বড় দি

চন্দনা সেনগুপ্ত

বাংলার ঘরে ঘরে অনেক প্রতিমা, মিনতি, রমা দিদি দেখেছি। যাঁরা ভাই-বোনদের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। পরিবারের বৃদ্ধ, শিশু, নারী, পুরুষ সকলের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখতে গিয়ে নানাভাবে ত্যাগ স্বীকার করে এসেছেন।

একটি সেইরকম পরিবারের গল্প এটি। অনিমা, প্রতিমা, অসীমার পরে মায়ের কোলে এল ঘর আলো করা এক ভাই, সঞ্জয়। কিন্তু জন্মের একমাসের মধ্যে তাদের মা হটাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা গেলেন।

১২, ৮, ৬ ও ঐ দুধের শিশুটি নিয়ে অবিনাশবাবু পড়লেন একেবারে সমস্যা সংকুল সমুদ্রের মাঝে। আত্মীয় স্বজন, শ্বশুর শাশুড়ির কথায় তিনি আবার ‘দার পরিগ্রহ’ করলেন, তার বিবাহ যোগ্য দূর সম্পর্কের শ্যালিকাকে। স্ত্রী তাঁর থেকে অনেক ছোট, কিন্তু কন্যা দায়গ্রস্থ বাঙ্গালী মা-বাবা বড় জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে একেবারেই দ্বিধা করলেন না। সেও জেনেছিল, তার কালো রং, অর্থসংকট পিতা-মাতাকে পাত্র পেতে খুবই অসুবিধায় ফেলেছে তাই বিনা দ্বিধায় তিনি ঐ চারটি সন্তানের পিতাকে বিবাহ করে তাদের পালন পোষনের ভার গ্রহণ করলেন। পরের দুই বছরে তাঁরও দুটি সন্তানের জন্ম হল, একটি পুত্র ও একটি কন্যা।

১৬ বছরে বড় মেয়ে অনিমা তখন ঐ পাঁচ ভাই বোনের স্নেহময়ী বড়দি। তার তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে উঠতে লাগল তারা। নতুন মা তার থেকে মাত্র ছয় বছরের বড়। দুজনের মধ্যে আন্তরিক প্রীতির সম্পর্ক। মা রান্না ঘরের সমস্ত কাজ নিজে হাতে করেন এবং তাঁর লক্ষ্মী শ্রী অবিনাশ বাবুর সংসারে শ্রী ফিরিয়ে এনেছে। আর অনিমার স্নেহে শাসনে শিক্ষায় সযতনে পালিত হচ্ছে তাদের পাঁচজন ছোট ভাইবোন।

এক প্রতিবেশী বলেন, “উনি তোর সৎ মা – এর, এসব লোক দেখানি ব্যবহার” – তখন বড় মেয়ে জোর গলায় জবাব দেয়। – ‘সৎ’ বলেই এমন ভালোবাসেন, তোমার মতন ‘অসৎ’ মা হলে কু-শিক্ষা দিতেন। নতুন মা ওর চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে খিল খিল করে হাসেন।

দশ বছর পার হল অনিমা স্কুলে কাজ পেয়েছে। প্রতিমা নার্স। অসীমা খুব ভাল পড়াশোনা করছে। ছোট দুই ভাই ও সবচেয়ে কনিষ্ঠা মেয়েটিও স্কুলের পড়া, নাচে গানে আনন্দে মেতে আছে, দিদির তত্ত্বাবধানে। হঠাৎ অবিনাশ বাবুর ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসা করতে করতে সব জমানো পুঁজি শেষ হয়ে গেল তাঁর। কিন্তু দু বছরের বেশি জীবিত রইলেন না তিনি। নতুন মা কে মনের জোর বাড়াতে, বাবার অফিসেই কম্পেন্সেশন গ্রাউন্ডে কাজ নিতে সাহস যোগালেন ঐ বড়দি অনিমা। মা দশটা – পাঁচটার কাজ নিলেন, সংসারে অনিমার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। প্রতিমা নার্সিং করে কিছু সাহায্য দিত সংসারে কিন্তু তারও একটা সহকর্মীর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতেই অনিমা তাড়াতাড়ি হাসপাতালের সেই যুবক কম্পাউন্ডার এর সঙ্গে বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করল। ওর ছোট ভাই বোন দুটি খুব আদরে আবদারে মানুষ হচ্ছিল এতদিন, এখন সংসারের অবস্থাটা খারাপ হওয়ায় তাদের সব চাহিদা পূরণ করতে না পারায় তারা ক্রমশঃ বেয়ারা হয়ে উঠল। কথায় কথায় ঝগড়া মারামারি লেগেই থাকে তাদের। যে ভাইটির জন্মের পরেই মা মারা গেছেন, সেই সঞ্জয় খুব নিরীহ ও শান্ত। তার সব জিনিস কেড়ে নেয় ঐ ছোট দুজন, খুব জ্বালাতন করে তাকে। তাই নিরুপায় হয়ে অনিমা সঞ্জয়কে ভর্তি করে পুরুলিয়ার সৈনিক স্কুলে। ছোট দুজন তন্ময় ও মধুশ্রী প্রায় মামাবাড়ি বেড়াতে যায়, সেখানে কুশিক্ষা দেওয়ার মতন এক মামী ছিলেন, যিনি ওদের বোঝালেন ‘বড়দি ওর অন্য ভাই বোনেদের বেশি ভালোবাসে।’ তাদের ব্যবহার ও মানসিকতা পাল্টাতে লাগল, এদিকে নতুন মা চাকরি স্থলে গিয়ে এক নতুন জীবনের স্বাদ পেলেন। তাঁর সাজ সজ্জা, সিনেমা, পিকনিকে যাওয়া, সহকর্মী অফিসারদের সঙ্গে বাইরে খাওয়ার সময় বেড়ে যেতে লাগল।

বড়দি অনিমার জীবনেও এইসময় একজন যুবকের আবির্ভাব হল। সে সরকারী ব্যাঙ্কে ভাল চাকরী করে। ভীষণভাবে অনিমার প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু সাড়া পায় না কোনোরকম। একদিন একা পেয়ে প্রস্তাব দিয়ে বসলো বিয়ের। কিন্তু অসীমা তখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে দুর্গাপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পেয়েছে। তার পড়া শেষ হলে, সে চার বছর পরে একটা ভালো চাকরী পেলে তারপর নিজের চিন্তা করবে। শুভময় নামে যুবকটির পক্ষে এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না, বিয়ে হয়ে গেল তার।

এদিকে ছোট ভাই তন্ময় ‘জিম’ জয়েন করে শরীর মজবুত করার দিকে মন দিয়েছে, ছোট বোন মধুশ্রী সারারাত প্রায় ফেসবুকে বন্ধু বানায়, বিউটি পার্লারের কাজ শিখেছে, ফ্যাশন করতে তার খুব ভাল লাগে। নতুন মা ওদের খুব প্রশ্রয় দেন। মাঝে মাঝে ভাই বোনের চালচলন নিয়ে বোঝাতে গেলে তিনি বলেন, “তুই এখনও নিজের পুরোনো খেয়াল নিয়েই রইলি। জমানা, যুগ, বাচ্চাদের ইচ্ছে সব বদলে গেছে। পুরোনো ধারণা পাল্টে ফেল।”

কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা উৎশৃঙ্খল হয়ে উঠতে লাগল। তন্ময় এখন তাদের পাড়ার নামকরা মস্তান, সব রাজনীতি নেতারাই তাকে যখন তখন ডাকাডাকি করতে থাকেন এবং নিজেদের দলের স্বার্থে তাকে ব্যবহার করেন। মারামারি করতে টাকা ধরিয়ে দেন, তার মজবুত শরীরের দিকে লক্ষ্য অনেকেরই। একথা ভাইকে বোঝাতে গেলে মুখের ওপরে কথা বলে সে। “বড়-দি তুমি আমার ব্যাপারে নাক গলিও না please।” ছোট বোন মধুশ্রী ফেসবুকের মাধ্যমে আলাপ হওয়া বড়লোক বন্ধুদের গাড়ি চড়ে বেড়িয়ে বেড়ায়। বাধা দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, নতুন মা ওদের হয়ে সবসময় সালিশি মারেন। এটাই তো বয়স, একটু হৈ হুল্লোড় করবে না ! তার অকাট্য যুক্তি বড়দি অনিমার মূল্যবোধকে ফিকে করে দেয়।

একভাবে কেটে যায় আরও কতগুলো বছর। অসীমা খুব ভালো করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে। GRE দিয়ে সে তার সহপাঠী সুজয়ের সঙ্গে আমেরিকা পাড়ি দেয়, মাস্টার ডিগ্ৰী হাসিল করতে। বড়দি চোখের জল লুকিয়ে তার স্যুটকেস গুছিয়ে দেয়। ওদিকে সঞ্জয় পুরুলিয়ায় সৈনিক স্কুল থেকে পাশ করে NDA তে জয়েন করে সে পুনার পাশে ‘খাগড়াসলা’ চলে যায়। তিন বছর পরে আর্মি অফিসার হয়ে সে বড়দিকে তার কাছে নিয়ে চলে যাবে এই প্রতিশ্রুতি দেয়। খুব আনন্দ হয় অনিমার সন্তানতুল্য ঐ দুই ভাই বোনের সাফল্যে। চুলে পাক ধরেছে তার। নতুন মা চুলে রঙ করেন পার্লারে গিয়ে রূপ চর্চা করেন। ছয় বছরের ছোট হয়েও অনিমাকে তার থেকে বড় মনে হয়।

হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে বাড়িতে তার মা ও ছোট বোন কথা কাটাকাটি ও কান্নাকাটি করছে দরজা বন্ধ করে। কিছু একটা অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত ব্যাপার হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অনিমা ইদানীং নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে, কাউকে কিছু বলে না, কি হয়েছে জানতেও চায় না। প্রায় ভাবে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে।আজও নিজের জন্য দুটি রুটি আর আলু পেয়াঁজ ভাজা করে খেতে বসেছে, হটাৎ নতুন মা চিৎকার করে ডাক দিলেন তাকে। অনিমা দেখো কি কান্ড করেছে মধু, ছুটে গিয়ে হতভম্ভ হয়ে গেল বড়দি।

একটা ওড়না নিয়ে গলায় জড়িয়ে ফাঁস লাগাচ্ছে বোনটি, মা তার হাত ধরে আছেন। অনিমা এক চড় মারল তাকে এবং মা কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওড়না টা টান দিয়ে কেড়ে নিল তার হাত থেকে এবং গলার ফাঁসটি খুলে তাকে খাটে শুইয়ে দিল জোর করে। ‘কী ড্রামাবাজি হচ্ছে এসব? কি হয়েছে বল আমাকে। এবারে – বড়দি বড়দি বলে কেঁদে জড়িয়ে ধরলো সে, মুখটা তার বুকে গুঁজে দিয়ে।

নতুন মা রাগে দুঃখে হাঁফাচ্ছিলেন – বললেন – “মুখে কালি মেখে বাড়ি এসেছেন মহারানী – আজকে বমি করছে দেখেই সন্দেহ হল। কিন্তু এই ক’মাস কেমন লুকিয়ে রেখেছে দেখ, সর্বনাশী মেয়ে।

অনিমা বলল – ‘তুমি ও ঘরে যাও, একটু চোখে মুখে জল দাও। শান্ত হও। আমি দেখছি। বোনকে আদর করে অনেকক্ষন দু হাত দিয়ে জাপ্টে ধরে রাখলো। সময় দিল কাঁদবার। সে স্বাভাবিক হলে, শুধু জিজ্ঞেস করলো – “এখন কয় মাস চলছে? তুই কি করতে চাস?” – “পাঁচমাস দিদি।” এতদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম যার বাচ্চা সে যদি বিয়ে করতে রাজী হয়। কিন্তু – – – – আবার ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। অনিমা জানতে চাইলো না যে সে কে, শুধু ভাবতে লাগল এই মা ও সন্তানকে বাঁচাতে হলে কি করা উচিৎ তার।

স্কুলের এক বান্ধবীকে ফোন করল। ক’দিন ধরেই বলছিল যে এবারে গরমের ছুটিতে তার সঙ্গে রাঁচীতে তাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। প্ল্যান বানিয়ে ফেলল, তার সাথে বোনকে নিয়ে যাবার। ছয় মাসের ছুটি নিল স্কুলে। ঝাড়খণ্ডের অচেনা অজানা পরিবেশে এক অখ্যাত ছোট হাসপাতালে মধুশ্রীর বাচ্চা প্রসব হল। চমৎকার ফুটফুটে এক মেয়ে। একটু সুস্থ হলে বোনকে ঐ গ্রাম থেকে পাঠিয়ে দিল, রাঁচী শহরে ঐ বান্ধবীর আন্তরিক সাহায্য পেল সে এই কাজে। নতুন করে কলেজে ভর্তি হয়ে বোন পড়ানো শুরু করল, বড়দির তত্ত্বাবধানে সেদিন থেকে তার জীবনে এল, এক বিরাট পরিবর্তন। নিজের পায়ে দাঁড়াবার অঙ্গীকার নিয়ে সময় নষ্ট করা ছেড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানান ভোকেশনাল ট্রেনিং নিতে আরম্ভ করল মেয়েটি।

সদ্যঃ জাত শিশু কন্যাটির জন্য আগেই সে যোগাযোগ করেছিল রাঁচির এক মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তারা ফেলে যাওয়া শিশুদের রাখে আবার adoption এর জন্যেও অনেকে বাচ্চা দত্তক নেয়, সেখান থেকে। সেখানকার সিস্টার সুন্দর কন্যাকে সাগ্রহে গ্রহন করলেন।

হঠাৎ শুরু হল কোভিড মহামারী। করোনার প্রকোপে বিনা নোটিশে সারা দেশে “লক ডাউন” ঘোষণা হল, বাস, ট্রেন, প্লেন সব বন্ধ হয়ে গেল।

অনিমাকে সিস্টার অনুরোধ জানালেন, – “আপনাকে এখানেই থাকবার ঘর দিচ্ছি আমরা। আমাদের ট্রাইবাল মেয়েদের স্কুলে শিক্ষিকা খুব কম। থেকে যান না আপনি আমাদের সঙ্গে।”

“বড়দি, বড়দি please তুমি ওখানেই থেকে যাও, এটাই হয়ত ঠাকুরের ইচ্ছে।” ফোন করলো ছোট বোন মধুশ্রী। – “ক’টা বছর আমাকে দাও। একটু নিজের পায়ে দাঁড়াই তারপরে মেয়েকে আমি আবার নিজের কাছে নিয়ে আসবো, শুধু দেখো, ওকে যেন অন্য কেউ দত্তক নিয়ে চলে না যায়।”

বোনের ও ঐ সিস্টার (নান) অ্যালিসার কথা যেন সত্যি অনিমার ঈশ্বরের নির্দেশ বলে মনে হল। সে থেকে গেল ঐ ছোট পাহাড়ঘেরা আদিবাসীদের গ্রামের মিশনারী আশ্রমের স্কুলে। মনে হল যেন জীবনে একটা নতুন আশার আলো দেখতে পেল সে। বাঁচবার জন্য অসহায় অনুন্নত কন্যাদের হাতগুলি চেপে ধরল সে। সিস্টারও তার মতন একজন বুদ্ধিমতী স্নেহময়ী হাউস মাদার – টিচার তথা সেবিকাকে সাথী হিসাবে পেয়ে খুব খুশী হলেন।

ওদিকে নতুন ফোনে জানালেন যে ভাই সঞ্জয় দুই দলের গুন্ডাদের কাছেই প্রচন্ড মার খেয়ে, হাত পা ভেঙ্গে বিছানায় শয্যাশায়ী। বড়দির কাছে সে ক্ষমা চেয়েছে। নতুন মায়ের অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। এই মহামারী তাকেও অনেক বড় শিক্ষা দিল। মা ও ছেলের জীবন এবার নতুন ধাতে বইতে শুরু করেছে। তারা দুজনেই আবার স্বাভাবিকভাবে আর পাঁচজন ঘরোয়া পরিবারের মতন করে সময় কাটাতে শিখেছে। মা ছেলে দুজনেই রান্না ও পরিশ্রম করতে ভালোবাসতো। আগের মতোই দুজনে মিলে বাড়িতে রান্না করে এবার ঘরে টিফিন সার্ভিস দিতে শুরু করল। এটাও বড়দি অনিমার বুদ্ধিতে হল। বিশেষ করে কোভিড রুগীদের কেউ দেখার নেই, তাই ফোনে App অ্যাপ বানিয়ে ঐ ছোট শহরের বহু পরিচিত ও অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলল তন্ময়। ভাইকে একটা বাইক কিনে দিল অনিমা ঐ দূর থেকে গুগল পে-এর মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে। মা কে আমাজন থেকে অর্ডার করে বড় বড় কুকার ও অনেকগুলি টিফিন বক্স কিনে দিল, যা দিয়ে এই ব্যবসা সুন্দর করে চলতে লাগল তাদের।

আজ মনে অদ্ভুত আনন্দ, শান্তি ও সফলতার গর্ব অনুভব করল অনিমা। আমাদের মতন লেখক/পাঠকদের মনে হল – অসাধ্য সাধন করেছেন এই “বড় দিদি”। এ যুগেও এরকম অনেক দিদি পাওয়া যায় বহু ঘরে ঘরে।

বৌদি

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমি উষা। বয়স ৩৬ বছর। ছোট থেকেই জ্যেঠিমার কাছে মানুষ হয়েছি। বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আমার মা ও আমাকে জ্যেঠিমার কাছে নিয়ে আসা হল। কিছুদিন পরে মা ও মারা গেলেন, জ্যাঠামশাই বাইরে চাকরী করতেন, রাশভারী মানুষ ছিলেন, তাঁকে আমরা বেশি কাছে পেতাম না। দাদা দিদিরা সবাই পড়াশুনাতে ভালো ছিলেন, তাঁরা নিজের নিজের স্কুল কলেজে ব্যস্ত থাকতেন। ছোটবেলায় পোলিও হয়ে আমার পা টি ছোট হয়ে যায়, তাই বিয়ের কোনও প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়নি, তাই ঠাকুমা, জ্যেঠিমা ও মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজেই আমি ব্যস্ত থাকতাম। অবসর সময়ে সেলাই, বড়ি দেওয়া বা আচার দেওয়া, বাড়ির বড়দের সেবা শুশ্রষাতেই সময় কেটে যেত। জীবনটা খুব স্বাভাবিক ছন্দেই বয়ে চলতো। কোনোদিন নিজের সংসার না হওয়ার জন্যে মনে খেদ বা দুঃখ বোধও ছিল না। বাড়ির পরিবেশটি সুন্দর করে রেখেছিলেন, আর একজন মানুষ। জ্যেঠিমার বৌমা, আমার প্রিয় বৌদি।

দাদা ডাক্তার হওয়ায় খুব ব্যস্ত থাকতেন হাসপাতাল ও নিজের রুগীদের নিয়ে। আমাদের সময়ে বড়দের সামনে একসঙ্গে বসে অল্পবয়সী স্বামী-স্ত্রীকে গল্প করতে বা হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকতে কেউ দেখতে পেতেন না। প্রত্যেকেই সংসারে নিজের নিজের কর্ত্বব্য নিদৃষ্ট করে দেওয়া দায়িত্বতে ও কাজে মন নিবেশ করতে ভালবাসতেন।

জ্যেঠিমার ছোট ছেলে আমার ছোট দাদা আর্মিতে চলে যান এবং বরাবরই বাড়ির বাইরে থাকেন। তাঁর স্ত্রীও বাঙালি নন, তাই তাঁর সঙ্গে পরিবারের বন্ধন ক্রমশঃ ছিন্ন হয়ে এসেছে। অতএব বাড়ির সর্বময়ী কর্তৃ বৃদ্ধা ঠাকুমা, প্রৌঢ়া শাশুড়ি, নিজের শ্বশুর, স্বামী ও তিন ছেলে মেয়ে সবাইকার দেখাশোনা, গৃহ কর্ম পরিচালনার ভার ওই বৌদিদির ওপরে। আমি সবসময় তাঁর হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিই বলে, আমাকে ছাড়া তার একপাও চলেন না। সর্বদা কানে তাঁর ডাক শুনতে পাই আমি – ”উষা, উষি – এ্যাই উষশী গেলি কোথায় মুখপুড়ি, বিকেল গড়িয়ে গেল যে, ছাদের থেকে কাপড়গুলো তুলে নিয়ে আয়, কাপড় ছেড়ে সন্ধ্যেটা দিয়ে দে না রে বোন, আমি ঠাম্মা কে সাবু সেদ্দ খাইয়ে আসি।”

ওদিকে জ্যেঠিমা ডাক দিলেন, – “ও মা উষি চুলটা বেঁধে দিয়ে যা, বাতের ব্যাথাটা বড় বেড়েছে হাতটা যে নাড়তে পারছিনা মা।”

ছুটে ছুটে কাজ করতে করতে আমার ভালো লাগে। আজ নিজের ডাইরী লিখতে বসে মনে হল, নিজের কথা ছেড়ে আমার বৌদির কথা লিখতে পারলে আমি ধন্য হয়ে যাব।

ঠাকুমার খুব পেট খারাপ, বারেবারে কাপড়ে চোপড়ে পায়খানা হয়ে যাচ্ছে। বৌদি সেগুলি কেচে, ঠাম্মাকে পরিষ্কার করিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিচ্ছেন। কখনও সস্নেহে চিড়ে দই খাওয়াচ্ছেন, গামছা ভিজিয়ে মুখ মুছিয়ে আবার তাঁর ফোকলা মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। সেদিন ভোরবেলায় উঠে জ্যাঠামশাই প্রাতঃ ভ্রমণে বেরুতে যাচ্ছেন, দেখতে পেলেন ঠাকুমার ঘরের সামনে এক দলা ‘গু’ পড়ে আছে। ডাক দিলেন, ‘বৌমা দেখোতো এখানে বেড়াল, কুকুরে পায়খানা করে রেখেছে না কি?’ বৃদ্ধা ঠাম্মা লজ্জা পেয়ে ঘর থেকে বেশ জোরে আওয়াজ দিলেন – ‘ওরে বৌমার ছোট ছেলেটার বোধহয় পেট ছেড়েছে, দেখতো উষা কোথায় ময়লা করে ফেললো।’ আমাদের ছোট্ট ভাইপো ৭ বছরের বিট্টু তখন স্কুলে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছে, বড় ঠাম্মার দোষারোপ শুনে রেগে আগুন তেলে বেগুন হয়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল – “দেখো দেখো আমার পাছায় গু লেগে আছে কিনা? আমি এত বড় ছেলেটা এখানে ওখানে হাগু করে বেড়াবো? বড় ঠাম্মা আমার নামে কেন মিথ্যে বললো? আমি স্কুলে যাব না” – কান্না শুরু হল তার। –

