ডানা ভাঙা পাখী (Dana Bhanga Pakhi)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মিস্টার ভেঙ্কট ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা দেবী চেন্নাই থেকে রওনা দিলেন সিঙ্গাপুরের দিকে। আর পাঞ্জাব থেকে দিল্লীতে এসে এয়ার ইন্ডিয়ায় সিঙ্গাপুরের ফ্লাইটে চড়ে বসলেন, মিস্টার ও মিসেস কাপুর। দুই বৃদ্ধ চাকুরী থেকে অবসর প্রাপ্ত এবং তাঁদের পত্নীদ্বয় ছেলে বা মেয়ের সাফল্যে গর্বিত গৃহবধূ। তাঁরা তাঁদের চেন্নাই ও অমৃতসরের বড় বাড়িতে গাছপালা লাগিয়ে চাকর-বাকর, মালী, ড্রাইভারদের নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছেন। তাঁদের একমাত্র নাতি ‘রাঘবের’ ১৮ বছরের জন্মদিন পালন করতে ওখানে যাত্রা করছেন। ভেঙ্কট ও বিনীতা ওর ঠাকুরদা ও ঠাকুরমা এবং কাপুর দম্পতি নানা-নানী। দুই দাদু এবং দাদী ও নানী আনন্দে একেবারে বিগলিত।

রাঘবের স্কুলের পাঠ শেষ হয়েছে। এবারে সে এয়ার ফোর্সে পাইলটের ট্রেনিং নিতে ‘কানাডায়’ চলে যাবে। তাই তার সঙ্গে আর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ আসবে না, এই জন্য মা বাবা রাঘবের আগ্রহে বড় পার্টি দিতে “সন্তোষা দ্বীপে” (Sentosa Island) একটি হোটেল বুক করেছেন। তার মা কমলেশ ও বাবা রঙ্গনাথ দুজনেই IIT এবং IBM একসঙ্গে পড়েছেন, তাদের এই প্রবাসে চাকরী জীবনে সাফল্য ও অর্থ দুটোই এনে দিয়েছে। ২০ বছর এখানে আছেন, নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন। দু’জনেই তাদের বাবা মা দের একটি করে সন্তান। কিন্তু দেশে ফিরে যেতে বা চেন্নাই অমৃতসরের জমি-জমা, সম্পত্তি, বিশাল বাড়ি ভোগ করতে ইচ্ছুক নয়।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান উৎসব – অনেক বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খুব সুষ্ঠভাবে পালিত হল, নাতি চলে গেল বিদেশে। এই বৃদ্ধ বৃদ্ধা রা তাঁদের ছেলে মেয়েদের দূরে পাঠিয়েছেন, অতএব রাঘবের বাবা মা ও  মুখে করুন হাসি টেনে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। এক সপ্তাহ পরেই দুই Grand Parentsদের চলে যাওয়ার টিকিট কাটা আছে। এমন সময় জানা গেল, চীন দেশে উদ্ভব হয়েছে, সেই ভীষণ করোনা ভাইরাস।

যার প্রকোপে – আক্রমনে (২০১৯ এর ডিসেম্বরে যার সৃষ্টি) ২০২০ জানুয়ারীতেই সিঙ্গাপুরে ভীতি দেখা দিল। এখানে বিচক্ষণ সরকার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন ঘোষণা করলেন।

দেশ থেকে কেউ বেরোতেও পারবে না, আবার কেউ বাইরে থেকে আসলে ১৪দিন হোটেলে ‘কোরেন্টাইনে’ থাকতে হবে। অনেক টাকা খরচ করতে এবং বার বার কোভিড টেস্টে পাশ করতে হবে।

অতএব সব বাবা মায়েদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দেশে যারা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন, তাঁদের সন্তানেরা অসহায় হয়ে – বিদেশে বসে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। এ এক বিভীষিকাময় পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নিরুপায় মানুষ নিরানন্দে জীবন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ঐ চারজন বৃদ্ধ – বৃদ্ধার অবস্থাও দাঁড়ালো যেন ঠিক চিড়িয়াখানায় আটকে রাখা জন্তুর মতন।

মেয়ে কমলেশ ও ছেলে রঙ্গনাথ বাড়িতে বসেই কাজ করেন, দিনরাত কম্পিউটারে। Work from home এই মহামারীতে তাদের জীবনটি এক নতুন খাতে বহে নিয়ে যাচ্ছে।

‘চারজন’ ভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন কালচার ধর্মাবলম্বী লোক অবসর সময়ে ছেলে তথা জামাইয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এখানে একটাই এখনও ভাল যে মাস্ক পরে নিচে সুইমিং পুলের ধারে সকাল বিকেল ঘুরতে পারছেন। সেখানেই আলাপ হল, আরও অনেক মা বাবাদের সঙ্গে, তাঁরা কেউ কলকাতা তো কেউ হায়দ্রাবাদ, কেউ পুনে তো কেউ কাশ্মীর থেকে আগত। ছেলে মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশুনো করে কেউ কম্পিউটার কোম্পানীতে, অথবা কেউ ব্যাংকে সব ভালো ভালো পদাধিকারী, ভালো মাইনে পান। কিছু প্রফেসর বা জাহাজের ক্যাপটেন, ইঞ্জিনিয়ার, সুন্দর সুন্দর এপার্টমেন্ট     (কন্ডো- তে) বাস করছেন। বৃদ্ধ বাবা মা রা তাদের নিয়ে গর্বিত। যখনই দেশ থেকে কেউ আসেন, তাঁদের নিয়ে হৈ হুল্লোড় করতে, বিভিন্ন দ্বীপে – কাছে পিঠে নিয়ে যেতে, গাড়ি করে মালয়েশিয়া বেড়াতে তাঁরা বেশ উৎসাহ দেখান। বাড়িতে প্রায় দিন রান্না করতেও হয় না। এখানের খাওয়ার দোকান food court থেকে নিয়ে বড় বড় বিভিন্ন দেশের রেস্তোরা হোটেলগুলিতে এত নতুন নতুন খাদ্য তালিকা পাওয়া যায় যা সারা বিশ্বকে আকৃষ্ট করে। তাই রোজ একঘেয়ে খাবার না খেয়ে তারা বাবা মা দের নিয়ে প্রত্যেক শনি – রবিবারে বেরিয়ে পড়েন জিভের স্বাদ বদল করতে। সামুদ্রিক মাছ, জাপানী সুশি বা চীনদেশের রকমারি খাদ্য দ্রব্যের পাশেই পাকিস্তানী কাবাব বা বাংলাদেশের বিরিয়ানি। এখানে লন্ডন – আমেরিকার মতন দেখবার দর্শনীয় স্থান খুব বেশী নেই, আমাদের ভারতের মতন ঐতিহাসিক পুরোনো সব রাজপ্রাসাদ, মন্দির – মসজিদ, তীর্থক্ষেত্র কিংবা হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতেও পাওয়া যায় না। তাই সব মনোযোগ এই দেশের খাওয়ার ওপরে। সুতরাং যখনই কেউ আসেন ছেলে মেয়েদের সঙ্গে অন্য দেশের আহার্য্য দ্রব্য তাদের নতুন নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এখানে সুযোগ ঘটে। সিঙ্গাপুরে র এই সব Food court গুলো World Heritage এর আওতাভুক্ত হয়েছে এদের বৈচিত্রের জন্য। দু-চার মাস আনন্দে কাটিয়ে তারা ফিরে যান। কখনও কখনও বা কোন কোন পিতা মাতার ভাগ্যে বালি, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বিনথাম বাথাম কিংবা থাইল্যান্ডের ফুকট, ব্যাঙ্কক ঘোরার বেশ উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা লাভ হয়ে যায়।

কিন্তু এখন সব বন্ধ। দু/চার মাস থেকে ছয়/আট মাস বছর ও ঘুরে গেল, কিন্তু long term visa নিয়ে যে সব পিতা মাতার দল সিঙ্গাপুর বাসী হয়েছিলেন, কেউই আর ফিরে যেতে পারছেন না নিজের আরামপ্রদ চেনা পরিবেশে। কেউ তাই এখন আগেকার সময়ের মতন খুশি বা সুখী নন। দেশের গ্রামে বা শহরে কিংবা ছোট্ট নগরে যে প্রশস্ত আঙ্গন, আম, জাম কাঁঠালের বাগান, গাড়ী, ড্রাইভার কাজের লোক তাদের জন্যে অধীর আগ্রহে বসে আছে, নিজের ঘরের বারান্দা, ফুলের টব বা তুলসী গাছ, পোষা গরু, বাছুর, কুকুর – পাড়া – প্রতিবেশী, চায়ের দোকান, প্রভাতে সন্ধ্যায় আড্ডামারার সেই পার্কের কোনায় সিমেন্টের বেঞ্চ, পুরোণো বন্ধু সব পড়ে আছে দেশের মাটিতে।

‘ভেঙ্কটবাবু’  নতুন প্রতিবেশী  মিঃ দাশের সাথে কথা বলতে বলতে তাঁর অতি মোটা জোরালো গলায় কখনও দেশের প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ তো কখনও কখনও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি রাগ ব্যক্ত করেন, তাঁর স্ত্রী খুঁজে বেড়ান তামিল বান্ধবী। সময় কাটান, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ান হেল্পার কে ধোসা ইডলী শেখাতে।

একসঙ্গে দুটো বাসন থাকলে যেমন ঠোকাঠুকি লাগে, শব্দ হয়, কাঁচের পাত্র তো ভেঙে চুরমারও হয়ে যায়, ঠিক সেইরকম দুজন মানুষকে এক জায়গায় বন্দি করে রাখলে, তাদের সম্পর্কের চিড় ধরতে থাকে। এই প্রবাসী পরিবারেও সেই আনন্দময় পরিবেশের জল একটু একটু করে ঘোলা হতে শুরু হল।

ছেলের বাবা মা ধার্মিক দক্ষিনী ব্রাহ্মণ। নিরামিষ খাওয়া, তিলক কাটা, সকাল বিকাল অনেক্ষন ধরে পুজো পাঠ করতেই তাঁরা অভ্যস্ত। মেয়ের পাঞ্জাবী মা বাবা গুরুদ্বারে যান, পাঠ শুনে, কর সেবা করে, সেখানে হালুয়া প্রসাদ, কখনও বা ‘লঙ্গর’ অর্থাৎ ওদের বানানো কমন কিচেনে ডাল – রুটি খেয়ে আসেন, কখনও বা বাড়িতেই খুব পেয়াঁজ রসুন দিয়ে ডালের সুস্বাদু তড়কা বানাতে ভালোবাসেন, সব রকমের আমিষের রান্না করতে  তাঁদের আগ্রহ। মেয়ে তাদের জন্যে মুর্গা নিজেদের ওভেনে তন্দুরী করে দেন। ছেলে বাবা মায়ের জন্যে ‘আনন্দভবন’ কিংবা ‘কোমিলা বিলাসের’ মসলা ধোসা, সাম্বার অর্ডার করে আনায়।

তাদের দুজনের মধ্যে খুবই সুন্দর বোঝাপড়া আছে। যে যার মা ও বাবার খরচ বহন করে। দুজনেই তাঁদের মা বাবা দের একটি মাত্র করে সন্তান হওয়ায় নিজের নিজের মায়েদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ট। এই কোভিড-এর সময় সিঙ্গাপুরের অবস্থা অনেকটা ভালো, কিন্তু ইন্ডিয়ার খবর রোজ রোজ ক্রমশঃ খারাপের থেকে খারাপ হচ্ছে, তাই তারা বাবা মা কে ওই রোগের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেদের কাছেই খুব যত্নে ও আনন্দে রাখতে চায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে নানান সমস্যা শুরু হল। ক্রমশঃ দুই প্রদেশ থেকে আগত দুই ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন আচার এবং আচরণে, খাওয়া পরার ট্রেডিশনএ-ও কালচারে অভ্যস্ত মা বাবাদের অসুবিধেগুলো সামনে আসতে লাগল, মাত্র কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ এই বয়সে অন্য পরিবারের সঙ্গে থাকা যায়, কিন্তু মাসের পর মাস তো সম্ভব হয় না। – এটা দুই বৃদ্ধ দম্পতির মনের কথা। ভেঙ্কটবাবু ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা হাত দিয়ে ভাতে তরকারী ‘সাম্বার ডাল’ এবং তার সাথে দই মেখে বেশ সপ সপ করে মুখে আওয়াজ করে খেয়ে তৃপ্তি পান। এর মধ্যে তো লজ্জার কিছু নেই। এইভাবেই তাঁরা ছোট থেকে তেঁতুল বা নারকেলের চাটনি খেতে শিখেছেন, এতেই তাঁদের পেট ও মন ভরে। কিন্তু কমলেশ-এর মা বাবা সব সময় চামচ দিয়ে ভাতের ওপর একটু চাপ চাপ রাজমা, চানা বা ছাল শুদ্ধ মুগ / মুসুরের ডাল ছড়িয়ে খেতে ভালোবাসেন। তাঁদের যে কোন তরকারী সে ভিন্ডি(ঢেঁড়স) বা তরী(ঝিঙে) বা ঘিয়া(লাউ) হোক না কেন, বেশ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটো, লঙ্কা বা গরম মসলা দিয়ে রেঁধে খেতে তাঁরা অভ্যস্ত। করলার ভরুয়া কিংবা আরবিকেও (কচু) তাঁরা বেশ চটপটি বানাতে পারেন। তার সাথে স্যালাড বা রায়তা’তে বেশ শশা, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা দেওয়া  চাই। দুই ভদ্রমহিলাই ভাল রাঁধুনি ছিলেন নিজের নিজের পরিবারে। সুগৃহিনী রূপে নাম কামিয়েছেন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। তাঁরা বাইরে কাজ করতে যাননি, রান্নার লোক রাখেননি, নিজেরা খুব যত্ন সহকারে সংসারের খুঁটিনাটি সব জিনিষ সাজিয়েছেন, নিজেরাই মসলা পিশে, সব্জি কেটে, ধুয়ে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে ঘরের কাজ সম্পন্ন করতেন। তাই এখানে বিদেশী মেয়েদের হাতের রান্না তাদের মুখে রোচে না। দুজনেই এখন রান্না ঘরে ঢুকতে বা রান্নার তদারকিতে ব্যস্ত থাকতে চান। কিন্তু তাঁদের মেয়ে ও ছেলে মায়েদের সাবধান করে দিয়েছেন, – এখানে অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের সরকার ভীষণ কড়াকড়ি ভাবে নজর রাখে কাজের লোকেদের ও মালিকদের ওপর।

দেশে যেমন কাজের লোককে তুই বলে সম্বোধন করা যায়, বা যখন যেমন তখন তেমন ভাবে কাজ নেওয়া হয় – এখানে সে সব একেবারেই চলবে না। রোজ মাছ, মাংস, ডিম, নুডুলস, ভাত ওদের নিজেদের মুখের স্বাদের মতন বানিয়ে, যাতে ওরা খায়, সেদিকে ও খেয়াল রাখতে হবে। দুই মায়েরই এ ব্যাপারে এক মত, যে “তোমরা এদের বড্ডো বেশি প্রশ্রয় দাও।” বৌমা ছেলে খুব হাসে। – বলে ‘না হলে এখানে ফাইন লেগে যাবে। কোন একটা অভিযোগ পেলে আমরা প্রবলেমে পড়ে যাব। ঝি চাকরদের জ্বালাতন করলে শাস্তিও পেতে হয়, ওদের ত্রুটি সরকার বা ওদের ‘এজেন্সি’ একেবারে বরদাস্ত করবে না। সে রকম অভিযোগ গেলে আমাদেরকে চাকরিও খোয়াতে হতে পারে। অতএব দেশের মতন কথায় কথায় ‘ঝি-চাকরদের’ বকা ঝকা করা, দোষ দেওয়ার অভ্যাস এখানে ছাড়তে হবে। সুতরাং মায়েদের মুখে কুলুপ পড়ে গেছে। বাবারাও বেশিরভাগ সময় খেলা বা রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় সময় কাটান, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে ভেঙ্কটবাবু ভীষণ রকমের মোদী ভক্ত, হিন্দুত্ববাদকে প্রাধান্য দেন, কিন্তু কাপুর সাহেব ঠিক তার উল্টো কথা বলেন। ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে তিনি একটু বেশি সোচ্চার। পুজোপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ এসব তাঁর ধাতে পোষায় না। মেয়ে পড়াশুনোয় খুব ভাল ছিল। ইংরেজি স্কুলে পড়াশুনো করায়, পাঞ্জাবী ভাষায় কথা বলে না, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রেমালাপ বা কলহ সবই চলে তাদের ইংরেজিতে। তাই শুধু নিজের মায়ের সঙ্গেই মাতৃভাষায় কথা বলে।

কোভিড ১৯ মহামারী তাদের চারজনকে সোনার খাঁচায় সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে রাখলেও কিন্তু তাঁরা ডানা ভাঙা পাখীদের মতন ডানা ঝাপটাতে লাগলেন। দেশের জমি, বাড়ি, ঘর, টাকাপয়সা, গয়নাগাটি ও আত্মীয়দের ভালোবাসার আকর্ষণটা তাদের দিনে দিনে তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হতে লাগল।

ছেলে ‘রঙ্গনাথ’ ও মেয়ে ‘কমলেশ’ ধীরে ধীরে বিরক্ত হতে আরম্ভ করল। বাড়িতে সারাদিন বসে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়, তাদের ফোনের পর ফোন কল আসে, ঘরে চারজন বুড়ো বুড়ি ঘুরে বেড়ান, কেউ জোরে কাশেন তো কেউ তার চেয়েও জোরে হাঁচেন। কেউ যখন তখন ধুম্রপানের সঙ্গে ড্রয়িং রুমে টিভির সামনে বসে ফুল স্পীডে খবর শুনতে ভালোবাসেন তো কেউ ফোনে Youtube এ গীতাপাঠ chanting শোনেন।

যে যার নিজের ভাষায় নিজেদের মধ্যে দেশে ফিরতে না পাড়ার জন্যে বা কখনও কখনও আত্মীয়দের মৃত্যু সংবাদে উতলা হয়ে জোরে জোরে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগেন। দুই দম্পতির মধ্যে সেই আগের মতন বন্ধুত্ব বা ভদ্রতা রক্ষার বালাই নেই।

ভেঙ্কটবাবুর স্ত্রী বিনীতা বৌমার মায়ের ব্যাপারে নিজেদের ভাষায় নিন্দা, টিপ্পনী করেন। ওনার আমিষ খাওয়া, জামাই মেয়ের সঙ্গে বসে বিয়ার বা ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দেওয়া, ওড়নি (চুনরি) গায়ে না দেওয়া, জোরে জোরে হাঁসা বা কথা বলা, এসব  কিছুই পছন্দ করেন না তাঁরা।  ওদিকে কাপুর সাহেব আবার ভেঙ্কটবাবুর খাটো করে ধুতি পরা, রোজ রোজ দুবেলা ভাত খাওয়া, পুজো পাঠে সময় কাটানো নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হাসি মজাক করতে ছাড়েন না। বয়স্ক লোকেদের এই judgmental হওয়া, অন্যের দোষ দেখা, নিজের নিজের ট্রেডিশন, ধর্ম ও অভ্যাসগুলোকে ভালো, ও অন্যদেরটি খারাপ ভাবার অভ্যেস কেউই ছাড়তে পারেন না। একটা ‘ইগো’ দিয়ে ঢাকা মেঘের আচ্ছাদনে, আবরণে থাকাটাকে শ্রেয় বলে মনে করেন। তাঁদের ছেলে মেয়েরা আলাদা ভাবে নিজের নিজের মা বাবাকে বোঝাতে থাকেন, কেন তোমরা চারজনে একসঙ্গে বসে তাস কিংবা ক্যারামবোর্ড খেল না। একদিন নর্থ ইন্ডিয়ান ও একদিন সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খাও, তাহলে ওই কাজের ফিলিপিন মেয়েটার কাজ হালকা হয়ে যাবে। না দুই মা-ই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উঠবেন, নাস্তা বানাবেন, রান্না করবেন আলাদা আলাদা বাসন ব্যবহার করে। . . . .

হটাৎ একদিন বিনীতা দেবীর পেটে অসম্ভব যন্ত্রনা শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার দেখলেন নানা টেস্ট হল, জানা গেল,’ক্যান্সার’। আগেও তাঁর ব্রেস্ট ক্যানসারের অপারেশন হয়েছিল, বোঝা গেল পুরোনো রোগের বীজ পেটেও ছড়িয়ে গেছে। অনেক খরচ করে কেমো দিয়ে সেবা যত্নের ত্রুটি না হওয়া সত্বেও ছয় মাসের বেশী বাঁচানো গেল না তাঁকে। স্বামী ভেঙ্কটেশ বাবুর  মনে যতই কষ্ট হোক, একটা সান্ত্বনা রইল যে, তিনিও তার স্ত্রীকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই করেছেন। ছেলের ও বৌমার সেবা তো অতুলনীয়। দেশে থাকলে হয়ত কোভিড হয়ে বিনা চিকিৎসায় বিনীতা মারা যেতেন। ভেঙ্কটবাবু অসহায় হয়ে একা কি করতেন সেখানে? ভেবে পান না। এখানে মায়ের দাহ ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম ছেলে নিজের হাতে সম্পন্ন করতেও সক্ষম হল। হিন্দু ধর্মের এইসব নিয়মকানুন মা খুব মানতেন, তাই তামিলভাষী পুরোহিত, মন্দির ও সমুদ্রের মাঝে সরকার নির্দেশিত এক বিশেষ দ্বীপে গিয়ে মায়ের ভস্ম‌ বিসর্জন করে সে ও তার বাবা ভেঙ্কটবাবু খুব শান্তি পেলেন। এখন দুই বৃদ্ধই চুপচাপ গুমসুম হয়ে থাকেন। ভেঙ্কটবাবু স্ত্রীর শোকে এবং কাপুর সাহেব দেশের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে, নিজের জমির গম বিক্রির চিন্তায়। বহু কষ্টে তিনি ঐ ফলের বাগান, চাষের জমি, কাপাস তুলোর ক্ষেতগুলি একটি একটি করে কিনেছিলেন। এখন বিহার থেকে আগত সব শ্রমিকরা সে সব ছেড়ে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছেন। প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে রোজ কোন না কোন অসুখের খবর শুনতে শুনতে তিনিও যেন কেমন বোবা হয়ে গেছেন। সামনে বেয়ানের ঐ ক্যান্সারের পেছনে তাঁর মেয়ে ও জামাইয়ের প্রায় ৭০/৮০ লক্ষ টাকা খরচ হতে দেখে আরও ঘাবড়ে গেছেন। এখানে মেডিক্যালের জন্য খরচ করতে গিয়ে লোকে ফতুর হয়ে যায়। যাঁরা এখানের নাগরিক তাদের সব বিনামূল্যে হয়। কিন্তু তারা Long Term Visa নিয়ে বেড়াতে বা সন্তানের বাড়ি থাকবার ছাড়পত্র পেয়েছেন, তাঁদের সব ব্যায় ভার নিজেদেরই বহন করতে হয়। আমাদের দেশের মতন এখানে অলিতে গলিতে ডাক্তার বসে না। ‘প্যাথলজির’ জন্যে ওখানে বহু সরকারী বেসরকারী ল্যাব পাওয়া যায়। এখন আবার ওনাদের যদি কিছু হয় তো কি হবে? কেউ এবারে কোন ইন্সুরেন্স (বীমা) করে আসতেও পারেননি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য আসার ইচ্ছে ছিল তাঁদের।

ক’দিন আগে পর্যন্ত বেয়াই ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে তর্ক করে বেশ আনন্দ উপভোগ করতেন, মিঃ কাপুর এখন স্ত্রী হারা শোকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষটিকে দেখলে বড় মায়া লাগছে তাঁর। খালি মনে হচ্ছে এই ‘কোভিড’ এর প্রকোপ কবে কাটবে এবং তারা দেশে ফিরতে পারবেন। একটা অচেনা ভয়-ভাবনা-বিষন্নতা তাঁকে পেয়ে বসেছে। যদি তাঁর স্ত্রীও এমনি করে হটাৎ চলে যান, তাহলে কে তাঁকে দেখবে? পত্নী তাঁকে সারাজীবন হাতে হাতে সব এগিয়ে দেন, সুস্বাদু রান্না করে খাওয়ান, গরমের সময় বিয়ার এনে দেন, রাত্রে ডিনারের পরে নিজেদের বারান্দায় বেডরুমে বসে তাঁরা ওয়াইন পান করেন দুজনে মিলে, ভেঙ্কটবাবুর মতন মন্ত্র বলা পুজো পাঠে মন লাগানো তাঁর পক্ষে তো সম্ভব নয় – এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁর ঘুম হয় না। বুকে ব্যাথা করে। ঠিক এসময়েই দিল্লী থেকে তাঁর ছোট ভাইয়ের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার খবর এল। এই ভাইকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন, ইনি তাঁর গ্রামে মাঝে মাঝে যেতেন, অমৃতসরের জমিজমার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাই কাপুর সাহেব কিছুটা নিশ্চিন্তেও ছিলেন, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় কোনো হাসপাতালে যেতে না পারায় ঘরের কোনে একা নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হল। তাঁর স্ত্রীও তখন পাঞ্জাবের গ্রামের বাড়িতে, অতএব পাড়ার লোক ও ডেলিভারি বয়, ফল, সব্জি দিতে এসে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। তারা ফোন দেখে গ্রামের লোককে খোঁজ করে। এখানে খবর দেয়। দিল্লীর গুরুদ্বারে খবর ফোন করে ঠিকানা দিলে তারা গিয়ে শব নিয়ে আসে। কোনো শ্বশ্মানেও তখন জায়গা খালি নেই, গুরুদ্বারের পার্কিংএ অচেনা অজানা লোকেরা তাঁকে পোড়াবার ব্যবস্থা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভীষণ শোকাহত হয়ে পড়েন কমলেশ এর বাবা মি. কাপুর। কখনও স্ত্রী কিরণ অথবা মেয়ে কমলেশ এর কোলে মুখ রেখে শিশুর মতন ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে থাকেন। তাঁকে এমনভাবে ভেঙে পড়তে বা বিচলিত হতে জীবনে কেউ দেখেনি। রাত্রে ভয় পান বলেন, এবার তোমার পালা ‘কিরণ’, তুমিও রঙ্গনাথের মায়ের মতন ছেড়ে যাবে আমায়। এই বিদেশ বিভুঁয়ে আমি একা কেমন করে থাকবো। স্ত্রী অনেক বোঝান, মেয়ে বলে, ইন্ডিয়ার অবস্থা একটু ভালো হলেই তোমায় ‘বন্দে ভারত’ প্লেনে পাঠিয়ে দেব। এখন ওখানে গিয়ে তোমাদের একজনের কিছু ঘটলে কে সামলাবে, অন্যজনও অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। দেখলে তো চাচাজীর কি অবস্থা হল, আমি এই অবস্থায় কিছুতেই পাঠাতে পারবো না।

বাড়ির পরিবেশটা ক্রমশঃ নৈরাশ্যজনক শোচনীয় হয়ে উঠলো, – এবার জামাই রঙ্গনাথও বিরক্ত হয়ে উঠলেন। একে তো তার মায়ের শোক, তার ওপর এই কান্নাকাটি, বাচ্চার মতন শ্বশুর কে বোঝানো, প্রায়ই সে বেরিয়ে যেত বাইক (সাইকেল) নিয়ে। এখানে নদী সমুদ্রের ধার দিয়ে সুন্দর সাইকেল ট্র্যাক (পথ) বানানো আছে। সারারাত ছেলে মেয়েরা সেখানে দলে দলে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের নিরাপত্তার যেমন ভয় নেই, তেমনি ভয় নেই চোর ছ্যাচড় বা ছিনতাইকারীর উৎপাত। সরকারের শাস্তি, নিয়মকানুন এতো কড়া, যে কারো কোন অপকর্ম করতে সাহসও হয় না। তারমধ্যেও যদি কেউ বাসে ট্রেনে কাউকে একা পেয়ে বিরক্ত করে, সঙ্গে সঙ্গে ধরে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেত্রাঘাতের সঙ্গে কারাবাস। রাস্তায় একটু নোংরা করা, থুতু ফেলা বা মাস্ক না পরার জন্যে, হোটেলের ঘরে কিংবা জাহাজের ‘ক্রুসে’ বসে একসঙ্গে আড্ডা মারলেও অনেক ডলার ফাইন দিতে হয়।

তাই সারাদিন Work Form Home করে রাত্রে রোদের তাপ কমলে সবাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বুড়ো-বুড়িরাও একা একা হেঁটে চলেন, আপনমনে। সেদিনও বিকেল বেলায় মিস্টার ও মিসেস কাপুর বেড়াতে বেড়িয়েছেন। কিরণ ভারী শরীর ও হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে বেশী হাঁটতে পারেন না। বাগানের বেঞ্চে বসে পড়লেন তিনি, সূর্যাস্তের সোনালী আলোয় নদীর জলও ঝলমল করছে। কাপুর সাহেব বললেন, আমি আগে ব্যারাজ পর্যন্ত হেঁটে আসছি, তুমি এখানেই বসো, সাতটা পর্যন্ত ফিরে একসঙ্গে বাড়ি যাব। কিন্তু ৭টা থেকে ৮টা/৯টা হয়ে গেলেও তাঁর দেখা নেই। স্ত্রী কিরণ বাড়ি ফিরে এলেন, যদি তিনি আগেই অন্য কোন দিক দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কিন্তু না, ১০টার পর মেয়ে ও জামাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মেরিনা ব্যারেজের দিকে। আর বেঙ্কটবাবু সুইমিং পুলের পাশে বসে থাকা যত ইন্ডিয়ান বৃদ্ধদের পেলেন, সবাইকে জিজ্ঞেস করে বেড়াতে লাগলেন, কেউ মিস্টার কাপুরকে দেখেছেন কিনা। হটাৎ একজন চৌকিদার এসে খবর দিলেন, পুলিশের গাড়ি ও একটা এম্বুলেন্স আসতে দেখেছেন তাঁরা ঐ রাস্তায়।

কিছুক্ষন পরে জানা গেল কমলেশের বাবা মিস্টার কাপুর হটাৎ হার্ট অ্যাটাক করে রাস্তায় পড়ে ছিলেন, পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায় – কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি তারা। কারণ ফোনটিও সঙ্গে  নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছেন তিনি। কারোর সঙ্গে শেষ দেখাও তাঁর আর হল না। স্ত্রী চলে যাওয়ার আতঙ্কে থাকতে থাকতে সুস্থ সবল মানুষটি নিজেই এরকমভাবে হটাৎ চলে যাবেন, – এ কথা কেউ ভাবতেও পারেনি। এই আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বাড়িটা শোকে দুঃখে একেবারে শোকাচ্ছন্ন হয়ে রইল। কয়েক মাসের মধ্যে ছেলেটি মা কে এবং মেয়েটি বাবাকে হারিয়ে ভাষাহারা নির্বাক মূর্ত্তি হয়ে বসে রইল। কাজ কিন্তু তাদের বন্ধ রাখা চলবে না।

এই মহামারী এখন সারা বিশ্বকে শিখিয়েছে, বিষাদ ভাবনা ভুলে কিভাবে বিপদের মধ্যেও স্থির হয়ে কাজ করে যেতে হয়। Work form home, online dealing, বিদেশী কোম্পানির ব্যাঙ্কে বা আমদানি রপ্তানির কেনা বেচার কাজ তো বন্ধ থাকবে না। এই দেশটার তো নিজের কোনো ক্ষেত বা জমি, চাষ আবাদ নেই, খাদ্য বস্তু – আনাজ, সব্জি ও ফল সবই আসে, যায় অন্য অন্য দেশ থেকে, তাই পণ্যবাহী জাহাজের আসা যাওয়া বন্ধ নেই। সুতরাং অনলাইন-এ সব বাণিজ্য টাকার লেন/দেন সবই চলতে থাকে।

যাঁরা ‘ম্যানেজার’ বা অফিসের ও জাহাজের কর্মী তাঁরা দিনরাত বাড়িতে বসেই কম্পিউটারে কাজ করে যান। তাই রঙ্গনাথ ও কমলেশ আবার ব্যস্ত হয়ে যেতে বাধ্য হলেন। শুধু ভেঙ্কট ও কিরণ দূরত্ব বজায় রেখে কোনোরকমে দিন কাটাতে লাগলেন। একই ব্যাথার ব্যাথী হয়ে জীবনসঙ্গী হারানোর দুর্দমনীয় কষ্ট বুকে চেপে – দুই দিকে দুই দেওয়ালে মুখ ঘুরিয়ে তাঁদের দিন কাটছে, এমন সময় জানা গেল, এই বড় প্রশস্ত এপার্টমেন্টটি ছাড়তে হবে তাঁদের। বাড়িওয়ালা ইন্দোনেশিয়ান বড় ট্যুরিস্ট গেস্ট হাউসের মালিক কিন্তু কোভিড-এ তাদের ওই ট্যুরিজিমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ভ্রমণ বিলাসীদের থেকে তাদের রমরমা ছিল। এখন এক বছর ধরে সব বন্ধ, কেউ আর কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন না। বর্ডারও সীল করে দেওয়া হয়েছে। তাই সিঙ্গাপুরের সিটিজেনরা সব দলে দলে চলে আসছেন বালি বা কম্বোডিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড থেকে। রঙ্গনাথ বহু চেষ্টা করেও কোথাও একটি বড় এপার্টমেন্ট জোগাড় করতে পারলেন না। শেষে ছোট ছোট দুটি ফ্ল্যাট পাওয়া গেল। কাজেই ভেঙ্কটবাবু ও কিরণ দেবী বাধ্য হলেন, এক সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে আস্তানা বাঁধতে। খুবই অসুবিধা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়লেন দুজনে।

ঠিক এইসময়ে তাঁদের নাতি রাঘবের আবার আবির্ভাব হল সিঙ্গাপুরে। সরকার একবছরের ট্রেনিং এর পর তাদের ফিরিয়ে এনেছে ১৪ দিন করেন্টাইনে থাকার পর সব পাইলট ট্রেনি ছেলেদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। তারপর তারা বাড়ি এসে দেখা করতে ও বাবা মায়ের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে আবার এয়ারফোর্স হোস্টেলে ফিরে যাবে। দূর থেকে সে সব খবরই পেয়েছে, মন খারাপও হয়েছে ক’দিন, কিন্তু আকাশে ওড়ার আনন্দ, পড়াশোনা ও নানা ব্যায়াম, খেলা ধুলায় ও শরীর চর্চার মধ্যে থাকে বলে মনটিকেও তার হালকা ঝরঝরে, বিষাদমুক্ত, নৈরাশ্যশূন্য আনন্দময় রাখতে হয়। গোটা বিশ্ব জগতের সব সম্প্রদায় বা বয়সের মানুষ গৃহবন্দী হয়ে এখন হতাশায় ভুগছেন। কিন্তু তাঁদের সবসময় শেখানো হচ্ছে যে পজেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গী নিয়ে চলতে হবে। জীবনের স্রোত তো থেমে থাকবে না। তাই এখানে দুই অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধার কাছে সে নতুন যুগের নতুন বার্তা বহন করে নিয়ে এল।

এ যুগের ছেলে মেয়েরা এত সুন্দর সহজ, কুসংস্কার মুক্ত, উদার যে তাদের সঙ্গ অদ্ভুত আলোড়ন তোলে, আগের জেনারেশন এর মানুষের মনে। তারা কোনও বাঁধা নিষেধ মানতে রাজী নয়। আবার জাত – পাত – ভাষা – ধর্ম – বর্ণ নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের সংকীর্ণ পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে অবিহিত করে। নিজেদের আবেগ ইচ্ছে ও পছন্দকে প্রাধান্য দেয় সবসময়। অন্যেরা কে কি ভাবছে বা ভাববে – সেই নিয়ে কখনও মাথা ঘামায় না। যে প্রফেশন অর্থাৎ জীবিকায় যেতে তাদের আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে, সেটি ছোট থেকেই ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং সেই interest ও skill নিয়ে আগে চলতে চায়, যে কোন ঘরে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে রুমমেট হয়ে থাকে। আলাদা আলাদা সময়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিজেদের খাবার বানায়, নিজের রুচি, ইচ্ছে অনুযায়ী এবং যা হাতের কাছে পেয়ে যায় তার ওপর নির্ভর করে। কেউ সিঙ্গাপুরের, কেউ কানাডা বা নিউজিল্যান্ড, হংকং বা ফ্রান্স – জার্মানির বাসিন্দা। এই সহ অবস্থানে তাদের কোন সমস্যাও হয় না, কেউ কারুর ব্যাপারে কখনও নাক গলায় না কিম্বা মন্তব্য – সমালোচনা বা কটূক্তিও করে না।

এই শিক্ষাই সে আজ দিতে চাইলো এই ভিন্ন মতাবিলম্বী ভিন্ন ধরণের খাওয়া পরায় অভ্যস্থ, দুই বৃদ্ধ দম্পতিকে। ছোট থেকেই সে প্রত্যেক বছর স্কুল ছুটি হলে মায়ের সঙ্গে পাঞ্জাবে ও বাবার সঙ্গে মাদ্রাজের গ্রামে গিয়ে খুব আনন্দে কাটিয়েছে। দুদিকের ‘কাজিন’ ভাই বোনেদের সবাই এখন হিন্দি সিনেমা দেখে মোটামুটি হিন্দি বোঝে ও বলে, ইংরেজি তো সবাই ভালোই জানে, তাই তাদের অসুবিধে হয় না। দুই দাদুই তার সাথে খুব খেলাধুলা করেছেন, তাঁদের জমি, বাগানে বেড়াতে, ট্রাক্টর চালাতে, মাছ ধরতে নিয়ে গেছেন। তার দুই দিদা’ (বা তাতা/ঠাকুমা/নানী) তাকে কতরকমের আচার, মিষ্টি ও রান্নায় মুখের স্বাদ বদলাতে ব্যস্ত থাকতেন।

পৃথক পৃথকভাবে তাঁরা দুজনেই খুব ভালো, সৎ, আদর্শবাদী, ট্রেডিশন বজায় রেখে জীবন কাটিয়েছেন, এবং দুই দম্পতিই ভীষণ স্নেহপ্রবণ – এটাই হয়তো grand parentsদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ। নাতির জন্য তাঁরা সবকিছু দিয়ে দিতে প্রস্তুত সবসময়। নিজেদের ছেলেমেয়েদের ব্যবহারে হয়ত ক্ষুন্ন হন, মান অভিমানের পালা চলে তাদের মধ্যে, কারন পিতা পুত্র বা মাতা কন্যার কাছে একটা expectation একটা চাওয়া/পাওয়া আশা আকাঙ্খার কথা থাকে। কিন্তু নাতির সঙ্গে অন্য সম্পর্ক, তার জন্য আলাদা এক জায়গা সৃষ্টি হয়েছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মনে।

তাই ‘রাঘব’ সিঙ্গাপুরে এসে তার বাবা মা কে জানালো – সে ঐ নানী – দাদার এপার্টমেন্ট-এ থাকবে ক’টা দিন। খাওয়া দাওয়া সবাই মিলে একসঙ্গে করবে, নতুন নতুন দেশের ডিশ বানিয়ে। ওদের ওই বিষন্ন – গুমোট – হতাশাব্যাঞ্জক ঘরের পরিবেশটি তাকে বদলে দিয়ে যেতেই হবে। এ জন্য সে একটা প্রজেক্ট প্ল্যানও বানিয়ে ফেলল।

প্রথমে জানতে চেষ্টা করলো – কি কি বিষয়ে দাদু ও নানীর মিল আছে। দেখলো দুজনেই বসে একা একা সময় কাটান তাসের কার্ড নিয়ে। কারন, দুজনেই অল্প বয়সে তাস খেলা জানতেন। তারপর তাঁরা দুজনই বাগান করতে, বেড়াতে ভালোবাসেন, রাঘব এবার নিজের এক বন্ধুকে নিয়ে এল একদিন সবাই মিলে তাসের ম্যাজিক দেখাতে। ভালো সিনেমা দেখার জন্য  NETFLIX ,আমাজন লাগিয়ে দিল। দুজনকেই YouTube এ নানান অনুষ্ঠান, গান, নাটক ও আলোচনা শুনতে উৎসাহ দিল। দুজনের জন্যই ভাল দুটো ‘আই প্যাড’ এবং কানে লাগিয়ে শোনবার জন্য  কিনে নিয়ে এল ‘এয়ার ফোন’। তাতে অনেকটা সময় সকাল সন্ধ্যে তারা নিজের নিজের ভাষায় spiritual আলোচনা শুনতে শিখলেন। কিরণ কাপুর ৬৫ বছর বয়সে আবার পাকিস্তানী নাটক ও গুরুদ্বারের বানী,/প্রবচণ ও ‘শবদ-কীর্তণ’ শুনতে লাগলেন, মন দিয়ে। ‘ভেঙ্কটবাবু’ গীতা chanting করতে লাগলেন, তামিল ভাষায় তার অর্থ অনুধাবনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। মাঝে মাঝে ট্যাক্সি ডেকে নাতি তাঁদের নানা Indian Temple ও গুরুদ্বারা ঘোরালো। এরপর রাঘবের এক বাঙালি বান্ধবীর মা বাবার সঙ্গে ভেঙ্কট ও কিরণকে একদিন সে নিয়ে গেল ”রামকৃষ্ণ মিশনে।”

সিঙ্গাপুরে এমন একটি সুন্দর প্রার্থনার কেন্দ্র আছে, যেখানে তামিল, হিন্দি ও ইংরেজীতে এতো সুন্দর করে শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রীশ্রী মা ও বিবেকানন্দের কথা আলোচনা হয়, তাঁদের সম্বন্ধে লেখা বই পাওয়া যায়, ভজন, আরতি এবং একাদশীর দিনে রাম নাম সঙ্কীর্তণ শোনা যায় – কথামৃতের বাণী আলোচনা হয় – তা তাঁদের জানা ছিল না। এইসব পেয়ে মনের জানালাগুলো যেন খুলে যেতে লাগল, দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার। একই বাড়িতে রুমমেটের মতন নতুন ভাবে থাকার এক অন্য অধ্যায় শুরু হল, তাঁদের জীবনে। দুই ডানা ভাঙা পাখী খাঁচা খুলে বাইরে এলো। ক’দিন পরেই নাতি চলে গেল, দুজনের জীবনে অদ্ভুৎ এক ‘ধামাকা’, করে, যেন তাঁদের হৃদয় মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়ে আবার কানাডায় তার ট্রেনিংয়ে।

এদিকে উড়তে না পারলেও দাঁড়ে বসে তারা যেন পোষা তোতার মতন আপন আপন জগতে সুখে জীবন কাটানোর পদ্ধতিটা একটু একটু শিখতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ‘রাঘবের’ বাঙালি বান্ধবীর বাবা রোজ এসে ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে morning walk এবং evening walk এ যান। মাও কিরণ কাপুর আর পাঁচজন প্রায় সমবয়সী বন্ধু মহিলার সঙ্গে বাগানে বেড়াতে যান। দেশে কখনও একসঙ্গে মনিটর লিজার্ড বা গোসাপ, কচ্ছপ, বন্য মোরগ ঘুরে বেড়াতে দেখেননি। অটার্স বা ভোঁদড়ের মতন প্রাণী যে নির্ভয়ে সমুদ্র নদী থেকে বেরিয়ে বাগানের বৃষ্টির জলে ভরা পদ্ম পুকুরে লাফায় – ঝাপায়, সাঁতার কাটে কচ্ছপদের সঙ্গে, আগে কখনও জানতেনও না। গাছের তলায় অজস্র আমলকী, কুল, কামরাঙ্গা ও তাল পড়ে থাকে, অনেক মহিলা কুড়িয়ে নিয়ে যান। পাঞ্জাবের গ্রামে এসব গাছ বা ফলের স্বাদ তিনি কখনও পাননি। তাই প্রকৃতির মাঝে যেন এক কিশোরী বালিকা হয়ে গেছেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে একই দিনে চাররকমের ঋতুর লীলা চলে। সকালে ঠিক বসন্ত কালের মতন কোকিল ডাকে তো বিকেলে বর্ষায় ব্যাঙের গান শোনা যায়। দুপুরে একটু গরম, রাত্রে একটু ঠান্ডা হাওয়া বয়। তাদের ঐ পাঞ্জাবের মতন extreme climate অত্যন্ত অসহ্য লু’চলা গরম বা হাঁড় কাঁপানো শীতের উগ্রতা বা তীব্রতাও নেই এখানে। আস্তে আস্তে জায়গাটা ভালও লাগতে আরম্ভ হল ঐ পাঞ্জাবের মায়ের।

কোভিড ১৯ এর আরম্ভে জীবন যতটা অসহনীয় বোঝা হয়ে উঠেছিল, এখন আর তা মনে হয় না। ভেঙ্কটের সঙ্গে বেয়াই /বেয়ান সম্পর্কের বাঁধনটা আলগা হয়ে যাচ্ছে। আকাশের ভাসমান কালো সাদা মেঘের মতন তাঁরাও দুই বন্ধু  ভাসতে ভাসতে মোহনার দিকে ধীরে ধীরে ক্রমশঃ এগিয়ে চলতে লাগলেন নতুন খেয়া বেয়ে।

একদিন মিসেস কিরণ কাপুর east coast এ ভোর বেলায় বেড়াতে গিয়ে দেখলেন ষাট উর্ধের বয়স্ক মেয়েরা যোগ ব্যায়াম করছেন। সূর্যাস্তের আলোয় তাঁদের মুখ চুলে সোনালী রং ধরেছে। সমুদ্রের শীতল হাওয়ায় দেহ মন স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জলের স্রোতে পণ্যবাহী জাহাজগুলি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল,  তিনি তো মাত্র পঁয়ষট্টি, কত ৭৫/৮০ বছরের মহিলারা একসঙ্গে প্রাণায়াম ও ব্যায়াম করছেন, আগ্রহভরে তাঁকেও ঐ দলে যুক্ত হতে হবে। কাছে গিয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করতেই সাদরে আহ্বান জানালেন তাঁরা।

দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেল কিরণের। একটা নতুন ভালোলাগা ও উদ্যম জাগলো তাঁর মনে। এদিকে ঘরে তরুণ নাতি রাঘবের প্রাণচাঞ্চল্য তার সমস্ত হতাশা কাটিয়ে দিতে সাহায্য করল ভেঙ্কটেশ বাবুর। বৌমা কমলেশও খুশি হলেন তাঁদের পরিবর্তন দেখে।  ভেঙ্কটপ্রসাদ তাঁর ছেলের সাইকেলটি নিয়ে চালাতে চালাতে নদীর ধার দিয়ে বহুদূরে চলে যেতে যেতে এক মুক্তির স্বাদ পেতে থাকেন। প্রথম দিনেই নাতি তাঁকে সাবধান করেছিল, বিনা হেলমেটে সাইকেল না চালাতে, কিন্তু তিনি সেই কথাটি ভুলে যান। একদিন রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা একটি  বন্য মোরগ দেখে অণ্যমনস্ক হতেই পড়ে গেলেন, মাথায় চোট লাগল ভীষণ জোরে। কিছুক্ষন যেন বুঝতেই পারলেন না, কি হল, পড়ে উঠতে চেষ্টা করেও পারলেন না। পকেট থেকে ফোন বের করে একটি ছেলেকে মেলাতে দিলেন। প্রথমে ছেলে রঙ্গনাথকে ডাকতে চেষ্টা করলেন, অফিসের অন কল-এ সে এখন ব্যস্ত আছে। বৌমা কমলেশের ফোনটিও এই সময়ে Silent mode এ থাকে। সারা রাত সে আমেরিকার অফিসের সঙ্গে zoom এ মিটিং করে, তাই সকালে একটু ঘুমোয়। ডাকলে পাওয়া যাবে না। একটু সংকোচ হলেও ফোন করলেন বেয়ান কিরণ দেবীকে।

কিছুক্ষনের মধ্যে তিনি তাঁর যোগা / ব্যায়াম গ্রূপের লোক জন দের  নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলেন সেখানে। ততক্ষনে আরও অনেক সাইকেল আরোহী ও পথচারী তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে, পাশের ঘাসে শুইয়ে দিয়ে জল খাইয়ে কিছুটা সুস্থ করেছে। বাঁ চোখে ভীষণ ব্যাথা করছে তাঁর, চোখ খুলতেও পারছেন না। একজন তরুণ ছেলে রুমালটা তাঁর কপালে চেপে ধরে আছে, মনে হয় কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়েছে।

মেরিনা ব্যারাজ ও কালাং নদী ধরে সবসময় সরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা ব্যাটারি চালিত গাড়ি নিয়ে টহল দিতে থাকেন। পথচারীরা মাস্ক না পরলে সাবধান করেন, ছবি তুলে নেন। তাদের একটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, ভেঙ্কটবাবুর সামনে। পথচারী দের সাহায্য করা তাঁদের কাজ।

কিরণদেবী এসেই তাঁকে ঐ গাড়িতে তুলে নিলেন কয়েকজন যুবকের সাহায্যে তারপর ‘কালান- মলের’ প্রায় কাছাকাছি এসে সিকিউরিটির লোকেদের অনুরোধ করলেন এম্বুলেন্সকে খবর দিতে। মেয়ে বা জামাইকে বিরক্ত না করে তাঁকে প্রথমেই কোনো ডাক্তারখানায় – হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফার্স্টএইড দেওয়াটা বেশী প্রয়োজন মনে হল তাঁর। তিনি বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও স্মার্ট। পাঞ্জাবের জমিতে ট্র্যাক্টর ও চালিয়েছেন, নিজের বাগানে কোদাল দিয়ে মাটিও কুপিয়েছেন। শরীর ও তাঁর খুব পুষ্ট এবং মনের বল যে অন্যান্য ভারতীয় গৃহবধূর থেকে বেশী আজ এই সক্রিয় ভূমিকায় তাঁর প্রত্যুৎমন্নমতি ব্যবহারে সেটা প্রকাশ পেল। যন্ত্রনা কাতর অসহায় ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ভেঙ্কট বাবু আজ সেটা বুঝতে পারলেন। ঐ সিকুরিটি গার্ড তাঁর ছেলেকেও মেসেজ করে দিলেন এবং ওনাদের সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলেন। প্রথমেই তাঁরা কপালের কাটাটিতে স্টিচ করলো, কারণ রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। তারপরে চোখের ওপরেও একটা কালো পট্টি লাগিয়ে দিল টেপ দিয়ে, ডাক্তারবাবু সেখানেও হেমারেজ লক্ষ করেছেন। ডান হাত ও বাঁ পায়ের গোড়ালীতে ভীষণ ব্যাথা শুরু হয়েছে। কুনুইটি ফুলে উঠেছে, গলার সঙ্গে বেঁধে ডাক্তার বললেন, X-ray করাতে। কিরণদেবী ওনার সঙ্গে সঙ্গে চললেন। হুইল চেয়ারে করে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় তাঁকে নিয়ে এল, সেই X-ray ডিপার্টমেন্টে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তাঁকে, কিরণ ততক্ষনে পাশের ক্যান্টিন থেকে চা ও বিস্কুট এনে খাওয়ালেন, তাঁর বেয়াইকে। নিজেও একটা কেক ও কফি খেলেন। কেকে ডিম থাকায় ঐ নিরামিষী খেতে অভ্যস্থ ভেঙ্কটকে দিলেন না। আজ তিনি ঐ ভদ্রমহিলার উপস্থিত বুদ্ধি ও মমতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন দুর্ঘটনায় আহত বৃদ্ধ মানুষটি। কিছুক্ষন পরে রিপোর্ট এলে দেখা গেল কনুইয়ের হাঁড় সরে গেছে এবং পায়ের পাতার ঠিক গোড়ালীর কাছটায় লিগামেন্ট  ফেটে যাওয়ায় অত ব্যাথা হচ্ছে। হাতে প্লাস্টার চড়ল পায়ে একটা ব্যাথা কমানোর চওড়া টেপ লাগল। ততক্ষণে তাঁর ছেলে রঙ্গনাথও এসে গেল। একদিকে কোভিড-এর ভয়, অন্যদিকে এই দুর্ঘটনা, কয়েকমাসের মধ্যেই দুজন বাবা মায়ের মৃত্যু – সব যেন কেমন গোলমেলে করে দিল তাঁদের সবাইকার জীবন।

এদিকে কাজের মেয়েটি হটাৎ গভমেন্টের ‘MOM’ বিভাগ থেকে নোটিশ পেল তখুনি বাড়ি ছেড়ে গিয়ে সরকারী কোরেন্টাইনে সেন্টারে গিয়ে পৌঁছাতে, ১৪ দিন তাকে আলাদা থাকতে হবে। তিনবার কোভিড টেস্ট হবে। রবিবার সে যে migrated labourদের সাথে সময় কাটিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে। অতএব তার সংশ্রবে যারা যারা এসেছিল, তাদের চিহ্নিত করে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে এইসব কাজের লোকেদের ওপর খুব খেয়াল রাখে সরকারী দপ্তর। তাদের ওষুধ ইনজেকশন সময়মত দেওয়া হয়। ৬ মাস অন্তর pregnancy টেস্ট হয়। নজর রাখা হয়, তারা ছুটির দিন কোথায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইনস ও শ্রীলংকা থেকে এরা আসেন। মালিক কেমন ব্যবহার করেন, ফল, দুধ, মাছ, মাংস খেতে দেন কিনা, সেদিকেও সরকারী দপ্তর ও বিভিন্ন এজেন্সী খবর নেয়। এখন দু সপ্তাহ তার ছুটি ।সরকারী খরচে সরকারি  জায়গায় আরামেই থাকবে সে।

অতএব এখন রান্না-বান্না, ও ভেঙ্কটবাবুকে খাওয়ানো দেখাশোনা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন কমলেশের মা। ছেলে রঙ্গনাথ তাঁকে বাথরুম পায়খানা করানোর কাজটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সুষ্ঠ ভাবে করতে লাগল। মা হারানোর পর বাবাকে সে আরো বেশী করে ভালোবাসতে শিখলো। বৌমা কমলেশ তাঁকে রোজ স্পঞ্জ করে দেয়। তাঁর বিছানার চাদর ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, ভ্যাকুম করে ধুলো শূন্য করা বা সব্জি, ফল, দুধ, ব্রেড ইত্যাদি যাবতীয় সামগ্রী অর্ডার দেওয়া, সেগুলি এলে ভালোভাবে সোডার বা গরম জলে ধোয়া বাইরে রোদে দিয়ে তারপর ফ্রিজে তোলার কাজটিতে মন দিল। প্রত্যেকটি দ্রব্য সামগ্রীকে সে স্যানেটাইজ করে, যাতে কোন জীবাণু না থাকে তাতে। তার সেবা, নিষ্ঠা ভরে কাজ করা গোছানো এবং পুরো পরিবারের খুঁটিনাটি সব প্রয়োজন পূরণ করা – অর্গানাইজ করার দক্ষতা দেখে ভেঙ্কট, কিরণ এবং তার স্বামী রঙ্গনাথও ভীষণ অবাক হয়ে গেল।

ভীষণভাবে বিস্মিত হল তাদের প্রতিবেশী যারা একই এপার্টমেন্টে বাস করেন এবং এতদিন ঐ দক্ষিণ ভারত উত্তর ভারতের চার বৃদ্ধ – বৃদ্ধা, ছেলে, মেয়ে, নাতি – সকলের একসঙ্গে বাস করা নিয়ে তাঁরা সবাই আলোচনা করতেন, ও কৌতুক বোধ করতেন। একটা বিরাট ঢেউ বা ঝড়ের ধাক্কায় আজ যখন সকলে এক হয়ে আনন্দে একসাথে বসবাস করছেন, তখন বিস্ময়ে তাঁরা হতবাক হয়ে গেলেন।

কিরণ তাঁকে নিজের বড় ভাই মনে করছে, ছেলের বৌ একেবারে মেয়ে তথা কন্যারুপী নার্স হয়ে তাঁকে সবসময় এমন যত্নে রেখেছে, যেন তিনি বৃদ্ধ নন, একটি ছোট্ট শিশু। ছেলে যেভাবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে তার ডাইপার পাল্টাচ্ছে – মলমূত্র পরিষ্কার করছে – অবলীলাক্রমে তা তাঁকে এক স্বর্গীয় আনন্দধামে পৌঁছে দিয়েছে। কিরণ এখন টিভি দেখার সময় পান না, সব সময় তাঁকে গীতা chanting কিম্বা সদ্গুরুর ভাষণ শোনাবার জন্যে ল্যাপটপে ইউটউব চালিয়ে তাঁর কানে এয়ার ফোনটি লাগিয়ে দিয়ে যান। ঠিক সময়মত ওষুধ পত্র – জল – ফল সব খাওয়াতে থাকেন। ভেঙ্কটবাবুর মনে হয় অনেকদিন পরে তিনি যেন এদের মধ্যে দিয়ে নিজের শৈশবের সেই একান্নবর্তী পরিবারে মা, বাবা ও বোনের কাছে আবার ফিরে গেছেন।

একদিন মনে হল শুধু গীতা পড়ে – সাধুদের প্রবচন শুনে কি হবে – তা যদি নিজেদের জীবনে পরিবারের, প্রতিবেশী সমাজের আর পাঁচজন মানুষের জন্য কার্যকরী না করা যায়। Theory যুক্ত জ্ঞান গর্ভ বক্তৃতা বা পাঠ অধ্যয়ন ধর্ম পুস্তকের বিদ্যা অওড়ালে তো চলবে না প্রতিটি অধ্যায় জীবনের প্রত্যেক পর্বে সেই সব বক্তব্যকে Implement করলে তবেই তো স্বাক্ষরতা আসবে।

লকডাউন-এ দুর্ঘটনাতে ও মৃত্যশোকে তাঁর আজ এক নতুন বোধোদয় হ’ল। দেশে তাঁর যত বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা, সম্পত্তি আছে সব তিনি দূঃস্থ গরিব মানুষের সেবায় লাগাবেন, বিভিন্ন অনাথ আশ্রম হাসপাতাল, গ্রামের বিদ্যালয়ে দান করবেন ঠিক করলেন। কিরণ একদিন জানালেন তাঁর সব জমি জমা গরিব কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সু অভিপ্রায়ের কথা।

চোখ ভালও হয়ে গেল, কিন্তু পায়ের ব্যাথা তখনও কমেনি, হাতের প্লাস্টারটিও খোলা হয়নি, কিরণ মেয়েকে একটি হুইল চেয়ার অর্ডার করতে বললেন। অতি সাবধানে সেটিতে বসিয়ে রোজ সকালে বিকেলে ভেঙ্কটবাবুকে বাইরে নদীর ধারে, বাগানে ঠেলে ঠেলে বেড়াতে শুরু করলেন তিনি। ঠিক যেন দুই ভাই বোন। স্বর্গ থেকে বিনীতা দেবী ও মিস্টার দলবীর কাপুর তাঁদের হয়তো আশীর্বাদ পাঠালেন।

ছেলে রঙ্গনাথ ও মেয়ে কমলেশ শান্তিতে আনন্দিত মনে কাজে মন দেয়, Without pay ছুটি তো আর বেশী দিন দেবে না অফিস থেকে। প্রভাতে কোকিলের কুজন ও বিকেলে বৃষ্টির পরে ব্যাঙের গান শুনতে শুনতে তারা দুজন এগিয়ে চলেন ধীর পদক্ষেপে, আবার কখনও সমুদ্রের ধারে বসে রোমণ্থণ করেন, তাঁদের দীর্ঘ জীবনে সুখ দুঃখের কথা। অতীত আর ভবিষ্যতে র চিন্তা তাঁদের আর ভাবায় না , ‘বর্তমান’ সময় তাঁদের প্রকৃতির নতুন পরিবেশে  আজ এক জীবনের নতুন পাঠ পড়িয়েছে। সংগ্রাম ও দুঃখের আগুনে শুদ্ধ হয়ে তাই এই দুই ডানা ভাঙা পাখী এখন স্থিথপ্রজ্ঞ মানব হয়ে শান্ত সমাহিত ভাবে দিন কাটাতে লাগলেন।

একই পথের পথিক ( Ak e pother pothik )

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

মাঝে মাঝেই সাইক্লোন, ঝড়, টর্নেডো আসে উড়িষ্যায় ও পূর্ব মেদিনীপুরের এই সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে। ভীষণ তান্ডবলীলায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় গ্রামগুলোকে। এইখানেই ১৯৮০ সালে জন্ম হয় অর্ণবের। কাজুবাদামের বাগান, সারি সারি নারিকেল গাছ, মাটি দিয়ে সুন্দর করে নিকোনো উঠোনে একদিকে মাদুর পাতা। তার ওপরে বড় বড় পরাতে ‘গহনা বড়ির’ সমারোহ। ভারী সুন্দর তার রূপ। আর একদিকে শীতল পাটি মাদুর তৈরির জন্যে বেশ খানিক জায়গা বরাদ্দ। বৃষ্টি না হলে সবই ঠিকঠাক চলে। আমদানি, কেনাবেচাও বেশ ভাল হয়। অন্যদিকের নিচু জমিতে নানান সব্জি লাগানো, পুকুরে টলটলে জল ও মিষ্টি মাছের চাষ। বেশ সমৃদ্ধ সচ্ছল আনন্দময় পরিবার।

কিন্তু এই ঝড়গুলো এসে সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়, সাধারন গ্রামবাসীদের। সাগরের জল ঢুকে নদী-নালা, পুকুর-জমি সব একাকার হয়ে যায়। মরে যায় কত শত মাছ, ‘গহনা বড়ি’ গুলোতে সূর্য্যের আলো না পেয়ে ছাতা ধরে যায়। মাদুর তৈরী বন্ধ থাকে।

অর্ণবের বাবা “প্রফুল্লবাবু” এইসময় কিন্তু চুপ করে বসে থাকেন না। প্রত্যেকবারই কোমর বেঁধে লেগে পড়েন “ত্রান কার্য্যে”। তাঁদের বাড়ির দোতলায় ,ছাদে আশ্রয় নেয় কত গৃহহারা অসহায় মানুষ।

গ্রামের মেয়েদের নিয়ে মা বানাতে থাকেন, হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি। সারা বছরের যত্নে তুলে রাখা মুড়ির মোয়া, সিঁড়ির অর্থাৎ ঝুড়ি বেসনের লাড্ডু কিম্বা নারকেল নাড়ু কাজুর গুড়ে মাখা তক্তি – সব বের করে অভুক্ত ভীত আতঙ্কিত বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন। বড় বড় কাঁচের জারে নানান মসলায় জারিত আচার বা আমসত্ত্ব, আমসি, তেঁতুল দিয়ে এক এক দিন চাটনিও বানিয়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র কৃপণতা বা দ্বিধা করেন না।

আসে পাশে যে আত্মীয় স্বজন থাকেন, সবাই কখনও কখনো বোঝাবার চেষ্টা করেন, – ‘সব কেন বের করছেন দিদি, নিজের ছেলে পিলেদের জন্যে রাখুন।’ মা হাসেন, বাবাও বলেন – ওদের কথায কান দিও না। এই গরীব মানুষগুলো ই  তো আমাদের আপনজন, ওরাই  তো আমার মাদুরের ব্যবসা, মাছের চাষ দেখে। গহনা বড়ি দেওয়ার অপূর্ব শিল্পকলা টাকে ওরা ই এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এই ঝড় বন্যা তো আর রোজ রোজ হয় না। এগুলো তো ঈশ্বরের পরীক্ষা।

ছোট্ট অর্ণব জিজ্ঞেস করে, “এ কেমন পরীক্ষা বাবা ভগবানের?’’

