দিদি

চন্দনা সেনগুপ্ত

‘জননীর প্রতিনিধি’ – কর্মভারে অবনত – অতি ছোট এক ‘দিদি’কে নিয়ে রবিঠাকুর যে ছোট্ট কবিতার মধ্যে এক অববদ্য তথ্য ব্যক্ত করেছেন, তা পড়ে বিশ্বের সমস্ত ভগিনীর প্রতিচ্ছবি পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

প্রত্যেক গৃহে আমাদের বাংলায় শুধু নয়, ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে লক্ষ লক্ষ বোন ও দিদিরা তাঁদের ভাই-বোনদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কর্ত্তব্য পরায়ণতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। মাতা-পিতার সঙ্গে সঙ্গে বড় দিদিদের আন্তরিক আদর যত্ন ও আত্মত্যাগের বহু উজ্জ্বল কাহিনী আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত রূপে হাজির হয়।

পূর্ণিমার আলো যেমন এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায় রাত্রির অন্ধকারকে শুভ্র জোছনায় ভরিয়ে দেয়, পরিবারে একজন বড় দিদি থাকলে তার স্নেহ মমতায় ছোট ভাই-বোনদের জীবনেও ঠিক সেইরকম কোমল পরশ বুলিয়ে দেয়।

মায়ের হাতে হাতে কাজ করা, বাবার ছোটোখাটো সব প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা, ভাই-বোনদের স্নান, খাওয়া, পড়ানো, পোশাক-পরিচ্ছদে সাজানো, খুব দুধের শিশুদের কোলে পিঠে নিয়ে ঘোরা, ঘুম পাড়িয়ে তবে দিদির ছুটি হয়।

গরীবের ঘরে বাসন মাজা বা কাপড় কাচা, রান্নায় সাহায্য করা সবই দিদিরা করে থাকে। ধনী পরিবারেও দিদি লক্ষ রাখে ভাইটির রেজাল্ট ভাল হওয়া বা চারিত্রিক গঠনের প্রতি। বাবা – মা তাঁদের অর্থ উপার্জন বা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় দিদি খেয়াল রাখে ভাই – বোন কি ধরণের বন্ধুদের সাথে মিশছে, কোন পথে যাচ্ছে। তার স্বভাব ও অভ্যাস ভাল হচ্ছে কিনা। স্কুলে, কলেজে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঠিকমত আচার আচরণ করছে কিনা। দিদির দায়িত্ব পরিবারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 সারু দিদি

মায়ের বাড়ি ছিল, বাঁকুড়া জেলার জয়রাম বাটিতে। তাঁর দরিদ্র পিতার দেহাবসানের পর ছোট ছোট ভাইদের রক্ষণাবেক্ষনের ভার তিনি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন। ছোট ভাই অক্ষয়কে ডাক্তারি পড়তে কলকাতায় পাঠানো হয়, কিন্তু তরুণ বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে ঘরে অল্প বয়সী ভাতৃবধূ তখন অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুতে সে পাগল হয়ে যায়। তাঁর কন্যা জন্মায় সেই রাধিও প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে থাকে। সারদা-মা অতি ধৈর্য্য সহকারে তাদের লালন পালন করতে থাকেন। একদিকে তাঁর সাধক স্বামী ও অন্যদিকে ছোট ভাইয়ের সংসার। সমান সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দুইদিকেই সামাল দিতে থাকেন। গ্রামের অন্য ভাইরা আবার ক্রমশঃ স্বার্থান্বেষী হয়ে ওঠে। মা কে কষ্ট দিতে থাকে। নিজেদের মধ্যে জমি জমা নিয়ে লাঠালাঠি মারামারি করতে থাকে। মা কত বোঝান কিন্তু তারা কথা শোনে না। দিদির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মা যে কত ভাবে হেনস্থা বা অপদস্থ হন, কষ্ট ভোগ করেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। নিজে এত বড় একজন মহীয়সী মহিলা, সাধিকা তথা বিবেকানন্দের মতন শিষ্যদের মা হয়েও বড় বোনের কর্ত্তব্য পালনে তিনি কোন ত্রূটি করেননি। ভাইয়ের মেয়েদেরও তিনি বিয়ের ব্যবস্থা করেন, বিপদে আপদে সাহায্য করা অথবা প্রয়োজন হলে দুঃখী ভাইঝিদের নিজের কাছে এনে রাখার ব্যবস্থা করে চলেন নির্ধিদ্বিধায়।

তাঁর মতন অসামান্য দিদির চরিত্র আমাদের মাথা নত করে দেয়। ভাইয়েরা বা তাদের পরিবারগুলি তাঁর দেবীত্ব মহানুভবতা উদার ভাবটি তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণের জ্ঞানী, তপস্বী শিক্ষিত সন্তানদের তিনি সংঘ জননী নন, দীক্ষা দাত্রী গুরুমা ছিলেন। গ্রামের মানুষেরা কিন্তু সেই সারু কে অসাধারণ এক দিদি বলেই জানে।

এই ধরণের নিরাসক্ত ঠাকুর ভক্ত – স্বাত্তিক ভাবাপন্ন মহিলাদের অবদান আমাদের সমাজে অনেক পরিবারেই পাওয়া যায়। “শ্রী শ্রী মা সারদা” তো এঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্টা।

