হুজুকে ( Hujuke )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ওই ছেলেটা ভ্যাল ভ্যালেটা, বড়ই সে যে হুজুকে,
ছোট থেকেই পায়ে চাকা -
পালিয়ে যায় কোন মুলুকে,
মামার বাড়ি, বাঁশের ঝাড়ি,
ছাড়িয়ে সে দেয় কোথায় পাড়ি
সঙ্গে নিয়ে প্রাণের দোসর -
নেড়ী কুত্তা, - ভুলু - কে।

পাঠশালাতে মন লাগে না,
ঢেঁকী শালায় যায় ঢুকে,
চিঁড়ে কুটে দেয় পিসিকে
কোলে নিয়ে এক পুঁচকে কে -
ওটা যে তার পোষা বেড়াল
করে রাখে সবার আড়াল,
কখনও বা চরিয়ে বেড়ায়, সাদা গরু ধুলু কে,
কাক, চিল বা পেঁচার ছানা, 
ঘেন্না করে কেউ ছোঁয় না
গাছে চড়ে, তুলে সে দেয় দয়া মায়ায় ডুবে থাকে,
চান খাওয়া যে ক্খন সারে !
বসে থাকে নদীর ধারে, 
বানের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, - বাঁচায় বন্ধু বুলু কে।

বড় হয়েও শোধরালো না, চলন বলন এক থাকে।
উধাও হয় সে পাহাড় বনে,
কখন কোথায় সেই তা জানে, -
সাগর পারে বালুর তীরে ক্যাঁকড়া ধরে -
কোন বাঁকে।

রাতের বেলায় গ্রাম পাহারায়
"জাগতে রহো" - হাঁক হাঁকে।
যাযাবরের মতন স্বভাব, দেখে না সে নিজের কি লাভ,
পরের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে -
ঘুরে মরে কার ডাকে?
ধন-দৌলত চায় না গো সে
পয়সা তো নেই তার ট্যাঁকে,
কিন্তু আছে ভীষণ সাহস
আত্মবল যে তার বুকে।
মহামারী হলেও ভারী, মারলো তুড়ি সে তাকে,
কোভিড কেও ভয় পায় না,
মড়া পোড়ায় কোন ঝোঁকে !
সবাই তাহার কাছে আসে, -
আপন বলে ভালোবাসে,
শ্রদ্ধা জানায়, মনে মনে
হুজুকে ঐ ছোঁড়াকে।

মুড়ি (Muri)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তুমি আমার জীবন সঙ্গী
শৈশব হতে বন্ধু 
তোমার শুভ্র চিকন শরীরে -
রয়েছে প্রেমের সিন্ধু।
প্রথম যখন মাড়িতে আমার
বেরুল, দুইটি  দাঁত,
তখন থেকেই তোমার সামনে 
পেতে ছিলাম হাত।
কুট কুট করে খেতাম তোমায়
দিতে দিতে হামাগুড়ি l
বাল্য বয়সে নারকেল কোরা 
চিনি গুড় মাখা মুড়ি,
ভাবলে তোমার সে স্বাদের কথা 
জিভে দেয় সুড়সুড়ি।
ছোলা ভাজা আর মোটর সেদ্দ 
 শশা, লঙ্কার  ঝুড়ি,
মুড়ি দিয়ে জল খাবারে কখনো
বাড়ে না কারোর  ভুঁড়ি,
পেট রোগা ওই অফিসের বাবু
তাই খান রোজ মুড়ি l
পান্তা ভাতেতে সর্ষের তেল,
লেবু চটকায় বুড়ি,
মুড়ি মেখে নেয়, স্বাদ করে খায়
পিসি, মাসী, দিদা, খুড়ি।

অম্বল জ্বরে মুড়ি খেলে পরে
রোগ যায় সেরে সত্য।
মুড়ি গুঁড়ো দিয়ে চপ ভাজা হয়,
দোকানি বানায়  নিত্য।
মুম্বাইবাসী করে ভেলপুরি
মেশায় তাহাতে বেসনের ঝুরি 
তার মধ্যেও প্রধান দ্রব্য
আমি জানি, তুমি মুড়ি।
গুড়ের মধ্যে পাক দিয়ে করে
মুড়ি মোয়া, শত কুড়ি,
নদী ধারে বসে খুকী খায় হেসে.
হাতে তার লাল চুড়ি।
ট্রেনের কামরা সরব হয় যে 
ছেলে বেচে ঝালমুড়ি
'যাত্রীরা' সব কেনে আনন্দে,
খান দাদু, ছোঁড়া-ছুঁড়ি।
বাঙালীরা আজ তব অবদানের 
খুঁজে নাহি পায় জুড়ি,
পাস্তা, পিজ্জা, নুডুলস পেলেও 
মুড়ি খায় দিয়ে তুড়ি।
ঘুঘনি ও মুড়ি বিক্রী করে যে
পায় ভালো টাকাকড়ি
জয় জয় গায়, মুখ ভরে খায়
আহারে আমার মুড়ি।

