সমীরদাকে চিঠি (Samir da ke chithi)

 

সমীরদাকে চিঠি

 

১লা মার্চ, ২০২১

সিঙ্গাপুর

প্রিয় বনু ও শ্রীচরণেষু সমীর দা, –

তোমরা দুজনে ঠিক ঊনপঞ্চাশ বছর আগে, বিয়ের ঠিক পরে পরে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে শান্তিনিকেতনের বিড়লা হোস্টেলে। বনুর পরনে ছিল হলুদ সিল্কের শাড়ি, লাল পাড়ে দেহের ভাঁজে ভাঁজে তুলেছিলো হিল্লোহ, মুখে ঝরঝরে হাসি, কপালে জ্বলজ্বলে সিঁদুর। সমীরদার পরনে নীল শার্ট ও (অফ হোয়াট) ঘিয়ে ঘিয়ে মাখন রঙের প্যান্ট। ফর্সা সুন্দর মুখে অপূর্ব সুন্দর প্রেমময় দীপ্তি। আমার বন্ধুরা যখন জানলা দিয়ে দেখেছে, তখন তাদের সে কী আনন্দ – যেন উত্তম সুচিত্রা এসেছে তাদের হোস্টেলের গেটে। একজন মন্তব্য করলো – “দেখ দেখ দাদা বৌদিকে কী সুন্দর মানিয়েছে”। ‘আমি মুখ বাড়িয়ে দেখি আমার গেস্ট – এ্যাই তোরা একদম কিছু বলবি না’ – বলেই আমি ছুট লাগলাম নিচের visitor রুমের দিকে। তাও কি ওরা থামে – ‘আ-হা-হা এমন সুদর্শন মোহনকান্তি কার্ত্তিক ঠাকুরের মতন বর আমাদের কবে জুটবে রে?’

সেই দিনের ছবিটা আজ চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠল আমার। তোমাদের অনেক অনেক শুভকামনা ও শ্রদ্ধা এবং আন্তরিক প্রীতি ভালোবাসা জানাই।

মুকুলিকা –

খোলা চিঠি (Khola Chithi) শ্রদ্ধাঞ্জলি মানস চৌধুরীকে

চন্দনা সেনগুপ্ত

শ্রদ্ধাঞ্জলি মানস চৌধুরীকে

সরস্বতী পুজোয় ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নাচের অনুষ্ঠান করাচ্ছি। জয়া গানগুলো গাইছে হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাদের সঙ্গে। তার সুন্দর করে সাজানো “ট্যাগোর গার্ডেনের” একতলায় ড্রইংরুমে রোজ বসছে চাঁদের হাট।

আমার কোলে চার মাসের ‘রুস্তম’ এবং জয়ার কন্যা মিষ্টি, ও আমার বড় পুত্র রানা তখন ৫/৬ বছরের শিশু। বাচ্চাদের কলকাকলিতে মুখর হত হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশ। বেশ কিছুটা সন্ধ্যে গড়ালে যখন বাড়ি যাবার পালা তখন অফিস থেকে ঢুকতেন মানস দা। মাথায় খাটো কৃষ্ণকায় মাঝারি গড়নের চেহারা – কিন্তু অদ্ভুত এক প্রশান্তিমাখা মুখচ্ছবি। সর্বদায় কৌতুকপ্রিয় হাসিতে উজ্জ্বল, শান্ত স্নিগ্ধ যুবক তখন তিনি। আমরা রোজ তাঁর ঘর তছনছ করে, টেবিল চেয়ার সরিয়ে, ডেকোরেশনগুলি এধার ওধারে ফেলে নাচগান করতাম। এসেই সব গোছাতে লাগতেন তিনি।

সেবার শুধু দূরের থেকে দেখার মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। পরে ছেলে মেয়েরা একটু বড় হয়েছে। রুস্তম, রানা ও মিষ্টির সবে ৮/৯, তখন ও ‘কীর্তিনগরের মিলনী ক্লাব’ বা রাজরী গার্ডেনের পুজো প্যান্ডেল এর জন্যে ঠিক মনে নেই “খ্যাতির বিড়ম্বনা” নাটকের মহড়া দিচ্ছি ঐ প্রশস্ত বৈঠকখানায়, মানসদার মাঝে মাঝে উপস্থিতি থাকতো সেখানে খুব সম্ভব রবিবারে।

বাচ্চা বাচ্চা কুশীলবদের প্রতি আন্তরিক স্নেহ, যাঁরা শেখাচ্ছেন তাঁদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার উৎসাহ দেওয়া ও কখনও কখনও তাদের ধৈর্য ধরে ত্রুটি বলে দেওয়া – সব যেন এক মোহময় জগৎ সৃষ্টি করত। শেষ হয়ে গেলে ভাবতাম, এইরকম শৈল্পবোধ সম্পন্ন রুচিশীল বাংলা গান, কবিতা নাটকপ্রেমী নির্ভেজাল এক সাদাসিধে কিন্তু বোদ্ধা বাঙালি খুব কমই দেখেছি দিল্লীতে।

এরপর আমরা ট্যাগোর গার্ডেন ছেড়ে চলে গেলাম ময়ূর বিহারে। কিন্তু স্কুলে চাকরি করতাম ট্যাগোর গার্ডেনের হোলি চাইল্ড স্কুলে। কাজেই দুটো বাস বদলে আসতে হত সুদূর যমুনা পার থেকে ঐ ট্যাগোর গার্ডেনে।

সেখানে তখন অর্থ উপার্জনের জন্য শনিবার/রবিবার নাচ শেখাতাম আমি, কিন্তু এখন তো বাড়ি নেই, কোথায় ক্লাশ করব? ঐ ক্লাশটি বন্ধ হয়ে যাবে ! কিন্তু সহৃদয় বন্ধু দুজন পাশে এসে দাঁড়ালেন আমার। জয়া ও মানসদা খুলে দিলেন নিজেদের ঘরের দরজা, প্রতি শনিবারে ড্রয়িং রুমের চেয়ার টেবিল সরিয়ে নাচ শেখাতাম, জলখাবারও খেতাম জয়ার হাতের তৈরী। কোনোদিন সেজন্য ওঁদের স্বামী স্ত্রীর মনে এতটুকু বিরক্তি বা কিন্তু ভাব দেখিনি। অদ্ভুত এক মধুর আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে বেঁধে ফেললেন ওঁরা আমায়, মানসদা গৃহকর্তা ছিলেন – অত্যন্ত উদার ও উদাসীন তাঁর বিন্দুমাত্র ভেদভাব ছিল না কোনও। 

তারপর ওঁরা চলে গেলেন রোহিনীতে। সেখানেও জমিয়ে রাখলেন বাঙালী পরিবারদের। আসর বসালেন নানান গান বাজনা নাটকের রিহার্সাল প্রস্তুতিতে প্রত্যেক পুজোর সময়। আমরা দেখতে যেতাম তাঁদের সেই সব মঞ্চস্থ  নাটক,  শুনতাম জয়ার অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠের গান।

একবার এক নাটকে ‘মানসদা’ এক মেসের বাসিন্দা, তাঁকে সেই আশ্রয় ছাড়তে বলা হয়েছে। জয়া ‘মন্দিরার’ ভূমিকায় অভিনয় করছে। মানস দা অদ্ভুত এক মায়াময় কণ্ঠে বলে উঠলেন – “যাবো তো, কিন্তু কোথায় যাবো বলুনতো ভাইটি”, – সেই ডায়ালগটি জানিনা কেন আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল। ভীষণ মোহিত হয়ে সেই নাটকটি দেখতে দেখতে একেবারে একাত্মা হয়ে গিয়েছিলাম, ঐ চরিত্রের অসহায়তা ও সারল্যে। আর তারপর থেকেই আমি মানসদাকে আর দাদা ডাকিনি, সব সময় ‘ভাইটি’ বলতাম এবং তিনিও সেই সম্বোধন খুব পছন্দ করতেন। আমার আমুদে ভাইটি আমাদের বাড়ি এলে আমার স্বামী নির্মল বাবু প্লেনে পাওয়া ছোট ছোট মিনি বোতল খুলে দিতেন তাঁকে একটু গলা ভিজিয়ে অনেক মজার মজার কথা বলার জন্য।

আমাদের দুই দম্পত্তির বিয়ের তারিখ ছিল একই, – তাই ফেব্রুয়ারী মাসে মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গে বসতাম ও আনন্দ করতাম। একবার কুরুক্ষেত্রে গেলাম। হটাৎ সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে বসে শীতের পড়ন্ত বেলায় গ্রাম্য পরিবেশে দুটি অ-সাধারন সহজ আন্তরিক সহৃদয় মানুষ জয়া ও ভাইটির সঙ্গে যে কি অনাবিল অপার আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন, তা হয়ত আর কখনো কোথাও পাইনি। সূর্যাস্তের আলো পড়েছিল তাঁদের সরল মুখে, স্মিত হাসিতে উদ্ভাসিত সেই কুঞ্চিত চোখ ও প্রসারিত ঠোঁট আমাদের যেন কিশোর বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিনের সেই স্মৃতি আমার মনের মনিকোঠায় এখনও জ্বল জ্বল করে হীরের দ্যুতি দিতে থাকে।

ভাইটি, তুমি ঐ কোভিড দানবের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছো – আর তোমার চলে যাওয়ার পর জয়া একা স্মরণ ভেলায় ভেসে, নীরবে কোথায় – কখন ভেসে যাচ্ছে জানিনা – কিন্তু তারও যুদ্ধ চলছে প্রতি নিয়ত, প্রতি মূহুর্ত্ত এই কথা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি।

আজ তুমি তো বিদেহী আত্মা, কিন্তু তোমার সর্বগুণ সম্পন্না বিজ্ঞানী কন্যা, ভক্তিমতী স্ত্রী আত্মবিশ্বাসে সাহসে ভর করে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে যেন একে একে ছয়রিপু – কাম, ক্রোধ, লোভ, ভয়, মাৎসর্য ও মোহকে অপসারিত করতে করতে এগিয়ে চলছে। তুমিই তাদের শিখিয়েছো, অকৃত্তিম সহজ সরল স্বাভাবিক ভাবে পথ চলার ছন্দ।

তাই তোমার হাসিমাখা স্নেহে আপ্লুত ছবি তাদের মনের জোর বাড়াতে সাহায্য করছে – এ কথাও নিশ্চিতরূপে সত্য। আমরা যারা বন্ধু পরিজন দূরের থেকে তোমাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফুটবল খেলার দর্শকের মতন শুধু চিৎকার করে উৎসাহ দিতে চাইছি। তোমাদের বর্তমান রণক্ষেত্রের ভয়াবহতায় ভীত হয়ে কখন কখনও বা নিজেরাও অদ্ভুত এক দ্বিধাগ্রস্থ বিষন্ন মনে সময় কাটাচ্ছি।

নৈরাশ্য জনক দুর্দিনে মহামারীর সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হওয়া – সংগ্রামী আহত মানুষদের কথা ভেবে যখন কাতর হয়ে পড়েছি, – তখন যেন তোমার কণ্ঠস্বর আবার আমাদের জাগিয়ে তোলে, আমরা শুনতে পাই আমার ‘ভাইটি’ বলছেন, – “আরে এসবের মধ্যে দিয়েই তো চলতে হবে, ঘাবড়ে যেও না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এগিয়ে চলো।” চরৈবেতি চরৈবেতি।

তোমাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম ও জয়া এবং মিষ্টি মামনিকে অনেক ভালোবাসা জানিয়ে স্বর্গের ঠিকানায় এই পত্র পাঠিয়ে দিলাম।

আমার প্রিয় ভাই শিবু (Amar Priyo Bhai Shibu)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শুভ বিদায়

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রিয় ভাই শিব প্রাসাদ , তুমি আর নেই  দুনিয়ায়,
কত তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেললে
এই জীবনের স্বাদ।
তোমাকে হারানোর বেদনা, অন্তহীন, ভাষাহারা,
কাউকে বোঝানো যাবে না।
ছিলে তুমি সকলের প্রাণের চেয়েও প্রিয়।
মনে জাগে দুঃখ ও খেদ,
কেন যে হল এ বিচ্ছেদ !
'আত্মনির্ভর' স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারও মুখাপেক্ষী
ছিলে  না কোনোদিনও !
কারো দ্বারস্থ, হও  নি কখনো !
পরিবারের প্রত্যেক সদস্য তোমার স্নেহে প্রেমে
শ্রদ্ধায় তৃপ্ত, ছোটদের ছিলে তুমি সতত নমস্য।
তোমার সহজ সরল উদার মনোভাব, -
সর্বদা সাকারাত্মক, খেলোয়াড়ের স্বভাব।
আজ শুধু মনে পড়ে যায়, সংসার সংগ্রামে
ছিল কত নির্ভীক, সৎ পথে চলে যেতে ঠিক ঠিক সদাই,
মানো নি তো নি কোনো বাধাই  !
রক্ষা করে, আগলে ধরে, আদর ভরে -
এতদিন যারে রেখেছিলে কাছে,
সেই জীবন সঙ্গিনী একাকিনী আজ
এখানেই পড়ে আছে।
এটাই যে প্রকৃতির রীতি, বিধাতার অমোঘ বিধান।
না চাহিলেও মেনে নিতে হয় -
দেহের খাঁচা ত্যাগ করে যায়, -
সকল মানব প্রাণ।
জীবাত্মা তব মিলায়েছো আজ পরমাত্মার সাথে -
মুক্তির ক্ষণে ঈশ্বরের আশীষ ঝরুক যাত্রা পথে।

