আপোষ

কতক্ষন – কতদিন ধরে চলবে?

চন্দনা সেনগুপ্ত

আগ্নেয় গিরি থেকে যেমন করে
'লাভা' উদ্গীরণ হয়,
ঠিক তেমনি ভাবে মেদিনী নয়,
আমাদের সমাজ ভূমি ভেদ করে
ঘটলো বিস্ফোরণ।
বাঙালী জাতির জীবন - হৃদয় - দেহ - মন
সব অদ্ভুত এক কালো ধোঁয়ায় দিল ঢেকে।
কী ভীষণ লজ্জার আবরণ।
করাপশন - করাপশন - করাপশন
শব্দটা ইংরেজী হলেও আর বিদেশী
ভাষার কোষে আবদ্ধ নয়।
কাপ - ডিশ - টেবিল - চেয়ার - পেন - পেন্সিলের
মতন একেবারে খাঁটি বাঙালীর রক্তে
মজ্জায় মিশে হল -
দুর্নীতির অভিনব সংস্করণ।
ব্যাভিচার - অত্যাচার - অন্যায় - অবিচার
কথা গুলো এক হয়ে করলো -
স্বার্থপর মানুষের কার্যকলাপের
নতুন নামকরণ।
আগে সিঁদ কেটে লোকেদের ঘরে ঢুকতো চোর।
বাক্স, প্যাটরা ভেঙে করতো মারধোর।
ডাকাতেরা রণ পা পরে আসতো -
লুঠ তরাজে তারা ছিল সিদ্ধ হস্ত, -
ধরা পড়লে কখনও কখনও খেত
গণ ধোলাই, -
আর কেউ না আটকালে মুখে পড়তো
দুধ মালাই।
কিন্তু এখন? -
চোরের মায়ের বড় গলা, লজ্জা শরমের
নেই কো বালাই।
কারণ, তাদের ছেলেমেয়েদের আর কোনও
রকম প্রাণ বা মান খোয়ানোর
ঝুঁকি নিতে হয় না,
পিস্তল, ছোরা, চাকু, বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে
রাতের আঁধারে বেরুনোর আর
কোন দরকার পড়ে না।
রাজা, উজির, সৈন্য-সেনাপতির সামনে -
নাকের ডগা দিয়ে তস্করের দল -
বুক ফুলিয়ে রাস্তা দিয়ে দিনের
আলোয় করেন সর্বত্র বিচরণ।
ব্যাঙ্ক, এটিএম আর করতে হয় না লুন্ঠন।
কারণ? -
দেশের গরীব অসহায় মানুষেরা দলে দলে এসে
কষ্টোপার্জিত আয় চোর ডাকাত ঠগীদের
হাতে হাঁসতে হাসতে করেন অর্পণ।
বাপ ঠাকুরদার জমি বেচে, মা বৌদির
ভাঁড়ার ছেঁচে, বোনের বিয়ে বা
ভাইয়ের পড়া, দাদার ক্যান্সারের চিকিৎসা
ভুলে নেচে নেচে, হেঁচে হেঁচে তারা চলে -
রক্ষক - ভক্ষক - তথা তক্ষক নামে
যক্ষ রাজাদের পায়ে টাকার থলি করতে
সমর্পন -
তবু কেন? -
আমরা সমগ্র দেশবাসী আর
অবাক হই না তাতে?
এতই কি সহ্যশক্তি বেড়ে গেছে
মানব প্রকৃতিতে।
'দুর্নীতির' সঙ্গে "আপোষ" করতে করতে -
অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, - অশিক্ষিত -
শিক্ষিত মানুষ সমস্ত?
তাই কি যেখানে তাকাই -
ক্রেতা, বিক্রেতা, মুচি, মেথর, শিক্ষক, নেতা
আজ সবাই শুধু করে চলেছে সমঝোতা,
আপোষ।
আদর্শ্যহীন মূল্যবোধ শূন্য
দিশাহারা হয়ে পাগলামি করছে
তরুণ, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ আপামর
জন সাধারণ?
তাদের ছেলের ভবিষ্যৎ, মেয়ের স্বপ্ন
ভেঙ্গে চুরে চুরমার হতে দেখেও
তারা সম্পূর্ণ নির্বাক, মুক, বধির
অন্ধ না হয়েও কলুর বলদ
মাতা গান্ধারীর মতন
চোখ বেঁধে প্রতিবাদের ভাষা ভুলে
স্তাবকতায় করছেন নিজেদের
মনোরঞ্জন ?
আর চৌর্যবৃত্তি যাদের করে না
ক্ষুধা নিবৃত্তি, লোভ চরিতার্থের জন্য
যারা নির্বল, নির্বোধের অশ্রু
পান করে চলেছেন অনুক্ষণ
তাদেরকে নিয়েই মাতামাতি আজ
২৪ ঘন্টা ধরে -
বিভিন্ন চ্যানেলে শেয়ালের মত
হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, কুছ নেহী হুয়া, কুছ নেহী . . .
ক্রমাগত বলে চলেছেন আমাদের দূরদর্শন।
অবাধে হচ্ছে নৈতিকতার হনন।
মানবিকতার নাম নিশানা মুছে দিয়ে
স্নেহ - ভালোবাসা, আস্থা - শ্রদ্ধা পায়ে দলন।
মনে পড়ে কথামৃতের সেই গল্পটাতে ঠাকুর
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের এক চমৎকার
কথন।
স্যাঁকরার দোকানে এসেছে নিরীহ
খরিদ্দার।
মালিক জানতে চান - ওরা কেশব?
কর্মচারী বলেন - "গোপাল" - মানে
"গরুর পাল" তারপর সেও
মালিককে প্রশ্ন করে হরি হরি?
তিনি বলেন - হর হরো।
লোকেরা ভাবেন কৃষ্ণ, গোপাল, হরি বা
শিবের নাম করছেন, তিনি।
কতই পবিত্র শুদ্ধাত্মা।
কিন্তু একদিন না একদিন মুখোশ
খুলে তার চরিত্র স্বরূপের হবে
উন্মোচন।
সর্বদা - আমাদের ভবিষ্যৎ আজ তাই তারই
প্রতীক্ষায় দিন গুনছে?
সবরকম আপোষ ছেড়ে মাটি ফুঁড়ে
যে বিপ্লবীর হবে পুনরাগমন।

