প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় -
বার্দ্ধক্যের দোর গোড়ায়
নতুন এক অদ্ভুত সময় - অধ্যায়ে এসে -
নতুন ভক্ত বন্ধু লাভ, -
বদলে দিল,
জীবনের মানে।
কে জানে ! কোনখানে জমা ছিল,
এতো হাসি-কান্না, চুনী-পান্না।
কে যেন হটাৎ বলে, - বুড়ো তো
হই নি এখনও।
ফিরে এসেছি আবার সেই শৈশবে।
আজকে তাই, পাল্টে গেল স্বভাব।
সম পর্যায়ের সম মনস্কতার -
সম ভাবনায় পোষা।
সন্তানের সাফল্যে গর্বিত আনন্দিত,
সমান মূল্যবোধে পালিত।
সম ধর্ম ধারণায়, বিশ্বাস ও চেতনায়
আপ্লুত কয়েকটি মানুষ -
যখন হন একত্রিত,
তখন তাঁদের মনে প্রাণে
লাগে আর এক নতুন রঙ।
খুলে যায়, কৃত্রিমতার আবরণ।
উজ্জ্বল এক আলোকে
হৃদয়ের উন্মোচন।
যখন -
ভাগ করে নেওয়া হয়,
সব দুঃখ সুখ,
স্মিত হাস্যে আবেগে আশায়
উদ্ভাসিত হয় সকলের মুখ।
তখন "ঠাকুর" বলেন, -
"এই তো তোমাদের মাঝে
এই যে অদ্ভুত প্রেম বন্ধন,
এই যে স্নেহ মমতা, ভালোবাসার
আলিঙ্গন, -
এই যে পাহাড় ঘেরা,
পুষ্পে ভরা শ্যামল
সবুজ প্রাঙ্গন, -
এখানে এই হাজার হাজার
শত শত কত ভক্ত
স্বজনের আগমন,
এতেই জাগবে -
উদ্দীপন"।
গৈরিকধারী ত্যাগী সন্যাসীদের সঙ্গে
তোদের আবার বিচরণ,
রৌদ্রে স্নাত, সুন্দর পরিবেশে
দূর্গা মায়ের রূপ বর্ণন,
সানাইয়ের সুরে, শিশুদের ঝংকারে -
অপূর্ব এক অনুরণন - এর
মধ্যেই তো আমার আগমন।
একে অপরকে ছুঁয়ে দেখো -
অন্তরে অন্তরে সেতু বন্ধন।
এতেই পাবে, -
আমার পরশন।
হবে অকাতরে আশীষ বর্ষণ
আর চলবে সবার তরে
প্রেম বিতরণ।
"মুখার্জী দা" কোন নাম নয় ।
কোনো ব্যক্তির নিছক উপাধি -
যদি হয়,
তাহলে আমাদের মনে সূর্যের মতন উদয়,
এক অত্যন্ত খাঁটি,
স্নেহশীল মানুষের মুখ,
প্রকৃত দয়াবান, দায়িত্ব সম্পন্ন -
দরদী সেই উদার মানুষের পাই
অপূর্ব পরিচয় ।
বন্ধু - স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী,
বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শিশু ও যুবক -
তরুণ তরুণী কিশোরী -
পুরুষ কি নারী, - সবাইকে
আপন করে নিয়ে, এক করে দিয়ে -
অসীম কৌশলে যিনি
করেছেন, সকলের মন জয় ।।
সেই ডি পি মুখার্জী দাদা কে -
প্রথম দেখি ঈশ্বর সুব্রত সেনের বাড়িতে ।
আমাদের 'মা' ভিলায় ।
স্মিত হাস্যে, অবলীলায়,
একেবারে ছোট বোনের মতন
নিজের করে নিতে -
ত্রিশ বছর আগে,
এখনও জ্বল জ্বল করছে সেই দিনটি
আমার স্মৃতিতে ।
মোহর ও পলা, -
তাঁর দুই কন্যা, মন মাতিয়ে দিয়েছিল, -
সারা ঘরের আবহাওয়া বদলে দিয়ে -
তাদের অপূর্ব কণ্ঠের
রবীন্দ্র সংগীতে ।
মৃদু মৃদু হাস্যে - অনাড়ম্বর আন্তরিক -
ভাষ্যে, তাঁর স্ত্রী অলোকা দিদিভাইকে
শুনেছিলাম কথা বলতে ।
চশমার আড়ালে তাঁদের দুজনেরই উজ্জ্বল দৃষ্টি
দেখেছি, সারল্যে ঝলমল ও স্নেহে টলমল করতে ।
পুরো পরিবারটিকেই এক মুহূর্তে -
বড় ভালো লেগে গিয়েছিল ।
বাঁকুড়া নিবাসী এই 'চন্দনা' সেদিন
বাড়ি ফিরেছিল, আবেগে আপ্লুত হয়ে -
তাঁদের কথা ভাবতে ভাবতে ।।
বেথুন শান্তিনিকেতনের থেকে আগত
এই মেয়েটির একসময়
সব পেয়েছির দেশে, রাজধানীতে এসে,
বড় একা লাগতো, কেন কে জানে ।
নিজের আত্মীয়, স্বামী, সন্তান, স্কুলের চাকরী
সব সাফল্যের পরশ পেয়েও
একটু বোধহয় অভাববোধ থেকে গিয়েছিল,
তার কর্মমুখর ব্যস্ত জীবনে ।
বাংলা সংগীত, নাটক, সাহিত্য থেকে দূরে
যেতে যেতে ফাঁকা ফাঁকা লাগত
কখনও কখনও, মনে মনে ।
ছাত্র ছাত্রী, সন্তান, বন্ধু কিম্বা
কাজের লোক, প্রতিবেশী
নতুন প্রজন্মের বঙ্গ প্রবাসী
সকলের সঙ্গে হিন্দি, ইংরাজীতে
অহরহ কথা বলার প্রাধান্যে -
প্রাণ যেন হাঁপিয়ে উঠতো ।
এলাম আমি এ কোন এক
রাজধানীতে, মানব অরণ্যে !
জগাখিচুড়ি ভাষার উদ্যানে -
জীবনের সেই ঠিক সন্ধিক্ষণে,
আমাদের মতন ঐতিহ্য ও কালচার
সচেতন কিছু মানুষকে একত্রিত করলেন,
তিনি ঋতুরঙ্গের অনুষ্ঠানে ।
'বাহার' এসে গেল, সেদিন আমাদের
মতন কিছু খেতে খাওয়া সংগ্রামী সংসারী
বাঙালী নর-নারীর জীবনে ।।
'মুখার্জী দার' বদান্যতায়
সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা হল 'মিলনী' ক্লাব ।
তাঁর কল্যানে - ও
স্বভাবের উষ্ণ প্রসবনে, নির্ঝরের মতন উদ্বীপ্ত
আবেগে আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা ।
ধন্য হল, ময়ূর বিহারের পূর্ব ও
পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী সন্তানেরা -
তাঁরই অবদানে ।
এ জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ ।
এতদিন মহালয়া সঙ্গেতালেখ্য শুধু
বেতারেই শুনতাম আমরা -
এবারে - যারা ছিলাম
সংস্কৃত উচ্চারণে অপটু বা কোনরকম
পূজাপাঠে অনভিজ্ঞ,
তারাও গুটি গুটি পায়ে দাদার ঐ
'সুপ্রিম' এনক্লেভের আলোকোজ্জ্বল
ড্রয়িং রুমে গিয়ে হাজির হতাম,-
তালিম নিতে ছিলাম অজ্ঞ ।
তবুও গান ধরতাম - "জাগো দূর্গা,
জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী" ।
মা দূর্গা ঐ সমবেত কণ্ঠস্বরে
কতটা জাগ্রত হতেন জানিনা, -
আমাদের মতন অনেক ঘরোয়া
কন্যা, বধূ, মা ও শ্বাশুড়ির মনে কিন্তু
জেগে উঠতো অপারআনন্দ - রোশনী
বড়োই উপভোগ্য ।
যেন আমাদের অন্তর হতে তুবড়ির মতন
আচমকা ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে আসা
জ্বলন্ত বারুদের ফুলকি -
সেদিনের সেই অপরিমেয়
আনন্দ ও উৎসাহের কথা ভাষায় ব্যক্ত
করতে আমি অযোগ্য ।
ষষ্ঠীর দিন থেকে বিজয়ের দূর্গাপূজার
উৎসবে দাদা ছিলেন কান্ডারী ।
সব আয়োজন ব্যবস্থা,
ভোগরান্না, প্রসাদবন্টন, শেষে বিজয়া
সম্মেলনে মাংস ভাত। কেটে যেত প্রভাত থেকে
রাত। সে এক বিরাট মহাযজ্ঞ ।
গীতায় পড়েছিলাম - লোভ, ক্রোধ, ক্ষোভ ভয়শূন্য
অভিমান অহংকার বর্জিত মানুষকে
বলে, - "স্থিতপ্রজ্ঞ" ।
আমাদের মুখার্জী দাদা ছিলেন, সেই দলে
জ্ঞানী, মোহমুক্ত, অভিজ্ঞ ।।
সেই সঙ্গে শুরু হল আরো
নানান ব্যাপার ।
স্থানীয় শিশুদের নিয়ে নানা খেলাধুলা
নাচ গানের প্রতিযোগিতা ।
কিশোরী তরুণদের গীতি নাট্য ।
বুড়ো ও যুবক তরুনের মিলিত প্রয়াসে
অভিনীত নাটক প্রহসন ।
কিশোর বালকদের মনোরঞ্জন করতে
ম্যাজিক প্রদর্শন ।
কলকাতা থেকে নিমন্ত্রিত শিল্পীদের দ্বারা
আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান, -
যা হতো ভীষণই মনোজ্ঞ ।।
তারপর এতগুলো বছর গেছে কেটে ।
দেশে বিদেশে, কাজে বা অবকাশে
ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি, কখনও যানবাহনে চড়ে -
কখনও পায়ে হেঁটে ।
বহু মানুষের মিছিলে সামিল হলে
নানা রকমের মানব চরিত্রের
সন্ধান মিলেছে, পুরোনো ও নতুন
পথে ঘাটে ।
কিন্তু চোখে পড়েনি আমার, কোনও তল্লাটে -
মুখার্জী দার সমতুল্য,
অসাধারণ নির্ভেজাল ব্যক্তিত্ব ।
আইনের দাড়িপাল্লায় যাঁর মাপ হয় না ।
এ কথাটি স্বীকার করে যাব আমি, -
আজ অকপটে ।
যাঁরা সর্বদা সৎ পথে চলেন,
ভিড়ের মধ্যেও সতত
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন,
দূর থেকেও যাঁকে চেনা যায় স্বভাবের মাধুর্য্যে -
তাঁরা তো চির নমস্য । তাঁদের সহজে -
খুঁজে পাই না আমরা, প্রতিদিনের জীবন যাত্রায়
আজকের - এই মূল্যবোধহীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের
হাটে - মাঠে বা বাটে ।।
কোভেট ১৯ এর আক্রমণে, বিশ্বের এই চরম দুর্দিনে, -
যখন সারা পৃথিবীর লোক কাঁপছে ঘরে বসে, -
তখন তাঁর পরিবারে না পৌঁছাতে পারার -আফশোষে,
কাঁদছে শত শত মানুষ ।
ময়ূর বিহারের বঙ্গ সমাজ আজ -
শ্রদ্ধা সম্মান ও হৃদয় উজাড়
শত শত বার
প্রণাম জানাচ্ছে
মুখার্জী দার মতন দেব-তুল্য
মহান প্রাণের মহাপ্রয়াণে ।।
Eons have flown past,
Races flourished and civilizations have turned to dust
Messengers of God have come and gone
Leaving behind the message of compassion and love
Buddha, Jesus, Mohammed opened the doors
of the peace and tolerance we morals need to become pure
But alas we humans lack the ken,
to see the rewards of the brotherhood of men.