আমার প্রিয় ভাই শিবু

চন্দনা সেনগুপ্ত

খোলা চিঠি এক অসাধারণ সুদক্ষ গোলরক্ষক কে :-

একেবারে মায়ের জঠরে থাকতেই শিশু খেলোয়াড় পেটের মধ্যে এমন পা চালাতো, লাথি ছুঁড়তো যে মা ‘বিদ্যুতরানী’ অস্থির হয়ে পড়তেন। বাবা বলতেন হাসতে হাসতে – “ভালো ফুটবলার হবে গো তোমার ছেলে। মোহনবাগানের ক্লাবে খেলতে নামবে একদিন”। ভবিষ্যতে দেখা গেল যে সত্যিই ছেলেটা স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় ক্লাবে এবং পরে দিল্লীর বড় বড় নাম করা দলে বল পায়ে নিয়ে সারা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে “গোল রক্ষক” হিসাবে খুব নাম যশ হল তার। খেলা দেখে নর্দান রেলের বড় বাবু ও কোচ বাড়ি এসে চাকরী দিলেন তাঁকে।

বাবার মৃত্যুর পর এই দক্ষ খেলোয়াড় আমাদের শিবু নিজের চেষ্টায় ও পরিশ্রমের জোরে সংসারে অর্থ সাহায্য করতে লাগল অতি অল্প বয়স থেকে। তাঁর যমজ বোন দূর্গা ও পরের দুই ছোট বোন জয়া বাচ্চু এবং অসুস্থ মায়ের প্রতি কর্তব্য করতো সে অন্য দাদাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

মা কে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বোনেদের ছোট ছোট চাহিদা মেটানো, বৌদিদের ও ভাইপো ভাইঝিদের আন্তরিকভাবে যেকোন ব্যাপারে সাহায্য করা, বিনোদন করা ছিল তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ।

পরিবারেও সে যেন গোল রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলতো। তাই শেষ সময়ে অত্যন্ত সুষ্ঠভাবে দুই কন্যার বিবাহ, নাতি নাতনির প্রতি যথাযথ কর্ত্তব্য পালন করে সে আমাদের পরিবারের নাট্যমঞ্চ হতে বিদায় নিল সকলের আগে।

কোভেট-১৯ দানবটা সজোরে ‘বল’ মেরে গোল করবার চেষ্টা করেও সফল হল না। আমাদের ছোট ভাই সেই বল তথা করোনা ভাইরাসের পদাঘাত বুকে ধরে নিল নিজের। গোল রক্ষকের সক্রিয় ভূমিকায় সে অন্তিম শ্বাস পর্যন্ত অভিনয় করে গেল। তাই আজ শিবু প্রসাদ তোমাকে স্যালুট ও সশ্রদ্ধ নমষ্কার জানাই।

স্বর্গীয় বাসুদেব সেনগুপ্ত শ্রীরামপুর গ্রাম, ভগীরথপুর থানা, মুর্শিদাবাদ জেলা নিবাসী পরবর্তী কালে ভারতের রাজধানী দিল্লী প্রবাসী একজন অতি সজ্জন উদার, পরপোকারী মানুষ ছিলেন। তৎকালীন লাহোরের এক মেডিকেল স্কুল থেকে পাশ করে দিল্লীর “চাঁদনীচকের” বিখ্যাত বাঙালি ডাক্তার অনিল সেন এর কাছে কাজ করতেন তিনি। যুদ্ধের বাজারে অনেকগুলি ছেলেমেয়ে ‘কাশ্মিরী গেট তথা গন্ধ নালার মন্দিরওয়ালা গলিতে তাঁর বাস ছিল। নন্দ, আরতি, মঞ্জুর পরে তাঁর পুত্র গোবিন্দ জন্মায়। কিন্তু মাত্র ৭ বছর বয়সেই ‘মেনেঞ্জাইটিস’ রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। তারপর নিতাই মঙ্গল ও শংকর জন্মায়। অর্থাৎ এই ছয়জন পুত্র কন্যা নিয়ে যখন তিনি অতি দরিদ্রতার মধ্যে কোনোরকমে দিনগত পাপক্ষয় করছেন, তখন ভারত স্বাধীন হয়। তাঁর ওই গ্রামটি সেই সময় পাকিস্তানে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গুজব রটেছে। সীমান্ত ভাগে বিচ্ছিন্ন বিভক্ত দুই দেশের সব জাতি ধর্ম ও বয়সের লোকেরা বিভ্রান্ত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আনন্দ কীভাবে যে দেশের মানুষ উপভোগ করবে, ভিটে মাটি হারানোর দুর্ভাবনাগ্রস্থ লোকেরা কখন কোথায় কোনদিকে পা বাড়াবে বুঝতে পারছে না।

রাজধানী দিল্লীতে হিন্দু মুসলমানের হানাহানি, মারামারি, হিংসা, দ্বেষ তখন চরমে উঠেছে। জাপানে নিউক্লিয়ার বোমের ভয়াবহতা হিরোশিমার আক্রমণের বিভীষিকা প্রত্যেক দেশের মানুষকেই আতংকিত করে দিয়েছে। দিল্লী শহরেও বোমা পড়তে পারে সেই ভয়ে দলে দলে লোক বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কোন রকমে প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছে।

বাসুবাবুও ঐ ছয় সন্তানসহ তাঁর শ্রীরামপুরের ভিটায় মা সুশীলা বালা দেবীর কাছে এসে হাজির হলেন। বেশ কয়েকবছর কেটে গেল। বাসুদেব বাবুর স্ত্রী বিদ্যুৎরানী আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। পুজোর সময় ঠাকুর দালানে দেখে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর পেটের আকার এতো বড় যে আত্মীয় ও প্রতিবেশী গণ চিন্তিত হলেন। বিজয়ার দিন সিঁদুর খেলা খেলে এসে হাঁসফাঁস করতে লেগেছেন তিনি, গোয়ালের পাশে খড়ের গাদার ওপর শতরঞ্চি চাদর পেতে আঁতুর ঘর তৈরী করলেন – শাশুড়ী বৌ মিলে। ডাক্তার স্বামী বাড়ি নেই, রোগীর খবর নিতে, ওষুধ ইনজেকশন পথ্যের ব্যবস্থা করতে অন্য গ্রামে গেছেন। তখনকার দিনে আমাদের বঙ্গদেশে মেয়েদের প্রসবকালে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

একাদশীর দিন সকাল থেকে উঠল ভীষণ বেদনা। তারমধ্যেও সংসার গুছিয়ে রেখে বৌমা ঢুকলেন আঁতুড়ঘরে একা। শাশুড়ী মাতা পাড়ার ছেলেকে পাঠালেন পাশের গ্রামে ‘ভগীরথপুর’ থেকে ‘দাই মা’ কে ডাকতে। দাই মা জানালেন, তিনি দুপুরের আগে আসতে পারবেন না, বাড়ির বাচ্চাদের জন্য ভাত রান্না করে, ভিজে কাপড় শুকোলে তারপরে আসতে পারবেন। গরীব দাই মা কত প্রসূতির প্রাণ বাঁচিয়েছেন, গ্রামে কত শিশু তাঁর হাতে নির্বিঘ্নে জন্ম গ্রহণ করলো কিন্তু সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাঁর। দারিদ্রের ভারে জর্জরিত মহিলার কাছে মাত্র একখানি শাড়ী, যা পরে তিনি বাইরে যেতে পারেন। আজ সকালে ওটি কেচে ফেলেছেন আর শতছিন্ন একটি কাপড় জড়িয়ে তিনি উনুনে ঘুঁটে সাজাচ্ছিলেন। বললেন, – “গিন্নি মা কে বলো খুব ব্যাথা উঠলে বৌমাকে আঁতুড়ে নিয়ে যেতে, আর গরম জল, নরম পুরোনো কাপড় সব ঠিক করে রাখতে। আমি একটু পরেই ছুটতে ছুটতে এসে যাব”।

কিন্তু পেটের মধ্যে তখন বৌমার খেলোয়াড় সন্তান পা চালাতে শুরু করে দিয়েছে, সেকি দাই মা, ডাক্তার, নার্সদের অপেক্ষা করবে? বাইরের জগতে তাকে ঠিক সেই সময়ে বেরিয়ে আসতে হবে, বিধাতা তার জন্য যে ‘শুভক্ষণ’টি ঠিক করে রেখেছেন। অতএব শুরু হল নাটকের চরম মূহুর্ত্ত। বৌমার একটা আর্তনাদ শোনা গেল – “মা মাগো বাঁচাও আমায়” আর যে সহ্য করতে পারছেন না তিনি। শাশুড়ী দেখে প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, কিন্তু ভীষণ তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি ছিল তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা শক্ত বেতের ঝুড়ি বৌমাকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বৌমা এই ঝুড়িটা বুকের তলায় ধরে জোর দাও জল ভেঙে গেছে, মাথা বেরিয়ে এসেছে। দম দাও, দম দাও ধৈর্য হারিও না”। ঝপ করে সুন্দর ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান বেরিয়ে এল, মায়ের জরায়ু থেকে। কিন্তু তারপরেও আবার ভীষণ জোরে তীব্র যন্ত্রনার ঢেউ উঠল।

শাশুড়ী মা চিৎকার করে উঠলেন, “হাল ছেড়ো না বৌমা, আর একটি বাচ্চা আসছে। বৌমা বৌমা শক্ত হও, জোর দাও – পরেরটাকে বেরিয়ে আসতে দাও,” এক হাতে সদ্য প্রসব হওয়া নবজাতটা সরিয়ে দিলেন মা।

ঠাকুর কী অসাধারণ অদম্য প্রাণ শক্তি তাঁকে দিয়েছেন আজ। যমজ দুই সন্তানের মা, যেমন করেই হোক একা একাই দুটি শিশুকে তাঁর দেহ থেকে আলাদা করতে পেরে – প্রচন্ড উত্তেজনায় আবেগে হাঁপিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে রইলেন, সারা চাদর রক্তে লাল। পরেরটি এক অপরূপা কন্যা।

শাশুড়ী মা আনন্দে কাঁদছেন, আর উঠোনে, ঘরে জমা হওয়া প্রতিবেশী কে চিৎকার করে বলছেন, ওগো তোমরা শাঁখ বাজাও আমার ঘরে শিব দূর্গা এসেছেন, আজ একাদশীর দিনে। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাঁপাতে হাঁপাতে ‘দাই মা’ এসে হাজির। নাড়ী কাটা বাচ্চাদের পরিষ্কার করার কাজগুলি আনন্দের সঙ্গে সমাধা করলেন।

একটু বড় হতে দেখা গেল সত্যিই তার পায়ে জাদু আছে। বল খেলতে সে ভীষণ ভালোবাসে। ১৯৬৮ সালে যখন তার বাবা হটাৎ হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন, তখন মাথায় যেন বাজ পড়ল তাদের ঐ পরিবারের ওপর। ‘কিরোরী মাল’ কলেজে পড়া কালেই শিবুর ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ হল এবং দিল্লীর বিভিন্ন ফুটবল ক্লাব তাকে নিয়ে মাতামাতি করতে লাগল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মতন দলের বিরুদ্ধেও খেলবার সুযোগ পেল সে জীবনে, এবং খেলার জোরেই “নর্দান রেলওয়ে” তে টিকিট চেকারের পদে নিযুক্ত হল সে। পরবর্তীকালে সেখানে ক্যাপ্টেন ও পরে কোচ হয়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করল।

শুধু যে খেলায় ভাল ছিল তা নয়, তার মধুর ব্যবহারে পরিবারের সব সদস্য, প্রতিবেশী চাকুরী ক্ষেত্রে বন্ধু বান্ধব, প্রথমে কাশ্মিরী গেটে ও পরে লক্ষ্মী নগরের সমস্ত বাঙ্গালী ক্লাবের সব সদস্যরা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।

শিবুর ওপরে তিন দাদা ও তিন দিদি ছিলেন কিন্তু কোনদিন সে কারোর কাছে হাত পাতে নি, মুখ ফুটে কিছু চায় নি, সদা সর্বদা তার মুখে হাসি লেগে থাকতো। নিজে পছন্দ করে অতি সুন্দর স্নিগ্ধ স্বভাবের সহজ সরল ভক্তিমতী কন্যা নীলিমাকে বিবাহ করে সে কোনো পণ না নিয়ে এবং তাদের কোনো প্রকার খরচ না করিয়ে। পত্নীও পেয়েছে সে অত্যন্ত সুলক্ষণা, সুগৃহিনী, দুঃখে কষ্টে জীবন সংগ্রামের সহধর্মিনী। দুই কন্যা ও জামাতারাও ঈশ্বরের কৃপায় অত্যন্ত সুযোগ্য এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। সরস্বতীর মতন গুনবতী নাতনি ও গণপতির মতন মঙ্গলদায়ক এক নাতিকে নিয়ে তার পরিপূর্ণ সুন্দর পরিবার। –

সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছিল, হটাৎ কোথা থেকে “করোনা ভাইরাস” এসে তাকে আক্রমণ করল এবং এক অতি পুন্যদিনে সে সজ্ঞানে স্বর্গারোহন করল প্রকৃত সাহসী কুশল এক খিলাড়ির মতন।

শিবপ্রসাদ সেদিন কাউকে সঙ্গে না নিয়ে একাই চড়লো অ্যাম্বুলেন্স-এ এবং কোন আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ছাড়াই অন্তিম যাত্রায় শয়ন করল নির্ভীক ভক্ত পথিকের মতন।

তাঁর পুন্য আত্মার শেষ কৃত্য শ্রাদ্ধানুষ্ঠানটিও সম্পন্ন হল আর এক পুন্য একাদশীতে। তাঁর বিদেহী আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে বিলীন হয়ে শান্তিধামে বিরাজমান এবং সেখান থেকেই তাঁর সারা পরিবারের ওপর বর্ষণ করে চলেছে স্নেহাশীর্বাদ – এ কথা আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।

খোলা চিঠি

চন্দনা সেনগুপ্ত

কারো মৃত্যু হয়ে গেলে কি তাকে আর ‘চিঠি’ লেখা যায় না? মন কে জিজ্ঞেস করলাম বারে বারে। কেন যায় না, সে তো এখন অদৃশ্যভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে কাগজ বা কলমে লেখার পরে তাকে সরকার তৈরী এক মাধ্যমের দ্বারা অর্থাৎ পোস্টাপিসের টিকিট লাগিয়ে পিয়ন বন্ধুর দ্বারা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতাম। পরে সে ভাবে পত্র পাঠানোর রেওয়াজ আজকাল উঠে গেল, কম্পিউটার, মোবাইলের বিশেষ কম্যুনিকেশন-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট-এর সুবাদে ‘ই-মেলে’ মেসেজে পাঠানোর পদ্ধতি চালু হল। সেখানে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করার খুব সুবিধা। চিঠিটি তো দুটি মনের সংযোগ সেতু। কিন্তু মানুষ মরে গেলে আর চিঠির কি দরকার! কারণ সেই অন্য মানুষটি তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না, – এটাই তোমাদের সকলের – অর্থাৎ যে কোন মানুষের ধারণা।

আমার হৃদয় ও আত্মা বলে অন্য কথা। আত্মা তো মরেনি, তাহলে সেই অবিনাশী বিদেহী তো আমার জীবাত্মার একেবারে খুব নিকটে আসতে পারেন। তাকে ছুঁতে হয়ত পারবে না আমার পার্থিব সত্তা, কিন্তু তিনি যদি আমার অন্তরের ভাষা বুঝতে পারেন, আমার আকুল আবেগ – ভাবনাকে জানতে পারেন, তাঁর সম্বন্ধে আমার কতটা শ্রদ্ধা – ভালোবাসা – স্নেহ – প্রীতি সর্বদা প্রবাহিত হয়ে চলছে, তাকে ‘অনুভব’ করতে পারেন, তাহলে তো আমার স্বার্থকতা।

কেউ কেউ হাসবেন। Critic এর দল বিনা বিচারেই মতামত দেবেন – অনুভব আর উপলব্ধি তো জীবন্ত মানুষ করে – মৃত্যুর পরে সে তো অনন্তে বিলীন হয়ে গেল, তোমার কথা শুনে তার লাভ?

আমি বলব – লাভ ক্ষতির হিসাব তো করিনি, শুধু ব্যক্ত করতে চেয়েছি আমার ব্যাকুল বেদনা। তাই এই পত্র রচনা। তার হয়ত আর কোন ফারাক পড়বে না, তিনি হয়ত আমাকে ফিরে উত্তর দিতেও আসবেন না, কিন্তু আমার আত্মা শান্তি পাবে, মুক্তি পাবে আমার অন্তঃ নিহিত সত্য বোধ। –

এই কয়েকমাসে ‘করোনার’ প্রবল প্রতাপে বহু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। প্রথমেই তাঁদের প্রতি আমার প্রণাম জ্ঞাপন করি। চীন দেশে জন্মগ্রহণ করে এই ভয়ানক রোগের দানব প্রথমে সেখানে অসংখ্য লোককে আক্রমণ করে মৃত্যু লোকে পাঠালো। তারপর সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেল, আমেরিকা, ইতালি, ব্রাজিল, ইউরোপে এবং ধীরে ধীরে আমাদের ভারতবর্ষের প্রতিটি শহরে – নগরে – গ্রামে-গঞ্জে। আফ্রিকার জঙ্গলে আদিবাসীদের মধ্যে ও ছড়িয়ে গেল সেই অদ্ভুত কোভিড-১৯। প্রায় একবছর পূর্ন হল, এখনও তার মুখের শিকার হয়ে চলেছে কত যে বৃদ্ধ – শিশু – নর-নারী বিশেষ করে যাঁরা – বিভিন্ন হাসপাতালে সেবারত ডাক্তার, নার্স, গবেষক এই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার ‘ভ্যাকসিন’ বানাবার চেষ্টা করছেন, – যাঁরা অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন, মৃত্যু পথ যাত্রীদের অন্তিম সংস্কার করছেন, তাঁরা শত সাবধানতা নেওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুলোকে যেতে বাধ্য হচ্ছে ঐ ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণু সংক্রমিত হয়ে। তাঁদের পরিবারের মানুষ প্রিয়জনদের সহকর্মীদের স্বান্তনা জানিয়ে – সাহস জুগিয়ে পত্র রচনা করে চলেছি – মনের খাতায়।

এছাড়াও অনেকে যাঁরা কোভিড ১৯ এর জন্য নয় কিন্তু পরোক্ষোভাবে – তার প্রতাপে Lockdown হওয়ার জন্য সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় – সু-চিকিৎসা, ওষুধ পথ্যের অভাবে অসময়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন – তাঁদের উদ্দেশ্যেও সমবেদনার বার্তা পাঠাই আমার অলিখিত সব চিঠির মাধ্যমে। –

আজ মনে হল, আমরা সবাই তো এখন মহা শ্মসানের ধারে মোহনার কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময় অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে যেসব মানুষের চলে যাওয়া হৃদয়কে মুচড়ে দিয়ে গেল, সেই কয়েকজন ব্যক্তিকে লেখা চিঠিগুলি যদি লিপিবদ্ধ করে যাই তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা জানবে এই সময়টা আমাদের এই যুগের সব দেশের, সব জাতের সাধারণ মানুষকে কতটা আলোড়িত করে তুলেছিল। তাদেরকে লেখা পত্র লেখনী এটি।

১) প্রথমে একজন দিল্লীর বন্ধু শিবানন্দ গুপ্ত, ২) নিজের দেশের সমাজ সুধারক আর্য্যসমাজের সন্ন্যাসী “ভাপা শ্যাম রাও”, ৩) সুদূর আফ্রিকার ডাক্তার সোমালিয়া বাসী ডঃ হাওয়া আবেদি, ৪) আমার প্রিয় পরিবারের সদস্য পার্থ গুপ্ত, ৫) আমার প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শেষে ৬) ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদা।

 

প্রথম চিঠি শিবানন্দ গুপ্ত মহাশয়কে

প্রিয় শিবানন্দ,

সুন্দর, সতেজ, হাস্যোজ্জ্বল, সহৃদয় এক বুদ্ধিমান বিচক্ষণ মানুষ ছিলে তুমি। এখনো প্রৌঢ়ত্বের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা দিয়ে মা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে টাটা কোম্পানির সুদক্ষ কর্মবীরের দায়িত্ব পালন করে চলেছিলে তুমি। এতো আনন্দ শান্তি নিরাপত্তা ছিল তোমার সংসারে যার কোন তুলনা করা যায় না। শত্রু ছিল না কোন মিত্র স্বজন তোমার প্রেম প্রীতি ভালোবাসা সিক্ত হয়ে সর্বদা তোমার ও তোমার পরিবারের দিকে তাকিয়ে থাকতো। মা, কন্যা ও পত্নীকে কোনদিন বুঝতেই দাওনি দুঃখ কাকে বলে।

কিন্তু একদিন হল ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট,এটাকে অন্য লোক কোন দুর্ঘটনা মনেই করবে না কিন্তু তোমার জীবনে মোটর সাইকেল সরাতে গিয়ে কোমরে আঘাত পাওয়া একটা বিরাট বড় চাবুকের আঘাত আনলো জানি। ওই ব্যাথার উপশম করতে গিয়ে ধরা পড়ল সেই মারণ রোগের অত্যাচার ও বিস্তারের কথা, – তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত।

পৃথিবীতে তখন সেই ভয়ঙ্কর দানবের চেয়েও এক দুর্দমনীয় পিশাচী রোগ ‘করোনা’ ভাইরাস তার তান্ডবলীলা দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। তাই হাসপাতালে ডাক্তার নার্সরা ল্যাবের পরীক্ষকের সামনে শুধু ঐ ভীষণ কোভিড ১৯ এর রুগীদের ভিড়। অন্য যে কোন রুগী হলেন একেবারে উপেক্ষিত।

শিবানন্দ তুমিও সুচিকিৎসা অর্থাৎ ঠিক সময়ে Ray বা Chemotherapy কিছুই পেলে না। অসহায় প্রিয়জনের চোখের সামনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে। বহু কষ্টে অর্জিত ধন সম্পত্তি এবং সেবা করার মতন তিনজন মমতাময়ীর ছয়খানা হাত ও ছয়খানা ব্যাকুল নয়ন সর্বদা তোমাকে আগলে রাখলেও শেষ রক্ষা হল না তোমার। লকডাউন-এর মধ্যে গৃহবন্দী নির্ভেজাল খাঁটি, সৎ সাহসী এক মানুষের দেহের শক্তি ক্রমশঃ শুষে নিতে লাগল ঐ ক্যান্সারের রক্তবীজ দানব। তুমি সকলকে ছেড়ে চলে গেলে সেই অনন্ত লোকে। তোমার মা পুত্র শোক সহ্য করতে না পারায় তার কিছুদিনের মধ্যেই তোমার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন, তাঁর আত্মাও মিলিত হল সেই শান্তিময় পরমাত্মার সঙ্গে।

নিজের লোকের শোক প্রশমিত হয় যখন আরও অনেকের তরতাজা প্রাণ ভালোভাবে ওষুধ পথ্য অপারেশন এর সুযোগ না পেয়ে চলে গেছে এই ২০২০ সালে তাদের কথা জানতে পারলে। তোমার ও তোমার পরিবারের নিকট ও দূরের আত্মীয়স্বজন, অফিস বা সব প্রিয় প্রতিবেশীদের সমবেদনা জানাবার উপায় না পেয়ে আমার এই খোলা চিঠির অবতারণা। স্বান্তনা দেবার ভাষা নেই, তোমার স্নেহধন্যা কন্যাকে। শুধু বলব সে তো তবুও সময় পেয়েছিল, তাকে পিতা প্রস্তুত না করলেও নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতন শিক্ষা, দীক্ষা ও যোগ্যতা দিতে পেরেছেন, – কিন্তু সুদূর সোমালিয়ার চাকুরীরত একজন অত্যন্ত উৎসাহী প্রাণবন্ত যুবকের হঠাৎ চলে যাওয়ার কথা ভাবো তো – তা হলে তোমার পরিবারের মানুষের মনের চাঞ্চল্য কমতে পারে।  আমার কাকা আশীষ গুপ্তের পুত্রের কথা তোমায় স্মরণ করতে বলি।

জীবিকার প্রয়োজনে তরুণী পত্নী ও এক শিশুপুত্র ও বৃদ্ধ মা বাবাকে দেশে ফেলে রেখে সেই রাজন গুপ্ত আফ্রিকায় অফিসে চলে গিয়েছিল। সেখানে নানাভাবে সে কাজে ব্যস্ত রাখতো নিজেকে। রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামীজীদের কাছে গিয়ে নানান সমাজসেবা মূলক কাজে মেতে থাকতো। স্ফূর্তিতে ভরপুর ছিল সে। যখন সুদূর চীন দেশের কোভিড ১৯ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আফ্রিকার ঘন অরণ্য ভেদ করে আদিবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেখানের মানুষেরাও রেহাই পেলেন না। মাত্র কয়দিনের জ্বরে শ্বাস কষ্টে সে বিনা চিকিৎসায় স্বজন বান্ধব হারা অবস্থায় একাকী মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েও নিজের অবিনাশী অচ্ছেদ্য আত্মাকে তার সুন্দর সুঠাম যৌবনের সমস্ত শক্তি সমৃদ্ধ দেহের খাঁচায় আর আটকে রাখতে পারল না। সে বিনা কোনও ভূমিকায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক অভিমুন্যর মতন মৃত্যুর দেবতার সামনে আত্মসমর্পণ করল। তাঁর পরিবারের মানুষ জানতেও পারল না কখন কেমন করে তার জীবন নাট্যমঞ্চের যবনিকা পতন হয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্যে দশরথ রাজার তীরে বিদ্ধ ‘শ্রবণ কুমারের’ জন্য অন্ধ পিতা মাতা যেভাবে স্বান্তনা লাভ করেছিলেন, আমরাও সেই ভাবে কবিগুরুর ভাষায় বলব – “যাও রে অনন্ত ধামে – মোহ মায়া পাসরি দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি”। তার পরিবারের অসহায়তা বৃদ্ধ মা বাবা, তরুণী স্ত্রী ও কিশোর পুত্রের কথা ভাবলে তোমার স্ত্রী ও কন্যা হয়তো মনে জোর পাবেন। ভাববেন তাদের জীবন তো পিতা শিবানন্দ অনেক সুরক্ষিত করে গেছেন।

