ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেই যে দুজন, কে জানে কখন - !
বিষ বৃক্ষের ফল খেয়ে, -
প্রণয় করতে শিখেছিল - তাদের আমার প্রণাম।
ওই 'আদম - ইভের' ভ্যালেন্টাইন পর্বটি না
থাকলে তো আমরা জানতামই না।
পেতাম কি এই সুন্দর জগতে
এমন অপূর্ব জীবনের দাম?

প্রেম, প্রতীক্ষা - প্রত্যাখ্যান বা মিলন।
যুগ যুগ ধরে - মুগ্ধ - স্নিগ্ধ - ধন্য
করে রোমান্টিক ভুবন।
কবি কালিদাস-এর কাব্যে, আমাদের 
শাস্ত্রে পূরণে - কামদেব মদনের
আগমনে, মানব-মানবীর মনে
তুলেছে আলোড়ন।

রাধা - কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী -
অভিসার - বিরহ - এসবই তো 
বৈষ্ণব পদাবলীর - ছন্দে বদ্ধ,
পূর্ব যুগের ভ্যালেন্টাইন।
কথাটা হয়তো একসময় তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে
রোমান অক্ষরে লেখা হত,
কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর প্রতি ভাষায় -
বনে, কোনে, মনে -
তার মানে 'গোপন প্রেমবন্ধন'।
যীশুখৃষ্টের ধর্ম প্রচারক -
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কে
নিয়ে সূত্রপাত এই উৎসবের।

ধর্ম বিদ্ধেষী সম্প্রদায়ের কারাগারে 
বন্দী ছিলেন সেই সজ্জন -
মুখ বুজে সহ্য - করে চলেছিলেন
অকথ্য নির্যাতন, 
ঠিক তখন -
তাঁর হৃদয় মুকুরে উদ্ভাসিত এক মুখ 
জেলার কন্যার আবেগাপ্লুত -
দুই নয়ন, -
তাঁকে বারে বারে চঞ্চল করে,
তিনি কী যেন ভাবতে থাকেন, -
সারাক্ষণ, তারপর সুযোগ বুঝে 
তাঁর সেই বান্ধবীকে করেন
পত্র প্রেরণ।
কেউ জানে না কী লেখা ছিল তাতে।
কিন্তু সেই কারনে 
করতে হল তাঁকে মৃত্যু বরণ।
তারপর থেকেই 'শহীদ সাধুর' নাম
তরুণ তরুণীর দল
স্মরণীয় করে দিলেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ শতাব্দী থেকে শুরু হল
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে
নতুনভাবে প্রণয় নিবেদন।

সবাই জানে লুকিয়ে প্রেম করার মধ্যে
আছে এক শিহরণ।
তার ওপরে সব দেশেই যখনই হয় -
'বসন্তের' আগমন -
ফুলে ফুলে অলি করে পরাগ মিলন, -
পাখীরা খুঁজে বেড়ায়, তাদের প্রিয় সাথীকে,
বেড়ে যায় তাদের কলকাকলী
মধুর কুজন -
এই ঋতু বরফ গলা জলে তোলে তখন,
মৃদু হিল্লোল, হাওয়ায়,
সঙ্গীতের মূর্ছনা - চিরকালীন প্রেমিক -
প্রেমিকা করে আবাহন তীরবিদ্ধ পাখীটিকে।
গান গায় - কবির 
সুরে "প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো
দোঁহারে -
বাঁধন খুলে দাও - দাও দাও দাও" -
নতুন যুগে নতুন ভাবে এ যুগের
যুবক যুবতী ফুলের তোড়া উপহার 
নিয়ে এগিয়ে যায়। করে
প্রেম নিবেদন, -
ধন্য হয় সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের 
নির্বাসন ও আত্ম বিসর্জন।

