চন্দনা সেনগুপ্ত
প্রথম অধ্যায়
জীবনকে অনেক কাছ থেকে যাঁরা দেখেছেন, দুঃখ সুখের পালায় দোলায়-অবলীলায় দুলতে দুলতে সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথকে যাঁরা অতিক্রম করেন, তাঁদের দলে “জ্যোতির্ময়” বাবুও বোধহয় নাম লিখিয়েছেন, তাই হাজার কষ্টেও তাঁর হাসি মুখ, নির্বিকার মনোভাব, বিরক্তিশূন্য সুদীর্ঘ কপাল, ষাটের কোটায় এসেও টাক না পড়া এক মাথা কাঁচা পাকা কোঁকড়ানো চুল, চশমার ভেতরে জ্বল জ্বল করা চঞ্চল দুটি চোখ, ঋজু দেহ, দীপ্ত দ্রুতলয়ের চলন, গম্ভীর আওয়াজে ধীরে ধীরে কথা বলার অপূর্ব বাচনভঙ্গী – সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, দিল্লীর রোদে পুড়ে ঝলসে যাওয়া তামাটে গায়ের রঙ তাঁকে আরও দৃঢ় মজবুত দেখতে সাহায্য করছে। অস্তমিত সূর্য্যের দিকে এক দৃষ্টে যখন তিনি চেয়ে আছেন, ছাদের কার্নিশে দাঁড়ানো তাঁর সেই চেহারাটি দেখে মনে হয় কোনো ব্রোঞ্জের তৈরী গ্রীক দেবতার মূর্ত্তি। এত টিকালো নাক কিন্তু ঔদ্ধত্য নেই হাবে ভাবে।
স্ত্রী কমলমণির অকাল মৃত্যু তাঁকে একলা করে দিলেও অসহায়তা বা বিষন্নতার কালো ছায়াকে তিনি কাছে ঘেঁষতে দেননি, ছেলে-মেয়েদের মুখ চেয়ে। গত বছর সরকারী দপ্তর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এবং দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় দায় দায়িত্বর ভারও ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে। সুপ্রভা থাকে কলকাতায় আর ছোট আভা বরের সঙ্গে জাপানে চলে গেছে বেশ কিছুদিন হ’ল। ছেলে সুপ্রকাশও বাবার মতন লম্বা এবং গৌরকান্তি সুপুরুষ। জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ইচ্ছে ছিল সে ইঞ্জিনিয়ার হবে; অনেক পড়াশুনা করবে, কিন্তু তার পড়াশুনোর চেয়ে খেলাধুলাতে বেশী মন। ইংরেজি তিনি ছেলেমেয়েদের নিজে পড়িয়েছিলেন, তাই ভালো কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স পাশ করার পরই সে চাকরী খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে কিছুদিন সেলস-এ প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করার পর প্রতিবেশী মিস্টার রায়ের বদান্যতায় ‘এয়ার ইন্ডিয়ায়’ চাকরী পায় সে স্টুয়ার্ডের। খুবই গ্ল্যামারাস কাজ মনে হয় ছেলের। ফ্লাইং আলাউন্স নিয়ে মাইনেও পায় মোটা টাকা, কিন্তু জ্যোর্তির্ময় বড় এক হয়ে যান, কারন ছেলেকে মাসের মধ্যে ২০ দিনিই বাইরে থাকতে হয়। মায়ের বাৎসরীকিতে দুই বোন এসে তাই উঠে পড়ে লেগেছিল ভাই-এর বিয়ে দেওয়ার জন্য। “চিত্তরঞ্জন পার্কের” এক ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধও এসেছিল অনেক। তিন ভাই বোন ও জামাইরা মিলে ঘরোয়া আলোচনা ও প্রাথমিক দেখা-দেখির পর ঠিক করলো “চন্দ্রানীকে”। জ্যোর্তির্ময় বাবু প্রথম থেকেই কোনো মেয়ে দেখতে যাওয়ায় বিরোধী। বলেন – ‘যে বিয়ে করবে সে দেখুক, কথা বলুক, সব পছন্দ হয়ে গেলে আমার সঙ্গে বিয়ের দিন ঠিক করতে আসতে বলো মেয়ের মা বাবাকে। আমার কাছে তো সব পাত্রীই “আভা” “প্রভা”র মতন নিজের মেয়ে মনে হয়, কাউকে দেখে এসে “বিয়ে দেবো না” বলাটা ভীষণ দুঃখ জনক মনে হয়। মেয়েরা মায়ের জাত, তাদেরকে অপমান করার কোনো অধিকার আমার নেই”। তাই দিদি জামাইবাবুদের সঙ্গে প্রকাশই গিয়েছিল চন্দ্রানীদের বাড়ি, পরে দুজনে একা হোটেলে ডিনার করতে করতে অন্যান্য সব কথাও খোলাখুলি বলে নেওয়ার পরে বাবাদের সাক্ষ্যাৎকারের পালা। এক রবিবারের বিকেলে চন্দ্রানীর মা বাবা এলেন তাদের “ময়ূর বিহারের” বাড়িতে। দেনা পাওনার কথা ওঠালেন চন্দ্রানীর মা। বাবা প্রফেসর মানুষ ভীষণ শান্ত ও সিধেসাধা। মিসেস দত্তগুপ্তই সব কথাবার্তা বলছেন।
“দেনা-পাওনা? – হ্যাঁ, আছে বৈকি” – হাসতে হাসতে বললেন জ্যোর্তিময়।
ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে একসঙ্গে চমকে সবাই মিলে তাকাল তাঁর দিকে।
– “আপনি মেয়ে দেবেন আর আমি মা লক্ষী পাবো”।
আমার ইলেক্ট্রিকের খরচ এবার কমে যাবে একেবারে, চন্দ্রানী মায়ের মত বৌ এলে এই গরিবের ঘর আলো হয়ে যাবে।
চন্দ্রানীর মাও রসিকতা করতে ছাড়েন না। জবাব দিলেন – “আমার মেয়ে তো শুধু আপনার ঘর আলো করবে আর প্রকাশের মতন দিব্যকান্তি জামাইতো আমাদের আত্মীয় বন্ধু সবাইকার মধ্যে সূর্য্যের মত জ্বল জ্বল করবে”।
লজ্জা পেয়ে প্রকাশ মাথা নিচু করে নিল। কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটু অহমিকার গন্ধ পেলেন জ্যোতির্ময়। প্রসঙ্গ পাল্টে এবার একটু অপরাধবোধ মিশ্রিত মিয়ান গলায় থেমে থেমে বললেন তিনি – দেখুন সবই তো ভালো, দুজনে দুজনের সঙ্গে খোলাখুলি ভাবে কথাবার্তা বলে নিয়েছে, দুই পরিবারও আমরা বন্ধুর মতন বলে মনে করছি শুধু একটাই একটু প্রবলেম আছে –
“হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন না, দ্বিধা করছেন কেন? প্রকাশের মতন সুন্দর ছেলের জন্য যা যৌতুক চান আমি দিতে রাজী আছি” – জ্যোতির্ময়বাবুর কথা শেষ করতে না দিয়ে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন তড়িঘড়ি করে।
– আরে না না, ওসব কথা আমি বলতে চাইছি না, আপনি ভুল বুঝছেন।
– “আপনাকে বলতে হবে না মেয়েকে আমি গয়নাগাটি, ফার্নিচার, গাড়ি, সবই দেবো, আপনি ঘাবড়াবেন না”।
– এবার চোয়ালের হাড় শক্ত হল জ্যোতির্ময়বাবুর। কপালের শিরা দুটো ফুলে উঠলো অপমানে। ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারলো বাবা বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু কোনোদিনই তারা বড়দের মধ্যে ফালতু কথা বলা বা অকারণ বাচালতা করা যুক্তি যুক্ত মনে করে না, তাই চুপ করে বুঝতে চাইল, এবার বাবা কি বলেন সেটা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। প্রকাশের মোবাইলটা বেজে ওঠায় সে সেটা কানে চেপে বাইরে চলে গেল এক্সকিউজ মি বলে। আভা প্রভা অথিতিদের চা জল খাবার আনার অছিলায় উঠে গেল রান্না ঘরের দিকে।
এবার চন্দ্রিমার বাবার সরল সোজা হাসিমুখ খানি আকৃষ্ট করেছে জ্যোতির্ময় বাবুকে। তিনি ভাবলেন স্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ন কথাবার্তায় অস্বস্তি বোধ করছেন, অধ্যাপক দাসগুপ্ত। তাই আর সময় নষ্ট না করে তাঁর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ফেললেন তিনি।
– “দেখুন ছেলের কাজটাই এমন যে মাসের মধ্যে অর্দ্ধেক দিনই ওকে বাইরে কাটিয়ে আসতে হয়। আপনার মেয়ের কোনো “হবি” আছে তো? নইলে কিন্তু ও খুব বোর ফিল করবে”।
হ্যাঁ, হ্যাঁ ওর তো অনেক হবি। ড্রইং, পেন্টিং, ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট অনেক শখ আছে। মেয়ের স্কুলে, কলেজে “হবি” ক্লাসে তৈরী ক্রাফট দেখলে তো আপনি ভাববেন যেন কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে কিনেছি। আর তাছাড়া আমরা কাছে আছি যখন মন লাগবে না চিত্তরঞ্জন পার্কে চলে যাবে, ও সব নিয়ে আপনি ভাববেন না।
কথাটা মনোপূতঃ হল না জ্যোর্তির্ময়ের, বললেন – “গান-বাজনা, নাচ, লেখালেখি I mean freelancing journalism কিছু করলেও সময়টা ভালো কাটাতে পারে।
এবার মিঃ দত্ত হটাৎ ছেলেমানুষের মতন জ্যোতির্ময়ের হাতটা চেপে ধরে, কেমন যেন আবেগের বশে বললেন, – “আপনি তো থাকবেন বাড়িতে, মেয়ে আমার গল্প করতে খুব ভালোবাসে আপনার সঙ্গে যখন বন্ধুদের অ্যাক্টিং করে কলেজের গল্প শোনাবে না, আপনার খুব ভাল লাগবে”।
– “তাহলে তো আর কথায় নেই”। আমাদের তো শুধু এটাই চাই। বাবা বড় একা হয়ে গেছেন চন্দ্রানী এসে যদি বাড়িতে হৈ হৈ করে গান, গল্প, কথায় বাবাকে ভুলিয়ে রাখে তাহলে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে”। বলল প্রভা চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে।