 

অন্ধ্র প্রদেশের Vepa Shyam Rao ২১শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। Law এবং management পাশ করে কলকাতায় প্রফেসর হয়ে কাজে যোগ দেন। আর্য্য সমাজের দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাবধারায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন নাম হল স্বামী অগ্নিবেশ। আজকের পত্র আমি তাঁকে লিখতে উদ্যত হয়েছি কারণ ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি স্বর্গ লাভ করেছেন দিল্লীতে।

 

দ্বিতীয় চিঠি স্বামী অগ্নিবেশকে

শ্রদ্ধেয় স্বামীজী,

প্রথমেই আপনার চরণে শতকোটি প্রণাম জানাই। আপনি আর ইহজগতে নেই, আমার মতন হাজার হাজার নর-নারীর মনে কিন্তু আপনি অমর হয়ে আছেন। শত সহস্র শিশু শ্রমিককে আপনার কৃপা লাভে ধন্য করেছেন, সে কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি। তাদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে মানুষ হবার সুযোগ পেল, যারা হরিয়ানার ‘Stone Quaries’ মাত্র পাঁচ টাকার Bonded Lebourer ছিল, তোমার হাতের ছোঁওয়ায় তারা মুক্তি পেল, তারা তোমাকে ভগবান মনে করে। সিল্ক ফ্যাক্টরিতে বা Tannery তে বিষাক্ত ক্যামিক্যাল এর মধ্যে কাজ করতে করতে মালিকের মার খেতে খেতে Beast of Burden এর মতন জীবন কাটিয়েছে তাদের হৃদয় মন্দিরে তোমার মূর্ত্তি আজ জ্বল জ্বল করে কারণ তুমি তাদের উদ্ধার কর্ত্তা।

আমরা তখন গৃহবধূ, শিক্ষিকা, মা হয়ে তোমায় প্রণাম জানাচ্ছি দূর থেকে। লক্ষ্ণৌতে কার্পেট ফ্যাক্টরিতে যে পাঁচ থেকে আট বছরের শিশুগুলির হাত পা বেঁকে গিয়েছিল, দিনরাত ছোট ছোট হাতে তারা কার্পেট বুনে যেত। শিশুদের সঙ্গে পিতামাতারাও ছিল বন্দি। সেই সব দলিত শ্রমিকদের অভিশপ্ত অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য তুমি যে কত সংগ্রাম করেছো – তার পরোক্ষ দর্শক আমরা।

‘দাসত্ব প্রথার’ মতন আমাদের স্বাধীন ভারতেও যে বহু শিশু এখনো ছোট ছোট আঙুলে বিড়ির কারখানায় দিনরাত কাজ করে তাদের আঙুলে ঘা করে ফেলেছিল, কেউ তা লক্ষ্য রাখেনি। তুমি নিজে উকিল ছিলে তাই আইনের দরজায় হাজির হয়েছো, তর্ক-বিতর্কের দ্বারা বিচারকদের মনে দয়ার সঞ্চার করতে, সমস্ত দেশবাসীকে, ওই সব ভূমিহীন বন্দি শ্রমিকদের জাগ্রত ও সচেতন করতে। উঁচু জাতির ধনী লোকেদের কাছে তাই তুমি ছিলে চরম শত্রু আর গরিবদের পরম বন্ধু, তুমি সক্রিয় হয়েছিলে আমাদের মতন মধ্যবিত্ত ছা পোষা, গৃহী মানুষের কাছে এক আদর্শ সন্ন্যাসী। হিন্দু ধর্মের সবরকম কুসংস্কার বর্জিত এক দরদী আর্যপুত্র।

১৯৮১ সালে একদিন কচি ছেলেটি কে বুকে জড়িয়ে আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে ভাবছি যে আমরা যদি এই শহরে না জন্মে ঐ গ্রামের দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করতাম, তাহলে তো আমাদের অবস্থাও ঐ রকম হতো। দূরদর্শনে তো তখন এখনকার মতন এতো খবর পাওয়া যেত না, সাংবাদিকেরাও এত সাহসী বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি। সব সত্য তথ্য আমরা জানতেও পারতাম না। কিন্তু সেদিন যখন খবর কাগজে বা টিভি তে সংবাদ বেরুলো তোমার জয়লাভের তখন আনন্দে চোখে জল এসে গেল। আমরা জানতে পারলাম স্বামী অগ্নিবেশ ‘The Bonded Labourer – Liberation Front তৈরী করে, অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করেছেন এবং জমি ফ্যাক্টরিতে বন্দি শ্রমিকদের উদ্ধার করতে উদ্দ্যত হয়েছেন, কোর্টের কেসেও তিনি জয়ী হয়ে প্রায় ১,৭৮,০০০ লোকের জীবনে মুক্তির আলো দেখাতে সফল হয়েছেন তখন আনন্দে এই তরুণী মায়ের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। এই এক লক্ষ আঠাত্তর হাজারের মধ্যে ছাব্বিশ হাজার ছিল শিশু ও কিশোর যাদের স্কুলে যাওয়ার বা নতুন ধরনের সব প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হল। তারপর থেকে নতুন আশায় আনন্দে তারা নতুন করে বাঁচবার পথ খুঁজে পেল।

স্বামীজী, তুমি ব্রাহ্মণদের মতন কোন দেব-দেবীকে মানতে না বলে হিন্দু পন্ডিতদের কাছে ছিলে অবজ্ঞার পাত্র-ব্রাত্য। অহিংসার পূজারী গান্ধিজী, ও সাম্যের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী কার্লমার্ক্স এর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে Vedic – Socialism আনতে চেয়েছিলে আমাদের ভেদাভেদপূর্ন সমাজে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই তোমার ভালোবাসার পাত্র ছিল।

আমার মনে পড়ে ছত্তিশগড়ের সেই জঙ্গল রাজের হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নকশালদের কার্যকলাপের একটি ঘটনা। একবার তারা যখন কিছু পুলিশ কর্মীকে ধরে নিয়ে যায়, তখন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে তুমি সেই গভীর অরণ্যে তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং ২০ মাইল দূরের গভীর জঙ্গলে উগ্রবাদীদের সঙ্গে বসে বার্ত্তালাপ করে তাদের মধ্যে শান্তির বাণী শুনিয়ে পাঁচজন পুলিশ কর্মচারীকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলে। পুতুল পুজোর বিরোধী রাজা রামমোহন দয়ানন্দের মতন নিরাকারবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই বহু গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে।

‘নবেল শান্তি’ পুরষ্কার পাওয়ার জন্য সেদিন কিন্তু আমাদের দেশের নেতারা কখনো তোমার নাম পাঠায়নি। দেশের সর্বোচ্চ যে সব সম্মানীয় উপাধি আছে – ‘পদ্মভূষণ’, ‘ভারতরত্ন’ দেবার কথাও কেউ ভাবতে পারেনি, কারণ তুমি কোন দলের অন্যায়কে মেনে নিয়ে বা নিজের স্বার্থে যশের লোভে কোন কাজ করোনি। দেশের উচ্চবিত্ত – উচ্চবর্ণের – ক্ষমতাশালী বহু মানুষের তুমি শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। গুন্ডা দিয়ে তোমার কাজ ভন্ডুল করা হয়েছে। তোমাকে এবং তোমার অনুগামীদের মারধর করে রাস্তা বন্ধ করে উদ্ধার কার্য বন্ধ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা এই পৃথিবী থেকে সরাতে চেয়েছে। হতাশ হলেও, দুঃখ পেলেও হাল ছাড়োনি তুমি। এই ৮০ বছর বয়সে বহু অভিমান, অভিযোগ, নৈরাশ্য বুকে নিয়ে এই কোভিড-এর সময় দিল্লীর ‘লিভর হাসপাতালে’ তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে। বিদেশের ম্যাগাজিনে তোমার খবর পড়ে গভীর শোকাচ্ছন্ন মন শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফেলে প্রার্থনা করল, আবার যেন দুঃখী ও অসহায়ের মাঝে ফিরে আসো তুমি, জন্ম নাও আমার সন্তানের ঘরে। স্বামী অগ্নিবেশ প্রণাম তোমায়। –

“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে

তুমি ধরায় আসো, সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো

পাগল ওগো, ধরায় আসো।”

স্বামীজী,

তোমাকে আমার বিবেকানন্দের আর এক প্রতিনিধি মনে হত, যদিও তুমি রামকৃষ্ণ মিশনের মতন কালীপুজো, দুর্গাপুজো করোনি, তাদের মতাদর্শের বা গোষ্ঠী পরিচালনার সঙ্গে তোমার সম্পূর্ণ অমিল ছিল, কিন্তু তবুও মনে হয় – বিবেকানন্দ – নেতাজিরা – ভবিষ্যৎ ভারতে তোমার মতন নেতা – সৎ সাহসী, নিঃস্বার্থ কর্মবীরদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। আমি ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মা এবং স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত হয়েও মনে করি এখন তোমার মতন হাজার হাজার ত্যাগী, নির্লোভী সন্ন্যাসীদের বড় প্রয়োজন। দুঃস্থ, পতিত, দলিত তথা যে কোনও অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য নরেন তাঁর গুরুভাই ও ভক্তদের উদ্বুদ্ধ করতেন। ঘটা করে পুজোর ঘন্টা শঙ্খ ধ্বনি নয় এবার “মানব পূজারীদের” আহ্বান জানাতেন তাঁরা। বড় বড় মন্দির মসজিদ গুরুদ্বারে অথবা তার তোরণ নির্মাণ, পাথর কিম্বা সুবৃহৎ ধাতব মূর্ত্তি বানিয়ে অর্থ নষ্ট না করে এই চরম দুঃসময়ের দিনে হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক, হস্তশিল্পী, জমাদার-ঝাড়ুদার, ঘরের কাজের চাকর, পথে পথে ফল সব্জি বিক্রেতা, সব নিম্ন মধ্যবিত্ত বা অভাবগ্রস্থ অনাহারে বিনা চিকিৎসায় জীর্ণ শীর্ণ হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য তরুণ সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতেন বিবেকানন্দ। আশীর্বাদ করতেন ‘স্বামী অগ্নিবেশ’-এর মতন দরদী ব্যক্তিদের কারণ তাঁর মতে –

“বহু মুখে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা

খুঁজিছ ঈশ্বর –

জীবে প্রেম করে যেই জন,

সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”

 

তৃতীয় চিঠি এক বিদেশিনী কে

পরম শ্রদ্ধেয়, Respected Late ‘Hawa Abdi’- আফ্রিকার ‘সোমালিয়ায় মোগাদিস্যুতে’ ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে জন্ম লাভ করেছিলে তুমি নিজের দেশের এক অসম্ভব দুঃসময়ে। মাত্র তেরো বছর বয়সে অন্তঃসত্তা হয়েছিলে child marriage এর শিকার হয়ে। আর কিশোরী শরীরের ওপর পাশবিকতার লালসার অত্যাচার সহ্য করতে পারোনি তুমি, তাই সন্তানের মৃত্যু হয় তোমার জঠরে। নিজের মা কেও তুমি দেখেছো অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। অন্তঃস্বত্তা নারীর প্রসব যন্ত্রনা ভোগ করা বা পৃথিবীতে পুত্র কন্যাকে নিয়ে আসার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে সোমালিয়ার হাজার হাজার মায়ের জীবনে আনন্দ ও শান্তির বার্ত্তা বহন করে আনতে চেয়েছো তুমি। তাই স্বামী পরিত্যক্ত (মুসলমান সমাজের কন্যা) হয়েও তুমি অসীম সাহস দেখাতে পেরেছো মাত্র ১৭ বছর বয়সে। পিতার অনুমতি নিয়ে ‘রাশিয়ায়’ ডাক্তারি পড়তে গেছো বহু বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। শুধু সাধারণ ডাক্তার নয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হবার মতন উচ্চতর শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে নিজের দেশে ফিরে এসেছো।

ডাক্তার মা, এরপরে তুমি শুধু বাচ্চা প্রসবের দায়িত্ব নাওনি সমাজ সুধারকের ভূমিকাতেও কাজ করতে শুরু করেছো।

আমরা যারা তোমার থেকে অনেক দূরে, সুদূর ভারতবর্ষে বাস করি তারা তোমার কথা অনেক পরে জানতে পেরেছি। আর যতই জানছি মুগ্ধ, বিস্মৃত, হতবাক হচ্ছি।