বিশ্ব নার্স দিবস (Bishwa Nurse Divas)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ধাত্রী', মা তথা দাই মা ছিলেন,
আমার জীবনের প্রথম দেখা নার্স।
তিনি আমাকে তাঁর কর্ম
সম্পর্কে কোন ধারনাই কখনও
এনে দিতে পারেননি, যথক্ষণ না
আমার নিজের সন্তান জন্ম নিতে
আমায় প্রসব ব্যাথায় কাতর করে দেয়।
শুভ্রবসনা 'সেবিকা' এসে হাত
দুটি চেপে ধরে কত সাহস দেয় আমায়।
আমি পাই আশ্বাস।
দেবদূতের মতন, দেব দেবীর মতন
মানুষকে বাঁচাবার, যত্নে শুশ্রষায়
রুগীর কষ্ট লাঘব করবার
ব্রতে ব্রতী সেই নার্স।
তারপর দেখেছি কত আত্মীয় স্বজনের
অসুখে অপারেশনে তাঁদের
জীবিকার সঙ্গে মানবিকতা ও মমত্বের
আবেগপূর্ণ আচরণ,
আমায় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও
কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত করেছে আজীবন।
বিশেষতঃ এই 'কোভিড'-এর মহামারীতে
যখন মৃত্যুর মিছিল চলছে -
সারি সারি,
তখন তাঁদের বড় কাছ থেকে
চিনলাম আবার।
পরিবারের আপনজনের কাছেও
অস্পৃশ্য - শত ইচ্ছেতেও যখন
স্বামী, পুত্র, ভাই, বন্ধু, মা, বোন
স্ত্রী ও কন্যার কারো রুগীকে
ছোঁয়ার অধিকার বা উপায় নেই, -
তখনও তুমি হে মহিয়সী নারী, -
হে মহান পুরুষ তোমরা তোমাদের
বাহু প্রসারিত করে খুলে দিলে,
হাসপাতালের দ্বার।
তোমার মনে থাকতে নেই একবিন্দু
ভয়ের বাদল, 'করোনা ভাইরাস' !
তোমাকেও করতে পারে গ্রাস -
একথা ভেবে ছড়াওনি কোন ত্রাস।
কারণ, তুমি যে অঙ্গীকারবদ্ধ,
শপথ নিয়েছো, ট্রেনিং শেষে -
তোমার জীবন উৎসর্গিত -
মানব সেবার জন্যে,
রোগীর যন্ত্রনা দূর করা
সময়ে সময়ে ওষুধ পত্র ইনজেকশনের
বন্টনে, অক্সিজেন গ্লুকোস
চড়ানোর দুরহ কাজগুলি -
অনায়াসে করিলে অভ্যাস।
নার্স।
প্রত্যেক 'বিশ্ব-নার্স দিবসে' 'মহিলা'
নার্সের ছবি দিয়ে সারা পৃথিবী
কত অভিনন্দন বার্তা পাঠান,
কিন্তু হাসপাতালে শুধু মহিলা
নার্সই নেই, -
শ'য়ে শ'য়ে হাজারে হাজারে -
'পুরুষ সেবকের' দল - ওয়ার্ডবয় নামে
প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রে কর্মরত।
তাঁরা কি শুধু ফেলবেন হতাশ -
দীর্ঘশ্বাস।
না - তাঁরা তো নিবেদিত প্রাণ।
দিন রাত এক করে দিয়ে -
তাঁহাদের শ্রম দিয়ে যান।
মলমূত্রে, রক্তে পুঁজে ভরা বিছানা
পালটান।
পুরুষ রুগীটির দুর্গন্ধময়
পোশাক বদলান।
একশ কেজির বিশাল বপুকে শল্য চিকিৎসার পর
সাবধানে তুলে ড্রসিং করান, -
বিনা যন্ত্রনায় আবার শোয়ান।
এঁদের নাম দিয়েছে সবাই নার্স নয়
'ওয়ার্ড বয়'
একটু কোথাও ময়লা থাকলেই -
তাঁরা বকুনি খান, -
স্ত্রীর মৃত্যুকে সহ্য করতে না পেরে
স্বামী যখন পাগল হয়ে যান,
তখনও তাঁরাই তাঁদের ধরে স্বস্নেহে
ঘরে পাঠান।
হাসপাতালে আগত কুকুর বেড়াল
তাড়ান, ডাক্তার বা নার্স
দিদিদের ফরমায়েশ খাটেন -
সব অপ্রিয় কাজকর্ম সামলান।
ওয়ার্ড বয় !
তাঁদের যে কত কাজ -
শিখে নিতে হয়। -
করোনায় আক্রান্তদের কাছ থেকে
দূরত্ব বজায় নয়, -
একেবারে কাছে থেকে তাদের
অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানোয়
তাঁরা ব্যস্ত রয়।
এক মৃতদেহটি ঢেকে মুড়ে সযতনে
শ্মশান যাত্রায় রওনা করেই -
অন্য রোগীনিকে দিতে হয় অভয়, -
'এইতো একটা বেড পাওয়া গেছে' -
বিছানার চাদর বদলে, দিয়ে -
'স্যানিটাইজার' ছিটোয়।
কী অসামান্য তার দক্ষতা,
ধৈর্য্য ও বাঁচাবার প্রয়াস,
কারণ তিনি যে পুরুষ
নার্স।
জীবনের মায়া তুচ্ছ করে এই নিবেদনে, -
তাই আজ বিশ্ব দিবসে বার বার -
বলি মনে মনে, -
তোমাদের প্রয়োজনে, - আজি এই দুর্দিনে,
প্রাণে জাগে নব চেতনার উচ্ছাস,
আগামী প্রজন্মে এনে দাও -
নতুন উদ্যম -
ঘোরে তারা কতরূপ - জীবিকার সন্ধানে,
মহামারী দূরীকরণে -
আজ লেখা হল, নতুন এক ইতিহাস।
মানব সন্তান বাঁচাবার তরে
এই ক্ষণে শত শত
প্রাণ বিসর্জনে ধন্য হলেন প্রণম্য এইসব নার্স।