মাধবীলতা – বড়দি

আমার বাবার বয়স যখন মাত্র দুই/আড়াই বছরের তখন তাঁর মা মারা যান তাঁর বড়দিদি মাধবীলতা তখন মাত্র ১৩ তে পা দিয়েছেন এবং ১৯ বছরের স্বামীর মৃত্যুর পর বাপের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। বাবা ডাক্তার পূর্ণচন্দ্র কিন্তু আর বিয়ে করেননি। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে মাধবীলতার থেকে ছোট।

নিরামিষী আহারে অভ্যস্ত সাদা থান পরা, সেই মেয়েটি তার চারটি ছোট ভাই-বোনের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বাবা ডাক্তার। সাঁকতোড়িয়া হাসপাতালে রুগীদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়ে যখন বাড়িতে আসেন তখন পুজো-পাঠে মন দেন। ছেলেদের পড়াশোনা দেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। বড় মেয়ে তাদের যত্ন ও দেখাশোনার ভার নেওয়ায় পিতা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন। 

ধীরে ধীরে ভাইরা বড় হয়ে উঠতে থাকে, ছোট বোন দুর্গার বিয়ে দেওয়া হয় এক তরুন ডাক্তারের সঙ্গে কিন্ত সে ও দিদির মতই খুব অল্প বয়সে স্বামী কে হারিযে ঘরে ফিরে আসেন,তার জীব্নে ও এই দিদি মাযের মতন স্নেহ দিযে তাকে সন্গ্রাম করতে সাহাজ্য করেনl  বড় ভাই ডাক্তার, মেজো ভাই কোলিয়ারীতে বড় ইঞ্জিনিয়ার ও ছোট ভাইটিও ডাক্তার হয়ে বিবাহযোগ্য হন। দিদি ভাই-এর বৌদের হাতে সংসার তুলে দেন। বাবার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ ভাবে সংসারের দায় হতে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং ঠাকুর ঘরের গিরিধারীর পূজা অর্চনায় তাঁর সময় কাটান।  সংসারের প্রতি এই মোহহীন ‘সাধিকা’ দিদিকে পরে সবাই ‘ঠাকুর ঘরের দিদি’ আখ্যা দেন। এরকম অনেক সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়েও অসাধারণ নিরাসক্ত কামকাঞ্চন ত্যাগী নারী চরিত্র আমাদের শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থে আমরা বহু পেয়ে থাকি।

ভগিনী নিবেদিতা

এই বিদেশিনী দিদিকে সবাই Sister Nivedita বলেই জানে, বাঙ্গালী বোনেদের জীবনে তিনি আসেন, জ্ঞানের আলো জ্বালাতে। বিবেকানন্দ, ও শ্রী শ্রী মায়ের কৃপা লাভ করে, এই মহিয়সী নারী আপন দিদির মতন যত্ন নিয়ে তার বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিধবা ও অসহায় বহু কন্যা শিক্ষা লাভ করে ধন্য হন, এখনও সেই স্কুল কত সন্ন্যাসিনী মাতাজীদের তৈরী করে সারদা মঠে পড়া লেখার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নারীকে আদর্শের ও মূল্যবোধের পাঠ পড়াচ্ছেন। দেশে প্লেগ মহামারী এলে নিজের প্রান তুচ্ছ করে মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতে দ্বিধা বোধ করেননি, এই রকম দিদি পেয়ে আমরা মুগ্ধ্য হয়েছি।

অন্ত্যোদয় আশ্রম (Antyodoy Ashrom)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে,

পরশমনির খোঁজে যখন

এধার ওধার ঘুরে বেড়ায় মন,

সংসারের সংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে পড়ে জীবন

তখন –

আমার এই অন্ত্যোদয় আশ্রমে

পদার্পন।

শিশুর মহা মেলায়, সেখানে লুকিয়ে আছে –

অনেক অমূল্য ধন।

‘বলরাম করণে’র মতন একজন অসাধারন

নির্ভেজাল, অকৃত্তিম উদার

মানুষের পেলাম দর্শন।

তাঁহার কর্মযজ্ঞে – করতে গিয়ে –

আত্ম – নিবেদন

আমার হৃদয় মুগ্ধ হল,

প্রাণ আনন্দে মগন

আজ সকলকে সেই কথা ভাই

করতে চাই গো বর্ণন।

শুনুন তবে দিয়া মন,

হৃদয়বান জনগণ।

 

অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম

 

অন্ত্যোদয় – ‘অন্ত্য থেকে উদয়’ নামটি বলরামের যখন মনে আসে, তখন তার বয়স মাত্র – পঁচিশ। ১৯৯৬ – ১৯৯৭ সালে আস্তাকুঁড় থেকে খাবার খুঁড়ে খাওয়া, চায়ের দোকানে পিতা মাতা হারানো ছেলের পরিশ্রম, অসহায়তা – নির্মম মালিকের হাতে নিপীড়িত, গরম ছ্যাঁকা খাওয়া, আত্মীয় স্বজনের প্রহার বা অত্যাচার সহ্য করতে না পারা, পথে পরে থাকা দুঃখী মেয়েদের ক্রন্দন, সহ্য করতে না পেরে একেক করে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসতে থাকে। তখন তাঁর সব আত্মীয় স্বজন, ভাই বোন বন্ধুরা আশ্চর্য্য হয়ে যান। এতগুলি শিশুর ভরণ পোষণ করতে গিয়ে দেনার দায়ে তাঁর কিছু জমি এবং ওষুধের ছোট দোকানটিও বিক্রি হয়ে যায়।

