ফুটবল ফুটবল

চন্দনা সেনগুপ্ত

World Cup soccer soccer?
শুনি চারিদিকে শুধু চিৎকার
দিকে দিকে ওঠে তার শোরগোল,
সারা পৃথিবীতে তুলেছে যে আজ
উত্তাল কল্লোল।
দেশে দেশে লোক হল চঞ্চল,
ফুটবল ফুটবল।
কেউ হারে আর কেউ জেতে যবে, 
কাঁদে হাসে আর মেতে ওঠে সবে,
হাজির হয়েছে তাই ময়দানে
নাম করা যত দল।
ফুটবল ফুটবল।
যুদ্ধ লড়াই, ধ্বংসের লীলা,
মহামারী আনে মৃত্যুর খেলা
ভুলেছে মানুষ এই ক'টা দিন,
কলরব অবিরল।
স্টেডিয়াম সাজে আলোর মালায়
হয় উজ্জ্বল - ঝলমল।
বিশ্বের সেরা কে হবে এবার?
উত্তেজনায় কাঁপে সংসার,
কার গোলে যাবে শেষ ঐ বল
পাবে স্বর্ণের বল। ফুটবল!

লোভ

চন্দনা সেনগুপ্ত

"লোভ" নামে একটা দানব আছে।
যে হাঙ্গরের মতন বিরাট হাঁ করে থাকে।
মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে চায় সেই গভীর গহ্বরে।
সেঁধিয়ে যেতে যেতে তাকে অন্ধকার হতে
আরও অন্ধকারে ভীষণ জোরে -
হটাৎ দড়াম করে নীচে দেয় ফেলে।
কোথায় যে সে ফাঁদ পেতে রাখে কে জানে।
তাই প্রলোভনের বশে মানুষ শেষ -
একেবারে তলিয়ে যায়
কোন অতলে।
'লোভ' আবার একা কখনও আসে না।
সঙ্গে বেঁধে আনে তার বন্ধুদের কে।
কাম, ক্রোধ, মোহ, মাৎসর্য্য সবাই বুঝি -
ওৎ পেতে থাকে।
টাকা টাকা টাকা আর যশের পুঁজি থাকে ঢাকা।
সম্পত্তি - প্রতিপত্তি
নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি,
তার মনে তখন করে নতুন লালসার সৃষ্টি,
তখন সে সমস্ত বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে।
কিসের অমোঘ আকর্ষণে,
দিনরাত সে অর্থ গোনে,
ডুবতে থাকে নরক পাঁকে।
কারো প্রতি হয় না যে আর
তখন করুণা বৃষ্টি,
বিনষ্ট হয় সকল শান্তি
ভালোবাসা ও আশা।

বর্ষ-বরণ (Borsho-Boron)

