সুরে সুরে বাঁশি পুরে (Sure Sure Banshi pure)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমার প্রিয় কবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের জীবন বাঁশির সুরে আপ্লুতা তাঁর প্রাণ মন সর্বদাই সেই সুর ধারায় যেন সিক্ত হয়ে থাকে। রাধাভাবে বিভোর সাধক – গায়ক বৈষ্ণব কাব্যকারের মতন তাই কখনো গেয়ে ওঠেন – “মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে”।

আবার কখনো একাকী বসে উদাস প্রাণে ভাবতে থাকেন, “বাঁশি কি আশায় ভাষা দেয় আকাশেতে, সেকি কেহ বোঝে। সব কথা সবাই বোঝে না, কিন্তু অনুভব করে, তাই গভীর তত্ত্ব কথা, অসীম কালের চিরন্তন সত্য জ্ঞান কবির মনে যখন প্রতিভাত হয়, তখন তিনি লেখেন, – “নিত্যকালের গোপন কথা বিশ্ব প্রাণের ব্যাকুলতা আমার বাঁশি দেয় এনে দেয় আমার কানে”। আর সেই বাঁশির সুর – সুমধুর অপার্থিব ধুন কানের ভিতর দিয়ে যখন তাঁর মরমে প্রবেশ করে – তখন তিনি তাঁর জীবন দেবতাকে প্রশ্ন করেন, – “কেন শুধু বাঁশরীর সুরে ভুলায়ে লয়ে যাও দূরে?

কার আহ্বানে দূরে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্ত্তে আবার মনে বোধ হয় সংশয় জাগে, দিশাহারা কবি তাই দ্বিধা ভরা কণ্ঠে কাকে শুধান – “সখি ওই বুঝি বাঁশি বাজে বনমাঝে”। কিন্তু একটু পরেই তার উপলব্ধি হয়, – যে না বনে নয়, মনেই বেজেছে বাঁশি, তখন ভক্তি প্রেমের রসধারায় স্নাত হয়ে সাধক কবি গেয়ে ওঠেন, –

“পরানে বাজে বাঁশি, নয়নে বহে ধারা, দুঃখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা”।

অপুরূপা এই মধুময় পৃথিবীর রূপ রস গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়ে এই বংশী ধ্বনি বার বার ধ্বনিত করে এক মোহময় আনন্দ সংগীত। শ্রী রাধার মতন আকুল হয়ে মুগ্ধ কবি তখন সেই আনন্দ গানের তানে লীন হয়ে যান, – আর প্রিয় জনকে ডেকে বলেন, – “ওগো শোনো কে বজায়, – বনফুলের গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়। অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি, চুরি করে হাসি খানি, কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে, বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে।

এখানে ভক্ত প্রাণের আকুলতা, ঈশ্বর প্রেম সবই যেন ওই বাঁশের ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলির মধ্যে অবলীলায় খেলা করে। বাদকের অঙ্গুলি স্পন্দনে, মুখ নিঃসৃত ফুঁ এর হওয়ার কারণে অনুরণিত ধ্বনি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভাবনার দ্যোতনা জাগায়। তাই দেখি যখন শরৎকালের ধান ক্ষেতে রোদ্রছায়া লুকোচুরি খেলায় মত্ত তখন ফসল ফলানোর আনন্দে অধীর ধরণী মায়ের বুকে গানও বাজে বাঁশির সুরে। দূর দেশী কোন রাখাল যখন বটের ছায়ায় বসে সারাবেলা খেলা করে, বাঁশি বজায় তখনো সে মগ্ন হয়ে শোনে মাঠের গান। ঘরে তার যেমন মন টেঁকে না, কবিও তেমনি ধান ক্ষেতের ধারে শোনেন পৃথিবীর গান, বাঁশরীর ধুনে, “মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশি হলো ঘরেতে আজ কে রবে গো”? অথবা – “যেথায় তরু তৃণ যত, মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতন, তখন আমরা বুঝতে পারি যে এই বাঁশি শুধু এক বাঁশ গাছের ডাল কেটে বানানো বাদ্যযন্ত্র নয়, এখানে প্রকৃতি প্রেমিক কবি বলতে চেয়েছেন অন্য গভীর কথা।

মাটি তার বুকের অমৃত সুধা বৃক্ষের মধ্যে স্ফুরিত প্রাণশক্তি জাগরিত করে, তাঁর অপার আনন্দ সংগীত তথা আত্মার বাণী ঘোষিত হয় এই অপূর্ব ধ্বনি সম্বলিত বাঁশরীর মাধ্যমে কবিগুরু নিভৃতে বসে যখন সাধনারতো – আত্মার শান্তি, প্রাণের আরাম ও চিরন্তন মিলনে জাগে একান্ত আকৃতি। তিনি গান ধরেন –

“দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলেম অনেক সুরে –

গানের পরশ এল আপনি তুমি রইলে দূরে।

শুধাই যত পথের লোকে, এই বাঁশিটি বাজালো কে –

নানান নামে ভোলায় তারা নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে”।

তাঁর ঈষ্টদেবতা বাহির ছেড়ে যখন ভেতরেতে আসন পেতে বসেন তখন কবি শান্ত সমাহিত চিত্তে তদ্গত হয়ে বলতে থাকেন, – “তোমার বাঁশি বাজাও আসি আমার প্রাণের অন্তঃপুরে”।

যখন তাঁর ধ্যান ভগ্ন হয়, ধ্যানী যোগী ত্যাগী সাধক তখন শোনেন পথের আহ্বান সাধক ফকির বাউল তাঁর প্রাণের মানুষ যে প্রাণেই আছেন একথা জানলেও বার বার বাহির পেইন পা বাড়িয়ে দেন। সন্ন্যাসীর ব্রত উদযাপনে আল্লাতালার নাম শোনার মন্ত্র গ্রহনে তিনি চির পথিক। আর মাঠে ঘুরতে ঘুরতে তিনি স্বগতোক্তি করেন, “বেলা কখন যায় গো বয়ে, আলো আসে, মলিন হয়ে, পথের বাঁশি যায় কি কয়ে, বিকালবেলায় মুলতানে।

আমরা জানি এবং মানি, যে সেই পথে পথে থাকে পাথর ছড়ানো। আর তাতে ঈশ্বরের বাণী বাজে ঝর্ণা ধারার মতন। তাই তিনি পরম আনন্দে কবিতা রচনা করেন, – “আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো, তাই তো তোমার বাণী বাজে ঝর্ণা ঝরানো।

আমার বাঁশি তোমার হাতে, ফুটোর পরে ফুটো তাতে, তাই শুনি সুর এমন মধুর পড়ান ভরানো”।

পথ চলার আনন্দে, বাঁশরীর লয় তাল সুর ছন্দে তিনি সর্বদাই মাতোয়ারা। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে শ্রীরাধা যেমন উন্মনা, পাগলিনী প্রায় পথের বাধা না মেনে ছুটে চলেন অভিসারে, আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথও তাঁর জীবন দেবতা ব্রহ্ম-ঈশ্বরের প্রতি অহরহ ধাবমান, তার অভিসার অন্তহীন। তাই সর্বদা স্বীকার করেন, – “পথিকেরা বাঁশি ভরে সুর আনে সঙ্গে করে, তাই যে আমার দিবানিশি সকল লয় রে কাড়ি।

এখানে শুধু পথ নয় পথের সাথী যাত্রীদের কথাও শোনা যায় কারণ বাঁশির মধ্যে থেকে নিঃসৃত ভিন্ন ভিন্ন রাগ রাগিণীর মধ্যে বাজে মানুষের জীবনের ছোট ছোট হাসি গান, তুচ্ছ মান অভিমান, প্রেম প্রীতি, সুখ দুঃখের কথা তাই তখন বাঁশি শোনায় মানবতার গাথা। আমাদের বাঙালীর কবি তখন হয়ে ওঠেন বংশীবাদক বিশ্বকছব, যার সুরে, গানে, কোথায়, ভাবে ও আবেগে আজ সারা জগৎ প্লাবিত। কিন্তু গুরুদেবেরও গুরু যিনি প্রতি শুভ মুহুর্ত্তে তাঁকে সুরের দীক্ষা দিতে থাকেন তিনি মনুষ্য দেবতা বা অলৌকিক সত্তা নন, তিনি হলেন এক পৃথিবী তথা প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন শক্তির মধ্যে যে অনন্ত আনন্দের কথা দিন রাত ব্যক্ত হচ্ছে তা আমরা শুনতে পাই কবির গানের মধ্যে, বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি সে কি সহজ গান, সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান।

সেই কান তৈরী হয়ে গেলে কবির সাথে এই অতি নির্বোধ, ভাষা ছন্দহীন জ্ঞান হারা লেখক স্বীকারোক্তি করেন কবিরই গানে হৃদয় আমার প্রকাশ হল, অনন্ত আকাশে বেদন বাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে।

বাঁশি আনন্দ গান শোনাতে শোনাতে আবার করুন সুরে বিষাদ পূর্ন ধুন তোলে মাঝে মাঝে। কারণ যে অন্তরের ধনকে কবি পেতে চান, তা তো সহজে ধরা দেয় না। তাই শূন্য ভবনে বিরহী হিয়া কখনও কখনও কেঁদে ওঠে।

ঋনী (Hrini)

চন্দনা সেনগুপ্ত

রোজই ট্রেন লুট হয়, রাস্তায় ডাকাত পড়ে, এসব কথা পেপারে পড়ি, টিভিতে দেখি। কিন্তু আমার নিজের জীবনেও যে এরকম এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ঘটবে তা কখনো ভাবতেও পারিনি।
অফিসের কাজে মধ্যপ্রদেশের এক অত্যন্ত ছোট শহরের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এ যেতে হবে। সঙ্গে একজন পিয়ন কাম সিকিউরিটি ম্যান যাচ্ছেন, তিনি ঐ অঞ্চলেরই লোক, তাই জঙ্গলের রাস্তাও সব চেনেন। আমি ফার্স্ট ক্লাশে যাচ্ছি। মাত্র দুজন মহিলা আমরা একটা কূপে। ৯টা বাজতেই ডিনার খেয়ে শোবার ব্যবস্থা করলাম। রাত্রি প্রায় ১১টা নাগাদ ট্রেনটা একটা স্টেশনে থেমে আছে মনে হলো, ভাবলাম ওয়াশরুমে ঘুরে আসি। বাথরুম থেকে বেরুতেই দেখি এই স্টেশনে বেশ কয়েকজন লোক উঠেছে। কেমন যেন অস্বস্তি লাগলো। প্রথম শ্রেণীর গার্ড, টিকিট চেকার কি নেই, এদের দেখে তো কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। নিজের কূপে আসতেই পেছন থেকে এসে ধরলো একজন, গলার হার, দুল টেনে খুলে নিলো, ব্যাগগুলো ধরে বাইরে বাথরুমের সামনে দরজার কাছে নিয়ে ফেলতে লাগলো। চেঁচামেচি, হৈ চৈ, লুটপাট শুরু হলো। মার ধর, ধাক্কা ধাক্কি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওদের কাজ সারা। পাশের কূপেও সেই একই অবস্থা। প্যাসেন্জারদের যথা সর্বস্য কেড়ে নিয়ে ওরা চেন টানলো এক অতি অন্ধকার ছোট্ট স্টেশনের কাছে। ট্রেন থামতেই ওরা ঝপাঝপ করে নেমে পড়লো, কিন্তু নামার আগে এক বৃহৎ পাগড়ীওয়ালা, মুখ বাঁধা, লম্বা চওড়া লোক কি ভেবে জানিনা আমার হাত ধরে টানতে লাগলো। প্রানপনে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারলাম না। ঐ সব ব্যাগ, সুটকেস, টাকা, গহনার সঙ্গে ওরা আমাকেও ওদের দলভুক্ত করে মাটিতে পা দিলো। ছুটতে লাগলো মাঠের মধ্যে দিয়ে। কিছুক্ষন পরেই ট্রেনটি ছেড়ে দেবার আওয়াজ পেলাম। ওদের একটি জিপ দাঁড়িয়েছিল গ্রামের কাঁচা রাস্তায়। তাতে ওঠালো আমায়। তারপর জিপ ছুটলো বড় রাস্তার দিকে। একটা লোক আমার মুখ মাথা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে, যে নড়তেও পারছিনা। যন্ত্রনায় সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। বেশ কয়েক ঘন্টা চলার পর, ওরা থামলো একটা ধাবার সামনে। আমার কোমরে ঠেকিয়ে রেখেছে একটা চাকু, একটু শব্দ করলেই যে সেটা আমার পেটের ভেতরে প্রবেশ করবে তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।
এখানে আগেই বেশ কয়েকটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ড্রাইভাররা কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ পিছনে দড়ির খাটিয়াতে নিদ্রা যাচ্ছে। একজন খাবার ও মদের অর্ডার দিল, আমাকে পিছনের দিকে রাখা একটা খাটে এনে বসালো, একটা ছেলেকে ডেকে বললো - ভালো মাল পেয়েছি আজ, পিছনের ছোট ঘরটা খালি করে দে। পনেরো কি ষোলো বছরের ছোটু। এতো রাত্রে কাজ করতে হচ্ছে বলে, বিরক্ত হয়ে সে ঘর পরিষ্কার করতে চললো। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে সাহস সঞ্চয় করলাম, বললাম - 'বাথরুম যাবো'।
লোকটা নোংরা ইঙ্গিত করে মুখ ভেঙ্গালো - পালাবার চেষ্টা করবি না, এই চাকু চালিয়ে দিয়ে পেট ফাঁসিয়ে দেব। কিন্তু আমার এই একটাই সুযোগ। ঐ খোলা বাথরুমের পিছনেই অন্ধকার খোলা মাঠ। ওটার ওপাশে একটা ঘরের মতন দেখা যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি হয় ওখানে পৌঁছাতে হবে আমায়। খুব সম্ভব কাঠ, কয়লা, ভাঙা বাক্স ইত্যাদি রাখা আছে ঐ ঘরটায়। বাথরুমের কল খুলে দিলাম, জলের শব্দ হবে বলে, তারপর সন্তর্পনে পিছনের রাস্তা দিয়ে ঐ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ইঁদুর, টিক্টিকিদের সঙ্গে ঘুঁটে, কয়লা ও কাঠের বোঝার পিছনে লুকিয়ে রইলাম আমি। কিছুক্ষন পড়ে হৈ চৈ, খোঁজা খুঁজি শুরু হলেও এদিকে কেউ এলোনা। ওরা  ভাবলো মাঠ পেরিয়ে শিকার পালিয়েছে। একজন আবার ওদের মধ্যে লুঠ করা জিনিসপত্র ভাগাভাগি করতে শুরু করেছিল। তাই নিয়ে মনে হয় তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লো, বেশ কিছুক্ষন সব চুপচাপ। হটাৎ কেউ যেন এই ঘরের দরজাটা খুললো। টর্চের আলো ফেলে খুঁজছিলো কাঠ, ঘুঁটে বা কয়লা। অনেক চেপে চুপে একেবারে নিচু হয়ে থাকা সত্ত্বেও শরীরের কোনো অংশে পড়লো আলোর ঝলক। চমকে উঠলো সে, অস্পষ্ট আওয়াজ বের হলো তার মুখ দিয়ে। আমিও তাকে দেখতে পেলাম - ছোটু, ভয় পেয়ে সে ডাকতে যাচ্ছিলো তার মালিককে। এবার এক সেকেন্ড দেরি না করে লাফিয়ে উঠে চেপে ধরলাম তাকে। অন্ধকারে তাকে জড়িয়ে শুধু বলতে পারলাম "বেটা ম্যায় তেরা মা জ্যাসা হু, মুঝে বাঁচালে"। আমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে পারলে সে হয়তো ভালো বকশিস পেত। কয়েকটা মুহূর্ত কি যেন ভাবলো সে, তারপর ঘরের কোণে রাখা বড় বড় দুটো প্যাকিং বাক্স খালি করে আমাকে তার মধ্যে বসতে বললো, উপর থেকে ঢেকে দিল কাঠ খড় দিয়ে। বুঝলাম তার মতন অন্য কেউ এই ঘরের থেকে জিনিস বের করতে এলেও যেন আমায় দেখতে না পায়।
সারারাত ধরে এই ধাবায় ট্রাক, গাড়ি দাঁড়ায়, লোকেরা হৈ চৈ করে, ভোর রাত্রে ছোটু আবার এলো এক গেলাস গরম চা নিয়ে। বললো চারটের সময় একটা বাস আসবে। যাত্রীরা সবাই নেমে হাত মুখ ধুয়ে চা খাবে, তখন তুমি ঐ বাসে চড়ে যেও। সকালে তোমায় এখানে দেখলে আমার মালিকও সহজে ছেড়ে দেবে না, আটকে রাখবে, টাকা চাইবে - বা তোমার সঙ্গে আরো অনেক কিছুই হতে পারে। এসো আমার সঙ্গে, বাথরুমে চলে যাও। ঐ বাসটি এলে লেডিস প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে মিশে যেও, কেউ বুঝতে পারবে না।
বাসের পিছনের সিটে বসে ভাবছি কেমন করে ঋণ শোধ করবো এই ছোট ছেলেটার। ওকে যখন আমার চোখ দুটো ব্যাকুলভাবে খুঁজছে - তখন জানালা দিয়ে টুপ করে একটা জলের বোতল ও বিস্কুটের প্যাকেট পড়লো কোলে। মুখ বাড়িয়ে দেখলাম সেই ছোটুকে। বললো -"রাস্তায় এটা খেয়ো"। আমি চোখে জল নিয়ে ভাবছি - "কি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমায়"। আমার মাকে তো বাঁচাতে পারিনি তোমায় বাঁচাতে পারলে মনে হবে - প্যাসেঞ্জারদের হৈ হৈ, বাসের হর্ন কন্ডাক্টারের হাঁকা-হাঁকিতে আর কোনো কথাই শোনা বা বলার সুযোগ হলো না আমার।
সকালে বড় শহরে বাস থামলে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছালাম। বাড়িতে খবর পাঠানো হলো, লেডি অফিসারকে বললাম ঐ ছোটু কে ওখান থেকে নিয়ে আসতে চাই, আমি পড়াশুনো করিয়ে মানুষ করতে চাই, নইলে ওর ঋণ শোধ করবো কি করে।
কোথায় কোন ধাবায় খুঁজবেন আপনি ওকে? ওরকম শত শত ছোটু রাতের পর রাত জেগে নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে কত গ্রামে, শহরে, রাস্তায়। নিজে বেঁচে ফিরে এসেছেন আপনার খুব ভাগ্য ভালো তাই। ও অবাস্তব চিন্তা ছেড়ে বাড়ি যান। বড় অপরাধী মনে হলো নিজেকে। সত্যিই তো কোনো গ্রাম, কোনো ধাবা, কি সেই ঠিকানা - কিছুই তো জানা হয়নি আমার। কোন স্টেশনে যে ওরা আমাকে নামিয়েছিল অন্ধকারে তাও বুঝতে বা দেখতে পায়নি। বাসে আসতে আসতে বড় রাস্তার দুধারে এই রকম অসংখ্য ধাবা ও কত শত ছোটুদের দেখলাম খাবারের থালা হাতে ছোটাছুটি করতে - আমার উদ্ধার কর্তা সেই দয়ালু সাহসী ছোটুকে কোথায় খুঁজে পাবো। - ভগবান, তুমি আমায় ঐ ছোট্ট - কিশোরের কাছে চির ঋনী করে দিলে।