প্রত্যয়

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথায় পাবো সেই ছায়াহীন 
আলোকবর্তিকা অন্ধকারে -
ভাবছি, আর ভাসছি মোরা -
মূল্যবোধ অবক্ষয়ের সাগরে।
নিশ্চুপ আর নিস্তব্ধ থাকার মানে 
কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহবস্থান নয়।
'চরম সত্য' কি সর্বদায় বরফের মতন
কঠিন শীতল ও স্নিগ্ধ হয় ?
আমরা এখন এমন এক দেশে বাস
করি যা অখণ্ড হলেও
অসম্পূর্ন।
ভঙ্গুর না হলেও আসলে এই দেশ 
বিচ্ছিন্নতা ভেদাভেদের 
শিকার। তাই অসমাপ্ত।
আমি এক কালো শীর্ণকায় তরুণী,
উন্নত আমেরিকার নতুন প্রজন্ম।
আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল,
দাস, (ক্রীত - দাস) প্রথায় -
বিভ্রান্ত ও উৎপীড়িত - অত্যাচারিত।
কিন্তু এখনও এতদিন এ 
দেশের সেবা করেও আমাদের প্রাণে 
জাগে বড় সংশয়।
বর্ণ - বৈষম্যের গ্লানি, আমাদের এখনও 
বিচলিত করে, মনে জাগায় ভয়।
এই বছরের ৬ই জানুয়ারীর 
ইচ্ছাকৃত হানাহানি, নির্লজ্ব -
নির্যাতন আমাদের মনে তুলেছে 
আলোড়ন।
কে করবে এই অযাচিত অবাঞ্ছিত 
বৈষম্যের লয়।
নতুন নেতার আগমনের অপেক্ষায়
দিন গুনছি আমরা।
চুপ থাকার মানে মেনে নেওয়া নয়।
একদিন আনবই মোরা জয়।
হয়েছে 'প্রত্যয়'।

ওই সায়াহ্নে ( Oi Sayanhe )

চন্দনা সেনগুপ্ত

গামছা নিঙড়ানোর মতন করে
আমার শৈশব, যৌবন ও 
বার্ধক্যকে দুমড়ে, মুচড়ে দেখতে
পেলাম নতুন রঙের জল।
জমাট বাদল কেটে জীবন হল সরল,
মিষ্টি তেঁতো ভালোবাসার স্বাদ হল 
তরল।  পুরাতন -
অভিজ্ঞতায় সিক্ত সময় মনে এনে
দিল বল।
ভবিষ্যতের টান নেই, তাই
অন্তিম অধ্যায়ে সূর্যাস্তে সেই
ফিরে যাওয়ার পথটি অনুজ্জ্বল,
সন্ধ্যা তারার মতন আকাশে 
ফিকে হয়ে আসা রঙ
জীবনকে স্নিগ্ধ করে। এ এক 
নতুন ঢং।
সায়াহ্নের আলো বড় পবিত্র নির্মল।
কাজ শেষ; ফিরে যেতে মন হল চঞ্চল।

বাগানের মালী (Baganer Mali)

চন্দনা সেনগুপ্ত

গাছের চারা লাগাই আমি বড় বাবুদের বাগানে।
ছোট ছোট গাছগুলির জন্যে সবচেয়ে আগে, সেখানে 
তৈরী করি মাটি, ঝরঝরে উর্ব্বর।
পরিবেশ ভাল না পেলে অঙ্কুর কি বেরোতে পারে!
ওরা বাড়তে পরে সর সর
তারপর খাদ্য সার দেওয়া,
সময়মত গোড়ায় জল ঢালা।   
আশে পাশের আগাছা তুলে ফেলে
তাদের বড় করার পালা।
বাঁশের বেড়া লাগিয়ে ঘিরে দিই তাদের
নইলে ছাগলে খাবে মুড়িয়ে, -
গরু মোষে দেবে পাড়িয়ে।
সবুজ সবুজ নরম কোমল পাতা
ছোট ছোট পাখিদের ভীষণ প্রিয় জানি।
তাদের থেকেও তো বাঁচাতে হবে, ওদের কচি কচি মুখ খানি,
কাগজের টুপি পরিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখি,
বসে থাকি ঠায়, খুঁজি উপায়, তাড়াই পাখি।
ধীরে ধীরে তারা বড় হয়ে যায়,
যখন দোলে একটু বেশি হাওয়ায়, -
তখন কাঠি পুঁতে দিই, সোজা রাখতে।
 রোদের তাপে মুরঝে যায় যদি, দিই না তাপ লাগাতে,
পোকা লাগলে ভয় লাগে, ওষুধ দিই,
যদি বাঁচাতে না পারি, - মায়ার অন্জন মাখি,
সারাক্ষণ ওদেরকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি।
অনেক ধৈর্য্য ও যত্ন লাগে, গাছগুলিকে
বড় করতে করতে, মাস থেকে বছর ঘুরে যায়। তারপর সেথায়,
কলি ধরে বুঝি, ফুল ফুটতে আর নেই বাকি।
প্রজাপতির রঙে, মৌমাছিদের ঢঙে,
ভোমরার গুনগুন গানে ও সৌরভে
বাগানটি যেন খিল খিল করে হেসে ওঠে।
আমি মনে মনে আনন্দের
আল্পনা আঁকি।
 