সতর্ক নাগরিক (Sotorko Nagorik)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোভিড-১৯ সারা বছর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে,
হয়ত ছিল ঘুমন্ত কিছুক্ষন।
যে কোন সময়েই আবার করতে পারে
পেছন হতে সে কাউকে আক্রমণ;
কেউ তো করে নি এই নাগরিক কে সে বিষয়ে
সতর্ক বা সচেতন !
রাজনীতিবিদদের - ক্ষমতা - লিপ্সা -
শিল্পপতি ব্যবসাদারের অর্থ পিপাসা,
ভুলিয়ে রেখেছিল মিথ্যা স্তোকে কিছুক্ষন।
'মাস্ক' না পরে আবার নির্ভয়ে পথে বেড়িয়েছেন,
সাহসী অবোধ জনসাধারণ।
আহম্মক - নির্বোধের অদূরদর্শিতা, না
অযোগ্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসন?
ভুল করে চলল একের পরে এক যখন তখন;
সাবধানতার বদলে তারা শুনিয়ে গেল
বৃথা অহমিকার আস্ফালন।
বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানী ডাক্তার, যে যেখানে ছিলেন
জগতের শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
হলেন হতবাক বিস্মিত
সাবধান করতে চাইলেন, যত মনীষী বিচক্ষণ।
হাসপাতালে হাসপাতালে আবার রুগীর ভিড়,
শয্যা নেই, ওষুধ নেই, নেই কোন ভ্যাকসিন।



নার্স ডাক্তার সবাই খাচ্ছেন হিমসিম,
প্রাণহীন দেহ হল শীতল,
অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর কবলিত
শরীর নিথর হিম।
হাজার হাজার মানুষের মৃতদেহে
ঢেকে গেল শ্মশানের ভূমি,
প্রিয়জনের ক্রন্দনে, আর্তনাদে
ফেটে গেল ভারতের সকল প্রদেশের
রক্তাক্ত জমি।
কে এর জন্যে দায়ী?
কিছু মানুষের দায়িত্ব জ্ঞানের অভাব !
মৃত্যু নিয়েও কারচুপি, কালোবাজারির দল -
উঠিয়ে নিল লাভ।
রাজা প্রজা সবাই কিন্তু পাবে একদিন সাজা !
যারা দলে দলে করেছিল ভোটের র়্যালি,
তারা আজ ডেকে আনলো বিপর্যয় -
কোভিড এর পায়ে দিল অকারণে -
শত শত নিরীহ মানুষের নরবলি।
দেশের এই চরম দুর্দিনেও শিক্ষা হল না কারও।
ঈশ্বর আরাধনার মুখোশ পরে যারা ধর্মের
নামে  অপপ্রচার করে ,- অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে বাহবা দিয়ে
মঠ মন্দিরে ধ্বজা ওড়ায়, মন্ত্র উচ্চারণ করে উচ্চস্বরে -
তারা নামলো শাহী স্নানের নামে, -
হরিদ্বারের গঙ্গা জলে, হাজারে হাজারে
পুন্য় লাভের  তরে !