টনিক (Tonic)

চন্দনা সেনগুপ্ত

- ডাক্তারবাবু নমস্কার।
- আরে আরে আসুন ভবেশবাবু, কি হলো? এতো বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন? আবার জ্বর বাঁধালেন নাকি?
- না না টেম্পারেচার তো আসেনি তবে বড় দুর্বল লাগছে, মাথা ভার, বুক ধড়ফড়, কি হলো ডাক্তারবাবু কিছু বুঝতে পারছি না।
- দেখি দেখি হাতটা, জিভ কুঁচকে অমন করে চোখটা টিপছেন কেন? রিলাক্স, হুঁ, সেরকম তো কিছু মনে হচ্ছে না।
আড়ষ্ট শরীরটা ডাক্তারের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে মিয়ানো গলায় ভবেশবাবু বললেন, কোনো কাজ ভালো লাগে না, খাবারে স্বাদ পাই না, মাঝে মাঝে হাত পাও ঝিম ঝিম করে।
ডাক্তারবাবু সদা হাস্যময় মানুষ অনেকদিন ধরে একই পাড়ায় দুজনের বাস, ছেলেদের হাম, চিকেনপক্স, মাম্স, মেয়ের হুপিং কাশি, স্ত্রীর আমাশা, অম্বল, বোনের পেটে ব্যাথা, ভাইয়ের এলার্জি, বাবার হাঁপানি, মায়ের পা ফোলা, সব কিছুতেই ভবেশবাবু সমব্যাথী, দুঃখভঞ্জন "হরির" মতন এই পরিবারের সব লোকের কষ্ট দূর করতে ছেলে, বুড়ো, বৃদ্ধা, প্রৌঢ়া সকলেরই পরম বন্ধু তিনি।
প্রেসার চেক করে, লিভার আর গ্ল্যান্ডগুলো সব টিপে-টুপে বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন - নাঃ কিছু হয়নি আপনার। মেয়েদের মেনোপস আর ছেলেদের এই মানে.... মানে এই প্রৌঢ়ত্বের সীমায় বয়সটা এলে, সবাইকার একটু আধটু এরকম হয়। অতো ঘাবড়াবেন না।
- একটা ভালো ওষুধপত্র কিছু লিখে দিন না আপনি, তাহলে নিবু নিবু প্রদীপের শিখাটা হয়তো আবার জ্বলে উঠবে - হতাশ গলায় ভবেশবাবুর আকুতিটা শোনালো বাচ্চা বেড়ালের মিউ মিউ আওয়াজের মতন।
- আরে রাখুন তো মশাই, ওষুধপত্র। কি করবেন আমার ওষুধগুলো? বিনা কারনে গিলবেন? আগে তো আপনি এরকম হাইপোকন্ড্রিক ছিলেন না মশাই, আজকাল হলোটা কি?
- অন্ততঃ একটা "টনিক" দিন না ডাক্তারবাবু - স্নায়ুগুলো বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। মেয়েটা অফিস থেকে দেরী করলে, কেমন পাগল পাগল হয়ে যায়। ছেলের বন্ধুরা হঠাৎ ছেলেকে ডেকে নিয়ে গেলে ভয় লাগে, মনে হয় রাজনীতির কোনো চোরাবালিতে পড়লো না তো ছেলেটা।
- স্ত্রীর সঙ্গেও কথায় কথায় ঝগড়া, আমি কি সাইকোলজিস্ট দেখাবো?
এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো ডাক্তারবাবুর। না আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না দাদা। এবার যা বলি মন দিয়ে শুনুন, শহুরে জীবনের এক ঘেঁয়েমীতে আপনার শরীর মন ক্লান্ত হয়ে গেছে। কোনো "টনিক" আপনাকে এখন চাঙ্গা করতে পারবে না। আপনি এক কাজ করুন, মিসেস কে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসুন কিছুদিনের জন্যে। আপনার "টনিক" হচ্ছে খোলা হাওয়া। সব সবুজ গাছ-পালা কিম্বা নদী-নালা। সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসুন ফ্রেশ হয়ে আসবেন।
অরে ডাক্তারবাবু ওসব জায়গায় যাওয়ার ঝামেলা কত জানেন? ট্রেনের টিকিট, হোটেল বুকিং, বাক্সপ্যাঁটরা গোছানো। স্ত্রীর পানের বাটা নেই মায়ের মতন ঠিকই, কিন্তু জামাকাপড়, স্নো-পাউডার, লিপস্টিক থেকে চুলের কলপ, নিভিয়ার বোতল, শ্যাম্পু-সাবান বিরাট লিস্ট সমেত জিনট্যাক-ফিনট্যাক সব ওষুধপত্র গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চারটিখানি কথা? এর চেয়ে একটা "টনিক" খেয়ে জোরটা বাড়িয়ে নিলে ভালো হতো না ডাক্তারবাবু?
- না হতো না। আপনাকে এবার কিছুতেই আমি ওষুধ দেবো না, যান বেরিয়ে আসুন।
- ডিসেন্ট্রি রুগীর মতন পাঁচন খাওয়া তেতো মুখে, ভিজে বেড়ালের মতন চুপসে যাওয়া ভবেশবাবু বাধ্য হয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়তেই ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, আরে বাবা অতো টেনশন করছেন কেন বলুন তো? গ্রাম সাইডে কোনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িও তো কাটিয়ে আসতে পারেন। লাইফে মোনোটোমি কাটাতে মাঝে মাঝে চেঞ্জে যেতে হয়।
- দেখি! কি যে করি! - রাস্তায় নামলেন ভবেশবাবু।
বাড়িতে এসে অবশ্য অত ন্যাকা সেজে থাকা যায় না, কারন শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু সুকুমার রায়ের সিদ্ধান্ত তাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় - "কাউকে বেশী লাই দিতে নেই, সবাই চড়ে মাথায়"। তাই ছেলে পিলে বা স্ত্রীকেও তিনি কোনো দিনই মাথায় তুলতে রাজি নন, কিন্তু এখন এই অকারণ বিমর্ষতা তথা "ডিপ্রেশন"-এ ভুগতে শুরু করে মাঝে মাঝে একটু নিরীহ ছাগলের মত বোকা বোকা ব্যবহার করে ফেলছেন। বাড়ি ফিরেই বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে খানিকটা জল দিয়ে এসে একটু যেন ধাতস্ত হলেন, এবং অন্য দিনের মতন চা নিয়ে কাছে দাঁড়াতেই স্ত্রীর হাতটা ধরে ফেললেন অকস্মাৎ। একটু গদ্গদভাবে বললেন-
- গ্রাম সাইডে মানে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের সেরকম কোনো আত্মীয় টাত্মীয় আছে না কী গো?
- সে রকম মানে? কি রকম? কাদের কথা বলছো? - হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে স্ত্রী মলিনাদেবী ওদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিয়ে আশ্বস্ত হলেন - না কাজের মেয়েটা রান্না ঘরের ভেতরে, হাত ধরাটা দেখে ফেলেনি।
- সে রকম মানে এই ধরো যাদের কাছে গিয়ে দু-চার দিন একটু আরাম করে কাটানো যায়।
- কেন? হটাৎ গ্রামে যাওয়ার কি হলো?
- ডাক্তারবাবু বলছিলেন আমার শরীরটা আবার কেমন যেন দুর্বল হয়ে গেছে তাই চেঞ্জে যাওয়ার দরকার।
- আগেকার দিনে কলকাতা থেকে "মধুপুর" "দেওঘর" কিংবা পুরী যেতাম, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে হাওয়া বদল করতে, তোমার কি সে রকমই ইচ্ছে জাগলো নাকি?
- ধরো তাই যদি হয়, তাহলে ভেবে দেখো না, কোথায় যাওয়া যায়। কারন এই বেড়ানোটা হবে আমার "টনিক"।
- তা "টনিক"ই যদি চাই তো এই দিল্লী শহরের কাছেই তো হরিদ্বার, মুসৌরি নয়তো সিমলা যাই, চলো। অনেকদিন তো সত্যি কোথাও যাওয়াই হয় না।
- না না ওসব জায়গায় আমার ভালো লাগে না, হোটেল ফোটালে থাকবো, আমার পোষাবে না।
- পোষাবে না? না টাকা খরচের ভয়ে বেরুবে না? তাই বলো। এখন তো ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে যে যার নিজের নিজের কাজ, পড়া, কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত, চলো না একটু শখ মিটিয়ে, বেড়িয়েই আসি।
- আরে ওতে আমার টেনশন আরও বেড়ে যাবে, প্রেসার তো হাই জানোই, তার ওপরে বাইরের খাবার খেলেই তো তুমি ঢেকুর তুলে তুলে মরবে - এই বয়সে ও রকম বেড়ালে কি "টনিক" পাওয়া যায়?
- হ্যাঁ, গ্রামে তোমার জন্যে সব লোকেরা "টনিক" বানিয়ে যেন বসে  আছে - যত সব ঢঙের কথা! মুখ ঝামটা দিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মলিনা চলে গেলেন রুটি করতে।
সত্যি বাবা সেই কত বছর আগে পুরুলিয়া থেকে দিল্লী চলে এসেছেন ভবেশবাবুরা এই প্রবাসেই লেখা পড়া চাকরী-সংসার নিয়ে পঞ্চাশটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, দেশের বাড়ি খুব একটা যাওয়াই হয়নি, এখন কার কাছে যাই ভাবতে ভাবতে হটাৎ মনে পড়লো, মায়ের খুড়তুতো বোন "পিতুমাসী" মানে 'প্রতিমা মাসী' ও 'সোমেন মেশোমশাই' একবার বছর দশেক আগে মা বেঁচে থাকতে 'কেদার-বদ্রী' তীর্থে যাওয়ার সময় দিল্লিতে তাঁদের বাড়ি এসে কিছুদিন ছিলেন এবং বারবার অনুরোধ করেছিলেন একবার ওনাদের গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে। অতএব শুরু হলো পুরোনো ডায়রী ঘেঁটে ওনাদের ঠিকানা আবিষ্কার। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার মতন মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্ক, বাবার পুরোনো চামড়ার সুটকেশ, সেটারই এক কোনে বহু পাকিং বাক্সের নীচে যা চাপা পড়েছিল এতদিন ধরে তা বের করা হলো, পাশের দোকানের 'চাকর' ও 'ঝি'-এর ছেলেকে দশ দশ টাকা দক্ষিণা দিয়ে। স্ত্রী মলিনাদেবী তো রেগে গজ গজ করতে লাগলেন। এইসব লোকদের ঘরের ভেতরে ঢোকানোর জন্য। কিন্তু ভবেশবাবুও "টনিকের" সন্ধানে এবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, পিতু মাসীর গ্রামে তিনি যাবেনই যাবেন। বাবার ডাইরীতে তাঁদের সবাইকার জন্ম তারিখ বাংলায় লেখা এবং কিছু দোকানের হিসাব নিকাশ। অতীতকে হাতড়াতে হাতড়াতে হটাৎ রুপোর কৌটোতে ঠাকুমার আমলের সেই বিখ্যাত সোনার টিকলিটা পাওয়া গেল, ছোট্ট কাগজের পুরিয়া মোড়ানো, যেটার ওপর সব দিদিদেরই নজর ছিল কিন্তু মা কাউকে দেননি, বলতেন - তোদের তো অনেক দিয়েছি আবার কেন? "মলিনাও একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, যখন মা প্রায় বিছানায় শয্যাশায়ী, "মা" জবাব দিয়েছিলেন - "জানি নে বাপু কোথায় হারিয়ে ফেলেছি"। অতএব দশ বছর পরে জিনিষটির হদিশ পাওয়ায় সবাই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভবেশবাবুর ঘাড়ে। বিমর্ষতা, মাথা ধরা সব ভুলে গিয়ে খুব বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, 'সরো তো সব - আমাকে মায়ের কাগজপত্রগুলো দেখতে দাও'। যে কাগজের পুরিয়াটিতে "টিকলিটি" মোড়াছিল স্ত্রী সেটা ফেলে দিয়েছিলেন কেন্নোর মত কুন্ডুলি পাকিয়ে, ভবেশবাবুর পায়ের কাছে পড়েছিল সেটি। এতদিন যার বুকে অমূল্য ধন সমুদ্রের "মুক্তোর" মত সযত্নে রক্ষিত ছিল আজ সে অকেজো, - কুড়াদানিতে চলে যেতে হবে তাকে, কেমন যেন হতাশাগ্রস্থ হয়ে গেল মুখ হাঁ করে। ঝিনুকের মত পরে থাকা "মোড়ক"টা হাতে তুলে নিলেন তিনি, মায়ের অপটু হাতে পেন্সিলে লেখা প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া, একটা লাইন পড়বার জন্য। তাতে লেখা - পিতুর মেয়ের বিয়ের জন্য"। চমকে উঠলো সমস্ত সত্তা। এক মুহুর্ত্তে কেটে গেল নৈরাশের কালো মেঘে ঢাকা পর্দা। কাগজের টুকরোটা খুলে ভালোভাবে টানটান করলেন, হ্যাঁ পেছনে পিতু মাসীর ঠিকানা -
শ্রী সোমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, গ্রাম - সুপুর, জেলা - বাঁকুড়া
আনন্দে লাফিয়ে উঠলো হৃৎপিণ্ড। সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী 'আর্কিমিডিসের' মতন বলতে ইচ্ছে করল তার 'ইউরেকা' 'ইউরেকা'।
তারপর চিঠিপত্রের 'আদান প্রদান', সোমেন মেসোর আন্তরিক আহ্বান, টিকিট রিজার্ভেশন, "নীলাচল" এক্সপ্রেসে। স্ত্রীকেও আকৃষ্ট করলেন "পুরী" ঘোরাবার আকর্ষণ, ওখানে কিছুদিন থেকে তাঁরা জগন্নাথ দর্শনটাও সেরে আসবেন এই ফাঁকে - সেরকম প্ল্যানও একটা হয়ে গেল। ডাক্তারবাবুর চেম্বারে আবার গিয়ে হাজির হলেন তিনি। - ডাক্তারবাবু যাচ্ছি গ্রামে আপনার "টনিকের" খোঁজে, দেখি কেমন কাজ দেয়। ভবেশবাবুর মুখের চেহারা দেখে ভীষণ খুশী ডাক্তার "বরাট"।
- "আরে যাওয়ার নামে আর প্রিপারেশন-এ তো আপনার সব রোগ পালিয়ে গেছে, আধ ফোঁটা 'গোলাপের কুড়ি' মনে হচ্ছে আপনাকে। এটাই তো চাই।
নির্দিষ্ট দিনে 'জগন্নাথে'র মাসীর বাড়ী যাওয়ার মতন তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। "পুরাতন ভৃত্য" তো আর আজকাল কার দিনে তার "বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে" গিন্নি ক্ষান্ত হতে পারলেন না, হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, "আমি লাজপত নগরের সেন্ট্রাল মার্কেট এবং সরোজিনী নগরের ব্যাগ, চপ্পল আর সালোয়ার কামিজের বাজারে ঘুরে শপিং করতে যাচ্ছি, নিজের কি কি নেবে ঐ সুটকেশটাতে ভরে নাও, VIP টা আমি নেব। স্ত্রীকে চিরকাল VIP ট্রিটমেন্ট দিতে হয় একথা তিনি খুব ভালো করে জানেন। স্বামীদের জীবন যে সংসারের রঙ্গমঞ্চে স্ত্রীর সামনে কতটা গৌণ তা ভুক্ত ভোগীরা সবাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।
"নীলাচল" এক্সপ্রেসে প্রথমে বাঁকুড়া, সাতদিন পরে পুরী এবং সেখানে একসপ্তাহ কাটিয়ে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় স্বাস্থ্য ও মন পরিবর্তনের কোনো এক অজানা "টনিক" সেবন করে ফেরত আসা - এই পরিকল্পনা যোজনা বানিয়ে ট্রেনে বসলেন, ভবেশবাবু সস্ত্রীক। ভয় না টেনশন কে জানে, বুকটা ধড়ফড় করে উঠল অকারণ উত্তেজনায়। স্ত্রী তখন পাশের মহিলার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছেন অপটু স্বামীর নার্ভাসনেস নিয়ে।
গাজিয়াবাদ পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের আঁখের ক্ষেতের মধ্যে এসে ট্রেনের গতি গেল বেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সব আশংকা ভয় চিন্তাও দূরে সরে যেতে লাগল মন থেকে। সবুজ আর সবুজ ক্ষেত অবুজ শিশুদের মত মাথা দুলিয়ে যেন আনন্দে বিগলিত। বড় ভাল লাগল তাঁর। ভাবলেন ডাক্তারবাবুর কথা শুনে ভালোই করেছেন। বিভিন্ন টিফিন বাক্স খুলে ততক্ষনে বিকানীরের নমকিন, বাঁটনেয়ালী মহীয়সী মাড়োয়ারী "বহনজি" মায়াবন বিহারিণী হরিণী - পাটনার বাক্য পটিয়সী আচার, ছাতুর পরোটা চখানেয়ালী তরুণীর সঙ্গে তাঁর গিন্নি বাঙালী আলুর দম লুচি দিয়ে পিকনিক জমিয়ে ফেলেছেন। সকাল বেলায় পেপারটা পড়া হয়নি তাই সদ্য স্টেশন থেকে কেনা খবরের কাগজে চোখ বোলাতে অথবা বলা যায় এসব মেয়েলী গল্প কথা বা দৃষ্টির আড়ালে যাবার জন্য নিজের আমড়ার মত গোমড়া মুখটি ঢাকতে সবে টাইমস অফ ইন্ডিয়াটি খুলে মেলে ধরেছেন, চোখের সামনে গিন্নি এক ঝটকায় সেটি কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে আরম্ভ করলেন। "আরে করো কি করো কি"? বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন কাগজের টুকরোগুলি নেমন্তন্ন বাড়ির পাতার মতন ট্রেন পিকনিকের অতিথি সৎকারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনা-সামনি সব যাত্রী বন্ধুই পরম আনন্দে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা খাবারের স্বাদ নিতে ব্যস্ত। ছেলেরা এত তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব পাতাতে পারে না কেন কে জানে? বিশেষতঃ গল্প শুরু করলেও রাজনীতি দুর্নীতি আর ক্রিকেট প্রীতি ছাড়া যে পৃথিবীতে অন্য কোনো টপিক নিয়েও বাক্যালাপ করা যায় এ তারা ভাবতেও পারেন না। মেয়েরা কেমন মনের-প্রাণের কথা ছেলে-মেয়ে, বৌ-জামাই, ঘর-সংসার সব নিয়ে এক মিনিটেই একজন আরেকজনের হেঁসেলে, অন্দরমহলে, বেশী সময় থাকলে বেডরুমের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। স্বামীদের আলুর দোষ, পটোলের প্রীতি কিছু নিয়ে আলোচনা করতে তাদের মুখে আটকায় না। পারেও বাবা এরা বকবক করতে! ভাবতে থাকেন ভবেশবাবু।
সন্ধ্যে গড়িয়ে এলো। ছুটে পার হয়ে যাওয়া অসংখ্য জীবনমুখী কবিতা মাখা গ্রাম সূর্য্যাস্তের পর্যন্ত রোদের রক্তিম আভা, ঘরে ফিরে যাওয়া গরু-ছাগল মোষ - রাখালের দল, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীদের আকাশ থেকে গাছের বাসায় প্রত্যাবর্তন, - দেখতে দেখতে মনটা যখন উদাস হয়ে অনেক দিনের সেই ভুলে যাওয়া গানের কলিটা মনে মনে ভাঁজছেন - "দিনের শেষে ঘুমের দেশে...."
- শোনো ঘুম পেয়েছে তো বাঙ্কে শুয়ে পড়ছো না কেন।
- সব ভাবনার সুর হটাৎ ঝনাৎ করে কেটে যাওয়ায় একটু রাগত স্বরে বলে উঠলেন ভবেশবাবু "ঘুম পাবে কেন এত তাড়াতাড়ি"। তোমার জায়গা চাই তো বলো উঠে যাচ্ছি ওপরে।
- ভালো কথাই তো বললাম, অতো খেঁকিয়ে কথা বলছো কিসের জন্যে? আমি কি আমার জায়গার কথা বললাম নাকি?
- কথা না বাড়িয়ে উঠে বাথরুমের কাছে গিয়ে একটা সিগারেটে ধরালেন তিনি।
এবারে শুয়ে পড়া যাক ভেবে রাবারের বালিশটি ফোলাতে উদ্যত হলেন ভবেশবাবু। ঠিক সেই সময় মোক্ষম প্রশ্ন মলিনাদেবীর।
- মায়ের সেই টিকলিটা এনেছো নাকি?
- হ্যাঁ, ওটা আমি মাসীর মেয়েকে দেব।
- তোমার জন্যে যেন মাসীর মেয়ের বিয়ে এতদিন আটকে আছে? যদি সেই মেয়েকে না পাও তো ...
- হ্যাঁ, ওটার দিকে তোমাদের সবাইকার লোভ আছে জানি, কিন্তু মাসীর কি একটাই মেয়ে নাকি, মায়ের যখন ইচ্ছে ছিল, আমি তখন মাসীকেই দিয়ে আসবো।
- কেন? সে বুড়ি কি চিতায় যাবার সময় পরে যাবে নাকি?
- দেখো সব সময় ঐ সব বাজে বাজে কথা বলবে না। পিতু মাসী মায়ের থেকে অনেক ছোট ছিলেন, আমার চেয়ে বড়জোর পাঁচ/ছয় বছরের বড়।
- আচ্ছা আচ্ছা খুব দরদ উথলে উঠছে যে দেখছি, "টনিক" পাবার লোভে।
আর কথা বাড়ালেন না তিনি স্ত্রীর সঙ্গে। ভোর রাত্রে ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসলেন, ট্রেন থেমে আছে, যাত্রীদের শোরগোল, কুলিদের হৈ হল্লা ছাপিয়ে নিজের নামটা কানে গেল তাঁর।
- হ্যাঁরে 'ভবা' আছ নাকি এই কামরায়? কুথা গেলেক ব ডিল্লির ছা ট।
- ষাট বছরের ভবেশবাবু সোমেন মেসোর কাছে এখনও ছোট "ছা" হয়ে গেলেন, ষোলো তরুনের মতন ঝট করে বাঙ্ক থেকে নেমে কোনো রকমে চাদর টাদর টেনে গোল করে আওয়াজ দিলেন।
- মেসোমশাই এই যে আমরা নামছি নামছি।
- স্ত্রীও তখন জানলা দিয়ে দেখে নিয়েছেন স্টেশন এর নাম "বাঁকুড়া"।
দুটো কুলী উঠে পড়েছিল, তাড়াতাড়ি 'মাজী'কে ধরে নামালো তারা। ভবেশ স্যুটকেশ হাতে নিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়াতেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
"নীলাচল" থেকে ধরাতলে পা দিতে গিয়ে হুড়মুড় করে প্লাটফর্মে পড়লেন মেসোমশায়ের গায়ের ওপর।
সস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন ৭২ বছরের ফুর্তিবাজ সতেজ মানুষটি। অর্দ্ধেক রাতে স্টেশনে এসে বসে আছেন, অতিথিকে সম্বর্ধনা জানাবার জন্য আশ্চর্য্য প্রাণবন্ত, বয়সের নাগাল না পাওয়া বৃদ্ধ-যুবক। দুই শক্ত বাহুর আলিঙ্গনে ধরা দিয়ে পরম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন "ভবা"।
ভোরবেলায় সূর্য্যের লাল আভায় শালগাছে ঘেরা বাঁকুড়ার গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ ভুলিয়ে দিল সারা পথের ক্লান্তি। 'সুপুর' যাওয়ার রাস্তায় শিমুল-পলাশের মাথায় লেগেছে রঙের আগুন। পঞ্চাশ বছর, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর (দশ বছরে সেই শেষ আসা) মাসীর বাড়ী আসছেন, ভবেশবাবু আর এতগুলো বছর তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন বসন্ত ঋতুকে। "ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে, ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে -
- হুঁ তা যা বলেচ বাপ, ই রাস্তা ট বড় সোন্দর। হুই উধারে তাল ডাংরা ... ঝিলিমিলি, সিমলাপাল। দু-দিন জিরাই লে, তোদিকে "মুটুকমুনিপুরটা"ও দেখাই লিয়ে আসবো।
- মেসোমশাই-এর মিষ্টি বুলি আর কবিতার ছন্দে দোল খাওয়া গ্রামের নামগুলো ভবেশবাবুর বুকের মধ্যে যেন জল-তরঙ্গ বাজিয়ে দিল।
- মুটুকমুনিপুর লয় গো কর্ত্তা মুকুটমণিপুর বটে - ট্রেকার তথা গাড়ির চালক মেসোর ভাষা মার্জনা করতে চাইলো।
- হঁ হঁ লে তোকে আর 'বাকচাতুরী করতি হবেক লাই, তাড়াতাড়ি যেতে লাইরচু, তোর গিন্নিমাকে তো জানুস নাই অতখন দশবার ঘর বার কইরবেক।
- ট্রেকার বা জিপের চালক হর্ন বাজালো ভোঁ ভপ ভপ।
গ্রামের খোলা মেলা পরিবেশে কী যে ভালো লাগল ভবেশবাবুর তা অবর্ণনীয়, রোজ সকালে ক্ষেতের আল ধরে ধরে তাল দীঘির ধারে বেড়াতে যাওয়া, মুড়ি চপ দিয়ে জল খাবার খাওয়া, দুপুরে টাটকা মাছের ঝোল ভাত, রাত্রে বাড়ির চালে বড় হওয়া মিষ্টি কুমড়োর ছক্কা লুচি কিম্বা হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়া বড়ই আনন্দের। সন্ধ্যেবেলায় বাঁকড়ী ভাষায় গাওয়া কীর্তন, গৌরাঙ্গ মেলায় খোলের সঙ্গে পুরোনো হারমোনিয়ামের গান - "মালা কে লিলি রে? পাড়ার ছিল্যারা/গৌড় আমার কেঁইদ্যে আকুল মালা দ্যে তরা"।
একদিন শখ করে আদরের ভবাকে মেসোমশাই বেশ বাগিয়ে পরিয়ে দিলেন নিজের একখানা ধুতি, কিন্তু দিল্লীর বাবু সেটি পরে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গুলি ডান্ডা খেলতে গিয়ে পড়লেন ধড়াম করে। তাঁর সেই শিশু সুলভ আনন্দ ও পতন দেখে গ্রাম সুদ্ধ লোক তো হেঁসেই বাঁচে না।
যাবার দিন এসে গেল, ঠিক বেরুবার আগে টিকলিটি মাসীর হাতে দিয়ে বললেন ভবেশবাবু 'এটি মা তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য রেখে গেছেন'।
সেটি প্রথমে হাতে নিয়ে দেখলেন দুজনে তারপর মাথায় ঠেকিয়ে বললেন - "বৌমা ইটি তোমার শাশুড়ির জিনিষ তোমার ছিল্যার বৌ এলে দিও। আমার বিটির বিয়া তো কতদিন আগ্যে হই গ্যাছে, উয়াকে আর দিতে হবেক লাই"। মলিনার চোখে জল, স্বামী কে বললেন এতো তাড়াতাড়ি পুরীর টিকিট কেন কাটলে? আরো কিছুদিন এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে। ভবেশবাবুকে মেসো ছোট বাচ্চার মতন জড়িয়ে ধরে বললেন হ্যাঁ তাই ভালো। রিটায়ার্ড জীবন, কাজ তো কিছু নাই তোর ভবা, অখন য্যাত্যে হবেক নাই। সাত/দশ দিন আরো থাক, তারপর না হয় জগন্নাথ ধামে যাবি। পিতু মাসীমা বললেন, হ হ আমারও অনেকদিন জগন্নাথ দর্শন হয়নি, চলো না আমরা সবাই একসঙ্গে যাই। মলিনাও আদুরে মেয়ের মতন মাসীমার হাতটা ধরে গদগদ কন্ঠে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ তাহলে তো খুব মজা হয়। ভবেশবাবু কত বছর পর স্ত্রীর মধ্যে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের ভাব দেখেননি। ভীষণ ভালো লাগলো তাঁর। টিকিট ক্যান্সেল হল। তারপর ওই চারজন সিনিওর সিটিজেন মিলে পুরীর সমুদ্র সৈকত হোটেলে আরো এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন, এক অনাবিল সুখের সাগর ভাসলেন তারা, যেন শৈশব ফিরে এল আবার তাদের জীবনে। আসবার সময় মাসী মেসো নেমে গেলেন বাঁকুড়ার স্টেশনে, এবং তাদের আন্তরিকতার টনিক পান করে অশ্রুসিক্ত নয়নে  মলিনা দেবী ও ভবেশবাবু নতুন মানুষ হয়ে ফিরে এলেন দিল্লি শহরে।

