পরশণে (Poroshone)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"ঠাকুরের" ভাব ছোঁওয়া কি লেগেছে !
"নরেনের" ডাকে বিবেক জেগেছে,
"বৈরাগ্য" - যে কামান দেগেছে, - মায়া মোহ, পায়ে দলা।
"মায়ের" পরশ জাগায় হরষ, - তোমরা করিছ, লীলা।
তোমাদের কথা স্মরণে মননে; জল হয়নি তো ঘোলা।
দয়া, ক্ষমা দিয়ে - "দাঁড়" বেয়ে যায়,
"তরী" এগুনোর হাওয়া - লেগেছে যে পালে, "মোহনার" পথ খোলা।
আজ কারো প্রতি নেই অভিমান, নেই রাগ অবহেলা,
কে যে গেল চলে ! কত ব্যাথা দিলে, এ সব বেদনা ভোলা।
বন্ধ থাকিনা কোন ঘেরা টোপে, বিপদকে ভয় পাই না আদপে,
শুধু ভালোবাসা, মন খুলে হাসা, টান-টুন ছিঁড়ে ফেলা।।

জপের – মন্ত্রে (Joper – Montre)

চন্দনা সেনগুপ্ত

পাহাড়ের - খাঁজে, পাথরের মাঝে,
ঘন বনানীর শ্যামলিমা -
একাকী বেড়াই, - কত দূরে ধাই, -
'কবিতা' দেবীর - "শব্দের" খোঁজে।
হাতড়াই যবে বালুকার পরে -
নোনা জল সেথা চিক চিক করে,
মাছরাঙা বসে, মোরে দেখে হাসে,
পাড়ে ঢেউ এসে, কী সে তাল বাজে।
আকাশে বাদল, হয় চঞ্চল,
পাখীদের দল করে - কোলাহল,
সূর্য কিরণে, এ ধরণী যে সাজে
"জপের" মন্ত্রে, তন্ত্রে তন্ত্রে -
হৃদয় যন্ত্রে শব্দ আওয়াজে
প্রাণ স্পন্দন, ছেঁড়ে বন্ধন কবিতা লিখতে -
মরি যে লাজে শব্দেরা মোর
হন্যে হয়ে যে - বেরিয়ে পড়েছে,
শব্দেরা আজ বেরিয়ে পড়েছে ,
ঠাকুর তোমার কাজে।

“বিবেক – অস্ত্র” (Bibek – Astro)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"বিবেকানন্দ" করিল মুগ্ধ - রাজা - প্রজা এই দুনিয়ার
"সপ্তর্ষির" শ্রেষ্ঠ ঋষি, যে খাপ খোলা এক তলোয়ার।
যেমন তেমন অস্ত্র সে নয়, ভীষণ তাহার কথার ধার।
অবশ, অচল - জীবন সচল পিছনের পানে দেখে না তো আর।।
ঝাঁপাইয়া পড়ে, পরের বিপদে - ঝঞ্জা হইতে করে উদ্ধার,
"বিবেকের বাণী" সার কথা মানি, পার হব এই ভব সংসার।।
তাঁর আহ্বানে - ভক্তের কানে বাজে অদ্ভুত এক ঝংকার,
"উত্তিষ্ঠিত - জাগ্রত" হতে মোদের বলেন, তিনি বার বার।
অসাধারণ প্রতিভার প্রভা, দেখিল যখন জগতের সভা,
বিচ্ছুরিত শত জগতের আভা, করিলেন তিনি চমৎকার।
'বিবেকানন্দ' নামে আনন্দ পবিত্র যে দেহের আধার
শিব জ্ঞানে জীবে সেবা যেবা করে, - সেই তো আসল বন্ধু তার।।

নতুন অধ্যায় (Notun Adhyay)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঠাকুর -
তোমার নাম নিয়ে মুখে -
মায়ের ছবির তকমা এঁকে বুকে -
স্বামীজীর দিকে একটু ঝুঁকে -
আবার এক নতুন পথের দিকে -
আমার যাত্রা হল যে শুরু।
জীবনের প্রত্যেক মোড়ে যখন রাস্তা হারিয়ে -
ভাবছিলাম এবার কোন ধারে
পা বাড়াই -
ঠিক তখনই ট্রাফিক পুলিশের মতন -
মাঝখানে দাঁড়িয়ে -
মার্গ দর্শন করিয়ে দিয়েছো তুমি,
আজও তাই করবে জানি।
তোমাকে জড়িয়ে ধরবে -
আমার জীবন তরু।
কারণ আমি তো বাঁদর ছানার মতন
তোমাকে আঁকড়ে থাকি না,
ভয় নেই তাই অপটু হাত ছেড়ে
পড়ে যদি যাই -
বরং এই ভক্তকে শক্ত করে ধরে রেখেছো তুমি।
যেমন মা বেড়াল তার ছানাটিকে
মুখে নিয়ে যে ভাবে চলে, ঠিক তেমনি, -
যেখানে, যেভাবে, যার কাছে রাখলে
রক্ষা পেতে পারি
সেই দিকে সর্বদা নজর রেখেছো তোমার
তাই তোমার ওপরেই সব ছেড়েছি আমি,
তুমিই ত্রাতা, পিতা অবতার
মোর আরাধ্য গুরু।।