ঠিক এমনি করে পরের বাড়ির
কচি কাচাদের দেখাশোনা করেন, -
পদ্ম, লতা, কমলা, মঙ্গলা ঝি’দের দল।
মা বাবারা তাদের ব্যস্ত ভীষণ,
পড়াশোনায় বড় বড় কঠিন কাজে,
অর্থ উপার্জন। দিনরাত তারা বাইরে থাকেন,
ঘরে এলেও কানে 'ডাক' শোনে,
ফোন আসে, অফিসের সারাক্ষণ।
কাজের মাসি, দিদি, পিসি এঁরাই তাঁদের সহায়।
যত্ন করে বুকে ধরে করেন শিশু পালন।
মনে থাকে না, নিজের বাড়ির কথা, -
ভুলে যেতে থাকেন, স্বামী হারানোর ব্যথা।
কেউ কেউ আবার বিয়ে করার চিন্তা
মনেও আনে না কখনও।
গ্রামে টাকা পাঠানো, পিতৃহারা ভাইবোন
মায়ের কর্তব্য পুরো করতে তাঁর,
বিদেশে আগমন।
বাগানের ঐ মালীর মতন করে - আগলে
রাখেন, বড় করে দেন ঐ
বড়লোকের আদুরে, চঞ্চল, অভিমানী বাচ্চাদের।
কোন অভিযোগ নেই কারো প্রতি,
নেই কোনো অনুযোগ।
রোজগারের টাকা নিয়েও করেন না ভোগ।
শুধু ওরা বড় হয়ে যখন সম্মান দেয়, বলে -
আমায় উনি মানুষ করেছেন, - আনন্দে আবেগে
চোখের জলে ভাসেন, তখন।

