ঋনী (Hrini)

চন্দনা সেনগুপ্ত

রোজই ট্রেন লুট হয়, রাস্তায় ডাকাত পড়ে, এসব কথা পেপারে পড়ি, টিভিতে দেখি। কিন্তু আমার নিজের জীবনেও যে এরকম এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ঘটবে তা কখনো ভাবতেও পারিনি।
অফিসের কাজে মধ্যপ্রদেশের এক অত্যন্ত ছোট শহরের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এ যেতে হবে। সঙ্গে একজন পিয়ন কাম সিকিউরিটি ম্যান যাচ্ছেন, তিনি ঐ অঞ্চলেরই লোক, তাই জঙ্গলের রাস্তাও সব চেনেন। আমি ফার্স্ট ক্লাশে যাচ্ছি। মাত্র দুজন মহিলা আমরা একটা কূপে। ৯টা বাজতেই ডিনার খেয়ে শোবার ব্যবস্থা করলাম। রাত্রি প্রায় ১১টা নাগাদ ট্রেনটা একটা স্টেশনে থেমে আছে মনে হলো, ভাবলাম ওয়াশরুমে ঘুরে আসি। বাথরুম থেকে বেরুতেই দেখি এই স্টেশনে বেশ কয়েকজন লোক উঠেছে। কেমন যেন অস্বস্তি লাগলো। প্রথম শ্রেণীর গার্ড, টিকিট চেকার কি নেই, এদের দেখে তো কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। নিজের কূপে আসতেই পেছন থেকে এসে ধরলো একজন, গলার হার, দুল টেনে খুলে নিলো, ব্যাগগুলো ধরে বাইরে বাথরুমের সামনে দরজার কাছে নিয়ে ফেলতে লাগলো। চেঁচামেচি, হৈ চৈ, লুটপাট শুরু হলো। মার ধর, ধাক্কা ধাক্কি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওদের কাজ সারা। পাশের কূপেও সেই একই অবস্থা। প্যাসেন্জারদের যথা সর্বস্য কেড়ে নিয়ে ওরা চেন টানলো এক অতি অন্ধকার ছোট্ট স্টেশনের কাছে। ট্রেন থামতেই ওরা ঝপাঝপ করে নেমে পড়লো, কিন্তু নামার আগে এক বৃহৎ পাগড়ীওয়ালা, মুখ বাঁধা, লম্বা চওড়া লোক কি ভেবে জানিনা আমার হাত ধরে টানতে লাগলো। প্রানপনে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারলাম না। ঐ সব ব্যাগ, সুটকেস, টাকা, গহনার সঙ্গে ওরা আমাকেও ওদের দলভুক্ত করে মাটিতে পা দিলো। ছুটতে লাগলো মাঠের মধ্যে দিয়ে। কিছুক্ষন পরেই ট্রেনটি ছেড়ে দেবার আওয়াজ পেলাম। ওদের একটি জিপ দাঁড়িয়েছিল গ্রামের কাঁচা রাস্তায়। তাতে ওঠালো আমায়। তারপর জিপ ছুটলো বড় রাস্তার দিকে। একটা লোক আমার মুখ মাথা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে, যে নড়তেও পারছিনা। যন্ত্রনায় সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। বেশ কয়েক ঘন্টা চলার পর, ওরা থামলো একটা ধাবার সামনে। আমার কোমরে ঠেকিয়ে রেখেছে একটা চাকু, একটু শব্দ করলেই যে সেটা আমার পেটের ভেতরে প্রবেশ করবে তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।
এখানে আগেই বেশ কয়েকটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ড্রাইভাররা কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ পিছনে দড়ির খাটিয়াতে নিদ্রা যাচ্ছে। একজন খাবার ও মদের অর্ডার দিল, আমাকে পিছনের দিকে রাখা একটা খাটে এনে বসালো, একটা ছেলেকে ডেকে বললো - ভালো মাল পেয়েছি আজ, পিছনের ছোট ঘরটা খালি করে দে। পনেরো কি ষোলো বছরের ছোটু। এতো রাত্রে কাজ করতে হচ্ছে বলে, বিরক্ত হয়ে সে ঘর পরিষ্কার করতে চললো। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে সাহস সঞ্চয় করলাম, বললাম - 'বাথরুম যাবো'।
লোকটা নোংরা ইঙ্গিত করে মুখ ভেঙ্গালো - পালাবার চেষ্টা করবি না, এই চাকু চালিয়ে দিয়ে পেট ফাঁসিয়ে দেব। কিন্তু আমার এই একটাই সুযোগ। ঐ খোলা বাথরুমের পিছনেই অন্ধকার খোলা মাঠ। ওটার ওপাশে একটা ঘরের মতন দেখা যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি হয় ওখানে পৌঁছাতে হবে আমায়। খুব সম্ভব কাঠ, কয়লা, ভাঙা বাক্স ইত্যাদি রাখা আছে ঐ ঘরটায়। বাথরুমের কল খুলে দিলাম, জলের শব্দ হবে বলে, তারপর সন্তর্পনে পিছনের রাস্তা দিয়ে ঐ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ইঁদুর, টিক্টিকিদের সঙ্গে ঘুঁটে, কয়লা ও কাঠের বোঝার পিছনে লুকিয়ে রইলাম আমি। কিছুক্ষন পড়ে হৈ চৈ, খোঁজা খুঁজি শুরু হলেও এদিকে কেউ এলোনা। ওরা  ভাবলো মাঠ পেরিয়ে শিকার পালিয়েছে। একজন আবার ওদের মধ্যে লুঠ করা জিনিসপত্র ভাগাভাগি করতে শুরু করেছিল। তাই নিয়ে মনে হয় তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লো, বেশ কিছুক্ষন সব চুপচাপ। হটাৎ কেউ যেন এই ঘরের দরজাটা খুললো। টর্চের আলো ফেলে খুঁজছিলো কাঠ, ঘুঁটে বা কয়লা। অনেক চেপে চুপে একেবারে নিচু হয়ে থাকা সত্ত্বেও শরীরের কোনো অংশে পড়লো আলোর ঝলক। চমকে উঠলো সে, অস্পষ্ট আওয়াজ বের হলো তার মুখ দিয়ে। আমিও তাকে দেখতে পেলাম - ছোটু, ভয় পেয়ে সে ডাকতে যাচ্ছিলো তার মালিককে। এবার এক সেকেন্ড দেরি না করে লাফিয়ে উঠে চেপে ধরলাম তাকে। অন্ধকারে তাকে জড়িয়ে শুধু বলতে পারলাম "বেটা ম্যায় তেরা মা জ্যাসা হু, মুঝে বাঁচালে"। আমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে পারলে সে হয়তো ভালো বকশিস পেত। কয়েকটা মুহূর্ত কি যেন ভাবলো সে, তারপর ঘরের কোণে রাখা বড় বড় দুটো প্যাকিং বাক্স খালি করে আমাকে তার মধ্যে বসতে বললো, উপর থেকে ঢেকে দিল কাঠ খড় দিয়ে। বুঝলাম তার মতন অন্য কেউ এই ঘরের থেকে জিনিস বের করতে এলেও যেন আমায় দেখতে না পায়।
সারারাত ধরে এই ধাবায় ট্রাক, গাড়ি দাঁড়ায়, লোকেরা হৈ চৈ করে, ভোর রাত্রে ছোটু আবার এলো এক গেলাস গরম চা নিয়ে। বললো চারটের সময় একটা বাস আসবে। যাত্রীরা সবাই নেমে হাত মুখ ধুয়ে চা খাবে, তখন তুমি ঐ বাসে চড়ে যেও। সকালে তোমায় এখানে দেখলে আমার মালিকও সহজে ছেড়ে দেবে না, আটকে রাখবে, টাকা চাইবে - বা তোমার সঙ্গে আরো অনেক কিছুই হতে পারে। এসো আমার সঙ্গে, বাথরুমে চলে যাও। ঐ বাসটি এলে লেডিস প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে মিশে যেও, কেউ বুঝতে পারবে না।
বাসের পিছনের সিটে বসে ভাবছি কেমন করে ঋণ শোধ করবো এই ছোট ছেলেটার। ওকে যখন আমার চোখ দুটো ব্যাকুলভাবে খুঁজছে - তখন জানালা দিয়ে টুপ করে একটা জলের বোতল ও বিস্কুটের প্যাকেট পড়লো কোলে। মুখ বাড়িয়ে দেখলাম সেই ছোটুকে। বললো -"রাস্তায় এটা খেয়ো"। আমি চোখে জল নিয়ে ভাবছি - "কি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমায়"। আমার মাকে তো বাঁচাতে পারিনি তোমায় বাঁচাতে পারলে মনে হবে - প্যাসেঞ্জারদের হৈ হৈ, বাসের হর্ন কন্ডাক্টারের হাঁকা-হাঁকিতে আর কোনো কথাই শোনা বা বলার সুযোগ হলো না আমার।
সকালে বড় শহরে বাস থামলে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছালাম। বাড়িতে খবর পাঠানো হলো, লেডি অফিসারকে বললাম ঐ ছোটু কে ওখান থেকে নিয়ে আসতে চাই, আমি পড়াশুনো করিয়ে মানুষ করতে চাই, নইলে ওর ঋণ শোধ করবো কি করে।
কোথায় কোন ধাবায় খুঁজবেন আপনি ওকে? ওরকম শত শত ছোটু রাতের পর রাত জেগে নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে কত গ্রামে, শহরে, রাস্তায়। নিজে বেঁচে ফিরে এসেছেন আপনার খুব ভাগ্য ভালো তাই। ও অবাস্তব চিন্তা ছেড়ে বাড়ি যান। বড় অপরাধী মনে হলো নিজেকে। সত্যিই তো কোনো গ্রাম, কোনো ধাবা, কি সেই ঠিকানা - কিছুই তো জানা হয়নি আমার। কোন স্টেশনে যে ওরা আমাকে নামিয়েছিল অন্ধকারে তাও বুঝতে বা দেখতে পায়নি। বাসে আসতে আসতে বড় রাস্তার দুধারে এই রকম অসংখ্য ধাবা ও কত শত ছোটুদের দেখলাম খাবারের থালা হাতে ছোটাছুটি করতে - আমার উদ্ধার কর্তা সেই দয়ালু সাহসী ছোটুকে কোথায় খুঁজে পাবো। - ভগবান, তুমি আমায় ঐ ছোট্ট - কিশোরের কাছে চির ঋনী করে দিলে।

Ode to The Mother…

chandana Sengupta

Eons have flown past,
Races flourished and  civilizations have turned to dust
Messengers of God have come and gone
Leaving behind the message of compassion and love
 
Buddha, Jesus, Mohammed opened the doors
of the peace and tolerance we morals need to become pure
But alas we humans lack the ken,
to see the rewards of the brotherhood of men.
 
And when the dark threatened to envelop,
You brought love and hope
You teachings were sublime, your message a mere hint,
Serve and care, for the present rather than worry about what still isn't.
 
You brought with you the ambrosia of humanity,
making people drunk on the wine of service and pity
You were a beacon whose light brought the drifted home,
whose touch brought out love and pity from a stone.
 
The oppressed, the deprived and the forgotten
were blessed with your compassionate touch
The enervated, the frail and the wingless,
Found strength and security in your heart.
 
The rich, the poor, the lepers and the outcasts,
all have been enriched by the strength of your love
Your eyes never saw any  differences,
religion, casts, nor creed never put a veil on your senses.
 
In this battle stricken and war torn world
you took it upon yourself to wipe every-ones tears
You were proof of the existence of God,
who had sent you to comfort us and to soothe our fears.
 
O mother, O mother grant us the strength and the wisdom,
that we may have the fortitude and dedication
To keep serving and loving the week,
And that we may never lose track of our mission.