তবে তাঁর স্ত্রী ছবি ও তিন কন্যা ময়না, চায়না, মনি এবং পরে তাদের তিন জামাতা তাঁকে এই আশ্রমটি গড়ে তুলতে, বড় করতে এবং পরিচালনা করতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। আর একজন পরম আত্মীয়া শ্রীমতি অলকা করন এসে বিদ্যালয়টির ভার সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে তুলে নেন। গ্রামের কিছু শিক্ষিত উদার মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তির সহযোগিতা ও অবদানের কথাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন।

২০০৪ সালের ১৬ই জুন আনন্দবাজার পত্রিকায় একটা লেখা চোখে পড়েছিল, ‘ঘরে ঘরে লক্ষীর ভাঁড় রেখে মুষ্ঠি ভিক্ষা করে’ একজন তরুণ যুবক কিছু পথ শিশুকে বাঁচিয়ে একটি ‘অনাথ আশ্রম’ তৈরী করেছেন। সেই বাচ্চাগুলোর ছবি বেরিয়েছিল, অত্যন্ত করুন সেই দৃশ্য। শীতের দিনেও গায়ে জামা নেই তাদের, আগুনের সামনে গোল করে বসে তারা হৈ হল্লা করছে। সাংবাদিক সুব্রত গুহ মহাশয় জানিয়েছিলেন তারা মুড়ি খেয়ে জীবন ধারণ করছে। ওদের ত্রানকর্তা রাস্তার থেকে তুলে এনে প্রাণ বাঁচিয়েছেন, কিন্তু নিজের বাচ্চাদের সঙ্গে তাদেরও অন্নের জোগাড় করতে গিয়ে সেই ‘বলরাম করন’ এখন দিশেহারা হয়ে গেছেন।

এই খবরে অনেক পাঠকেই অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ওই উদার যুবকের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। প্রথম যিনি ‘বলরামের’ খোঁজে লোক পাঠান, পূর্ব মেদিনীপুরের পাউশি গ্রামে। তিনি জার্মানি প্রবাসী স্বর্গীয় বিমল রায়। বলরাম তাঁর কাছে ছুটে যান, সাহায্যের আশায়, তিনি তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসাবার বদলে ধমকের সুরে বলে ওঠেন, – “তুমি কি পাগল? যদি খাওয়ানোর ক্ষমতা না থাকে, তো এতগুলো বাচ্চাকে পথ থেকে তুলে এনেছিলে কেন?”

বলরাম তো হতভম্ব। ‘এ কী রে বাবা গ্রাম থেকে ডেকে আনলেন, – তাঁকে এইভাবে ভর্ৎসনা করবার জন্যে’, ভাবছে সে। মুখে কথা সরছে না। তখন তিনি নরম হয়ে জানালেন, – যে তিনিও একদিন অনাথ অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়ে পথে নেমেছিলেন, বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তাই আজ এই শিশুগুলির জন্য কিছু করতে চান।

এরপর তাঁর বদান্যতায় অনাথ আশ্রমের বাড়ি, ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা হোস্টেল এবং যদি কোন সজ্জন ঐ আশ্রমের শিশুদের জন্যে কোনও কাজ করতে, ট্রেনিং দিতে যান, তাদের জন্যে একটি সুন্দর অতিথিশালা তৈরী হয়ে গেল একবছরের মধ্যে।

আনন্দবাজারের এই খবরটি কলকাতা, দিল্লী থেকেও অনেক মানুষকে বলরাম করনের কাছে টেনে নিয়ে আসে। তাঁদের মধ্যে যেমন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের কোনও জেনেরাল ম্যানেজার আছেন, তেমনি লন্ডনের কোন ডাক্তার, হাওড়ার লোহা ব্যবসায়ী, অথবা অতি সাধারন শিক্ষক শিক্ষিকা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক অফিসার কিম্বা কর্পোরশেনের দলবদ্ধ দায়বদ্ধ সংস্থা, ব্যারাকপুরের মহিলা সমিতি – বহু সমাজ সেবী আছেন।

যাঁরাই এখানে এসেছেন, তাঁরাই বলরাম ও তার তিন কন্যা, স্ত্রী ও অন্যান্য সহৃদয় আত্মীয় বা গ্রামবাসীদের আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। এখানে পাউশি গ্রামটির অপূর্ব শ্যামল সবুজ পরিবেশ, নদী, পুকুর, বাগান, সব্জির চাষ, আগত মানুষের হৃদয় কেড়ে নেয়। আর সঙ্গে বাচ্চাদের অপূর্ব কল – কাকলি, নাচ, গান, নাটকের মহড়া, খেলাধুলা, পরবর্তীকালে, সরস্বতী পুজো, দুর্গাপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী সব অনুষ্ঠানে আগ্রহ দেখে অতিথিরা অত্যন্ত আকৃষ্ট হন। তাঁরা এই আনন্দলাভের খবরটি মুখে মুখে এবং পরে – ফেসবুক, ইন্টারনেট, ইউটিউব অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও বহু লোকেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তাঁদের এখানে আসতে অনুরোধ জানায়। বিদেশ থেকেও কোনও কোনও ছাত্র ছাত্রী অধ্যাপকের দল এসে ঘুরে পরিদর্শন করে যান অন্ত্যোদয় আশ্রমটি।

