ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেই যে দুজন, কে জানে কখন - !
বিষ বৃক্ষের ফল খেয়ে, -
প্রণয় করতে শিখেছিল - তাদের আমার প্রণাম।
ওই 'আদম - ইভের' ভ্যালেন্টাইন পর্বটি না
থাকলে তো আমরা জানতামই না।
পেতাম কি এই সুন্দর জগতে
এমন অপূর্ব জীবনের দাম?

প্রেম, প্রতীক্ষা - প্রত্যাখ্যান বা মিলন।
যুগ যুগ ধরে - মুগ্ধ - স্নিগ্ধ - ধন্য
করে রোমান্টিক ভুবন।
কবি কালিদাস-এর কাব্যে, আমাদের 
শাস্ত্রে পূরণে - কামদেব মদনের
আগমনে, মানব-মানবীর মনে
তুলেছে আলোড়ন।

রাধা - কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী -
অভিসার - বিরহ - এসবই তো 
বৈষ্ণব পদাবলীর - ছন্দে বদ্ধ,
পূর্ব যুগের ভ্যালেন্টাইন।
কথাটা হয়তো একসময় তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে
রোমান অক্ষরে লেখা হত,
কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর প্রতি ভাষায় -
বনে, কোনে, মনে -
তার মানে 'গোপন প্রেমবন্ধন'।
যীশুখৃষ্টের ধর্ম প্রচারক -
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কে
নিয়ে সূত্রপাত এই উৎসবের।

ধর্ম বিদ্ধেষী সম্প্রদায়ের কারাগারে 
বন্দী ছিলেন সেই সজ্জন -
মুখ বুজে সহ্য - করে চলেছিলেন
অকথ্য নির্যাতন, 
ঠিক তখন -
তাঁর হৃদয় মুকুরে উদ্ভাসিত এক মুখ 
জেলার কন্যার আবেগাপ্লুত -
দুই নয়ন, -
তাঁকে বারে বারে চঞ্চল করে,
তিনি কী যেন ভাবতে থাকেন, -
সারাক্ষণ, তারপর সুযোগ বুঝে 
তাঁর সেই বান্ধবীকে করেন
পত্র প্রেরণ।
কেউ জানে না কী লেখা ছিল তাতে।
কিন্তু সেই কারনে 
করতে হল তাঁকে মৃত্যু বরণ।
তারপর থেকেই 'শহীদ সাধুর' নাম
তরুণ তরুণীর দল
স্মরণীয় করে দিলেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ শতাব্দী থেকে শুরু হল
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে
নতুনভাবে প্রণয় নিবেদন।

সবাই জানে লুকিয়ে প্রেম করার মধ্যে
আছে এক শিহরণ।
তার ওপরে সব দেশেই যখনই হয় -
'বসন্তের' আগমন -
ফুলে ফুলে অলি করে পরাগ মিলন, -
পাখীরা খুঁজে বেড়ায়, তাদের প্রিয় সাথীকে,
বেড়ে যায় তাদের কলকাকলী
মধুর কুজন -
এই ঋতু বরফ গলা জলে তোলে তখন,
মৃদু হিল্লোল, হাওয়ায়,
সঙ্গীতের মূর্ছনা - চিরকালীন প্রেমিক -
প্রেমিকা করে আবাহন তীরবিদ্ধ পাখীটিকে।
গান গায় - কবির 
সুরে "প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো
দোঁহারে -
বাঁধন খুলে দাও - দাও দাও দাও" -
নতুন যুগে নতুন ভাবে এ যুগের
যুবক যুবতী ফুলের তোড়া উপহার 
নিয়ে এগিয়ে যায়। করে
প্রেম নিবেদন, -
ধন্য হয় সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের 
নির্বাসন ও আত্ম বিসর্জন।

জন্মদিনে

চন্দনা সেনগুপ্ত

জন্মদিনে আজ ভাবি বসে,
থাকি যেন সদা হেসে রসে বশে,
প্রতি লোমকূপ কাঁপে যেন মোর
'শ্রী রামকৃষ্ণ' আবেশে।

মৃত্যুর ভয় নাই আজ তাই,
থাকি আনন্দে নাচি গান গাই,
ভুলিয়া 'করোনা' - ত্রাসে।
'শ্রী শ্রী মায়ের' শীতল বক্ষে, -
ঠাঁই দিও ক্ষমাপূর্ণ চক্ষে
পাশে এসো দিন শেষে।

স্বামী-সন্তান মোরে ভালোবাসে,
তাদের নয়নে ঈশ্বর ভাসে, -
রূপ দেখি তাঁর তাই বারবার,
মুক্ত শূন্য আকাশে।





	

ঠাকুরের ডাক

চন্দনা সেনগুপ্ত

বন্ধু এসে ভালোবেসে, বলল কথা হেসে হেসে,
"দেখবে চলো, নতুন সাধু -
রইবে কেন ঘরে বসে, 
ধর্ম গুরুর গীতার বচন,
শোনাবেন গো নানান কথন,
তরুণ কত ছেলে মেয়ে -
পড়ছে পায়ে কোন আবেশে।"

অবাক হয়ে গেলাম যে তাই,
মহাত্মাকে দেখতে চাই, -
ফল মূল সব সাজিয়ে নিয়ে
যেতে হবে তাঁর সকাশে।
যাবার আগে প্রণাম করতে
দাঁড়ায় গিয়ে জোড় হস্তে,
"শ্রী রামকৃষ্ণ পদ প্রান্তে -
পুজোর ঘরে "মায়ের" পাশে।

কেমন যেন ধাক্কা খেলাম,
তাঁদের চোখে কী দেখিলাম,
চোখের জলে সিক্ত হলাম,
যাচ্ছি কোথায়, কিসের আশে?
আপন মায়ের বাণী ভুলে,
গুরুদেবকে অবহেলে
এমনভাবে কি যাওয়া চলে, আমার
মনে - প্রশ্ন আসে !

অনিচ্ছাতেও এগিয়ে চলি,
বন্ধুর সঙ্গে কথা বলি,
নিজের বিবেক যাই যে ছলি, -
বুক দূর দূর করে ত্রাসে।
বন্ধ দরজা কড়া নাড়ি, সেই সাধু আজ
নেই তো বাড়ি, -
শিষ্য করে কাড়াকাড়ি, তিনি -
গেছেন কোন প্রদেশে !

ছাড়ি আমার বাড়াবাড়ি -
সেখান থেকে তাড়াতাড়ি 
চললাম, যেন ভেলায় ভেসে।
'রামকৃষ্ণ মিশন' পানে 
ডাক শুনেছি আজকে কানে,
বুঝতে পারি ঠাকুর ও মা
আমায় কত ভালোবাসে।

প্রত্যয়

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথায় পাবো সেই ছায়াহীন 
আলোকবর্তিকা অন্ধকারে -
ভাবছি, আর ভাসছি মোরা -
মূল্যবোধ অবক্ষয়ের সাগরে।
নিশ্চুপ আর নিস্তব্ধ থাকার মানে 
কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহবস্থান নয়।
'চরম সত্য' কি সর্বদায় বরফের মতন
কঠিন শীতল ও স্নিগ্ধ হয় ?
আমরা এখন এমন এক দেশে বাস
করি যা অখণ্ড হলেও
অসম্পূর্ন।
ভঙ্গুর না হলেও আসলে এই দেশ 
বিচ্ছিন্নতা ভেদাভেদের 
শিকার। তাই অসমাপ্ত।
আমি এক কালো শীর্ণকায় তরুণী,
উন্নত আমেরিকার নতুন প্রজন্ম।
আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল,
দাস, (ক্রীত - দাস) প্রথায় -
বিভ্রান্ত ও উৎপীড়িত - অত্যাচারিত।
কিন্তু এখনও এতদিন এ 
দেশের সেবা করেও আমাদের প্রাণে 
জাগে বড় সংশয়।
বর্ণ - বৈষম্যের গ্লানি, আমাদের এখনও 
বিচলিত করে, মনে জাগায় ভয়।
এই বছরের ৬ই জানুয়ারীর 
ইচ্ছাকৃত হানাহানি, নির্লজ্ব -
নির্যাতন আমাদের মনে তুলেছে 
আলোড়ন।
কে করবে এই অযাচিত অবাঞ্ছিত 
বৈষম্যের লয়।
নতুন নেতার আগমনের অপেক্ষায়
দিন গুনছি আমরা।
চুপ থাকার মানে মেনে নেওয়া নয়।
একদিন আনবই মোরা জয়।
হয়েছে 'প্রত্যয়'।

পেত্নীর প্রলাপ (একাঙ্ক নাটিকা) (Petnir Prolap)

চন্দনা সেনগুপ্ত





[মঞ্চ সজ্জা – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড। একটি মহিলা বিভাগের ঘরে সারি সারি ৮টি বিছানা, পাশে নার্স দিদিমনির টেবিল ও চেয়ার পাতা। (সাদা সাদা চাদরে ঢাকা বেডে বিভিন্ন বয়সের রুগী।]

                       কুশীলব – (পাত্র - পাত্রী)

সিস্টার নার্স – (মধ্যবয়স্ক মহিলা)

উকিল দিদি – (কালো কোটটি বার বার পড়েন আর খোলেন, বেশ ব্যাসক্তিত্বপূর্ন চেহারা)