নীরব অভিসার (Nirob Abhisar)

চন্দনা সেনগুপ্ত



হাতে "ডোনেশন" বাক্স নিয়ে ঘুরছিলাম সমুদ্রের ধারে। দেখা হল, সেই ছেলেটির সঙ্গে। শান্ত স্নিগ্ধ চেহারা, একটু তামাটে রঙ, মাথায় কোঁকড়ানো থাক থাক চুল। পশ্চিমে মুখ করে স্থির হয়ে বসে সে, বোধহয় সূর্য্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্যে। সমুদ্রের নীল জলে তখন আলোর আল্পনা। রোদের তেজ কমে এলেও চোখের গগলসটা খোলেননি তিনি। কী যেন একটা আকর্ষণ আছে ঐ বুদ্ধিদ্বীপ্ত চেহারার মধ্যে, বারবার চোখ চলে যায় তার দিকে, "বন্দর" পাহারারত "নৌ সেনাদের" একটি হেলিকপ্টার মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে খুব কাছে চলে এল, বোধহয় তার শব্দ শুনেই ওপরে তাকালেন, মুখ তুলে। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ্য করলেন, ঐ যন্ত্র পাখিটার ওড়বার গতিপথ।
একটু পরে বিশাল এক মালবাহী জাহাজ ধীর গতিতে এগিয়ে এল, এই "সানফ্রান্সিসকো" বন্দরের ঘাটে, নোঙর ফেলবার জন্যে। তার ধাক্কায় বিরাট কয়েকটা দানবী ঢেউ আছড়ে পড়ল পাথরের বাঁধানো - দেওয়ালটার ওপর। জানি না, শব্দ করে উঠল কিনা 'ছলাৎ ছলাৎ ছল' - কিন্তু আমার মনে হল হাস্য মধুর সুরে ওরা যেন ডাক দিল. - 'বল, বল না কথা বল'। এটা অবশ্য আমার অনুমান, কারন ঐ তরঙ্গ বা হাওয়ার শনশনানি কোনোটাই তো আমি শুনতে পাই না। ওরা যতই আমায় ওদের সভায় গাইতে বলুক, আমি তো গাইতে পারিনে এক কলিও। কারন আমি যে বধির মূক। অবশ্য বোবা কালা হওয়ার জন্য দুঃখ নেই আমার কোনো। মা বলেন, এটা নাকি শব্দ দূষণের যুগ। বাস, ট্রেন, প্লেন বা মোটর বাইকের শব্দে নাকি তাঁদের কান ঝালা পালা হয়ে গেছে।
সব চেয়ে অবাক লাগে যখন লাল আলোর ঝলকানি তুলে পুলিশের গাড়ি কিম্বা অ্যাম্বুলেন্সগুলো যায় তখন অনেক বুড়ো বুড়িকে দেখি কানে হাত চাপা দিতে। ওদের 'সাইরেন' ভীষণ কান ফাটানো আওয়াজ তোলে। আমি কিন্তু ওদের কাজের 'গুরুত্ব' অনুভব করে তীব্র বেগে ছুটে চলার গতি দেখে খুব উৎসাহ অনুভব করি।
'ডোনেশন বাক্স'তে চাঁদা সংগ্রহ করতে বেরিয়ে আজ কেমন যেন একটা লজ্জা ভাব আসছে মনে। আমাদের চেয়েও তো কত অসহায় দুঃখী মানুষ আছেন, এ সংসারে তাদের কথাই মনে পড়ছে। যদিও এ চাঁদার অর্থ আমাদের বোবা-কালা স্কুলের দুস্থ ছাত্রদের জন্যই ব্যয় করা হবে, তবু অনেকের কাছেই এটাতো একটা ভিক্ষাবৃত্তি। তবুও কেউ কেউ এক দু ডলার ফেলে যাচ্ছেন আমাদের কৌটোতে এবং আমি ওদের বুকে লাগিয়ে দিচ্ছি ছোট্ট একটা 'পতাকা'। স্মিত হাসি দিয়ে মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের।
ধীরে ধীরে ছেলেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে সে বলল - হাই, কিন্তু দানপাত্র সামনে তুলে ধরতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিছুই না দিয়ে। চাঁদা না দেওয়ার জন্যে নয়, একজন তরতাজা যুবকের কাছ থেকে উপেক্ষা পেয়ে মনটা ভীষণ কুঁকড়ে গেল। মনে হল বোবা বলেই বোধহয় এমন ব্যবহার পেলাম।
বাড়ি এসে মাকে বললাম ঐ অভদ্র ছেলেটার কথা - ইশারাতে। মাও তার হাত মুখ নেড়ে শব্দহীন ভাষায় বোঝাবার চেষ্টা করলেন, অত অল্প সময়ে কাউকে দেখেই বিচার করা ঠিক নয়, হয়তো ওর পকেটে খুচরো ছিল না, তাই লজ্জাই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। - সত্যিই! এই কথাটা তো মাথায় আসেনি আমার। অযথা এমন রাগ করা উচিত হয়নি আমার।
পরেরদিন আবার বেশ সেজে গুজে বেড়াতে গেলাম সমুদ্রের ধারে। পড়ন্ত সূর্য্যের আলোয় সাগরের ঢেউগুলি মাথায় পড়েছে লাল, বেগুনি রঙিন মুকুট। সাদা সাদা সীগল বলাকা আর হাঁসেরা ভিড় জমিয়েছে, সাগর তটের "ম্যাক্সিকান" মাছ বিক্রেতার সামনে। ফুটপাতের ধারে কেউ বিক্রি করছে মুক্ত মালা, কেউ বা হাতে বোনা দস্তানা, টুপি। আমি অন্য দিনের মতন লোকের মেলা দেখতে বসেছি, চোখ কিন্তু খুঁজে চলছে অন্য একজনকে।
হ্যাঁ, ঐ তো, ঐ তো সে ওখানে দাঁড়িয়ে। জেটির পাশে, যেখানে দুটি "ল্যাটিন আমেরিকান" ছেলে বাঁশি আর গিটারের তালে নাচ, গান অভিনয় দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে - সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন ঐ পথ শিশুদের। আর তারপর পকেট থেকে নোট বের করে মেলে ধরলেন তাদের সামনে। আবার রাগ ধরলো আমার। 'বা, বা এদের বেলায় তো বেশ উন্মুক্ত হস্ত, মূক বধিরদের প্রতি তোমার যত অবহেলা।
অচেনা অজানা যুবকের প্রতি এমন অভিমানের কারন খুঁজে পাচ্ছি না, কিন্তু মন টানছে বারে বারে ওঁরই দিকে। ভিড়ের সঙ্গে মিশে একেবারে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ঠিক সেদিনের মতো বললেন - "হাই" কিন্তু অন্য যুবকদের মত আলাপ করতে চাইলেন না। বাড়ি ফিরে এসে মনে হল, আমার এই নিঃস্তব্ধ জগতে আমি তো নীরব নই - কত কাজে ব্যস্ত থাকি, বই পড়ি, সাঁতার কাটি, শান্তির জন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে পুরুস্কার পাই। ছোট থেকেই মা আমাকে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সেই ওয়াশিংটনের "গ্যালন্ডট" (Gallandet) থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাবার জন্য ভর্ত্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে শিখেছি (Gestuno) 'গেসটুনো' ইঙ্গিত ভাষা। বিশ্ব সম্মেলনে জ্ঞানী-গুণীদের সমারোহতে মূক বোধির বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিম্বা শিল্পীরা তাদের বিভিন্ন কাজ বা জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। (Lixicalize design) লেক্সিকালাইজ সেই চিহ্ন ভাষাতেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করায়, "আঙ্গুলের" মাধ্যমে অনেক অব্যক্ত শব্দহীন বাণীতে অর্থাৎ অভিব্যক্তির সাহায্যে আমি তো কথা বোঝাতেও পারি, কিন্তু এইসব আমার মূক বধিরদের সঙ্গে communicate অর্থাৎ যোগাযোগ করবার জন্য। 