ইতিমধ্যে বলরাম করনকে নানান সম্মানে ভূষিত করেন সরকারি বেসরকারি নানান সংস্থা, “দাদাগিরিতে” আহ্বান জানান সৌরভ গাঙ্গুলি। জেলাশাসকবৃন্দ যে যখন আসেন বলরামের আশ্রমের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতারই – প্রিয় মানুষ এই বলরাম। প্রথমে সি পি এম দলের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ থেকে শুরু করে পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেস বা ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী বা নেতারা সবাই তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে এম এল এ, এম পি রা সকলেই একবাক্যে বলরামের অবদান শিকার করেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ এটাই যে, তিনি প্রকৃত সমাজ সেবক কোন রাজনীতি মতবাদ আঁকড়ে নিয়ে নয় ঐ শিশুগুলির জীবনের উন্নতি সাধনে, বছরের পর বছর তাদের নানা ভাবে নানা ক্ষেত্রে সাহায্য করে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাতেই দিন রাত প্রাণপাত করেন। যে সব কন্যারা ১৮ পার হয়ে যায়, দায়গ্রস্থ চিন্তিত পিতার মতন তাদের জন্য পাত্র খুঁজে বেড়ান। বিভিন্ন বড় মানুষের কাছে ভিক্ষা করে তাদের পাত্রস্থ করেন, পরে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া এমনকি জামাইষষ্ঠীর দিনে নেমন্তন্ন করে স্নেহময় শ্বশুর পিতার ভূমিকা পালনেও উদ্যোগী হন।

যে সব মেয়েরা আরও পড়াশুনো করতে বা নার্সিং ট্রেনিং-এ যেতে চান, যতদিন না তারা চাকরী পাচ্ছেন ততদিন তাদের ব্যয় ভারও বহন করতে দ্বিধা করেন না। ছেলেদের নানা ধরনের ট্রেনিং ITI শিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। যারা পড়াশোনায় ভালো তাদের গ্রাজুয়েশন করিয়ে তবে শান্ত হন। শুধু যে আশ্রমিক ছাত্র-ছাত্রী শিশুদের প্রতি তার কর্ত্তব্যবোধ প্রকাশ পায় তা নয়, যারা এখানে কাজ করছেন, বাচ্চাদের দেখাশুনো প্রতিপালনে সাহায্য করছেন, – বাগানে সব্জি ফলাচ্ছেন বা চিংড়ি অথবা মাছের চাষ করছেন, তাঁদের প্রতিও তাঁর অসীম দরদ। কারো অসুখ বিসুখ হলেও বলরাম করন তাদের চিকিৎসা বা সেবার বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেন না। কর্মীবৃন্দের বেশিরভাগ মহিলাই অসহায় স্বামীহারা। এঁদের পিতৃ পরিত্যক্ত অসহায় সন্তানেরাও বলরামের নিজের তিন কন্যা ও এক পুত্রের সঙ্গে সমভাবে লালিত পালিত হন। তারা বড় হয়ে কেউ উবের ওলা গাড়ির মালিক, চালক, কেউ অন্য কোনো হাতের কাজ শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েরা এখন বলরামকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আর এইসমস্ত দায়িত্ব পালন করতে তাঁকে সাহায্য করে যারা এই আশ্রমের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করে চলেছেন, তাঁরাও যেন ধীরে ধীরে আশ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। কেউ মা, বাবা, কেউ জ্যেঠু, কাকু, পিসিমনি, মাসিমনি, দিদিভাই, দাদাভাই হয়ে নিজেদের ঐ আশ্রমের সুখে – দুঃখে প্রত্যেক পর্বে নিজেদের যুক্ত করে ধন্য বোধ করছেন। আশ্রমিকদের ঐ মিষ্টি মধুর সম্বোধন তাঁদের বলরামের নিকট আত্মীয় – স্বজন, প্রিয় বন্ধু তথা শুভাকাঙ্খী হয়ে বাঁচার অধিকার এনে দিয়েছে।

দিঘা মন্দারমণী অঞ্চলে প্রায় ঝড় ঝঞ্ঝা বা বন্যায় অনেক গ্রাম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। গত কয়েকবছরের মধ্যে নিশা, আমফান, যশ ইত্যাদি ঘূর্ণি ঝরে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। তখন বলরামের পাশে এসে দাঁড়ায় ঐসব প্রাক্তন ছাত্রের দল। ত্রাণকার্য্যে তাদের অবদানে গ্রামবাসীরা উপকৃত হন।

অতি ছোট ছোট শিশুগুলি দূরের পাঠশালায় যেতে পারবে না বলে বলরামবাবু তাঁর স্বর্গত পিতার স্মরণে ঐ আশ্রমেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলেন। “খগেন্দ্র শিশু নিকেতন”। গ্রামের কিছু শিক্ষিত তরুণ তরুণী অতি সামান্য হাত খরচের অর্থ গ্রহণে সন্তুষ্টি হয়ে সুন্দর ভাবে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে থাকেন। বর্তমানে সেটি সরকারের অনুমোদন লাভ করে এবং শিক্ষকের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পায়। এছাড়া গ্রামের অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা, দুস্থ পরিবারের মেয়েদের ‘সমূহ-বিবাহ’ অনুষ্ঠান করাও তাঁর বিশেষ সৎকর্ম রূপে চিহ্নিত করা যায়।

 