বড় দিদিমনি – (স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, নাকের ওপরে চশমা, বেশ কড়া মেজাজের বয়স্ক মহিলা)

নেতা বা সমাজ সেবিকা – সাধারণ সাদা শাড়ি পরনে, শান্ত মহিলা কিন্তু বেশ কর্ম চঞ্চল, নেত্রী (বছর ৪০–এর)

ছাত্রী – (দুজন আধুনিক পোষাকে)

লেডি পুলিশ – (হাতে লাঠি, পরনে খাঁকি প্যান্ট, কর্কশ কণ্ঠ, ধমকের সুরে কথা বলেন)

অভিনেত্রী – (খুব সাজগোজ ও সুন্দরী মডেল, ন্যাকা ন্যাকা ভাব, জিন্স ও টি–শার্ট পরে)

ঝাড়ুদারনী – (বিহারের মহিলা, সামনে আঁচল, মাথায় ঘোমটা, হাতে ঝাড়ু)

বাজনা – প্রথমে বাঁশি, সেতার ও হারমোনিয়াম

                প্রথম দৃশ্য – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড

নার্স মেট্রন – (রুগীদের দিকে এগিয়ে এসে) এই যে ম্যাডামরা, অক্সিজেন মাক্সটা ঠিক করে লাগান। আপনাদের কোভিড হয়েছে, ভুলে যাচ্ছেন কেন।

গৃহবধূ – সত্যি সিস্টার আপনাদের দেখে অবাক লাগে। এই ওষুধের গন্ধে কি করে যে থাকেন, কষ্ট হয় না?

নার্স – কষ্ট হলে সেবা করব কেমন করে ভাই। কিন্তু আপনি এখন মাস্ক খুলে কোথায় যাচ্ছেন? একদম উঠবেন না।

উকিল ম্যাডাম – ও সিস্টার একটু এদিকে আসুন তো।

নার্স – এলাম এবার বলুন কি চাই?

উকিল – আমাকে একটা ল্যাপটপ আনিয়ে দিন না। শুয়ে শুয়ে এতদিন ভী–ষ–ণ বোর হয়ে গেছি। আজকে খুব ভালো লাগছে। শরীরটা একেবারে ঝরঝরে – যেন আর কোনো রোগ জ্বালাই নেই।

নার্স – তাই নাকি? কই দেখি দেখি। অক্সিডেশন একেবারে চল্লিশের নিচে। ও মা – (দর্শকের দিকে ফিরে – উনি তো আর বেঁচে নেই)

উকিল – কি বলছেন বিড় বিড় করে? আমাকে ঠিকমত এটেন্ড না করলে এখন থেকে ছাড়া পেয়েই আপনার নাম একটা কেস ঠুকে দেব।

বড়দিদিমনি – আঃ কী আরাম। দেখো ভাই উকিল ম্যাডাম তোমার মতন আমারও আর কোনও শ্বাস কষ্ট নেই।

গৃহবধূ – আমারও তো মনে হচ্ছে সকালে উঠেই. আমি একেবারে ভালো হয়ে গেছি। তাহলে এবার আমাদের ডিসচার্জ করে দেবে মনে হয়।

উকিল – হ্যাঁ, ছুটি দিয়ে দেবে নিশ্চয়।

নার্স – এবার আপনাদের তো একেবারেই ছুটি হয়ে গেল। এখানে আর থাকতে হবে না।

অভিনেত্রী – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়) কী মজা আমাকেও ছেড়ে দেবে মনে হয়। কতগুলো ছবির শুটিং চলছে, এখানে পড়ে থাকলে চলবে না কি? সিস্টার, সিস্টার – 

নার্স – হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনিও আর জীবিত নেই। ভেন্টিলেশনটি তাইতো খুলে নেওয়া হয়েছে।

অভিনেত্রী – মানে? কি বলতে চান আপনি, আমি এখন ভূত হয়ে গেছি?

উকিল – চুপ একদম বাজে বকবে না, বললেই হল? এস আগে আমার জেরা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক ভাবে দাও, সাক্ষী নিয়ে এস, প্রমান করো যে আমি বা এঁরা কেউ বেঁচে নেই।

ছাত্রী – আরে আপনারা সবাই একটু চুপ করুন না, আমি পরীক্ষার পড়া মুখুস্ত করছি।

অন্য ছাত্রী – রাখতো তোর সবসময় ঐ পড়া পড়া খেলাটা। মুখস্ত বিদ্যা করে কি কোভিড তাড়ানো যায়? এটা হাসপাতাল।

ছাত্রী – তা আমার তো এখন জ্বর, কাশি কিছুই নেই তাই –

গৃহবধূ – তাই কি ভাই? আমারও তো সব রোগের উপশম হয়ে গেল, কত আরাম লাগছে এখন, খিদেও পাচ্ছে খুব। তারমানে আমিও ভালো হয়ে গেছি।

নার্স – না আপনারও পরপারের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

গৃহবধূ – অ্যাঁ কি বলেরে সিস্টার ! হাসপাতালের রুগীদের তোমরা মনোবল বাড়ানোর বদলে এমন নেগেটিভ কথা বলছো কেন দিদি?

দিদিমনি – আমারও এসব নেগেটিভ কথাবার্তা একদম ভালো লাগছে না। এই নার্সের নামে আমি নালিশ করব।

নার্স – যান, যেখানে খুশি যান।

নেত্রী – (এতক্ষন ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন) – হটাৎ উঠে তেড়ে এলেন নার্সের দিকে। আমি এই রাজ্যের এম এল এ। আমাকে বলুন তো কে আপনাদের জ্বালাতন করছে?

অভিনেত্রী – দেখুন না ন্যাতা ম্যাডাম –

নেত্রী – এই আমি ন্যাতা নই, নেতা – মানে নেত্রী। সমাজ সেবার জন্যই তো এখানে আসা।

উকিল ম্যাম – এই সিস্টার বলছেন যে আমরা নাকি মরে গেছি। এদিকে সাক্ষী সাবুদ কিছুই জোগাড় করেনি, কি করে মরলাম, কে মারলো, কখন –

দিদিমনি – আরে থামুন তো আপনি। আগে ডাক্তার কে ডাকুন, তিনিই পরীক্ষা করে ঠিক ঠিক রায় দেবেন।

অভিনেত্রী – (ছাত্রীকে) এই মেয়ে দেখতো ওনার নাকে হাত দিয়ে শ্বাস পড়ছে কিনা।

ছাত্রী – উকিল ম্যামের – নাঃ এনার তো নাক দিয়ে অক্সিজেন ভেতরে ঢুকছে না, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ও বেরোচ্ছে না। ইনি সত্যিই মৃত।

বড়দিদিমনি – আমি হলাম গিয়ে তোমাদের মহারানী বিদ্যালয়ের বড়দিদিমনি, কত প্রশ্নপত্র তৈরী করা এখনও বাকি। এত তাড়াতাড়ি মরলে চলবে কেন?

গৃহবধূ – কিন্তু সেটাই তো হয়েছে, আমারও নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। (নিজের নাড়ি টিপতে থাকেন বারবার)

অভিনেত্রী – দেখুন আমিও এখন আর জীবন্ত নেই। প্রাণ পাখিটা যে কোথায় উঠে গেল ! এখন আমি মুক্ত। এবার পরীর মতন উড়তে পারব।

গৃহবধূ – আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। একটু পরিবেশটা হালকা করে দাও না ভাই নায়িকা দিদি। কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা ভয় ভয় ফিলিং হচ্ছে।

অভিনেত্রী – সুচিত্রা সেন, মাধবী না সাবিত্রী কার অভিনয় দেখাবো?

ছাত্রী – ধুর, ওরা তো সব আমাদের মা – ঠাকুমার প্রিয় নায়িকা, এখনকার কিছু করো না।

গৃহবধূ – শ্রীদেবীর সেই "ম্যায় নাগিন তু সপেরা" করো না ভাই, মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

অভিনেত্রী –                গান নাঁকি সুরে –
                  অমাবস্যার রাতে, চাঁদ ধরি আঙিনাতে
                        এসো এসো নিরালাতে,
                         চুপি চুপি কথা বলি,
                        প্রেমিক নায়কের সাথে।

উকিল / বড়দিদিমনি / গৃহবধূ – ওরে বাবা এর গলার আওয়াজটা তো অন্যরকম লাগছে। ও কি পেত্নী তাহলে?

নার্স – হ্যাঁ শুধু ও নয় তোমরাও সবাই কাল রাত্রেই মারা গেছো। দেহগুলো প্লাস্টিকে পুড়ে ফেলে দিয়েছি, এখন তোমরা মিথ্যে এসব পেত্নীর প্রলাপ বকছো।

নার্স – (হঠাৎ ঘুরে) মাথায় হাত দিয়ে ও বাবা আমার কি শেষ সময় আসতে আর দেরী নেই। না আমিও মরে গেছি?

গৃহবধূ – হ্যাঁ সিস্টার, তা নইলে তুমি আমাদের মতন ভূত প্রেতদের সঙ্গে থাকবে কি করে। তোমার প্রান্তি আর দেহের মধ্যে নেই।

নার্স – না না আমি বেঁচে আছি।

অন্যেরা – একেবারেই তা সত্যি নয়। তুমিও আমাদের দলে যোগদান করে ভূত হয়েছো, তাইতো আমাদের সঙ্গে এতক্ষন ধরে বচসা করে চলেছো।

ছাত্রী – চলো তবে সবাইমিলে একটু ভূতলামী করা যাক।

দিদিমনি – সেটা আবার কি?