মা গো, –

তোমার অসীম কৃপায় ধন্য হয়েছেন তৎকালীন বহু বিপ্লবী, সোমালিয়ার সমাজ ও রাজনীতিতে গৃহহীন জঙ্গলে আশ্রয়কারী বহু আহত গুলিবিদ্ধ তরুণ যুবককে তোমার ছোট্ট হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সাহসের ভরে অপারেশন করে গুলি বের করে, রক্তপাত বন্ধ করে প্রাণ বাঁচিয়েছো তুমি। তখন কেউ কেউ অবাক হয়ে গিয়েছিল তোমার কুশলতা ও দক্ষতা দেখে। মেয়ের প্রসব করার হাসপাতালে শত শত সৈনিক তোমার হাতের সেবা পেয়ে পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।

জঙ্গলের মধ্যে একটি পুরো গ্রামকে ঘর বানিয়েছো তুমি। ৯০,০০০ মহিলা থাকেন সেখানে, তাঁদের পুরুষেরা বেশির ভাগই মারা গেছেন বা উগ্রবাদী হয়ে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

সেই সময় তোমার দুটি কন্যা রত্ন জন্মায়। তাদেরও তুমি তোমার পথের অনুগামিনী করেছো। তোমার সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারাও ডাক্তারি পাশ করে সুচিকিৎসক হয়ে যোগ দিয়েছেন তোমার হাসপাতালে। গ্রামের মেয়েরা পড়াশোনা শিখে নার্স হয়ে সেবাকর্মের যজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ধন্য তোমার শিক্ষা। এখানে তুমি সবাইকে শেখাতে পেরেছো “Sitting is empty, Working is plenty” তোমার ঠাকুমার এই বাক্যটি সর্বদা মনে রেখে কর্মযোগীর মতন কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলে তুমি।

তোমার প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা জানাই। ১৯৯০ সালে কত যোদ্ধাকে পথ থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে তুমি, সে কথা পড়েছিলাম কোন পত্র বা পত্রিকায়। ২০১১ সালের চরম দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে উদ্দ্যত হয়েছিলে তুমি। পুষ্টি যুক্ত “শরগুন ঘাসের” বা মিলেটের রুটি খাওয়াতে দেখা গেছে তখন তোমায় অভুক্ত মানুষদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে। কারন তুমি জানতে শরগুন ঘাসে অনেকরকম নিউট্রিয়েন্ট থাকে।

তোমার গ্রামে নারী ও শিশুরা নির্ভয়ে বাস করে। মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী হলেও কোনরকম গোড়ামি বা কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দাওনি তুমি। তাই ২০১০-এ একবার  এক Islamic Militantsরা তোমার ওপরে ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায় এবং তোমার ঐ সুন্দর সাজানো বহু কষ্টের তৈরী হাসপাতালে আক্রমণ চালিয়ে ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় সব যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটর।

কোন পুরুষ সেই গ্রামে নারী নির্যাতন করতে সাহস পান না। তাহলে তাকে সব মেয়েরা মিলে বন্দি করে রাখে এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। এটা তোমার নিয়ম তৈরী করা আছে ওখানে। ৭৩ বছর বয়েসে ৫ই আগস্ট কোভিড-এর দুঃসময়ে তুমি ইহলোক ছেড়ে চলে গেলে। অত্যন্ত দুঃখে ভেঙে পড়েছে সমস্ত ‘মোগাদিস্যুর’ মানুষ, আমরাও তোমায় প্রণাম, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই।

 

চতুর্থ চিঠি নিজের ভাইকে

স্নেহের ভাই বাচ্চু, –

কোভিড ১৯ আক্রমণের ২ মাস আগে আমার স্বর্গীয় পিতা ডঃ কল্যাণী প্রসাদ গুপ্তের শতবর্ষ জন্ম উৎসব উদযাপনের জন্য বাঁকুড়ায় গিয়েছিলাম, তখনই তোর সাথে আমার শেষ দেখা।

আকাশ ভরা সূর্য্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ – আমাদের মনে এক অপূর্ব আনন্দ ও উন্মাদনা জাগিয়েছিল, আমার মন নেচে উঠেছিল তোর গানের তালে। সেই ছোটবেলার দিনগুলোকে আবার ফিরে পেয়েছিলাম আমরা।

তুই শান্তিনিকেতন থেকে আসতিস এবং আমি বেথুন স্কুলের হোস্টেল থেকে। গরমের ছুটিতে, পুজোর ও বড়দিনের সময়ে আমাদের পূর্ন ভবনের গোল ঘর নাচে, গানে, নাটকে, আবৃত্তিতে মুখর হয়ে যেত – সঙ্গে থাকতো মায়ের উদ্দাত্ত কণ্ঠস্বর ও হারমোনিয়াম বাজনা।

ছোট ভাই সিদ্ধার্থ তখনও গিটার বাজাতে বা গান গাইতে শুরু করেনি। সুর লহরীতে ভাসতেন বাবা, গনুদাদা বা আগত অনেক আত্মীয় স্বজন। কখনও ‘বাল্মীকি প্রতিভার’ সব গানগুলো ছাড়া গলায় একাই গাইতে পারতিস তুই।

ডাকাতদের অভিনয়  দেখাতিস নেচে নেচে –

“প্রাণ নিয়ে তো সঠকে ছি রে – – –

ওরে বরা – – – ।

মোহরদী, নীলিমাদির গল্প শুনতাম আমরা তোর কাছে। সলিল চৌধুরী সবিতা চৌধুরীর গান শুনতে কেমন করে হোস্টেলের পাঁচিল ডিঙিয়ে তোরা বীরেন দা, কণিকা দি (মোহর দি)র বাড়ির আসে পাশে ঘুরে বেড়াতিস – সেই সব গল্পে মোহিত হয়ে থাকতো তোর এই ছোড়দি ভাই।

আমার খুব মনে হত সুযোগ পেলে তুইও ‘দেবব্রত বিশ্বাসের’ মত বড় শিল্পী হবি। তোর গলার ভরাট আওয়াজ ও গায়কী ঢঙটা ঠিক ওনার মতোই ছিল।

স্কুল পাশ করে ‘সংগীতভবনে’ কিম্বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকের জগতে যদি ভর্তি করা হত তোকে তাহলে হয়ত বড় একজন গায়ক বা অভিনেতা রূপে তোর আত্মপ্রকাশ ঘটতো। কিন্তু তা হয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে একটি গান শুধু পূর্ববঙ্গ নয় পশ্চিমবঙ্গেও ভীষণ ভাবে গাইতে শোনা যেত। “শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে – – -” সেই গান তোর গলায় শুনে গায়ে কাঁটা দিতো আমার। মনে হত সব ছেড়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিতে চলে যাই। বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে একটা নতুন দেশ গঠনের ঘটনা, তাজা তাজা প্রাণের বলিদান ও হাজার হাজার মানুষের গৃহ ত্যাগের খবর নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠতাম আমরা দুই ভাই বোন। ভাবতাম আমরাও এই সমাজের জন্য কিছু কাজ করব – শিল্প, সাহিত্য, সংগীতের সাধনায় নিজেদের প্রাণ মন ঢেলে দেব। কিন্তু না, অদৃষ্টের চাকা আমাদের অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। তুই ওষুধের দোকানি ছা পোষা মধ্যবিত্ত ও আমি সংগ্রামী এই প্রবাসিনী গৃহবধূ হয়ে দুই বিপরীত ধর্মী পরিবেশে খুবই সাদামাটা জীবনে বন্দি হয়ে গেলাম।

থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় —- দোকানে দোকানে ওষুধ বেচা, বাজার করা, ছেলেকে স্কুলে এবং সে ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পরও মেডিকেল কলেজে পৌঁছানো। স্নেহশীল পিতা – দায়িত্বশীল স্বামীরূপে, সহৃদয় পিতা রূপে দিনের পর দিন একই গতে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার আবর্তে ঘূর্ণায়মান তোর সময় কেটে যেতে লাগল। সেই সব বয়ে চলা সময় যখন একই ঢেউয়ের তালে তাল মেলায় তখন তবুও একটা ছন্দ হয়ত থাকে কিন্তু স্ত্রীর – জীবন সঙ্গিনীর অসুস্থ হওয়া এবং বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ায় সেই মন্দাক্রান্তা ছন্দের লয় হঠাৎ সব ওলোট পালট করে দেয়। সবাই ভাবে ঐ ছা পোষা নির্ভেজাল সাদাসিধা মানুষটি এবারে একেবারে ভেঙে পড়বে। কিন্তু তোর হৃদয়ের প্রেমিক শিল্পী সত্ত্বা যেন একটা কাজ খুঁজে পায়। একজন মহিলা নার্সের মতন ঐ রুগ্ন পত্নীর পাশে বসে সেবায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্রতকে বুকে চেপে ধরলি তুই ভাইটি।  তাও তো তাকে রক্ষা করতে পারলি না।

বাচ্চু, তোর দিনগুলো কিন্তু এক অসাধারন অন্য অনুভবে উপলব্দ্ধিতে এরপর থেকে – অন্য এক জগতে উন্নীত করে দেয় তোকে। ওষুধের ব্যবসা তোর লাটে উঠেছে, নিজস্ব পুঁজি শেষ হয়ে গেছে – কিন্তু ছেলের মাইনের টাকায় সংসার চলতে আরম্ভ হলে আর্থিক স্বাধীনতা হারিয়ে ছেলের অধীনস্থ হতে হতে ক্রমশঃ নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়ে গেলি তুই। স্ত্রী বিয়োগে পুত্রের প্রতি মোহ আরও বাড়তে শুরু হল। হীনমন্যতা ও হতাশায় ভুগতে লাগলি তুই।

সর্বদা পাশে থাকার, কথা বলার মানুষটিকে হারিয়ে দিশাহারা একাকী একেবারে অসহায় হয়ে গেলি তুই। আমরা ভাই বোনেরা তোর ছোট বেলার সঙ্গী বন্ধুরা কেউ কিছুই করতে পারলাম না।

জীবনের সংগ্রাম একদিকে মানুষ চিনতে শেখালো আমাদের। বাস্তব জগতের নানা সমস্যার সমাধা করতে গিয়ে আমরা হয়ত দৈহিক – মানসিক ও আবেগের ভারসাম্য ক্রমশঃ হারিয়ে ফেলতাম, কিন্তু সমস্ত দুঃখ আবার ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতাম। প্রবাসে বাস করে আমার একটা সুবিধা ছিল, নানা জাতের, নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষের প্রভাব। কিন্তু কূয়োর ব্যাঙের মতন শুধু বাঁকুড়ার গন্ডিবদ্ধ জীবনে তুই আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলতে লাগলি তোর সাহস তথা মনের জোর। নানান ‘সাইকোসোমাটিক’ রোগে ধরল তোকে। শিশির বিন্দুর মতন অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালো লাগা, ইচ্ছেগুলোও দ্বন্দ্ব – দায়বদ্ধতা এবং প্রকাশ করতে না পারা ক্রোধের উত্তাপে শুকিয়ে গেল, উবে গেল। অনেকবারই –

তোর ছোড়দিভাই সর্বদা তোকে বাঁচাতে, ঐ নৈরাশ্য থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছে, নিয়ে আসতে চেয়েছে নিজের বাড়িতে – নিজের সুন্দর শান্তিময় স্নেহছায়ায় – গল্প কথা গানে এবং ভ্রমণের লোভ দেখিয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। সেই হানিমুনের নামে একবার স্বস্ত্রীক তুই এসে হরিদ্বার, হৃষিকেশ ঘুরে গেলি, পরে কিশোর পুত্র কে নিয়েও একবার এসে ঘুরে গেলি দিল্লী। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় খুব তাড়াতাড়ি বার্দ্ধক্য এসে গেল তোর মধ্যে। যখনই কথা বলি শুধু হতাশা, হাহাকার ও নৈরাশ্য ভরা দীর্ঘশ্বাস, আমাকে বড্ড ব্যথিত করতো।

একবার ভাইফোঁটায় বাচ্চু ভাইকে ফোঁটা দেব – আনন্দে রাখব – কিছুদিন মনের সুখে সেবা করব – যা খেতে ভালোবাসে বা শরীরের প্রয়োজনীয় সেই সব ফল/মূল/মাছ/মাংস খাওয়াব এই আশা বুকে নিয়ে খুব জোর লাগলাম। ট্রেনের টিকিটও কাটা হল। কিন্তু পারিবারিক ও শারীরিক সমস্যা তোকে বাধ সাধল। শেষ দিনে টিকিট ক্যানসেল করে দিলি তুই।

খুব দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি। আবার উঠে পড়ে লেগেছিলাম আমাদের বাবার জন্ম শতবর্ষের উৎসব উদযাপনের বাহানায় আবার আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে একত্রিত করে একটা আনন্দ সমারোহ করতে।

২০১৯ সালের ২০শে অক্টোবর সেই অনুষ্ঠানে তোকে দিয়ে গান গাওয়ালাম। আত্মীয় বন্ধু শহরের ১০০ জন বিদগ্ধ দর্শক, বাবার ছাত্র ছাত্রী ও পরে আমাদের ছেলে বৌমারাও শুনলো সেই গান। তোকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তোর আত্মবিশ্বাস জাগানোর জন্য ৭০ বছরের ছোড়দি সেই পার্থ গুপ্তের গানে নাচও করে ফেললো আনন্দের তোড়ে ভেসে গিয়ে। তোর বাড়ি গিয়ে জামাইবাবু নির্মলদা ও আমি অনেক counselling করলাম। কথা দিলি আবার তুই গান-বাজনা ভ্রমণের আনন্দে জুটে যাবি। কোভিড ১৯ এর করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরু হল তার মাত্র ২/৩ মাসের মধ্যেই।