এবার বৌদি আদর করে তাকে বোঝাতে বসলেন ঘরে নিয়ে গিয়ে। কি সুন্দর তার কায়দা। বললেন ,-

”জানো ৮০ বছর বয়স হলে মানুষ একেবারে শিশু হয়ে যায়। তখন তার মনের বয়স আবার শূন্য থেকে গুনতে হয়।ঠাম্মার এখন ৮৩ বছর, তাহলে তার মানসিক বয়স কত বলতো – ছেলে উত্তর দিল 3  উত্তর দিল। আর তুমি? – ৭, এখন তাহলে কে বড় তুমি নাকি ঠাম্মা? বুড়ো-বুড়িরা এখন বাচ্চা হয়ে গেছে, – তাদের কথা ধরতে নেই।

ছেলে চোখ মুছে আবার স্কুল ইউনিফর্ম পরতে পরতে বললো – ‘তাহলে আমি ঠাম্মার চেয়ে ৪ বছরের বড়। ঠিক আছে, ছোট বোনকে আজকে মাফ করে দিলাম।’

আমি বৌদির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তিনি নির্বিকারভাবে ঐ ময়লা সব পরিষ্কার করে ঠাম্মার বিছানাও পাল্টে দিলেন।

সেদিন জ্যেঠিমা ও ঠাকুমা দুই ৮৭ ও ৬৪ বছরের বৃদ্ধাদের ডাক্তারবাবু এসে বৌদির খুব প্রশংসা করে গেলেন। বড়দা কে বললেন –

”তুমি খুব ভাগ্যবান এরকম লক্ষ্মীমন্ত বৌ পেয়েছো। আজকাল ‘জেরিয়াটিক’ সাইকোলজি’ পড়েও নার্সরা বুড়ো-বুড়িকে এত সুন্দর যত্ন করতে পারে না। আমি পরে ঐ কথাটির মানে খুঁজে বেড়ালাম। শিশু মনস্তত্ব নিয়ে অনেক পড়াশোনা রিসার্চ হচ্ছে। অনেকে বই লিখেছেন, শিক্ষিকা হতে গেলে সেগুলির ব্যাপারে জানতে হয়। কিন্তু বুড়োদের জন্য যে jeriatric pycholgyটা জানতাম না,  বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায় প্রায় ৯০ ভাগ লোকের। হয় তারা সব ভুলে যান বা বেশি সচেতন, খিটখিটে হয়ে পড়েন। শরীরের সঙ্গে মাথার মনের স্মৃতিশক্তির যে সম্পর্ক সে বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও তাঁদের ওপরে পরিবারের লোকেরা বিরক্ত হয়ে যান, শুধু তাঁদের ধৈর্য্য না থাকার জন্য।

আমাদের এই ‘বৌদিদি’টি তার একেবারেই ব্যতিক্রমী। তাঁর আরও কয়েকটি সক্রিয় কাজের এর দৃষ্টান্ত দিলে পাঠক-পাঠিকারা আরও প্রেরণা পাবেন, এবং বয়স্কদের সেবায় ভালোভাবে নিযুক্ত হতে পারবেন।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগেরদিন বৌদি বাজারে গেছেন দীনুকাকাকে সঙ্গে নিয়ে, নিজের পছন্দ মত ঠাকুর ও পুজোর সামগ্রী আনতে। প্রতিমাটি সুন্দর না হলে তাঁর মন খুঁত খুঁত করে।

আমি ,কাজের মাসী ও মণিদি তিন জন মিলে বসে গেছি, নারকেল কুরিয়ে নাড়ু বানাতে। একদিকে বানিয়ে থালায় রাখছি, একটু পরেই আমার তিন ভাইপো ভাইঝি ও এসে তা চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে। খুব জ্বালাতন হয়ে নাড়ু করা বন্ধ করে ঠাকুমার খাওয়ার রান্না করে তাঁকে খাওয়াতে গেছি – কিন্তু খুব গম্ভীর বিষণ্ণ বদনে বলে দিলেন, তাঁকে খাওয়ার দেওয়ার দরকার নেই।

বুঝলাম বৌদি না এলে খাবেন না। বৌদি এসেই আমাদের বকাবকি শুরু করলেন, “কিরে মা, ঠাকুমার এখনও খাওয়া হয়নি?”

জ্যেঠিমা মাথা ধরেছে বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, – ঠাকুমা তাঁর কথা শোনেন না, শুধু তাঁর নাত-বৌ কে মানেন, ভেবে তাঁর দুঃখ হয়েছে, কারন আমারদের হাত থেকে খাবার থালা নিয়ে তিনি তাঁর বুড়ি শাশুড়িকে খাওয়াতে গিয়েছিলেন, কিন্তু অকারণে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বুড়ি মা। “আমার আর খাওয়ার দরকার নেই, তিন কাল গিয়ে এক কাল ঠেকেছে, এবার গেলেই বাঁচি।”

বৌদি চারিদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর হেসে বললেন – “দে এবার আমায় থালাটা। আমাদের বানিয়ে রাখা এক মুঠো সাদা নারকেল কোরা তুলে একটা বাটিতে নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন, -“ঠাম্মা দেখো কি এনেছি।” ফোকলা দাঁতে একমুখ হাসি হেসে তিনি থালার দিকে চেয়ে ভীষণ খুশী হয়ে গেলেন। ঠিক যেন পাঁচ বছরের কন্যা। জ্যেঠিমা এবার মুখ খুললেন। “ও এইজন্যই বুড়ির এত রাগ।”

এমনিতে কানে কম শোনেন, কিন্তু ঐ ‘বুড়ি’ কথাটা ঠিক কানে গেল।

“কি বললে বৌমা, আমি বুড়ি?” তুমি বুড়ি হও নাই? তুমিও নাতির ঠাকুমা হয়েছো?” তারপর আদর করে বললেন, “নাতবৌ কেমন বুঝতে পারে – কখন কি চাই। ছেলে পুলেরা সবাই নারকেল খাচ্ছিল, আমায় তো দিলে না। বড় খোকাও একটা টুকরো নিয়ে কডর মডর করে চিবিয়ে খেলে, আমার কি দাঁত আছে?”

ঠাকুমা কে শান্ত করে এবার জ্যাঠামশাই ও জ্যেঠিমা কে বাটি ভরে শুক্তো, মাছের ঝাল সাজিয়ে ভাত বেড়ে দিলেন। তাঁরাও খুশী হয়ে পান চিবুতে চিবুতে দিবা নিদ্রায় গেলেন।

বৌদি আমাদের সঙ্গে রান্না ঘরে হাঁড়ি কুড়ি সব নিয়ে খেতে বা খাওয়াতে বসতেন। বারবার করে তাঁর ঐ আন্তরিকতায় মুগ্ধ হতাম আমরা – “উষা আর একটা মাছ ভাজা নে, তুই তো আবার ঝাল দেওয়াটা খাবি না। মাসি দু হাতা ভাত নাও, চাটনি মেখে খেও শেষ পাতে, মনি তুই ডাল মাখ না, এতো শুকনো শুকনো খাচ্ছিস কেন?” ইত্যাদি কথায় গল্পে আমাদের সকলের সারাদিনের পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দিতেন তিনি। লক্ষ্মী শ্রী বোধহয় একেই বলে। শুধু বাড়ির লোকদের নয়, বাইরেও তাঁর দয়ালু পরোপকারী মনটা সর্বদা সবদিকে লক্ষ্য রাখতো। সেদিন বৌদির সঙ্গে ডাক্তারখানায় ওষুধ আনতে গেছি, দেখলাম একটি ঘোমটা টানা গ্রাম্য বৌ ছেলে কোলে নিয়ে একধারে বসে আছে, আর কয়েকটি লোক তার পাশে এসে বসবার বা কথা বলার চেষ্টা করছে।

বৌদি রুখে দাঁড়ালেন – “কি ব্যাপার তোমরা এদিকে কেন? বাইরে বেঞ্চিতে গিয়ে বসতে পারছো না? তোমাদের তো ওষুধ নেওয়া হয়ে গেছে।” ছেলেগুলি বাইরে গেল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ভাল নয় দেখে, বৌদি সেই মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে রিক্সা করে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলেন। কিন্তু সে সবে শহরে এসেছে, ঠিকানা বলতে পারছে না, খুব ভয় পেয়ে গেছে। তার স্বামী দোকানে রান্না করে। ডাক্তারখানায় বসিয়ে দিয়ে গেছে, ছেলেটার জ্বরের ওষুধ নিতে। একঘন্টা পরে আসবে বলেছিল কিন্তু তিনঘন্টা হয়ে গেছে। চেম্বার বন্ধ করে ডাক্তারবাবু বাড়ি যাচ্ছেন, এই অবস্থায় ঐ বৌটিকে নিয়ে খুঁজে খুঁজে তার স্বামীর দোকান বের করে তাকে ডেকে ঐ বৌটিকে সঁপে দিয়ে বকুনি ও কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি এলেন বেশ অনেক রাত্রে। লোকটিকে তার রেস্টুরেন্ট এর মালিক ছাড়েনি, বহু খরিদ্দার খাবার খেতে আসায়। সে ঘড়ি দেখেনি মুখ বুজে তন্দুরি রুটি বানিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের বৌদি না পৌঁছে দিলে, ঐ বৌ টি যে কত রকম বিপদে পড়তো, ঐ অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে, সে বিষয়ে তাদের ধারণাই ছিল না। বাড়িতে দেরী করে ফেরার জন্য শাশুড়িকে মিথ্যে কথাও বলতে হল।

– ‘এতক্ষণ দেরী কেন বৌমা?’

– ‘ডাক্তারবাবুর কাছে আজ বড় ভিড় ছিল মা, ওষুধ দিতে খুব দেরী করলেন তাই

– আমি হাসতে হাসতে বললাম, – ‘বৌদি তুমি দেখি বেশ বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতেও পারো

– ‘আরে এগুলো সব “সফেদ ঝুট,” কারো কোনো উপকার করলে বলে বেড়াতে নেই। তাছাড়া এঁরা বয়স্ক মানুষ, ঐ ঘটনা – গুন্ডাদের থেকে একটি অসহায় গ্রাম্য মেয়েকে বাঁচানো – এ সব ওরা বুঝবেন না, শুধু শুধু টেনশন করবেন, আমাকে বকুনি দেবেন, কেন মোড়লি করতে গেছি ভেবে। তাই একটু আধটু মিথ্যে বলি, মাঝে মাঝে। তারপরে আমার মাথার পেছনে আলতো করে চাটি মেরে বললেন – “উষা তোকে ট্রেনিং দিচ্ছি ,আমি যখন বুড়ো হবো তুই  ও বলিস আমাকে।”

‘সত্যি বৌদি পারোও বটে’,- বলে অন্য কাজে মন দিতেই শুনতে পেলাম জ্যাঠামশাই এর চেঁচামেচী।

-“আমার চামচ, আমার চামচটা কোথায় নিয়ে গেল, হতভাগা দিনুটা? উষা, উষি – – –

আমি ভাবলাম তিনি তাঁর গ্যাসের এ্যাসিডিটির জন্য চামচ দিয়ে লিকুইড ডাইজিন খাবেন, ওনার বিছানার পাশের টেবিলে সব রাখা থাকে, ওটা হয়তো কেউ সরিয়েছে। তাই ছুটে গেলাম রান্নাঘর থেকে একটা চামচ ধুয়ে নিয়ে। সেটি দেখে তো উনি আরও রেগে গেলেন, “ঐটা চেয়েছি? ইয়ার্কি হচ্ছে?” বৌদি ছুটে এলেন, এক মুহূর্ত শ্বশুরের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেললেন তাঁর মনের কথা। তাড়াতাড়ি টেবিলের নিচে পড়ে থাকা তাঁর পড়বার চশমাটি তুলে হাতে দিলেন। কারণ তাঁর হাতে রাত্রে পড়বার ‘কথামৃত’ বইটি ধরা ছিল।

খুব খুশী হলেন, “তাইতো বৌমা ওটা পড়ে গিয়েছিল।” আমরা সবাই হাসতে লাগলাম।

পরের দিনও বাজার থেকে ফিরে যখন থলিটি নামালেন, দেখা গেল সব উল্টোপাল্টা করেছেন – কলার জায়গায় মূলো, তোয়ালে আনতে তুলো এনেছেন কিনে। আর বৌমা কে বলছেন, “আমার চশমা, ছাতা কোথায় গেল বৌমা?”

বৌদি ছুটে বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে তাঁর ঘরে পরার চপ্পল, গামছা ও লুঙ্গি নিয়ে। ডাক্তার স্বামীকে বললেন, – বাবার স্মৃতিভ্রংশ অসুখ কি যেন নাম – ডিমনোশিয়া শুরু হয়েছে। ওনাকে আর বাজারে, ব্যাংকে যেতে দিও না।

বড় প্রশংসাপূর্ন চোখে তাকালেন স্বামি, ও অতি কৃজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে স্বীকার করলেন, আমি তো এতো রুগী দেখি, কিন্তু তুমি এই তিনজন বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে এতো সুন্দরভাবে শিশুর মতন করে লালন পালন করছো, তাদের রোগের পূর্বাভাস দিচ্ছো – যা দেখে সত্যিই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।

পনেরো বছর পার হয়ে গেল, এই ভাবে নানা সমস্যার সমাধান করতে করতে। আমি এখন ৫২ আর বৌদি ৬০ বছরের প্রৌঢ়া মহিলা।

ঠাকুমা, জ্যেঠিমা, জ্যাঠামশাই সবাই গত হয়েছেন। তিন ভাইপো ভাইঝি সবাই দেশের বাইরে। এখন পাসপোর্ট ভিসা করে তাঁকে প্রায় ই আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই ছুটতে হয়, নাতি-নাতনিদের মুখ দেখবার জন্য ৬ মাস করে তাদের দেখাশোনা করতে। কিন্তু ঠিক ফিরে আসেন বারবার তাঁর এই শ্বশুরের ভিটায়, খুব শান্তি ও আনন্দে সময় কাটে তাঁর – পাড়া প্রতিবেশী ও ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজনের মধ্যে। তবে আমাকে না হলে চলে না বৌদির, – বলেন ভাগ্যিস তুই বিয়ে করিসনি আমার কাছে পড়ে আছিস – অন্ধের যষ্টি হয়ে। ঠাকুর আমার ঊষার মঙ্গল করুন।

এবারে বিদেশ থেকে এসেই ভর্তি হলেন স্পোকেন ইংলিশ ক্লাসে। ইংরেজী না বলতে পারলে নাতি নাতনিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা মুশকিল হবে। তারা সবাই তো ইংরেজীতেই পড়াশোনা করেছে। এতগুলো বছর বুড়ো-বুড়িদের সঙ্গে কেটেছে এবং নিজেকে পাল্টে  ফেলতে সময় নিলেন না আমার প্রিয় বুদ্ধিমতী বৌদি। ছেলে ল্যাপটপ এবং মেয়ে আই প্যাড কিনে দিয়েছে। তাই তার সদ্ব্যবহার করতে শিখে ফেললেন, ই-মেল করা, মেসেজ পাঠানো, NETFLEX বা You Tube খুলে গান শোনা ও সিনেমা দেখা। সালোয়ার কামিজ পরে যোগব্যায়ামের ক্লাসে যাওয়া ও মর্নিং ওয়াক করা শুরু হল এবার, কিন্তু লক্ষ্মীপুজো, সত্যনারায়ণ পুজো, গীতা পড়া, রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে কাজ করা সবই বজায় রইল তাঁর। পূর্ব – পশ্চিম, অতীত ও বর্তমানকে মেলাতে মেলাতে বৌদির জীবন হয়ে উঠতে লাগল আরও অর্থপূর্ণ ও গতিময় এবং সুন্দর।  

ধন্য  আমার  বৌদি।

ফাঁকি ( Fanki )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফাঁকি কথাটার মধ্যে একটা বিরাট ফাঁক থেকে যায়। একজন আর একজনের হৃদয়ে – অন্তরের অন্থঃস্থলে উঁকি মেরে যদি দেখি, সেখানে অনেক শূন্যতা-র আভাস পাই। বাইরে থেকে হয়তো খুব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নজরে আসে, কিন্তু মন দিয়ে তার অন্দরমহলে গেলে বুঝতে পারি, অনেকগুলো ঘর তালা বন্ধ। সেখানে কেউ নেই। কিছু বস্তু/সম্পদ কি রক্ষিত আছে – না? – তালা ভেঙে দেখা যায়, তাও নেই, শুধু খালি, একেবারে শূন্যতা।

আর সেই জায়গাগুলো ভরতে গেলে অনেক অনুভবী হতে হয়, – গভীর মননশীলতা ও সহানুভূতি লাগে। – এক মানুষের মনের কষ্ট, হতাশা, দুঃখ আর একজন যখন জানবার বা বোঝবার চেষ্টা করে, তখন সবচেয়ে দরকার হয় – ভালোবাসার উষ্ণ পরশের। স্নেহ, প্রেম ও দয়া এমন এক উত্তাপ আনতে পারে – যা ভয়ঙ্কর কঠিন পাষাণকেও গলিয়ে দেয়। মানব হৃদয় তো বরফের মতন, একটু আদর পেলেই গলে জল হয়ে যায়।

পৃথিবীতে স্বামী স্ত্রীকে, বন্ধু বন্ধুকে, মালিক কর্মচারীকে বা কখনও কখনও সাধুবেশী গুরু তাঁর শিষ্যকে ছলনা করেন। প্রাপ্য প্রাপকের সম্পর্কে চিড় ধরে। কারন অল্প মাত্রায় হলেও কেউ কাউকে ফাঁকি দিলে একদিন কিন্তু তার নিজের জীবনেও এক সময়ে একটা বিরাট ফাঁক এসে যায়।

অর্থ লিপ্সা, যশ বা নামের লোভ চলার গতিকে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু পাহাড়ী নদী হটাৎ যেমন পাথরের ফাঁকে ঢুকে পড়ে, দেখে আর বেরোবার রাস্তা নেই, তখন তাকে ভীষণ খাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় – জলপ্রপাতের রূপে। ঠিক তেমনি মানব জীবনও কভু বা পথ নির্ণয় করতে না পেরে হটাৎ অন্য খাতে বইতে শুরু করে। পড়ে যায় গহ্বরের ফাঁকে। মধ্যবিত্ত ঘরের আদর্শবাদী পিতা মাতার সন্তান স্ত্রীকে খুশী করবার জন্য ঘুষ নিতে আরম্ভ করে – তার মূল্যবোধে বেশ বড় রকমের ছিদ্র হয়ে যায়।

সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত ধনী পরিবারের মেয়ে প্রথম যেদিন বন্ধুদের পার্টিতে গিয়ে মদ্যপানের স্বাদে মাতে, সেদিন তার নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার নেশা লাগে মনে।

ফাঁকি – নিয়ে লিখতে বসে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই ‘বিনু’ নামে অসুস্থ মেয়েটাকে। পঁচিশ বছর বয়সেই যাকে রোগে ধরেছিল, তার স্বামী তাকে হাওয়া বদলের জন্যে পশ্চিমে যাত্রা করেছিলেন। মাঝপথে ট্রেন বদলের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষারত ঝুমরু কুলির বৌ মহিলা যাত্রী নিবাসে ঝাড়ু লাগাতে এলে বিনু তার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করতে বদ্ধ পরিকর হয়, অনুরোধ করে – স্বামীর কাছে, তাকে টাকা দিতে। তার সেই আবদার কিন্তু রক্ষা করেননি তিনি উল্টে বকুনি দেন – সেই কুলিকে ডেকে, যাত্রীদের কাছে টাকা চাইবার জন্য। ওদিকে স্ত্রী কে বলেন, যে তিনি তার কথামতো ঐ বৌটিকে সাহায্য করেছেন। বিনু সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানায়। দুই মাস পরে যখন বিনুর মৃত্যুর পর পশ্চিম থেকে স্বামী একা ফিরছিলেন, তখন ঐ স্ত্রীকে ঠকাবার কথা ভেবে অত্যন্ত ব্যথিত ও লজ্জিত বিচলিত হয়ে ঝুমুর কুলির খবর নেন তিনি। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি, শুধু ঐ বিষম ফাঁকির অপরাধবোধ তাঁকে কুরে  কুরে দংশন করতে থাকে।

এইরকমই একজন বিমলবাবু ও তাঁর পত্নী সরোজিনীর কথা আমি জানি। যিনি পেশায় ব্যাংক ম্যানেজার ও তাঁর ভালোই উপার্জন ছিল,  কিন্তু স্ত্রী যখন তাঁর গরিব ভাইয়ের মেয়েটিকে পাত্রস্থ করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ বৌদির চিন্তা লাঘব করবার ইচ্ছায় তাঁর স্বামীর কাছে  টাকা সাহায্যের আর্জি পেশ করেন, তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ হয়ে যায়। বিমলবাবু বলেন, – “আমি কেন দেব, যাদের মেয়ে তারা এতদিন জোগাড় করতে পারেনি?”

স্ত্রী সরোজিনী বলেন, “দেখো তোমার কত বড় চাকরী ব্যাংকে ….” কথাটা শেষ করতে না দিয়েই গর্জে ওঠেন তিনি – “তো ব্যাংকে অন্যেরা যে টাকা গচ্ছিত রাখে তা থেকে চুরি করবো না কি?”