চন্দনা সেনগুপ্ত 

আমরা যারা, আজ সুখের জমিতে, শ্যামল ভূমিতে 
আনন্দে শান্তিতে বসে বসে
বর্ষবরণের গান গাইছি, মধুর স্বরে, -
সময় কাটাচ্ছি, নানান নেশার ঘোরে, -
তারা কেমন করে ভাবতে পারে?
আঠাশ দিন ধরে, একটা অপোক্ত পুরোনো নৌকা ভরে -
পঞ্চাশ জন নারী, সাতচল্লিশ জন শিশু ও 
কতিপয় দুঃসাহসিক পুরুষ নাবিক-এর ‘প্রাণ‘
নাচছে যে গভীর সাগরে।
ঢেউয়ের তালে, খিদে তেষ্টায় দিশাহারা মানুষগুলো 
কলার পাতায় আশ্রয় নেওয়া
পোকার মতন অদৃষ্ট দেবতার খেয়ালে
কোন উদ্দেশ্যে শুধু ভেসে চলেছে !
ঝড় তুফানে, সুনামির কাঁপনে, তাদের
জন্ম মৃত্যুও ক্ষণস্থায়ী, জীবন যে নাচছে শুধু
'তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ করে।
ওদিকে ডিসেম্বর - একত্রিশে, পৃথিবীর সব দেশে,
পূর্ব দিগন্ত হতে পশ্চিমের শেষ প্রান্তে,
মরুভূমি থেকে মরুদ্দেশে - বনে অরণ্যে
নগরে - শহরে বিশেষ করে সমুদ্র কিনারে 
মানুষ নেশায় মাতে,
আনন্দের ফুলঝুরি, পড়ে ঝরে ঝরে।
"ক্যালেন্ডার" পুজোয় মত্ত জনতা মহামারীকেও 
উপেক্ষা করে, জমা হয় হাজারে হাজারে।
পথ ঘাট সাজে, বাদ্যি বাজে, আগুনের মশাল জ্বলে।
বাজি পোড়ায় তারা। আকাশের কালো আঁধার চিরে
আলোর মালা দোলে।
কী অসম্ভব বৈপরীত্য - কী অস্বাভাবিক বৈসাদৃশ্য -
একধারে তুবড়ির রোশনী ঝলমলে সাগরতীরে,
আর অন্যদিকে -
জমাট ভয়ে আতঙ্কিত মানবের ভাগ্য - নৌকা ঘিরে;
সব আশা মোমবাতির মতন তখন পড়ে গলে গলে।
পাল ছেঁড়া, ইঞ্জিন বিকল হওয়া নৌকার -
উদ্বাস্তু যাত্রীদল হয়তো আর একটু পরেই 
তলিয়ে যাবে অতল সলিলে।
আকাশের তারারা শুধু মিটি মিটি করে চায়,
এই অভাবনীয় অবাঞ্ছিত দৃশ্য দেখতে হবে বলে,
এক ফালি চাঁদটাও মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়।
সময় থমকে দাঁড়ায়, সবাই নিশ্চুপ।
ঐসব শিশুগুলি - যারা এখনও প্রার্থনা করতে শেখেনি,
আল্লাহ, ঈশ্বর - কাউকেই চেনে না, বুদ্ধদেবের অহিংসার 
পরিচয় তাদের কেউ দেয়নি, কিম্বা ক্রূশবিদ্ধ যীশুর 
বাণী প্রচারকদের নামও জানে না -
শুধু একদৃষ্টে টলমলে পাল থেকে হেলে পড়া
বাঁশের দিকে ঊর্ধ মুখে তাকায়,
ডুবন্ত নৌকার অবিরাম দোলা তাদের কাঁপুনি বাড়ায়। 
'মৃত্যু' নামের ভীষণ দানবের চেহারাটা তাদের তো 
অজানা নয়। 
চোখের সামনে তাদের  বাপ, দাদারা  গুলিবিদ্ধ হয় ,
রক্তাক্ত দেহগুলো কবরের মাটি নাহি পায়,
গলিতে গলিতে কুকুর শেয়াল সেগুলি ছিঁড়ে খায়।
মা, মাসি, দিদি, বৌদিদির ওপর পাশবিক অত্যাচার, ক্রন্দন 
হাহাকার যেদিন তাদের কানের পর্দা ফাটায়, -
সেদিনও তারা ছিল, এমনই নির্বাক অসহায়।
চোখের জল ফেলার মতন ছিল না সময় বা উপায় !
এই কয়মাস ধরে তারা জীবন পাখি হাতে নিয়ে 
কেবলই এক দেশ হতে অন্যদেশে স্থল বা জলপথে 
শুধু পালিয়ে বেড়ায়।
তাদের অন্তরে অদ্ভুত বিহ্বলতা ও সীমাহীন বিস্ময়।
শন শন করে বাতাস বয়, তারা চায় একটু
‘আশ্রয়’।
মায়েরা খালি ভাবে - শিশুগুলি বুকে চেপে ধরে -
আমাদের ত্রাণকর্তা আজ কোথায়?
এদের কী অপরাধ প্রভু? অবোধ, অবুঝ বালক শিশু -
এরা কেন শাস্তি পায়!
করেছে কী এমন অন্যায়?
‘আল্লাহ’র দরবারে  তারা অভিযোগ জানায়।
শেষে, সেই ব্যাকুল মানুষের আকুল আকূতি
হয়তো ঈশ্বরের দরজা ধাক্কায়, 
তাই
একটি দ্বীপের কাছে - ইন্দোনেশিয়ায় ,
এক চকিতে সেই ডুবন্ত নাও, দৃষ্টি গোচর হয়,
মৎস্যজীবী একদল লোক চমকে ওঠে -
যখন বিদ্যুতের আলো ঝলকায়।
আর সেই মানুষদের প্রাণে ভগবান জাগায়
আত্মবিশ্বাস, তারা অনুভব করে -
'মানবিকতার' দায়।
তাদের সমস্ত সত্তাকে কেউ যেন নাড়া দেয়।
তাদের তৎপর করে, 
একমুহূর্ত দেরী করলে ভীষণ অনর্থের
সাক্ষী হবে ভেবে, তারা - চিৎকার করে -
‘ঐ প্রানগুলি বড় অমূল্য, বাঁচাতেই হবে ওদের।
তুলে আনবই, আমরা, নিরাপদ নিশ্চিন্ত ডাঙায়’ ।
‘নৌসেনার’ কাছে তারা বার্তা পাঠায়;
তাদের এই জেলেদের নৌকায় 
ধরবে না এই শতাধিক লোক,
তাই আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থা ও
সৈনিকের অসামান্য প্রচেষ্টায় 
আঠারো ঘন্টা ধরে, উদ্ধার কার্য তারা চালায়।
'রোহিঙ্গ্যার' বাস্তুহারা ছন্নছাড়ার দল
উঠে আসে সমুদ্র কিনারায l
বছরের প্রথমদিনে এতোগুলি প্রাণীর জীবনদানে 
দ্বিতীয় জন্ম দিয়ে, অবিশ্বাস্য 
দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে সেই 
দয়ালু ধীবর সম্প্রদায়।
 সার্থক হয় ওদের বর্ষ-বরণ l
সারা বিশ্বের মানবদরদী আত্মা আবার 
মনুষ্যত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
জগতের মায়েরা উদ্ধারকারীদের পাযে বারেবারে 
প্রণাম জানায়।