ছাত্রী – মদ খেয়ে যেমন মাতলামী করে, তেমনি আনন্দে আবেগে আমরা বেশী আনন্দ করব।

গৃহবধূ – হ্যাঁ, সেই ভাল, চলো একটু গল্প গুজব করি, সবাইমিলে একসঙ্গে বসি।

বড়দিদিমনি – হ্যাঁ, গল্পের চেয়ে তো তোদের 'গুজবে' বেশী মন টানে।

ছাত্রী – কেন দিদিমনি কি হয়েছে তাতে? ন্যাতা ম্যাডাম আপনি অমন গুমসুম কেন কিছু বলুন। আপনিও তো এখন পেত্নীদের সমাজসেবী হয়ে গেছেন।

উকিল – ও মনে হয় এখন জ্বালাময়ী ভাষণ তৈরী করছে। ভূতের রাজ্যেও যদি ভোট হয় তাহলে ওকে ইলেকশন লড়তে হবে।

গৃহবধূ – তার আগে দাঁড়াও আগে আমরা গুজবগুলো ছড়ায়।

ছাত্রী – কি হয়েছে বৌদি বলুন না খুলে।

নার্স – এখানে গোলমাল করবেন না আপনারা। তর্ক বিতর্ক করতে হয় তো ঐ ওদিকের শ্মশানে চলে যান।

গৃহবধূ – কেন যাবো আপনার কথায়? এই হাসপাতালটায় এখন আমাদের ঘর।

নার্স – দাঁড়ান আমি এখনই লেডি পুলিশ ডাকছি। আপনারা অসুস্থ রুগিনীদের শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছেন না।
(হৈ চৈ ঝগড়াঝাটি শুরু হয়ে গেল) (লেডি পুলিশের প্রবেশ)

পুলিশ দিদি – হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমায় এই জেনানা ওয়ার্ডে পাঠালেন, এখানে নাকি খুব গোলমাল করছে করা।

ছাত্রী – এই যে পুলিশ ম্যাডাম এদিকে আসুন। এই সিস্টার কে এখন থেকে নিয়ে যান আর আমাদের অন্য সেবিকা দিন।

পুলিশ দিদি – আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমাকে বলা হয়েছে যে তোমাদের সব বেড খালি করাতে। নয়তো এই ডান্ডার বাড়ি খাবে বলে দিলাম।

গৃহবধূ – অ্যাঁ, মগের মুলুক নাকি? মারলেই হলো? (দর্শকের দিকে ফিরে) কতদিন পরে সংসার থেকে একটু ছুটি পেয়ে এখানে সাদা বিছানায় আরাম করছিলাম, আর উনি বললেই খালি করে দিতে হবে।

উকিল – বেশী জ্বালাতন করলে তোমার নামে এমন একখানা কেস ঠুকে দেবো না, বুঝবে তখন বাছাধন – কত ধানে কত চাল।

ছাত্রী – থামুন তো ম্যাডাম। আপনাকে আর কেস ঠুকতে হবে না, আগে নিজে বেঁচে থাকাটা প্রমান করুন দেখি।

নেত্রী – সমবেত ভদ্রমহোদয়া গণ, এখন আমার কথাটা মন দিয়ে শুনুন।

নার্স – আপনারা কেউ আর ভদ্রমহোদয়া নেই সব পেত্নী হয়ে গেছেন। সেই কথাটা কিছুতেই বুঝতে কেন পাচ্ছেন না কেন বলুন তো।

অভিনেত্রী – আমার কিন্তু বেশ বিশ্বাস হচ্ছে। কারণ মনটা বড় ফুরফুরে লাগছে।

বড়দিদিমনি – আমিও গীতার সেই স্থীতপ্রজ্ঞের মতন শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেছি। দুঃখে সুখে বিচলিত হচ্ছি না। তার মানে আমিও আর মানবী নেই মনে হয়।

পুলিশ – ছাত্রীকে তাড়া করতে করতে চলুন বাইরে চলুন। কিন্তু ওদের গায়ে ডান্ডা কেন লাগছে না। – অন্যদিকে গৃবধূকে – আয় তোকে চুলের মুঠি ধরে বের করে নিয়ে যাব।

গৃহবধূ – ধরো তো দেখি।

পুলিশ – এ কি রে বাবা এরও তো চুল দেহ কিছুই নেই শুধুই ছায়া।

নার্স – ঐ উকিল ম্যাডাম কে আগে নিয়ে যাও, আর ওদিকের ঐ ন্যাতা ম্যাম কে। ওরাই বেশী হল্লা করছেন এতক্ষন ধরে।

       (পুলিশ ধরতে যাওয়ার অভিনয়ে স্টেজে একটু লুকোচুরি খেলা)

সিস্টার, সিস্টার সত্যি করে বলুন তো এরা কি মানবী নন?

নার্স – সেই কথাটাই তো বলছি এতক্ষন ধরে।

পুলিশ – (ভয়ে আর্তনাদ করে) ওরে বাবারে আমি ভূত – পেত্নীদের মাঝে এসে পড়েছি, বাঁচাও, বাঁচাও।

                     (সবাই মিলে চেপে ধরে) –

উকিল ম্যাম – তাহলে তুমিই বা বাদ যায় কেন? সিস্টারের মতো এসো আমাদের দলে ভিড়ে যাও।

পুলিশ – সিস্টার আপনিও তাহলে –

নার্স – হ্যাঁ, পেত্নীরে আমিও এখন পেত্নী।

গৃহবধূ – চলো তাহলে সবাই মিলে একটু পিকনিক করি। ঐ দেখো পাশের হোটেলের ডাস্টবিনে কত মাছের আঁশ ফেলে দিয়েছে। চলো আমরা মুচমুচে করে ঐ আঁশগুলো ভেজে খাই।

ছাত্রী – তারসঙ্গে একটু গান বাজনাও চলুক।

                  (অভিনেত্রী এগিয়ে এসে নাচের তালে)

                        আমরা যত পেত্নী কত
                          আনন্দেতে আছি
                        যেমন খুশি থাকছি এখন
                          মরেও সুখে বাঁচি।
                        ঝুট ঝামেলা নেই এখানে
                         নেই রে কাজের তারা
                        মরণ পারে নতুন জীবন
                          জাগাই প্রাণে সারা।

দিদিমনি – ভূতের কেত্তন করতে করতে ঐ দেখো কতজন পুরুষ আসছে এদিকে।

ছাত্রী – অনেকদিন জেনানা ওয়ার্ডে আছি পুরুষ মানুষ দেখিনি। আজ ওদেরকে দেখে কি ভালো লাগছে যে – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়)

দিদিমনি – আরে ওরা মানুষ নয়, পুরুষও নয় ওরা ভুতুষ। তাই ওদের জন্যে অপেক্ষা করে লাভ নেই।

অভিনেত্রী – না না ওদের না হলে চলে নাকি? দাঁড়াও একটু মেকআপ করে নি আগে – শাড়িটা পেঁচিয়ে পরি।

নার্স – তোমার তো এখন শরীরই নেই। এতো সাজের ঘটা কেন বাবা। ওই যে ন্যাতা ম্যাডাম আবার কি বলেন শুনি।

ন্যাতা – বান্ধবীগণ – আসুন আজ আমরা এক নতুন অঙ্গীকার করি। পেত্নী হলেও আমরা তো নারী জাতি। তাই সকল রমণীর হয়ে আমরা পুরুষের একচেটিয়া অধিকার থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন হই।

দিদিমনি – এখন আর অত কথায় কাজ নেই। আমরা সবাই বরং ঐ গঙ্গার জলে গিয়ে ঝাঁপাই।

ছাত্রী – হ্যাঁ, আমাদের ছায়া জলের সঙ্গে ঘুলে মিলে এক হয়ে যাক।

উকিল – আমরা আবার পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাই।

নার্স – তাহলে এবার পেত্নীদের প্রলাপ বন্ধ হোক। –

ছাত্রীরা – 
                   পেত্নী প্রলাপ বন্ধ করে
                     পালাই চলো সবে।
                  নাকে কান্না কাঁদলে মোদের
                      উদ্ধার কি হবে?
                   ওপর হতে ডাক এসেছে,
                     শোনো গো সব ভূত
                  মরণ দোলায় দুলতে দুলতে
                      হয়েছি অদ্ভুত।

                  মানব সমাজ আজ ছেড়েছি
                      আমরা যে অচ্ছুৎ
                    পেত্নী মোরা ভূতের পত্নী
                      করবো না খুঁত খুঁত।
                      সব অদ্ভুত কিম্ভূত।

                (নাচতে নাচতে পেত্নীদের প্রস্থান)




প্রকৃতির জয়-গান

চন্দনা সেনগুপ্ত

পাত্র-পাত্রী

স্থান: গভীর অরণ্য

সিংহ –       পশু রাজা, ও সিংহী তার পত্নী

বাঘ  –       মন্ত্রী ও বাঘিনী তার পত্নী

ভালুক  –       সেনাপতি

শেয়াল –       গুপ্তচর

হাতি –       প্রান্ত রক্ষক

বানর –       রাজ্ পেয়াদা ২/৪

হনুমান –       বীর সৈনিক ২/৪

পেঁচা, পেঁচী –       জ্ঞানী বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা

ময়ূর, ময়ূরী   –       রাজসভার নর্তক নর্তকী

হরিণ, খরগোশ, ইঁদুর, বেড়াল

সজারু, সাপ, কাঠবেড়ালি, টিয়া

ময়না ও কাঠঠোকরা   –       ক্ষুদ্র প্রাণীর দল

মানুষের দল –       শিকারী ২/৪, কাঠুরে ৩/৪

নাটকের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি

মঞ্চ সজ্জায় – ব্রাউন পেপার ও কার্ডবোর্ড, থার্মোকল দিয়ে তৈরী গাছ, সবুজ পাতার ছাউনি, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী ঘন জঙ্গল।

পিছনে পাহাড় ও নদীর দৃশ্যপট

পশু পাখিদের পোষাক, ল্যাজ, দাঁত, নখ ও শিং বা পাখিদের ডানা বা ময়ূর পেখম (কিন্তু মুখ ঢাকা থাকবে না। মাথায় টুপি পরিয়ে মুখোশ লাগাতে হবে। মুখের অভিনয় expression না দেখতে পেলে দর্শক আনন্দ পাবেন না।)

বাদ্যযন্ত্র – হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, বাঁশী, গীটার বা সিনথেসাইজার ও ঘুঙুর। (প্রথম দৃশ্যে হালকা ভাবে বাজবে। পাখিদের আনন্দের সঙ্গে ময়ূরের নাচে দ্রুতলয়ে ঝংকৃত হবে।)

বানর বা হনুমানের দল লম্ফ ঝম্ফ করে বেড়াবে, প্রথমে তাদের জন্য তবলা ও ড্রাম বাজবে, তারপর হারমোনিয়াম। হিংস্র পশুদের গর্জন, শেয়ালের ডাক, পেঁচার চিৎকার ইত্যাদি হরবোলা দ্বারা প্রয়োগ করলে, জঙ্গলের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

শেষ দৃশ্যে মানুষের আগমন, বাজনার তাল ও সুর পরিবর্তন। শিকারী ও কাঠুরের নিষ্ঠুরতার effect আনবার জন্য জুতোর শব্দ, কাঠ কাটবার কুঠারাঘাত এবং দু একবার বন্দুকের আওয়াজ দিতে হবে।

যুদ্ধের দৃশ্যে রকমারী আলোর খেলা চলবে, দ্রুত লয়ে বাদ্যযন্ত্র ঝংকৃত হবে এবং মানুষ হার স্বীকার করে “পলায়ন পলায়ন” চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যাবার পর হটাৎ সব শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং একটু পরে আনাচে কানাচে সব জায়গা থেকে সব ছোট বড় জন্তুরা একত্রিত হলে সম্পূর্ণ নতুন শুরে হারমোনিয়াম, বাঁশী ও তবলার সঙ্গে কোরাস গানটি গাওয়া হবে।

হাতিকে বেঁধে রাখার শেকলটি কাগজের হবে যাতে ছিঁড়তে সুবিধা হয়।

পোষাক – একদল শিকারী তীর ধনুক বা বর্ষা হাতে (নাগা নাচের মত) শুধু ড্রামের সঙ্গে নাচ করে কিছুক্ষন মঞ্চকে মাতিয়ে দেবে।

তারপরে প্যান্ট কোট, হ্যাট পরে বন্দুক হাতে সাহেবদের মত (পাশ্চ্যাত্য নাচের ভঙ্গিতে) শিকার করবে। সঙ্গে জন্তুদের আর্তনাদ।

চার বছরের শিশু থেকে ১৪ বছরের কিশোর বালক বালিকাদের দ্বারা নাটকটির অভিনয় করা যায়।

একেবারে ছোট শিশুদের খরগোশ, হরিণ, টিয়া, ময়না, সজারু, কাঠবিড়ালি বা বাঘ সিংহের বাচ্চা সাজানো হবে। প্রত্যেকে যেন ২/৪ লাইন করে কথা বলতে পারে – আদো আদো স্বরে। যুদ্দের দৃশ্যের বড় অভিনেতারা অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের (৮ থেকে ১২) এর বালক বালিকারা  ছোট পশু পাখিদের লক্ষ্য রাখবে এবং বাঘ, ভাল্লুক, হাতি ও সিংহ একটু বড় বাচ্চারা ১৩/১৪ সাজলে অভিনয় শেখাতে সুবিধা হবে।

বিদ্যালয়ে বা পুজো প্যান্ডেলে এই নাটকটি মঞ্চস্থ করবার সময় বাচ্চা বেশি এসে গেলে জানোয়ারের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ইঁদুর, শুয়োর, নেকড়ে, ছানারা পাখিদের সঙ্গে বাজনার তালে তালে হাত পা দুলিয়ে নাচ করতে পারে প্রথম দৃশ্যে তারপর ৮ থেকে ১৪ বছরের ছেলে মেয়েরা অভিনয় করবে। তাদের মুখে বিভিন্ন জেলার ভাষা বা উচ্চারণ পদ্ধতি দিয়ে দর্শককে আনন্দ দান করতে হবে। বাঁদরদের গা চুলকানো বা উকুন বাছার অভিনয়, ডিগবাজি খাওয়া, দাঁত খিঁচুনি – সব মিলিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করতে হবে।

আলো – প্রথমে আলো আঁধারি, পরে আস্তে আস্তে আলো বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা বাড়ানো হবে। মঞ্চে যে যখন কথা বলবে তার মুখে স্পট আলো ফেলা দরকার।

মাইক – গাছের ফাঁকে, অভিনেতার বুকে অথবা খুব নিচুতে ঝোলাতে হবে।

অভিনেতা চয়ন – অভিনেতা চয়ন খুব সচেতনভাবে করা প্রয়োজন। বাচ্চাদের চেহারা, চোখের চাহনি, নাচ বা অভিনয়ের পারদর্শিতা অনুযায়ী পার্ট দিতে হবে। মোটা সোটা ছেলে বা মেয়ে না পেলে বনরক্ষক হাতির অভিনয়ে একটু স্বাস্থবান বড় (১৫/১৬) ছেলে বা মেয়ে নেওয়া যেতে পারে।

নাটকটি শিশুদের জন্য লেখা হলেও এর মূল বক্তব্য – Conservation of forest and wild life

মূল বক্তব্য

স্বার্থপর “মানুষ” যেন ভুলে না যায় যে এই পৃথিবীটা “তার” একার নয়, গাছপালা, পশু-পাখি সবাইকেই বাঁচার অধিকার দিতে হবে।

প্রথম দৃশ্য

(গভীর জঙ্গলে প্রথমে কিছুক্ষন বাঘ সিংহের গর্জন, হায়নার হাঁসি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাবে, টুনি বাল্ব দিয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি পোকার জ্বলা ও নেভা। প্রথমে সিংহ ও পরে বাঘ এবং ভালুকের প্রবেশ।)

সিংহ – আমি পশুর রাজা, সবাইকে দিই সাজা, জন্তুগুলো পালায় কোথা? রক্ত খাবো তাজা।

বাঘ – হালুম হুলুম হালুম ! ওরে বাবারে গেলুম, জঙ্গল সব খালি হ’ল, খিদের জ্বালায় মলুম।

ভালুক – নমস্কার ! নমস্কার রাজামশাই, প্রাণটা করে আই ঢাই, হেথায় হোথায় ঘুরছি মরে, খাবার জিনিস কোথায় পাই?

(সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নি তাদের বাচ্চা ছানা পোনা নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবেন)

সিংহী – শিকার শিকার করছো ক্যানো, ছোট পশু যে হলো হাওয়া, গহন বনের আঁধার কোথায়, করবো যে আজ ওদের ধাওয়া !

বাঘিনী – সত্যি রে ভাই রানী দিদি, বাচ্চাদেরকে খাওয়াবো কি, উপোস করেই মরতে হবে, সর্বনাশ যে হল, দেখি !

সিংহী – গর্ত, গুহা নদীর বাঁকে, ছিল শাখে, পাতার ফাঁকে – চাঁদের আলোয় লুকোচুরি, ছানা পোনা লাফিয়ে গিয়ে – আসতো মুখে শিকার নিয়ে, করতো কতই বাহাদুরী।

ভালুক গিন্নি – সে সব কথা জাগায় ব্যাথা, মৌচাক সব হেথা হোথা, ঝরতো মধু সদায় সেথা; আজ সেই সব শাল কি সেগুন, ফোটায় না ফুল কোনো ফাগুন, শুনতে না পাই মৌমাছিদের, সেই সুমধুর গান গুনগুন।

বাঘ – হালুম হুলুম হুল, ভেবে না পাই কুল ! সিংহমশাই বিহিত করুন হচ্ছে কিসে ভুল?

সিংহ – আরে ভাইয়া কি যে হল, বিপদ বড়ই ঘনিয়ে এলো, জঙ্গল আর রইল না যে জন্তুরা সব হারিয়ে গেলো?