– না না তা কেন গো, আমার তো মেয়ে নেই, ছেলেরাও…..” এবার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল তাঁর।”

-“মেয়ে নেই তো ছেলেদের পড়ার খরচ নেই? সব তোমার বাপের বাড়িতেই ঢালবো। যাদের টাকা নেই তারা মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে চাইছে কি সাহসে?” রেজিস্ট্রি বিয়ে দিতে বলো।”

সরোজিনীর চোখে জল এসে গেল, কিন্তু ছোট থেকেই তাঁর মা তাকে শিখিয়েছেন “বোবার শত্রু নেই” আর স্বামীর মুখের ওপর কথা বলার সাহসও নেই তাঁর।

 প্রায় কুড়ি বছর পরে যখন মাত্র চারদিনের কোভিড-এ আক্রান্ত হয়ে সরোজিনী মারা গেলেন এবং বিমলবাবু করোনা পজিটিভ হয়ে একা ঘরে দিনের পর দিন ধরে বন্দি হয়ে আছেন, তখন ঐ শালার মেয়েটিই ছিল তাঁর একমাত্র ভরসা। দুই ছেলেই বিদেশে, মায়ের পারলৌকিক কাজেও আসতে পারলেন না, তারা দুজনেই।

স্ত্রীর ঐ ভাইঝি – সারাক্ষন থেকেছেন ৭০ বছরের অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিশেমশাইয়ের কাছে। ভাইদের সঙ্গে সবসময় ভিডিও কল করে মাকে দেখিয়েছে – শেষ যাত্রার আগে। বিমলবাবু বিবেক দংশনে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলেন। ভালো হবার পর যখন তিনি ছেলের পাঠানো ভিসা – টিকিট নিয়ে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরতে যাচ্ছেন, তখন সেই মেয়েটির দুটি হাত চেপে কেঁদে ফেললেন শিশুর মতন – “তোকে আমি বড্ডো ফাঁকি দিয়েছি মা – ক্ষমা করে দিস আমাকে।”

শুক্লাদিদি ভীষণ গোছানো মহিলা, স্বামীর সব মাইনে তিনি নিজে খুব বুঝে সুঝে খরচা করেন। কখনও ছেলে মেয়ে বা স্বামীকেও হাতে টাকা দেন না। সংসারের ভালোর জন্য তিনি সবসময় নিজের কাছে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে অর্থ জমাতে থাকেন, আর শুধু টাকা পয়সা লুকিয়ে নিজের অধীনে রাখেন তা নয়, একটি শাশুড়ির আমলে তৈরী কাঠের সিন্দুকে নানা রকম বাসন, বিয়ের দান সামগ্রী সযতনে জমাতে থাকেন। বড় বড় পিতলের পিলসুজ প্রদীপ, ঘড়া, কাঁসার বাসন, রুপোর থালা, বাটি, চামচ জামাই বরণের দ্রব্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তাঁর ইচ্ছে যখন মেয়ে বড় হবে তখন সবাই অবাক হয়ে যাবে, একজন সামান্য কেরানীর পত্নীর সম্পদ প্রাচুর্য্য দেখে। সোনার গহনাও গড়াতে থাকেন একটা একটা করে, ছেলের বৌ ও মেয়ের গা সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। নিরীহ স্বামী গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় যেতে পারেন না, ছেলে স্কুলে পিকনিকে বা শিক্ষামূলক ভ্রমণে যেতে অনুমতি পায় না। মেয়ে বন্ধুর জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারে না। দামী উপহারের টাকা নেই বলে। দু জনেই তারা ভাবে সত্যি তো মা কোথা থেকে দেবেন। আমরা তো নিম্নমধ্যবিত্ত – এসব বিলাসিতা করা আমাদের সাজে না। ছোট ছোট আনন্দ উৎসব, আত্মীয় স্বজনের দুঃখে, সুখে না যেতে যেতে তারা ঘরকুনো হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে জমা হয় চাপা বিদ্রোহের ভাব। একটু রাগ দেখলেই শুক্লা বলেন, – “আমি কি নিজের জন্যে কিছু করছি, – একটা ভাল কাপড়ও পরি না, পান দোক্তা খাই না, বাপের বাড়ি যাই না, সবই তো তোদের জন্য করছি।”

পরিবারের সকলের সঙ্গে নিজেকেও ঠকাতে থাকেন তিনি। ‘ফাঁকি’ দেওয়াতেই যেন অদ্ভুত একটা আনন্দ পান, শুধু সেই দিনের অপেক্ষায় থাকেন, – যখন ছেলে মেয়ের বিয়ের সময় তাক লাগিয়ে দিতে পারবেন সবাইকে।

কিন্তু তা আর হয় না, বিষন্ন স্বামী হটাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মেয়ে পাশের বাড়ির মুসলিম প্রেমিককে বিয়ে করে দুবাইতে পালিয়ে যায়, ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে হরিদ্বারে আশ্রমবাসী হয়। আর শুক্লা বসে থাকেন তাঁর গুপ্ত সঞ্চয় নিয়ে।

একদিন শোনেন দেওয়রের মেয়ের বিয়ে। আগে যে ভদ্রমহিলা কখনও শ্বশুরবাড়ি যাবার নাম নিতেন না। একদিন তাদের জন্য হটাৎ মনটা হু হু করে ওঠে। ডেকে পাঠান ছোট জা কে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসেন তিনি। শুক্লা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, – “তোর বিয়ের দানের সব বাসন রয়েছে দেখ মা এই সিন্দুকে। তোর তত্ত্ব সাজিয়ে দেবো আমি, সব গহনাও তৈরী, নিয়ে যা মা, আমি আমার বোঝা হালকা করি।” মেয়ে এক গাল হেসে উত্তর দেয় শুক্লা জেঠিমাকে, – “না গো মেজো-মা, আমি তো পণ নিয়ে যারা বিয়ে করে, তাদের ঘরে যাচ্ছি না, ‘রেজিষ্ট্রি’ ম্যারেজ-এর পরেই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাব, আর আজকাল কাঁসা পিতলের ভারী ভারী জিনিষ কেউ ব্যবহার করে না। এগুলো বরং বিক্রি করে কোন অনাথ আশ্রমে তুমি টাকা দিয়ে দাও, নয়তো নিজে একটু কাজের লোক রেখে আরামে থাকো। নিজের জন্যে তো কিছু করলে না।” এতদিনে ফাঁকির ফাঁকে যে ফাঁদ পাতা থাকে তা বুঝতে পারলেন শুক্লা।

প্রথমে মেয়ে হলে বাবার ভাগ্য খোলে শুনেছিলেন সন্দীপ বাবু। সত্যিই তাঁর মেয়েটি ভীষণ পয়া। রং যদিও শ্যাম বর্ণ। মায়ের মতন ফর্সা নয়, কিন্তু গালে টোল পড়ে, ভীষণ মিষ্টি হাসি তার। অনেক ভেবে নাম রাখলেন ‘মোনালিসা’ ডাকেন ‘মোনা/মনু মা বলে। ছোট থেকেই খুব বুদ্ধিমতী, তাই শহরের খুব নাম করা স্কুলে পরালেন তাকে। নাচ, গান, আঁকা, পিয়ানো, সাঁতার সব রকমের ট্রেনিং নিয়ে বড় হল সে। ব্যাঙ্গালুরুতে ‘ল’ পাশ করল সম্মানের সঙ্গে তারপর উচ্চ শীক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা। এই বাইশটা বছর মোনার বাবা মা শুধু তাকে কেন্দ্র করেই জীবন কাটিয়েছেন। তার সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া মেলামেশা করার সুযোগ পায়নি সে। হটাৎ আমেরিকার নতুন পরিবেশে নতুন পৃথিবীর পরিচয় পেল মোনা। বাবা মা একবার গিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে ভাড়া নেওয়া বাড়িতে একসপ্তাহ কাটিয়ে এলেন। সেখানে আলাদা আলাদা ঘরে বিভিন্ন দেশের চারজন ছেলে মেয়ে থাকে। রান্নাঘর একটি। যার যখন সময় সে নিজের খাওয়ার জোগাড় নিজে করে নেয়।

কেউ ‘ল’ পড়ে, কেউ ইন্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্ট কলেজে, একজন শ্রীলংকার প্রসিদ্ধ সিনেমা অভিনেত্রীর মেয়ে আবার ‘লস এঞ্জেলস’-এর কোন এক স্কুলে নাটক, নাচ ইত্যাদি শেখে – সে সন্ধ্যে থেকে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত বাইরে। চীন দেশের ছেলেটি হোটেল ম্যানেজমেন্ট-এর ছাত্র। রাত্রে যখন ঐ কমন কিচেনে তাদের সামুদ্রিক জীবজন্তুর রান্না করে, তখন অন্য রকম গন্ধে ঘর ভরে যায়। মোনা সেদ্দ ভাত বা খুচুড়ি এক হাঁড়ি করে রাখে, পাঁচদিন ধরে সেটাই খায়। ভালভাবে পড়াশোনা করতে হলে খাদ্যরসিক হলে তো চলবে না।

বাবা মা অবাক হয়ে যান এবং অখুশী মন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। মেয়ে পাশ করতেই ভাল ‘ল’ ফার্মে কাজ পায়। মা পাত্র দেখা শুরু করেন। তাঁর বোনের ভাগ্নেও আমেরিকায় থাকে, পি.এইচ.ডি শেষ করে কলেজে পড়াতে ঢুকেছে। স্বজাতি – পালিটঘর আনন্দে আত্মহারা হয়ে খবরটা জানান মোনালিসাকে। বাবা বলেন, – “তাড়াহুড়ো নেই, নিজেরা ওখানে দেখে নে, আলাপ করে নিশ্চয় ভাল লাগবে, তারপরে দুজজের একসঙ্গে ছুটি দেখে দেশে আয়, বিয়ের দিন ঠিক করব।”

প্রথমে মেয়ে উত্তর দেয় না। খুব পীড়াপীড়ি করলে বলে, – “এখন ব্যস্ত আছি রবিবারে কথা বলবো।”

রবিবার দুপুরে দিবানিদ্রা দিচ্ছেন মা, বাবা ম্যাগাজিন পড়ছেন, এমন সময় তার ফোন আসে, ঘড়ি দেখে তাড়াতাড়ি মোবাইলের ভিডিও কলটি খোলেন তিনি। মোনা বলে বাবা এখন ভিডিও করছিনা, খুব দরকার একবার মাকে দাও। বাবা ঘাবড়ে যান। এমন তো কখনও হয় না, প্রথমে তাঁর সঙ্গেই পড়া, কাজ, টাকা ইত্যাদি নিয়ে বেশ অনেক্ষন কথা বলার পর তো সে তার মায়ের সঙ্গে রোজ একই প্রশ্নের জবাব দেয়। – ‘কি রান্না করলি, আজ কি খেলি? ওই ছেলেটির ই মেল পেলি কিনা? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলি? কবে দেশে ফিরতে ছুটি পাবি?- – – ইত্যাদি ইত্যাদি, আজ প্রথমে মায়ের ডাক, নিজেকে একটু উপেক্ষিত মনে হল, সন্দীপবাবুর।

স্ত্রীকে হাঁক দিলেন, “ওঠো গো – মেয়ের ফোন” – এই সময়ে? সে কি এখন তো ওদের ওখানে অনেক রাত? – হ্যাঁ মামনি, বলরে, কেমন আছিস? এতো রাতে জেগে আছিস কেন?”

-“মা, মা শোনো, তোমাকে একটা জরুরী কথা বলছি, একটু ধৈর্য্য ধরে শোনো।”

-“হ্যাঁ বল মা।”

-“আমি আমি বলছি, আমি প্রেগনেন্ট।” খুব কেটে কেটে শান্ত গলায় বললো মোনা।

-“কী, কি বলছিস তুই, কাকে, কাকে বিয়ে করেছিস? এই সব কি হয়ে গেল?” চমকে উঠলেন সন্দীপ বাবু স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে।

– না মা বিয়ে এখনও হয়নি, আমরা লিভিং টুগেদার করি।

-কে, কে সে? – ম্যাক্স(Max) – আমেরিকান ছেলের সঙ্গে থাকতিস তুই? সন্দীপ বাবু ওর মায়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন। “ঠিক আছে আমরা আসছি তোর কাছে, ওর সাথে কথা বলতে, অথবা ইন্ডিয়াতে আয় দুজনে, বিয়ের অনুষ্ঠান তো একটা করতে হবে।” হটাৎ মনে হল, ওদিকে মেয়ের আর একটা ফোন আসছে, মা, বাবার লাইনটা কেটে গেল।

মোনালিসার মা কাঁদতে আরম্ভ করলেন – এ কী শুনলেন তিনি। সন্দীপ বাবুর কেমন যেন পুরো শরীরটা কাঁপছে। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে না ভয়ে ঠিক বুঝতে পারছেন না তিনি। মেয়েটা এমন করে ওদের সব আশা আনন্দে জল ঢেলে দিতে পারলো ! মা শুধু বলতে লাগলেন ‘এখন কি হবে, মেয়ে এমন একটা ঘটনা ঘটালো লজ্জায় সমাজে মুখ দেখাবো কি করে?’

এবার নিজেই ফোনটা মেলালেন তিনি, মেয়ে তুলছে না। মেসেজ করলেন কাঁপা কাঁপা হাতে, – “যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি ঐ গোরা বন্ধুকে নিয়ে দেশে চলে আয়।”

-“বাবা আমার পেটটি এখন খুব বড় হয়ে গেছে, আর ম্যাক্সও এখন যেতে রাজি নয়। তুমি বরং মাকে নিয়ে বাচ্চা হওয়ার সময় এসে যাও, তিন মাস পরে।”

এতো স্বাভাবিকভাবে এমন একটা গভীর সমস্যার কথা কিভাবে বলতে পারছে মোনা কে জানে – মা বললেন, “আইবুড়ো মেয়ের বাচ্চা হবে তাতে লজ্জা করছে না ওর মা কে আসতে বলতে?”

এবার বাবা বোঝালেন, “সবাইকে বলবে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে ওখানে, কে দেখতে যাবে ওখানে? তারপর পরিবেশের গম্ভীরতা কমাবার জন্য বললেন, ভালোই তো হবে – ঝুম্পালাহিনীর মতন আমেরিকান সাহেব জামাই দেখে মন ভুলে যাবে তোমার। দেখ তখন তুমিই আর ছাড়বে না ওদের।”

এবার মোক্ষম মেসেজটা এলো মেয়ের কাছ থেকে, “বাবা ম্যাক্স তো গোরা সাহেব নয়, “আফ্রিকান আমেরিকান।”

মা কি সাংঘাতিক জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “শেষে তোমার মেয়ে একটা কালো ভূত নিগ্রো বিয়ে করলো? ছি ছি ছি।” বাবার মুখে কথা বন্ধ হয়ে গেল। পরদিন মেয়ের ফোন এলো –

“মা, বাবা তোমরা আসছো তো?” দশ বছরের ভিসা তো আছেই তোমাদের। আমি টিকিট পাঠাচ্ছি।

ফোনটা বাবার হাতে ধরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন তিনি। সন্দীপ কি উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না, “তোর মায়ের শরীরটা খারাপ, এখন কি পারবে যেতে !” দেখি . . . . । যেন কোনো অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।

-“সেকি তোমরা আসবে না? ম্যাক্স ও তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথম থেকেই সে বাচ্চা নষ্ট করতে বলেছে, কিন্তু আমি রাজী হইনি। এখন আমাকে avoid করছে। ঐ সময় জ্যামাইকা চলে যাচ্ছে – please বাবা – মা কে নিয়ে এসো।” কান্নায় ভেঙে পড়ল মোনালিসা।

-“তুই একটা কালো ছেলের সঙ্গে শেষে . . .” গলা বুজে এলো বাবার – অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ কিসের আবেগে আর কিছুই বলতে পারলেন না তিনি।

“ওঃ তাহলে এটাই তোমাদের প্রবলেম। কালো বিয়ে না করে সাদা চামড়ার জামাই হলে তোমরা সব মেনে নিতে? কিন্তু বাবা আমার রঙ ও কালো। ও রা না হয় আমার চেয়ে একটু বেশী। তাহলে আমার জীবনের প্রথম সন্তান আসছে আর তোমরা আমার কাছে আসবে না?”

মা ও ঘর থেকে চিৎকার করছেন – “এইরকম মেয়ে পেটে ধরেছিলাম – রে আমি? মর মর মরগে – যা – জাহান্নমে যা, আমি ওর মা নই। ঠাকুর ! আঁতুর ঘরেই কেন মরে গেল না এমন সর্বনাশী মেয়ে !” ফোনটা কেটে দিল মোনা। তারপর তিনমাস অনেক চেষ্টা করেও আর কথা বলতে পারেননি সন্দীপবাবু। স্ত্রীকেও যেতে রাজী করাতে পারেননি। কী করতে পারেন তিনি, এরা দুজনেই যা জেদী।

খবরটা দিল ভারতীয় দূতাবাস থেকে। – আপনার মেয়ে মোনালিসা আত্মহত্যা করেছে। তার একটি ছেলে জন্ম নিয়েছিল, সেটি এক দত্তক কেন্দ্রকে দান করে দিয়েছে সে।”

– মেয়েটি বাবা মা কে ধোঁকা দিল না বাবা মা ফাঁকি দিলেন, এর বিচার পাঠক করবেন।

‘পড়াকু’র – হাতে খড়ি ( Porakur haate khori )

চন্দনা সেনগুপ্ত

তাঁতী বৌ যখন বিধবা হল, তখন তার বয়স মাত্র বাইশ, ছেলেটি দুই বছরের। উকিল বাবুর বাড়িতে কাজ নিল সে, সঙ্গে ছেলেকে আনতে হয়, দেখাশোনা করবার কেউ নেই তার। সারাদিন থাকে সেখানে, বাবুদের বাগানে খেলা করে বাচ্চা আপনমনে। ন্যাংটো থাকে সবসময়ে। গিন্নি মা বলেন, ‘ও তাঁতী বৌ একটা প্যান্ট পরাতে পারিস নে’?

– ‘অখন ত্যাখন মুতে দেয় যে, কতক্ষন থাকবেক উয়ার পরানে’।

বামুন দিদি বলেন, – ‘চান করিয়ে দে লো মাগী ! ছেলাটাকে, দ্যাখ কত ধুলা মাখছে’।

তাঁতী বৌ একগাল হাসে – ‘একটুকুন মাটি মাখা ভালো দিদি, উয়াতে কুছু হবেক লাই।’

অবেলায় পুকুরে একটা ডুব দিতে গিয়ে ছেলেটাকেও চান টান করিয়ে গোল বারান্দায় বসিয়ে দেয়, তাঁতী বৌ। এক বাটি মুড়ি বাতাসা দিয়ে। খেতে খেতে সে শুনতে থাকে বাবুদের ছেলেমেয়ের পড়া, কিম্বা নামতা মুখস্ত করা।

ভারী ভাল লাগে তাঁতী বৌ-এর। বারবার মা ভাদু/তুসু বা ধর্ম ঠাকুরের কথা স্মরণ করে, সে মনে মনে বলে, – “হুই মা, যত দেব-দেবীরা তুমাদের খ্যানে কুছু চাই নাই, আমার ব্যাটাকে একটুন ‘পড়াকু’ কইরে দাও”, –

অলখ্যে শোনেন, তাঁর কথা ঐসব বাঁকুড়াবাসীর – ‘ঘরোয়া দেবতারা’।

ওর ছেলেটা সত্যি সুর করে করে মুখস্ত করে ওই  , ক এ যফলা – ঐক্য; –

বাবুর ছেলেদের বলেন, গৃহ শিক্ষক অজয় মাষ্টার – ‘দেখ দেখ কেমন মন ঐ ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটার।’

ওর হাতে খড়িটা দিয়ে দিলেই তাকে চক খড়ি আর শ্লেট কিনে দেবেন তিনি।

– তাঁতী বৌ গিন্নীমায়ের বাড়িতে সরস্বতী পুজোর দিনে পুরুতমশাইকে ওর ছেলের হাতে খড়ি দেবার জন্য অনুরোধ জানায়। খুব খুশী হন তিনি। বাড়ির নগেন দারোয়ান একবার ঠাট্টা করে ,

“হ্যাঁরে তাঁতী বৌ তোর ছিলাটাকে জজ, ম্যাজিস্টর বানাতে হবেক নাকি’?

তাঁতী বৌ সেই সহজ সরল হাসিটা হেসে উত্তর দেয় –

“না গো নগেন দাদা অতোটা লয়। পাঠশালার ম্যাস্টার হলেই চলবেক। আমার মতন মুখ্যু সুখ্যু মায়ের ছিল্যাকে লয়তো সবাই ঠগাই লিবেক”।

স্কুলে ভর্তি হল ছেলেটা যার নাম তাঁতী বৌ রেখেছিল ‘পবনকুমার’। কিন্তু ক’দিন পরেই সে পাড়া-প্রতিবেশী এবং বাবুঘরের সকলের কাছে পরিচিত হল একটি নতুন নামে ‘পড়াকু’।

সত্যিই অসাধারণ তার জ্ঞান পিপাসা, যেখানে যা পায় বানান করে করে পড়ে সে। খবরের কাগজটা বাবুমশাইকে দেবার আগেই বাগানে বসে পাঁচ মিনিট ধরে হেড লাইনগুলো বানান করে পড়ে ফেলে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতেই ঐ বাড়ির বাচ্চাদের জন্য আগত শুকতারা পত্রিকা এলে কেউ দেখার আগেই সে পড়ে নেয়।

দশ বছর বয়সেই বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয় পবন কুমার গোটা বাঁকুড়া জেলার মধ্যে। আনন্দে তাঁতী বৌ কাঁদতে থাকে। কিন্তু সেবার বাবুদের বাড়ির বড় ছেলে দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। তাঁতী বৌকে সবাই কেমন যেন অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। আট বছর ধরে মন প্রাণ ঢেলে কাজ করলেও কোন দোষে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, বুঝতে পারে না মা ও ছেলে, হঠাৎ সেই গৃহশিক্ষক অজয় মাষ্টারমশাই পিছন থেকে ডাক দেন তাদের। “ও তাঁতী বৌ, চল মা আমার ঘরে, এদের মতন বেশী পয়সা তো দিতে পারবো না, তবে ওকে পড়িয়েই আমার বড় আনন্দ হবে। ঐ গাধাগুলোকে এতদিন ধরে পিটিয়ে ঘোড়া করবার বৃথা চেষ্টা করলাম, আর নয়। এখন ঐ পক্ষীরাজ ঘোড়াটাকে আমার আকাশে ওড়াতেই হবে, – পার করিয়ে দিতে হবে সাত সাগর আর তেরো নদী, কিম্বা হিমালয়ের ওধারে। পারবি না রে তুই পড়াকু? আমার স্বপ্ন পূরণ করতে।’’

তাঁতী বৌ রাস্তাতেই গড় হয়ে একটা দণ্ডবৎ করলো তাকে, আর ছেলেটা হটাৎ লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালো, তার পেছনে। তার ঐ মিষ্টি হাসিতে বলে দিল, যে সে নিশ্চই পারবে, তার ঐ ‘পড়াকু’ নামটি স্বার্থক করতে।

বানপ্রস্থ (Banprostho)