মিষ্টি, কেক, চপ-কাটলেটের মচমচানিতে এবার সবাই মশগুল, শ্যামলা মেয়ের দীঘল চোখে আদুরে মেয়ে চন্দ্রাকে দিদিদের ভালো লেগেছে, প্রথম আলাপেই দিদি জামাইবাবুদের তুমি করে কথা বলা, মিষ্টি হাসি একটু বোকা বোকা লাগলেও প্রকাশকে করা বাচ্চা মেয়ের মতন প্রশ্ন – “প্লেনটা যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে যায় তখন ভয় লাগে না”? সবাইকার বেশ মজার লেগেছে। তাই সম্বন্ধ পাকা হতে দেরী লাগলো না। ওর আলগা শ্রী, কোঁকড়ানো চুল জ্যোতির্ময় বাবুর মন ভরিয়ে দিল, মনে পড়ল স্ত্রী কমলমণির এইরকম কোঁকড়া চুলে পিঠে মেঘের ঢল নামতো। কতদিন পরে বাড়িতে আবার কোমরে আঁচল জড়িয়ে, খোলা চুলে ঘুরে বেড়াবে, রান্না ঘরে কাজের মেয়ে বা চাকরের নুন ঝাল ঢালা রান্নার তদারক করতে তাকে বারে বারে মাথা ঘামাতে হবে না, এখন নিজের ফুলের টব, গল্পের বই ও কাঠের কাজ নিয়ে তিনি আবার আপন মনে ব্যস্ত থাকতে পারবেন ভেবে বড় ভালো লাগল তাঁর। বাড়ির পুরোনো জিনিষ ঘড়ি, সেলাই মেশিন, মিক্সি সব নিজে হাতে তিনি সারেন, মেরামত করেন, যত্ন করে রাখেন। ঘন্টার পর ঘন্টা টুল বাক্স নিয়ে, স্ক্রু ডাইভার ধরে তার পার হয়ে যায় – একাকীত্বটাকে সহ্য করে নিজের জগতে নানা টুকিটাকি কাজ ঘর সাজানো, পর্দা লাগানো, ঝুল ঝাড়ার মধ্যেও যে এত আনন্দ – শিল্প বোধ থাকতে পারে তা জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখতে দেখতে ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারে। বড় জামাই সুহাস তো বাবার ফ্যান বলেন – রিটায়ার করে বাবার মতন প্রত্যেক মুহূর্তে রসাস্বাদন করতে, করতে বাঁচবো। ছোট জামাই তো সর্বদাই প্রশংসামুখুর – তার উক্তি –
“আমরা ইঞ্জিনিয়ার হলেও এত সুন্দর করে পুরোনো জিনিষ মেইন্টেন করতে পারবো না। বাবা একাধারে জাপানি আর আমেরিকানদের মতন পরিশ্রমী ও ইনোভেটিভ, কত সিস্টেমিক ওয়েতে কাজ করেন, কত পেশেন্স আর ডিসিপ্লিনড। তোমরা কেন হওনি বলো না”। মেয়েদের চোখে জল আসে অদ্ভুত এক আনন্দ আবেগে।
যাক প্রকাশের বিয়ে হয়ে গেল ফাল্গুন মাসে। “চন্দ্রানী” আসায় ঘরের চেহারা বদলে গেছে – পুরোনো বাল্বগুলো চেঞ্জ করে বড়বড় ঝাড়লণ্ঠন ধরণের লাইট লেগেছে ড্রয়িং রুমে, পর্দা এসেছে অনেক দামী। কাঠের সোফা পাল্টে লোহার ফার্নিচার। টেলিফোনটাও নিজের জায়গায় নেই। দেওয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় মাঝে মাঝে বাজনা বাজাচ্ছে। জ্যোর্তির্ময় বাবু মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারেন না, টেপ রেকর্ড চলছে নাকি ফোন এসেছে। ঘরে ঘরে রিসিভার। সবচেয়ে চমকদার হয়েছে ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট, স্ত্রীর হাঁপানি ও মেয়ের ডাস্ট এলাৰ্জি থাকায় এবং মধ্যবিত্ত সংসারে অবাঞ্ছিত মনে হওয়ায় কোনোদিন কোনো কার্পেট কেনার কথা ভাবতে পারেননি তিনি। এখন ছেলে এত টাকা রোজগার করে, মেয়ে মায়ের সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে লাজপৎ নগর, করোলবাগ, সরোজিনী নগরে বাজার করতে ভালোবাসে তাই বিয়ের ৬ মাসের মধ্যেই প্রকাশের বাড়ির ভোল একেবারেই পাল্টে গেল। যদিও নিজের বেডরুমটাতে বিশেষ নতুনত্ব আনতে দেননি তিনি। দেওয়ালে ছেলে মেয়ের ছোটবেলাকার ছবিগুলো সরাতে দেন না কাউকে। টেবিলে সেই পুরোনো জলের জার, ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মায়ের বড় ক্যালেন্ডার বাঁধানো ফটোর পায়ে তাঁর স্ত্রী কমলমণি যেমন ভাবে হাসতেন তেমনি জ্বলজ্বল করছেন বুক কেসের ওপরে, এখনও কৃষ্ণনগর থেকে আনা বিবর্ণ বিবেকানন্দ কোলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার পাশে একই সারিতে আলখাল্লা পড়া রবীন্দ্রনাথ, লম্বাকানের বুদ্ধদেব, চশমা নাকে গান্ধীজি হাতে ছোট্ট লাঠিটি ধরে পুতুল সেজে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে।
হ্যাঁ, জ্যোর্তির্ময় বাবুদের বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগরের পাশে, নদীয়ার এক গ্রামে, নাম কেচুয়াডাঙ্গা। তাই কৃষ্ণনগরের থেকে আনা পুতুলগুলি তিনি একই ভাবে সাজিয়ে রেখেছেন কাঁচের আলমারির মধ্যে। স্ত্রীর হাতের তৈরী একটি আসন ও হাত পাখা মাথার কাছে রাখা। রোজ নিজ হাতে ঘরের সব জিনিষ মন দিয়ে অনেকক্ষন ধরে তিনি যখন মোছেন, তখন মনে হয় পুজো করছেন। মাঝে মাঝে পুরোনো হারমোনিয়ামটাও বের হয় খাটের তলা থেকে ছেলেমেয়েদের তিনদিকে বসিয়ে স্ত্রী সন্ধ্যে বেলায় গান শেখাতেন –
“আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।।
বুকের মাঝে বিশ্ব লোকের পাবি সাড়া”।
বিয়ের পর চন্দ্রানীকে গান গাইতে বললে সে দুটি হিন্দি গান গেয়েছিল। গলায় বেশ দরদ আছে তাই তাকে একদিন হারমোনিয়াম বের করে দিয়ে বললেন – “এটা বাজিয়ে গাইবে মা”। এখন একই রকম আছে, খুব বড় কোম্পানী থেকে কেনা হয়েছিল, দেখো দেখো কী সুন্দর আওয়াজ।
চন্দ্রানী বলল – বাবা আজকাল কারুর আর বেলো করে গান গাইতে ভালো লাগে না। এই দেখো না মা আমার সঙ্গে ক্যাশিও মানে সিন্থেসাইজারটা দিয়ে দিয়েছে, ওতেই সব গান বাজাতে ভাল লাগে।
নতুন ধরণের পিয়ানোটিতে এতো রকমের সুর বাজে এতো ঋদম বাজতে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসাবে – জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ভাল লেগেছিল। চন্দ্রিমা আসার পর ঘরে কত রঙ রূপ ও বাহার ফিরে এসেছে – প্রকাশও ফ্লাইট থেকে ফিরেই কত হৈ চৈ আনন্দ করছে – বড় ভাল লাগছে। এতো সুখের মাঝেও কমলমণির জন্যে বুকের মধ্যে চিনচিন করে ব্যাথা হয়, বেচারী কিছুই দেখে গেল না। ক্যান্সার তো কত লোকেরই হয় কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি সে যে চলে যাবে একথা জ্যোতির্ময় স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যাবার সময় তিনি চোখে জল, ঠোঁটে হাসি নিয়ে একদিন বলেছিলেন – “তুমি তো লক্ষীমন্ত পুরুষ, আমি জানি সংসারটা সব সামলে নেবে”। কথাটা মনে পড়লে এখনও জ্যোতির্ময় বাবুর বুকের মধ্যে বেহালার তারে মোচড় দেয়।
কিন্তু সব সুখ তো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সব ঘটনাও নিজের পছন্দমত বা ইচ্ছেমত ঘটে না। এক্ষেত্রেও হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।
সেদিন রবিবারের সকাল, বাড়িতে নতুন কম্পিউটার এসেছে, চন্দ্রানী জ্যোতির্ময় বাবুকে নিজের ঘরে বসে ইমেল করা শেখাচ্ছে। একবারে ছোট বালকের মতন কৌতূহলী বুড়ো ছেলেকে লিখে লিখে সবকিছু বোঝাতে বেশ মজা লাগছে চন্দ্রানীর। এত বয়সেও সবকিছু জানবার বা নতুন কিছু শেখবার আগ্রহ, এমন ভাল ছাত্র, বন্ধুর মত সহজ সাবলীল ব্যবহার সে কখনও কারোর মধ্যে দেখেনি। এতটুকু মেশিনের কি অসীম ক্ষমতা, মিনিটের মধ্যে সমগ্র বিশ্বকে মুঠোর মধ্যে করবার অসাধারণ শক্তি বৃদ্ধ শিশুকে মুগ্ধ করেছে, ঝুঁকে পড়ে টিচার পুত্রবধূর ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে তিনি “মাউস” ক্লিক করছেন, টাইপ করে মেয়ের সঙ্গে চ্যাট করছেন, – ভীষণ আনন্দ পেয়েছেন নতুন জগতে প্রবেশের অধিকার পেয়ে।
কিছুক্ষন আগেই কলিং বেলটা বেজে উঠেছিল, কে এসেছে খেয়াল করেননি, কাজের মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে এবং চন্দ্রানীর মা সোজা এসে দাঁড়িয়েছেন শ্বশুর বৌমার ঠিক পিছনে। “কম্পিউটারের” দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ ও যুবতীর কাণ্ড দেখে তিনি তো অবাক – তাই বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেই বললেন –
– “কিরে চন্দ্রা তৈরী হোসনি। আজ ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বাংলা নাটকের ফেস্টিভেল আছে না। সকালে অত কষ্ট করে কার্ড জোগাড় করেছি, তুই যাবি না নাকি”?