বাঘ – এখন বলুন উপায়টা কি? শেয়ালটাকে ডাকুন দেখি, গ্রাম শহরে খবর নিতে – আজকাল সে দিচ্ছে ফাঁকি।

ভালুক – শেয়াল মোদের গুপ্তচর – বনের ধারেই তার যে ঘর – পাণ্ড্যিত্ব দেখায় তো খুব এখন একটু কাজ তো কর।

গাছের ওপর একদল বাঁদরের আগমন তাদের কিচির মিচির আওয়াজে সবাই ওপরে তাকায়, সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নিরা – স্টেজের একদিকে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল – সিংহী এগিয়ে আসে –

সিংহী – চল চল সব ওদের পানে – লুকিয়ে পড়ি ঐ ওখানে – একটা বাঁদর ধরে খাই, বাচ্চাগুলোর প্রাণ বাঁচাই।

সিংহ (রাগত স্বরে) – আহা গিন্নি যাও বাড়ি যাও, পোকা মাকড় যা পাও খাওয়াও, এখন ওদের বড় দরকার ব্যাপারটা কি সেটা জানবার।

বাঘ – (মন্ত্রী) ওরে বাঁদর, হনু, বেবুন – একটুখানি এধারে শুন – শেয়ালটাকে আনতো ধরে, মেরেই ওকে করবো খুন।

বাঁদর – রাজামশাই, মন্ত্রীদাদা – আপনারা তো বড্ড হাঁদা – শেয়ালটাকে কোথায় পাবো? ওতো এখন ঘুমিয়ে কাদা।

ভালুক – মুখপোড়া তুই বলিস কিরে? থাকবে ওরা ঘুমের ঘোরে? বনের পশু যাচ্ছে মরে, সে কথা কি জানে না রে?

বাঘ – আগে মোরা সন্ধ্যাবেলা করতে যেতুম শিকার খেলা শেয়ালেরা গান শুনিয়ে, খুলতো মোদের কানের তালা। সিংহ বইতো কত গানের ভেলা, শুনতে পেতুম যাত্রা পালা।

ভালুক – সত্যি ভায়া যা বলেছো, ছিল বড়ই সুখের দিন, – চাঁদের আলো হলেই ক্ষীণ হরিণ, চিতল, বুনো শুয়োর নাচতো কেমন তা ধিন ধিন।

বাঘ, ভালুক, সিংহ (তিনজনে একসঙ্গে সুর করে) – আহা সে কি সুখের দিন, সন্ধ্যে হলেই ঝিঁ ঝিঁর বীন, – বাদল হলেই নাচতো ময়ূর – পেখম তুলে তা থৈ তিন।

সিংহী – বনরক্ষক হাতিরা সব শুঁড় দুলিয়ে কোথায় যায়? নেকড়ে শেয়াল ‘রা’ কাড়ে না, কেন এমন পালিয়ে বেড়ায়?

বাঘিনী – রাজপেয়াদা বানরগুলো, করছে দেখো ফোক্কড়ি, (সুর টেনে) ঘোর – “কলি যুগ” এলো বুঝি ওমা মোরা কি যে করি !

বাঘ (রাগত স্বরে) – বেগম, তুমি চুপ করবে? নাকে কান্না বন্ধ হবে? চলুন রাজা নদীর ধার, সাঁতার কেটে যায় উস পার, এই জঙ্গলটা হলো খালি, চারি ধারে ধুলো বালি।

সিংহী – তাই চলো ভাই, আমরা সবাই, পূর্ব হতে পশ্চিমে যাই, ভেবে ভেবে কূল নাহি পাই, কেন কাল কাটাই?

ভালুক (বিজ্ঞের মতন মাথা নেড়ে নেড়ে) – ওপারটারে দূরের থেকে, দেখতে কিন্তু লাগে ভালো, কাছে গিয়ে দেখবে শুধু, শহর বাজার আগুন আলো।

সবাই মিলে (হিংস্র পশুরা সবাই চলে যায়) – তবু চলো, দেখি চলো, . . . .হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই তাই চলো যাই।

বাঁদরদল (ওপর থেকে বাঁদরেরা ইয়ার্কির সুরে) – শ্যামল সবুজ নেইকো কোথাও, গাছপালা উদাও হল, নীল আকাশে ধোঁয়া কালো, ঘাস হীন মাঠ শুকনো ধুলো।       

হনুমানেরা – গাছের ফলে পেট ভরে না, তাই চলে যাই তীর্থস্থান, গণেশজীকে দুধ খাওয়াতে, ভক্ত মানুষ করছে গান। মোদের নামে ঠাকুর বানায়, লাড্ডু বোঁদে নিজেরা খায়, কদলী কি গাজর মুলী, ভুলেও কভু করে না দান।

একটা ছোট বাঁদর – ক্যামনে বাঁচে আমাগো জান, কি খায় বলো পোলা পান?

খালি স্টেজে এবার ধীরে ধীরে বাঁদরদের সঙ্গে অন্য ছোট পশুদের আগমন হয়। একধারে ময়ূর, হরিণ, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীদের প্রবেশ। প্রথমে ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক উঁকি মারে এবং তারপর সবাই গোল হয়ে দাঁড়ায়। বাজনা বাজতে থাকে তালে তালে সবাই দুলে দুলে গান গায়। মেঘ ডাকে মাঝখানে ময়ূরের নাচ শুরু হয়।

গান (লোকগীতির সুরে – ত্রি-তাল)

আমরা ছোটো জন্তু ভাই, –

এসো সবাই নাচি গাই,

বাঘ সিংহ পালিয়ে গেল,

আর তো কোনো চিন্তা নাই।

(খোল মৃদঙ্গ বাজবে)

ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই –

এসো ঠুংরি টপ্পা গাই,

হিংস্র পশু ওপার গেছে –

আমরা সবাই নাচি তাই।

নাচের তাল – তা থৈ থেই তাৎ,

আ থৈ থই তাত –

তিক দা তিকি তিকি তেই,

(কত্থকের তালে নৃত্য ৫ মিনিট)

(তারপর ভরত নাট্যমের তালে)

তই অম তাত্ তা, তই অম তা –

আ বৃষ্টি ঝেঁপে আ

মেঘ দেখে মন নাচেরে গা –

আয়রে তোরা তাল মেলা।

(প্রথমে মিউজিক দ্রুত হয় তারপর ধীরে ধীরে আওয়াজ প্রায় থেমে আসে, নাচ থেমে যায়।) স্টেজের দু দিক দিয়ে দুটি খরগোশ ছুটে আসে। সব পশুপাখি তখন পিছনে সেমি সার্কেলে দাঁড়িয়ে পড়ে।

খরগোশ (হাঁপাতে হাঁপাতে) – ও ভাই তোমরা নাচছো ক্যানো? সামনে বিপদ আসছে জেনো, খুশির সব ভুলে যাও, মোদের কথা একটু শোনো।

হরিণ, ইঁদুর – কেন কেন ব্যাপার কিরে? বাঘ ভাল্লুক আসছে ফিরে?

সবাই মিলে – সিংহ রাজাও আসছে বুঝি? গেলো তো সব নদীর পারে।

খরগোশ – না গো দাদা জন্তু নয়, ওদের দেখে লাগছে যে ভয়, নল – বন্দুক, ঘাড়ে নিয়ে, দুই পায়ে তো দাঁড়িয়ে রয়।

ময়ূর – ও মা গো মা, “মানুষ” ওরা, মহা পাঁজী হতচ্ছাড়া, ল্যাজ ধরে সব টানবে মোদের, সুযোগ পেলেই পাগল পারা।

ছোট্ট বাঁদর (সামনে এগিয়ে এসে) – শহর গঞ্জে গ্রামে থাকে, কাপড় দিয়ে দেহ ঢাকে, দয়া মায়া নেইকো মোটে, মানুষ নামে ওদের ডাকে।

(পাখিরা ভয় পেয়ে পেঁচা পেঁচীকে আওয়াজ করে জাগায়) ওপর দিকে তাকিয়ে –

টিয়া, ময়না – পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি, তাড়াতাড়ি নিচে আয়, সংকট আজ বড় মোদের, মানুষ বুঝি এসেই যায়।

পেঁচা (পেঁচা-পেঁচী গাছের থেকে নিচে নামে)       – নাতি নাতনিরা ক্যান চেঁচাস? কারণ বিনাই মাথা যে খাস ! কি হইস্যে বল তোদের? বনে আগুন লাগল কি ফের?    

ছোট্ট পাখি (সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে) – কিচিরমিচির ট্যাঁ ঠ্যাঁ, হর্ন বাজছে প্যাঁ প্যাঁ, ঢুকছে গাড়ি মানুষ নিয়ে এবারে কি হবে এ্যা এ্যা…..

বড় পাখি (বড় পাখিরাও কান্নার সুরে) – এ্যা এ্যা এ্যা এ্যা,  ভরবে খাঁচায় মোদের ছানা, কাটবে বড় পাখির ডানা, রাত দুপুরে ওদের হানা – কেমন করে করবো মানা, ঘৃণ্য যে কাজ ছ্যা ছ্যা ছ্যা মরতে হবে এবার তবে এ্যা এ্যা এ্য।

খরগোশ – মানুষেরা এলো বনে, জানোয়ারকে মারতে – চামড়া খুলে, মাংস খাবে, পারবে না কেউ বাঁচাতে।

পেঁচা – আগে ওরা আসতো শুধুই – করতে শিকার খেলা, এখন আসে অস্ত্র হাতে কাটতে যে গাছপালা।

বানর – ও মা – সে কি ! গাছ কাটবে? লাগবে ওদের কত ব্যাথা !

পাখিরা সবাই – ভাঙবে বাসা, টুটবে আশা, ডিম্ আমরা পারবো কোথা?