প্রলয় দিনের বন্ধু – ডেলিভারী বয় (Proloy diner bondhu – Delivery boy)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মহামারী বলিহারী - ঢেউ এর পাহাড় এসে,
ভাসিয়ে দিল জীবন তরী দস্যু ছদ্মবেশে।
ডুবিয়ে দিল আশার ভেলা, কোথায় পাব ঘাট !
হারিয়ে গেল অরণ্য আজ ঢাকলো ধুলোয় মাঠ।
বাহির হয় না কেউ পথে আর, দোকান বাজার বন্ধ,
ভাইরাস টা ঢুকলো বুঝি সর্বদা এই সন্দ।
আতঙ্কেতে ত্রস্ত সবাই, হারালো আনন্দ,
হাসপাতালেও বিছানা নেই, ওষুধ নিয়েও দ্বন্দ্ব।।

ভ্যাকসিনটা লাগবে কবে, প্রশ্ন সবার মনে,
কোভিড উনিশ দমন করবে কখন যে কে জানে !
হাজার লক্ষ্য লোকের মাঝেও সবাই এখন একা,
দ্বীপের মধ্যে বন্দি থাকি বুদ্ধিমান ও বোকা।
বন্ধ দরজা সামনে রাখে, দুধ, সবজির ঝাঁকা।
'ডেলিভারী' এনে সে দেয়, হাত বাড়ালেই বন্ধু,
নির্জন এই লকডাউন-এ তুমিই কৃপাসিন্ধু।।

দুধ, ডিম আর পাউরুটি দেয়, ডাল, চাল, তেল, নুন, -
বেল বাজিয়ে পালিয়ে সে যায়, গাইছি যে তার গুণ।
ওষুধ আনে ঠিক সময়ে, চায় না কভু পয়সা,
অনলাইন এ পেমেন্ট করি, পাই না যেতে ভরসা।
'ডেলিভারী' ছেলের মুখটি দেখতে যে মন চায়, -
মুখটি ঢেকে নীরবে সে দ্রব্য রেখে যায়।
প্রলয় দিনে তোমায় চিনে, রেখেছি আজ আমি,
তোমার অবদানের কথা সবচেয়ে হবে দামী।।

অঞ্জলী (Anjaly)

চন্দনা সেনগুপ্ত

অষ্টমীতে পুজো বাড়ি যেতে যেতে 
যাওয়া হয়ে উঠল না আর l
বান্ধবী বলেছিলেন, -
“সিঙ্গাপুরের  দোকান বাজার 
কিছুই তো চেনো না, তাই -
সঙ্গে থাকবো আমি।
লিটিল ইন্ডিয়ায়, সব পাওয়া যায়
কিন্তু একটু দামী l