গত সতেরো বছর ধরে আমি এই অন্ত্যোদয় আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রী আশ্রমিক কর্মীবৃন্দ, করন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রতিদিনের সংগ্রামের এবং প্রতিনিয়ত সহৃদয় ব্যক্তিদের দয়া-দাক্ষিণ্যে জীবন ধারনের লড়াই – সম্পর্কে অবগত আছি। ২০০৪ থেকে ২০২১ এর জুন মাস পর্যন্ত তাদের জীবনের মান অনেকটা উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘কোভিড’ ১৯ এর ‘মহামারী’ পৃথিবীর সব দেশ, জাতি ও সমাজের সবকিছু ওলোট পালট করে দিয়েছে।

যেসব সংস্থা নিয়মিত ভাবে আর্থিক আনুকূল্য দান করে এসেছেন তাদের অনেকেরই নিজেদের কাজ – কর্মও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। যে সব অদূর ও সুদূর প্রবাসী অতিথি শুভাধ্যায়ী প্রত্যেক বছরে নানা ভাবে আশ্রমে এসে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, তাদের সন্তানের জন্মদিন, বিবাহ অনুষ্ঠানে অকারণে আড়ম্বর – বিলাসিতা বর্জন করে এই শিশুদের মাঝে উপস্থিত হয়ে তাদের জন্যই ব্যয় করতে ভালোবাসতেন, তাঁরাও লকডাউন-এর জন্য এখন প্রায় ২ বছর ধরে আসতে পারছেন না। মন্দারমণী, দিঘা ভ্রমণের সঙ্গে এই আশ্রমের মনোরম শিশু উদ্যানে অবসর কাটিয়ে যেতে আগ্রহী হতেন কিছু ট্যুরিস্ট, তাঁরাও এই দুবছর গৃহবন্দী। যে সব বিদেশী ছাত্র সমাজ বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ পাঠ নিতে বলরামের অনুমতি নিয়ে এই সুন্দর অনাথালয়ে শিশুদের সঙ্গে কিছুদিন মূল্যবান সময় কাটিয়ে যাবার সুযোগ পেতেন এবং বাচ্চাদের প্রতিভা অনুযায়ী কখনও রোবট বানানো, কখনও কম্পিটার ট্রেনিং দিতে সক্ষম হতেন, তারাও এখন অনুপস্থিত। কিছু শিক্ষিকা এখানে এসে মহানন্দা গেস্ট হাউসে (বিমল রায়ের মায়ের নামে নির্মিত) বাচ্চাদের পড়াশুনো, সংগীত, নৃত্য, সেলাই – ফোঁড়ায়, ক্রাফটের কাজ ইত্যাদি শেখানোর মধ্যে দিয়ে নিজেরাও আনন্দ পেতেন এবং অনাথ শিশুগুলির জীবন রামধনুর সাতটি রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যেতেন তাঁরা সব যেন আবার আসতে পারেন। তাদের সমবেত প্রচেষ্টা অন্ত্যোদয়-এ মানুষ গোড়ার কারখানায় – শিবজ্ঞানে জীব সেবায় আরও বহু মানুষের আগমন হোক – বলরামের থেমে যাওয়া প্রজেক্টগুলি আবার সুচারু রূপে নব নব সৃজনশীলতায় কার্যকরী হোক – এই আমাদের মতন শুভাকাঙ্খীদের একান্ত কাম্য।

এই আশ্রমের প্রতিটি তৃণ, ফুল বা ফলের গাছ, জল টলটলে পুষ্করিণী, শুদ্ধ হাওয়া, বলরাম সহ সব শিশুদের আন্তরিক ভালোবাসা ও আতিথেয়তায় আমরা ধন্য ও আপ্লুত হয়ে – এই লেখনীর মাধ্যমে আরও অনেক শিল্প প্রেমী ও সমাজ সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই আপনাদের পত্রিকায় এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে। শুধু অর্থ সাহায্য নয় – এমন অনেক লেখক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, চলচিত্র অভিনেতা আছেন, যাঁরা তাঁদের উপস্থিতিতেও কলাকৃতি দেখিয়ে আশ্রমিকদের জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে দেন।

একজন পুলিশে কর্মরত ব্যক্তিকে একবার দেখলাম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আশ্রমে এসেছেন। তাঁর হবি ম্যাজিক দেখানো – তাই দেখিয়ে শিশুদের, স্টাফদের এবং আরও অনেক গ্রামবাসীর মনোরঞ্জন করছেন।

কয়েকজন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকা এখানে এসে হায়ার সেকেন্ডারী ও অন্যান্য পরীক্ষার দু-মাস আগে এসে রোজ তিন বেলা নিয়মিত ভাবে ছাত্রদের অঙ্ক, ইংরেজী বা অন্যান্য বিষয়ে পড়াতেন। স্কুলের পড়া না বুঝতে পারা ছাত্র-ছাত্রীরা ঐ দু মাসের অতিরিক্ত অধ্যয়নে বোর্ডের পরীক্ষায় খুব ভালো ফল পেতেন। রাহুল মান্নার মতন ভালো বুদ্ধিমান ছেলে অঙ্কে ১০০/১০০ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুরস্কার এনেছে। ৭ জন মেয়ে এখন থেকে পাশ করে বিখ্যাত সব হাসপাতালে নার্সের কাজ করছে। তাদের গর্বে বলরাম আজ গর্বিত। একজন সহৃদয় ব্যক্তি আশ্রমকে একটি এম্বুলেন্স দিয়েছেন, কেউ আশ্রমের সংগ্লনগ্ন জমি খণ্ডটি কিনে বলরামকে সব্জি লাগাতে, মাশরুম চাষ করতে, পুকুরে মাছের চাষ করে বাচ্চাদের খাওয়ার কষ্ট দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন। এঁদের সবাইকে আমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার মহাশয়ের ‘পরাণের পদ্মবনে’ গ্রন্থে এই আশ্রমের কথা লেখা আছে, যা পরে অনেক পাঠকের মনে ইচ্ছে জাগে এই আশ্রমটি পরিদর্শন করতে।