– “ওঃ মা এসে গেছো, এই দেখো না বাবাকে কম্পিউটার শেখাচ্ছি”।
-“হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কম্পিউটার তো আমাদের সাইবার ক্যাফের সুনীলদাকে বললেই এসে শিখিয়ে দিয়ে যাবে, তোমায় অত সময় নষ্ট করতে হবে না। যাও তৈরী হয়ে নাও তাড়াতাড়ি।
অপ্রস্তুত হয়ে ঠিকমতো শাট-ডাউন না করেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জ্যোতির্ময় বাবু। আর সেদিন থেকে ঘটে গেল কেমন যেন ছন্দ পতন।
প্রকাশ ফ্লাইট থেকে এলে এবার একদিন ঝগড়া হতে শুনলেন ছেলে-বৌয়ের। কারণ দু-দিনের জায়গায় চারদিন দেরী হওয়া। প্রকাশ বোঝাবার চেষ্টা করলো – “এয়ার ক্র্যাফট খারাপ হয়ে গিয়েছিল, দু-দিন ধরে হোটেলে বসে থাকতে আমাদেরই কি ভাল লাগছিল? কি বেকার তর্ক করছো?
চন্দ্রানীর মুখ ভার রইলো দু’দিন। পরের সপ্তাহে আবার বোম্বে থেকে ফিরে এলে সেই একই বাক বিতন্ডা।
– “তুমি আমাকে সময় দাও না, আমি ভীষণ বোর হচ্ছি”।
– “বোর হওয়ার কি আছে? বাড়িতে বাবা আছেন তোমার সঙ্গে সর্বদাই তো কথা বলছেন, রান্না করছেন, তাঁর দেখাশোনা করলেই তো সময় কেটে যাবে”। হালকা গলায় হাসি মুখে উত্তর দিয়ে যখন পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করছে প্রকাশ, ঠিক তখনি কানে এলো, সেই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া অপ্রিয় সত্যটা – যা চন্দ্রানীর মিষ্টি পিয়ানোর সুরের আওয়াজটাকে ভীষণ বেসুরো ব্যাঞ্জোর মত কর্কশ করে দিল।
“বাবা কি বুড়ো থুরথুরে, পঙ্গু কিম্বা কানা খোঁড়া নাকি? জোয়ান লোকের মতন দিব্যি সুস্থ সবল, ওনার আবার কি দেখাশোনার দরকার”?
তখনও সম্পূর্ণ ধৈর্য্য হারায়নি ছেলে একটু বিরক্ত ভরা গলায় বেশ জোরেই চেঁচিয়ে উঠল, – “সারাদিন তো মায়ের সঙ্গেও ঘুরে বেড়াচ্ছো, কোনো কিছুতেই তো মানা নেই আমাদের বাড়িতে, তাতেও খুশী নেই তোমার”? অকারণে এত ঝগড়া করছো কেন?
– “কি আমি ঘুরে বেড়াই? একথাও লাগানো হয়ে গেছে ওনার”? ক্ষুব্দ বেড়ালের মত স্বর পাল্টালো চন্দ্রানী। “বেশ করি মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই? বেশ করি। সারাদিন একটা আধবুড়ো লোক আশে পাশে ঘুর ঘুর করলে কার ভাল লাগে”।
এবার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ প্রকাশের গলায়। “স্যাট আপ, আর একটাও কথা শুনতে চাই না তোমার। ভাল না লাগে তো চলে যাও নিজের বাড়ি। I don’t want to see your face।
হতবম্ভ জ্যোতির্ময় বাবু দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মতন বাইরের বারান্দায়। নিজের সুটকেশ নিয়ে দুপদাপ আওয়াজ তুলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল চন্দ্রানী, মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই। বাধা দেবার, বোঝাবার সুযোগই পেলেন না তিনি। প্রকাশের ঘর অন্ধকার – একটা ইংরেজি গান বাজতে লাগলো সমুদ্রের ঢেউ আছাড় খাওয়ার মতন।
অনেক রাত্রে খাবার টেবিলে ঢাকা দিয়ে যাওয়া, ‘ঝি’-এর রাখা খাবারগুলো ফ্রিজে তুলতে তুলতে ভাবলেন তিনি, একী হয়ে গেল! ‘লো’ ‘বিপ’ দিয়ে টেলিফোনটা তখনই বেজে উঠল, এসটিডি-র কল বুঝে আস্তে করে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। আভার গলা – বাবা কেমন আছো? গলার কাছে জমে থাকা কান্নার ডেলাটাকে ঠেলে ভেতরে চালান করতে করতে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, জ্যোতির্ময় বাবু। কিন্তু আওয়াজ বেরুলো না। ফোনের শব্দে ওঘরে প্রকাশও তুলেছে রিসিভার। বাবাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে ফেললো –
-“হ্যালো দিদি আমি প্রকাশ বলছিরে, বাবা বোধহয় শুয়ে পড়েছেন। বলো তোমরা সব কেমন আছো?
– আমরা তো ভালোই আছি, তোরা – বাবা, তুই, চন্দ্রানী আমার কাছে কলকাতায় কবে আসছিস?
– এবার একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে জানালো প্রকাশ। “দিদি চন্দ্রানী আজ চলে গেল রে”।
– “সেকি কেন? কোথায়?
– প্রকাশ বোঝাতে লাগলো – দিদিকে বেশ অনেক্ষন ধরে, চুপচাপ শুনতে লাগলেন বাবা জ্যোতির্ময়।
– “মেয়েটা বড্ডো বোকা রে দিদি। বিয়ের দিনে যে সব পাইলট, এয়ার হোস্টেস বন্ধু-বান্ধবীরা এসেছিল তাদের হাসি, মজাক শুনেই ও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল। ওদের সুন্দর চেহারা ফ্রি মিক্সিং দেখে ওর মনে একটা inferiority complex grow করে। আর তার থেকেই আসে, insecurity।
– তুই বোঝাসনি? বেড়াতে টেড়াতে নিয়ে যাসনি?
– হ্যাঁ, দু’তিন দিন পরপর ফ্লাইট এলেই কোনো না কোনো কথায় ঝগড়া শুরু করতো। ওর অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে প্রথম প্রথম তো আমি হাসতাম, মজা পেতাম। তাতে ও আরো রেগে যেত, অহেতুক ভয়, সন্দেহের সঙ্গে এখন আবার শুরু হয়েছিল, আমি “বোর” হচ্ছি।
– সে কি রে আমাদের বাবার মতন লোক বাড়িতে থাকলে কেউ আবার বোর হয়?
– সেটা বলতেই তো আরও অশান্তি। এরকম মেয়েকে কেমন করে সহ্য করা যায় বলো দিদি। বাবাকে যে মেয়ে দুঃখ দেয়, সম্মান করতে পারে না, তাকে আমি কিভাবে স্ত্রী বলব?
প্রশ্ন, তর্ক-বাদ বিতণ্ডার সূত্রপাত তাহলে প্রথম দিন থেকেই। কুয়াশা মেঘ, ঝড়, বজ্রপাত, বর্ষণ, প্রাকৃতিক ঘটনার মতন জীবনেও তো টক, ঝাল, মিষ্টির মতন এসব মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ, ভয়-সন্দেহ সবই থাকবে, তাহলে ছাড়াছাড়ি এত তাড়াতাড়ি, তাও বাবার উপস্থিতি নিয়ে। কেমন যেন অসহায় বোধ করতে লাগলেন তিনি। এই ছয় মাসে তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহপূর্ণ ব্যবহার, মায়ের মতন নিজে হাতে মাছের চপ, রায়তা দইবড়া বানিয়ে খাওয়ানো, শিশুর মতন আনন্দে দাবা, লুডো খেলা, কম্পিউটার শেখা সব মিথ্যে হয়ে গেল একমিনিটের ঝগড়ায়, দুই স্বামী-স্ত্রীর কচকচিতে দুধে এক ফোঁটা লেবুর রস ফেলার মতন কেটে গেল! হঠাৎ কম্পিউটারের কথাটা মনে আসতেই বুঝতে পারলেন সহজ সরল মেয়েটির মানসিক ভারসাম্য ঠিক না থাকার পেছনে মায়ের একটা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। একদিন ওদের একটা কথোপকথনও শুনেছিলেন তিনি, এখন তার মানেটা পরিষ্কার হল। – “এসব আধবুড়োগুলোর আবার একটু আলুর দোষ থাকে। ‘মা’ সাবধান করছিলেন মেয়েকে।
‘জ্যোতির্ময় বাবু’ ভেবেছিলেন বোধহয় কোনো বাসযাত্রীর সম্বন্ধে কথা হচ্ছে বা দোকানে বাজারে ধাক্কাধাক্কি করা মেয়েদের গায়ে পড়া কোনো লোকের সম্বন্ধে মেয়েলি আলোচনা চলছে তাদের। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল, “আধবুড়ো” বলতে তাকেই উল্লেখ করেছিলেন মা। মাথা কান গরম হয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল তাঁর, ঘুমের ওষুধ খেয়েও দু চোখের পাতা এক করতে পারলেন না তিনি।
আলো জ্বালিয়ে ‘স্ত্রীর’ ছবির দিকে তাকাতেই হু হু করে বন্যার জল যেন হঠাৎই ছাপিয়ে এলো, চোখের দুই কিনারা বেয়ে। -“তুমি তো ওপর থেকে দেখছো মিনু, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তোমার ছেলে-মেয়ের সংসারটা শুধু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। জীবনের শেষ সময়ে এসে শেষে এমনি করেই কাঁচের বাসনের মতন সব ঝনঝনিয়ে ভেঙে যাবে? “তোমার পরিবারের সব শ্রী” এমনি করে “বিশ্রী” হয়ে যাবে? আমি কি এমনি হতচ্ছাড়া?