প্রবাসে, এই সাগরপারে, ভারতীয়দের ঘরে ঘরে 
নিত্য নতুন পূজার তরে, -
মালা, চন্দন, ধুপ অগুরু
ডাব নারকেল সারে  সারে  -
নানান রকম সামগ্রী সব
সাজানো হয়, দোকান পরে।
কিনিয়ে দেব - আমি”। -

- ‘সঙ্গে কত টাকা নেব?’
প্রশ্ন ছিলো আমার,

‘পাঁচশ ডলার’ নিলেই হবে।
ভোগের টিকিট,
মায়ের শাড়ী, ফল-মিষ্টি, দক্ষিনা আর
ট্যাক্সি ভাড়া, সব মিলিযে কুলিয়ে যাবে

টাকাটা তো 'ডলার' হেথায় 
মূল্য যে তার অনেক গুনে,-
ভাবলে সেটা চলবে না তো ,-
যখন যেথায় থাকতে হবে,
খরচ করতে হবেই, ততো।
চলতে হবে সেসব জেনে।
পুজোটা তো দিতেই হবে
হিন্দু রীতি নীতি মেনে।

সাজ গোজ করে  বেরোতে যাবো,
ফোনটি বাজলো ঠিক সেই খনে,
রোডিথ নামে কাজের মেয়েটি উঠল কেঁদে জোরে 
তারই ভাইয়ের সংবাদটি শুনে, -
সাংঘাতিক এক ধাক্কা লাগল মনে।
তরুণ শ্রমিক 'ম্যানিলাতে' কোভিড আক্রমনে
মৃত্যু কোলে পড়ল ঢলে -
কখন যে তা কে জানে।
ক'মাস আগেই দেশে যখন ‘করোনার’ই প্রকোপে 
একের পর এক প্রিয় স্বজন
স্বর্গ ধামে চলে গেল -
এই মেয়েটি তখন সেদিন 
কেঁদে কেটে আকুল হল
কেমন করে আজকে তারে -
পুজোর নামে একলা ঘরে,
আমরা যেতে পারি ফেলে।
ভাবতে কেন পারবো না গো 
তাকে আমার কন্যা বলে?
ভাইয়ের শীতল দেহ খানি
পড়ে আছে, তার  হাসপাতালে।
‘ছাড়পত্র’ মিলবে না তাঁর
পাওনা গন্ডা না চুকালে।

নিজের মেয়ের মতন সে যে  করছে মোদের সেবা
এই বিদেশে ভলোবেসে করে তাহা কে বা
জড়িয়ে ধরলো সে আমারে,
স্বান্তনা দিই, কে কাহারে !
শিশুর মতন ফুঁপিয়ে কাঁদে
ভাইয়ের শোকে বারে বারে।
‘ও দূর্গা মা’, করো ক্ষমা,
যাব না আজ তোমার দ্বারে,
'বিবেক' কাঁটা বিঁধছে যে গো, -
আয় না মা গো, তুই এবারে,
মণ্ডপের ঐ বিলাস ছেড়ে, 
সোজা হেথায় আমার ঘরে।

পুজোর টাকা তাকেই দিতে
আদেশ দিলেন, "মহামায়া"
মৃন্ময়ী আজ চিন্ময়ী যে 
মানব তরে অপার দয়া।
গরীব চাষী, শ্রমিক সাজে -
আবির্ভূত জগৎ মাঝে, -
মাটির পুতুল, পাথর মূর্ত্তি -
শুধু জানি তাহার ছায়া,
জীবের দুঃখে, ক্লেশ ও লাজে
 কাঁসর, ঘন্টা, শঙ্খ বাজে,
সর্বভূতে 'মা জননী' ছড়িয়ে দেন যে 
তাঁরই মায়া।

মিথ্যা মন্ত্রে উচ্চ স্বরে, ডাকি সবাই বারে বারে,
ভন্ডামী আর আড়ম্বরে, হারিয়ে ফেলি
যখন তারে -
তখন তিনি এক ধাক্কায় নামিয়ে আনেন,
পথের ধুলায় -
মানুষ মাঝে বেড়ান ঘুরে 
জগতের এই পারাবারে।
জীবন্ত এক 'মা দূর্গার' দেখতে পেলাম
করুন মুখ, -
যুগ যুগান্তে গৃহের প্রান্তে -
এসে, মনে দেন যে সুখ,-
ভক্ত প্রাণে মমতা এনে - মুগ্ধ করেন কৃপা দানে,
শান্তি সুধায়, ভরান যে বুক।
অসহায়ের পাশে দাঁড়ান,
বিশ্বাস আর সাহস বাড়ান,
ভুলিয়ে দিতে সকল দুখ।