বাবা উত্তর দেন, – ‘’মানুষের ধৈর্য্যের, আর মানুষ যাচাইয়ের। দেখবি ক’দিন পরেই জলটা নেবে যাবে। কত পলি পড়বে, আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাঠি ঘাস আবার হু হু করে বেড়ে উঠবে। – চার – পাঁচ  সপ্তাহ পরে সেগুলো কেটে ঘরে আনব, জলে ভিজিয়ে রেখে এইসব গ্রামের মেয়েরা তাকে একটা একটা করে চিরে চিরে ফেঁসো বের করবে, শুকাবে এবং মাদুর বানাতে বসে যাবে, দু দিকে দুটো বাঁশ বেঁধে। এতো সামান্য সাধনে শুধুমাত্র ঘাস দিয়ে যে এতো সুন্দর শিল্প বানানো যায় তা না দেখলে তো কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।’’

গ্রামের লোকেরা বলে, এমন আদর্শবাদী সৎ দয়ালু মা-বাবার ছেলে ‘অর্ণব’, একদিন ঠিক দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

অর্ণব পড়াশোনায় খুব ভাল, অঙ্কে খুব মাথা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টারমশাই একদিন প্রফুল্লবাবুকে বললেন, – “ছেলেকে চন্ডিপুর, পুরুলিয়া. রহড়া কোন রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলে পাঠিয়ে দিন এবার। ঘরের খেয়ে আদুরে ছেলের মতন তেল চুক চুকে মাথায় পাঠশালায় গেলে তো আর ভাল মানুষ হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে, ঐ সব আশ্রমের নিয়ম শৃঙ্খলায় থেকে মূল্যবোধের পাঠ পড়লে, নিজের কাজ নিজের হাতে করার শিক্ষা ও ট্রেনিং দুটোই হবে ওর।”

– কথাটা বাবার মনেও ভাল লাগলো। প্রথম প্রথম মা, পিসি, ঠাকুমা ও কাকা কাকিমা সকলের আপত্তি ছিল, ঐ সহজ সরল আমুদে বাচ্চাটাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু ছেলেও চাইলো, ঐ ছোট স্কুলের গন্ডি ছেড়ে বড় স্কুলে চলে যেতে, সেখানে প্রতিযোগিতা নামে একটা বিশেষ ব্যাপার থাকে। সব ছাত্ররাই সেখানে পড়াশোনাতে খুব ভাল, তাই কে প্রথম হবে সেই নিয়ে বিরাট একটা রেজাল্ট ভাল করার লড়াই নাকি অন্যরকম এক নতুন পরিবেশের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

মাত্র ক্লাশ VI থেকেই শুরু হয়ে গেল, সত্যি সে যুদ্ধের পরিস্থিতি তার জীবনে।

কিন্তু সব যেন ওলোট পালট হয়ে গেল, নবম  শ্রেণীতে  এসে, তরুণ একজ্ন  ভীষণ কর্মঠ বুদ্ধিদীপ্ত, – বিবেকানন্দের আদর্শ প্রনোদিত কর্মযোগী – নিবেদিত প্রাণ হেড মাস্টারমশাই যখন এলেন, তাদের রামকৃষ্ণ মিশনের বিদ্যালয়ে। প্রথম দিনেই সব ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে তাদের গত বছরের অর্থাৎ ‘অষ্টমশ্রেণীর’ ফল অর্থাৎ রেজাল্ট কেমন হয়েছে এবং কে কাকে টপকে কতবার প্রথম হয়ে এই তিন বছরে অর্থাৎ ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টমে প্রথম স্থান অধিকার করেছে তাদের চিহ্নিত করলেন।

দেখলেন চারটি ছেলের মধ্যেই এই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়, চতুর্থ হওয়ার প্রতিযোগিতা বৃত্তাকারে ঘুরছে। এবার ওদের আলাদা করে দাঁড় করিয়ে রেখে বাকি ৩৬ জনের দিকে ঘাড় ঘোরালেন তিনি, – বেশ জোরে অনেকটা আদর কিন্তু বকুনি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, – “কি গো তোমরা কি পড়াশোনা করতে ভালোবাসো না? তোমাদের ফার্স্ট / সেকেন্ড হতে ইচ্ছে যায় না? – প্রায় সবাই চুপ, মাথা নিচু করে আছে। এবার নিজের চেয়ার টেবিল ছেড়ে ক্লাসের একেবারে মধ্যে সব বাচ্চাদের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, তিনি।

“কি হলো – বলো তোমরা, ওদের মতন নাম্বার পেতে ইচ্ছে করে না তোমাদের?”

– “করে স্যার কিন্তু”

– “কিন্তু কি? বলো বলো বলে ফেলো তাড়াতাড়ি, কেন ওরা চারজনের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতাটা চলছে, তোমরা কেন পারছো না ঐ রকম নাম্বার নিতে?”

– “স্যার, স্যার ওদের খুব বুদ্ধি – আমাদের অতো বুদ্ধি নেই ওদের মতন, স্যারদের পোড়ানো অতো তাড়াতাড়ি আমাদের মাথায় ঢোকে না যে, কী করব?”

-“ঠিক আছে, একটা যুক্তি শুনলাম, কিন্তু জানতো, চেষ্টা করলে,অভ্যাস করতে করতে বুদ্ধি ও বাড়ে, যেমন ভালো করে ঘষে মেজে তামা বা সোনা কে ঝক ঝকে করা হয়, তেমনি  খুব অধ্যবসায় থাকলে নিশ্চয় সফল হবে তোমারাও।  এবার একদম পিছনের বেঞ্চে গিয়ে দেখলেন, কতগুলো তাস এবং কাগজের টুকরো পরে আছে। খুব চেষ্টা করেও সেগুলো লুকোতে পারেনি তারা। স্যার অর্থাৎ সেই তরুণ মহারাজ/স্বামীজী একটা একটা করে কুড়োলেন সেগুলি। তারপর যে ছেলেটির পায়ের কাছে ঐগুলি পড়েছিল তার মাথার চুলটাতে আলতো করে হাত লাগিয়ে বললেন, – “ও পেছনে বসে তাস খেলাটা খুব জমে বুঝি?” আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো করে পড়াশোনা করে একবার ওদের হারিয়ে দেখিয়ে দাও, তারপর আমরা তাস, ক্যারাম সব খেলবো।”

সবচেয়ে পেছনের সারি থেকে সব থেকে দুষ্টু ছেলেটা বলে উঠলো –

“সাধু সন্ন্যাসীরা আবার এসব খেলা করে নাকি? তাঁরা তো শুধু জপ, ধ্যান, পূজা আচ্চা করে।” – এবার নতুন স্বামীজী হেসে ফেললেন। তাই নাকি রে?”

“শুধু পুজো পাঠে মেতে থাকলে তোদের পড়াবো কেমন করে? – সমাজ সেবার মধ্যে যাবো কখন? বিবেকানন্দ কি শুধু ধ্যান করেই কাটিয়েছেন? মিশনের ছাত্র তোরা এখানের আদর্শ কি শেখাচ্ছে তোদের?”

“স্বামীজীর” মতন তেজ্স্বী তরুণ শিক্ষকের কথায়, আন্তরিকতায় ছাত্ররা খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করল। এবার সবচেয়ে শান্ত মুখচোরা ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো, “আমার খুব ফার্স্ট হতে ইচ্ছে করে স্যার, কি করে পারবো বলুন তো, সব subject এ ভালো করি, অঙ্কটা যে বুঝতেই পারি না।’

এবার সে শিক্ষক – “চল সবাই গল্প ছেড়ে একটু কাজ করি।” – বলেই নিজের চেয়ারটা বাইরে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় রেখে এলেন। সবাইকে উঠতে বলে ছাত্রদের বসবার কায়দাটা পাল্টাতে চেয়ারগুলো সব গোলাকার রেখে দশ দশ জনের একেকটা গ্রূপ তৈরী করলেন। ছাত্ররাও খুব উৎসাহের সঙ্গে লেগে পড়লো।

এবার প্রত্যেক দলে একজন করে ঐ বেশি নম্বর পাওয়া ছেলে এবং ৮ জন সাধারণ ছেলেদের বসালেন। অর্থাৎ প্রত্যেক গ্রুপে ৯ জন করে হল। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানাধিকারী ছাত্রদের নিজের টেবিলটির মাঝখানে রেখে চারটি চেয়ারে বসতে বললেন। এবার ব্ল্যাকবোর্ড-এ দাঁড়িয়ে বোঝালেন, একটি নতুন অঙ্কের অধ্যায় থেকে কয়েকটি অঙ্ক। বাকি আরও চারটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন, তারপরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, পুরো ক্লাশ রুমে। একেক গ্রুপের কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়াবার পর ফিরে এলেন, নিজের চেয়ারের সামনে। কিছুটা সময় কাটতেই ওই চারজন তাঁকে অঙ্ক দেখাতে এল। তারা সত্যিই খুব বুদ্ধিমান ও মনোযোগী ছাত্র রূপে প্রমান দিল।

এবার শিক্ষক ওদের ঐ চারজন কে পাঠালেন, চেয়ার নিয়ে একেক গ্রুপের মধ্যে বসতে এবং যতক্ষণ না ওরা সবাইকে ঐ অঙ্কগুলি বোঝাতে পারছে, ততক্ষন অপেক্ষা করলেন, অন্য আর দুটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে সমাধান করতে দিয়ে।

“অর্ণব” সবচেয়ে চৌখস ও বুদ্ধিমান ছেলে, আর সে, অন্যকে সাহায্য করতেও খুব আগ্রহী, বেশ সুন্দর সহজভাবে ধৈর্য্য নিয়ে সে বন্ধুদের অঙ্ক শেখাতে পেরে আজ একটা অদ্ভুত আনন্দ পেল।

স্যার বললেন, যারা খুবই দুর্বল ও অঙ্কে কাঁচা তাঁর কাছে পাঠাতে। পরের ক্লাশ সংস্কৃতের, কিন্তু সে বিষয়ের অধ্যাপক সেদিন স্কুলে আসেননি। অঙ্ক ক্লাশটা চললো এই পিরিয়ডেও। ছেলেরা কিন্তু সবাই খুশি। যেন কোন খেলার ছলে কঠিন প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে পারছে, তারা বন্ধুদের সাহায্যে। খুব যারা ভীত – দুর্বল তারা একে একে স্যারের পাশে বসে সেই অঙ্কগুলি বুঝতে চেষ্টা করছে। স্যার বলছেন,- ‘‘আমি একজন, দুজন ভাল ছাত্র চাই না। আমার ক্লাশে সবাইকেই খুব ভাল নম্বর পেতে হবে। সাফল্য তখনি আসবে. যখন একজন আরেকজনের হাত ধরে টেনে তুলবে।’

স্কুলের মাস্টারমশাই নয়, বাড়ির পরম আত্মীয়ের মতন এই সন্ন্যাসী শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ভীষণ ভাবে অর্ণবের মন আলোড়িত ও উৎসাহিত হল। উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট করার পর সে ‘ডাক্তারীর’ পড়ায় ভর্তি হ’ল। মহারাজের মাধ্যমে বিবেকানন্দের আহ্বান শুনতে পেয়েছে, সে ডাক্তার হয়ে দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে।

পাঁচ বছর পর যখন পড়া শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র কয়েক মাস। পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় হল। ২০০৩ সালের জুন মাস। চারিদিকে একটা থমথমে গুমোট ভাব। বিকেলে বৃষ্টি নামবে মনে হয়। ‘অর্ণব’ হাওড়া স্টেশনে এসে শুনলো ,আজ “দীঘা-কাঁথি” লাইনের ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে, কোন দুর্ঘটনার কারনে। অগত্যা বাসই ভরসা। একটা বাস একটু আগেই ছেড়ে গেছে, কাজেই প্যাসেঞ্জাররা সব প্রায় চলে গেছে। একজন বৃদ্ধ কাকাবাবু বললেন, “যা ভিড় ছিল, ঐ বাসে, তাই উঠতে পারিনি, পরেরটার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমিও কাঁথির দিকে যাবে নাকি? চলো তবে পরের বাসাটায় গিয়ে এখন থেকে বসি, নইলে আর সীট পাবে না।”

দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলেন, বাস ছাড়বার সময় হতেই পিল পিল করে লোক উঠতে শুরু করেছে, ধাক্কা ধাক্কি – চেঁচামেচী, কেউ কাউকে এক বিন্দু জায়গা দিতে নারাজ।

একটি মেয়ে উঠল বহু কষ্টে একখানা বড় ব্যাগ তার কাঁধে। কয়েকটি ছেলে তাকে দুদিক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলছে। ইচ্ছে করে তাকে কোন ঠাসা করে দুজন পিছনে দুজন সামনে তাকে এমন ভাবে আটকে দিয়েছে, যে সে অস্বস্তিতে বিরক্তিতে খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে, – “কী হচ্ছে কি? রাস্তা ছাড়ুন, আগে লেডিজ সীটের দিকে যেতে দিন।”

হ্যা হ্যা করে দাঁত বের করে হেসে উঠল তারা, – কি করে যেতে দেব কোলে নিয়ে নাকি?

বৃদ্ধ কাকাবাবু হঠাৎ অর্ণবের পাশ থেকে ভীষণ জোরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন – “কন্ডাক্টর – কন্ডাক্টর, রাস্তা করে দাও, আসতে দাও দিদিমনিকে এদিকে।”

টিকিটের গুচ্ছ হাতে নিয়ে সার্কাসের জোকারের মতন ভিড়ের মধ্যেও সে পয়সা টাকা নিয়ে টিকিট ধরাতে ব্যস্ত ছিল, ভদ্রলোকের চিৎকারে একটু টনক নড়লো তার।

“এই যে সরুন দাদা – একটু রাস্তা দিন, দিদি এদিকে আসুন, দিন ব্যাগটা আমাকে ধরান।” মেয়েটি অর্ণবের সীটের কাছাকাছি আসতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, বেশ জোর দিয়েই বলল, – ‘এই যে এদিকে আসুন এখানে বসুন।” কাকাবাবু একটু সরুন,বলে জানলার দিকের সীট টা দেখালো মেয়েটিকে।

সে একটু থতমত খেয়ে বলল, “না না আপনাকে উঠতে হবে না এটা তো লেডিস সীট নয়।”

– “যা বলছি শুনুন” গম্ভীর গলায় যেন আদেশ করল অর্ণব সেই মেয়েটিকে। দ্বিরুক্তি না করে সে ওই কাকাবাবুর পাশের সীটে গিয়ে বসে পড়ল। – ‘অনেক ধন্যবাদ’ বলে সলজ্জ একটা হাসি হাসলো মেয়েটি। তারপর গলার স্বর নামিয়ে ঐ ভদ্রলোককে বলল, ‘এরা অনেক্ষন থেকে আমার পিছু নিয়েছে, কতদূর যাবে কে জানে !

– ‘তুমি কোথায় যাবে মা’? জিজ্ঞেস করলেন ঐ কাকাবাবু।

-“কাঁথি, কিন্তু ওখান থেকে আমার বাড়ি অনেকটা প্রায় তিন/চার কিলোমিটার হাঁটা পথ। হঠাৎ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এই ভিড় বাসেই উঠতে হল।”

অর্ণব মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভূব করল, এত স্নিগ্ধ সুন্দর চোখের চাহনি, এমন সরল পবিত্র ভাব সারা মুখে, দেখলেই কেমন যেন মায়া অথচ শ্রদ্ধার ভাব আসে মনে।

‘মেচেদায়’ বাস থামতেই হুড়মুড় করে নেমে লোকেরা চা, বিড়ি, সিগারেট খেতে লাগল। কাকাবাবু পেট্রলপাম্পের বাথরুমে গেলেন, প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে।

অর্ণব কিছুক্ষনের জন্য বসলো ওনার খালি সীটে। জানা গেল ঐ মেয়েটির নাম ‘আহুতি’।

-“বাঃ খুব সুন্দর নাম তো আপনার। কোথায় পড়াশোনা করেন?”

– “লেডি ব্রেবোন কলেজে সংস্কৃত তে অনার্স নিয়ে পড়ি, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। – আপনি?”

-“আমি ডাক্তারি পড়ি, কলকাতা মেডিকেল কলেজে। আজকাল তো কাউকে বিশেষ সংস্কৃত নিয়ে পড়তে শুনিনা, আপনি এই বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন কি করে?” – জিজ্ঞেস করল অর্ণব।

-“ছোট থেকেই নিবেদিতা স্কুলে পড়তাম, আমাদের মাতাজী-রা অর্থাৎ সন্ন্যাসিনী শিক্ষিকাদের মুখে নানা বেদ-বেদান্ত, গীতা, উপনিষদের কথা শুনে আমারও পড়তে ইচ্ছা যেত। তাই – – –

কথাটা শুনেই হঠাৎ যেন সমস্ত বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল অর্ণবের – আরে এই মেয়েটিও তো তারই মতন সম মনস্কতার wave length নিয়ে চলছে – তাই ওর মুখের মধ্যে যেন এক আধ্যাত্মিকতা মাখানো পবিত্র ভাব।

বাস আবার চলতে শুরু করলো, বৃদ্ধ কাকাবাবু ও মেয়েটি – নানান ঘরেলু গল্প করতে করতে চলেছে, বাসের শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকালেই “শ্রী শ্রী সারদা মায়ের” মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে অর্ণবের চোখের সামনে।

‘নন্দকুমারের’ মোড়ে ভদ্রলোক নেমে গেলেন, খুব পরিচিত মানুষের মতন মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে সীট থেকে উঠতেই সে অচেনা অজানা পিতৃতুল্য মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

এবার ‘অর্ণব’ বসলো তার পাশে। ঐ ছেলেগুলিও পেছনে আসে পাশে বসে পড়েছে ততক্ষনে, কিন্তু সামনে ওদের নিয়ে টিপ্পুনি বা হাসাহাসি করে যাচ্ছে।

একবার অর্ণব ভাবলো উঠে দাঁড়িয়ে ধমক দেবে, কিন্তু তার ভদ্রতায় বিবেকে বাঁধলো, ঐ সব নিচ মন্ত্যব্যের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গিয়ে অকারণে ঝগড়া বা তর্কাতর্কিতে না জড়াতে। মনে  হল ওরা চাইছে, তার সঙ্গে লড়াই বাঁধাতে। অতএব ওদের উপেক্ষা করাই ভাল। বরং মেয়েটিকে তার গ্রামে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সন্ধ্যে হয়ে এলো। বাসটি কাঁথি বাজার পেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই বৃষ্টি শুরু হল। ঐ ছেলে চারটিও ওদেরকে ওখানে নামতে দেখে নেমে পড়ল বাস থেকে।

অর্ণব বুঝতে পারলো, এদের মতলব ভালো না। আহুতির সঙ্গেও বড় ব্যাগ তার নিজের স্যুটকেশটাও খুব ভারী – বই খাতাতে ভর্তি। আহুতিরটা কাঁধে আর নিজেরটা হাতে শক্ত করে ধরে ও এসে দাঁড়ালো সামনের চায়ের দোকানে। আহুতিও ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে মাথাটা আড়াল করে প্রায় ছুটে এল ওর পেছন পেছন।

দোকানদার তাড়াতাড়ি একটা টেবিল পরিষ্কার করে ওদের বসতে দিলেন। বেসিনে হাত পা ধুতে গিয়ে দেখলো দোকানটি বেশ বড়, ঠিক সাধারন চা সিঙ্গাড়ার দোকান নয়, বাথরুমও আছে। নিজে হাত মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আহূতিকে বলল, “যান, ওদিকে মেয়েদের একটা আলাদা টয়লেটও আছে, – আমি ততক্ষণ চায়ের অর্ডার দিচ্ছি।”

‘আহুতির’ মনে হল, যেন কত পরিচিত কোন আত্মীয় সঙ্গে রয়েছে তার। নিশ্চিন্ত হয়ে বাথরুমে ঢুকলো সে। ভাবলো, আজ ঐ কাকাবাবু বা এই ছেলেটি না থাকলে হয়তো সে বিপদে পড়তে পারতো। ছোট থেকেই সে “শ্রী শ্রী মায়ের ভক্ত” তার বাবার মতন সর্বদা তারও বিশ্বাস, – তিনি শুধু গুরু মা নন, আপন মা। তাই কোন দুঃখ কষ্ট হলেই তার হৃদয়ে সে সারদা মায়ের রূপটি কল্পনা করে এবং তাঁর শরণাগত হয়ে থাকে, কোন রকম দুর্যোগ, বিপদ, দুর্ঘটনায় সে গুন গুন করে গায়, সেই মনের জোর ও সাহস এনে দেওয়া গানটি।

“মা আছেন আর আমি আছি, –

ভাবনা কি আর আছে আমার,

মা’র হাতে খাই – পরি, মা নিয়েছেন –

আমার ভার। আমি যদি ভুলি মাকে

ভোলেন না মা একটি বার – – -“

মুখ ধুতে ধুতে মনে মনে গানটি গাইছিল সে, হঠাৎ একটি কর্কশ কণ্ঠস্বরে সব ভাবনা ছিন্ন হল।

– ‘এই যে রে মালটা পেয়ে গেছি, এখানে এসে ঢুকেছে’।

এক নিমেষে ঐ বাথরুমের কোনা থেকে এক ছুটে বেরিয়ে এল সে, অর্ণবকে বলল, “ছেলেগুলো এখানেও এসে গেল যে, কি করবেন এখন?”

দোকানদার বললেন, – ‘ওরা কি করবে? আপনারা চা, ডিমের ওমলেট আর সিঙ্গাড়া গুলো খান। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল, এখানে ওরা প্রায়ই আসে, বেশ সমাদর করেই অন্য একটি টেবিলে বসল ওদের ঐ মালিক।

অর্ণব ও আহুতি কোনোরকমে চা ও ডিম খেয়ে পয়সা মেটাতে চাইলো দোকানদারকে ডেকে। যে ছেলেটি বিলটি নিয়ে এল একটা কুশ্রী ইঙ্গিত করে বলল, – “এই বৃষ্টিতে তো মজা আসবে, – ওপরে ঘর আছে আমাদের। আজ রাত্রি টা ওখানেই থেকে যান না, মালিক বলছেন। ঐ ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বেশ বীরত্বের ভাব নিয়ে দোকানদারের দিকে এগিয়ে গেল – “হ্যাঁ আমরাও থাকবো আজ তোর ঐ ওপরের ঘরে।

এক মুহূর্তেই ‘আহুতির’ হাতে টান দিয়ে দোকান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এল অর্ণব।

সম্পূর্ণ ভিজে যাচ্ছে তারা, কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশ থেকে যত তাড়াতাড়ি পালতে পারে তার জন্য একটা চলন্ত ট্রেকারকে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে ইশারা করলো। তাতে আরো দুজন লোক ছিল। আহূতিকে পেছনে এবং অর্ণবকে নিজের পাশে বসিয়ে জোরে চালিয়ে দিল, ড্রাইভার তার বাহনটিকে।

– “কোথায় যাবেন দাদা”?

– আপনি যতটা যাবেন চলুন, তারপরে অন্য কোন গাড়ি নেব, বৃষ্টির মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

– ‘কোন গ্রামে বাড়ি’? গ্রামের নাম বলতেই সে জানতে চাইলো – কার বাড়ি যাবেন বলুন না, পৌঁছে দেব। এরা তো একটু আগেই নেমে যাবে, আমরা তো একটু পয়সা কমানোর জন্যেই গাড়ি চালাচ্ছি, না কি?

– প্রফুল্লবাবুর বাড়ি।

– আরে আপনি “মাদুর জ্যেঠু” – গহনা জেঠির ছেলে নাকি?

– “হ্যাঁ, হেসে ফেললো অর্ণব”।

– “আরে তোমাকে তো কতবার আমি তোমার  হোস্টেলে ছেড়ে এসেছি, সেই করিম চাচা, মনে নেই তোমার”?

– “ও হ্যাঁ তাই তো আপনার ভারী গলার আওয়াজেই আমার চেনা উচিত ছিল। সেলাম চাচাজী কেমন আছেন”?

অর্ণব গল্প জুড়ে দিল ট্রেকারের মালিকের সঙ্গে। পরের গ্রামে অন্য দুজন সাওয়ারী নেমে যেতেই এসে বসলো সে আহুতির পাশে।

“আপনাকে আজ আমার বাড়ি যেতে হবে। এই দুর্যোগের রাতে আপনাকে একা তো ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”

আহুতির মনে হল ‘মা’ সরদার সে অহেতুকী কৃপা লাভ করেছে। ঘোর আঁধারে বিপদ মাঝে মা তাকে উদ্ধার করবার জন্য আজ এই দেবতুল্য ডাক্তার ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবু একটু সংশয় জাগলো মনে, এর বাড়ির লোকেরা কি মনে করবেন? এই রাত্তিরবেলায় হঠাৎ একজন মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে দেখলে গ্রামের প্রতিবেশীরাও কি নানান সন্দেহ করতে ছাড়বে? তাই একটু আবেগ মেশানো গলায় সে ঐ ড্রাইভারবাবুকে বলল, – “চাচাজী আমার গ্রামটা একটু অন্য দিকে, ওনাকে নামিয়ে দিয়ে যদি আমায় আপনি বাড়ির দিকে নিয়ে যান, তাহলে খুব ভাল হয়”।

-“না গো মা, আল্লাহর সে রকম ইচ্ছা নাই। আমার গাড়িটা রাত ৯টায় এই কাঁথিতে এনে জমা করে দিতে হবে। এটা আমার নিজের গাড়ি নয়”।

অর্ণব শান্ত কণ্ঠে বললো, – “আমি জানি একজন অচেনা অজানা যুবকের সঙ্গে হঠাৎ করে তার বাড়ি যেতে আপনার অস্বস্তি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আমাকে পর ভাবছেন কেন? আপনি যে পরিবারের সদস্য, আমিও তো তাঁদেরই একজন”।

“কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না” আহুতি আস্তে আস্তে বলল।

“আপনি নিবেদিতার ভক্ত। আর তিনি কার শিষ্য? বিবেকানন্দের। বিবেকানন্দের গুরু কে? শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ – আমিও তাঁদের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি। আমার মা বাবাও অত্যন্ত বড় এবং উদার মনের মানুষ। তাঁরা কিছু মনে করবেন না। পাড়ার লোকেদের আমি জানি বাবারই আশ্রিত অসহায় আত্মীয় স্বজন তাঁরা। কারো স্বামী নেই, কারো স্ত্রী অসুস্থ, কারো বা ছেলে বিদেশে গিয়ে আর ফেরত আসেনি, কারও কারও মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবি হওয়াতে বাবা, কাকা, দাদা সবাই মারা  গেছেন, আমাদের বাড়িটাই তাদের বাড়ি”।

-“এরকম পরিবার এখনও আছে আমাদের দেশে”?

– “শত শত, হাজার হাজার, তাই তো ভারতবর্ষ এখনও এতো সুন্দর”।

– ‘তাহলে ওই ছেলেগুলো কি?’

– ওরা সমাজের ক্ষত। চাকরী নেই, শিক্ষা দীক্ষা ঠিক মতো হয় নি। মূল্যবোধের পাঠ না পড়ে এবং রাজনৈতিক নেতাদের ও সুবিধাবাদী মানুষের কাজ করতে করতে ওরা ওদের সামনে কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। সত্যিই ওদের এই অবক্ষয় আমাদের মতন স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিককে বিশেষতঃ মেয়েদের ভয় ভীত করে তুলেছে, কিন্তু তা বলে সবাই সেরকম নয়। ওদের ঠিক করার দায়িত্বও আমাদের মতন সুস্থ মানসিকতার তরুণ সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত। তাই আশা হারালে চলবে কেন”!

কথায় কথায় সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল, তারা জানে না। করিম চাচার বাহন এসে তাদের বাড়ির দরজায় থামলো তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। গ্রামের লোকেরা এইসময় প্রায় শুতে চলে যায়। প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী কথা বলছিলেন, – ছেলের বিষয়ে।

“ডাক্তার হয়ে এলে এখানেই ওকে একটা ডিসপেনসারি খুলে বসিয়ে দেব ভাবছি,” বললেন বাবা।

– “না গো ও তো আরও পড়বে বলছে। দিল্লীতে সব বড় জায়গায় হৃদযন্ত্র অপারেশন করতে শিখবে, আমাকে বলেছিল”। – মা জানালেন।

“সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু খুব বড় ডাক্তার হলে তো শহরের হাসপাতালগুলো ওদের কিনে নেবে, বন্দী করে রাখবে তাদের নার্সিং হোমে, টাকা পয়সা অর্থ – সুন্দরী স্ত্রী এইসব লোভ দেখিয়ে। তখন কি আর সে এই গ্রামের মানুষের সেবায় লাগবে”?

ঠিক এই সময়ে বাইরের থেকে হাঁক ডাক শুরু করলেন করিম চাচা, – “মাদুর জেঠু আসুন, দেখুন কাকে নিয়ে এসেছি।

ছাতা হাতে মা বাবা ছুটে বেরিয়ে এলেন, সদর দরজার বেড়া ডিঙিয়ে, এক উঠোন জল ছপিছপিয়ে।

নেমেই পায়ের উপর ঝুঁকে প্রণাম সারলো অর্ণব। আহুতি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকারের সামনে। অর্ণব বলল, – ‘মা এর নাম আহুতি, ওর গ্রামও অনেক দূরে, আজ আমাদের বাড়িতেই থাকবে’।

– “আহা গো বাছা ,মেয়ে আমার ভিজে একেবারে চুপড়ি হয়ে গেছে, এস মা আগে ঘরে এসে কাপড় ছাড়ো, মুখ হাত পা ধুয়ে নাও, তারপরে সব বেত্তান্ত শুনবো”।

বাবাও ওর ব্যাগটি তুলে নিলেন অক্লেশে “এসো এসো মা লক্ষ্মী, কোনো দ্বিধা করোনা”।

এমন আন্তরিকতায় কার মনে কি সংশয় থাকতে পারে!

ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। চার বোন আরাধনা, অর্চনা, আরতি ও আহুতি তারপর তাদের ভাইয়ের জন্ম দিয়েই মায়ের মৃত্যু হয়। বড় বোনেরা সর্বদা ভাইয়ের যত্নে ব্যস্ত। ঠাকুমা সংসার দেখেন। স্বামী পরিত্যক্ত মাসী রান্নাবান্না সামলান। তাঁরও দুটি ছেলে মেয়ে। আহুতি একটু একা একাই খেলা করে বেড়ায়। ঠাকুর ঘরে বসে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে সে। পাশের বাড়ির দিদি ‘নিবেদিতা’ স্কুলে পড়তেন, সেখানেই হোস্টেলে থাকতেন। তার আগ্রহেই আরতি ও আহুতি ভর্তি হল, কলকাতার বাগবাজারে গিয়ে,সেই বিখ্যাত বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আরতি চলে গেল B.Sc নার্সিং পড়তে। বড়দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল। সেই আশ্রিত মাসীর সাথে ঠাকুমার ঝগড়া হওয়ায় তিনিও তাঁর গ্রামে চলে গেলেন। ক’দিন পরেই জানা গেল, তাদের ভাই পড়াশুনো করে না, গ্রামের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে, তাই মন খুব খারাপ, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না তাই আহুতির। বিয়ে থাওয়া সংসারের প্রতি আকর্ষণ তার ক্রমশঃ কমে এসেছে। সংস্কৃত নিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যই ছিল, আমাদের ধর্মশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করা। নিবেদিতা স্কুলের মাতাজীদের আদর্শ, নিরাসক্ত, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ভাবনায় সিক্ত হয়ে আছে সে।

‘অর্ণবদের’ বাড়ি এসে বড় ভালো লাগলো তার। ভীষণ শান্তি ও আনন্দময় পরিবেশে মায়ের স্নেহপূর্ণ ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে দিল।

অর্ণব ও আহুতি যতক্ষণ ভিজে কাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুযে  এসে বাইরের খোলা বারান্দায় দাঁড়ালো, বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশে একফালি চাঁদ মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, বাগান থেকে জুঁই, চামেলী কিম্বা গন্ধরাজের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্যাঙগুলো একনাগাড়ে গান শুনিয়ে যাচ্ছে গ্যাঙোর গ্যাঙোর গ্যাঙ করে।

মা ততক্ষনে এদের জন্য গরম খিচুড়ি নামিয়ে বেগুনী ভাজছেন, তাঁদের খাওয়া দাওয়া আগেই হয়ে গিয়েছিল। বাবা পুজোর ঘরে ঠাকুরকে শয়ন করিয়ে, বাসি ফুলগুলি সরিয়ে সকালের জন্য ঘরটি পরিষ্কার করে, পূর্ব পুরুষের ছবিতে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে বেরিয়ে এলেন। প্রতিদিনই এই কাজগুলি তাঁকে নিয়ম করে করতে দেখা যায়। সকালে উঠেই আবার স্নান সেরে ঠাকুরের ফুল তুলে দেন স্ত্রীকে, পুজোর জন্য।

অর্ণবের সঙ্গে মেয়েটিকে আসতে দেখে একটু অবাক হলেও কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি জাগেনি তাঁর মনে, বরং ভালোই লাগলো, ডাক্তারি পাশ করে এইরকম একটি সঙ্গিনী যদি সে পেয়ে থাকে, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ছেলেকে সংসারী করে সফল ডাক্তার রূপে দেখতে চান তিনি। বয়স বাড়ছে তাঁর। ভাগ্নে শংকর যদিও তাঁর ব্যবসাপত্র – মাদুর তৈরী – বিক্রি ইত্যাদি ভালোই সামলে নেয়, আজকাল চাষ – বাসও ভাইয়ের ছেলেরা উৎসাহ নিয়ে করে। প্রচুর আলু ও পুকুরের মাছ তাঁকে – তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে সচ্ছলতার মধ্যেই রেখেছে। এবার একটা নাতি-নাতনি দেখার শখ জাগছে মনে। স্ত্রী কিন্তু এতো তাড়াতাড়িতে ওর সম্বন্ধ দেখতে বা বিয়ের প্রস্তাব আনতে ইচ্ছুক নন। একজন নারী হয়েও পড়াশুনো বা জ্ঞান অর্জনের উচ্চ আকাঙ্খা তাঁর প্রবল। স্কুলের গন্ডী পার হবার আগেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু পরিবারের ছেলে মেয়ে সবাইকে খুব উৎসাহ দেন , ভালো করে লেখা পড়া শিখতে। নিজের তো মেয়ে হয়নি ভাই, দেওর বা ননদদের মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের পিপাসা জাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। তারা সবাই তাঁর আগ্রহে B.A., M.A., B.Ed ইত্যাদিতে মহিষাদল কলেজে বা বর্দ্ধমান বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে। তাঁর ছেলে অর্ণব এদের সবার মধ্যে বেশি মেধাবী ছিল এবং ডাক্তারি পাশ করেও সে যেন আরও পড়াশোনা করে, বড় বড় অপারেশন করে রুগীদের বাঁচাতে পারে, সমাজের অনেক মানুষের সেবা করে – গরীব দুঃখী কে যেন ভালোবাসতে পারে – এটাই তাঁর ইচ্ছে। গ্রামের লোকেরা বলেন, এমন ‘মা’ না হলে কি আর ছেলে ‘রত্নগর্ভা’ হয়।

রান্না করতে করতে ভাবছেন তিনি, মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার কথা অর্ণব তো বলেনি কখনও। কিন্তু বড় সুন্দর মায়াময় চোখ মেয়েটির, হয়তো ওর সঙ্গে একসাথে ডাক্তারি পড়ে। ভালোই হয়, যদি পরে  তাঁর পুত্রবধূ হয়ে আসে। খিচুড়ি থালায় ঢালতে ঢালতে হাসি পেল তাঁর, আমাদের মন গুলো কেমন ! একটুতেই কত আগে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল দেওয়ার মত হল এটা। – ঠাকুরের ইচ্ছে ছাড়া তো একটা পাতাও নড়ে না – তাঁর বহু কৃপা লাভ করেছেন তিনি। এতসুন্দর স্বামী, সংসার ভরা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু প্রতিবেশীর ভালোবাসা – এ সবই তো অযাচিত ভাবে পাওয়া। এখন তাঁর প্রতি শরণাগত হয়ে থাকাটা, সবচেয়ে বড় কর্ত্তব্য। এসব নিয়ে একদম আর ভাববেন না। দেখি  না ছেলে কি বলে? মেয়েটিরই বা মনের মধ্যে কি আছে! কেমন বংশ, পরিবার, জাত, পাত, ধর্ম নিয়ে তাঁর মাথা ব্যাথা নেই, শুধু মনের মিল হওয়া চাই।

খাওয়ার ঘরে সুন্দর আসন পেতে বসালেন দুজনকে। ভারী ভদ্র মেয়েটি, ‘আপনারা খাবেন না’? জানতে চাইল সে। ‘না গো মা আমাদের খাওয়া অনেক্ষন হয়ে গেছে,’ বললেন মা, খাবারে হাত দেওয়ার আগে  ঠাকুরকে নিবেদন করলো, তারপর মুখে খাবার তুলে নিল সলজ্জভাবে। “কী সুন্দর স্বাদ, এত সুন্দর খিচুড়ি আগে কখনও এমন যত্ন করে বসে কেউ খাওয়াননি আমাকে”। অর্ণব বলল, – “আমার মায়ের হাতের বেগুনী তো খাননি এখনও, খান, একটু কামড় দিয়ে দেখুন, আরও চাইবেন। – মা আরও ‘চার ছ’টা দাও গো, এই কটাতে কি হবে আমার”।

-মা বললেন, “আজ ঝুড়িতে এই কটাই বেগুন পড়েছিল বাবা, কাল সকালে বাগানের গাছ থেকে তুলে করে দেব, মুড়ির সঙ্গে খাস”।

খাওয়া শেষে মায়ের ঘরে পাশের চৌকিতে শোবার জায়গা হল আহুতির। অর্ণব নিজের ঘরে টান টান সোজা হয়ে শুলো। সারাদিনের ঘটনা ও ধকলের কথা মনে পড়ল তার। বাবা ধীর পায়ে এসে ঢুকলেন তার ঘরে। “আজ খুব ক্লান্ত আছো, ঘুমিয়ে পড়ো বাবু, সকালে উঠে কথা হবে”।

বিছানায় বসে আহুতি শোবার আগেকার প্রার্থনাটি বলছে – চোখ বুজে – মা বিরক্ত না করে নিজের চৌকিতে উঠে বসলেন। তাঁর পায়ের শব্দ পেয়ে তাকালো আহুতি। ধীরে ধীরে এবার বলে চলল, তাদের বাসে ওঠা – ঐ ছেলেগুলির পিছু নেওয়া – বৃদ্ধ এক ভদ্রলোকের হুমকি ও অর্ণবের সক্রিয় ভূমিকায় – কি ভাবে আজ তার সম্মান রক্ষা পেয়েছে – প্রত্যেক ঘটনার কথা। বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তার। গলা বন্ধ হয়ে এল। মা উঠে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠাকুরই রক্ষা করেছেন। সময়মত তিনি আমার ছেলের মাথায় যে বুদ্ধি জুগিয়েছেন, সে তোমাকে সোজা বাড়ি নিয়ে এসেছে – খুব ভালো করেছে। আমাদের গ্রামের করিম ড্রাইভারও ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছেছে, না হলে হয়ত একটা অঘটন ঘটে যেত”। – ভয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। বার বার মাথায় দু হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানাতে লাগলেন তাঁর ইষ্ট দেবতার কাছে। যেন নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। কী অপূর্ব মমতাময়ী তাঁর রূপ। মাতৃহীনা আহুতির চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল। অনেক্ষন ঘুম এল না তার।

সকালবেলায় স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলো মায়ের সঙ্গে। মা ফুল চন্দন দিয়ে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রী শ্রী মা ও বিবেকানন্দের ছবিগুলি সাজালেন, – ঘরের গোপালকে বাতাসা জল ও একটু ফল কেটে ধুপ ধুনো জ্বেলে পুজো করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলেন ,মেয়েটি সেই একইভাবে বসে জপ করে চলেছে – তার পবিত্র মুখ, বসার ভঙ্গি, নীরব উপস্থিতি মা কে মুগ্ধ করে দিল।

একটু পরেই হটাৎ বাইরে “করিম চাচা”র গলা শোনা গেল – “মাদুর জেঠু, কেউ যাবেন নাকি গো কাঁথি শহরে? আমি যাচ্ছি এখন”।

বাবা আর অর্ণব চা নিয়ে বসে গল্প করছিল বারান্দায়। চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে উঠে গিয়ে বললেন তাকে – “ঘরে অতিথি এসেছে, ভাত না খাইয়ে তোমার জেঠিমা কি ছাড়বে ঐ মেয়েটিকে? তুমি বরং দুপুরে খেতে এলে একবার ডাক দিও। নইলে বিকেলে অর্ণব মহেশের গাড়িতে ছেড়ে আসবে”।

– “না গো জেঠু, আমিই নিয়ে যাব বিকেলে। অন্য কাউকে ডেকো না” বললো করিম।

 গ্রামের প্রতিবেশীদের কাছে ততক্ষনে অর্ণবের আগমন বার্তা বিশেষতঃ একজন মেয়ে বান্ধবী সঙ্গে নিয়ে আসার খবর বোধহয় রটে গেছে। কাকা-কাকী, পিসি ও তাদের ছেলে-মেয়েরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছে, তাদের বাড়ির উঠোনে। অবশ্য অর্ণব এলে প্রতিবারই তারা আসে, এবং হৈ চৈ, গানে কথায়, নানান গল্পে হাসিতে প্রফুল্লবাবুর বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যায়। মাদুর বোনা, বড়ি দেওয়া এমন কি চাষের কাজ  ফেলে – কাকাতো, মামাতো ভাই-বোন, ভাগ্নেরা যে যেভাবে পারে, এই আনন্দমুখর পরিবারে সক্রিয় যোগদান দেয়।

আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘ন’ টা বাজতে না বাজতেই তারা এসে সব মুড়ি চপ, পান্তাভাত, লুচি মণ্ডা-মিঠাই যার যা মন চায় তা দিয়ে জলখাবার খেয়ে পেট ভরিয়েছে এবং এন্তার হৈ চৈ করে অর্ণবের পেছনেও লেগেছে। –

“কি গো ছোড়দা ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? হটাৎ জোড়ে একেবারে এসে সবাইকে অবাক করে দেবে ভেবেছিলে”?

– “আরে চুপ, চুপ, চুপ কর তোরা। কি সব আবোল তাবোল বলছিস, উনি শুনতে পেলে কি ভাববেন বলতো”?

– পিসিমার ছেলেকে সবাই বড়দা, জেঠুর ছেলেকে মেজদা, এবং এই প্রফুল্লকাকার সবচেয়ে প্রিয় দাদাকে ‘ছোড়দা’ ডাকে, ভালোবাসে ওর মুখের মজার মজার কথা, মিশনের স্বামীজীদের নানান অলৌকিক সব গল্প ও রবীন্দ্রসংগীত শ্যামাসংগীত এবং কথামৃতের গান শুনতে। তার মতন সারা পাড়া পরিবারকে মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা আর কারো মধ্যে নেই। বড়দা মেজদার বৌ রা এসে রান্নার কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছেন। দুই কর্মচারীকে নিয়ে এক কাকা পুকুরে জাল ফেলেছেন। ঘরে কোন অতিথি এলেই এটা করেন তারা। কারণ অন্য দিন আলাদা আলাদা হেঁসেলে রান্না হলেও কেউ এলে প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী যে সবাইকে এখানেই মাছের ঝোল ভাত খেতে বলবেন, এটা তো একটা অলিখিত ঘটনা। কেউ কাউকে নেমতন্ন বা ডাকা ডাকির প্রয়োজন মনে করেন না এখানে। মালি কলাপাতা কেটে আনে, শশী জেঠি শাক কাটেন ঝুড়ি ঝুড়ি। মদন কাকার মাচার থেকে সবচেয়ে সব চেয়ে বড় বড় কুমড়ো – লাউ ডাঁটা সমেত কেটে আনা হয়। পাশাপাশি পুকুরে গুগলি তোলেন ওরা সব শহরের লোকেদের একটু নতুন জিনিস খাওয়াবেন বলে।

শান্তি মামীর ভাণ্ডার থেকে বর্ষার জন্যে তুলে রাখা শুকনো আমসী কুল ও পুরোনো তেঁতুল বেরিয়ে পড়ে। এই রান্না ঘরে জমা করা হয় বেশ ঝাল মিষ্টি টক চাটনি হবে বলে।

সিধু ময়রার দোকানে খবর পৌঁছে যায়, আজ মাদুর জেঠুর বাড়ি অতিথি এসেছেন, রসগোল্লা ও বোঁদে পাঠাতে হবে বিকেল বেলায়। ময়রা বৌ পান চিবোতে চিবোতে জানতে চায়, “ছেলে বাড়ি এসেছে বুঝি, কলকাতা থেকে”? সঙ্গে আর ক’জন?

অর্থাৎ প্রতিবারই অর্ণব তার কলকাতার ডাক্তারি পাঠরত হোস্টেলবাসী সহপাঠীদের নিয়ে আসে। তারা অনেকেই এরকম গ্রাম, পুকুর, নদী, মাদুর বোনার কৌশল, মাছ ধরার এতো বিশাল জাল দেখেনি কখনও। সেই সব বন্ধুরা বলে ‘প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রীর আপ্যায়নের কথা, এখানকার আত্মীয়-স্বজন, সহজ সরল মানুষগুলোর কথা তারা তাদের জীবনে হয়তো কখনও ভুলতে পারবে না।

– কিন্তু এবারে যে একেবারে অন্য ব্যাপার। অর্ণবের সঙ্গে বান্ধবী তাও অতি সুন্দরী সুশীলা। তাকে তো আলাদা ভাবে সমাদর করতে হবে।

অর্ণব কত চেষ্টা করছে – বোঝাতে চাইছে যে, কাল বাসেই এই মেয়েটিকে সে প্রথম দেখলো কিন্তু কে তার কথা শোনে। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে আহূতিকে। সে অবাক হলেও, লজ্জা পেলেও এই বাড়ির মজাদার উজ্জ্বল পরিবেশ, সকলের স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক ব্যবহার তার মন ছুঁয়ে গেছে। নিজেদের পরিবারে তো কখনও সে এরকম পায়নি। এমন মায়ের স্নেহে কোন সংসার যে এত স্নিগ্ধ শীতল হয়, পিতার গাম্ভীর্য্যময় কিন্তু প্রশান্ত ব্যক্তিত্ব – সমস্ত গ্রামের মানুষকে যেন এক করে রাখতে পেরেছে। তিনি যেন তাদের মাথার ছাতা। কাজেই বিকেলে যখন সবাই সমবেত ভাবে চাইলো – “না না আজ তোমার যাওয়া চলবে না, সন্ধ্যে বেলায় গান বাজনার আসর বসাবো আমরা। তবলা, হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, খঞ্জনী, একটা পুরোনো বেহালা সব বেরিয়ে এল। শতরঞ্চির ওপরে সাজানো হল একের পর এক।

আজ প্রফুল্লবাবুর মনও ভীষণ আনন্দে ভরে গেছে নিজের কাঠের একটা পুরোনো বাক্স খুলে তাঁর ‘ব্যাঞ্জো’টা বের করে আনলেন এবং ভাল করে মুছে দেখতে লাগলেন ,ওটা এখনও বাজছে কিনা। ভাই বেহালা বাজান, ভাগ্নেরও খোল বাজানোর হাতটি বড় সুন্দর। গ্রামের কীর্তনে তাকে সবাই ডেকে নিয়ে যায়।

প্রফুলবাবুর বাড়িতেও প্রতি পূর্ণিমায় কীর্তন এবং অমাবস্যায় শ্যামাসংগীত গাইতে আসে গ্রামের ছেলেরা, আজ বড় ভাল লাগছে – ছেলে বাড়ি আসায়, বিশেষ করে ঐ মেয়েটির উপস্থিতি তার মনকেও বোধহয় একটা নতুন স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে।

সন্ধ্যে বেলায় শুরু হল তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান। প্রথমে পিসিমার নাতি কবিতা শোনালো – সৎপাত্র – যেটা বলে সে এবার স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেয়েছে। বড়দার মেয়ে চুমকি “লক্ষ্মীর পরীক্ষা” নাটকে ক্ষীরো ঝি-এর ভূমিকায় অভিনয় করে খুব নাম কুড়িয়েছে, সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে। ছোট্ট সেই মেয়েটির চোখ মুখ ঘুরিয়ে অভিনয় দেখে বাড়ি সুদ্ধ লোক তো হেসে অস্থির। এরপর অর্ণব গলা ছেড়ে গান ধরল – ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’। কাকা বেহালায় অদ্ভুত মায়াময় সুর তুললেন। প্রফুলবাবুও আজ বেশ ছেলে মানুষের মতন একটা লোকগীতির তান শোনালেন। সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। এক বৌদি গাইলো “দাড়াও আমার আঁখির আগে”।

এবারে আহুতির পেছনে পড়ল তারা। তোমাকে শোনাতেই হবে কিছু। তোমার জন্যেই আজ সকলে এত উৎসাহে চঞ্চল।

সে চোখ বুজে শ্রী শ্রী মাকে স্মরণ করে প্রথমে তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো ও পরে গান ধরলো ,

“সকলি তোমার ইচ্ছা,

ইচ্ছাময়ী তারা তুমি,

তোমার কর্ম তুমি করো মা,

লোকে বলে করি আমি।”

অন্যরা খোল ও হারমোনিয়াম বাজালো তার সাথে। এতো সুন্দর এক পবিত্র পরিবেশ রচনা হল যা অর্ণবের মনে ভীষণ ভাবে দোলা লাগলো। বেশ কিছুক্ষন সে চুপ করে বসে রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে সে গান গেয়ে চলল, একের পর এক। অন্যরা সব যে যার বাড়ি চলে গেছেন, মা বাবা ও আহুতি নিস্তব্ধে বসে আছে। অর্ণব গেয়ে চলেছে ,একের পর এক গান, প্রথমে ই বিবেকানন্দের সেই অসামান্য গান, – মন চলো নিজ নিকেতনে- —

তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত, আজি যত তারা তব আকাশে, সবি মোর প্রাণ ভরি বিকাশে।

– জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, এই লভিনু সঙ্গ তব …… ,

পরদিন সকালবেলায় করিম চাচার ট্রেকারে বসে আহূতিকে তার গ্রামে ছাড়তে যাবার সময় হটাৎ অর্ণব বলল – “আপনি এখানে কপালকুন্ডলার কালী মন্দিরটিতে গেছেন কখনও?”

– আহুতি ঘাড় নেড়ে জানালো – না সে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

অর্ণব করিম চাচা কে বললে – ‘চাচা চলুন একটু ওদিকটা ঘুরে যাই’। “বঙ্কিমচন্দ্রের গল্পের নায়ক নবকুমার এইখানে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে কাপালিকের হাতে পড়েছিলেন। সমুদ্র কিনার  থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই কালী মন্দিরে কপালকুন্ডলার সঙ্গে তাঁর দেখা। পরে তপস্বিনী কপালকুন্ডলার সারল্য ও ত্যাগের কাহিনী পড়েছেন, তাঁরা।এই গল্পের  সেই বিখ্যাত উক্তি তার খুব ভালো লাগে, “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই উক্তি সব সময় মনে ভাবে সে, আজ এখানে নির্জনে বসে দুজনে কিছুক্ষন কোন কথা খুঁজে পেল না।

নীরবতা তাদের মধ্যে অনেক কথার তরঙ্গ প্রবাহ সঞ্চালিত করলো। ধীরে ধীরে একসময় অর্ণব বলল, –

– “আহুতি আপনাকে আমার মা বাবা পরিবারের সকলের খুব ভাল লেগেছে।

– আহুতি সলজ্জ্ব হেসে জানালো, তারও ওদের সবাইকে ভীষণ ভালো লেগেছে। এতো সুন্দর পরিবার সে আগে কখনও দেখেনি। অর্ণব আরও যদি কিছু বলে বসে – কোন প্রস্তাব – কোন ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেলে, তার আগেই তাকে বলে দেওয়া ভালো –

‘আমি – সারদা মঠে সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চাই। শ্রদ্ধেয়া অজয় প্রানা মাতাজীর মতন মেয়েদের কল্যানে, সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে – ঐ সারদা মঠের কোন বিদ্যালয়ে ‘শিক্ষিকা’ রূপে জীবন কাটাতে শপথ নিয়েছি’।

অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে এবার খুব সপ্রতিভ ভাবে হাসি মুখে বলল, আমারও তো একই পথ, আমিও যে বেলুড়ে ব্রহ্মচারী হবার জন্যে নাম লিখিয়ে এসেছি। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ডাক্তারের প্রয়োজন খুব বেশি। চারিদিকে নানা ধরণের বড় বড় হাসপাতাল খোলা হয়েছে।

মহারাজরা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে সেগুলি চালনা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ছেন। দেরাদুনের চোখের হাসপাতাল, সারগাছির ডিসপেনসারি দেখে আমার এই কথাই মনে হয়েছে। ডাক্তার সন্ন্যাসী হয়ে ঐ সেবাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর চিকিৎসায় জীবন দানের কথা। – “যাক আপনি আমায় বাঁচালেন, বাবা – মায়ের মতন আপনার মনেও যদি অন্য এক স্বপ্ন – কল্পনা বাসা বাঁধতো তাহলে আমি বড্ড মুশকিলে পড়ে যেতাম। আপনাকে কিভাবে না করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। – মা বাবাকে মানিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু আর পাঁচজনের মতন বিয়ে করে ঘর সংসার করা আমাদের দুজনের জন্যেই নয়। ঠাকুরের কৃপায় আমরা একই পথের পথিক হলেও আমাদের যাত্রা তো ভিন্ন দিকে, ঠিক করে রেখেছেন ঠাকুর। –

অদ্ভুদ বিচ্ছেদ ব্যাথা এসে তীর বিদ্ধ করলো আহুতির বুকে। তার নারী সত্তা চমকে উঠলো,- প্রণাম জানালো, সে ভবিষ্যতের তরুণ সন্ন্যাসীকে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে এলো সমুদ্রের ধারে। করিম চাচা কিছু লোক ভরে ট্রেকার নিয়ে পাশের গ্রামে ছাড়তে গেছেন। খুব সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা বসবার জন্য। একসারি নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে প্রভাতের সূর্য দেখা যাচ্ছে। মাঝিরা মাছ ধরার ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে জলে ভেসেছে – আকাশে কালো সাদা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ভেসে চলেছে। চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে আছে – দুই তরুণ – তরুণী, – ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অর্ণবই প্রথম কথা শুরু করল – রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা খুব মনে পড়ছে –  এইসময়ে – জানেন? – ‘এই যে তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ।’ আহুতি ঘাড় নাড়লো – ‘না শুনেছি তবে কথাগুলো মনে নেই’। –

– ওতে একটা লাইন আছে, –

“এই যে মধুর আলস  ভরে, –

মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে, –

এই যে বাতাস দেহে করে –

অমৃত ক্ষরণ”।

এই “অমৃত ক্ষরণের” কথা গুরুদেব – রবীন্দ্রনাথ যে কি ভাবে ভাবলেন তা আমার মনে হলে খুব অবাক লাগে। –

আহুতি ‘ক্ষরণ’ মানে টা ধরতে চাইল, কিন্তু পারলো না।

অর্ণব বলল, – ‘‘ডাক্তারি শাস্ত্রে তো অনেকবার রক্ত ক্ষরণ শুনেছি, – যে চুঁয়ে চুঁয়ে দেহ থেকে যখন রক্ত বেরিয়ে যায়। কিন্তু বাতাসের স্পর্শে হৃদয় আত্মা থেকে অমৃত – সুধা যখন বেরিয়ে আসে, তখন তা কতখানি মধুর ও পবিত্র হয় , তা ভাবতে পারেন?’’

এরকম অপুর্ব ভালো  আলোচনায় তাদের সময় কাটতে লাগলো।

আহুতি জিজ্ঞেস করল অর্ণবের দিকে তাকিয়ে – ‘আপনি শ্রীমদ স্বামী আত্মস্থানন্দজীর দর্শন পেয়েছেন? ওনাদের পরিবারের মানে পূর্বাশ্রমের কথা জানেন?”

– ‘হ্যাঁ, পড়েছি ওনার সম্বন্ধে আর স্কুল থেকে একবার বেলুড়ে নিয়ে গিয়েছিল, বিবেকানন্দের জন্মদিনে, – Youth Day, 12th January, তখন কাছে গিয়ে কথা শোনার ও প্রণাম করার সুযোগ হয়েছিল। জানেন মুর্শিদাবাদের ঐ গ্রাম থেকে ওনার দুই বোন সারদা মঠে ও ভাই রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছেন।  এরকম অসাধারন সব  পরিবার আরো অনেক আছে , যেখানে বাবা ঠাকুরের কাছে নিবেদন করেছেন ,তার পুত্র সন্তান কে তিনি যেন পায়ে স্থান দেন, পরে সেই ছেলে টি ও সন্যাসী হয়েছেন l খুব ভালো লাগছে অর্ণবের ঠিক সম মনস্কতার একজন বন্ধু র সঙ্গে কথা বলতে,  উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সে বলে চললো ‘‘স্বামী গহনানন্দজী মহারাজের এক দাদা প্রভানন্দ মহারাজ শিলং এর দুস্থ বঞ্চিত ,অবহেলিত  গরীব ছেলে মেয়েদের জন্যে চেরাপুঞ্জি র মতন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়  গড়ে তোলেন ,বহু কষ্ট সাধন করে, এবং  মাত্র ৩৭ বছরে তিনি শরীর ত্যাগ করেন, এইসব মহান মানুষদের পথে যেতে চাই আমি।

আহুতির মনে হলো ত্যাগের মন্ত্রে সে যেন আজ দীক্ষা গ্রহণ করলো ,এক অভিনব ঘটনার মধ্যে ,এক অসাধারন তারুণ্যের মাধ্যমে। নিজের জীবনের উদ্যেশ্য সফল করতে অনুপ্রেরণা পেলো আরো জোর বাড়লো তার, একই পথের পথিক কে প্রনাম জানালো  মনে মনে।

অর্ণব ঘড়ি দেখলো, করিম চাচার আসতে দেরী হচ্ছে। আপন মনে সে গুন গুন করছে, – ‘চিন্তয় মম মানস হরি’,এই গানটা স্বামী সর্বজ্ঞানন্দজী মহারাজের গলায় শুনেছিল দেওঘরে। উনি সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অদ্ভুত গানের গলা ও ভক্তি যুক্ত চেহারা, ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক স্নেহ। এঁদের মতন পথ পরিদর্শক মহারাজদের দেখে এখনও কত ছেলে ঠাকুরের সেবায়, বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মিশনে নাম লেখাচ্ছে। অনেকেই জানেন না সুদূর অরুণাচলে পাহাড়ের কোলে অরণ্যানীর মাঝে ঈশত্মানন্দজী মহারাজের তত্ত্বাবধানে কী সুন্দর বিশাল এক শিক্ষা – শিক্ষন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই তারা চুপ। হটাৎ অর্ণব জানতে চাইলো, – ‘আসাম সাইডে বেড়াতে গেছেন কখনও? ‘আহুতির পরিবারে কেউ ভ্রমণে উৎসাহ পায় না। সে মাথা নাড়লো।

অরুণাচলে মাতাজীদের পরিচালিত আশ্রমে একবার ঘুরে আসুন খুব শান্তি পাবেন এবং অনেক কিছু জ্ঞানলাভ হবে।

আহুতি জানতে চাইল – ‘আর কোথায় কোথায় ঘুরেছেন বলুন না শুনতে খুব ভালো লাগছে’।

“রাজস্থানের ক্ষেত্রীতে গিয়ে ভীষণ অনুপ্রেরণা পেয়েছি। রাজা মঙ্গল সিং  সিং-এর কথা আলোয়াড়ের সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে?”