চন্দনা সেনগুপ্ত

বিহারের এক অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ী অঞ্চলে এই অ্যালুমিনিয়ামের ফ্যাক্টরীটি স্থাপিত হয়েছিল, প্রায় ৭০বছর আগে। স্বাধীনতার ঠিক পরে পরে সারা দেশের উৎসাহী যুব সম্প্রদায় বিশেষতঃ গুজরাটি – মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবী কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু মিলে তৈরী করেছিলেন, এই অ্যালুমিনিয়ামের কারখানা। হাঁড়ি কুড়ি, কড়াই, মগ বা নিত্য ব্যবহার্য্য আরো নানান ধরণের দ্রব্য তৈরী হয় এখানে। দেশকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করার এই অদম্য বাসনা তাঁদের পূর্ণও হয়েছিল। ছোট ছোট পাহাড়ের কোলে রাঁচি জামশেদপুর থেকেও কিছুটা দূরে নানানরকম মেশিন বসানো হল, চারিদিকে ঘর-বাড়ি কোয়াটার তৈরী হবার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট, কুয়ো, পুকুর, মন্দির মসজিদ, গুরুদ্বারা, বাজার দোকান, হাসপাতাল, একটি নগর পত্তনের জন্য যা যা দরকার সবই নির্মাণ করা হতে লাগল। তখন মালিক গোয়েঙ্কা সাহেবের প্রিয় সহচর টেকনিশিয়ান ওরফে পিয়ন, ওরফে কেরানী ছিলেন মদনলাল গুপ্তা, যৌবনের সমস্ত উদ্যম ও পরিশ্রম দিয়ে বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ফ্যাক্টরীকে বড় করতে তাঁর অবদান কিছু কম ছিল না। সবাই ভালোবাসতেন, তার কাজের দক্ষতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখে। ওপরের সব ম্যানেজার ও অফিসার যেমন তাঁর সততা ও কর্ম ক্ষমতায় মুগ্ধ ছিলেন, নিচের শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীরা তাঁকে ততটাই সমীহ করতেন এবং ভয়ও পেতেন। কারন তাঁর মতন গম্ভীর স্বল্পবাক কঠোর মনোভাবের লোক ঐ ফ্যাক্টরীতে আর দ্বিতীয় ছিল না। তাঁর নাম দিয়েছে সবাই নারকেলবাবু। বাইরেরটা  ভীষণ শক্ত আর ভেতরটা নরম কোমল। নিজের কোন কাজে যেমন ত্রুটি হতে দিতেন  না সহজে, সামান্যতম ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আবার সেটাকে ঠিক নিখুঁত ভাবে সম্পূর্ণ করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে লেগে পড়তেন। অন্যদেরও তেমনি ধৈর্য ধরে কাজ শেখাতেন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন সবাইকে। কাজই তাঁর ধর্ম, কর্ম, জ্ঞান ছিল। নিত্য নতুন টেকনোলজি শিখতে, পড়তে, জানতে তাঁর আগ্রহ দেখে মালিক তাঁকে বেশ কয়েকবার বিদেশেও পাঠান। মাত্র স্কুল পাশ করে তিনি তাঁর সঙ্গে এখানে এসেছিলেন, আর পরে মালিক তাঁকে B.Sc., M.Sc. পাশ করান, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে স্পেশাল ট্রেনিং নিতে জার্মানী, ফ্রান্সে ও ঘুরে এসেছেন তিনি। পঞ্চাশ বছরে তাঁকে দেখা যায় এম.বি.এ, ও লেবার ‘ল’ পড়তে। জীবনে উন্নতি করার অদম্য ইচ্ছাটা তার নিজের জন্য নয়, সমস্ত ধ্যান জ্ঞান উৎসাহ ও প্রচেষ্টায় তিনি এই ফ্যাক্টরীরও সমৃদ্ধি ও সুনাম বাড়িয়ে তুলতে চেয়েছেন। পঞ্চান্ন বছরেই তাঁকে তাই জেনারেল ম্যানেজারের পদটি দেওয়া হল।

 

দ্বিতীয় পর্ব

মালিক দেহ রেখেছেন। এখন তাঁর ছেলেই কোম্পানীর মালিক। মদনলালবাবুকে সেও খুব মানে বা তার ওপরেই সব দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, পঁয়ত্রিশ বছরের টেকনিক্যাল ও ম্যানেজেরিয়াল দক্ষতা, শ্রমিক পরিচালনার সুকৌশল ও ফ্যাক্টরীর নিরাপত্তার জন্য তাঁর খ্যাতি দুর্দান্ত, বিশেষজ্ঞের সর্ব্বোচ্চ তালিকায় তারা তাকে রেখেছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেকটি দুর্নামও তিনি পেয়েছেন, বড় ‘পারফেকশনিস্ট।’ তাঁর একগুঁয়েমি জেদী স্বভাব তাঁকে যেমন ক্যারিয়ারের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে – এই এক রোখা, আপাতদৃষ্টিতে রাগী ও খুঁতখুঁতে, কাজের মান উঁচু রাখার জন্য শ্রমিক কর্মচারীদের বকা ঝকা করা, আদর্শবাদ ও মূল্যবোধের সঙ্গে কিছুতেই সমঝোতা না করতে পারা, – ইদানিং কালের অধঃস্তন কর্মচারীদের, জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার বা অফিসারদের ভালো লাগে না। বাইরে কঠিন ব্যবহার, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য নামটি তারা ঠিকই দিয়েছে ‘কোকোনাট স্যার’। ইউনিয়ানের নেতারাও এখন নানা রকম সমালোচনা করে। মালিকপক্ষের যা কিছু ত্রুটি তাদের চোখে পড়ে – সবকিছুর জন্যই তারা মদনলাল গুপ্তকেই দায়ী করেন, কারণ তিনি জেনারেল ম্যানেজার, আবার কর্মচারী অর্থাৎ নীচু স্টাফ, শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে, তাদের বোনাসের টাকা, কোয়াটার মেরামত, যানবাহন বা নিত্য নৈমিত্যিক বস্তু ঠিক সময় হাজির করার দাবী নিয়ে যখন তিনি মালিকদের দরবারে আর্জি করেন, তখন সেখানেও অপ্রিয় হয়ে যান। এই পঁয়ত্রিশ বছরে বহু পরিবর্তন এসেছে ফ্যাক্টরীর পরিবেশে।

আগে এখানে সমস্ত প্রদেশ থেকে লোক নেওয়া হত, এখন প্রাদেশিকতা জাতপাতের বিভেদ মাথা তুলেছে। স্থানীয় নেতাদের প্রাধান্যও বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে এই ফ্যাক্টরীগুলিতে। তার ওপরে ব্যবসায়িক সমস্যা। প্লাস্টিকের চল বাড়ছে। বাজারে অ্যালুমিনিয়াম স্টিলের পরিবর্তে সব জিনিষই পলিয়েস্টর – মোটা ধরনের প্লাস্টিকে তৈরী করে কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

অনুন্নত দেশগুলি ‘চীন’ দেশের দ্রব্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায়, রপ্তানীও কমে গেছে। লোক ছাঁটাই করার ইচ্ছে না থাকলেও ধীরে ধীরে কর্মীসংখ্যা কমানোর নির্দেশ এসে গেছে। – তিনি কাউকেই ছাড়তে পক্ষপাতী নন।

মাদনলালবাবু আজকাল প্রায় মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। আগে কর্মচারীরা যদি কাজে গাফিলতি করতো বা তাদের চারিত্রিক দোষ পাওয়া যেত, তাহলে সহজেই তাকে ডেকে বকুনি দিতে – বোঝাতে তথা শুধরাতে চেষ্টা করতেন তিনি এবং তার কথা মন দিয়ে শুনতো সে, কিন্তু এখন যুগটা কেমন পাল্টে গেল, কাউকে ভালোভাবে বসিয়ে কাজ শেখাতে গেলে সে বলে, ‘হ্যাঁ আমি জানি’ অর্থাৎ আপনার আর জ্ঞান দেওয়ার দরকার নেই। মালিকের ছেলেরা নতুন মনোভাব নিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চাই। মিনিস্টার, এম.এল.এ, এম.পিদের সন্তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত। মালিকের জামাই হংকং থেকে পড়াশোনা করে এসেছে, সে এখানে ফ্যাক্টরীর খরচ কমিয়ে চীন দেশ থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল আমদানী করে এখানে বড় বড় হোটেলে সাপ্লাই করতে চায়।

মদনবাবুর ইচ্ছে তরুণ কিছু ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠিয়ে ঐ কাজটির প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে। তারপরে আরও কিছু অন্য ধরনের মেশিন কিনে ওনাদের ফ্যাক্টরীতেই সেগুলি তৈরী করতে। কিন্তু তাঁর কথা মানতে কেউই রাজী নয়। কাউকে মোটা টাকার ঘুষ খাইয়ে একটি কোম্পানীর অ্যালুমিনিয়াম পাত লাগানোর টেন্ডারটি হাসিল করার কথাও একদিন তিনি জানতে পারলেন। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বড়বাবুর দয়ায় সে আজ এই পদে বসেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ক্ষমতা কমিয়ে আনা হচ্ছে। অসৎ লোকেদের পাশে বসতে হচ্ছে। স্ত্রী সবিতা মাঝে মাঝেই বলেন, এবারে কাজ ছেড়ে দাও, চলো আমরা দূরে কোথাও নিরিবিলি জায়গাতে গিয়ে বসবাস করি। ছেলে মেয়ে নেই তাঁদের। ঝাড়া ঝাপ্টা মানুষ, স্ত্রী বাগান করা নিয়ে এবং তিনি ফ্যাক্টরী নিয়েই ব্যস্ত, সারাটা জীবন কাজে কাজেই কেটে গেল।

কর্মচারীদের বাসগৃহগুলি মেরামত করা দরকার। নালিগুলি অনেকদিন পরিষ্কার হয়নি, ফ্যাক্টরীর আসে পাশের জঙ্গল, ঝোপ ঝাড় ঠিক সময় মালীরা কাটছে না। সেখানে নাকি সাপের উপদ্রপ বেড়েছে, কেউ যেতে চাইছে না। তাদের ওপর চেঁচামেচি করতে কাজ বন্ধ করে দিল তারা, সেই নিয়ে তরুণ মালিকের ইংরেজি ভাষণ ও সমালোচনা শুনতে হল মদনবাবুকে। ইউনিয়নকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করলেন তিনি। কয়েকজন বয়স্ক কর্মী নিয়ে সেখানে গেলেন মদন লাল, নিজে হাতে ‘কার্বলিক অ্যাসিড’ ঝোপে ছিটিয়ে সাপ তাড়ালেন। বাইরে থেকে ভাড়া করা গরীব মজদুর দিয়ে সব জায়গা ঝকঝকে তকতকে করলেন। ফ্যাক্টরীর রূপ সুন্দর হলে শুধু তাঁরই যেন লাভ। তবু কেন বারে বারে তাঁর মনে হয়, এই ‘কর্ম ভুমি’ তার কাছে এক দেবালয়, প্রান দিয়ে তাকে ভালোবাসার নামই পুজা বা সাধনা l

এদিকে ক্যান্টিনের খাওয়া দাওয়া নাকি ক্রমশঃ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একদিন একদল যুবক থালা বাটি ছুঁড়ে না সেদ্দ হওয়া মাংস ডাস্টবিনে ফেলে ভীষণ হৈ চৈ বাঁধিয়ে দিল। ক্যান্টিন ম্যানেজারকে ডেকে পাঠালেন, জেনেরল ম্যানেজার মদনলাল, – তিনি আঙ্গুল দেখালেন রাঁধুনিদের দিকে। প্রধান রাঁধুনী বেশ জোর গলায় জানালেন যে, – এটা তাদের দোষ নয় – যে এনেছে, সেই বাজার সরকারকে ধরুন, – তিনি জানালেন এবারে মাংস বিক্রেতার দোষ। মাংসের দোকানে লোক ছুটল, জানা গেল, দর কম দেওয়াতে বাসি মাংস দিয়েছে। কেন? টাকা ঠিকমত দেওয়া হয় নি? সে দিল ক্যাশিয়ার বাবুর নাম। মদনলাল তাকে যখন তলব করলেন তিনি শুধু মালিকের রুমের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিল যে সে কিছু জানে না, ওখানে জিজ্ঞেস করুন। এদিকে ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিল, ধর্মঘট হল, – উৎপাদন নেই, যেখানে অ্যালুমিনিয়ামের দ্রব্যাদি যাওয়ার ছিল, সেখানে সময়মতো সেগুলিকে সরবরাহ করা গেল না। জেনারল ম্যানেজার মদনলালের ওপর সমস্ত দায়িত্ব ছিল, অতএব বলির পাঁঠার মতন তাকেই – এই সমস্ত সমস্যা, বিভ্রাট অব্যবস্থা তথা বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হল।

মালিকপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন কেউই ছেড়ে কথা বলার লোক নন। ওপর থেকে অপমানসূচক চিঠি ও নীচে থেকে অকথ্য গালাগাল খেয়ে ঘেরাও হয়ে অসম্ভব টেনশন এর মধ্যে কাটালেন তিনটে দিন। ভাবলেন এবার চাকরীটা সত্যিই ছেড়ে দেবেন তিনি। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না।

 

তৃতীয় পর্ব

দু বছর পরে, তাঁর কাছে ওয়েল ফেয়ার অফিসার একজন ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। কর্মচারীদের ফ্যাক্টরীতে আনবার জন্য বাস চালায় সে। প্রায় মদ খায় ভীষণ বদ মেজাজী, কাউকে মানে না। জি.এম. সাহেব যেন চার্জশীট দেন তাকে। ডেকে পাঠালেন লোকটিকে। সত্যিই তার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। পান চেবাতে চেবাতে এল সে মুখ থেকে মদের গন্ধ ঢাকতে। দোষ করেও মাথা নীচু করে না। কদর্য ভাষায় সহকর্মীদের সাথেও কথা বলে। মদনলালবাবু তাকে সাবধান করে দিলেন, দ্বিতীয়বার এরকম করলে তাকে বরখাস্ত করা হবে, – সে কথাও বেশ জোরের সঙ্গে শুনিয়ে দিলেন।

অনেক দিন ধরে নানান ঝামেলায় তিনি একটু ক্লান্ত ও বিব্রত হয়ে পড়েছেন, ভালো লাগছে না আর কথা কাটাকাটি করতে নীচের অফিসারকে বললেন, এরপরেও যদি না শোনে তোমরা কোন অ্যাকশন নিও। এসব লোকেদের আমার কাছে আর পাঠিয়ো না।

পরের সপ্তাহে ঐ গুন্ডা প্রকৃতির লোকটি ঠিক সময়ে বাস নিয়ে কর্মীদের না আনায় এবং মদ খেয়ে গাড়ি চালানোর জন্য ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার তাকে সাসপেন্ড করল। লোকটিকে তার বন্ধুরা জানালো, “জি.এম. তোর নোকরী খেয়ে নিল।” কাল থেকে আর আসতে হবে না তোকে। আজ বাসটা গ্যারেজে পার্ক করে চলে যেতে বলেছেন বড়বাবু।’

মদনলাল তার সুন্দর অফিসরুমে খুব কম সময়েই বসেন, সারাদিন ফ্যাক্টরীর এ ডিপার্টমেন্ট থেকে ও ডিপার্টমেন্ট ঘুরে বেড়ান। আজও স্টোর পরিদর্শন করে আর একজন জুনিয়র ম্যানেজার এর সঙ্গে গেটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, হটাৎ উল্টো দিক থেকে ফ্যাক্টরীর খালি বাসটি তীব্র বেগে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে লাফিয়ে পাশে সরতে গিয়ে পড়ে গেলেন, সবাই ছুটে এল, খুব প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি, কিন্তু অন্যরা মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটল বাস ড্রাইভারকে ধরতে। সে এদিক ওদিক আঁকা বাঁকা চালিয়ে সোজা গিয়ে ধাক্কা মারল সামনের বাউন্ডারী দেওয়ালে। সবাই ভাবলো বাসের ব্রেক ফেল করেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। লোকটিকে বাস থেকে বের করে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মদনলালবাবু কিন্তু এক নজরে দেখেছিলেন ওই চালককে, কিন্তু কাউকে কিছু জানতে দিলেন না l

ছয়মাস পার হয়ে গেল, এবার বেশ কিছু টেকনিশিয়ান নেওয়া হবে ফ্যাক্টরীতে। প্রথম পরীক্ষায় যারা পাশ করেছে, তাদের ইন্টারভিউ হয়ে যাওয়ার পর কাকে কাকে নেওয়া হবে তার লিস্ট তৈরী হচ্ছে। মালিক তাঁর স্থানীয় নেতাদের প্রভাবে ও অনুরোধে ঠিক করে নিয়েছেন ,কার কার নাম প্যানেলে রাখা হবে। মদনবাবুকে শেষে পাঠানো হল, সাইন করবার জন্য। তিনি প্রতিবারের মতন এবারেও জানতে চাইলেন যে স্টাফদের কোনো ছেলে আছে কিনা। জুনিয়র অফিসার জানালেন যে একটি ছেলে খুব ভাল পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু তার নামটি ওঠেনি। ওর চাকরী হওয়া খুবই দরকার। কারণ ওদের বাড়ির অবস্থা খুবই শোচনীয়। সেই স্টাফের স্ত্রী অফিস এসে রোজ পা হাত ধরছে কিন্তু আমরা কি করব বলুন স্যার? বোর্ড মেম্বারের কিছু করার নেই। বললেন ঐ জুনিয়র।

‘‘স্টাফটি মারা গেছে? তাহলে তো ‘কমপেনশেশন গ্রাউন্ডে’ নিতে পারা যায়’’ – মদনলাল বাবু বললেন। ‘না না স্যার তার দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে।’ এক্সিডেন্টে পা দুটি এমনভাবে থেতলে যায়, যে ডাক্তারবাবু এমপুট করতে বাধ্য হয়েছেন। সে কিছু করতে পারে না। তার বড় ছেলেটি মানসিক ও শারীরিকভাবে অক্ষম। পাগল শুধু নয়, নিজে নিজে খেতে পরতেও পারে না। মেয়েকে অনেক পণ দিয়ে বিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু শশুরবাড়ির লোকেরা তাকে পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল, তার মুখ হাত সব পোড়া, সেও বাবার কাছে ফিরে এসেছে। এই ছেলেটিই মায়ের ভরসা। পড়াশোনা ও ব্যবহারে খুব ভাল, বুদ্ধিমান। কিন্তু আমরা কি করবো বলুন, এর নাম সবচেয়ে পেছনে। দুবছরেও চাকরী পাবে কিনা সন্দেহ। ততদিনে প্যানেল ক্যান্সেল হয়ে যাবে।

জি.এম. মদনলাল আবার সেই লিস্ট তৈরী করালেন, নিজে ঐ বোর্ডের সব মেম্বারদের নিয়ে। সেই লিস্টে সবচেয়ে আগে তিনি ঐ ছেলেটির নাম রাখলেন। স্টাফেরা এখানে রক্ত জল করে কাজ করছে, আর তাদের ছেলেদের চাকরী হবে না। হবে, ঐ বড়লোকের ছেলেদের! – দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের ভাই, ভাগ্নে বাড়ির লোকেরা পাবে চাকরী?

একসপ্তাহ পরে একদিন তাঁর পি.এ. বললেন, স্যার, একজন ভদ্রমহিলা আর ঐ দু পা কাটা স্টাফ এসেছে, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। দুই বগলে স্ক্র্যাচ নিয়ে ধীরে ধীরে লোকটি ঢুকল ঘরে। পেছনে ঘোমটা মাথায় একজন মহিলা। ঢুকেই সে স্ক্র্যাচ ফেলে দিয়ে হুমড়ি খেয়ে মদনবাবুর পায়ের উপর পড়ল। আরে ওঠো ওঠো, পি.এ. এবং তিনি নিজে ঝুঁকে তুলে ধরে চেয়ারে বসালেন। লোকটির দুচোখে জলের ধারা বইছে, – “স্যার আপনাকে আমি বাসে চাপা দিয়ে মারতে চেয়েছিলাম, আর আপনি আমার ছেলেকে চাকরী দিয়ে আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে দিলেন, ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।”

পরদিন সকালেই তাঁকে জানানো হল যে মালিকের কথামত কাজ না করায় বরখাস্ত করা হয়েছে জি.এম. মদনলাল গুপ্তকে। কিন্তু সমস্ত শ্রমিক কর্মচারী, বয়স্ক, তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অফিসার বা পিয়ন এমন কি ক্যান্টিনের রাঁধুনী, চাকর, দারোয়ান সবাই এসে ধর্ণা দিল মালিকের ঘরের সামনে। “জি.এম. সাহেবকে ফিরিয়ে দাও নইলে ফ্যাক্টরীতে তালা দাও। আমাদের দাবী মানতে হবে – নইলে গদী ছাড়তে হবে।”  ইউনিয়নের কথা শুনতেই হল তাদের। বরখাস্তের নোটিশ লেটার ছিঁড়ে ফেলা হল।

মদনলাল বাবু সাধারণ মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে ধীর পদক্ষেপে ফিরে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে। অদ্ভুত একটা আনন্দে মনটা শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেল। মেন গেটে প্রবেশ করতেই দেখলেন, তার বাগানের পাশের লনে বাক্স, বিছানা, ও নানা ব্যাগ, সুটকেস সব সারি দিয়ে রাখা আছে। তাঁর স্ত্রী এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে বললেন, জীবনে এক একটা সময় আসে যখন সব আকর্ষণ  কাটিয়ে আমদের এগিয়ে যেতে হয়, অনেক কাজের মোহ মানুষকে  workaholic করে তোলে, এবার সেটা ছাড়তে হবে তোমায়, আমিও অকারণে এই ঘর, দোর নিয়ে ভুতের বেগার খেটে মরছি, আর নয়, আমরা এখন গঙ্গার ধারে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি, সেখানে এখন থেকে আমাদের ‘বানপ্রস্থের’ শুরু।

রাধা (Radha)

চন্দনা সেনগুপ্ত

চব্বিশ পরগনার বাসন্তী গ্রামে গরীব চাষীর ঘরে জন্ম রাধার। অনেকগুলি ভাই বোন তারা। বড় দিদির বিয়ে হয়েছে, ‘জামাইদাদা’ নদীর ধারে একটা মুড়ি চপের দোকান চালায়, দিদিও তার সাহায্য করে। ছোট ছোট দুই ভাই, মা প্রায় অসুস্থ থাকেন, কেউ জানে না পেটে কি হয়েছে। বাবাও সারাদিন মজুরী করেন, অন্যের জমিতে পরিশ্রম করে ধান বোনেন, সব্জি লাগান। দিদির বাচ্চা হবে বলে রাধা এসেছে, জামাইবাবুর দোকানে আলু সেদ্দ মেখে, চপ ভাজার জোগাড় করতে, পিঁয়াজির জন্যে পেঁয়াজ কাটতে। নদী ঘাটে খেয়া এসে ভিড়লে বেশ লোকজন হয়। সুন্দরবনের দিকে যেতে হলে এই পথ দিয়েই লোকেরা চলে, তাই ভীড় হয় ভালোই। ষোলো বছরের রাধা বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। মুখখানা তার ঢলঢলে শ্যামলা রঙের, খুব তাড়াতাড়ি বুঝি যৌবন এসে গেছে। দিদি সাবধান করে, বাইরে বেশি যাবি না। লাল ফিতে দিয়ে বেড়া বিনুনি বেঁধে, চোখে কাজল লাগিয়ে যখন সে দোকানের আসে পাশে ঘুরে বেড়ায়, তখন পথ যাত্রীদের চোখে পড়ে যায়।