 মন্ত্র ,তন্ত্র উপোস ব্রত  আজকে  দিলাম  জলাঞ্জলী
'মা' যে নিজে হাত পাতিলেন,
নিলেন তুলে  মোর, ‘অঞ্জলী।’

দময়ন্তী – পয়মন্তী (Damayonti – Payomanti)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফুটফুটে সেই লাবণ্যময়ী সবার প্রিয় কণ্যা।
তুষার শুভ্র বরণ তাহার রূপের যেন বন্যা
রাঙা ধুলোর পথে পথে, কালু দাদুর সাথে সাথে,
কখনো বা কাঁধে পিঠে, চড়ে বেড়ায় সোহাগ রথে,
নয় তো সে মেয়ে নগন্যা।
 
কুমড়ো সেদ্ধ আলু ভাতে পোস্ত হলে রান্না,
সরস্বতীর মতন সাত্ত্বিক অন্য কিছু-ই খান না।
দামী দামী খেলনা পুতুল, ঐশ্বর্য্য আছে অতুল,
কখনও তিনি আবেগ বশে, অসার বস্তু চান না।
ছোট্ট থেকেই "দময়ন্তী" তাইতো অসামান্যা।
 
"ঠাকুমার" ঐ কোণের ঘরে, চুপটি করে উঁকি মারে -
জপ, ধ্যান আর পুজো দেখলে, বসে থাকে দু পা মেলে,
সাধিকা সেই মেয়ে তখন কোথাও যেতে চান না।
সবাই তারে ভালোবাসে, খলখলিয়ে সদায় হাসে, -
দেবলীনা শিশুকন্যা, শুনিনি তার কান্না।
 
সবার সঙ্গে একাত্ম হয়, কিশোরীটির নেই লোভ ভয়,
মিষ্টি সুরে কথা সে কয়, হতাশ প্রাণে দেয় যে অভয়,
বড় হয়ে "বুদ্ধদেবের" স্তুপে দিলেন ধর্ণা।
অপূর্ব কোন অনুভূতি, হৃদয় বীণায় ভক্তিগীতি,
স্বর্ণোজ্বল সেই সে স্মৃতি, বইতো প্রেমের ঝর্ণা।
 
মাত্র অর্ধ-শতাব্দীতে কঠিন রোগের জীবাণুতে, -
আক্রমিলো দেহ যে তার, পেলো "কেমোর" যন্ত্রনা।
যদিও তার অপার আনন্দ নষ্ট করতে পারলো না।
"স্বর্গ দুয়ার" খুলে নিজে, প্রভু এলেন তাহার খোঁজে
'মুক্ত' আত্মা চললো সেথায়, কারো অপেক্ষা করলো না।
 
ভিক্ষু কাঁদেন বৌদ্ধ-বিহারে, স্বজন মিত্র বহু দূরে -
অশ্রুনদী বাঁধ মানে না, জানায় সবে সমবেদনা,
অশুড়িয়া, আমেরিকা, নেপালি বন্ধু বসে একা -
স্মরণচিহ্ন পটে আঁকা - হৃদয় তাদের মেঘে ঢাকা।
ভারাক্রান্ত অন্তরেতে দুঃখ বরফ গললো না।
 
'এলিজাবেথ' মাতা তাঁহার, স্তব্ধ শান্ত - পাথর মূর্ত্তি,
তাঁকে দেখে সবার মনেই জাগে প্রবল প্রীতি ভক্তি,
পুত্র এবং পুত্রবধূ সদায় থাকেন তাঁহার পাশে,
পিতা গণপতির মৃত্যু - দৃশ্য তাদের চক্ষে ভাসে -
বিষন্নতার বাদল হতে বৃষ্টি বারি ঝরলো না।
 
মিটিয়ে দিলে সকল শ্রান্তি, ঘুচিয়ে দিলে ভুল ও ভ্রান্তি
করিল জীবাত্মা কত সুকৃতি, পেলে আজ তাই চরম শান্তি।
এই জগতে বিরল যে অতি, তোমার তুল্য তুলনা।
ধন্য তুমি দময়ন্তী, বুদ্ধপন্থী পয়মন্তী,
ঈস্বরে ছিল তব সদা মতি, -
প্রিয় জনের পরান হতে, পাষান প্রাচীর সরলো না।