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে) – বাঘ, ভাল্লুক তো অনেক ভালো, খিদে পেলে তবেই খায়। ঘর পরিবার শেষ করে দেয় ! এরা যে মোদের মেরে মজা পায় !

হনুমান (বৃদ্ধ হনুমানের গম্ভীর আওয়াজে কটূক্তি – ক্রোধিত স্বরে) – এরা কি শুধুই পশু মারে? ভীষণ নিঠুর কুটিল প্রাণী, ভাই ভাইকে হত্যা করে – নিত্য এদের হানা-হানি। জায়গা জমি, টাকার তরে – আগুন লাগায় স্বজন ঘরে – ধর্ম নামের দোহায় দিয়ে – রক্ত ঝরায় নিজেও মরে।

(সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে উদাস হয়ে)

ছোট্ট ইঁদুর একবার ছুটে এদিকে একবার ওদিক করে দর্শকদের জানায় –

ইঁদুর – এক্ষুনি ভাই দেখে এলাম, আজব ব্যাপার খানা, – হাতি মামা বইছে মানুষ – করছে নাতো মানা। কাঠ কেটে সব মোট বেঁধেছে, পিঠে কাঠের বোঝা ঠাসা, বনরক্ষক ওদের চাকর, ওকে মানিয়েছে বেশ খাসা।

ময়না, টিয়া – দেখেছিলাম মোরাও সেদিন, ওদের যাওয়া আসা, বসিয়ে পিঠে জন্তু মানুষ, হাতির ভালোবাসা।

পেঁচা – দিনের বেলা চক্ষে কানা, এসব কথা নেই তো জানা, বুঝতে হবে ব্যাপারখানা, করছে না “সে” কেন মানা?

বাঁদর – হ্যাঁ ভাই চলো, করি গো খোঁজ, হাতি কেন ওঠাচ্ছে বোঝ।

হনুমান – সিংহ রাজায় খবর দে – সময় যে নাই, করতে মৌজ।

ময়ূর – হ্যাঁ ভাই সবাই, তাই চলো, এই খবরটা ওদের বলো – বনবাসী যে মোরা তাই – সবার বিপদ ঘনিয়ে এলো।

সবাই – আমরা যত পশু-পাখী ছোট বড় প্রাণী, বনের মধ্যে মিলে মিশে থাকতে সবাই জানি। হিংশ্র জন্তু, বিরাট ভীষণ – বাঘ সিংহ কাঁপায় যে বন, মোদের ওরা ভক্ষক হন, তবু ওদের “গুরু” মানি।

(সব পশুরা লাইন করে মঞ্চের এক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় আবার অন্য দিক দিয়ে প্রবেশ করে। মঞ্চ কয়েক মিনিটের জন্য অন্ধকার হয় এবং সেই সময় একটি বড় সাপ গাছ থেকে ঝুলে পড়ে – মুখে স্পট লাইট দেওয়া হয়। নেপথ্যে গান। গানের সুরে – “মন ডোলে মেরা তন্ ডোলে” হিন্দি গানের সুরেও গাওয়া যেতে পারে।)

সাপ – কোথা যাবি ভাই সব, বন কোথা পাবি রে? মানুষের জঙ্গলে পিষে মরে যাবি রে। মোরা এতো বিষধর, তবু নেই ভয় ডর, দেখলেই লাঠি মারে কেন এই অনাদর?

(সাপুড়ের বাঁশি ও বাজনা বাজবে, দুই হাত মাথার ওপর ফনার মতন তুলে মঞ্চে শুয়ে বসে মাথা দুলিয়ে সাপের নৃত্য চলবে দু মিনিট তারপর প্রস্থান এরপর বন বিড়ালী ও নেকড়ের প্রবেশ গালে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে বসা। ধীরে ধীরে পশুদের প্রবেশ – খরগোশ, হরিণ ও বাঁদর বনবিড়ালীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করে –

বাঁদর – বন বিড়ালী, বিল্লী মাসি একলা ক্যানো আছো বসি?

খরগোশ – উদাস বড় লাগছে তোমায়, কোথায় গেল মুখের হাসি?

বিল্লী – আমাদের মেরে ফেলে, লোম চামড়া নিচ্ছে খুলে থাকবো না আর এই বনেতে, মনের দুঃখে যাচ্ছি চলে।

নেকড়ে – মোদের লোমে পড়ে জামা, জুতো টুপি দস্তানা, মারলো মানুষ আমার মিত্র, কোথায় যে যাই? নেই ঠিকানা। গুন্ডা ওরা, ঘোরায় ছোড়া মাস্তানদের মস্তানা। ভবিষ্যৎ কি নেই জানা?

খরগোশ – মোদের সঙ্গে চলুন মশাই, রাজ দরবার যাচ্ছি সবাই, তাঁরা সতেজ বলশালী তাই, বিহিত একটা হবেই ভাই।

সবাই প্রস্থান করতে করতে – এসো মোরা আজ সব, করি কিছু অভিনব। কোরো না গো কলরব, দুঃখ হোক অনুভব।

(খালি মঞ্চে শুধু কটি গাছ। ভোরের আলো ফুটলে কয়েকটি মৌমাছি এবং প্রজাপতির আগমন)

মৌমাছি – প্রজাপতি, প্রজাপতি, কেন তোর দ্রুতগতি? দাঁড়া নারে একটুখানি, ফুলে ফুলে উড়ে যাবো, দুজনাতে মধু খাবো, বাগানের মোরা যে রানী।

প্রজাপতি – মৌচাকে ঢিল পড়লো এবার, মোম, মধু সব নিলো চোরে – মৌমাছি তুই এখনো ভাই, আছিস কেন ঘুমের ঘোরে?

মৌমাছি – করছে যারা সর্বনাশ, বল না কোথায় তাদের বাস? হুল ফুটিয়ে কুপোকাৎ, করবো আমি বাজি মাৎ।

প্রজাপতি – চল তবে দলে দলে, পশু সব যেথা চলে, গাছহীন শ্মশানে, মানুষের বনে বনে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

(দিনের আলো – বনের খোলা চত্বর – গাছ-পালা দূরে সরিয়ে মঞ্চে একদিকে ছোট পশুদের বসার জায়গা অন্যদিকে একটি উঁচু পাথরের ওপর রাজার সিংহাসন, ফুল পাতায় সাজানো, তারপাশে মন্ত্রী বাঘমশাই ও সেনাপতি ভালুক দাঁড়িয়ে আছে।)

বাঘ – হুঁ, তাহলে দেখি ব্যাপার স্যাপার বড়ই গুরুতর সবাই মিলে একসঙ্গে, বসে কিছু উপায় করো।

ভালুক – বন কেটে আজ মানুষ জাতি, বানিয়ে নিল শহর ঘর, বৃষ্টি বন্ধ, মাটি ফাটে, আসছে শুধুই ধুলোর ঝড়। পাহাড় মাথায় পাথর শুধু, মাঠের ওপার মরু ধু ধু – মৌচাকেতে নেইকো মধু, কী হবে এরপর?

হনুমান – তাই তো মোরা হেথায় এনু, দেখে শুনে ভয় যে পেনু, আমি এতো মোটা হনু, মানুষগুলো শীর্ণ তনু – তবু ওদের বন্দুক যে বাড়িয়ে দিল, মনের ডর।

খরগোশ – ঝোপ ঝাড় নেই  নদীর পাশেই, দালান বাড়ি গ্রাম শহর, ঝর্ণাগুলোও শুকিয়ে গেল, জল পাওয়া যে হয় দুষ্কর।

(সিংহের প্রবেশ – সবাই উঠে দাঁড়াল, ছোটরা রাজার পায়ে পড়ে গেল)

একসঙ্গে (হৈ চৈ হট্টগোল) – প্রণাম, প্রণাম, জয় মহারাজ, আমাদেরকে বাঁচাও হে আজ, ছোট্ট মোরা নিরীহ যে, বন বাঁচাতে দাও তবু কাজ।

সিংহ – আরে আরে থামো সব। কেন করো কলরব? দুঃখ কি বল তোমরা, করি আমি অনুভব।

(ছুটতে ছুটতে শেয়ালের প্রবেশ, সবাইকে একসঙ্গে দেখে ঘাবড়ে যায়, মঞ্চের সামনে এসে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে। শেয়ালের ডাক হুয়া হুয়া হুক্কা হুয়া)

শেয়াল – (তারপর রাজার দিকে ফিরে) একী দৃশ্য অভিনব! বড় ছোট এক হলো সব, কিসের তরে এ উৎসব – করেন রাজা সভা? ডেকে পাঠান আমায় কেন, বিপদ আভাস পেল যেন, বনের প্রান্তে লাগলো আগুন, আকাশে লাল আভা। এই যে হুজুর সেলাম সেলাম ! একটু আগেই খবর পেলাম, আপনি আমায় তলব দেছেন, তাইতো ছুটে এলাম।

সিংহ (রাগতভাবে) – গর্ত্তে কেন সেঁধিয়ে থাকো? শত্রুদের কি খবর রাখো? জানোয়ারদের বিপদ কত, সে কথাটি জানো না কো?

বাঘ – গুপ্তচর যে পশুর তুমি, ছাড়লে কেন বনের ভূমি? গানের রেওয়াজ করছো না আর বানলে চেলা জানি না কার? ভুললে কি ভাই সবুজ বনের, কোমল নরম জমি? জানো না কি এ অরণ্য আজকে কত দামি!