স্টিমারের কর্মচারী ৩০/৩২ বছরের ‘দাশরথী প্রসাদ’ প্রায়ই এসে এই দোকানের বেঞ্চে বসে, চা ও মুড়ি চপ খায়, পেটের খিদের চেয়েও চোখের খিদে তার বেশী। ধূর্ত ধূর্ত দৃষ্টিতে খুঁজতে থাকে কিশোরী রাধাকে। একদিন বাগে পেয়ে ইশারা করে একটু আড়ালে যাবার জন্য, জামাইবাবু মুদির দোকানে গেছেন, চিনি আনতে, দিদি বাড়িতে মা ও বাচ্চার সেবায় ব্যস্ত। আদর করে চেপে ধরে রাধাকে দাশরথী গাছের আড়ালে, বলে “আমার সঙ্গে যাবি, খুব সুখে রাখব। এই দিদি জামাইবাবুর বেগার খেটে মরছিস, বোকা মেয়ে।” সেদিন হাত ছাড়িয়ে ভয়ে লজ্জায় ছুটে পালায় মেয়েটা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মা মারা গেল, বাপ ভাইদের রান্না বান্না সব কাজ করতে করতে হয়রান হয়ে গেল সে, একদিন দিদির রান্নাঘর থেকে চাল নিয়ে যাওয়ায় জামাইদাদা চুলের মুঠি ধরে পিঠে একটা ভীষণ জোরে কিল বসিয়ে দিল, খুব রাগ ধরে গেল তার l

সেদিন কাঁদতে কাঁদতে এক কোনে বসে দোকানের কাজ করছিল রাধা। মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল, এমন সময় সুযোগ বুঝে তার অবদমিত ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে দিল, ‘দাশরথী’l একটা সুন্দর লাল  সালোয়ার কামিজ  ও চুড়ি দিয়ে গেল তাকে, একটা প্যাকেটে করে। সন্ধ্যেবেলা সেগুলো পরে ঘরের বাইরে একটা নতুন অজানা জগতে পা দিল রাধা, দাশরথীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল অজানা উত্তেজনার তাড়নায়।

একটা ‘অটো আগে থেকেই ভাড়া করে রেখেছিল, রাধাকে নিয়ে সোজা কোলকাতা, সেখান থেকে ট্রেনে করে বিহারের এক গ্রামে। ছোট্ট একটা স্টেশন, হিন্দীতে নাম লেখা, পড়তে পারল না সে। সেই গ্রামে প্রথমেই দাশরথী নিয়ে গেল তাকে এক মন্দিরে, সেখানে ওর মাথায় সিঁদুর পরিয়ে, ওড়নি দিয়ে ঘোমটা টেনে নিয়ে গেল নিজের বাড়ি। এখানে এসে রাধা বুঝতে পারলো, আর এক বৌ বাচ্চা কাচ্চা সব আছে দাশরথীর, কাজেই কেউই সাদর সম্ভাষণ করল না তাকে বরং দুটো গালি দিয়ে বলল, – “অন্যের মেয়ে নিয়ে এসেছিস আমরা খাওয়াতে পারব না, এখানে জায়গা হবে না, শহরে গিয়ে রাখ। এসব মেয়ে আমাদের দেহাতী ভাষা, আদপ কায়দা জানে না, এখানে ডাল গলবে না।”

ভোজপুরী না কি একটা ভাষায় তাদের খুব ঝগড়া চলতে লাগল। কোন রকমে মোটামোটা রুটি ও লংকার তরকারী খেয়ে দিন কাটালো সে। দাশরথী এবার তাকে নিয়ে এল পাটনায়, এক বন্ধুর বাড়ি। তার সাহায্যে ফ্যাক্টরীতে কাজ জুটলো স্বামীর। কিন্তু সব আশা আনন্দ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল মেয়েটার। রাত্রে মদ খেয়ে দাশরথী ও তার বন্ধু বান্ধবদেরও নিত্য খেলার বস্তু হয়ে উঠল সে। সতেরো বছরেই একটা মরা মেয়ে হল তার। রোজ রাত্রে চলতে লাগল অকথ্য নির্যাতন এবং সারাদিন রাজ্যের কাজ। বাড়ির কথা ভেবে মন খুব খারাপ করে তার, কিন্তু কাঁদবার উপায় নেয়, তাহলে আরও মার পড়ে। এই এক ছোট্ট জীবনে এতো বিরাট একটা ভুল কেন করল ভেবে পায় না সে। খালি মনে হয় কখন এখান থেকে পালতে পারবে। দুর্গাপুজো, দীপাবলী কেটে গেল, এল বিহারের ‘ছট’ পুজোর সময়। মেয়েরা সব ব্রত করে দলে দলে চলেছে নদীর ঘাটে। পাড়ার বৌদের সঙ্গে রাধাও উপোস করে হাতে পুজোর থালা, ফল মূল নিয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে এক গলা ঘোমটা টেনে। এই দুই বছরে সে ভোজপুরী বা হিন্দী কোন ভাষায় শিখতে পারেনি, কারন কারোর সাথে মিশতেই দেওয়া হয় না তাকে। বেশ কিছুটা আসতেই চোখে পড়ল পাটনা রেল স্টেশনটা। কত ট্রেন আসছে যাচ্ছে, কত মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, আস্তে আস্তে দলছাড়া হল রাধা। পেছন দিক দিয়ে লাইন পার হয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মে চড়ল। একটা ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে, একটি বাঙালি পরিবার ট্রেন থেকে নামলেন বাংলায় কথা বলতে বলতে। রাধা তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে শুধু জানতে চাইলো ‘কোলকাতা’? তারা একটু অবাক হয়ে বলল – “হ্যাঁ কোলকাতা থেকে আসছি আমরা।” রাধার মনে যেন ঢাক বাজতে লাগল। ট্রেনটা ছাড়ছে। অজ্ঞ এবং অল্পশিক্ষিত মেয়েটি ভাবলো এই সুযোগ, উঠে পড়ল ট্রেনে, তার বাড়ির থেকে আসছে যখন, আবার ওখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তাকে, এই একই গাড়ি। কোনোরকমে বাথরুমের পাশে বসে পড়ল রাধা। সব সীটেই তো লোক। খাঁচা খুলে বন্দি পাখী বাইরের জগতে এসে ভীষণ শান্তি আরাম অনুভব করল, এবং ঘুমিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। –

সকালবেলায় এমন করে মাটিতে মুখ ঢেকে একটা মেয়ে শুয়ে আছে দেখে, টিকিটবাবু বিরক্ত করলেন না, বেলায় রাধা উঠে বসে রইল জানলার দিকে চলমান জগতের দিকে তাকিয়ে সময় কেটে গেল। সঙ্গে কেউ নেই, কোথায় যাচ্ছে, কি হবে এরপর কিছুই ভাবতে পারছে না সে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে শুধু। আবার কতক্ষন সে এইভাবে কাটালো, কত লোক প্রতি স্টেশনে উঠল নামল কে জানে!

কামরাতে বেশীর ভাগই মাথায় পাগড়ি বাঁধা লোক, তারা যে পাঞ্জাবী সর্দার সেটা বুঝতে পারলেও – ‘তুসি’, ‘তুয়াড্ডে’ – তেনু কি হোইয়া? এসব ভাষা বোধগম্য হলো না তার। শেষ গন্তব্য স্থান এসে গেল – ‘অমৃতসর’। সবাই নেমে গেল। রাধা বসে রইল একটা বেঞ্চে। এই ট্রেনটা যখন কোলকাতা থেকে আসছে, তখন আবার নিশ্চয় কলকাতাতেই ফিরে যাবে, অতএব নামবে না সে।

কামরা পরিষ্কার করে, পাখা লাইট চেক করে দেখতে রেলের কর্মচারীরা উঠলেন, পাঞ্জাবী ভাষায় ওকে নেমে যেতে বলল। ট্রেন ভোর বেলায় ছাড়বে, এখন অন্যদিকের লাইনে লাগানো হবে, কেউ যে এখানে থাকতে পারবে না সেটা খুব জোর দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলো। কারো কথাই শুনতে চাইছে না মেয়েটা। এবার স্টেশনের পুলিশ এসে টেনে নামালো তাকে। প্লাটফর্মে যেন নাটক দেখতে লোক জমে গেল। রাধা কোনও পুরুষকে দেখলেই চিৎকার করে, রাগে দুঃখে মাথার চুল ছেঁড়ে, নিজের কথা বলতে চায়, কেউ শোনে না। এরপর মেয়ে পুলিশ এসে তাকে হাত ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু শান্ত করল, কিন্তু নিজের ভাষায় তার সহকর্মী ও অফিসারদের জানালো – মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে। গায়ে মারের দাগও রয়েছে। পুলিশের হেফাজতে রাখাটা ঠিক হবে না, অতএব পাগলাগারদে পাঠিয়ে দেওয়াটাই বিবেচ্য হল।

রাধা কাঁদতে আরম্ভ করল – “আমি বাড়ি যাবো গো – আমাকে ছেড়ে দাও গো তোমরা।”  তার রুদ্র চন্ডী মূর্তি দেখে পুরুষ কর্মীরা ভয় পেয়েছিল। এই শিশুর মতন চিৎকার করে কাঁদতে দেখে মহিলারা চোখের জল রোধ করতে পারলো না। ওর ভাষা জড়িয়ে গেছে, মাটিতে আছাড় কাছাড় খাচ্ছে, কত কত ভাবে বলতে চেষ্টা করছে ও কি চায়; কিন্তু এক প্রদেশের লোক যে ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের মানুষের কাছে তার পরিচয় বা ইচ্ছে কিছুই জানতে সক্ষম নয়, – কেউ কারো মুখের কথা ভাষা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না, – সে কথা কি কেউ জানে!

অমৃতসরের বিখ্যাত সরকারী মানসিক ব্যাধিগ্রস্থদের রাখার লুনাটিক এ্যসাইলাম “বিদ্যাসাগর মেন্টাল হসপিটাল” থেকে মহিলা ওয়ার্ডেন ডাক্তার ও নিরাপত্তা কর্মচারীরা এসে রাধাকে জোর করে তুললেন হাসপাতালের এম্বুলেন্সে।

অনেকজন মহিলার মাঝে বসে রাধা একটু চুপ হল, ভাবলো এরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। ঐ ভ্যানটি এসে পৌঁছালো দেওয়াল ঘেরা এক নতুন ধরনের জায়গা, জেলখানা নয়  – ‘জেনানা পাগল খানা।’

দুজন দুদিকে ধরে ধরে ওকে নামালো গাড়ি থেকে। যেন চোর ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কয়েদীদের মতন করে। গেট পেরিয়ে বাগান, বেশ সুন্দর জায়গাটা, বড় বড় গাছে ঘেরা। জেল খানার মতন ঠিক লাগছে না তো রাধার। এরপর একটা বড় দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। সেখানে চারিদিকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব মেয়ে বসে শুয়ে কিম্বা দাঁড়িয়ে নানানরকম ভঙ্গী করছে। কেউ কাঁদছে, কেউ বিড়বিড় করে কী সব বলে চলেছে, কেউ আবার হাত পা নেড়ে দেওয়াল বা খাম্বার সাথে ঝগড়া করছে। একজন বেশ শান্ত হয়ে বসেছিল বারান্দার এক কোনে। হাত নেড়ে ইশারা করে ডাকলো রাধাকে, একমুখ হাসি নিয়ে, যেন নিজের আপনজনকে দেখতে পেয়েছে অনেকদিন পরে। যে দুজন মহিলা রাধার সঙ্গে আসছিলেন, তারা টেবিলে বসে থাকা একজন সুন্দর জামা ও কাপড় পরা দিদির কাছে কিছু লেখাচ্ছিল, একজন আদর করে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যায়া নাম হ্যায় বেটা তুমহারা?’ প্রশ্ন হিন্দীতে হলেও সে বুঝতে পারল, এবং উত্তর দিল, ‘রাধা রানী দাস’। তাকে তখন ওরা ছেড়ে দিয়ে তার চেহারা হাব ভাব লক্ষ্য করতে লাগল। যে মেয়েটি বার বার ফিক ফিক করে হেসে ওকে কাছে আসবার জন্য ইশারা করছে, তার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল – রাধা। প্রায় ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সে ভীষণ জোরে একটা গেলাস ছুড়ে মারলো, রাধার দিকে, তার রূপ ও চেহারা একনিমেষে বদলে গেল, চিৎকার করে গালাগালি দিতে লাগল সে। সবাই ছুটে এল তার কাছে, রাধার বিশেষ লাগেনি অন্য দিকে পড়েছে গ্লাসটা, ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে এল সে। মেয়েটা হয়তো তাকে তাড়া করতে পারে। বদ্ধ পাগল। কিন্তু আসতে পারল না। রাধাকে ছুটতে দেখে আবার তার মূর্ত্তি বদলে গেল, হাঁসতে লাগল হি হি করে। সেই দেখে অন্য দিকে একটা মেয়ে জোরে জোরে হাততালি দিতে লাগলো। তিন চারজন এসে ঘিরে ধরলো রাধাকে। কেউ জামা টানছে, তো কেউ চুল, তারা যেন কোন নতুন খেলনা পেয়েছে খেলবার জন্য। একজনকে ঝটকা দিয়ে ছাড়াতেই সে দিল ওর হাতে কামড়। ভীষণ জোরে চিৎকার করে রাধা ছুটে পালতে লাগল, বারান্দার অপরপ্রান্তে। সেখানে দুজন  খুব মোটাসোটা লম্বা চওড়া পুরুষালী চেহারার মহিলা ঝাড়ু লাগাচ্ছিলেন, তারা চেপে ধরলেন রাধাকে। সে জোরে জোরে বলল “আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও, আমি পাগল নই গো।”

কিন্তু কে তার কথা শোনে ! এবার গেটের দিকে পালাবার জন্য ওদের থেকে ছাড়া পেতে হাত পা ছুড়তে লাগল সে, বন্দিদশা ঘোচাতে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল তার। অন্য দিক থেকে খুব দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন এক মধ্যবয়সী সুন্দরী মহিলা – জড়িয়ে ধরলেন রাধাকে, – “শান্ত হো যা বিটিয়া, দেখ ম্যায় তেরী মা হুঁ।”

তাঁর বড় বড় করুনা মাখা চোখ, নরম হাতের ছোঁয়ায় কোন জাদু ছিল হয়ত, রাধা তাঁর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, – “মা মা মা আমি বাড়ি যাব।” হটাৎ একজন নার্স তাকে একটা ইনজেকশন দিল, ধীরে ধীরে সারা শরীর অবশ হয়ে গেল তার, ওরা ধরে একটা ঘরে সুন্দর সাদা চাদর পাতা বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘুমিয়ে পড়ল রাধা।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল মাথাটা ভার হওয়ায় অনেকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে ভাবতে লাগল কেমন করে এখানে এসেছে সে। সেই সুন্দর মহিলা ডাক্তার আবার প্রবেশ করলেন, তাদের প্রেসার চেক করতে, তাঁর হাসিমুখ দেখে একটু যেন ভরসা পেল রাধা। তিনি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘অব ঠিক হো বেটা, মেরী রাধারানী।” কালকের পাগলের কামড়ের জায়গাতে ওষুধ লাগিয়ে বললেন, – “শান্ত রহনা বেটা, কোই কুছ নেহী করেগা, উধার নেহী জানা, উধার বাগ মে যা, বহ ঔরৎ সব ঠিক হো গয়া, উন লোগো কে সাথ যাকে বৈঠনা। কোই তঙ্গ করে তো মুঝে বাতা দেনা, ম্যায় ফির আঁউঙ্গী।” সব কথা বোধগম্য না হলেও রাধা যেন ভীষণ শান্তি পেল।

একজন নার্স এসে তাকে দাঁত মাজার ব্রাশ, মাজন, তোয়ালে সব দিয়ে গেল। বড় বড় কেটলিতে চা নিয়ে এল একজন সঙ্গে বিস্কুট। বেশ আরাম বোধ করল সে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে জানলা দিয়ে দেখতে পেল একজন পাগলিনীকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে ভীষণ কাঁদছে ও চিৎকার করছে, কিন্তু প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে চললো চারজন মেয়ে কর্মচারী। সে অনেক গালাগালিও দিচ্ছে, থুতু ছুঁড়ছে, দাঁত খিঁচাচ্ছে এবং একটা কথাতেই জোর দিচ্ছে – “No Shock, No Electric Shock Please, মুঝে শক নেহী দে না, ছোড় দো, ছোড় দো।” ভয়ে শরীরে কাঁটা দিল তার অবস্থা দেখে, চা টা পড়ে গেল হাত থেকে। কাপটা ভেঙ্গে গেল। এক্জন ম্যাডাম বকে উঠলেন, তেড়ে এলেন যেন মারবেন তাকে, – “ঠিক সে পকড় নেহী সকতি?” ঘাবড়ে গিয়ে খাট থেকে লাফিয়ে অন্য দিকে চলে গেল রাধা। “মেরো না, আমাকে মেরো না।” কান্না শুরু করে দিল সে, স্বামীর ও তার বন্ধুদের অত্যাচার ও মারগুলো মনে পড়ে গেল। এখানেও কি অমনি করে আবার মারামারি শুরু করবে এরাও। সেই নার্স আবার একটা ইনজেকশন নিয়ে এগিয়ে আসতেই ছুট লাগালো সে বাইরে, যেখানে বেশ ক’জন নির্বিকারভাবে বসে সোয়েটার বুনছে, সেলাই করছে, একজন আরেক জনের উকুন বেছে দিচ্ছে। তারা কেউ হল্লা করছে না দেখে ওদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল সে। ইনজেকশন হাতে দিদিটিও এখানে এসে হাজির – রাধা বোঝাবার চেষ্টা করল যে সে পাগল নয়। কিন্তু ঐ মেয়েগুলিও তাকে চেপে ধরতেই প্যাঁট করে ছুঁচটা ফোটালো সেই ম্যাডাম। ওকে ওর কাটা ঘা টা দেখিয়ে বললেন, “ইয়ে টিটেনাস ইনজেকশন হ্যায় বেটা – ডাক্তার ম্যাডাম নে বোলা লাগানে কে লিয়ে, নেহী তো তেরা ঘা শুখেগা নেহী, সেপটিক হো জায়েগা।” সবটা বুঝতে না পারলেও একটু শান্ত হল সে এদের মধ্যে এসে।

পাগলের আড্ডায় ভীষণ অসহায় হয়ে বসে রইল রাধা। কিন্তু এখানে ওয়ার্ডার হরজিন্দর ম্যাডাম এলেই তার মন আনন্দে ভরে যায়। ওনার মুখ দেখলে, হাতের ছোঁয়া পেলে যেন জাদু হয়ে যায়। আজও তিনি এসেই রাধাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, – “খানা খায়া?” মাথা নাড়ল সে। “তকলিফ – কষ্ট তো নেহী হ্যায় পুত্তর?” সে কষ্ট কথাটা বুঝে আবার মাথা নাড়ল। অন্য দুটি পাগলিনী এসে হাত ধরে টানাটানি শুরু করতেই রাধা হরজিন্দর ম্যামের পেছনে গিয়ে লুকাতে চাইল। ম্যাডাম ঐ মেয়ে দুটিকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন একজন নার্স দিদিকে।

তারপর রাধার হাত ধরে স্টোর রুমে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে অনেকে কাজ করছে, কেউ চাদর পাট করে রাখছে, কেউ ওষুধ পত্রগুলি ট্রেতে সাজাচ্ছে, কেউ তোয়ালে গুনছে। তাদের একজনকে ডেকে বললেন, – ‘ইসকো ভী কুছ কাম দো’। পাশের রুমে চায়ের কাপ ও জল খাবারের বাসন ধুচ্ছিল একজন কর্মী, ওনাকে নিজের পাঞ্জাবী ভাষায় জানালো যে, আজ বাসন মাজা ও মুছে মুছে তোলার কর্মচারী অনুপস্থিত আছে, ওই মেয়েটিকে ওর সাহায্য করতে পাঠাতে। ‘হরজিন্দর’ ম্যাম ওকে ইশারায় দেখালেন ওগুলি ধুয়ে মুছে তাকে কিভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে। কাজ করতে রাধা ছোট থেকেই খুব উৎসাহী ও পটু। লেগে পড়লো আনন্দের সঙ্গে নিঃশব্দে।

এরপর নার্স দিদিদের পায়ে পায়ে ঘোরে সে, কখন কাকে সহায়তা করবে, কিভাবে অসুস্থ পাগল মেয়েগুলির কাপড় বদলে দেবে, চুল আঁচড়ে দেবে, বিছানার চাদর পাল্টাতে হবে – সবসময় সে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এক মাস যেতেই দেখা গেল, রাধা সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছে। মুখে তার কথা নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে ভীষণ লক্ষ্য। স্বাভাবিক ভাবেই এইরকম একটি মেয়ে যে এখানে সকলের চোখের মণি হয়ে উঠবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এতো সুন্দর ভাবে নিয়মমত সময়ে খাওয়া দাওয়া, স্নানের জল, নরম তোয়ালে পাওয়া, পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরার সৌভাগ্য তার বাড়িতে কখনও হয়নি। সেই চুলায় কাঠ বা ঘুটে জ্বেলে কোনরকমে একটু ভাত, একটু শাক কখনও গামছা দিয়ে ধরে পুঁটি মাছের ঝোল, শামুক গুগলীর তরকারী খেতো তারা। স্বামীর ঘরে মোটা মোটা রুটি বানাতো আর পেঁয়াজ চিবিয়ে রুটি খাওয়া। এখানে এতো সুন্দর ব্যবস্থা, শুধু স্বাধীনতা নেই আর সঙ্গী সাথীদের মানসিক বিপর্যয় অসহায়তায় মনটা ভারাক্রান্ত থাকায় মাঝে মাঝে ভীষণ বিষন্নতায় ভোগে, রাত্রে ঘুম হয় না, কারো চিৎকার, বুক ভাঙ্গা কান্নার আওয়াজ শুনতে শুনতে মনে হয় দেওয়াল ভেঙ্গে পালিয়ে যায়। কিন্তু কোথায়? কার কাছে যাবে সে? বাইরের জগৎটা তো আরও ভয়াবহ।