– হ্যাঁ, বিবেকানন্দকে যখন তিনি পুতুল পুজোর মানে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন রাজবাড়ীর দেওয়াল থেকে তিনি তাঁদের বাবা বা দাদু অর্থাৎ পূর্ব পুরুষের তৈল চিত্রটি পেড়ে মাটিতে রাখতে বললেন এবং রাজাকে বললেন ওর ওপরে পা দিতে। রাজা এবং তার সভাসদগন অবাক – “তা  কি করে হয়, এটি আমাদের মহারাজের প্রতিকৃতি, পা দিলে অপরাধ হবে না?”

– কিন্তু উনি এখন তো আর ঐ ছবির মধ্যে বিরাজমান নেই। তাহলে? নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, – মানুষ নিজের ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়ে পুতুলকে মৃন্ময় থেকে চিন্ময় করে নিতে পারে, তাই সে ঐ পাথরের মূর্ত্তিতেও ঈষ্টকে দর্শন ও পূজন করে। গল্পটিতে এই অকাট্য যুক্তি রাজাকে মুগ্ধ করে।

অর্ণব আরও বলে চলল, ‘আর জানেন তো রাজস্থানের  ক্ষেত্রীর রাজ বাড়িতে   আমাদের বিবেকানন্দের এক বোধদয় হয়। আহুতি অবাক হয়ে তরুণ ডাক্তারকে দেখতে লাগলো।

সেখানে বাঈজী -ময়নাবাই যখন রাজার সভায় গান গাইতে বসেছেন তখন বিবেকানন্দ নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকার জন্যে আসর পরিত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকেন। এমন সময় গায়িকা তার সুরেলা কণ্ঠে গান ধরেন, –

“প্রভু মেরে অবগুন চিতে না

ধরো – সমদর্শী হ্যায় নাম  তাহার “,

সেই গানটি শুনে বিবেকানন্দের বিবেক জাগ্রত হয়, তিনি মাতৃ জাতির প্রতি অবহেলা করে লজ্জিত হন এবং ক্ষমা চেয়ে নেন ঐ রমণীর কাছে নত – মস্তকে।

এবার করিম চাচার ডাক শোনা গেল – “এসো গো মা, এবারে চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে আসি।” তখনও অর্ণব বলে চলেছে, “রাজস্থানের এই ময়নাবাঈয়ের জীবনেও এক আমূল পরিবর্তন আসে স্বামীজিকে দেখার পর থেকে, তাঁকে আর রাজাদের রাজসভায় গান গাইতে শোনা যায়নি।

করিম চাচার গাড়ীতে বসে একটু দ্বিধাগ্রস্থ কুন্ঠিত গলায় আহুতি বলল – একটা অনুরোধ করব, যদি কিছু মনে না করেন, –

– “আরে আমরা দুজন তো এখন একই পথের পথিক, অনুরোধ নয় স্বচ্ছন্দ্যেই বলে ফেলুন।”

– “করিম চাচার সঙ্গে আমিই চলে যাই আপনি বরং বাড়ি ফিরে যান, বাড়িতে সবাই আপনাকে পেয়ে কত খুশি হয়েছেন।”

একটু গভীর দৃষ্টিতে অর্ণব তাকালো, তার দিকে, মনে হল যেন মনের ভেতরে কি লেখা আছে তা পড়া হয়ে গেল তার।

-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, করিম চাচা আমাকে কাঁথি বাজারের এই মোড়টাতেই নামিয়ে দাও। বাবার ওষুধগুলো কিনতে হবে। তুমি এনাকে একেবারে ঘরের দরজা পর্যন্ত দিয়ে এসো, টাকা বাড়ি এসে নিয়ে নিও।

ওদের গ্রাম বা বাড়ির পরিবেশ যে অন্যরকম তা বুঝতে অসুবিধা হল না অর্ণবের।

বাড়ি ফিরতেই মা ডাক দিলেন, চান করে রান্না ঘরে এসে বোস, আমার কাছে পিঁড়ি পেতে রেখেছি। গরম গরম মাছ ভাজা খাবি আয়।

আজ বাড়ি একদম খালি, বাবা মাদুরের ঘাস কাটতে মাঠে গেছেন, সারাদিন ভাগ্নে ভাইপোদের সঙ্গে ওখানেই কাটাবেন। মা লুচি তরকারি, মিষ্টি বানিয়ে সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। সাথে এক কান্দি কলা, নারকেলও আছে। অর্ণব বুঝলো মা আজ অনেকদিন পরে তাকে একা পেয়ে গল্প করতে চাইছেন। ভালোই হল তারও মন খুলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা জানাতে হবে আজ।

পাতে ডাল, ভাত, চচ্চড়ি ও মাছ ভাজা। “তোমাকেও আমার সঙ্গে বসতে হবে মা, তা না হলে আমি ভাতে হাত দেব না।” বলল অর্ণব।

“হ্যাঁ রে বাবা বসছি, তুই আগে শুরু কর না, আর কয়েকটা ভেজে নিই।”

– “না বসো তুমি আগে, নামাও কড়াইটা, ছ্যাং ছ্যাং করলে কথা বলব কি করে, তুমি শুনতে পাবে না যে।”

খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে হাত ধুয়ে এসে মায়ের কাছ টা তে পিঁড়ি টা টেনে নিয়ে সে বলতে আরম্ভ করলো – “মা আমি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে চাই।

– “আমি বুঝে গেছি, এই মেয়েটিকে তোর ভালো লেগেছে তাই না? তোর বাবা ও আমারও আহূতিকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এই রকমই একটি মেয়ের . . . .

মায়ের কথাটা শেষ করতে দিল না, অর্ণব – হ্যাঁ, মা আহুতি ভালো লাগার মতোই মেয়ে, কিন্তু আমাদের দুজনের পথ যে দু দিকে চলে যাচ্ছে।

– ‘সে আবার কি রকম কথা? ওদের বাড়ির লোকের আপত্তি হবে মনে হচ্ছে?’

– না না ওদের বাড়ি তো আমি যাই নি।

– ও তাহলে আমরা মাহিষ্য,ওরা  ব্রাহ্মণ তাই আপত্তি বলছিস?

– আরে তোমরা তো আগেই অনেক অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছো।

– আমাদের মধ্যে সেরকম কোন ব্যাপার হয় নি, আর হবার সম্ভাবনাও নেই কারন

– আরে আমরা এখনই বলছি না, তোর তো এখন তেইশ আরও দুবছর যাক – তারপর না হয় —

– এবার বেশ গম্ভীরভাবে অর্ণব জানালো, “মা আমি – আমি মিশনে নাম লিখিয়েছি ব্রহ্মচারী হবার জন্য।”

– “সে কী, তাহলে তোর ডাক্তারি করা হবে না? বিয়ে থাওয়া নিয়ে বাবা যে স্বপ্ন দেখছেন সে সব. . .” আর কথা বলতে পারলেন না তিনি, গলাটা ধরে এল। –

– “ডাক্তার তো হবোই মা, দিল্লীর AIIMS -এ সুযোগ ও পেয়ে গেছি সার্জারী শল্যবিদ্যায় MS করবার, কিন্তু মিশনের মাধ্যমে, বিবেকানন্দের আদর্শে – শ্রী শ্রী মা ও ঠাকুরের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে আমি – সন্ন্যাসী জীবন যাপন করতে চাই গো মা।”

-‘ত্যাগের মন্ত্রে যখন দীক্ষা নিয়েছো, ধীরে ধীরে ধরা গলায় বললেন অর্ণবের মা – তখন আমি তো এতে বাধা দিতে পারি না বাবা, তবে.. . ‘-

‘তবে আর কিছুই নেই মা, বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার, প্রথমে কষ্ট পেলেও একদিন তাঁর মনেও শান্তি এনে দিতে পারবো আমি, আমার সেবার কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষা, সংস্কার ও প্রকৃত মূল্যবোধেরই তো পরিচয় পাবে সকলে। তিনি নিশ্চয় আমাকে আশীর্বাদ দেবেন।”

আসতে আসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনের ধারে পুকুর পারে গিয়ে চুপ করে বসে রইল অর্ণব।

মা এঁটো হাতে কতক্ষন একভাবে কাটিয়ে দিলেন জানেন না।

সন্ধ্যে বেলায় শাঁখে ফু দিতে দিতে লক্ষ্য করলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের ছবিটা আজ যেন আরও জ্বলজ্বল করছে। তাঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন তিনি। সারদা মা তাঁর ভক্তদের বলতেন, – “মন তো নয় মা যেন মত্ত হাতি” তাকে বশ করার সবচেয়ে বড় উপায় হল জপ করা, – ‘জপাৎ সিদ্ধ’। আর কারও যদি জপ করতে মন না লাগে তাহলে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতে বলতেন তিনি।

আজ অর্ণবের সন্ন্যাস গ্রহণের শুভ অভিপ্রায় জানার পর থেকে মা কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এই এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন ঠাকুরের ছবির দিকে।

ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের দুই চোখের দৃষ্টি দুই রকমের। আগে কখনও এমন ভাবে লক্ষ্য করেননি তিনি।

এক চক্ষু প্রায় বুজে এসেছে, শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাধিস্থ। অন্যটি বড় অদ্ভুত। কখনও মনে হচ্ছে হাসছেন। স্মিত অপূর্ব সে হাসি তো ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকে, চোখের তারাও কি তাতে দ্যুতি লাভ করে। পরক্ষনেই মনে হল সেই নয়ন তারা যেন নড়ে উঠলো আর তার দৃষ্টি হৃদয় ভেদ করে অন্তরের অন্তস্থলকে একটি মৃদু আলোয় ভরিয়ে দিল।

সেই আলোকে মনের সব ময়লা, ক্লেশ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা – যা এতক্ষন অন্ধকারে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, সব একনিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল, অকারণ ভয় ভাবনা।

বাইরের বারান্দায় বাবার সামনে বসে অর্ণব গান ধরেছে –

“আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়

ধুইয়ে দাও, মনের কোনের

মলিনতা সব দীনতা ধুইয়ে দাও,

নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও. . . .”

এবার সন্ধ্যে আরতি। বাবা যথারীতি কাকাকে খোল মৃদঙ্গ আনতে বলে হারমোনিয়ামটা অর্ণবের সামনে রাখলেন। নিজে খঞ্জনীটা হাতে নিলেন। মা পঞ্চ প্রদীপ জ্বেলে আরতি শুরু করলেন। তার মায়ের মতন ভক্তিমতী সরল স্বার্থ ত্যাগী মানুষ যখন ঠাকুরের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁকে সাধারন মানবী নয় যেন দেবী মনে হয়। বহুদিন ধরেই পুজোর সময় তাঁর পরনে থাকে লাল পাড় সাদা শাড়ী, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ্, ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি। কখনও ভ্রু কুঁচকে থাকে না তাঁর। কখনও বিরক্তি ভাব দেখেনি কেউ আজও সব বিষন্নতা ছেড়ে ফেলে আরতি করছেন তিনি শ্রী শ্রী মা, ভগবান ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের তিনটি ছবিতেই মালা পড়ানো, ধুপ ধুনোর সুগন্ধে গৃহের পবিত্র পরিবেশ যেন মঠ-মন্দিরে উন্নীত হয়ে গেছে।

অর্ণব হাত জোর করে কপালে ঠেকালো বেশ কিছুক্ষন পরে শুরু করল হারমোনিয়ামে সুর তুলতে –

“খন্ডন ভব বন্ধন, বন্দন বন্দি তোমায়

নিরঞ্জন নর রূপ ধর, নির্গুণ নিরাময়. . .

মোচন অঘদূষণ . . .”

বাবা, কাকা, কাকিমা ও অন্যান্য ভাই বোন প্রতিবেশী, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমার দল খোলের আওয়াজেই আসতে শুরু করেছিলেন – তাঁরাও সবাই গলা মেলালেন এক সাথে। শেষে রামকৃষ্ণ শরণ্যে …  তালি দিয়ে দিয়ে।

রাতে খাবার সময় অর্ণব জানালো কাল ভোরেই সে ট্রেন ধরবে কলকাতার উদ্দেশ্যে। করিম চাচা তাকে নিয়ে যাবেন তমলুকে  ছাড়তে।

খুব চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল সে, ব্যাগ গোছাতে। রাত্রে বিছানায় শুতেই গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোক দুটো হটাৎ মনে পড়লো এখানে দৈবী শক্তির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে –

“অভয়ং . . . .আবর্জবম এবং অহিংসা . . .  হ্রীরচাপলম্। –

ভয়শূন্য হয়ে কিভাবে সরল অন্তঃকরণে ইন্দ্রিয় সংযম করে ভগবানের নাম করতে হয় স্বাত্ত্বিকভাবে। সে কথা লেখা এখানে, স্বত্ব ভাবের গুন গুলি বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু কায়মনোবাক্যে কাহাকেও কষ্ট না দেওয়ার কথাও তো বলা হয়েছে, পরবর্তী শ্লোকে। তাহলে? মা বাবাকে কিভাবে কষ্ট দেবে সে ! সারা রাত ঘুমাতে পারছে না সে, মা, বাবা কে দুঃখ দিয়ে কি ভাবে সে নতুন জীবন শুরু করবে? তারাই তো আসল দেবতা, তারাই তো তার প্রথম গুরু। কী করা উচিত তার, বুঝে উঠতে পারছে না।

ভোরে উঠেই সে দেখলো তার বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাগজে লেখা, – “আমাদের সম্মতি দিলাম, তোমাকে ঠাকুরের পদে সঁপে দিলাম। –

আশীর্বাদ – বাবা ও মা

একই পথের পথিক ( Ek e pother pothik )

চন্দনা সেনগুপ্ত

মাঝে মাঝেই সাইক্লোন, ঝড়, টর্নেডো আসে উড়িষ্যায় ও পূর্ব মেদিনীপুরের এই সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে। ভীষণ তান্ডবলীলায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় গ্রামগুলোকে। এইখানেই ১৯৮০ সালে জন্ম হয় অর্ণবের। কাজুবাদামের বাগান, সারি সারি নারিকেল গাছ, মাটি দিয়ে সুন্দর করে নিকোনো উঠোনে একদিকে মাদুর পাতা। তার ওপরে বড় বড় পরাতে ‘গহনা বড়ির’ সমারোহ। ভারী সুন্দর তার রূপ। আর একদিকে শীতল পাটি মাদুর তৈরির জন্যে বেশ খানিক জায়গা বরাদ্দ। বৃষ্টি না হলে সবই ঠিকঠাক চলে। আমদানি, কেনাবেচাও বেশ ভাল হয়। অন্যদিকের নিচু জমিতে নানান সব্জি লাগানো, পুকুরে টলটলে জল ও মিষ্টি মাছের চাষ। বেশ সমৃদ্ধ সচ্ছল আনন্দময় পরিবার।

কিন্তু এই ঝড়গুলো এসে সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়, সাধারন গ্রামবাসীদের। সাগরের জল ঢুকে নদী-নালা, পুকুর-জমি সব একাকার হয়ে যায়। মরে যায় কত শত মাছ, ‘গহনা বড়ি’ গুলোতে সূর্য্যের আলো না পেয়ে ছাতা ধরে যায়। মাদুর তৈরী বন্ধ থাকে।

অর্ণবের বাবা “প্রফুল্লবাবু” এইসময় কিন্তু চুপ করে বসে থাকেন না। প্রত্যেকবারই কোমর বেঁধে লেগে পড়েন “ত্রান কার্য্যে”। তাঁদের বাড়ির দোতলায় ,ছাদে আশ্রয় নেয় কত গৃহহারা অসহায় মানুষ।

গ্রামের মেয়েদের নিয়ে মা বানাতে থাকেন, হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি। সারা বছরের যত্নে তুলে রাখা মুড়ির মোয়া, সিঁড়ির অর্থাৎ ঝুড়ি বেসনের লাড্ডু কিম্বা নারকেল নাড়ু কাজুর গুড়ে মাখা তক্তি – সব বের করে অভুক্ত ভীত আতঙ্কিত বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন। বড় বড় কাঁচের জারে নানান মসলায় জারিত আচার বা আমসত্ত্ব, আমসি, তেঁতুল দিয়ে এক এক দিন চাটনিও বানিয়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র কৃপণতা বা দ্বিধা করেন না।

আসে পাশে যে আত্মীয় স্বজন থাকেন, সবাই কখনও কখনো বোঝাবার চেষ্টা করেন, – ‘সব কেন বের করছেন দিদি, নিজের ছেলে পিলেদের জন্যে রাখুন।’ মা হাসেন, বাবাও বলেন – ওদের কথায কান দিও না। এই গরীব মানুষগুলো ই  তো আমাদের আপনজন, ওরাই  তো আমার মাদুরের ব্যবসা, মাছের চাষ দেখে। গহনা বড়ি দেওয়ার অপূর্ব শিল্পকলা টাকে ওরা ই এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এই ঝড় বন্যা তো আর রোজ রোজ হয় না। এগুলো তো ঈশ্বরের পরীক্ষা।

ছোট্ট অর্ণব জিজ্ঞেস করে, “এ কেমন পরীক্ষা বাবা ভগবানের?’’

বাবা উত্তর দেন, – ‘’মানুষের ধৈর্য্যের, আর মানুষ যাচাইয়ের। দেখবি ক’দিন পরেই জলটা নেবে যাবে। কত পলি পড়বে, আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাঠি ঘাস আবার হু হু করে বেড়ে উঠবে। – চার – পাঁচ  সপ্তাহ পরে সেগুলো কেটে ঘরে আনব, জলে ভিজিয়ে রেখে এইসব গ্রামের মেয়েরা তাকে একটা একটা করে চিরে চিরে ফেঁসো বের করবে, শুকাবে এবং মাদুর বানাতে বসে যাবে, দু দিকে দুটো বাঁশ বেঁধে। এতো সামান্য সাধনে শুধুমাত্র ঘাস দিয়ে যে এতো সুন্দর শিল্প বানানো যায় তা না দেখলে তো কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।’’

গ্রামের লোকেরা বলে, এমন আদর্শবাদী সৎ দয়ালু মা-বাবার ছেলে ‘অর্ণব’, একদিন ঠিক দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

অর্ণব পড়াশোনায় খুব ভাল, অঙ্কে খুব মাথা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টারমশাই একদিন প্রফুল্লবাবুকে বললেন, – “ছেলেকে চন্ডিপুর, পুরুলিয়া. রহড়া কোন রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলে পাঠিয়ে দিন এবার। ঘরের খেয়ে আদুরে ছেলের মতন তেল চুক চুকে মাথায় পাঠশালায় গেলে তো আর ভাল মানুষ হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে, ঐ সব আশ্রমের নিয়ম শৃঙ্খলায় থেকে মূল্যবোধের পাঠ পড়লে, নিজের কাজ নিজের হাতে করার শিক্ষা ও ট্রেনিং দুটোই হবে ওর।”

– কথাটা বাবার মনেও ভাল লাগলো। প্রথম প্রথম মা, পিসি, ঠাকুমা ও কাকা কাকিমা সকলের আপত্তি ছিল, ঐ সহজ সরল আমুদে বাচ্চাটাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু ছেলেও চাইলো, ঐ ছোট স্কুলের গন্ডি ছেড়ে বড় স্কুলে চলে যেতে, সেখানে প্রতিযোগিতা নামে একটা বিশেষ ব্যাপার থাকে। সব ছাত্ররাই সেখানে পড়াশোনাতে খুব ভাল, তাই কে প্রথম হবে সেই নিয়ে বিরাট একটা রেজাল্ট ভাল করার লড়াই নাকি অন্যরকম এক নতুন পরিবেশের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

মাত্র ক্লাশ VI থেকেই শুরু হয়ে গেল, সত্যি সে যুদ্ধের পরিস্থিতি তার জীবনে।

কিন্তু সব যেন ওলোট পালট হয়ে গেল, নবম  শ্রেণীতে  এসে, তরুণ একজ্ন  ভীষণ কর্মঠ বুদ্ধিদীপ্ত, – বিবেকানন্দের আদর্শ প্রনোদিত কর্মযোগী – নিবেদিত প্রাণ হেড মাস্টারমশাই যখন এলেন, তাদের রামকৃষ্ণ মিশনের বিদ্যালয়ে। প্রথম দিনেই সব ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে তাদের গত বছরের অর্থাৎ ‘অষ্টমশ্রেণীর’ ফল অর্থাৎ রেজাল্ট কেমন হয়েছে এবং কে কাকে টপকে কতবার প্রথম হয়ে এই তিন বছরে অর্থাৎ ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টমে প্রথম স্থান অধিকার করেছে তাদের চিহ্নিত করলেন।

দেখলেন চারটি ছেলের মধ্যেই এই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়, চতুর্থ হওয়ার প্রতিযোগিতা বৃত্তাকারে ঘুরছে। এবার ওদের আলাদা করে দাঁড় করিয়ে রেখে বাকি ৩৬ জনের দিকে ঘাড় ঘোরালেন তিনি, – বেশ জোরে অনেকটা আদর কিন্তু বকুনি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, – “কি গো তোমরা কি পড়াশোনা করতে ভালোবাসো না? তোমাদের ফার্স্ট / সেকেন্ড হতে ইচ্ছে যায় না? – প্রায় সবাই চুপ, মাথা নিচু করে আছে। এবার নিজের চেয়ার টেবিল ছেড়ে ক্লাসের একেবারে মধ্যে সব বাচ্চাদের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, তিনি।

“কি হলো – বলো তোমরা, ওদের মতন নাম্বার পেতে ইচ্ছে করে না তোমাদের?”

– “করে স্যার কিন্তু”

– “কিন্তু কি? বলো বলো বলে ফেলো তাড়াতাড়ি, কেন ওরা চারজনের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতাটা চলছে, তোমরা কেন পারছো না ঐ রকম নাম্বার নিতে?”

– “স্যার, স্যার ওদের খুব বুদ্ধি – আমাদের অতো বুদ্ধি নেই ওদের মতন, স্যারদের পোড়ানো অতো তাড়াতাড়ি আমাদের মাথায় ঢোকে না যে, কী করব?”

-“ঠিক আছে, একটা যুক্তি শুনলাম, কিন্তু জানতো, চেষ্টা করলে,অভ্যাস করতে করতে বুদ্ধি ও বাড়ে, যেমন ভালো করে ঘষে মেজে তামা বা সোনা কে ঝক ঝকে করা হয়, তেমনি  খুব অধ্যবসায় থাকলে নিশ্চয় সফল হবে তোমারাও।  এবার একদম পিছনের বেঞ্চে গিয়ে দেখলেন, কতগুলো তাস এবং কাগজের টুকরো পরে আছে। খুব চেষ্টা করেও সেগুলো লুকোতে পারেনি তারা। স্যার অর্থাৎ সেই তরুণ মহারাজ/স্বামীজী একটা একটা করে কুড়োলেন সেগুলি। তারপর যে ছেলেটির পায়ের কাছে ঐগুলি পড়েছিল তার মাথার চুলটাতে আলতো করে হাত লাগিয়ে বললেন, – “ও পেছনে বসে তাস খেলাটা খুব জমে বুঝি?” আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো করে পড়াশোনা করে একবার ওদের হারিয়ে দেখিয়ে দাও, তারপর আমরা তাস, ক্যারাম সব খেলবো।”

সবচেয়ে পেছনের সারি থেকে সব থেকে দুষ্টু ছেলেটা বলে উঠলো –

“সাধু সন্ন্যাসীরা আবার এসব খেলা করে নাকি? তাঁরা তো শুধু জপ, ধ্যান, পূজা আচ্চা করে।” – এবার নতুন স্বামীজী হেসে ফেললেন। তাই নাকি রে?”

“শুধু পুজো পাঠে মেতে থাকলে তোদের পড়াবো কেমন করে? – সমাজ সেবার মধ্যে যাবো কখন? বিবেকানন্দ কি শুধু ধ্যান করেই কাটিয়েছেন? মিশনের ছাত্র তোরা এখানের আদর্শ কি শেখাচ্ছে তোদের?”

“স্বামীজীর” মতন তেজ্স্বী তরুণ শিক্ষকের কথায়, আন্তরিকতায় ছাত্ররা খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করল। এবার সবচেয়ে শান্ত মুখচোরা ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো, “আমার খুব ফার্স্ট হতে ইচ্ছে করে স্যার, কি করে পারবো বলুন তো, সব subject এ ভালো করি, অঙ্কটা যে বুঝতেই পারি না।’

এবার সে শিক্ষক – “চল সবাই গল্প ছেড়ে একটু কাজ করি।” – বলেই নিজের চেয়ারটা বাইরে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় রেখে এলেন। সবাইকে উঠতে বলে ছাত্রদের বসবার কায়দাটা পাল্টাতে চেয়ারগুলো সব গোলাকার রেখে দশ দশ জনের একেকটা গ্রূপ তৈরী করলেন। ছাত্ররাও খুব উৎসাহের সঙ্গে লেগে পড়লো।

এবার প্রত্যেক দলে একজন করে ঐ বেশি নম্বর পাওয়া ছেলে এবং ৮ জন সাধারণ ছেলেদের বসালেন। অর্থাৎ প্রত্যেক গ্রুপে ৯ জন করে হল। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানাধিকারী ছাত্রদের নিজের টেবিলটির মাঝখানে রেখে চারটি চেয়ারে বসতে বললেন। এবার ব্ল্যাকবোর্ড-এ দাঁড়িয়ে বোঝালেন, একটি নতুন অঙ্কের অধ্যায় থেকে কয়েকটি অঙ্ক। বাকি আরও চারটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন, তারপরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, পুরো ক্লাশ রুমে। একেক গ্রুপের কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়াবার পর ফিরে এলেন, নিজের চেয়ারের সামনে। কিছুটা সময় কাটতেই ওই চারজন তাঁকে অঙ্ক দেখাতে এল। তারা সত্যিই খুব বুদ্ধিমান ও মনোযোগী ছাত্র রূপে প্রমান দিল।

এবার শিক্ষক ওদের ঐ চারজন কে পাঠালেন, চেয়ার নিয়ে একেক গ্রুপের মধ্যে বসতে এবং যতক্ষণ না ওরা সবাইকে ঐ অঙ্কগুলি বোঝাতে পারছে, ততক্ষন অপেক্ষা করলেন, অন্য আর দুটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে সমাধান করতে দিয়ে।

“অর্ণব” সবচেয়ে চৌখস ও বুদ্ধিমান ছেলে, আর সে, অন্যকে সাহায্য করতেও খুব আগ্রহী, বেশ সুন্দর সহজভাবে ধৈর্য্য নিয়ে সে বন্ধুদের অঙ্ক শেখাতে পেরে আজ একটা অদ্ভুত আনন্দ পেল।

স্যার বললেন, যারা খুবই দুর্বল ও অঙ্কে কাঁচা তাঁর কাছে পাঠাতে। পরের ক্লাশ সংস্কৃতের, কিন্তু সে বিষয়ের অধ্যাপক সেদিন স্কুলে আসেননি। অঙ্ক ক্লাশটা চললো এই পিরিয়ডেও। ছেলেরা কিন্তু সবাই খুশি। যেন কোন খেলার ছলে কঠিন প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে পারছে, তারা বন্ধুদের সাহায্যে। খুব যারা ভীত – দুর্বল তারা একে একে স্যারের পাশে বসে সেই অঙ্কগুলি বুঝতে চেষ্টা করছে। স্যার বলছেন,- ‘‘আমি একজন, দুজন ভাল ছাত্র চাই না। আমার ক্লাশে সবাইকেই খুব ভাল নম্বর পেতে হবে। সাফল্য তখনি আসবে. যখন একজন আরেকজনের হাত ধরে টেনে তুলবে।’

স্কুলের মাস্টারমশাই নয়, বাড়ির পরম আত্মীয়ের মতন এই সন্ন্যাসী শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ভীষণ ভাবে অর্ণবের মন আলোড়িত ও উৎসাহিত হল। উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট করার পর সে ‘ডাক্তারীর’ পড়ায় ভর্তি হ’ল। মহারাজের মাধ্যমে বিবেকানন্দের আহ্বান শুনতে পেয়েছে, সে ডাক্তার হয়ে দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে।

পাঁচ বছর পর যখন পড়া শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র কয়েক মাস। পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় হল। ২০০৩ সালের জুন মাস। চারিদিকে একটা থমথমে গুমোট ভাব। বিকেলে বৃষ্টি নামবে মনে হয়। ‘অর্ণব’ হাওড়া স্টেশনে এসে শুনলো ,আজ “দীঘা-কাঁথি” লাইনের ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে, কোন দুর্ঘটনার কারনে। অগত্যা বাসই ভরসা। একটা বাস একটু আগেই ছেড়ে গেছে, কাজেই প্যাসেঞ্জাররা সব প্রায় চলে গেছে। একজন বৃদ্ধ কাকাবাবু বললেন, “যা ভিড় ছিল, ঐ বাসে, তাই উঠতে পারিনি, পরেরটার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমিও কাঁথির দিকে যাবে নাকি? চলো তবে পরের বাসাটায় গিয়ে এখন থেকে বসি, নইলে আর সীট পাবে না।”

দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলেন, বাস ছাড়বার সময় হতেই পিল পিল করে লোক উঠতে শুরু করেছে, ধাক্কা ধাক্কি – চেঁচামেচী, কেউ কাউকে এক বিন্দু জায়গা দিতে নারাজ।

একটি মেয়ে উঠল বহু কষ্টে একখানা বড় ব্যাগ তার কাঁধে। কয়েকটি ছেলে তাকে দুদিক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলছে। ইচ্ছে করে তাকে কোন ঠাসা করে দুজন পিছনে দুজন সামনে তাকে এমন ভাবে আটকে দিয়েছে, যে সে অস্বস্তিতে বিরক্তিতে খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে, – “কী হচ্ছে কি? রাস্তা ছাড়ুন, আগে লেডিজ সীটের দিকে যেতে দিন।”

হ্যা হ্যা করে দাঁত বের করে হেসে উঠল তারা, – কি করে যেতে দেব কোলে নিয়ে নাকি?

বৃদ্ধ কাকাবাবু হঠাৎ অর্ণবের পাশ থেকে ভীষণ জোরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন – “কন্ডাক্টর – কন্ডাক্টর, রাস্তা করে দাও, আসতে দাও দিদিমনিকে এদিকে।”

টিকিটের গুচ্ছ হাতে নিয়ে সার্কাসের জোকারের মতন ভিড়ের মধ্যেও সে পয়সা টাকা নিয়ে টিকিট ধরাতে ব্যস্ত ছিল, ভদ্রলোকের চিৎকারে একটু টনক নড়লো তার।

“এই যে সরুন দাদা – একটু রাস্তা দিন, দিদি এদিকে আসুন, দিন ব্যাগটা আমাকে ধরান।” মেয়েটি অর্ণবের সীটের কাছাকাছি আসতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, বেশ জোর দিয়েই বলল, – ‘এই যে এদিকে আসুন এখানে বসুন।” কাকাবাবু একটু সরুন,বলে জানলার দিকের সীট টা দেখালো মেয়েটিকে।

সে একটু থতমত খেয়ে বলল, “না না আপনাকে উঠতে হবে না এটা তো লেডিস সীট নয়।”

– “যা বলছি শুনুন” গম্ভীর গলায় যেন আদেশ করল অর্ণব সেই মেয়েটিকে। দ্বিরুক্তি না করে সে ওই কাকাবাবুর পাশের সীটে গিয়ে বসে পড়ল। – ‘অনেক ধন্যবাদ’ বলে সলজ্জ একটা হাসি হাসলো মেয়েটি। তারপর গলার স্বর নামিয়ে ঐ ভদ্রলোককে বলল, ‘এরা অনেক্ষন থেকে আমার পিছু নিয়েছে, কতদূর যাবে কে জানে !

– ‘তুমি কোথায় যাবে মা’? জিজ্ঞেস করলেন ঐ কাকাবাবু।

-“কাঁথি, কিন্তু ওখান থেকে আমার বাড়ি অনেকটা প্রায় তিন/চার কিলোমিটার হাঁটা পথ। হঠাৎ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এই ভিড় বাসেই উঠতে হল।”

অর্ণব মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভূব করল, এত স্নিগ্ধ সুন্দর চোখের চাহনি, এমন সরল পবিত্র ভাব সারা মুখে, দেখলেই কেমন যেন মায়া অথচ শ্রদ্ধার ভাব আসে মনে।

‘মেচেদায়’ বাস থামতেই হুড়মুড় করে নেমে লোকেরা চা, বিড়ি, সিগারেট খেতে লাগল। কাকাবাবু পেট্রলপাম্পের বাথরুমে গেলেন, প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে।

অর্ণব কিছুক্ষনের জন্য বসলো ওনার খালি সীটে। জানা গেল ঐ মেয়েটির নাম ‘আহুতি’।

-“বাঃ খুব সুন্দর নাম তো আপনার। কোথায় পড়াশোনা করেন?”

– “লেডি ব্রেবোন কলেজে সংস্কৃত তে অনার্স নিয়ে পড়ি, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। – আপনি?”

-“আমি ডাক্তারি পড়ি, কলকাতা মেডিকেল কলেজে। আজকাল তো কাউকে বিশেষ সংস্কৃত নিয়ে পড়তে শুনিনা, আপনি এই বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন কি করে?” – জিজ্ঞেস করল অর্ণব।

-“ছোট থেকেই নিবেদিতা স্কুলে পড়তাম, আমাদের মাতাজী-রা অর্থাৎ সন্ন্যাসিনী শিক্ষিকাদের মুখে নানা বেদ-বেদান্ত, গীতা, উপনিষদের কথা শুনে আমারও পড়তে ইচ্ছা যেত। তাই – – –

কথাটা শুনেই হঠাৎ যেন সমস্ত বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল অর্ণবের – আরে এই মেয়েটিও তো তারই মতন সম মনস্কতার wave length নিয়ে চলছে – তাই ওর মুখের মধ্যে যেন এক আধ্যাত্মিকতা মাখানো পবিত্র ভাব।

বাস আবার চলতে শুরু করলো, বৃদ্ধ কাকাবাবু ও মেয়েটি – নানান ঘরেলু গল্প করতে করতে চলেছে, বাসের শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকালেই “শ্রী শ্রী সারদা মায়ের” মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে অর্ণবের চোখের সামনে।

‘নন্দকুমারের’ মোড়ে ভদ্রলোক নেমে গেলেন, খুব পরিচিত মানুষের মতন মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে সীট থেকে উঠতেই সে অচেনা অজানা পিতৃতুল্য মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

এবার ‘অর্ণব’ বসলো তার পাশে। ঐ ছেলেগুলিও পেছনে আসে পাশে বসে পড়েছে ততক্ষনে, কিন্তু সামনে ওদের নিয়ে টিপ্পুনি বা হাসাহাসি করে যাচ্ছে।

একবার অর্ণব ভাবলো উঠে দাঁড়িয়ে ধমক দেবে, কিন্তু তার ভদ্রতায় বিবেকে বাঁধলো, ঐ সব নিচ মন্ত্যব্যের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গিয়ে অকারণে ঝগড়া বা তর্কাতর্কিতে না জড়াতে। মনে  হল ওরা চাইছে, তার সঙ্গে লড়াই বাঁধাতে। অতএব ওদের উপেক্ষা করাই ভাল। বরং মেয়েটিকে তার গ্রামে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সন্ধ্যে হয়ে এলো। বাসটি কাঁথি বাজার পেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই বৃষ্টি শুরু হল। ঐ ছেলে চারটিও ওদেরকে ওখানে নামতে দেখে নেমে পড়ল বাস থেকে।

অর্ণব বুঝতে পারলো, এদের মতলব ভালো না। আহুতির সঙ্গেও বড় ব্যাগ তার নিজের স্যুটকেশটাও খুব ভারী – বই খাতাতে ভর্তি। আহুতিরটা কাঁধে আর নিজেরটা হাতে শক্ত করে ধরে ও এসে দাঁড়ালো সামনের চায়ের দোকানে। আহুতিও ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে মাথাটা আড়াল করে প্রায় ছুটে এল ওর পেছন পেছন।

দোকানদার তাড়াতাড়ি একটা টেবিল পরিষ্কার করে ওদের বসতে দিলেন। বেসিনে হাত পা ধুতে গিয়ে দেখলো দোকানটি বেশ বড়, ঠিক সাধারন চা সিঙ্গাড়ার দোকান নয়, বাথরুমও আছে। নিজে হাত মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আহূতিকে বলল, “যান, ওদিকে মেয়েদের একটা আলাদা টয়লেটও আছে, – আমি ততক্ষণ চায়ের অর্ডার দিচ্ছি।”

‘আহুতির’ মনে হল, যেন কত পরিচিত কোন আত্মীয় সঙ্গে রয়েছে তার। নিশ্চিন্ত হয়ে বাথরুমে ঢুকলো সে। ভাবলো, আজ ঐ কাকাবাবু বা এই ছেলেটি না থাকলে হয়তো সে বিপদে পড়তে পারতো। ছোট থেকেই সে “শ্রী শ্রী মায়ের ভক্ত” তার বাবার মতন সর্বদা তারও বিশ্বাস, – তিনি শুধু গুরু মা নন, আপন মা। তাই কোন দুঃখ কষ্ট হলেই তার হৃদয়ে সে সারদা মায়ের রূপটি কল্পনা করে এবং তাঁর শরণাগত হয়ে থাকে, কোন রকম দুর্যোগ, বিপদ, দুর্ঘটনায় সে গুন গুন করে গায়, সেই মনের জোর ও সাহস এনে দেওয়া গানটি।

“মা আছেন আর আমি আছি, –

ভাবনা কি আর আছে আমার,

মা’র হাতে খাই – পরি, মা নিয়েছেন –

আমার ভার। আমি যদি ভুলি মাকে

ভোলেন না মা একটি বার – – -“

মুখ ধুতে ধুতে মনে মনে গানটি গাইছিল সে, হঠাৎ একটি কর্কশ কণ্ঠস্বরে সব ভাবনা ছিন্ন হল।

– ‘এই যে রে মালটা পেয়ে গেছি, এখানে এসে ঢুকেছে’।

এক নিমেষে ঐ বাথরুমের কোনা থেকে এক ছুটে বেরিয়ে এল সে, অর্ণবকে বলল, “ছেলেগুলো এখানেও এসে গেল যে, কি করবেন এখন?”

দোকানদার বললেন, – ‘ওরা কি করবে? আপনারা চা, ডিমের ওমলেট আর সিঙ্গাড়া গুলো খান। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল, এখানে ওরা প্রায়ই আসে, বেশ সমাদর করেই অন্য একটি টেবিলে বসল ওদের ঐ মালিক।

অর্ণব ও আহুতি কোনোরকমে চা ও ডিম খেয়ে পয়সা মেটাতে চাইলো দোকানদারকে ডেকে। যে ছেলেটি বিলটি নিয়ে এল একটা কুশ্রী ইঙ্গিত করে বলল, – “এই বৃষ্টিতে তো মজা আসবে, – ওপরে ঘর আছে আমাদের। আজ রাত্রি টা ওখানেই থেকে যান না, মালিক বলছেন। ঐ ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বেশ বীরত্বের ভাব নিয়ে দোকানদারের দিকে এগিয়ে গেল – “হ্যাঁ আমরাও থাকবো আজ তোর ঐ ওপরের ঘরে।

এক মুহূর্তেই ‘আহুতির’ হাতে টান দিয়ে দোকান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এল অর্ণব।

সম্পূর্ণ ভিজে যাচ্ছে তারা, কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশ থেকে যত তাড়াতাড়ি পালতে পারে তার জন্য একটা চলন্ত ট্রেকারকে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে ইশারা করলো। তাতে আরো দুজন লোক ছিল। আহূতিকে পেছনে এবং অর্ণবকে নিজের পাশে বসিয়ে জোরে চালিয়ে দিল, ড্রাইভার তার বাহনটিকে।

– “কোথায় যাবেন দাদা”?

– আপনি যতটা যাবেন চলুন, তারপরে অন্য কোন গাড়ি নেব, বৃষ্টির মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

– ‘কোন গ্রামে বাড়ি’? গ্রামের নাম বলতেই সে জানতে চাইলো – কার বাড়ি যাবেন বলুন না, পৌঁছে দেব। এরা তো একটু আগেই নেমে যাবে, আমরা তো একটু পয়সা কমানোর জন্যেই গাড়ি চালাচ্ছি, না কি?

– প্রফুল্লবাবুর বাড়ি।

– আরে আপনি “মাদুর জ্যেঠু” – গহনা জেঠির ছেলে নাকি?

– “হ্যাঁ, হেসে ফেললো অর্ণব”।

– “আরে তোমাকে তো কতবার আমি তোমার  হোস্টেলে ছেড়ে এসেছি, সেই করিম চাচা, মনে নেই তোমার”?

– “ও হ্যাঁ তাই তো আপনার ভারী গলার আওয়াজেই আমার চেনা উচিত ছিল। সেলাম চাচাজী কেমন আছেন”?

অর্ণব গল্প জুড়ে দিল ট্রেকারের মালিকের সঙ্গে। পরের গ্রামে অন্য দুজন সাওয়ারী নেমে যেতেই এসে বসলো সে আহুতির পাশে।

“আপনাকে আজ আমার বাড়ি যেতে হবে। এই দুর্যোগের রাতে আপনাকে একা তো ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”

আহুতির মনে হল ‘মা’ সরদার সে অহেতুকী কৃপা লাভ করেছে। ঘোর আঁধারে বিপদ মাঝে মা তাকে উদ্ধার করবার জন্য আজ এই দেবতুল্য ডাক্তার ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবু একটু সংশয় জাগলো মনে, এর বাড়ির লোকেরা কি মনে করবেন? এই রাত্তিরবেলায় হঠাৎ একজন মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে দেখলে গ্রামের প্রতিবেশীরাও কি নানান সন্দেহ করতে ছাড়বে? তাই একটু আবেগ মেশানো গলায় সে ঐ ড্রাইভারবাবুকে বলল, – “চাচাজী আমার গ্রামটা একটু অন্য দিকে, ওনাকে নামিয়ে দিয়ে যদি আমায় আপনি বাড়ির দিকে নিয়ে যান, তাহলে খুব ভাল হয়”।

-“না গো মা, আল্লাহর সে রকম ইচ্ছা নাই। আমার গাড়িটা রাত ৯টায় এই কাঁথিতে এনে জমা করে দিতে হবে। এটা আমার নিজের গাড়ি নয়”।

অর্ণব শান্ত কণ্ঠে বললো, – “আমি জানি একজন অচেনা অজানা যুবকের সঙ্গে হঠাৎ করে তার বাড়ি যেতে আপনার অস্বস্তি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আমাকে পর ভাবছেন কেন? আপনি যে পরিবারের সদস্য, আমিও তো তাঁদেরই একজন”।

“কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না” আহুতি আস্তে আস্তে বলল।

“আপনি নিবেদিতার ভক্ত। আর তিনি কার শিষ্য? বিবেকানন্দের। বিবেকানন্দের গুরু কে? শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ – আমিও তাঁদের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি। আমার মা বাবাও অত্যন্ত বড় এবং উদার মনের মানুষ। তাঁরা কিছু মনে করবেন না। পাড়ার লোকেদের আমি জানি বাবারই আশ্রিত অসহায় আত্মীয় স্বজন তাঁরা। কারো স্বামী নেই, কারো স্ত্রী অসুস্থ, কারো বা ছেলে বিদেশে গিয়ে আর ফেরত আসেনি, কারও কারও মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবি হওয়াতে বাবা, কাকা, দাদা সবাই মারা  গেছেন, আমাদের বাড়িটাই তাদের বাড়ি”।

-“এরকম পরিবার এখনও আছে আমাদের দেশে”?

– “শত শত, হাজার হাজার, তাই তো ভারতবর্ষ এখনও এতো সুন্দর”।

– ‘তাহলে ওই ছেলেগুলো কি?’

– ওরা সমাজের ক্ষত। চাকরী নেই, শিক্ষা দীক্ষা ঠিক মতো হয় নি। মূল্যবোধের পাঠ না পড়ে এবং রাজনৈতিক নেতাদের ও সুবিধাবাদী মানুষের কাজ করতে করতে ওরা ওদের সামনে কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। সত্যিই ওদের এই অবক্ষয় আমাদের মতন স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিককে বিশেষতঃ মেয়েদের ভয় ভীত করে তুলেছে, কিন্তু তা বলে সবাই সেরকম নয়। ওদের ঠিক করার দায়িত্বও আমাদের মতন সুস্থ মানসিকতার তরুণ সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত। তাই আশা হারালে চলবে কেন”!

কথায় কথায় সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল, তারা জানে না। করিম চাচার বাহন এসে তাদের বাড়ির দরজায় থামলো তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। গ্রামের লোকেরা এইসময় প্রায় শুতে চলে যায়। প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী কথা বলছিলেন, – ছেলের বিষয়ে।

“ডাক্তার হয়ে এলে এখানেই ওকে একটা ডিসপেনসারি খুলে বসিয়ে দেব ভাবছি,” বললেন বাবা।

– “না গো ও তো আরও পড়বে বলছে। দিল্লীতে সব বড় জায়গায় হৃদযন্ত্র অপারেশন করতে শিখবে, আমাকে বলেছিল”। – মা জানালেন।

“সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু খুব বড় ডাক্তার হলে তো শহরের হাসপাতালগুলো ওদের কিনে নেবে, বন্দী করে রাখবে তাদের নার্সিং হোমে, টাকা পয়সা অর্থ – সুন্দরী স্ত্রী এইসব লোভ দেখিয়ে। তখন কি আর সে এই গ্রামের মানুষের সেবায় লাগবে”?

ঠিক এই সময়ে বাইরের থেকে হাঁক ডাক শুরু করলেন করিম চাচা, – “মাদুর জেঠু আসুন, দেখুন কাকে নিয়ে এসেছি।

ছাতা হাতে মা বাবা ছুটে বেরিয়ে এলেন, সদর দরজার বেড়া ডিঙিয়ে, এক উঠোন জল ছপিছপিয়ে।

নেমেই পায়ের উপর ঝুঁকে প্রণাম সারলো অর্ণব। আহুতি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকারের সামনে। অর্ণব বলল, – ‘মা এর নাম আহুতি, ওর গ্রামও অনেক দূরে, আজ আমাদের বাড়িতেই থাকবে’।

– “আহা গো বাছা ,মেয়ে আমার ভিজে একেবারে চুপড়ি হয়ে গেছে, এস মা আগে ঘরে এসে কাপড় ছাড়ো, মুখ হাত পা ধুয়ে নাও, তারপরে সব বেত্তান্ত শুনবো”।

বাবাও ওর ব্যাগটি তুলে নিলেন অক্লেশে “এসো এসো মা লক্ষ্মী, কোনো দ্বিধা করোনা”।

এমন আন্তরিকতায় কার মনে কি সংশয় থাকতে পারে!

ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। চার বোন আরাধনা, অর্চনা, আরতি ও আহুতি তারপর তাদের ভাইয়ের জন্ম দিয়েই মায়ের মৃত্যু হয়। বড় বোনেরা সর্বদা ভাইয়ের যত্নে ব্যস্ত। ঠাকুমা সংসার দেখেন। স্বামী পরিত্যক্ত মাসী রান্নাবান্না সামলান। তাঁরও দুটি ছেলে মেয়ে। আহুতি একটু একা একাই খেলা করে বেড়ায়। ঠাকুর ঘরে বসে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে সে। পাশের বাড়ির দিদি ‘নিবেদিতা’ স্কুলে পড়তেন, সেখানেই হোস্টেলে থাকতেন। তার আগ্রহেই আরতি ও আহুতি ভর্তি হল, কলকাতার বাগবাজারে গিয়ে,সেই বিখ্যাত বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আরতি চলে গেল B.Sc নার্সিং পড়তে। বড়দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল। সেই আশ্রিত মাসীর সাথে ঠাকুমার ঝগড়া হওয়ায় তিনিও তাঁর গ্রামে চলে গেলেন। ক’দিন পরেই জানা গেল, তাদের ভাই পড়াশুনো করে না, গ্রামের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে, তাই মন খুব খারাপ, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না তাই আহুতির। বিয়ে থাওয়া সংসারের প্রতি আকর্ষণ তার ক্রমশঃ কমে এসেছে। সংস্কৃত নিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যই ছিল, আমাদের ধর্মশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করা। নিবেদিতা স্কুলের মাতাজীদের আদর্শ, নিরাসক্ত, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ভাবনায় সিক্ত হয়ে আছে সে।

‘অর্ণবদের’ বাড়ি এসে বড় ভালো লাগলো তার। ভীষণ শান্তি ও আনন্দময় পরিবেশে মায়ের স্নেহপূর্ণ ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে দিল।

অর্ণব ও আহুতি যতক্ষণ ভিজে কাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুযে  এসে বাইরের খোলা বারান্দায় দাঁড়ালো, বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশে একফালি চাঁদ মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, বাগান থেকে জুঁই, চামেলী কিম্বা গন্ধরাজের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্যাঙগুলো একনাগাড়ে গান শুনিয়ে যাচ্ছে গ্যাঙোর গ্যাঙোর গ্যাঙ করে।

মা ততক্ষনে এদের জন্য গরম খিচুড়ি নামিয়ে বেগুনী ভাজছেন, তাঁদের খাওয়া দাওয়া আগেই হয়ে গিয়েছিল। বাবা পুজোর ঘরে ঠাকুরকে শয়ন করিয়ে, বাসি ফুলগুলি সরিয়ে সকালের জন্য ঘরটি পরিষ্কার করে, পূর্ব পুরুষের ছবিতে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে বেরিয়ে এলেন। প্রতিদিনই এই কাজগুলি তাঁকে নিয়ম করে করতে দেখা যায়। সকালে উঠেই আবার স্নান সেরে ঠাকুরের ফুল তুলে দেন স্ত্রীকে, পুজোর জন্য।

অর্ণবের সঙ্গে মেয়েটিকে আসতে দেখে একটু অবাক হলেও কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি জাগেনি তাঁর মনে, বরং ভালোই লাগলো, ডাক্তারি পাশ করে এইরকম একটি সঙ্গিনী যদি সে পেয়ে থাকে, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ছেলেকে সংসারী করে সফল ডাক্তার রূপে দেখতে চান তিনি। বয়স বাড়ছে তাঁর। ভাগ্নে শংকর যদিও তাঁর ব্যবসাপত্র – মাদুর তৈরী – বিক্রি ইত্যাদি ভালোই সামলে নেয়, আজকাল চাষ – বাসও ভাইয়ের ছেলেরা উৎসাহ নিয়ে করে। প্রচুর আলু ও পুকুরের মাছ তাঁকে – তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে সচ্ছলতার মধ্যেই রেখেছে। এবার একটা নাতি-নাতনি দেখার শখ জাগছে মনে। স্ত্রী কিন্তু এতো তাড়াতাড়িতে ওর সম্বন্ধ দেখতে বা বিয়ের প্রস্তাব আনতে ইচ্ছুক নন। একজন নারী হয়েও পড়াশুনো বা জ্ঞান অর্জনের উচ্চ আকাঙ্খা তাঁর প্রবল। স্কুলের গন্ডী পার হবার আগেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু পরিবারের ছেলে মেয়ে সবাইকে খুব উৎসাহ দেন , ভালো করে লেখা পড়া শিখতে। নিজের তো মেয়ে হয়নি ভাই, দেওর বা ননদদের মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের পিপাসা জাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। তারা সবাই তাঁর আগ্রহে B.A., M.A., B.Ed ইত্যাদিতে মহিষাদল কলেজে বা বর্দ্ধমান বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে। তাঁর ছেলে অর্ণব এদের সবার মধ্যে বেশি মেধাবী ছিল এবং ডাক্তারি পাশ করেও সে যেন আরও পড়াশোনা করে, বড় বড় অপারেশন করে রুগীদের বাঁচাতে পারে, সমাজের অনেক মানুষের সেবা করে – গরীব দুঃখী কে যেন ভালোবাসতে পারে – এটাই তাঁর ইচ্ছে। গ্রামের লোকেরা বলেন, এমন ‘মা’ না হলে কি আর ছেলে ‘রত্নগর্ভা’ হয়।

রান্না করতে করতে ভাবছেন তিনি, মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার কথা অর্ণব তো বলেনি কখনও। কিন্তু বড় সুন্দর মায়াময় চোখ মেয়েটির, হয়তো ওর সঙ্গে একসাথে ডাক্তারি পড়ে। ভালোই হয়, যদি পরে  তাঁর পুত্রবধূ হয়ে আসে। খিচুড়ি থালায় ঢালতে ঢালতে হাসি পেল তাঁর, আমাদের মন গুলো কেমন ! একটুতেই কত আগে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল দেওয়ার মত হল এটা। – ঠাকুরের ইচ্ছে ছাড়া তো একটা পাতাও নড়ে না – তাঁর বহু কৃপা লাভ করেছেন তিনি। এতসুন্দর স্বামী, সংসার ভরা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু প্রতিবেশীর ভালোবাসা – এ সবই তো অযাচিত ভাবে পাওয়া। এখন তাঁর প্রতি শরণাগত হয়ে থাকাটা, সবচেয়ে বড় কর্ত্তব্য। এসব নিয়ে একদম আর ভাববেন না। দেখি  না ছেলে কি বলে? মেয়েটিরই বা মনের মধ্যে কি আছে! কেমন বংশ, পরিবার, জাত, পাত, ধর্ম নিয়ে তাঁর মাথা ব্যাথা নেই, শুধু মনের মিল হওয়া চাই।

খাওয়ার ঘরে সুন্দর আসন পেতে বসালেন দুজনকে। ভারী ভদ্র মেয়েটি, ‘আপনারা খাবেন না’? জানতে চাইল সে। ‘না গো মা আমাদের খাওয়া অনেক্ষন হয়ে গেছে,’ বললেন মা, খাবারে হাত দেওয়ার আগে  ঠাকুরকে নিবেদন করলো, তারপর মুখে খাবার তুলে নিল সলজ্জভাবে। “কী সুন্দর স্বাদ, এত সুন্দর খিচুড়ি আগে কখনও এমন যত্ন করে বসে কেউ খাওয়াননি আমাকে”। অর্ণব বলল, – “আমার মায়ের হাতের বেগুনী তো খাননি এখনও, খান, একটু কামড় দিয়ে দেখুন, আরও চাইবেন। – মা আরও ‘চার ছ’টা দাও গো, এই কটাতে কি হবে আমার”।

-মা বললেন, “আজ ঝুড়িতে এই কটাই বেগুন পড়েছিল বাবা, কাল সকালে বাগানের গাছ থেকে তুলে করে দেব, মুড়ির সঙ্গে খাস”।

খাওয়া শেষে মায়ের ঘরে পাশের চৌকিতে শোবার জায়গা হল আহুতির। অর্ণব নিজের ঘরে টান টান সোজা হয়ে শুলো। সারাদিনের ঘটনা ও ধকলের কথা মনে পড়ল তার। বাবা ধীর পায়ে এসে ঢুকলেন তার ঘরে। “আজ খুব ক্লান্ত আছো, ঘুমিয়ে পড়ো বাবু, সকালে উঠে কথা হবে”।

বিছানায় বসে আহুতি শোবার আগেকার প্রার্থনাটি বলছে – চোখ বুজে – মা বিরক্ত না করে নিজের চৌকিতে উঠে বসলেন। তাঁর পায়ের শব্দ পেয়ে তাকালো আহুতি। ধীরে ধীরে এবার বলে চলল, তাদের বাসে ওঠা – ঐ ছেলেগুলির পিছু নেওয়া – বৃদ্ধ এক ভদ্রলোকের হুমকি ও অর্ণবের সক্রিয় ভূমিকায় – কি ভাবে আজ তার সম্মান রক্ষা পেয়েছে – প্রত্যেক ঘটনার কথা। বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তার। গলা বন্ধ হয়ে এল। মা উঠে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠাকুরই রক্ষা করেছেন। সময়মত তিনি আমার ছেলের মাথায় যে বুদ্ধি জুগিয়েছেন, সে তোমাকে সোজা বাড়ি নিয়ে এসেছে – খুব ভালো করেছে। আমাদের গ্রামের করিম ড্রাইভারও ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছেছে, না হলে হয়ত একটা অঘটন ঘটে যেত”। – ভয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। বার বার মাথায় দু হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানাতে লাগলেন তাঁর ইষ্ট দেবতার কাছে। যেন নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। কী অপূর্ব মমতাময়ী তাঁর রূপ। মাতৃহীনা আহুতির চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল। অনেক্ষন ঘুম এল না তার।

সকালবেলায় স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলো মায়ের সঙ্গে। মা ফুল চন্দন দিয়ে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রী শ্রী মা ও বিবেকানন্দের ছবিগুলি সাজালেন, – ঘরের গোপালকে বাতাসা জল ও একটু ফল কেটে ধুপ ধুনো জ্বেলে পুজো করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলেন ,মেয়েটি সেই একইভাবে বসে জপ করে চলেছে – তার পবিত্র মুখ, বসার ভঙ্গি, নীরব উপস্থিতি মা কে মুগ্ধ করে দিল।

একটু পরেই হটাৎ বাইরে “করিম চাচা”র গলা শোনা গেল – “মাদুর জেঠু, কেউ যাবেন নাকি গো কাঁথি শহরে? আমি যাচ্ছি এখন”।

বাবা আর অর্ণব চা নিয়ে বসে গল্প করছিল বারান্দায়। চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে উঠে গিয়ে বললেন তাকে – “ঘরে অতিথি এসেছে, ভাত না খাইয়ে তোমার জেঠিমা কি ছাড়বে ঐ মেয়েটিকে? তুমি বরং দুপুরে খেতে এলে একবার ডাক দিও। নইলে বিকেলে অর্ণব মহেশের গাড়িতে ছেড়ে আসবে”।

– “না গো জেঠু, আমিই নিয়ে যাব বিকেলে। অন্য কাউকে ডেকো না” বললো করিম।

 গ্রামের প্রতিবেশীদের কাছে ততক্ষনে অর্ণবের আগমন বার্তা বিশেষতঃ একজন মেয়ে বান্ধবী সঙ্গে নিয়ে আসার খবর বোধহয় রটে গেছে। কাকা-কাকী, পিসি ও তাদের ছেলে-মেয়েরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছে, তাদের বাড়ির উঠোনে। অবশ্য অর্ণব এলে প্রতিবারই তারা আসে, এবং হৈ চৈ, গানে কথায়, নানান গল্পে হাসিতে প্রফুল্লবাবুর বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যায়। মাদুর বোনা, বড়ি দেওয়া এমন কি চাষের কাজ  ফেলে – কাকাতো, মামাতো ভাই-বোন, ভাগ্নেরা যে যেভাবে পারে, এই আনন্দমুখর পরিবারে সক্রিয় যোগদান দেয়।

আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘ন’ টা বাজতে না বাজতেই তারা এসে সব মুড়ি চপ, পান্তাভাত, লুচি মণ্ডা-মিঠাই যার যা মন চায় তা দিয়ে জলখাবার খেয়ে পেট ভরিয়েছে এবং এন্তার হৈ চৈ করে অর্ণবের পেছনেও লেগেছে। –

“কি গো ছোড়দা ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? হটাৎ জোড়ে একেবারে এসে সবাইকে অবাক করে দেবে ভেবেছিলে”?

– “আরে চুপ, চুপ, চুপ কর তোরা। কি সব আবোল তাবোল বলছিস, উনি শুনতে পেলে কি ভাববেন বলতো”?

– পিসিমার ছেলেকে সবাই বড়দা, জেঠুর ছেলেকে মেজদা, এবং এই প্রফুল্লকাকার সবচেয়ে প্রিয় দাদাকে ‘ছোড়দা’ ডাকে, ভালোবাসে ওর মুখের মজার মজার কথা, মিশনের স্বামীজীদের নানান অলৌকিক সব গল্প ও রবীন্দ্রসংগীত শ্যামাসংগীত এবং কথামৃতের গান শুনতে। তার মতন সারা পাড়া পরিবারকে মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা আর কারো মধ্যে নেই। বড়দা মেজদার বৌ রা এসে রান্নার কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছেন। দুই কর্মচারীকে নিয়ে এক কাকা পুকুরে জাল ফেলেছেন। ঘরে কোন অতিথি এলেই এটা করেন তারা। কারণ অন্য দিন আলাদা আলাদা হেঁসেলে রান্না হলেও কেউ এলে প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী যে সবাইকে এখানেই মাছের ঝোল ভাত খেতে বলবেন, এটা তো একটা অলিখিত ঘটনা। কেউ কাউকে নেমতন্ন বা ডাকা ডাকির প্রয়োজন মনে করেন না এখানে। মালি কলাপাতা কেটে আনে, শশী জেঠি শাক কাটেন ঝুড়ি ঝুড়ি। মদন কাকার মাচার থেকে সবচেয়ে সব চেয়ে বড় বড় কুমড়ো – লাউ ডাঁটা সমেত কেটে আনা হয়। পাশাপাশি পুকুরে গুগলি তোলেন ওরা সব শহরের লোকেদের একটু নতুন জিনিস খাওয়াবেন বলে।

শান্তি মামীর ভাণ্ডার থেকে বর্ষার জন্যে তুলে রাখা শুকনো আমসী কুল ও পুরোনো তেঁতুল বেরিয়ে পড়ে। এই রান্না ঘরে জমা করা হয় বেশ ঝাল মিষ্টি টক চাটনি হবে বলে।

সিধু ময়রার দোকানে খবর পৌঁছে যায়, আজ মাদুর জেঠুর বাড়ি অতিথি এসেছেন, রসগোল্লা ও বোঁদে পাঠাতে হবে বিকেল বেলায়। ময়রা বৌ পান চিবোতে চিবোতে জানতে চায়, “ছেলে বাড়ি এসেছে বুঝি, কলকাতা থেকে”? সঙ্গে আর ক’জন?

