ছোটবেলায় প্রায়ই শুনতাম, মায়ের মুখে “ওপর থেকে বেশ জুড়ি বানিয়ে পাঠিয়েছে বাবা" আকাশের দিকে তাকিয়ে কে কার'জোড়ি' কেমন করে বানিয়ে যে কখনপাঠান বুঝতে পারতাম না। একটু বড় হলে লক্ষ করলাম আমার এক কাকা যিনি ভীষণ শান্ত এবং ভালোমানুষ তার স্ত্রী অর্থাৎ ধীরা কাকীমা তার নামের একেবারে বিপরীত ছিলেন, ভীষণ অধীরা, রাগী ও ডমিনেটিং ছিল তাঁর নেচার কিন্তু সংসারে তাদের কোনো অশান্তি ছিল না। ছেলে মেয়ে স্বামী সবাই তার বাধ্য, ঘরের সব কাজ স্মুথ ভাবে হত। সব ফার্নিচার সবাইকার কাপড়-জামা এমনকি সব্জী-মাছ পর্যন্ত তারই ইচ্ছা ও পছন্দ মত আগত। অতএব নো টেনসন। ওদিকে মামাবাড়ীতে ভোলানাথ মামা ভীষণ রকমের চালাক চতুর বড়দের কথায় ধূর্ত, ধূরন্দর) এবং বদ মেজাজী। ছেলেমেয়ে ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাইপো-ভাইঝি কেউ আমরা পারতপক্ষে তার ছায়া মাড়াতাম না। তার চেহারাও ছিল শ্রী মহাদেব ভোলানাথ শিব ঠাকুরের একেবারে উল্টো। লম্বা, রোগা, টিকটিকে। জটা-জুটো থেকে গঙ্গা নেমে আসার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না, কারণ মাথায় ছিল বিশাল চকচকে টাক। সব সময় দাঁত খিঁচিয়ে কথা বলে বলে তাঁর সামনের দাঁতটা একটু উঁচু হয়ে গিয়েছিল। আর তাঁর বউ আমাদের "ভামিনী" মামী ছিলেন ভীষণ ঠাণ্ডা, নিরীহ, ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানেন না; কিন্তু এ বদমেজাজী পেটরোগা ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাতেন, মামার জন্য রোজ কাঁচকলা পেঁপের ঝোল ভাত বরাদ্দ ছিল। মামী দুপুর বেলা আচ্ছা করে সর্ষে লঙ্কা বাটা দিয়ে কুচো মাছের ঝাল খেতেন। পুকুর ঘাটে গা ধুতে গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে অন্যের নিন্দা ও স্বামীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। বলতেন - “ওনার মুখটাই যা খারাপ মনটা বড় নরম। মা, মাসীমারা মুখ টিপে হাসতেন, তাদের মুখে সেই একই কথা যেমন দেবা তেমনি দেবী। আমাদের বয়স যারা ৬০ পার করে ৭০/৮০ তে এসে গেছি তারা তো বাবা মায়ের পছন্দ মত পণ্ডিত মশায়ের কুষ্টি বিচার করার পর বরের গলায় মালা দিয়েছি এবং এ দুই দম্পতির মতন নির্দ্বিধায় সব বৈপরীত্য মেনে না নিলেও মোটামুটি একজন আর একজনকে সহ্য করে ৩০/৪০ বা ৫০ বছর কাটিয়েও দিয়েছি, আমরা সবাই এরেঞ্জ ম্যারেজ-এর শিকার ছিলাম। আমাদের “জোড়ি” ওপর থেকে না, মর্তলোকেই ঘটকালী করতে সিদ্ধহস্ত কালী খুড়ি, বৌদিদের সুবাদে অনায়াসে সমাধা হয়েছিল। কিন্তু এখনকার ছেলে মেয়েদের জোড়ি Facebook, Internet, Saadi.com বা বন্ধুবান্ধবদের