দ্বিতীয় অধ্যায়
সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। কী একটা ছুটির জন্য স্কুল কলেজ বন্ধ! রাস্তা ঘাটও ফাঁকা। প্রকাশ চেন্নাই গেছে ‘দু’ দিন হল, আজ বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। অন্য দিনের মতন সন্ধ্যা এসে সব বাসন মেজে ঘর মুছে চলে গেছে। বিকেলে এসে রুটি তরকারি বানিয়ে দেবে। এ বেলায় একটু দলিয়ার খিচুড়ি চাপিয়ে দেবেন তিনি সব সব্জি ফেলে দিয়ে। রোজকার মতন স্নান করতে যাবার আগে ডাস্টার হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাড়া বাড়ি একা একা। টিভি, কম্পিউটার, কাঁচের আলমারী, টেলিফোন, ডাইনিং টেবিলের সানমাইকা চকচকে করার পর ফটোগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। প্রকাশ আর চন্দ্রানীর হাসিমুখ দুটো ওদের বেডরুমের দেওয়ালে এখনও শোভা পাচ্ছে পাশাপাশি। চন্দ্রানীর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ কী মায়া। এতো লাবণ্যময়ী সরলতা যার, সে কেমন করে এমনভাবে নিজের সংসার ছেড়ে হটাৎ চলে যেতে পারলো, কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেন না তিনি। ওদের ঘরের দরজাটা টেনে দিয়ে স্ত্রীর ছবিটা মুছতে লাগলেন অত্যন্ত আদরের সঙ্গে। মনে পড়ল, এই ডাস্টিং করা নিয়ে কমলমণি কত খেপতেন। ছুটির দিন সকালে রুটি আলুরদমের জল খাবার খাওয়া শেষ হলেই ঝুলঝাড়া আর ঝাড়ন হাতে ধরিয়ে বলতেন “ঐ দেখো কত ধুলো, তোমার ঝারণের স্পর্শ পাওয়ার জন্য কাঁদছে”। তিন ছেলেমেয়েই টিকটিকি দেখে ভয় পেতো ছোটবেলায়। তাই ঝাঁটার ডগায় ডিমের খোলা লাগিয়ে সারা বাড়ির দেওয়াল টিকটিকি শূন্য করাও তাঁর একটা বিরাট কাজ ছিল। সারাক্ষণই বাড়ির কাজ করা, মাসকাবারী তোলার আগে তাক পরিষ্কার করা কৌটো কাটা মুছে, তেলচিটে জালি ফ্যান সাফ করায় সময়টা বেশ ভালোই কেটে যেত স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। রান্না ঘরে এসে চায়ের প্যাকেট থেকে চা পাতা ঢালতে লাগলেন তিনি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। ভাবছেন তিল তিল করে গড়ে তোলা এতো সুন্দর সংসারটা কার কাজে লাগবে। ছেলে-বৌয়ের মধ্যে যদি মিল না থাকে, নাতি-নাতনিদের কলকলানিতে বাড়ি যদি মুখর না হয়; রকমারি রান্নার গন্ধে এক্সজস্ট ফ্যান-এর হওয়াটা যদি পাশের বাড়িতে খবর না পৌঁছে দেয় যে হিং দিয়ে ডাল সাতলাচ্ছে প্রকাশের বৌ কিম্বা পাঁচফোড়ন ভেজে সুক্তোতে ঢালা হ’ল তাহলে আর বাঙালিদের বাড়ি কী হ’ল। শীতের দিনে খেজুর গুড়ের পায়েস বানিয়ে যখন কমলমণি টেবিলে এনে রাখতেন তখন সারা ঘর যেন অপূর্ব মিষ্টি গন্ধে ‘ম’ ‘ম’ করতো। এই ক’মাস চন্দ্রানীও লাফিয়ে বেরিয়েছে –
“বাবা এত সুন্দর টেস্ট হয়েছে না হাত চাটতে ইচ্ছে করছে তরকারী খেয়ে”।
প্রকাশ একদিন বলেছিল – “মা চলে গেলেও বাবা কোনোদিন আমাদের খাওয়ার কষ্ট পেতে দেননি”। মাংস-বিরিয়ানি খেয়ে সেদিন চন্দ্রানীর বাবাও বললেন – “এবার বেয়াইমশাই আপনি একটা হোটেল খুলুন”। আপনার এখানে এলে জিভের স্বাদই পাল্টে যায়। ভদ্রলোক খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মোটা হয়ে যাচ্ছেন বলে বাড়িতে স্ত্রী বড্ড ধরা কাট করেন। ওনার ভালোর জন্যই। চন্দ্রানীও খুব বকুনি দেয় বাবাকে বাচ্চার মতন; জ্যোতির্ময় বাবুর বেশ মজা লাগে।
জানলা দিয়ে বাইরের আকাশে থরে থরে জমে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে, এবার ঘরে আসতেই মনে পড়ল বৌ-এর পেছনে ঘুর ঘুর করা, আর রান্না ঘরের কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকার “হবি” নিয়ে বন্ধু বান্ধবেরাও কত সময় ঠাট্টা করতো তাঁকে। কিন্তু স্ত্রী প্রেসারের রুগী তারপর হার্টের অসুখ টা ধরা পড়ল, যখন একটু কাজ করলেই হাপাতে লাগলেন তখন থেকেই গৃস্থলীর কাজে আরও বেশি করে লেগে পড়েছিলেন তিনি। “ভাঁড়ার” গোছানোর কাজ, কখন কি আনতে হবে, কোন কোম্পানীর তেল, সাবান নীল আনলে ভাল হয়, কোন হ্যাঙ্গারে কোথায় কাপড় মেললে শার্ট, প্যান্ট, জিন্স এর জ্যাকেট তাড়াতাড়ি শুকোবে সব তার খেয়াল থাকতো। ছেলেমেয়েদের ইউনিফর্মগুলোও রাত্রি বেলায় ইস্ত্রি করতে উদ্যত হতেন। ছেলে মেয়েদের পড়া, গান বাজনা, সাঁতার শেখা, কম্পিউটার ট্রেনিং নেওয়াতে ব্যস্ত থাকতে হতো তবে বাবা মায়ের সাথে তারাও সর্বদায় সহযোগিতা করেছে। কখনও কোল্ড ড্রিঙ্কস, আইসক্রিম খাবার ঝোঁক পর্যন্ত তারা করেনি। খুব সহজে ও স্বাভাবিকভাবে আদর স্নেহ ও value education দিয়ে দুজনে মিলে মানুষ করেছিলেন।
তাঁর তিন সন্তানকে মায়ের চারিদিকে গোল হয়ে বসে তারা সবাই একসঙ্গে পিঠে গড়েছে, সিঙ্গাড়ার পুর ভরেছে, গাজর কুরে দিয়েছে গাজরের হালুয়া খাবার জন্য। বাংলাদেশে না থেকেও তারা ছুটির দিনে মাকে মোচা ছাড়িয়ে বা নারকেল কুড়ে দিয়ে বাঙালি ট্রেডিশনটা বজায় রাখতে পেরেছে। তাই মডার্ন আবহাওয়ায় থাকলেও প্রকাশ এখনও ছুটির দিনে লাউ ডাটা চচ্চড়ি চিবুতে চায়। তবে কাজের মেয়েদের হাতে কি আর সে রকম স্বাদ হয়! “ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং একটানা টেলিফোনের সুতীব্র আওয়াজে এবার নস্টালজিয়ার সূত্রটা ছিড়ে গেল, তাড়াতাড়ি উঠে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। – হ্যালো।
কিছুক্ষন কোনো আওয়াজ নেই। আবার হ্যালো কে কথা বলছেন? এবার খুব আস্তে পাখির ডাকের মতন অদ্ভুত গলায় কে যেন বলল – “বাবা”।
– কে, আভা না প্রভা? আমেরিকা জাপান থেকে ফোন করলে আভা বা জামাইয়ের গলাও এরকম কয়েক সেকেন্ড পরে পরে ভেসে আসে, তাই একটু থেমে তিনি একটু জোরেই বললেন – “হ্যাঁ বলো মা, বাবা বলছি”। – আরও একটু বিরতি।
– “কি রে কি হলো? কেমন আছিস? কথা বলছিস না কেন আভা”? – আবার চিন্তার সুর জ্যোতির্ময় বাবুর উৎকণ্ঠিত গলার স্বরে।
– “বাবা আমি চন্দ্রানী বলছি”।
– বৌমা? তোমার আওয়াজটা এরকম লাগছে কেন মা! এত দিনে মনে পড়ল বুড়ো বাপটাকে? অভিমানের প্রচ্ছন্ন আভাস তাঁর কথায়।
– “বাবা বাবা… আমার মা এইমাত্র” গলা বুজে এলো চন্দ্রানীর। কেন যেন কথা বলতে পারছে না মেয়েটা। একটা গানের কলি হটাৎই কানে বাজলো তাঁর “হায়রে ব্যাথায় কথা/যায় ডুবে যায় যায়রে”।
– বৌমা কি হয়েছে তোমার মার? তোমার বাবা কোথায়? ওনাকে ফোন দাও।
– এবার বাক্যটা কোনোরকমে শেষ করলো চন্দ্রানী – “বাবা, মা এইমাত্র চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে”।
চিত্তরঞ্জন পার্কে পৌঁছাতে (ময়ূর বিহার থেকে “অটো” নিয়ে) প্রায় ঘন্টা খানেক লেগে গেল, নিজামুদ্দিন পুলের ওপর ট্রাফিক জ্যাম। প্রগতি ময়দানে এখনো ট্রেড ফেয়ার চলছে।
ততক্ষনে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন যারা ঐদিকে থাকেন অনেকেই এসে গেছেন। জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখে শিশুর মতন ডুকরে কেঁদে উঠলেন চন্দ্রানীর বাবা। পাশে বসতেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁর হাতদুটো। বড় অসহায় মনে হল তাঁকে। ‘স্ত্রী’ বিয়োগ যে কি অসহনীয় দুঃখের তা জ্যোতির্ময় বাবুর চেয়ে বেশী আর কে বুঝবে। কিন্তু অকালে স্ত্রী চলে গেলেও সংসারটাকে ‘শ্রী’ হীন হতে দেননি তিনি কোনোদিনই। নিজের দুঃখ চেপে রাখার মতন অসম্ভব সহ্যশক্তি আছে তাঁর মধ্যে কিন্তু এই ষাট হয়ে যাওয়া মানুষটি অত্যন্ত সরল অপটু, স্ত্রীর ওপর এতদিন সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন তিনি। স্বামীকে এক গ্লাস জল গড়িয়েও খেতে হয়নি কোনোদিন। এক কাপ চা করেও খাননি তিনি। নিজের বই আর বন্ধুদের সঙ্গে তাস নিয়ে সময় কাটিয়েছেন এক সুরক্ষিত জগতে। এই নিষ্প্রাণ দেহের দিকে তাকিয়ে এবার জ্যোতির্ময় বাবুর বড় অদ্ভুত অনুভূতি হল। যে ভদ্রমহিলা অতি সুদক্ষ হাতে সংসারের সব কাজ সামলাতেন, চাকরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে মাছের, সব্জির বাজার আনতেন, ড্রাইভারকে বকে বকে গাড়ির চাকাগুলো পর্যন্ত চকচকে করে ধোয়াতেন, ছেলে, মেয়ে, স্বামী কি পরবে, খাবে, কোথায় যাবে, বেড়াবে, এমনকি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোবে – সে সব খুঁটি নাটি বিষয়েও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লক্ষ্য রাখতেন তিনি, এভাবে নিশ্চুপ শান্ত মুদিত নয়নে নাকে তুলো গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। মাটিতে কখনো তাঁকে বসতে দেখেননি তিনি। আজ পাড়ার লোকেরা এসে তাঁকে খাট থেকে মাটিতে একটা মাদুরে শুয়ে দিয়েছেন। চন্দ্রানী বলে খাবার পর একদিন ওর বাবাকে ফোনে ধরবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সেদিন এই ভদ্রমহিলা কত দাপটের সঙ্গে বললেন –