বিবাহ বার্ষিকী (Bibaho Barshiki)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দিনের সূর্য প্রদীপ্ত, রাতের তারারা
করে ঝিকিমিকি।
"ঊনপঞ্চাশ"(৪৯) টি বৎসর হল পার, -
তোমাদের জীবন আধার চমৎকার,
মন হল বিস্মিত, উঠিলো চমকি !
এ কী !
এখনও পৃথিবীর প্রতি এতো মায়া -
এতো টান, অকারণ আকর্ষণ,
এখনও যখন তখন দপ দপ করে,
জ্বলে আর নেবে আলেয়া -
হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকারে দেখতে পাও -
"ইচ্ছে-জোনাকি"।
স্বামীর স্নেহ, - সন্তানের শ্রদ্ধা -
বন্ধু স্বজনের ভালোবাসায়
বড় মোহময় - স্নিগ্ধ বাতাবরণ, -
আকাশ, বাতাস, ফুল, পাখী -
নিকট দূরের বন্ধু স্বজন সবাই করে -
ডাকাডাকি।
কোথাও নেই,- অসম্পূর্ণতা অতৃপ্তি,
সবই তো সুন্দর।
মায়ার জগতে তারা আজ কেমন - শক্ত হাতে
রয়েছে আঁকড়ি, আমরাও -
আকুল আবেগে যে যেমন তাকে, -
সব প্রতিবেশী - ছদ্মবেশী -
আসল, নকল - প্রত্যেক মানুষকেই
আপন করে ধরে - থাকি।
তবুও সব কিছুর মাঝে কি যেন
ব্যাথা বাজে !
প্রিয়জন হারানোর দুঃখ জমাট করে
ওরে, জমিয়ে রাখি -
চিন চিন করে বেদনার তারে, বারেবারে -
মৃদু ঝংকারে কে গান ধরে -?
টন-টনে কষ্ট হৃদয়ের তলা থেকে উঠে আসে
ঠিক বুকের মাঝে -
কান্নার বাঁধ এবার অকস্মাৎ -
ভাঙবে নাকি !
হতাশার পরশ, বার্ধক্যের অলস অবশ -
ভাবের ছোয়ায় - অন্তরে বিষাদ ভরে,
বিদায় - বিচ্ছেদের প্রস্তুতি চলে, -
সন্ধ্যার মেঘমালা দলে দলে -
দিগন্তে যায় ঢলে, -
বিয়ের পরদিনে - কনে শ্বশুরবাড়ি
যাবার সময় যেমন পিছন পানে চেয়ে -
একবার থমকে দাঁড়ায় - সুর শুনে -
সানাই এ ঠিক সেই মোচড় দেওয়া
ধূন টা বাজলো কি?
কি জানি কেন এখনও -
চাওয়া পাওয়ার দোলনা দোলায় -
প্রাণ কেন যে নিত্য ভোলায় !
একটুখানি মিষ্টি কথায়,
একটুখানি স্নিগ্ধ চোখের চাওয়ায় -
হই - সুখী।
অল্পেতে মন বিগলিত, -
আবেগের বশে বসে বসে - স্মৃতির পর্দা যবে তুলি,
দেখি কত পরিচিত মুখ - দেয় উঁকি।
প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, -
দুইটি তরুণ তরুণী -
বসেছিল একাসনে, সাজানো সিংহাসনে,
সুসজ্জিত গৃহের আঙ্গনে তুলেছিল আলোড়ন,
এঁকেছিল স্বপ্নের আল্পনা
নানা রঙের কত আঁকি বুকি।
তাদের একত্রে বেঁধেছিল এক দৃঢ় বন্ধনে, -
উল্লসিত নতুন জীবনে।
তারপর থেকে প্রতিবার আসে -
আনন্দ অভিলাষে -
বিবাহ-বার্ষিকী। -
জানাতে চায় কতটা অটুট তাদের প্রেম।
বোঝাতে চায়, - 'নদীর স্রোতের প্রায়
সময় চলিয়া যায়' -
কেন করো এখনও হায়।
খুনসুটি, ঝগড়া বিরোধ কোষাকোষি
চেঁচামেচি, হাঁকাহাঁকি?
এতোদিন যখন সহ্য করে নিলে
একে অপরের দোষ ত্রুটি -
ছেড়ে দাও এবার সকল মান-অপমান
ছলনা - অভিমানের নকল -
মিথ্যে বুজরুকি।
অপার শান্তিতে কেটে যাক - আরও ক'টা দিন।
এ জীবনে যতটুকু রস আছে -
এখনও বাকি, -
আস্বাদন করে নাও, নিজেদের
দিও নাকো ফাঁকি।
এসো এখন শুধু - ঈশ্বরকে একসঙ্গে স্মরণ করি -
দুজন দুজনের হাত ধরি - প্রভু কে ডাকি, -
"আমারে তুমি অশেষ করেছো" - এ কথা জানিয়ে
জীবন - দেবতাকে যেন নমন করতে থাকি।

পদস্খলন (Padoskholon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমাদের সবার পা সরে গেল, মাটির তলা থেকে।
'নরসিংহের' কোলে বসে, তোমায় যাচ্ছি ডেকে।
জলে, স্থলে, পাতালে নয়, ধ্বংস তোমার হাতে,
নিপাৎ করতে হুকুম সে দেয়, সকাল, সন্ধ্যা, রাতে।
কার যে কখন আসবে শমন, কেউ জানি না তাহা,
প্রথম প্রথম হাহাকার তার শুনতে পেতাম, - আহা!
ধীরে ধীরে নিত্য খবর কে কার তরে কাঁদে?
পরিবারে কে কাহারে রাখতে পারবে বেঁধে?
ওর বাড়িতে বাবা গেলেন, পাশের বাড়ির দিদি,
ছোট্ট খোকন সোনা গেল অবাক নয়ন মুদি
কোলের শিশু স্তন্য পানে ছিল যে নিশ্চিন্ত
মায়ের তখন শ্বাসরুদ্ধ, ছিড়লো ফুলের বৃন্ত।
শেষ হল সব জ্ঞানের কথা, তর্ক বিচার পুঁজি, -
'কোভিড' এসে বললো, শান্তি কোথায় পাবি খুঁজি?