যে আমার দিকে তাকাচ্ছেই না, আজ তাকে কেমন করে ডাকব আমি, ভিড় পাতলা হলে ছেলেটি একটু এগিয়ে হটাৎ থামলো, পকেট থেকে বার করলো তার "সাদা ছড়িটি" আর পাথরের ওপরে লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে গেল, রাস্তা পার হবার জন্য। চমকে উঠল আমার সমস্ত সত্তা। ছেলেটি অন্ধ। অনেক্ষন একা বসে রইলাম, সাগরের নীল জল আর আকাশ যেখানে এক হয়ে গেছে সেই দিগন্তের পানে তাকিয়ে। এতো সুন্দর পৃথিবী - এই সফেগ্ন উর্মিমালা, পাথরের পায়ে মাথা কুটছে। সদাই - ছোট ছোট তরঙ্গের খেলা। এই "সূর্য্যাস্তের" আলোয় রক্তিম, বর্ণালী ছটা - শ্যামল সবুজ শ্যাওলা কিম্বা নানা ধরণের হাজার পোষাক পরা মানুষের মিছিল - কিছুই তো দেখতে পায় না উনি।
পরদিন থেকে রোজ আগে ভাগে এসে বসে থাকি, ওঁর প্রিয় জায়গাটাতে। বিকেল ৬টা বাজলেই হয়, তাঁর আগমন - আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে, ছড়ি খুলে ধীর পায়ে উঠে যান, হাসি মুখে এবং যাবার আগে বলেন 'বাই'। আমি তো যথারীতি নিরুত্তর।
কিন্তু বাড়ি এসে শুরু হয়, আমার অদম্য প্রচেষ্টা নতুন এক 'সাধনা'। যুবকটির প্রতি গভীর ভালোবাসা।
দিনে দিনে আমার আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে বাড়িয়ে, ওঁর কাছে - আপন মনের অব্যক্ত ভাবনাকে একদিন প্রকাশ করতেই হবে আমায়, তাই আমি শিখতে শুরু করেছি - "ব্রেল লিপি"। কম্পিউটার খুলে বসে গেছি - আমি নতুন রকমের পড়াশুনোয়। নিঃস্তব্ধ জগৎ আমার হয়ে উঠেছে, আরও বাঙময়। আর জ্ঞান সাধনার সঙ্গে সঙ্গে চলছে আমার "নীরব অভিসার"। সে দিনটা ছিল রবিবার। মা ও আমি বেড়াতে এসেছি বন্দরের ধারে। 'আল্যাস্কা' থেকে আগত এক বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ এসে দাঁড়ালো জেটিতে। সেখান থেকে এবার নানা পোষাক পরা নানা ধরণের বিচিত্র সব মানুষ নেমে আসছে, সারিবদ্ধভাবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তাদের দিকে। বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ চোখ পড়ল ভিড় ঠেলে অতি সন্তর্পনে সাদা ছড়ি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁকে দেখতেই অদ্ভুত একটা যেন বিদ্যুতের প্রবাহ ছুটে গেল, দেহে মনে।
'মা'কে ইশারায় দেখলাম মানুষটিকে, আমার রক্তিম লজ্জা জড়ানো মুখের চেহারা লক্ষ্য করে প্রথমে স্মিত হাসিতে ভরে গেল তাঁর মুখ কিন্তু ওঁর হাতের "সাদা ছড়ি"-টির দিকে তাকিয়ে কুঞ্চিত কপালে চিন্তার ছাপ পড়ে গেল এক নিমেষে। ঝলমলে সূর্য্যকে এক চিলতে কালো মেঘ যেমন করে ঢেকে দেয়, তেমনি বিষাদময় হয়ে উঠল মায়ের দৃষ্টি। ভীষণ অসহায় লাগলো আমার। বাবাকে অকালেই হারিয়েছি। আমার মতন বোবা কালা মেয়েকে নিয়ে অনেক দুঃখে অনেক কষ্ট সহ্য করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে সংসারে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাঁর মন সর্বদায় চাইছে, আমার কোনো প্রকৃত বন্ধু বা জীবন সঙ্গীকে দেখতে - সে ইচ্ছেটা এবার হয়তো পূর্ণ হবে ভেবেছিলেন কিন্তু এখন ভীষণ হতাশ লাগলো তাঁকে। জীবনের কোন সমস্যা আঘাতেও তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি কিন্তু দৃষ্টিহীন প্রেমিকের প্রতি আমার এই একতরফা প্রেমের উচ্ছাস আবেগ তাঁকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্থ করে দিল। কি ভাবে এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াবো ভাবছি, ঠিক সেই সময় উল্টো দিক থেকে একটি তরুণ ছেলে পায়ে স্কেটিং এর চাকা পরে এগিয়ে এল দ্রুতবেগে। সামনে আগত ভিড় দেখে আস্তে করার চেষ্টা করলো হটাৎ, আর ঠিক তখনই নিজেকে সামলাতে না পেরে সজোরে ধাক্কা মারলো সাদা ছড়ির ভদ্রলোককে। দু'জন দুদিকে ছিটকে পড়ল তারা। হৈ হৈ করে ছুটে গেল অনেক লোক একসঙ্গে। আমি চিৎকার করে কিছু বলতে গেলাম, মুখ দিয়ে শুধু আওয়াজ বেরোলো আ...। আমি ছুটে গেলাম তাঁর দিকে। এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়তে চাইলেন তিনি, এবং প্রথমেই খোঁজ নিলেন অন্য ছেলেটির। সেও উঠে পড়ে হাতের ছড়িটা ধরিয়ে দিয়ে 'সরি' বলল তাঁকে এবং বোধহয় জিজ্ঞেস করল লেগেছে কিনা। তিনি হেসে কিছু উত্তর দিলেন, ঠোঁটের ভাষা পড়ে আশ্বস্ত হলাম আমি। না বেশি লাগেনি তবে ডান হাতের তালুটা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। এবার মা গিয়ে তাঁকে বাঁ হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। অন্য দু একজন ঝেড়ে দিল তাঁর জামা প্যান্ট, আমি ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলাম। ডান হাতের তালুটা কেটে রক্ত পড়ছে দেখে। মা তখন ওর বাঁ হাতটা ধরে ফুটপাতের কফি শপে বসালেন। হাসি মুখে বারে বারে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন তিনি। এবারে আমার দিকে ফিরে কোন প্রশ্ন করলেন, আমার হয়ে মা উত্তর দিতে লাগলেন ধীরে ধীরে। শব্দগুলো শুনতে না পারলেও বুঝতে পারলাম, কথা হচ্ছে আমাকে নিয়ে। টেবিলের ওপর অসার হয়ে পড়ে থাকা আমার হাতের "দশটা আঙ্গুল" যেন অবাধ্য হয়ে উঠতে চাইল। একবার তাদের দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, একবার কোলে রাখছি, আর কেঁপে কেঁপে উঠছে তারা অসংযতভাবে। কেমন একটা আবেগের উচ্ছাসে চোখের পাতা নত হয়ে আসছে, তিনি আমার চোখে চোখ মেলাতে অসমর্থ জেনেও সোজাসুজি তাকাতে পারছিনা আমি। অনর্গলভাবে কথা বলে যাওয়ার সুযোগে মা হয়তো শুনিয়ে যাচ্ছেন আমাদের জীবন কাহিনী।
এই কয়মাস ধরে রোজ এসে বসেছি, তাঁর পাশে। কিন্তু ব্যক্ত করতে পারিনি নিজের মনের ভাব। বুঝতে পেরেছি, "ভালোবাসা কারে কয়"। আর সে যে কেবলি যাতনাময় - তা আমার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ অনুভব করতে পারেনি কোনোদিন। 'বোবা' মেয়ের ভালো লেগেছে অন্ধ ছেলেকে। সহানুভূতি দেখানোর জন্য নয়, অদ্ভুত একটা আকর্ষণে সে ক্রমশঃ তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভালোলাগা - ভালোবাসা জানবার অদম্য ইচ্ছেটাকে চাপতে চাপতে বুকের ভেতরে যেন এতদিনে একটা ব্যাথার পাহাড় জমা হয়ে গেছে তাই আজ সেই সৌম্যকান্তি রূপ আমারই আলোচনায় মগ্ন অদ্ভুত একটা আনন্দবীণা ঝংকৃত হল সমস্ত সত্তা জুড়ে, কফি শেষ হলে এবার আমার হাতের ওপর হাত রাখলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে শিরা উপশিরা ধমনীতে ধমনীতে বয়ে গেল যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ। মা তাঁর ব্যাগ খুলে ছোট্ট নোটবুকটা বের করে লিখলেন, ওনার ফোন এবং ইমেল নম্বর। উনি মন দিয়ে শুনলেন আমাদের ইমেল ঠিকানা, ধন্যবাদ জানালেন। হাসিমুখে হাঁসতে হাঁসতে একসঙ্গে তিনজনে রাস্তা পার হলাম আমরা। রাস্তার ওপারেই ওনার এপার্টমেন্ট, সেখানে গেটের পাশে বাঁধা ছিল এক সুন্দর শুভ্র কুকুর। কাছে যেতেই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাত চাটতে ল্যাজ নাড়তে লাগল, তার সেই প্রিয় সঙ্গী।
সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে এলাম আমরা অসম্ভম ভালো লাগার আবেশ নিয়ে। মাকে জড়িয়ে ধরলাম গদ গদ হয়ে, মা তো আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন আমার মনের অবস্থাটা। আমাকে দুই গালে চুমু খেয়ে ইশারায় ঠোঁট নেড়ে বললেন - তোকে চিনতে পেরেছেন উনি, তুই যে ওর পাশে রোজ এসে বসতিস নিঃশব্দে তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ওনার। আমি অবাক হয়ে মাথা নাড়লাম - না না তা কি করে সম্ভব। বিস্ময় প্রকাশ পায় আমার চোখে মুখে। মা হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের দিকে। সেখানে রাখা "সুগন্ধি শিশিটা" অর্থাৎ আমার নিত্য ব্যবহার্য্য "পারফিউমটা" তুলে এনে দেখালেন উনি হেসে - 'এটার গন্ধে', এবার পরিচয় দিলেন ছেলেটির।
সুদূর ভারত থেকে ছেলেটির নাম কৃষ্ণ রাও। "গুগল" কোম্পানীতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তিনি, বয়স ৩৫, মনের মতন গার্ল ফ্রেন্ড না পাওয়ায় বিয়ে করেননি এখনও। সবদিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। কেউ তাকে সহানুভূতি দেখাতে এলে তার কাছ থেকে সরে যান তিনি। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরও মন চঞ্চল হয়েছে। বিশেষতঃ আমার 'নীরবতা' ভীষণভাবে তাঁকে বিচলিত করেছে, একথাও জানাতে দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানের অতুলনীয় সংমিশ্রণ, আন্তরিক কথাবার্তা এক ঘন্টার মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছে, মায়ের সব ভাবনা চিন্তা ও ভয়ের মেঘ, আমি তো আনন্দের সাগরে যেন ডুব দিয়ে উঠেছি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সকালে উঠেই প্রথম ইমেল পেলাম কৃষ্ণ রাও-এর কাছ থেকে - আমি তোমার জুঁই ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা পাগল। বন্ধু হবে নাকি আমার, একটু সময় দিলে শিখে নিতে পারি, তোমার "ইশারার ভাষা"। আমার হাতের মুদ্রা তখন কথা বলবে তোমার সঙ্গে। মধুর পরশ ধন্য করেছে আমায় - জবাব দিলাম আমি - শুধু বন্ধু নয়, জীবন সাথী হতে চাই - সুযোগ দেবে কি তুমি?
সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট-এ আমার উত্তর এল তার কাছ থেকে। "ভীষণ ভাল লাগছে তোমার ছোট্ট ইমেল পেয়ে, কেমন করে "হ্যাঁ" বললে, তুমি শুনতে সরি বুঝতে পারবে বলো তো আমার "জেসমিন"?
এবার ব্রেল লিপিতে বড় চিঠি লিখে ফেললাম আমি। প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেলাম দুজনে।

খেজুর গুড়ের গন্ধ (Khejur Gurer Gondho)

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের সামনে বেশ রোমান্টিক কায়দায় সেলফি তুলছে মিতা আর উদয়ন, ভারী সুন্দর মূহুর্ত্ত। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সোনালী আভায় সব যেন ঝলমল করছে। ঠান্ডা হাওয়ায় মন স্নিগ্ধ হয়ে গেছে। উদয়ন একজন প্রফেসর। প্যারিসের বিখ্যাত MBA কলেজ "NSEAD"-এ পড়ায়। আর মিতা আরেকটি কলেজে পি এইচ ডি করছে। জীবাণুদের ওপরে রিসার্চ করে সে। আর কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানী হবে, 'ডক্টরেট' আখ্যা পাবে।
মনের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দর দেশে, এতো মনোরম পরিবেশে, বিশ্বের নানা ধরণের লোকের মাঝে বসে থাকতে - দু জনেরই খুব ভালো লাগছে। হঠাৎ কাছে এসে দাঁড়ালো একটি ছেলে। হাতে তার অনেক ফুলের গুচ্ছ। উদয়নের দিকে এগিয়ে দিলো একটা। টিউলিপের তোড়া, ইশারায় একটু দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে দেখালো মিতাকে। অর্থাৎ ফুলের তোড়া কিনে বৌকে উপহার দেওয়ার একটা উপযুক্ত সময়, এটাই বোধহয় ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলো সে। উদয়ন পকেটে হাত রাখলো। মিতাকে জিজ্ঞেস করল, - "তোমার কাছে দেখতো খোলা 'ইউরো' আছে কিছু"?
ছেলেটি এক মুখ হেসে প্রশ্ন করলো -
"আপনারা বাঙালি"?
হ্যাঁ, তোমার বাড়ি কোথায়? মিশুকে মেয়ে মিতা কথা আগে বাড়ালো।
"আমাগো দ্যাস চিটাগাং, ইন্শাল্লাহ, আপনাগো দেইখ্যা বড় আনন্দ হইতাসে, আপা"।
"এই বিদেশে এতো কস্টলি জায়গায় শুধু ফুল বেচে তোমার চলে কি করে"? মিতার কথার সুরে খুব আন্তরিকতা ছিল।
ছেলেটি উৎসাহিত হয়ে আবেগ প্রবন হয়ে বসে পড়লো কাছের বেঞ্চে। "না গো আপা, এই এক কামে চলুম না, সকালে পেপার বিলি, পরে পিজজা ফ্যাক্টরী, বেকারির কাম, আর সন্ধ্যের পরে রেস্টুরেন্টে" -
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই উদয়ন প্রশ্ন ছুড়ে দিল, - "তাহলে ফুল কখন আনো"?
যেহেতু বিকেল ৪টা থেকে ৭টা বিশেষ কাজ থাকে না, তাই তার ঐ রেস্টুরেন্টের মালিক ফুল এনে দেন বিক্রি করবার জন্য। কমিশন পায় সে। এ কথা জানালো, ছেলেটি।
অন্যদিকে আরো বিদেশী লোকের ভীড় দেখে, ছুটলো সে ফুল বেচতে। যাবার সময় বলে গেল - যে তার নাম "আবু সৈয়দ", আপা যেন তাকে ভুলে না যায়।



এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জানুয়ারী মাস। ভীষণ শীত। কিন্তু সেদিন উজ্জ্বল রোদ উঠেছে। তাই উদয়ন ও মিতা বেশ ভালো করে ওভার কোর্ট ও টুপিতে শরীর ও মাথা ঢেকে আবার এসে হাজির হলো ঐ "আইফেল টাওয়ারের" সামনে। মিতা এদিকে ওদিকে খুঁজছে তার নতুন ভাই "আবু" কে। একটু পরেই এক মুখ হাসি নিয়ে সে এসে হাজির। পরনে কোর্টটি খুবই পুরোনো। ভালো কান ঢাকা টুপিও নেই তার মাথায়। কোনোরকমে মাফলার দিয়ে জড়ানো। এই ঠান্ডায় বেশি লোকও নেই, ফুলের বিক্রিও তেমন হচ্ছে না। আবুকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মিতার কাছে এসে সে বললো, -
"আপনার লেইগ্যে মনডা খারাপ করতাছিল আপা। ফোন নাম্বারটা একবার লইয়া যামু। কখনও সখনও বাংলায় কথা কইবার লিগ্যা মনডা কাঁদে"।
মিতা এবার ব্যাগ থেকে বের করল একটা প্যাকেট, ওর দিকে সেটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো, -
-"আমারও তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল। এই নাও এটা তোমার জন্য এনেছি খেয়ে দেখো"।
"আমার লাইগ্যা আপা খাবার জিনিষ আনতাছেন, ইনশাল্লাহ আপনারে কি কইরা সালাম দুয়া জানামু, কওনের ভাষা নাই"।
কলকাতা গিয়েছিলাম খ্রিস্টমাসের ছুটিতে। ওখান থেকে খেজুর গুড় এনেছি। তাই তোমার জন্যে খানিকটা দিলাম খেয়ো"। - মিতা সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।
আবু আনন্দে একেবারে গদ গদ হয়ে গেল।
উদয়ন জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কে কে আছেন? কতদিন পরে পরে সে দেশে যায়? কত টাকা সে জমাতে পারে ইত্যাদি নানা ঘরোয়া কথা পরম আত্মীয়ের মত।
আবু জানালো সে দুবছর হলো চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। ঐ রেস্তোরায় আরও দুজন চীন দেশের কুক, পাকিস্তানী মিস্ত্রি, ইন্ডিয়ান অফিসের কর্মীদের সঙ্গে ডরমেটরিতে থাকে। ঘরে আব্বু, খালাম্মা ও আরও দুই বোন ও এক ভাই আছে তার। মা ছোটবেলায় মারা গেছেন। বাবার সঙ্গে খালাম্মা অর্থাৎ মাসির বিয়ে হয়েছে এবং তিনিই নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি যত্নে ও স্নেহে তাকে মানুষ করেছেন। তাই তাঁকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তিনি আবার এই বিদেশে আসা নিয়ে খুব আপত্তি ও কান্নাকাটি করেছেন, কিন্তু বোনেদের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে - পাড়ার একজন চাচার সঙ্গে সে এসেছে এখানে। পানীর জাহাজে সমুদ্র পথে।
মন তার সবসময় পরে থাকে বাড়ির দিকে। এই বছর আর একটু পয়সা জমলেই বাড়ি চলে যাবে, আর আসবে না। খালাম্মার কথার অবাধ্য হবে না।



উদয়ন ও মিতা ওকে নিয়ে একটা রেস্তোরায় এল। ভাইয়ের মত সম্মান দিয়ে মন খুলে গল্প করতে লাগল তার সঙ্গে। মিতার মনে হল, সত্যিই যেন এক নিজের মামা কাকার ছেলেকে খুঁজে পেয়েছে বিদেশে। আর আবু সৈয়দ তো মুগ্ধ হয়ে গেল, এতো শিক্ষিত দুজন সম্ভ্রান্ত মানুষের সঙ্গে বসে একই টেবিলে খাবার খেতে খেতে ও নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে। "ইনশাল্লাহ আজ যে কি আনন্দ হইতাছে, কইতে পারুম না"।
কলকাতার পাটালি গুড়ের গন্ধে তার মন খুশিতে ভরে গেছে। উদয়নের হাত দুটি চেপে ধরে স্বজল নয়নে সে বললো, "আবার কহন দ্যাখুম আপনাগো"? মিতা বললে, "এই নাও ঠিকানাটা মেসেজ করে দিলাম, একদিন চলে আসবে আমাদের বাড়ি"।
আনন্দে আবেগে তার চোখের কোনায় জল এসে গেল।
ক'দিন পর থেকেই উদয়নের জ্বর, কাশি ও মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট শুরু হল। বুক ধড়ফড়ানি বেশি হতেই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেল সে, মিতার হাত ধরে। তখনও তারা জানে না, একটা বিরাট সাইক্লোন, টর্নেডোর চেয়েও ভয়ঙ্কর আঁধি রুপী মহামারী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে সমস্ত পৃথিবীকে।
প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে উদয়নকে পাঠানো হল সরকারি টেস্টিং সেন্টারে। সেখানে গিয়ে তো অবাক হয়ে গেল তারা। বহুলোক এসে জমা হয়েছে সেখানে। একই রকম সিম্পটম তাদের, জ্বর, শুকনো কাশি ও নিউমোনিয়ার মতন বুকে কষ্ট। এতলোক একসঙ্গে সংক্রামিত একই রোগে, খুব আশ্চর্য ব্যাপার মনে হল।
হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডাক দিল - "আপা গো একি হইলো? দাদা গো ধরছে এই রোগে? আমাগো চাইনিজ রুমমেট দ্যাশে যাইয়া নিউ ইয়ার কইরা, জ্বর লইয়া আইছে, ওগো থেইক্যা আমাগো কুক, মালিক, মিস্ত্রি কেউই বাদ যায় নাই, 'করোনা ভাইরাস' সবারে ধরছে"।
কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এবার উদয়ন ভর্ত্তি হল সরকারি হাসপাতালে। যমে মানুষে যুদ্ধ চলছে তার। বাড়িতে একা মিতা দিন রাত ঠাকুরকে ডাকছে, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে। এই দুর্দিনে দু বেলা ফোন করে তার মনের জোর বাড়িয়েছে তার আবু ভাই। সেও পড়ে আছে হাসপাতালের এক কোনে। কিন্তু ফোনে আপাকে সাহস জুগিয়েছে। "দ্যাখবেন, দাদা এক্কেরে ঠিক হইয়া যাইবেন"। সত্যিই হয়তো তার দুয়া কাজে লাগল উদয়নের। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তার জ্বর ছেড়ে গেল। এখন সে আর ভয় পায় না এই মহামারণ রোগকে। ল্যাবে গিয়ে ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানাতে, এই রোগের জন্য পরীক্ষা করতে সে নিজের রক্ত, প্লাজমা দান করল। তার ওপর টেস্ট করতে দিল নানান ওষুধ। যেমন কুইনিওন, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি। করেন্টাইনের ১৪ দিন সে ভলেন্টারি সার্ভিস দিতে লাগল, সেই হাসপাতালে। একদিন এইসব গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে সে খুঁজে বেড়াতে লাগল আবুকে। মিতাও জানালো যে তার ফোন আসছে না। প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে কোনার ঘরে চোখ পড়তেই দেখতে পেলো আবুকে। তার বিছানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখল সে। "আবু ভাই দেখো আমি ভাল হয়ে গেছি। তুমিও এই যুদ্ধে ঠিক জয়ী হবে, চোখ খোলো"।
শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন কম পড়ে গেছে। বড় বড় লোকেরাই পাচ্ছে না, আর এত এক অতি নগন্য "মাইগ্রেটেড লেবার"। অন্য এক অতি ছোট্ট দেশের থেকে জলের জাহাজের ডেকে বসে এই দেশে এসেছে পয়সা কমাতে। তার ওপরে অতিরিক্ত পরিশ্রমে, ভাল খাদ্য না খেয়ে, ইমিউনিটি পাওয়ারটাও গেছে একেবারে কমে। কি করে লড়বে সে ঐ 'কোরোনার' সঙ্গে।
ক্ষীণ হয়ে আসছে তার গলার আওয়াজ। কিন্তু এতদিন সে যেন উদয়নের অপেক্ষাতেই দিন গুনছিল। মিতা বলেছিলো একদিন, সে তখন গবেষণাগারে পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত ছিল। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাস বিজ্ঞানীরা স্যালাইভা, রক্ত, মাংস নিয়ে পরীক্ষা করেছে।
"না গো দাদা, আমারে জন্নত থেইক্যা আমাগো আম্মা লইত্যে আইসত্যাছেন। তবে আমার আর কোন দুঃখ হইব না, কারন তোমার দ্যাখা পাইছি শ্যাষ সময়ে। সারাডা দিন ধইরা আল্লাকে ডাকতাছি। একবার তোমারে য্যান পাঠায়ে দ্যান। আমার আর্জি শুনছেন তিনি"।
"বলো আবু কি করতে পারি আমি তোমার জন্যে। এই নাও কথা বলো আমার ফোনে তোমার খালাম্মার সঙ্গে"। - উদয়ন আন্তরিকভাবে ওর হাতটা চেপে ধরলো।
"আমি দুই সাল ধইরা যত কামাইছি এই থলিটাতে রাখা আছে। আমাগো দুই বোনের শাদি হইয়াও ঘর বানাইবার ট্যাকা থাকবো খালাম্মার হাতে। এহন এইগুলা আপনারে দিয়া যামু। একডা সোনার চেইনও কিনছি খালাম্মার লাইগ্যা। ছোড ভাইডারে এই ফোনটা দিবেন। কথা কওনের আর সময় নাই"।
উদয়ন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণ বন্ধুটির মাথায় হাত রাখলো। বললো - "আমি আর তোমার আপা নিজেরা চট্টগ্রামে তোমার বাড়ি যাব, খালাম্মার সাথে দেখা করব, আর তোমার বোনেদের বিয়ের জন্যে উপহার নিয়ে যাব। এখন থেকে তারাও আমাদের ভাই বোন"।
আবু আস্তে আস্তে তার ঐ বালিশের নিচে থেকে থলিটি বের করে উদয়নের হাতে দিল। কষ্ট করে চোখ খুলে দেখতে পেল, সেটি তার ঐ আল্লা প্রেরিত মসিহা, যত্ন করে একবার মাথায় ঠেকিয়ে আবার রাখছে, যেমন করে হিন্দু ভক্তরা পুজোর ফুলকে শ্রদ্ধাভরে রাখে। এবার অন্য হাতে ধরে রাখা আরেকটি ছোট্ট প্যাকেট নাকের মাস্ক সরিয়ে শুঁকতে লাগল প্রাণ ভরে।
"আঃ কী সুন্দর। খেজুর গুড়ে আমার দ্যেসের খুশবু - খালাম্মার গায়ের গন্ধ আসতেছে"। পরম আনন্দে, শান্তিতে চোখ বুজলো সে চিরতরে।

ডানপিটে ছেলে (Daanpite Chele)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ছেলেটাকে নিয়ে বাড়িসুদ্ধ লোক একেবারে ব্যাতিব্যস্থ - অস্থির। একেবারে সেই ছোট্ট থেকেই সে অসম্ভব চঞ্চল। সবসময় দেখ দেখ ধর ধর। চার থেকে ছয়ে যখন এল, তখন স্কুলে নিয়ে যাওয়া এক বিরাট সমস্যা। তার ইচ্ছেমতো সে থাকতে ভালোবাসে, কোনোদিন যদি যায়ও অন্য বাচ্চাদের মেরে ধরে, মাস্টারমশাই দিদিমনিদের জ্বালাতন করে অতিষ্ঠ করে দেয়। মা কাঁদে, বাবা মারে, দাদু লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে, ঠাকুমা হৈ হৈ করে চেঁচিয়ে ওঠেন, - ওরে আমার তেলের শিশিটা ভেঙ্গে দিল, কাকিমা সারা বাড়ি ছুটে বেড়ান ওর পেছনে পেছনে - এক হাঁড়ি রসগোল্লা একাই শেষ করে দিচ্ছে, কি রাক্ষস ছেলেরে বাবা খেতেও পারে। কাকুতি, মিনতি, বকুনি, গালাগাল, মার - সবই ওর কাছে তুচ্ছ - অবান্তর বলে মনে হয়। রসগোল্লাগুলো খেয়ে রসের হাঁড়িটা বারান্দায় দুম করে ফেলে ভেঙ্গে দিয়ে এক ছুটে পালালো বাড়ির বাইরে।
ছেলেটা যখন বারোতে পড়লো। 



হটাৎ তার দাদু মারা গেলেন গাড়ি চাপা পড়ে। দাদুর মুখে আগুন লাগানো ব্যাপারটা একদম ভালো লাগলো না ওর। ছেলেটার বাবা শ্মশানে মুখাগ্নি করতে গেলে রেগে উঠলো সবাইকার ওপরে। কেন এমনি করে পুড়িয়ে দেবে দাদুকে। সেই জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে তেড়ে গেল অন্যান্য লোকজনদের দিকে। তারা বলে উঠলেন, "এই পাগল ছেলেকে কেন এনেছেন, ভাইকে ডাকুন," - "কী আমি পাগল? তোমরা পাগল, তোমরা ছাগল - যাও ঘাস খাও বসে বসে," হন হন করে বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।



সেখানেও তো তখন বীভৎস সব দৃশ্য। নাটক চলছে - ঠাকুমার চুড়ি খোলা, সিঁদুর মোছা, বুক চাপড়ানো কান্না, প্রতিবেশী মাসী-পিসিদের ভিড়। ছেলেটার দিকে লক্ষ্য নেই কারো। রান্নাঘরে ঢুকে এক থালা পান্তাভাত নুন লঙ্কা মেখে হপ হপ করে খেয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল ছেলেটা।
চলছে তো চলছেই কোথায় কোন দিকে তা সে নিজেই জানে না। গ্রামের বাইরে একবারই শহরে গেছে তার বাবার সঙ্গে, আজ একাই চলেছে যেন কিসের ঘোরে। বেশ অনেকটা পথ চলে সে একটা রেল স্টেশন দেখতে পেল। সেখানে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল। একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামল এসে, কিছু না ভেবেই উঠে পড়ল তাতে। চলন্ত ট্রেনের খোলা জানলার হাওয়ায় একটু পরেই ঘুমিয়েও পড়ল সে।
পরদিন সকালে একটা বড় স্টেশনে বহু লোকজনের ওঠা নামা দেখে তারও নামতে ইচ্ছে হল। পেটে ভীষণ খিদে, ক্লান্ত দেহ, পকেটে পয়সা নেই। কি করবে সে ভেবে পাচ্ছে না কিছুই। হটাৎ নজর পড়ল কয়েকজন ভিখারী হাতে একটা করে শাল পাতার ঠোঙায় লুচি ও আলুর তরকারী নিয়ে আসছে। তাদের অনুসরণ করে দেখল স্টেশনের পিছনেই একটা মন্দির। সেখানেই খাওয়ার দেওয়া হচ্ছে, কোনো পুজো আছে। সকলের সাথে সেও খাওয়ার খেতে বসে পড়ল একটা বড় পাথরের ওপরে। দোকানদার বললে - এই ছেলেটা কাজ করবি? এই বাসনগুলো ধুয়ে ফেল তাহলে আরও খেতে দেব।



জীবনে কখনও কিছু কাজ করেনি সে। মা কাকিমাদের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। কতরকম ভাবে তারা তার অত্যাচার সহ্য করেছেন, এখন মা হয়ত তাকে দেখতে না পেয়ে খুব কান্নাকাটি করছেন। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল তার। আর কি ফিরে যেতে পারবে সে নিজের বাড়িতে?
অন্যমনস্ক হয়ে হাতে ধরে থাকা বাসনগুলো পড়ে গেল ঝনঝন করে মাটিতে। ভেঙ্গে গেল বেশ কয়েকটা কাঁচের গেলাস। দোকানদার উঠে এসে এলোপাথাড়ি চড় চাপড় মারতে লাগলো তাকে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রাস্তায়। ভীষণ রাগ এসে গেল তার, কিন্তু অচেনা অজানা জায়গায় সাহস হল না তার, ঘুরে গিয়ে তাকে মারতে।
জীবনে বার টা বছর পরে এই প্রথম সে অনুভব করলো যে, এটা বাড়ি নয়। সবাই তার অত্যাচার সহ্য করবে না। এবার থেকে ডানপিটে স্বভাব, অকারণে জ্বালাতন করা, অন্যকে উত্তক্ত করা আর চলবে না। ধুলো ঝেড়ে উঠে সে মন্দিরের সিঁড়িতে এসে বসে পড়ল।
মন্দিরের পেছনে একটা বড় ঘরে পাথর ভাঙ্গার আওয়াজ হচ্ছে, বেশ কয়েকজন লোক হাতে হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে পাথর কেটে মূর্ত্তি বানাচ্ছেন। হাঁ করে তাদের শিল্প কর্ম দেখতে লাগল ছেলেটা। একজন বৃদ্ধ শিল্পী অনেক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন তাকে। ইশারায় কাছে ডাকলেন। ধীরে ধীরে উঠে তাঁর কাছে এল সে। - "আমায় একটু সাহায্য করবে সোনা বাবু"? বেশ গম্ভীর কিন্তু মায়াময় গলায় তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। সে বুঝতে পারল না, সে কেমন করে ওনাকে সাহায্য করবে।
এই দেখো না আঙুলে হাতুড়ির ঘা লেগে আমার বুড়ো আঙ্গুলটা কেমন থেঁতলে গেছে। এই পাথরটাকে এইভাবে ছেনি দিয়ে একটু একটু করে ঘষতে আর কাটতে হবে। পারবে তো?
অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভব করল হটাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া সেদিনের সেই দুষ্ট ছেলেটা, হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে কাজ শুরু করে দিল তার। কয়েকদিন ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে সে। অদ্ভুত নেশায় যেন পেয়ে বসেছে তাকে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীও অবাক হয়ে গেছেন তার নিষ্ঠা ও মূর্ত্তি তৈরির আগ্রহ দেখে। মূর্ত্তিটা ছিল শিবের। জটাজুট ধারী দেবাদিদেবের সাপটা গলায় জড়ানো থাকে। বেশ গভীর মনোযোগ দিয়ে সে সেটা বানাবার চেষ্টা করছে। এমন সময় কয়েকজন ক্রেতা এলেন সেখানে। এরা মূর্ত্তি তৈরির অর্ডার দিয়ে যান এদের। তারাও ছেলেটির প্রশংসাতে পঞ্চমুখ হয়ে গেলেন। "আরে ভাস্কর জী, এই বাচ্চাটা আপনার নাতি নাকি? কি দারুন হাত এর"। শিল্পী বললেন, হ্যাঁ, এই কিশোরের হাতে জাদু আছে, কোনো উপযুক্ত ট্রেনিং ছাড়াই সে যে ভাবে কাজ করছে আমি তো তাজ্জব বোনে গেছি।