And when the dark threatened to envelop,
You brought love and hope
You teachings were sublime, your message a mere hint,
Serve and care, for the present rather than worry about what still isn't.
You brought with you the ambrosia of humanity,
making people drunk on the wine of service and pity
You were a beacon whose light brought the drifted home,
whose touch brought out love and pity from a stone.
The oppressed, the deprived and the forgotten
were blessed with your compassionate touch
The enervated, the frail and the wingless,
Found strength and security in your heart.
The rich, the poor, the lepers and the outcasts,
all have been enriched by the strength of your love
Your eyes never saw any differences,
religion, casts, nor creed never put a veil on your senses.
In this battle stricken and war torn world
you took it upon yourself to wipe every-ones tears
You were proof of the existence of God,
who had sent you to comfort us and to soothe our fears.
O mother, O mother grant us the strength and the wisdom,
that we may have the fortitude and dedication
To keep serving and loving the week,
And that we may never lose track of our mission.
বিবর্তনের সহস্রযুগ, প্রানধারী জীব করেছে পার।
মানসিকতার গান শোনাবার
প্রয়াসী হলেন কত অবতার।
বুদ্ধদেব ও যিশুখ্রিষ্ট
মহম্মদের খুলেছে দ্বার
শান্তি প্রেম ও সহিষ্ণুতার
কথা শোনা গেছে শত শত বার।
এই বাংলার ঘরের মানুষ,
প্রতি মূর্ত্তি যে সরলতার -
'রামকৃষ্ণ' 'বিবেক' জাগান
জীব প্রেম ও জন সেবার।
তবুও হেথায় বিদ্বেষ আর হানাহানি কুসংস্কার।
অভাব এখনও স্বার্থ শূন্য
মহৎ সেবা ও ভালোবাসার।
এই দুর্দিনে মানুষের বনে,
শ্বেত পদ্মের মত বাহার -
অপুরূপ তুমি চুমিলে এ ভূমি,
মাদার আমার প্রিয় মাদার।
এতোদিন বাদে কী নতুন স্বাদে
অমৃত পাত্র সভ্যতার
হাতে নিয়ে এলে, সব দুঃখ ভুলে,
মন্থিত হ'ল, সাগর দয়ার।
ঈশের আশীষ ধন্যা কন্যা
অতুলনীয়া টেরেসা মার্ -
চরণধূলিতে পুণ্য জমিতে
মাথা নুয়ে আসে শত শত বার।
তপ্ত রিক্ত দুঃখে সিক্ত -
স্নিগ্ধতা পেয়ে হয়েছে মুক্ত
ক্লান্ত শ্রান্ত ডানা ভাঙা পাখী
পেল যে পরশ তোমার সুধার।
ধনী নির্ধন, ঘৃণ্য জীবন,
দলিত গলিত পঙ্কিল মন,
প্রেমের জাদুর ছোঁওয়ায় তোমার
হাল্কা সবার বোঝার ভার।
কারো প্রতি নেই কোনো অবিচার
প্রতিভূ তুমি যে উদারতার,
মধুর করুণা অসীম অপার
প্রণাম জানাই হৃদয় উজাড়।
আঁখি হতে যাঁর হাজার হাজার
স্নেহ নির্ঝর ঝরে অনির্বার।
বিংশ শতকে বিপুল পুলকে
জয়গান গাই "টেরেসা মা'র।
আমার বাবা স্বর্গীয় ডাক্তার কল্যানী প্রসাদ গুপ্ত আজ ১লা জুন জন্ম গ্রহন করেছিলেন ১০১ বছর আগে। তাঁর শ্রদ্ধা র উদ্দেশ্যে এই লেখাটি আজ Website এ দিতে পেরে আমার মন আনন্দ ভরে গেল।
সকলেই সুখে থাকঘনায় অন্ধকার
স্বর্গীয় ডঃ কল্যাণী প্রসাদ সেনগুপ্ত
হে মহাকাল আর কতকাল
বইব দেহের ভার
জ্বরাগ্রস্থ, রোগ ক্লিষ্ট,
অস্থি চর্ম সার।
যাতনা আর সহিতে নারি
রোগের জ্বালায় জ্বলে মরি
এবার কর পার।
প্রদীপের তেল ফুরিয়ে এল
নিভু নিভু হয়ে এল
ঘনায় অন্ধকার।
পিছন পানে চেয়ে দেখি
এ জীবনে করেছি কি
কারও উপকার?
কত ভুল যে করে গেছি
সারা জীবন ধরে
হিসেবে নাইকো তার।
হিসেবের খাতা খুলে
দেখি আমি হায়
জমার খাতায় শূন্য কেবল
পুন্য কিছু নাই।
স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আদি
আত্মীয় পরিজন
নাই অভিযোগ নাই কোন ক্ষোভ
নাইকো অভিমান।
আমি যেন কারও উপর
বোঝা না হই কভু
এই আশীর্বাদ মাগি আমি
তোমার কাছে প্রভু।
স্নেহ, ভালোবাসার জোরে
বেঁধেছে যারা মোরে
ঋণী আমি তাঁদের কাছে।
প্রতিদানে আমি হায়
কিছু দিতে পারি নাই।
সেই খেদ মনে রয়ে গেছে।
তাঁর চরণে এই কামনা জানাই
সুখে ও শান্তিতে তারা থাকুক সবাই।
আজি এই বিদায়ের ক্ষণে
প্রণাম জানাই আমি তাঁর চরণে।
আমার অবস্থা হচ্ছে
স্বর্গীয় ডঃ কল্যাণী প্রসাদ সেনগুপ্ত
আমার অবস্থা হচ্ছে -
দুটি চোখেই পড়েছে ছানি
দুটি কানেই কম শুনি
নাসিকায় গন্ধ পাই কম
দাঁত নাই চিবোতে অক্ষম
মাঝে মাঝে কাশি হাঁপানি
শেষ যাত্রার দিন গুনি।
সন্তান আত্মীয় স্বজন
সম্বন্ধে আমার
নাই কোন ক্ষোভ নাই অভিযোগ
নাইকো অভিমান
এই আশীর্বাদ করুন ভগবান।
আমার কন্যা হৃদয় আজ ধন্য হয়ে গেল। আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি কিন্তু জানি এবং মনে প্রাণে মানি, যে আমাদের বাবা ডাক্তার কল্যাণী প্রসাদ গুপ্ত ছিলেন একজন দেবতা তুল্য মানুষ। সংসারের কোন দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, রোগ, শোক, আঘাত তাঁকে বিচলিত করতে পারত না। প্রতিদিন সকালে তাঁর গীতা, উপনিষদ পাঠ, ধ্যান, জপ এবং তারপর সারাদিন রোগীদের মল, মূত্র, রক্ত পরীক্ষা একভাবে - ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে "মাইক্রোস্কোপে" বসে থাকা, মনে হত যেন কোন সাধক। বিভিন্ন রোগের জীবাণুদের সনাক্ত করে মানুষের দেহ থেকে তাদের বিতাড়িত তথা বিনষ্ট করার ব্রতে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যে বেলায় রোগী বা ওষুধ বিক্রেতা ও প্রতিবেশী আত্মীয় বন্ধুর দল তাঁকে ঘিরে ধরত।
সর্বদা স্মিত হাস্যে তাদের শুধু রোগ সংক্রান্ত নয় - ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান করতেও শুনতাম ও দেখতাম তাঁকে।
কখনও কখনও আবার রাত্রে কল আসত তাঁর। গ্রামে গঞ্জে গরীব-বড়োলোক, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান, দলিত যে কোন বাড়ি থেকেই ডাক আসত তাঁর।
যত কষ্ট করেই হোক, যত ঝড় ঝঞ্জা বা শীতের রাত হোক বা কালবৈশাখীর দুপুর - কেউ তাঁকে আটকাতে পারত না। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের বাঁকুড়াও ছিল অন্যরকম। এতো গাড়ী, বাস, যানবাহনের সুবিধা ছিল না তখন। রাস্তাঘাট প্রায় সবই - কাঁচা - ভাঙ্গা চোরা জল কাদায় ভরা, গন্ধেশ্বরী নদীতে বান এলে শহর থেকে গ্রামের দিকে যাওয়ার উপায় থাকতো না। এক্তেশ্বর মন্দিরের কাছে দ্বারকেশ্বরী নদীতে নতুন সেতু তৈরী হলেও পথটি ভালোভাবে তখনও পাকা করা হয়নি। তাও সেই সব বাধা ডাক্তার "কল্যাণীবাবুকে" কখনোই ঘরে বসিয়ে রাখতে পারত না। গরুরগাড়ি, সাইকেলে চেপেও দূর্যোগের মধ্যে তিনি পৌঁছে যেতেন রোগীর বাড়িতে। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অক্লান্ত চেষ্টায় তাদের প্রাণ বাঁচানোর সাধনায় তিনি মগ্ন থাকতেন।
একদিন ঐ রকম কালবৈশাখীতে ছুটে এসেছেন দুজন মানুষ তাঁতি পাড়া থেকে, বিদ্যুৎ পৃষ্ট হয়েছে তাদের দুই কন্যা একসঙ্গে। মা চিৎকার করে উঠলেন – “এই ধুলোর মধ্যে কী করে যাবে তুমি?”