“মরণ”রে – তুঁহু মম (Moron’re – Tuhu momo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'মৃত্যু' এখন জল ভাত আর, একটা বাড়তি সংখ্যা।
'মৃত্যু' এখন মরণ দোলায় বাজায় বসে ডঙ্কা।
ভয় দেখাতো কতই না সে, ভয়াল ছিল রূপ।
এখন সে যে ল্যাজ গোটানো, ভিজে বেড়াল চুপ।

'মৃত্যু', ওগো সুন্দর সেই অন্তিম দিন সাথী,
তোমার তরে জ্বলতো ঘরে ফানুস স্বর্গ বাতি।
শ্মশান ছিল তোমার ভূমি, শ্রেষ্ঠ দেবালয়,
এখন সেথায় শেয়াল কুকুর, লুকোতে ভয় পায়।
 
মৃত্যু এখন 'কোভিড' সঙ্গে বেঁধেছে গাঁঠছড়া, -
সুখের স্মৃতি মাটির তলায়, বন্ধ মোহর ঘড়া।
অনেক বছর পরের যুগে যখন পাবে খুঁড়ে -
মানুষগুলোর নাম পদবী কোভিড সঙ্গে জুড়ে।
 
মহামারী, অতিমারী যে নামই তার দাও না,
'মৃত্যু' তোমার গরিমাকে করেছে সে আয়না।
তোমায় নিয়ে তাণ্ডব এক নির্মম এই খেলা,
জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, সয় না অবহেলা।

মরণ ছিল শ্যামের সমান প্রভুর সঙ্গে লীলা,
আজকে সবাই দেখছি হেথায় 'প্রহসনের' পালা।
'মৃত্যু' তুমি পরম প্রিয়, আবার এস ফিরে।
সসম্মানে শোকসভা যে করব ঘরে ঘরে।

জীবাত্মারই মিলন লাগি পরমাত্মার ডাক,
মৃত্যু তোমার মধ্যে দিয়ে মানব শুনতে পাক।
তুমিই যে গো চরম 'সত্য' এই কথা হোক সোজা,
"মৃত্যু" তোমায় শ্রদ্ধাভরে করব আবার পূজা।

ঘুমের বড়ি (Ghumer Bori)

চন্দনা সেনগুপ্ত

হাঁপানীতে কামারের হাপর, সদা করে হাঁসফাঁস।
ডায়াবেটিসে বহুমূত্রে জ্বালাতন।
হাই ব্লাডপ্রেসারে মাথা ঘোরায়,
নার্ভের কারো বা হাত পা কাঁপায়।
চোখে-ছানির পর্দা পড়ে, পায়ের হাঁটুতে বাত ধরে।
কানে কম শোনা যায়, কভু বা দাঁত কনকনায়।
ঠান্ডা-গরম, শক্ত-নরম, ভাজা-ভুজি বন্ধ থাকে।
তেলের রান্না ছেড়ে গলা ভাত খিচুড়ি
দালিয়া, দই, চিঁড়ে বা তরল সুজি,
বুড়ো-বুড়ির বরাদ্দ।
নিজেরাও সাবধান হয়ে যান সবাই,
এই বয়সে, দুপুরে তারা চেয়ারে বসে কাটায়।
রাতে যদি ঘুম না আসে,
সেই ভাবনায় সারাটাদিন নষ্ট হয়ে যায়।
সব দেশে - সব মানুষে সবাই একই ভাষায় কথা কয়।
আর কতদিন টানতে হবে রে বাবা?
যে শক্তি এতদিন করেছিলে সঞ্চয়,
আজ তার সবটুকু হয়ে গেল ক্ষয়।
ইনহেলার, ইন্সুলিন, স্টেরয়েড, রে কিম্বা কেমো
থেরাপি চলে, ওষুধ সৈন্যরা দেহের দুর্গকে
রক্ষা করতে চায়, কখনও বা জয়ের বাণীও শোনায়।
তুমি বলেছিলে, - বস্ত্র জীর্ণ হলে যেমন পরিত্যজ্য হয়,
তেমনি নড়বড়ে - ঝড়ঝড়ে এই খাঁচা ভেঙে তুমি
পালিয়ে যাবে। কিন্তু তা হতে দেয় না বিজ্ঞানী।
আত্মীয় স্বজন ভীরুমন কাঁদে, কী হবে উপায়?
"ঘুমের বড়ি" - তুমিই তাই পরম বন্ধু এখন
একমাত্র সহায়, তোমাতে আশ্রয় নিতে মন চায়।

