পেত্নীর প্রলাপ (একাঙ্ক নাটিকা) (Petnir Prolap)

চন্দনা সেনগুপ্ত





[মঞ্চ সজ্জা – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড। একটি মহিলা বিভাগের ঘরে সারি সারি ৮টি বিছানা, পাশে নার্স দিদিমনির টেবিল ও চেয়ার পাতা। (সাদা সাদা চাদরে ঢাকা বেডে বিভিন্ন বয়সের রুগী।]

                       কুশীলব – (পাত্র - পাত্রী)

সিস্টার নার্স – (মধ্যবয়স্ক মহিলা)

উকিল দিদি – (কালো কোটটি বার বার পড়েন আর খোলেন, বেশ ব্যাসক্তিত্বপূর্ন চেহারা)

বড় দিদিমনি – (স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, নাকের ওপরে চশমা, বেশ কড়া মেজাজের বয়স্ক মহিলা)

নেতা বা সমাজ সেবিকা – সাধারণ সাদা শাড়ি পরনে, শান্ত মহিলা কিন্তু বেশ কর্ম চঞ্চল, নেত্রী (বছর ৪০–এর)

ছাত্রী – (দুজন আধুনিক পোষাকে)

লেডি পুলিশ – (হাতে লাঠি, পরনে খাঁকি প্যান্ট, কর্কশ কণ্ঠ, ধমকের সুরে কথা বলেন)

অভিনেত্রী – (খুব সাজগোজ ও সুন্দরী মডেল, ন্যাকা ন্যাকা ভাব, জিন্স ও টি–শার্ট পরে)

ঝাড়ুদারনী – (বিহারের মহিলা, সামনে আঁচল, মাথায় ঘোমটা, হাতে ঝাড়ু)

বাজনা – প্রথমে বাঁশি, সেতার ও হারমোনিয়াম

                প্রথম দৃশ্য – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড

নার্স মেট্রন – (রুগীদের দিকে এগিয়ে এসে) এই যে ম্যাডামরা, অক্সিজেন মাক্সটা ঠিক করে লাগান। আপনাদের কোভিড হয়েছে, ভুলে যাচ্ছেন কেন।

গৃহবধূ – সত্যি সিস্টার আপনাদের দেখে অবাক লাগে। এই ওষুধের গন্ধে কি করে যে থাকেন, কষ্ট হয় না?

নার্স – কষ্ট হলে সেবা করব কেমন করে ভাই। কিন্তু আপনি এখন মাস্ক খুলে কোথায় যাচ্ছেন? একদম উঠবেন না।

উকিল ম্যাডাম – ও সিস্টার একটু এদিকে আসুন তো।

নার্স – এলাম এবার বলুন কি চাই?

উকিল – আমাকে একটা ল্যাপটপ আনিয়ে দিন না। শুয়ে শুয়ে এতদিন ভী–ষ–ণ বোর হয়ে গেছি। আজকে খুব ভালো লাগছে। শরীরটা একেবারে ঝরঝরে – যেন আর কোনো রোগ জ্বালাই নেই।

নার্স – তাই নাকি? কই দেখি দেখি। অক্সিডেশন একেবারে চল্লিশের নিচে। ও মা – (দর্শকের দিকে ফিরে – উনি তো আর বেঁচে নেই)

উকিল – কি বলছেন বিড় বিড় করে? আমাকে ঠিকমত এটেন্ড না করলে এখন থেকে ছাড়া পেয়েই আপনার নাম একটা কেস ঠুকে দেব।

বড়দিদিমনি – আঃ কী আরাম। দেখো ভাই উকিল ম্যাডাম তোমার মতন আমারও আর কোনও শ্বাস কষ্ট নেই।

গৃহবধূ – আমারও তো মনে হচ্ছে সকালে উঠেই. আমি একেবারে ভালো হয়ে গেছি। তাহলে এবার আমাদের ডিসচার্জ করে দেবে মনে হয়।

উকিল – হ্যাঁ, ছুটি দিয়ে দেবে নিশ্চয়।

নার্স – এবার আপনাদের তো একেবারেই ছুটি হয়ে গেল। এখানে আর থাকতে হবে না।

অভিনেত্রী – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়) কী মজা আমাকেও ছেড়ে দেবে মনে হয়। কতগুলো ছবির শুটিং চলছে, এখানে পড়ে থাকলে চলবে না কি? সিস্টার, সিস্টার – 

নার্স – হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনিও আর জীবিত নেই। ভেন্টিলেশনটি তাইতো খুলে নেওয়া হয়েছে।

অভিনেত্রী – মানে? কি বলতে চান আপনি, আমি এখন ভূত হয়ে গেছি?

উকিল – চুপ একদম বাজে বকবে না, বললেই হল? এস আগে আমার জেরা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক ভাবে দাও, সাক্ষী নিয়ে এস, প্রমান করো যে আমি বা এঁরা কেউ বেঁচে নেই।

ছাত্রী – আরে আপনারা সবাই একটু চুপ করুন না, আমি পরীক্ষার পড়া মুখুস্ত করছি।

অন্য ছাত্রী – রাখতো তোর সবসময় ঐ পড়া পড়া খেলাটা। মুখস্ত বিদ্যা করে কি কোভিড তাড়ানো যায়? এটা হাসপাতাল।

ছাত্রী – তা আমার তো এখন জ্বর, কাশি কিছুই নেই তাই –

গৃহবধূ – তাই কি ভাই? আমারও তো সব রোগের উপশম হয়ে গেল, কত আরাম লাগছে এখন, খিদেও পাচ্ছে খুব। তারমানে আমিও ভালো হয়ে গেছি।

নার্স – না আপনারও পরপারের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

গৃহবধূ – অ্যাঁ কি বলেরে সিস্টার ! হাসপাতালের রুগীদের তোমরা মনোবল বাড়ানোর বদলে এমন নেগেটিভ কথা বলছো কেন দিদি?

দিদিমনি – আমারও এসব নেগেটিভ কথাবার্তা একদম ভালো লাগছে না। এই নার্সের নামে আমি নালিশ করব।

নার্স – যান, যেখানে খুশি যান।

নেত্রী – (এতক্ষন ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন) – হটাৎ উঠে তেড়ে এলেন নার্সের দিকে। আমি এই রাজ্যের এম এল এ। আমাকে বলুন তো কে আপনাদের জ্বালাতন করছে?

অভিনেত্রী – দেখুন না ন্যাতা ম্যাডাম –

নেত্রী – এই আমি ন্যাতা নই, নেতা – মানে নেত্রী। সমাজ সেবার জন্যই তো এখানে আসা।

উকিল ম্যাম – এই সিস্টার বলছেন যে আমরা নাকি মরে গেছি। এদিকে সাক্ষী সাবুদ কিছুই জোগাড় করেনি, কি করে মরলাম, কে মারলো, কখন –

দিদিমনি – আরে থামুন তো আপনি। আগে ডাক্তার কে ডাকুন, তিনিই পরীক্ষা করে ঠিক ঠিক রায় দেবেন।

অভিনেত্রী – (ছাত্রীকে) এই মেয়ে দেখতো ওনার নাকে হাত দিয়ে শ্বাস পড়ছে কিনা।

ছাত্রী – উকিল ম্যামের – নাঃ এনার তো নাক দিয়ে অক্সিজেন ভেতরে ঢুকছে না, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ও বেরোচ্ছে না। ইনি সত্যিই মৃত।

বড়দিদিমনি – আমি হলাম গিয়ে তোমাদের মহারানী বিদ্যালয়ের বড়দিদিমনি, কত প্রশ্নপত্র তৈরী করা এখনও বাকি। এত তাড়াতাড়ি মরলে চলবে কেন?

গৃহবধূ – কিন্তু সেটাই তো হয়েছে, আমারও নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। (নিজের নাড়ি টিপতে থাকেন বারবার)

অভিনেত্রী – দেখুন আমিও এখন আর জীবন্ত নেই। প্রাণ পাখিটা যে কোথায় উঠে গেল ! এখন আমি মুক্ত। এবার পরীর মতন উড়তে পারব।

গৃহবধূ – আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। একটু পরিবেশটা হালকা করে দাও না ভাই নায়িকা দিদি। কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা ভয় ভয় ফিলিং হচ্ছে।

অভিনেত্রী – সুচিত্রা সেন, মাধবী না সাবিত্রী কার অভিনয় দেখাবো?

ছাত্রী – ধুর, ওরা তো সব আমাদের মা – ঠাকুমার প্রিয় নায়িকা, এখনকার কিছু করো না।

গৃহবধূ – শ্রীদেবীর সেই "ম্যায় নাগিন তু সপেরা" করো না ভাই, মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

অভিনেত্রী –                গান নাঁকি সুরে –
                  অমাবস্যার রাতে, চাঁদ ধরি আঙিনাতে
                        এসো এসো নিরালাতে,
                         চুপি চুপি কথা বলি,
                        প্রেমিক নায়কের সাথে।

উকিল / বড়দিদিমনি / গৃহবধূ – ওরে বাবা এর গলার আওয়াজটা তো অন্যরকম লাগছে। ও কি পেত্নী তাহলে?

নার্স – হ্যাঁ শুধু ও নয় তোমরাও সবাই কাল রাত্রেই মারা গেছো। দেহগুলো প্লাস্টিকে পুড়ে ফেলে দিয়েছি, এখন তোমরা মিথ্যে এসব পেত্নীর প্রলাপ বকছো।

নার্স – (হঠাৎ ঘুরে) মাথায় হাত দিয়ে ও বাবা আমার কি শেষ সময় আসতে আর দেরী নেই। না আমিও মরে গেছি?

গৃহবধূ – হ্যাঁ সিস্টার, তা নইলে তুমি আমাদের মতন ভূত প্রেতদের সঙ্গে থাকবে কি করে। তোমার প্রান্তি আর দেহের মধ্যে নেই।

নার্স – না না আমি বেঁচে আছি।

অন্যেরা – একেবারেই তা সত্যি নয়। তুমিও আমাদের দলে যোগদান করে ভূত হয়েছো, তাইতো আমাদের সঙ্গে এতক্ষন ধরে বচসা করে চলেছো।

ছাত্রী – চলো তবে সবাইমিলে একটু ভূতলামী করা যাক।

দিদিমনি – সেটা আবার কি?

ছাত্রী – মদ খেয়ে যেমন মাতলামী করে, তেমনি আনন্দে আবেগে আমরা বেশী আনন্দ করব।

গৃহবধূ – হ্যাঁ, সেই ভাল, চলো একটু গল্প গুজব করি, সবাইমিলে একসঙ্গে বসি।

বড়দিদিমনি – হ্যাঁ, গল্পের চেয়ে তো তোদের 'গুজবে' বেশী মন টানে।

ছাত্রী – কেন দিদিমনি কি হয়েছে তাতে? ন্যাতা ম্যাডাম আপনি অমন গুমসুম কেন কিছু বলুন। আপনিও তো এখন পেত্নীদের সমাজসেবী হয়ে গেছেন।

উকিল – ও মনে হয় এখন জ্বালাময়ী ভাষণ তৈরী করছে। ভূতের রাজ্যেও যদি ভোট হয় তাহলে ওকে ইলেকশন লড়তে হবে।

গৃহবধূ – তার আগে দাঁড়াও আগে আমরা গুজবগুলো ছড়ায়।

ছাত্রী – কি হয়েছে বৌদি বলুন না খুলে।

নার্স – এখানে গোলমাল করবেন না আপনারা। তর্ক বিতর্ক করতে হয় তো ঐ ওদিকের শ্মশানে চলে যান।

গৃহবধূ – কেন যাবো আপনার কথায়? এই হাসপাতালটায় এখন আমাদের ঘর।

নার্স – দাঁড়ান আমি এখনই লেডি পুলিশ ডাকছি। আপনারা অসুস্থ রুগিনীদের শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছেন না।
(হৈ চৈ ঝগড়াঝাটি শুরু হয়ে গেল) (লেডি পুলিশের প্রবেশ)

পুলিশ দিদি – হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমায় এই জেনানা ওয়ার্ডে পাঠালেন, এখানে নাকি খুব গোলমাল করছে করা।

ছাত্রী – এই যে পুলিশ ম্যাডাম এদিকে আসুন। এই সিস্টার কে এখন থেকে নিয়ে যান আর আমাদের অন্য সেবিকা দিন।

পুলিশ দিদি – আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমাকে বলা হয়েছে যে তোমাদের সব বেড খালি করাতে। নয়তো এই ডান্ডার বাড়ি খাবে বলে দিলাম।

গৃহবধূ – অ্যাঁ, মগের মুলুক নাকি? মারলেই হলো? (দর্শকের দিকে ফিরে) কতদিন পরে সংসার থেকে একটু ছুটি পেয়ে এখানে সাদা বিছানায় আরাম করছিলাম, আর উনি বললেই খালি করে দিতে হবে।

উকিল – বেশী জ্বালাতন করলে তোমার নামে এমন একখানা কেস ঠুকে দেবো না, বুঝবে তখন বাছাধন – কত ধানে কত চাল।

ছাত্রী – থামুন তো ম্যাডাম। আপনাকে আর কেস ঠুকতে হবে না, আগে নিজে বেঁচে থাকাটা প্রমান করুন দেখি।

নেত্রী – সমবেত ভদ্রমহোদয়া গণ, এখন আমার কথাটা মন দিয়ে শুনুন।

নার্স – আপনারা কেউ আর ভদ্রমহোদয়া নেই সব পেত্নী হয়ে গেছেন। সেই কথাটা কিছুতেই বুঝতে কেন পাচ্ছেন না কেন বলুন তো।

অভিনেত্রী – আমার কিন্তু বেশ বিশ্বাস হচ্ছে। কারণ মনটা বড় ফুরফুরে লাগছে।

বড়দিদিমনি – আমিও গীতার সেই স্থীতপ্রজ্ঞের মতন শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেছি। দুঃখে সুখে বিচলিত হচ্ছি না। তার মানে আমিও আর মানবী নেই মনে হয়।

পুলিশ – ছাত্রীকে তাড়া করতে করতে চলুন বাইরে চলুন। কিন্তু ওদের গায়ে ডান্ডা কেন লাগছে না। – অন্যদিকে গৃবধূকে – আয় তোকে চুলের মুঠি ধরে বের করে নিয়ে যাব।

গৃহবধূ – ধরো তো দেখি।

পুলিশ – এ কি রে বাবা এরও তো চুল দেহ কিছুই নেই শুধুই ছায়া।

নার্স – ঐ উকিল ম্যাডাম কে আগে নিয়ে যাও, আর ওদিকের ঐ ন্যাতা ম্যাম কে। ওরাই বেশী হল্লা করছেন এতক্ষন ধরে।

       (পুলিশ ধরতে যাওয়ার অভিনয়ে স্টেজে একটু লুকোচুরি খেলা)

সিস্টার, সিস্টার সত্যি করে বলুন তো এরা কি মানবী নন?