বাবা আমাদের দুই বোনকে দেখিয়ে বললেন – “আমার বকুল মুকুলের মতন দুটি মেয়ের কারেন্ট লেগেছে দেখি যদি এখনো আশা পাওয়া যায় ওদের প্রাণের।”
একদিন শীতের রাতে ভীষণ জোরে দরজায় ধাক্কা। “পুনিশোল” নামে গ্রাম থেকে লোক এসেছে, তক্ষুনি যেতে হবে, ওরা জীপ গাড়ী নিয়ে এসে হাজির।
বাবার শরীরটা ভালো ছিল না। বেশ সর্দি কাশি হয়েছে। কিন্তু গলায় মাফলার জড়িয়ে চলে গেলেন, ওদের সঙ্গে। সকাল বেলায় শুনলাম - কুখ্যাত হাতকাটা ডাকাতের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো তারা। প্রথমে জীপে, পড়ে গরুর গাড়ীতে, লোকের কাঁধে চড়ে জমি-ক্ষেতের ওপর দিয়ে কাঁটা ঝোপের পাশে মধ্যরাতে পৌঁছেছেন তিনি রোগীর বাড়ি। ডাক্তারবাবু তাদের কাছে দেবতা। ভেদ বমি পায়খানা করে তাদের ছেলেটি প্রায় মরণাপন্ন। ডাকাত বলে যে দুর্নাম তাদের পরিবারের আছে, কে যাবে সেখানে জীবনের আলো জ্বালাতে! ছেলেটিকে ওষুধ, ইনজেকশন-স্যালাইন দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে পরেরদিন সকালে যখন বাবা বাড়ি ফিরলেন, তখন তাঁর চোখদুটি লাল, মাথার চুল ধুলোয় ধূসরিত - চেনা যাচ্ছে না। কিন্তু স্নান সেরে 'জপ' ধ্যান শেষ করে আধঘণ্টার মধ্যে হাসি মুখে তিনি আবার গিয়ে বসলেন নিজের চেম্বারে।
বাড়ির সামনে সারি সারি রিকশা, গরুর গাড়ী দাঁড়িয়ে। মল মূত্রের শিশি হাতে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষারত বাঁকুড়ার লোক এই মানুষটির আশায় পথ চেয়ে আছে। তিনি জীবাণুদের ঘেঁটে, ব্লাড কাউন্ট শুনে, তার গ্রুপ বের করে - সুগার - ইউসোনোফিলিয়া ইত্যাদি পরীক্ষা করে বলে দেবেন ঠিক কোন রোগটি হয়েছে। রোগ ধরা পড়লেই তো ওষুধটাও দিতে পারবেন ডাক্তার।
একদিন আমি বললাম ছেলেমানুষি দুষ্টুবুদ্ধি দিয়ে – “মাইক্রোস্কোপে” যখন চোখ রাখো বাবা, নাকটাও একেবারে নিচে নেমে আসে, তোমার গন্ধ লাগে না, ঘেন্না করে না।
আমার humourous বাবা উত্তরটা এড়িয়ে বললেন, “শোন, ঠাকুর রামকৃষ্ণের একটা গল্প বলি।”
এক ‘মেছুনী’ তার মাছের ঝুড়ি নিয়ে এক ফুলওয়ালী মালী-বৌ এর বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন। ঝড় জল হয়েছে, রাত হয়ে এসেছে, অন্য গ্রামে তার বাড়ি, যেতে না পারায় ঐ মালী বৌ-এর ঘরে রাত কাটাতে হবে তাকে। যে ঘরে তাকে শুতে দেওয়া হয়েছে ফুলের সাজিতে গোলাপ, বেলী, চম্পা, চামেলী ভরা। সুন্দর গন্ধে ঘরের বাতাস একেবারে ম ম করছে। কিন্তু মেছুনীর আর ঘুম আসে না। শেষে তার গন্ধ মাখা মাছের চুপড়িটা এনে সে যখন মুখের কাছে নাকের ওপর রেখে শুলো তখন -'আঃ কী সুন্দর' বলে ঘুমিয়ে পড়লো। সেই রকমই তোর ডাক্তার বাবাও সারাজীবন এই মল, মূত্র, রক্ত পুঁজের সঙ্গেই বন্ধুত্ব পাতিয়েছে । এদের গন্ধ সহ্য করেই তো রুটি রুজি চালাচ্ছি। তোদের মানুষ করতে পারছি রে।
‘ক’ দিন আগে আমাদের পাশের বাড়ির জ্যাঠামশাই ছুটে এলেন সকাল থেকে অন্তত দশবার - উনি আমার বাবাকে কখনও বাবু বলতেন না। ছোট থেকে ভীষণ ভালোবাসেন, জোর গলায় কথা বলেন – “ডাক্তার, ছেলেটা বড্ড হাগছে - কি করি বলো দেখি।” বাবা মিক্সচার বানিয়ে তিন/চার পুরিয়া দিয়ে তাঁকে ফেরত পাঠালেন বাড়ি। কিন্তু আধঘণ্টা যেতে না যেতেই আবার এসে হাজির তিনি। “ও ডাক্তার আবার হাগল ছেলেটা।”
ঘর ভর্তি রুগী, বাবা বলে উঠলেন – “আরে দাদা একটু ওকে হাগতে দিন না। ও যদি হাগে তবেই তো আমার ছেলেটা খেতে পাবে।”
হো হো করে হেসে উঠলো তখন সবাই। মুখে সর্বদাই থাকতো বাবার রসাত্মক কথাবার্ত্তা।
কলেজে, স্কুলে বন্ধু আত্মীয়দের বাড়িতে গেলেই শুনতাম, - “তোর বাবার মুখের মিষ্টি কথা, হাস্যরসাত্মক ভাষা সব রোগের কথা ভুলিয়ে দেয়।”
এতো কাজের মধ্যেও প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। তাই কথায় কথায় পরশুরাম, শিবরাম চক্রবর্তী, বনফুল, রবীন্দ্রনাথের গল্প, নাটক থেকে উদাহরণ দিয়ে চিন্তান্বিত রোগক্লিষ্ট, সংসারের জ্বালা-যন্ত্রনা পিষ্ট মানুষকে আনন্দ দিতে পারতেন তিনি।
সংস্কৃত, বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের ভান্ডার উজাড় করে এনে জমা করেছিলেন তিনি ঘরে। তাঁর সেই সুন্দর লাইব্রেরীতে ডাক্তারি বই যেমন ভরা ছিল, তেমনি থাকতো 'ফ্রয়েডের মতন মনোস্তাত্বিকের' সমস্ত বইও। Reader Digest দেশ, অমৃত, শুকতারা, শিশুসাথী সব নিয়ম করে আসত প্রতিমাসে। সন্ধ্যে বেলায় কখন যে পড়েও ফেলতেন বাবা কে জানে।
এর সঙ্গে চলতো তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনাও। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দের জীবনীর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সাধক, বিভিন্ন পরিব্রাজকদের ভ্রমণ কাহিনী। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা “অঘটন আজ ঘটে” কিম্বা “দানিকেনের বাংলা অনুবাদ” দেবতা কি অন্য গ্রহের মানুষ? পড়তে ও পড়াতে ভীষণ ভালোবাসতেন বাবা। জ্ঞানের রাজ্যে তাঁর এই অবাধ বিচরণ, দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি তাঁদের নতুন নতুন গবেষণার প্রতি অপরিসীম আকর্ষণ, তাঁর জিগীষা ও অধ্যাবসায় তাঁর আন্তরিকভাবে যে কোন বিষয়কে শেখার ইচ্ছা - এখনকার যুগে অতি বিরল। অসম্ভব স্মরণশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও আগ্রহ না থাকলে এতো বই একসঙ্গে কেউ পড়ে শেষ করতে পারবে না। কিন্তু বাবা এক মিনিটে বলে দিতেন সব উত্তর। ‘কি খুঁজছো মামনি’? - একদিন জিজ্ঞাসা করলেন আমায়, বিবেকানন্দ গ্রন্থাবলী ঘাঁটতে দেখে, বিখ্যাত কবিতার পংক্তি দুটো কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে তাই খুঁজে পাচ্ছিনা বাবা। আমার ইতস্ততঃ দেখে জানতে চাইলেন তিনি, “কোন পংক্তি দুটো বলো তো।”
“বহু মুখে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ – ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখো, ‘সখীর প্রতি’ কবিতার শেষ লাইন ঐ দুটি।” তারপর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন তিনি ঐ মহাপুরুষের জীবনী ঘাঁটছি বলে। খুব খুশি হলেন আমায় তাঁর গ্রন্থসঙ্গী পেয়ে। বললেন, - আর কোন ধর্মগ্রন্থ, শাস্ত্র, পুরাণ, দর্শন, ইতিহাস জানতে বা পড়তে হবে না তোমায়, শুধু এই দুটো লাইন - বিবেকানন্দের এই অসাধারণ উপদেশ আদেশ তথা প্রকৃত আদশ ধর্মের বাণী যদি তোমার জীবনে প্রয়োগ করতে পারো, তাহলেই জেনো, তোমার মানব জন্ম স্বার্থক হয়েছে।
বাবা নিজের জীবনে – “ঠাকুর ‘মা’ ও বিবেকানন্দের” বাণী নানাভাবে ‘কার্যকরী’ করে দেখিয়েছেন। সর্বদা ‘সাকারাত্মক’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ধৈর্য্যের বাঁধ কখনও ভাঙতে না দিয়ে, নানা সমস্যার মধ্যেও শান্ত সমাহিত - চিত্তে কাজ করে যেতে পারতেন তিনি, আমাদের জীবন ধন্য হয়ে গেছে এইরকম পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথের সেই গান, “তোমারি গৃহে পালিছ স্নেহে - তুমি ধন্য ধন্য হে” তিনি লিখেছেন, “পিতার বক্ষে রেখেছ - মোরে জনম দিয়েছ জননী ক্রোড়ে”, একথা মনে পড়লে, সেই স্নেহময় পিতার মুখের চাউনী, মধুমাখা ডাক, কোমল স্পর্শ আমাকে অশ্রসিক্ত করে।