স্বর্গের পথে (Swarger Pothe)

চন্দনা সেনগুপ্ত

এতো তাড়াতাড়ি স্বর্গ থেকে রথ
তাদের নিতে আসবে -
তা জানতো না তারা।
ইন্দ্রের সভায় তাঁর প্রিয়
বাহন ঐরাবত ও নৃত্যপটীয়সী
অপ্সরা উর্বশীর বন্ধুত্ব হয়েছিল,
সবার অলক্ষ্যে।
দুজনে ঘুরতে যায়, নদী তীরে উদ্যানে,
একজন নাচে, অন্যজন শুঁড় দুলায়।
একজন স্নান সারে - সাঁতার কাটে
অন্যজন ফোয়ারায়
হিল্লোল তোলে।
হাসে খেলে, আনন্দে মাতে।
দেবতাদের রাজার সভায় আসতে
দেরী হয়ে যায় তাদের।
শাস্তিপায় তারা, একজন ৬ মাসের
অন্যজন ৮ মাসের জন্য।
কেরালার হস্তিনী মায়ের গর্ভে -
স্থান পায় ঐরাবত।
আর
উর্বশী দিল্লীর পাশে নয়ডা
শহরে এক রমণীর জঠরে।
পৃথিবী নাকি স্বর্গের চেয়েও সবুজ,
ধরিত্রী মায়ের কোমল ঘাসে
শীতল নীল জলে নাকি
অপরিসীম শান্তি -
শুনেছিলো সে, জন্ম নেবার -
না না জন্ম তো সে
নিতেই পারেনি -
ভ্রূণ হবার আগে -
স্বর্গবাসী দেবকন্যাদের মুখে।
আর ঐ নৃত্যশীলা সুন্দরী নারী
জেনেছিল এখানে ভারতবর্ষের
ঘরে ঘরে রাগিনী, পদ্মিনী
বৈজয়ন্তীমালা, কিম্বা
মাধুরী দীক্ষিত, হেলেন প্রমুখ
কত শত রমণী নাচের তালে -
সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়।
উর্বশীও মানুষের কাছে নতুন নাচ
শিখে আসবে, স্বর্গসভাকে
চমকিত করতে।
কিন্তু দুজনেরই মায়ের আর্তনাদ
বুকফাটা চিৎকার -
যন্ত্রনা, হতাশা, সন্তানকে -
রক্ষা করতে না পারার
হাহাকার শুনেছে
ওরা পেটের মধ্যে বসে।
"এ" কোথায় এসেছে তারা
এ তো এক অভিশপ্ত
ঘৃণ্য নিষ্ঠূর জগৎ।
এখানে ঐরাবতের ছয় মাসের জীবন
আনারস বোমে জ্বলে
পুড়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়।
অন্যদিকে নয়ডায় করোনা
আক্রান্ত - কোভিডের রুগী ভেবে
তার মা হাসপাতালের
দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়ান,
চিৎকার করে বলেন -
আমাকে নিশ্বাস বন্ধ
করে শেষ করে দিলে -
ক্ষতি নেই, শুধু আমার
৮ মাসের তরতাজা নিরীহ
সন্তানকে জঠর মুক্ত করো।
বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দাও।
ওগো নিঠুর স্বার্থপর -
মান আর হুঁশ খোয়া নো মানুষ,
তোমাদের নির্দয়তার আর কত জঘন্য
দৃষ্টান্ত রেখে যাবে তোমরা?
একটু দয়া করো।
কিন্তু গরীব মা এক দোর থেকে অন্য দোরে
এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে
শুধু ছোট ছুটি করাই
সার হয়েছে তাঁর।
উর্বশী আর সুযোগ পেলো না
বাইরে আসবার।
ঐরাবতের মা যেমন এক বুক
জলে তাঁর চোখের অশ্রু
মিশিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন
জঠরের পুত্রের কাছে -
মানুষের মাতাও তেমনি
নিষ্ফল আক্রোশে -
ভগবানকে নালিশ জানিয়েছেন।
- "এই কী তোমার
সুবিচার প্রভু ?
এখন আমরা দুই বন্ধু গর্ভাশয়ে মৃত্যু
বরণ করে ফিরে যাচ্ছি আবার
স্বর্গের পথে।
পৃথিবীতে আর কখনো না আসবার
শপথ মনে নিয়ে।