ধীরে ধীরে সাত বছর পার হয়ে গেল। এখন রাধা এদের কথা বুঝতে পারে। সকালের জল খাবারে পুরী ছোলে বা আলুর পরোটার স্বাদ তার ভীষণ ভালো লাগে। দুপুরের রাজমা চাওল, রায়তা ইত্যাদি খেতে খেতে একেবারে পাঞ্জাবী মেয়েদের মতন আনন্দ করে রাধা। রাত্রে ভিন্ডি, তরী, লাউয়ের তরকারী, তড়কা ডালের গন্ধে তার মন খুশীতে ভরে যায়। এখানের রুটিনে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

একদিন সেখানে একদল সমাজসেবী সংস্থার দল এলেন, মেন্টাল হাসপাতাল পরিদর্শন করতে এবং তাদের case study নিয়ে আলোচনা করতে। তাঁদের দলে ছিলেন একজন বাঙালী মনোবিজ্ঞানী। হরজিন্দর ম্যাডাম অন্যান্য ওয়ার্ডার দের সঙ্গে তাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মহিলার কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করাচ্ছেন। এরা এখানে কত আনন্দে আছে বোঝাবার জন্য সবাইকে গোল করে বসিয়ে গান বাজনা নাচ করতে উৎসাহ দিলেন।

রাধাকে ডাকতেই সে এসে বাংলায় গান শুরু করলো। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে”। সবাই খুব হাততালি দিল। ওকে তখন ওই বাঙালী দিদি কাছে ডেকে আদর করে তার বাড়ির ঠিকানা, খবর জানতে চাইলেন। বললেন খোঁজ নিয়ে তাকে একদিন তার বাড়ি পৌঁছে দিতে ইচ্ছুক তিনি। কিন্তু রাধা খুব একটা উৎসাহ দেখালো না। কারন নিজের বাপের বাড়ি থেকে সে পালিয়ে গিয়েছিল, তাই সেখানে ফিরে যাওয়ার তার মুখ নেই। আর পাটনায় স্বামীর কাছে তো সে কিছুতেই যেতে রাজী নয়।

এখানে যাঁদের বাড়ির লোকেরা পাগল রুগীকে রেখে যায়, তাঁরা ভাল হয়ে যাওয়া মা বোন বা স্ত্রীকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অনুরোধ করে, এখানের কর্তৃপক্ষ। কয়েকদিন আগে কমলা দেবীকে পাঠিয়ে দেওয়া হল, তাঁর পুত্রের বাড়ি কিন্তু কেউ তাকে উপযুক্ত সম্মান ও আদরে গ্রহণ করলো না। সবসময় তাঁকে শুনতে হত, আরে পাগলীকে কি জিজ্ঞেস করছো, – ওকে এসব কাজের ভার দিও না, বাচ্চা কে কোলে দিও না, ও  ফেলে দেবে ইত্যাদি।  ধীরে ধীরে সে বিষণ্ণ হয়ে গেল, তার মানসিক ব্যাধি আগের মতই দেখা দিল, আর এই হাসপাতালে আবার  আসতে বাধ্য করল তাকে।

তাঁকে ফিরে পেয়ে পুরানো বন্ধুদের সবাইকার কী আনন্দ! এই পাগলখানায় মানসিক ভারসাম্য হারানো মানুষগুলি সবাই কিন্তু নিজেদের সত্তা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেনি, একজন আরেকজনকে চুল আঁচড়ে দেয়, পাজামার দড়ি বেঁধে দেয়, বেশী অসুস্থ থাকলে বিছানায় গিয়ে খাবার খাইয়ে আসে। যারা বিষন্নতায় ভোগে, বিমর্ষ থাকে ‘হরজিন্দর ম্যাম’ তাদের মুড ভালো করার জন্য গান বাজনা করান, যারা একটু ভালো হয়ে গেছে এবং হৈ হুল্লোড় করতে ভালোবাসে তাদের দিয়ে। রাধা নিজের মনে গুন গুন করে সব সময় গান গায়, তাই তাকে মোবাইলে গান চালিয়ে নাচতে বলেন তিনি। সবাই হাততালি দেয়।

প্রত্যেক আবাসিক (inmate) দের বাড়ির লোকের খোঁজ করে একটি সরকারী বিভাগ থেকে। রাধার জন্যও ওই বাঙালী দিদিমনি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার বাসন্তীতে পুলিশের ‘খোঁজ বিভাগের লোক পাঠালেন, কিন্তু তার জামাইবাবু বলে দিলেন, ওই পলাতকা মেয়ের ওপর তাদের কারো কোন দুঃখ দরদ বা সহানুভূতি নেই, তার বাবা মারা গেছেন, ভাইরাও কলকাতায় অন্যের বাড়ি চাকরের কাজ করে, কাজেই কেউ তার ভার নিতে অসমর্থ। এবার পাটনার ঐ অঞ্চলে গিয়ে বিভিন্ন ফ্যাক্টরীতে রাধার ছবি দেখিয়ে তার স্বামী দাশরথীর খোঁজ পাওয়া গেল। তাকে যখন বলা হল যে, – ‘রাধা অমৃতসরের মহিলা পাগলখানায় আছে এবং এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, তখন সে খুব আগ্রহ দেখালো, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। নির্দিষ্ট দিনে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হল সেখানে।

রাধাকে বলতেই সে যেন চমকে উঠল। কিন্তু মনের কোন একটা আশার আলোও জ্বলে উঠল, সে হারিয়ে যাওয়াতে দাশথীর মনে নিশ্চয় অনুতাপ হয়েছে, এবং তার প্রতি এখনও কিছু ভালোবাসা জমে আছে তার মনের কোনায়। বুকটা কেমন কেঁপে উঠল তার, মেয়ে মানুষের এই দুর্বলতা কেন যে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন কে জানে। এই সাত বছরে সে অনেক পরিণত হয়ে গেছে। হিন্দি – পাঞ্জাবী ভাষাও ভালোই বুঝতে পারে যদিও দরকার না হলে নিজের মুখ খোলে না। নার্স দিদি ওয়ার্ডার ম্যামের পায়ে পায়ে ঘুরতে, হাতে হাতে কাজ করতে তার সময়টা খুব ভালোই কাটে। আগে ঘুমের ওষুধ দিত তাকে, এখন সারাদিন ঘোরাঘুরি কাজ করায় শুলেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে সে।

সেদিন সকালে তাকে হরজিন্দর ম্যাম অফিসে নিয়ে এলেন। দাশরথীর হাতে সঁপে দেওয়া হল রাধাকে, সমস্ত কাগজ পত্রে সই করিয়ে নিয়ে। সেখানে লেডী ডাক্তার তাকে আর একবার পরীক্ষা করে যেতে দিতে অনুমতি দিলেন। হরজিন্দর ম্যাম কানে কানে বলে দিলেন, – “কোই তাকলীফ হো তো মুঝে ফোন কর না, নাম্বার তেরী ব্যাগ মে লিখকর রাখ দিয়া ম্যায় নে।” অনেকদিন পরে যেন জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে রাধার ভীষণ কান্না পেল, আনন্দে না দুঃখে কেউ বুঝতে পারলো না।

একটা ট্যাক্সিতে বসিয়ে ওকে নিয়ে যেতে যেতে দুই বন্ধু কথা শুরু করল। যার মানে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না রাধার –

খুব সুন্দর ভরা যৌবন এসেছে মেয়েটির। দাশরথী তুই খুবই ভাগ্যশালী যে এরকম বৌকে ফিরে পেলি। এবার টাকা নিয়ে কথা চলল। দরাদরি শুরু হল। দিল্লীর বাজারে Red Light এর দেহ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিলে কত টাকা পাওয়া যাবে তার হিসেবে নিকেশ করতে লাগল তারা। দেখতে দেখতে অমৃতসর স্টেশন এসে গেল। স্টেশনের প্লাটফর্মে টিকিট কাটছে তার বন্ধু, দাশরথী রাধাকে দেখছে আর তার বিশ্রী পান খাওয়া দাঁত বের করে হাঁসছে। ট্রেন এসে গেল – ট্রেনে তারা ওঠার মুহূর্তেই ঠিক আগের মতোই চিৎকার ও বিকট জোরে কান্না শুরু করে দিল রাধা। কেউ তার হাত ধরতে এলেই মারপিট, থুতু ছোঁড়া, চুল ছেঁড়া, মাটিতে আছাড় খাওয়ার পুরোরাবৃত্তি হল, আবার সাত বছর পরে। সঙ্গে লেডী পুলিশ চারজন মিলে চেপে ধরে তাদের গাড়িতে তুলে সোজা পাগল খানায়।

হরজিন্দর ম্যাম ছুটে এলেন, সঙ্গে ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ডারদের দল। ইনজেকশন নিয়ে ফোঁটাতে এলেন তাকে শান্ত করতে। রাধা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল, “ম্যাম, ম্যায় বিলকুল ঠিক হুঁ।” মানসিক হাসপাতালের কর্মচারী, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডার, রাঁধুনী, জমাদারনী কারো বুঝতে বাকী রইল না যে সে ঐ স্টেশনে পাগলের অভিনয় করেছে, এখানে ফিরে আসবার জন্য। আনন্দের জোয়ার এসে গেল সেখানে।

প্রথমেই হরজিন্দর ম্যাম জড়িয়ে ধরলেন রাধাকে। নিরাপত্তার অভাবে বাইরের জগতের নিষ্ঠূরতা মেয়েটিকে যে এখানে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পেরেছে, সেটা ভেবে চোখে জল এসে গেল তার। পাগলের জেলখানায় এসেও যদি কেউ শান্তিতে আনন্দে সরকারের দেওয়া খাবার খেয়ে, কাপড় পরে, অসুখে বিসুখে ওষুধ পত্র সেবন করে – কাজকর্মে সেবার মধ্যে জীবন কাটাতে চায়, তাহলে ক্ষতি কি? ফাইলে তার নাম পাগলের সঙ্গে নথিবদ্ধ হোক না কেন, কার তাতে কি এসে যায় !

রাধা আবার স্টোরে ঢুকলো তার পাগলের উনিফর্মটি পরে নতুন ওয়ার্ডার ম্যামদের সঙ্গে সাদা বিছানার চাদর ও কম্বলগুলি সাজাতে লাগল টেবিলের ওপরে গান গাইতে গাইতে –

যদি সবাই ফিরে যায়/ওরে ওরে ও অভাগা কেউ ফিরে না চায়,/তবে পথের কাঁটা . . . . আপন . . .  গানের কলিগুলো খেই হারিয়ে ফেললো। আনন্দের অশ্রু বন্যায় ভেসে গিয়ে।

আগুনের পরশমনি (Aaguner poroshmoni)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের লেন্সে চোখ রেখে, ঘাড় গুঁজে গবেষণা করে চলেছে ‘রণিতা’। ভাইরাসটির সঙ্গে সারা বিশ্বের প্রত্যেক গবেষণাগারে এখন ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তারা। আজ তাদের তৈরী ‘ভ্যাকসিন’ বাজারে আসছে। লক্ষ লক্ষ লোক সেই ওষুধে আবার কোভিড জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে – তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়াতে সক্ষম হবে।

গভীর আনন্দে শান্তিতে তার বন্ধু সহকর্মী ল্যাবের সব রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাত্র ছাত্রীরা আজ আবেগাপ্লুত। –

এতদিন তারা কিভাবে যে সময় কাটিয়েছেন, কি খেয়েছেন, কখন একটু ঘুমাবার চেষ্টা করেছেন, কেউ জানে না। তাঁদের উদ্দীপনা, উত্তেজনা, অসাধ্য সাধনের অদম্য প্রচেষ্টা আজ সফল হল।

আজ অনেকদিন পরে বাড়ি আসছে রণিতা। বুকের ভেতরে তার একটা অদ্ভুত খুশির বান ডেকেছে। গিয়েই প্রথমে স্নান করবে সে অনেক্ষন ধরে। তারপর খুব ভালো করে রান্না করে সে নিজের হাতে ঘর সাজাবে, এলোমেলো সংসারের হাল ধরবে। আর তার পঁচিশ বছরের জীবন সঙ্গীকে খুব যত্ন আদর দিয়ে ভরিয়ে দেবে। মনোরঞ্জন আর তার প্রেম কাহিনী তো বন্ধু মহলে বিশেষ ভাবে আলোচনার বিষয়। একমাত্র মেয়েকেও খুব ভালো ভাবে মানুষ করছে তারা। সে এখন East Cost এ ফিলাডেল ফিয়াতে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে। মায়ের কাজের সাফল্যে সেও খুব গর্বিত। স্বামী একা একা বাড়িতে work form home করছে। সারাদিন কম্পিউটার এর মধ্যে ঢুকে থাকে। মাঝে মাঝে স্পন্ডেলাইটিসে বড্ডো কষ্ট পায় সে। এবার লকডাউনে ওর জীবন একেবারে বন্দী কয়েদিদের মতন হয়ে গেছে।

রণিতা ভাবে এবারে কিছুদিন ছুটি নিয়ে শুধু মনোরঞ্জনকে সময় দেবে সে। কেমন যেন অপরাধবোধ ও কষ্ট বুকের ভেতরে এসে হৃদয়টাকে কুরে কুরে খেতে থাকে। প্রথমে দুজনেই পাঁচ বছর Phd করতে একজন আরেকজনকে কম সময় দিয়েছে। পরে মেয়ের পড়াশোনা, বিভিন্ন activity তে গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, ঘরের কাজ, বাজার দোকান ইত্যাদিতে দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত ছিল। স্বামী তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে, পরিবারের জন্য। রান্না করাটা তার একটা হবি ছিল। ভারতীয় খাবার শুধু নয়, ইটালিয়ান পাস্তা বা সবরকমের চাইনীজ ডিশ বানিয়ে মেয়েকে খুশি করতো সে। এখন দুবছর তাদের একে অপরের দিকে তাকাবার সময় পাইনি। আলাদা আলাদা কর্মক্ষেত্রে এই দুই সত্ত্বা যেন দুই দ্বীপে বাস করছে। কিন্তু কি করবে! যে মহামারী এসেছে – যে সংকটের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ এক দুঃসময়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তার প্রভাব তো তাদের ওপরও পড়তে বাধ্য।

গাড়ি বেশ জোরেই চালালো সে। হটাৎ একটা পুলিশের ভ্যান এসে সাইরেন দিয়ে হাত দেখালো, থামতে বললো। রণিতা গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করাতেই দুজন পুলিশ অফিসার এসে জানলা খুলে ID Card দেখতে চাইলেন। তারপর হাসপাতালের front line worker, scientist দেখে সেগুলি ফেরৎ দিয়ে বললেন, – ঠিক আছে যান, তবে আর speed limit cross করবেন না, পরেরবার ফাইন হয়ে যাবে। স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললো রণিতা।

বাড়ির চাবি সব সময়ই ওর কাছে একটা থাকে, যদি মনোরঞ্জন ঘুমোয় বা মন দিয়ে কাজ করে – এই ভেবে কখনও disturb করে না তাকে। আজ মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে সে স্বামীকে। ওর এই ‘ফাইজার’ কোম্পানীর সাফল্যে নিশ্চয় মনোরঞ্জন বুকে চেপে ধরবে রণিতাকে অথবা আগেকার মতন একেবারে কোলে তুলে নেবে। বুকের মধ্যে আনন্দ ধ্বনি যেন ড্রাম বাজাতে লাগল।

দরজা খুলতেই একটা ভীষণ উগ্র সেন্টের গন্ধ নাকে এল তার। ড্রইং রুমের সোফায় সম্পূর্ণ নগ্ন একটি যুবতী ঘুমে অচৈতন্য। পাশে ড্রিঙ্কস এর খালি বোতল ও দুটো গ্লাস। মনোরঞ্জন বোধহয় বাথরুমে। কাঁধ থেকে বড় ব্যাগটা পাশে আপনা আপনি খসে পড়ে গেল। দু মিনিট একদম স্তম্ভিত হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এটা কি তার নিজের বাড়ি? অন্য কোথাও এসে যায়নি তো ! মনোরঞ্জনের ডেস্কটপ কম্পিউটারটিতে তখন একটা ভিডিও চলছে, নানা ধরনের উত্তেজক দৈহিক সুখ ভোগের ক্রিয়াকলাপ, এগুলো দেখতে দেখতে শরীরের সমস্ত স্নায়ু গরম হয়ে ওঠে।

রণিতার পা দুটো কে যেন পেছন দিকে টানছে, সে ধীরে ধীরে যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনি বেরিয়ে গেল, গাড়ির চাবি ও ফোনটা হাতে ধরাই ছিল, যন্ত্রচালিত রোবোটের মতন সে তাই গিয়ে বসল আবার তার স্টিয়ারিংটি ধরে। এক্সিলেটরে চাপ দিতেই গাড়ি ছুটলো যেন দিকবিদিক শূন্য হয়ে। পশ্চিম আমেরিকার এই রাস্তাটা তার ভীষণ প্রিয়, 101, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র – সামনে নীল আকাশ, দুধারে বোগেনভিলার গাছ। এখন গরমকাল, প্রখর রোদ্রে চারিদিক ভীষণ তপ্ত, রৌদ্রের তেজে ছোট ছোট পাহাড়-টিলা একেবারে শ্যামলতা হীন, রুক্ষ শুকনো ঘাস যেন ধুলোর রঙে ধূসরিত ধূসর রঙের বিবর্ণ। কোথাও কোনও কি স্নিগ্ধতা নেই! এতদিন একটা মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে ভীষণ ভয়ানক একটা দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল তারা, সেই সাংঘাতিক লড়াই চালাতে গিয়ে অন্য কোনোদিকে তাকাবার – ভাববার বা অন্য কাউকে সময় দেবার কথা মনেও আসেনি তার। মহামারী – লকডাউন বহু Introvert একাকিত্বের শিকার নর-নারীর জীবনে কোভিড আক্রমণ ছাড়াও আরও কত রকমের বিচ্ছিন্নতা – নিরাপত্তা হীনতা ভয় প্রসূত মানসিক বিকার এনে দিয়েছে, তা হয়তো আস্তে আস্তে বোঝা যাবে। এই ভীষণ ঝড় অনেক দূরের মানুষকে যেমন কাছে এনে দিয়েছে তেমনি আবার মাত্র এক/দেড় বছরের মধ্যে অতি কাছের মানুষকেও বহু দূরে ঠেলে দিয়েছে – একথা রণিতা গভীরভাবে অনুভব করল আজ। একটা ‘ভিসতা’ পয়েন্টে যেখান থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে নীল জলের পাশে অনেক পাথর পড়ে আছে, সেখানে গাড়ি রাখার জায়গায় গাড়িটা রেখে ধীরে ধীরে নামলো রণিতা। একটা পাথরের ওপরে গিয়ে বসে রইল, পাথরের মূর্ত্তির মতন। ফোনে গান চালালো – দেবব্রতের কণ্ঠে “আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী “সুদূর বিপুল সুদু….র, তুমি…. যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশুরী” – শুনতে শুনতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রণিতার মনও সব বিস্ময় – দুঃখ – নৈরাশ্য ভুলে উধাও হয়ে যেতে লাগল দূরে – বহুদূরে – প্রখর সূর্যালোক, সমুদ্রের উদাত্ত বাতাস ও সামনে জলের ধারে উঠে আসা কিছু অটার্সের অশান্ত ভাবে খেলাধুলা করার দৃশ্য এবং বিশাল বিশাল কিছু ওয়ালরাস, সী লায়নের চলাচল দেখে মুগ্ধতার কোন গভীরে ডুবে যেতে লাগল রণিতা। কয়েকটি সিগল এসে জড়ো হয়েছে তার চারপাশে। মাছ মুখে নিয়ে একটা সাদা বক উঠে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে কতকগুলো কাঁকড়া সমুদ্রতটে পাথরের খাঁজে খাঁজে বড় বড় দাঁত নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে, এ জগৎটা কত সুন্দর – এই প্রকৃতি কত উদার, বিভিন্ন জন্তু জানোয়ার, পোকা-মাকড়, পশু-পাখিদের এই সহাবস্থান – এই সক্রিয় জীবনের ছবি তার মনকে বিভোর করে দিল। শান্ত মনে নতুন বোধদ্বয় হল। নতুন এক ছবি ফুটে উঠল তার সামনে। এত বৃহত্তর জীবনের মাঝে এসে সে – অনুভব করল যে তার অনুপস্থিতি এবং গৃহবন্দী হওয়ায় দৈহিক ক্ষুধা বা একটু আরাম সহানুভূতি আন্তরিকতা, কারো হাতের স্পর্শ, সুখ লাভের ইচ্ছের বশবর্তী হয়ে যদি ‘মনোরঞ্জন’ তার থেকে দূরে সরে যায় – তাহলে সেটাকে অস্বাভাবিক ভাবলে চলবে কেন? সেই স্কুল কলেজের সময় থেকে তারা প্রেমের বন্ধনে বাঁধা। সুন্দরভাবে সন্তান পালনের কর্ত্তব্য দুজন মিলে পালন করেছে। তাদের জীবন কি এই এক প্যানডামিকের ঝড়ে বিধ্বস্থ হয়ে যাবে। কোভিড তাদের ছুঁতে পারেনি। বাবা মায়েরা কেউ হটাৎ মারা যাননি। মেয়ে এখনও ভাল আছে – যে কাজে সে যুক্ত তাতেও তার সাফল্য লাভ হয়েছে, তাহলে কেন সে এমন মনকে অবশ বিবশ সংকীর্ণ করে ফেলে এমনভাবে নিজের বাড়ি ঘর সংসার ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তার বাবা সব সময় বলেন, “forgive and forget, নাহলে আগে এগোতে পারবে কি করে?” এগিয়ে চলাই তো জীবনের ধর্ম। 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ ঘুম এসে গিয়েছিল রাচেল নামে মেয়েটির। দরজা খুলে রণিতা চলে যাওয়ায় একটা আওয়াজ হল এবং  গরম হওয়ার ঝোঁকায় উঠে পড়ল সে। তাড়াতাড়ি হাফ প্যান্ট ও টি শার্টটি গলিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। আরও পাঁচটি জায়গায় সময়মত ডেলিভারী পৌঁছে দিতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে মালিকের কাছে। ওষুধ কোম্পানীর থেকে প্যাকেটগুলি সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় তাকে। ভীষণ গরম পড়েছে এবার ক্যালিফোর্নিয়ায়, এরকম আশ্চর্য রোদের তাপ আগে কখনও সব রাস্তা ঘাট সবুজ পার্কগুলিকে এমনভাবে ঝলসে দেয়নি। খুব ক্লান্ত হয়ে এই ভদ্রলোককে ওষুধ দিতে এসে এক বোতল ঠান্ডা জল চেয়েছিল সে। তিনি ড্রইং রুমে বসে কম্পিউটারে কিছু খুলে রেখেছিলেন। ওকে আন্তরিকভাবে ভেতরে আসতে বললেন। ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে দুটি গ্লাসে বিয়ার ঢেলে নিয়ে গল্প করতে আরম্ভ করলেন।