মাদার আমার মাদার (Mother Amar Mother)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
বিবর্তনের সহস্রযুগ, প্রানধারী জীব করেছে পার।
মানসিকতার গান শোনাবার
প্রয়াসী হলেন কত অবতার।
 
বুদ্ধদেব ও যিশুখ্রিষ্ট
মহম্মদের খুলেছে দ্বার
শান্তি প্রেম ও সহিষ্ণুতার
কথা শোনা গেছে শত শত বার।
 
এই বাংলার ঘরের মানুষ,
প্রতি মূর্ত্তি যে সরলতার -
'রামকৃষ্ণ' 'বিবেক' জাগান
জীব প্রেম ও জন সেবার।
 
তবুও হেথায় বিদ্বেষ আর হানাহানি কুসংস্কার।
অভাব এখনও স্বার্থ শূন্য
মহৎ সেবা ও ভালোবাসার।
 
এই দুর্দিনে মানুষের বনে,
শ্বেত পদ্মের মত বাহার -
অপুরূপ তুমি চুমিলে এ ভূমি,
মাদার আমার প্রিয় মাদার।
 
এতোদিন বাদে কী নতুন স্বাদে
অমৃত পাত্র সভ্যতার
হাতে নিয়ে এলে, সব দুঃখ ভুলে,
মন্থিত হ'ল, সাগর দয়ার।
 
ঈশের আশীষ ধন্যা কন্যা
অতুলনীয়া টেরেসা মার্ -
চরণধূলিতে পুণ্য জমিতে
মাথা নুয়ে আসে শত শত বার।
 
তপ্ত রিক্ত দুঃখে সিক্ত -
স্নিগ্ধতা পেয়ে হয়েছে মুক্ত
ক্লান্ত শ্রান্ত ডানা ভাঙা পাখী
পেল যে পরশ তোমার সুধার।
 
ধনী নির্ধন, ঘৃণ্য জীবন,
দলিত গলিত পঙ্কিল মন,
প্রেমের জাদুর ছোঁওয়ায় তোমার
হাল্কা সবার বোঝার ভার।
 
কারো প্রতি নেই কোনো অবিচার
প্রতিভূ তুমি যে উদারতার,
মধুর করুণা অসীম অপার
প্রণাম জানাই হৃদয় উজাড়।
 
আঁখি হতে যাঁর হাজার হাজার
স্নেহ নির্ঝর ঝরে অনির্বার।
বিংশ শতকে বিপুল পুলকে
জয়গান গাই "টেরেসা মা'র।

প্রার্থণা (Prarthona)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দূর করো এই মহামারী,
প্রেমের ঠাকুর মম,
মায়ের মধ্যে জাগাও শক্তি,
দুর্গা মায়ের সম।
মহিষাসুর দমন কালে,
দশ হাতে তাঁর অস্ত্র দোলে,
করোনা'কে, ধ্বংস করতে,
অন্য রকম লীলা চলে।
শ্রীশ্রী মায়ের ভীষণ তেজে
ভাইরাসটাও যাবে গলে,
তাঁরাই মোদের শিব ও দুর্গা,
কৃষ্ণ রাধা, কালী
রামকৃষ্ণ শরন্যে,
বাজাও আজি তালি।
ভবতারিণী রূপিনী
তোমরা মাতা পিতা,
বিশ্ববাসীর প্রান রক্ষায়
মাথায় ধরো ছাতা।

ভ্রমণে – মানব অরণ্যে (Bhromone – Manob Aronye)