অর্থাৎ প্রতিবারই অর্ণব তার কলকাতার ডাক্তারি পাঠরত হোস্টেলবাসী সহপাঠীদের নিয়ে আসে। তারা অনেকেই এরকম গ্রাম, পুকুর, নদী, মাদুর বোনার কৌশল, মাছ ধরার এতো বিশাল জাল দেখেনি কখনও। সেই সব বন্ধুরা বলে ‘প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রীর আপ্যায়নের কথা, এখানকার আত্মীয়-স্বজন, সহজ সরল মানুষগুলোর কথা তারা তাদের জীবনে হয়তো কখনও ভুলতে পারবে না।

– কিন্তু এবারে যে একেবারে অন্য ব্যাপার। অর্ণবের সঙ্গে বান্ধবী তাও অতি সুন্দরী সুশীলা। তাকে তো আলাদা ভাবে সমাদর করতে হবে।

অর্ণব কত চেষ্টা করছে – বোঝাতে চাইছে যে, কাল বাসেই এই মেয়েটিকে সে প্রথম দেখলো কিন্তু কে তার কথা শোনে। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে আহূতিকে। সে অবাক হলেও, লজ্জা পেলেও এই বাড়ির মজাদার উজ্জ্বল পরিবেশ, সকলের স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক ব্যবহার তার মন ছুঁয়ে গেছে। নিজেদের পরিবারে তো কখনও সে এরকম পায়নি। এমন মায়ের স্নেহে কোন সংসার যে এত স্নিগ্ধ শীতল হয়, পিতার গাম্ভীর্য্যময় কিন্তু প্রশান্ত ব্যক্তিত্ব – সমস্ত গ্রামের মানুষকে যেন এক করে রাখতে পেরেছে। তিনি যেন তাদের মাথার ছাতা। কাজেই বিকেলে যখন সবাই সমবেত ভাবে চাইলো – “না না আজ তোমার যাওয়া চলবে না, সন্ধ্যে বেলায় গান বাজনার আসর বসাবো আমরা। তবলা, হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, খঞ্জনী, একটা পুরোনো বেহালা সব বেরিয়ে এল। শতরঞ্চির ওপরে সাজানো হল একের পর এক।

আজ প্রফুল্লবাবুর মনও ভীষণ আনন্দে ভরে গেছে নিজের কাঠের একটা পুরোনো বাক্স খুলে তাঁর ‘ব্যাঞ্জো’টা বের করে আনলেন এবং ভাল করে মুছে দেখতে লাগলেন ,ওটা এখনও বাজছে কিনা। ভাই বেহালা বাজান, ভাগ্নেরও খোল বাজানোর হাতটি বড় সুন্দর। গ্রামের কীর্তনে তাকে সবাই ডেকে নিয়ে যায়।

প্রফুলবাবুর বাড়িতেও প্রতি পূর্ণিমায় কীর্তন এবং অমাবস্যায় শ্যামাসংগীত গাইতে আসে গ্রামের ছেলেরা, আজ বড় ভাল লাগছে – ছেলে বাড়ি আসায়, বিশেষ করে ঐ মেয়েটির উপস্থিতি তার মনকেও বোধহয় একটা নতুন স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে।

সন্ধ্যে বেলায় শুরু হল তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান। প্রথমে পিসিমার নাতি কবিতা শোনালো – সৎপাত্র – যেটা বলে সে এবার স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেয়েছে। বড়দার মেয়ে চুমকি “লক্ষ্মীর পরীক্ষা” নাটকে ক্ষীরো ঝি-এর ভূমিকায় অভিনয় করে খুব নাম কুড়িয়েছে, সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে। ছোট্ট সেই মেয়েটির চোখ মুখ ঘুরিয়ে অভিনয় দেখে বাড়ি সুদ্ধ লোক তো হেসে অস্থির। এরপর অর্ণব গলা ছেড়ে গান ধরল – ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’। কাকা বেহালায় অদ্ভুত মায়াময় সুর তুললেন। প্রফুলবাবুও আজ বেশ ছেলে মানুষের মতন একটা লোকগীতির তান শোনালেন। সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। এক বৌদি গাইলো “দাড়াও আমার আঁখির আগে”।

এবারে আহুতির পেছনে পড়ল তারা। তোমাকে শোনাতেই হবে কিছু। তোমার জন্যেই আজ সকলে এত উৎসাহে চঞ্চল।

সে চোখ বুজে শ্রী শ্রী মাকে স্মরণ করে প্রথমে তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো ও পরে গান ধরলো ,

“সকলি তোমার ইচ্ছা,

ইচ্ছাময়ী তারা তুমি,

তোমার কর্ম তুমি করো মা,

লোকে বলে করি আমি।”

অন্যরা খোল ও হারমোনিয়াম বাজালো তার সাথে। এতো সুন্দর এক পবিত্র পরিবেশ রচনা হল যা অর্ণবের মনে ভীষণ ভাবে দোলা লাগলো। বেশ কিছুক্ষন সে চুপ করে বসে রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে সে গান গেয়ে চলল, একের পর এক। অন্যরা সব যে যার বাড়ি চলে গেছেন, মা বাবা ও আহুতি নিস্তব্ধে বসে আছে। অর্ণব গেয়ে চলেছে ,একের পর এক গান, প্রথমে ই বিবেকানন্দের সেই অসামান্য গান, – মন চলো নিজ নিকেতনে- —

তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত, আজি যত তারা তব আকাশে, সবি মোর প্রাণ ভরি বিকাশে।

– জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, এই লভিনু সঙ্গ তব …… ,

পরদিন সকালবেলায় করিম চাচার ট্রেকারে বসে আহূতিকে তার গ্রামে ছাড়তে যাবার সময় হটাৎ অর্ণব বলল – “আপনি এখানে কপালকুন্ডলার কালী মন্দিরটিতে গেছেন কখনও?”

– আহুতি ঘাড় নেড়ে জানালো – না সে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

অর্ণব করিম চাচা কে বললে – ‘চাচা চলুন একটু ওদিকটা ঘুরে যাই’। “বঙ্কিমচন্দ্রের গল্পের নায়ক নবকুমার এইখানে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে কাপালিকের হাতে পড়েছিলেন। সমুদ্র কিনার  থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই কালী মন্দিরে কপালকুন্ডলার সঙ্গে তাঁর দেখা। পরে তপস্বিনী কপালকুন্ডলার সারল্য ও ত্যাগের কাহিনী পড়েছেন, তাঁরা।এই গল্পের  সেই বিখ্যাত উক্তি তার খুব ভালো লাগে, “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই উক্তি সব সময় মনে ভাবে সে, আজ এখানে নির্জনে বসে দুজনে কিছুক্ষন কোন কথা খুঁজে পেল না।

নীরবতা তাদের মধ্যে অনেক কথার তরঙ্গ প্রবাহ সঞ্চালিত করলো। ধীরে ধীরে একসময় অর্ণব বলল, –

– “আহুতি আপনাকে আমার মা বাবা পরিবারের সকলের খুব ভাল লেগেছে।

– আহুতি সলজ্জ্ব হেসে জানালো, তারও ওদের সবাইকে ভীষণ ভালো লেগেছে। এতো সুন্দর পরিবার সে আগে কখনও দেখেনি। অর্ণব আরও যদি কিছু বলে বসে – কোন প্রস্তাব – কোন ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেলে, তার আগেই তাকে বলে দেওয়া ভালো –

‘আমি – সারদা মঠে সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চাই। শ্রদ্ধেয়া অজয় প্রানা মাতাজীর মতন মেয়েদের কল্যানে, সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে – ঐ সারদা মঠের কোন বিদ্যালয়ে ‘শিক্ষিকা’ রূপে জীবন কাটাতে শপথ নিয়েছি’।

অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে এবার খুব সপ্রতিভ ভাবে হাসি মুখে বলল, আমারও তো একই পথ, আমিও যে বেলুড়ে ব্রহ্মচারী হবার জন্যে নাম লিখিয়ে এসেছি। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ডাক্তারের প্রয়োজন খুব বেশি। চারিদিকে নানা ধরণের বড় বড় হাসপাতাল খোলা হয়েছে।

মহারাজরা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে সেগুলি চালনা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ছেন। দেরাদুনের চোখের হাসপাতাল, সারগাছির ডিসপেনসারি দেখে আমার এই কথাই মনে হয়েছে। ডাক্তার সন্ন্যাসী হয়ে ঐ সেবাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর চিকিৎসায় জীবন দানের কথা। – “যাক আপনি আমায় বাঁচালেন, বাবা – মায়ের মতন আপনার মনেও যদি অন্য এক স্বপ্ন – কল্পনা বাসা বাঁধতো তাহলে আমি বড্ড মুশকিলে পড়ে যেতাম। আপনাকে কিভাবে না করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। – মা বাবাকে মানিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু আর পাঁচজনের মতন বিয়ে করে ঘর সংসার করা আমাদের দুজনের জন্যেই নয়। ঠাকুরের কৃপায় আমরা একই পথের পথিক হলেও আমাদের যাত্রা তো ভিন্ন দিকে, ঠিক করে রেখেছেন ঠাকুর। –

অদ্ভুদ বিচ্ছেদ ব্যাথা এসে তীর বিদ্ধ করলো আহুতির বুকে। তার নারী সত্তা চমকে উঠলো,- প্রণাম জানালো, সে ভবিষ্যতের তরুণ সন্ন্যাসীকে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে এলো সমুদ্রের ধারে। করিম চাচা কিছু লোক ভরে ট্রেকার নিয়ে পাশের গ্রামে ছাড়তে গেছেন। খুব সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা বসবার জন্য। একসারি নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে প্রভাতের সূর্য দেখা যাচ্ছে। মাঝিরা মাছ ধরার ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে জলে ভেসেছে – আকাশে কালো সাদা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ভেসে চলেছে। চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে আছে – দুই তরুণ – তরুণী, – ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অর্ণবই প্রথম কথা শুরু করল – রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা খুব মনে পড়ছে –  এইসময়ে – জানেন? – ‘এই যে তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ।’ আহুতি ঘাড় নাড়লো – ‘না শুনেছি তবে কথাগুলো মনে নেই’। –

– ওতে একটা লাইন আছে, –

“এই যে মধুর আলস  ভরে, –

মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে, –

এই যে বাতাস দেহে করে –

অমৃত ক্ষরণ”।

এই “অমৃত ক্ষরণের” কথা গুরুদেব – রবীন্দ্রনাথ যে কি ভাবে ভাবলেন তা আমার মনে হলে খুব অবাক লাগে। –

আহুতি ‘ক্ষরণ’ মানে টা ধরতে চাইল, কিন্তু পারলো না।

অর্ণব বলল, – ‘‘ডাক্তারি শাস্ত্রে তো অনেকবার রক্ত ক্ষরণ শুনেছি, – যে চুঁয়ে চুঁয়ে দেহ থেকে যখন রক্ত বেরিয়ে যায়। কিন্তু বাতাসের স্পর্শে হৃদয় আত্মা থেকে অমৃত – সুধা যখন বেরিয়ে আসে, তখন তা কতখানি মধুর ও পবিত্র হয় , তা ভাবতে পারেন?’’

এরকম অপুর্ব ভালো  আলোচনায় তাদের সময় কাটতে লাগলো।

আহুতি জিজ্ঞেস করল অর্ণবের দিকে তাকিয়ে – ‘আপনি শ্রীমদ স্বামী আত্মস্থানন্দজীর দর্শন পেয়েছেন? ওনাদের পরিবারের মানে পূর্বাশ্রমের কথা জানেন?”

– ‘হ্যাঁ, পড়েছি ওনার সম্বন্ধে আর স্কুল থেকে একবার বেলুড়ে নিয়ে গিয়েছিল, বিবেকানন্দের জন্মদিনে, – Youth Day, 12th January, তখন কাছে গিয়ে কথা শোনার ও প্রণাম করার সুযোগ হয়েছিল। জানেন মুর্শিদাবাদের ঐ গ্রাম থেকে ওনার দুই বোন সারদা মঠে ও ভাই রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছেন।  এরকম অসাধারন সব  পরিবার আরো অনেক আছে , যেখানে বাবা ঠাকুরের কাছে নিবেদন করেছেন ,তার পুত্র সন্তান কে তিনি যেন পায়ে স্থান দেন, পরে সেই ছেলে টি ও সন্যাসী হয়েছেন l খুব ভালো লাগছে অর্ণবের ঠিক সম মনস্কতার একজন বন্ধু র সঙ্গে কথা বলতে,  উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সে বলে চললো ‘‘স্বামী গহনানন্দজী মহারাজের এক দাদা প্রভানন্দ মহারাজ শিলং এর দুস্থ বঞ্চিত ,অবহেলিত  গরীব ছেলে মেয়েদের জন্যে চেরাপুঞ্জি র মতন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়  গড়ে তোলেন ,বহু কষ্ট সাধন করে, এবং  মাত্র ৩৭ বছরে তিনি শরীর ত্যাগ করেন, এইসব মহান মানুষদের পথে যেতে চাই আমি।

আহুতির মনে হলো ত্যাগের মন্ত্রে সে যেন আজ দীক্ষা গ্রহণ করলো ,এক অভিনব ঘটনার মধ্যে ,এক অসাধারন তারুণ্যের মাধ্যমে। নিজের জীবনের উদ্যেশ্য সফল করতে অনুপ্রেরণা পেলো আরো জোর বাড়লো তার, একই পথের পথিক কে প্রনাম জানালো  মনে মনে।

অর্ণব ঘড়ি দেখলো, করিম চাচার আসতে দেরী হচ্ছে। আপন মনে সে গুন গুন করছে, – ‘চিন্তয় মম মানস হরি’,এই গানটা স্বামী সর্বজ্ঞানন্দজী মহারাজের গলায় শুনেছিল দেওঘরে। উনি সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অদ্ভুত গানের গলা ও ভক্তি যুক্ত চেহারা, ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক স্নেহ। এঁদের মতন পথ পরিদর্শক মহারাজদের দেখে এখনও কত ছেলে ঠাকুরের সেবায়, বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মিশনে নাম লেখাচ্ছে। অনেকেই জানেন না সুদূর অরুণাচলে পাহাড়ের কোলে অরণ্যানীর মাঝে ঈশত্মানন্দজী মহারাজের তত্ত্বাবধানে কী সুন্দর বিশাল এক শিক্ষা – শিক্ষন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই তারা চুপ। হটাৎ অর্ণব জানতে চাইলো, – ‘আসাম সাইডে বেড়াতে গেছেন কখনও? ‘আহুতির পরিবারে কেউ ভ্রমণে উৎসাহ পায় না। সে মাথা নাড়লো।

অরুণাচলে মাতাজীদের পরিচালিত আশ্রমে একবার ঘুরে আসুন খুব শান্তি পাবেন এবং অনেক কিছু জ্ঞানলাভ হবে।

আহুতি জানতে চাইল – ‘আর কোথায় কোথায় ঘুরেছেন বলুন না শুনতে খুব ভালো লাগছে’।

“রাজস্থানের ক্ষেত্রীতে গিয়ে ভীষণ অনুপ্রেরণা পেয়েছি। রাজা মঙ্গল সিং  সিং-এর কথা আলোয়াড়ের সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে?”

– হ্যাঁ, বিবেকানন্দকে যখন তিনি পুতুল পুজোর মানে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন রাজবাড়ীর দেওয়াল থেকে তিনি তাঁদের বাবা বা দাদু অর্থাৎ পূর্ব পুরুষের তৈল চিত্রটি পেড়ে মাটিতে রাখতে বললেন এবং রাজাকে বললেন ওর ওপরে পা দিতে। রাজা এবং তার সভাসদগন অবাক – “তা  কি করে হয়, এটি আমাদের মহারাজের প্রতিকৃতি, পা দিলে অপরাধ হবে না?”

– কিন্তু উনি এখন তো আর ঐ ছবির মধ্যে বিরাজমান নেই। তাহলে? নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, – মানুষ নিজের ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়ে পুতুলকে মৃন্ময় থেকে চিন্ময় করে নিতে পারে, তাই সে ঐ পাথরের মূর্ত্তিতেও ঈষ্টকে দর্শন ও পূজন করে। গল্পটিতে এই অকাট্য যুক্তি রাজাকে মুগ্ধ করে।

অর্ণব আরও বলে চলল, ‘আর জানেন তো রাজস্থানের  ক্ষেত্রীর রাজ বাড়িতে   আমাদের বিবেকানন্দের এক বোধদয় হয়। আহুতি অবাক হয়ে তরুণ ডাক্তারকে দেখতে লাগলো।

সেখানে বাঈজী -ময়নাবাই যখন রাজার সভায় গান গাইতে বসেছেন তখন বিবেকানন্দ নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকার জন্যে আসর পরিত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকেন। এমন সময় গায়িকা তার সুরেলা কণ্ঠে গান ধরেন, –

“প্রভু মেরে অবগুন চিতে না

ধরো – সমদর্শী হ্যায় নাম  তাহার “,

সেই গানটি শুনে বিবেকানন্দের বিবেক জাগ্রত হয়, তিনি মাতৃ জাতির প্রতি অবহেলা করে লজ্জিত হন এবং ক্ষমা চেয়ে নেন ঐ রমণীর কাছে নত – মস্তকে।

এবার করিম চাচার ডাক শোনা গেল – “এসো গো মা, এবারে চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে আসি।” তখনও অর্ণব বলে চলেছে, “রাজস্থানের এই ময়নাবাঈয়ের জীবনেও এক আমূল পরিবর্তন আসে স্বামীজিকে দেখার পর থেকে, তাঁকে আর রাজাদের রাজসভায় গান গাইতে শোনা যায়নি।

করিম চাচার গাড়ীতে বসে একটু দ্বিধাগ্রস্থ কুন্ঠিত গলায় আহুতি বলল – একটা অনুরোধ করব, যদি কিছু মনে না করেন, –

– “আরে আমরা দুজন তো এখন একই পথের পথিক, অনুরোধ নয় স্বচ্ছন্দ্যেই বলে ফেলুন।”

– “করিম চাচার সঙ্গে আমিই চলে যাই আপনি বরং বাড়ি ফিরে যান, বাড়িতে সবাই আপনাকে পেয়ে কত খুশি হয়েছেন।”

একটু গভীর দৃষ্টিতে অর্ণব তাকালো, তার দিকে, মনে হল যেন মনের ভেতরে কি লেখা আছে তা পড়া হয়ে গেল তার।

-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, করিম চাচা আমাকে কাঁথি বাজারের এই মোড়টাতেই নামিয়ে দাও। বাবার ওষুধগুলো কিনতে হবে। তুমি এনাকে একেবারে ঘরের দরজা পর্যন্ত দিয়ে এসো, টাকা বাড়ি এসে নিয়ে নিও।

ওদের গ্রাম বা বাড়ির পরিবেশ যে অন্যরকম তা বুঝতে অসুবিধা হল না অর্ণবের।

বাড়ি ফিরতেই মা ডাক দিলেন, চান করে রান্না ঘরে এসে বোস, আমার কাছে পিঁড়ি পেতে রেখেছি। গরম গরম মাছ ভাজা খাবি আয়।

আজ বাড়ি একদম খালি, বাবা মাদুরের ঘাস কাটতে মাঠে গেছেন, সারাদিন ভাগ্নে ভাইপোদের সঙ্গে ওখানেই কাটাবেন। মা লুচি তরকারি, মিষ্টি বানিয়ে সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। সাথে এক কান্দি কলা, নারকেলও আছে। অর্ণব বুঝলো মা আজ অনেকদিন পরে তাকে একা পেয়ে গল্প করতে চাইছেন। ভালোই হল তারও মন খুলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা জানাতে হবে আজ।

পাতে ডাল, ভাত, চচ্চড়ি ও মাছ ভাজা। “তোমাকেও আমার সঙ্গে বসতে হবে মা, তা না হলে আমি ভাতে হাত দেব না।” বলল অর্ণব।

“হ্যাঁ রে বাবা বসছি, তুই আগে শুরু কর না, আর কয়েকটা ভেজে নিই।”

– “না বসো তুমি আগে, নামাও কড়াইটা, ছ্যাং ছ্যাং করলে কথা বলব কি করে, তুমি শুনতে পাবে না যে।”

খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে হাত ধুয়ে এসে মায়ের কাছ টা তে পিঁড়ি টা টেনে নিয়ে সে বলতে আরম্ভ করলো – “মা আমি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে চাই।

– “আমি বুঝে গেছি, এই মেয়েটিকে তোর ভালো লেগেছে তাই না? তোর বাবা ও আমারও আহূতিকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এই রকমই একটি মেয়ের . . . .

মায়ের কথাটা শেষ করতে দিল না, অর্ণব – হ্যাঁ, মা আহুতি ভালো লাগার মতোই মেয়ে, কিন্তু আমাদের দুজনের পথ যে দু দিকে চলে যাচ্ছে।

– ‘সে আবার কি রকম কথা? ওদের বাড়ির লোকের আপত্তি হবে মনে হচ্ছে?’

– না না ওদের বাড়ি তো আমি যাই নি।

– ও তাহলে আমরা মাহিষ্য,ওরা  ব্রাহ্মণ তাই আপত্তি বলছিস?

– আরে তোমরা তো আগেই অনেক অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছো।

– আমাদের মধ্যে সেরকম কোন ব্যাপার হয় নি, আর হবার সম্ভাবনাও নেই কারন

– আরে আমরা এখনই বলছি না, তোর তো এখন তেইশ আরও দুবছর যাক – তারপর না হয় —

– এবার বেশ গম্ভীরভাবে অর্ণব জানালো, “মা আমি – আমি মিশনে নাম লিখিয়েছি ব্রহ্মচারী হবার জন্য।”

– “সে কী, তাহলে তোর ডাক্তারি করা হবে না? বিয়ে থাওয়া নিয়ে বাবা যে স্বপ্ন দেখছেন সে সব. . .” আর কথা বলতে পারলেন না তিনি, গলাটা ধরে এল। –

– “ডাক্তার তো হবোই মা, দিল্লীর AIIMS -এ সুযোগ ও পেয়ে গেছি সার্জারী শল্যবিদ্যায় MS করবার, কিন্তু মিশনের মাধ্যমে, বিবেকানন্দের আদর্শে – শ্রী শ্রী মা ও ঠাকুরের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে আমি – সন্ন্যাসী জীবন যাপন করতে চাই গো মা।”

-‘ত্যাগের মন্ত্রে যখন দীক্ষা নিয়েছো, ধীরে ধীরে ধরা গলায় বললেন অর্ণবের মা – তখন আমি তো এতে বাধা দিতে পারি না বাবা, তবে.. . ‘-

‘তবে আর কিছুই নেই মা, বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার, প্রথমে কষ্ট পেলেও একদিন তাঁর মনেও শান্তি এনে দিতে পারবো আমি, আমার সেবার কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষা, সংস্কার ও প্রকৃত মূল্যবোধেরই তো পরিচয় পাবে সকলে। তিনি নিশ্চয় আমাকে আশীর্বাদ দেবেন।”

আসতে আসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনের ধারে পুকুর পারে গিয়ে চুপ করে বসে রইল অর্ণব।

মা এঁটো হাতে কতক্ষন একভাবে কাটিয়ে দিলেন জানেন না।

সন্ধ্যে বেলায় শাঁখে ফু দিতে দিতে লক্ষ্য করলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের ছবিটা আজ যেন আরও জ্বলজ্বল করছে। তাঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন তিনি। সারদা মা তাঁর ভক্তদের বলতেন, – “মন তো নয় মা যেন মত্ত হাতি” তাকে বশ করার সবচেয়ে বড় উপায় হল জপ করা, – ‘জপাৎ সিদ্ধ’। আর কারও যদি জপ করতে মন না লাগে তাহলে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতে বলতেন তিনি।

আজ অর্ণবের সন্ন্যাস গ্রহণের শুভ অভিপ্রায় জানার পর থেকে মা কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এই এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন ঠাকুরের ছবির দিকে।

ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের দুই চোখের দৃষ্টি দুই রকমের। আগে কখনও এমন ভাবে লক্ষ্য করেননি তিনি।

এক চক্ষু প্রায় বুজে এসেছে, শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাধিস্থ। অন্যটি বড় অদ্ভুত। কখনও মনে হচ্ছে হাসছেন। স্মিত অপূর্ব সে হাসি তো ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকে, চোখের তারাও কি তাতে দ্যুতি লাভ করে। পরক্ষনেই মনে হল সেই নয়ন তারা যেন নড়ে উঠলো আর তার দৃষ্টি হৃদয় ভেদ করে অন্তরের অন্তস্থলকে একটি মৃদু আলোয় ভরিয়ে দিল।

সেই আলোকে মনের সব ময়লা, ক্লেশ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা – যা এতক্ষন অন্ধকারে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, সব একনিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল, অকারণ ভয় ভাবনা।

বাইরের বারান্দায় বাবার সামনে বসে অর্ণব গান ধরেছে –

“আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়

ধুইয়ে দাও, মনের কোনের

মলিনতা সব দীনতা ধুইয়ে দাও,

নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও. . . .”

এবার সন্ধ্যে আরতি। বাবা যথারীতি কাকাকে খোল মৃদঙ্গ আনতে বলে হারমোনিয়ামটা অর্ণবের সামনে রাখলেন। নিজে খঞ্জনীটা হাতে নিলেন। মা পঞ্চ প্রদীপ জ্বেলে আরতি শুরু করলেন। তার মায়ের মতন ভক্তিমতী সরল স্বার্থ ত্যাগী মানুষ যখন ঠাকুরের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁকে সাধারন মানবী নয় যেন দেবী মনে হয়। বহুদিন ধরেই পুজোর সময় তাঁর পরনে থাকে লাল পাড় সাদা শাড়ী, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ্, ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি। কখনও ভ্রু কুঁচকে থাকে না তাঁর। কখনও বিরক্তি ভাব দেখেনি কেউ আজও সব বিষন্নতা ছেড়ে ফেলে আরতি করছেন তিনি শ্রী শ্রী মা, ভগবান ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের তিনটি ছবিতেই মালা পড়ানো, ধুপ ধুনোর সুগন্ধে গৃহের পবিত্র পরিবেশ যেন মঠ-মন্দিরে উন্নীত হয়ে গেছে।

অর্ণব হাত জোর করে কপালে ঠেকালো বেশ কিছুক্ষন পরে শুরু করল হারমোনিয়ামে সুর তুলতে –

“খন্ডন ভব বন্ধন, বন্দন বন্দি তোমায়

নিরঞ্জন নর রূপ ধর, নির্গুণ নিরাময়. . .

মোচন অঘদূষণ . . .”

বাবা, কাকা, কাকিমা ও অন্যান্য ভাই বোন প্রতিবেশী, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমার দল খোলের আওয়াজেই আসতে শুরু করেছিলেন – তাঁরাও সবাই গলা মেলালেন এক সাথে। শেষে রামকৃষ্ণ শরণ্যে …  তালি দিয়ে দিয়ে।

রাতে খাবার সময় অর্ণব জানালো কাল ভোরেই সে ট্রেন ধরবে কলকাতার উদ্দেশ্যে। করিম চাচা তাকে নিয়ে যাবেন তমলুকে  ছাড়তে।

খুব চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল সে, ব্যাগ গোছাতে। রাত্রে বিছানায় শুতেই গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোক দুটো হটাৎ মনে পড়লো এখানে দৈবী শক্তির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে –

“অভয়ং . . . .আবর্জবম এবং অহিংসা . . .  হ্রীরচাপলম্। –

ভয়শূন্য হয়ে কিভাবে সরল অন্তঃকরণে ইন্দ্রিয় সংযম করে ভগবানের নাম করতে হয় স্বাত্ত্বিকভাবে। সে কথা লেখা এখানে, স্বত্ব ভাবের গুন গুলি বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু কায়মনোবাক্যে কাহাকেও কষ্ট না দেওয়ার কথাও তো বলা হয়েছে, পরবর্তী শ্লোকে। তাহলে? মা বাবাকে কিভাবে কষ্ট দেবে সে ! সারা রাত ঘুমাতে পারছে না সে, মা, বাবা কে দুঃখ দিয়ে কি ভাবে সে নতুন জীবন শুরু করবে? তারাই তো আসল দেবতা, তারাই তো তার প্রথম গুরু। কী করা উচিত তার, বুঝে উঠতে পারছে না।

ভোরে উঠেই সে দেখলো তার বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাগজে লেখা, – “আমাদের সম্মতি দিলাম, তোমাকে ঠাকুরের পদে সঁপে দিলাম। –

আশীর্বাদ – বাবা ও মা।

ত্রিনয়নী ( Trinoyoni )

চন্দনা সেনগুপ্ত

কলকাতার এক সরকারী হাসপাতালের লেবার রুম। একটা ঘরে একগাদা মহিলা, প্রসব বেদনায় কাতর। তাঁদের সঙ্গে আগত মা, বৌদি, মাসী, দিদিরা সব বাইরের বেঞ্চে বসে আছেন। যাদের যন্ত্রনা ঘন ঘন আসছে, ঢেউয়ের মতন ওপর পেট থেকে নীচে সমস্ত শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে বা মেমব্রেন রাপচার মানে জলের থলি ভেঙে ঝর ঝর করে জল বেরিয়ে পড়ছে, তাদের অবস্থা বুঝে একেক করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – প্রসূতি ঘরে। ডাক্তার – নার্সরা ছুটে যাচ্ছেন তার পাশে।

নিজের জন্মের সময়কালে কি কি ঘটনা ঘটেছিল তা আমার জানার কথা নয়, কিন্তু মা এতবার আমাকে সেই গল্পটা করেছেন, যে মনে হয় আমি চোখের সামনে দৃশ্যটা খুবই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি। সেই প্রথম দিন থেকেই তো আমার জীবনে চমকের পর শুধু চমক দেখা দিয়েছে। ভাগ্যদেবীর ছলনা কি বুঝতে পারি আমরা? না, আমার মাও তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু আমাকে আজ তা ব্যক্ত করতেই হবে। না হলে মরেও শান্তি পাবো না আমি।

মায়ের সঙ্গে সেদিন কেউ ছিলেন না, শুধু বাবা শুকনো মুখে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। মা কে বার বার পরীক্ষা করার পর যখন নার্স দেখলেন সে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে কিন্তু অন্য মেয়েদের মতন চিৎকার করছে না, মুখ দাঁত চিপে ওঃ মা, ও বাবাঃ করতে আরম্ভ করেছেন, তখন তাঁকে নিয়ে গেল – লেবার রুমে, টেবিলে শুতেই একজন মাথার দিকে এসে দাঁড়ালেন। আরও দুজন এসে চেপে ধরলেন হাত দুটি, পায়ের কাছে ডাক্তার ম্যাডাম সাহস দিলেন, – কোন ভয় নেই, জোর দাও, বাচ্চার মাথা এসে গেছে।

আপ্রাণ চেষ্টায় জঠর বন্দি শিশুটিকে বাইরে আনতে হবে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্যে; যে বাচ্চাদানীর মুখে মাথা কুটছে শুধু মায়ের শক্তি ও চেষ্টাই তাকে ঠেলা দিয়ে নীচে নামাতে পারে। আঃ মা গো চিৎকারে ভীষণভাবে জোর লাগাতেই মাথা বেরিয়ে এলো, ডাক্তারের হাতে। হ্যাঁ এরচেয়েও বেশি force লাগাতে হবে কাঁধটা বেরুতে পারছে না, হাল ছাড়বেন না, জোর দিন – আরো – না আসছে না ঐ শিশুর দেহ। ফোরসেপ দিয়ে বেশ খানিকটা কেটে দিলেন; ডাক্তার ম্যাডাম ইউট্রাসের মুখ। একরাশ ময়লা জল, রক্ত ঠেলে বাইরে এল সেই শিশুটি এবারে। প্রথমে কাঁদছে না, এই দেখে ডাক্তার তাকে ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে দিতেই ক্যাঁ – করে কান্নার আওয়াজ বের করলো সে। মা ক্লান্ত শ্রান্ত হলেও আনন্দের ঝংকার শুনতে পেলেন, বুকের মধ্যে – যাক – বেঁচে আছে বাচ্চাটা। তাঁর প্রথম সন্তান, ধন্য হলেন তিনি, কিন্তু লেবার রুমে প্রত্যেকটি নার্স, আয়া, ডাক্তার নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি, গুঞ্জন করছে – একটা ঘরের মধ্যে থাকলেও তিনি শুনতে পেলেন – “এ মা, এ কী গো, এ তো ছেলেও নয়, মেয়েও নয়।” হাসপাতালে বোধহয় একমুহূর্ত্তে খবরটা রটে গেল। সবচেয়ে বড় সার্জেনও এসে দেখে গেলেন, বললেন, কোনরকম অপারেশন করেও কিছু করা যাবে না। এটি Third Gender – “হিজড়ে”। বাচ্চাকে মায়ের কোলের কাছে দিয়ে গেলেন একজন নার্স দিদি। বুকের নীচে ধরে স্তন পান করাতে শুরু করলেন মা। তাঁর স্নেহের অমৃত ধারায় ধন্য হল শিশুটি। সন্তান প্রাণে বেঁচে আছে, তাঁর দুধ পান করছে চকচক করে, সুন্দর দুটি চোখ মেলে অবলোকন করছে তার জন্মদায়িনীর অপূর্ব করুন মুখখানি। সে যে ছেলে বা মেয়ে নয় – কোন অদ্ভুত এক অজানা তৃতীয় সত্তা – সে কথা মা’র মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা জাগাচ্ছে না বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়।

বাবাকে বাইরে গিয়ে একজন ছোকরা জমাদার, (যে লেবার রুমের ময়লা নিতে এসেছিল এবং শুনেছে বাচ্চাটি নরমাল নয়,) বলে দিল – “তোমার ‘ছে-মে’ হয়েছে গো দাদা। এইরকম ঘটনা আমাদের এই হাসপাতালে এই প্রথম, হৈ চৈ পড়ে গেছে”।

চব্বিশ বছরের সাধারণ একজন কেরানী, কথাটা শুনে ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। এখন কি করবেন তিনি? স্ত্রী নমিতা এই সংবাদে কতটা বিচলিত, পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনকেই বা কি খবর দেবেন? ঘরে তাঁর বৃদ্ধা মা, এক ভাই ও আইবুড়ো বোন অপেক্ষা করে আছে, ঘর আলো করা শিশুর আগমনের জন্য। কেমন করে এই “তৃতীয় সত্তা”কে গ্রহণ করবে তারা – কিছুই ভেবে পেলেন না। মাথাটা ঘুরে গেল।

ইউট্রাসে অনেকগুলি সেলাই পড়েছিল, তার দু-একটি পেকেও গেছে, প্রচন্ড যন্ত্রনা, জ্বর এসে গেছে সদ্য – সন্তান প্রসবের পরে তরুণী মায়ের। অনেক দাইমা’রা এটাকে সুতিকা জ্বর বলেন। এখন সেপটিক জ্বর বলা হয়। ডাক্তার ম্যাডাম এন্টিবায়োটিক দিয়ে দু-দিন আরও রাখতে চাইলেন, হাসপাতালে। চার পাঁচজন আরও নবজাতকের সঙ্গে শিশুটি রইল। বাচ্চাকে পরিষ্কার করতে গিয়ে একজন নার্স চমকে উঠলেন, বললেন, “আমি পারবোনা একে ডাইপার চেঞ্জ করতে”। মেট্রন দিদি ধমকালেন তাঁকে, – “কেন এই শিশুটি কি মানুষ নয়, সেবা ধর্মে দীক্ষিত হয়ে, এই জীবিকায় এসে তুমি এসব কি বলছো। আমি তোমার নামে নালিশ জানাবো হাসপাতাল কতৃপক্ষের কাছে”। তবুও সে শুনলো না। অন্য একজন আয়া তার ভার নিল, কিন্তু একবারে বিরক্ত মুখ এনে। মা আচ্ছন্ন হয়ে জ্বরের মধ্যেও বুঝতে পারলেন সব। রাত্রে ডাক্তার ম্যাডাম যখন জানালেন যে আগামীকাল তার ছুটি হয়ে যাবে, তখন আর থাকতে পারলো না মা। ম্যাডামের হাত দুটি ধরে কেঁদে ফেললো একটা বাচ্চা মেয়ের মতন। “এখন কি করে একে বাঁচাবো বলুন তো দিদি, আমাদের এই নিষ্ঠূর সমাজের কাছে তো তার কোন মর্যাদা নেই। আবার এদের গোষ্ঠীর – মানে হিজড়ে সম্প্রদায়ের লোকেরা জানতে পারলেই নিয়ে চলে যাবে কেড়ে। আমি আমার প্রথম সন্তানকে হারাতে চাই না। কি করি আমায় বলে দাও তোমরা”।

ডাক্তার দিদি ও মেট্রন ম্যাডাম পাশে বসলেন তাঁর স্নেহভরে। তাঁরাও তো সন্তানের মা। এই তরুণী মায়ের বেদনা তাঁরা অনুভব করতে পারছেন। মেট্রন বা চিফ নার্স তারপর ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পরামর্শ দিলেন – “হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তুমি বাড়ি যেও না। অন্য কোথাও চলে যাও বাচ্চাটি নিয়ে, যদি ওকে বাঁচাতে চাও, নিজের কাছে রাখতে চাও, তাহলে আজ সকালের মধ্যেই ট্রেনে করে চলে যাও, পালাও এখন থেকে। বাড়ি গেলেই এই হাসপাতালের ছেলেরা রেজিস্ট্রার দেখে ওদের মানে ঐ সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেবে তোমাদের ঠিকানা। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউই তখন তোমার সাহায্য করতে আসবে না।” এবার ডাক্তার ম্যাডাম তার বাচ্চাকে আদর করে কোলে তুলে নিলেন। কী সুন্দর ফুটফুটে বেবী – “তুমি মা, বাঁচাও ওকে। ওর বাবাকে ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার নাম করে ডাকছি আমি। তোমরা দুজনে মিলে ঠিক করো কোথায় যাবে। বাড়ি থেকে খুব জরুরী জিনিসপত্র টাকাকড়ি নিয়ে মা কে জানিয়ে চলে এসো। বলো বাচ্চা অসুস্থ এখন ওকে অন্য জায়গায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হবে। একদিনও দেরী করো না, পালাও বাচ্চা নিয়ে, একেবারে অন্য শহরে যেখানে তোমাদের কেউ জানতে বা চিনতে পারবে না। বড় করো একে, দেখো কিভাবে কতদিন লুকিয়ে রাখতে পারো”।

দিশাহারা মা-বাবা আমাকে নিয়ে ভোর রাত্রে ট্রেন ধরলেন শিয়ালদহ থেকে। পাঁচটায় ছাড়লো লোকাল ট্রেন। তাতেই চড়ে বসলেন তাঁরা। আপাতত বনগাঁ। তারপর দরকার পড়লে, অন্য কোথাও বসতি বাঁধবেন। কিছুতেই তো ছাড়তে পারবেন না, কাউকে কাড়তেও দিতে পারবেন না, তাঁর নাড়ি ছেঁড়া এই বুকের ধন। সুন্দরভাবে কেটে গেল, আমাকে নিয়ে মা বাবার দিনগুলো। ভাই বোনেদের বিয়ে হয়ে গেলে সেই শহরের নিরিবিলি সংসারে ঠাকুমাও এসে গেলেন। স্কুলে ভর্তি হলাম আমি। কন্যা রূপে, নাম রাখা হল “ত্রিনয়নী”, মা, বাবা ও ঠাম্মা আদর করে ডাকেন “তিন্নি” বলে।

দিদিমনিরা খুব ভালোবাসেন, চঞ্চল বুদ্ধিমতী মেয়েটিকে। চতুর্থ শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি অর্থাৎ ‘জলপানি’ পেয়ে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করলাম, বলে প্রাইজ পেলাম অনেক।

ক্লাস ফাইভ থেকে খেলাধুলাতেও বিশেষ আগ্রহী ছিলাম। তখন আমার বয়স দশ। স্কুলের স্পোর্টসে দেখা গেল সব বিষয়েই প্রথম ‘ত্রিনয়নী’। পনের / ষোল বছরের মেয়েরাও দৌড়ে হেরে যায় আমার কাছে। খেলার দিদিমনি আমাকে নিয়ে গেলেন Inter School Competition গুলোতে। সব জায়গাতেই মেয়েরা হেরে যেত আমার কাছে। ভীষণ আনন্দ উৎসাহে কেটে গেল কয়েকটা বছর। আমি একেবারেই যখন খেলাধুলায় মেতে উঠেছি তখনই একদিন ঘটলো ঘটনাটা।

কাবাড্ডি বা হাডুডু আমাদের চলতি ভাষায় ‘কিতকিত’ খেলছি স্কুলের মাঠে, আমি তখন ১২/১৩ বছরের, ভীষণ জোর আমার গায়ে, কেউ আটকাতে পারে না। – “চু — কিত, কিত, কিত, কিত একবার দম ভরে নিয়ে, ঢুকে পড়েছি, বিপক্ষীদের কোর্টে। তার আগে মেরে পালিয়ে এসেছি, প্রায় চারজনকে, একসঙ্গে আউট করে। – এবার বাকিরা সবাই মিলে চেপে ধরল আমাকে। কিছুতেই ছাড়বে না। আমি প্রানপন চেষ্টায় দম না ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছি ঐ দাগটা ছোঁবার জন্য। আর একটু – আর একটু – শুয়ে পড়ে – পা হাত ছিচঁড়ে যাচ্ছে, তবুও ওরা পাঁচজনে আমাকে চেপে ধরে অপরদিকে টানছে। এবার আমার জামা টেনে ছিঁড়ে দিল, তবুও আমি চিৎ হয়ে শুয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, মুখে কি- – -ৎ – – – কি- – -ৎ, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। জোর দিয়ে সবাইকে ফেলে দিয়ে আর একটু এগুতে যাব, একজন প্যান্টটা ধরে টান দিল, আমার সেটাও ওদের টানাটানিতে নেমে গেল, কোমর থেকে। আমি তখন দাগ ছুঁয়ে পড়ে গেছি আমার কোর্টে, – সেখানে সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে – জিতে গেছি, জিতে গেছি – ওদিকে অন্য মেয়েরা স্পোর্টের দিদিমনিকে ডেকে এনে শুরু করে দিয়েছে আমার নিম্নাঙ্গ দেখে অদ্ভুত আলোচনা। আমি মেয়ে নই। তবে কি? তৃতীয় সত্তা! মা বাবা কেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানাননি, আমার ভভিষ্যৎ সেদিনিই হয়ে গেল অনিশ্চিত। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, কেন বুঝতে পারলাম না। বাবা, মা, ঠাকুমা আমাকে নিয়ে আবার চললেন, নতুন ঠিকানার সন্ধানে। এবার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আমরা এসে উপস্থিত হলাম কানপুরে, গঙ্গার ধরে, এক ছোট্ট অজানা আস্তানায়। ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে লাগলেন বাবা। পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেল আমার। চেহারাতে হাবে ভাবে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। মনে মনে মেয়ের মতন কোমলতা, কিন্তু চেহারায় পুরুষের কাঠিন্য। আমি বয়ঃসন্ধিকালে অন্যান্য ছেলে ও মেয়েদের মতনই কখনও হঠাৎ (adult) বড় হয়ে উঠতে চাইছি। সব সমাজব্যবস্থা – মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক ভেদাভেদ, জাতপাত, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-নির্ধনের বৈষম্য নিয়ে ভাবতে মা বাবাদের সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করেছি। মানতে চাইছি না কোনও ছেলে, মেয়ে, হিজড়ে বাধা নিষেধের গন্ডি।

আবার কখনও মায়ের কোলের কাছে ছোট্ট মেয়ে হয়ে চুপ করে বসে বসে তাঁর রান্না করা দেখছি। মা একটা একটা করে বেগুনি ভেজে খাওয়াচ্ছেন। রাত্রে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি, অজানা এক আতঙ্ক গ্রাস করে – আমায় এদের ছেড়ে যদি কোন দিন চলে যেতে হয়; কি হবে তাহলে? ভয় পাই। কাঁদি হাপুস নয়নে। আমার বয়সী অন্য মেয়েরা কত লাবণ্যময়ী তাদের বুকে, মুখে, হাসিতে ছেলেরা আকৃষ্ট হয়, – আর আমার যে সবই অন্যরকম। কোনদিনই কেউ কি আমায় নিজের বলে গ্রহণ করতে পারবে? ঠাকুমা ছোট থেকেই রামায়ণ, মহাভারত, পূরণের গল্প শোনান, আমি তাঁকে সেই একই গল্প বারবার বলতে পীড়াপীড়ি করি। খুবই জ্বালাতন করি। – যেখানে অজ্ঞাতবাসের শেষ পর্যায়ে অর্জুন বিরাট রাজার বাড়িতে “বৃহন্নলা” সেজে নাচ শেখাতে গেছেন।

আমার কোনদিন “মাসিক ঋতুস্রাব” হবে না, সন্তানের মা হবার সম্ভাবনা থাকবে না, এসব কথা এখন আসতে আসতে বুঝতে পারছি। আমার নামটা স্বার্থক হয়েছে, তৃতীয় নয়নের দৃষ্টি খুলে গেছে। – ঠিক এই সময়েই আমার মা আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। মাঝে বছর পাঁচেক আগেও একবার তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন, কিন্তু বাথরুমে পড়ে গিয়ে তাঁর সেই বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। বাবা খুবই হতাশায় আচ্ছন্ন থাকতেন। এবারে মাকে আমি ও ঠাকুমা খুবই সাবধানে যত্নে রাখলাম। বাবা ভাল ভাল ওষুধপত্র, ফল, দুধ খাওয়াতে লাগলেন। আমার তেরো বছর বয়সে সুন্দর দেবশিশুর মতন একটা ভাই জন্ম নিল। আনন্দের যেন বন্যা বয়ে গেল বাড়িতে, হঠাৎ একদিন ঠাকুমা হার্ট এ্যাটাকে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। মাও ঠাকুমার সেবায় ভীষণ ব্যস্ত, ওদের এই ‘তিন্নি’ তখন ঘরের কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিল। বাড়িতে একদিন ডাক্তারবাবুকে ডাকা হল, ঠাকুমার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায়। তিনি বেশ কিছুক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন আমায়। খুব খুশি হয়ে বাবাকে বললেন, – “এর মধ্যে এতো সেবা ভাব – এই মেয়েকে নার্স করুন আপনি। তবে মনে হয় এর একটু ‘হরমোনাল প্রবলেম’ আছে।” আমার স্ত্রী গাইনোকোলজিস্ট একদিন নিয়ে আসুন, আমাদের নার্সিং হোমে, উনি চেক করে বলে দেবেন কি Treatment করতে হবে। কিন্তু সে সুযোগ আর এলো না। বাবা তাঁর কাছে গিয়ে আমার ‘তৃতীয় সত্তার’ কথা প্রকাশ করতে চাইলেন না। ঠাকুমা মারা গেলেন, তাঁকে জড়িয়ে থাকার আনন্দ আমার চিরতরের জন্য যে হারিয়ে গেল, তা বুঝতে পারলাম।

ঠিক এই সময়েই বাবা জানতে পারলেন তাঁর প্রমোশন ও ট্রান্সফারের কথা। খুব খুশি মনে অফিস থেকে এসে জানালেন, এই কানপুরের ফ্যাক্টরির মালিক নতুন কারখানা খুলছেন ‘সোদপুরে’ গঙ্গার ধারে, সুন্দর বাগান ঘেরা কোয়াটার দিচ্ছে। আবার তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের বাঙালি পরিবেশে ফিরে যাবেন এবং মাইনেও খুব ভাল হবে জেনে মা বাবা ভীষণ আনন্দিত। আমার মনটাও খুব চঞ্চল হল, হয়ত আবার নতুন করে বাংলা স্কুলে যাব। ভাইটা আমাদের খুব পয়মন্ত ভাবলাম আমি।

শোবার সময় অন্য ঘরে মাকে জল দিতে গিয়ে বাবা-মায়ের কিছু কথাবার্তা কানে এল, – তাতে যেন সমস্ত পৃথিবীটা এক রাত্রের মধ্যে ভীষণ অচেনা মনে হল আমার। বাবা বলছেন মাকে – “যাবো তো সোদপুরে, কিন্তু চারপাশে আরও অনেক কোয়াটার থাকবে। তারা মেলামেশা করতে চাইবে আমাদের সঙ্গে। এই ছেলেটাও বড় হবে. তাকেও স্কুলে দিতে হবে, কিন্তু তোমার এই তিন্নি “ত্রিনয়নী” যে ক্রমশঃ ‘হিড়িম্বার’ মতন লম্বা ধিঙ্গি পুরুষালি ভাব নিয়ে বড় হচ্ছে – একে এবারে তুমি লুকাবে কোথায়”? – বাবার উক্তি।

মা বেশ জোর দেখিয়েই উত্তর দিলেন – “কেন লোকের বাড়ি আইবুড়ো বা বিধবা মেয়েরা কি বাবা মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে না? আমার সন্তান, আমি এতদিন যখন বড় করেছি, – তখন যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আমার কাছেই থাকবে”।

– “তারপর? তারপর ওর ভবিষ্যৎ কি হবে ভেবে দেখেছো একবার”।

– কি আবার ভাববার আছে? জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। ওর ভাগ্য ওকে যেভাবে রাখবে সেই ভাবেই থাকবে।

– ভীষণ গম্ভীর গলায় বাবার রায় শোনা গেল, – “না আর আমি ওকে সঙ্গে রাখতে পারব না, এই ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। একটু বড় হলেই সবাই ওকে নানান প্রশ্ন করবে, ও লজ্জায় পড়ে যাবে”।

– তাহলে কি করবে? মা রাগত ভাবে বললেন, – “গলা টিপে মেরে ফেলবো এই সুন্দর পেটের সন্তানকে”?

-“মারবো কেন ওকে …..” কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি, হটাৎ আমার ছায়া দেখে।

সেদিন সকালটা ভীষণ সুন্দর রৌদ্রে ঝলমল, শরৎ কালে পুজোর গন্ধ বাতাসে। ভাইকে বারান্দায় বসিয়ে তেল মালিশ করছেন মা, বাবা বাজারে। আমি রান্না ঘরে ভাতের চাল ছাড়ছি। বাইরে করা যেন ঢোলক বাজিয়ে গান করছে। আওয়াজটা আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই। দরজার কড়া নড়ে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলতেই – হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লেন “তাঁরা”। একজন মায়ের কোল থেকে তুলে নিলেন ভাইকে ছোঁ মেরে। তারপর শুরু করলেন, গান ও নাচ। আমরা একেবারে হতবুদ্ধি। ওদের যিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ্য মানুষটি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে ওদের গানের সঙ্গে সঙ্গে তালি বাজাচ্ছিলেন, তিনি হঠাৎ মুখ ঘোরালেন। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। একটু থমকে গেলেন, ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগলেন আমায়। আমারও সারা শিরা ধমনীতে যেন একটা শিহরণ বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। এতো বছর কেটেছে এমন করে তো কাউকে দেখে আকর্ষণ অনুভব করিনি। অন্যের নাচ, ভাইটির কান্না, মায়ের নার্ভাস হয়ে চিৎকার করে ওঠা, কিছুই যেন দেখতে বা শুনতেও পাচ্ছিনা আমি। ওনার দিকে চেয়েই আছি তাই এক দৃষ্টিতে। আর উনিও ঠিক তাই। যেন জহুরি জহর চিনে ফেলেছে – এক মূহুর্ত্তের মধ্যে। মনে হল এতদিনে খুঁজে পেলাম আমি আমার আপনজনকে।

বাবা মা সব জিনিসপত্র বেঁধে ছেঁদে ভাইকে ও আমাকে এবং নিজেদের সমস্ত টাকা-পয়সা নিয়ে স্টেশনে এসে উপস্থিত হলেন। ট্রেনের বেঞ্চে বসে সব জিনিসপত্র সিটের তলায় গুছিয়ে রাখলেন বাবা। জল আনতে নামলেন সামনের দরজা দিয়ে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল, – “তোর বাবা কি চড়েছেন, দেখতো তিন্নি জানলা দিয়ে”। মায়ের কথায় জানলা দিয়ে মুখ বার করতেই চোখে পড়লো আবার ওই দলটিকে। সেই বয়স্ক মানুষটিও আমাকে হঠাৎ দেখতে পেয়েছেন। বাবা সামনের দরজা দিয়ে উঠলেন, কিন্তু ট্রেন চলতে শুরু করে দিল। আমি আর দেরী করলাম না। অন্য দিকের দরজায় ছুটে গেলাম যাতে বাবা আমায় আটকাতে না পারেন। লাফ দিলাম ট্রেন থেকে। সেই দলটি ছুটে এসে তুললো আমায়। মায়ের গলাটা শুনতে পেলাম একবার তিন্নি – তিন্নি রে। রেলগাড়ির ঝমঝমানিতে মিলিয়ে গেল সেই আওয়াজ। ট্রেন স্পীড নিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে – আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন ওদের ঐ ‘গুরুমা’, সবাই তাঁকে “কমলা আম্মা” বলে জানে। হিজড়েদের সমাজে সবাই তাঁকে খুব সম্মান করে ভালোবাসে।

বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, – “ইতনে দিন কাঁহা থে বচ্চে”? “বহুচারা” মাতা নে তুঝে মিলায়া। ইস লড়কা লড়কীকে বীচ মে তুম কাঁহা ফাঁস গয়ে থে। আও মেরে পাশ আও। ওহ দুনিয়া তেরে লিয়ে নহি হ্যায়”।

তাদের সঙ্গে হিজড়েদের আড্ডায় এসে বুঝতে পারলাম আমার ঐ মা আমায় জন্ম দিয়েছেন, স্নেহ মমতায় পালন করেছেন, আর এই “মা” আমাকে আজ নতুন ‘জীবন’ দান করলেন।

 

দ্বিতীয় অধ্যায় (বৃহন্নলা)

শুরু হ’ল বাস্তব জীবনে “বৃহন্নলার” চরিত্র রূপায়ণ। প্রথম দিন থেকেই কমলা আম্মাজী বুঝতে পেরেছিলেন, আমি বাঙালী ঘরের এক লাজুক কন্যা হিসাবে বড় হয়েছি। বাড়ি বাড়ি নাচ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা ট্রেনে বাসে উঠে টাকা চাইতে, গালাগাল দিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাব, অসভ্য ব্যবহার, কদর্য ইঙ্গিতও পছন্দ করতে, সহ্য করতে পারব না, তাই সবাইকে তিনি সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন আমাকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না করে। আমাকে হারমোনিয়াম বাজাতে, লক্ষ্ণৌ ঘরানার একজন মাষ্টারমশাইকে দিয়ে কত্থক শেখাতে শুরু করলেন। পড়াশুনো করতে আমার ভীষণ আগ্রহ দেখে হিন্দিতে বই কিনে দিলেন, বললেন টীচার রেখে দেব। তুই প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিবি। তিনবছরের মধ্যেই আমি পারদর্শী হয়ে উঠলাম নানা বিষয়ে। সব সময় বলতে লাগলেন, – “হম লোগো কো সরকার বুদ্ধু বানাকে রাখ দিয়া হ্যায়। পড় লিখকর তেরে কো আওয়াজ উঠানে হ্যায়। হামারে বারে মে লেখ লিখনা হ্যায়, হমে ভোট দেনে কি অধিকার দিলওনা হ্যায়”। আমি একজন শিক্ষিত মানুষ হবার চেষ্টায় প্রাণ মন সোঁপে দিলাম।

আমাকে আমার মা উল বোনা, সেলাই ফোঁড়ায় সব কাজ শিখিয়েছিলেন। রান্নাতেও ঠাকুমা একেবারে ওস্তাদ বানিয়ে দিয়েছিলেন, তাই এখানে এই নতুন সম্প্রদায়ে এসে সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে দেরী হল না আমার। কিন্তু হিংসাতে জ্বলতো অন্য দু একজন, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যাতে কমলা আম্মার থেকে দূর করা যায়, সেই চেষ্টাও চালাতে থাকতো তারা। দুটি ছেলে ছিল এ দলে, বাজনা বাজানো, বাজার করা, হাসপাতালে গিয়ে গিয়ে কোথায় কোন বাড়িতে বাচ্চা হয়েছে, কোন ঠিকানায় যেতে হবে সে সব কাজ করবার জন্য। তাদের একজন প্রথম দিন থেকেই পিছনে পড়েছে আমার। একটু সুযোগ পেলেই চেপে ধরছে, ওর সঙ্গে শুতে বলছে, আমার রুক্ষ ব্যবহারে একটু ভয় পাচ্ছে এবং হতাশও হয়ে পড়েছে। যখন দেখলো আমি ওদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ক্রমশঃ গুরুমার কাছের জন হয়ে উঠছি, তখন একদিন টাকা চুরির দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করল, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে অপমান করল। আমি তখন দরজা বন্ধ করে ভাবলাম জীবনটা শেষ করে দেব। আমার জন্য কোথাও কি শান্তির জায়গা নেই? এখানে বেশিরভাগ সময়ই সালোয়ার কামিজ পরতাম তাই চুনরি বা ওড়নিটা নিয়ে ঠিক যখন পাখার সঙ্গে লাগিয়েছি, চিৎকার শুনতে পেলাম কমলা আম্মার।

“বেটা দরওয়াজা খোল, ম্যায় ইনলোগোকে বাত বিশওয়াশ নেহি কিয়া, কোই অনর্থ নেহি কর না, খোল দে রানী, ইয়ে মা কো রুলানা নেহি”।

দরজা খুলতেই গভীর আবেগে কেঁদে উঠলেন তিনি। তারপর চিৎকার করে সবাইকে একত্র করলেন, ধমক দিয়ে সাবধান করে দিলেন, যে আমার দিকে নজর দেবে তাকে দলত্যাগ করতে হবে, এ কথাও জানালেন। রাত্রে আমাকে নিজের পাশে শোয়ালেন তিনি, ঠিক মা ও ঠাকুমার মতন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানালেন, প্রথমদিন আমাদের বাড়িতে দেখার পর থেকেই তিনি আমাকে কতটা নিজের করে নিতে চেয়েছিলেন। সেদিন যে ঐভাবে আবার ট্রেনের জানলায় আমায় দেখতে পাবেন বা আমি ঐভাবে লাফিয়ে নেমে আসবো বাবা মাকে ছেড়ে – তা উনি ভাবতে পারেননি। এখন কয়েক বছর কানপুরে থেকে হিন্দিটা আমার ভালোই রপ্ত হয়েছে। তাই তাঁর কথাগুলো বুঝতে পারছিলাম। এবার খুব কাছে টেনে ‘কমলা আম্মা’ বললেন যে এদের সবাইকে পরীক্ষা করবার জন্য কিছু টাকা তিনি টেবিলের ওপর ইচ্ছে করেই ফেলে রেখেছিলেন এবং নিজে বাথরুম থেকে লক্ষ্য করছিলেন, কে নেয়। আমি ঘরে ঢুকে ঘর পরিষ্কার করে চলে এসেছি; ঐ ছেলেটি ওটি চুরি করে আমার ব্যাগে রেখে দিয়েছে। আর পরে সবাইকে ডেকে এনে আমাকে হাতে নাতে ধরার অপবাদ দিতে চেয়েছে। ছি ছি কি করে ওরা সবাই আমাকে ঘিরে ধরেছে। কমলা আম্মা ঠিক সেই সময়টিতে স্নান সেরে ‘বহুচারা’ মায়ের পুজোয় বসেছেন। আমার মনে হয়েছে যে তিনি হয়তো আমায় ভুল বুঝবেন, এবং তাড়িয়ে দেবেন এই নিরাপদ আশ্রয় থেকে। এই দুনিয়ায় তো আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই কোথাও। তাই হটাৎ আবেগের বশে নিজের জীবনটি শেষ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুইসাইড করার জন্য যে সাহসের দরকার আমার মতন ১৫/১৬ বছরের একজন Teen Age-এর পক্ষে আনা সহজ নয়। তাই কাঁদতে কাঁদতে আবার দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি আমি।

আম্মাজী আমাকে শপথ করালেন, এইরকম ‘গলদ’ ভাবনার বশবর্তী আমি যেন আর কখনও না হই। আরো বললেন, – “জিন্দেগী খুবসুরৎ হ্যায়, হম লড়কা হ্যায়, কি লড়কি হ্যায়, আমীর ইয়া গরীব হ্যায়; হিন্দু ইয়া মুসলমান হ্যায় – ইয়ে সব বাতে বেকার হ্যায়। হম ইনসান হ্যায়। জানোয়ার, কীড়ে মকোড়ে নেহী হ্যায় – ইয়ে হামেশা ইয়াদ রাখনা”। – তারপর ওনার ছোটবেলাকার দেখা একটি হিন্দি সিনেমার গান গাইতে লাগলেন, – ” এ মালিক তেরে বন্দে হম”। আমি খুব আনন্দ ও শান্তি-সুখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম।

পরের দিন থেকে আমার নানা ধরণের পড়াশোনার তালিম শুরু হল। প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষাও দিয়ে দিলাম, হিন্দি মিডিয়ামে। এবার ছুটি, পড়াশুনো নেই। গুরুমা বললেন, তিনি তীর্থ করতে যাবেন গুজরাটে বহুচারা মাতার মন্দিরে। এই শক্তিরূপিণী মাকে এঁরা খুব মানেন। আমার কমলা আম্মা – গুরুমা আমাকে তাঁর গল্প-গাঁথা শোনাতে খুব ভালোবাসেন। অনেকটা সন্তোষী মা বা জগদ্ধাত্রীর মতন তিনি চার হাত নিয়ে, নানা অলংকারে ভূষিতা হয়ে মোরগের পিঠে চড়ে অধিষ্ঠাত্রী। প্রত্যেক হিজড়ে কলোনীতে তাঁর ছবি বা মূর্ত্তি দেখতে পাওয়া যায়। মোরগ ভোরে সকালে উঠে যেমনভাবে মানুষকে জাগায়। মায়ের এই বাহনও তেমনি করে লোভ, মোহ ভঙ্গ করে মানবকে জাগাতে এসেছে – বলে তারা মনে করেন। মায়ের চার হাতের মধ্যে একটি হাত (ওপরের দিকের বাম হাতটি) অভয় মুদ্রা দেখায় এবং অন্য তিনটিতে থাকে বই, ত্রিশূল ও তলোয়ার।

আমাকে উদাস হয়ে বসে থাকতে দেখে গুরুমা কাছে এসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, – “পড় লিখকর এক অচ্ছে ইনসান বননা। ফির কলকাত্তা যা কে মিলকর আনা তেরী পিতা মাতা কে সাথ। মুঝে পতা হ্যায় হম কিতনা ভী প্যায়ার করে তেরা মন উনকে লিয়ে দুঃখী হ্যায়”। আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল টপ টপ করে।

কেননা হাজার চেষ্টা করলেও আমার এখানের ওই ভাই বোনদের মতন তালি বাজিয়ে ভিক্ষে বা জোর করে কাপড় তুলে দিয়ে পয়সা আদায় আমি তো করতে পারবো না, এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেহ বিক্রিও করছে এবং যেটা খুবই স্বাভাবিক, বেঁচে থাকার জন্যে ‘Sex Worker’ এর ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়েছে। সমাজই এইসব অসহায় হিজড়ে কন্যাগুলিকে বাধ্য করেছে পুরুষের লালসার শিকার হতে। কেউ আবার বিবাহিত স্বামী স্ত্রী হয়ে কোন ছোট কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাকে মানুষ করছেন, তাঁদের স্নেহ মমতা ও আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু পড়াশুনো শেখানোর ইচ্ছে থাকলেও আমাদের বাচ্চাদের জন্যে আলাদা স্কুল কলেজ নেই, আমার মতন কেউ কেউ জোর করেই প্রাইভেটে ওপেন স্কুল থেকে থেকে পরীক্ষা দিতে আরম্ভ করেছে, গুরুমা সেটা জানতে পেরেই আমাকে খুব উৎসাহ দিতে চেষ্টা করছেন। ক্লাস VI পর্যন্ত আমি তো শুধু রবীন্দ্রনাথের পদ্য, বিবেকানন্দের বাণী, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল পড়ে একটা সম্পূর্ণ আলাদা জগতে বড় হয়েছি, এখন এই অস্তিত্ব রক্ষা করতে, অর্থাৎ বাঁচবার তাগিদে নিজের আপনজনকে খুঁজে, নিজেকে একটা গোষ্ঠীবদ্ধ করে এই আস্তানায় আমি নিরাপত্তা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু এদের ভাষা, কালচার, আদব-কায়দা, ধর্ম, কিছুই আমাকে টানতে বা আকৃষ্ট করতে পারছে না। এরাও আমাকে বুঝতে ও মেনে নিতে পারবে কিনা, সেই সংশয়ের দোলায় দুলছি আমি।

 

তৃতীয় অধ্যায়

এইসময় একদিন শহরের এক খুব নাম করা উকিলের বাড়ি থেকে খবর এল, পুত্র সন্তান জন্ম লাভের। সেদিন আমাদের গোষ্ঠীর মেয়েরা অন্যত্র কোথাও গেছে। সেখান থেকে ফিরতে তাদের দেরী হবে। গুরুমা আমাকে অনুরোধ করলেন, আমার এক গুরু ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐ বাড়িতে যেতে। আমি মাথা গুঁজে বসে আছি দেখে নিজে তৈরী হলেন এবং ঐ ছেলেটিও ঢোলক নিয়ে বেরুবার আগে বহুচারা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনাতে রত হলেন। আমার মনে হল, আমি কি এটা ঠিক করছি? “গুরুমা” আমাকে এতরকম ভাবে স্নেহ ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাঁর আশ্রিত হয়ে আমি তাঁকে অমান্য করছি। তাড়াতাড়ি একটা ভাল শাড়ি পরে কাজল, টিপ ও লিপস্টিক লাগিয়ে তৈরী হয়ে গেলাম। তাই দেখে গুরুমার কি আনন্দ। বললেন, “দেখ মনুয়া – মেরে তিন্নি কো আজ কিতনি সুন্দর লগ রহি হ্যায়। দে এক কালা টিকা লগা দূঁ, তাকি নজর না লগ জায় মেরে বাচ্চো কো”।

আমি কমলা আম্মার সঙ্গে এসে হাজির হলাম শ্রী বিনোদ রঞ্জন বোসের বিশাল ভবনে। চারিদিকে বাগান ঘেরা বাড়িতে ঢুকেই মনটা ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। গেট দিয়ে ঢুকলাম আমরা তিনজনে। মনুয়ার ঢোলকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ছুটে এল চাকর বাকরেরা। একজন বোধয় ম্যানেজার বাবু, চ্যাঁচাতে লাগলেন, “চৌকিদার শম্ভূ কোথায় গেল, এদের বাড়ির ভেতরে আসতে দিল কেন”? গুরুমা তালি বাজিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “অরে ভাইয়া গুসসা কিউ করতে হো? হম তো বাচ্চে কো আশীর্বাদ, দুয়া দেনে আয়া হুঁ। বুলাও মালকিন কো। বাচ্চা ভী সাথ লানা”।

কিন্তু ততক্ষনে চৌকিদার এসে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। ইট সুড়কির লাল রাস্তা ঐ বিশাল প্রাসাদের বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। দুই সারিতে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা ও বাগানের কোনায় লাল – হলুদ – সাদা জবা। আমার মন সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে উঠল, ঠাকুমার সুরে। এক অচেনা ব্যাথায় বুকটা ভরে গেল, আমি ঐ ঢোলকের তালে হাতে তালি দিতে লাগলাম। গুরুমাও অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে, – “গাও না বেটা গাও জো গানা তুমহে আতা হ্যায়”।

আমি এই প্রথম হিজড়ে গোষ্ঠীর দুজন সদস্যের সামনে গলা ছাড়লাম। – “আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন, তার গন্ধ না থাক, যা আছে তার নয় তো ভুয়ো আবরণ”। – গানের কথাগুলো কানে যাওয়ার জন্যে কিনা জানি না – বারান্দায় বেরিয়ে এলেন সেই বাড়ির ‘মা’, পরণে সাদা শাড়ি। কপালে চন্দনের টিপ – কী সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ ও মমতায় ভরা তাঁর দুটি চোখের দৃষ্টি। কোন কথা না বলে ইশারায় ঐ চৌকিদারদের আদেশ দিলেন, আমাদের পথ না আগলাতে। হাতছানি দিয়ে ডাকলেন গুরুমাকে। তিনজনে এগিয়ে গিয়ে উঠলাম ঐ বারান্দায়। সেখানে অনেকগুলি বেতের চেয়ার ও একটা গোল টেবিল পাতা। বসতে নির্দেশ দিলেন আমাদের। আমার যে কী হল আমি জানিনা। ঠিক আগেকার মতন তাঁর দুই পায়ে হাত দিয়ে হাতটা নিজের মাথায় ছুঁয়ে প্রণাম করলাম তাঁকে। গুরু শিষ্য পরম্পরাতে ‘হিজড়ে’ সম্প্রদায়ের লোকেরাও সর্বদা বড়দের পা ছোঁয়, কিন্তু ঠিক আমার কায়দায় নয়। সেই মা জিজ্ঞাসা করলেন ধীর স্থির ভাবে, – “তুমি বাঙালী”?