নার্স – সেই কথাটাই তো বলছি এতক্ষন ধরে।

পুলিশ – (ভয়ে আর্তনাদ করে) ওরে বাবারে আমি ভূত – পেত্নীদের মাঝে এসে পড়েছি, বাঁচাও, বাঁচাও।

                     (সবাই মিলে চেপে ধরে) –

উকিল ম্যাম – তাহলে তুমিই বা বাদ যায় কেন? সিস্টারের মতো এসো আমাদের দলে ভিড়ে যাও।

পুলিশ – সিস্টার আপনিও তাহলে –

নার্স – হ্যাঁ, পেত্নীরে আমিও এখন পেত্নী।

গৃহবধূ – চলো তাহলে সবাই মিলে একটু পিকনিক করি। ঐ দেখো পাশের হোটেলের ডাস্টবিনে কত মাছের আঁশ ফেলে দিয়েছে। চলো আমরা মুচমুচে করে ঐ আঁশগুলো ভেজে খাই।

ছাত্রী – তারসঙ্গে একটু গান বাজনাও চলুক।

                  (অভিনেত্রী এগিয়ে এসে নাচের তালে)

                        আমরা যত পেত্নী কত
                          আনন্দেতে আছি
                        যেমন খুশি থাকছি এখন
                          মরেও সুখে বাঁচি।
                        ঝুট ঝামেলা নেই এখানে
                         নেই রে কাজের তারা
                        মরণ পারে নতুন জীবন
                          জাগাই প্রাণে সারা।

দিদিমনি – ভূতের কেত্তন করতে করতে ঐ দেখো কতজন পুরুষ আসছে এদিকে।

ছাত্রী – অনেকদিন জেনানা ওয়ার্ডে আছি পুরুষ মানুষ দেখিনি। আজ ওদেরকে দেখে কি ভালো লাগছে যে – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়)

দিদিমনি – আরে ওরা মানুষ নয়, পুরুষও নয় ওরা ভুতুষ। তাই ওদের জন্যে অপেক্ষা করে লাভ নেই।

অভিনেত্রী – না না ওদের না হলে চলে নাকি? দাঁড়াও একটু মেকআপ করে নি আগে – শাড়িটা পেঁচিয়ে পরি।

নার্স – তোমার তো এখন শরীরই নেই। এতো সাজের ঘটা কেন বাবা। ওই যে ন্যাতা ম্যাডাম আবার কি বলেন শুনি।

ন্যাতা – বান্ধবীগণ – আসুন আজ আমরা এক নতুন অঙ্গীকার করি। পেত্নী হলেও আমরা তো নারী জাতি। তাই সকল রমণীর হয়ে আমরা পুরুষের একচেটিয়া অধিকার থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন হই।

দিদিমনি – এখন আর অত কথায় কাজ নেই। আমরা সবাই বরং ঐ গঙ্গার জলে গিয়ে ঝাঁপাই।

ছাত্রী – হ্যাঁ, আমাদের ছায়া জলের সঙ্গে ঘুলে মিলে এক হয়ে যাক।

উকিল – আমরা আবার পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাই।

নার্স – তাহলে এবার পেত্নীদের প্রলাপ বন্ধ হোক। –

ছাত্রীরা – 
                   পেত্নী প্রলাপ বন্ধ করে
                     পালাই চলো সবে।
                  নাকে কান্না কাঁদলে মোদের
                      উদ্ধার কি হবে?
                   ওপর হতে ডাক এসেছে,
                     শোনো গো সব ভূত
                  মরণ দোলায় দুলতে দুলতে
                      হয়েছি অদ্ভুত।

                  মানব সমাজ আজ ছেড়েছি
                      আমরা যে অচ্ছুৎ
                    পেত্নী মোরা ভূতের পত্নী
                      করবো না খুঁত খুঁত।
                      সব অদ্ভুত কিম্ভূত।

                (নাচতে নাচতে পেত্নীদের প্রস্থান)




ভুতুষের ভূতলামী (একাঙ্ক নাটক) (Bhutusher Bhutlami)

চন্দনা সেনগুপ্ত

[একদল ডাকাত ও একজন ভুতের রাজা। তার অনেক প্রেতের প্রজা, আলেয়ার আলো, ফসফরাসের গ্যাসে শ্মশানে বাস করে কিছু জোনাকি ব্রহ্মদত্যি।]

ভুতের রাজা – আমি হলাম ভুতের রাজা।

দিন রাত খাই কাষ্ঠ ভাজা,

ভয় দেখতে পাই যে মজা –

আমার আছেন অনেক প্রজা।

কেউ বা ছিলেন নামী দামী,

কেউ বা ভীষণ আলসে কুঁড়ে,

কেউ বা থাকেন গাছের মাথায়

কেউ বা ওঠেন মাটি ফুঁড়ে।

চারিদিকেই শহর বাজার

ভিড় ভাড়াক্কা, শব্দ দূষণ,

এইখানেতেই শান্তি আছে,

অন্ধকার যে মোদের ভূষণ।

গ্রামের শেষে ছোট্ট নদী,

জল থাকে না সেথায় যদি,

পচা কুকুর, বেড়াল, গরু,

পড়ে থাকে কাদার গদি।

ওরাও মোরে ভুত হয়েছে

মোদের রাজ্য ঘিরে আছে।

শেয়াল, শকুন জ্যান্ত শুধু

ঘোরে তাদের কাছে কাছে।

ডাকাত সর্দার – এই কে রে ওখানে? ভারী সাহস দেখি! এই মধ্য রাতে আধো অন্ধকারে, দুর্গন্ধে ভরা পচা পাতা উইপোকাদের ঢিবি পেরিয়ে ওই ওখানে বসে কথা বলছিস ফিসফিস করে। কে তুই?

প্রথম ডাকাত – সর্দার এখানে যে ভীষণ দুর্গন্ধ, এখানে কেন নিয়ে এলে? দম বন্ধ হয়ে আসছে যে।

সর্দার – উঃ কি আমার নন্দ দুলাল রে? দম বন্ধ হয়ে আসছে (মুখ ভেঙ্গিয়ে) দেখছিস না কত মাল লুটেছি, কোথায় বসে ভাগাভাগি করব?

দ্বিতীয় ডাকাত – মাল পাওয়ার আগেই যে মোরে ভূত হয়ে যাব, এই পচা গ্যাসের মধ্যে থাকা যায় নাকি?

তৃতীয় ডাকাত – আর তা ছাড়া কি ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে মাটি, কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে। আমি তো আর এগুতে পারব না। যদি চোরা বালি থাকে? একদম ওর মধ্যে সেঁধিয়ে যাব যে, প্রাণটিও খোয়াবো আর মালটিও হারাবো।

প্রথম ডাকাত – (চিৎকার) সর্দার, সর্দার আমি গর্তে পড়ে গেছি, আমাকে সাপে কামড়ালো মনে হচ্ছে, উঃ মা গো – – – -। না না একটা ক্যাকড়া, আঙ্গুলগুলো যে ব্যাথায় টনটন করছে। সর্দার ফিরে চলো এখন থেকে।

সর্দার – আরে ওদিকে গ্রামের লোক সব উঠে গেছে। জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করা কি চাট্টিখানি কথা নাকি হে?

দ্বিতীয় ডাকাত – হ্যাঁ, বড় রাস্তায় পুলিশের গাড়ি ছুটছে, সাইরেন বাজিয়ে। কি হবে এখন?

তৃতীয় ডাকাত – (কাঁদতে আরম্ভ করলো) ও মা গো, ও বাবা গো, ওদিকে ওটা কিসের আলো? দপ করেই নিভে গেল।

প্রথম ডাকাত – ভুত – ভু – – ত –, ভুত – পালাও এখন থেকে, ভূতের চোখ জ্বল জ্বল করছে অন্ধকারে।

সর্দার – আরে চুপ সব ভীতু, আহম্মক ছোঁড়া। তোরা ডাকাতের দলে যোগ কেন দিলি বলতো। এতই যদি প্রাণের ভয় তো যা বৌয়ের আঁচল ধরে বসে থাক। এই সোনা দানা আর পেতে হবে না।

এমন সময় দূরে সত্যিই আলো জ্বলেই আবার নিভে গেল।

ডাকাতরা সবাই মঞ্চের এক কোণে বসে রাম নাম জপতে লাগল। – – রাম – – রাম – – রাম – – রাম

ভূতের রাজা – এঁ্যা এঁগুলো আবার কেঁ রেঁ? জ্যান্তো মানুষেরা আমাদের রাজ্য দখল করতে এঁয়েছে বুঝি?

প্রজা ভুতের দল – ঘাড় মটকে দেব না কি?

ভুতের রাজা – আরে নাঁ নাঁ, তোদের কিছুই করতেঁ হবেঁ নাঁ, ওরা ভয়েই মরেঁ যাবেঁ।

প্রজা ভুত – তাহলে বেশ হবে। আমাদের এই রাজ্যে ভুতের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে।

ভুতের রাজা – নাঃ আঁমরা তো বেঁশ আছি, এঁখানে আর ওঁদের ভিঁড় বাঁড়িয়ে দরকার নেই। ওদের এখানে লুকানো বের করছি। এখন থেকে তাড়াতেই হবে।

প্রজা – ডাক তো পেত্নী রানী কে – ঐ ডাকাতগুলোর সামনে একটু নাচ গান করলেই ওরা ওদের পেছন পেছন চলে যাবে।

দুজন পেত্নীর প্রবেশ – রাজা মশাই নমস্কার। আপনি আঁমাদের ডেকেছেন?

রাজা – হ্যাঁ, ঐ গাছের তলায় কজন জীবন মানুষ লুকিয়ে আছে, ওদের একটু ভয় দেখতে হবে, যাতে ওরা পালিয়ে যায়।

দুই পেত্নী –                                          হি – – হি – – হি – –

আমরা ভুতের ঝি – ।

পুরুষ মানুষ বশ করব –

শক্ত এমন কি?

হি – – হি – –  হি – ।

বাজনার সঙ্গে নৃত্য

দুলে দুলে তালে তালে –

চলো যাই পা ফেলে,

মোরা সবে দলে দলে

বসি গিয়ে পিঠে কোলে।

সহজে কি শ্মশানে তে

মানুষের দেখা মেলে?

ডাকাত সর্দার – (কোনা থেকে সাহস করে বেরিয়ে আসে একটা চাকু হাতে নিয়ে, তার মুখে আলো পড়বে)

(ভূতেদের নাচে নীল আলো ও সেটার বাদন চলছিল, এবার ডাকাতটি এগিয়ে আসবে -)

বুঝেছি এ ব্যাটারাও সব আর একদল ডাকাত, আমাদের মতোই এখানে লুকিয়ে আছে, আর আমাদের তাড়াবার জন্য ভুত সেজেছে। (হাতের লাঠি চাকু ঘুরিয়ে) – অ্যাই মেয়েগুলো আয় আমার সামনে, দেখি তোরা ছদ্মবেশী পুলিশ – না আমার মতোই চোর ডাকাতের বৌ মেয়ে।

(পেত্নীদের অন্তঃধান) –

(এবার ভুতের রাজার প্রবেশ) অন্ধকারে –

রাজা – কিঁ রে ডাকু সর্দার ! তোঁর সাহস তো কম নয়, আমাদের এলাকায় এসে আমার লোকেদের মানছিস না। দেখবি আমাদের কত শক্তি?

(তার শরীরের ওপরে আলো পড়বে। একটা কঙ্কাল লাগানো কালো জামার ওপরে সাদা কাগজ দিয়ে তৈরী)

ভুতের রাজা – আয় সামনে আয়, বড় যে তোর সাহস। এখনও প্রাণ আছে বলে দেখি এত আস্পর্দ্ধা। দেখ দেখি আমি ভুতের রাজা, নই মানুষ ডাকাত।

(তার চেহারা দেখে সকলে ভীত হয়ে পলায়ন, – সকলে ও বাবারে, ও মা রে – লুটের মাল সব থাকুক পড়ে)

এমন বিকট ভুতের মূর্তি

আগে কভু দেখিনি রে।

জীবন নিয়ে পালিয়ে যা রে।

আসবো না আর ভুতের দ্বারে।

(বলতে বলতে পলায়ন)

রাজা ও প্রজা ভুত আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। –

(পিছনে ড্রাম, তবলা, হারমোনিয়াম বাজতে থাকে। ভূতেরা ব্রেক ডান্স এর মতো নাচতে শুরু করে -)

প্রথম ভুত –                                         ভুতের সঙ্গে চালাকি?

আমরা ভীষণ ভয়াভয়

এ খবরটি যেন না কি?

দ্বিতীয় ভুত – স্যাঁতস্যাঁতে এই আস্তাকুড়ের পাশে

ঘাপটি মেরে থাকি শিকার আশে

গভীর রাতে ঝোপে ঝাড়ে

মরা প্রাণীর সঙ্গে থাকি।

মোদের সঙ্গে চালাকি?

তৃতীয় ভুত – মানুষ ভাবে পৃথিবীতে –

ওরাই করবে বাস,

আওয়াজ করে, আলোয় ভরে –

তাইতো ছড়ায় ত্রাস।

রাজা ভুত – কিন্তু মোরাও কম যায় না –

                 ভুতের যত ছানা পোনা,

                 নিজের রাজ্য পাহারা দিই

                 সব দিকেতেই লক্ষ্য রাখি।

                 ভুতের সঙ্গে চালাকি?

হটাৎ ধপ করে একটা আলো জ্বলে আবার নিভে যায়। ভূতেরাও ভয় পেয়ে যায়। একদিকে সবাই একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সবাই একসাথে — ওরে বাবা এটা আবার কি? নতুন কোন ম্যাজিশিয়ান মোদের ম্যাজিক দেখাচ্ছে নাকি?

(মঞ্চের একপাশে আবার দপ দপ করে আলো জ্বলে)

রাজা ভুত – (গম্ভীরভাবে) ব্যাপারটা তো খুঁটিয়ে দেখতে হচ্ছে? ওখানেও কি বদমাস, মানুষ, চোর, ছ্যাঁচোড়গুলো লুকিয়ে আছে নাকি? ধরা পড়ার ভয়ে?

প্রজা ভুত – রাজা মশাই, আঁমি একবার পরীক্ষা করে আঁসি।

রাজা – একা যাবি নে। অ্যাই, তোরাও সঙ্গে যা না।

(শেয়ালের ডাক – হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ। পেঁচার হুট হুট, বাদুড়ের দানা ঝাপটানোর আওয়াজে একটু ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি। শন শন হওয়ার শব্দ।)

(প্রজা ভুত সাহস করে মঞ্চের একপাশে গিয়ে আওয়াজ দেয়।)

প্রজা ভুত – কে কে ওঁখানে? ঘাপটি মেরে বসেঁ থাকা বের করছি, আঁয় বের হয়ে আয় বের হয়ে আঁয়। রাজার সামনে হাজির করি।

[মাথায় টুনি বাল্ব জ্বলছে আর নিভছে, একদল জোনাকি পোকার দল এসে হাজির] [জোনাকিদের নৃত্য বাজনার তালে তালে]

জোনাকির দল – আমরা জোনাকি পোকার দল গো ভুত মশাই। আমরা তো এই ঘন গাছের পাতায় অন্ধকারে লুকিয়ে থাকি। তোমরা আমাদের চেনো না কি?

প্রজা ভুত – ও জোনাকি কি সুখে ওই

                   ডানা দুটি মেলেছো – – – -।

                     – – – – গান – – – ।

জোনাকি – ওমা এই ভুতটা আবার রবীন্দ্রসংগীতও গাইতে পারে। কি সুন্দর গলা।

প্রজা ভুত – কেন পারবো না, আমি যখন বেঁচে ছিলাম তখন শান্তিনিকেতন-এ তো পড়তাম। সব মানুষগিরি ভুলে গেছি কিন্তু ঐ গুরুদেবের গানগুলি ভুলতে পারিনি।

জোনাকি – তা বেশ, তা বেশ, কিন্তু তোমাদের রাজা এমন ভয় পেয়ে গেছেন কেন?

প্রজা ভুত – ওই কী একটা আলোর ঝলক উঠেই নিভে গেল না, তাই ভাবলাম এখানেও কোন ইলেকট্রিক লাইট লাগাচ্ছে নাকি?

