সংবাদ – সমীক্ষা ও একটি আবেদন (Shongbaad – Shomikkha O Ekti Abedon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথাও জ্বলছে ভয়ঙ্কর আগুন,
কেমন করে লাগলো কে জানে!
কেউ কেউ বলে ধরা পড়েছে, তত্ত্ব-বিজ্ঞানে,
ধ্বংস হলো কত বিশাল অরণ্য।
পশুপক্ষী, কীট, পতঙ্গ, নিরীহ প্রাণী
ও শ্যামল সবুজ বনানী
যারা ছিল অসহায় ও বন্য -
পুড়ে ছারখার হল, পৃথিবীর উষ্ণায়নে।
কোয়ালা, ক্যাঙ্গারুদের বিচিত্র দেশ
অস্ট্রেলিয়া একেবারে হয়ে গেল, পশু শূন্য।
আবার তারপরেই এল প্রবল বৃষ্টি -
বাড়ি, ঘর, শস্য, প্রান্তর সব ভেসে গেল বানে।
আবার ওদিকে ফিলিপাইনের গিরি -
পর্বতের মুখ গহবর গেল খুলে,
শুরু হল হঠাৎ ভীষণ অগ্নুৎপাত।
লোকজন পালাবার পথ পেল না,
ধরণীর বুক চিরে, তপ্ত লাভা-সুপ্তি ভেঙে উঠল জেগে।
গলিত ধাতব ফোয়ারা ছুটল, ভীষণ তীব্র বেগে।
শহর, নগর, জমি উর্বর ভস্য কামান দেগে,
আকাশ বাতাসকে ধূলি ধূসরিত করে দিল,
পরিবেশ বিষাক্ত হল, প্রদূষণের ছোঁয়া লেগে।
মনে হল, প্রকৃতি মা গেছেন যেন
ভীষণ রকম রেগে।
আর আগ্নেয়গিরির কালো জল ধরণীকে
কলুষিত করল সেই ক্রোধের আবেগে।
ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, সুনামি, ঢেউ এসে,
বারে বারে এই রকম ভাবে
এ বারে জগতের ফুসফুস -
"অ্যামাজন" -
যে এতদিন ধরে করে চলেছিল -
অক্সিজেন সরবরাহ আমাদের কে 
নৃসংশ ভাবে কেটে কেটে শেষে,
বৃক্ষ শূন্য করে দিল মানুষ।
ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে নিজেরা
দহন করল বিশাল বিশাল গাছ,
কেননা, সেখানে তারা নগর বানাবে।
নির্বোধের দল শুধু স্বার্থকে ভালোবেসে
চারিদিকে শুধু নিজেদের আস্তানা বানায় -
নিজের সুখের আশে।
পাহাড় কেটে, পাথর এনে, সৌধ বানায়,
মনের উল্লাসে।
নদীর গতি বদলে দেয়, বাঁধ বেঁধে দিয়ে
কত স্রোত ক্ষীণ হয়ে আসে।
জগৎ বাসীর বুক ভরে যায়
রাসায়নিক বিষাক্ত সব গ্যাসে।
বিশ্বসংবাদ পাতায় পাতায় ছাপে,
এমনতর খবর প্রত্যহ,
মুখরোচক করে গল্প শোনায়
নানান ছবি সহ।
কিন্তু আজ আর শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়
কিম্বা মরণের কথা নয়,
সে সবই তো ঈশ্বরের মার,
মানুষ বহন করে চলেছে সেই সব ভার।
সে জানে যতই বাড়ায় ভয়, তবুও 
প্রকৃতি আপনা থেকেই আবার
শান্ত হয়।
নিজের আবর্তনে, বিবর্তনে জলে আগুনে 
খেলা চলে, আসে পরিবর্তন,
আসে প্রলয়, বিনাশ ও ক্ষয়।
কিন্তু তারপরেই সে দেখায় তার নতুন রূপ।
ধারণ করে নব কলেবর,
মানুষের কাছে দেয় নতুন পরিচয়।
সমুদ্রের নিচে থেকে এমনি করেই 
একদিন উঠে আসে হিমালয়।
আবার বৃহৎ কোন অরণ্য 
সাগরে তলিয়ে বিলীন হয়ে যায়।
তাই - আজ
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান মানবজাতি,
তোমার প্রতি এই আবেদন -
এই সতর্কবাণী সোচ্চারিত হয়,
শুধু তোমারই বাঁচার অধিকার নেই এখানে।
অন্য প্রাণীকেও ভালোবেসে,
স্বাচ্ছন্দে জায়গা ছেড়ে দিতে কয়।
মানব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে,
একে অপরকে সহ্য করে -
আনন্দে, সহাবস্থানে দাও আশ্বাস
ও অভয়,
আমরা জানি, 'যে সয় সে রয়'
তাই আজ আর অহংকার ও
ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
জাগুক নতুন অনুভব -
হিংস্র দানবিকতার
হোক চরম পরাজয়।
এবার এসেছে সময়।
আমাদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে 
করো আত্ম বিশ্লেষণ -
হৃদয়ে করো অপরিমেয়
শক্তির সঞ্চয়।
প্রত্যেক নর নারীর মনে হোক সঞ্চার -
গভীর মমত্ব বোধ ও দয়ার।
পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকে রক্ষা করবার 
নিক সে অঙ্গীকার।
প্রতিদিনই তো কতভাবে শুনতে পায় সে
মৃত্যুর হাতছানি,
তাহলে প্রকৃতিকে সবুজ শূন্য করে 
কেন ডেকে আনতে চায় এই
সুন্দর গ্রহের বিনাশ?
তার জীবনে হোক, প্রকাশ
নতুন এক আশার। শুরু হোক,
সবচেয়ে প্রথমে, 'বৃক্ষ রোপন অভিযান'।
মাটির নিচে থেকে উঠে আসুক -
রবিঠাকুরের বর্ণিত - সেই প্রবল প্রাণ।
ধূলিরে ধন্য করে সে মরু বিজয়ের
ওড়াক কেতন।
পৃথিবীর হাওয়া, জল, মাটি হোক শুদ্ধ
আর মানুষের মন কোমল
পবিত্র ও সুমহান,
শোনো শোনো মানব, আকাশে বাতাসে সেই 
আহ্বান - গান।