– “হ্যাঁ মা, কলকাতায় বাঙালী পরিবারে জন্মেছি”। এবার তিনিও একটা আশ্চর্য কান্ড করে বসলেন, আমার কাছে এসে ‘চিবুকটি’ ধরে মুখটি তুলে নিজের ঠোঁটে ঠেকালেন। এমনভাবে চুমু খেলেই আমি ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরতাম। হাতটা টেনে নিয়ে বলতাম – “আর একবার খাও না ঠাম্মা – বেশি করে আশীর্বাদ দাও যাতে আমি এবারেও ফার্স্ট হতে পারি”। চোখে জল চিক চিক করে উঠল। মায়ের ডাকে তাঁর বৌমা বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। গুরুমাকে সাদরে আহ্বান করলেন – ঐ মামনি। বললেন – “আপ বৈঠিয়ে না, খড়ে কিউ হো”? কমলা আম্মা এগিয়ে গেলেন বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আশীষ দিতে। –

হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। মানসিক ভারসাম্যহীন, একটু বেশি স্থুলকায়, বড় সরল হাসি, ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। ঢোলকের তালে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে গেল, আমার গুরুভাই মনুয়ার দিকে হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই ওর বাজনাটিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, মনুয়া জোর করে ধরে রেখেছে ও ছাড়বে না। অদ্ভুত গলার আওয়াজে চিৎকার করছে ওটিকে কেড়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় ধাক্কা দিল তাকে। মনুয়া বারান্দা থেকে ছিটকে পড়ল নিচে। সবুজ ঘাস ভরা মাটিতে, আর মেয়েটি উল্টোদিকে, ঠিক আমাদের পায়ের কাছে। আমি তাড়াতাড়ি তুলে ধরলাম ওকে, ঢোলকের কথা এক সেকেন্ডে ভুলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল, লজ্জিত ঠাকুমা ছাড়াবার চেষ্টা করলেন। “ছাড়ো সোনামনি, লক্ষী মেয়ে, ছাড়ো ওকে – চলো ভেতরে চলো” – কিন্তু সে আরও আঁকড়ে ধরেছে আমায়। আমি বললাম, – ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি ওকে সামলাচ্ছি”।

আদর করে ঘরের ভেতরে ওর খেলা ঘরে নিয়ে গেল সে আমায়। মা তার বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়ালেন। মাকে দেখে ঐ মেয়েটি অদ্ভুত আদো আদো সুরে জানতে চাইলো, – “এ তা কে? এ তা কে”? – মা তাকে শান্ত করবার জন্য বললেন, – “দিদি – তোমার দি দি”। আমার মনের বীণায় কেউ যেন ঝংকার তুললো। আমিও বলতে লাগলাম, – “হ্যাঁ সোনামনি, আমি তোমার দিদি”।

মেয়েটি নানান খেলনা তুলে তুলে দেখাতে লাগলো। তারপরই – ‘মা – আগু – আগু – আগু দাবো’ – বলে চেঁচাতে লাগল। মা বাচ্চাকে রাখতে অন্য ঘরে গেলেন, ততক্ষনে ঘরের মাঝেই পেচ্ছাব ও পায়খানা করে ফেললো মেয়েটি এবং হাসতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বাচ্চা কাঁদছে জোরে জোরে মা তাকে ছেড়ে আসতে পারছেন না, ওর ঠাকুমা তখন আমাদের গুরুমায়ের সঙ্গে কথা বলে, তাঁকে চাল, ডাল, তেল, ফল-মূল, টাকা ও একটি সুন্দর শাড়ি দিয়ে বিদেয় করতে ব্যস্ত। আমার বড় মায়া হল। ঐ অসহায় মানসিক ও শারীরিকভাবে ভারসাম্য হারানো কিশোরীর ওপরে। ওকে হাত ধরে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। পরিষ্কার করিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে পাশের ঘরে এনে বসলাম। ঠাকুমা যখন বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন অনেকবার তাঁকে বিছানাতে bedpan দিয়েছি, বিছানা নোংরা হয়ে গেলে পরিষ্কারও করেছি, তাই এসব কাজে কখন ঘেন্না লাগেনি। তাছাড়া ও আমাকে ‘দিদি’ বলে ডেকেছে, ছোট্ট একটা বোনের মতন মনে হচ্ছে ওকে আমার।

ততক্ষনে ওর মা যিনি পরে আমার ‘পিসিমনি’ হয়ে যান, কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন, লজ্জিত হয়ে sorry বলছেন বারবার। তিনি আরও জানাতে চাইছেন, “ও ইচ্ছে করে করেনি, তুমি কিছু মনে করো না, আসলে ওকে যে দেখাশোনা করে সে বাড়ি গেছে এবং চিকেন পক্স হওয়ায় এখন ২/৩ সপ্তাহ আসতে পারবে না। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম – “না না আমি এসব কাজ করতে কিছু মনে করি না। কাছে থাকলে রোজ চলে আসতাম। ঠাকুমা ও পিসিমনি নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করে গুরুমার কাছে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন, হিন্দিতে তাঁর সাথে কথা বলতে লাগল বিনীত ভাবে।

আমি বোনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। গুরুমা কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যদি কিছুদিন এঁদের কাছে মেয়েটিকে দেখাশোনা করি ওঁরা ভাল মাইনে দেবেন, আমি রাজী আছি কি না। আমি তো যেন আনন্দে আত্মহারা একটা কাজ পেয়ে। ভিক্ষে করে বা রাস্তায় পুরুষ মানুষদের সঙ্গে ন্যাকামি করে টাকা রোজগার নয়। নার্সের ভূমিকা হবে আমার। আমিও গুরুমার হাতে অন্যদের মতন কিছু অর্থ এনে দিতে পারব। খুব আনন্দ ও আগ্রহের সঙ্গেই রাজী হয়ে গেলাম। সেই দিন থেকে শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়। বোস বাবুদের বাড়িতে আমি যে চাকরি পেলাম তাতে অবাক হল তাঁর সমাজ। প্রতিবেশীরাও নানা আলোচনা শুরু করে দিলেন, স্থানীয় ছোকরাগুলো প্রথম প্রথম টিটকেরি মারার চেষ্টা করতো, ঘরের দারোয়ান ও চাকর বাকরও পেছনে লাগতে ছাড়েনি। কিন্তু রাসভারী উকিলবাবু ও ঠাকুমার ভয়ে কেউ আমার দিকে তাকাতে সাহস করতো না। পিসিমনি ভীষণ মমতাময়ী। সোনা রানী তো দিদিকে পেয়ে যেন মনে হয় হাতে চাঁদ পেয়েছে। বাংলায় কথা বলতে পেরে, বাঙালী সুতীর ছাপা শাড়ি, শান্তিপুরী, টাঙ্গাইল পরে ম্যাচ করা টিপ ব্যাগ হাতে কাজে যেতে শুরু করলাম।

সমাজে অন্ততঃ একটা পরিবার একজন হিজড়ে কন্যাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। উকিলবাবুকে একদিন ফোনে কথা বলতে শুনলাম, – Yes, I have appointed on eunuch third gender to look after my mentaly physically disabled daughter. Our society must “accept” them. They are aslo humanbeing. They have also different talents ability. What is other’s problem? I don’t care, what people think. I know I have done right thing”. 

ঐ ‘accept’ করা মেনে নেওয়া আমার গুরুমায়ের ভাষায় হিন্দিতে, – “তেরে কো উনহনে স্বুইকার কিয়া, আপনায়া. ইস সে খুশী অউর ক্যা হো সাকতা হ্যায়”?

আমাদের গোষ্ঠীতেও আমাকে পক্ষপাতিত্ব করা নিয়ে কানা ঘুঁষো চলছে, কিন্তু কমলা আম্মাকে সবাই ভালো যেমন বাসে, ভয়ও তেমনি করে। এই হিজড়ে সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষে হল বড়দের সম্মান করা। গুরু শিষ্য পরম্পরা, তাঁর কথার অমান্য না করা। যা কিছু কামাই, বিনা সংকোচে, কোন লোভের বশে নিজেদের কাছে না রেখে গুরুমাকে অর্পণ করা। আমাদের সমাজে মা-বাবা, শিক্ষক, অন্নদাতা সবই তিনি। গুরুর সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে সবাই চেষ্টা করে। তাই আমি এখনো পর্যন্ত কাউকে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তর্ক করে, তাঁকে অসম্মান, অনাদর করতে দেখিনি। আজ আমার তাই ঐ নতুন জীবিকা গ্রহণ, পড়াশোনা, বাংলায় কথা বলা সবাই এরা মেনে নিয়েছে।

এখানে দু বছরের মধ্যে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ভালোভাবে পড়াশোনা করে নিজেকে “ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে হাইয়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার জন্য তৈরী করছি। ‘সোনামনি’কে পরিষ্কার করে স্নান করিয়ে, খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর পর অনেকটা সময় থাকতো, বইপত্র পড়ার। একদিন পিসিমনি এসে আমাকে কম্পিউটার চালাতে শেখালেন। কি করে ইন্টারনেট থেকে সার্চ করে জ্ঞানের ভান্ডারকে বাড়ানো যায় তাও জানালেন। আমার পরিবারের কথা সবই ওনাকে জানিয়েছিলাম, তাই একদিন আমার সঙ্গে বসে Google Search করে বাবার কানপুরের কোম্পানী এবং তারপর তাদের সোদপুর ফ্যাক্টরীর ঠিকানা খুঁজে বার করলেন। E-mail করলেন সেখানে বড় বাবু বা ম্যানেজার কে। তারপর তাঁর ফোন নাম্বার জেনে একদিন কথা বলালেন, আমার সঙ্গে, – সেই মানুষটি তো তখন বিস্ময়ে হতবাক। পিসিমনি সুন্দর নম্রভাবে আগেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। – “দেখুন তো এখন আপনার মেয়ে তিন্নির গলা চিনতে পারছেন কিনা”। – আমি বাবার আওয়াজ শুনেই তাঁর গলা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু মুখ দিয়ে স্বর বার হচ্ছে না। হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো কি হল কে বলছেন? পিসিমনি ঠেলা দিয়ে বললেন, – ‘কি হল কথা বলো’। এবার আবেগরুদ্ধ কান্না ভেজা গলায় শুধু বললাম – “বাবা আমি তোমার তিন্নি”।

“তুই বেঁচে আছিস মা, তুই কোথায়, কেমন আছিস, কেমন করে আমায় পেলি?” এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন কিছুই দিতে পারলাম না। শুধু মা ও ভাইয়ের খবর নিয়ে ফোন ছেড়ে পিসিমনিকে ধরে কেঁদে ফেললাম বাচ্চা মেয়ের মতন।

এই সময় বোস বাবুরা সবাই কলকাতা ঘুরতে চলে গেলেন, আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গুরুমা আমাকে তাঁর কাছ থেকে এতদূরে এতদিনের জন্য ছাড়তে চাইলেন না। আমিও এই গোষ্ঠীদের ছেড়ে থাকতে ইচ্ছুক নই এখন।

গুরুমা এবার হিজড়ে সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ তীর্থ ক্ষেত্র গুজরাটের “বহুচারা” মাতার মন্দিরে তীর্থ দর্শন করতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। আমি প্রত্যেক মাসে যে মাইনে পাচ্ছিলাম সেটি তিনি খরচা করেননি। আমাদের চারজনকে নিয়ে তিনি “চৈত্র পূর্ণিমার” কয়েকদিন আগে আমেদাবাদের ট্রেনে চড়ে বসলেন। আমাদের শোনাতে লাগলেন বহুচারা মাতার কাহিনী। আমেদাবাদের থেকে প্রায় ২০০কি.মি. দূরে “মেহসানা জেলায় এই মন্দিরটি স্থাপিত হয় – ১৮৮৩ সালে। এই অঞ্চলে এক ধরণের লোক থাকতেন, যাঁরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন, তাই তাদের ‘চারণ’ বা যাযাবর শ্রেণী বলা হত। তাদেরই একজন দল নেতা যাকে ওরা রাজার মতন মানতো, তাঁর নাম ছিল চারণ বাপন ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন দেথা। তাঁদের কন্যা ছিলেন ভীষণ সুন্দরী। এই উপজাতিদের দলটিকে একবার পথ দস্যু আক্রমণ করে। শত্রুর হাতে নিজেকে সোঁপে দিয়ে সম্মান হারাবার আগে সেই কন্যা ও তার বোন নিজেদের ‘স্তন’ কেটে ফেলেন, এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য মারা যান। তাঁদের এই মৃত্যুবরণ যাতে বৃথা না যায় এবং তারা চিরদিন নমস্য হয়ে থাকেন তাই এই মন্দির স্থাপনা করা হয়। ঐ দস্যু ব্যাপিয়া শাপগ্রস্ত হয়। ঐ দুষ্টু – দস্যু কে শাপ দেওয়া হয় – যেন সে তার পুরুষত্ব হারায় এবং কোনোদিনও যেন কোন নারীকে ভোগ করতে না পারে। শাপমুক্ত হবার জন্য সে বহুচারা মায়ের কাছে মেয়ের রূপ ধরে এসে ধর্ণা দেবে। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলে বন্ধা নারীও সন্তান ধারণের ক্ষমতা ফিরে পাবে। তাই সন্তানহীন মা-বাবাদের ভীড় এখানে।

“ভাবনা নগরে” নেমে ঐ মন্দিরে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন তো আমরা সেখানে হাজার হাজার ভক্তের আনাগোনা, উৎসব অনুষ্ঠান, প্রসাদ বন্টন ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খলভাবে লোকেদের লাইন করে পুজো দেওয়া দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। শ্বেতপাথরের সুন্দর কারুকার্য খচিত মন্দির ঐ ইংরেজদের সময় কি করে এখানকার রাজারা স্থাপনা ও নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ভাবতে অবাক লাগে। কারণ এই ব্রিটিশ সরকার ভারতে এই হিজড়ে জাতির সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কদর্য ব্যবহার করেছে – এসব কথা আমি পিসিমনির কম্পিউটারে ইন্টারনেটে Indian Eunuch দের History পড়তে গিয়ে জেনেছি। তাদের সবসময় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে তুলনা করা হত, নানান ছুতোয় শাস্তি দেওয়া, কারাগারে বন্দি করা যেন তাদের খেলা ছিল। অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় তাঁরা দিন কাটাতেন। হিন্দু ধর্মে প্রতিটি শুভ কাজে বিয়ে বা সন্তানের জন্মকালে তাঁরা যেতেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ নেওয়া আমাদের সামাজিক জীবনে সেই প্রাচীনকাল থেকে এই আধুনিক কালেও শুভ বলে মানা হয়। কিন্তু ইংরেজ সরকারের অত্যাচারে অনেক হিজড়ে গোষ্ঠী তখন চারণ বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

এখানে পুজো দেওয়ার পর যাঁদের বাচ্চা হয় তাঁরা পুজো দিতে আসেন এবং বাচ্চাকে বা তার ছবি এনে ‘গুরুমা’কে দেখান। এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না যে, আমার সমাজও শুধু তালি বাজিয়ে, নেচে, গান করে পেট চালান না। আমাদেরও একটা বিশেষ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্ম ও সুশৃঙ্খল জীবন ধারণের পদ্ধতি – রীতি নীতি আছে। আমাদের মা কে “তৃতীয় প্রকৃতি” বলা হলেও তিনিও মা দুর্গারই এক অবতার রূপে পূজ্য। এখানে Transgender কে “কিন্নর” বলা হয়। গুরুমা এখানে মহামহিমা মন্ডলীর প্রধানা “লক্ষী নারায়ণ ত্রিবেদী কে” দেখালেন আমাদের। তিনি উজ্জয়িনীতে হিজড়েদের জন্য এক সুন্দর আশ্রম বানিয়েছেন। গুজরাটের মুরারি বাপু একজন ‘মহাত্মা’ যাঁকে এঁরা শ্রী শ্রী রামচন্দ্রের মতন মনে করেন। কারণ তিনিই প্রথম কিন্নরদের এই ‘আখড়া’ দিয়ে লক্ষীনারায়ণ মা কে কিন্নরদের প্রধান গুরু রূপে বরণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, যেন অহল্যাকে পাষান মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই মুরারীবাপুকে কিন্নর সম্প্রদায় ভীষণ ভাবে শ্রদ্ধা করে। তাই এখন এলাহাবাদের ও উজ্জয়নীর কুম্ভ মেলায় অন্যান্য সাধুদের সঙ্গে এই কিন্নর মাতাও মিছিল করে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন। এই তীর্থেই “মধু কিন্নর” কে দেখলাম যিনি প্রথম মেয়র হবার যোগ্যতা পেয়েছেন। এঁরা সবাই আমার চোখ খুলে দিলেন। বাড়ি ফিরে এলাম আনন্দিত চিত্তে।

এরপর হাইয়ার সেকেন্ডারীতে প্রথম বিভাগে পাশ করলাম আমি। ‘গুরুমা’ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এবার তীর্থ করতে নিয়ে গেলেন আমায় ম্যাড্রাস তথা চেন্নাই থেকে ২০০ কি.মি. দূরে ‘কুভা গাম’ গ্রামে পরের চৈত্র পূর্ণিমাতে। সেখানে হিজড়াদের এক দেবী “বিষ্ণুর” অবতার “মোহিনীর” মন্দির আছে। মহাভারতের গল্পে অর্জুনের পুত্র ‘আরাভানম’ শত্রু অর্থাৎ কৌরবদের নাশ করবার জন্য “জীবন দান” করতে রাজী হয়েছেন, কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি একদিনের জন্য হলেও বিয়ে করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু যে যুদ্ধে “মৃত্যুবরণ” করতে যাবে তাকে কোন মেয়েই বিয়ে করতে রাজী হলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন পাণ্ডবদের একমাত্র উপদেশ দাতা এবং উদ্ধার কর্ত্তা তিনিই এই সংসারে ইন্ধন যোগান দিয়েছেন, অর্জুনের মিত্র সারথি উদ্ধার কর্ত্তা তো শ্রী বিষ্ণু ভগবানেরই রূপ তাই এবারে অর্জুন পুত্রের সামনে এসে দাঁড়ালেন “মোহিনী” রূপে। বিয়ে করলেন আরাকানকে। তরুণ রাজপুত্র প্রাণ ভরে সম্ভোগ করলেন সেই মায়াময়ী দেবী নারী কে – সেই নারী রূপই এখানে পূজিতা হন। গুরুমায়ের সঙ্গে আমি আর একজন হিজড়াদের দেবী “রেণুকা” কেও দর্শন করতে গেলাম। দক্ষিণ ভারতে হিজড়ে সমাজে “অর্দ্ধনারীশ্বর” – অর্থাৎ অর্ধেক শিব অর্ধেক পার্বতী মূর্ত্তির পুজো হচ্ছে খুব ধুমধামের সঙ্গে। অভয় দান করছেন সেই দেবী শত শত হাজার হাজার “তৃতীয় প্রকৃতির” মানুষকে। হয়তো ধর্মের ভয় দেখিয়ে মূল্যবোধকে ধরে রাখা।

দুবছর ধরে এতো তীর্থ ভ্রমণ, ঠাকুর দেবতা বা ধর্মের কাহিনী আমার ভাল লাগলেও – কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা থেকে গেল আমার মনের মধ্যে। আমি গুরুমাকে অনুরোধ করলাম – ‘এতো দূর যখন এসেছি তখন একবার কন্যাকুমারী ‘বিবেকানন্দ’ রক দেখতে যাওয়ার জন্যে। সেখানে গিয়ে মন ভরে গেল অপার শান্তি ও আনন্দে। কিন্তু সাধারণ দর্শক তো আমাদের মতন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ নাম দেওয়া লোকদের মানুষ বলে মনে করেন না। ট্রেনে, বাসে, প্রসাদের বা টিকিটের লাইনে, বাজারে, দোকানে, হোটেলে যেখানেই যাই সব জায়গাতেই শুধু অবজ্ঞা – অবহেলার ও ঘৃণার প্রকাশ। আমাদের দূরে দূরে আলাদা আলাদা রাখা, ধমকি, মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলা এবং মাঝে মাঝে পুলিশের ভয় দেখানো, – যেন এই নিরীহ হিজড়ের দল কোন সংক্রামক রোগে ভুগছে, – যেন এরা কুকুর, বেড়াল, গাধা, গরু – এদের মনে দুঃখ – অভিমান, রাগ, অপমান নেই। কেউ কেউ তো ভাবেন এরা রক্ত মাংসের মানুষই নয়, কোন দানবী পিশাচ। এদের এই পুরুষালি দেহ, কর্কশ কণ্ঠস্বর এবং মেয়েদের মতন হাবভাব – গান নাচ করা ভীষণ হাস্যকর, লজ্জাজনক।

সেদিন ‘বিবেকানন্দ রকে’ যেতে গিয়ে যে ঘটনাটি ঘটে সে কথা মনে করলে এখনও আমার শরীরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। এখনও আমি আমার গুরুমাকে যারা অসম্মান করেছে, গুরু বোনের শ্লীলতাহানি করেছে তাদের ক্ষমা করতে পারি না।

ঐ বিবেকানন্দের বিরাট নিস্তব্ধ হ’লে বসে চুপ করে অনেকক্ষণ কাটিয়ে যখন বাইরে এসেছি, একদল ছেলে আমাদের এক গুরুবোনের পেছনে লেগে গেল। তাদের ভাষা আমরা বুঝতে পারছি না, কিন্তু হাবে ভাবে ইঙ্গিতে সব ধরতে পারা যাচ্ছে কি তাদের উদ্দেশ্য। পুলিশ বা গার্ড দাদারাও হ্যা হ্যা করে হাসছে, যেন কোন হাসির নাটক দেখছে তারা। নানাভাবে তাদের আমরা উপেক্ষা করে যাচ্ছি। গুরুমা আমাদের সাবধান করেছেন যে, আমরা যেন ওদের সঙ্গে ঝগড়া করতে না যাই। আমার অন্য গুরুবোনটি দেখতে খুবই সুন্দর। প্রয়াগের মেলায় আজ থেকে ২০ বছর আগে তাকে এঁরা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সে কোথাও শুনে এসেছে হিজড়েদেরও বিউটি কন্টেস্ট হয় আজকাল। তার ইচ্ছে সে তাতে নাম দেবে। তাই সবসময় একটু বেশি সেজেগুজে ভালো শাড়ি পরে থাকে সে। ভীষণ হাসি খুশি সরল। একটু চঞ্চল মতিও বলা যায়। ছেলেরা ওর প্রতি খুব তাড়াতাড়ি আকৃষ্ট হয়, আবার ওকে বারণ করা সত্ত্বেও ও বারবার ওদের দিকেই তাকায়। এখানে একটি খুব সাধারণ ধর্মশালায় উঠেছি আমরা। অটো করে তাড়াতাড়ি রওনা হবার পরে লক্ষ্য করলাম, পেছনে দুটি মোটরসাইকেল আমাদের অনুসরণ করে ঠিক ঐ আস্তানায় এসে হাজির হল।

সন্ধ্যে গড়িয়ে এসেছে, আমরা কন্যাকুমারী মন্দিরে আরতি দেখতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময় আবার ঐ চারটি গুন্ডা মতন ছেলে এসে আমাদের পান্থশালার ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে কথা বলতে লাগল নিজেদের ভাষায়। ব্যাপারটি গুরুমা ভাল চোখে নিলেন না। এবার সোজাসুজি ওদের সামনে অফিসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গলায় জোর এনে ঐ ছেলেগুলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, – “ক্যায়া বাত হ্যায় বেটা আপলোগোকো ক্যায়া চাহিয়ে”?

হিন্দি সিনেমা দেখে দেখে ভারতবর্ষের সর্বত্রই অর্থাৎ যে কোন প্রদেশের লোকেরাই এখন হিন্দি ভালোই বোঝে বা বলতে পারে। কিন্তু এরা বলতে চায় না। তবু সামনাসামনি স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়ায় একজন একটা কুৎসিৎ অঙ্গ ভঙ্গি করে উত্তর দিল – “তেরে কো নেহি রে বুড়িয়া উসকো চাহিয়ে”। একজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। “নেহী বিলকুল নেহী। হম ইঁহা তীর্থ করনে কে লিয়ে আয়ে হ্যায়। হম কোই sex worker নেহী হ্যায়”।

হো হো করে হেসে উঠলো তারা। বিনা দ্বিধায় এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে। আমাদের গুরুভাই বাধা দিতে গিয়ে এক থাপ্পড় খেল, একটা দৈত্যের মতন লম্বা চওড়া লোকের হাতে। এবার গুরুমা ভীষণ জোরে চিৎকার করে ঐ লোকগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, – “হারামজাদা ভাগ ইধর সে, নেহী তো হম পুলিশ বুলায়েঙ্গে” –

“পুলিশ? পুলিশ কাঁহা? হম হী তেরা পুলিশ কে বাপ হ্যায়। বুড়িয়া, আ জা, পহলে তু। তেরে জ্যায়সা হিজড়া বহৎ দেখা হ্যায়”। বলে এমন একটা ধাক্কা মারলো যে গুরুমা ছিটকে পড়ে গেলেন। পাশেই একটা লোহার চেয়ারে মাথাটা লাগল ভীষণ জোরে। আমি তখন আর থাকতে পারলাম না, ঝাঁপিয়ে পড়লাম হিংস্র বাঘিনীর মতন ঐ লোকটির ওপরে – রাগে আমার শরীর কাঁপছে। আঁচড়ে, কামড়ে, লাথি, কিল, ঘুষি চালাচ্ছি লোকটার ওপরে। ম্যানেজারটা ও তার চাকর বাকর এসে আমায় ধরল এবং কমলা আম্মাকে তুলে শোয়ালো, জল দিয়ে জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করতে লাগল। কেউ একজন আমার মারের ছবি তুলে নিয়েছে ততক্ষনে, পুলিশেও ফোন করে দিয়েছে। লোকগুলো গালি দিতে দিতে সেই সময়ের জন্য চলে গেল বটে কিন্তু শাসিয়ে গেল যে আবার আসবে তারা আমাদের সর্বনাশ করতে। ‘কমলা আম্মাকে’ অ্যাম্বুলেন্স-এ করে হাসপাতালে এবং আমাকে ওরা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেল। ধর্মশালায় রইল আমাদের বাকী দুই গুরুবোন, গুলাবী আর কুসুম।

সেদিন কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি ঐ দুষ্টু লোকগুলোর অভিপ্রায়, গুরুমায়ের সঙ্গে ঝগড়াটা ছিল, ওদের সাজানো নিছক একটা drama আমাদের আলাদা করার উদ্দেশ্যে।

পুলিশ স্টেশনে কেউ আমার কথা বোঝে না। মার পড়ল ভালো রকম, এমনভাব করছে যেন কোন চোর, ডাকাত কিম্বা উগ্রবাদী, টেরোরিস্ট ধরেছে। সারারাত ওদের নোংরা ‘লক আপে’ কাটলো। সকালে অফিসার এলে, হাত জোর করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বোঝালাম, সমস্ত ব্যাপারটা। তিনি কিছুটা নরম প্রকৃতির। আর আমি এরকম মারামারি করব না লিখিয়ে – একটা কাগজে সই করিয়ে আমাকে ছাড়লেন। আমি আমার কষ্ট যন্ত্রণাতে কাতর হইনি, শুধু গুরুমায়ের চিন্তায় কাঁদছি তখন।

তিনি জানতে চাইলেন ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও আমি কাঁদছি কেন ! আমি বললাম, আমার গুরুমাকে কোথায় কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কি করে তাঁর কাছে পৌঁছাবো, আমার কাছে তো কোন পয়সা কড়িও নেই। তিনি একজন সেপাইকে ডেকে বললেন – আমায় একটা আটো রিকসায় বসিয়ে সেই ড্রাইভেরকে আমরা যেখানে উঠেছি সেই ধর্মশালার নাম বলে দিতে। আমি বসে আছি অটোর অপেক্ষায়, ঠিক তখন একজন ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে থানায় প্রবেশ করলেন। ইংরেজীতে বললেন দারোগাবাবুকে যে তাঁর গাড়িটি রাত্রে চুরি হয়ে গেছে। ধর্মশালার পাশেই তাঁর ক্লিনিক, সেখানে রেখেছিলেন তিনি। ভোর বেলায় তাঁর ড্রাইভার জানায়, গাড়িটি সেখানে নেই। এতক্ষন ঐ অঞ্চলের দোকানদার ও রাত্রের চোকিদারদের কাছে জানা গেল চার পাঁচটি ছেলে একটি মেয়েকে ধর্মশালা থেকে নিয়ে ঐ গাড়িতে করে কোথাও নিয়ে গেছে। অনেকেই তাদেরকে ঐভাবে যেতে দেখেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর তখনই চারিদিকে ফোন করতে শুরু করলেন। আমার শরীরের রক্ত তখন ভয়ে হিম হয়ে গেছে। কোনোরকমে ইংরেজীতে বললাম – “oh my God! Gulabi, She is my Sister”, – ভদ্রলোক চমকে উঠে তাকালেন আমার দিকে। এরকম মার খাওয়া বিদ্ধস্ত চেহারার একজন হিজড়ে যে ইংরেজীতে কথা বলতে পারবে, এটা তিনি হয়ত আশা করতে পারেননি। ইন্সপেক্টরবাবু রাত্রে ধর্মশালার মারপিটের ঘটনাটি জানালেন ওনাকে। আমি তখন সম্ভ্রান্ত চেহারার ঐ মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের পায়ের কাছে বসে পড়ে বার বার বলে চলেছি – “Sir, Please help us, Save my Sister’s life।

আমার জন্য অটোটি এসে গিয়েছিল। ঐ ডাক্তারবাবু বললেন, – “আমি তো ওখানেই ক্লিনিকে যাচ্ছি – চলো তুমি আমার সঙ্গে। আর পুলিশ ইন্সপেক্টরকে বললেন, যত শীঘ্র পারেন গাড়ি ও ঐ মেয়েটির খোঁজ করুন”। শান্ত হয়ে বসে একটা ডাইরীও লিখলেন তিনি, শুধু তাই নয়, আমার হয়েও একটা বড় নালিশ ও ডাইরী লেখা শেষ করে আমাকে সই করতে বললেন।

ধর্মশালায় ফিরে দেখলাম কুসুম একা বসে হাউ হাউ করে কাঁদছে। বাইরে নানান রকমের লোকের ভিড়। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল সে। ডাক্তারবাবু এবার সেখানকার চাকর বাকরদের সবাইকে ডাকলেন, ধমকের সুরে নিজেদের ভাষায় কি সব বললেন, তারপর আমাকে ও কুসুমকে সঙ্গে করে – একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে গেলেন গুরুমায়ের খবর নিতে। সঙ্গে ধর্মশালার কর্মচারী, যাঁরা তাঁকে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছে।

‘কমলা আম্মা’ অর্থাৎ আমার গুরুমায়ের মাথায় ভীষণ আঘাত লেগেছে, তাঁর জ্ঞান ফেরত এলেও যন্ত্রনায় কাতর হয়ে গেছেন তিনি। ছোট্ট একটা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিশেষ পরীক্ষা নিরীক্ষারও ব্যবস্থা নেই। ডাক্তারবাবু ওনাকে অ্যাম্বুলেন্স-এ নিজের নার্সিংহোমে – ক্লিনিক সেন্টারে পাঠাবার জন্য অনুরোধ করলেন সরকারী ডাক্তারকে, আর আমাদের বললেন – ‘গুলাবীর’ কিডন্যাপ হওয়ার কথা যেন ওনাকে জানানো না হয়। চোখ খুলে আমাদের দুজনকে একবার দেখতে পেয়ে গুরুমা যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার চোখ বুজলেন। ডাক্তারবাবুকে আমাদের ভগবান মনে হল। আমরা তাঁর সঙ্গে তাঁর নার্সিং হোমে এলাম এবং ওখানে বসে ডাকতে লাগলাম আমাদের দেবী ‘বহুচারা’ ও ‘রেণুকা’ মাতাকে। পুলিশের সঙ্গে বারবার কথা বলছেন ডাক্তারবাবু এবং তাঁর স্ত্রী, গাড়ির জন্য নয়, ঐ মেয়েটির খোঁজ করবার জন্য নানা জায়গায় ফোন করছেন তাঁরা। বিকেল বেলায় খবর এল গাড়িটি একটি জঙ্গলে পাওয়া গেছে, এবং গুলাবীর ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেহ দূরে এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে পাওয়া গেছে। যখনই আমার কানে এল, – “Her body is found”- আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, কুসুম আমাকে চেপে ধরে কী যেন বলেই অজ্ঞান হয়ে গেল। নার্স দিদিরা তাকে চোখে মুখে জল দিচ্ছে – আমি যে কখনও কাউকে মুখে একটা খারাপ কথা বলতে পারি না – বাংলা, হিন্দি, ইংরাজী যে ভাবে যত খারাপ ভাষায় বলা যায় শাপ-শাপান্ত গালি দিয়ে যাচ্ছি ঐ নিষ্ঠূর নৃসংশ হত্যাকারী দানবদের।

এতো সুন্দর ফুলের মতন মেয়েটাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে কি লাভ পেল ওরা? ভগবান কি অন্ধ? কি হল ঐসব তীর্থে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেব-দেবীর দরবারে মাথা কুটে?

স্থানীয় লোকেরাও বিস্ময়ে ভয়ে সব স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সেখানকার মহিলা উকিল, সাংবাদিক, activists রা আমাদের ঘিরে ধরেছেন, তাঁদের কথা প্রশ্ন কিছুই আমার কানে যাচ্ছে না শুধু – গুলাবী রে — গুলাবী তু বাপিস আ – – শরীরে কোন রোগ হলে তাকে নিয়ে কত চিন্তা থাকে, আর যখন সেটা প্রাণহীন তাকে শুধু দেহটা বা Body বলে ধপাস করে এনে মাটিতে ফেলে দিতে কারুরই কোন দ্বিধা হয় না। আমাকে সেই “দেহ” যখন সনাক্ত করতে বলা হল। তখন আছড়ে পড়লাম সেই ধর্ষিতা গুরুবোনের বুকের ওপরে।

দিল্লীতে এই ধরণের গণ ধর্ষণ ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা শোনা গেছে। সারা দেশের মানুষ তার জন্য মোমবাতি জ্বেলে, মিছিল করে, শোক সভা করেছে। আমি রোজ খবরের কাগজ থেকে পড়ে শুনিয়েছি আমার গুরুমা কে। তাঁর চোখে জল পড়েছে। আর আজ তাঁরই ঘরের একজন সদস্য এইভাবে পশু মানবের লালসার শিকার হবে, এমন শোচনীয় ও ভয়াবহ মৃত্যু বরণ করবে আমরা কি কেউ ভাবতে পেরেছিলাম ! ডাক্তারবাবুর তোড়জোড়ের চেষ্টায় বোন গুলাবীর পোষ্টমর্টেম ও সৎকার করা হল। মুখাগ্নি করার সময় মনে হচ্ছিল যে ঐ জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে আমি সামনের সব পুরুষের পুরুষাঙ্গ জ্বালিয়ে দিই। সারা শহরের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে চলে যাই। গুরুমা ও কুসুমের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা ছাড়া আর কিছুই করবার মতন শক্তি সঞ্চয় করতে পারিনি সেদিন। পরে শুনেছিলাম ঐ ছেলেগুলি ধরা পড়ে আবার ছাড়া পেয়ে গেছে, কারণ স্থানীয় কোন রাজনৈতিক দলের নেতার পুত্র আছে সেই ঘৃণ্য পাষণ্ডদের মধ্যে, অতএব জামিনে খালাস পেয়ে আবার শহরের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। Activist সাংবাদিক এবং উকিল দিদিরা আমাদের হয়ে কেস করে হতাশ হয়েছেন। একে তো অন্য প্রদেশের লোক তায় আবার “হিজড়ে”! কে তাদের হয়ে সাক্ষী দেবে? কেউ সাহস করে এগিয়ে আসতে চাইছে না। সুতরাং কে তাদের বিচার করবে, শাস্তি দেবে? অতএব বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

কানপুরে এসেই গুরুমা দেখা করলেন আমার মালিক উকিল বোস বাবুর সঙ্গে। তিনি গুলাবীর কেস নিয়ে অনেক লেখালেখি শুরু করে দিলেন। ঐ পশুদানবদের প্রথম ছোট কোর্টে – যাবৎজীবন সাজা হলেও তারা আবার আপিল করল হাইকোর্টে। সব জায়গাতেই তাদের টাকার জোর খাটাতে লাগল। রক্ষক যেখানে ভক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করে সেখানে কে কি ভাবে সুবিচার পাবে? আমরা সবাই খুব বিমর্ষ মনমরা হয়ে পড়লাম।

এইসময়ই হঠাৎ আমার কলকাতা যাওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল। পিসিমনির ভাইয়ের বিয়েতে তাঁরা কলকাতা যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। সোনামনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল। পিসিমনি আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। সোনামনির দেখাশোনাও হবে, আবার আমি আমার মা বাবার সাথেও একবার দেখা করে আসতে পারব। আমি তো আনন্দের সঙ্গে এই সুযোগ গ্রহণ করলাম, অবশ্যই গুরুমায়ের অনুমতি নিয়ে।

হাওড়া স্টেশনে নামতেই মনটা যেন ময়ূরের মতন নেচে উঠল। ট্রাম, বাস, রিকশা – সবাই শাড়ি পরে, বাংলায় কথাবার্তা – একটা অদ্ভুত অন্য জগৎ, যার সঙ্গে আমার প্রাণের টান অনুভব করতে লাগলাম। পিসিমাদের বাড়িতে খুব ভিড় তাই আমাদের জন্য খুব সুন্দর এক Guest House এ থাকার ব্যবস্থা হল, ঐরকম মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ মেয়েকে নিয়ে তো সকলের মধ্যে থাকা যাবে না। আমারও খুব সুবিধে হল। পিসিমনি মা বাবাকে ফোন করে ডাকলেন সেই গেস্ট হাউসে। ভাইও এল। আমি যে কি করব তা ভেবে পাচ্ছি না। একবার মা কে জড়িয়ে ধরে – কাঁদছি, তো একবার বাবাকে প্রণাম করছি। কখনও ভাইয়ের মুখটা বুকে চেপে ধরে কাঁদছি। সেও দিদিকে পেয়ে অবাক হয়ে চেয়ে আছে – এ এক অপূর্ব মিলন মেলা যেন। হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে পেয়ে এমন আবেগে আপ্লুত হতে দেখে ঐ ঠাকুমা, পিসিমা এমন কি রাসভারী বোস বাবুরও চোখে জল এসে গেল। আনন্দ অশ্রু যে এতো পবিত্র হয়, মনকে এমন ভাবে সিক্ত করে, ধৌত করে স্নিগ্ধ করে দেয় – তা আগে কখনও অনুভব করিনি। ওঁদের জন্য পিসিমনি অনেক উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, মা বাবা ও আমার জন্য খুব সুন্দর শাড়ি এবং মায়ের গলার একটি চেন, কানের ঝুমকো ‘তিন্নি’ লেখা একটি আংটি দিলেন – আমায়। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আরও পড়াশুনো করার প্রতিজ্ঞা করলাম তাঁদের সামনে। ভীষণ খুশি হলেন তাঁরা। বাবা পিসিমনির কাছে অনুরোধ করলেন যাওয়ার আগে একবার যেন তাঁদের বাড়ি যাই আমরা সবাই মিলে। ঠাকুমা প্রশ্ন করলেন “আপনাদের ওখানের প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবরা আমাদের তিন্নিকে অন্য চোখে দেখবে না তো? ওর অসম্মান হোক এমনটা কিন্তু হতে দেওয়া চলবে না”। –

এবার হাত জোড় করে বাবা বললেন – “মা আপনারা ওকে আপন করতে পেরেছেন, সুন্দর জীবনের রাস্তা দেখিয়েছেন, আর আমরা আপন বাবা মা ওকে কোন সাহসে দূরে ফেলে রাখব? ওর অপমান তো আমরাই আগে করেছি, ওর মনে আঘাত দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা কর মা, তিন্নি মা আমার একবার বাড়ি চল”।

বাড়ি গিয়ে সারাদিন প্রানখুলে গান, গল্প – সুক্ত, মাছের ঝোল, চাটনি, পায়েস, খেয়ে সারাক্ষন ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করে এক অবাধ ভালোবাসার স্বাদ ও পরিতৃপ্তিতে ভরে ফিরে এলাম, এক নতুন উৎসাহ, আনন্দ ও প্রেরণা নিয়ে।

কলকাতা থেকে ফেরার সময় যেন আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। ট্রেনে সবাইকার এক জায়গায় সীট পাওয়া যায়নি। আমি বললাম – ‘আমি পাশের কামরায় একা বসছি। যখন তখন এসে সোনামনিকে দেখে যাব, বাথরুম করিয়ে দেব। পিসিমনি তো এবার আমাকে একটা মোবাইল ফোনও উপহার দিয়েছেন। সেটিতেই তো সর্বদা যোগাযোগ থাকবে। অন্য কামরায় এসে একা একটি কোণে জানলার ধারে মুখ করে বসে রইলাম। বাংলাকে যে এতো ভালোবাসে, বাংলা ভাষায়, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে খাওয়া পরায় যার এতো আসক্তি ও অনুরাগ তাকে বাংলা পরিবেশ ছেড়ে কেন যে বারবার চলে যেতে হয়, – দূরের পানে চেয়ে আঁখি – কেবল আমি চেয়ে থাকি, মনটা মোচড় দিতে থাকে, কান্নায় বুকের মধ্যে একটা ঠেলা উপলব্ধি করতে পারছি। বাইরে সবুজ মাঠ ছুটে যাচ্ছে – – – রাখাল, গরু, নদী, পুকুর, হাঁসের দল – কী সুন্দর অনুভূতি – হটাৎ কে যেন ডাকল, – “Excuse me, May I know your seat number”? চমকে উঠে মুখ ফেরালাম আমি, যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম, প্রথমে মুখে কথা সরল না, বোধহয় অন্য জগতে বিচরণ করছিলাম। আবার তাঁর সুন্দর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে বাজলো – “আপনার সীট টা বোধহয় ঐদিকে – এটা আমার জায়গা – ১২ নাম্বার – দেখুন টিকিটটা একবার”।

চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। এক সেকেন্ডে আমার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল, – এতো সুন্দর প্রগাঢ় দৃষ্টি – এতো সম্মানজনক ভঙ্গি – এমন সুঠাম লম্বা পুরুষ ! আমার সঙ্গে একজন হিজড়ে, বৃহন্নলা – কিন্নরের সঙ্গে এইভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন – একি কোন দেবদূত নাকি? লজ্জিত মুখে উঠে দাঁড়ালাম – উত্তর দিলাম। “Yes, I know, this is not my seat । জানলার ধারে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আপনি বসুন এখানে, আমি ওদিকে চলে যাচ্ছি”।

কিন্তু তাঁর চোখে হয়তো কিছু ধরা পড়ে গেল, – “একী আপনি কাঁদছিলেন? Any bad news, না আপনার শরীর খারাপ”?

বুঝতে পারলাম না কি জবাব দেব। – কিন্তু আমার “তৃতীয় নয়ন” বা অন্য একটা সত্তা বলে দিল এটাই বোধহয় “- – – Love at first sight” – প্রেমের আকর্ষণ এটাকেই বলে কিনা জানি না। আমার বুক কাঁপতে লাগল অকারণে। ঠিক এই সময়ে আমার ফোনটা বেজে উঠল, আমি ছুটে গেলাম পাশের কামরায় সোনামনিকে attend করতে। কি মনে হল যাওয়ার আগে ঐ attractive খুব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষটিকে ইশারা করে শুধু আমার স্যুটকেশটা দেখিয়ে বললাম – “Please একটু দেখবেন – আমি পাশের কামরায় আমার বোনকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আসছি”।

তিনি মাথা নাড়লেন – ‘OK No Problem! প্রায় এক ঘন্টা লাগল, সোনামনিকে বাথরুম করাতে, খাওয়াতে ও শোয়াতে। এসে দেখলাম, চা, বিস্কুট, চপ দিয়ে গেছে, আমাদের টেবিলে। আমারগুলি আগলে উনি বসে আছেন। আমি স্মিত হাসি হেসে – ধন্যবাদ জানালাম। ট্রেনের আওয়াজে ভালো করে কথা বলা বা শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ছোট্ট কাগজে কিছু লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ঐ যুবক। লেখা – “Can’t – talk, Please Give me your Whatsapp Number”।

আমার বুকের মধ্যে তখন শত শত দামামা তবলা, খোল, মৃদঙ্গ বাজতে শুরু করেছে। হাত কাঁপছে তবুও ওনার পেন ও কাগজে লিখে দিলাম আমার নাম – ‘ত্রিনয়নী’ এবং ফোন নাম্বার।

শুরু হল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। সামনে যেন খুলে গেল স্বর্গের দ্বার। হৃদয়ের মন্দিরে যেন চার্চের বেল বাজছে, দূর থেকে মসজিদের আজান ও গুরুদ্বারার শব্দ কীর্তনের ধ্বনি ভেসে আসছে ভাবছি, – “সখী ভালোবাসা কারে কয়? সে কী – – – -?

‘ধানবাদ’ স্টেশনে উঠলেন দুজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা প্রায় ৭০/৮০ হবেন। যাঁরা চড়িয়ে দিতে এসেছিলেন তাঁরা জিনিসপত্র গুছিয়ে ওনাদের প্রণাম করে নামার আগে ঐ ভদ্রলোক ও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, – “দাদা, – বৌদি, Please একটু সীট চেঞ্জ করে দেবেন, ভুল করে ওপরের বার্থ দিয়েছে ওঁদের। আমরা বলেছি, জ্যেঠুকে ট্রেনে কোন ভাল লোককে অনুরোধ করে বদলে নেবেন। জ্যেঠিমা খুব অসুস্থ”। তাড়াতাড়িতে নেমে গেলেন তাঁরা, কারণ ট্রেন এখানে খুব অল্প সময়ের জন্য থামে। আমি বললাম, “ঠিক আছে কোন চিন্তা করবেন না, আমি ঐ মায়ের বার্থে উঠে যাব”। খুব খুশি হলেন ঐ বুড়ো বুড়ি জ্যেঠু-জ্যাঠিমা আমাদের পেয়ে। গল্প জুড়ে দিলেন ঐ ছেলেটির সঙ্গে জোরে জোরে। আমিও শুনতে লাগলাম চুপ করে।

উনি একজন – প্রাকৃতিক উর্জা বিশেষজ্ঞ, মানে Sustainable – Energy – Consultant, বিদেশে পড়াশোনা করে এসেছেন। আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় অর্থাৎ ৩০ বছরের বিবাহিত ব্যক্তি! একটি ছেলেও আছে তাঁর ৩ বছরের। পুনে, মহারাষ্ট্রতে থাকেন, নিজের বাবা মায়ের বাড়িতে। বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এই সুন্দর শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার আমার মনকে যেমন আবেগে আপ্লুত করল তেমনই আবার যেন একটা চাবুকও খেলাম আমি। সমস্ত প্রেমিক সত্তা আমার প্রথম এবং হয়তো এই শেষ প্রেমের প্রবল স্রোতে বাধাপ্রাপ্ত হল। ও হো উনি বিবাহিত? না, না, কারোর সংসার ভাঙতে চাই না আমি। রাত্রে ‘ডিনার’ খেয়ে আর একবার দেখে এলাম ঐ কামরায় পিসিমনিদের। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে একটু যেন ধাতস্ত হলাম। ভেতরে যে অদ্ভুত একটা আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাৎ হচ্ছে তাকে শান্ত করার জন্য অনেক মেঘ কান্নার বৃষ্টি চাই। ঐ মায়ের পাশে বসে অনেকটা জল খেলাম নিজের সীল করা বিসলারির বোতলটা থেকে, উনি আমায় লক্ষ্য করছিলেন এতক্ষন, বোধহয় একজন ‘হিজড়ে’র পাশে বসে ওনার একটু সংকোচও হচ্ছিল, কিন্তু আমাকে এতটা জল একসঙ্গে ঢক ঢক করে পান করতে দেখে মাতৃ সুলভ প্রশ্নটা স্নেহময়ীর কণ্ঠে শোনা গেল।

“ও মা ! কত জল তেষ্টা পেয়েছিল গো। কতক্ষন জল খাওয়া হয়নি তোমার”?

আমি শুধু বললাম, – “অনেকক্ষন – – -“। মনে হচ্ছিল আমার এই তৃষ্ণা বোধহয় আর কোনদিন মিটবে না। ঐ মায়ের বিছানাটা করে দিয়ে চাদর বালিশ কম্বলে ঢেকে, ওনার পা দুটি সুন্দর করে মুড়ে দিয়ে বললাম, – “এবার শুয়ে পড়ুন, আমি ওপরে উঠে যাচ্ছি”। – সালোয়ার কামিজ পরেছি – ট্রেনের সফরে সুবিধে হল। তাড়াতাড়ি ঐ ওপরের বার্থে উঠে শুয়ে পড়বার আগে হাত জোড় করে ঠাকুমার শেখানো প্রার্থনাটা করলাম, যেটা ছোট থেকেই করি, – “শরণাগত পরি – – – । তারপর ওনার দিকে কোনরকমে তাকিয়ে শুধু Good Night বলে শুয়ে পড়লাম।

মুখটা অন্য দিকে করে ফোনটা বুকের কাছে ধরে শুয়ে আছি। যদি হটাৎ পিসিমনি ডাকেন সোনামনির বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনে। ঠিক তখনই মেসেজ আসতে শুরু করলো একের পর এক। প্রথমে ভাবলাম বোধহয় কোন বিজ্ঞাপন কোম্পানীর মেসেজ, কিন্তু বেশ কয়েকটা আসার পর খুলতেই হল, ফোনের আলোয় জ্বল জ্বল করে উঠল কয়েকটা লাইন।

তিনি কে বুঝতে দেরী হল না –

– ঘুমিয়ে পড়লেন? আপনার নামটা বড় সুন্দর। একটু কথা বলতে চাই !

উত্তর দিচ্ছি না দেখে আবার মেসেজ, –

– Are you sleeping?

– No

– Please turn this side , look at me

– Sorry I am very tired

– I know you are upset also

– বাবা, মা ভাইকে ছেড়ে এসেছি।

– কোথায় যাচ্ছেন?

– কানপুর। এক এক word এ reply দিচ্ছি।

– আমি দিল্লী, পরের সপ্তাহে পুনে চলে যাব, ওখানে আমার মা ও ছেলে আছে।

– নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হচ্ছে না।

– কানপুরে আপনার কে আছে? ঐ বোনটি কি আপনার নিজের?

– না, আমি ওর নার্স দিদি, ওদের বাড়িতে কাজ করি। মেয়েটি মানসিক দৈহিক ভারসাম্যহীন।

– এইরকম একটি অসুস্থ বাচ্চাকে সেবা করতে কষ্ট হয় না আপনার?

– না খুব ভালো লাগে, আনন্দের সঙ্গেই করি। তাছাড়া ভদ্রভাবে বাঁচার জন্য টাকা রোজগারেরও দরকার।

– খুব ভাল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভীষণ খুশি হলাম।

– Thank You

– আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন Please

– কেন? আমাদের গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়ম নেই, বাইরের লোকের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করার।

– আপনার ওখানে গার্জেন, মানে অভিভাবক কে?

– আমার গুরুমা – কমলা আম্মা।

– ওনাকে আপনি খুব ভালোবাসেন মনে হচ্ছে।

– হ্যাঁ, বাবা মা বাঙালি, জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু উনিই আমাকে জীবন দান করেছেন, নতুন ভাবে।

– Very Interesting

– আমাদের হিজড়ে মানে থার্ড জেন্ডার-দের কে সবাই খুব ইন্টারেস্টিং মনে করে।

– না না আমি কিন্তু সেভাবে বলিনি। কিছু মনে করবেন না please

– মনে করার কিছু নেই। আপনাদের সমাজ আমাদের সম্মানের চোখে কোন দিনিই দেখে না।

– কে বলেছে আপনাকে? কত থার্ড জেন্ডার-এর ব্যক্তি এখন অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন।

– তাই নাকি? একটু ব্যঙ্গ করে বলে উঠলাম।

– আপনি গৌরী শাওনের নাম শোনেননি।

– না, কে তিনি? কোথায় থাকেন?

