন ও মিতা ওকে নিয়ে একটা রেস্তোরায় এল। ভাইয়ের মত সম্মান দিয়ে মন খুলে গল্প করতে লাগল তার সঙ্গে। মিতার মনে হল, সত্যিই যেন এক নিজের মামা কাকার ছেলেকে খুঁজে পেয়েছে বিদেশে। আর আবু সৈয়দ তো মুগ্ধ হয়ে গেল, এতো শিক্ষিত দুজন সম্ভ্রান্ত মানুষের সঙ্গে বসে একই টেবিলে খাবার খেতে খেতে ও নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে। "ইনশাল্লাহ আজ যে কি আনন্দ হইতাছে, কইতে পারুম না"। কলকাতার পাটালি গুড়ের গন্ধে তার মন খুশিতে ভরে গেছে। উদয়নের হাত দুটি চেপে ধরে স্বজল নয়নে সে বললো, "আবার কহন দ্যাখুম আপনাগো"? মিতা বললে, "এই নাও ঠিকানাটা মেসেজ করে দিলাম, একদিন চলে আসবে আমাদের বাড়ি"। আনন্দে আবেগে তার চোখের কোনায় জল এসে গেল। ক'দিন পর থেকেই উদয়নের জ্বর, কাশি ও মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট শুরু হল। বুক ধড়ফড়ানি বেশি হতেই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেল সে, মিতার হাত ধরে। তখনও তারা জানে না, একটা বিরাট সাইক্লোন, টর্নেডোর চেয়েও ভয়ঙ্কর আঁধি রুপী মহামারী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে সমস্ত পৃথিবীকে। প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে উদয়নকে পাঠানো হল সরকারি টেস্টিং সেন্টারে। সেখানে গিয়ে তো অবাক হয়ে গেল তারা। বহুলোক এসে জমা হয়েছে সেখানে। একই রকম সিম্পটম তাদের, জ্বর, শুকনো কাশি ও নিউমোনিয়ার মতন বুকে কষ্ট। এতলোক একসঙ্গে সংক্রামিত একই রোগে, খুব আশ্চর্য ব্যাপার মনে হল। হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডাক দিল - "আপা গো একি হইলো? দাদা গো ধরছে এই রোগে? আমাগো চাইনিজ রুমমেট দ্যাশে যাইয়া নিউ ইয়ার কইরা, জ্বর লইয়া আইছে, ওগো থেইক্যা আমাগো কুক, মালিক, মিস্ত্রি কেউই বাদ যায় নাই, 'করোনা ভাইরাস' সবারে ধরছে"। কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এবার উদয়ন ভর্ত্তি হল সরকারি হাসপাতালে। যমে মানুষে যুদ্ধ চলছে তার। বাড়িতে একা মিতা দিন রাত ঠাকুরকে ডাকছে, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে। এই দুর্দিনে দু বেলা ফোন করে তার মনের জোর বাড়িয়েছে তার আবু ভাই। সেও পড়ে আছে হাসপাতালের এক কোনে। কিন্তু ফোনে আপাকে সাহস জুগিয়েছে। "দ্যাখবেন, দাদা এক্কেরে ঠিক হইয়া যাইবেন"। সত্যিই হয়তো তার দুয়া কাজে লাগল উদয়নের। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তার জ্বর ছেড়ে গেল। এখন সে আর ভয় পায় না এই মহামারণ রোগকে। ল্যাবে গিয়ে ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানাতে, এই রোগের জন্য পরীক্ষা করতে সে নিজের রক্ত, প্লাজমা দান করল। তার ওপর টেস্ট করতে দিল নানান ওষুধ। যেমন কুইনিওন, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি। করেন্টাইনের ১৪ দিন সে ভলেন্টারি সার্ভিস দিতে লাগল, সেই হাসপাতালে। একদিন এইসব গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে সে খুঁজে বেড়াতে লাগল আবুকে। মিতাও জানালো যে তার ফোন আসছে না। প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে কোনার ঘরে চোখ পড়তেই দেখতে পেলো আবুকে। তার বিছানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখল সে। "আবু ভাই দেখো আমি ভাল হয়ে গেছি। তুমিও এই যুদ্ধে ঠিক জয়ী হবে, চোখ খোলো"। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন কম পড়ে গেছে। বড় বড় লোকেরাই পাচ্ছে না, আর এত এক অতি নগন্য "মাইগ্রেটেড লেবার"। অন্য এক অতি ছোট্ট দেশের থেকে জলের জাহাজের ডেকে বসে এই দেশে এসেছে পয়সা কমাতে। তার ওপরে অতিরিক্ত পরিশ্রমে, ভাল খাদ্য না খেয়ে, ইমিউনিটি পাওয়ারটাও গেছে একেবারে কমে। কি করে লড়বে সে ঐ 'কোরোনার' সঙ্গে। ক্ষীণ হয়ে আসছে তার গলার আওয়াজ। কিন্তু এতদিন সে যেন উদয়নের অপেক্ষাতেই দিন গুনছিল। মিতা বলেছিলো একদিন, সে তখন গবেষণাগারে পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত ছিল। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাস বিজ্ঞানীরা স্যালাইভা, রক্ত, মাংস নিয়ে পরীক্ষা করেছে। "না গো দাদা, আমারে জন্নত থেইক্যা আমাগো আম্মা লইত্যে আইসত্যাছেন। তবে আমার আর কোন দুঃখ হইব না, কারন তোমার দ্যাখা পাইছি শ্যাষ সময়ে। সারাডা দিন ধইরা আল্লাকে ডাকতাছি। একবার তোমারে য্যান পাঠায়ে দ্যান। আমার আর্জি শুনছেন তিনি"। "বলো আবু কি করতে পারি আমি তোমার জন্যে। এই নাও কথা বলো আমার ফোনে তোমার খালাম্মার সঙ্গে"। - উদয়ন আন্তরিকভাবে ওর হাতটা চেপে ধরলো। "আমি দুই সাল ধইরা যত কামাইছি এই থলিটাতে রাখা আছে। আমাগো দুই বোনের শাদি হইয়াও ঘর বানাইবার ট্যাকা থাকবো খালাম্মার হাতে। এহন এইগুলা আপনারে দিয়া যামু। একডা সোনার চেইনও কিনছি খালাম্মার লাইগ্যা। ছোড ভাইডারে এই ফোনটা দিবেন। কথা কওনের আর সময় নাই"। উদয়ন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণ বন্ধুটির মাথায় হাত রাখলো। বললো - "আমি আর তোমার আপা নিজেরা চট্টগ্রামে তোমার বাড়ি যাব, খালাম্মার সাথে দেখা করব, আর তোমার বোনেদের বিয়ের জন্যে উপহার নিয়ে যাব। এখন থেকে তারাও আমাদের ভাই বোন"। আবু আস্তে আস্তে তার ঐ বালিশের নিচে থেকে থলিটি বের করে উদয়নের হাতে দিল। কষ্ট করে চোখ খুলে দেখতে পেল, সেটি তার ঐ আল্লা প্রেরিত মসিহা, যত্ন করে একবার মাথায় ঠেকিয়ে আবার রাখছে, যেমন করে হিন্দু ভক্তরা পুজোর ফুলকে শ্রদ্ধাভরে রাখে। এবার অন্য হাতে ধরে রাখা আরেকটি ছোট্ট প্যাকেট নাকের মাস্ক সরিয়ে শুঁকতে লাগল প্রাণ ভরে। "আঃ কী সুন্দর। খেজুর গুড়ে আমার দ্যেসের খুশবু - খালাম্মার গায়ের গন্ধ আসতেছে"। পরম আনন্দে, শান্তিতে চোখ বুজলো সে চিরতরে।
এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জানুয়ারী মাস। ভীষণ শীত। কিন্তু সেদিন উজ্জ্বল রোদ উঠেছে। তাই উদয়ন ও মিতা বেশ ভালো করে ওভার কোর্ট ও টুপিতে শরীর ও মাথা ঢেকে আবার এসে হাজির হলো ঐ "আইফেল টাওয়ারের" সামনে। মিতা এদিকে ওদিকে খুঁজছে তার নতুন ভাই "আবু" কে। একটু পরেই এক মুখ হাসি নিয়ে সে এসে হাজির। পরনে কোর্টটি খুবই পুরোনো। ভালো কান ঢাকা টুপিও নেই তার মাথায়। কোনোরকমে মাফলার দিয়ে জড়ানো। এই ঠান্ডায় বেশি লোকও নেই, ফুলের বিক্রিও তেমন হচ্ছে না। আবুকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মিতার কাছে এসে সে বললো, -
"আপনার লেইগ্যে মনডা খারাপ করতাছিল আপা। ফোন নাম্বারটা একবার লইয়া যামু। কখনও সখনও বাংলায় কথা কইবার লিগ্যা মনডা কাঁদে"।
মিতা এবার ব্যাগ থেকে বের করল একটা প্যাকেট, ওর দিকে সেটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো, -
-"আমারও তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল। এই নাও এটা তোমার জন্য এনেছি খেয়ে দেখো"।
"আমার লাইগ্যা আপা খাবার জিনিষ আনতাছেন, ইনশাল্লাহ আপনারে কি কইরা সালাম দুয়া জানামু, কওনের ভাষা নাই"।
কলকাতা গিয়েছিলাম খ্রিস্টমাসের ছুটিতে। ওখান থেকে খেজুর গুড় এনেছি। তাই তোমার জন্যে খানিকটা দিলাম খেয়ো"। - মিতা সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।