করোনার করুনায় (Coronar Korunay)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফসকে গেল সুযোগগুলো,
খসকে গেল সুসময়, -
টসকে গেল মিথ্যা গর্ব
উসকে গেল মৃত্যু ভয়।
 
চটকে দিল শান্তির ঘুম
মটকে দিল শক্ত ঘাড়
লঠকে দিল ফাঁসির কাঠে
ঝটকে দিল সবার বাড়।
 
অঙ্কে রইলো বিয়োগ শুধু
পঙ্কে রইলো প্রিয়র লাশ,
ব্যাঙ্কে রইলো শূন্য মধু
ট্রাঙ্কে রইলো হাহুতাশ।
 
মনটা হল পাগলা হাতি,
প্রাণ হল নিরুদ্দেশ,
জ্ঞানটা হল লুপ্ত কোথায়
মানটা হল কখন শেষ।

কোভিড দিনে তব শরণ্যে (Covid din e tobo shorone)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঈশ্বর, মোর জাগুক শুধু গভীর -
অনুরুক্তি -
রাত্রি দিনে লইব চিনে -
তোমার স্নেহ আনব ছিনে,
অস্ত্র যে মোর একমাত্র -
অগাধ শ্রদ্ধা ভক্তি,
ঝিনুক হতে বেরিয়ে আসে -
নরম কোমল শুক্তি, -
তেমনি আমি খোলস ছেড়ে -
আসতে যে চাই তোমার দ্বারে, -
'কোভিড' দিনে স্মরণ করি -
কথামৃতের উক্তি, -
শরণাগত থাকতে হবে, তোমায় শুধু ডাকতে হবে, -
বৃথা সময় নষ্ট যে হয়,
করলে তর্ক যুক্তি।
এই জীবনে ঘুচিয়ে দিল,
সকল চাওয়া পাওয়া
মিথ্যে কেন ছুটে চলা, অর্থ পিছে ধাওয়া, -
'ঠাকুর' তোমায় ডাকতে আমার -
নেই শুধু বিরক্তি,
মৃত্যুর ভয় করবো গো জয় -
পাইব পরশ মুক্তি।

ভস্মাসুর কোভিড (Bhosmasur Covid)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথ থেকে কে আনলো ডেকে
দানবটা এই কোভিড উনিশ?
কে জানতো তার মুখে, বুকে, দাঁতে
আছে মৃত্যু বিষ।
 