– পুনে তে। মহারাষ্ট্রের মেয়ে – মানে জন্মগত ভাবে নন, প্রথমে ছেলে ছিলেন পরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে তাঁর এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি Eunuch “ইউনাক” গোষ্ঠী ভুক্ত হন।

একসঙ্গে এতো বড় মেসেজটা পাঠিয়ে একটু উঠে বসলেন তিনি নিজের বার্থে। জল খেলেন বোতল থেকে।

আমি ওনার দিকে ফিরে তাকিয়ে আছি হাঁ করে। কত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ত তাঁর ব্যবহার। যেন কত চেনা কোনো এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন।

অদ্ভুত একটা ভাল লাগায় মনটা যেন আপ্লুত হয়ে গেল।

আমার দিকে হাত বাড়িয়ে নিজের বড় ফোনটা মনে হয়  I-Pad এগিয়ে দিয়ে বললেন, Google Search করে গৌরী শাওনের ‘Ted Talk’, Proctor and Gamble-এর অফিসে, বিভিন্ন স্কুল, কলেজে দেওয়া কথাগুলো শুনুন। আমি একটু নিচে নামি। washroom যেতে হবে।

আমি পড়তে লাগলাম গৌরী দেবীর কথা মন দিয়ে, মুগ্ধ হয়ে – মগ্ন হয়ে শুনতে লাগলাম তাঁর অপূর্ব ভাষণ, True Story। চেহারাটা ঠিক যেন বাঙালি মেয়ের মতন। কপালে “উষা উত্থুপের” মতন বড় টিপ।

মেরুন রঙের শাড়িতে তাঁর অসম্ভব উজ্জ্বল শ্যামলী চেহারা যেন জ্বল জ্বল করছে, স্টেজের ওপরে। দাঁড়িয়ে এক মিনিটেই আমাকে সম্মোহিত করে দিলেন তিনি।

পুনের এক বড় পুলিশ অফিসারের পুত্র, – খুব ভাল ইংরেজী স্কুলে পড়তেন। বিরাট বাংলো বাড়িতে থাকতেন। অনেক চাকর বাকর, এক দিদি – মা – বাবা – সুখের জগতে বিলাসিতার মধ্যে বড় হচ্ছিলেন। হটাৎ তাঁর ‘মা’ অকালে মারা গেলেন। দিদির বিয়ে হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকেই পুরুষের সমস্ত লক্ষণ নিয়ে জন্মালেও মানসিক ভাবে মেয়ের গুণগুলি লক্ষ্য করা যেত তার মধ্যে। পুতুল খেলতে, মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রান্না বাড়ি খেলতে পছন্দ ছিল তাঁর। ধীরে ধীরে চেহারায় পরিবর্তন এসে গেল। ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী, থেরাপিস্ট কেউই তাঁর পুরুষত্ব প্রমান করতে বা অক্ষুন্ন রাখতে পারল না। বাবা কথা বলতেন না, অপমানে, গ্লানিতে, লজ্জায়, ঘৃনায় ও ভগবানের ওপর – পৃথিবীর মানুষের ওপর রাগে – অভিমানে সেই গণেশ নামের ছেলেটি যখন সম্পূর্ণ লালিত্য নিয়ে কন্যা তথা কিন্নরীর রূপ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করল, তখন একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিল মুম্বাইয়ের হিজড়ে সম্প্রদায়ের আড্ডায়। ইংরাজী সাহিত্য জানা ছিল, আর মনে ছিল অদম্য উৎসাহ, তাই যুবতী গৌরী হয়ে সে প্রথমে ‘গায়েত্রী’ নামে এক sex worker এর কন্যাকে adopt করে ‘মা’ ডাক শুনে নিজেকে ধন্য করল। পরে ওই রকমই আরও অসহায় পতিত দুঃখী পথ শিশুদের নিয়ে তৈরী করল ‘NGO’ “নানী কা ঘর”। সেখানে তাঁর মাতৃত্বে স্নেহে লালিত পালিত হচ্ছে কত শিশু দুঃখী পরিত্যক্ত বাচ্চারা।

ফোনে গৌরী শাওনের জীবনী পড়তে পড়তে আনন্দে আশায় আবেগে উঠে বসলাম এবং ঐ ভদ্রলোকের – হাতে সেটি ফেরত দিয়ে, নিজের মোবাইলে আবার আমাদের নীরব বার্তালাপ – গল্প কথা শুরু হল। এবার আমিই প্রথম মেসেজটা করলাম।

– অনেক অনেক অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমার আজ পথ প্রদর্শক গুরু হলেন। আপনাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

– তাহলে এসো না, আমরা দুজনে মিলে একটা নতুন জীবন, আলোকোজ্জ্বল পবিত্র স্নেহ সেবা, ভালোবাসায় গড়া পরিবার তৈরী করি।

– না না সে কী করে হয়? আপনার স্ত্রী পুত্র কি ভাববে? কত আঘাত পাবে।

– আমার পুত্রটি অন্ধ। আর স্ত্রী? একটু স্মিথ হাসি হেসে থেমে কেটে কেটে শুধু বললেন, তিনি বাচ্চা প্রসব করেই চিরতরে এই পৃথিবী থেকে স্বর্গের পথে চলে গেছেন।

– ওঃ হো, I am very sorry।

– ঐ বাচ্চা ও আমার বুড়ি মায়ের ভার যদি শেয়ার করে নাও, I will be grateful, কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চাই “ত্রিনয়নী” তোমাকে।

– আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এই রাত্রের ট্রেন জার্নিতে মা বহুচারা, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী সারদা মা – বিবেকানন্দ কি তোমার মধ্যে আমার সামনে প্রকট হয়েছেন।

– তোমাকে আমার পুত্রের ‘মা’ বলে আমি মর্যাদা দিতে চাই, সুযোগ দেবে তুমি?

– হে ভগবান, এ আমি কি শুনছি ! আমি কি এর যোগ্য হতে পারব?

– হ্যাঁ নিশ্চয় পারবে। – আমরা দুজন স্বর্গ খেলনা গড়িব এ ধরণীতে।

কানপুরে সোনামনি, পিসিমনি, ঠাকুমা ও বোস বাবুর সঙ্গে স্যুটকেশ হাতে করে যখন নেমে পড়লাম, তখন ঐ নাম না জানা দেবদূত হটাৎ বিদায় সম্ভাষণ জানাতে আমাদের পিছনে এসে দাঁড়ালেন।

কি ভাবে যে কি কথা বলা উচিৎ এখন বুঝতে পারলাম না। শুধু দু চোখে জল নিয়ে অদ্ভুত আবেশে ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, আমি ধরা গলায় বললাম, –

– আমি রাজী।

সোনামনি খুব আনন্দে উৎসাহে স্টেশনের মাটিতে পা দিয়ে হেসে উঠল খল খল করে। কলকাতায় গিয়ে মামার বিয়ে দেখে সে এখন “বৌ – বর – বর” খেলতে ভালোবাসে।

আমি ওকে একহাতে চেপে ধরে অন্য হাতে স্যুটকেশ নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমার জীবনের প্রিয় মানুষগুলির সঙ্গে।

বাইরে দুটি বড় বড় গাড়ি অপেক্ষা করছে। ঠাকুমা ও আমি সোনামনিকে নিয়ে একটা গাড়িতে বসে পড়লাম। পিছনে হুইশেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার শব্দ ক্রমশঃ মিলিয়ে যেতে লাগল। বুকের ভিতরে ঐ আওয়াজটা যেন “শেল” বিঁধিয়ে দিচ্ছে। কে জানে কখন কেমনে তার সঙ্গে আবার দেখা হবে? আর ঠিক তখনই আমার বোনটি হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল – “দিদি দিদি বল, তোল বল এসেছে, – বল? কোথায় আবার বল পেলে তুমি? ঐ যে বল, বল, বল, আয়, আয়। জানলার বাইরে দেখি সত্যি তো আমার বর দাঁড়িয়ে আছেন – তিনি বললেন – “চলো তোমার গুরুমাকে প্রণাম করে আসি”।

 

চতুর্থ অধ্যায়

গুরুমা বললেন, –

“আজ মেরে জিন্দগীকে সব সে আচ্ছা দিন হ্যায়। হামারা বরাদ্রিকে কিসিকো এক সাচ্ছা ইনসান নে জীবন সাথী বানানে কে লিয়ে তৈয়ার হুয়া। ঈশ্বর তুম দোনো কো সদা সুখী রাখেঙ্গে।”

বোসবাবুদের বাড়ির লনে সুন্দর করে আম পল্লব, গাঁদা ফুলের মালা সাজিয়ে প্যান্ডেল বানানো হল এবং মা বাবার উপস্থিতিতে আমাদের সম্প্রদায়ের সব সদস্যদের মাঝে বিবাহ মণ্ডপ তৈরী করা হল। আমার স্বামীর মা ও পুত্রও যোগ দিলেন সেই অনুষ্ঠানে। সম্পূর্ণ বাঙালিদের নিয়ম কানুন অর্থাৎ আইবুড়ো ভাত ও গায়ে হলুদ ইত্যাদি সমাধা হলে, কন্যাকে সম্প্রদানের জন্য পিতার ডাক পড়ল।

কিন্তু বাবা দুই হাত জড়ো করে বললেন, – “আমি এর যোগ্য নই, ‘কমলা আম্মাই’ একে মেয়ের যথার্থ মর্যাদা দিয়েছেন, তিনিই সম্প্রদান করুন।” কিন্তু পুরোহিত মহাশয় রাজী নন। তিনি বললেন “তা কি করে হয়, গোত্র চাই, এর গোত্রান্তর হবে। নারায়ণ স্বাক্ষী করে এসব অনাচার তো হতে দেওয়া চলবে না।”

এবার বরের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বর – স্বামী “দেবমাল্য সাহা।” – “তাহলে দক্ষিণাটার টাকা নিয়ে আপনি এখন থেকে বিদায় গ্রহণ করুন।” তারপরে আমার হাত ধরে টেনে তুললেন – বিয়ের পিঁড়ি থেকে। – “এসো তিন্নি আমরা আজ এক নতুন ধরণের বিবাহ বন্ধনে যুক্ত হই।” প্রথমে তাঁর নিজের মা ও পরে আমার মা, বাবা, গুরুমা, ঠাকুমা, পিসিমনি, ও বোসকাকুকে প্রণাম করে তিনি তাঁর ছোট্ট শিশুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমাদের দুজনের হাত তার ছোট্ট হাতে সঁপে দিয়ে বলে উঠলেন, কান্না জড়িত গলায়, – “হে শিশুরুপী নারায়ণ, তুমি আমাদের এই বিবাহ বন্ধনকে স্বীকার করো, অনুমতি দাও তোমাকে ও সমগ্র জগতের দুঃখীজনের সেবায় যেন আমরা দুজন লাগতে পারি।” – সেই ছোট্ট পুত্র প্রথমে আমার হাতটি পরশ করে, পরখ করে দেখতে লাগল। আমি ওর কাছে নিচু হয়ে বসে পড়েছি। মালাটি নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলো সে, তারপর আমার মুখে চোখে হাত বুলিয়ে মাথার চুলে তার আঙুল ছোঁয়ালো। আমার শরীর আনন্দে, আবেগে শিহরিত হয়ে কাঁপছে – আমি আর থাকতে পারলাম না। মাটিতে বসে ওকে বুকে টেনে নিলাম। সে ও আমায় জড়িয়ে ধরে বলল – “আমার মা! বাবা তুমি আমার জন্য ‘মা’ কিনে এনেছো? কি সুন্দর গন্ধ”, – আমার মতন বিবাহ বাসরে আনন্দ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিতদের আসরে সবাইকার চোখে জল এসে গেল।

বোসকাকু রেজিস্ট্রি অফিসের লোকদের আগেই নিয়ে এসেছিলেন। আইনসম্মতভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে গেলাম। –

ওদিকে আমার বোন সোনামনি তখন একটু দূরে ঠাকুমার পাশে বসে হাততালি দিচ্ছে। ওকেও আমি চন্দনের ফোঁটা, লাল ছোট্ট বেনারসী পরিয়ে ‘নিৎ কনে’ সাজিয়ে দিয়েছি আগেই। এবার সে আমায় ডাকাডাকি শুরু করেছে। “দিদি দিদি আয় আয়, বল বল আয় আয়।” – বুঝলাম আমার বরকে নিয়ে সে তার কাছে যেতে বলছে। আমরা এগিয়ে গেলাম তার দিকে। ক’দিন ধরেই তার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। পিসিমনি তাকে ধরে আছেন। যেমন করে শিশু নারায়ণের কাছে নতজানু হয়েছিলাম, এবার আমার স্বামী ‘দেবমাল্য সাহা’ ঠিক সেইভাবে সোনামনির কাছে গিয়ে বসলেন, – “এইতো সোনামনি বল এসে গেছে” বলে তার হাতটি ধরল। সোনামনি তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো তারপর আমাকে কাছে পেতেই হটাৎ কেন জানিনা, ঢোলে পড়ল আমার কোলে। হাসি মুখে আমাদের আশীর্বাদ দিতে দিতে ঐ শুদ্ধ সরল প্রাণ আজকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিল স্বর্গলোকে।

ফুলে সাজানো যে গাড়িতে বর – তার বল এসেছিল তাতে ফুলের মালা চন্দনে চর্চিত ফুটফুটে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হল, অন্তিম যাত্রায়। ডাক্তার আগেই তার বাবা মা কে জানিয়েছিলেন, কিডনী ফেল হওয়ার কথা, কিন্তু বিয়ে যাতে বন্ধ না হয়, তাই আমাকে বলেননি তাঁরা। জানা ছিল সে চলে যাবে কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি ভাবতে পারিনি।

পুনে শহরে এসে প্রথমে মা ও ছেলের দেখাশুনোর সঙ্গে সঙ্গে B.A. পড়া শুরু করলাম। প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলে ‘দেবমাল্য’ আমাকে বললেন Law পড়তে। ব্রেল লিপিতে তখন পুত্রের লেখা পড়া শুরু হয়েছে।

দেবমাল্য সূর্য্যপ্রদীপ জ্বালাতে অর্থাৎ সোলার প্যানেল লাগাতে উড়িষ্যা গেলেন। খুব ভাল লাগল তার সেখানে একটি গ্রাম। ফিরে এসে বললেন এবার তোমায় নতুন কিছু করার কথা ভাবতে হবে। তোমাদের তৃতীয় সত্তার মানুষগুলির উন্নতির জন্য একটা এমন সংস্থা তৈরী করব যেখানে ওদের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। –

আমি বললাম, আমাদের একার পক্ষে তা কি করে সম্ভব? তিনি বললেন অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো প্রকৃত মানুষের কাজ। এখন ইন্টারনেট-এর যুগ। অন্য দেশের ট্রান্স জেন্ডারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি Organisation গড়ে তুলতে হবে যেখানে আশার আলো দেখবে তারা।

আনন্দে, উৎসাহে, আবেগে ভরে উঠল আমার মন। শুধু ভোটের অধিকার বা উজ্জয়িনী প্রয়াগের কুম্ভমেলায় প্রবেশাধিকার আমাদের জন্য সবকিছু নয়। এমন প্রশিক্ষণের দ্বারা তাদের আত্মনির্ভর করে তুলতে হবে যাতে তাঁদের মধ্যে থেকে সমাজ পায় অনেক দক্ষ কুশল কর্মীর দল।

বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা বলা, আলোচনা শুরু হল। কি কাজে লাগবেন এরা? এতদিন তো শুধু হাতে তালি আর মুখে গালি নিয়ে জীবন কেটেছে এদের।

প্রথম কাজ – নিরাপত্তা বাহিনী অর্থাৎ পুলিশের মধ্যেই Male, Female-এর সঙ্গে একটি কিন্নর সুরক্ষা বাহিনী তৈরী। যারা পুলিশ সৈনিক বা কমান্ডোদের মতন নানা ধরণের দৈহিক শক্তি বাড়াবে। Excercise জুডো, ক্যারাটে-এর ট্রেনিং নিয়ে মহিলাদের সুরক্ষায় নিযুক্ত হতে পারবেন।

আমরা জেনেছি – ‘Eunachs are casterated male since 9th century B.C…. The World derives from the Greek – “The keeper of Bed”, because those castrated men where in populer demand to guard royal harems”।

এঁরা বহু দেশে বহু রাজার – সম্রাটের বাড়িতে অন্দরমহলে তাঁদের রানী ও রাজকন্যাদের “সুরক্ষা কাজে” নিযুক্ত হতেন। গ্রীক, রোমান, হিন্দুদের পর মুসলমানদের বেগমদের রক্ষা কার্য্যেও তাঁদের অর্থাৎ এই হিজড়ে ট্রান্স জেন্ডারদের ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ইংরেজ সরকার তাঁদের ওপর অত্যাচার করেছে, অকারণে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে, – উল্লেখ মনিপুরের ঘটনা – শিশুদের সঙ্গে দেখলেই ছেলে ধরা বলে তাড়া করে গ্রেপ্তার করেছে – সে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অন্য জগতে বন্দি করে। ‘বহুচারা মাতার’ কল্পনা তাদের ধর্মবোধ জাগায় এবং নানাভাবে তারা একত্রিত হতে থাকে, কিন্তু তাদের মধ্যেও সেরকম কোন মানুষ নেতৃত্ব করতে বা তাদের সাহস এক করে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সক্ষম হয়নি।

বর্তমানে অনেক NGO হয়েছে। কলকাতায় ৪০/৫০ বছর আগে কোন ইউনাক বা হিজড়েকে কোথাও ভিক্ষে করতে দেখা যেত না এখন পথে ঘাটে রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রায় প্রত্যেক ট্রাফিক লাইটে, বাস স্ট্যান্ডে এবং ট্রেনে, বাসে এদের উপদ্রপ বাড়তে শুরু হল। এতো হিজড়ের সংখ্যা আচমকা কেন বেড়ে গেল সে বিষয়ে গবেষণা করে সমাজ বিজ্ঞানী তথা সাংবাদিকরা জানতে পারলেন যে কিছু গুরুমা তাঁদের আশীর্বাদ দানের অর্থাৎ বিয়ে বাড়িতে বর কনে দম্পতিকে ও সদ্য জন্মানো নবজাতককে স্নেহাশিস দিতে যাওয়ার ব্যবসাটাকে একচেটিয়া করে রেখেছেন তাদের অবস্থা বেশ ভালো। এখনও মানুষের আবেগে – ধর্মীয় ভাবনায় – দেবী মাতার দোহাই দিয়ে, কোথাও বা অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তাঁরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। বিশেষতঃ যাঁদের অনেক ধর্ণা দিয়ে অনেক দেব-দেবীর কাছে মানত করে বাচ্ছা হয়, তারা এবং কিছু অন্ধবিশ্বাসী ধনী পরিবারের লোকেদের বদান্যতায় এরা তাদের এই blessing দেবার জীবিকাটা ধরে রেখেছে। কিন্তু বাকিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়; হয় তারা Sexworker নয় Begger। আরেকটি চাঞ্চল্যপূর্ন খবর (ত্রিনয়নীর) আমার কানে এলো। –

কিছু গরিব ছেলে যারা চাকরি পাচ্ছেন না কিন্তু বড় পরিবারের সদস্যরা তাদের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল, তারা ছদ্মবেশী হিজড়ে সেজে টাকা রোজগারের এক অভিনব নতুন উপায় খুঁজে বের করেছেন।

এইরকম একটি দলের সঙ্গে আমার যে সত্যি সত্যি দেখা হয়ে যাবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। বিয়ের চার বছর পরের ঘটনা। “নির্মাল্য” আমার ছেলে, এখন দশ বছরের। তাকে বার বার চোখ পরীক্ষা করতে হয়। এখানে একজন চক্ষু বিশারদ বললেন ওকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ধরণের পরীক্ষা করাতে ও সেখানে ডাক্তারের মতামত নিতে। বাবা দেবমাল্য ও ছেলে নির্মাল্য খুব সহজে পাসপোর্ট ভিসা পেয়ে গেলেও আমি কিছুতেই যাওয়ার অনুমতিপত্র জোগাড় করতে পারলাম না। কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশন-এ জানা গেল আমার নামে তামিলনাড়ু পুলিশের খাতায় মারপিট করার কেস লিপিবদ্ধ করা আছে। বুঝতে পারলাম গুলাবীর রেপ ও মার্ডারের সময়কার ঘটনার জন্য আমার বাইরে যাওয়ার ছাড়পত্র মিললো না। অতএব ছেলে ও বাবা গেলেন তার চোখের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নতুন এক আলোর সন্ধ্যানে সিঙ্গাপুরে।

আমাকে আমার শাশুড়ি মা বললেন, – “তিন্নি চলো মা এই কয়েকদিন আমরা কলকাতা ঘুরে আসি। আমার ভাই বোনদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি, তোমারও বাপের বাড়ি যাওয়া হবে।”

আমার এই প্রস্তাবটা খুব ভাল লাগল। ওখানে শুনেছি এখন অনেকগুলি NGO আছে এই ট্রান্স জেন্ডারদের  জন্য, তাদের সঙ্গেও দেখা হবে।

দিল্লীর (Sangini 1997) সঙ্গিনী, নাজারিয়া (Nazariya), আশীর্বাদ (Ashirwad in Pune) পুনেতে প্রান্তিক প্রভৃতি নানা নাম নানা রকম বেসরকারি সংস্থা পথ শিশু নারী বা হিজড়ে, লেসবিয়ান, গে অর্থাৎ সমাজের অবহেলিতদের সাহায্য করবার জন্য অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন। কিন্তু আরও নানা দিক থেকে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত পুরুষ, নারী তথা হিজড়ে – সকলকেই জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজন আছে। সাধারণ মানুষ ঐসব গোষ্ঠীর মানুষকে যেমন সমদৃষ্টিতে দেখেন না, তাদের সহানুভূতি যেমন বাড়ানো দরকার ঠিক তেমনি আমাদের নিজেদের গোষ্ঠীরও দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে হবে। তাদের যত কুসংস্কার ছাড়তে হবে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, উত্যক্ত-জ্বালাতন করে টাকা রোজগারের পন্থাও পাল্টাতে হবে।

দেবমাল্য ও নির্মাল্যকে বিদেশ যাত্রায় পাঠিয়ে আমি ও মা চেপে বসলাম কলকাতার ট্রেনে। অনেক জায়গাতেই দেখলাম স্টেশনে আমাদের গোষ্ঠীর সদস্যদের ভিক্ষে করতে। কলকাতার কাছাকাছি আসতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমাদের সামনের সীটে একজন মধ্যবয়স্ক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছিলেন। প্রথমে মায়ের সঙ্গে আলাপ করলেন পরে আমার প্রতি কৌতূহল দেখে আমিও কথা বলতে শুরু করলাম। মনে হল উনি খুব অবাক হয়েছেন, তবে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেশের সমস্যা ও রাজনীতি আলোচনা করতে লাগলেন আমার সঙ্গে।

খড়গপুর স্টেশন এল, স্টেশনে নেমে চপ, সিঙ্গারা জিলেপী কেনার লোভটা সামলাতে পারলাম না। মায়ের জন্যে গরম চা হাতে নিয়ে কামরার জানলা দিয়ে তাঁকে দিতে যাব এমন সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে একদল আমারই গোষ্ঠীর হিজড়ে সম্প্রদায় হৈ হৈ করে উঠে পড়ল আমাদের ঐ রিজার্ভ কম্পার্টমেন্টে। ট্রেন ছেড়ে দিল, আমরা যারা নেমেছিলাম তারা সবাই উঠে নিজের সীটে বসতে গেলাম। কিন্তু তারা ততক্ষণে নানা অসভ্য ভাষায় গালি গালাজ দিয়ে লোকেদের কাছে টাকা/পয়সা আদায় করতে শুরু করেছে।

ভীষণ রাগ হল আমার। ঐ বয়স্ক ভদ্রলোকও বেশ জোরে বলে উঠলেন – “কি হচ্ছে এসব? সরো আমাদের বসতে দাও।” তারা ঐ ভদ্রলোক কে বললো – “আগে টাকা ছাড় – – – শা – – – ব – – – পরে বসতে পারবি, নয়তো এই আমার কাপড় তুল – – – ” কথাটা শেষ হল না, লজ্জায় ঘেন্নায় মুখ সরিয়ে নিলেন ঐ ভদ্রলোক। এবার মায়ের কাছে একজন মুখ ঝামটা দিল – “এ্যাই বুড়িয়া তালি বাজাচ্ছি তুই নিজের ব্যাগ খোল।”

এবার আর আমি থাকতে পারলাম না। আমাদের হিজড়েদের মধ্যে আমরা ফারসি, উর্দু এবং হিন্দি মেশানো যে বিশেষ ভাষায় আমরা কথা বলি, সে ভাষায় বললাম চিৎকার করে, “একদম চুপ কর নয়তো এমন শাস্তি দেব যে” ওরা হো হো করে হেসে উঠলো। আমার হিজড়ে সম্প্রদায়ের ভাষা ওদের বোধগম্য হল না। প্রথমে ভাবলাম পশ্চিমবঙ্গে ওরা হয়ত এখন ঐ ভাষায় আর বার্তালাপ করে না। তাই একজনের শাড়িতে টান দিয়ে বললাম “সাৎলা (শাড়িকে আমরা বলি) উঠায়েগা তো এক থাপ্পড় খায়েগা – তেরে গুরুমা কোন হ্যায়?”

আমাকে ধাক্কা দিয়ে সে আর একটা অশ্রাব্য গালি দিতেই আমি দাঁড়িয়ে উঠে ওদের চুলের মুঠি ধরে টান দিলাম। আমার হাতে ওদের লম্বা পরচুল্লা এসে গেল। অনেক্ষন থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল, এবার প্রমান পেয়ে গেলাম এরা হিজড়ে সেজে এসেছে। শাড়ি ধরে টান দিতেই সে ঘুরে পড়ল বেঞ্চের উপর। ব্লাউজে টান দিতেই অন্যরা হৈ হৈ করে উঠলো। কিন্তু ততক্ষণে আমি ওকে বে-আব্রু করে কাচ্ছা বনিয়ানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। সবাই বুঝতে পারল যে কিছু ছেলে “হিজড়ের” পোশাক ও বেশ ধরে এসে এক নতুন ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেছে। ঐ ভদ্রলোক এবং আরও দু চারজন যুবক তরুণ ততক্ষণে ভিড় জমিয়ে ওকে কিল চড় মারতে শুরু করেছে। ছেলেটি হাউ মাউ করে কেঁদে আমার পায়ে পড়ল। আমার বড্ডো মায়া লাগল, মারের হাত থেকে রক্ষা করে জিজ্ঞাসা করলাম – ‘সারাদিন কি করো?’

– ট্রেনে পেন, চিরুনি, আমলকি চূর্ণ বিক্রি করি, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। তাই যখন দেখলাম হিজড়েদের দলটি কেমন ‘তালি’ আর ‘গালি’ দিয়ে টাকা আদায় করছে – প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে, শাপ-শাপান্তর ভয়ে, অসভ্যতামী, নির্লজ্য অঙ্গভঙ্গি এবং অকথ্য ভাষা শুনে পুলিশ তাদের ভয় করে চলে এবং গাড়ি বাবুরা টাকাও দিয়ে দেয়। তখন ভাবলাম সন্ধ্যে বেলায় এইভাবে ভিক্ষা করতে পারলে ভালো উপার্জন হবে।

– আমার চোখে জল এসে গেল। দারিদ্রতা অসহায়তা সমাজের বৈষম্য আজ আমাদের তরুণদের কত নিচে নামতে বাধ্য করেছে। প্যাসেঞ্জেরদের মধ্যে আলোচনা শুরু হল। হিজড়ে সম্প্রদায়ের এইভাবে ঘৃণ্য উপায়ে জোর করে টাকা আদায়ের পন্থাকে সরকার কি বন্ধ করতে পারে না? তাদের জন্য যদি কাজের বা নানা ধরণের ‘প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার ব্যবস্থা হয় তাহলে তো তারাও এইভাবে পথে বেরুবে না।

আজকাল বড় বড় এপার্টমেন্টে তারা বাচ্চাকে আশীর্বাদ করতেও ঢুকতে পারে না। বিয়েতেও কেউ সহজে তাদের আসতে বা আশীর্বাদ করতে দেয় না। কারণ মানুষ আর বিশ্বাসও করে না যে শুভ কাজে ঐ তৃতীয় সত্তার কোন প্রয়োজন আছে।

সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যেমন গুন্ডা পালন করা হচ্ছে। এই গোষ্ঠীর মধ্যেও এখন তেমনি সব দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষ জুট গেছে। তারা বড় বড় ব্যবসাদারদের বাড়ি গিয়ে পুত্রকে দেখবার জন্য হাজির হয়ে যায় নার্সিংহোমে, হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে। যাত্রীদের মধ্যে এখন নানা গুঞ্জন শোনা গেল। একজন সাংবাদিকও যোগ দিলেন সেই আলোচনায়। কয়েকদিন আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন তিনি।

বর্দ্ধমান জেলার একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাচ্চা হওয়ার খবর শুনে একদল হিজড়ে এসে বাচ্চাটিকে কোলে নিতে চাইল। মা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। বাড়ির মালিকও টাকার অঙ্ক শুনে আঁতকে উঠলেন, বললেন, – “মগের মুলুক নাকি? এত টাকা কোথায় পাবো?” বাড়িতে তাঁর দুই ভাই ছিলেন, তাঁরাও রুখে উঠলেন। “পারবো না এত টাকা দিতে আমরা – পুলিশ ডাকবো।”

তারা এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে মায়ের কোল থেকে টেনে নিতে গেল। গালির সঙ্গে শাপ দেওয়ার অমঙ্গলের ভয় দেখানো চলতে লাগল।

মায়ের কোলে কচি বাচ্চা কেঁদে উঠল। যে ঢোলক বাজাচ্ছিল তার সঙ্গে বড় ভাইয়ের ধাক্কা ধাক্কি হাতাপাই শুরু হল। আর তখনই একজন ছিনিয়ে নিয়ে বাচ্চাটিকে দোলাতে লাগল জোরে জোরে। নবজাত শিশুটি পড়ে গেল তার হাত থেকে। তারপরের বর্ণনা শোনার আর আমাদের প্রবৃত্তি হল না।

সত্যিই এরা দিনে দিনে কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছে, কেন এমন ভাবে সমাজে নিজেদের কলঙ্কিত করছে তা ভাবতে ভাবতে আমার ও মনে ভীষণ ভীষণ হতাশা নৈরাশ্য এসে ঘিরে ধরল।

কলকাতায় গিয়ে অনেক বুদ্ধিমান সমাজসেবীদের, Activist দের সঙ্গে, পুলিশ অফিসার এমন কি মন্ত্রীদের কাজে যারা সাহায্য করেন সেই সব বড় বড় অফিসারদের সঙ্গে কথা বললাম। সকলেই সমালোচনা করেন, নিন্দাতে সোচ্চার হন, কিন্তু প্রতিকারের উপায় কেউ বলছেন না।

আমি নিজে ট্রান্স জেন্ডার তাই তাদের দুঃখ-কষ্ট শোচনীয় অবস্থায় যেমন ব্যথিত হই, তেমনি তাদের অসামাজিক কার্যকলাপকে বন্ধ করে ভদ্র জীবন যাপনের উপায় বের করতে সচেষ্ট হই।

যতক্ষণ না আমার ভারতবর্ষের সব প্রদেশের হিজড়ে গোষ্ঠীকে এক করতে পারব, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান না জাগাতে পারব ততক্ষণ কোন লাভ হবে না।

 

পঞ্চম অধ্যায় (আলোকাশ্রম)

পুনে ফিরে এসে দেবমাল্য ও আমি উঠে পড়ে লাগলাম একটি NGO তৈরী করবার জন্য। এখন তো আমরা ভোটের অধিকার পেয়েছি, তাহলে সরকারকে সজাগ করতে হবে। আমাদের সমাজের উন্নতি না ঘটলে, আমাদের পুলিশ বাহিনীতে আলাদা প্রশিক্ষণ দিয়ে সুরক্ষা দলে কাজ না দিলে, শিক্ষার জন্যে আলাদা বিদ্যালয়, নার্সিং কলেজে সীট রিজার্ভ না করলে, আমরা তাদের ভোট দেব না। “ভোট ব্যাঙ্ক” মন্ত্রীদের কাজে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট তাই এবার ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে নিজেদের স্বনির্ভর করার চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। এমনকি ট্যাক্সি চালক হবার জন্য মোটর ট্রেনিং স্কুলে হিজড়েরা যদি গাড়ি চালানো শেখেন তাহলে রাত্রে মেয়েদের জন্যে ট্যাক্সি চালকের কাজ দিলে সমাজে মেয়েদের প্রতি অত্যাচার এমনকি রাত্রে ধর্ষণের কেসও কমে যাবে। মহিলা এম.পি, এম.এল.এ-দের সাথেও দেখা করলাম। কিন্তু তেমন সাড়া পেলাম না। হটাৎ একদিন কাগজে পড়লাম উড়িষ্যা সরকারের কথা। তারাই প্রথম প্রদেশ যারা এই হিজড়ে গোষ্ঠীকে নানারকম সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ছুটলাম সেখানে।

সত্যিই তাদের এই প্রথম কেউ সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখলো। তাদের জন্যে ‘পেনশন’ ভাতা দেওয়ার কথা শুনে মনটা আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। উড়িষ্যার এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে নিরিবিলি জায়গাতে আমাদের এক অফিস তথা আশ্রম গৃহ বানানো হল। নাম দিলাম আলোকাশ্রম।

সেখানে প্রথমেই একটি গাড়ি কিনে মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং এর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। যে হিজড়েরা একটু আত্মবিশ্বাসী এবং রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন। প্রথমে মাত্র দশ জন হিজড়ে ভাই বোন এসে ওখানে আশ্রয় নিলেন। পরে কয়েকমাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা বেড়ে ২০ হয়ে গেল। অনেকেই গুরুমা কে ছেড়ে আসতে ভয় পায় তাই এবার আমাদের গুরুমা কে অর্থাৎ কমলা আম্মাও আমার সব গুরু ভাই বোনদের নিয়ে এলাম এখানে। এবার জমে উঠল এক নতুন আনন্দালয়।

১৯৯৪ তে ভোট দেওয়ার ‘অধিকার’ পেয়েছি আমরা “শাবানা মৌসী” মধ্যপ্রদেশের বিধায়ক হন ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। রায়গড়ে মধু কিন্নরও অনেক কাজ করছেন। কিন্তু সারা ভারতে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক জাগরণ আনার জন্যে একজোট হয়ে কিভাবে আমরা কাজ করব – আন্দোলনে গিয়ে আমাদের মর্যাদা – সুবিধা Basic Need গুলো পূরণের দাবি করব – তা ভেবে পাচ্ছি না। অনেক কিন্নর ধর্মকে – নাচ-গানকে উপজীব্য করেই থাকতে চান। হিন্দি সিনেমার প্রভাব একদলকে সাজ-সজ্জা বিলাস-বাহুল্য ও অতি জাঁক জমকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখছে সেই সব মানুষের প্রতি অন্যান্য পুরুষেরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন – জমাচ্ছেন তাঁদের পাশে কিন্তু সাধারণ গরীব হিজড়েরা আরও গরীব হয়ে যাচ্ছেন – এই বৈষম্য সমাজের প্রতিটি স্তরে এই ধনী নির্ধনের বিভেদ ক্রমশঃ বাড়ছে। এর যে প্রতিকার কী ভাবে হবে তা কে জানে।

আমাদের ‘আলোকাশ্রমে’ ধীরে ধীরে অনেক সদস্য বাড়তে লাগলো – প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাল শিক্ষক – ট্রেনার জোগাড় করা বিদেশের ইউনাকদের ভারতের হিজড়েদের এই শোচনীয় দুর্দশার কথা অবগত করিয়ে ‘দান’ – funding তথা সবরকমের সহযোগিতার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। আশা ও উৎসাহ আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। একদিন আমাদের জীবনের অন্ধকার দূর হবেই যদি সবাই এগিয়ে আসেন।

জীবন বড় মূল্যবান তার রক্ষার দায়িত্বও আমাদের। যখন বেঁচে আছি তখন ডাক্তার, ওষুধপত্র, সুচিকিৎসায় স্বাস্থকর পরিবেশ সৃষ্টি করে শরীরকে অক্ষত নীরোগ করার দায়িত্ব যেমন আমাদের তেমনি মৃত্যুর পরও যে এই দেহ অন্যের কাজে আসতে পারে সে সম্পর্কেও সজাগ হবার দিন এসেছে।

আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল চোখ। আমাদের দেশে চোখের চিকিৎসাও এখন খুব ভালোভাবে হচ্ছে। একটি NGO এসে আমাদের আলোকাশ্রমের কিন্নরদের কাছে অনুরোধ করলেন ‘চক্ষুদানের’ জন্য।

“ত্রিনয়নী” নাম যখন পেয়েছি তখন এই জীবনের নয়ন যদি আরও কারো চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে তার চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে।

বিশেষ করে আমাদের পুত্র দৃষ্টিহীন নির্মাল্য কে নিয়ে বিভিন্ন চক্ষু চিকিৎসালয়ে ঘোরাঘুরি করতে করতে আরও অনেক কিছু জানতে পারলাম। বিজ্ঞানের এই বিশেষ অবদান অপারেশনের দ্বারা চক্ষুদান। নির্মাল্যের চোখ পরীক্ষা করে জানা গেছে, তার কর্নিয়ার মধ্যে সমস্যা আছে। কোনো সুস্থ ব্যক্তির কর্নিয়ার টিস্যু যদি পাওয়া যায় তাহলে তার অপারেশন করা হবে। অর্থাৎ Healthy Donner চাই। এই অপারেশনকে বলা হয় ‘Keratoplasty ‘ – ‘A cornea transplant operation is possible to restore vission ‘ – এই খবর আমাদের মনে ভীষণ আলোড়ন তুললো। Healthy donated Tissue ঐ diseased cornea র damaged portion কে বাদ দিয়ে ডোনারের টিস্যু লাগিয়ে দিলেই আমাদের ছেলে নির্মাল্য দেখতে পাবে, অতএব এবার চলল ডোনারের অপেক্ষা। দিল্লী – মুম্বাই – চেন্নাই সব জায়গায় এখন বড় বড় চোখের হাসপাতাল, আমাদের দেশেই এখন এত ভালো চিকিৎসা হয়। ছেলেকে নিয়ে স্বামী দেবমাল্য ব্যস্ত আছেন। এদিকে আমার গুরুমা কমলা আম্মা খুব অসুস্থ। কিছুদিনের মধ্যেই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের মাতৃ পিতৃ হারা করল। প্রচন্ড শোকে ভেঙে পড়লেন আমার আশ্রমের গুরু বোনেরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আম্মার দেহ আগলে বসে রইলেন। শুধু চক্ষু দান নয় পুরো দেহ দান করে গেছেন তিনি। কিন্তু আমাদের গোষ্ঠীর কেউই তাঁর দেহতে হাত লাগাতে দিল না হাসপাতাল থেকে আগত ডাক্তারদের। তাদের ধারণা চোখ খুলে নেবে – চোখের কোটোর থেকে এবং তাঁর দেহ সৎকার হবে না। পরের জন্মে তিনি অঙ্গহীন চক্ষুহীন হয়ে জন্মাবেন। অতএব তাঁকে পোড়ানো হোক।

আমার বোঝানো, আম্মার শেষ ইচ্ছে পূরণ করার চেষ্টা বৃথা গেল। তাঁদের কান্নাকাটি, হৈ চৈ – তর্ক বিতর্কে সময় পার হয়ে গেল। এখানে তিন্নি একা তো তাঁর শিষ্যা তথা সন্তান নন। সমস্ত গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠল।

কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ মানুষগুলির ধর্মান্ধকার – ইহকাল – পরকালের ভুল ধারণা একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে দিল না। আমি ও দেবমাল্য ভীষণ বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। কমলা আম্মার শোকে আচ্ছন্ন হলেও তাঁর শ্রাদ্ধ শান্তি অবাস্তব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রবৃত্তি আর রইলো না আমাদের। অন্ধ পুত্র কে নিয়ে কখনও Shroft Eye Centre কখনও Shankar Netralay কখনও অন্য কোনো চোখের হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম এক তরুণ মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে দিল্লীর রাজপথে। বাবা মাকে খবর দেওয়া হলে তাঁরা যখন তাকে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছালেন তখন জানতে পারলেন সেই তরুনের শরীরের নিচের অংশ ট্রাকের তলায় ঢুকে যাওয়া দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু ওপর দিকের ভাগ সম্পূর্ণ অক্ষত আছে। মৃত পুত্রের সামনে তার পিতা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পাথরের মতন দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে দিয়ে নিয়ে গেল আরও কয়েকটি যুবক রুগীকে – কেউ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাতরাচ্ছে যন্ত্রনায়। কয়েকজন তরুণ ডাক্তার নার্স সেই ছেলেগুলিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একজন লেডি ডাক্তার এসে সেই পিতার হাত ধরে অনুরোধ জানালেন – “Uncle আপনার ছেলে তো চলে গেছেন, আর ফিরে আসবেন না, এই ছেলেগুলির অবস্থা দেখুন – একজনের একটি চোখ নেই, দুজনের পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে – আপনার ছেলের শরীর থেকে আমরা – – -” কথাটা শেষ করতে দিলেন না সেই বাবা। বললেন আমার ছেলের দেহ আপনারা নিয়ে যান, যদি কোন যন্ত্র এখনও তাজা থাকে লাগিয়ে দিন অন্যকে – আমি জানব তার জীবন ধন্য হ’ল।

দেবমাল্যর মোবাইলটা বেজে উঠল – “আপনার ছেলের ডোনার পাওয়া গেছে। শীঘ্র Eye Centre এসে যোগাযোগ করুন।”

নির্মাল্য তার দৃষ্টি ফিরে পেল, ভগবানের অশেষ কৃপা ও ডাক্তারদের অপরিসীম প্রচেষ্টায়। আমি আবার লেগে পড়লাম আমার কিন্নর গোষ্ঠী কে শিক্ষিত করার, জাগ্রত করার, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে।

 

সমাপ্ত

লক্ষীপুরুষ (Lokkhipurush)

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রথম অধ্যায়

জীবনকে অনেক কাছ থেকে যাঁরা দেখেছেন, দুঃখ সুখের পালায় দোলায়-অবলীলায় দুলতে দুলতে সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথকে যাঁরা অতিক্রম করেন, তাঁদের দলে “জ্যোতির্ময়” বাবুও বোধহয় নাম লিখিয়েছেন, তাই হাজার কষ্টেও তাঁর হাসি মুখ, নির্বিকার মনোভাব, বিরক্তিশূন্য সুদীর্ঘ কপাল, ষাটের কোটায় এসেও টাক না পড়া এক মাথা কাঁচা পাকা কোঁকড়ানো চুল, চশমার ভেতরে জ্বল জ্বল করা চঞ্চল দুটি চোখ, ঋজু দেহ, দীপ্ত দ্রুতলয়ের চলন, গম্ভীর আওয়াজে ধীরে ধীরে কথা বলার অপূর্ব বাচনভঙ্গী – সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, দিল্লীর রোদে পুড়ে ঝলসে যাওয়া তামাটে গায়ের রঙ তাঁকে আরও দৃঢ় মজবুত দেখতে সাহায্য করছে। অস্তমিত সূর্য্যের দিকে এক দৃষ্টে যখন তিনি চেয়ে আছেন, ছাদের কার্নিশে দাঁড়ানো তাঁর সেই চেহারাটি দেখে মনে হয় কোনো ব্রোঞ্জের তৈরী গ্রীক দেবতার মূর্ত্তি। এত টিকালো নাক কিন্তু ঔদ্ধত্য নেই হাবে ভাবে।

স্ত্রী কমলমণির অকাল মৃত্যু তাঁকে একলা করে দিলেও অসহায়তা বা বিষন্নতার কালো ছায়াকে তিনি কাছে ঘেঁষতে দেননি, ছেলে-মেয়েদের মুখ চেয়ে। গত বছর সরকারী দপ্তর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এবং দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় দায় দায়িত্বর ভারও ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে। সুপ্রভা থাকে কলকাতায় আর ছোট আভা বরের সঙ্গে জাপানে চলে গেছে বেশ কিছুদিন হ’ল। ছেলে সুপ্রকাশও বাবার মতন লম্বা এবং গৌরকান্তি সুপুরুষ। জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ইচ্ছে ছিল সে ইঞ্জিনিয়ার হবে; অনেক পড়াশুনা করবে, কিন্তু তার পড়াশুনোর চেয়ে খেলাধুলাতে বেশী মন। ইংরেজি তিনি ছেলেমেয়েদের নিজে পড়িয়েছিলেন, তাই ভালো কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স পাশ করার পরই সে চাকরী খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে কিছুদিন সেলস-এ প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করার পর প্রতিবেশী মিস্টার রায়ের বদান্যতায় ‘এয়ার ইন্ডিয়ায়’ চাকরী পায় সে স্টুয়ার্ডের। খুবই গ্ল্যামারাস কাজ মনে হয় ছেলের। ফ্লাইং আলাউন্স নিয়ে মাইনেও পায় মোটা টাকা, কিন্তু জ্যোর্তির্ময় বড় এক হয়ে যান, কারন ছেলেকে মাসের মধ্যে ২০ দিনিই বাইরে থাকতে হয়। মায়ের বাৎসরীকিতে দুই বোন এসে তাই উঠে পড়ে লেগেছিল ভাই-এর বিয়ে দেওয়ার জন্য। “চিত্তরঞ্জন পার্কের” এক ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধও এসেছিল অনেক। তিন ভাই বোন ও জামাইরা মিলে ঘরোয়া আলোচনা ও প্রাথমিক দেখা-দেখির পর ঠিক করলো “চন্দ্রানীকে”। জ্যোর্তির্ময় বাবু প্রথম থেকেই কোনো মেয়ে দেখতে যাওয়ায় বিরোধী। বলেন – ‘যে বিয়ে করবে সে দেখুক, কথা বলুক, সব পছন্দ হয়ে গেলে আমার সঙ্গে বিয়ের দিন ঠিক করতে আসতে বলো মেয়ের মা বাবাকে। আমার কাছে তো সব পাত্রীই “আভা” “প্রভা”র মতন নিজের মেয়ে মনে হয়, কাউকে দেখে এসে “বিয়ে দেবো না” বলাটা ভীষণ দুঃখ জনক মনে হয়। মেয়েরা মায়ের জাত, তাদেরকে অপমান করার কোনো অধিকার আমার নেই”। তাই দিদি জামাইবাবুদের সঙ্গে প্রকাশই গিয়েছিল চন্দ্রানীদের বাড়ি, পরে দুজনে একা হোটেলে ডিনার করতে করতে অন্যান্য সব কথাও খোলাখুলি বলে নেওয়ার পরে বাবাদের সাক্ষ্যাৎকারের পালা। এক রবিবারের বিকেলে চন্দ্রানীর মা বাবা এলেন তাদের “ময়ূর বিহারের” বাড়িতে। দেনা পাওনার কথা ওঠালেন চন্দ্রানীর মা। বাবা প্রফেসর মানুষ ভীষণ শান্ত ও সিধেসাধা। মিসেস দত্তগুপ্তই সব কথাবার্তা বলছেন।

“দেনা-পাওনা? – হ্যাঁ, আছে বৈকি” – হাসতে হাসতে বললেন জ্যোর্তিময়।

ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে একসঙ্গে চমকে সবাই মিলে তাকাল তাঁর দিকে।

– “আপনি মেয়ে দেবেন আর আমি মা লক্ষী পাবো”।

আমার ইলেক্ট্রিকের খরচ এবার কমে যাবে একেবারে, চন্দ্রানী মায়ের মত বৌ এলে এই গরিবের ঘর আলো হয়ে যাবে।

চন্দ্রানীর মাও রসিকতা করতে ছাড়েন না। জবাব দিলেন – “আমার মেয়ে তো শুধু আপনার ঘর আলো করবে আর প্রকাশের মতন দিব্যকান্তি জামাইতো আমাদের আত্মীয় বন্ধু সবাইকার মধ্যে সূর্য্যের মত জ্বল জ্বল করবে”।

লজ্জা পেয়ে প্রকাশ মাথা নিচু করে নিল। কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটু অহমিকার গন্ধ পেলেন জ্যোতির্ময়। প্রসঙ্গ পাল্টে এবার একটু অপরাধবোধ মিশ্রিত মিয়ান গলায় থেমে থেমে বললেন তিনি – দেখুন সবই তো ভালো, দুজনে দুজনের সঙ্গে খোলাখুলি ভাবে কথাবার্তা বলে নিয়েছে, দুই পরিবারও আমরা বন্ধুর মতন বলে মনে করছি শুধু একটাই একটু প্রবলেম আছে –

“হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন না, দ্বিধা করছেন কেন? প্রকাশের মতন সুন্দর ছেলের জন্য যা যৌতুক চান আমি দিতে রাজী আছি” – জ্যোতির্ময়বাবুর কথা শেষ করতে না দিয়ে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন তড়িঘড়ি করে।

– আরে না না, ওসব কথা আমি বলতে চাইছি না, আপনি ভুল বুঝছেন।

– “আপনাকে বলতে হবে না মেয়েকে আমি গয়নাগাটি, ফার্নিচার, গাড়ি, সবই দেবো, আপনি ঘাবড়াবেন না”।

– এবার চোয়ালের হাড় শক্ত হল জ্যোতির্ময়বাবুর। কপালের শিরা দুটো ফুলে উঠলো অপমানে। ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারলো বাবা বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু কোনোদিনই তারা বড়দের মধ্যে ফালতু কথা বলা বা অকারণ বাচালতা করা যুক্তি যুক্ত মনে করে না, তাই চুপ করে বুঝতে চাইল, এবার বাবা কি বলেন সেটা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। প্রকাশের মোবাইলটা বেজে ওঠায় সে সেটা কানে চেপে বাইরে চলে গেল এক্সকিউজ মি বলে। আভা প্রভা অথিতিদের চা জল খাবার আনার অছিলায় উঠে গেল রান্না ঘরের দিকে।

এবার চন্দ্রিমার বাবার সরল সোজা হাসিমুখ খানি আকৃষ্ট করেছে জ্যোতির্ময় বাবুকে। তিনি ভাবলেন স্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ন কথাবার্তায় অস্বস্তি বোধ করছেন, অধ্যাপক দাসগুপ্ত। তাই আর সময় নষ্ট না করে তাঁর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ফেললেন তিনি।

– “দেখুন ছেলের কাজটাই এমন যে মাসের মধ্যে অর্দ্ধেক দিনই ওকে বাইরে কাটিয়ে আসতে হয়। আপনার মেয়ের কোনো “হবি” আছে তো? নইলে কিন্তু ও খুব বোর ফিল করবে”।

হ্যাঁ, হ্যাঁ ওর তো অনেক হবি। ড্রইং, পেন্টিং, ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট অনেক শখ আছে। মেয়ের স্কুলে, কলেজে “হবি” ক্লাসে তৈরী ক্রাফট দেখলে তো আপনি ভাববেন যেন কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে কিনেছি। আর তাছাড়া আমরা কাছে আছি যখন মন লাগবে না চিত্তরঞ্জন পার্কে চলে যাবে, ও সব নিয়ে আপনি ভাববেন না।

কথাটা মনোপূতঃ হল না জ্যোর্তির্ময়ের, বললেন – “গান-বাজনা, নাচ, লেখালেখি I mean freelancing journalism কিছু করলেও সময়টা ভালো কাটাতে পারে।

এবার মিঃ দত্ত হটাৎ ছেলেমানুষের মতন জ্যোতির্ময়ের হাতটা চেপে ধরে, কেমন যেন আবেগের বশে বললেন, – “আপনি তো থাকবেন বাড়িতে, মেয়ে আমার গল্প করতে খুব ভালোবাসে আপনার সঙ্গে যখন বন্ধুদের অ্যাক্টিং করে কলেজের গল্প শোনাবে না, আপনার খুব ভাল লাগবে”।

– “তাহলে তো আর কথায় নেই”। আমাদের তো শুধু এটাই চাই। বাবা বড় একা হয়ে গেছেন চন্দ্রানী এসে যদি বাড়িতে হৈ হৈ করে গান, গল্প, কথায় বাবাকে ভুলিয়ে রাখে তাহলে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে”। বলল প্রভা চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে।

মিষ্টি, কেক, চপ-কাটলেটের মচমচানিতে এবার সবাই মশগুল, শ্যামলা মেয়ের দীঘল চোখে আদুরে মেয়ে চন্দ্রাকে দিদিদের ভালো লেগেছে, প্রথম আলাপেই দিদি জামাইবাবুদের তুমি করে কথা বলা, মিষ্টি হাসি একটু বোকা বোকা লাগলেও প্রকাশকে করা বাচ্চা মেয়ের মতন প্রশ্ন – “প্লেনটা যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে যায় তখন ভয় লাগে না”? সবাইকার বেশ মজার লেগেছে। তাই সম্বন্ধ পাকা হতে দেরী লাগলো না। ওর আলগা শ্রী, কোঁকড়ানো চুল জ্যোতির্ময় বাবুর মন ভরিয়ে দিল, মনে পড়ল স্ত্রী কমলমণির এইরকম কোঁকড়া চুলে পিঠে মেঘের ঢল নামতো। কতদিন পরে বাড়িতে আবার কোমরে আঁচল জড়িয়ে, খোলা চুলে ঘুরে বেড়াবে, রান্না ঘরে কাজের মেয়ে বা চাকরের নুন ঝাল ঢালা রান্নার তদারক করতে তাকে বারে বারে মাথা ঘামাতে হবে না, এখন নিজের ফুলের টব, গল্পের বই ও কাঠের কাজ নিয়ে তিনি আবার আপন মনে ব্যস্ত থাকতে পারবেন ভেবে বড় ভালো লাগল তাঁর। বাড়ির পুরোনো জিনিষ ঘড়ি, সেলাই মেশিন, মিক্সি সব নিজে হাতে তিনি সারেন, মেরামত করেন, যত্ন করে রাখেন। ঘন্টার পর ঘন্টা টুল বাক্স নিয়ে, স্ক্রু ডাইভার ধরে তার পার হয়ে যায় – একাকীত্বটাকে সহ্য করে নিজের জগতে নানা টুকিটাকি কাজ ঘর সাজানো, পর্দা লাগানো, ঝুল ঝাড়ার মধ্যেও যে এত আনন্দ – শিল্প বোধ থাকতে পারে তা জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখতে দেখতে ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারে। বড় জামাই সুহাস তো বাবার ফ্যান বলেন – রিটায়ার করে বাবার মতন প্রত্যেক মুহূর্তে রসাস্বাদন করতে, করতে বাঁচবো। ছোট জামাই তো সর্বদাই প্রশংসামুখুর – তার উক্তি –

“আমরা ইঞ্জিনিয়ার হলেও এত সুন্দর করে পুরোনো জিনিষ মেইন্টেন করতে পারবো না। বাবা একাধারে জাপানি আর আমেরিকানদের মতন পরিশ্রমী ও ইনোভেটিভ, কত সিস্টেমিক ওয়েতে কাজ করেন, কত পেশেন্স আর ডিসিপ্লিনড। তোমরা কেন হওনি বলো না”। মেয়েদের চোখে জল আসে অদ্ভুত এক আনন্দ আবেগে।

যাক প্রকাশের বিয়ে হয়ে গেল ফাল্গুন মাসে। “চন্দ্রানী” আসায় ঘরের চেহারা বদলে গেছে – পুরোনো বাল্বগুলো চেঞ্জ করে বড়বড় ঝাড়লণ্ঠন ধরণের লাইট লেগেছে ড্রয়িং রুমে, পর্দা এসেছে অনেক দামী। কাঠের সোফা পাল্টে লোহার ফার্নিচার। টেলিফোনটাও নিজের জায়গায় নেই। দেওয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় মাঝে মাঝে বাজনা বাজাচ্ছে। জ্যোর্তির্ময় বাবু মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারেন না, টেপ রেকর্ড চলছে নাকি ফোন এসেছে। ঘরে ঘরে রিসিভার। সবচেয়ে চমকদার হয়েছে ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট, স্ত্রীর হাঁপানি ও মেয়ের ডাস্ট এলাৰ্জি থাকায় এবং মধ্যবিত্ত সংসারে অবাঞ্ছিত মনে হওয়ায় কোনোদিন কোনো কার্পেট কেনার কথা ভাবতে পারেননি তিনি। এখন ছেলে এত টাকা রোজগার করে, মেয়ে মায়ের সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে লাজপৎ নগর, করোলবাগ, সরোজিনী নগরে বাজার করতে ভালোবাসে তাই বিয়ের ৬ মাসের মধ্যেই প্রকাশের বাড়ির ভোল একেবারেই পাল্টে গেল। যদিও নিজের বেডরুমটাতে বিশেষ নতুনত্ব আনতে দেননি তিনি। দেওয়ালে ছেলে মেয়ের ছোটবেলাকার ছবিগুলো সরাতে দেন না কাউকে। টেবিলে সেই পুরোনো জলের জার, ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মায়ের বড় ক্যালেন্ডার বাঁধানো ফটোর পায়ে তাঁর স্ত্রী কমলমণি যেমন ভাবে হাসতেন তেমনি জ্বলজ্বল করছেন বুক কেসের ওপরে, এখনও কৃষ্ণনগর থেকে আনা বিবর্ণ বিবেকানন্দ কোলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার পাশে একই সারিতে আলখাল্লা পড়া রবীন্দ্রনাথ, লম্বাকানের বুদ্ধদেব, চশমা নাকে গান্ধীজি হাতে ছোট্ট লাঠিটি ধরে পুতুল সেজে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে।

হ্যাঁ, জ্যোর্তির্ময় বাবুদের বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগরের পাশে, নদীয়ার এক গ্রামে, নাম কেচুয়াডাঙ্গা। তাই কৃষ্ণনগরের থেকে আনা পুতুলগুলি তিনি একই ভাবে সাজিয়ে রেখেছেন কাঁচের আলমারির মধ্যে। স্ত্রীর হাতের তৈরী একটি আসন ও হাত পাখা মাথার কাছে রাখা। রোজ নিজ হাতে ঘরের সব জিনিষ মন দিয়ে অনেকক্ষন ধরে তিনি যখন মোছেন, তখন মনে হয় পুজো করছেন। মাঝে মাঝে পুরোনো হারমোনিয়ামটাও বের হয় খাটের তলা থেকে ছেলেমেয়েদের তিনদিকে বসিয়ে স্ত্রী সন্ধ্যে বেলায় গান শেখাতেন –

“আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।।

বুকের মাঝে বিশ্ব লোকের পাবি সাড়া”।

বিয়ের পর চন্দ্রানীকে গান গাইতে বললে সে দুটি হিন্দি গান গেয়েছিল। গলায় বেশ দরদ আছে তাই তাকে একদিন হারমোনিয়াম বের করে দিয়ে বললেন – “এটা বাজিয়ে গাইবে মা”। এখন একই রকম আছে, খুব বড় কোম্পানী থেকে কেনা হয়েছিল, দেখো দেখো কী সুন্দর আওয়াজ।

চন্দ্রানী বলল – বাবা আজকাল কারুর আর বেলো করে গান গাইতে ভালো লাগে না। এই দেখো না মা আমার সঙ্গে ক্যাশিও মানে সিন্থেসাইজারটা দিয়ে দিয়েছে, ওতেই সব গান বাজাতে ভাল লাগে।

নতুন ধরণের পিয়ানোটিতে এতো রকমের সুর বাজে এতো ঋদম বাজতে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসাবে – জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ভাল লেগেছিল। চন্দ্রিমা আসার পর ঘরে কত রঙ রূপ ও বাহার ফিরে এসেছে – প্রকাশও ফ্লাইট থেকে ফিরেই কত হৈ চৈ আনন্দ করছে – বড় ভাল লাগছে। এতো সুখের মাঝেও কমলমণির জন্যে বুকের মধ্যে চিনচিন করে ব্যাথা হয়, বেচারী কিছুই দেখে গেল না। ক্যান্সার তো কত লোকেরই হয় কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি সে যে চলে যাবে একথা জ্যোতির্ময় স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যাবার সময় তিনি চোখে জল, ঠোঁটে হাসি নিয়ে একদিন বলেছিলেন – “তুমি তো লক্ষীমন্ত পুরুষ, আমি জানি সংসারটা সব সামলে নেবে”। কথাটা মনে পড়লে এখনও জ্যোতির্ময় বাবুর বুকের মধ্যে বেহালার তারে মোচড় দেয়।

কিন্তু সব সুখ তো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সব ঘটনাও নিজের পছন্দমত বা ইচ্ছেমত ঘটে না। এক্ষেত্রেও হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।

সেদিন রবিবারের সকাল, বাড়িতে নতুন কম্পিউটার এসেছে, চন্দ্রানী জ্যোতির্ময় বাবুকে নিজের ঘরে বসে ইমেল করা শেখাচ্ছে। একবারে ছোট বালকের মতন কৌতূহলী বুড়ো ছেলেকে লিখে লিখে সবকিছু বোঝাতে বেশ মজা লাগছে চন্দ্রানীর। এত বয়সেও সবকিছু জানবার বা নতুন কিছু শেখবার আগ্রহ, এমন ভাল ছাত্র, বন্ধুর মত সহজ সাবলীল ব্যবহার সে কখনও কারোর মধ্যে দেখেনি। এতটুকু মেশিনের কি অসীম ক্ষমতা, মিনিটের মধ্যে সমগ্র বিশ্বকে মুঠোর মধ্যে করবার অসাধারণ শক্তি বৃদ্ধ শিশুকে মুগ্ধ করেছে, ঝুঁকে পড়ে টিচার পুত্রবধূর ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে তিনি “মাউস” ক্লিক করছেন, টাইপ করে মেয়ের সঙ্গে চ্যাট করছেন, – ভীষণ আনন্দ পেয়েছেন নতুন জগতে প্রবেশের অধিকার পেয়ে।

কিছুক্ষন আগেই কলিং বেলটা বেজে উঠেছিল, কে এসেছে খেয়াল করেননি, কাজের মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে এবং চন্দ্রানীর মা সোজা এসে দাঁড়িয়েছেন শ্বশুর বৌমার ঠিক পিছনে। “কম্পিউটারের” দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ ও যুবতীর কাণ্ড দেখে তিনি তো অবাক – তাই বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেই বললেন –

– “কিরে চন্দ্রা তৈরী হোসনি। আজ ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বাংলা নাটকের ফেস্টিভেল আছে না। সকালে অত কষ্ট করে কার্ড জোগাড় করেছি, তুই যাবি না নাকি”?