ছোট থেকেই সে লাস্যময়ী, শরীরের প্রতিটি খাঁজে ঢেউ তুলে হেসে কথা বলতে পারে। মেক্সিকো থেকে এখানে আসার পর থেকেই বিভিন্ন হোটেলে, রেস্টুরেন্টে কাজ করেছে সে। ১৮ বছর বয়স থেকে আলাদা থাকে, বন্ধুদের পরামর্শে কন্ট্রাসেপ্টিক ওষুধ খায়। যে কোনও জায়গায় যে কোন ধরনের মানুষের সঙ্গে সহবাস করতে তার যেমন আপত্তি নেই, তাদের কথা এক মিনিটে ভুলে যেতেও তার পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না। অতএব আজকের ঘটনাটি জলে বুদবুদ ওঠার মতন একমুহূর্ত্তে মন থেকে মুছে দিয়ে আবার সে এগিয়ে যায় অন্য পাড়ায় অন্য বাড়িতে ওষুধের ডেলিভারী দিতে। এই প্যানডামিকে বহু লোকের চাকরী চলে গেছে কিন্তু Amazon, Zomato বা আরও অনেক অনলাইন দোকানগুলির মাল বহনকারী এই ডেলিভারী বয় ও মেয়েদের কাজ অনেক বেড়েছে। কিছু বন্ধুর ‘কোভিড’ হওয়ায় সে এখন দুই শিফটে কাজ করে অনেক ওভারটাইম পায়। লকডাউন খুললে দেশে ফিরে গিয়ে সংসার পাতবার বাসনা তার বাড়ছে।

 

তৃতীয় অধ্যায়

মেয়েটির ধড়মড় করে উঠে হড়বড় করে পালিয়ে যাওয়াতে মনোরঞ্জন তোয়ালে হাতে ড্রইং রুমে এসে দাঁড়ালো। এতক্ষন সে বোধহয় কোন ঘোরে ছিল, কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। মাথায় জল ঢেলে শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। হটাৎ খোলা দরজার পাশে রণিতার বড় ব্যাগটি চোখে পড়ল। ইলেকট্রিক কারেন্ট লাগল তার শরীরে। এক মুহূর্তে মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্যতায় ভরে গেল। পায়ের তলা থেকে মাটি ক্রমশঃ সরে যেতে লাগল তার। ছোট বাচ্চার মতন বিড় বিড় করতে লাগল, – ‘হে ভগবান এখন কি হবে?’ আমি কি করে রণিতার সামনে আবার সহজভাবে দাঁড়াতে পারব। ও যদি মেয়েকে জানায়, বাবা মাকে বলে দেয়, বন্ধু বান্ধবদের কাছে নালিশ জানায়? ও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়! বা রাগে দুঃখে অভিমানে কিছু করে বসে, তাহলে? তাহলে . . . . . তাহলে . . . ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে লাগল মনোরঞ্জন। তার এতদিনের সুন্দর সংসার কি সে নিজের ভুলের জন্যে কাঁচের ফুলদানীর মতন ভেঙ্গে দিল! খোলা টেলিভিশনে হটাৎ একটা ঘোষণা শোনা গেল, – ফরেস্ট ফায়ার লেগেছে চারিদিকে। দলে দলে ঘর খালি করে পথে, মাঠে বেরিয়ে পড়েছে, হাজার হাজার লোক। সেগুলি দেখতে দেখতে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মনোরঞ্জন। সম্বিৎ ফিরে এলো দরজায় অনেক লোক, পুলিশ এসে চেঁচামেচি করেছে শুনে, কি চায় এরা, কি বলতে এসেছে? রণিতার কি কোন বিপদ হয়েছে?

ইভাকুয়েট করে তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন। পাশের বাড়ির ছাদে পাশের জঙ্গলের আগুনের ফুলকি এসে পড়েছে, আপনার কাঠের বারান্দাতেও সে আগুন পৌঁছাতে দেরী লাগবে না। বেরিয়ে আসুন শীঘ্রই. . .  ইংরেজি, স্প্যানিশ নানা ভাষায় পুলিশের মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে। ল্যাপটপ ও ওয়ালেট এবং একটা জলের বোতল হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো সে। পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে হাত নেড়ে ডাকছেন এক বৃদ্ধা। তার সামনের ঘরে আগুন ধরে যাওয়ায় বেরোনোর রাস্তা বন্ধ। মনোরঞ্জন এক লাফে বাগানের পেছন দিয়ে তাঁর গ্যারেজে ঢুকে পড়লো। এখানে সে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার দরজাটি খুঁজে পেল। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল সেটি। তাড়াতাড়ি ঐ ভীত মহিলার পাশে পৌঁছেই চ্যাং দোলা করে কোলে তুলে নিল তাকে। ধোঁয়ায় ঘর ভরে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে পারছে না তারা, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোরকমে পেছনের রাস্তা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে। বৃদ্ধাকে বাঁচিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশীরা ঘিরে ধরলো তাকে। ভীষণ জোরে একটা আওয়াজ শুনে চমকে তাকালো তারা – মনোরঞ্জনের বাড়িটি তখন জ্বলন্ত আগুনের কবলে। ফায়ার ব্রিগেড এসে গেছে, জলের ফোয়ারা ছুটেছে – সবাই দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছে। পাশের বড় বড় রেডউড গাছগুলি বাঁচাবার জন্য আরেকদল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে তাদের মুড়ে দিচ্ছে। 

দাবানল – দাবানলের ভয়ঙ্কর রূপ বাক্যহারা করে দিল। অবশ বিবশ হয়ে পথের ওপরে বসে পড়ে মনোরঞ্জন। রণিতার গাড়ি বাড়ির প্রায় কাছাকাছি আসতেই ফায়ার ফরেস্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে, ভাবতেই পারেনি তাদের ঐ কাঠের বাড়িগুলিও ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। গাড়ি থামিয়ে ছুটে এল সে। প্রথমেই মনে হল আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে মনোরঞ্জনকে খুঁজে আনবার কথা, কিন্তু বাইরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখতে পেল তার চেহারা। ওদিকের মাঠে – কৃষ্ণকায়া আফ্রিকান আমেরিকান অ্যালমা ও শ্বেতাঙ্গিনী মিসেস জন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে কাঁদছেন। কিছুদিন আগেও বর্ণ বিদ্বেষের কারণে একজন আরেকজনকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। আজ মহামারী এসেও যখন তাঁদের মিল করাতে পারেনি, আগুনের লেলিহান শিখার সামনে মিলন দৃশ্য এক অভিনব সত্যের দর্শন করিয়েছে তাঁদের।

রণিতা মনোরঞ্জনের কাছে আসতেই শিশুর মতন ফুঁপিয়ে উঠল সে। মায়ের মতন মমতায় স্ত্রী তার স্বামীর মাথাটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ও প্রণাম জানাতে লাগল বারেবারে। তাদের দুজনের বুকেই তখন গান বাজছে – “আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে, এজীবন . . . .”

 

দময়ন্তীর আধ্যাত্মিকতার বীজ (Damoyontir Adhyatmikotar beej)

চন্দনা সেনগুপ্ত

লজ্জাপটাবৃতা দুর্গাদেবী সকালে উঠেই বাসি কাপড় ছেড়ে তুলসীতলায় গোবর ছড়া দিয়ে, ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে ঘটি, কলসী নিয়ে পুকুরে যেতেন স্নান সারতে। তারপর চলতো তার পূজাপাঠ – জপতপ।

বাংলাদেশের সাধিকা বিধবা মা নিষ্ঠা ভাবে চন্দন ঘষতেন, তুলসী তুলে, ফলফুল কেটে প্রাসাদের থালি সাজাতেন। গাঁদা, মালতী, চম্পা, টগর, বেলী – যখন যা ফুল ফুটতো তাঁর আঙ্গনে তাই সাজিয়ে ধুপ জ্বেলে পূজা উপাচার সংগ্রহ করে, হরিনামের মালাটি হাতে নিয়ে একমনে চোখ বুজে জপ করে চলতেন, – “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”। তাঁর সেই পূজারিণী রূপটি ছিল বড় সুন্দর। ছেলের বউ এলিজাবেথ প্রায় এসে ছোট্ট কন্যা “দময়ন্তীকে” নিয়ে গ্রামের বাড়িতে শাশুড়ির কাছে থাকতেন, সেখানে তাঁর সময় কাটতো এক অদ্ভুত অনাবিল আনন্দে। শিশু কন্যা তার ঠাকুমার মন্ত্র উচ্চারণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতাপাঠ শুনতো হা করে। দূর্গা দেবীর আধ্যাত্মিক সাত্ত্বিক জীবন ধারনের মানে কিছুই সে বুঝতো না, কিন্তু ধ্যান জপ অনেকক্ষন শান্ত হয়ে বসে ও চক্ষু মুদিত ওই অপূর্ব মূর্ত্তি তাকে ভীষণ আকর্ষণ করতো। ঠাকুরমার কোলে পিঠে চড়ে দাপাদাপি করার সুযোগ সে পাইনি, spirituality কাকে বলে সেকথা তখনও তার বোধগম্য হয়নি, কিন্তু এই ভাবধারাটি – অর্থাৎ শান্ত স্নিগ্ধভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে একান্ত হওয়ার গুনটি সে ঠাকুরমার থেকেই লাভ করেছিল।

“দময়ন্তীর” বাবা ‘গণপতি বাবু’ও দুর্গাপূজার সময় চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে মেতে উঠতেন নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে। ‘কলা বউ’ স্নান করতে গিয়ে গ্রামের সব লোকের সঙ্গে – আমার উমা এলো গো কিংবা অষ্টমীর দিনে আঁখ বলীর পরেই “রণ মাঝে, বন মাঝে নাচে গো উমা দিগম্বরী” গান ও খোল করতাল ঢোলকের গানের তালে একেবারে বিভোর নাচ – দেখলে কেউ বলতে পারতো না যে তিনি আমেরিকা ফেরত ইঞ্জিনিয়ার বা তাঁর স্ত্রীও বিদেশিনী।

দুবছরের কন্যা দময়ন্তীকে কাঁধে নিয়ে বিজয়ার ভাসানের সময় “চন্ডী মণ্ডপ আঁধার করে ওমা উমা আমার কোথা গেলি গো” গানের সুরে তাল মিলিয়ে দূর্গা মায়ের মূর্ত্তি বিসর্জন দিতে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত রমণীয়। জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থাকে না কিন্তু পরোক্ষভাবে চরিত্র গঠনে – ভাবনা চিন্তায় তার ছাপ পড়ে পরিণত বয়সে। সেই বিদেশিনী বধূর শেতাঙ্গিনী কন্যার জীবনেও তাই বোধহয় ভারতীয় সংস্কৃতি, কালচার ও অধ্যাত্মবাদ এবং দয়া ক্ষমা, স্নেহমমতা মাখা বাঙালী নারীর সব লক্ষণগুলির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। দুর্গাদেবী তার গ্রামের সর্বহারা চাষী, জেলে, নাপিত কিংবা অসহায় আত্মীয়স্বজনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁর পুত্র গণপতিও যে কোন লোককে আপন করে নিতে এতোটুকু কুন্ঠাবোধ করতেন না।

তাঁদের মধ্যে দময়ন্তী তাই বড় হয়ে আমেরিকার আধুনিক পশ্চিমী শিক্ষায় মানুষ হয়েও সবাইকে আপনার জন মনে করে ভালবাসবার অসাধারণ ক্ষমতাটি অর্জন করেছিলো।

তাই কলেজ পাশ করার পর সে যখন Peace Crops এ কাজ নেয়, তখন তাকে নেপালে এক অতি নগন্য গ্রামে পাঠানো হয়। পাহাড়ের কোলে “বহিনী হাউসে” পতিতালয় থেকে আগত ছোট ছোট মেয়েদের দেখাশুনো ও শিক্ষা দেওয়ার কাজে সে নিয়ত ছিল।

সেখানে গিয়ে দময়ন্তী সবচেয়ে আগে – নেপালী ভাষা শিখে নেয়। সেই বাড়িতে জল ছিল না। পাহাড়ের নিচে গিয়ে ঝর্ণার জল নিয়ে তাকে জল তুলে আনতে হতো। কোনো Modern Lifestyle, সুযোগ সুবিধা, বিলাস ব্যাসন কিছুই সে সেখানে পেতো না। সবসময় আলো থাকতো না। গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করার জন্য কোনো বন্ধু ছিল না। ওই গ্রাম্য মহিলাদের তাদের ভাষায় জীবনের পাঠ – পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে আনন্দের সঙ্গে কাজ করে যেত সে।

বাবা গণপতি সেনগুপ্তর অকাল মৃত্যু Car Accident এর ঘটনা তাকে অত্যন্ত দূঃখিত করে। কিন্তু ওই মর্মান্তিক আঘাতেও তাকে শান্ত স্নিগ্ধভাবে সবাইকে বোঝাতে দেখা যায়। তার Balanced Nature আত্মীয় বন্ধুদের অভিভূত করে দেয়।

এর পর দময়ন্তী বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে এবং Meditation ও Yoga তেই তার বেশিরভাগ সময় কাটে।

দময়ন্তীর আর এক দিদিমার অনুপ্রেরণা ও প্রভাবও বিশেষভাবে পড়তে দেখা যায়। Late Halen Dancy জীবিকায় শিক্ষিকা ছিলেন – কিন্তু Nature Lover বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি প্রকৃতি প্রেমী এবং Bird’s Watcher ছিলেন। তার বাড়ির আসে-পাশের জঙ্গলে গাছে গাছে পাখিদের অবলোকন করা ও সংখ্যা গণনা করা তাঁর এক বিশেষ কাজ ছিল।

সেই প্রকৃতি প্রেমী আমেরিকার ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বাধীনচেতা সংস্কারমুক্ত উদার মনোভাবের মহিলা। তাঁর অন্যন্ত প্রিয় নাতনি ছিলো দময়ন্তী। মেয়ে এলিজাবেথ ভারতীয় বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করে দুর্গাপুরে এসে সংসার পাতলে, তিনি মেয়েকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেন। অন্যান্য আধুনিক আমেরিকার মায়ের মতন তাকে উপেক্ষা করেননি।

যে দেশে আঠারো বছরের হয়ে গেলে বাবা মা তাদের সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন এবং আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার সাহায্য করতে ইচ্ছুক হন না, সেই দেশের মা হয়ে তিনি কন্যা এলিজাবেথকে কখনো পরিত্যাগ করেননি। জামাই গণপতিকে যেমন স্নেহ ও প্রেমের দ্বারা গ্রহণ করেছিলেন, দুই দেশের সবরকম পার্থক্য ব্যবধান তাকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি। তাই এলিজাবেথের সন্তান প্রসবকালে তিনি নিজের সব কাজ, সুখ-সুবিধা ছেড়ে সুদূর শিকাগো থেকে দুর্গাপুরে এসে তার আমাদের দেশের মায়ের মতন “আঁতুড়ের” ঘরে কন্যাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে চলে আসেন। তাঁর মতন মমতাময়ী, সুকক্ষ, কর্মকুশল মহিলা খুবই কম দেখা গেছে। নাতনি দময়ন্তী তাঁর সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করেছে। মৃত্যুকালে ওই দিদিমা Halen Dancy তাঁর অন্যান্য নাতি-নাতনি থাকা সত্ত্বেও এই স্নেহ সম্পৃক্ত মেয়েকে তাঁর সম্পত্তি দেন করে যান, কারণ তিনি জানতেন ওই উদার মনোভাবের ধার্মিক বুদ্ধপন্থী মেয়েটি তাঁর টাকা পয়সা ভালো কাজেই ব্যয় করবে।

‘দময়ন্তী’ সেই অর্থে সিয়াটলে নব নালন্দা নামে এক অপূর্ব সংস্থা গড়ে তুলেছে, সেখানে যোগা ও মেডিটেশন, বুদ্ধদেবের ধর্ম চর্চার এক সুন্দর মনোগ্রাহী কেন্দ্র তৈরী হয়েছে। তার পরিচালনায় আমেরিকার নব নালন্দা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ – স্থান গড়ে উঠেছে।

হাত টান (Hat Taan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মিসেস ভাটিয়ার পার্টিতে সমবেত ভদ্রমহিলারা একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। এ সব ক্ষেত্রে কয়েকটি ‘টপিক’ খুব কমন থাকে। কার কার স্বামীর প্রমোশন হল বা কার ছেলে মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারিতে চান্স পেল, অথবা কে কত টাকা ডোনেশন দিয়ে পড়াতে পাঠিয়েছেন ছেলেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর নইলে কার ঝি কত টাকা মাইনে নেয়, কত ছুটি করে এসব চর্চা।

আজকেও সে সবের মধ্যে জানা গেল, মিসেস গুপ্ত ট্রান্সফার হয়ে মুম্বাই চলে যাচ্ছেন, অতএব তাঁর অত্যন্ত কর্মপটু maid কমলা কাজ খুঁজছে। মিসেস রায় তো একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ওনার বিহার থেকে আগত কাজের মেয়েটি বাড়ি চলে গেছে, আর আসবার নাম নিচ্ছে না, তাই ‘কমলাকে’ তাঁর চাই-চাই। মিসেস রায়ের বাড়িতে অনেক লোক, বুড়ো শ্বশুর / শাশুড়ি, বাচ্চা, নাতি-নাতনি, ডাক্তার ছেলের বৌদের নিয়ে খুব বড় পরিবার।

বাইরের কাজের – ঝাড়াপোঁছা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজার আলাদা লোক আছে। বাগানের মালি, ড্রাইভার সবাই মিলে বেশ একটা এলাহি ব্যাপার সামলাতে হয় তাঁকে। ভীষণ বিচক্ষণ, স্মার্ট মহিলা, রাঁধুনির কাজে তাই ‘কমলাকে’ বহাল করতে ইচ্ছা। মিসেস গুপ্ত বললেন, – “খুবই ভালো কাজ করে মেয়েটা কিন্তু কিন্তু – – – – – একটু নজর রাখতে হবে আপনাকে কেননা – – – -“

– কেননা কি কোন রোগ টোগ আছে নাকি? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস রায়।

“না না শরীর স্বাস্থ্য খুব ভালো তবে – তবে ‘একটু হাত টান’ আছে, এই আর কি”।

মিসেস শ্রীবাস্তব বলে উঠলেন, – “ও বাবা, এসব চোর ছ্যাচড়দের রাখা কেন? কোনদিন ঘরে লোক ঢুকিয়ে দেবে”।

আর একজনের প্রশ্ন – “তা কি কি নিয়েছে আপনার বাড়ি থেকে?”

– “না না সেরকম বড় কিছুই নয়, তবে ওই গাছের পেঁপে, কলা, সবজির ঝুড়ি থেকে চার পাঁচটা আলু পটল – এইসব নিয়ে নিত। ঘরের জিনিস মানে টাকা পয়সা ইত্যাদিতে হাত দেয়নি অবশ্য”।

মিসেস রায়ের উক্তি – “নিজে একটু সাবধান থাকলে, নজর রাখলেই হ’ল। আজকাল টাকা তো ঘরে রাখি না, সব কেনাকাটা কার্ড দিয়েই করি। আর গয়নাগাটি লকারে। বেগুন, মূলো গুলোও ফ্রিজে চাবি দিয়ে রাখতে হবে। যা রান্না হবে তা গুনে গেথে নিজে বার করে দেবেন”।

মিসেস গুপ্তার উক্তি – “মেয়েটার কাজ বড় পরিষ্কার। আর রান্নাটাও আমি খুব ভাল করে শিখিয়েছি। রেখে দেখুন, আপনার তো সব দিকেই লক্ষ্য”।

শহরের নাম করা উকিল সুজয় রায়ের স্ত্রী এই মিসেস রায়ের নাম – মানসী দেবী। তাঁর বাড়িতেই বহাল করা হল কমলাকে – মাসের ১৫ তারিখেই। সত্যিই মেয়েটির কাজ খুব ভালো। বেশ খুশি মনেই দিন কাটাচ্ছিলেন মানসী দেবী, কিন্তু সব সময় একটু সন্দেহের কাঁটাটা ফুটে থাকতো মনের মধ্যে। ভাবতেন কে জানে কখন কি নিয়ে পালাবে সে। একদিন সন্ধ্যেবেলায় রান্নাবান্না সেরে কমলা বাড়ি যেতে উদ্যত হয়েছে, মানসী দেবী হটাৎ লক্ষ্য করলেন ওঁর কোঁচড়ে কিছু বাঁধা, পেটের কাছে শাড়িটা যেন ফুলে আছে মনে হল। মানসী দেবীর নাতি ১৪ বছরের ছেলে বাইরের ঘরে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়া করছে। বাগানের মালী, গেটের দারোয়ান এবং আরও দুজন কাজের মেয়েও ঘর বাড়ি ধুয়ে মুছে বাড়ি যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। উকিলবাবুর মায়ের জন্য নার্স আছে। সে সেই বৃদ্ধাকে wheel chair -এ করে ঘোরাচ্ছে। হঠাৎ মানসী দেবীর গলার স্বর শোনা গেল। –

“অ্যায় কমলি, দাঁড়া, দাঁড়া বলছি, দেখা কি নিয়ে যাচ্ছিস লুকিয়ে?”