“আপনার ছেলের যখন আমার মেয়ের জন্য সময় নেই তখন মেয়ে আপনার বাড়িতে থেকে কি করবে? আমার কাছে থেকে সে আরো পড়াশোনা করবে”।
এই চার পাঁচ মাস আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। জ্যোতির্ময় বাবু বুঝেছিলেন বাবার যেখানে কোনো say নেই তখন লাভ হবে না বারবার ফোন করে। পাড়ার মহিলারা এবং চন্দ্রানীর মাসীও যাঁরা পাশেই B-Block এ থাকেন এসে সিঁদুর আলতা পড়াচ্ছেন। ফোলাফোলা চোখ, খোলা চুল সাধারন ছাপা শাড়ি পরনে, সকলের কথামত কখনও চন্দন পিঁড়ি, কখনও গঙ্গার জল আনতে ব্যস্ত চন্দ্রানীমাকে বড় ক্লান্ত ও অসহায় লাগছে। জানলেন কাল রাত থেকেই সবাই জেগে বসেছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই তিনি হটাৎ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একবার কাছে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা। আলতার শিশিটা খুলতে গিয়ে সারা হাতের তালুতে লেগেছে লাল রঙ। শ্বশুর আলতো করে হাতটা মাথায় রাখতেই মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। আর তার সারা মুখটা লালে লাল হয়ে গেল – যেন বিজয়ার দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন হল।
তৃতীয় অধ্যায়
শ্রাদ্ধের দিনটাতে ছেলে প্রকাশকে অনেক কষ্টে রাজী করিয়ে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলে বাবা জ্যোতির্ময়। অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে কথা বললেও চন্দ্রানী-প্রকাশকে একবারও মুখোমুখি হতে দেখেননি তিনি। এই দশদিন ধরে অনেক কথায় তাঁর কানে গেছে। সমগ্র পরিবারের ভদ্রতা সভ্যতার মুখোশও খসে পড়তে দেরী লাগেনি। যেমন চন্দ্রানীর বড় মাসী তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বেশ কয়েকটা কটূক্তি করেছেন যা তার মনে তীরের মতন বিঁধেছে।
– “কি রে এ সব মেহমানদের রোজ রোজ এসে বসে থাকার কি দরকার তা তো বুঝি না বাপু” – কিম্বা ছোট মাসীর সরাসরি প্রশ্ন – “কি রে তোদের আসল খবরটা কি বলতো? প্রকাশ ডিভোর্সের মামলা করার আগেই তুই করে দে। খোর পোষ নিতে ছাড়বি না কিন্তু। দিদি নেই, কিন্তু আমরা তো আছি”।
চন্দ্রানী ইশারায় চুপ করতে বলেছে মাসীদের কিন্তু তাঁরা মনে করেন “স্পষ্ট কথায় কষ্ট নেই”।
– “আমাদের আবার খোলামন, ঢাক গুড় গুড় একদম পছন্দ নয়, আর দিদির কাছে সবই তো শুনেছি আমরা”।
কিন্তু তবু তিনি প্রায় রোজই গেছেন ঐ বাড়িতে। বেয়াইমশাইও যেন তাঁকে দেখে অনেকটা শান্তি পান।
চন্দ্রানীর দাদা ক্যালিফোর্নিয়ার থেকে এসেছে মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এবং পরিষ্কার বলে দিয়েছে বাবাকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার স্ত্রী ডক্টরেট করছে আর তাঁরও ভীষণ খারাপ সময় চলছে এখন। ১১/৯ এর পর থেকে ওদেশে IT মার্কেট ডাউন হয়ে গেছে। প্রচুর লোকের চাকরি চলে যাচ্ছে, তাকে হয়তো কোম্পানী বাড়ি সব বদলাতে হবে, তাই চন্দ্রানী তো আছেই। বাবাকে সামলে নেবে। অথবা যদি কোনো হোমে রাখা যায়, তাই ভাবা হচ্ছে। এদিকে বাঁকুড়া থেকে চন্দ্রানীর এক কাকা এসেছেন। দাদাকে নিয়ে যাওয়ার তাঁর খুব ইচ্ছে। তাতেও চন্দ্রানীর বৌদি remark করলেন ইংরেজিতে – actually these people went to grab his property so this uncle is so much interested to look after his brother। সায় দিলেন চন্দ্রিমার মামা – “Chittarajan park is very costly now if you sell this house to the promoter they will give you crore rupees”।
জ্যোতির্ময় বাবুর পাশে বসে নিরীহ গ্রাম্য মানুষটি তখন পুরোহিত মশাইকে একটা কাগজে পিতা, প্রপিতামহদের নাম লেখাচ্ছিলেন। সব কথাই যে কাকার কানে যাচ্ছিল তা বোঝা গেল, যখন দাদার কাছে এসে ক্রুদ্ধ গলায় তিনি বলে উঠলেন – “তুমার সম্পত্তির লেইগ্যে ইখানে আসি নাই দাদা, তুমাকে ভালোবাসি বলেই আইছিলাম। যেইত্যে হবেক নাই আমার সঙ্গে – উয়াদের মতন আমরা ইংরেজি বলতে লারি ঠিক কিন্তু বুইজতে তো পারি। বৌদিদি তো কখনোই তুমার কাছকে এইসত্যে দিলেন নাই, আবার ইয়াদের কথার বহর দেখ না, ক্যানে অসটা রাখতে জায়গা লাই”।
চিত্তরঞ্জন পার্কের বেশির ভাগ লোকই পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা ছিলেন এককালে তাই এখনও তাঁদের অনেকের ভাষায় অন্যরকম টান আছে। এই কাকার হটাৎ বাঁকরে বোলি শুনে একটু অবাক লাগলো জ্যোতির্ময় বাবুর। ক্রুদ্ধ মানুষটিকে হাত ধরে শান্ত করে বাইরে নিয়ে এলেন তিনি। শিবমন্দিরের চাতালে একপাশে বসে গল্প শুরু করলেন, জয়রামবাটি, কামারপুকুরের। ইনি চন্দ্রানীর বাবার মামাতো ভাই। বিষ্ণুপুরের বনেদি পরিবার। জমি জমা, পুকুর স্বচ্ছল অবস্থা তাঁর। পিসিমা মানে চন্দ্রানীর ঠাকুমাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় এই দুই মামাতো পিসতুতো ভাই একসঙ্গে খেলেছেন পড়েছেন। চন্দ্রানীর বাবারা বাংলাদেশ থেকে চলে এলে মামা বাড়িতেই মানুষ। খ্রিষ্টান কলেজ থেকে ইংরাজি সাহিত্যে বি.এ. পাশ করে তিনি দিল্লী চলে আসেন। কারন তখন তাঁর বাবা হিন্দু কলেজে চাকরী পান। বৌদির মৃত্যুর খবর পেয়েই ঐ মামাতো কাকা ছুটে এসেছেন, দাদার শোক সন্তপ্ত পরিবারকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে। আর এভাবে সম্পত্তির লোভে আসবার নির্লজ্জ অভিযোগে সরল মানুষটা দুঃখে ক্ষোভে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। চন্দ্রানী যে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে সে কথা তিনি জানেন না। তাই তার শ্বশুর জ্যোতির্ময় বাবুকে তাঁর বড় আপন বলে মনে হল। বেয়াইমশাইও করুণ চোখে যখন বললেন, – “শ্রাদ্ধের কাজকর্ম খাওয়া দাওয়াগুলো একটু সামলে দিন দাদা”। তখন তাঁর কথা ফেলতে পারলেন না তিনি। প্রকাশের উপস্থিতিটা বেয়াইমশাইয়ের কাছে যে কত আনন্দের হয়েছে তা জ্যোতির্ময় বাবু উপলব্ধি করলেন কেননা তিনিও মেয়ের বাপ। মেয়ে জামাই-এর ছাড়াছাড়ি হলে তিনি কি স্থির থাকতে পারতেন। চন্দ্রানীর বাবাও যে এই বিচ্ছেদটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রীর ভয়ে চুপ ছিলেন সেটা বেশ পরিষ্কার বোঝা গেল সেদিন।
নিয়ম ভঙ্গের পর সবাই চলে গেল একবার চন্দ্রানী মাকে একা পেয়ে শ্বশুর প্রশ্নবানটা ছুড়ে দিলেন, “কি মা কবে যাবে নিজের বাড়ি”? মুখ নিচু করে বৌমা শুধু পাল্টা প্রশ্ন করলো শুকনো মুখে, – ” আমার বাবাকে কে দেখবে বলো”? এত স্বাভাবিক রূঢ় সত্যটার সামনে এসে আর কোনো কথা খুঁজে পেলেন না তিনি।
বাঁকুড়ার কাকাকে চন্দ্রানীর দাদা অনুরোধ করেছে আপাতত মাস ছয়েকের জন্য তাঁর কাছে গ্রামে নিয়ে গিয়ে রাখতে। চন্দ্রানী বি.এড পড়ায় চান্স পেয়েছে, সেও হোস্টেলে চলে যাবে। টাকার সমস্যা হবে না কারন মা ছেলের পাঠানো ডলারের বেশ ভালো ভাবেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অতএব নিয়ম ভঙ্গ একটা সংসারের সমস্ত নিয়ম কানুনকে ভেঙে চুরমার করে একটা বৃদ্ধ মানুষের জীবনে যেন বুলডোজার চালিয়ে দিল।