চন্দনা সেনগুপ্ত

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের বধূ হিসেবে আমার জীবনতরী হয়তো ঘরের আঙিনাতেই চিরদিন এক ভাবে বাঁধা থাকতো, যদি না স্বামী এয়ার লাইন্স কোম্পাণীতে চাকুরীরত হতেন। তাই পথ আমাদের ডাকে। অচেনা মানুষ দেয় হাতছানি। সাত সাগরের তেরো নদীর পারে শুধু স্বপ্নে দেখা রাজকন্যারাই বাস করেন না, তার সঙ্গে আরো কত সুয়োরানী দুয়োরানী সাত রাজার ধন মানিক এবং কত শত খ্যাপারা পরশপাথর খুঁজে বেরোনোর পরিচয় মেলে সেখানে। পরিচয় পায় কত সুন্দর উদার মানুষের যাঁরা বৈভবের মধ্যে বাস করেও অহংবোধ শূন্য। যাঁরা বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে দ্বিধাহীন এবং সরলতা ও সেবার প্রতিমূর্তি।
বাঁকুড়ার লাল মাটির রক্তিম আভায় মন রাঙানো সজনে ফুলের শুভ্রতায় স্নাত কিশোরী আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। ৩০ বছরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ছোট ছোট সুখ দুঃখ আনন্দ ভাগ করে নিতে চাই আমার মতো আরো অনেক বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। শুধু ভৌগোলিক বর্ণনা বা ঐতিহাসিক বিবরণ দেওয়ার আগ্রহ আমার নেই। কারণ বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামের কল্যানে এখন তো ঘরে বসেই নানান দেশের দর্শনীয় স্থান, রাস্তাঘাট, স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর থেকে শুরু করে কি না দেখার সুযোগ মিলছে। তাই আক্ষরিক অর্থে শুধু ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, পথে পথে ছড়ানো পাথরগুলি সরিয়ে ফুল পাখি বন্ধু মানুষগুলির কথা তুলে ধরার এক ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এই জনমেই যে জন্ম জন্মান্তর ঘটে যায় তা অনুভব করতে পারি যখন পথে বেরিয়ে ঐসব অমূল্য চরিত্র, অসাধারণ মানুষগুলির সঙ্গ লাভ করি।
ক্যালিফোর্নিয়া - পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের দেশের ঠিক অপর প্রান্তে উত্তর আমেরিকার পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের কিনারে এবং রকি পর্বতের কোলে অপূর্ব সুন্দর প্রদেশ। তরুণীর তন্বী দেহের মতন শীর্ণকায় অর্থাৎ লম্বা আয়তন তার। একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সাগর মাঝখানে কোথাও সবুজ আঙ্গুর ক্ষেত কোথাও বিশাল বৃক্ষের অরণ্য, লম্বা সুদীর্ঘ সেই বিখ্যাত 'রেড উড' বৃক্ষের সারি আকাশকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। এই স্টেটটিকে তিন ভাগে ভাগ করে দেখা যাক। উত্তরে বরফে ঢাকা, সবুজ পাহাড় ঘেরা "লেক টাহো" এবং রেডউড পার্ক। সেখানে এক একটা গাছের গুঁড়ি এতোই বৃহৎ যে মাঝখানটা কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ঠিক মধ্যভাগ সমতল ভূমি। "সানফ্রানসিস্কো বে" প্রশান্ত মহাসাগর থেকে জলের স্রোতকে বয়ে নিয়ে এসেছে শহরের চারপাশে অথবা সানফ্রানসিস্কো শহরটি গড়ে উঠেছে এই বে এরিয়া-তেই। এখানকার আবহাওয়া সারাবছরই অত্যন্ত সুখদায়ক। আমেরিকার কোনো প্রদেশে এতো সুন্দর প্রাকৃতিক শোভা ও নাতিশীতোষ্ণ  আবহাওয়া নেই। এজন্য মধ্যাঞ্চলের (৬০০ কি.মি. বা ৩৭৫ মাইল) সমতল ভূমিতে বহুলোকের বসবাস। মাটিও এখানে ভীষণ উর্বর। শ্যামল জমিগুলিতে এক্সটেন্সিভ কাল্টিভেশন হয় অর্থাৎ আমাদের মতন ছোট 'আল' দিয়ে জমিগুলি বিভাজিত হয়নি। বিশাল প্রান্তর শুধু সবুজ আর সবুজ আর তার মধ্যে হাজার হাজার ফোয়ারা বা ঝর্ণা লাগানো, যা জল দিচ্ছে সময় সময়। জমির সব কাজই করে মেশিন। কিন্তু চাষীও ভীষণ পরিশ্রমী। বিশেষত "নাপা" ভ্যালি এরিয়া তে গিয়ে আঙ্গুর ফলের চাষ ও তাঁদের কাজ দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। ট্যুরিস্টরা এই আঙ্গুর ক্ষেতের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আলাপ করেন তাদের সঙ্গে জায়গায় জায়গায় তারা আবার আঙ্গুর থেকে তৈরী রকমারি ওয়াইন টেস্ট করবার জন্য সেন্টার খুলছেন। এখানে একজন বাঙালি ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ হল যিনি একজন আমেরিকানকে বিয়ে করেছেন। সন্তানহীন এই দম্পতি ঐ নিরিবিলি অঞ্চলে অদ্ভুত শান্তিময় পরিবেশে প্রকৃতির কোলে শুধু একজন আর একজনের পরিপূরক হয়ে কখনও আঙ্গুর ক্ষেতে কখনও রঙ তুলি হাতে পাহাড়ের কোলে বসে নিস্তব্ধতার মধ্যে বার্ধক্যের বারাণসী রচনা করেন। আমেরিকান ভদ্রলোক ভীষণ আমুদে। এক সময় কলকাতায় ছিলেন। ভদ্র মহিলা অপূর্ব ছবি আঁকেন। কোনো দাম পাবার আশায় বা নাম কামাবার তাগিদে নয়। মাঝে মাঝে ছবিগুলি নিজের বাগানে সাজান অতি সুন্দরভাবে এবং পাড়া প্রতিবেশীরা ইচ্ছে হলে কিনে নিয়ে যান। আঙ্গুর ছাড়াও এই সমতলভূমিতে লেবু, ধান, কমলালেবু প্রচুর পরিমাণে হয়। তাই ক্যালিফোর্নিয়ার ফলের রস ও স্যালাড এতো সুস্বাদু। সানফ্রানসিস্কো এবং তার আশপাশের জায়গাগুলি অনেক বার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে পাহাড়ের থাকে থাকে খাঁজে নতুন রাস্তা ও শহর। উঁচু নিচু এই রাস্তায় ট্রাম চলে। শহর জুড়ে নানা জাতের নানান লোক। "চায়না টাউনে" অসংখ্য চীনা দোকান এবং রেস্টুরেন্ট। তারই মধ্যে খুঁজে বের করেছি আমাদের প্রাণের প্রিয় রামকৃষ্ণ মিশনটি। "ঠাকুর, শ্রীশ্রীমা, বিবেকানন্দের পাশে সেখানে যিশুখ্রিষ্ট এবং বুদ্ধদেবের ছবি। ফুলের বাগানে সাজানো কথামৃত, লীলাপ্রসঙ্গ। লাইব্রেরি ভরা ঠাকুর ও মায়ের ছবিতে। সেই মহিমান্বিত রামকৃষ্ণ মিশনে আমেরিকান সাধু ও সাধুনীরা কী সুন্দর গভীর ধ্যানে মগ্ন। গানে আরতিতে মুখর পরিবেশটি এতোই মনোরম যে মনে হয় জয়রামবাটি বা কামারপুকুরে বসে আছি। ক্যালিফোর্নিয়াতে বিবেকানন্দ এসেছিলেন এবং তাঁর ভাব প্রেরণায় পরে এগুলি গড়ে উঠেছে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কেন্দ্র রূপে। শিকাগোতে প্রথম তিনি যে বাড়িতে ছিলেন বা যে হলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেই 5423 South Hyde Park Blvd, Chicago তে গিয়ে এতো আনন্দ পাইনি যত ক্যালিফোর্নিয়ার এই আশ্রম দুটির পরিবেশে পেয়েছি। (Vedanta Society of Berkeley 2455 Bowditch Street Berkeley, California 94704 2429 এবং অন্যটি  Vedanta Society of Northern California, 2323 Valle jo St. Sanfransisco 94123)।
ক্যালিফোর্নিয়ার এই বে অঞ্চলটি সারা বিশ্বে Silicon Valley নামে বিখ্যাত। এখানেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার কোম্পানি। এগুলি সম্বন্ধে কিছু কথা বলার আগে অতীতের দিকে একটু তাকিয়ে দেখি। ১৮৫০ সালে এই প্রদেশটি Statehood পাওয়ার আগে ১৮৪৬ - ৪৮ সালে Mexican - American War হয়েছিল এবং তার পরেই Mt. Whitney (Sierra Nevada) তে আবিষ্কার হয় সোনা। এই সোনা যারা সেই সময় যত সংগ্রহ করতে পারে তারা তত বড়লোক হয়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই ধনী পরিবারের সন্তানেরাই তৈরী করেন আমেরিকার বিভিন্ন উদ্যোগ। স্থাপিত হয় বিখ্যাত গবেষণাগার, সংগ্রহশালা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। আবার বিংশ শতাব্দীতে তারাই টাকা ঢালতে থাকেন এক অদ্ভুত নতুন যন্ত্রদানবের উত্তরোত্তর উন্নতিতে। ১৯৯৯ তে যখন ঐ অঞ্চলের কম্পিউটার কোম্পানীগুলি দেখি তখন IT  ইন্ডাস্ট্রিতে Boom এসেছে। ভগবানের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে এই সিলিকন ভ্যালি তখন আবার একবার চমকাচ্ছে সোনা নয় হীরের ঝলকানিতে। টাকা উড়ছে হাওয়ায়। ছোট খাটো প্রোগ্রামার থেকে বড় বড় গবেষক ও ব্যবসাদার তথা Venture Capitalist হয়ে যাচ্ছে ধনকুবের। আলাদীনের প্রদীপ ঘষে কম্পিউটার "জিন" মানে সেই দানবের ছোঁয়ায় দেশ বিদেশের ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানীর দোকানদার লালে লাল হয়ে যাচ্ছে। বহু ভারতীয় Brain drain হয়ে সিলিকোন ভ্যালি তে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে।
হটাৎ এলো ৯/১১ এর সেই বিরাট ধাক্কা। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দুটি এক সঙ্গে ধ্বংস হয়ে সমগ্র আমেরিকাকে আপাদমস্তক ঝাঁকিয়ে দিল। তারপরে ইরাকের যুদ্ধ। অর্থনীতির দুরবস্থার কোপ পড়লো সবচেয়ে আগে এই শিল্পের ওপর। সব আশীর্বাদ অভিশাপে পর্যবসিত হয়ে হাজার হাজার কোম্পানী বন্ধ হয়ে গেল। আতঙ্কবাদীদের একদিনের আক্রমণের বলি হল লক্ষ্য লক্ষ্য ছাত্র বিজ্ঞানী তথা সাধারণ মানুষ। কোম্পানীগুলির সুবৃহৎ অট্টালিকাগুলি হয়ে গেল কর্মহীন। সব হয়ে গেল শূন্য। কম্পিউটার চিপস তৈরির mother machine বানাবার সুবিশাল সেই কারখানাগুলি প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। আমেরিকা বিদেশী ছাত্রদের খুব তাড়াতাড়ি ঋণ দিয়ে মাকড়সার জালে আবদ্ধ করে দেয়। তাই ধার নিয়ে বাড়ি গাড়ি কেনা তরুণ তরুণীরা পড়ে গেল অথৈ জলে। এরকম হটাৎ চাকরি চলে যাওয়া কয়েকটি ছেলে মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি বা তার আশে পাশে স্যানিভেল, সানহোসে (সান Jose কে spanish এ হোসে বলা হয়) শহরে। কেউ অবসাদে ভুগছে, কেউ তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে গেছে জলের দরে বাড়ি গাড়ি বিক্রি করে। ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখলাম অনেক শান্তি প্রেমী মানুষকে যাঁরা পোস্টার হাতে নিয়ে যুদ্ধবিরোধী শ্লোগান লিখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন এবং পথচারী লোক ও গাড়িরা হর্ন দিয়ে তাঁদের সমর্থন জানিয়ে চলে যাচ্ছে।
দক্ষিণ ক্যালিলিফোর্ণিয়া অঞ্চলে অবস্থিত লস এঞ্জেলেস অর্থাৎ হলিউড। আমাদের বলিউডের মতই হাজার রকমের চিত্রপ্রেমী টেকনিশিয়ান, অভিনেতা ও এক্সট্রা এবং গুন্ডার বাস সেখানে। এরা শিক্ষা দীক্ষার অভাবে চুরি ছিনতাই খুন জখম রাহাজানিতে লিপ্ত থাকে। বিদেশিদের প্রতি কিছু লোকের খুবই রাগ ও ক্ষোভ, কারণ এখানে ৬০% চীনা এবং বাকি ২০% এশিয়ান অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ইত্যাদির লোক। এখানে ভালো ভালো চাকরি ব্যবসা থাকতেও তারা সুযোগ পাচ্ছে না। তাই তারা ক্ষুণ্ণ। তারা পড়াশোনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে অক্ষম তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ নিষেধ।
‌এবার আসুন এই ক্যালিলিফোর্ণিয়াতে আলাপ পরিচয়ে মুগ্ধ করে দেওয়া একজন মায়ের কথা, শোনাই।          তাকে পেয়েছিলাম  এই Bay এরিয়া-র বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় Sanford-এ, যাকে আমি পরে "ভিক্ষা মা", বলে চিহ্নিত করেছি।
আমেরিকান ভিক্ষা মা
(“আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী)
উজ্জ্বল সোনার বর্ণের ঝলমলে রোদ্দুর, মিষ্টি মধুর কনকনে ঠান্ডা হাওয়া চারিদিকে গাঢ় সবুজ, চিকন শ্যামল গাছপালা, লাল হলদে বেগনী ঘাসফুলে ঢাকা পাহাড়ের সারি, তার কোলে সাগর তটের শুভ্র বালিয়াড়ি নিয়ে আমাদের পশ্চিম ভারত বা আন্দামানের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যযুক্ত আমেরিকার পশ্চিম প্রদেশ ক্যালিফোর্নিয়া। তার মধ্যভাগে সানফ্রান্সিসকো-সিলিকন ভ্যালি এবং অনতিদূরেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম "স্ট্যানফোর্ড"। সেখানে পৌছেই মনে হল যেন প্রাচীন ভারতের কোনো তপোবন বা গুরুকুল আশ্রমে এসে পড়েছি। বাইরে থেকে দেশটার চাকচিক্য জাঁকজমক উৎকট উল্লাস যতটা দৃষ্টিকটু লাগে শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে তার ঠিক বিপরীত ভাব। সাদা-কালোর বৈষম্য এবং বিধ্বংসী মারণাস্ত্র বানাবার জন্য এই জাতি শান্তিকামী মানুষের অভিশাপ কুড়িয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প বাণিজ্য সবদিক দিয়ে তাদের উন্নতির কারণ এই বিখ্যাত বিদ্যালয়গুলির অনবদ্য পরিবেশ। কত বিশ্বামিত্র আর্যভট্ট, ধন্বন্তরী বা খনা লীলাবতীরা যে সমগ্র বিশ্ব থেকে একত্রিত হয়ে এখানকার জ্ঞানভান্ডারের সুধারস পানে লিপ্ত তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। নোবেল প্রাইজ অস্কার প্রাপ্ত স্বনামধন্য প্রতিভাসম্পন্ন সেই গুরুকুলের অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের ব্যবহার, শিষ্যদের আক্ষরিক অর্থে সাহায্য তথা guide করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সেই ঋষিতুল্য অধ্যাপকদের সহধর্মিণীরা আবার শুধু ছাত্রছাত্রীদের খবরাখবর নিয়েই শান্ত থাকেন না। (তারা অনেকেই) দুরাগত বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের সব রকম সাহায্য করে "নতুন মা" হবার আগ্রহ প্রকাশ করেন ইনটারনেটে। যে সব ছাত্ররা নতুন দেশে একেবারে অচেনা পরিবেশে এসে নানা রকম অসুবিধা ও অস্বস্তির মধ্যে পড়েন তারা যতদিন না হস্টেল পাচ্ছেন ততদিন নিজেদের বাড়িতে রেখে আপ্যায়িত করতে ছাড়েন না এই মায়েরা। এরকম একজন "Home stay mother" “মিসেস চুলা"। স্বামী হুভার্ট (Huvert) Stanford University র অধ্যাপক ছিলেন। ফরাসি ভাষায় 'চুলা' মানে "খুকি"। এই 'চুলা' ৬৫ বছর বয়সেও সত্যিই ছোট্ট খুকীর মতন সরল, সহজ, অমায়িক স্বভাবের মহিলা। নিজে আমেরিকান হলেও সারা বিশ্বের ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের তিনি অসাধারণ মহত্বে, ও আন্তরিকতায় একান্ত আপন করে নিয়েছেন। তাঁর মতন আরো অনেক "Home stay mother" আছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। যারা একসঙ্গে মিলিত হন “স্টানফোর্ডের" 'International Bechtel Centre'- এ। নানা ধরনের আলোচনা হয় সেখানে। দূরাগত ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা অসুবিধা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে আলোচনা করা হয় এবং যে কোনো সাহায্য দেবার জন্য তাঁরা হাত বাড়িয়ে দেন বিশ্বস্ত বন্ধুর মতন। ভারতীয় ছেলেরা এই 'Centre' এ একত্রিত হয়ে হোলি, দেওয়ালি, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান করে আনন্দ পান, পাকিস্তানী বা অন্যান্য মুসলিম দেশের ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চিন্ত মনে নির্বিঘ্নে কোথায় নামাজ পড়বে এবং নামাজ পড়ার আগে কোথায় হাত পা ধোয়ার জল পাবে সে বিষয়েও তাঁরা লক্ষ্য রাখেন। এই বেকটেল ইনটারন্যাশনাল সেন্টারে জাপানি, কোরিয়া, চীনা ছেলে মেয়েদের ইংরেজি ভাষা, রান্না অপেরা গান বাজনা, নাচ ও যোগ ব্যায়াম শেখবার সুযোগ করে দিতেও তাঁরা সর্বদা আগ্রহী।