– “ওঃ মা এসে গেছো, এই দেখো না বাবাকে কম্পিউটার শেখাচ্ছি”।

-“হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কম্পিউটার তো আমাদের সাইবার ক্যাফের সুনীলদাকে বললেই এসে শিখিয়ে দিয়ে যাবে, তোমায় অত সময় নষ্ট করতে হবে না। যাও তৈরী হয়ে নাও তাড়াতাড়ি।

অপ্রস্তুত হয়ে ঠিকমতো শাট-ডাউন না করেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জ্যোতির্ময় বাবু। আর সেদিন থেকে ঘটে গেল কেমন যেন ছন্দ পতন।

প্রকাশ ফ্লাইট থেকে এলে এবার একদিন ঝগড়া হতে শুনলেন ছেলে-বৌয়ের। কারণ দু-দিনের জায়গায় চারদিন দেরী হওয়া। প্রকাশ বোঝাবার চেষ্টা করলো – “এয়ার ক্র্যাফট খারাপ হয়ে গিয়েছিল, দু-দিন ধরে হোটেলে বসে থাকতে আমাদেরই কি ভাল লাগছিল? কি বেকার তর্ক করছো?

চন্দ্রানীর মুখ ভার রইলো দু’দিন। পরের সপ্তাহে আবার বোম্বে থেকে ফিরে এলে সেই একই বাক বিতন্ডা।

– “তুমি আমাকে সময় দাও না, আমি ভীষণ বোর হচ্ছি”।

– “বোর হওয়ার কি আছে? বাড়িতে বাবা আছেন তোমার সঙ্গে সর্বদাই তো কথা বলছেন, রান্না করছেন, তাঁর দেখাশোনা করলেই তো সময় কেটে যাবে”। হালকা গলায় হাসি মুখে উত্তর দিয়ে যখন পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করছে প্রকাশ, ঠিক তখনি কানে এলো, সেই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া অপ্রিয় সত্যটা – যা চন্দ্রানীর মিষ্টি পিয়ানোর সুরের আওয়াজটাকে ভীষণ বেসুরো ব্যাঞ্জোর মত কর্কশ করে দিল।

“বাবা কি বুড়ো থুরথুরে, পঙ্গু কিম্বা কানা খোঁড়া নাকি? জোয়ান লোকের মতন দিব্যি সুস্থ সবল, ওনার আবার কি দেখাশোনার দরকার”?

তখনও সম্পূর্ণ ধৈর্য্য হারায়নি ছেলে একটু বিরক্ত ভরা গলায় বেশ জোরেই চেঁচিয়ে উঠল, – “সারাদিন তো মায়ের সঙ্গেও ঘুরে বেড়াচ্ছো, কোনো কিছুতেই তো মানা নেই আমাদের বাড়িতে, তাতেও খুশী নেই তোমার”? অকারণে এত ঝগড়া করছো কেন?

– “কি আমি ঘুরে বেড়াই? একথাও লাগানো হয়ে গেছে ওনার”? ক্ষুব্দ বেড়ালের মত স্বর পাল্টালো চন্দ্রানী। “বেশ করি মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই? বেশ করি। সারাদিন একটা আধবুড়ো লোক আশে পাশে ঘুর ঘুর করলে কার ভাল লাগে”।

এবার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ প্রকাশের গলায়। “স্যাট আপ, আর একটাও কথা শুনতে চাই না তোমার। ভাল না লাগে তো চলে যাও নিজের বাড়ি। I don’t want to see your face।

হতবম্ভ জ্যোতির্ময় বাবু দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মতন বাইরের বারান্দায়। নিজের সুটকেশ নিয়ে দুপদাপ আওয়াজ তুলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল চন্দ্রানী, মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই। বাধা দেবার, বোঝাবার সুযোগই পেলেন না তিনি। প্রকাশের ঘর অন্ধকার – একটা ইংরেজি গান বাজতে লাগলো সমুদ্রের ঢেউ আছাড় খাওয়ার মতন।

অনেক রাত্রে খাবার টেবিলে ঢাকা দিয়ে যাওয়া, ‘ঝি’-এর রাখা খাবারগুলো ফ্রিজে তুলতে তুলতে ভাবলেন তিনি, একী হয়ে গেল! ‘লো’ ‘বিপ’ দিয়ে টেলিফোনটা তখনই বেজে উঠল, এসটিডি-র কল বুঝে আস্তে করে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। আভার গলা – বাবা কেমন আছো? গলার কাছে জমে থাকা কান্নার ডেলাটাকে ঠেলে ভেতরে চালান করতে করতে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, জ্যোতির্ময় বাবু। কিন্তু আওয়াজ বেরুলো না। ফোনের শব্দে ওঘরে প্রকাশও তুলেছে রিসিভার। বাবাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে ফেললো –

-“হ্যালো দিদি আমি প্রকাশ বলছিরে, বাবা বোধহয় শুয়ে পড়েছেন। বলো তোমরা সব কেমন আছো?

– আমরা তো ভালোই আছি, তোরা – বাবা, তুই, চন্দ্রানী আমার কাছে কলকাতায় কবে আসছিস?

– এবার একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে জানালো প্রকাশ। “দিদি চন্দ্রানী আজ চলে গেল রে”।

– “সেকি কেন? কোথায়?

– প্রকাশ বোঝাতে লাগলো – দিদিকে বেশ অনেক্ষন ধরে, চুপচাপ শুনতে লাগলেন বাবা জ্যোতির্ময়।

– “মেয়েটা বড্ডো বোকা রে দিদি। বিয়ের দিনে যে সব পাইলট, এয়ার হোস্টেস বন্ধু-বান্ধবীরা এসেছিল তাদের হাসি, মজাক শুনেই ও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল। ওদের সুন্দর চেহারা ফ্রি মিক্সিং দেখে ওর মনে একটা inferiority complex grow করে। আর তার থেকেই আসে, insecurity।

– তুই বোঝাসনি? বেড়াতে টেড়াতে নিয়ে যাসনি?

– হ্যাঁ, দু’তিন দিন পরপর ফ্লাইট এলেই কোনো না কোনো কথায় ঝগড়া শুরু করতো। ওর অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে প্রথম প্রথম তো আমি হাসতাম, মজা পেতাম। তাতে ও আরো রেগে যেত, অহেতুক ভয়, সন্দেহের সঙ্গে এখন আবার শুরু হয়েছিল, আমি “বোর” হচ্ছি।

– সে কি রে আমাদের বাবার মতন লোক বাড়িতে থাকলে কেউ আবার বোর হয়?

– সেটা বলতেই তো আরও অশান্তি। এরকম মেয়েকে কেমন করে সহ্য করা যায় বলো দিদি। বাবাকে যে মেয়ে দুঃখ দেয়, সম্মান করতে পারে না, তাকে আমি কিভাবে স্ত্রী বলব?

প্রশ্ন, তর্ক-বাদ বিতণ্ডার সূত্রপাত তাহলে প্রথম দিন থেকেই। কুয়াশা মেঘ, ঝড়, বজ্রপাত, বর্ষণ, প্রাকৃতিক ঘটনার মতন জীবনেও তো টক, ঝাল, মিষ্টির মতন এসব মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ, ভয়-সন্দেহ সবই থাকবে, তাহলে ছাড়াছাড়ি এত তাড়াতাড়ি, তাও বাবার উপস্থিতি নিয়ে। কেমন যেন অসহায় বোধ করতে লাগলেন তিনি। এই ছয় মাসে তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহপূর্ণ ব্যবহার, মায়ের মতন নিজে হাতে মাছের চপ, রায়তা দইবড়া বানিয়ে খাওয়ানো, শিশুর মতন আনন্দে দাবা, লুডো খেলা, কম্পিউটার শেখা সব মিথ্যে হয়ে গেল একমিনিটের ঝগড়ায়, দুই স্বামী-স্ত্রীর কচকচিতে দুধে এক ফোঁটা লেবুর রস ফেলার মতন কেটে গেল! হঠাৎ কম্পিউটারের কথাটা মনে আসতেই বুঝতে পারলেন সহজ সরল মেয়েটির মানসিক ভারসাম্য ঠিক না থাকার পেছনে মায়ের একটা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। একদিন ওদের একটা কথোপকথনও শুনেছিলেন তিনি, এখন তার মানেটা পরিষ্কার হল। – “এসব আধবুড়োগুলোর আবার একটু আলুর দোষ থাকে। ‘মা’ সাবধান করছিলেন মেয়েকে।

‘জ্যোতির্ময় বাবু’ ভেবেছিলেন বোধহয় কোনো বাসযাত্রীর সম্বন্ধে কথা হচ্ছে বা দোকানে বাজারে ধাক্কাধাক্কি করা মেয়েদের গায়ে পড়া কোনো লোকের সম্বন্ধে মেয়েলি আলোচনা চলছে তাদের। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল, “আধবুড়ো” বলতে তাকেই উল্লেখ করেছিলেন মা। মাথা কান গরম হয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল তাঁর, ঘুমের ওষুধ খেয়েও দু চোখের পাতা এক করতে পারলেন না তিনি।

আলো জ্বালিয়ে ‘স্ত্রীর’ ছবির দিকে তাকাতেই হু হু করে বন্যার জল যেন হঠাৎই ছাপিয়ে এলো, চোখের দুই কিনারা বেয়ে। -“তুমি তো ওপর থেকে দেখছো মিনু, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তোমার ছেলে-মেয়ের সংসারটা শুধু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। জীবনের শেষ সময়ে এসে শেষে এমনি করেই কাঁচের বাসনের মতন সব ঝনঝনিয়ে ভেঙে যাবে? “তোমার পরিবারের সব শ্রী” এমনি করে “বিশ্রী” হয়ে যাবে? আমি কি এমনি হতচ্ছাড়া?

দ্বিতীয় অধ্যায়

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। কী একটা ছুটির জন্য স্কুল কলেজ বন্ধ! রাস্তা ঘাটও ফাঁকা। প্রকাশ চেন্নাই গেছে ‘দু’ দিন হল, আজ বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। অন্য দিনের মতন সন্ধ্যা এসে সব বাসন মেজে ঘর মুছে চলে গেছে। বিকেলে এসে রুটি তরকারি বানিয়ে দেবে। এ বেলায় একটু দলিয়ার খিচুড়ি চাপিয়ে দেবেন তিনি সব সব্জি ফেলে দিয়ে। রোজকার মতন স্নান করতে যাবার আগে ডাস্টার হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাড়া বাড়ি একা একা। টিভি, কম্পিউটার, কাঁচের আলমারী, টেলিফোন, ডাইনিং টেবিলের সানমাইকা চকচকে করার পর ফটোগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। প্রকাশ আর চন্দ্রানীর হাসিমুখ দুটো ওদের বেডরুমের দেওয়ালে এখনও শোভা পাচ্ছে পাশাপাশি। চন্দ্রানীর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ কী মায়া। এতো লাবণ্যময়ী সরলতা যার, সে কেমন করে এমনভাবে নিজের সংসার ছেড়ে হটাৎ চলে যেতে পারলো, কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেন না তিনি। ওদের ঘরের দরজাটা টেনে দিয়ে স্ত্রীর ছবিটা মুছতে লাগলেন অত্যন্ত আদরের সঙ্গে। মনে পড়ল, এই ডাস্টিং করা নিয়ে কমলমণি কত খেপতেন। ছুটির দিন সকালে রুটি আলুরদমের জল খাবার খাওয়া শেষ হলেই ঝুলঝাড়া আর ঝাড়ন হাতে ধরিয়ে বলতেন “ঐ দেখো কত ধুলো, তোমার ঝারণের স্পর্শ পাওয়ার জন্য কাঁদছে”। তিন ছেলেমেয়েই টিকটিকি দেখে ভয় পেতো ছোটবেলায়। তাই ঝাঁটার ডগায় ডিমের খোলা লাগিয়ে সারা বাড়ির দেওয়াল টিকটিকি শূন্য করাও তাঁর একটা বিরাট কাজ ছিল। সারাক্ষণই বাড়ির কাজ করা, মাসকাবারী তোলার আগে তাক পরিষ্কার করা কৌটো কাটা মুছে, তেলচিটে জালি ফ্যান সাফ করায় সময়টা বেশ ভালোই কেটে যেত স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। রান্না ঘরে এসে চায়ের প্যাকেট থেকে চা পাতা ঢালতে লাগলেন তিনি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। ভাবছেন তিল তিল করে গড়ে তোলা এতো সুন্দর সংসারটা কার কাজে লাগবে। ছেলে-বৌয়ের মধ্যে যদি মিল না থাকে, নাতি-নাতনিদের কলকলানিতে বাড়ি যদি মুখর না হয়; রকমারি রান্নার গন্ধে এক্সজস্ট ফ্যান-এর হওয়াটা যদি পাশের বাড়িতে খবর না পৌঁছে দেয় যে হিং দিয়ে ডাল সাতলাচ্ছে প্রকাশের বৌ কিম্বা পাঁচফোড়ন ভেজে সুক্তোতে ঢালা হ’ল তাহলে আর বাঙালিদের বাড়ি কী হ’ল। শীতের দিনে খেজুর গুড়ের পায়েস বানিয়ে যখন কমলমণি টেবিলে এনে রাখতেন তখন সারা ঘর যেন অপূর্ব মিষ্টি গন্ধে ‘ম’ ‘ম’ করতো। এই ক’মাস চন্দ্রানীও লাফিয়ে বেরিয়েছে –

“বাবা এত সুন্দর টেস্ট হয়েছে না হাত চাটতে ইচ্ছে করছে তরকারী খেয়ে”।

প্রকাশ একদিন বলেছিল – “মা চলে গেলেও বাবা কোনোদিন আমাদের খাওয়ার কষ্ট পেতে দেননি”। মাংস-বিরিয়ানি খেয়ে সেদিন চন্দ্রানীর বাবাও বললেন – “এবার বেয়াইমশাই আপনি একটা হোটেল খুলুন”। আপনার এখানে এলে জিভের স্বাদই পাল্টে যায়। ভদ্রলোক খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মোটা হয়ে যাচ্ছেন বলে বাড়িতে স্ত্রী বড্ড ধরা কাট করেন। ওনার ভালোর জন্যই। চন্দ্রানীও খুব বকুনি দেয় বাবাকে বাচ্চার মতন; জ্যোতির্ময় বাবুর বেশ মজা লাগে।

জানলা দিয়ে বাইরের আকাশে থরে থরে জমে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে, এবার ঘরে আসতেই মনে পড়ল বৌ-এর পেছনে ঘুর ঘুর করা, আর রান্না ঘরের কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকার “হবি” নিয়ে বন্ধু বান্ধবেরাও কত সময় ঠাট্টা করতো তাঁকে। কিন্তু স্ত্রী প্রেসারের রুগী তারপর হার্টের অসুখ টা ধরা পড়ল, যখন একটু কাজ করলেই হাপাতে লাগলেন তখন থেকেই গৃস্থলীর কাজে আরও বেশি করে লেগে পড়েছিলেন তিনি। “ভাঁড়ার” গোছানোর কাজ, কখন কি আনতে হবে, কোন কোম্পানীর তেল, সাবান নীল আনলে ভাল হয়, কোন হ্যাঙ্গারে কোথায় কাপড় মেললে শার্ট, প্যান্ট, জিন্স এর জ্যাকেট তাড়াতাড়ি শুকোবে সব তার খেয়াল থাকতো। ছেলেমেয়েদের ইউনিফর্মগুলোও রাত্রি বেলায় ইস্ত্রি করতে উদ্যত হতেন। ছেলে মেয়েদের পড়া, গান বাজনা, সাঁতার শেখা, কম্পিউটার ট্রেনিং নেওয়াতে ব্যস্ত থাকতে হতো তবে বাবা মায়ের সাথে তারাও সর্বদায় সহযোগিতা করেছে। কখনও কোল্ড ড্রিঙ্কস, আইসক্রিম খাবার ঝোঁক পর্যন্ত তারা করেনি। খুব সহজে ও স্বাভাবিকভাবে আদর স্নেহ ও value education দিয়ে দুজনে মিলে মানুষ করেছিলেন।

তাঁর তিন সন্তানকে মায়ের চারিদিকে গোল হয়ে বসে তারা সবাই একসঙ্গে পিঠে গড়েছে, সিঙ্গাড়ার পুর ভরেছে, গাজর কুরে দিয়েছে গাজরের হালুয়া খাবার জন্য। বাংলাদেশে না থেকেও তারা ছুটির দিনে মাকে মোচা ছাড়িয়ে বা নারকেল কুড়ে দিয়ে বাঙালি ট্রেডিশনটা বজায় রাখতে পেরেছে। তাই মডার্ন আবহাওয়ায় থাকলেও প্রকাশ এখনও ছুটির দিনে লাউ ডাটা চচ্চড়ি চিবুতে চায়। তবে কাজের মেয়েদের হাতে কি আর সে রকম স্বাদ হয়! “ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং একটানা টেলিফোনের সুতীব্র আওয়াজে এবার নস্টালজিয়ার সূত্রটা ছিড়ে গেল, তাড়াতাড়ি উঠে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। – হ্যালো।

কিছুক্ষন কোনো আওয়াজ নেই। আবার হ্যালো কে কথা বলছেন? এবার খুব আস্তে পাখির ডাকের মতন অদ্ভুত গলায় কে যেন বলল – “বাবা”।

– কে, আভা না প্রভা? আমেরিকা জাপান থেকে ফোন করলে আভা বা জামাইয়ের গলাও এরকম কয়েক সেকেন্ড পরে পরে ভেসে আসে, তাই একটু থেমে তিনি একটু জোরেই বললেন – “হ্যাঁ বলো মা, বাবা বলছি”। – আরও একটু বিরতি।

– “কি রে কি হলো? কেমন আছিস? কথা বলছিস না কেন আভা”? – আবার চিন্তার সুর জ্যোতির্ময় বাবুর উৎকণ্ঠিত গলার স্বরে।

– “বাবা আমি চন্দ্রানী বলছি”।

– বৌমা? তোমার আওয়াজটা এরকম লাগছে কেন মা! এত দিনে মনে পড়ল বুড়ো বাপটাকে? অভিমানের প্রচ্ছন্ন আভাস তাঁর কথায়।

– “বাবা বাবা… আমার মা এইমাত্র” গলা বুজে এলো চন্দ্রানীর। কেন যেন কথা বলতে পারছে না মেয়েটা। একটা গানের কলি হটাৎই কানে বাজলো তাঁর “হায়রে ব্যাথায় কথা/যায় ডুবে যায় যায়রে”।

– বৌমা কি হয়েছে তোমার মার? তোমার বাবা কোথায়? ওনাকে ফোন দাও।

– এবার বাক্যটা কোনোরকমে শেষ করলো চন্দ্রানী – “বাবা, মা এইমাত্র চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে”।

চিত্তরঞ্জন পার্কে পৌঁছাতে (ময়ূর বিহার থেকে “অটো” নিয়ে) প্রায় ঘন্টা খানেক লেগে গেল, নিজামুদ্দিন পুলের ওপর ট্রাফিক জ্যাম। প্রগতি ময়দানে এখনো ট্রেড ফেয়ার চলছে।

ততক্ষনে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন যারা ঐদিকে থাকেন অনেকেই এসে গেছেন। জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখে শিশুর মতন ডুকরে কেঁদে উঠলেন চন্দ্রানীর বাবা। পাশে বসতেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁর হাতদুটো। বড় অসহায় মনে হল তাঁকে। ‘স্ত্রী’ বিয়োগ যে কি অসহনীয় দুঃখের তা জ্যোতির্ময় বাবুর চেয়ে বেশী আর কে বুঝবে। কিন্তু অকালে স্ত্রী চলে গেলেও সংসারটাকে ‘শ্রী’ হীন হতে দেননি তিনি কোনোদিনই। নিজের দুঃখ চেপে রাখার মতন অসম্ভব সহ্যশক্তি আছে তাঁর মধ্যে কিন্তু এই ষাট হয়ে যাওয়া মানুষটি অত্যন্ত সরল অপটু, স্ত্রীর ওপর এতদিন সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন তিনি। স্বামীকে এক গ্লাস জল গড়িয়েও খেতে হয়নি কোনোদিন। এক কাপ চা করেও খাননি তিনি। নিজের বই আর বন্ধুদের সঙ্গে তাস নিয়ে সময় কাটিয়েছেন এক সুরক্ষিত জগতে। এই নিষ্প্রাণ দেহের দিকে তাকিয়ে এবার জ্যোতির্ময় বাবুর বড় অদ্ভুত অনুভূতি হল। যে ভদ্রমহিলা অতি সুদক্ষ হাতে সংসারের সব কাজ সামলাতেন, চাকরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে মাছের, সব্জির বাজার আনতেন, ড্রাইভারকে বকে বকে গাড়ির চাকাগুলো পর্যন্ত চকচকে করে ধোয়াতেন, ছেলে, মেয়ে, স্বামী কি পরবে, খাবে, কোথায় যাবে, বেড়াবে, এমনকি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোবে – সে সব খুঁটি নাটি বিষয়েও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লক্ষ্য রাখতেন তিনি, এভাবে নিশ্চুপ শান্ত মুদিত নয়নে নাকে তুলো গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। মাটিতে কখনো তাঁকে বসতে দেখেননি তিনি। আজ পাড়ার লোকেরা এসে তাঁকে খাট থেকে মাটিতে একটা মাদুরে শুয়ে দিয়েছেন। চন্দ্রানী বলে খাবার পর একদিন ওর বাবাকে ফোনে ধরবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সেদিন এই ভদ্রমহিলা কত দাপটের সঙ্গে বললেন –

“আপনার ছেলের যখন আমার মেয়ের জন্য সময় নেই তখন মেয়ে আপনার বাড়িতে থেকে কি করবে? আমার কাছে থেকে সে আরো পড়াশোনা করবে”।

এই চার পাঁচ মাস আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। জ্যোতির্ময় বাবু বুঝেছিলেন বাবার যেখানে কোনো say নেই তখন লাভ হবে না বারবার ফোন করে। পাড়ার মহিলারা এবং চন্দ্রানীর মাসীও যাঁরা পাশেই B-Block এ থাকেন এসে সিঁদুর আলতা পড়াচ্ছেন। ফোলাফোলা চোখ, খোলা চুল সাধারন ছাপা শাড়ি পরনে, সকলের কথামত কখনও চন্দন পিঁড়ি, কখনও গঙ্গার জল আনতে ব্যস্ত চন্দ্রানীমাকে বড় ক্লান্ত ও অসহায় লাগছে। জানলেন কাল রাত থেকেই সবাই জেগে বসেছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই তিনি হটাৎ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একবার কাছে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা। আলতার শিশিটা খুলতে গিয়ে সারা হাতের তালুতে লেগেছে লাল রঙ। শ্বশুর আলতো করে হাতটা মাথায় রাখতেই মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। আর তার সারা মুখটা লালে লাল হয়ে গেল – যেন বিজয়ার দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন হল।

তৃতীয় অধ্যায়

শ্রাদ্ধের দিনটাতে ছেলে প্রকাশকে অনেক কষ্টে রাজী করিয়ে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলে বাবা জ্যোতির্ময়। অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে কথা বললেও চন্দ্রানী-প্রকাশকে একবারও মুখোমুখি হতে দেখেননি তিনি। এই দশদিন ধরে অনেক কথায় তাঁর কানে গেছে। সমগ্র পরিবারের ভদ্রতা সভ্যতার মুখোশও খসে পড়তে দেরী লাগেনি। যেমন চন্দ্রানীর বড় মাসী তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বেশ কয়েকটা কটূক্তি করেছেন যা তার মনে তীরের মতন বিঁধেছে।

– “কি রে এ সব মেহমানদের রোজ রোজ এসে বসে থাকার কি দরকার তা তো বুঝি না বাপু” – কিম্বা ছোট মাসীর সরাসরি প্রশ্ন – “কি রে তোদের আসল খবরটা কি বলতো? প্রকাশ ডিভোর্সের মামলা করার আগেই তুই করে দে। খোর পোষ নিতে ছাড়বি না কিন্তু। দিদি নেই, কিন্তু আমরা তো আছি”।

চন্দ্রানী ইশারায় চুপ করতে বলেছে মাসীদের কিন্তু তাঁরা মনে করেন “স্পষ্ট কথায় কষ্ট নেই”।

– “আমাদের আবার খোলামন, ঢাক গুড় গুড় একদম পছন্দ নয়, আর দিদির কাছে সবই তো শুনেছি আমরা”।

কিন্তু তবু তিনি প্রায় রোজই গেছেন ঐ বাড়িতে। বেয়াইমশাইও যেন তাঁকে দেখে অনেকটা শান্তি পান।

চন্দ্রানীর দাদা ক্যালিফোর্নিয়ার থেকে এসেছে মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এবং পরিষ্কার বলে দিয়েছে বাবাকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার স্ত্রী ডক্টরেট করছে আর তাঁরও ভীষণ খারাপ সময় চলছে এখন। ১১/৯ এর পর থেকে ওদেশে IT মার্কেট ডাউন হয়ে গেছে। প্রচুর লোকের চাকরি চলে যাচ্ছে, তাকে হয়তো কোম্পানী বাড়ি সব বদলাতে হবে, তাই চন্দ্রানী তো আছেই। বাবাকে সামলে নেবে। অথবা যদি কোনো হোমে রাখা যায়, তাই ভাবা হচ্ছে। এদিকে বাঁকুড়া থেকে চন্দ্রানীর এক কাকা এসেছেন। দাদাকে নিয়ে যাওয়ার তাঁর খুব ইচ্ছে। তাতেও চন্দ্রানীর বৌদি remark করলেন ইংরেজিতে – actually these people went to grab his property so this uncle is so much interested to look after his brother। সায় দিলেন চন্দ্রিমার মামা – “Chittarajan park is very costly now if you sell this house to the promoter they will give you crore rupees”।

জ্যোতির্ময় বাবুর পাশে বসে নিরীহ গ্রাম্য মানুষটি তখন পুরোহিত মশাইকে একটা কাগজে পিতা, প্রপিতামহদের নাম লেখাচ্ছিলেন। সব কথাই যে কাকার কানে যাচ্ছিল তা বোঝা গেল, যখন দাদার কাছে এসে ক্রুদ্ধ গলায় তিনি বলে উঠলেন – “তুমার সম্পত্তির লেইগ্যে ইখানে আসি নাই দাদা, তুমাকে ভালোবাসি বলেই আইছিলাম। যেইত্যে হবেক নাই আমার সঙ্গে – উয়াদের মতন আমরা ইংরেজি বলতে লারি ঠিক কিন্তু বুইজতে তো পারি। বৌদিদি তো কখনোই তুমার কাছকে এইসত্যে দিলেন নাই, আবার ইয়াদের কথার বহর দেখ না, ক্যানে অসটা রাখতে জায়গা লাই”।

চিত্তরঞ্জন পার্কের বেশির ভাগ লোকই পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা ছিলেন এককালে তাই এখনও তাঁদের অনেকের ভাষায় অন্যরকম টান আছে। এই কাকার হটাৎ বাঁকরে বোলি শুনে একটু অবাক লাগলো জ্যোতির্ময় বাবুর। ক্রুদ্ধ মানুষটিকে হাত ধরে শান্ত করে বাইরে নিয়ে এলেন তিনি। শিবমন্দিরের চাতালে একপাশে বসে গল্প শুরু করলেন, জয়রামবাটি, কামারপুকুরের। ইনি চন্দ্রানীর বাবার মামাতো ভাই। বিষ্ণুপুরের বনেদি পরিবার। জমি জমা, পুকুর স্বচ্ছল অবস্থা তাঁর। পিসিমা মানে চন্দ্রানীর ঠাকুমাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় এই দুই মামাতো পিসতুতো ভাই একসঙ্গে খেলেছেন পড়েছেন। চন্দ্রানীর বাবারা বাংলাদেশ থেকে চলে এলে মামা বাড়িতেই মানুষ। খ্রিষ্টান কলেজ থেকে ইংরাজি সাহিত্যে বি.এ. পাশ করে তিনি দিল্লী চলে আসেন। কারন তখন তাঁর বাবা হিন্দু কলেজে চাকরী পান। বৌদির মৃত্যুর খবর পেয়েই ঐ মামাতো কাকা ছুটে এসেছেন, দাদার শোক সন্তপ্ত পরিবারকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে। আর এভাবে সম্পত্তির লোভে আসবার নির্লজ্জ অভিযোগে সরল মানুষটা দুঃখে ক্ষোভে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। চন্দ্রানী যে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে সে কথা তিনি জানেন না। তাই তার শ্বশুর জ্যোতির্ময় বাবুকে তাঁর বড় আপন বলে মনে হল। বেয়াইমশাইও করুণ চোখে যখন বললেন, – “শ্রাদ্ধের কাজকর্ম খাওয়া দাওয়াগুলো একটু সামলে দিন দাদা”। তখন তাঁর কথা ফেলতে পারলেন না তিনি। প্রকাশের উপস্থিতিটা বেয়াইমশাইয়ের কাছে যে কত আনন্দের হয়েছে তা জ্যোতির্ময় বাবু উপলব্ধি করলেন কেননা তিনিও মেয়ের বাপ। মেয়ে জামাই-এর ছাড়াছাড়ি হলে তিনি কি স্থির থাকতে পারতেন। চন্দ্রানীর বাবাও যে এই বিচ্ছেদটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রীর ভয়ে চুপ ছিলেন সেটা বেশ পরিষ্কার বোঝা গেল সেদিন।

নিয়ম ভঙ্গের পর সবাই চলে গেল একবার চন্দ্রানী মাকে একা পেয়ে শ্বশুর প্রশ্নবানটা ছুড়ে দিলেন, “কি মা কবে যাবে নিজের বাড়ি”? মুখ নিচু করে বৌমা শুধু পাল্টা প্রশ্ন করলো শুকনো মুখে, – ” আমার বাবাকে কে দেখবে বলো”? এত স্বাভাবিক রূঢ় সত্যটার সামনে এসে আর কোনো কথা খুঁজে পেলেন না তিনি।

বাঁকুড়ার কাকাকে চন্দ্রানীর দাদা অনুরোধ করেছে আপাতত মাস ছয়েকের জন্য তাঁর কাছে গ্রামে নিয়ে গিয়ে রাখতে। চন্দ্রানী বি.এড পড়ায় চান্স পেয়েছে, সেও হোস্টেলে চলে যাবে। টাকার সমস্যা হবে না কারন মা ছেলের পাঠানো ডলারের বেশ ভালো ভাবেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অতএব নিয়ম ভঙ্গ একটা সংসারের সমস্ত নিয়ম কানুনকে ভেঙে চুরমার করে একটা বৃদ্ধ মানুষের জীবনে যেন বুলডোজার চালিয়ে দিল।

সন্ধ্যে বেলায় বেয়াইমশাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সেই ভোলা ভালা সহজ সরল অধ্যাপক মানুষটি তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন কান্নার দমকে সারা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠলো তাঁর। এই মানুষটার মায়ায় এই এগারো বারোদিন মান অপমান, অভিমান সব জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি এই বাড়িতে এসেছিলেন। আজ কেমন যেন অব্যক্ত ব্যাথায় বুকের ওপর একটা ভীষণ ভারী পাথর চেপে বসতে লাগলো প্রকাশের বাবা জ্যোতির্ময় বাবুর। বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন, অন্ধকার বারান্দায় একা বসে আছে ছেলে আকাশ ভরা তারার মাঝে নিজের অস্তিত্বের সন্ধানে। দেবব্রত বিশ্বাস গান শোনাচ্ছেন – যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝরে। রাত্রের খাওয়া দুজনে ভীষণ স্তব্ধতার মধ্যে সারলেন, নম নম করে। নীরবতার নিশ্চিদ্রতায় বাড়ির আবহাওয়াও হয়ে উঠল অদ্ভুত অস্বাভাবিক। এটাই বোধহয় সেই গানের কলির মতন সত্য – মনে হল তাঁর “ঘর ভরা মোর ‘শূন্যতা’ যে বুকের পরে”।

ক’দিন ধরে জ্বর হওয়ায় অফিসে যায়নি প্রকাশ। চুপচাপ শুয়ে আছে নিজের ঘরে। বাবার মৌনতার সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন বোবা হয়ে গেছে। কথা বলার শুধু নয়, ভাবার ক্ষমতাও যেন লুপ্ত হয়ে তার মনটা অবশ করে দিয়েছে। ছোট থেকেই বেশী ভাবুক বা আবেগ প্রবন নয় সে, খেলাধুলা, হৈ চৈ শান্তিপূর্ণ বাড়ির বাতাবরণে খুব স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দে গাছের মতন বেড়ে উঠেছে ছেলেটি। মায়ের মৃত্যু তাকে বিচলিত করলেও বাবা বা দিদিদের স্নেহ ও আদরের ছত্রছায়ায় বিশেষ ভাবে আলোড়িত করতে পারেনি এবং অভাব তাকে কখনও বুঝতে দেওয়া হয়নি। হঠাৎ এত পছন্দ হওয়া ভালো লাগা মেয়েটি যাকে সে শুধু স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেনি, প্রেয়সীর রোমান্সে আপ্লুত করতে চেয়েছিল, সারাজীবন যার রক্ষণাবেক্ষণের, ভাত কাপড়ের ভার নেবার জন্য অগ্নি সাক্ষী করে যে শপথ নিয়েছিল হটাৎ তাকে এমন করে যে হারাতে হবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

আজ সকাল থেকেই ভাবছে দিদিকে একবার ফোন করবে কিন্তু বিছানা ছেড়ে বাইরে বসে চা খেয়েও আবার শুতে ইচ্ছে করলো তার। কিছু ভালো লাগছে না, খবরের কাগজ নিয়ে তাই গা এলিয়ে দিল সে সোফায়।

স্বর্গীয় শাশুড়ির কাজের দিনে কেবল বাবার কথাতেই কি প্রকাশ শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল! না চন্দ্রানীর জন্য ভীষণ মন কেমন করছিল তার। কিন্তু ওদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে সারাদিনে একবারও ওকে সে একা পায়নি। একবার চোখাচোখি হলেও মেয়েটা কাছে আসেনি, কেমন যেন ভয়, লজ্জা বেদনা বিদুর সেই চোখ দুটো বারেবারে মনে পড়ছে তাই। সেই ঝকমকে সেজে থাকা, বাড়িতেও লিপস্টিক লাগানো গোলাপি ঠোঁট ফুলিয়ে যখন তখন অভিমান করা, একটু তর্কবাগিনী মায়ের মুখের ঝাল খাওয়া, সন্দেহ আর অশান্তির দোলায় অকারণে দোল খাওয়া মেয়েটা মায়ের মৃত্যুটাতে ভীষণ ভাবে আঘাত পেয়েছে। তার বিব্রত, নৈরাশ্য পীড়িত চেহারা অনেকটা ডানাকাটা পাখির মতন অসহায়। তার বিষন্নতা, যন্ত্রচালিতের মতন কাজ করে যাওয়া, বাবাকে ওষুধ খাওয়ানো, আত্মীয় স্বজন প্রবাসী দাদা সবাইকেই যথারীতি সম্মান দেওয়া, শ্রাদ্ধবাসরে পুরোহিত মশাইকে ঠাকুর ঘর থেকে কখনও গঙ্গাজল, কখনও চন্দন কাঠ ইত্যাদি যোগান দেওয়া, সবই সে করে যাচ্ছে দম দেওয়া পুতুলের মতন। মাসী-পিসি, দূর সম্পর্কীয় দিদি বৌদিদের একই প্রশ্নের একই রকম উত্তর আবেগহীন গলায় দিয়ে যাচ্ছে, অনেকটা টেপরেকর্ডে ধরে রাখা একই গতে। “মা’ কেমন করে কখন অসুস্থ হলেন ,কোন হাসপাতালে কখন কি ধরণের চিকিৎসা হ’ল, ক’টার সময় মারা গেলেন? এইসব একই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত কেউ কেউ তার ব্যক্তিগত জীবন, ভবিষ্যৎ নিয়েও খোঁচা দিতে ছাড়ছেন না, হয়ত সেই কারনেই বেশ গম্ভীর মুখে কাজ করে যাচ্ছে সে, কাঁদার অবকাশ নেই। শ্বশুরমশাই প্রকাশের হাত দুটো ধরে একটু চাপ দিয়েছিলেন শুধু। প্রণাম তিনি কোনোদিনই করতে দেননি জামাইকে। একটু ঝুঁকলেই হাত দুটো ধরে নিজের বুকে টেনে নিতেন। আজ আর ঠিক সেইভাবে বুকে টানতে অসমর্থ বৃদ্ধ অধ্যাপক। প্রকাশের উপস্থিতিতে কেমন যেন এক দিশেহারা বিহ্বল হয়ে পড়লেন, কিন্তু সবাইকার চোখ তাঁর ঐ সুদর্শন জামাইয়ের দিকে থাকায় মুখে কিছু বলতে পারলেন না, শুধু হাতের ওপর চাপটা অনুভব করে প্রকাশের মনে হল – আঙুলেরা বোধহয় কখনও কখনও কথা বলে। একটু পরশ সামান্য উত্তাপ জমাট বরফের মধ্যেও বুঝি এমনি করে ফাটল ধরায়। আর স্নেহমমত্বের তথা ব্যাকুল আবেগের ফল্গু স্রোত কঠিন পাথরের মতন স্তব্ধ জলের মধ্যে সৃষ্টি করে তরল কোমল ঝর্ণার। যা খুব ধীরে ধীরে ঝির ঝির করতে করতে বেরিয়ে আসে স্বপ্ন ভঙ্গ নির্ঝরের মতন। মুখ নিচু করে সে ভাবতে লাগলো, স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে প্রথমে হালকাভাবে পরে সিরিয়াস হয়ে অনেক কথা কাটাকাটি করেছে সে। আত্ম অভিমান, অহং বোধ বা দাম্ভিকতা কিনা জানে না, কিন্তু সম্মানে আঘাত লাগায় অনেক অপ্রিয় কথা শোনাতেও বাধ্য হয়েছে সে কিন্তু এই শিশুর মতন বৃদ্ধ শ্বশুরের সঙ্গে কোনোদিনই মুখোমুখি তার কোনো তর্ক বিতর্ক হয়নি। আজকে কেমন যেন অপরাধী লাগছে নিজেকে। এনার কথা তো একবারও ভাবেনি, এনার অসহায়তা, প্রতিবাদ করার অক্ষমতা, অসম্ভব সারল্য ও স্ত্রীর প্রতি নির্ভরতার কথা আজ সে অন্য দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে পারলো। কেননা এই বৃদ্ধ শিশুটিতো সব সময় তাঁর জামাইকে ‘বাবা’ বলেই সম্বোধন করতেন। আর ওঁদের বাড়ি যখন ও গেছে, খাওয়া হয়ে গেলেই নিজে তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মেয়েকে বলতেন – “ওরে ওকে কিছুক্ষন বিশ্রাম করতে দে। কতদূর ফ্লাই করে এসেছে”। প্রকাশের ইচ্ছে করছিলো ওনাকে আজ বাচ্চার মতন আদর করে বুকে টেনে নিতে।

এবারে লক্ষ্য করলো সে রান্নার লোকেদের কাছে একটা চেয়ারে বসে থাকা নিজের বাবাকে। একজন গ্রাম্য মতন মামা বা কাকার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলছেন তিনি। সর্বদা সোজা হয়ে বসেন তিনি। কিন্তু আজ তাঁর ঋজু দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে, কপালে বারবার হাত যাচ্ছে। খুব সম্ভব মাথা ব্যাথা হচ্ছে। সবসময় ধপধপে জামা-কাপড় পরার অভ্যাস তাঁর। আজকের পাজামা-পাঞ্জাবীটি ময়লা, চুলও রুক্ষ এলোমেলো। ক্রমাগত দশদিন ধরে রোজ আসছেন তিনি এই বাড়িতে। প্রথমে খবরটা পেয়ে প্রকাশ বুঝে উঠতে পারেনি কি করা উচিৎ তার। যে স্ত্রীর সঙ্গে এই ক’মাস ধরে যোগাযোগ নেই, সম্ভবতঃ তাকে অক্ষম স্বামী সাজিয়ে ওরা ডিভোর্সের কেস করবে অথবা বাবার থেকে আলাদা করে নেবার পরিকল্পনা চলছে তাদের বাড়িতে। অভিসন্ধি করা হয়েছে তাকে “ময়ূর বিহার” ছেড়ে “গুরগাঁও” বা পালাম বিহারে আলাদা বড় ফ্লাট নেওয়ার জন্য। ঈস্বরতুল্য বাবার সম্বন্ধে মন বিষানোর চেষ্টাও কম হয়নি। সেখানে কেন যাবে সে? তাদের বাড়িতে কে মরলো বা বাঁচলো প্রকাশের জানবার ইচ্ছে নেই। কিন্তু যখন বাবা বললেন – “সব সময় মনে রাগ অভিমান পুষে রাখতে নেই বাবা। আজ একবার মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো তোমার কর্তব্য। এখনও তো ডিভোর্স হয়নি তোমাদের। তখন গিয়েছিল সে তাদের বাড়িতে। সেই শাশুড়ির মৃত্যু যিনি প্রথমে মায়ের অভাব পূর্ণ করবার ভান করেছিলেন, প্রথম তিন মাস প্রকাশ প্রকাশ করে পাগল হয়ে যেতেন, জামা-কাপড়, জিনিষ উপহারে ভরিয়ে দিতেন বাড়ি। তিনিই যখন একদিন আদো আদো গলায় বললেন – “তোমাদের বাড়িটা পুরোনো দিনের এর পরিবেশটাও কেমন যেন সব লোয়ার মিডল ক্লাস লোকের বাস। তুমি এত ভাল এয়ার লাইন এ চাকরী করো, এত টাকা মাইনে পাও, এদিকে সাউথ দিল্লীতে একটা ফ্লাট নাও”। তখন প্রকাশ নয় চন্দ্রানীও বলে উঠেছিল – “না না আমাদের পাড়াটা খুব ভালো। আর বাবার অনেক কষ্টের তৈরী বাড়ি। মায়ের স্মৃতি জড়ানো, ওখান থেকে যাবার কথা তো ভাবতেই পারি না”।

চন্দ্রানী বলল – “ছাদটাও বড় সুন্দর মা, আমার তো খুব ভালো লাগে”। আবার ক’দিন পরে শুরু হলো, অন্য যুক্তি – বাবা ওখানেই থাকবেন, তবু ভবিষ্যতের জন্যে তোমাদের তো একটা আলাদা প্রাইভেসি চাই, ওখানে তো খুব ভালো স্কুলও সেরকম নেই। বাচ্চা-কাচ্চা হলে পড়াবে কোথায়? এর জবাবও চন্দ্রানী দিয়েছিল – “না মা, এখানে ডিপিএস কলম্বাসের বাস শুধু নয়, সব বড় স্কুলের বাস আসে। আর আমাদের বাড়ির কাছেই তো ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমস হবে। মেট্রো ট্রেনও এসে যাবে। বাড়িতে বাবা কত সুন্দর বাগান করেছেন, আমার তো খুব ভালো লাগে”।

কিন্তু তার ক’মাস পরে ওনার মনে হতে লাগলো – “দেখো প্রকাশ তোমার এত কাজ, মাসের মধ্যে এতবার আউট অফ স্টেশন যাও, চন্দ্রা তো বোর হয়ে যায়, তাছাড়া বয়স্ক লোকের সঙ্গে কতক্ষন আর কি গল্প করবে। ওকে বরং MBA তে ভর্ত্তি করে দাও”।

– “হ্যাঁ, পড়ুক না যত ইচ্ছে পড়াশোনা, খেলাধুলো, গান-বাজনা, সেলাই আরো কম্পিউটার কোর্স শেখা সবকিছুর জন্য, সব হবির জন্যই বাবার খুব উৎসাহ আছে আর আমার তরফ থেকেও কোনো বাধা নেই”।

উনি আবার আন্তরিকতা ভরা গলায় বললেন – “না, সাউথ দিল্লীতে না থাকলে কি ভালো কোনো কলেজ পাবে? তাই বলছিলাম কি আমার বাড়ির কাছেই একটা খুব সুন্দর ফ্লাট আছে, যদি তুমি ভাড়া নাও…”। এবার কথাটা শেষ করতে দেয়নি প্রকাশ। – “না, সেটা একেবারেই সম্ভব নয়”। ধীরে ধীরে চন্দ্রানীর সুরও বদলাতে লাগলো। প্রকাশ ফ্লাইট-এ গেলেই ওর মাসীর বাড়ি, মামীর বুটিকে বা সিনেমা থিয়েটারে যাওয়া চাই মায়ের সঙ্গে।

বাবার সম্বন্ধে কটূক্তি সহ্য করা সেই অসহ্য মহিলা আজ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর জন্যেও মনটা কেন এমন খারাপ লাগছে প্রকাশের। যাঁর ছবিতে প্রণাম করতে পারলো না, কিন্তু কেমন যেন মনে হল সেও কি একটু বেশী নিষ্ঠুরভাবে উদ্ধত হয়ে কথা বলেনি তাঁর সঙ্গে। একটু অবুঝ – সন্তান স্নেহে অন্ধ, মেয়ের প্রতি কনফিডেন্স হারানো ওভার প্রোটেক্টিভে বা খুব বেশী পোসেসিভ ছিলেন তিনি কিন্তু ‘মা’ তো ছিল চন্দ্রানীর, আর জামাইকে ভালোবাসতেও তিনি তো কোনো কার্পণ্য করেননি, তবে অনেক লোক থাকে যারা নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে – স্নেহে অন্ধ হয়ে তাই এই মহিলার প্রতিও তার আজ কেমন যেন একটা মায়া জন্মাচ্ছে। মানুষ ভাবে সবকিছু তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটবে কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হয়ে যায়। আজ মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জাগছে প্রকাশের। ভাবছে একটু নরম হয়েও তো সে বোঝাতে পারতো, অনেক ঘটনা ভেসে আসছে চোখের সামনে। প্রকাশকে ভালো ভালো রান্না করে খাওয়ানো, নামি দামী কাপড়ের জামা-কাপড়, স্যুট বানিয়ে পরানো, একটু শরীর খারাপ হয়ে গেলে ছুটে আসা, নিজে ফল কেটে খাওয়ানো, কোনো কারনে প্লেনের কোনো গোলমাল শুনে ভীত হওয়া। বারবার ফোন করার মধ্যে যে অকৃত্রিম উদ্বেগ ও স্নেহের প্রকাশ ছিল তার কথা তো কোনোদিন ভাবেনি সে। একটা মানুষের সবটাই তো অভিনয় বা খারাপ অভিপ্রায় হতে পারে না। তাই শ্রাদ্ধে নিয়ে আসার জন্য বাবাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল সে। বিপদের দিনে যে সে চন্দ্রানীর কাছে আসতে পেরেছে এটাতে কেমন যেন একটা হালকা আত্মতুষ্টির উপলব্ধি জাগলো তার মনে।

চন্দ্রানীর কথা ভাবলো প্রকাশ। তার তো মা। তার এই ক্ষতি তো অপূরণীয়। শেষ দিন যখন ফোনে ঝগড়া হয় তখন চন্দ্রানীর মা রেগে মেগে বলেছিলেন – “তোমার বাবার ঝি গিরি করার জন্য তো চন্দ্রাকে আমি রেখে যাবো না। হয় তুমি ফ্লাইট ছেড়ে গ্রাউন্ড-এর অফিসে কাজ চেঞ্জ করো, নয় আমার কাছাকাছি আলাদা বাড়ি নাও”। তখন সেও খুব চেঁচিয়ে জবাব দিয়েছিল – “সব জেনেশুনেই তো বিয়ে দিয়েছিলেন, এখন ফ্লাইটের চাকরী পছন্দ হচ্ছে না কেন? আপনার মেয়ের এখানে থাকতে অসুবিধে হচ্ছে তো নিজের কাছে নিয়ে যান, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না”। একটু পরেই চন্দ্রানীর ফোন আসে – “তুমি আমার মাকে অপমান করেছো, তোমার সঙ্গে আমি কথা বলতেও চাই না”। – “বলো না, থাকো তোমার মায়ের আঁচলের তলায়, don’t disturb me, you fool woman”। ফোনের তারটা খুলে দিয়েছিলো প্লাগ থেকে, বিরক্তি আর ঘেন্নায়।

এরপরে ক’মাস কোনো কথাই হয়নি। আজ চন্দ্রানীর শুকনো মুখটা দেখে কিন্তু বড় মায়া লাগলো প্রকাশের। মা হারানোর বেদনা কি তা সে নিজে অনুভব করেছে মর্মে মর্মে, মায়ের মতন স্নেহ পরায়ন প্রিয় বন্ধু এই মেয়েটার জীবনে কেউ ছিল না। সন্তানকে দুঃখ বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য যিনি এত ব্যস্ত থাকতেন তার ছত্র ছায়া এইভাবে হটাৎ সরে গেল, মেয়েটা কি করবে।

বিষন্নতা, চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে প্রকাশের কেমন যেন অসহায় বিপন্ন মনে হতে লাগলো নিজেকে। কি করবে সে, কি তার করা উচিৎ কিছুই ভেবে কুল কিনারা পেল না অথচ চন্দ্রানীর জলভরা কালো চোখের “চাউনি” টা বুকের ভেতরে বেহালার “ছড়ি” হয়ে বার বার মোচড় দিল সুরের মূর্ছনায়।

চতুর্থ অধ্যায়

প্রকাশের মতন সুন্দর বর হবে – সেকথা চন্দ্রানী ভাবতেও পারেনি। একটু শ্যামলা রঙ, গোল গাল মোটাসোটা মেয়ে সে। লম্বাও সেরকম নয়। ভালো গান জানা কিম্বা কোনো প্রফেশনাল ডিগ্রি নিয়ে পাশ করা বা চাকুরিরতাও সে নয়। বি. এ. পাশ আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই সে। মা বলেন, না বলতেন – “বড় বেশি সরল আর বোকা তুই তাই তোর জন্যই চিন্তা”। দাদা ভীষণ বুদ্ধিমান আর শান্ত, কলোম্বাসে পড়ত, অনেক প্রাইজ আনতো ঘরে, কিন্তু সে পড়েছে রাইসিনা স্কুলে, বরাবরই সেকেন্ড ডিভিশন, কিন্তু তার মুখটা নাকি ভীষণ মিষ্টি আর অদূরে ভাব বলে স্কুলে, পাড়ায়, বাড়িতে সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। কেউ কখনো বকেনি। মারা তো দূরের কথা। আজ যে স্বামীকে সে মন প্রাণ সব সঁপে দিয়েছিল, তাকে এমনভাবে হারাতে হবে, একথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে যে তাকে বলতে পারে, “থাকতে হবে তোমায় আমাদের বাড়ি, get lost,” একথা প্রায় অবিশ্বাস্য। আজ আবার মায়ের শ্রাদ্ধের দিনে প্রকাশকে দেখে সারা বুকের রক্ত যেন উছলে উঠল। জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ যেমন কিনারায় আছড়ে পড়ে ঠিক তেমনি করেই সব সুখের স্মৃতিগুলো মনের তীরে আছড়ে ভেঙে পড়তে লাগলো। গানটা মনে পড়ল – “হটাৎ দেখা পথের মাঝে কান্না তখন থামে না যে, ভোলার তলে তলে ছিল, অশ্রুজলের পালা… যখনই ভাঙলো ভাঙলো মিলনমেলা ভাঙলো”। কিন্তু এতো লোকের সামনে সে কাঁদবে না, এই দশদিন ধরে অনেক কেঁদে নিয়েছে, অনেক রূঢ় বাস্তবের ‘সত্য’ তার সামনে প্রকাশ পেয়েছে। দাদা যে শুধু টাকা দিয়ে কর্তব্য করতে চায় – মামা মাসীরা বড় বড় উপদেশ দিয়ে পাশ কাটাচ্ছেন, কৌতুহলী প্রতিবেশীরাও কাটা ঘায়ে নুন ছেটাতে দ্বিধা বোধ করছে না – এসব কথা আগে কখনও সে এমন করে বুঝতে পারেনি। জীবনের চলার পথটা যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ, মানুষ যে নিজের জালে কতটা জড়িত তা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। বাবার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, সংসারের কত কাজ, হিসেব নিকেশ, একটা মানুষের চলে যাওয়ায় কারুর কিছুই আটকায় না কিন্তু তার জায়গা নেবার জন্য আর একজনকে যখন বাধ্য করা হয় – তখন তার থেকে পরিত্রান পাওয়ার উপায় কি সে জানে না।

প্রকাশের প্রতি বিদ্বেষ, রাগ, অভিমান, ঝগড়া সে যত করেছে সবই যে মায়ের সমর্থনে তা তো নয়। নিজের মনের কোনেও কি তার স্বার্থ-অন্বেষণ, সন্দেহ বা একা থাকার লুপ্ত বাসনা কাজ করেনি। ‘মা’র সঙ্গে বসে মাসী-মামীদের মতন নিন্দে চর্চায় সময় নষ্ট করা, শুধু সাজগোজ, সিনেমা থিয়েটারের আর অকারণ শপিংয়ের নেশায় সেও কি পাগল ছিল না। নিজেকে প্রশ্ন করতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে ‘মা’ যদি তাকে প্রভোক করে থাকে সেও তবে কম ভুল করেনি। মাকে তার সম্মান দিয়ে যথাযত কর্ত্তব্য পালন করেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে “দখল” দেবার “অধিকার” অন্যকে সে কেনো দিলো, আজ সে কথা ভীষণ বিচলিত করছে। সংসারকে অসার লাগছে। শ্বশুরের প্রতি এতো শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সে “উপেক্ষা” কেমন করে করেছে, আজ সে কথা বুঝে উঠতে পারছে না।

মা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়েছে, ঐ বৃদ্ধ মানুষটিকে সবচেয়ে আগে খবর দিতে হবে। উনি এলেই যেন ভরসা পাবেন বাবা এবং সে নিজেও। মার যে হটাৎ এমন করে “হার্ট এট্যাক” হবে, একথা কেউ বুঝতে পারেনি। প্রকাশকেও মা খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন, কিন্তু ঐ এক দোষ ছিল তাঁর কাউকে নিজের মনে করলেই ভীষণভাবে অধিকার জমাবার চেষ্টা করতেন। ভাবতেন আমি তো তার ভালো চাইছি, সে নিশ্চই পরে বুঝতে পারবে আমার কথা। কিন্তু সবাই প্রায় ভুল বুঝতো মাকে। অবশ্য চন্দ্রানী এটা ভাবছে অন্যরা তো তাঁর নিজের সন্তান নয়। অন্যরা বলতে প্রকাশ। কিন্তু প্রকাশ কি সত্যিই চেয়েছিল চন্দ্রানী চলে যাক। বাবাকে নিয়ে কথা বললে সে কেন বিরক্ত হবে না। তারপর এরকম বাবা যাঁকে দেবতার চেয়েও বড় মনে হয় চন্দ্রানীর। কিন্তু মা ভুল বলেছেন জেনেও তার প্রতিবাদ করার মতন সাহস জোগাতে পারেনি সে। ছোট থেকেই মা যা পড়তে বলেছেন পড়েছে, মা নিজে যেটা খেতে ভালোবাসতেন তাই খেয়েছে, যে ভাবে সাজাতেন সেভাবে সেজেছে, মায়ের মত ছাড়া সে যে একা তার নিজের ভালো চাইতে পারে বা কিছু করতে পারে একথা সে কখনও ভাবতে পারেনি। মায়ের মৃত্যুতে তাই প্রথমে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলো সে। মা মাছ, মাংস ডিম ছাড়া ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার কিছুই খাওয়াতেন, না সর্বদা বলতেন – “আমার ছেলে মেয়েদের মাছ, মাংস ডিম না থাকলে গলা দিয়ে খাবার নামবে না”। কিন্তু এই দশদিন ধরে তারা নিরামিষ সেদ্দ ভাত খাচ্ছে, তার কাজটা ৪ দিনে হয়ে গেলেও দাদার জন্যে রোজই সে হবিষ্যি রান্না করেছে। কারণ বৌদি আসতে পারেননি। আর আলু সেদ্দ, ডাল সেদ্দ ভাত দুই ভাই বোনে বসে ঘি দিয়ে খেতে কত ভালো লাগছে।

জীবনের মানেটাই যেন এই ক’দিনে পাল্টে গেল। মনে হল এতদিন যেন সে একটা ঘোরে ছিল, রঙিন চশমার আড়ালে সবকিছুই রঙিন। অন্যের দোষ ধরার আনন্দ যতখানি সে পেয়েছে আজ নিজের ভুল ত্রুটিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠায় তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ তাকে খোঁচা মারতে লাগলো। বিশেষ করে এই দশদিনে ক্রমাগত শ্বশুরমশাই-এর আসা যাওয়া। বাবাকে সামলানো, মামা, কাকা ইত্যাদি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অতি পরম সুহৃদের মতন ব্যবহার – চন্দ্রানী-প্রকাশের চিড় ধরাটা যাতে কারুর চোখে না পড়ে তার আপ্রাণ চেষ্টা চন্দ্রানীকে মুগ্ধ ও অভিভূত তথা কৃতজ্ঞ করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রাদ্ধের দিন প্রকাশের আগমন যেন তার দেহ-মনের প্রতিটি অনু-পরমাণুকে রোমাঞ্চিত করেছে, কিন্তু লজ্জায় দুঃখে আর হতাশায় গ্লানিতে কিভাবে কথা বলবে ভেবে পায়নি সে।

আজ সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, উদাস বাতাস আর শিশুর মতন সরল বাবার ব্যাকুল হুতাশ তার মনকে ভীষণ ভাবে কাঁদাচ্ছে। কিছুতেই কোনো কাজে মন লাগাতে পারছে না সে, আবার তার অল্প বুদ্ধি তাকে রাস্তাও দেখতে পারছে না, এর থেকে মুক্তির।

পঞ্চম অধ্যায়

সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল। জ্যোতির্ময় বাবু বেশ অনেক্ষন ধরেই লক্ষ্য করছেন, ছেলের হাবভাব। একভাবে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে সে চুপচাপ। ঘুমোয়নি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে পেপার পড়ছে, কখনও কখনও টিভি চ্যানেল পাল্টাচ্ছে, কোনো কিছুই দেখছে না, আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ছে, শুধুই আঙ্গুল মটকে যাচ্ছে একের পর এক। মনের অস্থিরতা চেপে রাখতে পারছে না ঐ activity গুলো।

ড্রইংরুমে এসে ডাকলেন, “কি রে বাবু ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? আয় আমার কাছে একটু বোস, চা করে এনেছি, নে ধর”।

তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গিয়ে হালকা হ’ল প্রকাশ। চোখে মুখে জল দিয়ে কিছুটা আরাম পেল, তারপর বাবার হাতের তৈরী চায়ে চুমুক দিয়েই বলে উঠল – “আঃ”। জ্যোতির্ময়বাবু উঠে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিলেন। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ। বাবার বুক সেল্ফটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। কত সুন্দর করে রবীন্দ্র, শরৎ, বিভূতি বা সত্যজিতের রচনাবলী সাজানো। মায়ের ছবিতে শুকনো গাঁদা ফুলের মালা, বেশ ক’দিন পাল্টানো হয়নি। আলমারি, টেবিলে কোথাও একটুও ধুলো জমে নেই। ঘরের কোনে নেই একরত্তি ঝুলও। পর্দার প্লিট, বিছানার চাদর, নীল পাপোশ সবই কত সুন্দর করে সাজানো। মনে পড়লো, মা বলতেন – “তোর বাবাতো লক্ষী পুরুষ, এতো অল্প পয়সার মধ্যেও কেমন সুন্দর করে আমাদের ঘর কন্না গুছিয়ে দিয়েছেন, বলতো? কোনো একটা জিনিষও এলোমেলো রাখতে দেননি কোনোদিন”।

প্রকাশকে স্বর্গীয় মায়ের ছবির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাবার চোখের কোনায় দু ফোঁটা জল চিকচিকিয়ে উঠল শিশির বিন্দুর মতন। কাছে এসে ছেলের চুলে হাত বোলাতে লাগলেন তিনি, তারপর ভরাট গাঢ় গলায় ধীরে ধীরে বললেন, –

“জিনিষপত্রের সাজ সরঞ্জামে এই সংসারটাতো অনেক গোছালাম রে বাবাই, কিন্তু তোদের দুটো সুন্দর জীবন কেন এমনভাবে অগোছালো হয়ে গেল বলতো? আমি কি এতো অযোগ্য বাপ”! প্রকাশ বাবার হাতটা টেনে নিলো নিজের কোলে – ‘এরকম কেন বলছো বাবা, আমাদের ভুলের জন্য আমরাই দায়ী।

বাবা বললেন – “জীবনটা তো কোনো কাঁচের বাসন নয়রে বাবু, যে ঠোক্কর লাগলেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে বা কোনোদিন জোড়া লাগানো যাবে না”? এর উত্তর তো আজ সারাদিন ধরে প্রকাশও খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠিক এইসময় ফোনটা বেজে উঠল, হটাৎ চমকে উঠলেন দুজনেই।

প্রকাশ উঠে ফোন ধরলো – “হ্যালো”, কোনো উত্তর নেই, আবার “হ্যালো” কে বলছেন? ধীরে ধীরে আওয়াজ এলো বহু দূর হতে ভেসে আসা বাঁশির সুরের মতন, – “বাবা আছেন”? চন্দ্রানীর দ্বিধা জড়িত কণ্ঠস্বরে প্রকাশ বাবাকে ধরালো রিসিভারটা।

– “হ্যাঁ, বলো মা, কি হয়েছে বেয়াইমশাই এর”?