সন্ধ্যে বেলায় বেয়াইমশাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সেই ভোলা ভালা সহজ সরল অধ্যাপক মানুষটি তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন কান্নার দমকে সারা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠলো তাঁর। এই মানুষটার মায়ায় এই এগারো বারোদিন মান অপমান, অভিমান সব জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি এই বাড়িতে এসেছিলেন। আজ কেমন যেন অব্যক্ত ব্যাথায় বুকের ওপর একটা ভীষণ ভারী পাথর চেপে বসতে লাগলো প্রকাশের বাবা জ্যোতির্ময় বাবুর। বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন, অন্ধকার বারান্দায় একা বসে আছে ছেলে আকাশ ভরা তারার মাঝে নিজের অস্তিত্বের সন্ধানে। দেবব্রত বিশ্বাস গান শোনাচ্ছেন – যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝরে। রাত্রের খাওয়া দুজনে ভীষণ স্তব্ধতার মধ্যে সারলেন, নম নম করে। নীরবতার নিশ্চিদ্রতায় বাড়ির আবহাওয়াও হয়ে উঠল অদ্ভুত অস্বাভাবিক। এটাই বোধহয় সেই গানের কলির মতন সত্য – মনে হল তাঁর “ঘর ভরা মোর ‘শূন্যতা’ যে বুকের পরে”।
ক’দিন ধরে জ্বর হওয়ায় অফিসে যায়নি প্রকাশ। চুপচাপ শুয়ে আছে নিজের ঘরে। বাবার মৌনতার সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন বোবা হয়ে গেছে। কথা বলার শুধু নয়, ভাবার ক্ষমতাও যেন লুপ্ত হয়ে তার মনটা অবশ করে দিয়েছে। ছোট থেকেই বেশী ভাবুক বা আবেগ প্রবন নয় সে, খেলাধুলা, হৈ চৈ শান্তিপূর্ণ বাড়ির বাতাবরণে খুব স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দে গাছের মতন বেড়ে উঠেছে ছেলেটি। মায়ের মৃত্যু তাকে বিচলিত করলেও বাবা বা দিদিদের স্নেহ ও আদরের ছত্রছায়ায় বিশেষ ভাবে আলোড়িত করতে পারেনি এবং অভাব তাকে কখনও বুঝতে দেওয়া হয়নি। হঠাৎ এত পছন্দ হওয়া ভালো লাগা মেয়েটি যাকে সে শুধু স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেনি, প্রেয়সীর রোমান্সে আপ্লুত করতে চেয়েছিল, সারাজীবন যার রক্ষণাবেক্ষণের, ভাত কাপড়ের ভার নেবার জন্য অগ্নি সাক্ষী করে যে শপথ নিয়েছিল হটাৎ তাকে এমন করে যে হারাতে হবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
আজ সকাল থেকেই ভাবছে দিদিকে একবার ফোন করবে কিন্তু বিছানা ছেড়ে বাইরে বসে চা খেয়েও আবার শুতে ইচ্ছে করলো তার। কিছু ভালো লাগছে না, খবরের কাগজ নিয়ে তাই গা এলিয়ে দিল সে সোফায়।
স্বর্গীয় শাশুড়ির কাজের দিনে কেবল বাবার কথাতেই কি প্রকাশ শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল! না চন্দ্রানীর জন্য ভীষণ মন কেমন করছিল তার। কিন্তু ওদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে সারাদিনে একবারও ওকে সে একা পায়নি। একবার চোখাচোখি হলেও মেয়েটা কাছে আসেনি, কেমন যেন ভয়, লজ্জা বেদনা বিদুর সেই চোখ দুটো বারেবারে মনে পড়ছে তাই। সেই ঝকমকে সেজে থাকা, বাড়িতেও লিপস্টিক লাগানো গোলাপি ঠোঁট ফুলিয়ে যখন তখন অভিমান করা, একটু তর্কবাগিনী মায়ের মুখের ঝাল খাওয়া, সন্দেহ আর অশান্তির দোলায় অকারণে দোল খাওয়া মেয়েটা মায়ের মৃত্যুটাতে ভীষণ ভাবে আঘাত পেয়েছে। তার বিব্রত, নৈরাশ্য পীড়িত চেহারা অনেকটা ডানাকাটা পাখির মতন অসহায়। তার বিষন্নতা, যন্ত্রচালিতের মতন কাজ করে যাওয়া, বাবাকে ওষুধ খাওয়ানো, আত্মীয় স্বজন প্রবাসী দাদা সবাইকেই যথারীতি সম্মান দেওয়া, শ্রাদ্ধবাসরে পুরোহিত মশাইকে ঠাকুর ঘর থেকে কখনও গঙ্গাজল, কখনও চন্দন কাঠ ইত্যাদি যোগান দেওয়া, সবই সে করে যাচ্ছে দম দেওয়া পুতুলের মতন। মাসী-পিসি, দূর সম্পর্কীয় দিদি বৌদিদের একই প্রশ্নের একই রকম উত্তর আবেগহীন গলায় দিয়ে যাচ্ছে, অনেকটা টেপরেকর্ডে ধরে রাখা একই গতে। “মা’ কেমন করে কখন অসুস্থ হলেন ,কোন হাসপাতালে কখন কি ধরণের চিকিৎসা হ’ল, ক’টার সময় মারা গেলেন? এইসব একই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত কেউ কেউ তার ব্যক্তিগত জীবন, ভবিষ্যৎ নিয়েও খোঁচা দিতে ছাড়ছেন না, হয়ত সেই কারনেই বেশ গম্ভীর মুখে কাজ করে যাচ্ছে সে, কাঁদার অবকাশ নেই। শ্বশুরমশাই প্রকাশের হাত দুটো ধরে একটু চাপ দিয়েছিলেন শুধু। প্রণাম তিনি কোনোদিনই করতে দেননি জামাইকে। একটু ঝুঁকলেই হাত দুটো ধরে নিজের বুকে টেনে নিতেন। আজ আর ঠিক সেইভাবে বুকে টানতে অসমর্থ বৃদ্ধ অধ্যাপক। প্রকাশের উপস্থিতিতে কেমন যেন এক দিশেহারা বিহ্বল হয়ে পড়লেন, কিন্তু সবাইকার চোখ তাঁর ঐ সুদর্শন জামাইয়ের দিকে থাকায় মুখে কিছু বলতে পারলেন না, শুধু হাতের ওপর চাপটা অনুভব করে প্রকাশের মনে হল – আঙুলেরা বোধহয় কখনও কখনও কথা বলে। একটু পরশ সামান্য উত্তাপ জমাট বরফের মধ্যেও বুঝি এমনি করে ফাটল ধরায়। আর স্নেহমমত্বের তথা ব্যাকুল আবেগের ফল্গু স্রোত কঠিন পাথরের মতন স্তব্ধ জলের মধ্যে সৃষ্টি করে তরল কোমল ঝর্ণার। যা খুব ধীরে ধীরে ঝির ঝির করতে করতে বেরিয়ে আসে স্বপ্ন ভঙ্গ নির্ঝরের মতন। মুখ নিচু করে সে ভাবতে লাগলো, স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে প্রথমে হালকাভাবে পরে সিরিয়াস হয়ে অনেক কথা কাটাকাটি করেছে সে। আত্ম অভিমান, অহং বোধ বা দাম্ভিকতা কিনা জানে না, কিন্তু সম্মানে আঘাত লাগায় অনেক অপ্রিয় কথা শোনাতেও বাধ্য হয়েছে সে কিন্তু এই শিশুর মতন বৃদ্ধ শ্বশুরের সঙ্গে কোনোদিনই মুখোমুখি তার কোনো তর্ক বিতর্ক হয়নি। আজকে কেমন যেন অপরাধী লাগছে নিজেকে। এনার কথা তো একবারও ভাবেনি, এনার অসহায়তা, প্রতিবাদ করার অক্ষমতা, অসম্ভব সারল্য ও স্ত্রীর প্রতি নির্ভরতার কথা আজ সে অন্য দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে পারলো। কেননা এই বৃদ্ধ শিশুটিতো সব সময় তাঁর জামাইকে ‘বাবা’ বলেই সম্বোধন করতেন। আর ওঁদের বাড়ি যখন ও গেছে, খাওয়া হয়ে গেলেই নিজে তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মেয়েকে বলতেন – “ওরে ওকে কিছুক্ষন বিশ্রাম করতে দে। কতদূর ফ্লাই করে এসেছে”। প্রকাশের ইচ্ছে করছিলো ওনাকে আজ বাচ্চার মতন আদর করে বুকে টেনে নিতে।
এবারে লক্ষ্য করলো সে রান্নার লোকেদের কাছে একটা চেয়ারে বসে থাকা নিজের বাবাকে। একজন গ্রাম্য মতন মামা বা কাকার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলছেন তিনি। সর্বদা সোজা হয়ে বসেন তিনি। কিন্তু আজ তাঁর ঋজু দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে, কপালে বারবার হাত যাচ্ছে। খুব সম্ভব মাথা ব্যাথা হচ্ছে। সবসময় ধপধপে জামা-কাপড় পরার অভ্যাস তাঁর। আজকের পাজামা-পাঞ্জাবীটি ময়লা, চুলও রুক্ষ এলোমেলো। ক্রমাগত দশদিন ধরে রোজ আসছেন তিনি এই বাড়িতে। প্রথমে খবরটা পেয়ে প্রকাশ বুঝে উঠতে পারেনি কি করা উচিৎ তার। যে স্ত্রীর সঙ্গে এই ক’মাস ধরে যোগাযোগ নেই, সম্ভবতঃ তাকে অক্ষম স্বামী সাজিয়ে ওরা ডিভোর্সের কেস করবে অথবা বাবার থেকে আলাদা করে নেবার পরিকল্পনা চলছে তাদের বাড়িতে। অভিসন্ধি করা হয়েছে তাকে “ময়ূর বিহার” ছেড়ে “গুরগাঁও” বা পালাম বিহারে আলাদা বড় ফ্লাট নেওয়ার জন্য। ঈস্বরতুল্য বাবার সম্বন্ধে মন বিষানোর চেষ্টাও কম হয়নি। সেখানে কেন যাবে সে? তাদের বাড়িতে কে মরলো বা বাঁচলো প্রকাশের জানবার ইচ্ছে নেই। কিন্তু যখন বাবা বললেন – “সব সময় মনে রাগ অভিমান পুষে রাখতে নেই বাবা। আজ একবার মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো তোমার কর্তব্য। এখনও তো ডিভোর্স হয়নি তোমাদের। তখন গিয়েছিল সে তাদের বাড়িতে। সেই শাশুড়ির মৃত্যু যিনি প্রথমে মায়ের অভাব পূর্ণ করবার ভান করেছিলেন, প্রথম তিন মাস প্রকাশ প্রকাশ করে পাগল হয়ে যেতেন, জামা-কাপড়, জিনিষ উপহারে ভরিয়ে দিতেন বাড়ি। তিনিই যখন একদিন আদো আদো গলায় বললেন – “তোমাদের বাড়িটা পুরোনো দিনের এর পরিবেশটাও কেমন যেন সব লোয়ার মিডল ক্লাস লোকের বাস। তুমি এত ভাল এয়ার লাইন এ চাকরী করো, এত টাকা মাইনে পাও, এদিকে সাউথ দিল্লীতে একটা ফ্লাট নাও”। তখন প্রকাশ নয় চন্দ্রানীও বলে উঠেছিল – “না না আমাদের পাড়াটা খুব ভালো। আর বাবার অনেক কষ্টের তৈরী বাড়ি। মায়ের স্মৃতি জড়ানো, ওখান থেকে যাবার কথা তো ভাবতেই পারি না”।