জোনাকি – ও ওটা আলেয়া।

ভুত – সে আবার কি?

জোনাকি – ও তো এই স্যাঁতস্যাঁতে মরা পঁচা আবর্জনার মধ্যে ওঠা একটা গ্যাস। ও তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। ও একরকমের ভুত। গাছের তো প্রাণ ছিল তাদের ভুত।

প্রজা ভুত – আলেয়ার সৃষ্টি কি করে হয় ভাই?

জোনাকি – গাছপালা পচনের ফলে যে মার্শ গ্যাসের সৃষ্টি হয়, সেই মিথেন গ্যাস দাহ্য ফসফিনের PH3 ও ফসফরাস ডাই হাইড্রেড P2Hq থেকে।

প্রজা ভুত – তা কি করে হয়?

জোনাকি – পঁচা পাতা পলি মাটি থেকে মিশ্রিত মিথেন গ্যাস বাতাসের সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। তাই ওই আগুন দপ দপ করতে দেখা যায়।

প্রজা ভুত – জীবনানন্দের ঝরা পালকে – লেখেন –

“প্রান্তরের পারে তব তিমিরের খেয়া

নীরবে যেতেছে, দুলে নিদলী আলেয়া।”

জোনাকি – তাই অনেক লোক আলেয়া ভুত ও বলেন।

প্রজা ভুত – ওঃ তাই বলো। আমরা হই মানুষ মরে। আর ওদের সৃষ্টি পঁচা গাছের পরে। তাহলে তো ওদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।

রাজা ভুত – যাক বাবা বাঁচলাম। কিন্তু আমরা সব ভূতেরাই তো কথা বলতে পারি, আলেয়া কথা বলে না কেন রে?

প্রজা ভুত – গাছেরও তো মূক বধির। কিন্তু তাদের তো প্রাণ আছে। তাই তারা মরে পঁচে গর্তে বাস করে আর আলেয়া ভুত হয়ে যায়।

শাকচুন্নির প্রবেশ – (পা দুটি বেঁকিয়ে) আমি তো ওই আলেয়ার কাছ থেকেই আসছি। যে সব মহিলা শাঁখা পরেন, আমি তাদের ঘাড়ে গিয়ে চাপি। কিন্তু ঐ জীবন্ত মানুষেরা ওঝা এনে আমায় ঝাঁটা পেটা করে। ধুনোর ধোঁয়ায় চোখে মুখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, তাই শাকচুন্নি, পেত্নী নামে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। এখানে এসে এতজন ভুত পেত্নীদের পেয়ে খুব ভাল লাগছে।

মামদো ভুত – (মোটা গলায়) আমি ঐ মুসলমানদের গোরস্থানে মানে কবরে থাকি। যত মৌলবী ফকিরদের সঙ্গে বসে নামাজ পড়ি।

রাজা ভুত – তা ভালোই করো, নিজের ট্রেডিশন, কালচার কখনও ছাড়া উচিৎ নয়।

গেছো ভুত – ঐ দেখো স্কন্ধ কাটা। রেলে মাথা দিয়ে মরেছে বলে ওর ঐ দেহে ঘাড় পর্যন্ত রয়েছে। তাই ওকে দেখে সবাই ভয় পায়।

মেছো ভুত – এই নদী খাল বিল গুলোতে খুব মাছ ছিল আগে। তাই খেয়ে খেয়ে আমাদের নামটায় মেছো ভুত হয়ে গেছে।

প্রজা ভুত – বাবারে বাবা এত রকমের ভুতের কথা তো আমরা সব ভূতেরাই জানি না। কিন্তু একজন ভূতকে সবাই জানি।

রাজা ভুত – আমাকে ছাড়া আর কাউকে মানবি না বলে দিচ্ছি, তাহলে তোদের মজা দেখিয়ে দেব।

প্রজা ভুত – তুমি দেখলে তোমারও শ্রদ্ধা হবে। তিনি হলেন সব ভূতেদের সেরা ব্রহ্মদত্যি। জ্ঞানী গুণী ব্রাহ্মণেরা অপঘাতে মারা গিয়ে এই মহান ভুতের উদয় হয়।

শাকচুন্নি – তেনার কিন্তু খুব দয়া মায়া। সহজে কারুর ক্ষতি করেন না। ভালো ভালো কথা বলেন।

নেতা ভুত – কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো – মানুষেরা বাচ্চারা আজকাল আর ভুত/টুতে বিশ্বাস করে না।

প্রজা ভুত – সূর্য্যি দেবের কাছে তো আমরা সবাই জব্দ, তাপও একদম সহ্য করতে পারি না।

রাজা ভুত – আজকাল সূর্য্য দেবের আলো থেকে শক্তি নিয়ে রাত্রে সোলারের আলো জ্বালাচ্ছে সর্বত্র। তাহলে কোথায় গিয়ে মুখ লুকাই বলতো? ব্রহ্মদত্যি দাদা কে বরং ডাকা যায় এই সভায়। তিনি কি রায় দেন দেখি। সবাই মাইল প্রার্থনা –

হে ব্রহ্মদত্যি দাদা একবার দেখা দাও। আমাদের জীবনে মানে এই মরে বেঁচে থাকার ব্যাপারটা শেষ করা যায় কি না, একটু বলে দাও। আমরা সব ভুতের দল বড় টেনশন এ আছি। একটা কিছু উপায় করো।

ব্রহ্মদত্যির আগমন – (গম্ভীরভাবে ধীরে ধীরে আলখাল্লা বা সন্যাসীর মতন কাপড় পরনে তার প্রবেশ) – বন্ধুগণ এসো, এবার সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, আল্লা বা ভগবানের দরবারে আমরা আর্জি করি। আমাদের ভুতুড়ে সম্প্রদায়কে শেষ করে তিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করুন।

“হে ঈশ্বর, আল্লা, প্রভু,

কাছে কেন হে আসো না কভু?

মোদের দশা শোচনীয়

আসবে না কি এখনও তবু?

আমরা হলাম প্রেত আত্মা –

তুমি শ্রেষ্ঠ পরমাত্মা

তোমার হাতের পুতুল সবাই

মানব, শিশু, জীবাত্মা।

আকাশবাণী

“এসো এসো সব অমৃত পুত্র।

জীবন মরণ বাঁধা যে সূত্র –

বৃষ্টি ধারায় ধুয়ে যায় আজ,

উদ্ভিদ রূপী পুষ্প পত্র।

পরিবর্তন নিয়ম মানিয়া,

পুনরায় যায় জগতে ফিরিয়া,

আকাশ হোক মাথার ছত্র।

ভূতের কেত্তন (একাঙ্ক নাটক) Bhuter Ketton

চন্দনা সেনগুপ্ত

ভূতেদের প্রবেশ মঞ্চে এই গানটি গাইতে গাইতে –

চল চল চল, রাতের আঁধারে ভূতের দল,

হারাস নে রে মনের বল,

দুঃখে শোকে হয়ে পাগল, কাটাস নে রে পল।

চল চল চল।

ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত,

আমরা ঘুচাবো ভেদ জাত পাত,

একে অপরের ধরিব হাত

বিশ্বাস সম্বল।

নব জীবনের গাহিয়া গান,

বাড়াবো সকল ভূতের মান

মানব জাতির করিতে ত্রাণ,

টুটাব মিথ্যে ছল।

চলরে নও জোয়ান, শোনরে ভূতের গান,

মহামারী করে দুয়ারে দুয়ারে মৃত্যুকে আহ্বান,

ভাঙ রে ভাঙ আগল, ঢালরে ঠান্ডা জল –

চল চল চল।

(মঞ্চটি আলো আঁধারিতে ঢাকা, পেছনে আকাশ ও মেঘের দৃশ্য। নিচে একটি পৃথিবীর মানচিত্র আঁকা গ্লোব। কালো পাজামা কুর্তা, কিন্তু পেছনে সাদা কাপড়ের চাদর, ভেসে আসার মতন হেলে দুলে চলবে।)

কুশীলব পাত্র পাত্রী – মহামারী ভূত, প্রলয় ভূত, সৈন্য ভূত, প্রেতাত্মা ও একজন বৃদ্ধ জ্ঞানী দাদু ভূত, বিজ্ঞানী ভূত এবং দুজন এলিয়েন (অন্য গ্রহ থেকে আগত)

ভূতেদের মধ্যে একজন বাঁকুড়ার ভাষায় ও একজন বাঙালি ভাষায় বলবে, একজন একটু তোতলাবে ও একজন নেতার মতন ভাষণ ঝাড়বে।

প্রথম মহামারী ভূত – ওহে ভূতের দল, অমনি করে খোস মেজাজে গান গেয়ে খোলা আকাশে ঘুরে বেড়ালেই চলবে?

দ্বিতীয় জন – কেন শোনো নাই, মাষ্টার মশাই কইলেন – ভূতের কেত্তন ক্যান করস?

তৃতীয় জন (মুসলিম) – কি আমাদের তোমরা কীর্তন করতে বলছো? আমরা কি হিন্দু যে খোল করতাল নিয়ে কীর্তন গাইবো?

প্রথম জন – তবে ‘কাওয়ালী’ গাইবো নাকি? সূফীগান?

দ্বিতীয় জন – না ভাই, আমরা কীর্তন ও জানি না আর কাওয়ালীও গাইতে পারি না, তবে খ্রিসমাসে যীশুখৃষ্টের ক্যারোল গাইতে পারি। –

তৃতীয় জন – তবে যার যা ইচ্ছে গাও না, কে মানা করবে এখানে? পণ্ডিত, মৌলভী, পাদ্রীরা কেউ তো নেই, যে গোল করবে।

প্রথম জন – ভজ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গের নাম – – – – –

দ্বিতীয় জন – কাওয়ালীর সুরে – আ — আ — কানে হাত দিয়ে তালি বাজিয়ে আল্লাহ হু – হু – হু

তৃতীয় জন – জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল অল দি ওয়ে – – –

জ্ঞানী – (জোর গলায় সবাইকে থামিয়ে দেন) চোপ! চুপ সব। বোকা ভূতের দল। তোদের আবার এখন ধম্ম আছে নাকি? মানুষ জন্মের কথা এখানে মনে করে এমন হল্লা করছিস কেন রে তোরা?

প্রথম জন – আকাশটাকেও মাছের বাজার করে দিল। বাপরে কি শোরগোল !

জ্ঞানী ভূত – শান্ত হয়ে বসে একটা কিছু করা যাক।

প্রথম জন – একটা “অশরীরী ক্লাব” মানে সংগঠন করলে হয় না? সেখানেই গান, গল্প সব করা যাবে। সেটাই তো ভূতের কেত্তন হবে।

দ্বিতীয় জন – না হে না, আমার এখনও ওদের ওপর রাগ কমেনি। আমাকে ওরা কবর না দিয়ে মাঝপথেই পুড়িয়ে দিল। কি অন্যায় বলো তো। এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

তৃতীয় জন – আরে মশাই, আমারে তো পোড়ানোও হল না, নদীর জলে ভাসাই দিল।

প্রথম জন – আমাকে তো ভাসাতেও পারেনি, গ্রামে নদী নেই বলে জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে গেল, – কত শেয়াল, কুকুরে কামড়ে কামড়ে খেয়েছে, ও মাগো সে যে কি যন্ত্রনা – – –

জ্ঞানী ভূত – অ্যাই, হতভাগা, তখন তো তুই মরেই গেছিলি, ভূতের আবার ব্যাথা লাগে নাকি?

বিজ্ঞানী ভূত – (হটাৎ আবির্ভাব রাগত ভাবে) ওরে আহম্মকের দল মরেও তোদের শিক্ষা হল না?

জ্ঞানী ভূত – একটা করোনা – না কি কোভিড১৯ নামে অতি ক্ষুদ্র ভাইরাস এসে সারা বিশ্বের সমস্ত ধনী-দারিদ্র, সাদা-কালো, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিষ্টান-হিহুদীদের এক পংক্তিতে দাঁড় করিয়ে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তবু তোরা এখনও ধর্ম, বর্ণ, জাতপাতের লড়াই ছাড়তে পারলি না?

বিজ্ঞানী ভূত – (মাথা নেড়ে) তাই না বটে, কত কষ্ট করে পরিশ্রম ও সাধনার পরে আমরা বিজ্ঞানী, গবেষক আর ডাক্তাররা মিলে ভ্যাকসিন বানালাম, জানিনা কতটা কাজে লাগবে? তার আগে নিজেই মৃত্যুর শিকার হলাম।

জ্ঞানী ও বৃদ্ধ ভূত – (সাদা চুল দাড়ি নিয়ে প্রবেশ) – মানব দেহ তো আর নেই এখন, খাঁচা খুলে যেমন পাখি বেরিয়ে যায়, তোমরাও তাই এখন সবাই মুক্ত। এখানে এসে আবার ঝগড়া বিবাদ কেন করছো বাবা রা? (কাঁপা কাঁপা গলায়)

প্রথম ভূত – হ্যাঁ, দেখুন না দাদু, আমি আমি ‘কেত্তন’ মানে আমি বলছিলাম একটু আলাপ আলোচনা করি, পরের প্রজন্মকে কিভাবে জীবন কাটাতে শিক্ষা দেবো, তা তা তা এরা (একটু তোতলিয়ে) সব কথা কাটাকাটি, ত – – র – কো শু – – রু করে দিল।

তৃতীয় ভূত – দূর ভবিষ্যতের লোকের কি কইরা শিক্ষা দিমু। ওগো কারো জ্ঞান শোনার অভ্যাস নাই, – হ্যাঁ ওসব কথা ছ্যাড়ান দাও।

দ্বিতীয় জন – যখন বেঁচে ছিলাম তখন এই গরীবদের কথা কেউ শুনতো না আর এখন ভূতের কথা মানতে ওদের বয়ে গেছে (মুখ বেঁকিয়ে)

(অন্য দিক থেকে আরও ২/৩ জন কুশীলবদের প্রবেশ – চেহারা খুবই বিদ্ধস্ত, চুল উস্কো খুস্কো, খুব জীর্ন শীর্ন করুন অবস্থায় ধীরে ধীরে মঞ্চে আসে।)

প্রথম ভূত – তোমরা আবার কথা থেকে এলে ভাই?

তিন জন কথা বলল একসাথে – আমরা হলাম প্রলয় ভূত ! বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, সুনামির ঝরে বা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, জঙ্গলের দাবানলে প্রাণ হারিয়েছি।

দ্বিতীয় জন – ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত মানুষে ভূত হল কে জানে?

বিজ্ঞানী ভূত – কেন এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, Natural Calamity , Disaster জানো?

প্রলয় ভূত – সবাই বলছে মানুষই নাকি তার জন্য দায়ী।

তৃতীয় ভূত – হ হ আমিও শুনছি, গাছপালা কাইট্যা ওরা পৃথিবী মা রে শূন্য কইরা দিতেছে। পাহাড় ভাঙ্গত্যাসে, নদীরে বাইধ্যাঁ দিয়া যা মন চায় যা মন চায় করত্যাসে তাই তো এরকম হইলো।

জ্ঞানী ভূত – ঠিক বলেছো। পলিউশন এর জন্য এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং।

প্রথম ভূত – সেটি আবার কি গো জ্ঞানী বাবা?