নববর্ষ (Noboborsho)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দরজা খোলো, তোমার দ্বারে, নতুন বছর এসে,
দিচ্ছে উঁকি, বাগান ধারে, বারান্দা কার্নিশে।
কাজের বোঝা ফেলে এবার, বোস না জানলা পাশে,
অনেক কথা শুনতে পাবি, নীরব অবকাশে।
সারা জগৎ কাঁপছে এখন, চিন্তা, ভয়ে, ত্রাসে,
বন্দি দশায় মন বিহঙ্গ, উড়িয়ে দে আকাশে।
 
অন্যরূপে বর্ষা এলো, মহামারীর সাজে -
ধনী নির্ধন দুষ্টু ভালো, সাধক ফকির মাঝে।
বিমর্ষভাব ছেয়ে গেল, মন লাগে না কাজে,
ধর্মগুরু মুখ লুকালেন, দেন না জবাব লাজে।
কেমন ধারা "নতুন" বরণ দিশাহীন এ সমাজে!
মৃত্যু শঙ্কা, বাজায় ডঙ্কা, দামামা কার বাজে?
 
তাইতো আমার জাগছে না, আর হর্ষ দিনে রাতে,
কে যেন ভাই চাইছে সকল আসক্তি ভোলাতে,
বসে আছি তুচ্ছ সুখের আকর্ষণ কাটাতে, -
"আশা" এবং "উৎসাহ" কে ধরেছি দুই হাতে,-
মানব জীবন বড় অমূল্য, সেই কথা জানাতে।
দুঃসহ এই দুঃসময়টি কাটাই শুধু প্রার্থনাতে।

উই পোকা (Ui Poka)