সত্যিই তিনি ছিলেন - গীতার “স্থিত প্রজ্ঞ” ব্যক্তি।
দুঃখে উদ্বিগ্ন - না হয়ে সুখে স্পৃহাহীন থেকে, আসক্তি, ক্রোধ ভয় রোহিত যিনি থাকেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি। আমাদের বাবাও ঠিক তাই ছিলেন।
নিজের প্রতি একনিষ্ট ঈশ্বরের প্রতি শরণাগত, অবতারদের পায়ে নিবেদিত প্রাণ, পিতার মনুষ্যলীলার কথা এবার উল্লেখ করি।
আমাদের বাবা ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল ভালোমানুষ। সাংসারিক ব্যাপারে বিষয় সম্পত্তি টাকা পয়সা সম্পর্কে উদাসীন। আমার মা সংসারের ভার গ্রহণ করে ছিলেন বলে তাঁকে সমস্ত ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন তিনি। পাঁচ সন্তান সন্ততিদের প্রতি শুধু স্নেহশীল ছিলেন না, আত্মীয় স্বজনদের প্রতি ছিল তাঁর আন্তরিক প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক। নিজের কাকা মামা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ওপর অগাধ শ্রদ্ধা। প্রত্যেকের প্রতি ছিলেন তিনি কর্তব্য পরায়ণ ও অত্যন্ত দয়ালু। আপনজন সুদূর দিল্লী প্রবাসী তাঁর কাকা এই ভাইপোকে এতই ভালোবাসতেন যে অবসর পাওয়ার পর ঐ রাজধানীর পরিবেশ ছেড়ে বাঁকুড়ায় আমার বাবার কাছে এসে প্রতাপবাগানে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন।
বাবা আশুরিয়া, মালিয়াড়া, হাড়মাসড়া, লক্ষীশোল, আসানসোল - সিউড়ি সব জায়গা থেকে আগত স্বজন পরিজনের চিকিৎসা ও সেবায় সর্বদাই নিজেকে নিযুক্ত রাখতেন। ভাইপো, ভাইজি ভাগ্নে ভাগ্নিদের প্রতি অপরিসীম টান। নিজের দুই দাদা ও দিদিদের তিনি ভালোবাসতেন অসম্ভব রকমের। তাঁরাও এই শৈশবে মা হারা ছোট ভাইকে ভীষণভাবে স্নেহ করতেন।
আমার ঠাকুরদাও ছিলেন ডিসেরগড় হাসপাতালের ডাক্তার। থাকতেন সাঁকতোরিয়ার কোলিয়ারির কলোনীতে। বাবা সেখানেই বড় হয়েছেন। আমার বাবা যে কত দয়ালু ছিলেন তাঁর বদান্যতায়, সহায়তায় কত ছাত্র তাদের পড়াশুনো শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন তা কিন্তু কখনও কেউ জানতে পারেনি - সেই সময়। পরবর্তীকালে একবার কলকাতার ‘বিড়লা হাসপাতালে’, পরে দিল্লীর এ্যাপোলোতে এমন দুজন তরুণ ডাক্তারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে যাঁরা বাবার নাম শুনেই শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁরা জানালো যে বাঁকুড়া মেডিকেল এ পড়ার জন্য বাবা তাঁদের কতরকম ভাবে আর্থিক সাহায্য করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। বাবা আমাদের বলতেন – “বাঁ হাত দান করলে ডান হাতকে জানতে দিও না তাহলে দানের কোন মূল্য থাকে না” সেদিন বাবার পুরাতন ছাত্রদের স্মৃতিতর্পন করতে করতে আমি আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। বাবার মহানতায় নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল। শুধু ব্যক্তি বিশেষ কে নয় তিনি 'রামকৃষ্ণ মিশনে', ‘ভারত সেবাশ্রমে’, বাঁকুড়ার সরকারী অনাথ আশ্রমে নিয়মিত যেতেন। সেখানকার বৃদ্ধ, সন্ন্যাসী অথবা শিশুদের চিকিৎসা করতেন - তাদের সর্বপ্রকার সাহায্য দেবার কথা পরে আমরা আরও অনেক মানুষ ও মহারাজদের মুখে শুনেছি।
সদা হাস্যময় সদাচারী এই “কল্যাণী ডাক্তারের” প্রতি কত ধরনের দুঃখীজন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তাঁর পরিচয় পেতে গেলে আমাদের রানিগঞ্জের মোড়ে (যেখানে বাবার আগের চেম্বার ছিল) অথবা গোপীনাথপুরের তাঁতি পাড়ায় যেতে হবে। কত লোককে তিনি বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন, তা গুনে বলা যায় না। শুধু তাই নয় রক্ত পরীক্ষায় সেরকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তিনি। তাঁদের আত্মীয় স্বজন বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন বন্ধু প্রতিবেশীকে বোঝাতেন – “রোগকে ঘৃণা করো কিন্তু রোগীকে কখনও উপেক্ষা করো না।” নিজের লোকেরা অবহেলা করলে, মুখ ফিরিয়ে আপনজনকে দূরে সরিয়ে দিলে বা পৃথক করে রাখলে সে প্রাণে বেঁচেও মৃতপ্রায় হয়ে যাবে।
তাদের আরও বড় হাসপাতালে স্যানিটোরিয়ামে কুষ্ঠাশ্রমে তিনি নিজের পয়সা খরচ করে আরোগ্য লাভের জন পাঠিয়ে দিতেন। রোগ সম্বন্ধে অহেতুক ভয় ও সন্দেহ কাটাবার জন্য সমাজের মানুষকে সজাগ করবার তাঁর আন্তরিক প্রয়াস ও আগ্রহ ছিল অপরিমেয়। অন্যান্য মানুষ তাঁর থেকে কতটা উপকৃত প্রভাবিত হতেন জানি না। এত কিছু বোঝার বা উপলব্ধি করার মতন বয়স, বুদ্ধি বা মন তখন আমাদের তৈরী হয়নি। পরবর্তীকালে, নিজেদের এই সমস্যা সংকুল, ক্ষয়িষ্ণু - মূল্যবোধহীন মানবিকতা রোহিত সমাজে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিদ্ধস্থ হয়ে যখন জীবন কাটাচ্ছি, তখন মর্মে মর্মে অনুভব করছি যে বাবার মতন মহান মানুষেরা ছিলেন বলেই সংসার এখনও সুন্দর আছে। বাস্তব জীবনে তাঁর নিদর্শন উদাহরণ কার্যকরী করাই আমাদের প্রধান কর্তব্য।
স্বর্গীয় ডাক্তার কল্যাণী প্রসাদ গুপ্ত আমাদের পিতাশ্রীর মধ্যে ছিল একটা চাইল্ড লাইক সিম্প্লিসিটি।
ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গে তিনি মিশতেন, অত্যন্ত বন্ধুর মতন। ছোটবেলায় কোনোদিন বাবা আমাদের মারা তো দূরে থাক, একটা বকা ঝকাও করেননি। আমাদের যে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি, আমাদের মতন সহজ ভাবে বুঝিয়ে। গান, নাচ, নাটক, খেলাধুলা সব ব্যাপারেই তাঁর উৎসাহ ছিল অসাধারন।
১৯৬৫ সালে আমি একবার সূর্য্য গ্রহণ (বলয়গ্রাস) দেখে অন্ধ হয়ে যাই। সবাই আমাকে তখন কত বলেছিলো – “কেন সূর্য্যের দিকে খালি চোখে তুই তাকালি? বেশি কৌতূহল, দেখো এবার, বোঝো ঠেলা, বসে থাকো কালো চশমা পড়ে বাড়িতে।”
আমার বাবা কিন্তু একবার ও সে প্রশ্ন করেননি। আমাকে সাহস আর আশা জুগিয়েছিলেন, তাঁর বন্ধু, “ডঃ অবনী ভট্টাচার্য্যের” চেষ্টায় সে যাত্রায় আমি রক্ষাও পেয়েছিলাম।
সায়েন্স পড়া আর হয়নি আমার। বাবার একটা সুপ্ত ইচ্ছে - মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়নি, কিন্তু সে নিয়ে কোন হা হুতাশ, দুঃখ বা আফসোস করতে শুনিনি কোনোদিন তাঁকে। তাঁর দৃঢ় মনোবল, উৎসাহ ও সাকারাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে ঐ ১৫ বছর বয়সেই এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল, “বিপদে মোর রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রাথনা - বিপদে আমি না জেনো করি ভয়” - এই মন্ত্রে অনুপ্রাণিত করেন আমায় বাবা সেদিন। তাঁর সাহস প্রদান জীবনকে সহজ ছন্দে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছিল। আমাদের মনে কোনোদিন গ্লানি অর্থাৎ গিলটি ফিলিং আনতে দিতেন না তিনি। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ধানাই পানাই করে আমাদের শৈশব কৈশোরের সহজ অনাবিল আনন্দকে তিনি কখনও কোনোভাবে নষ্ট করতে চাইতেন না।