ভিক্ষে দেওয়া মা - ছেলে আমাকে যখন তার পরম প্রিয় এই Home stay mother - এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল তখন তাঁর অকৃতিম আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের ভিক্ষে মায়েদের কথা। পৈতের দিন প্রথম "ভিক্ষে" প্রদান করে তিনি যে সন্তানটিকে নিজের বলে কোলে টেনে নেন, তার প্রতি অগাধ স্নেহ ও দায়িত্ববোধ তাঁকে নতুন সম্মানে গৌরবান্বিত করে সেই কথা শৈশবে নিজের মাকে দেখে অনুভব করতাম। এখানেও ব্রহ্মচার্য্য পালনে আগত শিষ্য ছাত্র যেন গুরুকুল আশ্রমে গুরু পত্নীর স্মরণে এসে ধন্য এবং নিশ্চিন্ত হয়। প্রথম সাত দিন ধরে এই "ভিক্ষেমা" তাকে নিয়ে ম্যাপ দেখিয়ে চিনিয়ে দেন শিক্ষালয়ের বাজার, দোকান, লাইব্রেরি, ক্যান্টিন। কিনে দেন অতি প্রয়োজনীয় নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিষ যেমন - সাইকেল, কুকার, খাদ্য সামগ্রী। সাবধান করেন শহরের নিষিদ্ধ স্থানগুলির সম্পর্কে। বুঝিয়ে দেন বিদেশে আগত নতুন ছাত্রদের ছোট ছোট সমস্যাগুলির সমাধান কিভাবে করতে হয়। এছাড়া জন্মদিনে বা যে কোন আনন্দ উৎসবের দিনগুলি পালন করতে আহ্বান করেন পরম আগ্রহে নিজের ঘরে। এমন কি পূর্ণিমার রাত্রে চাঁদের হাসি যখন ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড় অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের ফেনিল ঢেউয়ের উপর আছড়ে পড়ে তখন তাঁরা ছাত্র সন্তানদের নিয়ে পিকনিক করতেও যান। অসম্ভব পড়ার চাপে ভারী হয়ে যাওয়া ছাত্রদের মাথার ভার হালকা করতে বা মা-বাবার জন্য মন কেমন করা তাদের দুঃখময় দিনগুলিকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিতে তাঁরা সর্বদাই ব্যস্ত। মিসেস 'চুলা'র সঙ্গে আলাপ যখন বন্ধুত্বে বদলে গেল তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম - "এইসব ছেলে মেয়েদের জন্যে এতো করো, তারা কি পরে মনে রাখে? চিঠি পত্র দেয় দেশে ফিরে গিয়ে?" কারোর উপর কোনো অভিমান না দেখিয়ে স্মিত হাস্যে উত্তর দেন তিনি - 'না, সবাই রাখে না, তবে কেউ কেউ কার্ড পাঠায়। কারণ সব দেশেই এই যুগের ছেলে মেয়েরা আজকাল ভীষণ ব্যস্ত'। - 'তাহলে কেন এত করো? তোমার কি লাভ হয় এতে?' প্রশ্ন ছুড়ে দি আবার। আর তখনই শুনি এক ঝরঝরে হাসি। "গোটাটাই তো লাভ। কোন বই না পরেও সমগ্র বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের ধর্ম সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে এমন practical knowledge আর কেমন করে পেতাম বলো? তাছাড়া আমরা তোমাদের দেশের মতন অত Emotional attachment রাখি না। আমাদের নিজেদের ছেলে মেয়েরাই তো আমাদের সঙ্গে কত কম যোগাযোগ রাখে, তাই ওসব নিয়ে ভাবি না। সময় আছে কিছু কাজ করা কর্ত্যব্য। তার সঙ্গে উপরি পাওনা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সেতু রচনা"।
চুলা সংস্কৃতির সেতু - নিজে আমেরিকান। চার কন্যার জননী, সমাজ সেবিকা অসাধারণ মা। দেশ কাল জাত ধর্ম, সাদা কালোর কোনো ভেদাভেদ নেই তাঁর কাছে। তাঁর নিজের মেয়েরাও কেউ কালো মানুষ, কেউ বাদামি মেক্সিকান স্বামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। স্বামী 'হুভার্ট' ফ্রান্সের লোক। বিশ্ব শান্তির জন্যে বহু ধরণের আলোচনা সভায় যোগদান করেন। ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতায় বহু ভাবে সোচ্চার হন। পেশায় ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। একসময় "রুড়কী ইউনিভার্সিটিতে Visiting Prof. হিসাবে বেশ কিছুদিন ভারতে কাটিয়ে যাওয়ায় ভারত বন্ধু। চুলার কাজে সর্বদায় উৎসাহ দেন এবং বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের শুধু নয় তাদের মা-বাবাদের সঙ্গেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে মেলামেশা করেন। ভারতীয় ছাত্র "সিজার সেনগুপ্তর" বিবাহ উপলক্ষে চুলা দিল্লী আসেন এবং বিয়ের আগের দিন পৈতের সময় বাঙালি আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে বসে সব কাজে সাহায্য করতে থাকেন। পুরোহিত মশায় জিজ্ঞেস করেন ভিক্ষে মা কে হবে? এদিকে আসুন। সিজার তখন বলে "চুলা" আমার "Home stay mother" যখন তিনি এখানে উপস্থিত তখন তাঁকেই আমার "প্রকৃত ভিক্ষেমা" রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। চুলাকে ব্যাপারটা ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলা হলে, সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিত মশায় যে তাকে এরকম একটা ধর্মীয় ব্যাপারে যোগ দিতে অনুমতি দেবেন তা সে একেবারেই আশা করতে পারেনি। "প্রথম আমেরিকান ভিক্ষামা" হবার অধিকার পেয়ে সে মুগ্ধ কৃতজ্ঞ ("O I am obliged, charmed") ধন্য হয়ে যায়।
আর একটা কথা মনে পড়ছে। আমরা বাঙালিরা মনে করি যে, বাঙালি শ্বাশুড়ি-জামাইদের সম্পর্কই বুঝি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে মধুর ও সম্মান জনক - স্নেহ ভাজন সম্পর্ক। কিন্তু আমেরিকায় থেকেও হুভার্ট তার ৯৩ বছরের বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে যে ভাবে সেবা করেছেন তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এই তুলনাহীন মানুষ দুটির কথা বলে শেষ করা যাবে না।
ভিক্ষা করতে বাধ্য যে ভিক্ষা মা - এরপর পল অ্যালটোতে চুলার বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় চোখে পড়লো, ক্যাল ট্রেন এর ছোট স্টেশনের টিকিট ঘর। সেখানে অতি সুন্দর একটি দেওয়াল চিত্র। ছবিটি দেখেই মনে হল এই Wall painting টি ধ্যৈর্য্য ধরে যিনি বানিয়েছেন - তিনি নিশ্চয় একজন বড় মাপের নামী দামী শিল্পী। প্রতিটি তুলির আঁচড়ে যার আনন্দের তথা নৃত্যরতা শিশু কন্যাদের উচ্ছাসের অভিব্যক্তি। শিল্পী নিজেও নিশ্চয় প্রাণ চঞ্চল কোন তরুণী হবেন। চুলা কোন কিছু কিনতে একটি দোকানে গিয়েছিলেন। আমাকে মন দিয়ে দেওয়াল চিত্র নিরীক্ষণ করতে দেখে বললেন - "ভালো লাগলো ছবিটা? আলাপ করবে নাকি শিল্পীর সঙ্গে"? বললাম - "নিশ্চয়। কিন্তু তিনি রাজি হবেন আমার মতন একজন সাধারণ মহিলার সঙ্গে কথা বলতে"? - চুলা মুচকি হেসে গাড়ি ঘোরালেন - স্টেশনের অন্য পাশে। রবিবারের সকাল। চার্চের পাশেই ছোট একটি মাঠ, টেবিল চেয়ার পেতে বা বেঞ্চে বেশ অনেকজন বিভিন্ন ধরণের ছিন্ন ভিন্ন পোশাক পরিহিত সাদা ও কালো মানুষ। শিল্পীরা সামনে টুপি উল্টে রেখে রাস্তার লোককে আকৃষ্ট করছে, নিজেদের শিল্প প্রতিভার নমুনা পেশ করে। কারোর হাতে গীটার, কারো মুখে 'স্যাক্সোফোন'। কেউ ভিক্ষে চাইছেন না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে সবাই ভিখারি। আমাদের দেশের কানাই বলাই বা মোহন বাউলের মতন গান বাজনা শুনিয়ে কিছু রোজগারের আশায় একত্রিত এখানে। তাঁদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে ফ্রি-তে চা কফি খাওয়ানো দোকানদারের পাশেই দেখলাম একটা টেবিলে বসে আপনমনে ছবি এঁকে চলেছেন - একজন বিশাল মোটা বেঁটে কালো মহিলা পঞ্চাশোর্ধের। অত্যন্ত দরিদ্র শিল্পী "আলমা"। চুলা কাছে যেতেই একগাল হাসি, হাত দুটি জড়িয়ে ধরে কি আবেগে চুমু খাওয়া, সুদূর ভারতবর্ষ থেকে একজন ছাত্রের 'মা' তাকে দর্শন করতে এসেছে শুনে সে কি আনন্দ! আমি তার আঁকা ছবির প্রশংসা করায় একেবারে বাচ্চার মতন গদগদ। তারপর একবারে ঘরেলু প্রশ্ন - "ছেলে মেয়ে ক'টি? তুমি কি করো? স্বামী ছেড়ে দিয়েছেন না সঙ্গে থাকেন"? এবং আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই শোনাতে লাগলেন নিজের কথা। জানো আমার স্বামী আমায় ছেড়ে দিয়েছে, মেয়ে বিয়ে করে চলে গেছে জ্যামাইকা। ছেলে খুব বুদ্ধিমান, গ্রেহাউন্ড বাসের চালক, অনেকদিন পরে পরে তাকে দেখতে পাই, এবার খ্রিস্টমাসে আসবে। সে এলে তাকে বলবো ইন্ডিয়া থেকে আমার friend এসেছিল। আনন্দে আবেগে একসঙ্গে অনেক কথা বলে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিল সেই গর্বিত শিল্পী মা। কেন জানিনা, আমাদের গ্রামের "পদী পিসিমার" মতন বড় অসহায় লাগলো তাকে। সরকারী সেল্টার হোমে বিনা পয়সায় থাকার সুযোগ পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞ। কোন ক্ষোভ, অভিযোগহীন, অসুস্থ নিঃস্ব শিল্পী স্কুলের বাচ্চাদের বা চুলার মতন হেল্পফুল ফ্রেন্ডসদের সহায়তায় কোন রকমে নিজের অস্তিত্বটা টিকিয়ে রেখেছেন। বেঁচে থাকাটাকে কিন্তু কষ্টকর মনে করেন না তিনি আর। "ভিক্ষে (করা) মা" হলেও নিজের আত্মার আনন্দ প্রকাশ করে চলেন তার আঁকা ছবির মধ্যে দিয়ে। শিল্পী "আলমা"কে জড়িয়ে ধরে আমার অন্তরের সমস্ত সত্তা ধন্য হয়ে গেল। গ্রামের বিধবা নিঃসহায় ধন সম্পদহীন পদী পিসিকেও দেখতাম ঠিক এইরকম অকারণ আনন্দে কাঁথায় মোটা পারের সুতো দিয়ে তুলতেন কত রকমের নকশা। উঠোনে দিতেন অপূর্ব আলপনা। আর সব দুঃখ অবজ্ঞা সহ্য করে রোদে বসে দিতেন গহনা বড়ি।
উষ্ণ পরশের ভিক্ষা কাঙাল বিদ্ধাশ্রমের ভিক্ষে মা - সাধারণ বাঙালি মধ্যবৃত্ত গৃহবধূ। ভ্রমণ বিলাসী টুরিস্ট হয়ে বড় বড় দর্শনীয় স্থান দেখবার চোখ বা মন নেই আমার। সর্বদা খুঁজে বেড়ায় সমান মানসিকতার বন্ধু যেখানে মাতৃ হৃদয়ের আকর নিয়ে স্ত্রী, বৌদি, ভগ্নি মহিলামহলের সুখ দুঃখের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবো শুধু এমন অন্দরমহলেই ছুটে যেতে চাই বারেবারে। এতদিনে চুলাও আমার মন বুঝে গেছে। তাই এক প্রভাতে তার ফোন বেজে উঠল। চন্দনা চলো তোমায় বৃদ্ধাশ্রমের শিশুদের দেখাতে নিয়ে যাব। 'বৃদ্ধাশ্রম বা হোমের' ধারণাটি এখন আমাদের দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। একটু উচ্চবিত্ত সমাজে ওটা একটা জলভাতের মতন ব্যাপার। তবু এদেশের বুড়িমাদের দেখতে পাওয়ার সুযোগটা এত তাড়াতাড়ি এমনি ভাবে এসে যাবে ভাবতে পারিনি।
সুন্দর পাহাড়ি টিলার ওপর লম্বা লম্বা গাছে ঢাকা এক অপূর্ব স্বর্গোদ্যান। ভেতরে বাগান, ঝর্ণা-শুভ্র বিছানা বইঘর ছবির মেলায় অনেক ফোকলা শিশুর ভিড়। তারা কেউ অতি শীর্ণকায়, কেউ বিশাল বপু নিয়ে চলৎশক্তি রোহিত। তাঁদের তত্বাবধানে ব্যস্ত কালো মেয়ে ও ছেলে সেবক সেবিকার দল। কি অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধার মায়া মাখা করুন মুখগুলি। আমরা কার Visitor জানার দরকার নেই। আমাদের আগমনে যেন সারা বাগান চঞ্চল হয়ে উঠল। হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে কাছে এসে কুঞ্চিত চামড়া প্রশস্ত করে তারা একগাল হেসে আমাদের উইশ করছেন। কেউ বা বিরক্ত আরামের ঝিমুনির রেশ কেটে যাওয়ায়। চুলার মা ৯৩ বৎসরের বৃদ্ধা যেন একটি নরম তুলোর পুতুল। ৯০ বছর অবধি নিজে গাড়ি চালিয়েছেন, নানান রকম সমাজ সেবার কাজে ব্যস্ত থেকে জীবনকে উপভোগ করেছেন। এখন পা অক্ষম হয়ে যাওয়ায় Nursing cum home এ আসতে বাধ্য হয়েছেন। এই মমতাময়ী কন্যা চুলা এবং তার ফরাসি জামাই স্নেহপ্রবণ ৬৮ বৎসরের পুত্রসম হুভার্ট প্রায় প্রতিদিন একবার করে আসেন এই স্মিত হাস্যময়ী বৃদ্ধার কাছে। এই বয়সেও যাঁর বিন্দুমাত্র স্মৃতিভ্রম হয়নি, আরো হাজারো শান্তিকামী স্থিরবুদ্ধি মানুষের মতন ২০০০ শতাব্দীতে পদার্পন করা পৃথিবীর প্রতি - নব্য যুবা সম্প্রদায়ের প্রতি দারুন আশাবাদী। হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসলীলা যিনি স্বামীর সঙ্গে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছেন, বহু প্রিয় আত্মীয় বন্ধুদের যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধখেলায় অকারণে হারিয়েছেন - তাঁর কোলের কাছে বসে মন প্রাণ শান্ত স্নিগ্ধ আনন্দিত হয়ে গেল। জীবনের উজ্জ্বল সুন্দর সুকোমল দিকটার প্রতি সর্বদা দৃষ্টি দেওয়ার উপযোগী আশাবাদী মনোভাব জেগে উঠল। আর আমার উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে তিনিও হলেন তৃপ্ত। প্রকৃত মূল্যবোধের দীক্ষায় দীক্ষিত করার জন্য আমাদের ভারতবর্ষের কোণে কোণে এই রকম অনেক ভিক্ষা মায়েরা অপেক্ষা করছেন যাঁরা স্কুল কলেজের ডিগ্রিধারী না হয়েও প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষিতা। কিন্তু তাঁদের কাছে দুদন্ড বসে মনের কথা বলার বা শোনার সময় নেই আমাদের। তাই দূরদর্শনের পর্দায় অথবা চিত্রকথার পত্রিকায় চোখ সেঁটে বসে আছি, আমরা সত্যিকারের জীবন থেকে পালিয়ে গিয়ে।
এরপর এমন একজন ভিক্ষে মায়ের সঙ্গে চুলা আলাপ করিয়ে দিলেন যিনি ভোগীর দেশে ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিতা এক মহিয়সী সাধিকা কর্মচঞ্চল, সদ্য হাস্যময়ী প্রচার বিমুখ ফ্রান্সিয়া আলা-র সঙ্গে। পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত ঘর সংসার স্বামী-পুত্র পরিবার নিয়ে ব্যস্ত জীবন যাপন করেছেন। তখনই তাঁর চোখ পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার এক অতি অবহেলিত অত্যাচারিত দুঃখ - পীড়িত মানুষে ভরা ছোট্ট দেশটির দিকে। নাম গুয়াতেমালা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপদে বিপর্যস্ত গুয়াতেমালার প্রায় নিঃস্ব রিক্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার মতন নির্ভীক, কর্মঠ ও সেবাপরায়ণ বন্ধু খুবই কম। এই দেশের অসহায় শিশু ও মহিলাদের কাছে পৌঁছে গেছেন - 'ফ্রান্সিয়া মা' সব বৈভব সুখের আরাম ছেড়ে। কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি হাতে (ব্যাঙ্কের চেক জোগাড় করার) ভিক্ষার পাত্র। ক্যালিফোর্নিয়ার ধনকুবেরদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ওষুধ কাপড় জামা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে তিনি পৌঁছে দেন সেই নিষ্পাপ আদিবাসী পরিবারের ঘরে ঘরে। ছেলের দেওয়া ২৩ ডলার পকেট মানি তাঁর ঝুলিতে দিতেই অশ্রুসজল চোখে জড়িয়ে ধরলেন তিনি আমায়।
অপূর্ব এক আবেশ নিয়ে ফিরলাম নিজের দেশে। আমাদের দেশেও কত 'প্রব্রাজিকা - সন্ন্যাসিনী নিজেদের নিঃস্বার্থ জীবন "ফ্রান্সিয়া আলার" মতই যাপন করছেন। কত খ্রিস্টান নান, সিস্টার, মাদার এই ভারতের গ্রামেগঞ্জে (তা সে বিহারের দুমকা হোক আর পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর বা ত্রিপুরার বনের মধ্যেই হোক অথবা নাগাল্যান্ডের পাহাড়ী চার্চে) একাগ্র মনে সেবা করে চলেছেন অসহায় দুঃস্থ মানব শিশুদের। সবাই এঁরা একই গোত্রের একই ধর্মের। সংসারের সুখ ছেড়ে কুষ্ঠ রোগীর ঘায়ে ওষুধ লাগাতে তাদের যেমন কুন্ঠা নেই, বেদনাকাতর নার্স ডাক্তারহীন সহায়সম্বল রহিত আদিবাসী তরুণী কন্যার মুখখানি বুকে চেপে ধরে ভগবানের নাম গাইতে গাইতে সদ্য জন্মলাভে ধন্য কৃতজ্ঞ নতুন প্রজন্মকে সাহস ও উৎসাহ প্রদান করতেও তাঁরা তেমনিই পারদর্শী কুশল। ভিক্ষে মায়েরা আমাদের চিরনমস্য। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমার আজকের এই ভ্রমণ কাহিনী উৎসর্গিত হল।