দুগ্গি বিটি (Duggi Beti)

চন্দনা সেনগুপ্ত

হেই মাই, তোর পায়ে পড়ু
         আমাক তুই পড়ত্যে দে গো,
'ইসকুলটার' ঘন্টা, বাজ্যে -
         বললেক কে-জাগ্যো জাগ্যো।
 
বড়লোকের বিটি ছা টা -
       হাসত্যে হাসত্যে চল্যে যাবেক,
আর তুয়ার ঘরে চোকের জল্যে -
              এই বিটিটা বুক ভিজাবেক!
 
দুখ-লাগ্যে না, তোদের ক্যানে -
            ঠাকমা বুড়ি কঁকাই মরে
বাপ, দাদা, খুড়া ও জেঠ্যা -
              বিয়া দিবার জুগাড় করে।
 
তোর জীবন তো ঘুচাইছুস মাগো
             গোপর লেপ্যে কাদা ঘ্যাঁট্যে
আমাক হবেক বাঁচতে মা,
          যাবো নাই ঘাস কাটতে মাঠে।
বা বাদাড়ে ধুমশা মরদ
         ভ্যাল ভ্যালায়ে তাকাই থাকে।
 
মায়ের কথা -
আয় না রে মা দুগ্গি রানী,
        চুল বেঁধ্যে দিই, যতন করে,-
পড়ত্যে তোকে যেতেই হবেক -
         সাদা জামা ইসকাট পরে।
 
বই খাতা আর কলম লিবি,
        জেদটা তুয়ার রাখবি ধইরে
ফাসটো তোখে হতেই হবেক
        চিষ্টা থাকল্যে কেউ কি হারে।
 
দশ হাত তোর নাই বা হল্য -
       কাজ করবি মনের জোরে,
দশের কাছে নাম কুড়াবি
        গর্বে বুকটা উঠবে ভরে।
 
চোখ থাকতেও নিরক্ষর যে -
         পোইড়ে আছি, অন্ধকারে-
লিখাপড়া শিখ্যে তোকে -
         যেত্যে হবেক আলোর পারে।
ই বাগ ছাইড়ে ওই উধারে।
          যেত্যে তোকে হবেক ইবারে,
ইয়াদিকে সামলাই লিব -
            যা পাল্যায়ে ইসকুল ঘরে।

প্রেম বন্ধন (Prem Bondhon)

“যত মত , তত পথ “- সমন্বয়ের এ মন্ত্র 
শেখালেন যে মহাপুরুষ ,-
তিনি যন্ত্রী , আমি যন্ত্র। 
জল কে বলো - পানী বা নীর ,-
একোয়া এবং ওয়াটার ;
শ্রী রামকৃষ্ণ দূর করলেন,-
মানব মর্ণের অন্ধকার। 
ভেদাভেদের রাজনীতিতে
ধর্মে ধর্মে ভাব বিরোধ ,-
এই জগতেই সর্গ মত্ত -
জীবনের ঋণ পরিশোধ। 
সত্য প্রেম অহিংসা যে সবার গ্রন্থে স্থান
হিন্দু , বৌদ্ধ, জৈন, শিখ  বা -
    মুসলমান  ও খ্রিষ্টান। 
 কেউ ছোট নয় কারো থেকে , সবাই সবার আপনজন 
সাদা কালোর বিভেদ ভুলে -
এক সাথে হোক ধনী - নির্ধন। 
নানক - কবির - মুহম্মদ ও খীপ্ত খ্রিস্ট অবতার ,-
যাঁর কথাতেই চলো নাকো 
করবেন তিনি উদ্ধার। 
জীবনপ্রেমের মদ্ধ দিয়ে বানবে সেতু বন্ধন ,-
দয়া মায়া সেবা দিয়ে -
মোছাও  দুখীর ক্রন্দন।।