– ‘কিছু তো নয় গিন্নি মা’ – কমলার কাচু মাচু মুখে কথা আটকে গেল।

“নয় মানে? তোর পেটটা ওরকম ফুলে আছে কেন? – বলেই -তার কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। রেগে গেলে তাঁর মাথার ঠিক থাকে না। সামনে, পেছনে কে কোথায় আছে দেখেন না তিনি, মুখের ভাষাও এক মুহুর্ত্তে তাঁর বদলে যায়।

– “হারামজাদী, নচ্ছার মাগী দেখা কি চুরি করে পালানো হচ্ছে, এই কথাগুলি চিৎকার করে বলে সকলের সামনে তার শাড়ির আঁচল ধরে এক টান মারলেন।

কোঁচড়ে বেঁধে রাখা অমূল্য বস্তুটি মাটিতে পরে গেল। অপমানে, লজ্জায় তার চোখে জল এসে গেল। বাড়ির লোকেরা সবাই ঘিরে ধরলো তাকে। মাটিতে পড়া প্লাস্টিকের প্যাকেটটি হাতে করে তুললেন তিনি, – কয়েকটি রুটি মাত্র।

– ঐ শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মহিলা কিন্তু ক্ষান্ত হলেন না। কমলিকে এক ধাক্কা দিয়ে বললেন, –

“তাই ভাবি রোজ রোজ এতক্ষন ধরে কেন রুটি করা হয়। ভাত রুটি মা লক্ষী তাকে গৃহস্থের বাড়ি থেকে সন্ধ্যেবেলায় চুরি করে নিয়ে যেতে লজ্জা করে না তোর?” আজ রুটি, কাল ঘটি বাটি, – তারপর সোনার আংটি, চোর মাগী তোর সাহস তো কম নয়।”

কাপড়টা প্রায় খুলে মাটিতে লুটাচ্ছে, কমলা ভাবছে ধরণী দ্বিধা হও। ওর সঙ্গের কর্মীরা দাঁড়িয়ে মজা দেখছে।

হটাৎ মাষ্টারমশাই বেরিয়ে এলেন বৈঠকখানা থেকে গম্ভীর গলায় বৃদ্ধ শিক্ষকের যেন হুঙ্কার শোনা গেল।

“ম্যাডাম যেতে দিন ওকে। একজন গরিব অসহায় মহিলা কেন দুটো রুটি নিয়ে যেতে চায়, সেটা তো জানতে চাইলেন না ওর কাছে? সবাইকার সামনে এভাবে অপদস্ত করা কি ঠিক?”

গেটে উকিলবাবুর গাড়ি ঢুকলো, তিনি একটু অবাক হয়ে গেলেন বাড়ির দরজায় চাকর বাকরদের ভিড় ও স্ত্রীর রুদ্র মূর্তি দেখে, ভালো একটা ঝামেলার আভাষ পেলেন তিনি।

মানসী দেবী এবার কমলাকে ছেড়ে – মাস্টারমশাইয়ের ওপর বাক্যবাণ শুরু করলেন। “আপনাকে আর কাল থেকে পড়াতে আসতে হবে না। আমার বাড়ির ব্যাপারে ২ টাকার টিউশন টিচারের নাক গলানো আমি একদম পছন্দ করি না, আর বরদাস্তও করব না।”

উকিল বাবু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, – “কি হয়েছে কি বলবে তো তোমরা?”

হটাৎ কমলি বাবুর পায়ের কাছে পড়ে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল। –

“ছেলেটার খুব জ্বর গো বাবু, ঘরে আটা নেই, তাই আমার সকালের জল খাবারের রুটি দুটো আমি না খেয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম।”

মানসী দেবী রগে ফুঁসে উঠলেন, – “তাই বলে তুই চুরি করবি? চেয়ে নিতে পারতিস না? ধরা পড়ে এখন বাবুদের সিম্প্যাথি কারবার চেষ্টা হচ্ছে? বদমাইসি বের করছি তোমার, পাড়ায় আর কারো বাড়িতে যাতে কাজ না পাস, তার জন্যে দেখ আমি কি করতে পারি।”

এবার অপমানিত নিত মাষ্টারমশাই ও লজ্জিত, লাঞ্চিত অসহায় কমলাদিদির মাঝে এসে দাঁড়ালো তাঁদের ১৪ বছরের নাতি ‘সমীরেন্দ্র’।

– “চাইলেই কি তুমি দিতে ঠাম্মা? ওদের বাচ্চাদের খাবার দাও না বলেই তো ওকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে, তাও নিজের ভাগের খাবার। নিজে মুখে না দিয়ে সে – – -“

– “চুপ করো খোকন তুমি। একদম বড়দের মাঝে কথা বলবে না।”

-“ও তো ঠিকই বলছে। বড় হচ্ছে – ওরা ন্যায় অন্যায় বুঝতে শিখেছে। যাও মা, কমলা তুমি বাড়ি যাও।”

সমীর এসে তার রুটির প্যাকেট টা তুলে নিল, রান্না ঘরে গিয়ে নিজের ভাগের চারটে রুটিও ভরে দিল তার মধ্যে। তারপর দাদুর দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে জানালো, –

“কাল থেকে যদি তোমরা কাজের লোকদের ভালো করে খেতে না দাও, ওদের বাচ্চাদের খবর না নাও, অপমান করো, আমিও তাহলে এবাড়ির খাবার খাবো না।”

আর মাষ্টারমশাই কাল থেকে আমি আপনার বাড়িতে পড়তে যাব। যে বাড়িতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আপনাকে নীচু করা হল, সে বাড়িতে কেন আসবেন আপনি? ঠাম্মা কে উপেক্ষা করে এগিয়ে এল সে।

– চলো কমলাদিদি তোমার ছেলেকে দেখে আসি। দাদু আমাকে টাকা দাও ওর ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাস্টারমশাইয়ের চোখে জল এসে গেল। জড়িয়ে ধরলেন তিনি তাঁর ছাত্রকে। – বিবেকানন্দ তো এইরকম বিবেকবান ছেলেদের আত্মবিশ্বাস জাগাতে চেয়েছিলেন।

দাদু একটা ১০০ টাকার নোট বের করে নাতির হাতে দিলেন, আর বললেন, “I am proud of you।”

রূপোর থালা (Rupor Thala)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মলিনাদেবীর ছোট ছেলের বিয়ে, আত্মীয় স্বজনে বাড়ি ভরে গেছে, বিরাট ধুমধাম। কাঠের বড় সিন্দুক থেকে পিতলের সব পুরোনো আমলের পিলসুজ, প্রদীপ, তামার কোষাকুষি বের হয়েছে। সেগুলি তেঁতুল দিয়ে ঘষে মেজে পরিষ্কার করা হচ্ছে। নান্দীমুখ, পৈতে তে ভট্টাচার্য্য মশাই নারায়ণ আনবেন। দশকর্মা ভান্ডার থেকে নানারকম সামগ্রী আনা হয়েছে। আর সেগুলি প্যাকেট খুলে সুন্দর করে থালায় সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘মলিনাদেবীর’ পিসতুতো জা ‘রমাকে’। বাঁকুড়া শহরের পাশেই রাজগ্রাম থেকে যে কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানেই তিনি এসে কোমর কোষে কাজে লেগে যান, বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করে। পৈতের পর আইবুড়ো ভাত, গায়ে হলুদ, বিয়ে এবং বিয়েতে কখন কি দরকার লাগে, সব তাঁর নখদর্পনে। বরণ ডালায় কি কি জিনিষ সাজাতে হবে কতগুলি পান সুপারী লাগবে, পিঁড়ি গুলোয় কেমন নক্সা আঁকা হবে, পুরুতমশাইয়ের কাছে কখন মধু, ঘি, দুধ, দই, গোমূত্র, কলা বা হোমের কাঠ, ইঁট সব গুছিয়ে রাখতে হবে, – এ সব ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী।

মলিনাদেবীর বড় ছেলের ও মেয়ের বিয়েতেও ‘রমা’ এসেই পায়েস রান্না থেকে বিয়ের যাবতীয় খুঁটিনাটি কাজে তাঁকে সাহায্য করেছেন। এই ছোট ছেলের বিয়েটা হয়ে গেলে এখন আর শুভ কাজ নেই তাঁর বাড়িতে। তাই এবার আয়োজন ও আড়ম্বর একটু বেশিই মনে হচ্ছে। মলিনাদেবীর বয়স হয়েছে, শরীরও ভারী হয়ে যাওয়ায় হাঁটু ব্যাথা ইত্যাদিতে কষ্ট পাচ্ছেন। তাই রমাকেই যত ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে। বসে বসে পান খাচ্ছিলেন আর নিজের বোনেদের সঙ্গে গল্প করছিলেন মলিনাদেবী। হঠাৎ মনে হল, আরে বৌমা এলে এ বাড়ির রীতি অনুযায়ী বৌভাতের দিন যে ‘রূপোর থালায়’ খাবার দেওয়া হবে, সেটি তো বের করা হয়নি। কাঠের আলমারিতে তো নেই সেটি, তাহলে কোথায় রেখেছেন, তিনি। ডাকলেন রমাকে।

-“তোমার মনে আছে রমা সেই সাবেকী আমলের রূপোর বড় থালাটার কথা?”

– হ্যাঁ, যেটা মন্টির বিয়ের সময় ‘কোলগেট’ দিয়ে ঘষে নতুনের মতন করে দিয়েছিলাম, আমি? – ওটা তো এই পুজোর বাসনের সঙ্গে তোলা হয়নি, – আপনি আপনার গোদরেজ আলমারীর নীচের তাকে রাখিয়েছিলেন।

– ‘আলমারী তে?’ চলো তো দেখি। সত্যিই কাপড়ের নীচের থেকে বেরিয়ে এল সেই অপূর্ব কারুকার্য খচিত বিরাট বড় সুন্দর থালাটি। খুব খুশি হলেন মলিনা। ওটি হাতে নিয়ে বললেন, “বাঃ রমার স্মরণ শক্তি তো খুব তীক্ষ্ণ। ছয় বছর আগেকার কথা মনে রেখেছে।”

রমা মিষ্টি হাসি হেসে বললেন, “দিন আমাকে ভালো করে চকচকে করে আনি।”

মসৃন সুন্দর ফুলপাতা খোদাই করা ১০০ ভরি রূপোয় বানানো থালাটি হাতে করে মলিনাদেবী প্রতিবারের মতন এবারেও একটু ভাবুক হয়ে পড়লেন।

রমা যদিও এই দুষ্প্রাপ্য অমূল্য থালার ইতিহাস জানেন তবুও আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে মলিনা তাঁকে ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে বললেন –

এটি প্রায় দুশো বছর আগের তৈরী। আমার দিদিমা স্বর্গীয়া রাধারানী দেবীর বিয়েতে বর্ধমানের রাজবাড়ী থেকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। থালায় রাখাছিল আসল সোনার জরির কাজ করা শাড়ী, সিঁদুর কৌটো ও একটি চাবির গোছা। মা একমাত্র কন্যা হওয়ায় সেগুলি তাঁর কাছে আসে এবং মলিনাদেবীর ভাই লন্ডনে পড়তে গিয়ে আর ফেরত না আসায় তাঁর সিন্দুকেই স্থান পায় ঐসব রূপোর বাসন ও অন্যান্য দ্রব্য।

বৌভাতের দিন বিরাট এক শতরঞ্জির ওপর বসলেন বাড়ির মেয়েরা। রূপোর থালায় পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে বৌকে খেতে দেওয়া হল। পায়েস রাঁধলেন অন্য বারের মতন এবারেও রমা কাকীমা।

খাওয়া শেষ হলে বৌমাকে নিয়ে দেওর ননদেরা হাসি মস্করা করছে, ছবি তোলা হচ্ছে নানান কায়দায় এমন সময় বাইরে বেশ বড় বড় দুটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। কেউ একজন ভেতরে এসে চেঁচিয়ে বলে গেল – “ফুলশয্যার তত্ত্ব নিয়ে এসেছে বৌমার বাপের বাড়ি থেকে। সঙ্গে সঙ্গে হৈ হৈ করে ঢুকলো একদল ছেলে মেয়ে ফল ও ফুলের টুকরী নিয়ে। তাদের পেছনে লাইন দিয়ে নানান শৈল্পিক কুশলতায় বানানো অনেক রকমের দ্রব্য সামগ্রী। ট্রে তে করে নমস্কারীর শাড়ী, বরের শার্ট – প্যান্ট, পাঞ্জাবী – পাজামা, শাল ইত্যাদিতে ভরা চোখ ধাঁধানো সব সম্ভার।

মলিনাদেবী মধুকাকুকে ডেকে বললেন – “চাকর বাকরদের ডেকে তাড়াতাড়ি এই শতরঞ্জীটা উঠিয়ে ফেলো। চারজন মিলে ওটি গুটিয়ে নিয়ে আবার সেই কাঠের সিন্দুকে রাখতে নিয়ে গেল। মাটিতে মাছ, ফুল, মিষ্টি ফুলশয্যার তত্ত্বগুলি রেখে কনের বাড়ির লোকেরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলেন।

সন্ধ্যেবেলায় সবাই সাজ গোজ করতে ব্যস্ত মলিনাদেবী রমাকে ডেকে বললেন, – রমা রূপোর থালাটা ধুয়ে নিয়ে এসেছে কি খ্যান্তমনি? তাহলে ওটি এখন ঠাকুরঘরে রেখে ঘরটা চাবি দিয়ে দাও।”

রমা ঠাকুরঘরে রূপোর থালাটির খোঁজ করতে গিয়ে সেটি দেখতে পেলেন না। খ্যান্তমনি ঝি বললেন, – “বৌমনির খাওয়ার পর ওটা ধুয়ে এখানেই তো রেখে দিয়ে গেনু। গেল কোথা”?

রমা এবার ঘাবড়ে গেলেন। পার্টিতে যাওয়া মাথায় উঠলো তাঁর। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে লাগলেন বারান্দায় – যেখানে বাসন মাজা হয় – পুজোর বাসন, তত্ত্বের ট্ৰে, ফুল সব সরিয়ে। কিন্তু কোথাও সেটির চিহ্ন নেই। চাকর বাকরেরা বলছেন – “দেখিনি তো। অতজন লোক তত্ত্ব নিয়ে ঢুকলেন হুড়মুড় করে – আমরা তো বাইরে পালালাম সবাই। কোন বিষয়ে হটাৎ উত্তেজিত হওয়া তাঁর স্বভাব নয়, তাই মনিলাদেবীকে ওই অতিথিদের মধ্যে গিয়ে কিছু না বলে কাজের লোকগুলির কাছে গেলেন। একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। পুরোনো মাসী – খ্যান্তদিদি সবাই মিলে খোঁজা শুরু হল এদিকে ওদিকে – কাপড় চোপড় ফুলের ঝুড়ি খাটের তলা কিন্তু কোথাও তার হদিস মিললো না।

রমাকাকীমা দেখেছেন বৌমার খাওয়ার অনুষ্ঠানের পরে ওটি ধুয়ে আনা হয়েছে এবং এই শতরঞ্চির ওপরে যেখানে মেয়েরা বসে হাসি ঠাট্টা করছিল সেখানে রাখাও ছিল। তারপর হুড়মুড় করে মেয়ের বাড়ির লোকেরা এসে পড়ায় কেউ আর খেয়াল করেননি, রমাও ঠিক তখনিই ঠাকুরঘরে গিয়েছিলেন; ভট্টাচার্য মশাই নিজের থলি, গামছা, দক্ষিণার টাকা সব ভুলে ফেলে যাওয়াতে রমা সেগুলি নিয়ে বৃদ্ধ পন্ডিতমশাইকে দেওয়ার জন্যে ছুটেছিলেন গেটের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলছিলেন পাঁচ মিনিটের জন্যে। পন্ডিতমশাই তাঁর ওপর খুব খুশী। প্রতিবারই রমা এতো সুন্দরভাবে সকলের অজান্তে কারো প্রশংসার অপেক্ষা না করে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে নিষ্ঠা ভরে সাহায্য করেন তা লক্ষ্য করে তিনি তাঁকে মন প্রাণ দিয়ে আশীর্বাদ করেন। আজও তাঁর থলি তুলে দিয়ে রমা দেবী তাঁকে প্রণাম করে ফিরে এলেন ঐ বড় ঘরে, তখন সেখানে বাসনপত্র বা শতরঞ্চি কিছুই ছিল না শুধু ফুল, ফল, মাছ ইত্যাদি – – – –  তাহলে ঐ সাবেকী কালের কারুকার্য খচিত “রূপোর থালাটি” গেল কোথায়? চিন্তা ভাবনায় অস্থির রইলেন তিনি।

বাড়ির সবাই বৌভাতের ভোজের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত। হৈ চৈ আনন্দে নানা কোলাহলে, নাচ, গান, হাসি মস্করায় – আসর জমজমাট। শুধু রমা কাকীমা, খ্যান্তমাসী, বাসন মাজার বাউরী বৌ সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সেই রূপোর থালাটি।

পরের দিন সকালে কথাটা কানে গেল মলিনাদেবীর। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুললেন তিনি। সব চাকর বাকর এবং আত্মীয় স্বজন তটস্থ। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে সেই পুরোনো আমলের অমূল্য থালা। নতুন বউও ঘাবড়ে গিয়ে একদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। খ্যান্তমাসী তার ঘরে ঢুকে এবার ফুলের মালা সাজানো খাটের চারপাশে ঘুরে এলেন একবার যদি কেউ নিয়ে গিয়ে থাকে।

বাউরী বৌ কাঁদতে লাগল। রমাকাকীমা বললেন, ‘তুই কেঁদে মরছিস কেন? তোকে তো আমি এইখানে এনে রাখতে দেখেছি। তারপর তত্ত্ব এলো – – -‘।

একজন আত্মীয়া বলে উঠলেন যে ছোঁড়া গুলো ফুলের টুকরী, মাছ, ফলের ঝুড়ি এনেছিল তাদের কারো কাজ হতে পারে।

“ওরা সবাই তো বৌমার ভাই, বোন, বন্ধু ছিল। তারা তো ঐ সব জিনিষগুলি রাখার পর গিন্নিমা ওদের ড্রয়িং রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন, মিষ্টি, শরবত খাওয়ানো হল। যাওয়ার সময় সবাই তো খালি হাতেই চলে গেল”। – বললেন মধু কাকা, তিনি ওদের আপ্যায়নে নিযুক্ত ছিলেন।

“তাহলে কি অতবড় থালাটা কর্পূরের মতন উবে যাবে”? গিন্নিমার ধ্যৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। হটাৎ বললেন – মধু তুমি যাও তো পন্ডিতমশাইয়ের বাড়ি, যদি ওনার সঙ্গে চলে গেছে।

রমা কাকীমা বললেন – “না না ওনার কাছে যেও না, উনি তো নিজের গামছা ধুতি ফল গুলোও না নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, আমিই তো ওনার থলেটা গেটে গিয়ে ওনার হাতে ধরালাম”।

মলিনাদেবী বললেন – “তুমি চুপকর রমা, যাক মধু একবার ওনার বাড়ি, বুড়োমানুষের ভীমরতি ধরতে পারে, সকালেও তো একবার বাড়ি গিয়েছিলেন”।

মধু কাকা তখুনি গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন, ভট্টাচার্য্য মশাইয়ের বাড়ি।

পন্ডিতমশাই খুব শান্ত জ্ঞানী মানুষ। তিনি শুধু বললেন, – “সেকি কথা, ওটা তো শতরঞ্চি ওপরেই রাখা ছিল, কোথায় হারালো”?

– ভট্টাচার্য্য মশাইয়ের মুখরা স্ত্রী কিন্তু চুপ করে ঐ অপমানটা হজম করলেন না। তিনি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, – “পন্ডিতমশাইয়ের বাড়ি রূপোর থালা খুঁজতে এসেছেন? এতো বড় আস্পর্দ্ধা আপনাদের। বড় লোক বলে নিজেদের কি মনে করেন আপনারা? একজন সৎ ব্রাহ্মণ পূজারীকে এইভাবে অসম্মান করলেন, আর কোনোদিন কোন কাজে ওনাকে ডাকতে আসবেন না। অভদ্র ছোটোলোক সব”।

মধু কাকাও বুঝলেন মলিনা বৌদির কথায় এরকমভাবে চলে আসা তাঁর উচিত হয়নি।

আশ্চর্য্য রূপোর থালা হাওয়া। হটাৎ রমা কাকীমার দিকে নজর পড়ল ধনী বড় যা মলিনাদেবীর। যে ঘরে রমাদেবী নিজের স্যুটকেসটি রেখেছিলেন সেখানে ঢুকে ঐদিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর পেছনে পেছনে বাড়ি সুদ্ধ লোক। বললেন – “রমা স্যুটকেসটা খোলো তো একবার”।

রমা কাকীমা একেবারে হতভম্ব। তাঁকে যে কেউ সন্দেহ করতে পারে এ কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না তিনি। অঞ্চল থেকে স্যুটকেসের চাবিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে হন হন করে। মলিনাদেবী সেদিকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে খুললেন সেই স্যুটকেস। কাপড়-জামা সামান্য ছিল। ব্লাউজ, নিচের জামা, গায়ের চাদর সব ঘাঁটতে লাগলেন তিনি। রমা কাকীমা ততক্ষনে নিজের পরনের কাপড়টা একটু ঠিকঠাক করে, পায়ে চপ্পল গলিয়ে একেবারে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। পেছনে কে বা কারা তাকে ডাকছে সে দিকে কান না দিয়ে একটা অটো রিকশায় চেপে বসেছেন। লজ্জা, ঘেন্নায় বা রাগে দুঃখে নয় অদ্ভুত একটা জ্বালায় তাঁর সারা শরীর জ্বলছে। আর কোনদিন তিনি যে আগ্রহ করে বিয়ের কাজ করতে যাবেন না – সে বিষয়ে যেমন প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হ’ল, তাঁর মনে তেমনি অভিমান হল ভগবানের ওপর। “ঠাকুর কী বিচার তোমার? যে তোমাকে ভালোবাসে বিয়ে, পৈতেতে মানুষের বাড়ি গিয়ে সাহায্য করে, শুভকার্য্যে পন্ডিতমশাইয়ের হাতে হাতে তোমার পূজোর ফুল সামগ্রী অর্চনার বস্তু এগিয়ে দিয়ে আনন্দ লাভ করে, তাঁকে আজ সবাইকার সামনে তুমি এতো ছোট করলে”! চোখ দিয়ে জল নয় যেন আগুন বেরুতে লাগল।

প্রায় দশ বছর পরে মলিনাদেবীর স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে আবার আত্মীয় স্বজনেরা উপস্থিত হয়েছেন সেই বাড়িতে। রমা দেবী, মধু কাকা ও পুরোনো ভট্টাচার্য্য মশাই সেখানে নেই। কাঠের সিন্দুক খুলে আবার তামা পিতলের বাসন বেরুলো এবং সেই শতরঞ্জিটি যা এই দশ বছর ধরে গোটানো ছিল সেটিকে খুলে ধুলো ঝেড়ে আবার পাতবার নির্দেশ দেওয়া হল। আর তখনি অবাক হয়ে সবাই দেখলো তারমধ্যে সেই রূপোর থালাটি এতদিন লুকিয়ে ছিল।

ফুলশয্যের তত্ত্ব আসায় না দেখে চাকর বাকরেরা ঐ শতরঞ্জিটি গোটানোর সময় “থালাটিও” ওর মধ্যে ঢুকে যায়।

“রূপোর থালা” খুঁজে পাওয়ার আনন্দে নাকি রমার মতন ভালো বোনকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলার জন্যে জানেন না – অনুশোচনায়, দুঃখে মলিনাদেবী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সবাই ভাবলো স্বামীর শোকে বোধহয় কাঁদছেন তিনি।