টনিক (Tonic)

চন্দনা সেনগুপ্ত

- ডাক্তারবাবু নমস্কার।
- আরে আরে আসুন ভবেশবাবু, কি হলো? এতো বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন? আবার জ্বর বাঁধালেন নাকি?
- না না টেম্পারেচার তো আসেনি তবে বড় দুর্বল লাগছে, মাথা ভার, বুক ধড়ফড়, কি হলো ডাক্তারবাবু কিছু বুঝতে পারছি না।
- দেখি দেখি হাতটা, জিভ কুঁচকে অমন করে চোখটা টিপছেন কেন? রিলাক্স, হুঁ, সেরকম তো কিছু মনে হচ্ছে না।
আড়ষ্ট শরীরটা ডাক্তারের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে মিয়ানো গলায় ভবেশবাবু বললেন, কোনো কাজ ভালো লাগে না, খাবারে স্বাদ পাই না, মাঝে মাঝে হাত পাও ঝিম ঝিম করে।
ডাক্তারবাবু সদা হাস্যময় মানুষ অনেকদিন ধরে একই পাড়ায় দুজনের বাস, ছেলেদের হাম, চিকেনপক্স, মাম্স, মেয়ের হুপিং কাশি, স্ত্রীর আমাশা, অম্বল, বোনের পেটে ব্যাথা, ভাইয়ের এলার্জি, বাবার হাঁপানি, মায়ের পা ফোলা, সব কিছুতেই ভবেশবাবু সমব্যাথী, দুঃখভঞ্জন "হরির" মতন এই পরিবারের সব লোকের কষ্ট দূর করতে ছেলে, বুড়ো, বৃদ্ধা, প্রৌঢ়া সকলেরই পরম বন্ধু তিনি।
প্রেসার চেক করে, লিভার আর গ্ল্যান্ডগুলো সব টিপে-টুপে বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন - নাঃ কিছু হয়নি আপনার। মেয়েদের মেনোপস আর ছেলেদের এই মানে.... মানে এই প্রৌঢ়ত্বের সীমায় বয়সটা এলে, সবাইকার একটু আধটু এরকম হয়। অতো ঘাবড়াবেন না।
- একটা ভালো ওষুধপত্র কিছু লিখে দিন না আপনি, তাহলে নিবু নিবু প্রদীপের শিখাটা হয়তো আবার জ্বলে উঠবে - হতাশ গলায় ভবেশবাবুর আকুতিটা শোনালো বাচ্চা বেড়ালের মিউ মিউ আওয়াজের মতন।
- আরে রাখুন তো মশাই, ওষুধপত্র। কি করবেন আমার ওষুধগুলো? বিনা কারনে গিলবেন? আগে তো আপনি এরকম হাইপোকন্ড্রিক ছিলেন না মশাই, আজকাল হলোটা কি?
- অন্ততঃ একটা "টনিক" দিন না ডাক্তারবাবু - স্নায়ুগুলো বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। মেয়েটা অফিস থেকে দেরী করলে, কেমন পাগল পাগল হয়ে যায়। ছেলের বন্ধুরা হঠাৎ ছেলেকে ডেকে নিয়ে গেলে ভয় লাগে, মনে হয় রাজনীতির কোনো চোরাবালিতে পড়লো না তো ছেলেটা।
- স্ত্রীর সঙ্গেও কথায় কথায় ঝগড়া, আমি কি সাইকোলজিস্ট দেখাবো?
এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো ডাক্তারবাবুর। না আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না দাদা। এবার যা বলি মন দিয়ে শুনুন, শহুরে জীবনের এক ঘেঁয়েমীতে আপনার শরীর মন ক্লান্ত হয়ে গেছে। কোনো "টনিক" আপনাকে এখন চাঙ্গা করতে পারবে না। আপনি এক কাজ করুন, মিসেস কে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসুন কিছুদিনের জন্যে। আপনার "টনিক" হচ্ছে খোলা হাওয়া। সব সবুজ গাছ-পালা কিম্বা নদী-নালা। সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসুন ফ্রেশ হয়ে আসবেন।
অরে ডাক্তারবাবু ওসব জায়গায় যাওয়ার ঝামেলা কত জানেন? ট্রেনের টিকিট, হোটেল বুকিং, বাক্সপ্যাঁটরা গোছানো। স্ত্রীর পানের বাটা নেই মায়ের মতন ঠিকই, কিন্তু জামাকাপড়, স্নো-পাউডার, লিপস্টিক থেকে চুলের কলপ, নিভিয়ার বোতল, শ্যাম্পু-সাবান বিরাট লিস্ট সমেত জিনট্যাক-ফিনট্যাক সব ওষুধপত্র গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চারটিখানি কথা? এর চেয়ে একটা "টনিক" খেয়ে জোরটা বাড়িয়ে নিলে ভালো হতো না ডাক্তারবাবু?
- না হতো না। আপনাকে এবার কিছুতেই আমি ওষুধ দেবো না, যান বেরিয়ে আসুন।
- ডিসেন্ট্রি রুগীর মতন পাঁচন খাওয়া তেতো মুখে, ভিজে বেড়ালের মতন চুপসে যাওয়া ভবেশবাবু বাধ্য হয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়তেই ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, আরে বাবা অতো টেনশন করছেন কেন বলুন তো? গ্রাম সাইডে কোনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িও তো কাটিয়ে আসতে পারেন। লাইফে মোনোটোমি কাটাতে মাঝে মাঝে চেঞ্জে যেতে হয়।
- দেখি! কি যে করি! - রাস্তায় নামলেন ভবেশবাবু।
বাড়িতে এসে অবশ্য অত ন্যাকা সেজে থাকা যায় না, কারন শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু সুকুমার রায়ের সিদ্ধান্ত তাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় - "কাউকে বেশী লাই দিতে নেই, সবাই চড়ে মাথায়"। তাই ছেলে পিলে বা স্ত্রীকেও তিনি কোনো দিনই মাথায় তুলতে রাজি নন, কিন্তু এখন এই অকারণ বিমর্ষতা তথা "ডিপ্রেশন"-এ ভুগতে শুরু করে মাঝে মাঝে একটু নিরীহ ছাগলের মত বোকা বোকা ব্যবহার করে ফেলছেন। বাড়ি ফিরেই বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে খানিকটা জল দিয়ে এসে একটু যেন ধাতস্ত হলেন, এবং অন্য দিনের মতন চা নিয়ে কাছে দাঁড়াতেই স্ত্রীর হাতটা ধরে ফেললেন অকস্মাৎ। একটু গদ্গদভাবে বললেন-
- গ্রাম সাইডে মানে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের সেরকম কোনো আত্মীয় টাত্মীয় আছে না কী গো?
- সে রকম মানে? কি রকম? কাদের কথা বলছো? - হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে স্ত্রী মলিনাদেবী ওদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিয়ে আশ্বস্ত হলেন - না কাজের মেয়েটা রান্না ঘরের ভেতরে, হাত ধরাটা দেখে ফেলেনি।
- সে রকম মানে এই ধরো যাদের কাছে গিয়ে দু-চার দিন একটু আরাম করে কাটানো যায়।
- কেন? হটাৎ গ্রামে যাওয়ার কি হলো?
- ডাক্তারবাবু বলছিলেন আমার শরীরটা আবার কেমন যেন দুর্বল হয়ে গেছে তাই চেঞ্জে যাওয়ার দরকার।
- আগেকার দিনে কলকাতা থেকে "মধুপুর" "দেওঘর" কিংবা পুরী যেতাম, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে হাওয়া বদল করতে, তোমার কি সে রকমই ইচ্ছে জাগলো নাকি?
- ধরো তাই যদি হয়, তাহলে ভেবে দেখো না, কোথায় যাওয়া যায়। কারন এই বেড়ানোটা হবে আমার "টনিক"।
- তা "টনিক"ই যদি চাই তো এই দিল্লী শহরের কাছেই তো হরিদ্বার, মুসৌরি নয়তো সিমলা যাই, চলো। অনেকদিন তো সত্যি কোথাও যাওয়াই হয় না।
- না না ওসব জায়গায় আমার ভালো লাগে না, হোটেল ফোটালে থাকবো, আমার পোষাবে না।
- পোষাবে না? না টাকা খরচের ভয়ে বেরুবে না? তাই বলো। এখন তো ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে যে যার নিজের নিজের কাজ, পড়া, কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত, চলো না একটু শখ মিটিয়ে, বেড়িয়েই আসি।
- আরে ওতে আমার টেনশন আরও বেড়ে যাবে, প্রেসার তো হাই জানোই, তার ওপরে বাইরের খাবার খেলেই তো তুমি ঢেকুর তুলে তুলে মরবে - এই বয়সে ও রকম বেড়ালে কি "টনিক" পাওয়া যায়?
- হ্যাঁ, গ্রামে তোমার জন্যে সব লোকেরা "টনিক" বানিয়ে যেন বসে  আছে - যত সব ঢঙের কথা! মুখ ঝামটা দিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মলিনা চলে গেলেন রুটি করতে।
সত্যি বাবা সেই কত বছর আগে পুরুলিয়া থেকে দিল্লী চলে এসেছেন ভবেশবাবুরা এই প্রবাসেই লেখা পড়া চাকরী-সংসার নিয়ে পঞ্চাশটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, দেশের বাড়ি খুব একটা যাওয়াই হয়নি, এখন কার কাছে যাই ভাবতে ভাবতে হটাৎ মনে পড়লো, মায়ের খুড়তুতো বোন "পিতুমাসী" মানে 'প্রতিমা মাসী' ও 'সোমেন মেশোমশাই' একবার বছর দশেক আগে মা বেঁচে থাকতে 'কেদার-বদ্রী' তীর্থে যাওয়ার সময় দিল্লিতে তাঁদের বাড়ি এসে কিছুদিন ছিলেন এবং বারবার অনুরোধ করেছিলেন একবার ওনাদের গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে। অতএব শুরু হলো পুরোনো ডায়রী ঘেঁটে ওনাদের ঠিকানা আবিষ্কার। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার মতন মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্ক, বাবার পুরোনো চামড়ার সুটকেশ, সেটারই এক কোনে বহু পাকিং বাক্সের নীচে যা চাপা পড়েছিল এতদিন ধরে তা বের করা হলো, পাশের দোকানের 'চাকর' ও 'ঝি'-এর ছেলেকে দশ দশ টাকা দক্ষিণা দিয়ে। স্ত্রী মলিনাদেবী তো রেগে গজ গজ করতে লাগলেন। এইসব লোকদের ঘরের ভেতরে ঢোকানোর জন্য। কিন্তু ভবেশবাবুও "টনিকের" সন্ধানে এবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, পিতু মাসীর গ্রামে তিনি যাবেনই যাবেন। বাবার ডাইরীতে তাঁদের সবাইকার জন্ম তারিখ বাংলায় লেখা এবং কিছু দোকানের হিসাব নিকাশ। অতীতকে হাতড়াতে হাতড়াতে হটাৎ রুপোর কৌটোতে ঠাকুমার আমলের সেই বিখ্যাত সোনার টিকলিটা পাওয়া গেল, ছোট্ট কাগজের পুরিয়া মোড়ানো, যেটার ওপর সব দিদিদেরই নজর ছিল কিন্তু মা কাউকে দেননি, বলতেন - তোদের তো অনেক দিয়েছি আবার কেন? "মলিনাও একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, যখন মা প্রায় বিছানায় শয্যাশায়ী, "মা" জবাব দিয়েছিলেন - "জানি নে বাপু কোথায় হারিয়ে ফেলেছি"। অতএব দশ বছর পরে জিনিষটির হদিশ পাওয়ায় সবাই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভবেশবাবুর ঘাড়ে। বিমর্ষতা, মাথা ধরা সব ভুলে গিয়ে খুব বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, 'সরো তো সব - আমাকে মায়ের কাগজপত্রগুলো দেখতে দাও'। যে কাগজের পুরিয়াটিতে "টিকলিটি" মোড়াছিল স্ত্রী সেটা ফেলে দিয়েছিলেন কেন্নোর মত কুন্ডুলি পাকিয়ে, ভবেশবাবুর পায়ের কাছে পড়েছিল সেটি। এতদিন যার বুকে অমূল্য ধন সমুদ্রের "মুক্তোর" মত সযত্নে রক্ষিত ছিল আজ সে অকেজো, - কুড়াদানিতে চলে যেতে হবে তাকে, কেমন যেন হতাশাগ্রস্থ হয়ে গেল মুখ হাঁ করে। ঝিনুকের মত পরে থাকা "মোড়ক"টা হাতে তুলে নিলেন তিনি, মায়ের অপটু হাতে পেন্সিলে লেখা প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া, একটা লাইন পড়বার জন্য। তাতে লেখা - পিতুর মেয়ের বিয়ের জন্য"। চমকে উঠলো সমস্ত সত্তা। এক মুহুর্ত্তে কেটে গেল নৈরাশের কালো মেঘে ঢাকা পর্দা। কাগজের টুকরোটা খুলে ভালোভাবে টানটান করলেন, হ্যাঁ পেছনে পিতু মাসীর ঠিকানা -
শ্রী সোমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, গ্রাম - সুপুর, জেলা - বাঁকুড়া
আনন্দে লাফিয়ে উঠলো হৃৎপিণ্ড। সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী 'আর্কিমিডিসের' মতন বলতে ইচ্ছে করল তার 'ইউরেকা' 'ইউরেকা'।
তারপর চিঠিপত্রের 'আদান প্রদান', সোমেন মেসোর আন্তরিক আহ্বান, টিকিট রিজার্ভেশন, "নীলাচল" এক্সপ্রেসে। স্ত্রীকেও আকৃষ্ট করলেন "পুরী" ঘোরাবার আকর্ষণ, ওখানে কিছুদিন থেকে তাঁরা জগন্নাথ দর্শনটাও সেরে আসবেন এই ফাঁকে - সেরকম প্ল্যানও একটা হয়ে গেল। ডাক্তারবাবুর চেম্বারে আবার গিয়ে হাজির হলেন তিনি। - ডাক্তারবাবু যাচ্ছি গ্রামে আপনার "টনিকের" খোঁজে, দেখি কেমন কাজ দেয়। ভবেশবাবুর মুখের চেহারা দেখে ভীষণ খুশী ডাক্তার "বরাট"।