শেয়াল – মন্ত্রী, রাজা কোরো না রোষ – বিচার করো দিও না দোষ। যেথায় সেথায় মরি ঘুরে, মানুষ সদাই তাড়াকরে কুকুর ভয়ে লুকিয়ে থাকি – বাচ্চা কাচ্চা গেল, মরে। দুঃখ জানাই কেমন করে? করছি শুধু আফশোষ। সিংহ রাজা ক্ষমা করো, রেখো না হে আক্রোশ।

(খরগোশ হঠাৎ আবেগ প্রবন স্বরে রাজার সামনে লুটোপুটি খায়)

খরগোশ – রাজামশাই মোদের কে খাও, তুমি তোমার জোর বাড়াও তারপরেতে ঝাঁপিয়ে পড়ো মানুষগুলো তাড়িয়ে দাও।

হরিণ – হ্যাঁ মহারাজ আমাকে খাও, বাচ্চাদের তো তুমি বাঁচাও।

পাখী – ডিমগুলো তো ফুটতে দাও, কাঠুরেকে মেরে খাও।

পেঁচা – গাছপালা সব সাবাড় হলে, ঘর বংশ থাকবে না তাও।

ভালুক – আগে চলো হাতির কাছে, দেখি কি যে উপায় আছে! বিশাল দেহের শক্তি কেন, ক্ষয় করে সে মানুষ পিছে।

বাঘ – হাতি মোদের বন রক্ষক, এমন শক্তিশালী তাকেও ওরা বশ করেছে, বোঝা সে বয় খালি।

সিংহ – মানব জন্তু এই পৃথিবীর, সবচেয়ে অধিক বুদ্ধিমান, অস্ত্র হতে ক্যামনে আমি, বাঁচাই তোদের কোমল জান?

হনুমান – হে মা তুমি বনদেবী, রাখো সকল পশুর মান। সবাই মিলে একসঙ্গে, যুদ্ধ করে বাঁচাবো প্রাণ।

সবাই একসঙ্গে – চলো সবাই মিছিল করে, প্রথমে যাই হাতির কাছে, নখ, দাঁত, শিং বাগিয়ে ধর – যার যা কিছু অস্ত্র আছে।

(পশু-পাখী চলে গেছে এবার গাছপালার গান ধরে। শারীরিক বেশি স্বাস্থবান শিশু বা যে কোনো কারণে যারা মঞ্চে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের এই সব গাছ পালার অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। গানের সুরে – রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদী বা দিজেন্দ্রগীতি। শ্যামাসংগীতের সুরেও হতে পারে।)

বড় গাছ – কী আনন্দ কী আনন্দ, উঠল জেগে, আমার মন, পশু-পাখী জানোয়ার, হ’ল সব সচেতন। আমরা যত গাছ-পালা, হলাম বড় আজ উতলা, দাঁড়িয়ে থাকি – আঁকড়ে মাটি, মনের কথা হয় না বলা।

ছোট গাছ – কাটছে মানুষ সারাক্ষন, কাঠের লোভে অরণ্য বন, এই প্রকৃতি সদায় ভোলা, জানে না কে আপনজন।

বড় গাছ – মূক করেছেন. ভগবান, দেছেন, অসীম শক্তি দান, ভুলেই গেছে মানব বুঝি – মোদের বুকেও আছে যে প্রাণ। আমরা যে দিই শুদ্ধ হাওয়া – অক্সিজেনে ভরা, আমরা করি শ্যামল কোমল, স্নিগ্ধ সবুজ ধরা। ইচ্ছে করে এ ডাল দিয়ে, আঘাত হানি জোরে। পশু-পাখীর সঙ্গে গিয়ে শেষ করি শত্রুরে। মা, মা গো মা গো বিনাশ হতে বাঁচাও তুমি – রক্ষা করো মোদের সবারে।

সবাই একসঙ্গে – বাঁচাও অরণ্যেরে।

তৃতীয় দৃশ্য

(হাতি বনের এক প্রান্তে শেকল দিয়ে বাঁধা আছে এবং বার বার শুঁড় দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে তার দুঃখ ব্যক্ত করে। করুন বাঁশির সুর আবহ সংগীতে)

হাতি (মোটা গলায় গান) – হে ভগবান রাজার রাজা, আমাকে দাও এ কোন সাজা? মানব ছিল, তোমার প্রজা, আজ ধরণী রাজ করে – নিষ্ঠূর সে, অবুঝ প্রাণী, পশুর পরে আঘাত হানি, বনের থেকে আনলো টানি – বশ করে বা চাবুক মেরে।

(বাঘ সিংহের প্রবেশ)

সিংহ – নমস্কার নমস্কার হাতি মামা, এ কী হল তোমার হাল? চোখের জলে শুঁড় ভেসে যায় – কোথায় গেল মত্ত চাল?

হাতি – কী আর তোদের বলবো রে হায় – কেমনভাবে দিন কেটে যায়, সারা দেহে মারের আঘাত – মরছি আমি যন্ত্রনায়।

পাখীর দল-পেঁচা – তাইতো আহা হাতি দাদা, তোমা গো এই দশা! দুঃখ মোদের রাখমু কোথা? পায় না খুঁজে ভাষা।

হাতি – দেখো, আমার পায়ে শেকল, শরীরে নাই আর কোনো বল, কাঠের বোঝা চাপিয়ে পিঠে – পাচ্ছে মজা মানুষ দল।

ভালুক – আমরা তোমার সমব্যাথী, তাই তো সবাই হলাম সাথী, মুক্ত করবো যেমন করেই হোক, তারপরেতে কাল প্রভাতে বনের পশু সব একসাথে, মারবো যত কুটিল বোকা লোক।

বাঘ – বেকার কথাই সময় কাবার – রাজা, আপনি আদেশ করুন, শিকারী ও কাঠুরে কে জব্দ করবো, কখন বলুন?

সিংহ – আগে এস সবাই মিলে, হাতি মামাকে দিই খুলে, তারপর প্রস্তুত হও, যার আছে যা অস্ত্র লও।

(সেনাপতি ও মন্ত্রী একসঙ্গে আদেশ দেয় – মার্চের সুরে বাজনা বাজবে চল-চল-চল গান। সাবধান, বিশ্রাম। সাবধান, আগুয়ান। সবাই লাইন করে দাঁড়ায় এবং বাজনার তালে তালে শেকল খোলা হয়।)

বাঘ, সিংহ – জোর লাগাকে

ছোট পশুর দল – হেঁ-ই-সা

বড়রা – শেকল হোক না

ছোটরা – ক্যায়সা

বড় – হাতি মামাকে

ছোট – মুক্ত কর

বড় ও ছোটরা মিলে – আগে ছিল জ্যায়সা। হেঁ-ই-ও মারো হেঁ-ই-সা, জোর লাগাকে হেঁ-ই-সা…)

(হাতি মুক্ত হয়ে যায়। পশুরা সবাই আনন্দে হাততালি দেয়। এবারে সবাই সিরিয়াস হয়ে দাঁড়ায়।)

সিংহ – সেনাপতি ভালু দাদা – কোথায় গেল রাজ পেয়াদা?

বাঁদর – (স্যালুট করে পা ঠুকে আগে এসে দাঁড়ায়) পশুদের মর্যাদা রাখবো যে মোরা সদা।

(বাজনা দ্রুত হয় এবং জন্তুরাও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়)

হাতি – বড় বড় দাঁতগুলো ভগবান যদি দিল, কেন তারে রাখি শুধু সাজিয়ে, শত্রু যে দিনে দিনে আমাদের নিল কিনে, আজ দেব তার ভুঁড়ি ফাটিয়ে।

হরিণ – সুন্দর দাঁত মোর চোখে যেন লাগে ঘোর, কাজে কেন এতদিন লাগেনি? নিজ মনে করি বাস, খাই লতা পাতা ঘাস, রাগ দ্বেষ মনে কভু জাগেনি, এই শিঙে দেব ধার, তেড়ে যাব বার বার – থেমে যাবে মানুষের বকুনি।

বাঘ – গদা সম থাবা মম হবে তার যম রে – শিকারীকে চিৎপাত, করে নেবো দম হে।

একসঙ্গে – শিঙ সব করি ধার –

তিনজনে – দাঁত সাজিয়ে রাখবো না আর,

বাঁদর – মল্ল যুদ্ধ করব আমি, মাথায় চাঁটি মারবো কার?