দ্বিতীয় ভূত – আরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং মানে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি। দেখছো না উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর বরফ কেমন করে গলছে।

প্রথম ভূত – ওই জীবন্ত মানুষগুলোর মাথায় এই প্রদূষণ ব্যাপারটা ঢোকেনি এখনও। (নাঁকি সুরে – কি যে হবেঁ ওঁদের)। চলো না সবাই মিলে কিছু করি।

(এবার একটা যুদ্ধের বাজনা, সব ভূতেরা সচকিত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ায়। মার্চ করতে করতে একদল লোকের প্রবেশ।)

যুদ্ধে নিহত ভূতেরা মার্চ করতে করতে আসবে –

“কদম কদম বাঢ়ায়ে যা –

নতুন পথে আগায়ে যা –

স্বর্গ নরক কোথা আছে

খুঁজতে খুঁজতে গান গা –

কদম কদম বাঢ়ায়ে যা – – – – ।

তারপরে লেফট রাইট লেফট রাইট এটেনশন বলে স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়াবে।

তৃতীয় ভূত – ওরে বাবা খাই সে রে, এ ডা আবার কে ডা আইতাসে?

বাঁকুড়ার ভূত – একবার তো ভগবান মারলেক, ইয়ারা কি দুবার করে মারত্যে আইছে নাকি?

প্রথম সৈন্য ভূত – আরে আরে ঘাবড়াচ্ছো কেন, আমরাও তো তোমাদের মতোই ভূত গো।

দ্বিতীয় সৈন্য ভূত – মহামারী শেষ না হতেই বোকা মানুষেরা আবার যুদ্ধ লাগিয়ে দিল, হতভাগারা কেউ শান্তি চায় না।

প্রথম সৈন্য – সৈনিক বিভাগে নাম লিখিয়েছিলাম কত আশা ভরসা আর সাহস নিয়ে, কিন্তু এমন বেঘোরে প্রানটা যাবে, তখন কে ভেবেছিল?

জ্ঞানী ভূত – (এগিয়ে এসে) এসো ভাই এখানে ভূতের রাজ্যে ওসব গলা বারুদ, প্যাটন ট্যাঙ্ক নেই, অপার শান্তি আর আনন্দ।

প্রথম সৈন্য – শুধু গোলাবারুদ বন্দুক? ওই যুদ্ধবাহী জাহাজ এরোপ্লেন, মিশাইল এগুলো কে যে বানায় আর কেন যে বানায়।  শালা ঘাড় মটকে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব?

বিজ্ঞানী ভূত – এটোমিক এনার্জি দিয়ে কত ভালো ভালো কাজ করা যায়। আর এরা নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে পৃথিবীটার কি হাল করে দিল। ঈশ্বর জানেন কি করে এর প্রকোপ কমবে

(ওয়ার ভিক্টিম) – একটু কাঁদো কাঁদো সুরে মঞ্চের সামনে এসে – আমরা মহামারীতেও মরিনি, যুদ্ধেও যায়নি। গ্রামে চাষ আবাদ করছিলাম। কাদের জানি না একটা মিসাইল এসে আমাদের বাড়ি, ঘর, জমি, ছেলে-মেয়ে, পাঠশালা, হাসপাতাল সব ভেঙ্গে চুরে শেষ করে দিল। ওরা আমাদের সুন্দর একটা নামও দিয়েছে “ওয়ার ভিক্টিম” – অসহায় নাগরিকরা আজ তাই ভূত হয়ে তোমাদের ‘কেত্তন’ – আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছে।

তৃতীয় ভূত – অহন বিচার তর্ক ছাইড়্যা কিছু করন লাইগবো।

নাকি সুরে সবাই – হ্যাঁ হ্যাঁ এখন কিঁ কঁরা যাঁয় ভাঁব দেঁখি সঁবাই।

জ্ঞানী ভূত – বিশ্বের সমস্ত ভূত এবার এক হও।

বিজ্ঞানী ভূত – আমাদের এখন থেকে আর কিছুই করতে হবে না। ওরা নিজেরাই খাওয়া-খায়ি, মারামারি হিংসা করে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনবে। তার আর দেরী নেই।

(হটাৎ মঞ্চের পেছন দিক থেকে একজন প্রেতাত্মা ভূতের আবির্ভাব)

প্রেতাত্মা – অ্যাই কি হচ্ছে এইসব? এ তো যেমন তেমন নয়, এ যে বিরাট ভূতের সভা হচ্ছে দেখছি। (শুঁকে শুঁকে) নাঃ তোমাদের গা থেকে তো এখনও মানুষ মানুষ গন্ধটাই গেল না দেখছি। ঘাড় মটকানো, আক্রমণ, লুন্ঠন, লড়াই, ঝগড়া এসব তো মানুষ নেতাদের কাজ।

তৃতীয় ভূত – তুমি কে ডা? আমাগো বুদ্ধিমান জ্ঞানী দাদুরও জ্ঞান ঝাড়ত্যাসো?

দ্বিতীয় ভূত – হুঁ হুঁ তুমাকে আর বাক চাতুরী করত্যে হবেক লাই। লাও একটা বিড়ি দাও তো বাপু। একটু টান দিই।

প্রথম ভূত – আরে বুদ্ধু বিড়ি জ্বালাতে গেলে আগুন চাই না, ওটি এখানে কোথা পাবে বাপধন?

প্রেতাত্মা – আমি প্রেতাত্মা ভূত। নেতাদের কথাই বাড়ির লোকের জ্বালাতনে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছি। এখানে এসে আবার সভা আর লেকচারের বাহাদুরী। এখন কি আর করি। বিষও নেই যে পান করে দু-বার আত্মহত্যা করবো।

প্রথম ভূত – হ্যাঁ ভাই, এবার আমার হাসি পাচ্ছে, হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ – মানুষকে শিক্ষা দেবে ভূতে? ওর জন্যে কত চিন্তা করতে হয়, মাথা ঘামাতে হয়।

তৃতীয় ভূত – হুঁ আমাগো মাথাই নাই, সব ঘিলু যখন শুকাই গ্যালো তখন প্ল্যান বানাই কেমন কইরা?

দ্বিতীয় ভূত – আমরা তো ওখানেও শ্রকিক ছিলাম। লেবারদের আবার কোনো মূল্য আছে নাকি? খেটে খেটে আধমরা হয়ে যেতাম, তখন কেউ শিক্ষা দিতে আসতো ‘ভূতের বেগার খাটছিস কেন’?

তৃতীয় ভূত – তা ঐ ব্যা গ্যার ব্যাপার টা কি এখানেও করতে হবে না কি?

সৈন্য ভূত – (লেফট রাইট – লেফট রাইট করে গোটা মঞ্চ ঘুরে বেড়ালো) ও হো প্যারেড করছি কেন? আমার তো এখন বন্ধুক ঘাড়ে নেই, কেউ অর্ডারও দিচ্ছে না। দেখি ওদিকে এদিকে ঘুরে যদি একজন মনের মত পেত্নী জোগাড় করতে পারি।

জ্ঞানী ভূত – দেখো কান্ড ! মানুষ গিরি করাটা আর ছাড়তে পারলি না তোরা? এখানে এসেও সঙ্গিনীর খোঁজ, যত্তসব !

দ্বিতীয় ভূত – হঁ খুঁজত্যে হবেক লাই মোরে গেছি বলে কি শখ সাধ থাইকতে লাই?

(সব ভূত হেসে ওঠে হা হা হা হো হো হো)

বিজ্ঞানী ভূত – তেনারা যতক্ষণ না আসেন ততক্ষনই ‘কেত্তন’ করতে পারো। এলেই তো গোলমাল বাঁধিয়ে দেবেন।

প্রথম ভূত – হঁ বাবা আবার সেই গোলামী করা, মন জুগিয়ে চলা, পেছন পেছন ঘোরা –

দ্বিতীয় ভূত – ইত্য পেত্নী প্রীতি কেনে ভাই? চলো বেড়াতে যাই।

(মঞ্চে একটা বাক্সের মতো গাড়ি ঢুকবে অন্ধকারে। হঠাৎ একটা বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। কেঁপে উঠবে ভিষণ আওয়াজ।)

ভূতেদের মধ্যে একজন – ও বাবা এ যে দেখি একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত।

(গম্ভীর গলায় কে যেন সেই বাক্স বাহনটির থেকে বেরিয়ে এল আর বলল-)

এলিয়েন ভূত – ওরে মানুষ ভূতের দল, আকাশে এসে এতো গোলমাল করছো কেন হে তোমরা?

বিজ্ঞানী – তুমি কে ভাই? একদম অন্যরকম দেখতে লাগছো। কোথা থেকে এলে এখানে?

প্রথম ভূত – ও মনে হয় স্বর্গের দূত। ভালো লোকেদের মানে ভূত – আত্মাদের নিতে এসেছে।

দ্বিতীয় ভূত – আর ঐ দেখো ওর সঙ্গে মাথায় হেলমেট এন্টিনা লাগানো আর জন রয়েছো, ও বোধহয় যমরাজের দূত।

তৃতীয় ভূত – হঃ আমাগো মনে হয় জান্নাত থেইক্যা পয়গম আইসতেছে। দেখি কারে কারে লইয়া যায়?

দ্বিতীয় ভূত – হঁ তা হবেক, উয়ারা মারকুটটা, বদমায়েশ গুলাকে লিয়ে যাবেক।

তৃতীয় ভূত – অ্যাই তরা চুপ করবি? যমদূত কো আর দ্যাবদূত ওগো কথা কোষের চান্সটা দেওন লাইগব।

এলিয়েন – আমরা অন্য গ্রহের বাসিন্দা এখনও বেঁচে আছি। তবে আমাদের স্পেস শিপটি এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কাছে আসতেই হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যে ফিরে যেতে না পারলে, আমরাও তোমাদের মতন ভূত হয়ে যাব।

যমদূত এর মতন এলিয়েনটা – ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো আমি এই ধোঁয়া আর ধুলোর পলিউশনে ঢাকা পৃথিবীতে থাকবো না গো। আমি আমার নিজের গ্রহে কেমন করে যাব, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ।

প্রলয় ভূত – কেঁদো না সোনা, কেঁদো না। আমাদের জ্ঞানী দাদু আর বিজ্ঞানী জ্যেঠু নিশ্চয় একটা উপায় বের করবেন।

জ্ঞানী ভূত – (বৃদ্ধ দাদু এগিয়ে এসে) আমি জানি তোমাদের মতন এলিয়েনরা আমাদের পৃথিবীতে আগেও এসেছেন, আমি সুইস লেখক দার্শনিক “ভন দানিকেনের” লেখায় পড়েছি – Gods are from outer space, দেবতারা কি অন্য গ্রহের মানুষ ছিলেন, তাই নিয়ে উনি অনেক কথাই বলেছেন, “পুষ্পক রথ” যে Space ship এ বিষয়ে আমাদের আজ আর কোনো সন্দেহ নেই।

এলিয়েন – আমরাও আসছিলাম মানুষের জন্য কিছু ভালো দৃষ্টান্ত নিদর্শন রেখে যেতে কিন্তু তা আর পারলাম না।

যমদূত নামে এলিয়েন – আমাকে যমদূত বলে দূরে সরে যাচ্ছো কেন? তোমরা তো ভারী অদ্ভুত!

মহামারী প্রলয় ভূত – না গো আমরা অদ – ভূত নই। একেবারে সত্যিকারের দেহহীন অশরীরী আত্মা, ভেজালহীন প্রেত। শুধু ভেসে ভেসে বেড়াই।

(এবার সেই বিজ্ঞানী ভূত এগিয়ে আসেন এবং গম্ভীরভাবে বলেন)

তোমরা সবাই গোলমাল থামাও, আমি যদি একবার তোমাদের রকেট মানে ঐ স্পেস শিপটা দেখি, আপত্তি আছে কি?

এলিয়েন – না, না আপনি আসুন না দাদা, প্লিজ, আপনি যদি এস্তোফিজিক্স পরে থাকেন, তাহলে নিশ্চই হেল্প করতে পারবেন।

বিজ্ঞানী – হ্যাঁ, আমি NASA তে কাজ করেছি, এস্টোনোটদের মঙ্গোল গ্রহে – চাঁদে পাঠাই – দেখি একবার চেষ্টা করে। (তিনি মেশিনটা পরীক্ষা করতে লাগলেন)

অন্য ভূতেরা তাঁকে ঘিরে গান করতে লাগলো –

“ভূত হয়েছে বলে কি ভাই বুদ্ধি গেছে মরে?

সরিয়ে দেব অন্য গ্রহের যন্ত্রটি ঠিক করে।

মানবজাতির আত্মা মোরা বড়ই শক্তিধর।

সবাই মিলে ধাক্কা দেব বাহন চালু কর।”

গাড়ি যেমন ঠেলে তেমনি অ্যাকশন করে এবং মানুষ ভূতের চেষ্টায় স্পেস শিপটি চালু হয়ে যায়। সবাই মিলে হাততালি দিয়ে আনন্দ করতে থাকে।

এলিয়েন – ধন্যবাদ ভূত বন্ধুরা। তোমরা যে শুধু বুদ্ধিমান ও প্রতিভাশালী তা নও, তোমাদের মত দয়ালু পরোপকারী প্রাণী আর অন্য কোনো গ্রহে আমরা কখনও দেখিনি।

তৃতীয় ভূত – কি কইত্যাসেরে, আমাগো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূতের এওয়ার্ড দেওন লাইগবো।

দ্বিতীয় ভূত – নিজের বড়াই করত্যে হবেক লাই, বিজ্ঞানী দাদা বুঝাই দিলেক মানুষ জাতটো কেমন বট্যে।

এলিয়েন – চলো কে কে তোমরা আমাদের সঙ্গে অন্য গ্রহে পাড়ি দেবে।

প্রলয় ভূত – না ভাই, যতই ঝঞ্জা, আঁধি, তুফান, বন্যা, খরা হোক। জগৎজননী ছেড়ে আমরা কোথাও যাবো না।

সৈন্য ভূতেরা – এটেনশন, এস ভূত ভাইয়েরা এলিয়েনদের বিদায় দাও। বিদায় বন্ধু বিদায় –

জ্ঞানী ভূত – শ্যামল ধারার দিকে তাকাও কী সুন্দর ঝলমল করছে। এস এখন সবাই মিলে শান্তির গান গাই। পৃথিবীর জীবন্ত লোকেদের মনে আসার বার্তা শোনাই।

হও প্রেমে সবে ধীর,

হও কর্মেতে বীর,

সত্যেতে থাকো স্থির

নাহি ভয়।

থামাও গো প্রদূষণ !