১৯৬৭ তে আমাদের পরিবারে গনুদাদার (বাবার পিতৃহারা স্নেহভাজন ভাগ্নে - যিনি তাঁর পুত্র অধিক প্রিয় ছিলেন) বিয়ে উপলক্ষে যে বিতর্কের ঝড় ওঠে অশান্তির আবহাওয়ার সৃষ্টি হয় আমাদের বাড়িতে তারও অত্যন্ত সুন্দর সমাধান সূত্র খুঁজে বের করে সবাইকে শান্ত করতে পেরেছিলেন তিনি। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল - এরকম, - আমাদের গনুদাদা শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করার পর কোন সরকারী ট্রেনিং নিতে আমেরিকায় যান। সেখানে তাঁর ভাব হয় এলিজাবেথ ড্যান্সির সঙ্গে। দুজনের প্রণয় - বিবাহ প্রস্তাবটা কিন্তু তৎকালীন হিন্দু বাঙালি সমাজ মেনে নিতে পারছিলো না। গনুদাদার ‘মা’ আমার ছোট পিসিমা ছিলেন বাল্য বিধবা, মাও এ ব্যাপারে ভীষণ প্রকাশ করেন, বিদেশী খ্রিস্টান মেয়ে কিভাবে আঙডিয়ার মতন জায়গায় থাকবে -- না না --- ন প্রশ্ন। বাবা কি সুন্দর উদার মনোভাব নিয়ে সবাইকে বোঝালেন কলকাতার কালীঘাট থেকে পুরোহিত আনিয়ে এলিজাবেথকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করলেন এবং হিন্দু মতেই তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হল। ৬/৭ বছর পর আবার গনুদাদাকে উৎসাহ দিলেন এলিজাবেথকে নিজের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।
সে দিনটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। বাবা লক্ষ্য করেছিলেন, এলিজাবেথ বৌমা পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। স্কুল পাশ করার পর সে জার্মানি ও আমেরিকার অনেক কলেজে ‘চিকিৎসাবিদ্যায়’ পড়বার সুযোগও পায়, কিন্তু গনুদাদার প্রেম তাঁকে এই ভারতবর্ষে টেনে আনে। এখানেই তাঁর দুটি সন্তানও জন্মায়। ১৯৭৪ সালে বাবা আমার বিয়ের ঠিক আগে একদিন গনুদাদাকে খুব সুন্দরভাবে বোঝাচ্ছিলেন – “একটা ডাক্তারি পাঠরতা মেয়ের জীবন কেন তুই নষ্ট করছিস? আমাদের দেশে মেডিকেল কলেজে ভর্ত্তি হওয়ার নানা সমস্যা আছে বিদেশিনীর পক্ষে। ওকে ওর আমেরিকায় ফিরিয়ে নিয়ে যা, ওর ডাক্তারি পড়াটা আবার শুরু কর। ও দেশে বেশি বয়সে পড়া সম্ভব।” সেই বছরেই বাবার আদর্শে প্রনোদিত হয়ে গনপতি সেনগুপ্ত এবং এলিজাবেথ আবার শিকাগো চলে যান এবং বৌদি ডাক্তারি পাশ করে বাবার মতন একজন (বিশেষজ্ঞ) প্যাথলজিস্ট রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পান।
আমার মনে এই বিশেষ ঘটনা ভীষণ ভাবে দাগ কাটে পড়াশুনোটাকে - বাবা কতটা ভালোবাসতেন সেটা অনুভব করে মন আনন্দে ভরে ওঠে।
পরবর্তীকালে একবার আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রবাসী বাঙালির বাড়ি বেড়াতে গেছি, ভদ্রলোক যেই শুনেছেন যে আমাদের বাড়ি বাঁকুড়ায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে জানতে চাইলেন, “শহরের কোথায়? আমরাও তো ছোটবেলায় ঐখানেই কেটেছে।”
আমি উত্তর দিলাম - জেলখানার পেছনে।
প্রশ্ন কল্যাণী গুপ্তর বাড়ির কাছে – “ঐ বাড়িটাই তো আমাদের বাড়ি। আমি ওনার মেয়ে।” তিনি সোফা থেকে উঠে এসে জড়িয়ে ধরলেন আমায়, - “আরে তুমি ডাক্তারবাবুর মেয়ে? আমার তো তাহলে একেবারে নিজের বোন। তোমার বাবার ওষুধ খেয়েই তো আমরা ছোটবেলায় কত অসুখ থেকে সেরে উঠেছি। এত দেশ ঘুরলাম কিন্তু ওরকম একজন ডাক্তার বা ভালো মানুষ আর দেখলাম না। তাই তখন থেকে ভাবছি তোমাকে তো একেবারে বাবার মতন দেখতে।”
আনন্দে সেদিন আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল, - এটাই তো আমার ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া - শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ একবার বলেছিলেন, - “তিন রকমের ডাক্তার আছেন। একজন চুপ করে শুধু রোগীর কথা শুনে ওষুধ দেন, তারপর তাকে ভুলে যান, দ্বিতীয় জন পরেও তার খোঁজ খবর নেন, আর তৃতীয় জন সেই রোগী তেতো ওষুধ খেতে না চাইলে তার বাড়ি গিয়ে তাকে চেপে ধরে জোর করে ওষুধ খাইয়ে দেন।”
আমাদের বাবাও রোগীকে রক্ত ও শরীরের সব বর্জ্য পদার্থগুলি মল, মূত্র পরীক্ষা করে প্রথমে রোগ নির্ণয় করতেন, সেটি কতটা খারাপ অবস্থায় এসে মানুষটির জীবন সংকট সৃষ্টি করেছে, তা বোঝবার ও তার বাড়ির লোককে বোঝাবার তথা আশা ও সাহস দেবার চেষ্টা করতে; - দুরারোগ্য কোন রোগ জীবাণুর সন্ধান পেলে, সেটি সংক্রামক কিনা, সমাজে, পরিবারে তাকে ত্যাগ দিয়ে এক ঘরে করা উচিত কিনা, সে বিষয়েও নিজের বিচার জানাতে দ্বিধা বোধ করতেন না তারপর নিজে হাতে ওষুধও বানাতেন। তার জীবিকা শুধু ডাক্তারি নয়, তিনি যে একজন সার্থক সমাজসেবক পারিবারিক বন্ধু - পরম প্রিয় গুরুর ভূমিকা পালন করতে সচেষ্ট হতেন, তা আমরা গভীরভাবে অনুভব করেছি। বাড়ির ঝি, চাকর, গোয়ালা, ধোপা, ডিম সবজি বিক্রেতা - মুচি, মেথর - সবাই ছিল তাঁর প্রিয়জন - কৃপার পাত্র। কখনও কোন জাত, পাত, ধনী, নির্ধনের ভেদাভেদ করতে দেখিনি তাঁকে আমরা। হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গার সময় নিজের চেম্বারে ওষুধের প্যাকিং বাক্সে বেশ কিছুদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি মুসলমান হাবিব দর্জিকে।
কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, জনসংঘ কখনও কোন রাজনৈতিক দলভুক্ত হতে দেখিনি তাঁকে। কখনও পরচর্চা পরনিন্দার আড্ডায় সময় নষ্ট করতেও দেখিনি। তখনকার দিনে টিভি, কম্পিউটার, ফেসবুকও ছিল না। তাই তাঁর মতন অকৃত্রিম সহৃদয় অল্পে সন্তুষ্ট ধৈয্যশীল মানুষ পৃথিবীর আবহাওয়াকে সর্বপ্রকার দূষণমুক্ত সুন্দর ও বসবাসের যোগ্য করে রেখেছিল। ভগবানকে শতকোটি ধন্যবাদ দিই, আমাদের ঐ রকম পিতাশ্রী উপহার দেওয়ার জন্য।
(পূর্বকথা পারিবারিক)
বাঁকুড়ার প্রখ্যাত ডাক্তারবাবু (সার্জেন) শল্য চিকিৎসক ডঃ অনাথ বন্ধু রায় দেখা করতে গেছেন ‘বাঁকুড়া খ্রিস্টান’ কলেজের পদার্থ বিদ্যার প্রফেসর “ললিত মোহন গুপ্তের” বাড়ি। তিনি আবার ছদ্ম নামে (অমলা দেবী) গল্প উপন্যাসও লেখেন। ভীষণ কৌতুক প্রিয় হাস্যরসিক মানুষ। অনাথ বাবু গম্ভীর স্বভাবের জ্ঞানী সিরিয়াস ব্যক্তি। অনুরোধের স্বরে অধ্যাপক বাবুকে বললেন, “আপনার সন্ধানে কোন ভালো বদ্যি “পাত্র” আছে নাকি? মেয়ে আমার ষোলো বছর পার হল, ম্যাট্রিক পাশ করে “আই-এ” পড়ছে।”
প্রফেসর – “পাত্র? স্বর্ণপাত্র, রৌপ্য পাত্র, কাংসপাত্র - কোন ধরণের পাত্র চান আপনি?”
অনাথবাবু – “মানে?”