পুরাকালের মহিষাসুর, বাইবেলের ঐ
শয়তান,
করোনা রূপে পেল কি প্রাণ?
রক্ত বীজের মতন যে তার
অযুত নিযুত শত হাজার।
লক্ষ লক্ষ কীটাণুতে -
মানব জাতিকে করে প্রহার।
 
ধনী নির্ধন, সুখী দুঃখী জন,
তরুণ, বৃদ্ধ, যুবক, সুজন,
মালিক, শ্রমিক, দার্শনিক -
সবাই তাহার শিকার হন।
কোন দেবতার বর পেয়ে সে
ভস্মাসুরের মতন ধায় -
কোনো দেশের নর নারী কোনও ভাবেই
ছাড়া না পায়।
সূক্ষ্ম রূপে চুপে চুপে, নিঃশ্বাসে সে
ঢুকে যে যায়,
ফুসফুসকে আঁকড়ে ধরে
বংশ বাড়ায় নীরবে হায়।।
 
পুরাকালের দানব যেমন
যার মাথাতে রাখতো হাত,
জ্বলে পুড়ে ছাই  হতো সে -
মাথার উপর বজ্রপাত।
নারায়ণকে তখন স্মরণ
করল ব্যাকুল জগৎ জন,
বিপদকালে এলেন 'হরি', -
আসার আলো দেখে ভুবন।
মোহিনী বেশ ধারণ করে
নারী রূপে ভোলান মন,
অসুর তাহার মোহে বিবস -
অদ্ভুত তাঁর আকর্ষণ।
কাছে এসে বলেন তিনি ,
কল্লোলিনী রমণী -
"দানব রাজা তোমায় দেখে
কাঁপছে শিরা ধমনী।
আমায় তুমি করতে বিয়া,
চাও যদি গো - বরণী,
নিজের মাথায় হাত দিয়ে আজ
শপথ করো এখ্খুনি"।
 
উল্লাসেতে নৃত্যরত, আবেশ বশে ভস্মাসুর,
যেই না দিল মস্তকে হাত
উত্তেজনায় ভরপুর -
অমনি তাহার বিশাল দেহ
দহন তাপে ভস্যচুর।
স্বর্গ মর্ত্ত হতে তখন
বিদায় নিল সে শত্তুর।।
 
মানব জীবন ত্রাহি ত্রাহি করছে
কোভিড এসে অবধি
পতন তাহার হবেই হবে,
এটাই কবির উপলব্ধি।
নতুন যুগে -
ঈশ্বর আজ আবার ফিরে
আসেন যদি,
নারায়ণের কৃপাবৃষ্টি সৃষ্টি করে
দয়ার নদী, -
 
তাহলে কি দমন হয় না -
ভীষণ দৈত্য করোনা
'ভ্যাকসিন' হয় 'ব্রহ্মাস্ত্র' -
মিথ্যা সে নয় কল্পনা, -
শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বানিয়ে দেবেন যোজনা,
বিষে বিষে বিষক্ষয়ের
মানুষ শুনবে মন্ত্রণা।
 
স্নিগ্ধ শান্ত রোগমুক্ত হবে আবার এই জগৎ।
হানাহানি বন্ধ করে সকল মানব হবে মহৎ।
থাকবে না আর ভয়ে ভয়ে,
বন্দি থাকার নহবৎ,
কোভিড হবে পরাজিত
এটাই হবে হকীকৎ।