অচ্ছু্ৎ কন্যা (Achyut Konya )

চন্দনা সেনগুপ্ত

সমস্ত জগৎবাসীর কাছে আজ আমার দেশ জননী
হলেন, “অচ্ছু্ৎ কন্যা”
'ভারতবর্ষ' 'কোভিড' আক্রান্ত অস্পৃশ্য - কেউ তাকে
তাই ছুঁতেই চাই না।
মায়ের চোখে ঝরছে অবিরল জল,
বিষন্ন বদনে, সারা বিশ্বের পানে -
দু হাত পেতে তাকিয়ে আছেন - তিনি হয়ে আজ নিতান্ত অসহায় দুর্বল।
অন্ন-বস্ত্র বাসস্থান, অর্থ কিম্বা কোনো সম্মানপত্র
দান কিম্বা ধন সম্পদ নয়, - কোথায় পাবে? কোন খানে
একটু বিশুদ্ধ হাওয়া, অক্সিজেন সিলিন্ডার?
শুধু সন্তানের প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশায়, তাঁর বইছে অশ্রু বন্যা।।
 
কত সুন্দরভাবে গত একবছরের বিভীষিকা কাটিয়ে
ঝড় প্রায় থেমে এসেছিল।
সবই নরমাল, শহরে, নগরে, গ্রামে গঞ্জে -
পথে বেরিয়ে পড়েছিল নর-নারী -
এইতো সেদিন।
বন্ধ দোকান খুলে, আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল
বেচাকেনা প্রতিদিন।।
 
নিত্য খেটে খাওয়া মজদুরের ঘরে আবার জ্বলে উঠেছিল চুলা
ভাঙাচোরা বাহন নিয়ে রিকশাওয়ালারা পুনরায়
গামছায় ঘাম মুছে, হয়ে উঠেছিল সচল।
ঘরে বসে কাজ করতে করতে বন্ধুহীন ইঞ্জিনিয়ার
হাত পা ঝেড়ে অফিসের জামা কাপড়
পরে ট্রেনে বাসে হয়ে উঠেছিল চঞ্চল।।
 
ডাক্তারবাবুরা এবার 'ক্যান্সার' রোগীদের কেমো
নেবার জন্য হাসপাতালে নির্ভয়ে আসতে
আহ্বান জানিয়েছিলেন, উঠে গেছে লক ডাউনের অবরোধ।
দাঁত, কান, চোখের ডাক্তারবাবু চেম্বার
পরিষ্কার করে নিজের সহযোগী কর্মচারীদের
কাজে আসতে করেছিলেন অনুরোধ।।
 
যে শ্রমিকের দল ১২০০ কিলোমিটার
হেঁটে বিহারে, পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে প্রাণ
বাঁচিয়েছিলেন, তারাও স্বরস্বতী পুজোর পরই
ট্রেনের টিকিট কেটে এখন ফিরতে শুরু
করেছিলেন দিল্লী - বোম্বে আমেদাবাদ
কারখানায়। ছেলে পিলেদের কতদিন আর
না খাইয়ে রাখা যায়।।
 
যাঁরা বিয়ে বাড়ির ভোজ রান্নার ক্যাটারার,
ট্রাকে করে সব্জি, ফল আনে ভরে -
সরব করে মন্ডি বাজার -
তারা সবাই নতুন উদ্যোগে, লোকসানের
দুঃখ ভুলে, আবার শুরু করেছিল ব্যাপার।।
 
ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ লাগিয়েই
আনন্দে আত্মহারা দেশবাসী,
'ফেসবুকে' ছবি ছাপালো রাশি রাশি।
দূরদৃষ্টির অভাব নেতাদের টেনে আনলো
পথে ঘাটে ময়দানে।।
বিনা মাস্ক পরে ৱ্যালি করলো হাসি হাসি।
মানুষের জীবনের চেয়ে এখানে দামী
ক্ষমতা অধিকারের।
ভোট ব্যাঙ্কের অভাবনীয় রেশারেশি।।
 
ধর্মীয় গুরু মহা সিদ্ধ পুরুষেরা দলে দলে
নামলেন গঙ্গা জলে, -
গুহায় বসে ধ্যান জপ করা
ছেড়ে 'করোনা' দানবের পরাক্রম ভুলে।
দেশের তৈরী ওষুধ ইঞ্জেকশান উদার ভাবে করা হল
বিতরণ।
ধন্য ধন্য করল প্রতিবেশী দেশের মানুষজন।।
 