গুঁজিভাঙ্গা মা (Gunjibhanga Maa)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শ্রী শ্রী মা যে ছিলেন মোদের
গুঞ্জিভাঙ্গা মা -
কোন বাঁধা, গণ্ডি, নিষেধ
কিছুই তিনি মানতেন না।
তার এক বিশেষ উদাহরণ
স্বামীর মৃত্যুর চারদিন পরে
দক্ষিনেশ্বর দর্শন।
 
লক্ষীমণি ভাইজি তাঁহার
যখন তাঁকে বলেন -
"তোমার এখন চলছে অশৌচ কাল"
'মা' মানতে নারাজ ছিলেন তাহা,
তাঁর মতে তো শুচি অশুচি
মনেরই জঞ্জাল।
 
ঠাকুর তাঁকে থান পরতে দেন নি
খুলতে দেননি হাতের বালা-চুড়ি -
লাল নরুন পার শাড়িতে ঘোমটা টেনে,
লজ্জা পটাবৃতা মা -
চলেন, রীতি মেনে।
কিন্তু শরীরে বা মনে,
হননি তিনি বুড়ি।
 
মা-সারদা - স্বরস্বতী, চোখে মুখে
জ্ঞানের জ্যোতি,
ছিলেন যিনি অতিসাধারণ
'রামলালের' ঐ খুড়ি।
 
"গুঞ্জিভাঙ্গা" কথার মানে,
বোঝার মতন লোক সেকালে
ছিলেন না তো কোনখানে।
মুসলমানের এঁটো তোলেন,
মাতাল ডাকাত জাত না মেনে।
মা বলে যে ডাকেন তাঁকে -
তারেই তিনি নেন যে টেনে।
গিরীশ, রাখাল, শরৎ, নরেন
মা বলে তো তাঁকেই চেনে।
আদেশ পালন করেন তাঁহার
ভক্তি করেন, মনে প্রাণে।
 
স্বর্গলোকের পরপারে
দেবী মা তো নন তিনি।
নিজের ঘরের আপন মা যে
সহজ সরল গৃহিনী।
মোদের ঠাকুর হন অবতার
দেবতা মোরা তাঁরে মানি,
সারদা মা ও নিত্যশুদ্ধা
ছিলেন স্বামীর পূজারিণী
সেবার ব্রতে ব্রতী হয়েও
ছিলেন গ্রাম্য রমণী
সংসারেতে সফল হতে
প্রচার করেন সহজ বাণী।
 
দূর-দূরান্ত হতে আসতো কতই ভক্তদল,
সঙ্গে থাকতো পুত্রকন্যা, করতো কোলাহল,
মায়ের হাতের রান্না প্রসাদ পেয়ে
বাড়ত তাদের সুখ শান্তি, জাগত মনে বল।
বিদায় দিতে গিয়ে মায়ের
ঝরতো অশ্রুজল।
মুখে থাকতো বুলি,
- "আহা বাচ্চাগুলি,
কত কষ্ট পেল হেথায়
আসতে গিয়ে বল"?
মা যে ছিলেন দয়াময়ী,
দীক্ষা নিয়ে ভক্ত পেত
তাই তো পুণ্যফল।
 
নারীমুক্তি সাধন তরে, শিক্ষা দানের লাগি,
'নিবেদিতা' কে মেয়েদের স্কুল
করতে, দিলেন উৎসাহ, -
শ্বেত পদ্মের মতন খুকী পেলেন তাঁহার
অপার স্নেহ।
বিদেশ হতে হেথায় এসে
ধন্য হল তাঁহার গেহ।
মায়ের আশীষ মাথায় নিয়ে
সামর্পিল মন ও দেহ।
 
"বেলুড় মঠে"র সংঘমাতা,
কিন্তু তো নন সন্যাসী
তবু লোকে ছুটে যে যায়,
তাঁর দর্শন প্রত্যাশী।
সহজ সরল জীবন কাটান
আপন হাতে ঝেঁটিয়ে উঠান,
কুটনো কোটেন, পানও সাজেন
মুখে নিয়ে মধুর হাসি।
 