কাংস পাত্ররা কেরানী, দোকানি, রৌপ্য পাত্র - শিক্ষক, ব্যবসাদার আর স্বর্ণপাত্র হল - ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। হা হা করে হেসে উত্তর দিলেন তিনি।
হেঁয়ালী না করে একটি ভালো বুদ্ধিমান সদবংসের ডাক্তার ছেলের সন্ধান থাকে তো বলুন।
হ্যাঁ আছে বৈকি। আমার ভাইপো কল্যাণী প্রসাদই তো আছে। কলকাতা মেডিকেল-এ সে এবার প্যাথলজিতে ক্লাশ অ্যাসিস্ট্যান্স হয়েছে। খুব মেধাবী, মাত্র ২২ বছর বয়স। আর ওর বাবাও তো “ডিসেরগড়” হাসপাতালের ডাক্তার। সাঁকতোড়িয়ায় থাকেন। বিস্তারিতভাবে পাত্র পরিচয় দিলেন ললিতবাবু। ‘অনাথবাবু’ ভীষণ খুশি হলেন। ১৯৮২ সালে বিয়ে হয়ে গেল তাঁর কন্যা চিন্ময়ী দেবীর সঙ্গে কল্যাণী প্রসাদের। মাতৃহারা জামাইকে স্নেহ মমতায় ভরিয়ে দিলেন শাশুড়িমাতা শ্রীমতি অন্নপূর্ণা দেবী। শ্বশুর চাইলেন এই বুদ্ধিমান মেধাবী তরুণ চিকিৎসককে বিলেত পাঠাতে। কিন্তু সেই ছেলে তখনই পন করেছেন স্বাধীনভাবে প্র্যাক্টিস করবেন। বাঁকুড়ার সাধারণ রোগক্লিষ্ট মানুষের প্রকৃত বন্ধু হতে চান তিনি। বাজারে তাঁর এক পরিচিত আত্মীয় “খোকন মামার” দোকানে একপাশে একটি মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসে গেলেন, রোগ নির্ণয়ের ল্যাবরেটরী খুলে। তারপর একটু নামডাক হতেই রাণীগঞ্জের মোড়ে (রাংতা পানের বিখ্যাত দোকানের উল্টো দিকে) একটি ভাড়া বাড়িতে হল তাঁর চিকিৎসা কেন্দ্র, নাম “পূর্ণচন্দ্র ক্লিনিক”। কম্পাউন্ডার গোবর্ধন ও সহকর্মী রূপে পেলেন সুশীবাবুকে। বাস করতেন গোপীনাথপুরের তাঁতীপাড়ায়। সেখানকার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন দেবতার সমতুল্য। কারও ছেলের বমির সঙ্গে উঠে এসেছে বিরাট একটি সর্পাকৃতি কৃমি, ডাক্তারবাবু একমিনিটও দেরী না করে গভীর রাতে তাকে বাঁচাতে ছুটলেন পুকুর পাড় ধরে। জ্বরের ঘোরে বিকারগ্রস্থ কন্যা ভুল বকছেন, বাড়িতে কান্নার রোল উঠে গেছে, ডাক্তারবাবু সবাইকে বকে ধমকে এক পাশে বসিয়ে নিজে সারাদিন রাত তার মাথার কাছে বসে রইলেন ইনজেকশন হাতে নিয়ে। যতক্ষণ না তার জ্বর নামল, তার মা বাবা আত্মীয় স্বজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তিনি নড়লেন না সেখান থেকে। খুব ছোট বেলায় তাঁর মাতৃবিয়োগ হয়েছিল। বড় দিদি মাধবীলতা বাল্য বিধবা ছিলেন এবং ছোট দিদি দুর্গাও ছোট ছোট দুটি দুধের শিশু নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। সমাজে ঐ দুঃখী অসহায় বিধবাদের প্রতি তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মেছিল সেই কিশোর বয়স থেকেই। গ্রামের সব বিধবা মাসীমা, পিসিমা, জ্যেঠিমা, কাকিমাদের কাছ থেকে তিনি কখনও ফিস নিতেন না তাদের পূজো অর্চনা, ব্রত উপবাস, অম্বুবাচী সবসময় টাকা পাঠাতে বা অনেককেই ওষুধ পথ্য অন্ন বস্ত্র পাঠিয়ে সাহায্য করতে দেখা যেত তাঁকে।
আমাদের দাদু তাঁর শ্বশুর মশাই ডাক্তার অনাথ বন্ধু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান রায়ের অনুরোধে ১৯৫৭ সালে নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচিত হন এবং ভোটে জেতার পর পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ মন্ত্রীর পদ অধিকার করেন। কিন্তু আমার বাবাকে কখনও দেখিনি তাঁর কাছ থেকে কোনরকম সুযোগ সুবিধা নিতে বা অহংকার প্রকাশ করতে। সর্বদা নিজের কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে যেতেন তিনি অতি নিঃশব্দে। রাজনীতির জগৎ প্রতিপত্তি, সামাজিক পদমর্যাদা বা সম্মান পাওয়ার লোভে তিনি একদিনের জন্যও নিজের চেম্বার ল্যাব বা রুগী ছেড়ে কোথাও যেতেন না। প্রত্যেককে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে নিষ্কামভাবে অত্যন্ত ধৈয্যশীল হয়ে তিনি এক সাধকের মতন নিরলস সাধনায় যেন ডুবে থাকতেন। তাঁর ‘হবি’ ছিল নাটক করা। অত্যন্ত ভালো উঁচুদরের অ্যাক্টর ছিলেন তিনি। কিন্তু ডাক্তারি পোশাকে করে (প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও) কোনভাবেই পথভ্রষ্ট হতে তাঁকে দেখিনি কেউ। ধন্য ছিল তাঁর জীবনের মূল্যবোধ। সন্ধ্যে বেলায় বাবা এসে বসতেন আমাদের ওপরের গোল ঘরটায়। মা নিয়ে আসতো হারমোনিয়াম। আমরা ভাই বোনেরা গান গাইতাম “আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে।”
এসো এসো আমার ঘরে এসো বাবার প্রিয় গানগুলোও মাঝে মাঝে বাজানো হতো রেকর্ড প্লেয়ারে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান - দিলীপ রায় গেয়েছিল, সেই উদ্যোত্ত কণ্ঠস্বরে বাবাকে ভীষণভাবে মোহিত করে রাখত। চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে তিনি গান শুনতেন। মায়ের গলায় ‘রাম নাম ঘন শ্যাম শিব নাম - শিবরি দীন নাম’, তাঁর খুব ভালো লাগত। কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় গান দুটো যা তাঁকে গাইতেও শুনেছি “তাই তোমার আনন্দ আমার পর” এবং “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।”
পিতা থেকে পিতামহ - ১৯৭৪ সালে বিয়ে এবং ১৯৭৬ এ প্রথম জন্ম নেয় আমার ছেলে। জানুয়ারী মাসের প্রচন্ড শীত। বাঁকুড়ায় বাবার বন্ধু “ডঃ দূর্গা মুখার্জীর” নার্সিং হোমে। প্রসব বেদনায় কষ্ট পাচ্ছি সারা রাত ধরে। বাবা পাশে বসে আছেন, কখনও মাথায় হাত বোলাচ্ছেন, কখনও সহ্য শক্তি বাড়ানোর জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন।
“মা হওয়া কি মুখের কথা? কত কষ্ট, কত বেদনার সাগর মন্থন করলে মা ডাক শোনা যায়।” ঢেউয়ের মতন ব্যাথা আসছে, আবার চলে যাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করছি – ‘আর কতক্ষন বাবা?’ তিনি দূর্গা জেঠুকে ডেকে এনেছেন। দ্বিতীয় দিন অপেক্ষা করার পর তিনি স্থির করলেন, ‘অপারেশন’ করতে হবে। বাবা চুপ করে কয়েক মিনিট আমার সামনে বসে জপ করলেন। তাঁর সেই স্নিগ্ধ রূপ, শান্ত চেহারা ভাগবদ বিশ্বাস, আমার মনের জোড় আরও বাড়িয়ে দিল। তাঁর আশীর্বাদের পরশ মাথায় নিয়ে নির্ভয়ে আমি চললাম; পৃথিবীতে নতুন জীবন আনয়নের প্রয়াস করতে ক্লোরোফর্মের মিষ্টি তীব্র গন্ধ ভরা ঘরে নার্স মায়ার সঙ্গে। পুত্র জন্মাবার পর শুনলাম বাবা বলছেন, ‘ওঃ বড্ড ভোগালো নাতি সাহেব’, এমার্জেন্সি সিজারিয়ান না করলে আজ বিপদ হয়ে যেত।” ধন্যবাদ দুর্গাবাবু এই সিজার করে ‘জুলিয়াস সিজর’ কে জগতের আলো দেখানোর জন্য। মামনির জীবন রক্ষা করলেন আপনি। এক ডাক্তার পিতা আর এক ডাক্তারকে এরকমভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দৃশ্যে সেখানে উপস্থিত নার্স, কম্পাউন্ডার, আত্মীয় স্বজন আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন।