গৃহবন্দী হয়ে বন্ধু-বান্ধব – বাইরের খোলা হাওয়া – দ্বারকেশ্বর নদীর ধার, রাজগ্রামের তাঁতীপাড়ার সহজ সরল মানুষ, বাড়ির অনতি দূরের ভৈরব স্থান – স্টেশনে ছেলের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় প্লাটফর্মে কুলিদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠা – চা চপ খাওয়া – প্রতিবেশী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাড়ি গিয়ে ঘরেলু আড্ডায় সময় কাটানো সব বন্ধ হয়ে গেল তোর। ভাগ্যলক্ষী যখন মানুষকে ত্যাগ করেন, তখন বোধহয়, ধন দৌলতের চেয়ে বেশী মানুষ তার নিরাপত্তা ও শান্তি কে হারিয়ে ফেলে।

কেউ অবজ্ঞা না করলেও সর্বদা মনে হয় – আমাকে এরা বোধহয় আর সহ্য করতে পারছে না। আমি চলে গেলেই ভালো হয়। বাঁচার ইচ্ছে হারিয়ে যাওয়ায় ঠাকুরও হয়তো তোর মিনতি শুনলেন। অতিরিক্ত ডায়াবিটিস, আর্থারাইটিস, রক্তের উচ্চ চাপ তো ছিলই তার সঙ্গে যুক্ত হল নার্ভের রোগ, হাত পা কাঁপা। বিষাদ ভাবনা তোকে মাত্র ৬৫/৬৬ তেই ৮০/৮৫ র মতন বার্ধক্য যন্ত্রনায় অস্থির করে মৃত্যু দেবতাকে খুব তাড়াতাড়ি ডেকে আনলো। তারওপর দুই চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে এলো তোর। তাই এই পরপারের অন্তিম যাত্রা তোকে সব ব্যাথা বেদনা ক্লেশ এবং নৈরাশ্য থেকে মুক্তি দিল – তা জেনে হয়ত আমি মনকে স্বান্তনা দিলাম সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে। কিন্তু কোভিড দানবের অত্যাচার না হলে হয়তো আমাদের আবার দেখা হতো। তাই পরোক্ষভাবে এবারেও সারা দোষ ঐ গৃহবন্দী দশা সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসের ওপর ন্যস্ত হল।

আমি তোকে গতবছরে অনুরোধ করেছিলাম বন্ধ ওষুধের দোকানটি পরিষ্কার করে ওখানে একটি সংগীত বিদ্যালয় খুলতে। তুই বসে বসে শুনবি। অন্যান্য গানের নাচের বা গিটার তবলার মাস্টারমশাইরা এসে সময় ধরে শেখাবেন। নতুন নতুন ছাত্র-ছাত্রী-শিশুদের-কিশোর-কিশোরীর কলকাকলিতে ভরে উঠবে তোর গৃহের অঙ্গন। সংগীতের মূর্ছনায় তোর রোগ ও শোক উপশম হবে।

কিন্তু সে ইচ্ছে আর পূর্ণ হল না। “তোমার অসীমে” গানটা প্রায় গাইতিস, আমিও আজ তাই গুরুদেবের কথা শুনিয়ে তোর চিঠিটার ইতি টানছি। এই ভারতবর্ষের ঘরে বসে এখন যদি ইন্টারনেটের সুবাদে কানাডা আমেরিকার মানুষের সঙ্গে চাক্ষুস দেখে বার্তালাপ করতে পারা যায়, তাহলে এই চিরন্তন আত্মা এখন যেখানেই থাকুক না কেন ঠিক এই চিঠির শব্দ অনুধাবন করতে পারবে। আমার জীবাত্মা তোমার পরমাত্মায় লীন হওয়া বিদেহী সত্ত্বাকে নিশ্চয়ই পরশ করতে পারবে। কারন তুমি তো এখন সেই অনন্তধামে দেবলোকে বিচরণ করছো। তাই মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে।

বাচ্চু ভাই – আত্মা অবিনাশী, আমরাও তাই বলি – “হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, যাহা কিছু সব আছে আছে আছে, নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারি নিশিদিন কাঁদি তাই।” কিন্তু এখন সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসায় তরণী এ কর্ণধার।

 

পঞ্চম চিঠি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে লেখা_ _ _

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সমীপেষু –

সামনে থেকে কখনও কি দেখেছি তোমায়? আলাপ পরিচয় হয়েছিল আমাদের? না বোধহয়। কিন্তু বাড়ির একজন প্রিয় সদস্যের মতন অত্যন্ত চেনা, অত্যন্ত প্রিয় ছিলে তুমি।

অপুর সংসার থেকে বেলাশেষে, হীরক রাজার দেশে, ফেলুদা কোনটাতেই তুমি অভিনয় করো নি এমন একাত্ম হয়ে গিয়েছিলে, যে ওরা সবাই আমাদের মনের মানুষ হয়ে গিয়েছে। তোমার শেষরক্ষা নাটকের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার কিশোরী মন। ‘ঝিন্দের বন্দির’ ময়ূর বাহনের সঙ্গে ‘তিন ভুবনের পারে’ নায়কের কোন মিল ছিল না, কিন্তু তোমার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, চরিত্র রূপায়ণের ক্ষমতা – প্রতিভা – সমস্ত বাঙালীর মনকে আপ্লুত করেছে। ৮৫ বছর কম নয়। জীবনের এই যাত্রা কালে কত মানুষের সম্পর্কে এসেছো তুমি, আমি ‘লক্ষ্মীপুরুষ’ গল্পটি লেখার পর থেকেই ভেবেছি যদি কখনও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই গল্পে বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন।

ও হ্যাঁ মনে পড়েছে সামনে থেকে কবে কোথায় তোমার চেহারা দেখেছি। ১৯৭৩ সালে যখন শান্তিনিকেতনে এম এ পড়ি তখন সত্যজিৎ রায়ের “অশনি সংকেত” এর শুটিং চলছিল কাছেই একটি গ্রামে। আমরা ক্লাস কেটে সেখানে পালাতাম, শুধু তোমায় দেখবো বলে। যেমন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালন ক্ষমতা ও কৌশল তেমনি এক বাচ্চা ছেলের মতন – বাধ্য ছাত্রের মতন তোমার তাঁকে অনুসরণ করা।

ভীষণ ভাল লেগেছিল আমাদের। বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতাকে দেখে হিংসে হত – ও তো আমাদের মতন এক সাধারণ মেয়ে, ও কি করে চান্স পেল, তোমার সঙ্গে নায়িকার রোল করতে – – – আহা আমাকেও যদি নিতেন জীবন ধন্য হয়ে যেত। সত্যজিৎ রায়ের সেট এর আসে পাশে ঘুরে বেড়াতাম সেই জন্য। তখন দেখেছি তোমার কাজের কি নিষ্ঠা। ‘কোভিড’ এর আক্রমণেও আক্রান্ত হলে তুমি সেই অভিনয়ের শুটিং করতে গিয়ে। এই বয়সে গৃহবন্দী থাকতে পারলে না। কাজের নেশা ও অর্থের প্রয়োজন তোমাকে বাধ্য করল। সারা জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী পত্নী ক্যান্সারে ভুগছেন, এবং এই রোগ যার পরিবারে আসে তাদের অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে যান। যে নাতি তোমায় সুখময় সাচ্ছন্দপূর্ণ জীবন দিতে সমর্থ হত সেই নাতি সেই কবে মোটর বাইক দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। তার চিকিৎসার দায়িত্বও তোমার ওপর ছিল, তাই তোমার মনের মধ্যে কত বড় ঝড় চলছিল, তা হয়তো তোমার সহকর্মীরা বুঝতে পারেনি।

সংগ্রামের মধ্যেও অটুট থাকার শিক্ষা দিয়ে গেলে বাঙালী জাতটাকে। কমিউনিস্ট মানসিকতার ছিলে বলে অনেকেই তোমার নিন্দায় সোচ্চার হত। কিন্তু ঐ সাম্যবাদী মন তোমাকে কোন আদর্শের কাছে মাথা নত করতে দেয়নি। কোন অন্যায় দেখলেই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছ, মিছিলে হেঁটেছ সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তোমার শেষ যাত্রায় তাই সব রকম লোকেরাই যোগ দিয়েছে, কোভিড-এর ভয় উপেক্ষা করে। আমরা প্রণাম জানিয়েছি সুদূর প্রবাসে থেকে।

তিন ভুবনের পারে, কোন স্বর্গের দ্বারে

প্রতীক্ষামান তুমি এখন !

জানি না আমরা কেউ।

শুধু মানি ‘কোভিড দানবটা’ যতই অত্যাচার –

উৎপীড়ণ করুক, জব্দ করতে পারেনি,

স্তব্ধ হয়ে গেছে তোমার যুদ্ধ ক্ষমতা দেখে।

সারা পৃথিবীর করোনায় আক্রান্ত

মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তুমি পাঞ্জা লড়ে

মৃত্যুকে চল্লিশ দিন ধরে

ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছো।

আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম – অবাক হয়ে

সেই রণক্ষেত্রের দিকে।

ভাবছিলাম এই বুঝি খবর আসবে –

তুমি ছাড়া পেয়েছো হাসপাতাল থেকে।

একটা রোগ দমন করলেও আর এক

রক্ত-বীজ দানব যে তোমার দেহ পিঞ্জর

কে একেবারে জীর্ন করে ফেলেছিল, তা

জানতাম না আমরা।

আত্মা অবিনাশী – সে তাই আর থাকতে পারল না,

আবার ফিরে গেল পরমাত্মার সঙ্গে

মিলনের আনন্দে স্বর্গ লোকে।

তোমার মন মাতানো হাসি, প্রাণ জুড়ানো

কথা ও বাচিক শিল্পীর অসাধারন

প্রভাব বুকে নিয়ে বাঙালী বেঁচে রইল।

অমরত্ব পেলে তুমি আমাদের মনে।

শ্রদ্ধায় আপ্লুত স্মৃতি শুধু ধরা রইল

আমাদের প্রাণে।

 

ষষ্ঠ ও শেষ চিঠি ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদাকে

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

দাদা, আপনার কোভিড-এ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাইনি আমরা, শেষ দিনে যে সে আপনাকে মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে একবারে পরাস্ত করবে, সে খবর যখন পেলাম তখন ভীষণ দুঃখ, ক্রোধ, অভিমান জন্মালো ভগবানের ওপর। কেন যে তিনি ঐ করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯ কে দমন করতে পারছেন না, বুঝতে পারছি না। ঈশ্বরের নিষ্ঠূরতার শিকার হচ্ছে কতশত ভালো ভালো প্রাণ। সারা বিশ্ব আজ কাঁপছে, কাঁদছে ও হাহাকার করে উঠছে। ভ্যাকসিন বেরিয়েছে শুনেছি কিন্তু কত দিনে সেই ওষুধ ইঞ্জেকশনে বিষে বিষে বিষক্ষয় করতে সমর্থ হবে জানি না। মানুষ বড়ই অসহায়, নিরুপায়। তার ক্ষমতা কোথায় এই বিশাল শক্তিশালী রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করার। দুর্গাপূজায় হিন্দুরা আকুলভাবে ডেকেছিল মা কে। ঈদের দিন মুসলমান জনতা তাদের আল্লাহর দুয়া মেগেছিল, ২৫শে ডিসেম্বর সারা রাত খৃষ্টানেরা খ্রিষ্টকে স্মরণ করে ঈশ্বরের কাছে একান্তভাবে প্রার্থনা করেছিল, এইবার তো তুমি এই ধরার মানুষকে রক্ষা করো প্রভু। কিন্তু কারো মনোকামনা, ব্যাকুল মিনতি, আকুল আবেগে ঐ ভগবানের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সারাটি বছর ধরে যে তান্ডবলীলা চলেছে তৃতীয়বার সারা আমেরিকা, ইউরোপে আবার তার প্রচন্ড প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে তা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শেষ দিনে ‘পাপিয়ার’ আর্তনাদ শুনতে পেলাম আমেরিকার থেকে – “বাবাকে নিয়ে গেল কোভিড। মা ও হাসপাতালে।”

 

 

 

শ্রীচরণেষু

দাদা, ১৯৭৪ সালে বিয়ে হয়ে প্রথম যখন সেনগুপ্ত পরিবারে এলাম তখন আপনার মাসি আমার মা (শাশুড়ী মাতা) আমায় জানালেন তাঁর পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, সহজ সরল সদস্য মন্টু। অর্থাৎ আমার “ভাসুর” প্রিয় বিজ্ঞানী, নিরাহংকারী স্নেহশীল ‘ডঃ অমলেশ চৌধুরী’ – আমার জীবনে একজন বিশেষ অনুপ্রেরণা উৎসাহ ও স্নেহ প্রদানকারী ব্যক্তি।