কিন্তু কে জানতো তখন !
ভূমি ফাটিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে রঙ্গমঞ্চে
আবার করবে অবতরণ -
সে ধেয়ে এল সাংঘাতিক ঝড়ের মতন।
ছিন্ন ভিন্ন হল আমাদের দেশ মাতৃকার বদন।
লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃতদেহে  ভরে গেল
যত ছিল শ্মশান ভূমি।।
 
হাহাকারে আর্তনাদে বিদীর্ণ হল নরম জমি।
দেশের মানুষের অমার্জনীয় ভুল ! না ঐ
প্রকৃতির প্রতিশোধ নিতে উদ্যত বিধাতার
রোষ ডেকে নিয়ে এলো দ্বিতীয় বার
"কোভিড সুনামী"।।

নৈঃশব্দের গান (Noishobder Gaan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

নৈঃশব্দের গান (Noishobder Gaan)
             "স্বর্গীয় মিঠুর উদ্দেশ্যে"
               চন্দনা সেনগুপ্ত
 
জীবনটাকে রসিয়ে রসিয়ে
          তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা নয়,
শুধু স্থির এক প্রদীপ শিখার মতন
          নিঃশব্দে প্রজ্জ্বলিত রাখা -
অভিনব ধৈর্য্য, সাহস ও অসীম আশায়
          প্রিয়জনের মুখপানে
                 ফিরে ফিরে দেখা
তোমার চোখের তারায়
          আজ অনেক কথাই আছে লেখা।
 
স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত
                 সন্তানের শ্রদ্ধা, গুরুজনের স্নেহচ্ছায়ায়
      সর্বদা এইভাবে আপ্লুত হয়ে থাকা -
অতল মহাসাগরের গভীরে -

                 মুক্তসম ঝিনুক মনে,
          নির্লিপ্তভাবে, আপনাকে এই ঢাকা
আশ্চর্য এক অহেতুকী কৃপারই পরিচায়ক
          যা শুধু ঈশ্বরের আশীর্বাদ মাখা।।
 
দখিনা হওয়ার ঝোঁকায়
          আপন মনে উড়ে এল
                 সবুজ রঙের পাখী চন্দনা
তোমার জানলা দিয়ে ঢুকল সেদিন একা
          বিছানার পিছনে আছে যেখানে
                 রকমারি যন্ত্রপাতি সব
শরীরের প্রতিটি অঙ্গে লাগানো
          নল আর পাইপগুলি ঝুলছে সব এঁকা ব্যাঁকা।
 
মনে হল,
          ভীষ্মের শর শয্যায়
                 "মা লক্ষ্মী" শুয়ে আছেন যেন
"মনসা দেবীর" সাপেদের হাতে পায়ে
          জড়িয়ে ধরে -
                 চারিদিকে ইলেকট্রিক তারে
          বহু বিচিত্র আলপনা আঁকা।।
 
"মিঠুরে" - "চন্দনাটা" বলে,
          ভালোবেসে ফিসফিসিয়ে হেসে হেসে -
"দে ভাই, আমাকেও একটু ধার দে,
          তোর অসাধারণ স্মরণশক্তি,
          বুদ্ধি, বিশ্বাস ও ভক্তি
মুখর হয়ে নয়, নিঃশব্দের সাধনায়
          আমি এবার মেলব আমার অবুঝ পাখা।।
 
এখানে -
          পাখির মতন, কলকাকলি নয় -
                 ভ্রমরের গুনগুন ধুন, তাল লয়,
সব ভুলে তোমার ঐ পদ্মফুলের মতন চোখে
                 মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা -
বন্ধুত্বের উত্তাপ আনন্দ সুগন্ধ
          ছড়িয়ে দিতে দিতে, শুধু জানাই -
নতুন বছরের শুভেচ্ছা নিয়ে
          ধীরে ধীরে এগিয়ে যাক -
                 সময়ের চাকা।।

স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

চন্দনা সেনগুপ্ত

"বুদু-মামা"
স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের
প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
চন্দনা সেনগুপ্ত

ছোটবেলায় চিনাকুড়ির বাড়ীতে
বসতো চাঁদের হাট ।
সেই আনন্দমেলায় মেজ জ্যাঠামশাই
দিতেন মোদের মূল্যবোধের পাঠ ।
মেজ জ্যেঠিমার সারল্যে মাখা -
ছিল সেথায় বাগান ঘেরা -
অপূর্ব এক বাট ।
সেই খানেতে আসতে যেতে -
দেখেছিলেম তাঁরে -
গভীর বোদ্ধা জ্ঞানের ভারে, অবনত -
বিনয়ী এক ঋষি ।
নেই কোন তাঁর অহংকার -
নকল বাবুর ঠাঁট ।।
 