১৯৮০ সালে এবার বাঁকুড়ায় নয় দ্বিতীয় পুত্রের জন্মকালে প্রথমে চিঠি লিখে - পরে ট্রাঙ্কলে অনুরোধ করলাম বাবাকে দিল্লী আসবার জন্য। কোনদিন চেম্বার রুগীদের ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে পারেন না। ছোট থেকে তাঁকে সর্বদায় অন্যদের জন্য ব্যস্ত থাকতে দেখে অভ্যস্ত আমরা। এবারে কেন জানিনা আমাদের মনে হল ঐ মানুষটিকেও তো একটু ছুটি দেওয়া দরকার। এই বাহানা বা অজুহাতে বাবা এলে একটু আগ্রা ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে - জামাই নির্মল প্রসাদের সেটাই বিশেষ ইচ্ছা। সারা জীবন ঐ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রেখে তিনি সময় কাটাচ্ছেন, আমাদেরও তো কর্ত্তব্য একবার অন্তত তাঁকে বাইরে বেড়াতে - ঘোরাতে নিয়ে যাই। এয়ার লাইন্স-এ কর্মরত স্বামী ভীষণভাবে পীড়াপীড়ি করায় এবার বাবা রাজী হলেন। ‘অক্টোবর মাস’ পুজোর সময় তিনি দিল্লী এসে লক্ষীপূজো পর্যন্ত ছিলেন এই রাজধানীতে। আমার দ্বিতীয় পুত্র প্রসব হল, এবারেও সারাক্ষন নার্সিং হোমের বাইরে কাটালেন বড় নাতিকে সঙ্গে নিয়ে। তাঁর মধ্যে একটা অদ্ভুত সুন্দর ভাব ছিল যা শিশুদের মুগ্ধ করত। গল্পে কথায় যেমন তিনি ছোট বাচ্চাদের মাতিয়ে রাখতেন তেমনি তাদের যথাযত সম্মানও দিতেন, তিনি তাদেরকে কখনও নাম ধরে ডাকতেন না, বা তুই তোকারি করতেন না। সর্বদা দাদুভাই রানা দাদা ছাড়া তাঁর ডাক ছিল না। নিজে ঘোড়া হয়ে নাতিকে পিঠে নিয়ে ঘুরতে তাঁর খুবই আনন্দ ছিল। আমাদের বকুনিও খেতেন এরকম বাচ্চামো করার জন্য। কিন্তু নাতিদের মন তিনি অল্প সময়ের মধ্যে জিতে নিতেন এবং নিজেও শিশুর মতন ব্যবহার করতেন। “আবোল তাবোল” বা শিশু বইয়ের বহু কবিতায় তাঁর মুখস্ত ছিল। আমার বড় ছিলেন মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সেই শৈশব থেকে তিনিই জাগিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের জন্য কখনও কোনও দামী জামা কাপড় কিনতে দেখিনি আমরা। জোড় করে একটা সুন্দর স্যুট বানিয়ে দেওয়া হল বাবাকে। জামাই প্লেনে করে আগ্রা ঘোরাতে নিয়ে গেল। মাত্র আধঘণ্টার আকাশ ভ্রমণ, ছোট্ট বালক কিশোরের মতন আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠে প্লেন সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতে লাগলেন। আগ্রার ফোর্ট, তাজমহল দেখতে গিয়েও স্কুলের ছাত্রদের মতো তাঁর কৌতূহল বা প্রশ্ন শুনে নির্মলবাবুর মনে হল উনি যেন এক সহজ সরল কিশোর। আমি তখন সদ্যজাত পুত্র নিয়ে নার্সিং হোমে বিশ্রামরত। বড় ছেলে সিজার ওরফে রানা সেদিন দাদুর কাছে “সৌরভ – রুস্তমের” গল্প শুনে যোদ্ধা যোদ্ধা খেলাটা রপ্ত করেছিল তাই ছোট ভাইকে সেই নাম দিয়ে দিল 'রুস্তম'। বাবার আগমনে আমাদের জীবনে এক অনাবিল আনন্দে ভরে গেল। আমরা ধন্য হলাম এক মহান স্নেহশীল জ্ঞানী পিতার সান্নিধ্যে।
মাতা পিতা তাঁদের সন্তানের জন্য কত প্রয়াস করেন, কিন্তু তাঁদের সেই অবদান আমরা ছেলেমেয়েরা কি শুধু গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হয়ে যাই, আমাদের পরবর্তীকালে এত ব্যস্ততার মধ্যে কাটাই যে তাঁদের ঐ নিঃস্বার্থ স্নেহের মূল্য চুকাবার অবসর পাইনা। বিশেষতঃ এই কন্ডিশনের যুগে আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এমনভাবে বন্ধি করে রাখে যে আমরা আর ফিরে তাকাতে তাঁদের সেবায় নিজেদের নিযুক্ত করতে পারিনা। আমার মনে হয় পারি না নয় পারলেও সময়ের অভাবের অজুহাত দিয়ে, কর্মক্ষেত্রের নানা সমস্যাকে সামনে দাঁড় করিয়ে আমরা এ যুগের তোমাদের আগেকার যুগের লোকেদের থেকে আমরা খুব ব্যস্ত এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি কর্ত্তব্য করতে পিতাকে কত যে অবজ্ঞা করেছি, জ্ঞানে বা অজ্ঞানে তা বলতে পারি না।
এখন আমরাও ৭০/৭৫ এর কোটায় এসে অনুভব করি পিতাকে তাঁর উপযুক্ত সম্মানটুকুও হয়তো আমরা দিতে অপারগ হয়েছি। আমার বাবা একবার বলেছিলেন - জানিস, মামনি এখন বিদেশে খুব ভালো ভালো নতুন ধরনের 'মাইক্রোস্কোপ' আবিষ্কার হয়েছে। ঘাড় কাৎ করে সারাক্ষন নীচু হয়ে ঐ যন্ত্রে আর চোখ রাখতে হবে না। এরকম একটা যদি পেতাম….
আমার সংসারে তখন অর্থানুকূল্য আসেনি। স্কুলের চাকরিতে তখন খুব কম মাইনে পাই। বি এড পড়ছি, শিক্ষিকার পদ যাতে পার্মানেন্ট হয় তার জন্য। আমার পিতৃহারা স্বামী বোনদের বিয়ে, দশ ভাই-বোনের বৃহৎ পরিবার, মায়ের অসুস্থতায় বিব্রত। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমার দেবতুল্য বাবাকে ঐ রকম ‘মাইক্রোস্কোপ’ কিনে দিতে পারিনি। হয়তো সে কথাটা ভুলেও ছিলাম। কিন্তু একটা বিশেষ ঘটনায় ভগবান মনে করিয়ে দিয়েছিলেন আবার।
দাদুর আশীর্বাদে উৎসাহে এবং অনুপ্রেরণায় আমার দুই ছেলেই জীবনে সাফল্য লাভ করেছে, পৌঁছে গেছে আমেরিকায়, ঠিক এরকম সুখের সময় নির্মলের বুকে এক ফোঁড়া (টিউমার) দেখা গেল। অপারেশন ও বায়প্সি করে জানা গেল – ‘ক্যান্সার’। বাবা তখন এই পৃথিবীতে নেই, কার সঙ্গে পরামর্শ করি। ফোন করলাম ডঃ এলিজাবেথ সেনগুপ্ত - আমাদের প্রিয় বিদেশিনী বৌদিকে। গনুদাদাও গাড়ি এক্সিডেন্ট-এ তার আগেই মারা গেছেন - তিনি ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, ফিলোজফার, গাইড - বাবার পরই তাঁর স্থান। এলিজাবেথ বৌদি সঙ্গে সঙ্গেই বললেন ঐ ল্যাব থেকে অপারেশন করা টিস্যুটা মোম দিয়ে প্যাক করে তুমি ইউএসএ নিয়ে চলে এসো। আমি ও আমার সহকর্মীরা মিলে ভালোভাবে আবার পরীক্ষা করব। আমি আমার স্বামীকে নিয়ে ২০০০ সালের জুন মাসে পাড়ি দিলাম আমেরিকায়। শিকাগোতে বৌদির ল্যাব-এ অঙ্কোলজিস্টদের পরীক্ষাগারে সেটি পরীক্ষা করা হল। একই মাইক্রোস্কোপের চারটি মুখ। কেউ ঘাড় কাৎ করে লেন্সের ভেতরে রাখা টিস্যুটা পরীক্ষা করছেন না। একসঙ্গে মাথা সোজা রেখে চোখের সামনে সে এক অপূর্ব যন্ত্রে নিরীক্ষণ করে এক বাক্যে রায় দিলেন - “এটিতে ক্যান্সারের জীবাণু একেবারেই নেই।” তোমার স্বামীকে রে, কেমো কিছুই দিতে হবে না।
দিনটা ছিল ১৭ই জুন, “ফাদার্স ডে”। আমি প্রথমেই বাবাকে প্রণাম জানালাম শত সহস্রবার মনে মনে। তিনি যদি বৌদিকে সেই সময় জোর করে ইউএসএ তে ডাক্তারি পড়ার প্রেরণা, উৎসাহ না দিতেন, তাহলে আমিও আজ এই উপকার, সুবিধা পেতাম না।
ঐ দিন আনন্দে আবেগে চিন্তামুক্ত হয়ে যেমন অশ্রু সজল হয়েছি তেমনি অনুশোচনায় দুঃখে অব্যক্ত ব্যাথায় সমস্ত অন্তরাত্মা আমার কেঁদে উঠেছিল পূজ্য প্যাথলজিস্ট আমি এখন আর এরকম উন্নত ধরণের ‘অণুবীক্ষণ যন্ত্র’ কিনে দিতে পারব না ভেবে। পিতাশ্রী বাবা ক্ষমা করো আমায়।
এখন আমাদের সবাইকার ঘরে ঘরে এয়ার কন্ডিশন, রুম হিটার কিন্তু বাবার ঘরে ঐ সময় কিছুই ছিল না। বাঁকুড়ার দুর্ধষ্য গরমে, বিদ্যুৎ প্রায় চলে যেত। পাখা বন্ধ হয়ে গেলেও কাজ বন্ধ তাঁর। এখন একটু সময়ের জন্যও আমরা গরম ঠান্ডা সহ্য করতে পারিনা। মশার কামড় খেতে খেতে সেই সাধক তাঁর মাইক্রোস্কোপটির মধ্যে চোখ রেখে রক্ত পরীক্ষা করে চলতেন। বর্তমানে সামর্থ থাকলেও তাঁর জন্য আর কিছু করতে পারব না।