ডানপিটে দুষ্টু ছেলেটাকে কেউ কোনোদিন কোনো ব্যাপারে ভালো বলেনি। আজ সে নিজের পাঁচ পাঁচ দশ আঙ্গুলকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে শুধু কাজ ভণ্ডুল করতে ওস্তাদ, আজ সেই যে এমন মূর্ত্তি তৈরির কাজে দক্ষতা দেখাবে তা সে সত্যি ভাবতেই পারছে না।
একজন ভদ্রলোক দু-চার মাস পরে আবার এলেন কিছু মূর্ত্তির অর্ডার নিয়ে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীকে বললেন, "এই ছেলেটিকে উড়িষ্যায় ভাস্কর মেলায় নিয়ে যাব? সমুদ্রের ধারে পাথর আর ছেনি নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হবে ১২ থেকে ১৮ বছরের উৎসাহী ছেলেদের। স্কুল থেকেও আসবে বিভিন্ন সব জায়গার বাচ্চারা। যে প্রথম হবে সে অনেক টাকা পুরস্কার পাবে। শিল্পী বললেন, "নিয়ে যাবেন? আবার এনে দেবেন তো? বড্ড মায়া পরে গেছে আমার ওর ওপরে।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। কিন্তু এর মা বাবা কোথায়? বাড়ি যায় না?
কিছুই বলতে চায় না ও। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে বলে, "মা দেখো আমি কেমন মূর্ত্তি গড়ি, আর আমায় ডানপিটে, পাগল, দুষ্টু ছেলে বলবে না তো"? মনে হয় কোন অভিমানে এ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন গ্রাম শহরের নাম কিছুই মনে করতে পারছে না।
পরদিন ছোট একটা টিনের বাক্স গুছিয়ে বৃদ্ধশিল্পী ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিলেন উড়িষ্যার কোনার্কে।
সেখানে প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান পেল। 



তার বিশেষ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন বিচারক ও দর্শক বৃন্দ। যে মূর্ত্তিটি সে বানিয়েছে তার রূপ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সবাই। এক অপূর্ব মাতৃ মূর্ত্তি।
বিচারক প্রাইজ দেবার সময় তাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, "কার মূর্ত্তি বানিয়েছো গো খোকা? কোন দেবী"। সে মুখ নিচু করে জবাব দিল, "আমার মায়ের"।
টেলিভিশনে এই খুদে শিল্পী ভাস্কর নিজের পরিচয় দিতে পারছে না অনেকেই তাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ছেলেটি যেন তার ঐ বানানো মূর্ত্তির মতন নির্বাক। কেন যে সে নিজের বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারে না, সে বুঝতে পারে না।
আরও সাত বছর কেটে গেল তার জীবনের। ২১ বছরের ছেলেটা ভীষণ গম্ভীর ও শান্ত। দিল্লীতে অক্ষরধাম মন্দির তৈরী হচ্ছে, শিল্পীরা কাজ করে সেখানে। অনেক সুন্দর সুন্দর মূর্ত্তি, হাতি, সিংহ, বাঘ ও দেব দেবতাদের কাহিনী পাথরে খোদাই করে বানানো হচ্ছে। অনেক বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের সেই ছেলেটা যে এখন এক সুন্দর সুঠাম ধীর স্থির যুবক সে কাজ করছে এক মনে।
একদল তীর্থযাত্রী বাসে করে হরিদ্বার বৃন্দাবন ঘুরে এসেছেন, দিল্লী ভ্রমণ করতে। তারা ঐ মূর্তিগুলির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন প্রৌঢ় মহিলাকে দেখে ঐ ছেলেটি কেমন যেন টান অনুভব করল। দলটির পিছন পিছন যেতে লাগল সে। তারা কোথা থেকে এসেছে জানতে চাইলে, তারা বললেন পূর্ব মেদিনীপুর। পশ্চিমবঙ্গের "পাউশী গ্রাম" থেকে। এক মুহূর্তে বিদ্যুতের যেন ঝলক এনে দিল ছেলেটির মনে। সে এক ছুটে প্রথমে মন্দিরের পিছনে তাদের ঘরে গেল। সেখানে নিজের সেই প্রথম প্রাইজ পাওয়া মায়ের মূর্ত্তিটি বের করে আনল। ঐ ভ্রমণ যাত্রী দলের লোকদের দেখিয়ে বলল - "দেখুন তো আমার এই মূর্ত্তির মতন দেখতে কেউ কি এই দলে আছেন"? তখন একজন চিৎকার করে বলে উঠলো, "হ্যাঁ, এই তো সেই দুষ্টুর মা"।
এক মিনিট ও আর দেরী না করে সে তখন তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রণাম করল পায়ে হাত দিয়ে। ভদ্রমহিলা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর "ওরে আমার দুষ্টু রে, তুই এতদিন কোথায় ছিলি" বলে কেঁদে ফেললেন ঝর ঝর করে করে। এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না তীর্থ যাত্রীর দল। পাড়ার লোকেরা যারা তার সঙ্গে ছিলেন তারা ঐ ডানপিটেটার গুনের খবরে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। অত দুষ্টুমীর মধ্যেও যে এতোবড় প্রতিভা লুকিয়ে থাকতে পারে তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল।

বিনা দোষে (Bina doshe)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শ্যামল সবুজ ধরার মাঝে ছোট্ট একটা গ্রাম। তার মাঝে বেশ জায়গা জুড়ে শাল বন। সেখানেই সুন্দর পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর।
'লাটুয়া' তার বৌ, ছেলে, মেয়ে, বুড়ো বাপ্-মাকে নিয়ে সেইখানেই থাকে। মাঝে মাঝে জঙ্গলে হাতির উৎপাত হয়। কিন্তু অরণ্যের প্রাণী এই বনের মানুষের গায়ের গন্ধ চেনে। এদের ক্ষতি করতে তারা বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নয়। শুধু খাবারের খোঁজে, জলের মধ্যে গা ডুবিয়ে থাকার আশায় নদী নালার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। গরমকাল তাই এই বাঁকুড়ার সব নদী পুকুর প্রায় শুকিয়ে গেছে। ধুলোর ঝড়ে শুকনো গাছপালাগুলো ধূসরিত হয়ে গেছে। বৃষ্টি যে কবে নামবে কে জানে।
লাটুয়ার ছেলে ও বাবা শুকনো দ্বারকেশ্বর-এর বালু খুঁড়ে একটু পরিষ্কার জল বের করছে। মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাটির ঘড়াটা ভরবে বলে। হটাৎ ভীষণ শব্দ মড়মড়, কড়কড় - বুঝি কালবৈশাখী এল। দাদু ও নাতি নাতনি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বাড়ীর রাস্তা ধরল অর্ধেক কলসী ভরেই। দেখলো ছোট্ট একটি বাচ্চা হাতিকে ধাওয়া করেছে একদল লোক। খুব সম্ভব ওকে একা পেয়ে নিজেদের ট্রাকে তুলে নেবে। সে ছুটছে চিৎকার করতে করতে প্রানপনে। গাছের ঝোপে তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়লো লাটুয়ার বাপ্ ও ছেলে মেয়ে। কিন্তু ঠিক এই সময়ে ভীষণ গর্জন করতে করতে ছুটে এল বড় বড় হাতিরা বাচ্ছাকে বাঁচাতে।
একটি লোকের হাতে বোধহয় বন্দুক ছিল সে তাদের দিকে তাক করতেই বৃহৎ চেহারার দলনেতা হাতিটি এসে তাকে একনিমেষে শুঁড়ে ধরে ছুড়ে দিল, অন্য একজনকে পায়ে দলতে শুরু করেছে, এমন সময় লাটুয়া ছুটে এল ঠিক উল্টো দিক থেকে। ভাবলে বোধহয় তার বাবা বা বাচ্চারা আক্রান্ত হয়েছে। হাতিদের কাছে চলে গিয়ে কোনোরকমে পায়ের তলার লোকটিকে টেনে নিয়ে বাঁচালো। কিন্তু ওদের রাগ পড়লো তার ওপরে। তাকে পায়ের নিচে ফেলে একেবারে পিশে দিল সেই হাতিটি। ততক্ষনে তার বাচ্ছাটি ফিরে এসেছে। জয় ঘোষণা করতে করতে অন্য পথে এগিয়ে গেলো তারা।
কয়েকটি বন্দুকধারী মানুষের ভুলের মাশুল দিতে আমাদের লাটুয়ার তরতাজা প্রাণটি চলে গেলো।

দস্যি মেয়ে (Dosshi Meye)

চন্দনা সেনগুপ্ত

এই মেয়েটার নাম বুলবুলি। ওকে পাড়ায় সবাই বলে চুলবুলি। কারণ ভীষণ চঞ্চল ও ছটফটে সে। সবসময় তার কিছু না কিছু দুষ্টুমি করা চাই। কাউকে ভয় পায় না, মানে না, কারো কথা শুনতে রাজী নয়। বাবা অধ্যাপক, মা সরকারি হাসপাতালের নার্স। কাকা, কাকিমা, ছোট পিসি, সবাইকে নিয়ে এক বেশ সুখী যৌথ পরিবার। বড় পিসির বিয়ে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়ে তিনিও এসে যোগ দেন এদের সব সুখ দুঃখ ও আনন্দ অনুষ্ঠানে।
বুলবুলির আরও দুই ভাই বোন আছে, তারা ভীষণ শান্ত ও মেধাবী। পড়াশোনা, গানবাজনা, আঁকাজোকা সবকিছুতেই খুব ভালো। ভাই দিগন্ত ও দিদি বনশ্রী খেলাধুলাতেও অনেক প্রাইজ পায়। বুলবুলির দুষ্টুমি ও জ্বালাতনে তারা অতিষ্ট হয়ে যায়। মা বাবা বাইরে সারাদিন কাজ করেন, এসে হয়রান হয়ে যান আর তখন এই ছোট কন্যার নামে সব কাজের লোক, প্রতিবেশীদের থেকে নালিশ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে মেয়েকে বকাবকি করেন। কখনো যদি চড় চাপড় মারেন, ঠাকুমা ছুটে আসেন, কিছু বলতে দেন না, তিনি তার সাধের নাতনিটিকে। কাকা-কাকী, মামা-মাসীরা কেউ বেড়াতে এলে বিরক্ত হয়ে যান এই বুলবুলির অত্যাচারে। পিসিমনি ঠাকুমার সঙ্গে ঝগড়া করেন, বলেন “এই ঠাকুমার প্রশ্রয়েই মেয়েটা এতো বদমায়েশ হয়ে গেছে।”
পিসিমার ছোট ছেলে বুদ্ধুকে সেদিন চকলেট বলে মাটি খাইয়ে দিয়েছিলো। মামার মেয়ে সুমনার চুলে আঠা লাগিয়ে দিয়েছে। জ্যেঠিমার পানের বাটাতে পানের খয়ের সরিয়ে ইটের গুঁড়ো ভরে দিয়েছে। তারপর তারা যখন হৈ হৈ করে ওঠে, ওয়াক থু ওয়াক থু করে বমি করে তখন বুলবুলির কি হাসি।
মা এসে রাগের চোটে দু ঘা বসিয়ে দেন, চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখে দেন। আধঘন্টা যেতে না যেতেই তাদের ঠাকুমার গলা শোনা যায় – “ওরে তোরা কি মেরে ফেলবি নাকি মেয়েটাকে? ও সারাদিন কিছু খায়নি। খুলে দে দরজাটা শিগগিরি।”
সেদিন রবিবার। এবার বাড়ির সবাই একসঙ্গে আলোচনা করতে বসেন, - “এই মেয়েকে নিয়ে কি করা যায়!”
বুলবুলির মা বলেন, - “আমি আমার হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের সাথে কথা বলেছি, একজন ওকে মনোবিজ্ঞানী মানে সাইক্রিয়াটিস্ট কে দেখাতে পরামর্শ দিয়েছেন।”
তাই দেখাও না কেন, মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে বিয়ে থাওয়া কি করে দেবে? আমাদের মতন শিক্ষিত পরিবারে মুখ্যু হয়ে শুধু দুষ্টুমি করলেই চলবে? আজ না হয় ঠাকুমা আস্কারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলে রাখছেন, কাল বড় হবে, তখন কে ওকে সামলাবে?
- পিসিমার কথায় সায় দিলেন সকলেই।
অধ্যাপক বাবা বড় হাসপাতালের একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মেয়েটা কি তাঁর সত্যি সত্যি পাগলামি করেই কাটাবে সারাজীবন। কেন এমন হলো। এত বকুনি খায় স্কুলে, ক্লাশ - IV এ সে এই নিয়ে দুবার ফেল করে গেল। এবার তাকে স্কুলও চেঞ্জ করতে হবে। পড়াশোনাতে মন দিতে পারে না।
প্রথম প্রথম পাঁচ বছর বয়স অবধি যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। এখনো সবাই ভালোবাসে তার ওই চঞ্চল স্বভাবের মেয়েটিকে কারণ হাজার বকুনি খেয়েও ও হাসে হিহি করে। ভীষণ মায়াদয়া ওর প্রাণে।
নিজে না খেয়ে কুকুর, বেড়াল, পাখিদের খাওয়ায়। ঠাকুমা, কাকিমা ও রান্না ঘরের মাসীর কাছে বসে মশলা বাটতে, আটা মাখতে, সেগুলো দুহাতে মেখে আপন মনে খেলা করতে খুব উৎসাহ তার। কেউ অসুস্থ হলে তাকে সেবা করতে যায় মায়ের মতন। মা নার্স বলে বাড়ির কারো অসুখ হলে তিনিই ওষুধ খাওয়ান, ইনজেকশন দেন, জ্বর হলে গা স্পঞ্জ করে দেন। ঠাকুমার পায়ে তেল মালিশ করে গরম সেক দিতে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত বা বিরক্ত হন না।
বুলবুলির এসব করতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু তাকে কেউ কোন কাজ করতে দেয় না। কেউ যেন ওকে বিশ্বাসই করে না। খালি চিৎকার করে ওকে দেখলেই -  “ওরে ছাড় ছাড় তুই পারবি না।”
খুব অবাক লাগে তার। বড়রা এমন কেন? একদিন একটা ওষুধের শিশি গ্লাস ভেঙ্গে ফেলেছে বলে রোজই সে ঐরকম করবে - এটা কেমন কথা। ভাবে সে একা বসে। কিন্তু চুপ করে বসে থাকবার তো উপায় নেয় তার। বিড়ালটাকে দুধ খাওয়াতে হবে। কুকুরটাকে বাবার পাতের পাশে রাখা মাংসের এঁটো হাড়গুলো দিতে হবে। উঠোনে কাকেরা এসে জড়ো হয়েছে। ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে এক খাবলা ভাত এনে ছড়িয়ে দিতে না পারলে কি ওর শান্তি আছে। কিন্তু ততক্ষনে মাসীর চিৎকার শুরু হয়ে গেছে, - “ওরে বাবা কি দস্যি মেয়েরে তুই, ঐ এঁটো হাড়টা কুকুরের মুখে দিলি, আবার ঐ হাতেই আমার ভাতের হাড়ি থেকে ভাত নিলি, আবার আমাকে ভাত রাঁধতে হবে।” একটা ভেংচি কেটে সেখান থেকে ছুট দেয় বুলি।
কলকাতার বড় মনোবিজ্ঞানী রায় দিলেন – “আপনার মেয়ের তো ADHD আছে।”
বুলবুলির বাবা অংকের অধ্যাপক। এইসব ‘সাইকোলজিক্যাল’ নাম কি বুঝতে না পেরে তাকালেন অবাক হয়ে।
- “সেটা কি রোগ ডাক্তারবাবু?”
- “Attention deficit/Hyper Active Disorder”
কাঠবেড়ালী যেমন এক ডাল থেকে আর এক ডালে এক নিমেষের মধ্যে ছুটে যায়, দাপাদাপি করে, এইসব বাচ্চারাও তেমনি এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়।
মা বাবা দুজনেই হতাশ হয়ে বসে পড়লেন। ডাক্তারবাবু কিন্তু আস্বস্ত করলেন তাঁদের। ঘাবড়াবেন না, আজকাল অনেক ওষুধ ও থেরাপি বেরিয়েছে। তা ছাড়া বেশ অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় এইসব শিশুরা কিশোর বয়সে এসে যদি নিজেদের মনমতো কোন ক্ষেত্রে কাজ পায়, তাহলে খুশি হয়ে খুব সফলতা লাভ করে। যেমন ধরুন সাঁতারে, খেলাধুলোয়, দৌড়ে বা অঙ্কনে, ওর কিসে ইন্টারেস্ট সেটা দেখুন।
সেদিন সাইক্রিয়াটিস্ট মানে মনোবিজ্ঞানীর চেম্বারে আরো কয়েকজন বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁরাও তাঁদের ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তিত। নানা ধরনের সব মস্তিষ্ক জনিত ভারসাম্য হীনতা নিয়ে ভুগছে তারা।
একটি ৩৫/৩৬ বছরের যুবক সেখানে চুপ করে বসে বসে বাচ্চাদের বাবা মায়েদের কথা আলোচনা শুনছিলো একজন বয়স্কলোক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, - “তোমার বাচ্চার কি প্রবলেম বাবা?”
যুবক উত্তর  দিলো, “বাচ্চার তো নয়, আমার নিজেরই সমস্যা, যা এতদিন আমি জানতে পারিনি।”
সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকালেন - তার দিকে।
“হ্যাঁ, আমি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, IIT থেকে পাশ করে -  ভালো চাকরি করি। কিন্তু পড়াশুনো ছাড়া আর কোন কাজই ঠিক মতো করতে পারি না। স্কুলে বা কলেজে কোন বন্ধুত্ব পাতাতে পারিনি, আত্মীয় স্বজনের সাথেও মন খুলে কথা বলতে পারি না। বাবা মা জোর করে বিয়ে দিলেন, কিন্তু বৌ মাত্র কয়েক মাস পরেই আমায় ছেড়ে চলে গেল। কিছুদিন আগে আমার বাবা মারা যাবার পর আমি আরও অসহায় বোধ করছি। মা এখন খুব অসুস্থ, বিছানায় শয্যাশায়ী। কিন্তু আমি বাজার দোকান ডাক্তার দেখানো কিছুই করতে পারিনা। মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া-আসা সব আমার মামা করে দেন। সেদিন একজন ডাক্তারবাবু আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন, নিজের ঘরে। আমার জামার ও প্যান্টের বোতামগুলো উল্টোপাল্টা লাগানো দেখে উনি সন্দেহ করেছেন আমার মেন্টাল ডিসর্ডার আছে। মস্তিষ্কের সব দিকটা সম্পূর্ণভাবে পরিণত বা পুষ্ট হয়নি। এটা ADHD না ATISM তাই পরীক্ষা করতে এই মনোবিজ্ঞানীর কাছে এসেছি। এতদিনে আমি বুঝতে পারছি কেন আমি সোশ্যাল নই। সামাজিক ও প্রাকটিক্যাল বোধবুদ্ধি আমার কেন সুপক্ক হয়নি।”
- ছেলেটির কথায় এমন বিষন্নতা ছিল যে চেম্বারে যারা তার কথা শুনছিলেন সবাইকার মন খুব খারাপ হয়ে গেল।
বুলবুলির বাবা মা লক্ষ্য রাখতে লাগলেন মেয়ের দিকে। কিসে তার আগ্রহ বুঝতে পারছে না তারা। কত্থক নাচের স্কুলে ভর্তি করলেন মেয়েকে, ক'দিন পরেই এসে সে বিরক্ত হয়ে বলল – “ধুর ওখানে যাবো না, ওরা ওই পায়ের চারটে তাল শেখাচ্ছে।” ড্রয়িং ক্লাশে এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই শিক্ষকের নালিশ এলো, - “এই মেয়েকে আঁকা শেখাতে কেউ পারবে না, - যা চঞ্চল। সমস্ত মেয়েদের বিরক্ত করে, রং, কাগজ, সময় সব বেকার নষ্ট করা। নিয়ে যান ওকে, শিল্পী করার আশা ছাড়ুন।”
এবার সাঁতার শেখানোর প্রস্তুতি। সেখানেও অসফলতা। নিজে তো শিখবেই না, অন্য কাউকেও ডুবিয়ে দিতে পারে, ভয়ের চোটে জলের খেলা বন্ধ হল।
বাড়ির পুরোনো কাজের মাসী একদিন ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে হাত পোড়ালো। ঠাকুমা রাঁধতে বসে বার বার ডাকাডাকি করেন – “ওরে বুলি সোনা আয়না ভাই, এই গোলমরিচটা পিশে দে না মিক্সিতে, আমি বাপু ওটা চালাতে পারিনা।” বুলবুলি ছুটে আসে। রান্নাঘরে থাকলে বেশ খেতে পাওয়া যায়। এখন তার তেরো বছর বয়স। কে বলবে সে কাজ করে না। সুন্দর করে সবজি কেটে, ধুয়ে, মশলা পিশে, পেঁয়াজ রসুন ছাড়িয়ে ঠাকুমার কাছে কাছে এগিয়ে দেয় সে। মা হাসপাতালে, কাকিমাও স্কুলে কাজ করেন। সব কাজেরই লোক আছে - অতএব এতদিন কেউ বুঝতেই পারেননি, কি করে এই এত বড় পরিবারের সকালের জলখাবার, দুপুরের ভাত, বিকেলের চা, টিফিন বা রাতের রুটি তরকারি তৈরী হচ্ছে এবং মুখের কাছে সব খাবার এসে যাচ্ছে তাঁদের।
পরদিন সকালে কাকার ও বাবার স্যান্ডউইচ - দিদি - ভাইয়ের নুডুলস, ঠাকুমার চিঁড়ে দই কলা মাখা বাটি - সব ঠিক ঠিক সময়ে হাজির করে দিল বুলবুলি। দুপুরে বাড়িতে বড়রা কেউ নেই তাই ঠাকুমা ও সে আলু সেদ্ধ, কুমড়ো সেদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে নিল। বিকেলে ফ্রিজ থেকে মুরগি বের করে নুন লেবু মাখিয়ে রেখে দিল কিছুক্ষন। তারপর সুন্দর করে সব পেঁয়াজ রসুন আদা টমেটো পিশে গরম তেলে ছাড়লো, প্রথমে ছলকে এসে কয়েক ফোঁটা হাতে পড়ল তার। কিন্তু রান্না করার গন্ধটা তাকে ভয় পেতে দিল না। মুরগির টুকরোগুলো দিয়ে নাড়তে নাড়তে ভীষণ আনন্দ পেতে লাগল। খেতে সে বরাবরই ভালোবাসে, তাই আজ প্রথম দায়িত্ব নিয়ে রান্না করতে গিয়ে সে উৎসাহিত হয়ে নিজেকে একজন বড় রাঁধুনি ভাবতে আরম্ভ করল।
বিশেষ করে আজ তার ধারে কাছে বড়রা কেউ নেই, ঠাকুমাও ছাদে বসে রোদে আচার, বড়িগুলো শুকাচ্ছেন। বাসন মাজার বাউরি বৌ এই সময় অন্য বাড়ি যায়। কেউ তার পেছনে রে রে করে তেড়ে আসছে না। একা একা তেরো বছরের বুলবুলির মধ্যে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস জেগে উঠল।
কুকার বন্ধ করে সে আটা মাখতে শুরু করল। প্রথমে কিছুতেই ঠিকমতো পারছে না। এ হাতের আটা ও হাতে লেগে যাচ্ছে। কখনো জল বেশি হয়ে যাচ্ছে, আবার আটা ঢেলে ঠিক করতে হচ্ছে। কিন্তু মোটামুটি মাখা আটার তালটা সে বশে আনতে পারল।
বুলবুলির দিদি ও ভাই ততক্ষনে স্কুল ও টিউশন পড়ে বাড়ি এসে গেছে। তারা রান্না ঘরে বোনের কান্ড দেখে তো প্রথমে হেসে অস্থির, বুঝতেই পারেনি যে সে সত্যি সত্যি একা হাতে আজ রান্না করে এক অসম্ভব কে সম্ভব করেছে। ইতিমধ্যে তার মা কাকিমাও ফিরে এসেছেন, ঠাকুমাও নেমে এসেছেন ছাদ থেকে, বাবা কাকাও একসঙ্গে গাড়ি নিয়ে ঢুকছেন গ্যারেজ - অতএব সবাই মিলে হৈচৈ শুরু করে দিল আজ বুলবুলি রান্না করেছে একা একা। আজকের বিরাট খবর তাঁদের পরিবারে।
বাবা মা খুঁজে পেলেন মেয়ের আগ্রহ প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে তাঁদের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় মেয়েটি বড় হয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্ট এবং ক্যাটারিং করে হয়ে গেল ফাইভ ষ্টার হোটেলের শেফ। নাম করা রাঁধুনি।