দ্বারা বানানো হয়। প্রায় সব পাত্র-পাত্রীই সম পর্যায়ের, সমান ওজনের ডিগ্রী ধারী, সমান টাকার থলি (Pay pack) নিয়ে বাড়ী ফেরেন, দুজনের কাছেই লোন নিয়ে কেনা আলাদা আলাদা গাড়ি আপার্টমেন্টের চাবি থাকে, দুজনকেই বিভিন্ন সময় অফিসিয়াল আন অফিসিয়াল ডিউটিতে বাইরে ট্যুরে যেতে হয়, তাই দুজনের বক্তব্যে শোনাযায়় “ম্যায় তুমসে কম নেহী” জোড়-বিজোড়ের খেলাটা তাদের দুজনের হাতেই থাকে। সাপ লুডোর মতন ঝপ করে কারো ডিভোর্স হয়ে আবার বিয়েও হয়ে যায়, কেউ আবার বলেন _ “সিঙ্গল প্যারেন্ট হওয়া অনেক ভালো, কারুর কথায় তো উঠ বোস করতে হবে না"। তাই ভগবানের জোড়ি বানাবার প্ল্যানটা ভেস্তে যায় এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে। এদিকে মেড সার্ভেন্টদের দাম্পত্য জীবনের দিকে আলোকপাত করলে দেখি, সেখানেও সেই বৈপরীত্য, সেই অসামঞ্জস্য, সেই ট্রাডিশন একইভাবে চলে চলেছে। মায়াবতীর বর ভম্বলালের বিয়ে নেপালের কোনো এক মন্দিরে বকরা কেটে, দশ মন চালের ভাত, বেসনের লাডডু খাইয়ে পোখরার গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৪ বছর আগে। তারপর ১৫ বছরের সুন্দর ফুটফুটে গোলগাল মেয়েটিকে ৩২ বছরের দোজবরে (বেউ ভেগে যাওয়া) যুবক দিল্লী নিয়ে আসে, ত্রিলোকপুরীর ঝুগ্গিতে বাসা বাঁধবে বলে। ভালো কোম্পানীতে তার চৌকিদারের চাকরী। বাঁধা মাইনে। রাত জাগার উপরি ভালোই পয়সা আসে পকেটে। কিন্তু তার সব কাগজের নোটগুলোই চলে যায় মদের ঠেকায়। ঘরে এসে আবার গরম ভাত মাংস না পেলে বউ পেটাতে তার বড় আনন্দ হয়। সুতরাং স্ত্রীকে কাজ করতে হয় বাড়ী বাড়ী। ছেলে মেয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাঁচে এসে যখন থামে, - তখন পাড়া প্রতিবেশী সবাই জেনে গেছে, কিভাবে মাতাল স্বামী সহ সন্তান সন্ততি পালনের দায়িত্ব নিয়েও হাসিমুখে বাসন ধুয়ে যাচ্ছে সেই মেয়েটি। অন্যদিকে ড্রাইভার সোহন সিং বড় ভালো মানুষ। পান, বিড়ি, সিগারেট খেতেও দেখা যায়নি তাকে কখনও। তিনটি মেয়েকেই ভালোবাসে, স্কুলে পড়াচ্ছে, ঘরে গিয়ে রান্না-বান্না, কলের জল আনা _ সব কাজই তাকে নিঃশব্দে করে যেতে দেখছি সবাই। কারন তার জোড়ি প্রমীলা রানী বড় চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। কেউ কেউ বলেন, অনেক রাত্রেই সে বাড়ী থাকে না। দুবার বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সোহন সিং অসুস্থ অবস্থায় তাকে পেয়ে আবার ঘরে নিয়ে এসেছে। অসীম তার ধৈর্য্য, ক্ষমাশীল তার স্বভাব। তাই এবার আমার বলতে ইচ্ছা হয়, "ভগবান তুমি পারোও বাবা জোড়ি বানাতে।" ধন্য তোমার ঘটকালী।