সবাই যেন ধনী বা বিদেশী প্রতিষ্ঠিত সন্তানের দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত পিতা মাতা তা কিন্তু নয়, এমন গরীব বা মধ্যবিত্ত সাধারণ ব্যক্তিও তাঁদের যৎসামান্য রোজগারের এক অংশ পাঠান এই শিশুদের উপকারে লাগবে বলে। হাওড়া হাটে মাত্র কয়েকশো টাকার জামা কাপড় ফেরিওলাকেও দেখেছি কিছু গামছা ও বাচ্চাদের গেঞ্জি বা মেয়েদের (নাইটি) ছিটের ফ্রক নিয়ে এসেছেন পুজোর আগে। এগরার প্রাক্তন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই বাজারে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে অনুরোধ জানাচ্ছেন এই নির্ভেজাল দয়াবান বলরামকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান দিতে। বিভিন্ন স্কুলের তরুণ ও প্রতিভাবান ছাত্র এবং মাস্টারমশাইকে অনুপ্রাণিত তথা উৎসাহিত করছেন, অন্ত্যোদয়-এর আশ্রমিকদের যোগব্যায়াম, অঙ্কও অন্যান্য খেলাধুলা শেখাতে।

আমাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি অতি মহত্ত্বপূর্ণ, ব্যবহারযোগ্য ও আনন্দময় হয়ে উঠেছে এই আশ্রমের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সুদক্ষ ছেলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছে, এখানে এক একটি শিশুকে স্পনসর করে – প্রতি মাসে তাদের খরচ পাঠাতে। নিজেদের আনন্দের দিনগুলিতে পার্টি না করে বা পিতা মাতার স্বর্গারোহনে শ্রাদ্ধতে অতিরিক্ত লোক দেখানো খরচ না করে তারা এই সব অসহায় শিশুদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এক নতুন ভাবনার পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছে। একজনকে দেখে আর একজন অনুসরণ করছে।

বিশেষত এই ‘কোভিডে’ – পরলোক গমন করার পর যখন কিছু তরুণ তরুণীকে দেখলাম সুদূর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড – সিঙ্গাপুর থেকে এসে বাবা-মা বা ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের শ্রাদ্ধ করতে আসতে পারলো না, তখন বলরামদা কে টাকা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছে তাদের পিতৃ তর্পনের নামে ঐ শিশুদের কাজে অর্থ ব্যয় করতে। – এই সব ছেলে মেয়েদের সমবেদনা জানিয়ে যাই আশ্রমের পক্ষ থেকে।

এমনও একজন চাল, ডাল, তেল, মসলার ব্যবসায়ী এই আশ্রমের কথা জানার পর থেকে নিয়মিত তাঁর দোকান থেকে ঐ সব দ্রব্য সামগ্রী পাঠিয়ে যাচ্ছেন – নিজের নাম ঠিকানা গোপন রেখে। এটা বোধহয় ঠাকুরের ভোগ নিবেদনের তাঁর প্রকৃত প্রয়াস।

বলরাম ভালোভাবে শিক্ষা, দীক্ষা, মূল্যবোধের পাঠ পড়াতে আর একটি দিকে বিশেষভাবে সচেতন, তাঁর ধর্ম – নিরপেক্ষতা। পূর্ব মেদিনীপুরে অনেক মুসলিম গ্রাম আছে – মোসলন্দপুরের মাদুর ব্যাবসায়ী থেকে মন্দারমণীর গুড় – বড়ি – মুড়ি – কাজু ব্যবসায়ী গরীব ও বড়লোক, সমৃদ্ধশালী চাষী থেকে জমিহীন শ্রমিক – সবাই এই মানুষটির পাশে এসে দাঁড়ান। বিপদে আপদে ত্রাণকার্যে সমূহ বিবাহ সম্পন্ন করতে তাঁরা সর্বদা এই আশ্রমের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। কারন বলরাম সব জাতের, সব সম্প্রদায়ের, সব ধর্মের লোকেদের সমান ভাবে শ্রদ্ধা, স্নেহ ও সম্মান করেন। তাই সে সকলের প্রিয় পাত্র। বলরামের মতন মানুষের আজ আমাদের বাঙালির গর্ব একথা অনস্বীকার্য।

একটি “মাইক্রোস্কোপের” আত্মকথা (Ekti “Microscope” er Attokotha)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ডাঃ কল্যাণী প্রসাদের পরশে অণুবীক্ষণের যন্ত্র যখন তার আত্মাকে খুঁজে পেল