ধনী নির্ধন সুখী-দুঃখী জন,
জড়ো হ'ল তাঁর গৃহে আসি,
গুরু রূপে চুপে চুপে,
পুজেঁ মাকে ভালোবাসি।
ঠাকুর তাঁকে রেখে গেলেন,
মোদের তরে এই জগতে
শিখিয়ে দিয়ে গেলেন গৃহীর ধর্ম,
শরণাগত থাকার কথা বুঝিয়ে দিতে
মা শেখালেন নাম জপেরই মর্ম।
দোষ দেখো না অন্য কারোর
করে যে যায় কর্ম
সব অবস্থায় মানিয়ে নিতে
পরো নামের বর্ম।
 
'সা' মানে সান্নিধ্য আর 'র' মানে রক্ষাকর্ত্তি
'দা' মানে দান করে যাও স্বরস্বতী জ্ঞানদাত্রী।
"সারদা" মা অপার দয়া, আমরা তোমার কৃপা পাত্রী,
নিজের আসল রূপ লুকায়ে, রাখো মাগো জগদ্ধাত্রী
গণ্ডি ভেঙ্গে এগিয়ে গেলে
ভক্ত তোমার পথের যাত্রী
তাই তো নিত্য প্রণাম জানাই
স্মরণ করি দিবারাত্রি।

“আমি’র” – পাগলামি (“Ami’r” Paglami)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমি চলে যাই, হয়ে "মীরাবাঈ",
শুধু গান গাই, "গিরিধারীর"
কৃষ্ণের প্রেমে - মাতোয়ারা হয়ে -
ছাড়ি তনু - মন - ধন ও শরীর।
"পাঞ্জাব" পথে "মারদানা" সাথে "রাবাব বাজিয়ে নানক" পন্থী,
হরি নাম গাই, অমৃতসরে "হরমন্দিরে" হবো যে গ্রন্থি।
"আজমীরের ঐ শরীফে" পৌঁছে - চাদর চড়াই আল্লাহ কে স্মরি -
"সুফী" ফকির হবার নেশায় বন-অরণ্যে বেড়াই ঘুরি।
'বারাণসীর' 'গঙ্গার' তীরে আবার আমার নৌকা ভিড়ে
'কবীরে'র দোহা গানে, এ মন আনন্দেতে যায় যে ভরে।
নবদ্বীপের "শ্রী চৈতন্য" পুরী ধামে গিয়ে করেন লীলা
ভক্তি প্রেমে - আকুল হয়ে - সাগর কূলে, কাটাই বেলা।
"বৌদ্ধ গয়া"- তে "বুদ্ধদেবের" স্তুপে গিয়ে যবে  ঠেকাই মাথা,
অহিংসা ও সত্যের বাণী - ভুলিয়ে দিল যে সব শোক ব্যথা।
"সব তীর্থ" পার হয়ে শেষে এলাম মায়ের স্নেহচ্ছায়।
ধন্য জীবন হেথায় এসে - "জয়রামবাটি আঙিনায়"।
"রামকৃষ্ণ" লীলা প্রসঙ্গ জুড়িয়ে দিল, প্রাণ ও অঙ্গ
ভুল ভ্রান্তি হইল ভঙ্গ - "কামার পুকুর বাটিকায়"।
তীর্থ ঘোরার নেশা হল শেষ
আসল সাধক পাগল দেখে
'মা' ও ঠাকুর, মর্ত্তে এলেন
গৃহী যাতে সাধন শেখে।
তাঁদের মতে সরল পথে - সঙ্গে রেখে সত্য - মাথে, -
কাম কাঞ্চন ত্যাগী হয়ে - চলব নিয়ে কৃপা সাথে।
ঘুচিয়ে দিও, সব পাগলামি - তোমার নাম-ই 'সবচেয়ে দামী'।
সুরক্ষিত দুর্গ-মাঝে, ব্যস্ত থাকি, গৃহ কাজে
লোভ, ক্রোধ-এলে মরি লাজে, ভুল করিলে দুঃখ বাজে -
তাই তো কৃপা মাগি স্বামী
"ঘুচাও আমি'র  সব পাগলামি"।।

প্রভু তোমার সনে (Probhu tomar sone)

চন্দনা সেনগুপ্ত

যখন তোমায় স্মরণ করি, যেমন ভাবে আঁকড়ে ধরি,
যেথায় তোমার সঙ্গে ঘুরি,
ভয় থাকে না মনে।
যারা তোমায় ভালোবাসে,
দুঃখ মাঝে কাঁদে হাসে কাটিয়ে ওঠে ,
বিপদ ত্রাসে সদা থাকি তাদের সনে।
এই পৃথিবীর সবুজ কোলে নানান রঙের পুষ্প দোলে,
নদী সাগর ঢ়েউ যে তোলে,
পশু পাখি ঘন বনে।
আমার পরাণ আনন্দে তে, জোয়ার জলে উঠছে মেতে,
ঈশ্বরেরই দয়া পেতে, চমক লাগে ক্ষনে ক্ষনে।