বাঁচাও প্রকৃতি ধন

ভাইরাস অগণন হোক ক্ষয়।

নাই ভাষা, নাই ভেদ, নাই পরিধান,

এ বিশ্ব মাঝে তাই ভূতেরা মহান,

দেখিয়া জগৎ হবে লজ্জায় ম্লান,

ভূতেরা গাহিছে ওগো শান্তির গান।

দেহ খাঁচা ছেড়েছি যে নই পরাধীন

যত রোগজীবাণুরা হল আজি ক্ষীণ,

ভূতেরা সবাই কাম, ক্রোধ, লোভ হীন,

জীবন্ত লোক অজ্ঞান

ভূতেদের করো সম্মান।

[ শেষ গান গাইতে গাইতে ড্রপসিন পড়বে। ]

সরল রামু ও ভেজাল বাবু (Sarol Ramu O Bhejal Babu)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মালিক - রামু রামু, কোথায় গেলি? দোকান ছেড়ে? শিগগির এদিকে আয়।
রামু - আমায় ডাকতেছিলেন ক্যানো?
মালিক - তোমায় ডাকছিলাম পুজো করব বলে, বৃন্দাবনের হনুমান, পুরীর ষাঁড়, যে আক্কেলে রাম ছাগল - এটা কি করেছিস?
রামু - কি করেছি বাবু? অতগুলো জানোয়ারের কাজ এক সঙ্গে করব কি করে বলেন?
মালিক - আবার মুখে মুখে কথা? এই তেল, ডাব, চাল সব নির্ভেজাল রেখে দিয়েছিস? এখনো কিছু মেশাসনি?
রামু - আজ্ঞে বাবু মিশাইছি তো।
মালিক - বলেছিলাম ঐ সস্তার তেলটায় এইটা মিশাবি।
রামু - ক্যামন কইরা বাবু?
মালিক - ক্যানো এই ভালো টিনের তেলটা অর্দ্ধেক করবি আর ওটা মেশালে দুটো তিন ভর্তি হবে।
রামু - আর এই পাথর, কাঁকরগুলা ক্যান আনছেন বাবু?
মালিক - কালকেই তো বললাম, গাধা। এইগুলো কালো ডালে আর ওগুলো হলদে ডালে আর চলে মেশাতে হবে।
রামু - তা নয় মিশালাম বাবু - কিন্তু যারা কিনবেন ওদের যে খেতে গিয়ে দাঁত ভাঙ্গি যাবে। ত্যাখন কি হবে?
মালিক - (মুখ ভেঙ্গিয়ে) ত্যাখন কি হবে? তোর মাথা হবে।
রামু - (নিজের মাথায় হাত দিয়ে) এ্যা আমার মাথা? ইখানটায় বড় জট হইছে! ত্যাল দ্যান না বাবু একটু নরম করি, চান কইরে আসি।
মালিক - হতভাগা তুমি এখন চান করে ফুলবাবু হবে? আমি এখন ভেজালের হিসাব করছি আর উনি নিজের চুলের জঙ্গল দেখাচ্ছেন। কর কর জলদি জলদি কাজ কর। এখুনি খদ্দের এসে পড়বে।
রামু - (মাথা চুলকে) বড় উকুন হইছে বাবু (হেসে) চুলকাইছে।
মালিক - তা আমি কি করব। এখন বসে বসে তোমার উকুন বাছবো? না না ধর এই বস্তাটা ওদিকে কর। ঝাঁট দে, ওজন দাড়িটার এক দিকে এই চুম্বকটা লাগা।
রামু - ওটাতে কি হবে বাবু?
মালিক - ওতেই তো লাভটা খাবো।
রামু - (হটাৎ এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে) দাঁড়া তোকে আজ আমি ধরব।
মালিক - অ্যাই, অ্যাই বুদ্ধু কি করে বেড়াচ্ছিস?
রামু - আজ্ঞে এই ইঁদুর গুলোর সঙ্গে একটু কিরকেট খেলছি।
মালিক - আরে! তাড়া তাড়া ওগুলো খেয়ে ফেলল যে অর্দ্ধেক আটা, চিনি।
রামু - বাবু ওরা হল গণেশ ঠাকুরের বাওন, ওদের একটু খ্যাতি না দিলে বগমান রাগ কব্বে না?
মালিক - ওরে আমার গুরুঠাকুর এলেন রে। গণেশ ঠাকুরের ভোগ দিতে গিয়ে যে আমার সব্বোনাশ হয়ে যাচ্ছে সে খেয়াল নেই তোমার? দাঁড়া দ্যাখাচ্ছি মজা।
রামু - আচ্ছা এটাকে ধইরেছি এখন কি করি বাবু। (একটা নেংটি ইঁদুরের ল্যাজ ঘোরাতে থাকে)
মালিক - আরে আরে করিস কি? ফেলে দে ফেলে দে, ফ্যাল ওটাকে।
রামু - একটা ফ্যাললে কি হবে গো বাবু ওদের তো রাজত্ব এখানে।
মালিক - যা যা ঐ ইঁদুর মারার ওষুধটা আটার সঙ্গে মিশিয়ে কোনে কোনে ছড়িয়ে দে আর ঐ কলটা লাগা, রাতে ইঁদুর পড়বে, সকালে ফেলে আসবি যমুনার জলে।
রামু - কি মজা হবে কাল যমুনা গিয়ে ঝাঁপাই আসব কতদিন সাঁতার কাটি নাই।
মালিক - এই গেঁয়ো ভূতটাকে নিয়ে যে কি করি। অ্যাই এই দিকে আয় ঝাঁট পাট দে, আমি একটু ব্যাঙ্ক থেকে ঘুরে আসছি।
রামু - আপনি টেরেনের ব্যাঙ্কে ক্যান যাবেন বাবু? আমাকে আমার কাকা গ্রাম থেকে আনবার সময় তো ব্যাঙ্কে উঠাই দিছিলো।
মালিক - আরে চুপ। ট্রেনে কে যাবে এখন টাকার ব্যাঙ্কে যাচ্ছি। দোকান পাহারা দে। খদ্দের এলে ওজন করে জিনিষ দিবি হিসেবে করে পয়সা নিবি।
রামু - খালি পয়সা নিব বাবু টাকা নিব নাই।
মালিক - আচ্ছা জ্বালাতন তো এই আহম্মকটাকে নিয়ে।
রামু - আপনি নিশ্চিন্তে যান, আমি দোকান পেহারা দিচ্ছি।
মালিক - হ্যাঁ হ্যাঁ তাই ভালো বেচা বেচি করতে হবে না! এই জিনিষগুলো গোছ-গাছ কর। (প্রস্থান)
রামু - গান গাইতে গাইতে চাল, ডাল ওলোট পালট করে।
            তাই না না না নাই রে না রে না
            উঠান ধারে ব্যাগুন ফলছে, খাতি পেলাম না।
খদ্দের - ও ভাই ও দোকানীর ছেলে, এক কেজি চিনি দাও তো।
রামু - এখন তো বেচাকেনা হবি না বাবু।
খদ্দের - ক্যান রে ঐ তো চিনি বস্তা, আর এই তো ওজনদারি - দে দে তাড়াতাড়ি দে, আমার ঘরে অতিথি এসেছে। (দর্শকদের দিকে ফিরে) বৌ আবার চায়ে জল চাপিয়ে দেখছে চিনি নেই। আগে থেকে তো তেনার খেয়ালেই হয় না।
রামু - কি বকতেছেন গো বাবুমশাই?
খদ্দের - কিছু বলছি না, তুই চিনিটা দে বাবা তাড়াতাড়ি।
রামু - ওটাতে যে এখনও কি ভেজাল মেশাবো মালিক বলে দ্যান নাই, কি করে দেব?
খদ্দের - কি বলছিস রে? ভেজাল মেশাবো মানে?
রামু - হ্যাঁ এই দ্যাখেন না এইটাতে - গোলমরিচে পেঁপের বীজ, ঐ লঙ্কায় ইঁটের গুঁড়ি, চালে কাঁকর আর কাচ্চি ঘানির সঙ্গে - - - -
খদ্দের - থাক থাক আর বলতে হবে না। তোদের দোকানে বাবা আর কিছু কিনতে আসছি না।
রামু - (ঠোঙায় এক খাবলা চিনি ভরে দিয়ে) এই একটু চিনি আপুনি নিয়ে যান, গিন্নিমা চা বসিয়েছে বললেন। চিনি না নিয়ে গেলে বকুনি খ্যাতি হবে না?
খদ্দের - তা মুফতে যখন দিলি তখন নিয়েই যাই পরে আর আসব না। (প্রস্থান)
দ্বিতীয় খদ্দের - ও ভাই শুনছো, দুটো কপি দাও না স্কুলের জন্যে।
রামু - কপি? এটা কি তরকারি - সব্জির দোকান নাকি? কপি কোথায় পাবো?
দ্বিতীয় খদ্দের - আরে বুদ্ধু কফি না, কপি মানে কাগজের খাতা. যাতে লেখা লেখি করে।
রামু - তা খাতা তো দিতে পারি। পয়সা আনছো?
দ্বিতীয় খদ্দের - বিনা পয়সায় নেব নাকি? এই নাও পাঁচ পাঁচ দশ টাকা।
রামু - মালিকবাবু বলে গেলেন পয়সা নিতে। খাতার পাতায় ভেজাল দেছেন কিনা তাও তো জানি না, এখন কি করি?
দ্বিতীয় খদ্দের - আরে ভাই আমার স্কুলের দেরী হয়ে গেল যে, নেই তো বলে দাও, অন্য দোকানে যাচ্ছি।
রামু - হ্যাঁ তাই যাও, না জিজ্ঞেস করে দিতি পারবো না।
দ্বিতীয় খদ্দের - প্রস্থান (ধুৎ তোর দোকানের নিকুচি করেছে)
মাসী - এই ছেলে এক কিলো মুসুর ডাল দে তো বাবা।
রামু - দাঁড়াও গো মাসীমা এই পাথরগুলো মেশাই নি তাপ্পরে দেব।
মাসী - সে কি রে হতভাগা পাথর মেশাবি কি রে - আচ্ছা বেয়াদ্দপ দেখি।
রামু - বাবু বলে গেছে যে।
মাসী - আরে দেখাচ্ছি তোর বাবুকে। আমাকে চেনে না আমি রায় গিন্নির ঝি খেমঙ্করী, গোটা পাড়ার লোক এনে দোকানের বারোটা বাজাবো।
রামু - ও মাসী দাঁড়াও গো, ডাল নিয়ে যাও।
মাসী - হ্যাঁ, আসব একেবারে পুলিশ নিয়ে, ভেজাল দেওয়া ঘুচিয়ে দেব।
রামু - খানিকটা গুড় ভেঙে খেতে খেতে - অ্যা থুঃ থুঃ এটা আবার কবেকার গুড়, আরশোলার গন্ধ। ইঁদুরের লাদি ভর্তি। আমি খ্যাতি পারছি না খদ্দের বাবুরা কি করে মুখে দেবে!
তৃতীয় খদ্দের - আরে এই ছেলে তোর মালিক কোথায় রে? তাড়াতাড়ি ডাক। বল ইন্সপেক্টর বাবু এসেছেন।
রামু - বাবু তো নাই। একটুকুন বসতি হব্যে।
ইন্সপেক্টর - আচ্ছা আচ্ছা বসছি, যা চা সিঙ্গারা নিয়ে আয় আগের বারের মতন সঙ্গে ডবল ডিমের ওমলেটও আনবি।
রামু - কুথা থেক্যে বাবু? আমিও খাব। কাল রাত্তির থেক্যে কিছু খাই নাই, বড্ডো খিদা পাইছে।
ইন্সপেক্টর - ও তুই নতুন চাকর? ওই গোপালদার চায়ের দোকানটা চিনিস না? ওই ওদিকের মোড়ে বাঙালি দাদার দোকান, তোর বাবুর নাম বলবি, ধারেই দেবে।
রামু - বাবুর নাম তো জানি না।
ইন্সপেক্টর - আচ্ছা বোকা ছেলে রেখেছে তো দোকানী। দে দুটো বিস্কুটের প্যাকেট দে।
রামু - (প্যাকেট দেয়) পয়সা দাও।
ইন্সপেক্টর - আমার পয়সা লাগে না। মালিকদের আমি বাবা হই, হপ্তা নিতে এসে চা পানি পেলাম না এই দুদিনের ছোকরা আবার পয়সা চায়। (প্রস্থান করতে উদ্যত)
রামু - (পা টা জড়িয়ে ধরে) - না বাবু আপনাকে আমি যেতে দিব না বাবু, তাইলে বাবু মারবে আমাকে। আপনি বসেন আর একটু।
ইন্সপেক্টর - আমাকে আরো অনেক দোকান ঘুরতে হবে, যা যা যেতে দে। যার কাছে যাব সেই আমাকে খাওয়াবে। তোর বাবু থাকলে দেখতিস কত খাতির করত। এই বড় বড় মিষ্টি আসত।
রামু - আমি আপুনিকে য্যাতি দেব না, আপনার খাবার এলে আমারেও একটু দেবেন বাবু।
ইন্সপেক্টর - আরে তুই তো বড় হ্যাংলা ছেলে। খালি খাই খাই করছিস। দে ঐ নুডুলসের ঐ প্যাকেটগুলো দে, আমার ছেলেটা আবার টিফিনে চাইনিজ ছাড়া কিছু খাবে না।
(একসঙ্গে একগাদা প্যাকেট তুলে ব্যাগে ভরে নেয় নকল ইন্সপেক্টর)
মালিক - রামু রামু আরে বাবা এ আবার এসেছে। (পলায়নের প্রয়াস)
রামু - ঐ তো বাবু এসে গেছেন, বসুন কর্ত্তা। এখুনি মিষ্টি, সিঙ্গারা, ডিম ভাজা সব আনতেছি।
মালিক - আরে এ বাঁদরটা করে কি? এ তো সেই নকল ইন্সপেক্টরটা, একে এতো
(জনান্তিকে দর্শকের দিকে) খাতির করছে।
ইন্সপেক্টর - হ্যাঁ দাদা এগুলো বাচ্চাদের জন্য নিলাম, আর চা টা কাল এসে খাব। আপনার এই ছেলেটা বড় ভালো পেয়েছেন। চলি -
মালিক - দাঁড়া তোর মজা দেখাচ্ছি। সিঙ্গারা খাওয়াবে, ফ্রি তে জিনিষ বিলি করছেন। আজই তোকে বিদায় করব।
রামু - ক্যান বাবু, আমি কি দোষ করছি?
মালিক - (মারতে উদ্যত) দোষ! না, না, তোর দোষ কেন হবে, আমিই ভুল করেছি তোকে রেখে, গেঁয়ো ভূত।
(কয়েকটি ছেলে, প্রথম, দ্বিতীয় খদ্দের, পুলিশ ও আসল ইন্সপেক্টর বাবুর প্রবেশ)
ইন্সপেক্টর - একি আপনি এই বাচ্চা সার্ভেন্টকে মারছেন?
মালিক - ও কিছু নয়, ওকে তো আদর করে বকছি। বসুন বসুন, চা খাবেন? রামু যা বাজার থেকে চা, সিঙ্গারা, মিষ্টি নিয়ে আয়।
রামু - না বাবু, আপনারা বসবেন না। বাবু আমাকে পরে বকবেন।
পুলিশকে ইন্সপেক্টর - (সব জিনিষ চেক করতে করতে) দেখুন সব জিনিসেই কত ভেজাল, আমরা খবর পেয়েছি আগেই। আজ এই বাচ্চাটা একজন ভদ্রলোককে চিনি দেয়নি ওতে তখনও কিছু মেশানো হয়নি বলে। চলুন এ্যারেস্ট করুন এঁকে।
রামু - আমি কোথায় যাব বাবু? আমাকে গাঁয়ে পাঠাই দ্যান বাবুরা। ই পাগলদের শহরে আমি আর থাকবনি।
মালিক - মাথায় চাপড় মারতে মারতে পুলিশের সঙ্গে প্রস্থান।
রামু - গান গায়
            ভেজাল বাবু পড়লো ধরা
            রামু পেল এবার ছাড়া
                                কয়েকটি ছেলের প্রবেশ। যে খাতা কিনতে এসেছিল
            দুষ্টু দোকানদারকে জেলে ভরো
            সরল রামু আজকে হিরো।
চল চল ভাই আজ থেকে তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে। তোমাকে আমরা পড়াব। দোকানে পড়ে পড়ে আর মার খেতে হবে না।
                                আনন্দে হৈ হৈ করতে করতে ড্রপসীন পড়ে।
 
       
                              সমাপ্ত

প্রকৃতির জয়-গান

চন্দনা সেনগুপ্ত

পাত্র-পাত্রী

স্থান: গভীর অরণ্য

সিংহ –       পশু রাজা, ও সিংহী তার পত্নী

বাঘ  –       মন্ত্রী ও বাঘিনী তার পত্নী

ভালুক  –       সেনাপতি

শেয়াল –       গুপ্তচর

হাতি –       প্রান্ত রক্ষক

বানর –       রাজ্ পেয়াদা ২/৪

হনুমান –       বীর সৈনিক ২/৪

পেঁচা, পেঁচী –       জ্ঞানী বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা

ময়ূর, ময়ূরী   –       রাজসভার নর্তক নর্তকী

হরিণ, খরগোশ, ইঁদুর, বেড়াল

সজারু, সাপ, কাঠবেড়ালি, টিয়া

ময়না ও কাঠঠোকরা   –       ক্ষুদ্র প্রাণীর দল

মানুষের দল –       শিকারী ২/৪, কাঠুরে ৩/৪

নাটকের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি

মঞ্চ সজ্জায় – ব্রাউন পেপার ও কার্ডবোর্ড, থার্মোকল দিয়ে তৈরী গাছ, সবুজ পাতার ছাউনি, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী ঘন জঙ্গল।

পিছনে পাহাড় ও নদীর দৃশ্যপট

পশু পাখিদের পোষাক, ল্যাজ, দাঁত, নখ ও শিং বা পাখিদের ডানা বা ময়ূর পেখম (কিন্তু মুখ ঢাকা থাকবে না। মাথায় টুপি পরিয়ে মুখোশ লাগাতে হবে। মুখের অভিনয় expression না দেখতে পেলে দর্শক আনন্দ পাবেন না।)

বাদ্যযন্ত্র – হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, বাঁশী, গীটার বা সিনথেসাইজার ও ঘুঙুর। (প্রথম দৃশ্যে হালকা ভাবে বাজবে। পাখিদের আনন্দের সঙ্গে ময়ূরের নাচে দ্রুতলয়ে ঝংকৃত হবে।)

বানর বা হনুমানের দল লম্ফ ঝম্ফ করে বেড়াবে, প্রথমে তাদের জন্য তবলা ও ড্রাম বাজবে, তারপর হারমোনিয়াম। হিংস্র পশুদের গর্জন, শেয়ালের ডাক, পেঁচার চিৎকার ইত্যাদি হরবোলা দ্বারা প্রয়োগ করলে, জঙ্গলের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

শেষ দৃশ্যে মানুষের আগমন, বাজনার তাল ও সুর পরিবর্তন। শিকারী ও কাঠুরের নিষ্ঠুরতার effect আনবার জন্য জুতোর শব্দ, কাঠ কাটবার কুঠারাঘাত এবং দু একবার বন্দুকের আওয়াজ দিতে হবে।

যুদ্ধের দৃশ্যে রকমারী আলোর খেলা চলবে, দ্রুত লয়ে বাদ্যযন্ত্র ঝংকৃত হবে এবং মানুষ হার স্বীকার করে “পলায়ন পলায়ন” চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যাবার পর হটাৎ সব শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং একটু পরে আনাচে কানাচে সব জায়গা থেকে সব ছোট বড় জন্তুরা একত্রিত হলে সম্পূর্ণ নতুন শুরে হারমোনিয়াম, বাঁশী ও তবলার সঙ্গে কোরাস গানটি গাওয়া হবে।

হাতিকে বেঁধে রাখার শেকলটি কাগজের হবে যাতে ছিঁড়তে সুবিধা হয়।

পোষাক – একদল শিকারী তীর ধনুক বা বর্ষা হাতে (নাগা নাচের মত) শুধু ড্রামের সঙ্গে নাচ করে কিছুক্ষন মঞ্চকে মাতিয়ে দেবে।

তারপরে প্যান্ট কোট, হ্যাট পরে বন্দুক হাতে সাহেবদের মত (পাশ্চ্যাত্য নাচের ভঙ্গিতে) শিকার করবে। সঙ্গে জন্তুদের আর্তনাদ।

চার বছরের শিশু থেকে ১৪ বছরের কিশোর বালক বালিকাদের দ্বারা নাটকটির অভিনয় করা যায়।

একেবারে ছোট শিশুদের খরগোশ, হরিণ, টিয়া, ময়না, সজারু, কাঠবিড়ালি বা বাঘ সিংহের বাচ্চা সাজানো হবে। প্রত্যেকে যেন ২/৪ লাইন করে কথা বলতে পারে – আদো আদো স্বরে। যুদ্দের দৃশ্যের বড় অভিনেতারা অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের (৮ থেকে ১২) এর বালক বালিকারা  ছোট পশু পাখিদের লক্ষ্য রাখবে এবং বাঘ, ভাল্লুক, হাতি ও সিংহ একটু বড় বাচ্চারা ১৩/১৪ সাজলে অভিনয় শেখাতে সুবিধা হবে।

বিদ্যালয়ে বা পুজো প্যান্ডেলে এই নাটকটি মঞ্চস্থ করবার সময় বাচ্চা বেশি এসে গেলে জানোয়ারের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ইঁদুর, শুয়োর, নেকড়ে, ছানারা পাখিদের সঙ্গে বাজনার তালে তালে হাত পা দুলিয়ে নাচ করতে পারে প্রথম দৃশ্যে তারপর ৮ থেকে ১৪ বছরের ছেলে মেয়েরা অভিনয় করবে। তাদের মুখে বিভিন্ন জেলার ভাষা বা উচ্চারণ পদ্ধতি দিয়ে দর্শককে আনন্দ দান করতে হবে। বাঁদরদের গা চুলকানো বা উকুন বাছার অভিনয়, ডিগবাজি খাওয়া, দাঁত খিঁচুনি – সব মিলিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করতে হবে।

আলো – প্রথমে আলো আঁধারি, পরে আস্তে আস্তে আলো বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা বাড়ানো হবে। মঞ্চে যে যখন কথা বলবে তার মুখে স্পট আলো ফেলা দরকার।

মাইক – গাছের ফাঁকে, অভিনেতার বুকে অথবা খুব নিচুতে ঝোলাতে হবে।

অভিনেতা চয়ন – অভিনেতা চয়ন খুব সচেতনভাবে করা প্রয়োজন। বাচ্চাদের চেহারা, চোখের চাহনি, নাচ বা অভিনয়ের পারদর্শিতা অনুযায়ী পার্ট দিতে হবে। মোটা সোটা ছেলে বা মেয়ে না পেলে বনরক্ষক হাতির অভিনয়ে একটু স্বাস্থবান বড় (১৫/১৬) ছেলে বা মেয়ে নেওয়া যেতে পারে।

নাটকটি শিশুদের জন্য লেখা হলেও এর মূল বক্তব্য – Conservation of forest and wild life

মূল বক্তব্য

স্বার্থপর “মানুষ” যেন ভুলে না যায় যে এই পৃথিবীটা “তার” একার নয়, গাছপালা, পশু-পাখি সবাইকেই বাঁচার অধিকার দিতে হবে।

প্রথম দৃশ্য

(গভীর জঙ্গলে প্রথমে কিছুক্ষন বাঘ সিংহের গর্জন, হায়নার হাঁসি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাবে, টুনি বাল্ব দিয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি পোকার জ্বলা ও নেভা। প্রথমে সিংহ ও পরে বাঘ এবং ভালুকের প্রবেশ।)

সিংহ – আমি পশুর রাজা, সবাইকে দিই সাজা, জন্তুগুলো পালায় কোথা? রক্ত খাবো তাজা।

বাঘ – হালুম হুলুম হালুম ! ওরে বাবারে গেলুম, জঙ্গল সব খালি হ’ল, খিদের জ্বালায় মলুম।

ভালুক – নমস্কার ! নমস্কার রাজামশাই, প্রাণটা করে আই ঢাই, হেথায় হোথায় ঘুরছি মরে, খাবার জিনিস কোথায় পাই?

(সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নি তাদের বাচ্চা ছানা পোনা নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবেন)

সিংহী – শিকার শিকার করছো ক্যানো, ছোট পশু যে হলো হাওয়া, গহন বনের আঁধার কোথায়, করবো যে আজ ওদের ধাওয়া !

বাঘিনী – সত্যি রে ভাই রানী দিদি, বাচ্চাদেরকে খাওয়াবো কি, উপোস করেই মরতে হবে, সর্বনাশ যে হল, দেখি !

সিংহী – গর্ত, গুহা নদীর বাঁকে, ছিল শাখে, পাতার ফাঁকে – চাঁদের আলোয় লুকোচুরি, ছানা পোনা লাফিয়ে গিয়ে – আসতো মুখে শিকার নিয়ে, করতো কতই বাহাদুরী।

ভালুক গিন্নি – সে সব কথা জাগায় ব্যাথা, মৌচাক সব হেথা হোথা, ঝরতো মধু সদায় সেথা; আজ সেই সব শাল কি সেগুন, ফোটায় না ফুল কোনো ফাগুন, শুনতে না পাই মৌমাছিদের, সেই সুমধুর গান গুনগুন।

বাঘ – হালুম হুলুম হুল, ভেবে না পাই কুল ! সিংহমশাই বিহিত করুন হচ্ছে কিসে ভুল?

সিংহ – আরে ভাইয়া কি যে হল, বিপদ বড়ই ঘনিয়ে এলো, জঙ্গল আর রইল না যে জন্তুরা সব হারিয়ে গেলো?

বাঘ – এখন বলুন উপায়টা কি? শেয়ালটাকে ডাকুন দেখি, গ্রাম শহরে খবর নিতে – আজকাল সে দিচ্ছে ফাঁকি।

ভালুক – শেয়াল মোদের গুপ্তচর – বনের ধারেই তার যে ঘর – পাণ্ড্যিত্ব দেখায় তো খুব এখন একটু কাজ তো কর।

গাছের ওপর একদল বাঁদরের আগমন তাদের কিচির মিচির আওয়াজে সবাই ওপরে তাকায়, সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নিরা – স্টেজের একদিকে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল – সিংহী এগিয়ে আসে –

সিংহী – চল চল সব ওদের পানে – লুকিয়ে পড়ি ঐ ওখানে – একটা বাঁদর ধরে খাই, বাচ্চাগুলোর প্রাণ বাঁচাই।

সিংহ (রাগত স্বরে) – আহা গিন্নি যাও বাড়ি যাও, পোকা মাকড় যা পাও খাওয়াও, এখন ওদের বড় দরকার ব্যাপারটা কি সেটা জানবার।

বাঘ – (মন্ত্রী) ওরে বাঁদর, হনু, বেবুন – একটুখানি এধারে শুন – শেয়ালটাকে আনতো ধরে, মেরেই ওকে করবো খুন।

বাঁদর – রাজামশাই, মন্ত্রীদাদা – আপনারা তো বড্ড হাঁদা – শেয়ালটাকে কোথায় পাবো? ওতো এখন ঘুমিয়ে কাদা।

ভালুক – মুখপোড়া তুই বলিস কিরে? থাকবে ওরা ঘুমের ঘোরে? বনের পশু যাচ্ছে মরে, সে কথা কি জানে না রে?

বাঘ – আগে মোরা সন্ধ্যাবেলা করতে যেতুম শিকার খেলা শেয়ালেরা গান শুনিয়ে, খুলতো মোদের কানের তালা। সিংহ বইতো কত গানের ভেলা, শুনতে পেতুম যাত্রা পালা।

ভালুক – সত্যি ভায়া যা বলেছো, ছিল বড়ই সুখের দিন, – চাঁদের আলো হলেই ক্ষীণ হরিণ, চিতল, বুনো শুয়োর নাচতো কেমন তা ধিন ধিন।

বাঘ, ভালুক, সিংহ (তিনজনে একসঙ্গে সুর করে) – আহা সে কি সুখের দিন, সন্ধ্যে হলেই ঝিঁ ঝিঁর বীন, – বাদল হলেই নাচতো ময়ূর – পেখম তুলে তা থৈ তিন।

সিংহী – বনরক্ষক হাতিরা সব শুঁড় দুলিয়ে কোথায় যায়? নেকড়ে শেয়াল ‘রা’ কাড়ে না, কেন এমন পালিয়ে বেড়ায়?

বাঘিনী – রাজপেয়াদা বানরগুলো, করছে দেখো ফোক্কড়ি, (সুর টেনে) ঘোর – “কলি যুগ” এলো বুঝি ওমা মোরা কি যে করি !

বাঘ (রাগত স্বরে) – বেগম, তুমি চুপ করবে? নাকে কান্না বন্ধ হবে? চলুন রাজা নদীর ধার, সাঁতার কেটে যায় উস পার, এই জঙ্গলটা হলো খালি, চারি ধারে ধুলো বালি।

সিংহী – তাই চলো ভাই, আমরা সবাই, পূর্ব হতে পশ্চিমে যাই, ভেবে ভেবে কূল নাহি পাই, কেন কাল কাটাই?

ভালুক (বিজ্ঞের মতন মাথা নেড়ে নেড়ে) – ওপারটারে দূরের থেকে, দেখতে কিন্তু লাগে ভালো, কাছে গিয়ে দেখবে শুধু, শহর বাজার আগুন আলো।

সবাই মিলে (হিংস্র পশুরা সবাই চলে যায়) – তবু চলো, দেখি চলো, . . . .হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই তাই চলো যাই।

বাঁদরদল (ওপর থেকে বাঁদরেরা ইয়ার্কির সুরে) – শ্যামল সবুজ নেইকো কোথাও, গাছপালা উদাও হল, নীল আকাশে ধোঁয়া কালো, ঘাস হীন মাঠ শুকনো ধুলো।       

হনুমানেরা – গাছের ফলে পেট ভরে না, তাই চলে যাই তীর্থস্থান, গণেশজীকে দুধ খাওয়াতে, ভক্ত মানুষ করছে গান। মোদের নামে ঠাকুর বানায়, লাড্ডু বোঁদে নিজেরা খায়, কদলী কি গাজর মুলী, ভুলেও কভু করে না দান।

একটা ছোট বাঁদর – ক্যামনে বাঁচে আমাগো জান, কি খায় বলো পোলা পান?

খালি স্টেজে এবার ধীরে ধীরে বাঁদরদের সঙ্গে অন্য ছোট পশুদের আগমন হয়। একধারে ময়ূর, হরিণ, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীদের প্রবেশ। প্রথমে ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক উঁকি মারে এবং তারপর সবাই গোল হয়ে দাঁড়ায়। বাজনা বাজতে থাকে তালে তালে সবাই দুলে দুলে গান গায়। মেঘ ডাকে মাঝখানে ময়ূরের নাচ শুরু হয়।

গান (লোকগীতির সুরে – ত্রি-তাল)

আমরা ছোটো জন্তু ভাই, –

এসো সবাই নাচি গাই,

বাঘ সিংহ পালিয়ে গেল,

আর তো কোনো চিন্তা নাই।

(খোল মৃদঙ্গ বাজবে)

ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই –

এসো ঠুংরি টপ্পা গাই,

হিংস্র পশু ওপার গেছে –

আমরা সবাই নাচি তাই।

নাচের তাল – তা থৈ থেই তাৎ,

আ থৈ থই তাত –

তিক দা তিকি তিকি তেই,

(কত্থকের তালে নৃত্য ৫ মিনিট)

(তারপর ভরত নাট্যমের তালে)

তই অম তাত্ তা, তই অম তা –

আ বৃষ্টি ঝেঁপে আ

মেঘ দেখে মন নাচেরে গা –

আয়রে তোরা তাল মেলা।

(প্রথমে মিউজিক দ্রুত হয় তারপর ধীরে ধীরে আওয়াজ প্রায় থেমে আসে, নাচ থেমে যায়।) স্টেজের দু দিক দিয়ে দুটি খরগোশ ছুটে আসে। সব পশুপাখি তখন পিছনে সেমি সার্কেলে দাঁড়িয়ে পড়ে।

খরগোশ (হাঁপাতে হাঁপাতে) – ও ভাই তোমরা নাচছো ক্যানো? সামনে বিপদ আসছে জেনো, খুশির সব ভুলে যাও, মোদের কথা একটু শোনো।

হরিণ, ইঁদুর – কেন কেন ব্যাপার কিরে? বাঘ ভাল্লুক আসছে ফিরে?