অগ্নি বলয় (Agni Boloy)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
'মাতৃ হৃদয়' তো করুণাসিক্ত কোমল,
একটুতেই গলে যায় -
দয়া, মায়া, ক্ষমা দিয়ে গড়া,
কিন্তু আজ কি হল !
খবরের কাগজের নিত্য বিবরণ
প্রতিদিন মর্মান্তিক যত
নারী নির্যাতন, -
তার ভেতরে জ্বালানো আগুন।
মনের গহ্বরে চলছে যেন
গলিত লাভার দহন।
আগ্নেয় গিরি হয়ে উঠল আমার
ক্রুদ্ধ বিক্ষুব্ধ ব্যথিত মন।
ভারতবর্ষের প্রতিটি মা, - শুধু আমি না -
দিদি, বৌদি, মাসী, কাকীরাও
এখন রাগে ফুঁসছে।
ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গা -
কৃষ্ণা-কাবেরী থেকে বিপাশা
ঝিলাম -
ভরে গেল যে এদেশের কন্যাদের
চোখের জলে, -
অসম্ভব আক্ষেপে, হতাশা মনে পুষছে।
উত্তর প্রদেশ থেকে রাজস্থান
হাত্রাস কিংবা কোন মরুদ্যানে -
নিরীহ অসহায় অচ্ছুৎ কন্যার দেহ
লালসার ঘৃণ্য জিহ্বায় কারা
চুষছে।
ওদের নির্লজ্য চেহারা দেখে
কোভিড উনিশ
হার মানছে আজ
তাদের দাঁতের বিষ
তাই আমাদের ক্ষমতার
প্রবৃত্তিকে সব শুষছে।
সেই ভাগ্যহীন কন্যারা বারে বারে
করে আর্তনাদ
কার কানে যায় সেই কান্না
পিতা মাতার হাতে
তাদের মৃতদেহও তুলে দেয় না তারা
অন্তিম ক্রিয়াতেও সাধে বাদ।
রক্ষাকর্ত্তা নীরব,
রাজনীতি - দুর্নীতি - গদি - প্রীতি
ভুলিয়ে দেয় আদর্শ সব।
বিচারকও ঘুমন্ত
বুদ্ধিমানেরা বধির অন্ধ
সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ
বিবস-নিত্য - ভয় ভীত।
তাই এবার আসুক প্রলয়
মায়েদের মনে।
আগ্নেয়গিরি হতে ছুটে যাক
ক্রোধের অগ্নি বলয়।
গলিত লাভায় ভস্ম করে দিক
ঐ দানব মানবের
নিশ্চিন্ত আলোয়।
আমাদের মুখনিঃসৃত অভিশাপ
পুড়িয়ে দিক ওদের এই সাহস পাপ,
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে
বাকরুদ্ধ করে দিক ওদের প্রতাপ।
বিচারের বাণী আর নিভৃতে নির্জনে
করে না যে অশ্রুপাত,
দুর্গার ত্রিশূলে ছেদন করা দেহ
হয়ে যাক শরীরের
রক্তের উত্তাপ।
নিজেদের কন্যাকে হারিয়ে করুক
হাহাকার সন্তাপ।

“প্রত্যাগমন” (Protyagomon)(ঘরে ফেরার গান)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
বনের পাখীর সঙ্গ পেয়ে, উড়ে উড়ে চলল দূরে।
মন চায় না, ফিরতে যে তার ঘরে।
এখানে নয়, ওখানে নয়, অন্য কোথাও -
অন্য কোন সমৃদ্ধ শহরে।
বাঁধলো বাসা, সুপ্ত আশা জমিয়ে রাখে -
কত যে তার অন্তরে।
হঠাৎ এল, মহামারীর মার,
করোনা নামে দানবীটা
দেয় দুয়ারে, আঘাত যে বার বার।।
 
কেউ চেনে না তারে, -
না চাইলেও সাড়া দিল, হাজারে হাজারে -
অজুৎ, নিজুৎ, লক্ষ, কোটি
গুনতে কে আর পারে !
ধরল চেপে, মারল টিপে, উকুন যেমন মারে,
বোনের পাখী কাঁদছে যে তাই, ব্যর্থ হাহাকারে, -
তারা হেথায় লাগবে না আর কোনই দরকারে।
প্রবাস হতে চলে যেতে হবে আবার এবারে, -
উল্টো পানে, দেবে পাড়ি, - ভারত মহাসাগরে।।
 
মন কাঁদে আজ গ্রামের তরে, -
ফিরতে সে চায় নিজের ঘরে,
তাহার তরে আসন পাতা, হয়তো ধুলার, -
পথের পরে।
সেথায় নেইতো সুখের সজ্জা -
সাজিয়ে রাখা আড়ম্বরে, -
কিন্তু সেথায় পিতা মাতার স্নেহের সুধা সদাই ঝরে।
আছে অবাধ স্বাধীনতা,
ব্যক্ত করতে মনের কথা, -
মাথাটি সে নুইয়ে দেবে -
পুন্য দেশের মাটির পরে।
 