- "আরে যাওয়ার নামে আর প্রিপারেশন-এ তো আপনার সব রোগ পালিয়ে গেছে, আধ ফোঁটা 'গোলাপের কুড়ি' মনে হচ্ছে আপনাকে। এটাই তো চাই।
নির্দিষ্ট দিনে 'জগন্নাথে'র মাসীর বাড়ী যাওয়ার মতন তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। "পুরাতন ভৃত্য" তো আর আজকাল কার দিনে তার "বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে" গিন্নি ক্ষান্ত হতে পারলেন না, হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, "আমি লাজপত নগরের সেন্ট্রাল মার্কেট এবং সরোজিনী নগরের ব্যাগ, চপ্পল আর সালোয়ার কামিজের বাজারে ঘুরে শপিং করতে যাচ্ছি, নিজের কি কি নেবে ঐ সুটকেশটাতে ভরে নাও, VIP টা আমি নেব। স্ত্রীকে চিরকাল VIP ট্রিটমেন্ট দিতে হয় একথা তিনি খুব ভালো করে জানেন। স্বামীদের জীবন যে সংসারের রঙ্গমঞ্চে স্ত্রীর সামনে কতটা গৌণ তা ভুক্ত ভোগীরা সবাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।
"নীলাচল" এক্সপ্রেসে প্রথমে বাঁকুড়া, সাতদিন পরে পুরী এবং সেখানে একসপ্তাহ কাটিয়ে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় স্বাস্থ্য ও মন পরিবর্তনের কোনো এক অজানা "টনিক" সেবন করে ফেরত আসা - এই পরিকল্পনা যোজনা বানিয়ে ট্রেনে বসলেন, ভবেশবাবু সস্ত্রীক। ভয় না টেনশন কে জানে, বুকটা ধড়ফড় করে উঠল অকারণ উত্তেজনায়। স্ত্রী তখন পাশের মহিলার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছেন অপটু স্বামীর নার্ভাসনেস নিয়ে।
গাজিয়াবাদ পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের আঁখের ক্ষেতের মধ্যে এসে ট্রেনের গতি গেল বেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সব আশংকা ভয় চিন্তাও দূরে সরে যেতে লাগল মন থেকে। সবুজ আর সবুজ ক্ষেত অবুজ শিশুদের মত মাথা দুলিয়ে যেন আনন্দে বিগলিত। বড় ভাল লাগল তাঁর। ভাবলেন ডাক্তারবাবুর কথা শুনে ভালোই করেছেন। বিভিন্ন টিফিন বাক্স খুলে ততক্ষনে বিকানীরের নমকিন, বাঁটনেয়ালী মহীয়সী মাড়োয়ারী "বহনজি" মায়াবন বিহারিণী হরিণী - পাটনার বাক্য পটিয়সী আচার, ছাতুর পরোটা চখানেয়ালী তরুণীর সঙ্গে তাঁর গিন্নি বাঙালী আলুর দম লুচি দিয়ে পিকনিক জমিয়ে ফেলেছেন। সকাল বেলায় পেপারটা পড়া হয়নি তাই সদ্য স্টেশন থেকে কেনা খবরের কাগজে চোখ বোলাতে অথবা বলা যায় এসব মেয়েলী গল্প কথা বা দৃষ্টির আড়ালে যাবার জন্য নিজের আমড়ার মত গোমড়া মুখটি ঢাকতে সবে টাইমস অফ ইন্ডিয়াটি খুলে মেলে ধরেছেন, চোখের সামনে গিন্নি এক ঝটকায় সেটি কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে আরম্ভ করলেন। "আরে করো কি করো কি"? বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন কাগজের টুকরোগুলি নেমন্তন্ন বাড়ির পাতার মতন ট্রেন পিকনিকের অতিথি সৎকারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনা-সামনি সব যাত্রী বন্ধুই পরম আনন্দে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা খাবারের স্বাদ নিতে ব্যস্ত। ছেলেরা এত তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব পাতাতে পারে না কেন কে জানে? বিশেষতঃ গল্প শুরু করলেও রাজনীতি দুর্নীতি আর ক্রিকেট প্রীতি ছাড়া যে পৃথিবীতে অন্য কোনো টপিক নিয়েও বাক্যালাপ করা যায় এ তারা ভাবতেও পারেন না। মেয়েরা কেমন মনের-প্রাণের কথা ছেলে-মেয়ে, বৌ-জামাই, ঘর-সংসার সব নিয়ে এক মিনিটেই একজন আরেকজনের হেঁসেলে, অন্দরমহলে, বেশী সময় থাকলে বেডরুমের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। স্বামীদের আলুর দোষ, পটোলের প্রীতি কিছু নিয়ে আলোচনা করতে তাদের মুখে আটকায় না। পারেও বাবা এরা বকবক করতে! ভাবতে থাকেন ভবেশবাবু।
সন্ধ্যে গড়িয়ে এলো। ছুটে পার হয়ে যাওয়া অসংখ্য জীবনমুখী কবিতা মাখা গ্রাম সূর্য্যাস্তের পর্যন্ত রোদের রক্তিম আভা, ঘরে ফিরে যাওয়া গরু-ছাগল মোষ - রাখালের দল, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীদের আকাশ থেকে গাছের বাসায় প্রত্যাবর্তন, - দেখতে দেখতে মনটা যখন উদাস হয়ে অনেক দিনের সেই ভুলে যাওয়া গানের কলিটা মনে মনে ভাঁজছেন - "দিনের শেষে ঘুমের দেশে...."
- শোনো ঘুম পেয়েছে তো বাঙ্কে শুয়ে পড়ছো না কেন।
- সব ভাবনার সুর হটাৎ ঝনাৎ করে কেটে যাওয়ায় একটু রাগত স্বরে বলে উঠলেন ভবেশবাবু "ঘুম পাবে কেন এত তাড়াতাড়ি"। তোমার জায়গা চাই তো বলো উঠে যাচ্ছি ওপরে।
- ভালো কথাই তো বললাম, অতো খেঁকিয়ে কথা বলছো কিসের জন্যে? আমি কি আমার জায়গার কথা বললাম নাকি?
- কথা না বাড়িয়ে উঠে বাথরুমের কাছে গিয়ে একটা সিগারেটে ধরালেন তিনি।
এবারে শুয়ে পড়া যাক ভেবে রাবারের বালিশটি ফোলাতে উদ্যত হলেন ভবেশবাবু। ঠিক সেই সময় মোক্ষম প্রশ্ন মলিনাদেবীর।
- মায়ের সেই টিকলিটা এনেছো নাকি?
- হ্যাঁ, ওটা আমি মাসীর মেয়েকে দেব।
- তোমার জন্যে যেন মাসীর মেয়ের বিয়ে এতদিন আটকে আছে? যদি সেই মেয়েকে না পাও তো ...
- হ্যাঁ, ওটার দিকে তোমাদের সবাইকার লোভ আছে জানি, কিন্তু মাসীর কি একটাই মেয়ে নাকি, মায়ের যখন ইচ্ছে ছিল, আমি তখন মাসীকেই দিয়ে আসবো।
- কেন? সে বুড়ি কি চিতায় যাবার সময় পরে যাবে নাকি?
- দেখো সব সময় ঐ সব বাজে বাজে কথা বলবে না। পিতু মাসী মায়ের থেকে অনেক ছোট ছিলেন, আমার চেয়ে বড়জোর পাঁচ/ছয় বছরের বড়।
- আচ্ছা আচ্ছা খুব দরদ উথলে উঠছে যে দেখছি, "টনিক" পাবার লোভে।
আর কথা বাড়ালেন না তিনি স্ত্রীর সঙ্গে। ভোর রাত্রে ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসলেন, ট্রেন থেমে আছে, যাত্রীদের শোরগোল, কুলিদের হৈ হল্লা ছাপিয়ে নিজের নামটা কানে গেল তাঁর।
- হ্যাঁরে 'ভবা' আছ নাকি এই কামরায়? কুথা গেলেক ব ডিল্লির ছা ট।
- ষাট বছরের ভবেশবাবু সোমেন মেসোর কাছে এখনও ছোট "ছা" হয়ে গেলেন, ষোলো তরুনের মতন ঝট করে বাঙ্ক থেকে নেমে কোনো রকমে চাদর টাদর টেনে গোল করে আওয়াজ দিলেন।
- মেসোমশাই এই যে আমরা নামছি নামছি।
- স্ত্রীও তখন জানলা দিয়ে দেখে নিয়েছেন স্টেশন এর নাম "বাঁকুড়া"।
দুটো কুলী উঠে পড়েছিল, তাড়াতাড়ি 'মাজী'কে ধরে নামালো তারা। ভবেশ স্যুটকেশ হাতে নিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়াতেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
"নীলাচল" থেকে ধরাতলে পা দিতে গিয়ে হুড়মুড় করে প্লাটফর্মে পড়লেন মেসোমশায়ের গায়ের ওপর।
সস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন ৭২ বছরের ফুর্তিবাজ সতেজ মানুষটি। অর্দ্ধেক রাতে স্টেশনে এসে বসে আছেন, অতিথিকে সম্বর্ধনা জানাবার জন্য আশ্চর্য্য প্রাণবন্ত, বয়সের নাগাল না পাওয়া বৃদ্ধ-যুবক। দুই শক্ত বাহুর আলিঙ্গনে ধরা দিয়ে পরম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন "ভবা"।
ভোরবেলায় সূর্য্যের লাল আভায় শালগাছে ঘেরা বাঁকুড়ার গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ ভুলিয়ে দিল সারা পথের ক্লান্তি। 'সুপুর' যাওয়ার রাস্তায় শিমুল-পলাশের মাথায় লেগেছে রঙের আগুন। পঞ্চাশ বছর, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর (দশ বছরে সেই শেষ আসা) মাসীর বাড়ী আসছেন, ভবেশবাবু আর এতগুলো বছর তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন বসন্ত ঋতুকে। "ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে, ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে -
- হুঁ তা যা বলেচ বাপ, ই রাস্তা ট বড় সোন্দর। হুই উধারে তাল ডাংরা ... ঝিলিমিলি, সিমলাপাল। দু-দিন জিরাই লে, তোদিকে "মুটুকমুনিপুরটা"ও দেখাই লিয়ে আসবো।
- মেসোমশাই-এর মিষ্টি বুলি আর কবিতার ছন্দে দোল খাওয়া গ্রামের নামগুলো ভবেশবাবুর বুকের মধ্যে যেন জল-তরঙ্গ বাজিয়ে দিল।
- মুটুকমুনিপুর লয় গো কর্ত্তা মুকুটমণিপুর বটে - ট্রেকার তথা গাড়ির চালক মেসোর ভাষা মার্জনা করতে চাইলো।
- হঁ হঁ লে তোকে আর 'বাকচাতুরী করতি হবেক লাই, তাড়াতাড়ি যেতে লাইরচু, তোর গিন্নিমাকে তো জানুস নাই অতখন দশবার ঘর বার কইরবেক।
- ট্রেকার বা জিপের চালক হর্ন বাজালো ভোঁ ভপ ভপ।
গ্রামের খোলা মেলা পরিবেশে কী যে ভালো লাগল ভবেশবাবুর তা অবর্ণনীয়, রোজ সকালে ক্ষেতের আল ধরে ধরে তাল দীঘির ধারে বেড়াতে যাওয়া, মুড়ি চপ দিয়ে জল খাবার খাওয়া, দুপুরে টাটকা মাছের ঝোল ভাত, রাত্রে বাড়ির চালে বড় হওয়া মিষ্টি কুমড়োর ছক্কা লুচি কিম্বা হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়া বড়ই আনন্দের। সন্ধ্যেবেলায় বাঁকড়ী ভাষায় গাওয়া কীর্তন, গৌরাঙ্গ মেলায় খোলের সঙ্গে পুরোনো হারমোনিয়ামের গান - "মালা কে লিলি রে? পাড়ার ছিল্যারা/গৌড় আমার কেঁইদ্যে আকুল মালা দ্যে তরা"।
একদিন শখ করে আদরের ভবাকে মেসোমশাই বেশ বাগিয়ে পরিয়ে দিলেন নিজের একখানা ধুতি, কিন্তু দিল্লীর বাবু সেটি পরে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গুলি ডান্ডা খেলতে গিয়ে পড়লেন ধড়াম করে। তাঁর সেই শিশু সুলভ আনন্দ ও পতন দেখে গ্রাম সুদ্ধ লোক তো হেঁসেই বাঁচে না।
যাবার দিন এসে গেল, ঠিক বেরুবার আগে টিকলিটি মাসীর হাতে দিয়ে বললেন ভবেশবাবু 'এটি মা তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য রেখে গেছেন'।
সেটি প্রথমে হাতে নিয়ে দেখলেন দুজনে তারপর মাথায় ঠেকিয়ে বললেন - "বৌমা ইটি তোমার শাশুড়ির জিনিষ তোমার ছিল্যার বৌ এলে দিও। আমার বিটির বিয়া তো কতদিন আগ্যে হই গ্যাছে, উয়াকে আর দিতে হবেক লাই"। মলিনার চোখে জল, স্বামী কে বললেন এতো তাড়াতাড়ি পুরীর টিকিট কেন কাটলে? আরো কিছুদিন এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে। ভবেশবাবুকে মেসো ছোট বাচ্চার মতন জড়িয়ে ধরে বললেন হ্যাঁ তাই ভালো। রিটায়ার্ড জীবন, কাজ তো কিছু নাই তোর ভবা, অখন য্যাত্যে হবেক নাই। সাত/দশ দিন আরো থাক, তারপর না হয় জগন্নাথ ধামে যাবি। পিতু মাসীমা বললেন, হ হ আমারও অনেকদিন জগন্নাথ দর্শন হয়নি, চলো না আমরা সবাই একসঙ্গে যাই। মলিনাও আদুরে মেয়ের মতন মাসীমার হাতটা ধরে গদগদ কন্ঠে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ তাহলে তো খুব মজা হয়। ভবেশবাবু কত বছর পর স্ত্রীর মধ্যে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের ভাব দেখেননি। ভীষণ ভালো লাগলো তাঁর। টিকিট ক্যান্সেল হল। তারপর ওই চারজন সিনিওর সিটিজেন মিলে পুরীর সমুদ্র সৈকত হোটেলে আরো এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন, এক অনাবিল সুখের সাগর ভাসলেন তারা, যেন শৈশব ফিরে এল আবার তাদের জীবনে। আসবার সময় মাসী মেসো নেমে গেলেন বাঁকুড়ার স্টেশনে, এবং তাদের আন্তরিকতার টনিক পান করে অশ্রুসিক্ত নয়নে  মলিনা দেবী ও ভবেশবাবু নতুন মানুষ হয়ে ফিরে এলেন দিল্লি শহরে।