সবাই মিলে – সিংহ রাজাও আসছে বুঝি? গেলো তো সব নদীর পারে।

খরগোশ – না গো দাদা জন্তু নয়, ওদের দেখে লাগছে যে ভয়, নল – বন্দুক, ঘাড়ে নিয়ে, দুই পায়ে তো দাঁড়িয়ে রয়।

ময়ূর – ও মা গো মা, “মানুষ” ওরা, মহা পাঁজী হতচ্ছাড়া, ল্যাজ ধরে সব টানবে মোদের, সুযোগ পেলেই পাগল পারা।

ছোট্ট বাঁদর (সামনে এগিয়ে এসে) – শহর গঞ্জে গ্রামে থাকে, কাপড় দিয়ে দেহ ঢাকে, দয়া মায়া নেইকো মোটে, মানুষ নামে ওদের ডাকে।

(পাখিরা ভয় পেয়ে পেঁচা পেঁচীকে আওয়াজ করে জাগায়) ওপর দিকে তাকিয়ে –

টিয়া, ময়না – পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি, তাড়াতাড়ি নিচে আয়, সংকট আজ বড় মোদের, মানুষ বুঝি এসেই যায়।

পেঁচা (পেঁচা-পেঁচী গাছের থেকে নিচে নামে)       – নাতি নাতনিরা ক্যান চেঁচাস? কারণ বিনাই মাথা যে খাস ! কি হইস্যে বল তোদের? বনে আগুন লাগল কি ফের?    

ছোট্ট পাখি (সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে) – কিচিরমিচির ট্যাঁ ঠ্যাঁ, হর্ন বাজছে প্যাঁ প্যাঁ, ঢুকছে গাড়ি মানুষ নিয়ে এবারে কি হবে এ্যা এ্যা…..

বড় পাখি (বড় পাখিরাও কান্নার সুরে) – এ্যা এ্যা এ্যা এ্যা,  ভরবে খাঁচায় মোদের ছানা, কাটবে বড় পাখির ডানা, রাত দুপুরে ওদের হানা – কেমন করে করবো মানা, ঘৃণ্য যে কাজ ছ্যা ছ্যা ছ্যা মরতে হবে এবার তবে এ্যা এ্যা এ্য।

খরগোশ – মানুষেরা এলো বনে, জানোয়ারকে মারতে – চামড়া খুলে, মাংস খাবে, পারবে না কেউ বাঁচাতে।

পেঁচা – আগে ওরা আসতো শুধুই – করতে শিকার খেলা, এখন আসে অস্ত্র হাতে কাটতে যে গাছপালা।

বানর – ও মা – সে কি ! গাছ কাটবে? লাগবে ওদের কত ব্যাথা !

পাখিরা সবাই – ভাঙবে বাসা, টুটবে আশা, ডিম্ আমরা পারবো কোথা?

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে) – বাঘ, ভাল্লুক তো অনেক ভালো, খিদে পেলে তবেই খায়। ঘর পরিবার শেষ করে দেয় ! এরা যে মোদের মেরে মজা পায় !

হনুমান (বৃদ্ধ হনুমানের গম্ভীর আওয়াজে কটূক্তি – ক্রোধিত স্বরে) – এরা কি শুধুই পশু মারে? ভীষণ নিঠুর কুটিল প্রাণী, ভাই ভাইকে হত্যা করে – নিত্য এদের হানা-হানি। জায়গা জমি, টাকার তরে – আগুন লাগায় স্বজন ঘরে – ধর্ম নামের দোহায় দিয়ে – রক্ত ঝরায় নিজেও মরে।

(সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে উদাস হয়ে)

ছোট্ট ইঁদুর একবার ছুটে এদিকে একবার ওদিক করে দর্শকদের জানায় –

ইঁদুর – এক্ষুনি ভাই দেখে এলাম, আজব ব্যাপার খানা, – হাতি মামা বইছে মানুষ – করছে নাতো মানা। কাঠ কেটে সব মোট বেঁধেছে, পিঠে কাঠের বোঝা ঠাসা, বনরক্ষক ওদের চাকর, ওকে মানিয়েছে বেশ খাসা।

ময়না, টিয়া – দেখেছিলাম মোরাও সেদিন, ওদের যাওয়া আসা, বসিয়ে পিঠে জন্তু মানুষ, হাতির ভালোবাসা।

পেঁচা – দিনের বেলা চক্ষে কানা, এসব কথা নেই তো জানা, বুঝতে হবে ব্যাপারখানা, করছে না “সে” কেন মানা?

বাঁদর – হ্যাঁ ভাই চলো, করি গো খোঁজ, হাতি কেন ওঠাচ্ছে বোঝ।

হনুমান – সিংহ রাজায় খবর দে – সময় যে নাই, করতে মৌজ।

ময়ূর – হ্যাঁ ভাই সবাই, তাই চলো, এই খবরটা ওদের বলো – বনবাসী যে মোরা তাই – সবার বিপদ ঘনিয়ে এলো।

সবাই – আমরা যত পশু-পাখী ছোট বড় প্রাণী, বনের মধ্যে মিলে মিশে থাকতে সবাই জানি। হিংশ্র জন্তু, বিরাট ভীষণ – বাঘ সিংহ কাঁপায় যে বন, মোদের ওরা ভক্ষক হন, তবু ওদের “গুরু” মানি।

(সব পশুরা লাইন করে মঞ্চের এক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় আবার অন্য দিক দিয়ে প্রবেশ করে। মঞ্চ কয়েক মিনিটের জন্য অন্ধকার হয় এবং সেই সময় একটি বড় সাপ গাছ থেকে ঝুলে পড়ে – মুখে স্পট লাইট দেওয়া হয়। নেপথ্যে গান। গানের সুরে – “মন ডোলে মেরা তন্ ডোলে” হিন্দি গানের সুরেও গাওয়া যেতে পারে।)

সাপ – কোথা যাবি ভাই সব, বন কোথা পাবি রে? মানুষের জঙ্গলে পিষে মরে যাবি রে। মোরা এতো বিষধর, তবু নেই ভয় ডর, দেখলেই লাঠি মারে কেন এই অনাদর?

(সাপুড়ের বাঁশি ও বাজনা বাজবে, দুই হাত মাথার ওপর ফনার মতন তুলে মঞ্চে শুয়ে বসে মাথা দুলিয়ে সাপের নৃত্য চলবে দু মিনিট তারপর প্রস্থান এরপর বন বিড়ালী ও নেকড়ের প্রবেশ গালে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে বসা। ধীরে ধীরে পশুদের প্রবেশ – খরগোশ, হরিণ ও বাঁদর বনবিড়ালীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করে –

বাঁদর – বন বিড়ালী, বিল্লী মাসি একলা ক্যানো আছো বসি?

খরগোশ – উদাস বড় লাগছে তোমায়, কোথায় গেল মুখের হাসি?

বিল্লী – আমাদের মেরে ফেলে, লোম চামড়া নিচ্ছে খুলে থাকবো না আর এই বনেতে, মনের দুঃখে যাচ্ছি চলে।

নেকড়ে – মোদের লোমে পড়ে জামা, জুতো টুপি দস্তানা, মারলো মানুষ আমার মিত্র, কোথায় যে যাই? নেই ঠিকানা। গুন্ডা ওরা, ঘোরায় ছোড়া মাস্তানদের মস্তানা। ভবিষ্যৎ কি নেই জানা?

খরগোশ – মোদের সঙ্গে চলুন মশাই, রাজ দরবার যাচ্ছি সবাই, তাঁরা সতেজ বলশালী তাই, বিহিত একটা হবেই ভাই।

সবাই প্রস্থান করতে করতে – এসো মোরা আজ সব, করি কিছু অভিনব। কোরো না গো কলরব, দুঃখ হোক অনুভব।

(খালি মঞ্চে শুধু কটি গাছ। ভোরের আলো ফুটলে কয়েকটি মৌমাছি এবং প্রজাপতির আগমন)

মৌমাছি – প্রজাপতি, প্রজাপতি, কেন তোর দ্রুতগতি? দাঁড়া নারে একটুখানি, ফুলে ফুলে উড়ে যাবো, দুজনাতে মধু খাবো, বাগানের মোরা যে রানী।

প্রজাপতি – মৌচাকে ঢিল পড়লো এবার, মোম, মধু সব নিলো চোরে – মৌমাছি তুই এখনো ভাই, আছিস কেন ঘুমের ঘোরে?

মৌমাছি – করছে যারা সর্বনাশ, বল না কোথায় তাদের বাস? হুল ফুটিয়ে কুপোকাৎ, করবো আমি বাজি মাৎ।

প্রজাপতি – চল তবে দলে দলে, পশু সব যেথা চলে, গাছহীন শ্মশানে, মানুষের বনে বনে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

(দিনের আলো – বনের খোলা চত্বর – গাছ-পালা দূরে সরিয়ে মঞ্চে একদিকে ছোট পশুদের বসার জায়গা অন্যদিকে একটি উঁচু পাথরের ওপর রাজার সিংহাসন, ফুল পাতায় সাজানো, তারপাশে মন্ত্রী বাঘমশাই ও সেনাপতি ভালুক দাঁড়িয়ে আছে।)

বাঘ – হুঁ, তাহলে দেখি ব্যাপার স্যাপার বড়ই গুরুতর সবাই মিলে একসঙ্গে, বসে কিছু উপায় করো।

ভালুক – বন কেটে আজ মানুষ জাতি, বানিয়ে নিল শহর ঘর, বৃষ্টি বন্ধ, মাটি ফাটে, আসছে শুধুই ধুলোর ঝড়। পাহাড় মাথায় পাথর শুধু, মাঠের ওপার মরু ধু ধু – মৌচাকেতে নেইকো মধু, কী হবে এরপর?

হনুমান – তাই তো মোরা হেথায় এনু, দেখে শুনে ভয় যে পেনু, আমি এতো মোটা হনু, মানুষগুলো শীর্ণ তনু – তবু ওদের বন্দুক যে বাড়িয়ে দিল, মনের ডর।

খরগোশ – ঝোপ ঝাড় নেই  নদীর পাশেই, দালান বাড়ি গ্রাম শহর, ঝর্ণাগুলোও শুকিয়ে গেল, জল পাওয়া যে হয় দুষ্কর।

(সিংহের প্রবেশ – সবাই উঠে দাঁড়াল, ছোটরা রাজার পায়ে পড়ে গেল)

একসঙ্গে (হৈ চৈ হট্টগোল) – প্রণাম, প্রণাম, জয় মহারাজ, আমাদেরকে বাঁচাও হে আজ, ছোট্ট মোরা নিরীহ যে, বন বাঁচাতে দাও তবু কাজ।

সিংহ – আরে আরে থামো সব। কেন করো কলরব? দুঃখ কি বল তোমরা, করি আমি অনুভব।

(ছুটতে ছুটতে শেয়ালের প্রবেশ, সবাইকে একসঙ্গে দেখে ঘাবড়ে যায়, মঞ্চের সামনে এসে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে। শেয়ালের ডাক হুয়া হুয়া হুক্কা হুয়া)

শেয়াল – (তারপর রাজার দিকে ফিরে) একী দৃশ্য অভিনব! বড় ছোট এক হলো সব, কিসের তরে এ উৎসব – করেন রাজা সভা? ডেকে পাঠান আমায় কেন, বিপদ আভাস পেল যেন, বনের প্রান্তে লাগলো আগুন, আকাশে লাল আভা। এই যে হুজুর সেলাম সেলাম ! একটু আগেই খবর পেলাম, আপনি আমায় তলব দেছেন, তাইতো ছুটে এলাম।

সিংহ (রাগতভাবে) – গর্ত্তে কেন সেঁধিয়ে থাকো? শত্রুদের কি খবর রাখো? জানোয়ারদের বিপদ কত, সে কথাটি জানো না কো?

বাঘ – গুপ্তচর যে পশুর তুমি, ছাড়লে কেন বনের ভূমি? গানের রেওয়াজ করছো না আর বানলে চেলা জানি না কার? ভুললে কি ভাই সবুজ বনের, কোমল নরম জমি? জানো না কি এ অরণ্য আজকে কত দামি!

শেয়াল – মন্ত্রী, রাজা কোরো না রোষ – বিচার করো দিও না দোষ। যেথায় সেথায় মরি ঘুরে, মানুষ সদাই তাড়াকরে কুকুর ভয়ে লুকিয়ে থাকি – বাচ্চা কাচ্চা গেল, মরে। দুঃখ জানাই কেমন করে? করছি শুধু আফশোষ। সিংহ রাজা ক্ষমা করো, রেখো না হে আক্রোশ।

(খরগোশ হঠাৎ আবেগ প্রবন স্বরে রাজার সামনে লুটোপুটি খায়)

খরগোশ – রাজামশাই মোদের কে খাও, তুমি তোমার জোর বাড়াও তারপরেতে ঝাঁপিয়ে পড়ো মানুষগুলো তাড়িয়ে দাও।

হরিণ – হ্যাঁ মহারাজ আমাকে খাও, বাচ্চাদের তো তুমি বাঁচাও।

পাখী – ডিমগুলো তো ফুটতে দাও, কাঠুরেকে মেরে খাও।

পেঁচা – গাছপালা সব সাবাড় হলে, ঘর বংশ থাকবে না তাও।

ভালুক – আগে চলো হাতির কাছে, দেখি কি যে উপায় আছে! বিশাল দেহের শক্তি কেন, ক্ষয় করে সে মানুষ পিছে।

বাঘ – হাতি মোদের বন রক্ষক, এমন শক্তিশালী তাকেও ওরা বশ করেছে, বোঝা সে বয় খালি।

সিংহ – মানব জন্তু এই পৃথিবীর, সবচেয়ে অধিক বুদ্ধিমান, অস্ত্র হতে ক্যামনে আমি, বাঁচাই তোদের কোমল জান?