উপহার (Upohar)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেজ কাকীমার ন'দির দেওর খুব একটা দামী সুন্দর বিদেশী ঘড়ি উপহার দিয়েছেন নিজের বৌদিকে। তিনি আবার সেটি তাঁর আদরের বোনঝি অর্থাৎ সেজকাকীমার মেয়ে 'ঝর্ণা' কে জন্মদিনে দিয়ে দিলেন, কারণ তাঁর কাছে ওইরকম আরো একটি ঘড়ি আছে। বোনঝি বললো - আজকাল রিস্টওয়াচ পড়ার ফ্যাশন নেই আমরা মোবাইলেইতো সময় দেখে নিই। ক্যালেন্ডারও বাড়িতে টাঙায় না কেউ, সেটাও ফোনেই পাওয়া যায়। আবহাওয়ার খবর, কারো ঠিকানা, দোকানের হদিশ কিছুই আর গুগল-এর দৌলতে না পাওয়া নয়। অতএব অত কথায় কাজ নেয় ভেবে, মেয়ের মা অতি যত্ন করে আলমারীতে তুলে রাখলেন, কাউকে গিফট করবেন বলে। আমার মেয়ের বিয়ে। অতএব সুন্দর প্যাকেটে ওটি চালান হলো এরপর আমার বাড়ীতে। ব্যাপারটা আমার বাড়ীতে কেউ জানে না, ওটি ঠাঁই পেলো আমার ড্রয়ারে। প্রাণের বন্ধু সুনীলের বিবাহবার্ষিকী। সেদিন অফিস থেকে এসে মনে পড়লো, আরে কিছুই তো কেনা হয়নি। ঘড়ি বের হ'ল আমার সংগৃহিত উপহারের পেটি থেকে। বৌ একবার বললো - এতো দামী জিনিষটা বন্ধুকে দেবে?

– তাতে কি হয়েছে, কিনতে তো আর হয়নি গো, পড়েইতো আছে। ও তো আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে রুপোর সেট দিয়েছে।

– হুম, ওটাতো মণিদার ছেলের বৌভাতে দিয়ে দিয়েছি।

– এটাও হয়তো ওরা আবার কাউকে দিয়ে দেবে।

মাঝে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। হটাৎ খবর পেলাম সেজকাকীমার ন'দির সেই দেওর আমেরিকার থেকে এখানে আসছেন ছেলের বিয়ে দিতে। মেয়ে বাঙালি নয়, রাজস্থানী। উদয়পুরের কোনো হোটেল প্যালেস ভাড়া করে তারা বিয়ে দেবে।

একে বলে নাকি destination  wedding, মেয়ের বাবা বিরাট বড় বিজনেস ম্যান, পলিটিক্যাল লিডার, অতএব পুরো বাঙালি গুষ্টিকে নেমন্তন্ন করে বসেছেন সেই বিখ্যাত দেওর সাহেব। কারণ খরচ তাঁর কোনো হচ্ছে না। মেয়ের বাবায় সব arrangement  করবেন। আমেরিকান সিটিজেন জামাই। কোনো পণ নেবে না তাঁর বাবা মা, ঘর, গাড়ী, আসবাব, ফার্নিচার কিছুই দিতে হবে না, তাই আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে আছেন, ডাকা হচ্ছে, মেয়ের বাবার শান ও সৌকত দেখানোর জন্য। আমি যেহেতু দিল্লিতে থাকি, সুখে-দুঃখে সেজকাকীমা ও তাঁর দিদিদের দেখাশুনো করি তাই আমারও সুযোগ এসে গেলো। স্ত্রী বললেন, এতদিন পরে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে তো ছিঁড়লো। একটা বড়োলোকের বাড়ি ফিল্ম এক্টরদের মতন বিয়েতে তো যেতে পারব। শুরু হল নতুন জামাকাপড় জুতো কেনা। কিন্তু উপহার? আমি দেখলাম আলমারীর ওপর তাকে সুন্দর করে যত্ন সহকারে রাখা আছে একটি সুন্দর চামড়ার ব্যাগ। অবশ্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নামটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। একটা ভালো কাগজের ব্যাগে সেটা ভরে ফেললাম। দোকানে নিয়ে গিয়ে প্যাকেট করবো ভাবলাম কিন্তু সময় হল না। উদয়পুরে গিফট প্যাক হয়ে যাবে। এখন সুটকেসে ভরে ফেলো, বললাম স্ত্রীকে।

বিয়ের দিন সকালে ওখানে পৌঁছেই সব আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। হটাৎ পেছন থেকে কে যেন এসে জড়িয়ে ধরলো আমায়, চমকে উঠলাম -

– আরে সুনীল তুই? কতদিন তোর সঙ্গে দেখা নেই, তুই তো উদয়পুরে ট্রান্সফার হয়েছিলি, মনে ছিল না। কি খবর বল।

– এই হোটেলে আমার বস-এর মেয়ের বিয়ে, তাই আমরা অফিসের ক'জন বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছি। আর তুই?

– আমার এক দাদার ছেলের বিয়ে ওরা ইউ এস থেকে এসেছে।

– আরে এখানেই তো হচ্ছে সেই বিয়ে। খুব হৈ চৈ করে। গল্প-গুজব, খাওয়া দাওয়া চলতে লাগলো, হটাৎ সে বললে - একটু বাজারে যাব রে একটা গিফট প্যাক করতে। চল না আমার সঙ্গে, গাড়ীতে যাবি আর আসবি।

– স্ত্রী আমার হাতে একটা চিমটি কেটে বললেন, আমাদেরটাও প্যাক করিয়ে আনো, ঐরকম ভাবে দেওয়া যায় নাকি এতো বড় লোকের বাড়ীতে। যখন হাতে নিয়ে ঢুকবো তখন তো ভিডিও তুলবে।

– হাঁ হাঁ ঠিক বলেছো, আমাদেরটাও নিয়ে এসো। দুই বন্ধুতে একটা বড় দোকানে গেলাম। নানা ধরণের  কাগজ ও সোনালী রুপোলী ফিতে কাপড় দেখাতে লাগলো তারা। ব্যাগটা বেশ বড়, সেটি আমার হাত থেকে নিয়ে ওরা ভেতরে চলে গেলো। বন্ধুর গিফটটা ছোট একটা বাক্স। মনে হয় ঘড়ি। আরে হ্যাঁ, আমার দেওয়া সেই রিস্ট ওয়াচটা। সুন্দর সোনালী মোড়োকে আরও সুন্দর হয়ে গেল সেটি। কিন্তু ততক্ষনে আমার চক্ষু চড়ক গাছ। আরে এটা তো সেই বিদেশী তোফা ন'দির অনাবাসিক ইউ এস এ নাগরিক-এর দেওর থেকে সেজকাকার মেয়ে সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমার গৃহে এবং পরে সুনীলের বৌয়ের হাত ঘুরে আবার খোদ মালিকের ছেলের বৌ-এর কাছে পৌঁছে গেল। বাহ্ রে ভাই ঘড়ির ভাগ্য।

গিফট প্যাক নিয়ে যখন নিজের স্ত্রীর হাতে দিলাম তিনি কনুইয়ে এবার জোরে চিমটি কেটে বললেন - ওই ব্যাগটা সুনীল দেখতে পায়নি তো  গো? আরে ওটা তো ওরই দেওয়া উপহার মনে নেই তোমার। প্রচন্ড হাঁসির দমক থামাতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম আমি।

সেই মেয়েটি (Shei Meyeti)

Sei Meye ti , a story of an unknown girl. 