যখনই সোদপুরে সেই বিরাট বাগানঘেরা বাড়িতে গেছি, আপনার নিচের তলার আলমারীতে থরে থরে সাজানো নানান সামুদ্রিক জীব এবং মানুষের ভ্রূণ, হাড় কঙ্কাল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি আমি। আমার বিজ্ঞেনের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ও কৌতূহল, নানান প্রশ্ন আপনাকে খুব আনন্দ দিতো। অন্যদিকে দিদিভাই দীপ্তি চৌধুরীর আপ্রাণ চেষ্টায় গড়ে তোলা একটি ‘শিশুপাঠশালা’। কত সুন্দর করে দেওয়ালে দেওয়ালে রকমারী জন্তু জানোয়ারের ছবি, ফুল, পাখি আঁকা – নানান চার্ট পেপারে ছোট ছোট অক্ষরে বা A B C D র সঙ্গে লেখা নানান সব ছড়া, রঙের আঁকিবুকি আমার মনকে বিশেষভাবে আকর্ষিত করত। আমি দমদমে থাকলে হয়তো আপনার ঐ পাঠশালার একজন সক্রিয় শিক্ষিকা হয়ে উঠতাম। নাচে, গানে, নাট্য খেলায় আপনার গৃহের আঙ্গনটি মুখরিত করে দিতে পারতাম। কিন্তু আপনার প্রিয় ভাই “মঙ্গল” (শ্রী নির্মল প্রসাদ সেনগুপ্ত) দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রান্সফার হয়ে দিল্লী চলে এসেছেন তাই সোদপুরের বাড়ি আপনার ও দিদিভাইয়ের স্নেহচ্ছায়া থেকে দূরেই থাকতে হল আমাকে। কিন্তু দুই ছেলেকে নিয়ে বার বার গেছি আমি আপনার কাছে, যাতে সেখানে গিয়ে আপনার কাছে আমার ছেলেরা বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শেখে। পড়াশোনাকে ভালোবেসে জীবনে আপনার মত যশস্বী কিন্তু নিরাভিমানী শান্ত স্নিগ্ধ হতে পারে। তারাও আমার মতন নানান কথা গল্পে প্রশ্নে আপনার গবেষণার কাহিনী শুনতে আপনাকে অতিষ্ঠ করে তুলতো। তাদের আপনি আপনার গবেষণারত ছাত্রদের সঙ্গে একবার সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে পাঠালেন। ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে তারা গভীর জঙ্গলে ছোট ছোট নদীর খালে বিলে ঘুরে মাছ – কচ্ছপ কুমীরের দেখা পেয়ে ভীষণ আনন্দে বিগলিত হয়ে গিয়েছিল।

ছোট ছেলে তো বায়োলজি তে প্রাকটিক্যাল প্রজেক্ট করবার জন্য কোথায় কোন বাজারে গিয়ে দুটো কচ্ছপের ছোট ছোট বাচ্চা কিনে আনলো। আপনি নিজে সঙ্গে গিয়ে সেগুলি কিনতে সাহায্য করেছিলেন। ওরা সারা রাতদিন খট খট করে ঘরে ঘুরে বেড়াতো। ওদের প্রত্যেকটি movement নিয়ে study করতে এবং project বানাতে আপনি ওর বন্ধু, শিক্ষকের মতন সাহায্য করেছিলেন। আপনি যখন ঐ ১৬ বছরের ছেলের সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করতেন ‘মেরিন বায়োলজি’ সম্পর্কে ওকে অনেক প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিতেন তখন ও ভীষণ খুশি হত, এবং আপনাকেও ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু মনে হত। রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে আমি বারে বারে দেখতে থাকতাম আপনার সঙ্গে আমার ছেলের ঐ আন্তরিক খোলা মেলামেশা, হাসি ঠাট্টা – ঐ সব সামুদ্রিক জন্তু জানোয়ারদের গল্প অক্টোপাসের camoflage – আট হাত পা ও রঙের বাহার নিয়ে সমুদ্রের জগৎকে তোলপাড় করার কথা, shark বা whale এর পার্থক্য monitor lizard বা house lizard এর তফাৎ নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হত আবার আমি যদি পড়তে পারতাম। আপনার ক্লাশে zoology অনার্সে ভর্তি হতে পারতাম।

আপনার দুই মেয়েই বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল। ভীষণ বুদ্ধিমতী ও শান্ত স্বভাব তাদের। পরবর্তীকালে ‘পাপিয়া’ আমেরিকার (কলম্বিয়া) ইউনিভার্সিটিতে সায়েন্টিস্ট হল তখন আমি আপনার ভাই আপনি ও দিদিভাই চারজনে মিলে নিউইয়র্কের ঐ ল্যাব-এ তার কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। আনন্দে আমাদের সকলের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরে ছিল। আমি কবিতা লিখে রেখে এসেছিলাম তার টেবিলের ওপরের এক নোটিস বোর্ডে। গর্বিত হয়েছিলাম আমরা। সেই সময়কার আরও একটি বিশেষ “ঘটনা” আপনার প্রতি আমার মনকে আরও শ্রদ্ধায় আপ্লুত করে দিয়েছিল। আজকের খোলা চিঠিতে সেই কথা ব্যক্ত করার জন্যই লেখা।

পাপিয়া আবিরের (পাপিয়ার স্বামী) staten Island এর ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিউইয়র্কের কাছে নতুন গৃহে প্রবেশ করেছে। আপনারা দুজনে সোদপুর থেকে এসেছেন, আমরাও ক্যালিফোর্নিয়ায় ছেলেদের বাড়ি থেকে পৌঁছে গেছি সেখানে। নাতি দেবায়নকে নিয়ে খুব আনন্দে হৈ চৈ করে সময় কাটাচ্ছি চার জনে। নানারকম রান্না করে খাওয়াচ্ছি আমি আপনাদেরকে। একদিন ওদের ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে বাড়ি- গাড়ি – টাকা – পয়সা – চাকরি ইত্যাদির আলোচনায় মশগুল আমরা, হটাৎ দেখলাম আপনি উঠে চলে গেলেন। বাগানের বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কান পেতে কার যেন ডাক শুনতে লাগলেন। আমিও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি, সেদিকে লক্ষ্য নেই আপনার। কাকে যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গাছের ডালে ডালে পাতার ফাঁকে। পড়ন্ত সূর্যের রৌদ্রের কিরণ আপনার শিশুর মতন সরল মুখে এক ঝলক রক্তিম আভা মেখে দিয়েছে। আপনি আপন মনে খুঁজে চলেছেন একটা ‘পোকাকে’, যার নাম “শিকাডা”। যার ডাক শুনে ঐ আরাম কেদারা সরস আলোচনা ছেড়ে আপনি একা বাগানে বেরিয়ে এসেছেন। আমি তার সম্বন্ধে একটু কৌতহল প্রকাশ করায় কী খুশি আপনি।

“শিকাডা” পোকার সম্বন্ধে কত information যে আমাকে বিস্তারিত ভাবে দিতে লাগলেন, তার যেন কোন শেষ নেই – আমি যেন এক রিসার্চ স্টুডেন্ট, – zoology এর ছাত্রী। ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। একটা পোকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে চান আপনি India তে। ওখানের রিসার্চে ব্যস্ত গবেষক ছাত্রদের দেখাবেন ভারতীয় পোকা ও আমেরিকার পোকাদের মধ্যে কি কি পার্থক্য। কখন কখন কিভাবে ওরা একমাস ধরে নিজেদের বন্ধু খুঁজতে ঐ ভাবে অনেকটা ঝিঁ – ঝিঁ পোকার মতন এক নাগাড়ে ডাক ছাড়ে।

আমি বুঝেছিলাম আসল জীব বিজ্ঞানীর রূপ ও মনোভাব কেমন হয়। সাগরদ্বীপের গবেষণাগারটি যখন এবারে আমফানের ঝড়ে ভেঙে গেছিল, তখন ক্ষতিগ্রস্থ সেই গৃহের জন্যে আমি ডোনেশন ও অর্থ সংগ্রহ করার পর আপনার সে কী আনন্দময় শিশু সুলভ হাসি দেখেছি – যা ভোলবার নয়। দাদা, আপনি হাজার হাজার ছাত্রের মধ্যে আপনার প্রভাব ও অনুপ্রেরণা রেখে গেছেন। আপনাকে স্বর্গের ঠিকানায় চিঠি লিখে শত সহস্র প্রণাম নিবেদন করি।

খোলা চিঠি (শ্রীজাতকে মা) (Khola Chithi – Srijat ke Maa)