চন্দনা সেনগুপ্ত

উই পোকা, পোকাদের মধ্যে যেন
ধবধবে শ্বেতাঙ্গ সাহেব।
খুবই ক্ষুদ্র, খুবই লাজুক।
লুকিয়ে থাকে ভিজে কাঠে।
কী ভাবে কখন যে ওদের
শারীরিক মিলন ঘটে
কেউ টের পায় না।
কিন্তু হাজার হাজার ডিম
অণুপরমাণুর মতন, খালি চোখে
দেখাই যায় না তাদের।
তারপর লক্ষ্ লক্ষ্ জীর্ণ শীর্ণ
মোটা তাজা, ব্যাঁকা সোজা
পোকার দল জন্ম নেয়।
তারা ক্ষুদার্ত থাকে সর্বদা।
কাঠের গুঁড়ো থেকে
শুকনো গাছের লুকিয়ে থাকা
জমিয়ে রাখা প্রোটিন ভিটামিন
পুষ্ট করে তাদের।
উইপোকারা বংশ বিস্তার করে
নিশ্চিন্তে।
ধীরে ধীরে বুদ্ধি বেড়ে যায় ওদের।
হজম শক্তির সঙ্গে সঙ্গে
ধী শক্তিও বৃদ্ধি পায়,
তাদের প্রাণ আছে,
আর প্রাণ থাকলেই
মন ও মান দুই এসে যায়।
উইপোকারা অগ্রসর হয় -
জ্ঞানের খোঁজে।
মা-বাবা শিক্ষক-শিক্ষিকা -
অধ্যাপক পোকারা
দল দল ছাত্র নিয়ে
ঢুকে পড়ে বইয়ের
আলমারিতে।
সেখানে থরে থরে সাজানো -
কত জ্ঞানী গুণী লেখক
লেখিকা প্রবন্ধাকারের -
জীবন নিঙড়ানো বাণী
এক এক তাকে তারা আশ্রয় নেয়।
'রবীন্দ্রনাথের' রচনাবলীর মধ্যে
প্রবেশ করে শুনতে পায়
মধুর গানের সুর।
বড় শব্দকোষের অর্থ কেটে কুটে
হজম করে তারা সবাই,
চালায় তাদের পেটে।
'বিবেকানন্দ বাণী' গুলোর
নির্যাস নেয় চেটে -
'কথামৃতের' আসল রসের
সন্ধান পায় খেটে।
যাদের বাড়ির মানুষগুলো
পড়ে না আর বই,
সাজিয়ে রাখে থরে থরে
তাদের মাথা কেটে -
'উইপোকারা' আনন্দ পায়
অজানাকে ঘেটে।
ইংরেজি বা সংস্কৃত পুস্তক সব ছেঁটে -
শ্রেষ্ঠ পোকার মর্যাদা পায়
অক্ষরদের বেঁটে।
"গীনিজ বুকে" করল রেকর্ড তারা
দেখতে পাবে গুগল সার্চে নেটে
উইপোকাদের মিছিল করে চলা,
কেমন করে বেড়াই তারা হেঁটে।

পউশি গ্রামের অনাথাশ্রমে (Poushee Gramer Onathashrome)

দেখে এলেম, পউশী গ্রাম,
রসুল নদীর ধার।
“অনাথ শিশুর” আনন্দ ধাম,
সবুজ ক্ষেতের পার।

সাগর হাওয়া হয় উদ্দাম _
নারিকেলের সারে।

শিশুর তানে মুখর গৃহ -
ছোট্ট  পুকুর পাড়ে।

থাকেন, সেথা “শ্রী বলরাম”
বিশাল পরিবারে -
কাজ করে যান, রোজ অবিরাম,
"অন্তদদ্বয়ে ” তরে।

পাঠশালা এক উঠল গড়ে
আঙিনারি পরে।
“আশ্রমিকের' বাড়ে সুনাম -
দারিদ্র্যে না হারে।

'শিক্ষকেরা' তরুণ সুঠাম
ছাত্র-ছাত্রী পড়ে।
পারিশ্রমিক পান না ভালো
“সস্তোষে' মন ভরে।

গ্রামবাসীদের প্রধান ধরম,
অন্ন যে দান করে
তাদের স্নেহের দাক্ষিণ্যে
শিশুর ক্ষধা হরে।

ছোট্ট ছোট্র শিশুরা সব
আনন্দ গান ধরে -
সতা পথে চলার মন্ত্রে -
জীবন ধন্য করে।

পরিশ্রমের সুফল ফলে,
শান্তি আসে ঘরে -
স্নেহ প্রেমে ভরা গ্রামে
“ঈশের” আশীষ ঝরে।।