চন্দ্রানী বলল – “ছাদটাও বড় সুন্দর মা, আমার তো খুব ভালো লাগে”। আবার ক’দিন পরে শুরু হলো, অন্য যুক্তি – বাবা ওখানেই থাকবেন, তবু ভবিষ্যতের জন্যে তোমাদের তো একটা আলাদা প্রাইভেসি চাই, ওখানে তো খুব ভালো স্কুলও সেরকম নেই। বাচ্চা-কাচ্চা হলে পড়াবে কোথায়? এর জবাবও চন্দ্রানী দিয়েছিল – “না মা, এখানে ডিপিএস কলম্বাসের বাস শুধু নয়, সব বড় স্কুলের বাস আসে। আর আমাদের বাড়ির কাছেই তো ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমস হবে। মেট্রো ট্রেনও এসে যাবে। বাড়িতে বাবা কত সুন্দর বাগান করেছেন, আমার তো খুব ভালো লাগে”।
কিন্তু তার ক’মাস পরে ওনার মনে হতে লাগলো – “দেখো প্রকাশ তোমার এত কাজ, মাসের মধ্যে এতবার আউট অফ স্টেশন যাও, চন্দ্রা তো বোর হয়ে যায়, তাছাড়া বয়স্ক লোকের সঙ্গে কতক্ষন আর কি গল্প করবে। ওকে বরং MBA তে ভর্ত্তি করে দাও”।
– “হ্যাঁ, পড়ুক না যত ইচ্ছে পড়াশোনা, খেলাধুলো, গান-বাজনা, সেলাই আরো কম্পিউটার কোর্স শেখা সবকিছুর জন্য, সব হবির জন্যই বাবার খুব উৎসাহ আছে আর আমার তরফ থেকেও কোনো বাধা নেই”।
উনি আবার আন্তরিকতা ভরা গলায় বললেন – “না, সাউথ দিল্লীতে না থাকলে কি ভালো কোনো কলেজ পাবে? তাই বলছিলাম কি আমার বাড়ির কাছেই একটা খুব সুন্দর ফ্লাট আছে, যদি তুমি ভাড়া নাও…”। এবার কথাটা শেষ করতে দেয়নি প্রকাশ। – “না, সেটা একেবারেই সম্ভব নয়”। ধীরে ধীরে চন্দ্রানীর সুরও বদলাতে লাগলো। প্রকাশ ফ্লাইট-এ গেলেই ওর মাসীর বাড়ি, মামীর বুটিকে বা সিনেমা থিয়েটারে যাওয়া চাই মায়ের সঙ্গে।
বাবার সম্বন্ধে কটূক্তি সহ্য করা সেই অসহ্য মহিলা আজ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর জন্যেও মনটা কেন এমন খারাপ লাগছে প্রকাশের। যাঁর ছবিতে প্রণাম করতে পারলো না, কিন্তু কেমন যেন মনে হল সেও কি একটু বেশী নিষ্ঠুরভাবে উদ্ধত হয়ে কথা বলেনি তাঁর সঙ্গে। একটু অবুঝ – সন্তান স্নেহে অন্ধ, মেয়ের প্রতি কনফিডেন্স হারানো ওভার প্রোটেক্টিভে বা খুব বেশী পোসেসিভ ছিলেন তিনি কিন্তু ‘মা’ তো ছিল চন্দ্রানীর, আর জামাইকে ভালোবাসতেও তিনি তো কোনো কার্পণ্য করেননি, তবে অনেক লোক থাকে যারা নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে – স্নেহে অন্ধ হয়ে তাই এই মহিলার প্রতিও তার আজ কেমন যেন একটা মায়া জন্মাচ্ছে। মানুষ ভাবে সবকিছু তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটবে কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হয়ে যায়। আজ মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জাগছে প্রকাশের। ভাবছে একটু নরম হয়েও তো সে বোঝাতে পারতো, অনেক ঘটনা ভেসে আসছে চোখের সামনে। প্রকাশকে ভালো ভালো রান্না করে খাওয়ানো, নামি দামী কাপড়ের জামা-কাপড়, স্যুট বানিয়ে পরানো, একটু শরীর খারাপ হয়ে গেলে ছুটে আসা, নিজে ফল কেটে খাওয়ানো, কোনো কারনে প্লেনের কোনো গোলমাল শুনে ভীত হওয়া। বারবার ফোন করার মধ্যে যে অকৃত্রিম উদ্বেগ ও স্নেহের প্রকাশ ছিল তার কথা তো কোনোদিন ভাবেনি সে। একটা মানুষের সবটাই তো অভিনয় বা খারাপ অভিপ্রায় হতে পারে না। তাই শ্রাদ্ধে নিয়ে আসার জন্য বাবাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল সে। বিপদের দিনে যে সে চন্দ্রানীর কাছে আসতে পেরেছে এটাতে কেমন যেন একটা হালকা আত্মতুষ্টির উপলব্ধি জাগলো তার মনে।
চন্দ্রানীর কথা ভাবলো প্রকাশ। তার তো মা। তার এই ক্ষতি তো অপূরণীয়। শেষ দিন যখন ফোনে ঝগড়া হয় তখন চন্দ্রানীর মা রেগে মেগে বলেছিলেন – “তোমার বাবার ঝি গিরি করার জন্য তো চন্দ্রাকে আমি রেখে যাবো না। হয় তুমি ফ্লাইট ছেড়ে গ্রাউন্ড-এর অফিসে কাজ চেঞ্জ করো, নয় আমার কাছাকাছি আলাদা বাড়ি নাও”। তখন সেও খুব চেঁচিয়ে জবাব দিয়েছিল – “সব জেনেশুনেই তো বিয়ে দিয়েছিলেন, এখন ফ্লাইটের চাকরী পছন্দ হচ্ছে না কেন? আপনার মেয়ের এখানে থাকতে অসুবিধে হচ্ছে তো নিজের কাছে নিয়ে যান, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না”। একটু পরেই চন্দ্রানীর ফোন আসে – “তুমি আমার মাকে অপমান করেছো, তোমার সঙ্গে আমি কথা বলতেও চাই না”। – “বলো না, থাকো তোমার মায়ের আঁচলের তলায়, don’t disturb me, you fool woman”। ফোনের তারটা খুলে দিয়েছিলো প্লাগ থেকে, বিরক্তি আর ঘেন্নায়।
এরপরে ক’মাস কোনো কথাই হয়নি। আজ চন্দ্রানীর শুকনো মুখটা দেখে কিন্তু বড় মায়া লাগলো প্রকাশের। মা হারানোর বেদনা কি তা সে নিজে অনুভব করেছে মর্মে মর্মে, মায়ের মতন স্নেহ পরায়ন প্রিয় বন্ধু এই মেয়েটার জীবনে কেউ ছিল না। সন্তানকে দুঃখ বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য যিনি এত ব্যস্ত থাকতেন তার ছত্র ছায়া এইভাবে হটাৎ সরে গেল, মেয়েটা কি করবে।
বিষন্নতা, চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে প্রকাশের কেমন যেন অসহায় বিপন্ন মনে হতে লাগলো নিজেকে। কি করবে সে, কি তার করা উচিৎ কিছুই ভেবে কুল কিনারা পেল না অথচ চন্দ্রানীর জলভরা কালো চোখের “চাউনি” টা বুকের ভেতরে বেহালার “ছড়ি” হয়ে বার বার মোচড় দিল সুরের মূর্ছনায়।
চতুর্থ অধ্যায়
প্রকাশের মতন সুন্দর বর হবে – সেকথা চন্দ্রানী ভাবতেও পারেনি। একটু শ্যামলা রঙ, গোল গাল মোটাসোটা মেয়ে সে। লম্বাও সেরকম নয়। ভালো গান জানা কিম্বা কোনো প্রফেশনাল ডিগ্রি নিয়ে পাশ করা বা চাকুরিরতাও সে নয়। বি. এ. পাশ আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই সে। মা বলেন, না বলতেন – “বড় বেশি সরল আর বোকা তুই তাই তোর জন্যই চিন্তা”। দাদা ভীষণ বুদ্ধিমান আর শান্ত, কলোম্বাসে পড়ত, অনেক প্রাইজ আনতো ঘরে, কিন্তু সে পড়েছে রাইসিনা স্কুলে, বরাবরই সেকেন্ড ডিভিশন, কিন্তু তার মুখটা নাকি ভীষণ মিষ্টি আর অদূরে ভাব বলে স্কুলে, পাড়ায়, বাড়িতে সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। কেউ কখনো বকেনি। মারা তো দূরের কথা। আজ যে স্বামীকে সে মন প্রাণ সব সঁপে দিয়েছিল, তাকে এমনভাবে হারাতে হবে, একথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে যে তাকে বলতে পারে, “থাকতে হবে তোমায় আমাদের বাড়ি, get lost,” একথা প্রায় অবিশ্বাস্য। আজ আবার মায়ের শ্রাদ্ধের দিনে প্রকাশকে দেখে সারা বুকের রক্ত যেন উছলে উঠল। জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ যেমন কিনারায় আছড়ে পড়ে ঠিক তেমনি করেই সব সুখের স্মৃতিগুলো মনের তীরে আছড়ে ভেঙে পড়তে লাগলো। গানটা মনে পড়ল – “হটাৎ দেখা পথের মাঝে কান্না তখন থামে না যে, ভোলার তলে তলে ছিল, অশ্রুজলের পালা… যখনই ভাঙলো ভাঙলো মিলনমেলা ভাঙলো”। কিন্তু এতো লোকের সামনে সে কাঁদবে না, এই দশদিন ধরে অনেক কেঁদে নিয়েছে, অনেক রূঢ় বাস্তবের ‘সত্য’ তার সামনে প্রকাশ পেয়েছে। দাদা যে শুধু টাকা দিয়ে কর্তব্য করতে চায় – মামা মাসীরা বড় বড় উপদেশ দিয়ে পাশ কাটাচ্ছেন, কৌতুহলী প্রতিবেশীরাও কাটা ঘায়ে নুন ছেটাতে দ্বিধা বোধ করছে না – এসব কথা আগে কখনও সে এমন করে বুঝতে পারেনি। জীবনের চলার পথটা যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ, মানুষ যে নিজের জালে কতটা জড়িত তা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। বাবার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, সংসারের কত কাজ, হিসেব নিকেশ, একটা মানুষের চলে যাওয়ায় কারুর কিছুই আটকায় না কিন্তু তার জায়গা নেবার জন্য আর একজনকে যখন বাধ্য করা হয় – তখন তার থেকে পরিত্রান পাওয়ার উপায় কি সে জানে না।