আমরা মেয়েরা - কন্যারত্নরা মাঝে মাঝে অসহায় হয়ে থেকেছি। ওদিকে হঠাৎ কমে যাওয়ায় বাবা কোমায় চলে গেছেন, এধারে নিজের বাড়িতে তখন মা (শাশুড়িমাতা) হঠাৎ মারা গেলেন। বাবার পাশে বসে সেবা করার ইচ্ছেটা কখনই পূরণ হল না। মা যখন মৃত্যু শয্যায় তখনও বাবার পাশে গিয়ে বসবার সময় পেলাম না। দিল্লীতে স্বামী ১০৫ জ্বর নিয়ে তখন 'গঙ্গারাম হাসপাতালে' ভর্ত্তি হয়েছেন, - ছেলেদের পরীক্ষা চলছে। ভাইদের বিয়ের সময় তাঁকে পারিবারিক কাজকর্মেও সাহায্য করবার সুযোগ পাইনি। হয়তো একদিনের জন্যে বাপের বাড়ি গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে, নিজের পারিবারিক দায়-দায়িত্ব কর্ত্তব্য পালনে ব্যস্ত থাকায়। স্কুলের চাকরি, দেওর ননদদের বিয়ে কিম্বা কারো অসুস্থতা সব সময়ই পায়ে শেকল বেঁধে দিয়েছে। একবার ফোনে অক্ষমতা নিয়ে বাবার কাছে কেঁদে ফেলেছি, তিনি শুধু বললেন, - “I am proud of you, এমনি করে নিজের ডিউটি নিষ্ঠাভাবে পালন করে যাও। আমার আশীর্বাদ সর্বদা রইল।”
আমাদের যেমন বড় মাপের মানুষ ছিলেন, তিনি তাঁর কিছু কিছু দুর্বলতা নিয়ে সেই সময়কার বহু আত্মীয় পরিজন সমালোচনা করতেও ছাড়তেন না। বাবার অতিরিক্ত শান্ত ভাব - সহ্য শক্তিকে তাদের মনে হত defeating week - personality। কারনটা ছিলেন আমার মা।
“মা” স্বর্গীয়া চিন্ময়ী দেবী ছিলেন ভীষণ স্পষ্টবাদী ও স্বাধীনচেতা। সাংসারিক সমস্ত কাজেই অত্যন্ত দক্ষ MBA না করেও যে কোন কাজ, পারিবারিক দায়িত্ব, অনুষ্ঠান পালনে অতি কর্মপটীয়সী। তাঁর মতন মেধাবী প্রতিভাময়ী, সংগীত শিল্পী ও বক্তা লেখিকা সেই যুগে খুবই কম দেখা যেত। ছোট বেলা থেকেই সব বিষয়ে তিনি আগ্রহী, সাহসী, জাত-পাত, ধর্ম বিদ্বেষের বেড়া ভাঙা, কুসংস্কার মুক্ত নারী ছিলেন। কিন্তু দুধে একফোঁটা লেবু ফেলে দিলে সমস্ত দুধ যেমন ফেটে ছানা কেটে যায় ঠিক তেমনি আমার স্নেহময়ী বিদুষী - কর্মপটু মায়ের হটাৎ কোন ব্যবহার তাঁকে সমাজের আর পাঁচজন মানুষের চোখে 'অস্বাভাবিক' এক ব্যক্তিত্ব রূপে ধরা পড়ত। কোন কারনে রাগ হলে তা তিনি সামলাতে পারতেন না। ‘ক্রোধ’ এলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে চেঁচামেচি করতেন। পরিবারের শান্তি বিঘ্ন হত। যদিও রাগের উপশম হলেই আবার তাঁর কণ্ঠে গান, উদাত্ত হাসি শোনা যেত।
মাঝে মাঝে এই নিয়ে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অনুযোগ করতেন। আমরাও কখনও কখনও বিরক্ত হয়ে তাঁকে বলেছি - মাকে নিয়ে এত সমস্যার সৃষ্টি হয়, বাবা তুমি শান্ত কেন থাক, এত সহ্য কেন করো। জবাবটা ভারী সুন্দর করে দিতেন তিনি - ছোটবেলায় তোদের মাকে পাগল কুকুরে কামড়েছিল, সাংঘাতিকভাবে তাঁর শিশুটি দেহটি ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল, তবুও কুকুরটি তাঁকে কামড়ে ধরে। দাদু (অনাথবন্ধু রায়) বন্দুক দিয়ে জন্তুটিকে মেরে দেওয়ার পর মা অজ্ঞান হয়ে অন্য দিকে পড়ে যান। অনেক ওষুধ ইনজেকশন চলে, কিন্তু সেই সময়ের ডাক্তারও বলেন যে - ভবিষ্যতে তার মানসিক সন্তুলনও হারাতে পারে। বাবার সহানুভূতিশীল হৃদয় মায়ের প্রতি কোনদিন আস্থা হারাননি, তাঁকে মেন্টাল হাসপাতালে পাঠাননি। সর্বদা স্নেহ, প্রেম ও আন্তরিকতা দিয়ে ভরিয়ে রাখতেন তিনি। নিজে সঙ্গে না দিতেই পারলেও মাকে কুন্ডু স্পেশালে সারা ভারতে তীর্থ ভ্রমণে উৎসাহিত করতেন। বাবার ঐ ধৈর্য্য, সহ্যশক্তি প্রমাণ দিত, সমালোচকদের রায়, মত একেবারেই অযৌক্তিক। বরং এই দৃষ্টিভঙ্গি, সমস্যার সামনে পারিবারিক বিপর্যয়ের দিনেও সহজ সুন্দর স্বচ্ছন্দ ভাবে দাঁড়িয়ে অটুট থাকার প্রয়াস, পরিচয় দেয় যে আমাদের বাবার ব্যক্তিত্ব কখনোই ছিল না।
তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, তুচ্ছ বিষয়ে বিচলিত না হওয়া, গভীর সংশয়ের মধ্যেই সত্যকে আঁকড়ে বাস্তব জীবনে নিজের রোগী ও সন্তান সন্ততিদের প্রতি অকুন্ঠ স্নেহভরে কর্ত্তব্য পালন করা - অদ্ভুত এক মহা মানবের জীবন দৃষ্টান্ত রাখে, আমাদের সকলের সামনে। তাই তিনি চির নমস্য। তাঁর জীবন কথা আরও ভালোভাবে জানতে হলে তাঁর লেখা “ডাক্তারের ডাইরি” বইটি পড়তে হবে। বাবা একান্তে বসে মাঝে মাঝেই গীতার বঙ্গানুবাদ করতেন, সুন্দর সহজ ভাষায় এবং কবিতার ছন্দে। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। অত্যধিক হাঁপানি, কাশির দমক ও সুগারের রোগে আক্রান্ত থাকায় ভীষণ কষ্ট পেতেন। তখন এত ভালো ভালো ওষুধ বের হয়নি। ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার কিম্বা 'নিবুলাইজার' কিনে দিতেও পারিনি আমরা, যাতে তাঁর কষ্ট লাঘব করা যেত। তিনি নিশ্চিন্তে বসে আর লেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু কোনোদিন এই শরীরের কষ্ট নিয়েও কাতর হতে দেখিনি তাঁকে। কারো প্রতি অনুযোগ অভিযোগ না করেই তিনি চলে গিয়েছিলেন ৬ই জুলাই, ১৯৯৭।
বিশ্বকবি মানব প্রেমিক মোদের রবীন্দ্রনাথ
ছোট্ট হতে নিজ অজান্তে ধরিয়া তোমার হাত
পথ চলিয়াছি নির্ভয়ে আমি
প্রত্যেক 'পল' হইয়াছে দামী,
তুমি গুরুদেব, কবিবর স্বামী -
"জীবন দেবতা" সাক্ষাৎ।।
মেঘের দেশে উঠলো হেসে বাদল টুটে রোদ,
"মুকুল" মনে ভেলকি বুনে, জাগিয়ে দিলে বোধ
দুই পা আমার ছুটির ছন্দে,
নাচালে গো কোন আনন্দে
'আ-হা-হা-হা-হা' সুরে তালে গান করি দিন রাত।।
কেয়াপাতার নৌকা সাজাই, বয়স হল সাত
গলায় তখন ব্যাঙ ঢুকেছে গ্লান্ড টন্সিল বেশ পেকেছে,
এক দুপুরে জ্বরের ঘোরে হলাম কুপোকাৎ।।
মাথার কাছে বসলে এসে,
'সঞ্চয়িতা' রাখলে পাশে,
নতুন জগৎ আমার সামনে খুললে তুমি হটাৎ।।
শিশু 'বই'তে লিখলে পদ্য সেদিন "লুকোচুরি" -
সকাল বিকেল তোমার সঙ্গে খেলার ছলে ঘুরি,
চাঁপার গাছে কলি হলাম দুষ্টমি যে করি,
"রবি কবির সঙ্গে যে আর রইল না মোর তফাৎ।।
তারপরে আট বছরে সরস্বতী পুজোর ঘরে
ছেলেরা সব নাটক করে "জোড়াদীঘির ডাকাত।
বালিকা মন বীরের বেশে, কল্পনাতে লড়ছে কষে,
হা রে রে রে করে মা'কে মারবে যে নির্ঘাত।।
সেদিন থেকেই সাহসী মন ছুটছে তেপান্তরে-
মোদের কথা এমন করে কে আর ব্যক্ত করে !
মাকে শুধাই, কোন খানে তুই,
কুড়িয়ে পেলি মোরে?
হৃদয় দ্বারে বারে বারে করলে তুমি আঘাত।।
মা যদি হন কখনো নিঠুর, দূর দূর দূর তাড়ান কুকুর,
কিম্বা যদি টিয়ার পায়ে,
পরাতে চান, শেকল নুপূর।
তখন তুমি আমার মত, "সমব্যাথী" কাঁদলে কত,
বললে রেগে তোমার হাতে খাব না আর ভাত।।
কত ভাবে শিখিয়ে ছিলে,
নতুন জ্ঞানের পাঠ,
মেখেছি গায়ে ফুলের রেণু, রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু
চরিয়ে ছিলে, যে কী ধন খোঁজে, পার হয়ে বন মাঠ -
বুঝিয়ে ছিলে ঐ বয়সটা মানে না জাত পাত।।
দশ বছরে চিকেন পক্সে বন্দি ঘরে একা,
"সুধার" ডাক যে শুনতে পেলাম,
খাইনি মোটেই ধোকা।
ডাকঘরের ঐ অমল হয়ে, বিছানাটায় শুয়ে শুয়ে -
রাজার চিঠির আশা লয়ে, কাটল রাত্রি প্রভাত।।
ছয়টি ঋতু চিনিয়ে দিলে, কোথায় রঙ্গে মন ভোলালে,
'কবিরাজের' মতন এসে
টিপলে নাড়ির ধাত,
তাই স্বপ্ন ঘুড়ি লাটাই ও ডোর, যেই হাতে ধরালে,
কৌশলেতে কিশোরী মন, আকাশে ওড়ালে !
আমার রাজার বাড়ি কোথায়, গোপনে জানালে,
কল্পনাতে রঙ লাগাতে
ধন্য হল ছাত।
'বড়'রা কেউ জানল না যে, কোন কোটরে পাথর খাঁজে,
তোমার লেখন বাগান মাঝে, আমার যাতায়াত।।
একদিন এক গুহার আগল,
ভাঙলো অকস্মাৎ,
সূর্য কিরণ প্রবেশিল, ঝর্ণা ধারা বাহির হল,
ভাসল মুকুল হাসল বকুল, নির্ঝর বেগ হল ব্যাকুল,
যেমন জলপ্রপাত।
তোমার কাব্য নদীর স্রোতে, চললো ভেসে আনন্দেতে
সার্থক তাই হল যে আজ,
জীবন ধারাপাত।
"রবি-ঠাকুর", জানাই, তোমায় আমার প্রণিপাত।।