জ্যেঠিমারই ভাই যে তিনি,
মোদের বুদু মামা, -
বিষ্ণুপুরের শিক্ষক এক -
গবেষক খ্যাতনামা ।
শিশুসুলভ মুখে তাঁহার -
সদাই থাকতো হাসি,
প্রাচীন গ্রন্থ পেলেই যেন,
আনন্দেতে ভাসি, -
মোহিত হয়ে টেরাকোটা মন্দিরেরই কথা, -
বলতে বলতে ভুলে যেতেন,
নিজের দুঃখ ব্যাথা ।
খুঁজে বেড়ান, পুরাণ পুঁথি, -
ছোটেন হেথা - হোথা, -
দিন রাত্তির সে সব তথ্যে -
ঘামিয়ে যেতেন মাথা।।
 
পঞ্চাশটি বছর পরে আবার গেলাম বিষ্ণুপুরে -
তাঁর দর্শন পেলাম আমি, -
পুস্তকেতে ঠাসা ঘরে ।
মামা মামীর যুগল মূর্ত্তি, দেখতে পেলাম -
খাটের পরে ।
মনে হল, জীবন্ত দুই দেব দেবীর রূপ ধরে
বসে আছেন, দুইটি শিশু
শান্তি সুখে হৃদয় ভরে ।
এমন মানুষ বিরল অতি -
এই জগতে একেবারে ।
হৃদয় সেদিন ধন্য হল, যুগল মূর্ত্তি
প্রণাম করে ।।
 
"মল্লভূমের" চিত্তজয়ী চিত্ত করেন রঞ্জন,
তাঁহার মতন "স্থিতপ্রজ্ঞ" ব্যক্তি
আজি মেলে ক'জন?
সবার প্রতি স্নেহের সুধা নিত্য করিয়া বর্ষণ
মুগ্ধ করে রেখেছিলেন -
আছেন যত প্রিয়জন ।
রত্ন-তুল্য-সন্তান তাঁর, "বাপ্পা"
প্রবাসে, - করে ক্রন্দন, -
সমবেদনার পুষ্প পাঠায় -
শোকাচ্ছন্ন সব পরিজন ।
গৃহলক্ষ্মী বড় মামীমার
হারিয়ে গেল যে নারায়ণ, -
স্বামীর স্মৃতি - শোনায় গীতি -
'আত্মা অমর নেই তো মরণ' ।
নশ্বর এই দেহ ছাড়ি - অন্যলোকে বিচরণ,
পঁচানব্বই পরে তিনি -
পেলেন ঈশ্বর দর্শন ।।

ভক্ত বন্ধু (Bhokto Bondhu)

চন্দনা সেনগুপ্ত

এখানে, - দেরাদুনে, -
অপূর্ব এক শান্তি মনে,
দূর্গা পুজোর পুন্যক্ষণে,
এলাম আমরা ক'জনে।
 
প্রৌঢ়ত্বের সীমানায়,
বার্দ্ধক্যের দোর গোড়ায় -
আমরা এলাম যখন হেথায় -
তখন হঠাৎ খুঁজে পেলাম, -
এই জীবনের নতুন মানে।
কে জানে! আজ কোনখানে?
হাসি-কান্না, - চুনী-পান্না,
আনলো, চমক তাই জীবনে,
ভক্ত বন্ধু জুটলো শত,
'কথামৃতের' গল্প যত -
ধন্য করলো আমাদেরকে,
তাই তো কত কৃপা দানে।
 
মুগ্ধ হ'ল, হৃদয় সবার -
স্বামীজীদের আপ্যায়নে।
আশ্রমের এই বাগান ঘেরা,
মন্দিরেরই প্রাঙ্গনে।
 
শ্রী শ্রী মায়ের মূর্ত্তি হেথায়
মোদের সবার কল্যানে, -
আপন মায়ের মতন যেন
তাকিয়ে আছেন ভক্ত পানে।
শান্ত সমাধিস্থ 'ঠাকুর' -
বসে আছেন তাঁর আসনে, -
ধূপ, ধুনো আর পুষ্প গন্ধে -
পুন্য সভা এই লগনে।
মুগ্ধ হলাম, হাজার হাজার -
ভক্ত জনের আগমনে।
প্রতিবছর আসতে যে চাই -
'মা' দুর্গার আবাহনে।