"বন্দে ভারত" উড়ো জাহাজ আনল তারে -
বুকে ধরে।
শুভ্র যেন - বলাকা সে, মায়ের মতন ভালোবেসে,
উড়লো, আকাশ পারে।
চোখের জলে বিদায় নিল, কর্মভূমি ছেড়ে -
শুনতে পেল মধুর স্বরে -
কে যেন আজ ডাকছে তারে -!
আনন্দেতে হৃদয় উঠল ভরে।
ভাঙ্গাচোরা মরচেধরা - লোহার খাঁচার পরে,
প্রবাস হতে বনের পাখী
আজকে এল ফিরে।
পথভোলা সেই হারানো ভাই
স্বজন বন্ধু প্রতিবেশীর আনন্দাশ্রু ঝরে।
পুরানো সেই ফেলে যাওয়া -
খড়ের কুঁড়ে ঘরে -
ধন্য হ'ল, জীবন যে তার মায়ের চরণ ধরে।।

আহ্বান (Ahoban)

কত পরিবার হল যে উজাড় ,
 কাঁপে ভয়ে ত্রাসে সারা সংসার, 
কোথা হতে এর এই মহামারী, 
মোরা আজ কেহ বুঝিতে না পারি।
 আকাশে ঘনালো নিরাশা বাদল, 
চারিধারে ঘেরে অন্ধকার।
সারা পৃথিবীর এই যদি হাল,
কে কারে করিবে বলো উদ্ধার?
দেহ তো বন্দি গৃহ পিঞ্জরে।
খুলে দিও সবে হৃদয়ের দ্বার।
ঐক্যতানে স্নেহ প্রেম গানে ,
আসবে শান্তি ফিরে আবার।
বাঁচিবে মানব ,শুনিবে যখন,
 আশার রাগিনী চমৎকার।