জপ-যজ্ঞ (Jopo Jogyo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

যোগ করা হল, অগ্নি মধ্যে ঘি, ধুপ, বেলপাতা,
অন্ন পুষ্প ঢাললেন, তাতে, ঋষি "সাগ্নিক" - "তিনি হোতা"।।
পবিত্র হল যজ্ঞের স্থল,
আগুনের শিখা হল, উজ্জ্বল।
"ওঁ" "স্বহাঃ" ধ্বনি করে বিহ্বল, স্তব্ধ ধরণী মাতা।।
"জপ যজ্ঞে" তে অগ্নি জ্বলেনি।
সামগ্রী নেই হাতে।
"যজ্ঞ-পাবক" উত্তাপ-হীন, মন ঢেলে দেন, তাতে।
অন্তর হতে কাম, ক্রোধ, ভয়, লোভ, মোহ, মাৎসর্য-
বিষয় বাসনা, ভস্ম করিয়া
বাকি রাখি, শুধু ধৈর্য্য।।
স্থির হয়ে বসি, - চক্ষু মুদিয়া. -
প্রদীপের তৈল-ভক্তি, "শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ" যজ্ঞ-অগ্নি-
"মা" যে দাহিকা - শক্তি।
করি এক মনে, "ঠাকুরের" নাম, ভুলে যাই যত যাতনা।
কাম, কাঞ্চন ত্যাজিয়া করিব - জপাৎ সিদ্ধি সাধনা।
শরণাগত হয়ে "গুরু" প্রতি, ভেসে যাব, ভাব স্রোতে-
অশ্রু বিন্দু ঝরে অবিরল, হৃদ নির্ঝর হতে।
প্রণাম তোমায় প্রণাম ঠাকুর - আজই সুন্দর প্রাতে
তোমার মূর্ত্তি শুধু জেগে রয় - হৃদয়ের আয়নাতে।।

উন্মেষণ (Unmeshon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে -
আমার ক্ষুদ্র জীবন নীড়ে -
তোমার মূর্ত্তি উন্মোচন, -
"ঠাকুর" আমার -
"মন - মন্দিরে" তব ভবনের উদ্ঘাটন।
তোমার লীলা ভবের খেলা, -
প্রভাত, সন্ধ্যা, রাত্রিবেলা, -
নতুন পথের প্রদর্শন।
মায়ের মিষ্ট বচন, কথন,
আলোক বর্ষা করে বর্ষণ।
এ জগতে আছে যত দুঃখীজন,
তাহাদের মনে, আশা বর্দ্ধন -
"শিব" জ্ঞানে সেবা, মহান কর্ম,
"নরেন" করেন সম্পাদন।
"কথামৃতের" সরল বাণী আত্মাকে করে আকর্ষণ, -
তাই তো সদাই তোমার "নামের"
ব্রত করি উদযাপন।
এলো বুঝি সেই শুভ লগন,
এসেছে আজিকে শুভক্ষণ,
'ঠাকুর মা' ও 'বিবেকানন্দ' করেন,
কী এক "সম্মোহন" -
শত দুঃখেও রহিনু মগন, -
নব নব ভাব - উদ্ভাবন, -
ছড়ালো নতুন উন্মাদন।
বাংলা মায়ের কোলে আজ হ'ল
এই "ত্রয়" "দেব" - সম্মেলন
বঙ্গের ভূমি ধন্য তাই তো
"মানব" "ধর্ম" - উন্মেষণ।

শরণাগত ভক্ত (Shoronagoto Bhokto)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আসিলে তিমির - আবার শিশির - হই যে "ভক্তি বিন্দু"
পাতার উপর জন্ম নিই, গো - এসো, তুমি কৃপাসিন্ধু।
ব্যাকুল হইয়া ডাকি বারে বারে - উদ্ধারিতে এসো গো আমারে।
"ঠাকুর - মা"-র বিরহ এ মন, জানাইবে, বলো করে?
হারাবার ভয় করিল ছিন্ন, -
এঁকে দিল, "গুরু" পদচিহ্ন, গৃহ দুর্গের উপরে -
শ্রী রামকৃষ্ণ সূর্য কিরণ, - আসিয়া পড়িল দুয়ারে।
শেষের সুদিনে অন্তিম ক্ষণে কৃপা করো তুমি মোরে।
শরণাগত ভক্ত তোমার পড়ে আছে তব দ্বারে।।