লক্ষীপুরুষ (Lokkhipurush)

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রথম অধ্যায়

জীবনকে অনেক কাছ থেকে যাঁরা দেখেছেন, দুঃখ সুখের পালায় দোলায়-অবলীলায় দুলতে দুলতে সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথকে যাঁরা অতিক্রম করেন, তাঁদের দলে “জ্যোতির্ময়” বাবুও বোধহয় নাম লিখিয়েছেন, তাই হাজার কষ্টেও তাঁর হাসি মুখ, নির্বিকার মনোভাব, বিরক্তিশূন্য সুদীর্ঘ কপাল, ষাটের কোটায় এসেও টাক না পড়া এক মাথা কাঁচা পাকা কোঁকড়ানো চুল, চশমার ভেতরে জ্বল জ্বল করা চঞ্চল দুটি চোখ, ঋজু দেহ, দীপ্ত দ্রুতলয়ের চলন, গম্ভীর আওয়াজে ধীরে ধীরে কথা বলার অপূর্ব বাচনভঙ্গী – সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, দিল্লীর রোদে পুড়ে ঝলসে যাওয়া তামাটে গায়ের রঙ তাঁকে আরও দৃঢ় মজবুত দেখতে সাহায্য করছে। অস্তমিত সূর্য্যের দিকে এক দৃষ্টে যখন তিনি চেয়ে আছেন, ছাদের কার্নিশে দাঁড়ানো তাঁর সেই চেহারাটি দেখে মনে হয় কোনো ব্রোঞ্জের তৈরী গ্রীক দেবতার মূর্ত্তি। এত টিকালো নাক কিন্তু ঔদ্ধত্য নেই হাবে ভাবে।

স্ত্রী কমলমণির অকাল মৃত্যু তাঁকে একলা করে দিলেও অসহায়তা বা বিষন্নতার কালো ছায়াকে তিনি কাছে ঘেঁষতে দেননি, ছেলে-মেয়েদের মুখ চেয়ে। গত বছর সরকারী দপ্তর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এবং দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় দায় দায়িত্বর ভারও ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে। সুপ্রভা থাকে কলকাতায় আর ছোট আভা বরের সঙ্গে জাপানে চলে গেছে বেশ কিছুদিন হ’ল। ছেলে সুপ্রকাশও বাবার মতন লম্বা এবং গৌরকান্তি সুপুরুষ। জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ইচ্ছে ছিল সে ইঞ্জিনিয়ার হবে; অনেক পড়াশুনা করবে, কিন্তু তার পড়াশুনোর চেয়ে খেলাধুলাতে বেশী মন। ইংরেজি তিনি ছেলেমেয়েদের নিজে পড়িয়েছিলেন, তাই ভালো কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স পাশ করার পরই সে চাকরী খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে কিছুদিন সেলস-এ প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করার পর প্রতিবেশী মিস্টার রায়ের বদান্যতায় ‘এয়ার ইন্ডিয়ায়’ চাকরী পায় সে স্টুয়ার্ডের। খুবই গ্ল্যামারাস কাজ মনে হয় ছেলের। ফ্লাইং আলাউন্স নিয়ে মাইনেও পায় মোটা টাকা, কিন্তু জ্যোর্তির্ময় বড় এক হয়ে যান, কারন ছেলেকে মাসের মধ্যে ২০ দিনিই বাইরে থাকতে হয়। মায়ের বাৎসরীকিতে দুই বোন এসে তাই উঠে পড়ে লেগেছিল ভাই-এর বিয়ে দেওয়ার জন্য। “চিত্তরঞ্জন পার্কের” এক ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধও এসেছিল অনেক। তিন ভাই বোন ও জামাইরা মিলে ঘরোয়া আলোচনা ও প্রাথমিক দেখা-দেখির পর ঠিক করলো “চন্দ্রানীকে”। জ্যোর্তির্ময় বাবু প্রথম থেকেই কোনো মেয়ে দেখতে যাওয়ায় বিরোধী। বলেন – ‘যে বিয়ে করবে সে দেখুক, কথা বলুক, সব পছন্দ হয়ে গেলে আমার সঙ্গে বিয়ের দিন ঠিক করতে আসতে বলো মেয়ের মা বাবাকে। আমার কাছে তো সব পাত্রীই “আভা” “প্রভা”র মতন নিজের মেয়ে মনে হয়, কাউকে দেখে এসে “বিয়ে দেবো না” বলাটা ভীষণ দুঃখ জনক মনে হয়। মেয়েরা মায়ের জাত, তাদেরকে অপমান করার কোনো অধিকার আমার নেই”। তাই দিদি জামাইবাবুদের সঙ্গে প্রকাশই গিয়েছিল চন্দ্রানীদের বাড়ি, পরে দুজনে একা হোটেলে ডিনার করতে করতে অন্যান্য সব কথাও খোলাখুলি বলে নেওয়ার পরে বাবাদের সাক্ষ্যাৎকারের পালা। এক রবিবারের বিকেলে চন্দ্রানীর মা বাবা এলেন তাদের “ময়ূর বিহারের” বাড়িতে। দেনা পাওনার কথা ওঠালেন চন্দ্রানীর মা। বাবা প্রফেসর মানুষ ভীষণ শান্ত ও সিধেসাধা। মিসেস দত্তগুপ্তই সব কথাবার্তা বলছেন।

“দেনা-পাওনা? – হ্যাঁ, আছে বৈকি” – হাসতে হাসতে বললেন জ্যোর্তিময়।

ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে একসঙ্গে চমকে সবাই মিলে তাকাল তাঁর দিকে।

– “আপনি মেয়ে দেবেন আর আমি মা লক্ষী পাবো”।

আমার ইলেক্ট্রিকের খরচ এবার কমে যাবে একেবারে, চন্দ্রানী মায়ের মত বৌ এলে এই গরিবের ঘর আলো হয়ে যাবে।

চন্দ্রানীর মাও রসিকতা করতে ছাড়েন না। জবাব দিলেন – “আমার মেয়ে তো শুধু আপনার ঘর আলো করবে আর প্রকাশের মতন দিব্যকান্তি জামাইতো আমাদের আত্মীয় বন্ধু সবাইকার মধ্যে সূর্য্যের মত জ্বল জ্বল করবে”।

লজ্জা পেয়ে প্রকাশ মাথা নিচু করে নিল। কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটু অহমিকার গন্ধ পেলেন জ্যোতির্ময়। প্রসঙ্গ পাল্টে এবার একটু অপরাধবোধ মিশ্রিত মিয়ান গলায় থেমে থেমে বললেন তিনি – দেখুন সবই তো ভালো, দুজনে দুজনের সঙ্গে খোলাখুলি ভাবে কথাবার্তা বলে নিয়েছে, দুই পরিবারও আমরা বন্ধুর মতন বলে মনে করছি শুধু একটাই একটু প্রবলেম আছে –

“হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন না, দ্বিধা করছেন কেন? প্রকাশের মতন সুন্দর ছেলের জন্য যা যৌতুক চান আমি দিতে রাজী আছি” – জ্যোতির্ময়বাবুর কথা শেষ করতে না দিয়ে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন তড়িঘড়ি করে।

– আরে না না, ওসব কথা আমি বলতে চাইছি না, আপনি ভুল বুঝছেন।

– “আপনাকে বলতে হবে না মেয়েকে আমি গয়নাগাটি, ফার্নিচার, গাড়ি, সবই দেবো, আপনি ঘাবড়াবেন না”।

– এবার চোয়ালের হাড় শক্ত হল জ্যোতির্ময়বাবুর। কপালের শিরা দুটো ফুলে উঠলো অপমানে। ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারলো বাবা বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু কোনোদিনই তারা বড়দের মধ্যে ফালতু কথা বলা বা অকারণ বাচালতা করা যুক্তি যুক্ত মনে করে না, তাই চুপ করে বুঝতে চাইল, এবার বাবা কি বলেন সেটা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। প্রকাশের মোবাইলটা বেজে ওঠায় সে সেটা কানে চেপে বাইরে চলে গেল এক্সকিউজ মি বলে। আভা প্রভা অথিতিদের চা জল খাবার আনার অছিলায় উঠে গেল রান্না ঘরের দিকে।