চন্দনা সেনগুপ্ত

মেয়েটিকে প্রথম দেখলাম সেদিন হাসপাতালের বারান্দায়। ভীষণ প্রাণবন্ত। সুঠাম সুন্দর চেহারা। মাথায় ছেলেদের মতন করে ছাঁটা খুব ছোট ছোট চুল, ফর্সা রঙ, ভাসা-ভাসা দুটো বড়বড় চোখ আর মুখে ঝরঝরে হাসি। একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলার আজ ছুটি হল, তাঁর দুটো ব্যাগ দুই কাঁধে ঝুলিয়ে, হাতে একটা সুটকেশ নিয়ে সাবধানে ঐ রোগীটির পাশে পাশে হাঁটছে। তাঁকে see off করতে আমি নিজের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
- আপনার মেয়ে, নাকি বোন? বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে আপনাকে? প্রশ্ন করলাম তাঁকে।
- না না ও তো আমার বেড-এ আজকেই ভর্তি হল। ও এখানে চিকিৎসা করতে এসেছে।
উত্তরটা শুনে ভীষণ অবাক হলাম আমি।
যদিও এটা আয়ুর্বেদ হাসপাতাল, খুব কঠিন অপারেশন বা হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া রোগী এখানে ভর্তি হন না, তবুও যারাই আসেন কেউ তো সুস্থ নন। হয় আর্থারাইটিস নয়তো ডায়াবেটিসে পা চলছে না, কিম্বা আমার মতন হাঁপানির রুগী, স্টেরয়েড নিয়ে নিয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, এখন নেবুলাইজার, অক্সিজেন ও ইনহেলার ছেড়ে আয়ুর্বেদের সাহায্য নিতে ভর্তি হয়েছি। এই বাগান ঘেরা সুন্দর হাসপাতালে। অতএব একজন রোগী আর একজন অচেনা রোগীকে এইভাবে সাহায্য করে - গেট পার হয়ে তাঁর গাড়িতে সব মালপত্র তুলে দিয়ে আসতে ও হাসিমুখে হাত নেড়ে টা টা বাই বাই করতে দেখে সত্যিই আশ্চর্য্য হবারই কথা।
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, ওর ফেরার অপেক্ষায়। আমার পাশের রুমেই আসতে হবে। কত আর বয়স হবে ওর ৪০/৪২, বারান্দার কোণে গিয়ে রেলিং ধরে ঝুকলাম নিচে। দেখলাম লনে, একজন অস্বাভাবিক রকমের স্বাস্থবতী মহিলাকে। হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে বাগানের বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে গেছেন নার্স, কিন্তু বোধহয় এবার ওখান থেকে উঠে আসতে চান। চেষ্টা করছেন নিজে নিজে লাঠি ধরে উঠে দাঁড়াতে। গেট দিয়ে ঢুকছিল সেই মেয়েটি, ওনাকে দেখতে পেয়ে এক ছুটে এলো তাঁর কাছে। প্রায় পড়ে যেতে যেতে মেয়েটিকে ধরে ফেলে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। মেয়েটি ধমক দিল তাঁকে। চুপচাপ বসে থাকুন আমি নার্সকে ডেকে আনছি। তারপর নার্স এলে দুজনে মিলে ধরে বসালেন, সেই মহিলাকে সাবধান হয়ে। এবার বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়ালো, বেড়াল ছানার সঙ্গে কিছুক্ষন খেলা করল সে। তারপর উদাস হয়ে কিছুক্ষন বসে রইলো দূরের আকাশের দিকে চেয়ে। এবার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল সে। তিনি আস্তে আস্তে থেরাপি রুমের দিকে বোধহয় ম্যাসাজ করতে যাচ্ছিলেন, হাতে একটা ফাইল নিয়ে। হটাৎ সেটা পড়ে গিয়ে ভেতর থেকে এক্স-রে প্লেট, ওষুধের প্রেস্ক্রিপশন ও অন্যান্য কিছু কাগজ ছড়িয়ে পড়ে গেল চারিদিকে। আবার সেই মেয়েটি এলো ছুটে। নিচু হয়ে বসে একে একে সব তুলে, গুছিয়ে ফাইল ভরে ভদ্রলোকের হাত ধরে নিয়ে গেল সে রিসেপশন এর দিকে।
ওর এইসব ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। মেয়েটি ফিরে এসে দাঁড়ালো, আমার সামনে। একমুখ হাসি নিয়ে। বড় ভালো লাগল। প্রশ্ন না করে পারলাম না।
- কি প্রবলেম তোমার মা?
- এই একটু ঘারে পিঠে ব্যাথা, বিশেষ কিছু না। ক'দিন কেরালার মেয়েদের হাতের মালিশ খাওয়ার আশায় ভর্তি হয়েছি। আপনার কি হয়েছে?
- শ্বাসকষ্ট। অনেকদিন এলোপ্যাথি খেয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, তাই –
- ভালো হয়ে যাবেন। আপনাকে দেখলে তো রুগী মনেই হচ্ছে না। কতদিন হল এখানে? কি সুন্দর মিষ্টি করে কথা বলেন আপনি।
একসঙ্গে কথাগুলো বলে পাশের বেঞ্চে বসে পড়লো সে, মনেহয় এতগুলো ব্যাগ, সুটকেশ বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
- এখানে পিওন গুলো কেমন, ব্যাগগুলো একটাও নামিয়ে দিতে পারলো না?
- না না, ওরা এদিকে ওদিকে আছে হয়তো। পাওয়া গেল না, আর ঐ আন্টিও খুব অস্থির হচ্ছিলেন, ট্যাক্সিওয়ালা বেশিক্ষন তো দাঁড়াবে না, ওলা ক্যাব করেছেন।
- তুমি তো খুব পরপোকারী মেয়ে। আজকালকার দিনে এমন একটা দেখা যায় না, আমি বললাম।
- মানুষ মানুষের জন্য করবে না তো কি করে চলবে?
- সবাই তো সেটা ভাবে না, ভগবান তোমার মঙ্গল করবেন। এই রকম বড় মন পেয়েছো তুমি, আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম, কেন জানি না, ভীষণ মায়া মাখা মুখখানা।
- আমি না করলে আর কেউ করে দিত, আমি তো উপকার করবার সুযোগ পেলাম, এটাই আনন্দের কথা।
রোজ সকালে যোগব্যায়ামের ক্লাশে আমরা একসঙ্গে যায়, মেডিটেশন ক্লাশে অনেক্ষন নিস্তব্ধে একসঙ্গে বসে থাকি। সবসময় সে চায় আমার পাশে বসতে। তখন কিন্তু সে অন্যরকম মানুষ হয়ে যায়। কোন উশৃঙ্খলতা নেই, প্রগলভতা হাসি-মজাক নয়, একটা ধ্যান গম্ভীর ভাব নিয়ে অনেক্ষন চোখ বুজে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। ক্লাশ শেষ হয়ে গেলেও অনেকক্ষণ একা-একা বসে থাকে সেই বিশান ওঁ লেখাটার সামনে।
সেদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম - "কি গো মা এতক্ষন ধরে কার ধ্যান করলে?"
- পরমাত্মার। কোন বিশেষ দেবদেবী বা রিলিজিওন আমি মানি না। স্পিরিচুয়ালিটি তে বিশ্বাস করি। আসন করে শরীরটা হালকা হয়, তারপর অনুলোম-বিলোমে অনুভব করি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে জীবন দেবতার লীলা খেলা। আর তারপর "হৃদয়েতে পথ" কাটি মনের মধ্যে আসন পাতি, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে যে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর জন্য।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে রইলাম সেই মেয়েটির দিকে। মাঝে মাঝে এমনি জীবনবোধ নিয়ে কোন এক সাধিকার মতন কথা বলে সে। একদিন আবার আমাদের গানও শোনাল। মীরার ভজন, রজনীকান্তের "তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো।" এই প্রথম মনে হয় সত্যিই মেয়েটির মধ্যে কোন মলিনতা নেই, সে যেন সহজ সরল পুন্যস্রোতা নদীর মতন।
একদিন আমার ঘরে এসে গল্প করতে করতে মা বাবার সঙ্গে অনেক ছবি দেখালো সে নিজেদের পরিবারের। তাতে দেখা গেল খুব বড় বেণী ঝুলিয়ে বা পিঠে খোলা চুল এলিয়ে ফটো তুলেছে সে। ভারী মিষ্টি লাগছে। বললাম :
- কিছু মনে করো না মা, একটা প্রশ্ন করছি, যদিও অবান্তর তবু নিজের বুড়ি বান্ধবী ভেবে মাফ করে দিও। কৌতহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করছি, - এতো সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেললে কার পরামর্শে?
- খুব ঝড় ঝড় করে হেসে ফেলল সে। উত্তর দিল - মাথায় পোকা হয়েছিল তাই ন্যাড়া হতে হয়েছে।
- বুঝলাম, উকুনের কথা বলছে। একটু লজ্জায় পরে গেলাম - বললাম কিছু মনে করলে না তো মা, আমার বোধহয় জিজ্ঞেস করা এটা উচিত হয়নি।
- না না তাতে কি হয়েছে? সত্যি কথাটা বলতে বা জানাতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না।
এত ভালো লাগল ওর সপ্রতিভ ভাব দেখে, সহজভাবে সব জিনিষকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা দেখে। ভাবলাম আহা ও যদি আমার নিজের মেয়ে হত। ভগবান আমায় মেয়ে দেননি বলে দুঃখ ছিল না। আজ ষাট বছর পরে ওকে দেখে মেয়ে সন্তান না পাওয়ার জন্য প্রথম কষ্ট পেলাম।
কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের সকলের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠলো ঐ প্রাণবন্ত মেয়েটি। কাছে এসে বসলেই মনে হত এক উজ্জ্বল আলোয় যেন ভোরে গেল ঐ জায়গাটা। নানান ধরনের গল্প করে যেত সে। ফোন থেকে বের করত হাসির হাসির দৃশ্য - কৌতুকপ্রিয় স্বভাব, তার কাছে বসলেই যেন সব দুঃখ, রোগের যন্ত্রনা পালিয়ে যেত আমাদের। শীতকাল, রোদে বসতাম সবাই গোল হয়ে, আর হাসি মজাকে সময় যে কখন পার হয়ে যেত কেমন করে, বুঝতেই পারতাম না। সবসময় মুখে তার সাকারাত্মক কথা, কোনো নেগেটিভ ফীলিং সে আনতে দিত না আমাদের। কেউ মুখ ভার করে থাকলে বা যন্ত্রনায় কাতরালে, ছুটে যেত তার পাশে, আমার ঘরে চায়ের কেটলি ও সরঞ্জাম ছিল, যখন তখন বিনা সঙ্কোচে ঘরে ঢুকে চা বানিয়ে দিত আমাদের, নিজের মেয়ের মতন।
সেদিন ওর পাশের বেডের মোবাইল ফোনটা পাওয়া যাচ্ছে না, খুব নাকি দামী ফোন সেটি। যে মেয়েটি ঘর ঝাড়ু পোছা করতে এসেছিলো প্রথমে সন্দেহটা তার ওপরই পড়ল। হাসপাতালের সুপারভাইজার, নার্স, রিসেপশনিষ্ট, থেরাপিস্ট মেয়েগুলি সবাই ভীষণ অস্থির হয়ে সব রুম সার্চ করছেন। কাজের মেয়েটিতো প্রথমে ভীষণ রেগে গেল - 'আমরা কি এখানে চুরি করতে এসেছি নাকি' পরে জেরার চোটে কাঁদতে লাগল।  ঐ মেয়েটি তখন ফিজিওথেরাপি করতে গিয়েছিলো, ফিরে এসে নিজের রুমে এত হৈ চৈ দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেল, পরে বিছানা, বালিশ ঝেড়ে, বাথরুম খুলে সব জামাকাপড়গুলো বিছানায় ফেলে মোবাইল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হটাৎ তার বমি পেতে লাগল। ডাক্তারবাবুকে বললেন তার বাড়িতে খবর দিতে, শরীর খারাপ লাগছে, সে বাড়ি যাবে। এক ঘন্টার মধ্যে তার বাবা ও দাদা এসে পড়লেন, গাড়ি করে মেয়েটি বাড়ি চলে গেল। যাবার আগে আমার ফোন নম্বরটা নিতে কিন্তু ভোলেনি।
আমার ১৫ দিনের প্যাকেজ শেষ হতেই বাড়ি ফিরে এলাম। ক'দিন পরেই ফোন এল সেই মেয়েটির।
- কেমন আছো আন্টি?
- ভালো, তুমি কেমন? সেদিন হটাৎ চলে গেলে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার। তোমার নাম্বারও আমার কাছে ছিল না, তাই খবর নিতে পারিনি।
- আমিও তো ক'দিন যোগাযোগ করতে পারিনি ব্যস্ততার কারনে। ভাবছি একদিন আসব আপনার কাছে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়, আমার বাড়ি তো এই হাসপাতালের কাছেই। ঠিকানাটা এখুনি মেসেজ করে দিচ্ছি।
পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমার স্বামী। চোখ কটমট করে ফোন রাখতে ইশারা করছেন তিনি। বললাম - আচ্ছা মা, কেউ ডাকছে, এখন ফোন রাখছি, পরে কথা বলবো। লাইনটা কাটতেই স্বামীর বকুনি খেলাম।
সবাইকার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আসো, কাউকে বাড়িতে ডাকবে না। কার মনে কি আছে তুমি জানো? আজকাল কাউকে বিশ্বাস নেই। এটা কার ফোন ছিল, সেই মেয়েটা কি? যাকে নিয়ে হাসপাতালের লোকেরা আলোচনা করছিল। একদম বাড়ীর ঠিকানা দেবে না বলে দিলাম।
এরপর যখনই ওর ফোন আসে, স্বামী কাছে থাকেন বলে আর রিসিভ করতে পারি না, কথা বলা হয় না। মনটা খারাপ লাগে। আরও দিন ১৫ পরে ওর ফোন এল, মিষ্টি গলায় সে বললে -
- আন্টি, তোমাকে ভীষণ মিস করছি। আসলে আমার মা নেই তো, তোমাকে দেখতে, ব্যবহারে আমার মায়ের মতন মমতাময়ী লেগেছিল, তাই দাদা আর বাবা বাড়ি না থাকলে ফোন করি। ওরা কারো সঙ্গে বেশি কথা বলা পছন্দ করেন না। কেন জানো?
- কেন মা?
- হাসপাতালের লোকেরাও খুব বিরক্ত করত। জানেন ওরা আমাকে চোর বলে সন্দেহ করেছে। তারপর হেসে উঠলো সে।
- মনে হলো হাসিটার মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা বিদ্রুপ মাখা। মুখে বললাম, সে কী তাই নাকি?
- হ্যাঁ, কিন্তু আন্টি তোমার কাছে আমি জানতে চাই - 'তুমিও কি সেদিন আমার হটাৎ শরীর খারাপ হয়ে চলে যাওয়াটা এক্টিং মনে করেছো?
- অরে না না, মাথা খারাপ। তোমার মতন শুদ্ধ আত্মাকে ভগবান আমায় প্রথমদিন থেকেই চিনিয়ে দিয়েছেন। যার পাঁচটা আঙুলে হীরে, নীলা, দামী গোমেদ, প্রবাল হাতে এত দামী মোবাইল, গলায় দেখে রুপো মনে হলেও আমি জানি হোয়াইট গোল্ড-এর মোটা চেন - সে যে কতবড় বাড়ির মেয়ে তা কি বুঝিনি আমি, তুমি কেন নিতে যাবে অন্যের জিনিষ?
- ওগুলো আমার ঠাম্মা সব ধারন করিয়েছেন তাড়াতাড়ি রোগমুক্তি-ভোগান্তি কম হবে বলে। আর মোবাইলটা দাদা আমায় আমার জন্মদিনের শেষ উপহার দিয়েছে।
- কথাটা খট করে কানে লাগলো। শেষ উপহার মানে? প্রশ্নটা মনে মনে করলেও আবার সেই পরিচিত ঝরঝরে হাসিতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কোনো কথা সরলো না মুখে।
- আমার তো ক্যান্সার, লিউকোমিয়া। অ্যাডভান্স স্টেজ, অলরেডি ১২টা কেমো হয়ে গেছে গত ফেব্রূয়ারি থেকে, সব চুল পড়ে গিয়েছিল, আবার বেরুচ্ছে। তাই বলেছিলাম পোকার জ্বালাতনে ন্যাড়া হতে হয়েছিল। are you listening aunty?
- আমার মুখে ভাষা নেই তাই শুধু হুঁ বেরুলো।
- সাইড এফেক্ট দূর করতে Naturecure Hospitalএ ভর্তি হয়েছিলাম, তাই তোমায় পেয়ে গেলাম।
- আমিও তোমার মতন একটা মেয়ে খুঁজে পেলাম।
একটা গানের কলি এসে বুকের দুয়ারে আঘাত করল, আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যারে... ভগবানকে দেখা যায় না, এইসব পবিত্র মানুষের মাধ্যমেই বোধহয় তিনি একটু সময়ের জন্য ধরা দেন। তাই কবি বলেন, "মাঝে মাঝে তব দেখা পাই... চিরদিন কেন..."। সে বলে চলেছে –
- আয়ুর্বেদ-এর ট্রিটমেন্ট ও Nature Cure ডিপার্টমেন্ট-এর ম্যাসেজ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ফিজিও থেরাপীর পর খুব কষ্ট হল, বমি পেল, তাই চলে আসতে হল, ক'দিন আর আছি এই পৃথিবীতে সম্ভবতঃ কয়েকটা মাস, মোবাইল চুরি করে কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখব বলো তো? যমরাজের কাপবোর্ড-এ? বলার সাথে সাথে আবার হাসি।
আমি আর কথা বলতে পারছি না। চোখ দুটো থেকে জল ঝরে পড়ছে অঝোর ঝরে।
- কি হল আন্টি তুমি কথা বলছো না যে? আমি ঠিক করেছি বাকী ক'টা দিন শুধু যাদের খুব ভালো লেগেছে, পজিটিভ থিংকিং-এর লোক মনে হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলব। আর অজানা অচেনা লোকের উপকার করবার চেষ্টা করব। নিজের আত্মীয়-স্বজনেরা বড্ড এক ঘেয়ে হয়ে গেছে, ওরা আমাকে এমন সহানুভূতির চোখে দেখে যেন ক্যান্সারের জীবাণুগুলো দেখতে পাচ্ছে। বাবাকে তো তারা ইস, আহা, কেন হল গো - শুনিয়ে শুনিয়ে আধমরা করে রেখেছে।
আস্তে আস্তে একটু নিজেকে সামলে আমি এবারে বললাম - তোমার মতন সুন্দর স্বভাবের প্রকৃত আধ্যাত্মিক মনোভাবের একজন তরুণ বন্ধু পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। জন্ম-মৃত্যু তো আমাদের হাতে নেই। এই আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি এখুনি হার্ট এট্যাক হতে পারে, রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে চলে যেতে পারি। তুমি কোয়ালিটি লাইফ স্পেন্ড করছো, কারো প্রতি অভিমান নেই, আনন্দময়ী মেয়ে ভগবান তোমাকে যে সাহস ও সহ্যশক্তি দিয়েছেন ক'জন তা পায়।
আরে এই জন্যই তো তোমাকে আমার এত ভালো লেগেছে। দেখো আমাদের বয়সের কত পার্থক্য কিন্তু মনের কত মিল। কাশির ধমক এল মেয়েটির, তাই আমার ফোনটা হটাৎ কেটে গেল। প্রথমদিনের ঐ বাক্স ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার। মোবাইলটা আবার বাজছে। ভাবলাম আবার ওই করছে - না হাসপাতাল থেকে, ওখানের সুপারভাইজার।
- দিদি কেমন আছেন আপনি? হাঁপানি কমেছে একটু? ইউক্যালিপ্টাসের পাতা দিয়ে স্টিম ভাপটা নিচ্ছেন তো? ফুট বাত নিতে রাতে ভুলবেন না কিন্তু।
ওকে হটাৎ কৌতূহল ভরে প্রশ্ন করলাম, সেই ভদ্রমহিলার মোবাইলটির হদিশ মিলেছিল কি?
হ্যাঁ তো। জানেন না আপনি? উনি ওটি যোগা ক্লাশে ম্যাট-এর তলায় রেখে ব্যায়াম করছিলেন, তারপর ভুলে চলে গিয়ে এত হাঙ্গামা করলেন। রবিবার সব ম্যাট তুলে রুম ওয়াশ করতে গিয়ে কাজের লোকেরা ওটি পায় এবং আমাকে জমা দিয়ে যায়। শুধু শুধু এতগুলো মানুষকে চোর সন্দেহ করে দুঃখ দিলেন। আমি সেই মেয়েটির মুখটা মনে করে আবার চোখের জল ফেলতে লাগলাম, একা একা বসে।