১৯৪২ সাল, ভারতছাড়ো আন্দোলনে দেশের তরুণ যুবকেরা স্কুল, কলেজ কাজ কর্ম, অফিস আদালত ছেড়ে পথে নেমেছে – চারিদিকে একটা হৈ হৈ ব্যাপার চলছে ঠিক সেই সময় এক ২৪ বছরের যুবক আমায় নিয়ে এলেন কলকাতার এক দোকান থেকে কিনে। ধুলো ধূসরিত বাঁকুড়ার বাজারে, ছোট্ট ওষুধের দোকানের এক কোনে। এক টেবিলে জায়গা পেলাম আমি। আমার লেন্সের কাঁচটি বার বার মোছেন সেই যুবক, পাশে সিরিঞ্জ, স্পিরিট, কয়েকটা লোশনের শিশি, ও তুলোর প্যাকেট। অতি নগন্য সাজ সরঞ্জাম, কিন্তু লোকেদের রক্তের ভেতরে শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকাদের দেখার, মূল মূত্র পরীক্ষা করে কৃমি বা জিয়াডিয়া, আমাশয়ের কলেরা, জন্ডিসের জীবাণুদের চেনার জন্য যথেষ্ট আয়োজন।

গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। আমার সাহায্য নিয়ে এই যুবক ডাক্তার আজ নতুন জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন ইংরেজকে ভারতছাড়ো বলে হুঙ্কার তিনি হয়তো দিতে যাননি কিন্তু মানুষের শরীর থেকে রোগের কীটাণু বিষাক্ত জীবাণুদের দূর করার সাধনায় যুক্ত হয়েছেন। আমাকেও সেই মহান কাজে নিযুক্ত করেছেন, এজন্য আমি ধন্য।

কোনো মন্দিরে মাটি, পাথর, তামা বা অষ্টধাতুর মূর্তি বানিয়ে রাখা হলেই তাকে কেউ ভক্তি করে না। কিন্তু সংস্কৃত মন্ত্র জানা সদাচারী শুদ্ধ আত্মা পন্ডিত পুরোহিত এসে যখন তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেই মৃন্ময়ী বা ধাতুময় প্রতিমা হয়ে ওঠে ‘চিন্ময়ী’ – একেবারে দেবতার রূপধারী জীবন্ত। ভক্তেরা এসে তখন তাঁর পুজো করেন। আমিও এবার যেন প্রাণ পেলাম কল্যাণী ডাক্তারের সাধনায়। এতদিন এক সামান্য যন্ত্র ছিলাম। এখন হলাম জীবন্ত। ১৬১৯ সালে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেন ‘দূরবীক্ষণ যন্ত্র’ – আকাশের নক্ষত্রদের অতি কাছে দেখার জন্য। আর আমাদের অতি ক্ষুদ্রকে বৃহৎ করে দেখার জন্য তৈরী করলেন। আমার আবিষ্কার কর্তা Antone van Leeenwenhoek Armsterdom। এই ডাচ বিজ্ঞানীর চারশ বছর কেটে গেছে, কত পাতলা লেন্স দিয়ে কত সুন্দর সুন্দর দূরবীক্ষণ যন্ত্র এখন বেড়িয়েছি, ২০১৬ তে Google ৩৮৪তম এনিভার্সারি ঘোষণা করলো আমাদের জন্ম লগনের। কিন্তু এ সবই তো হলো যন্ত্রের ইতিহাস। এই ক্ষুদ্র অণুবীক্ষণকে যাঁরা কাজে লাগাতে পারেন মানবহিতের জন্য ব্যবহার করেন তাঁরাই আসল দেবতা।

তরুণ ডাক্তার কল্যাণী প্রসাদ গুপ্ত আমাকে সেদিন অত্যন্ত অতি নিষ্ঠার সঙ্গে যেন প্রাণ দিয়ে সজীব করে তুললেন। কত শত সহস্র জীবাণুদের ছোট একটি স্লাইডে বন্দী করে আমার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলে ধরা পড়লো তাদের প্রকৃতির দোষ গুন। জীবন্ত সেই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের বীক্ষণ করা এবং দেখার জন্য অত্যন্ত দক্ষতা চাই। আমার মালিক তথা ডাক্তারবাবু আমাকে ব্যবহার করে সেই দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ঠ হলেন, কারো কোনো সাহায্য না নিয়ে।

আমি সেদিন থেকেই তাঁর সুখ দুঃখের সাথী। আমায় রোজ এসে তিনি আদর করে তাঁর স্নেহ পরশ বুলিয়ে দিতেন। তাঁর জীবনের ছোটবড় সব সুখ দুঃখের ঘটনার গল্প আমি জানি। যেদিন কোন রোগীর শরীরে বড় রকমের কোন অসুখের সন্ধান পেতেন যার ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু সেই রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক তাই রোগীকে বাড়িতে আর রাখা যাবে না, তখন তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়তো আমার লেন্সের ওপর। একবার তাঁর এক তরুণ আত্মীয় এলেন কলকতা থেকে তাঁর বড় ভাইদের সঙ্গে নিয়ে। কি হয়েছে তার  সঠিক রোগ নির্ণয় করাতে। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে জানতে পারলেন তা দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগ। এই অপ্রিয় সত্যটি ব্যক্ত করতে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিলো বারবার আমার কাঁচ মুছে দ্বিতীয়বার – তৃতীয়বার নিরীক্ষায় ক্ষান্ত হতে হল তাঁকে। ছেলেটিকে “গৌরীপুরে” কুষ্ঠাশ্রমে পাঠানো হল। পড়াশুনোয় অত্যন্ত মেধাবী হাস্যময় সতেজ যুবকটি সেখানে গেলেন, কিন্তু কয়েকদিন পরেই আত্মঘাতী হলেন। ডাক্তারবাবু সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। মনে হল সত্য ভাষণে তিনি যেন ছেলেটিকে ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন। কখনো কখনো আবার দেখেছি অন্যত্র পরীক্ষা করে খুব খারাপ রিপোর্ট দিলে সেই রোগীকে কলকাতা থেকে “ডাঃ মনি চত্রির” মতন বড় হার্টের বিশেষজ্ঞ বাঁকুড়ায় এই কল্যাণী বাবুর কাছে পাঠিয়েছেন – সেকেন্ড ওপিনিয়ন অর্থাৎ দ্বিতীয় রায় নেবার জন্য। আমার ডাক্তারবাবু অনেক্ষন ধরে সব রকম পরীক্ষা করে হাস্যমুখে তাকে জানালেন – “কে বলেছে যে তোমার রক্তে এ সব দোষ আছে? কিচ্ছু নেই। কোন ভয় নেই, নির্ভিগ্নে তুমি বাড়ি চলে যাও।”