আবু আনন্দে একেবারে গদ গদ হয়ে গেল।
উদয়ন জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কে কে আছেন? কতদিন পরে পরে সে দেশে যায়? কত টাকা সে জমাতে পারে ইত্যাদি নানা ঘরোয়া কথা পরম আত্মীয়ের মত।
আবু জানালো সে দুবছর হলো চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। ঐ রেস্তোরায় আরও দুজন চীন দেশের কুক, পাকিস্তানী মিস্ত্রি, ইন্ডিয়ান অফিসের কর্মীদের সঙ্গে ডরমেটরিতে থাকে। ঘরে আব্বু, খালাম্মা ও আরও দুই বোন ও এক ভাই আছে তার। মা ছোটবেলায় মারা গেছেন। বাবার সঙ্গে খালাম্মা অর্থাৎ মাসির বিয়ে হয়েছে এবং তিনিই নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি যত্নে ও স্নেহে তাকে মানুষ করেছেন। তাই তাঁকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তিনি আবার এই বিদেশে আসা নিয়ে খুব আপত্তি ও কান্নাকাটি করেছেন, কিন্তু বোনেদের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে - পাড়ার একজন চাচার সঙ্গে সে এসেছে এখানে। পানীর জাহাজে সমুদ্র পথে।
মন তার সবসময় পরে থাকে বাড়ির দিকে। এই বছর আর একটু পয়সা জমলেই বাড়ি চলে যাবে, আর আসবে না। খালাম্মার কথার অবাধ্য হবে না।
উদয়ন ও মিতা ওকে নিয়ে একটা রেস্তোরায় এল। ভাইয়ের মত সম্মান দিয়ে মন খুলে গল্প করতে লাগল তার সঙ্গে। মিতার মনে হল, সত্যিই যেন এক নিজের মামা কাকার ছেলেকে খুঁজে পেয়েছে বিদেশে। আর আবু সৈয়দ তো মুগ্ধ হয়ে গেল, এতো শিক্ষিত দুজন সম্ভ্রান্ত মানুষের সঙ্গে বসে একই টেবিলে খাবার খেতে খেতে ও নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে। "ইনশাল্লাহ আজ যে কি আনন্দ হইতাছে, কইতে পারুম না"।
কলকাতার পাটালি গুড়ের গন্ধে তার মন খুশিতে ভরে গেছে। উদয়নের হাত দুটি চেপে ধরে স্বজল নয়নে সে বললো, "আবার কহন দ্যাখুম আপনাগো"? মিতা বললে, "এই নাও ঠিকানাটা মেসেজ করে দিলাম, একদিন চলে আসবে আমাদের বাড়ি"।
আনন্দে আবেগে তার চোখের কোনায় জল এসে গেল।
ক'দিন পর থেকেই উদয়নের জ্বর, কাশি ও মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট শুরু হল। বুক ধড়ফড়ানি বেশি হতেই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেল সে, মিতার হাত ধরে। তখনও তারা জানে না, একটা বিরাট সাইক্লোন, টর্নেডোর চেয়েও ভয়ঙ্কর আঁধি রুপী মহামারী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে সমস্ত পৃথিবীকে।
প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে উদয়নকে পাঠানো হল সরকারি টেস্টিং সেন্টারে। সেখানে গিয়ে তো অবাক হয়ে গেল তারা। বহুলোক এসে জমা হয়েছে সেখানে। একই রকম সিম্পটম তাদের, জ্বর, শুকনো কাশি ও নিউমোনিয়ার মতন বুকে কষ্ট। এতলোক একসঙ্গে সংক্রামিত একই রোগে, খুব আশ্চর্য ব্যাপার মনে হল।
হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডাক দিল - "আপা গো একি হইলো? দাদা গো ধরছে এই রোগে? আমাগো চাইনিজ রুমমেট দ্যাশে যাইয়া নিউ ইয়ার কইরা, জ্বর লইয়া আইছে, ওগো থেইক্যা আমাগো কুক, মালিক, মিস্ত্রি কেউই বাদ যায় নাই, 'করোনা ভাইরাস' সবারে ধরছে"।
কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এবার উদয়ন ভর্ত্তি হল সরকারি হাসপাতালে। যমে মানুষে যুদ্ধ চলছে তার। বাড়িতে একা মিতা দিন রাত ঠাকুরকে ডাকছে, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে। এই দুর্দিনে দু বেলা ফোন করে তার মনের জোর বাড়িয়েছে তার আবু ভাই। সেও পড়ে আছে হাসপাতালের এক কোনে। কিন্তু ফোনে আপাকে সাহস জুগিয়েছে। "দ্যাখবেন, দাদা এক্কেরে ঠিক হইয়া যাইবেন"। সত্যিই হয়তো তার দুয়া কাজে লাগল উদয়নের। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তার জ্বর ছেড়ে গেল। এখন সে আর ভয় পায় না এই মহামারণ রোগকে। ল্যাবে গিয়ে ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানাতে, এই রোগের জন্য পরীক্ষা করতে সে নিজের রক্ত, প্লাজমা দান করল। তার ওপর টেস্ট করতে দিল নানান ওষুধ। যেমন কুইনিওন, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি। করেন্টাইনের ১৪ দিন সে ভলেন্টারি সার্ভিস দিতে লাগল, সেই হাসপাতালে। একদিন এইসব গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে সে খুঁজে বেড়াতে লাগল আবুকে। মিতাও জানালো যে তার ফোন আসছে না। প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে কোনার ঘরে চোখ পড়তেই দেখতে পেলো আবুকে। তার বিছানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখল সে। "আবু ভাই দেখো আমি ভাল হয়ে গেছি। তুমিও এই যুদ্ধে ঠিক জয়ী হবে, চোখ খোলো"।
শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন কম পড়ে গেছে। বড় বড় লোকেরাই পাচ্ছে না, আর এত এক অতি নগন্য "মাইগ্রেটেড লেবার"। অন্য এক অতি ছোট্ট দেশের থেকে জলের জাহাজের ডেকে বসে এই দেশে এসেছে পয়সা কমাতে। তার ওপরে অতিরিক্ত পরিশ্রমে, ভাল খাদ্য না খেয়ে, ইমিউনিটি পাওয়ারটাও গেছে একেবারে কমে। কি করে লড়বে সে ঐ 'কোরোনার' সঙ্গে।
ক্ষীণ হয়ে আসছে তার গলার আওয়াজ। কিন্তু এতদিন সে যেন উদয়নের অপেক্ষাতেই দিন গুনছিল। মিতা বলেছিলো একদিন, সে তখন গবেষণাগারে পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত ছিল। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাস বিজ্ঞানীরা স্যালাইভা, রক্ত, মাংস নিয়ে পরীক্ষা করেছে।
"না গো দাদা, আমারে জন্নত থেইক্যা আমাগো আম্মা লইত্যে আইসত্যাছেন। তবে আমার আর কোন দুঃখ হইব না, কারন তোমার দ্যাখা পাইছি শ্যাষ সময়ে। সারাডা দিন ধইরা আল্লাকে ডাকতাছি। একবার তোমারে য্যান পাঠায়ে দ্যান। আমার আর্জি শুনছেন তিনি"।
"বলো আবু কি করতে পারি আমি তোমার জন্যে। এই নাও কথা বলো আমার ফোনে তোমার খালাম্মার সঙ্গে"। - উদয়ন আন্তরিকভাবে ওর হাতটা চেপে ধরলো।
"আমি দুই সাল ধইরা যত কামাইছি এই থলিটাতে রাখা আছে। আমাগো দুই বোনের শাদি হইয়াও ঘর বানাইবার ট্যাকা থাকবো খালাম্মার হাতে। এহন এইগুলা আপনারে দিয়া যামু। একডা সোনার চেইনও কিনছি খালাম্মার লাইগ্যা। ছোড ভাইডারে এই ফোনটা দিবেন। কথা কওনের আর সময় নাই"।
উদয়ন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণ বন্ধুটির মাথায় হাত রাখলো। বললো - "আমি আর তোমার আপা নিজেরা চট্টগ্রামে তোমার বাড়ি যাব, খালাম্মার সাথে দেখা করব, আর তোমার বোনেদের বিয়ের জন্যে উপহার নিয়ে যাব। এখন থেকে তারাও আমাদের ভাই বোন"।
আবু আস্তে আস্তে তার ঐ বালিশের নিচে থেকে থলিটি বের করে উদয়নের হাতে দিল। কষ্ট করে চোখ খুলে দেখতে পেল, সেটি তার ঐ আল্লা প্রেরিত মসিহা, যত্ন করে একবার মাথায় ঠেকিয়ে আবার রাখছে, যেমন করে হিন্দু ভক্তরা পুজোর ফুলকে শ্রদ্ধাভরে রাখে। এবার অন্য হাতে ধরে রাখা আরেকটি ছোট্ট প্যাকেট নাকের মাস্ক সরিয়ে শুঁকতে লাগল প্রাণ ভরে।
"আঃ কী সুন্দর। খেজুর গুড়ে আমার দ্যেসের খুশবু - খালাম্মার গায়ের গন্ধ আসতেছে"। পরম আনন্দে, শান্তিতে চোখ বুজলো সে চিরতরে।

অপূর্ব, মাসি। চোখে জল এসে গেল……
LikeLike