বাঘ – দয়া মায়া করব না রে, ঘাড় মটকে দেব এবার।

পেঁচা – ঠোকর খেয়ে মানবে হার,

পেঁচী – যমের দুয়ার হবে যে পার।

(বাঁদর, হনু জুডো ক্যারাটের ভঙ্গি করে সবাই খুব এক্সসাইটেড হয়ে ওঠে)

হরিণ – বোকা ভাবে আমাদের? গুঁতো খেলে পাবে টের।

বন বিড়ালী – নখ দিয়ে আঁচড়াবো, তেজ দেখো নখুনের।

সাপ – দংশনে যাবি জ্বলে, বিষ তাতে দেব গুলে, বিদ্রোহী হবি আয়, ভালো কথা যা রে ভুলে।

সিংহ – জিতে যায় ওরা সদা, বুদ্ধি ও ছলে বলে, মোরা যদি এক হই – লড়ে যাই কৌশলে – দুর্ব্বল মানুষের তাহলে কি আর চলে? আলোড়ন আজ তুলে, পশু চলে দলে দলে।

হাতি – ছোট বড় সক্কলে, যদি এক জোট হলে তাড়াতাড়ি চলো – তবে, হেরে যাবো দেরী হলে।

(বড় পশুরা পিছিয়ে যায় ছোটদের দল এগিয়ে আসে)

খরগোশ – সজারুর এই কাঁটাগুলো, ফুটিয়ে দেব ওদের পায়ে,

বাঁদর – ল্যাজ দিয়ে  আজ জোরে জোরে, মারবো ঝাপট সারা গায়ে।\

পেঁচা – চাঁচা ঠোঁটে ফুটো করি, টাক – মাথা – তালু আয়,

হরিণ – অক্কা পাবে শিকারী দল, করবে মানুষ হায় হায়।

ভালুক – চুপ চুপ কথা নয়, আসছে যেন কারা, লুকিয়ে পড়ো ঝোপে ঝাড়ে, ডাকলে দিও সাড়া।

(কেউ কেউ তখুনি গা ঢাকা দেয়, কেউ বা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে জায়গা খোঁজে)

খরগোশ – সেনাপতি বললেন লুকিয়ে পড়ো, ঐ গাছটাতে তোমরা চড়ো।

বাঁদর – চুপ চুপ একদম কেউ না ন’ড়ো, বুঝে সুঝে কাজ করো, বিপদ যে বড়ো

(মঞ্চ অন্ধকার, শুধু টুনি বাল্ব দিয়ে পশুদের চোখ জ্বলবে নিভবে। তার মধ্যে গলা শোনা যাবে -)

শেয়াল – মানুষগুলো রাতকানা ভাই, গাঢ় আঁধার হলে কালো, দেখতে পায় না মোদের মতন, নেইতো ওদের চোখের আলো।

সিংহ – করো নাকো ফিস ফাস, ধীরে ধীরে নাও শ্বাস, শত্রু যে বুঝে যাবে, পশুদের কোথা বাস। অতি চালু জেনো ওরা, দিও না হে অবকাশ, গুলি গোলা ছুঁড়ে দিলে, সাঙ্গ যে হবে আশ।

(মঞ্চ নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়)

ছোট্ট একটা পাখী – আমার বড় ভয় করছে, আমি যে রাত কানা। পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি কোথায় তোমার ডানা?

পেঁচা – চুপ চাপ সরে আয়, ডাকা ডাকি করো না, শোনা যায় শব্দ যে, মানুষের আনা গোনা।

চতুর্থ দৃশ্য

(জানোয়ারের দল মঞ্চে নেই, বন্দুক ও কুঠার হাতে শিকারী ও কাঠুরিয়াদের দল)

গান

কাঠুরে – এসেছি আজ কুঠার হাতে, পড়েছি এই সাজ, গাছ কাটবো, বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ।

শিকারী – জঙ্গলের এই পশুগুলি – মরবে সবাই খেয়ে গুলি – মানুষ জাতিই করবে শুধু, এই জগতে রাজ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ)

দু দল – প্রাণী মারতে, ডাল কাটতে – নেই কো মোদের লাজ, শক্তিশালী, আমরা যে তাই, বাঁচবো শুধু আজ, মানুষ জাতির জয়ের ধ্বজা – উড়বে জগৎ মাঝ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মুখ্য কাজ।)

(তালে তালে নৃত্য, বাজনার তাল দ্রুত। গাছ কাটবার আওয়াজও শোনা যাবে। সবাই অর্ধ গোলাকারে দাঁড়াবে, এক একজন আগে এগিয়ে এসে কথা বলবে।)

প্রথম শিকারী – রাত্রি বেলা আমরা আসি, মারতে পশু ভালোবাসি, নিরীহ বা হিংস্র সবই – অস্ত্র দিয়ে আজ বিনাশী।

দ্বিতীয় শিকারী – আহম্মক সব বৈজ্ঞানিক, যতই মোদের জ্ঞান ট্যান দিক – উড়িয়ে যে দিই, আমরা হাসি। চামড়া, শিঙ আর লোম, দাঁত, নখ বিক্রি করে হিসেব কষি।

তৃতীয় জন – সবচেয়ে বড় অর্থ বল, বনছে নতুন যাঁতার কল, তাই এসেছি এই জঙ্গল – ধরতে জন্তু আজ সবল, চিড়িয়াঘর কি সার্কাসে, শিশু বুড়োর দল আসে, আনন্দেতে সব ভাসে, পয়সা বানায় অবিরল।

চতুর্থ জন – ভালুক, বাঁদর, সাপ নাচাই – রাস্তা ঘাটে দু পয়সা পাই, ওদের নামেই অন্ন খাই – (হাঃ হাঃ হাঃ) আমরা বড়োই দুষ্টু ভাই।

প্রথম জন – কাঠের গুঁড়ি, বানায় বাড়ি – আসবাব আর রেলের গাড়ি, দরজা, জানলা, চেয়ার টেবিল – নৌকা, ছড়ি, মই ও সিঁড়ি।

দ্বিতীয় জন – তাইতো কাটি হাজার বৃক্ষ, বন বিনাশে নেইকো দুঃখ, এই ধরণীর ভূমি রুক্ষ – হবে খুবই তাড়াতাড়ি।

তৃতীয় জন – জন্তু যত বন্য, ভরা এ অরণ্য, মোদের সুখের জন্য, করত জীবন দান।

চতুর্থ জন – পন্থা নেব অন্য, বন যে হবে শূন্য – গাছ-পালা নগন্য হারাবে সব প্রাণ।

প্রথম ও দ্বিতীয় (একসাথে গান গেয়ে) – বলছে যারা মোদের বোকা, লাগবে চোখে তাদের ধোকা, করবো জমি বাগান ফাঁকা – গাইব তবে জয়ের গান। বাস করব আমরা একা, সিমেন্ট কাঠে শহর ঢাকা, ঘুরবে শুধুই গাড়ির চাকা, পশু পাখীর নেই কো ত্রাণ।

(মানুষের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পেছন থেকে সিংহের গর্জন)

সিংহী – হাতিয়ার ধরে সব হয়ে যাও সাবধান। নখ, দাঁত সব বের করো, হও সবে আগুয়ান।

(মানুষ হতচকিত হয়ে এধার ওধার ছুটোছুটি করতে থাকে – হাতি প্রথমে প্রবেশ করে শুঁড় দুলিয়ে বলতে থাকে)

হাতি – গাছ-পালা হীন এ সংসারে – বাঁচবি ওরে কেমন করে? জল হাওয়া সব ফুরিয়ে যাবে! বৃষ্টি বাদল বন্ধ হবে! ভগবানের প্রকৃতিকে – কেন রে তুই করবি ক্ষয়?

হনুমান – আহা কি ওর বুদ্ধি বহর! গড়বে নগর, গ্রাম ও শহর? চিবিয়ে খাবে শুধুই পাথর – করিস যদি প্রাণের লয়; লতা-পাতা ফুল না রবে! এই পৃথিবী কে সাজাবে? ফল ওষুধি কোথায় পাবে? সময় শুধু অপচয়। এই জগতে নিষ্ঠুরদের কখনও কি হয় রে জয়?

বাঘ, ভালুক – বড় ছোট জোট বেঁধেছি – আর তো তোদের করি না ভয় –

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে হটাৎ প্রবেশ করে) – মানুষ তোমায় হারিয়ে দেব, “বনদেবীর” হবেই জয়।

ভালুক (সেনাপতির আদেশ শোনা যায়) – আক্রমণ, আক্রমণ! ঝাঁপিয়ে পড়ো পশুগণ,নিষ্ঠুর তুই মানুষ জন্তু, এলো যে তোর মরণ ক্ষণ।

(মঞ্চে দুই ভাগে মানুষ ও পশুর অবস্থান। মানুষ আত্মরক্ষার সুযোগ পায় না, লড়াই করতে অসমর্থ হয়ে পালাতে থাকে। একই জায়গায় ছোটার অভিনয় – চিৎকার শোনা যায়)

পশুর দল – আক্রমণ ! আক্রমণ !

মানুষ দল – পলায়ন – পলায়ন ….

(এই যুদ্ধটি মঞ্চে সব অভিনেতাদের সরিয়ে বড় পর্দায় পেছনে ছায়া নৃত্যে অ্যাকশন দেখানো যেতে পারে। বারবার লড়াইয়ের অভিনয় এবং কাঠুরে ও শিকারীর পলায়ন) মানুষের প্রস্থান –

পশুদের গান – আমরা সবাই বন্য প্রাণী – বনের মধ্যে বাস, বন রক্ষার পণ করেছি – বন দেবীর দাস। গাছ আমাদের মাতা পিতা, গাছের মতন বন্ধু নাই। অরণ্যকে রাখতে সজীব, সবাই মিলে লড়বো ভাই।

পাখীর গান – রোধ করব এই পৃথিবীর – পরিবেশের যত দূষণ, লতা পাতায় সাজবে – ধরা, পরবে ফুলের নতুন ভূষণ। বনের মর্ম, আসল ধর্ম, অবুঝ মানব জানবে যখন – শুদ্ধ হবে, জল হাওয়া সব, ধন্য হবে মোদের জীবন।

সবাই মিলে – মানুষ জন্তু হারল আজি, আর তো মোদের নেইকো ভয়, জয় জয় আজ বৃক্ষ মায়ের জয় জয় “বন রাজের” জয়।

সমাপ্ত