হনুমান – হে মা তুমি বনদেবী, রাখো সকল পশুর মান। সবাই মিলে একসঙ্গে, যুদ্ধ করে বাঁচাবো প্রাণ।

সবাই একসঙ্গে – চলো সবাই মিছিল করে, প্রথমে যাই হাতির কাছে, নখ, দাঁত, শিং বাগিয়ে ধর – যার যা কিছু অস্ত্র আছে।

(পশু-পাখী চলে গেছে এবার গাছপালার গান ধরে। শারীরিক বেশি স্বাস্থবান শিশু বা যে কোনো কারণে যারা মঞ্চে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের এই সব গাছ পালার অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। গানের সুরে – রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদী বা দিজেন্দ্রগীতি। শ্যামাসংগীতের সুরেও হতে পারে।)

বড় গাছ – কী আনন্দ কী আনন্দ, উঠল জেগে, আমার মন, পশু-পাখী জানোয়ার, হ’ল সব সচেতন। আমরা যত গাছ-পালা, হলাম বড় আজ উতলা, দাঁড়িয়ে থাকি – আঁকড়ে মাটি, মনের কথা হয় না বলা।

ছোট গাছ – কাটছে মানুষ সারাক্ষন, কাঠের লোভে অরণ্য বন, এই প্রকৃতি সদায় ভোলা, জানে না কে আপনজন।

বড় গাছ – মূক করেছেন. ভগবান, দেছেন, অসীম শক্তি দান, ভুলেই গেছে মানব বুঝি – মোদের বুকেও আছে যে প্রাণ। আমরা যে দিই শুদ্ধ হাওয়া – অক্সিজেনে ভরা, আমরা করি শ্যামল কোমল, স্নিগ্ধ সবুজ ধরা। ইচ্ছে করে এ ডাল দিয়ে, আঘাত হানি জোরে। পশু-পাখীর সঙ্গে গিয়ে শেষ করি শত্রুরে। মা, মা গো মা গো বিনাশ হতে বাঁচাও তুমি – রক্ষা করো মোদের সবারে।

সবাই একসঙ্গে – বাঁচাও অরণ্যেরে।

তৃতীয় দৃশ্য

(হাতি বনের এক প্রান্তে শেকল দিয়ে বাঁধা আছে এবং বার বার শুঁড় দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে তার দুঃখ ব্যক্ত করে। করুন বাঁশির সুর আবহ সংগীতে)

হাতি (মোটা গলায় গান) – হে ভগবান রাজার রাজা, আমাকে দাও এ কোন সাজা? মানব ছিল, তোমার প্রজা, আজ ধরণী রাজ করে – নিষ্ঠূর সে, অবুঝ প্রাণী, পশুর পরে আঘাত হানি, বনের থেকে আনলো টানি – বশ করে বা চাবুক মেরে।

(বাঘ সিংহের প্রবেশ)

সিংহ – নমস্কার নমস্কার হাতি মামা, এ কী হল তোমার হাল? চোখের জলে শুঁড় ভেসে যায় – কোথায় গেল মত্ত চাল?

হাতি – কী আর তোদের বলবো রে হায় – কেমনভাবে দিন কেটে যায়, সারা দেহে মারের আঘাত – মরছি আমি যন্ত্রনায়।

পাখীর দল-পেঁচা – তাইতো আহা হাতি দাদা, তোমা গো এই দশা! দুঃখ মোদের রাখমু কোথা? পায় না খুঁজে ভাষা।

হাতি – দেখো, আমার পায়ে শেকল, শরীরে নাই আর কোনো বল, কাঠের বোঝা চাপিয়ে পিঠে – পাচ্ছে মজা মানুষ দল।

ভালুক – আমরা তোমার সমব্যাথী, তাই তো সবাই হলাম সাথী, মুক্ত করবো যেমন করেই হোক, তারপরেতে কাল প্রভাতে বনের পশু সব একসাথে, মারবো যত কুটিল বোকা লোক।

বাঘ – বেকার কথাই সময় কাবার – রাজা, আপনি আদেশ করুন, শিকারী ও কাঠুরে কে জব্দ করবো, কখন বলুন?

সিংহ – আগে এস সবাই মিলে, হাতি মামাকে দিই খুলে, তারপর প্রস্তুত হও, যার আছে যা অস্ত্র লও।

(সেনাপতি ও মন্ত্রী একসঙ্গে আদেশ দেয় – মার্চের সুরে বাজনা বাজবে চল-চল-চল গান। সাবধান, বিশ্রাম। সাবধান, আগুয়ান। সবাই লাইন করে দাঁড়ায় এবং বাজনার তালে তালে শেকল খোলা হয়।)

বাঘ, সিংহ – জোর লাগাকে

ছোট পশুর দল – হেঁ-ই-সা

বড়রা – শেকল হোক না

ছোটরা – ক্যায়সা

বড় – হাতি মামাকে

ছোট – মুক্ত কর

বড় ও ছোটরা মিলে – আগে ছিল জ্যায়সা। হেঁ-ই-ও মারো হেঁ-ই-সা, জোর লাগাকে হেঁ-ই-সা…)

(হাতি মুক্ত হয়ে যায়। পশুরা সবাই আনন্দে হাততালি দেয়। এবারে সবাই সিরিয়াস হয়ে দাঁড়ায়।)

সিংহ – সেনাপতি ভালু দাদা – কোথায় গেল রাজ পেয়াদা?

বাঁদর – (স্যালুট করে পা ঠুকে আগে এসে দাঁড়ায়) পশুদের মর্যাদা রাখবো যে মোরা সদা।

(বাজনা দ্রুত হয় এবং জন্তুরাও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়)

হাতি – বড় বড় দাঁতগুলো ভগবান যদি দিল, কেন তারে রাখি শুধু সাজিয়ে, শত্রু যে দিনে দিনে আমাদের নিল কিনে, আজ দেব তার ভুঁড়ি ফাটিয়ে।

হরিণ – সুন্দর দাঁত মোর চোখে যেন লাগে ঘোর, কাজে কেন এতদিন লাগেনি? নিজ মনে করি বাস, খাই লতা পাতা ঘাস, রাগ দ্বেষ মনে কভু জাগেনি, এই শিঙে দেব ধার, তেড়ে যাব বার বার – থেমে যাবে মানুষের বকুনি।

বাঘ – গদা সম থাবা মম হবে তার যম রে – শিকারীকে চিৎপাত, করে নেবো দম হে।

একসঙ্গে – শিঙ সব করি ধার –

তিনজনে – দাঁত সাজিয়ে রাখবো না আর,

বাঁদর – মল্ল যুদ্ধ করব আমি, মাথায় চাঁটি মারবো কার?

বাঘ – দয়া মায়া করব না রে, ঘাড় মটকে দেব এবার।

পেঁচা – ঠোকর খেয়ে মানবে হার,

পেঁচী – যমের দুয়ার হবে যে পার।

(বাঁদর, হনু জুডো ক্যারাটের ভঙ্গি করে সবাই খুব এক্সসাইটেড হয়ে ওঠে)

হরিণ – বোকা ভাবে আমাদের? গুঁতো খেলে পাবে টের।

বন বিড়ালী – নখ দিয়ে আঁচড়াবো, তেজ দেখো নখুনের।

সাপ – দংশনে যাবি জ্বলে, বিষ তাতে দেব গুলে, বিদ্রোহী হবি আয়, ভালো কথা যা রে ভুলে।

সিংহ – জিতে যায় ওরা সদা, বুদ্ধি ও ছলে বলে, মোরা যদি এক হই – লড়ে যাই কৌশলে – দুর্ব্বল মানুষের তাহলে কি আর চলে? আলোড়ন আজ তুলে, পশু চলে দলে দলে।

হাতি – ছোট বড় সক্কলে, যদি এক জোট হলে তাড়াতাড়ি চলো – তবে, হেরে যাবো দেরী হলে।

(বড় পশুরা পিছিয়ে যায় ছোটদের দল এগিয়ে আসে)

খরগোশ – সজারুর এই কাঁটাগুলো, ফুটিয়ে দেব ওদের পায়ে,

বাঁদর – ল্যাজ দিয়ে  আজ জোরে জোরে, মারবো ঝাপট সারা গায়ে।\

পেঁচা – চাঁচা ঠোঁটে ফুটো করি, টাক – মাথা – তালু আয়,

হরিণ – অক্কা পাবে শিকারী দল, করবে মানুষ হায় হায়।

ভালুক – চুপ চুপ কথা নয়, আসছে যেন কারা, লুকিয়ে পড়ো ঝোপে ঝাড়ে, ডাকলে দিও সাড়া।

(কেউ কেউ তখুনি গা ঢাকা দেয়, কেউ বা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে জায়গা খোঁজে)

খরগোশ – সেনাপতি বললেন লুকিয়ে পড়ো, ঐ গাছটাতে তোমরা চড়ো।

বাঁদর – চুপ চুপ একদম কেউ না ন’ড়ো, বুঝে সুঝে কাজ করো, বিপদ যে বড়ো

(মঞ্চ অন্ধকার, শুধু টুনি বাল্ব দিয়ে পশুদের চোখ জ্বলবে নিভবে। তার মধ্যে গলা শোনা যাবে -)

শেয়াল – মানুষগুলো রাতকানা ভাই, গাঢ় আঁধার হলে কালো, দেখতে পায় না মোদের মতন, নেইতো ওদের চোখের আলো।

সিংহ – করো নাকো ফিস ফাস, ধীরে ধীরে নাও শ্বাস, শত্রু যে বুঝে যাবে, পশুদের কোথা বাস। অতি চালু জেনো ওরা, দিও না হে অবকাশ, গুলি গোলা ছুঁড়ে দিলে, সাঙ্গ যে হবে আশ।

(মঞ্চ নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়)

ছোট্ট একটা পাখী – আমার বড় ভয় করছে, আমি যে রাত কানা। পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি কোথায় তোমার ডানা?

পেঁচা – চুপ চাপ সরে আয়, ডাকা ডাকি করো না, শোনা যায় শব্দ যে, মানুষের আনা গোনা।

চতুর্থ দৃশ্য

(জানোয়ারের দল মঞ্চে নেই, বন্দুক ও কুঠার হাতে শিকারী ও কাঠুরিয়াদের দল)

গান

কাঠুরে – এসেছি আজ কুঠার হাতে, পড়েছি এই সাজ, গাছ কাটবো, বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ।

শিকারী – জঙ্গলের এই পশুগুলি – মরবে সবাই খেয়ে গুলি – মানুষ জাতিই করবে শুধু, এই জগতে রাজ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ)

দু দল – প্রাণী মারতে, ডাল কাটতে – নেই কো মোদের লাজ, শক্তিশালী, আমরা যে তাই, বাঁচবো শুধু আজ, মানুষ জাতির জয়ের ধ্বজা – উড়বে জগৎ মাঝ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মুখ্য কাজ।)

(তালে তালে নৃত্য, বাজনার তাল দ্রুত। গাছ কাটবার আওয়াজও শোনা যাবে। সবাই অর্ধ গোলাকারে দাঁড়াবে, এক একজন আগে এগিয়ে এসে কথা বলবে।)

প্রথম শিকারী – রাত্রি বেলা আমরা আসি, মারতে পশু ভালোবাসি, নিরীহ বা হিংস্র সবই – অস্ত্র দিয়ে আজ বিনাশী।

দ্বিতীয় শিকারী – আহম্মক সব বৈজ্ঞানিক, যতই মোদের জ্ঞান ট্যান দিক – উড়িয়ে যে দিই, আমরা হাসি। চামড়া, শিঙ আর লোম, দাঁত, নখ বিক্রি করে হিসেব কষি।

তৃতীয় জন – সবচেয়ে বড় অর্থ বল, বনছে নতুন যাঁতার কল, তাই এসেছি এই জঙ্গল – ধরতে জন্তু আজ সবল, চিড়িয়াঘর কি সার্কাসে, শিশু বুড়োর দল আসে, আনন্দেতে সব ভাসে, পয়সা বানায় অবিরল।

চতুর্থ জন – ভালুক, বাঁদর, সাপ নাচাই – রাস্তা ঘাটে দু পয়সা পাই, ওদের নামেই অন্ন খাই – (হাঃ হাঃ হাঃ) আমরা বড়োই দুষ্টু ভাই।

প্রথম জন – কাঠের গুঁড়ি, বানায় বাড়ি – আসবাব আর রেলের গাড়ি, দরজা, জানলা, চেয়ার টেবিল – নৌকা, ছড়ি, মই ও সিঁড়ি।

দ্বিতীয় জন – তাইতো কাটি হাজার বৃক্ষ, বন বিনাশে নেইকো দুঃখ, এই ধরণীর ভূমি রুক্ষ – হবে খুবই তাড়াতাড়ি।

তৃতীয় জন – জন্তু যত বন্য, ভরা এ অরণ্য, মোদের সুখের জন্য, করত জীবন দান।

চতুর্থ জন – পন্থা নেব অন্য, বন যে হবে শূন্য – গাছ-পালা নগন্য হারাবে সব প্রাণ।

প্রথম ও দ্বিতীয় (একসাথে গান গেয়ে) – বলছে যারা মোদের বোকা, লাগবে চোখে তাদের ধোকা, করবো জমি বাগান ফাঁকা – গাইব তবে জয়ের গান। বাস করব আমরা একা, সিমেন্ট কাঠে শহর ঢাকা, ঘুরবে শুধুই গাড়ির চাকা, পশু পাখীর নেই কো ত্রাণ।

(মানুষের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পেছন থেকে সিংহের গর্জন)

সিংহী – হাতিয়ার ধরে সব হয়ে যাও সাবধান। নখ, দাঁত সব বের করো, হও সবে আগুয়ান।

(মানুষ হতচকিত হয়ে এধার ওধার ছুটোছুটি করতে থাকে – হাতি প্রথমে প্রবেশ করে শুঁড় দুলিয়ে বলতে থাকে)

হাতি – গাছ-পালা হীন এ সংসারে – বাঁচবি ওরে কেমন করে? জল হাওয়া সব ফুরিয়ে যাবে! বৃষ্টি বাদল বন্ধ হবে! ভগবানের প্রকৃতিকে – কেন রে তুই করবি ক্ষয়?

হনুমান – আহা কি ওর বুদ্ধি বহর! গড়বে নগর, গ্রাম ও শহর? চিবিয়ে খাবে শুধুই পাথর – করিস যদি প্রাণের লয়; লতা-পাতা ফুল না রবে! এই পৃথিবী কে সাজাবে? ফল ওষুধি কোথায় পাবে? সময় শুধু অপচয়। এই জগতে নিষ্ঠুরদের কখনও কি হয় রে জয়?

বাঘ, ভালুক – বড় ছোট জোট বেঁধেছি – আর তো তোদের করি না ভয় –

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে হটাৎ প্রবেশ করে) – মানুষ তোমায় হারিয়ে দেব, “বনদেবীর” হবেই জয়।

ভালুক (সেনাপতির আদেশ শোনা যায়) – আক্রমণ, আক্রমণ! ঝাঁপিয়ে পড়ো পশুগণ,নিষ্ঠুর তুই মানুষ জন্তু, এলো যে তোর মরণ ক্ষণ।

(মঞ্চে দুই ভাগে মানুষ ও পশুর অবস্থান। মানুষ আত্মরক্ষার সুযোগ পায় না, লড়াই করতে অসমর্থ হয়ে পালাতে থাকে। একই জায়গায় ছোটার অভিনয় – চিৎকার শোনা যায়)

পশুর দল – আক্রমণ ! আক্রমণ !

মানুষ দল – পলায়ন – পলায়ন ….

(এই যুদ্ধটি মঞ্চে সব অভিনেতাদের সরিয়ে বড় পর্দায় পেছনে ছায়া নৃত্যে অ্যাকশন দেখানো যেতে পারে। বারবার লড়াইয়ের অভিনয় এবং কাঠুরে ও শিকারীর পলায়ন) মানুষের প্রস্থান –

পশুদের গান – আমরা সবাই বন্য প্রাণী – বনের মধ্যে বাস, বন রক্ষার পণ করেছি – বন দেবীর দাস। গাছ আমাদের মাতা পিতা, গাছের মতন বন্ধু নাই। অরণ্যকে রাখতে সজীব, সবাই মিলে লড়বো ভাই।

পাখীর গান – রোধ করব এই পৃথিবীর – পরিবেশের যত দূষণ, লতা পাতায় সাজবে – ধরা, পরবে ফুলের নতুন ভূষণ। বনের মর্ম, আসল ধর্ম, অবুঝ মানব জানবে যখন – শুদ্ধ হবে, জল হাওয়া সব, ধন্য হবে মোদের জীবন।

সবাই মিলে – মানুষ জন্তু হারল আজি, আর তো মোদের নেইকো ভয়, জয় জয় আজ বৃক্ষ মায়ের জয় জয় “বন রাজের” জয়।

সমাপ্ত