প্রকাশের প্রতি বিদ্বেষ, রাগ, অভিমান, ঝগড়া সে যত করেছে সবই যে মায়ের সমর্থনে তা তো নয়। নিজের মনের কোনেও কি তার স্বার্থ-অন্বেষণ, সন্দেহ বা একা থাকার লুপ্ত বাসনা কাজ করেনি। ‘মা’র সঙ্গে বসে মাসী-মামীদের মতন নিন্দে চর্চায় সময় নষ্ট করা, শুধু সাজগোজ, সিনেমা থিয়েটারের আর অকারণ শপিংয়ের নেশায় সেও কি পাগল ছিল না। নিজেকে প্রশ্ন করতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে ‘মা’ যদি তাকে প্রভোক করে থাকে সেও তবে কম ভুল করেনি। মাকে তার সম্মান দিয়ে যথাযত কর্ত্তব্য পালন করেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে “দখল” দেবার “অধিকার” অন্যকে সে কেনো দিলো, আজ সে কথা ভীষণ বিচলিত করছে। সংসারকে অসার লাগছে। শ্বশুরের প্রতি এতো শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সে “উপেক্ষা” কেমন করে করেছে, আজ সে কথা বুঝে উঠতে পারছে না।
মা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়েছে, ঐ বৃদ্ধ মানুষটিকে সবচেয়ে আগে খবর দিতে হবে। উনি এলেই যেন ভরসা পাবেন বাবা এবং সে নিজেও। মার যে হটাৎ এমন করে “হার্ট এট্যাক” হবে, একথা কেউ বুঝতে পারেনি। প্রকাশকেও মা খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন, কিন্তু ঐ এক দোষ ছিল তাঁর কাউকে নিজের মনে করলেই ভীষণভাবে অধিকার জমাবার চেষ্টা করতেন। ভাবতেন আমি তো তার ভালো চাইছি, সে নিশ্চই পরে বুঝতে পারবে আমার কথা। কিন্তু সবাই প্রায় ভুল বুঝতো মাকে। অবশ্য চন্দ্রানী এটা ভাবছে অন্যরা তো তাঁর নিজের সন্তান নয়। অন্যরা বলতে প্রকাশ। কিন্তু প্রকাশ কি সত্যিই চেয়েছিল চন্দ্রানী চলে যাক। বাবাকে নিয়ে কথা বললে সে কেন বিরক্ত হবে না। তারপর এরকম বাবা যাঁকে দেবতার চেয়েও বড় মনে হয় চন্দ্রানীর। কিন্তু মা ভুল বলেছেন জেনেও তার প্রতিবাদ করার মতন সাহস জোগাতে পারেনি সে। ছোট থেকেই মা যা পড়তে বলেছেন পড়েছে, মা নিজে যেটা খেতে ভালোবাসতেন তাই খেয়েছে, যে ভাবে সাজাতেন সেভাবে সেজেছে, মায়ের মত ছাড়া সে যে একা তার নিজের ভালো চাইতে পারে বা কিছু করতে পারে একথা সে কখনও ভাবতে পারেনি। মায়ের মৃত্যুতে তাই প্রথমে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলো সে। মা মাছ, মাংস ডিম ছাড়া ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার কিছুই খাওয়াতেন, না সর্বদা বলতেন – “আমার ছেলে মেয়েদের মাছ, মাংস ডিম না থাকলে গলা দিয়ে খাবার নামবে না”। কিন্তু এই দশদিন ধরে তারা নিরামিষ সেদ্দ ভাত খাচ্ছে, তার কাজটা ৪ দিনে হয়ে গেলেও দাদার জন্যে রোজই সে হবিষ্যি রান্না করেছে। কারণ বৌদি আসতে পারেননি। আর আলু সেদ্দ, ডাল সেদ্দ ভাত দুই ভাই বোনে বসে ঘি দিয়ে খেতে কত ভালো লাগছে।
জীবনের মানেটাই যেন এই ক’দিনে পাল্টে গেল। মনে হল এতদিন যেন সে একটা ঘোরে ছিল, রঙিন চশমার আড়ালে সবকিছুই রঙিন। অন্যের দোষ ধরার আনন্দ যতখানি সে পেয়েছে আজ নিজের ভুল ত্রুটিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠায় তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ তাকে খোঁচা মারতে লাগলো। বিশেষ করে এই দশদিনে ক্রমাগত শ্বশুরমশাই-এর আসা যাওয়া। বাবাকে সামলানো, মামা, কাকা ইত্যাদি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অতি পরম সুহৃদের মতন ব্যবহার – চন্দ্রানী-প্রকাশের চিড় ধরাটা যাতে কারুর চোখে না পড়ে তার আপ্রাণ চেষ্টা চন্দ্রানীকে মুগ্ধ ও অভিভূত তথা কৃতজ্ঞ করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রাদ্ধের দিন প্রকাশের আগমন যেন তার দেহ-মনের প্রতিটি অনু-পরমাণুকে রোমাঞ্চিত করেছে, কিন্তু লজ্জায় দুঃখে আর হতাশায় গ্লানিতে কিভাবে কথা বলবে ভেবে পায়নি সে।
আজ সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, উদাস বাতাস আর শিশুর মতন সরল বাবার ব্যাকুল হুতাশ তার মনকে ভীষণ ভাবে কাঁদাচ্ছে। কিছুতেই কোনো কাজে মন লাগাতে পারছে না সে, আবার তার অল্প বুদ্ধি তাকে রাস্তাও দেখতে পারছে না, এর থেকে মুক্তির।
পঞ্চম অধ্যায়
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল। জ্যোতির্ময় বাবু বেশ অনেক্ষন ধরেই লক্ষ্য করছেন, ছেলের হাবভাব। একভাবে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে সে চুপচাপ। ঘুমোয়নি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে পেপার পড়ছে, কখনও কখনও টিভি চ্যানেল পাল্টাচ্ছে, কোনো কিছুই দেখছে না, আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ছে, শুধুই আঙ্গুল মটকে যাচ্ছে একের পর এক। মনের অস্থিরতা চেপে রাখতে পারছে না ঐ activity গুলো।
ড্রইংরুমে এসে ডাকলেন, “কি রে বাবু ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? আয় আমার কাছে একটু বোস, চা করে এনেছি, নে ধর”।
তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গিয়ে হালকা হ’ল প্রকাশ। চোখে মুখে জল দিয়ে কিছুটা আরাম পেল, তারপর বাবার হাতের তৈরী চায়ে চুমুক দিয়েই বলে উঠল – “আঃ”। জ্যোতির্ময়বাবু উঠে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিলেন। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ। বাবার বুক সেল্ফটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। কত সুন্দর করে রবীন্দ্র, শরৎ, বিভূতি বা সত্যজিতের রচনাবলী সাজানো। মায়ের ছবিতে শুকনো গাঁদা ফুলের মালা, বেশ ক’দিন পাল্টানো হয়নি। আলমারি, টেবিলে কোথাও একটুও ধুলো জমে নেই। ঘরের কোনে নেই একরত্তি ঝুলও। পর্দার প্লিট, বিছানার চাদর, নীল পাপোশ সবই কত সুন্দর করে সাজানো। মনে পড়লো, মা বলতেন – “তোর বাবাতো লক্ষী পুরুষ, এতো অল্প পয়সার মধ্যেও কেমন সুন্দর করে আমাদের ঘর কন্না গুছিয়ে দিয়েছেন, বলতো? কোনো একটা জিনিষও এলোমেলো রাখতে দেননি কোনোদিন”।
প্রকাশকে স্বর্গীয় মায়ের ছবির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাবার চোখের কোনায় দু ফোঁটা জল চিকচিকিয়ে উঠল শিশির বিন্দুর মতন। কাছে এসে ছেলের চুলে হাত বোলাতে লাগলেন তিনি, তারপর ভরাট গাঢ় গলায় ধীরে ধীরে বললেন, –
“জিনিষপত্রের সাজ সরঞ্জামে এই সংসারটাতো অনেক গোছালাম রে বাবাই, কিন্তু তোদের দুটো সুন্দর জীবন কেন এমনভাবে অগোছালো হয়ে গেল বলতো? আমি কি এতো অযোগ্য বাপ”! প্রকাশ বাবার হাতটা টেনে নিলো নিজের কোলে – ‘এরকম কেন বলছো বাবা, আমাদের ভুলের জন্য আমরাই দায়ী।
বাবা বললেন – “জীবনটা তো কোনো কাঁচের বাসন নয়রে বাবু, যে ঠোক্কর লাগলেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে বা কোনোদিন জোড়া লাগানো যাবে না”? এর উত্তর তো আজ সারাদিন ধরে প্রকাশও খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠিক এইসময় ফোনটা বেজে উঠল, হটাৎ চমকে উঠলেন দুজনেই।
প্রকাশ উঠে ফোন ধরলো – “হ্যালো”, কোনো উত্তর নেই, আবার “হ্যালো” কে বলছেন? ধীরে ধীরে আওয়াজ এলো বহু দূর হতে ভেসে আসা বাঁশির সুরের মতন, – “বাবা আছেন”? চন্দ্রানীর দ্বিধা জড়িত কণ্ঠস্বরে প্রকাশ বাবাকে ধরালো রিসিভারটা।
– “হ্যাঁ, বলো মা, কি হয়েছে বেয়াইমশাই এর”?
– “বাবার ভীষণ জ্বর, তার মধ্যে ভুল বকছেন, তোর মাকে ডাক, কি করছে ও ঘরে। আমি বুঝতে পারছি না কি করব”।
– তোমায় কিছু করতে হবে না মা, আমরা এখুনি আসছি আর তোমাদের নিয়ে আসছি আমাদের কাছে।
– “বাবা”? কান্নায় আপ্লুত হয়ে গেল চন্দ্রানীর গলার আওয়াজ!
– “হ্যাঁ, মা সত্যি বলছি এবার থেকে তোমরা আমার কাছেই থাকবে। আমরা দুই বুড়ো তাস খেলবো, মর্নিং ওয়াক করতে যাব, রামকৃষ্ণ মিশনে ঠাকুরের আরতি দেখতে যাবো, অক্ষরধামের ক্যান্টিনে গিয়ে গুজরাতি প্রসাদ খাব। স্বর্গীয় মায়েরা বেঁচে থাকতে কখনও ‘মলে’ যায়নি। দুই বুড়ো ‘মলে’ খুব সময় কাটাব। গরমকালের দুপুরে ঘরে এয়ারকন্ডিশন চালাব না। আবার শীতের দিনে কলকাতা, বাঁকুড়া, সুন্দরবনে ঘুরতে যাব আরও বুড়োদের সঙ্গে হৈ হৈ করে। শুধু তোমরা দুটি মিলে মিশে আনন্দে থেকো, কাঁচের গেলাসের মতন সংসারটা ভেঙ্গে দিও না।
চন্দ্রানী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল – “বাবা তুমি সত্যিই লক্ষিপুরুষ”।