শরীর ও মন (Shorir O Mon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শরীর ও মন, একে অপরের পরিপূরক,
একে অপরের ওপর নির্ভরশীল,
সারাটি ক্ষণ।
দেহের যন্ত্রনা ঘটায়, মানসিক বিপর্যয়।
ধ্বস নামে।
কী যে হয়ে গেল, কী যে হয় ! এবারে কি হবে?
কোথায় গিয়ে কেমন করে জীবনের
গাড়ী থামে !
কে জানে হঠাৎ কখন আসবে প্রলয়।
করোনা ভাইরাস এসে অদ্ভুৎ আক্রোশে
মানুষের ওপর ঝাঁপায়।
প্রিয়জনের হতাহত হয় বিনা বাধায়,
কুল কিনারা হারিয়ে যায়,
ডাইনে বামে।
যারা রুগী নয় তারাও হতভম্ব।
খুঁজে পায় না বাঁচার উপায়।
দূরত্ত্ব বজায় রাখে, একে ওপরের শুধু,
মোবাইলে ডাকে।
শুধু একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা কেটে
বিনা দামে।
অন্ধকার গুহায়, ঘরের কোনায় কে তাঁহাদের কাঁদায়।
শীতের দিনেও চিন্তা ভাবনায়
হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।
আতঙ্কে ভয়ে তুষারপাতেও তারা
অকারনে ঘামে।
অবশ হৃদয়ে তারা বসে থাকে ঈশ্বরের আশায়।
প্রভাতের পরেই আবার সন্ধ্যা নামে।

মরীচিকা (Morichika)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ -
চক চক করে ওঠে, দেখা দেয় জল।
পথ হারানো পথিকের হৃদয়ে -
জাগায় অদ্ভুত আকর্ষণ,
প্রাণে আনে তাই বল।
তার টানে ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে থাকে,
মোহচ্ছন্ন মন,
জীবন হয় তখন অকারণ উদ্দীপনায়
আবেগে চঞ্চল।
যত কাছে আসে সেই জলাশয়,
দূরে দূরে যায় সরে।
ধীরে ধীরে আশা ক্ষীণ হতে থাকে -
জাগে ভয়, চিত্ত হয় বিহ্বল।
শুকিয়ে যায় গলা, -
পিপাসায় তেষ্টায় ছাতি ফাটে।
অতি কষ্টে কাটায় সে
তার প্রতিটি পল।
না - সব যে মিথ্যে হল
জমাট বাঁধা দৃঢ় আশায়
সত্যের উত্তাপ লাগে, পুনরায়
সব 'ভ্রম' হয়ে যায় তরল
অলীক স্বপ্ন গুলো এবার হালকা মেঘ হয়ে
উড়ে যেতে থাকে।
এতক্ষন ধরে যাকে মনে হয়েছিল -
নদী বা সরোবর - অবিকল,
সে তো ভ্রান্ত - পথ শ্রান্ত মানুষকে
কে যেন বুঝিয়ে দেয়,
অদৃশ্য কোন জাদুকরের ছল
সোনার হরিনের পিছনে
ছুটে চলে মানব - ঠিক এই ভাবে
টাকা টাকা টাকা - মুদ্রা গোনে,
মাটিতে অর্থ পোঁতে - গাছ বোনে
আরো অর্থ পাওয়ার লোভে
চেষ্টা চালায় নিষ্ফল।
অন্তিম সময়ে ভুল ভাঙে তার -
ক্রমশঃ যার দিকে সে এগিয়েছিল
ধনরত্নের নেশায় উচ্ছল -
সে তো ঐ 'মরীচিকা'র মতোই সত্য নয়।
শুধু মিথ্যার ঘোরে -
এতক্ষন অমূল্য জীবন নষ্ট - করলো নির্বোধ
মানুষ জ্ঞানী হয়েও ছিল -
তাই, বদ্ধ পাগল।