জগন লেবারের প্রশ্ন (Jogon Lebarer Proshno)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শুশুনিয়া পাহাড় কোলে চাঁদড়া গাঁয়ে
বাগান তলে, -
ঘর ছেল্য মোর বড় সুকের
বাঁশের বাতায় ডিঙলা তলায়,
ফল ফলত্যো মাচায় ঢের
হলদ্যা হলদ্যা থোক্যা থোক্যা
ফুল ফুটত্যো ঝিঙার ঝার‌্যে।
সবুজ লরম কলমি শ্যাগ আর
লাউএর ডগা মনটি কাড়্যে।
মাটির দিবাল খড়ের ছাউনী
বেড়া দিল্যাম পখুর পার‌্যে।
বুড়া বাপ টা মহুয়া খায়্যে
বস্যে থাক্যে গাছের আর‌্যে।
বুড়ি মায়ী চাটাই বুন্যে
মুড়ি ভাজ্যে, চিড়া ঝার‌্যে।
বৌ টা আমার বড্ড স-জা
মুখটি খুলে "রা" না কাড়্যে।
আমার নামটি "জগন মনিষ"
মজুর খাটি বন বাদাড়্যে
ধানের খ্যাতে পিচ রাস্তায়
হ্যাঁট্যে যে যাই, কোদাল ঘাড়্যে।
কন্ডাকটর বাবুর সঙ্গ্য ধর‌্যে ছিলাম -
বাঁকুড়াতে,
বললেক উ - "শুনরে জগা -
তোর ঘরকে যাব্যো রাত্যে"।
- "ক্যানে? ক্যানে কিসের ল্যাগে"?
কথাটা হবেক বুঝাই দিত্যে।
- "ক্যানে? ক্যানে কিসের ল্যাগে"?
কথাটা হবেক বুঝাই দিত্যে।
"হ হ তোর ভয় নাই র‌্যে,
তোখে আমি যাব্যো লিত্যে
আমার ঠ্যাঁয়্যে থাকবি সুকে
কাজ করব্যি ফ্যাক্টরি ত্যে।
সনঝা রেইতে বাবু এলেন
আমার গরিব কুড়াট্যাত্যে
বললেক কথা হেস্যে হেস্যে
সিগারেট টা চ্যাপে ব্যাঁতে।
বাপটি উয়ার রগড় দেখ্যে
বসলেক এস্যে উঠান টাত্যে
ফুল বাবুট আইছে ক্যানে
সেই কথাট হবেক জানত্যে।
চলরে জগা "ডিল্ল্যি" যাব্যি -
অনেক ট্যাকা পইসা পাবি
বড় দরের "লেবর" হবি -
থাকবি কত্য আরাম করে
বছর বছর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লিয়ে
আসবি ঘরে।
বাপ বললেক - "ক্যানে ক্যানে?
ইখানে কি ভাত জুট্যে নাই?
জোয়ান ব্যাটা বৌকে ফ্যাল্যে
কুথায় যাবেক পালাই চল্যে
গরীব বটি দুঃখী তো লই
লুন পান্ত্যায় খুশিত্যে রই।
ছিল্যা ট খুব কথ্যা শুনে
জমি ট্যাতে আলু বুন্যে
উয়াকে কুথায় লিয়ে যাব্যে
গতর খাটাই, রাত্যে ঘুমাই
কাজ নাই তুমার কথ্যা শূন্যে।
- "ইটা তুমাক বলত্যে হবেক গো
জগার বাপ
বৌ ছিল্যা ট ও সঙ্গ্যেই যাবেক উয়ার।
গিন্নি মায়ের ঠ্যাঁয়্যে রইবেক।
তুমার ছিল্যা আমার ছিল্যা
আলাদা করলে চোলবেক ক্যানে
ধম্মে সইবেক নাই হব্যেক পাপ,
ভগবানেও দিবেক শাপ।
ইয়ার উপরে আর কথা তো নাই -
চলরে বধি "ডিল্লি" যাই -
ঠাঁয়্যের বড় মানুষ ট য়ে ঘরক্যে আইছেন,
ক্যামনে উনাক না বলত্যে পাই?
বাপ বুড়্যাটা বেবাক বোকা,
কথাট্যা উয়ার লাগল ব্যাঁকা
ভ্যাল ভ্যালায়ে তাকাই থাকে,
কানে গুঁজে পুড়া বিড়ি।
বুড়ি মা টা ও বস্যে থাকে,
হাতে লিয়ে ভাঙা ঝুড়ি।
লীলাচলের টেরন্যে - চেপ্যে
চল্যে এল্যম রাজধানী ত্যে।
দ্যেশের যত মুরুব্বিরা
সনতিরি মনতিরি হিথায় থাক্যে,
বাস ম্যাটরো ছুটছে হ্যাঁক্যে,
ধাঁ চকচকা রাস্তা বাজার -
স্বপন দেখায় 'মানুষ' দিক্যে।
'ফাকটোরি টা পিলাসটিকের -
মগ বাল্টি, তৈরী কর‌্যে
ডিল্লি শহর থ্যাক্যে কতক দূর‌্যে
পৌঁছে গেলাম টেম্পো ধর‌্যে।
পোটল্যা পুটলী ছিল্যা পিল্যা
লিয়ে গেলাম লয়ডা ঘু‌র‌্যে
শান্তির ঘুম হারাই গেল্য
এল্যম ইটা কোন শহ‌র‌্যে।