আমার কাঁচে তাঁর সুন্দর শুভ্র দাঁতের হাসি প্রতিবিম্ব দেখে আমিও খুশি হলাম। ছোট্ট সেই দোকান থেকে একটি বড় ভাড়া বাড়িতে দুই কামরার চেম্বারে এর পর উঠে এসেছি, আমরা। দুজন তরুণ ডাক্তারবাবুর সহচর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। গোবর্দ্ধন ও সুশীল। কত যত্ন করে তাদের তিনি সুদক্ষ কম্পাউন্ডার করে তুলেছেন, ট্রেনিং দিয়ে, সাহস জুগিয়ে, তা আমি জানি। আমার অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জন্য রক্ত নেওয়া, মূল, মূত্রকে ঘেন্না না করে, স্লাইডে রাখা সবই তিনি হাতে ধরে শেখাতেন তাদের। পরে এই চেম্বার চলে যায় “পূর্ণভবনে” জেল খানার পিছনের –  বিরাট বাড়িটায়। সেখানে এসে আমার মনে হল কি সুন্দর প্রাসাদে এলাম আমি।

ধোন, দৌলত, গৃহ সুখ সমৃদ্ধি সবই বৃদ্ধি পেল। স্ত্রী ছেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর নিজের বয়স-ও ধীরে ধীরে বেড়ে চলল চোখের সামনে। নতুন নতুন জামাই বৌমার আসছেন, মনে হল এতো সুন্দর পরিবেশে আমার মর্য্যাদাও বেড়ে গেল। রুগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল, আমার চারপাশে লাইন দিয়ে সাজানো কত কত মানুষের শরীরের বর্জ্য পদার্থ। ঘরের বড় বড় জানলা দিয়ে আলো হাওয়া এসে স্নিগ্ধ করে দিয়েছে ল্যাবরেটরী ঘরটি। মধ্য বয়সী ডাক্তারবাবু এখন পাঁচজন সন্তানের পিতা। তাঁর সু-গৃহিনী স্ত্রী চিন্ময়ী দেবী প্রতিদিন সকাল থেকে কাজের লোকদের দিয়ে সমস্ত বাড়িটি  ধোয়া মোছা করিয়ে দেন। কত রুগীদের গাড়ি, রিক্সা এসে ভিড় করে বাড়ির সামনে। আমার গর্ব হয় মনে মনে। আমাকে ঘিরেই তো এতসব। আমি এখন সেই সাধারণ যন্ত্র নই। ধনদৌলত নাম যশ সবই বৃদ্ধি পেয়েছে ডাক্তারের কিন্তু মনে তাঁর অহংকার আসেনি বিন্দুমাত্র। বয়স বেড়েছে যত, ছেলে মেয়ে, বৌমা জামাই নাতি নাতনীতে ভরে উঠেছে বাড়িখানি। তাদের কলকাকলিতে ভরে পূর্ণভবন। ভবনের অন্দর বাহির। বাগানের মাধবীলতা, জবা, স্থল পদ্ম গাছগুলি কত বড় হয়ে ফুলের গন্ধে ভরিয়ে রেখেছে সেই বাড়ির পরিবেশ। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি আমার। অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে ১৯৯২ হয়ে গেছে, তবু কখনো তিনি আমাকে বদল করার কথা ভাবেননি।

একবার কাউকে বলতেও শুনেছি এখন কত সুন্দর নতুন ধরনের “মাইক্রোস্কোপ” বেরিয়েছে একটা আনতে পারলে আর এর ওপরে ঘাড় কাত করতে হয় না। কিন্তু নিজের সামর্থ থাকলেও তিনি তা করেননি।

আমাকে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্যাথলজির কাজ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর স্বর্গারোহনে আমার আর কদর নেই। জলের দরে বিকিয়ে গিয়েছি আমি, আমার কান্না কেউই তো শুনতে পায়নি। হটাৎ একদিন দেখি আমার অজ্ঞাতবাসের দিন শেষ হল। সেই অজ্ঞাত পরিচয় মানুষটিকে খুঁজে বের করে ২০ বছর পরে তাঁর “নাতি” আমাকে আবার নিয়ে এসেছে প্রাপ্য মৰ্য্যাদার সঙ্গে।