– “বাবার ভীষণ জ্বর, তার মধ্যে ভুল বকছেন, তোর মাকে ডাক, কি করছে ও ঘরে। আমি বুঝতে পারছি না কি করব”।

– তোমায় কিছু করতে হবে না মা, আমরা এখুনি আসছি আর তোমাদের নিয়ে আসছি আমাদের কাছে।

– “বাবা”? কান্নায় আপ্লুত হয়ে গেল চন্দ্রানীর গলার আওয়াজ!

– “হ্যাঁ, মা সত্যি বলছি এবার থেকে তোমরা আমার কাছেই থাকবে। আমরা দুই বুড়ো তাস খেলবো, মর্নিং ওয়াক করতে যাব, রামকৃষ্ণ মিশনে ঠাকুরের আরতি দেখতে যাবো, অক্ষরধামের ক্যান্টিনে গিয়ে গুজরাতি প্রসাদ খাব। স্বর্গীয় মায়েরা বেঁচে থাকতে কখনও ‘মলে’ যায়নি। দুই বুড়ো ‘মলে’ খুব সময় কাটাব। গরমকালের দুপুরে ঘরে এয়ারকন্ডিশন চালাব না। আবার শীতের দিনে কলকাতা, বাঁকুড়া, সুন্দরবনে ঘুরতে যাব আরও বুড়োদের সঙ্গে হৈ হৈ করে। শুধু তোমরা দুটি মিলে মিশে আনন্দে থেকো, কাঁচের গেলাসের মতন সংসারটা ভেঙ্গে দিও না।

চন্দ্রানী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল – “বাবা তুমি সত্যিই লক্ষিপুরুষ”।

বেল সাহেবের গলি (Bell Saheber Goli)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সারা পৃথিবী জুড়ে তখন চলছে ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভারতের রাজনীতি ১৯৪২ সালের "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে আলোচিত, উদ্বেলিত। গান্ধীজীর ডাকে হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে এসেছে ইংরেজের তৈরী কারাগারে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি বানাতে বানাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রুজি রুটি কামানোর আশায় গ্রাম ত্যাগ করে আসা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের ভিড় বাড়াতে শুরু করেছে, দিল্লী শহরের অলিতে গলিতে। আকাশ ছোঁয়া জিনিষের দাম, দৈনন্দিন জীবন যাত্রার মানকে করে দিয়েছে নিম্নগামী। দিন আনা দিন খাওয়া শুধু নয়, 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয়' - এই কথাটির সত্যতা যাচাই করতে করতে ক্লান্ত গৃহকর্তা 'বাসুদেব' বাবু যখন তিন মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে "বেল সাহেবের" গলিতে এসে বাসা বাঁধলেন, তাঁর স্ত্রী তখন অন্তস্বত্তা।
"কাশ্মীরি গেটের" বাস আড্ডাতে তখন 'বাস' নয়, ঘোড়া গাড়িরা আড্ডা দেয়। যমুনার তীরে এখনকার মতন চওড়া "রিং" রোড নেই, দুপাশে গাছের সারি। "নিকলসন রোড" পেরিয়ে কুর্সিয়া গার্ডেন। সাহেবদের মালিরা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। বড় বড় কয়েকটি তালগাছও এখনো সাক্ষী দিচ্ছে, রাজধানীর পরিবর্তনশীল সেই ইতিহাসের।
শীতকাল, পৌষ মাসের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, "গোবিন্দ" তখন সাত বছরের। তাকে ধরলো জ্বরে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই - চিকিৎসা করার সুযোগ না দিয়েই প্রচন্ড মাথার যন্ত্রনায় অর্থাৎ "ম্যানেঞ্জাইটিসে" সে মারা গেলো। দিল্লীতে বোমা পড়তে পারে। চাঁদনী চকের দোকান বাজার বন্ধ হয়ে গেলো, বিনা নোটিসে। লাহোর থেকে মেডিকেল স্কুল পাস করে "বাসুবাবু" তখন "সেন" কোম্পানীর বড় ডাক্তারবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট। পয়সার অভাব, সংসার চালাবার দায়িত্বে হতবুদ্ধি মানুষটাকে পুত্রশোকে যখন কাতর করে দিয়েছে, ভাবছেন, আবার মুর্শিদাবাদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে - তখন একদিন আবার শাঁখ বেজে উঠল, তাঁর ছোট্ট ঘরে - জন্ম নিলো আর একটি পুত্র সন্তান "মঙ্গল"।
"বাসুবাবুর" মা একা গ্রামে থাকতে পারেন না, মাঝে মাঝে জমির ধান বিক্রি করতে যান এবং ফিরে আসেন শাড়ির আঁচলে কিছু টাকার পুটলি বেঁধে। বৌমা 'পোয়াতি' জেনে এবারেও পুজোর পরেই চলে এসেছেন, যদিও সাতবছরের তরতাজা নাতি হারানোর বেদনা তাঁর বুকে তীরের মতন বিঁধতে থাকে, তবু তিনি বৌমাকে স্বান্তনা দেন - ভগবানের ধন ভগবানই নিয়েছেন, দেখো আবার ঠিক তিনিই ফিরিয়ে দেবেন।
কাজেই নতুন নাতির জন্মে সবচেয়ে খুশি তিনি। মুড়ির মোওয়া, নারকেল নাড়ু - দেশ থেকে যা বানিয়ে এনেছিলেন সব বিলি করে দিলেন পাড়া প্রতিবেশীর মধ্যে। সকালে উঠে বাসি কাজ সেরে বৌমাকে সাবু সেদ্ধ খাইয়ে আসেন। চান করে সেই পুরোনো মটকার কাপড়খানা পরে বড় হাঁড়িতে ভাত বসান। চাপ চাপ অড়হরের ডাল ভাতে মেখে সব বাচ্চাদের একসঙ্গে বসিয়ে একই থালা থেকে গরম গরম ভাত তুলে দেন, ছোট ছোট হাঁ গুলিতে। এবার ধান খুব ভালো হয়েছে দেশে দেখে এসেছেন তিনি। তাই মনটা খুব খুশী। বাসুদেবও সারাদিন লোকের বাড়ি বাড়ি ইনজেকশন দিয়ে আপাতত দু টাকা আনছে ঘরে, আর আঁতুড়ের কোণে 'মঙ্গল' বাড়ছে পূর্ণ চন্দ্রের মতন।
"সুশীলা বালা" দেবীর গায়ের রঙ সোনার মতন, অন্যান্য নাতি নাতনিরা বেশ ফর্সাই হয়েছে, কিন্তু এ ছেলেটা যেন বৃন্দাবনের কেষ্ট ঠাকুর। শ্যামলা রঙের মোটা মোটা গড়ন, এক মাথা কালো চুল বড় সুন্দর উজ্জ্বল দুটি চোখ।
১৯৪৭ এ স্বাধীনতা এবং দেশভাগ। দলে দলে মুসলমান প্রতিবেশী চলে যাচ্ছে ওপারে নতুন জন্মানো দেশ পাকিস্তানে, পাকিস্তান মানে নাকি পবিত্র স্থান কিন্তু একি হানাহানি, কাটাকাটি, রক্তপাতে স্নাত দুই দেশের তিন ধর্মের মানুষ - হিন্দু, মুসলমান, শিখ একে আরেকজনের পরিবারের বৃদ্ধ তরুণ শিশুকে কচুকাটা করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করছে না। একি স্বাধীনতা? বন্ধু আত্মীয় সম প্রতিবেশীদের হারানোর দুঃখ, অহরহ নিরাপত্তার অভাব - রাজধানী দিল্লীর সব সম্প্রদায়ের মানুষকেই ভয় ভীত করে রেখেছে।
কিন্তু কাশ্মীরি গেটের ভেতরে মৌরী গেট, তার ভেতরে গন্ধ নালা এবং তার পাশেই ছোট্ট সরু হলেও পরিচ্ছন্ন এক রাস্তা। যার মোড়ে এক সাহেবের বাংলো বাড়ি, ইংরেজ সরকারের এক বড় অফিসার বেল সাহেবের বাড়ি। তাই ঐ রাস্তাটার নামও হয়ে গেছে বেল সাহেবের গলি, স্বাধীনতার আগে সেখানে কত সাহেব মেমের আসা যাওয়া ছিল, ঘোড়া ছুটিয়ে বাচ্চাদের কুর্সিয়া গার্ডেন-এ ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হত। গলির ভারতীয় বাচ্চারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত তাদের দিকে, অবাক বিস্ময় ছিল তাদের ঐ বাড়ির মালিকের প্রতি।
বৌমা বলেন - "বার বার বার্লি সাগু তো আর খেতে পারছি না মা" শাশুড়ির চোখে জল আসে। "কি করবো বলো বাছা, গ্রামে তো আমার গরু ছিল, নারকেল গাছে অত ডাব, পুকুরের মাছ - তোমাদের তো সেখানে থাকার ইচ্ছে নেই, এখানে কচি বাচ্চার মাকে আমি কি খেতে দেব? - না না ওটুকু সাগু খেয়ে নাও, বুকের দুধ নামবে কি করে বাছা।"
ছেলের লক্ষণ বড় ভালো, দু এক বছর যেতে না যেতেই আর একটি ভাই ডেকে আনলো সে। যুদ্ধ থামলো। ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। বেল সাহেবের অনেক পুরোনো লোকই চলে গেল, আর বাসুবাবুর পরিবারও বৃদ্ধি হল। ঠাকুমা বললেন, "মঙ্গলের পয়ে বাপের উন্নতি হয়েছে, দেখবে ও ছেলে বড় হলেও খুব নাম কামাবে।"
কিন্তু ওপরে চারজন এবং পরে আরও তিনজন ভাই বোন হয়ে যাওয়ায় 'মধ্যম' কুমারের দিকে মা বাবা, ঠাকুমার নজর দেওয়ার সময় হয় না, আর সাত আট বছর থেকেই সে তাই সর্বদা একটা নিজের জগতে বাস করে। বড় দিদিরা তখন কিশোরী। ঘরের রান্না, কাপড় কাঁচা, স্কুলে যাওয়া, সেলাই ফোঁড়ায়, উল বোনা, বান্ধবীদের সঙ্গ ও মায়ের সদ্য প্রসব করা ভাই বোনদের দিকে লক্ষ্য করতেই তাদের সময় কেটে যায়। বড় ছেলে খুব সাদাসিদে, পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলো ও গল্প শোনায় তার মন বেশি। একটু পেট ভরে খাওয়া আর পরিপাটি করে তেল চুকচুক চুল আঁচড়ে দিদিদের পায়ে পায়ে বাধ্য ভাইটি হয়ে ফায় ফরমাশ খাটতে তার খুব ভাল লাগে। ঝগড়াঝাটি মারামারিতে সে নেই, একা একা বাড়ির বাইরে ঘুরে বেড়াতেও তার ভয় লাগে।
মঙ্গল হয়েছে সম্পূর্ণ নিজের মত, হাট্টাকাট্টা চেহারা, দুষ্টু দুষ্টু চাহুনি, ভয়ডরহীন স্বভাব। কারও সঙ্গে তার ভাব নেই, আবার কারও কথা শুনতেও সে রাজী নয়। বাড়িতে যতক্ষণ সে থাকে কারোর সঙ্গে কোনো তর্কাতর্কি গল্প আড্ডায় কিম্বা কোনায় বসে লুডো, তাস, কেরাম খেলায়ও বেশি বসতে দেখা যায়নি তাকে। একা একাই ঘুরে বেড়াই সে বেল সাহেবের গলির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।
অনেক পরিবার, অনেক জীবন কাহিনী জড়ানো ভাঙা পুরোনো দালানের ছাদেই বেল সাহেবকে নিয়ে কিশোর বয়সে অনেক কল্পনার জাল বোনে মঙ্গল। তাঁর বেশভূষা, আচার ব্যবহার, শিক্ষা দীক্ষা, ঘোড়ার গাড়িতে মেমসাহেবকে ও গোড়া শিশুদেরকে নিয়ে 'কন্যাট' প্লেসে ঘুরতে যাওয়া - সবই তার মনকে আকৃষ্ট করে। এরাও তো তাদের মত মানুষ কিন্তু এদের জীবন যেন পরীর দেশের গল্পের মত। আর এ পাড়ার অন্যেরা বাস করে কত দুঃখ কষ্ট, অসহায়তার মধ্যে দিয়ে। কে জানে মঙ্গল কবে এই বেল সাহেবের গলির বাইরে গিয়ে থাকতে পারবে, এই সব ভাবতে ভাবতে সময় কাটে আকাশকুসুম কল্পনাতে।
তার জগৎ। মানুষের জীবনের চলমান ছবি দেখে আর জানবার চেষ্টা করে সে। প্রকৃত অর্থে তারা কে কেমন ভাবে বেঁচে আছে। বাঙালীরা তখন খুব বেশী দিল্লী আসেননি এবং যারা এসেছেন, তারা প্রায় সবাই সরকারী কাজ পেয়ে জীবিকার তাগিদে। রেলের কর্মচারীরা যারা স্টেশনের কাছে থাকতে চান তারা অনেকেই বাসা বেঁধেছেন ঐ কাশ্মীরি গেটের অলি গলিতে। 'মঙ্গল' ভাবে যার নামে এই গলিটা সেই বেল সাহেব এখন কোথায়? কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? যে বাড়িতে থাকতেন, সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোন দেশে তাঁর বাড়ি? কোনদিন সে সেখানে দেবে পাড়ি - কে জানে কখনও ঐ গলির বাইরেও সে যেতে পারবে কি না। গলির মাঝখানে এই বাড়িটাতে পাঁচটা পরিবারে মোট একত্রিশ জন লোক। ছাদের এক কোনায় শুধু একটা মাত্র বাথরুম। পায়খানার বিবরণ গল্প গাথায় লেখাটা অশোভনীয় হলেও আজ সেকথা জানাবারও একটা প্রয়োজন আছে। কারন এযুগের ছেলে মেয়েরা তা ভাবতেও পারবে না। শুধু ঐ সাহেবের বাড়িটা ছাড়া আর সব জায়গাতেই অন্যরকম বাথরুম। বেল সাহেবের বাড়ির ভেতরটা সে কোনোদিন দেখতে পায়নি। দুটো পাথরের পাদানির নীচে বিরাট গর্ত্তে রাশি রাশি মলমূত্র জমা হয় রোজ সারাদিন ধরে। পরদিন ভোরবেলায় হরিজনদের একজন, যাকে বলা হয় ‘মেথর’ আসেন বিনা ক্লেশে, বিনা দ্বিধায় নাকে কাপড় না দিয়েই বড় বড় টিনের মধ্যে সেই ময়লা তোলেন এবং মাথায় করে নিয়ে যান। খুব কষ্ট হয় মঙ্গলের। এরাও তো মানুষ, তবে কেন এই অত্যাচার তাদের ওপর। অনেকদিন পরে গান্ধীজীর আপ্রাণ চেষ্টায় ঐ "হরিজনদের" মুক্তি দেওয়া হয় ঐ নোংরা কাজের দুর্বিসহ যন্ত্রনা থেকে।
মঙ্গলের ছোটবেলায় সবচেয়ে জরুরী কাজটি হল, সকালে পায়খানা ধুয়ে দেওয়া হলেই প্রথমে ছুটে গিয়ে সে ঢুকে যায়, পরিষ্কার বাথরুমটা কে আগে দখল করতে পারে, সে নিয়ে রোজই প্রতিযোগিতা চলে তাদের মধ্যে।
বাড়িতে প্রায়দিনই তরকারি কম হলে, ডাল না পেলে সব ভাইবোনেরা নালিশ জানায়, কান্নাকাটি করে। মঙ্গলের বাড়িতে যখন ডাল তরকারি হয় না, রুটি, তেল, নুন ও লঙ্কা পেঁয়াজ খেয়ে চুপচাপ সে উঠে যায় বিনা দ্বিধায়। কারও প্রতি কখনও কোনও অভিযোগ সে করে না। স্কুলে যাবার জামা প্যান্ট একখানা, রোজ কাচলে শুকোবে না, তাই রুমালে একটু সাবান লাগিয়ে নিয়ে পকেটের আর কলারের ময়লাটা ঘষে ঘষে উঠিয়ে দেয় সে। রান্নার পরে নিবু নিবু উনোনের আঁচে ঘটিটা গরম করে কুঁচকানো ভিজে পকেটের ওপর ধরে, রাত্রে বিছানার নীচে ভাঁজ করে রেখে দিলেই ইস্ত্রি করা 'ইউনিফর্ম' হয়ে যায় তার। বাড়িতে গদী, তোষক নেই সবার জন্য, মাদুর শতরঞ্জি পেতে, ঠাকুমার হাতের তৈরী কাঁথা গায়ে দিয়ে শুতেই তারা অভ্যস্থ।
বেল সাহেবের গলির মাথায় বেশ কয়েকজন বড়লোক 'মুসলমান' পরিবার ছিলেন, স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত, সেখানে এখন যাদের বাস তারাও সব বড় বড় ব্যবসাদার। ছোটবেলা থেকেই ঐ বাড়িগুলির লোকজনদের একটু অন্য জগতের মনে হয় গলির অন্য সব বাচ্চাদের। সেখান থেকে ভেসে আসা বিরিয়ানির গন্ধ নাকে লেগে থাকে, চোখ ঝলসানো জামা কাপড়, ঘোড়া গাড়ির অদ্ভুত আওয়াজ 'মঙ্গলের' মনকে টানে, ভাবে সে - কবে যে তাদের বাড়িতেও ঐ রকম রান্নাবান্না জাঁকজমক হবে। কখনও কখনও আবার উল্টোটাও মনে হয় তার, - "ওদের পোলাও মাংসের গন্ধ যেমন আমাদের ভালো লাগে, আমাদের ঠাম্মার হাতের হিং দেওয়া অড়হরের ডালের গন্ধে নিশ্চয় ওদের জিভে জল আনে।"
রবিবারের দিনটা আসে আনন্দের আমেজ নিয়ে। গ্রাম থেকে আগত মামা কাকা বা দাদাবৌদি বিশেষতঃ বাচ্চাদের "লজেঞ্চুস" বিলি করা "পিসেমশাই" আসবেন স্নেহময়ী পিসিমাকে সঙ্গে নিয়ে, বাবা, ঠাম্মাকে ঘিরে বসবেন সবাই। চা পকোড়া মুড়ি খেতে খেতে কত ধরনের গল্প হত। মুর্শিদাবাদের কোন কোন গ্রাম "পূর্ব পাকিস্তানে" চলে গেলো, কোন খানে মহামারী কী বন্যা হয়েছে, "গান্ধী" হত্যার মামলায় আর কার কার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল, জাপানের অবস্থা এখন কেমন, নিউক্লিয়ার বোমে হিরোশিমা নাগাসাকির পর আর কোন দেশ কে ধ্বংস করতে পারে তার ভীতিপ্রদ কল্পনা। তখন টিভি ছিল না, রেডিও সকলে কিনতে পারতো না, মঙ্গলদের বাড়িতে নিত্য খবরের কাগজ আসত না, খবরের একমাত্র উৎস ছিল মানুষের মুখ নিঃসৃত সত্য কাহিনী, তারপর তার সঙ্গে রং চড়িয়ে কত কল্পনার পাহাড় করে দিয়ে ঘরে বা পথে, ঘাটে, চায়ের দোকানে, রেলের স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডে ছড়িয়ে যেত রকমারি গল্প। তাই এক শহরের কোন অবাঞ্চিত ঘটনা ঘটলে তার রেশ পৌঁছে যেত অন্য গ্রামে গঞ্জে। বেল সাহেবের গলির মোড়ে যারা থাকতেন, বিহারীলাল কাটরার লোকেরা কেউই হয়তো বেল সাহেবকে দেখেনি কিন্তু তার সম্বন্ধে নানান প্রচলিত কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলতে ছাড়ত না তারা। তিনি নাকি ৬ ফুটের বেশি লম্বা ছিলেন, তাঁর বাড়িতে আয়া খানসামাদের খুব ভালোবাসতেন। ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াতে যেতেন।
ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল মঙ্গল ও তার সব ভাই বোনেরা। মেয়ের বিয়ের পাত্র দেখতে গিয়ে অন্যের বাড়িতে হার্ট অ্যাটাক হল তার পিতার, গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই ঐ পুত্র মঙ্গলের কোলেই তিনি ঢলে পড়লেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
সমস্ত সংসারের দ্বায়িত্ব এসে পড়লো এবার এই মঙ্গলের ওপর। একটা সিগরেট ফ্যাক্টরিতে সে চাকরি করে, প্রাইভেট কোম্পানি, তারপর নানা রকম চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে হটাৎই সে চাকরি পেয়ে গেল, ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসে নিজের চেষ্টায়। টাকা পয়সার অভাব দূর হল তার মায়ের। এবার তারা বেরিয়ে এল ঐ বেল সাহেবের গলি থেকে লক্ষী নগরে নিজেদের বাড়ি করে। দুটি ভাই শঙ্কর ও শিবুও পড়াশোনা শেষ করে সরকারী চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। বড়দা আগেই চাকরি পেয়েছিলেন অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। এবার তিন বোনের বিয়ে দিয়ে সংসার পাতল সে। ছেলেরা তার পড়াশোনায় খুব ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং করে সোজা পাড়ি দিল আমেরিকায়। মঙ্গলবাবু এখন পঞ্চাশোর্ধের মধ্য বয়স্ক বড় ম্যানেজার, ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে ঐ মৌরি গেটের গন্ধ নালায় তাঁর শৈশব কেটেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্রি টিকিট নিয়ে বিজনেস ক্লাসে চড়ে তিনি স্বস্ত্রীক পাড়ি দিলেন ইউএসএ। আমেরিকা, গ্রাম, শহর ন্যাশনাল পার্কগুলি চষে বেড়াতে লাগলেন ছেলেদের দৌলতে। ভ্রমণের আনন্দে যেন মশগুল হয়ে গেলেন প্রৌঢ় মঙ্গলবাবু। ছেলে নতুন গাড়ি কিনেছে তাতে বসে তাঁরা চললেন, ওদেশের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে।
খরস্রোতা নদীতে পাহাড় কেটে কেটে, হাওয়ায় ক্ষয় হয়ে যাওয়া পাথরের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে আছে নানা রহস্য। সূর্য্যের আলোয় তার রং বদলাচ্ছে পাথরের ওপর প্রতিবিম্বিত হয়ে। ভারী সুন্দর দৃশ্য। ছেলে বলল - বাবা হেলিকপ্টারে চড়ে সফর করো, একেবারে ঐ ক্যানিয়নের নীচে ওপরে ভেতরে বাইরে - সব ঘুরিয়ে আনবে তোমাদের। আনন্দে বিগলিত হয়ে হেলিকপ্টারে পাইলটের পাশে গিয়ে বসলেন তিনি। স্ত্রী পুত্র পিছনে অন্য যাত্রীর সঙ্গে।
পাইলট আমেরিকান ভদ্রলোকটি ছিলেন ভীষণ রসিক। চালাতে চালাতেই গল্প শুরু করলেন, - কোথা থেকে এসেছেন - ভারতবর্ষ - দিল্লী শুনেই লাফিয়ে উঠল তার মন। বললেন আরে আমি তো আমার শৈশবের দশবছর ঐখানে কাশ্মীরি গেটের একটা গলিতে কাটিয়েছি। গলিটার নাম দেওয়া হয়েছিল - 'বেল সাহেবের গলি'। আমার দাদুর নামে।
চমকে উঠল মঙ্গলবাবুর সমস্ত সত্তা, এরকম একজন লোকের সাক্ষাৎ পেয়ে। যাদের দরজার সামনে তিনি ছোট বয়সে কখনও যাওয়ার সাহস পাননি, আজ তার পাশে বসে যাচ্ছেন তিনি।
পাইলট বললেন - তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু, তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী শিক্ষিত ইংরেজ আর্মি অফিসার। কিন্তু ১৯১৯ সালে যখন তাঁকে জেনারেল ডায়ার অমৃতসরে নিয়ে যেতে চান নিরীহ ভারতবাসীকে হত্যার উদ্দেশ্যে, তখন তিনি তাঁর কথা শুনতে চাননি, তর্ক করেন তাঁর বসের সঙ্গে - এটা অন্যায়, এটা পাপ, কিন্তু তিনি আজ্ঞাবাহী না হলেও তোমাদের দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক সরকারের খোসামুদে সিপাই প্রোমোশনের লোভে পড়ে চলে যায় অমৃতসরে এবং তাদের গুলিতে মারা যায় নিরপরাধ অসহায় জনতা। আমার দাদু তখন চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসে আমেরিকায়। এই দেশটাও কম যায় না ১৯৪৫ সালে বোমা ফেলে জাপানীদের দুই শহরে। মারা যায় কত লক্ষ নিরীহ মানুষ।
২০ মিনিট ঘুরে যখন ফিরে আসে হেলিকপ্টার তখন সম্বিত ফিরে পান তিনি। সুদূর ভারতবর্ষের সঙ্গে এই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বেল সাহেবের নাতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি মাটিতে পা দেন।
বেল সাহেবের গলির মালিকের সঙ্গে তাঁর ভাগ্য যে এমন জড়িয়ে যাবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
চলমান জীবনের স্রোত মানুষকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়। কোন মোড়ে যে আবার কার দেখা মেলে সে কথা কেউ জানতে পারে না। সবই ওপরওয়ালার অদৃশ্য লীলাখেলা - যার অর্থ খুঁজে পাওয়া ভীষণ দুষ্কর মানুষের পক্ষে।
এবারে ঐ পাইলটের সঙ্গে তিনি পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক বললেন - আমার এখনও ঐ বেল সাহেবের গলিতে ছুটে চলে যেতে মন চাই। ওখানকার কাজের লোকগুলোর সঙ্গে কুর্সিয়া গার্ডেনে যেতে ইচ্ছে করে। পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে কিন্তু আর যাওয়া হয়ে উঠল না।
মঙ্গলবাবু অনুরোধ করলেন, - "এসো না একবার দিল্লী, যদিও এখন সেখানে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হবে তোমার। সব পাল্টে গেছে। কাশ্মীরি গেটের বাগান মাঠ কিছুই নেই, সেখানে এক বিরাট বাস আড্ডা।"
তাই না কি? একবার শৈশবের খেলাঘরে দাদুর নামের ঐ গলিতে নিজের ছেলেদের নিয়ে যেতে ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ছেলেরা সব অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার সঙ্গে আমার ইচ্ছায় তাঁরা তো কোথাও যাবে না।
তুমি তো খুব লাকি, তোমার ছেলে এতো টাকা টিকিট কেটে দেশ থেকে ইউএসএ আনিয়েছে, হেলিকপ্টারে চড়িয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ঘোরাচ্ছে, নিশ্চয় এই রাস্তায় লস ভাগ্যাসও দেখিয়ে আনল। আর আমার ছেলে আজ কথা শোনে না।
মঙ্গল বললেন - হ্যাঁ, সত্যি ভগবানের অশেষ কৃপা যে বেল সাহেবের গলিতে ওয়ান রুম সেট ঘরে জন্ম নিয়েও আজ ছেলেদের দৌলতে সারা আমেরিকা চষে বেড়াচ্ছি। আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে মঙ্গলবাবু বলে যাচ্ছেন - জানো আমরা ইয়েলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কও ঘুরে এলাম।
সেই প্রৌঢ় পাইলট কিন্তু মঙ্গলের কথা শুনতে পাচ্ছেন না, সূর্য্যাস্তের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে মুখে বিড় বিড় করে বলছেন - "বেল সাহেবের গলি" কি সুন্দর নাম। আমার যে ঐ সরু রাস্তাটার জন্য বড় মন কেমন করছে। চোখের কোনায় জল চিক চিক করছে তাঁর।
এবার বিদায় নেওয়ার পালা। হস্তমর্দন করতে করতে তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, - তোমার ছেলে তোমাকে কত ভালোবাসে। আমার ছেলে আমায় ছেড়ে চলে গেছে। এখন শুনছি সে gun নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ড্রাগস্ মাফিয়াদের সঙ্গে জীবন কাটায়। বেল সাহেবের গলিতে থেকে তুমি ছেলেকে কত সুন্দর মানুষ করেছো আর এত ধনী সমৃদ্ধ দেশে এতো সব সুযোগ সুবিধা পেয়েও আমাদের সন্তানেরা কেন এমন বিপথে চলে গেল, বলতে পারো? You are lucky man you are fortunate -
বৃদ্ধ আমেরিকান পাইলটের আবেগে আপ্লুত কণ্ঠস্বরে ভারতীয় মঙ্গলবাবুরও চোখে জল এসে গেল। এ অশ্রু দুঃখের, আনন্দের না জয়লাভের তিনি বুঝতে পারলেন না।

কালু দাদা (Kalu Dada)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেনগুপ্ত বাবুদের গ্রামের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা সমস্ত দায়িত্বই কালুদার ওপর ন্যস্ত। তিনিই একাধারে ম্যানেজার, কৃষিকর্মের সঞ্চালক, পুকুরে মাছের চাষ, জাল ফেলার জেলে, ধবলী শ্যামলী গরুর পরিচালক রাখাল, বাগানের মালী, আবার বাড়ির শিশুদের মনোরঞ্জক। সুঠাম তার চেহারা। মনে হয় যেন দক্ষিণ ভারতের কালো কোষ্ঠি পাথরের কৃষ্ণ মূর্তি। সদা হাস্যময়, কাজ পাগল এক নির্ভেজাল মানুষ।

পূজোর সময় বাড়ি ভরে আত্মীয়স্বজন থাকেন, তাদের সকলের ভুরি ভোজন, শোয়ার ব্যবস্থা, ঘরদোর গোছানো, ধানের মারাই বাঁধা সবই নানান লোক ডেকে তিনি করান। কর্তা মা বা তাঁর ছেলেমেয়েদের কোনো চিন্তাই থাকে না।

এ বাড়ির বড় ছেলে ডাক্তার হয়ে জামুরিয়াতে কোলিয়ারির হাসপাতালে চলে গেছেন, কালুর তত্ত্বাবধানে মা, বৌ ও দুই বাচ্ছা রেখে। কালুদা ভীষণ খুশি। বাড়ির বড় বৌমা খুব ভোরে উঠেছেন।তুলসী তলায় গোবর লেপে, দরজায় আলপনা ঘট বসিয়েছেন তিনি। আজ ষষ্ঠীর দিন সকাল সকাল স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের টিপটা গোল করে আঁকছেন। বাচ্ছারা উঠোনে খেলা করছে। কাকারা কলা বৌ চান করাতে গেছেন ঢাক বাদ্যির সঙ্গে আনন্দ করে নাচতে নাচতে, কেউ গান ধরেছে-

‘আমার উমা এলো গো, চণ্ডীমণ্ডপ

আলো করে উমা এলো গো’।

হটাৎ দরজায় পিয়নদাদা এসে হাজির একটি টেলিগ্রাম নিয়ে। তখনকার দিনে ফোন আসেনি গ্রামে, ইলেক্ট্রিক ও ছিল না। এই “টরে টাক্কাই” ছিল একমাত্র জরুরি খবর পৌঁছানোর মাধ্যম। এতো সকালে কে করতে পারে টেলিগ্রাম। মনে হয় মেজোকাকার পরিবার জামশেদপুর থেকে কোন ট্রেনে আসবেন, তাই জানিয়েছেন। কালু টেলিগ্রামটা পিয়নদাদাকে পড়ে দিতে বলে। তিনি খুলে বললেন, “চান্ডিমন্ডপে গিয়ে এ বাড়ির দাদাদের হাতে দিয়ে এস গে তাড়াতাড়ি। আমার বয়স হয়েছে ভালো করে পড়তে পারছি না”। ওনার মুখটা দেখে ঘাবড়ে যায় কালু, ছুটে যায় বাইরে।

আর তারপর শুধু চিৎকার, হাহাকার, আর্তনাদ করতে করতে একে একে সবাই এসে জড়ো হতে থাকে বাড়ির উঠোনে।

– বড়দা, মানে মাত্র ২৩ বছরের তরুণ ডাক্তার ওই নির্জন কোলিয়ারির হাসপাতালে মাথায় জ্বর উঠে গিয়ে অর্থাৎ “ম্যানেঞ্জাইটিসে” মারা গেছেন, গতকাল রাতে। সমস্ত গ্রাম শোকে দুঃখে কাতর আর তাঁর ঊনিশ বছরের তরুণী স্ত্রী পাথর হয়ে গেছেন।

কর্তা মা তো পাগলের মতন করছেন – তাঁকে সামলানো যাচ্ছে না, দিন পনেরো পেরোলো না বৃদ্ধা মার্ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে গেলো, তিনিও দেহত্যাগ করলেন।

কাকারা সব কলকাতা, বোম্বে বা জামশেদপুর – যে যার কর্মক্ষেত্রে চলে গেলেন। বড় বৌমা, মানে শুদ্ধাচারিনী বিধবা মা ঠাকুরুণ ও তাঁর দুই ছেলে মেয়ে গ্রামেই থেকে গেলেন মতি পিসি, বাউরি বৌ ও কালুদার তত্ত্বাবধানে। শিশু সন্তান দুটিকে সারাক্ষণ বুকে আগলে রাখেন কালুদা। পুকুরে বন-বাদাড়ে যেতে দেন না। বাড়িতে কুঁয়োর জল তুলে চান করান। রোজ পাঠশালায় দিয়ে আসেন ও নিয়ে আসেন। বাগানে সবজি তুলতে, মেলা দেখাতে নিয়ে যান। মা ঠাকুরুণের হনুমান সে, সীতামাতার মতন মনে করেন।

দিন কাটতে থাকে, বছর ঘুরে যায়। কন্যাটি ডাগর হয়ে ওঠে। কাকা কাকিমারা নিয়ে যান তাকে কলকাতায়। অন্যান্য বোনদের সঙ্গে সে বিবাহযোগ্যা হয়ে যায় এবং অল্পবয়সেই সু পাত্রে তাকে পাত্রস্থ করেন তাঁরা। পাঠশালা শেষ করে গ্রামের স্কুলে ভাই পড়াশোনা করতে থাকে। শুদ্ধাচারিনী মায়ের সাথে সেও ওই আতপ চালের ভাত, আলু-কুমড়ো সেদ্ধ একটু গাওয়া ঘি মেখে খেয়ে নেয়। রবিবার দিন কালু দা উঠোনের একপাশে কাঠের উনুনে মাটির হাড়িতে ডিম সেদ্দ বসায়, বলে – “ভাই রে আজ তুমাকে হাঁসের ডিম খাওয়াবেক কালু দা”। বারো তেরো বছরের ভাই আনন্দে একেবারে গলে যায়। কালুদার গা ঘেঁষে বসে ঐ হাঁড়ির জল ফোটা দেখে, আর ভাবে কালুদাটা কত ভালো।

সত্যি এরকম অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে বোধহয় কেউ দিতে পারেনি। তাই সে কালুদাকেই তার জীবনের ‘কান্ডারী’ মনে করে। তার সঙ্গে থাকতে থাকতে কর্মঠ, সহিষ্ণু, নির্লোভ ও স্নেহশীল এক পূর্ণাঙ্গ কিশোর রূপে সে বেড়ে উঠতে থাকে। গরমের দুপুরে নামতা মুখস্ত করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়লে, কালুদা তাকে হাওয়া করে যায়, যতক্ষণ না তার ঘুম ভাঙ্গে।

রাত্রে দুটো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে জোরে জোরে পড়া করে সে। কাকা তাকে একটা গ্লোব উপহার দিয়েছেন। সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কালুদাকে দেশ চেনাতে থাকে। কালুদা অবাক হয়ে যায়। ইতিহাসের যুদ্ধ, বিজ্ঞানের ফোটোসিনথেসিস ব্যাপারগুলো গো গ্রাসে গেলবার সময় ভায়ের জন্যে গর্বে বুকটা ভোরে ওঠে তার। মা ডাকেন – ও কালু চা নিয়ে যা, সে চেঁচিয়ে উত্তর দে – “একটুকুন সবুর করুন গো মা, গাছগুলা অখনও সূয্যি দ্যাবতা থেকে আগুন নিয়ে মাটির রস ফুটায়ে খাবার বানাচ্ছে, সব বেতান্তটা শুনে নিয়ে যাব”।

মায়ের কাছে বসে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে আবার – “হ্যাঁ গো মা জননী – ইটা সত্যি বঠে? পাতার ভিতরে একরকম সবুজ সবুজ মশলা থাকে? আমরা যেমন লুন হলুদ দিই, গাছগুলাও কি উগুলা দিয়ে খাবার বানায়”?

মা ঠাকুরুণ বলেন – “হ্যাঁ রে বাবা ভাই যখন বই থেকে পড়েছে, তখন তো সব সত্যি। ওই থেকেই তো ফল ফুল হয়”। এরপর ভাই ম্যাট্রিক-এ প্রথম বিভাগে পাশ করলো। কালুর তখন সে কি আনন্দ। ধামা ধামা মুড়ি, বাতাসা, বাগানের আম বিলি করে এলো সে গ্রামের লোকেদের।

বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে ভর্তি হওয়ায় ভাই চলে গেল। টিনের বাক্সে জামাকাপড় গুছিয়ে তাকে ছেড়ে আসার পর কালু বলে বেড়ালো – “আমার ভাইয়ের মাথা ট তে কত্ত বুদ্ধি বটে, কত্ত বড় কলেজটাতে পড়ে।” পিতৃহারা সন্তানটির জন্য মা উদাস হয়ে বসে থাকলে তাকে আশ্বাস দেয় সে,- “উয়াকে লিয়ে আর ভাবতে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ, উ একদিন অনেক বড় কাজ করবেক।”

সত্যিই কালুর ভাইকে নিয়ে আর কাউকে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। আই এস সি পাশ করে সে চলে গেছে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং তারপর সেখান থেকে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার্থে। যেদিন সে চলে গেল, মা সেদিন সারাক্ষণ জপ আর পাঠে কাটাতে লাগলেন। তুলসী তলায় প্রদীপ দিতে এসে তাঁর খেয়াল হলো বিকালের চা দেওয়া হয়নি কালুকে। গরুর জন্য বিচালি কাটছিলো সে। কাটছে তো কেটেই যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কাঁধে ফেলে রাখা গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। নিজের দুঃখ হতাশায় কখনো তিনি কাবু হননি। আজ হবেন না সংযমের বাঁধ যেন না ভেঙে যায় তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা বড় গেলাসে চা করে বাটিতে মুড়ি নিয়ে ডাক দিলেন কালুকে, –

“মন খারাপ করিস না কালু, ওখানে তো ভাই পড়তে গেছে, কত জ্ঞান অর্জন করে বড় চাকরি নিয়ে ফিরে আসবে সে।”

পরেরদিন দুপুরে কালুর জন্যে রাঁধলেন কলাই ডাল, পোস্ত আর আমড়ার ঝাল চাটনি। কালু হাত চাটতে চাটতে বলল, – তুমার হাতের ব্যাজনটা যে খায় নাই, সেকি বুঝবেক উয়ার স্বাদ কি?” – বাটি থালা সব খালি হয়ে গেল এক নিমেষে। “আর একটুকুন দাও গো মা।”

তিনবছর কেটে গেল। সারা গ্রামে গুঞ্জন শোনা গেল, কালুর বিদ্বান ভাই মেম বিয়ে করেছে। বাড়িতে মায়ের কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ভিড় জমালেন। কেউ বললেন, – কী এই বিধবা মায়ের কাছে ম্লেচ্ছ বৌ আনবে? আমরা থাকতে তা কিছুতেই হতে দেব না। কেউ আবার পরামর্শ দিলেন – আপনি তো অর্ধেক সময় উপোস, পুজো আচ্ছা নিয়ে থাকেন, এবার অনশন ধর্মঘট করুন। আমরা সবাই অবস্থান ধর্মঘট করবো। এয়ারপোর্ট থেকেই ভাগিয়ে দেব ঐ মেমসাহেব কে। কেউ আবার এও বললেন – “এখানে যেমন ছেলেধরা থাকে, ওসব দেশে সেরকম মেয়েগুলো ছেলে ধরবার কাজ করে, এলে একেবারে এমন হেস্তনস্ত করব, পালাবার পথ পাবে না।” একটি ছোট মেয়ে টিপ্পনি কাটল, তার মা ঠাকুমার কথার খেই ধরে – “মেয়ের চোখে লংকার গুঁড়ো ছুড়ে দেব” – হাঁউ মাউ চাউ করে কেটে পড়বে রাক্ষুসীটা। বাঙালি ছেলেকে ধরার মজাটা টের পাবে তখন।”

কালুদা কিন্তু ভীষণ খুশি, তার ভাই বৌ নিয়ে বাড়ি আসছে, এর চেয়ে বেশি আনন্দের কি হতে পারে? বৌ কোন দেশের, কোন জাতের, কোন ভাষার বা কেমন দেখতে অতশত সাত পাঁচ ভেবে লাভ কি তার? ভাই যে ফিরে আসছে সেটাই তার কাছে সবথেকে সুখের কথা। ভাই নিজে যখন পছন্দ করেছে, তখন সেও যে ভাইয়ের মতনই সুন্দর মনের মানুষ হবে এটাই তার বিশ্বাস, তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোই তার প্রধান কর্তব্য।

শুরু হল বাড়িঘর পরিষ্কার করে সাজিয়ে সারিয়ে তোলার কাজ। শহর থেকে মিস্ত্রি আনিয়ে তৈরী হল সেপটিক ট্যাঙ্ক, পায়খানা, বাথরুম। ভাই তাকে এটি করার জন্য আগেও অনেকবার বলেছে কিন্তু মা ঠাকুরুণ সকাল সকাল নদীতে নাইতে যান, পুকুরে গিয়ে গা ধুয়ে আসেন আর পাঁচজন গ্রামের মহিলার সঙ্গে তাই এতো দিন কালুর খেয়াল হয়নি। কলাগাছ কেটে দরজার দুপাশে লাগলো, কুমোর বৌকে ডেকে মাটির ঘটে বসালো, গ্রামের পটুয়াকে দিয়ে ঘটগুলিকে উঠোনের পাশের আঙিনায় রেখে চিত্র অঙ্কন করলো। বামুনদিদির মেয়েদের দিয়ে চারিদিকে দালানে দাওয়াতে আলপনা দেওয়ালো। নাপিত বৌকে আলতা পরানোর বায়না দিয়ে এলো। সে কি ধুম লেগেছে তার। তাঁতির ঘর থেকে এলো নতুন নতুন চাদর। কবেকার পুরোনো বালিশ তোষক বিদায় নিল বাড়ি থেকে। তার হৈ চৈ করা দেখে গ্রামের সহজ সরল চাষী বাসী, জেলে, বাউরি, বাগদী বৌরাও এসে হাজির হল বাড়িতে। কায়েত গিন্নি, রায় বৌদি, সাহা কাকিমাদের বাড়ির এয়োদের ধরে আনলো বৌ বরণের জোগাড় করতে।

আত্মীয় স্বজনের কথা তীক্ষ্ণ বাণে জর্জরিত মা প্রথমে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে বৌকে কিভাবে আপ্যায়ন করবেন, কেউ নেমন্তন্ন খেতে আসবে কি না ভেবে পাচ্ছিলেন না। গ্রামের পন্ডিত, পরিবারের বয়স্ক লোকেদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এবার কালুর উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে তাঁর মনের মেঘ সব যেন দূরে কোথাও উড়ে পালিয়ে গেলো। ঘরে এলেন সেই বিদেশিনী। বৌকে ছেলে আগেই কাজ চালাবার মতো একটু আধটু বাংলা শিখিয়ে এনেছে। ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় বিদ্যাশিক্ষার আলোকে মেয়েটির মুখ জ্বল জ্বল করছে। মাকে পায়ে হাত দিতে নিচু হতেই বামুন দিদি ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন – “ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা বাছা, মাকে আবার এই অবেলায় চান করতে হবে।”

কালুদা রেগে উঠলো – “হলে হবেক। মা চান করবেক আর একবার, তা বলে বৌ এর পেন্নামটা লিবেক আবার নাই?”

ভাই বৌ নিয়ে চলে গেল তার কর্মক্ষেত্রে, একবছর পরেই ওদের কোল আলো করে এলো ফুটফুটে দেবশিশুর মতন এক কন্যা। বাবার মতন মুখ, মায়ের গায়ের রং। এখন বাড়িতে এলেই তার জায়গা হয় কালুকাকুর কোলে কাঁধে।

মেয়ে যখন তিন বছরের তখন ছয় মাসের জন্য ভাইকে আবার বিদেশ যেতে হলো কোনো ট্রেনিং এর জন্য। বৌ এবং মেয়েকে সে রেখে গেল, গ্রামের বাড়িতে কালুদার জিম্মায়। ঠাম্মার সঙ্গে ভালো ভাব জমবে বলে। সেই ছয় মাস বোধহয় কালুর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

মা তার বিদেশিনী বৌমা ও নাতনিকে কোনোদিনই অনাদর করেননি, কিন্তু পুজো পাঠ, বার ব্রত, একাদশী, নির্জলা উপবাস ভুলে গিয়ে সর্বদা বুকে টেনে আদর করতেও পারতেন না। তাই তাদের সবকিছু প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত ছিল ওই কালু। ছোট্ট সরস্বতীর মতন গৌরাঙ্গী তখন আদো আদো স্বরে কাকু কাকু বলে ডাকতে শুরু করেছে, কাকু তাকে কাঁধে নিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে সারা গ্রাম। পুকুরপাড়ে ছাগলের সঙ্গে খেলা করতে, বাগানে কাঠবেড়ালি তাড়াতে, জাল ফেলে মাছ ধরা দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগে। সকাল বিকেল গরুর দুধ দোওয়ানো দেখে তার শিশু মন অপার আনন্দে ভরে যায়। ধান ক্ষেতের আল ধরে কালুকাকু তাকে কাঁধে নিয়ে চলে। চাষী বন্ধুরা জমির কলাইশুটি, কুমড়ো, লাউ এনে হাতে দেয়। কালু এনে ঢেলে দেয় মা ঠাকুরুণের সামনে।

সহজ সরল, নির্ভেজাল এই মানুষটির সান্নিধ্যে ওই ছোট্ট কন্যাকে ছাড়তে তার ওই মা বা বৌদিমনি কারুর মনেই কোনো দ্বিধা আসে না। বিদেশিনী বৌমা ভাবেন, – নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন কত শহরে কতধরনের লোকের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন, কিন্তু এমন একজন নিখাদ সোনার মতন অতি স্বাভাবিক অথচ উচ্চ মানসিকতার মানুষ তিনি আর দুটি দেখেনি। যে কোনো বিষয়ে তার থ্যাংক ইউ বলা অভ্যেস। কালু জেনেছে মা ঠাকুরুণের কাছে তার মানে। একদিন হাসতে হাসতে বলে – “তুমার অতগুলা থ্যাংক্যু এই কালুর প্যাটে হজম হবেক লাই গো বৌ মনি। সন্ধ্যেবেলায় যখন যাব একেবারে বলে দিও। এতো মিষ্টি কথা শুনলে কালুর মনটা কেমন যেন আটুপাটু করে।” সেই থেকে ছোট মেয়েটাও শিখেছে – “আমার ও মনটা আটুপাটু করছে মা কালু কাকুর মতন। সবাই হেসে ওঠে তার কথা শুনে।

কিছুদিন পরে ভাই ফিরে এলো এবং কয়েকদিন খুব হৈ চৈ আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়ে ফিরে গেল রাঁচিতে তাঁর কর্মস্থলে। যাওয়ার আগে কালু দাদার জন্যে নিয়ে আসা একটি দামী ঘড়ি বেঁধে দিল তাঁর হাতে। প্রথমে সে তো লজ্জায় আবেগে গলায় নতুন কলার পড়া পোষা প্রাণীটির মতন হেঁসে নেচে গ্রামের সবাইকে দেখিয়ে এলো, তারপর আবার সেটি ভালো করে বাক্সে বন্দি করে বললে, – “হাতটা কনকনায় গেলরে ভাই, ইটা আমার কলাই রাখতে লারবেক (অর্থাৎ পারবেক নেই)। সূয্যির আলো ঐ উঠানে মারাইতে, পিয়ারা গাছে পড়লে উয়ার ছায়াতেই বুঝা যাই দণ্ড কত হল। ইটা অন্য কাউকে দিয়ে দাও ভাই।

ছোট্ট সরস্বতী তার কালো কেষ্ট ঠাকুরের কোল থেকে কিছুতেই নামবে না। জোর করে তাকে গাড়িতে বসিয়ে কালু দা বলল – “পরীর মতন মেয়েটাকে একটুকুন, সাবধানে রাখবে গো বৌরানী।” ভাই এবার তার হাতটা ধরে তাতে একটু চাপ দিয়ে বলল – “এবার খুব বড় বাংলো কোয়াটার পেয়েছি গো কালুদা, তোমাকে আর মাকে নিয়ে গিয়ে রাখব। বাগান করার মেলা জায়গা, তুমি লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে যা ইচ্ছে লাগবে।

– বটে বটে? ক্যানে যাবো নাই ভাই তুমি যিখানটায় লিয়ে যাবে শিখানকেই যাবো। মাঠাকুরুণ এই কালুকে ছাড়া থাকতে পারবেক নাই। লিচ্ছই যাবেক তুমার কালুদা।” সরস্বতী মাকে নিয়ে সে এই কয়মাস কুমীর কুমীর খেলত। কালু উঠোনে কুমীর হয়ে বসত তার ঐ শ্বেত পরী সিঁড়ি থেকে একটু নেমে তার আদো আদো সুরে বলল – “কুমীর তোর জলকে লেবেচি।” আধবুড়ো কুমিরটা তাকে ধরতে গেলে সে ছুটে সিঁড়ির উপর চড়ে যেত এক লাফে। আর তার সঙ্গে খলখলিয়ে হাততালি দিয়ে হাসি। বড় ভালো লাগতো কালুর।

ক’দিন ধরেই দেখছে বামুনপাড়ার কিছু মুরুব্বি আসছেন মায়ের কাছে। তারা দশজন মহিলাকে তীর্থ করতে নিয়ে যাবেন কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী। তারই তোর জোর চলছে। ভাই কে পোস্ট কার্ড লিখে অনুমতি আনিয়েছেন মা ঠাকুরুণ। কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করার কথাটা কেউ ভাবেনি। যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই হাঁউমাঁউ করে কেঁদে পায়ের কাছে বসে পড়লো কালু – “যেথ্যে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ। অতদূরে।”

মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন – তাঁর প্রৌঢ় শিশুটির দিকে। সত্যিই তো তার খুব ভুল হয়ে গেছে কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

“তুমি তো ঘরকে বস্যে বস্যে সারাক্ষণ পূজা পাঠে ল্যাগ্যে থাক্ক্য, উয়ারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বুলে, হাঁটা চলার অভ্যাস আছে। দোকানে বাজারে খাবার খাবেক, তুমি তো – ” কালুর কান্না দেখে মনে হচ্ছে যেন পিতা পুত্রী কে দূরে শ্বশুর বাড়ি পাঠাচ্ছে। কিন্তু এতো টাকা দেওয়া হয়ে গেছে – এতজনের সঙ্গে ট্রেন গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলেছে, গ্রামের অন্যান্য সব মহিলাও রাজি হবেন না মাকে ছাড়া যেতে। অতএব তীর্থ যাত্রায় বেরিয়ে পড়লো যাত্রীরা দলবল বেঁধে।

বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে। হরিদ্বার থেকে একটা পত্র এসেছে শুধু। কালু সেদিন বাগানে কাজ করছে। হটাৎ একজন এসে বললে – “ও কালুয়া তু এখনও ঘর যাস নাই রে? – দ্যাখ গা যা তোদের ঘরকে কত লোক আইছে।”

– “আরে অমন ভ্যাল ভ্যালায়ে তাকাই আছুস ক্যানে রে, খারাপ কিছু ঘটে নাই। গাঁয়ের মায়েরা তীর্থ করে ফিরত আইছে। তোদের উঠোনেই তো সব জড়ো হইচ্যে গো। বৌ বিটিরা উনাদের পেন্নাম করত্যে যাবেক নাই? তীর্থের ধূলা উনাদের পায়ে, ঘটিতে গঙ্গাজল। চল চল কালু জলদি চল। মোচ্ছব লেগ্যে যাবেক উখানে।”

কালু হন্তদন্ত হয়ে ঘরের কপাট গোড়ায় পৌঁছেই হতভম্ব একেবারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কিছুক্ষণের জন্য। এ কী চেহারা হয়েছে মা ঠাকুরুণের, অতসুন্দর সোনার প্রতিমা যেন শীর্ণকায় তামাটে আর সবচেয়ে দুঃখের বা কালুর কাছে আশ্চর্যের বিষয় মাথা ন্যাড়া। বামুনঠাকুররা ও তাঁদের আত্মীয় স্বজন খোল কর্ত্তাল বাজাচ্ছে, এতগুলি বিধবাকে চারধাম যাত্রা করানোর পুণ্যফল তাঁদের কোন খাতায় লেখা হচ্ছে কে জানে। কিন্তু কালুর ছায়া এরা মাড়ান না, তাই ভিজে গামছাটা কাঁধে থেকে কোমরে বেঁধে আবার ছুট লাগলো মাটি কোপাতে। বিকেল গড়িয়ে গেছে – কালু মাটিতে কোদাল চালাচ্ছে আর বলছে – “ইয়াকে আবার ধম্ম বলে? কচি বৌ টা বেধবা হতেই তার সব চুড়ি হার খুলে নিয়ে সাদা থান পরায়ে দিলেক। ইয়ারা ভদ্দর নোক বটে। ইয়াদের চ্যায়ে আমাদের ছোট জাতেই ভালো বিধবার বিয়াও হয়, তারা সব খায়ও। ধুস শালা তোদের অমন ধম্মের নিকুচি করেছে কালু।”

কদিন থেকেই শ্রাবনের জলধারা থামছে না। ভাই তো আসতেই পারছে না ট্রেন বাস ভালোমত চলছে না বলে। কালু হাটে গেছে। কিছুক্ষণ ধরে গরু দুটো বড় চেঁচাচ্ছে। মা তাড়াতাড়ি করে গোয়ালের পেছনে শুকনো খড় বের করতে গেলেন। হটাৎ কিসে যেন পা টা আঘাত পেয়ে কেটে গেল। ঘরে এসে খানিকটা গাঁদাপাতা লাগিয়ে দিলেন, একটা কাপড়ের ফালি ছিঁড়ে বেঁধে দিতেই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু পরদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না, পা ফুলে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। জ্বর এসেছে তাঁর।

কালু কবিরাজ মশাইকে নিয়ে এল, তিনি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, – “পা টা যে সেপটিক করে ফেললে বৌমা। কিসে কেটেছে নিশ্চয় লোহায়। তারপর তাঁর মধ্যে মাটি গোবর সব ঢুকেছে। এখানে তো ফেলে রাখা যাবে না, শহরে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ির ব্যবস্থা করো কালু।” কালু ছুটলো দিকবিদিক শূন্য হয়ে।

গ্রামে সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না। একটা বাসে চড়ে দুর্গাপুরে গিয়ে বোস বাবুদের ছোট বেটা যখন গাড়ি নিয়ে এল, তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে।

মায়ের শরীরে ‘ধনুষ্টঙ্কার’ রোগ গোটা দেহটাকে বেঁকিয়ে দিচ্ছে। পাশের গ্রামের ডাক্তারবাবু এসে ইনজেকশন দিয়েছেন। জীবনের এতগুলো বছর যে কালু মাকে ছুঁয়ে প্রণাম করেনি, আজ সে মাকে চেপে ধরে বসে আছে। যন্ত্রনায় শরীরটা দুমড়ে যাচ্ছে, কাতরাচ্ছেন তিনি। কালু বলছে – “ভাইকে তার করে দিয়েছে, সে চলে আসবেক বাঁকুড়া হাসপাতালে।”

ঠিক গাড়ি ছাড়বার আগে মা একবার কোনওরকমে চোখ খুলে কালুর দিকে তাকালেন। অতি কষ্টে বলতে পারলেন, “গরুটার বাচ্চা হবে কালু ওকে ছেড়ে…” – কথাটা শেষ হবার আগেই তাঁর শিরদাঁড়ায় যন্ত্রনা শুরু হলো, শরীর আবার বেঁকে যেতে লাগলো তাঁর। দুজন দুদিক দিয়ে ধরে আছে তাকে গ্রামের দুই কাকা, ড্রাইভার কে বললেন একজন – “তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও গো ভাই। বর্ষাকাল, রাস্তাঘাটও ভালো নয়। বাঁকুড়া সদর হাসপাতাল তো আর এখানে নয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাবে।”

মায়ের কথা আজ পর্যন্ত কালু অমান্য করেনি, মা তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন না, দুঃখে অভিমানে হতাশায় হতবুদ্ধি হয়ে কালু বসে পড়লো রাস্তার ওপর। পাঁচসিকে মানসিক করলো মা দুর্গার কাছে। ভগবান, ঠাকুর দেবতা কিছুই সে জানে না, মানেও না, কিন্তু তার মনে হল, গাঁয়ের লোকেরা তো মানসিক করে পুজো ও চড়ায় মা ঠাকুরুণ ভালো হলে তাকে সে ও ঘরে একটা বড় রকম “মোচ্ছব” করবে। চারদিন পরেই খবর এল, তার মা ঠাকুরুণ আর এ জগতে নেই।

সারা গ্রামের বিধবা সধবা কচিকাঁচার দল যারা দুপুরবেলায় রোজ আসতো এই ঘরের বড় বারান্দায় মা ঠাকুরুণের রামায়ন বা মহাভারত পাঠ শুনতে, তারা সবাই এসে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে বাড়ির উঠোনে। চন্দনের তিলক কাটা যে বোষ্টম-বোষ্টমী রোজ প্রভাতে এসে “রায় জাগো – রায় জাগো” বলে গান শুনিয়ে যেত তারা ফকির, বাউল, শ্মশান ঘাটের কালী সেবক লাল সিঁদুরে টিপ আঁকা, – কেউ বাকি নেই। ভজা পাগল যখন তখন এসে “খেতে দিবি নাই” বলে ডাক ছাড়তো, সেও হাঁকডাক করতে করতে ঘরে ঢুকেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে গোয়ালে গিয়ে চিৎকার জুড়েছে, “আই শালা কালু বল তোর মা কুথায় পালাইছে, অখন আমায় খ্যাতে কে দিবেক।” পাড়ার আত্মীয় স্বজন ছেলে বুড়ো বৌ ঝি রা কাঁদছে হাউহাউ করে। কালুর চোখে শুধু জল নাই। সে তো বিশ্বাসই করেনি এখনও তার দেবী মা আর কখনো আসবেন না। ওদিকে গরুর প্রসব বেদনা উঠেছে, কালু মন দিয়ে তাকে দেখাশুনা করতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে।

মায়ের শ্রাদ্ধ গ্রামেই হবে। তাই স্বস্ত্রীক কন্যা সহ ভাই এসেছে রাঁচি থেকে। কালুর তো কারুর সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। কাঙালি ভোজনের জোগাড় করা থেকে শুরু করে নিয়ম ভঙ্গের দিন পর্যন্ত জ্ঞাতি গুষ্টির মৎস মুখ করতে পুকুরের মাছ ধরা সবই তার দায়িত্ব। এ সময় একবার ও তার ভায়ের সঙ্গে কথা হয়নি, মনে মনে রাগও পুষেছে সে, “ঘরের নকখী (লক্ষী) চল্ল্যে গেলেক, আর ইয়াদের খাওয়া দাওয়ার ধুম লাগাইছে। পন্ডিতগুলা খাট, বিছানা, ছাতা লিয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে চলছে যেন – শালা ঘরের জামাই বটে। ছ্যা ছ্যা ইটা তুমাদের কোন ধম্ম কেউ বলতে পারবেক এই মুখ্য সুখ্য কালুকে?” আত্মীয় স্বজন সবাই চলে যাবার পর “স্বরস্বতী পরীকে” নিয়ে খেলা করছিলো সে, নতুন বাছুরটাও বড় সুন্দর – মনটা হালকা হল শিশুর সঙ্গে খানিকক্ষণ কাটিয়ে। ভাই ডাকলেন খুব মায়াময় স্বরে।

“কালুদা একটু কাছে বসো।” হাতে তার কতগুলো কাগজ। – “এটা রাখো তোমার কাছে যত্ন করে।” – “কি বটে ভাই ইটা? আমাকে দিতে হবেক নাই, হারাই যাবে, তুমার ঠায়ে লিয়ে যাও।”

– না গো কালুদা, এটা তোমার। আমাদের জমি, পুকুর, বাগান আমি সব তোমার নাম করে দিয়েছি। বসত বাটিটা থাক, কাকার ছেলেরা পূজোর সময় এসে থাকবে।

– “ক্যানে ভাই?”

-“তাহলে তোমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তাই। আর তোমাকে বলার সময় পায়নি, আমরা এ দেশে আর থাকছি না। অনেক বড় চাকরি পেয়েছি, বৌমনিও তোমার ডাক্তারি পড়তে ঢুকবে। আমরা আমেরিকায় চলে যাচ্ছি।” কথাটা শেষ করতে দিলো না কালু। তার চোখে তখন বিদ্যুতের ঝলক। ভীষণ জোরে একটা বাজ পড়ার মতন আওয়াজ করে সে চিৎকার করে উঠল – “আমার চাই নাই গো, তুমরা সবাই আমাকে ফ্যালে চল্যে যাব্যে? কার ল্যাগে ই গুলা আগুলে কালু পড়ে থাকবেক?

কাল বৈশাখীর ঝড়ের মতন ভীষণ শন শন হওয়ার বেগে কালু দরজা খুলে ছুটে পালিয়ে গেল, একবারও তাকালো না পিছনে ফিরে।