বাবু থাকেন ফারম হাউস,
আমরা থাক্যি ঝুগগি ঘরে
মেয়া মরদে ঘেষাঘেষি
পাশাপাশি লাইন ধার‌্যে
বিহার কিম্বা বিলাসপুরী
রাজস্থানী মাদ্রাজী ভাই,
সবাই মুরা একই জ্যাতের
"লেবর বঠি" নাম ধাম নাই।
মেশিন চালাই খটর পটর
সারাটা দিন শবদে কাট্যে
সনঝা বেলায় দেশির মদের
গন্ধ শুঁক্যি দড়ির খাট্যে।
বৌ গুলা সব বাবু বাড়ির
বাসন মাজ্যে কাপড় কাচ্যে
রাতের বেলা ফোঁস ফোসায়ে -
গাঁয়ের লেগ্যে কাঁদে হাঁচ্যে
পইস্যা লিয়ে ঘরকে যাব্যে
বুড়া বুড়িকে দেখতে পাবো,
আসবো নাই আর ডিল্লি দেশ্যে
ইখানে কি গরীব বাঁচ্যে।
পখুর লোদী ঝরনা নাই
হাওয়াই ধুলার গন্ধ পাই,
ছোট্ট একটা কল ঘরেত্যে
সিনান করত্যে সবাই যাই।
কথাই কথাই হিন্দি গালি
মা বোনেদের নামে এমন
অকথ্য সব ভাষা বুলি,
আমরা গাঁয়ে শিখি নাই।
তবু সময় যেথো কেট্যে
হঠাৎ সেদিন ফ্যাকটোরীতে
কে যে এস্যে ঝুলাই দিল্যেক
মস্ত বড় একটা তালা,
বাবু বললেক হেঁক্যে ডেক্যে
"লেবর লোক সব ইখান থেক্যে
জলদী পালা।"
'করোনা' রোগ আইছে তেড়্যে
যাক্যে পাবেক ধরবেক তাখ্যে
একা একা থাকত্যে হব্যেক
ক্যাটে পড়ো ইখান থেক্যে।
দল্যে দল্যে লেবর চল্যে
বোঁচকা বুঁচকি লিয়ে হাত্যে,
কাঁধ্যের উপরে ছিল্যা বস্যে -
চলছে সবাই গাঁয়ের পথ্যে।
জগন লেবর কেমন করে
পৌঁছাবেক ঘর যোজন দূর‌্যে?
রোগটা কেমন, ভূত না দানব!
কেউ তাখে না বুঝ্ত্যে পারে
মানুষ - মুনিশ লেবর লয় তো
জন্তু যেমন সার‌্যে সার‌্যে -
জঙ্গলটায় আগুন লাগলে
পালায় ছুট্যে নদীর ধার‌্যে।
'ভাইরাস' কি জানি না তো
খিদ্যের জ্বালায় সবাই মর‌্যে
আমাদিক্যে বাঁচাবেক কে
কেউ কি আজ বলত্যে পার‌্যে।
চলত্যে চলত্যে এক গাঁয়্যে ত্যে
থামলেক সব কুঁয়া দেখ্যে,
কালুর মা তাই - একটা থাল্যে -
ছিলার ল্যাগ্যে মুড়ি মাখ্যে।
এমন সময় পুলিশ এল্যো,
গাড়ি লিয়্যে ধরত্যে কাখ্যে?
উধার বাগে রাস্তা ধার‌্যে
ভিড় করেছ্যে কতক লোক্যে
বললেক সেই পুলিশ বাবু
জমা তোরা কখন থেক্যে?
একটা লেবর খ্যেপে ছিল্য
ঢিল ছুড়ল উয়ার দিক্যে,
ত্যখন আরো গোটা কতক -
পুলিশ নামলেন গাড়ি থেক্যে।
ধড়ধড়ায়্যে ডান্ডা মার‌্যে
ভয় খাওয়ালেক ডেক্যে হেঁক্যে।
মারের চোটে সবাই পালায়
ছুটল্য জমি মাঠের পার‌্যে।
আমার কালু ছুটতে লারে
হুঁচোট খালেক নালার ধার‌্যে।
রক্তে ভাস্যে বুকটা উয়ার
কপাল ফ্যাট্যে পড়ছে ঝরে
কুকুর বিড়াল লই গো বাবা
খেদাও ক্যানে অমন কর‌্যে?
পুলিশ গাড়ি গেল্য চল্যে -
এবার এল্যো ভটভটিত্যে -
দুই টা বাবু তর সয় না,
বললেক চল ফটো তুলত্যে।
শাড়ী কাপড় ছিড়্যে যখন
পট্টি বাঁধছি ছেলার মাথ্যে
তখন উটি খুলে দিলেক
রক্ত পড়ুক, দাও কাঁদত্যে।
'ইটা ক্যামন কথা হল্যো,
কি হবেক ঐ ফটো ট্যাত্যে?
খপর কাগজ ছাপবেক হে -
অধিকার টা হবেক লিত্যে।
"অধিকার" টা ক্যামন বঠে -
দ্যাখতে পেলাম না তো
তবু খিদ্যা প্যাটে মাঠ্যে মাঠ্যে
হাঁট্যে হাঁট্যে হল্যাম কাবু।
গাঁয়ের থেক্যে এলাম ক্যানে
আর কি যেত্যে পাবো কভ্যু?
দূ জনাকেই দণ্ডবৎ
সরকার আর রেপোট বাবু।
জগন লেবর প্রশ্ন করে -
ফুঁসছে যে সে দুঃখে রাগে,
আমরাও তো মানুষ বঠি
আমাদেরকে বাঁচাবেক কে?