Khola Chithi ( Srijato ke Ma) , An open letter to a NRI son in USA by his old ma

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ফেইসবুক' – নাম মানে "বদন পুস্তকে" -
তোর কবিতা পড়ে
খুশি হলাম রে খোকা।
আজকাল যে কি হ'ল,
পোস্টাপিস গুলো, -
বিলি করে না, চিঠিপত্র আগের মত।
'ডাকিয়া' কেই আসতে দেখি না রোজ,
পথ চেয়ে থাকি, -
কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে -
কেউ আর কাগজে এখন -
চিঠি লেখে না গো জেঠিমা,
কম্পুটার শেখো,-
'ফেজ বুকে' ছেলেকে দেখো।
শিখেছি রে হতভাগা,
ছেলের সোনামুখ দেখতে
সব শিখে নিলাম ধীরে ধীরে।
শ্রীকৃষ্ণ যেমন মুখ হাঁ করে অর্জুনকে
ব্রহ্মান্ড দর্শন করিয়েছেন,-
তেমনি এক একটা জানলা খুলে
বিশ্ব দর্শন করায় কোলে ধরে
রাখা ল্যাপটপ - ছোট যন্ত্র-টা।
আমরা ভারতীয় 'মা' রা
অনেক পরিবর্তন দেখলাম -
এই একশ বছরে -
নিজেরাও পাল্টে গেলাম
একটু একটু করে।
তোর ঠাকুরদার সময়ে -
এক গলা ঘোমটা টেনে,
হেঁশেল ঠেলতে ঠেলতে,
গোয়ালে গরুর গোবর তুলে
ঘুঁটে লেপ্তে লেপ্তে ও
"আশাপূর্ণার" মতন পড়া করেছি।
'সুবর্ণলতা' হয়ে তোর দিদিকে
বেথুনে পড়তে পাঠিয়েছি।
শুনেছিলাম সেখানে এক কালে
বিবেকানন্দ - রবীন্দ্রনাথের দিদিরা -
পড়েছেন।
মেয়ে আমার মুখ রেখেছে।
স্কুল পাশ করে - ডাক্তারি -
তারপর বিয়ের পরেও
লন্ডনে গিয়ে FRCS পড়েছে।
গ্রাম তো অনেকদিনই ছেড়ে এসেছিলাম, -
এবার কলকাতা পিছে ফেলে -
দিল্লী চলে এলাম, -
তোর বাবার চাকরীর সুবাদে।
তুই পড়া করলি নাম করা
বড় ইংরাজি স্কুলে।
তারপর আই আই টি,
আই এ এমের গন্ডি পেরিয়েও
থামলি না, তাই -
'স্টানফোর্ডই, ওয়ারটেন।
অনেক দূরে সেই সুদূরে
নিউ ইয়র্ক শহরে - তোকে
টেনে নিয়ে গেল তোর দ্রুতগামী
"কেরিয়ার" ট্রেন।
তোদের ব্যাস্ত ছড়ানো জীবন,
এখন -
অন্য খাতে - অন্য জগতে, - বয়ে চলে।
অন্য ধাতে, রকম মারি
খেলনা, বাড়ি, গাড়ি -
নিয়ম - অনিয়মের বেড়া জালে ঘেরা,
ভিন্ন ঘাটে, অচেনা মাঠে, হাটে,
বাঁধে নতুন ডেরা। -
নানা সমস্যা, -
আশা, নিরাশা, -
নিরাপত্তার অভাবে ঘেরা।
নিত্য নতুন সম্পর্কের ভাঙাগড়া -
উত্তেজনা, উন্মাদনা আবার
কখনও কখনও উন্নাসিকতায় ভরা।
যৌবন শেষ হয়ে এলো, তোর
খোকা, তুই এখন পঞ্চাশ উর্ধের প্রৌঢ় -
'বানপ্রস্থের' প্রস্তুতিতে চঞ্চল।
আমি তোকে আমেরিকায় পাঠাতে
পেরেছি, - তুই কেন
পারবি না রে চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহের
দিকে এগিয়ে দিতে!
তোর সন্তানকে।
"চরৈবেতি - চরৈবেতি -"
এই মন্ত্রই তো তোকে
শিখিয়েছি বাবা।
এগিয়ে চলাটাই তো
'পরিবর্তনশীল' জগতের নীতি।
জীবনের স্রোতে তীব্র বেগে বয়ে চলা -
সন্তান সন্ততিদের মধ্যে -
যে সব মা ঘুরে বেড়ান, -
কন্যা ও পুত্রবধূর প্রসব বেদনায়
যিনি পাশে থাকেন,
পুত্র ও জামাইকে সদ্যজাত -
নাতি বা নাতনিটি হাসপাতালের
ঘরে হস্তান্তরিত করেন,
তাদের দুঃখে সুখে কাঁদেন, হাসেন,
সমানভাবে ভাগ করে নেন,
তাদের চাকরীর উত্তরণ বা
অবতরণের টেনশন,
সেই সব মায়েদের দলে আছি -
আমি।
জাতকের উন্নতি - শ্রী বৃদ্ধির জন্য
তোমার নাম রেখেছিলাম শ্রীজাত
আজ তোমার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে আমি গর্বিত।
ওরে খোকা, সোনা আমার -
গাঁটের ব্যাথাটা কেমন আছে -
রোজ খবর নিতে না পারলেও
আমি জানি, তোর মন এখনও
এই বুড়ি মায়ের কথা ভেবে কাঁদে।
কবিতার প্রতিটি শব্দ প্রস্তরে
সময় পেলেই কালো অক্ষরে
লিখতে থাকিস বাবা মায়ের কথা।
তাই শুধু নয়, হাঁটু জলে ভরা -
সাদা বালির কিনারায় মোড়া
দারকেশ্বর নদী ধারে সেই
'বাঁশি' গাঁয়ের নামও
শুনি তোর গদ্য কবিতায়।
যেখান থেকে একদিন তোর
বাবা বেরিয়ে এসেছিলেন,
পড়া, চাকরি ও ছেলে মেয়ে মানুষ
করার তাগিদে, -
আর ফিরে তো
যেতে পারেননি, কোনোদিনও।
অথবা তাঁকে যেতে দেয়নি, -
আমার উচ্চাকাঙ্খী মাতৃ মনও।
হ্যাঁরে, বাবু, আজ মনে পড়ে -
কতবার কেমন করে আমি
আটকে ছিলাম, -
স্বামীর ক্ষুব্ধ - গ্লানি, বিধ্বস্ত -
ক্লান্ত সত্তাকে।
এখন বুঝতে পারছি তোর মতন
তাঁর হৃদয়ও রক্তাক্ত হয়েছিল।
বুকে মাথায় হাত বোলালেও
স্বস্তি পেতেন না তিনি।
পায়ের নখ কাটতে কাটতে বলতেন -
ছোটবেলায় মা আমার পা টা
কোলে নিয়ে নখ কেটে দিতেন।
বেল কাঁটা ফুটলে -
প্রদীপের আলোটা
কাছে ধরে সেপ্টিপিন দিয়ে
ধীরে ধীরে বের করে দিতেন সেটা।
এখন মা কে একবার . . .।
থামিয়ে দিতাম আমি।
"কি করে যাবে? খোকার জয়েন্ট
এন্ট্রাস-এর পরীক্ষা এসে গেল,
বিভিন্ন স্কুলে সময়মতো কে
তাকে পৌঁছে দেবে?"
তারপর একদিন তোর কাকার চিঠিতে
জানতে পারলাম 'মা' অসুস্থ।
আর যে সে রোগ নয়, -
নাকের ডগাটা ফুলে লাল,
হয়েছিল, শরীরে একটা অস্বস্তি
থাকায় রক্ত পরীক্ষা করেন -
"বাঁকুড়ার কল্যাণ ডাক্তার,"
এই ব্যাপারে ভীষণ
অভিজ্ঞতা তাঁর, এসব রোগের
ধ্বন্বন্তরী তিনি।
স্নিগ্ধ স্বরে বলেছিলেন, -
ওনার ছেলেকে একবার আসতে বলতে হবে
রোগটা আজকাল সেরে
যায়, ভয় পাবার কিছু নেই,
তবে সামাজিক কুসংস্কারে, -
লোকের মানসিকতা তো এখনও
বদলাই, নি তাই -
তোমার কাকা বুঝে গেছিলেন,
আর একদিনও দেরী না করেই
ঠাকুমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন
গৌরীপুর "কুষ্ঠাশ্রমে"।
তোর বাবা খবরটা শুনেই ছুটে চলে
যেতে চেয়েছিলেন,
তাঁর মায়ের কাছে, -
আমি সাহস পাইনি।
রোগীকে নয় রোগকে
আমার ভীষণ ভয়।
এমনকি, আজ তোর কাছে
স্বীকার করতে লজ্জা নেই
মায়ের পোস্টকার্ড এলেও
পড়েই পুড়িয়ে দিতাম।
পাছে তোদের ঐ রোগের জীবাণুরা কখনও
আক্রমণ করে।
তোর ঠাকুমা কিন্তু কখনও দুঃখ অভিমান
রাগ করে পত্র লেখেননি।
সর্বদা জানাতেন, -
"আমি ভালো আছিরে মনু -
এখানে নার্সদের বাচ্চাগুলোর
ভার নিয়ে নিয়েছি, -
ওদের পড়াই, গান শেখায়।
আর যারা খুব অসুস্থ চলৎশক্তিহীন
সেইসব দুস্থ রোগীদের পাশে বসে
গল্প শোনাই, খুব ভালো লাগে।"
থাক ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা
আদরের খোকন, বাবা,
বুকের যন্ত্রনাটা আর
বাড়তে দিস না যেন,
ডাক্তার দেখা, আর কিছুদিন
বৌ বাচ্চাদের নিয়ে -
"হাওয়াই" কিংবা "বালি"
বেড়িয়ে আয়, - মনটা ভাল হয়ে যাবে
আমার কাছে না আসতে
পারার জন্য কোন -
'গিলটি' মানে - অনুশোচনা,
অনুতাপ - পরিতাপ - দুঃখ বা
ক্লেশ রাখিস না মনে।
নিজেকে দোষারোপ -
করিস না সোনা -
ডিপ্রেশন হয়ে যাবে, ফুরিয়ে
যাবে তোর নিত্য নতুন -
টেকনোলজি - 'প্রোগ্রাম'
বানাবার ক্ষমতা, একাগ্রতা কমে গেলে
নিজেকে হারিয়ে ফেলবি ধীরে ধীরে।
আমি তো সব সময়ই -
তোর পাশে আছি রে।
'সময়' বড় নিষ্ঠূর আর
কঠোর শিক্ষক।
তার নিয়ম নিষ্ঠা, রীতি
নীতিকে মেনে চলাটাই
তো জীবনকে স্রোতস্বিনী -
রাখা, তবেই তো আসে -
সাফল্য।
শুধু কেরিয়ার নয়, জীবিকাকে
আঁকড়ে সোপানে চড়া নয় -
আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশী
সকলের সঙ্গে সম্পর্ক
বাঁচিয়ে রাখার জন্যে
প্রতি মুহূর্তে ছিঁড়ে
যাওয়া তার জোড়া দিতে
গিয়ে তোদের এ যুগের
ছেলেমেয়েদের অনেক চাপ সহ্য
করতে হয়, এই অজানা প্রবাসে।
নানান সমস্যা ও মানুষের
দাবী মেটাতে গিয়ে অহরহ
তোদের এই ছুটে চলা -
অবিশ্রাম ফোনে কথা বলা
আমাকে ব্যথিত করে, কাঁদায়,
ভাবায়। তোদের অবস্থা যারা -
অনুভব করতে পারে না -
তারা তোদের অনেকরকম
সমালোচনা করেন। না রে খোকা
আমি কিন্তু তাদের দলে নেই।
অকারণে আবেগপ্রবন হতে গিয়ে
তোর কাছে যেন ভুল
না হয়ে যায় বাবা।
আমার জন্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে
কোন চিড় না ধরে।
ঘরে ঘরে এখন সানাই এর
চেয়েও ডিভোর্সের বাঁশি বেশি বাজে।
ছোট ছোট শিশুরা
হাঁ করে মা বাবার ঝগড়া
শোনে, আর সারাদিন
ঢুকে যায় "আই প্যাড" এর আড়ালে,
নেটের জগতে - অন্য এক
স্বপ্নময় রহস্যপূর্ণ গুহায়।
তাই তোর মায়ের মাথায়
সব সময় চিন্তা -
সন্তানের সুখের নীড় যেন
ভেঙে না যায়। তারা যেন
শান্তিতে আনন্দে সময় কাটায়।
আর আমার খোকার যদি
ভুলভ্রান্তিও হয়েই থাকে কোন
কর্তব্যবোধ, আদর্শ, মূল্যবোধে যেন
ভাঁটা না পড়ে -
এই আমাদের কাম্য।
মা মানেই তো 'ক্ষমা'
উদারতার আকাশে বিচরণ করা।
তোর মতন প্রবাসী বিদেশী
ছেলে মেয়েদের জন্য আমি আজ
গর্বিত রে খোকা।
নিজেদের চেষ্টায়, সাধনায়,
পরিশ্রমে তোরা বড় হয়েছিস,
দুর্নীতি পরায়ন নেতাদের
পায়ে ধরে, খোশামোদের
জোর দিয়ে নয়।
মানুষ ঠকানোর ব্যবসা
তোরা করিস না
তোরা চোরা গলির পথ দিয়ে
উচ্চতার শিখরে পৌছোসনি,
লোভী, স্বার্থপর দানব হয়ে
দেশপ্রেমের মুখোশ পড়ে বেড়াসনি কখনও
দয়া, মায়া, স্নেহ, ভালোবাসায় -
তোদের মন, বাপ-ঠাকুরদার মতন
এখনো কোমল আছে।
জাত পাতের গন্ডি ছাড়িয়ে
ধনী নির্ধনের ভেদাভেদ ভুলে
সাদা কালো, ইহুদি মুসলমান
সবাইকে বুকে জড়িয়ে
ধরতে পারিস তোরা।
মানুষের মতন মানুষ হবার -
শিক্ষা গ্রহণ করে
জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিস ঘরে
এটাই আমাদের সবচেয়ে
বড় আনন্দ ও শান্তি।
তোকে আমি আশীর্বাদ করি তাই
বারে বারে জানাই, স্নেহাদর প্রানভরে।
হাতের স্পর্শ দিয়ে বুকের যন্ত্রনা
যদি দূর করতে নাও পারি, -
তবু জানবি - আমার আত্মা
সর্বদা ছুঁয়ে যেতে চায় -
তোর অমলিন সত্তা।
স্নিগ্ধ হাওয়ায় বার্তা পাঠায়,
আমার বাস্প হয়ে যাওয়া অশ্রু।
আর মেঘদূতের মতন এই মন
সর্বদাই তোর কাছে ধায়।
তোর মা তোর কাছে
কৃতজ্ঞ রে খোকা,
তোর পাঠানো টাকা
আমার দক্ষিণেশ্বরে ফ্ল্যাট
কিনে দেয়,
বাবার গ্রামের বাড়ি সারায়।
দুঃখী বিধবা পিসির -
মেয়ের বিয়ের গয়না গড়তে
আমার সাহায্য করে।
তোর পাঠানো স্কলারশিপের টাকায়
বিদেশের পাঠরত অসহায় ছেলেটির
উচ্চ শিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়।
ছোটবেলাকার গৃহ শিক্ষকের ক্যান্সার শুনে
কেমো বা রেডিয়েশন এর খরচ পাঠাতে
বিন্দুমাত্র দেরী করিস নে তুই।
এমনকি কাজের মাসির পাগল ছেলের
চিকিৎসা করাতে পারি আমি প্রতিমাসে,
কেননা - 'ডলারে' আমার হাত খরচা আসে।
তোর মতন আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি কিম্বা
অস্ট্রেলিয়া বাসী এরকম আরও অনেক
ছেলে মেয়েরা যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে
বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, সুনামি বা
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে
দেশবাসীর পাশে এসে দাঁড়ায়
তাদের দান ও টান আবেগে আপ্লুতো
করে দেয় মা বাবাদের,
এখনকার সমাজে মোদের সম্মান বাড়ায়।
যত "চোখে আঙ্গুল দাদা" বিদেশে কর্মরত
দু চার জন ব্যতিক্রমী স্বার্থান্বেসীকে ধরে
উদাহরণ দেয়, পত্রপত্রিকায়, গল্পে, নাটকে
শুধু লিখে যান 'ন-কারাত্মক' খবর।
কিন্তু আমি জানি তোরা এখনো হারিয়ে ফেলিসনি
তোদের ভাষা সাহিত্য বা ঐতিহ্যকে।
সর্বদায় তোরা মুক্ত মন নিয়ে যুক্ত আছিস
দেশবাসীর সুখে দুঃখে।
আর সেকথা বোঝাতেই তো শ্রীজাত
বাবা- তোকে লিখছি এই খোলা চিঠি।
ডাক্তার জ্যেঠুকে মনে আছে তোর?
তিনি কি বলেন জানিস?
"এরাই তো তোমার রবিঠাকুরের সেই
বীরপুরুষের দল।"
তারপর সেই অসাধারণ লাইন জুড়ে দেন
তোর সম্বন্ধে -
"পাড়ার লোকে সবাই বলতো শুনে,
ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের সনে।"
আজ আমার অকপটে স্বীকার করতে
ইচ্ছে হয়, জীবনে তুই পাশে না থাকলে,
আমি হতাম নেহাৎই এক দুঃখিনী
মা - অতি নগন্য।
সুজাতা ও শ্রীকান্তের পুত্র
বাবা শ্রীজাত, তোদের মতন
ছেলে মেয়েরাই তো মায়েদের জীবনকে
করেছে ধন্য।
ইতি টানার আগে বুকভরা
স্নেহাশীষ ও ঠাকুরের কাছে
কুশল প্রার্থনা জানাই
তোমার জন্য।
মা