এবার চন্দ্রিমার বাবার সরল সোজা হাসিমুখ খানি আকৃষ্ট করেছে জ্যোতির্ময় বাবুকে। তিনি ভাবলেন স্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ন কথাবার্তায় অস্বস্তি বোধ করছেন, অধ্যাপক দাসগুপ্ত। তাই আর সময় নষ্ট না করে তাঁর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ফেললেন তিনি।

– “দেখুন ছেলের কাজটাই এমন যে মাসের মধ্যে অর্দ্ধেক দিনই ওকে বাইরে কাটিয়ে আসতে হয়। আপনার মেয়ের কোনো “হবি” আছে তো? নইলে কিন্তু ও খুব বোর ফিল করবে”।

হ্যাঁ, হ্যাঁ ওর তো অনেক হবি। ড্রইং, পেন্টিং, ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট অনেক শখ আছে। মেয়ের স্কুলে, কলেজে “হবি” ক্লাসে তৈরী ক্রাফট দেখলে তো আপনি ভাববেন যেন কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে কিনেছি। আর তাছাড়া আমরা কাছে আছি যখন মন লাগবে না চিত্তরঞ্জন পার্কে চলে যাবে, ও সব নিয়ে আপনি ভাববেন না।

কথাটা মনোপূতঃ হল না জ্যোর্তির্ময়ের, বললেন – “গান-বাজনা, নাচ, লেখালেখি I mean freelancing journalism কিছু করলেও সময়টা ভালো কাটাতে পারে।

এবার মিঃ দত্ত হটাৎ ছেলেমানুষের মতন জ্যোতির্ময়ের হাতটা চেপে ধরে, কেমন যেন আবেগের বশে বললেন, – “আপনি তো থাকবেন বাড়িতে, মেয়ে আমার গল্প করতে খুব ভালোবাসে আপনার সঙ্গে যখন বন্ধুদের অ্যাক্টিং করে কলেজের গল্প শোনাবে না, আপনার খুব ভাল লাগবে”।

– “তাহলে তো আর কথায় নেই”। আমাদের তো শুধু এটাই চাই। বাবা বড় একা হয়ে গেছেন চন্দ্রানী এসে যদি বাড়িতে হৈ হৈ করে গান, গল্প, কথায় বাবাকে ভুলিয়ে রাখে তাহলে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে”। বলল প্রভা চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে।

মিষ্টি, কেক, চপ-কাটলেটের মচমচানিতে এবার সবাই মশগুল, শ্যামলা মেয়ের দীঘল চোখে আদুরে মেয়ে চন্দ্রাকে দিদিদের ভালো লেগেছে, প্রথম আলাপেই দিদি জামাইবাবুদের তুমি করে কথা বলা, মিষ্টি হাসি একটু বোকা বোকা লাগলেও প্রকাশকে করা বাচ্চা মেয়ের মতন প্রশ্ন – “প্লেনটা যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে যায় তখন ভয় লাগে না”? সবাইকার বেশ মজার লেগেছে। তাই সম্বন্ধ পাকা হতে দেরী লাগলো না। ওর আলগা শ্রী, কোঁকড়ানো চুল জ্যোতির্ময় বাবুর মন ভরিয়ে দিল, মনে পড়ল স্ত্রী কমলমণির এইরকম কোঁকড়া চুলে পিঠে মেঘের ঢল নামতো। কতদিন পরে বাড়িতে আবার কোমরে আঁচল জড়িয়ে, খোলা চুলে ঘুরে বেড়াবে, রান্না ঘরে কাজের মেয়ে বা চাকরের নুন ঝাল ঢালা রান্নার তদারক করতে তাকে বারে বারে মাথা ঘামাতে হবে না, এখন নিজের ফুলের টব, গল্পের বই ও কাঠের কাজ নিয়ে তিনি আবার আপন মনে ব্যস্ত থাকতে পারবেন ভেবে বড় ভালো লাগল তাঁর। বাড়ির পুরোনো জিনিষ ঘড়ি, সেলাই মেশিন, মিক্সি সব নিজে হাতে তিনি সারেন, মেরামত করেন, যত্ন করে রাখেন। ঘন্টার পর ঘন্টা টুল বাক্স নিয়ে, স্ক্রু ডাইভার ধরে তার পার হয়ে যায় – একাকীত্বটাকে সহ্য করে নিজের জগতে নানা টুকিটাকি কাজ ঘর সাজানো, পর্দা লাগানো, ঝুল ঝাড়ার মধ্যেও যে এত আনন্দ – শিল্প বোধ থাকতে পারে তা জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখতে দেখতে ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারে। বড় জামাই সুহাস তো বাবার ফ্যান বলেন – রিটায়ার করে বাবার মতন প্রত্যেক মুহূর্তে রসাস্বাদন করতে, করতে বাঁচবো। ছোট জামাই তো সর্বদাই প্রশংসামুখুর – তার উক্তি –

“আমরা ইঞ্জিনিয়ার হলেও এত সুন্দর করে পুরোনো জিনিষ মেইন্টেন করতে পারবো না। বাবা একাধারে জাপানি আর আমেরিকানদের মতন পরিশ্রমী ও ইনোভেটিভ, কত সিস্টেমিক ওয়েতে কাজ করেন, কত পেশেন্স আর ডিসিপ্লিনড। তোমরা কেন হওনি বলো না”। মেয়েদের চোখে জল আসে অদ্ভুত এক আনন্দ আবেগে।

যাক প্রকাশের বিয়ে হয়ে গেল ফাল্গুন মাসে। “চন্দ্রানী” আসায় ঘরের চেহারা বদলে গেছে – পুরোনো বাল্বগুলো চেঞ্জ করে বড়বড় ঝাড়লণ্ঠন ধরণের লাইট লেগেছে ড্রয়িং রুমে, পর্দা এসেছে অনেক দামী। কাঠের সোফা পাল্টে লোহার ফার্নিচার। টেলিফোনটাও নিজের জায়গায় নেই। দেওয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় মাঝে মাঝে বাজনা বাজাচ্ছে। জ্যোর্তির্ময় বাবু মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারেন না, টেপ রেকর্ড চলছে নাকি ফোন এসেছে। ঘরে ঘরে রিসিভার। সবচেয়ে চমকদার হয়েছে ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট, স্ত্রীর হাঁপানি ও মেয়ের ডাস্ট এলাৰ্জি থাকায় এবং মধ্যবিত্ত সংসারে অবাঞ্ছিত মনে হওয়ায় কোনোদিন কোনো কার্পেট কেনার কথা ভাবতে পারেননি তিনি। এখন ছেলে এত টাকা রোজগার করে, মেয়ে মায়ের সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে লাজপৎ নগর, করোলবাগ, সরোজিনী নগরে বাজার করতে ভালোবাসে তাই বিয়ের ৬ মাসের মধ্যেই প্রকাশের বাড়ির ভোল একেবারেই পাল্টে গেল। যদিও নিজের বেডরুমটাতে বিশেষ নতুনত্ব আনতে দেননি তিনি। দেওয়ালে ছেলে মেয়ের ছোটবেলাকার ছবিগুলো সরাতে দেন না কাউকে। টেবিলে সেই পুরোনো জলের জার, ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মায়ের বড় ক্যালেন্ডার বাঁধানো ফটোর পায়ে তাঁর স্ত্রী কমলমণি যেমন ভাবে হাসতেন তেমনি জ্বলজ্বল করছেন বুক কেসের ওপরে, এখনও কৃষ্ণনগর থেকে আনা বিবর্ণ বিবেকানন্দ কোলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার পাশে একই সারিতে আলখাল্লা পড়া রবীন্দ্রনাথ, লম্বাকানের বুদ্ধদেব, চশমা নাকে গান্ধীজি হাতে ছোট্ট লাঠিটি ধরে পুতুল সেজে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে।

হ্যাঁ, জ্যোর্তির্ময় বাবুদের বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগরের পাশে, নদীয়ার এক গ্রামে, নাম কেচুয়াডাঙ্গা। তাই কৃষ্ণনগরের থেকে আনা পুতুলগুলি তিনি একই ভাবে সাজিয়ে রেখেছেন কাঁচের আলমারির মধ্যে। স্ত্রীর হাতের তৈরী একটি আসন ও হাত পাখা মাথার কাছে রাখা। রোজ নিজ হাতে ঘরের সব জিনিষ মন দিয়ে অনেকক্ষন ধরে তিনি যখন মোছেন, তখন মনে হয় পুজো করছেন। মাঝে মাঝে পুরোনো হারমোনিয়ামটাও বের হয় খাটের তলা থেকে ছেলেমেয়েদের তিনদিকে বসিয়ে স্ত্রী সন্ধ্যে বেলায় গান শেখাতেন –

“আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।।

বুকের মাঝে বিশ্ব লোকের পাবি সাড়া”।

বিয়ের পর চন্দ্রানীকে গান গাইতে বললে সে দুটি হিন্দি গান গেয়েছিল। গলায় বেশ দরদ আছে তাই তাকে একদিন হারমোনিয়াম বের করে দিয়ে বললেন – “এটা বাজিয়ে গাইবে মা”। এখন একই রকম আছে, খুব বড় কোম্পানী থেকে কেনা হয়েছিল, দেখো দেখো কী সুন্দর আওয়াজ।

চন্দ্রানী বলল – বাবা আজকাল কারুর আর বেলো করে গান গাইতে ভালো লাগে না। এই দেখো না মা আমার সঙ্গে ক্যাশিও মানে সিন্থেসাইজারটা দিয়ে দিয়েছে, ওতেই সব গান বাজাতে ভাল লাগে।

নতুন ধরণের পিয়ানোটিতে এতো রকমের সুর বাজে এতো ঋদম বাজতে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসাবে – জ্যোর্তির্ময় বাবুর খুব ভাল লেগেছিল। চন্দ্রিমা আসার পর ঘরে কত রঙ রূপ ও বাহার ফিরে এসেছে – প্রকাশও ফ্লাইট থেকে ফিরেই কত হৈ চৈ আনন্দ করছে – বড় ভাল লাগছে। এতো সুখের মাঝেও কমলমণির জন্যে বুকের মধ্যে চিনচিন করে ব্যাথা হয়, বেচারী কিছুই দেখে গেল না। ক্যান্সার তো কত লোকেরই হয় কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি সে যে চলে যাবে একথা জ্যোতির্ময় স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যাবার সময় তিনি চোখে জল, ঠোঁটে হাসি নিয়ে একদিন বলেছিলেন – “তুমি তো লক্ষীমন্ত পুরুষ, আমি জানি সংসারটা সব সামলে নেবে”। কথাটা মনে পড়লে এখনও জ্যোতির্ময় বাবুর বুকের মধ্যে বেহালার তারে মোচড় দেয়।

কিন্তু সব সুখ তো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সব ঘটনাও নিজের পছন্দমত বা ইচ্ছেমত ঘটে না। এক্ষেত্রেও হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।

সেদিন রবিবারের সকাল, বাড়িতে নতুন কম্পিউটার এসেছে, চন্দ্রানী জ্যোতির্ময় বাবুকে নিজের ঘরে বসে ইমেল করা শেখাচ্ছে। একবারে ছোট বালকের মতন কৌতূহলী বুড়ো ছেলেকে লিখে লিখে সবকিছু বোঝাতে বেশ মজা লাগছে চন্দ্রানীর। এত বয়সেও সবকিছু জানবার বা নতুন কিছু শেখবার আগ্রহ, এমন ভাল ছাত্র, বন্ধুর মত সহজ সাবলীল ব্যবহার সে কখনও কারোর মধ্যে দেখেনি। এতটুকু মেশিনের কি অসীম ক্ষমতা, মিনিটের মধ্যে সমগ্র বিশ্বকে মুঠোর মধ্যে করবার অসাধারণ শক্তি বৃদ্ধ শিশুকে মুগ্ধ করেছে, ঝুঁকে পড়ে টিচার পুত্রবধূর ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে তিনি “মাউস” ক্লিক করছেন, টাইপ করে মেয়ের সঙ্গে চ্যাট করছেন, – ভীষণ আনন্দ পেয়েছেন নতুন জগতে প্রবেশের অধিকার পেয়ে।

কিছুক্ষন আগেই কলিং বেলটা বেজে উঠেছিল, কে এসেছে খেয়াল করেননি, কাজের মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে এবং চন্দ্রানীর মা সোজা এসে দাঁড়িয়েছেন শ্বশুর বৌমার ঠিক পিছনে। “কম্পিউটারের” দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ ও যুবতীর কাণ্ড দেখে তিনি তো অবাক – তাই বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেই বললেন –

– “কিরে চন্দ্রা তৈরী হোসনি। আজ ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বাংলা নাটকের ফেস্টিভেল আছে না। সকালে অত কষ্ট করে কার্ড জোগাড় করেছি, তুই যাবি না নাকি”?

– “ওঃ মা এসে গেছো, এই দেখো না বাবাকে কম্পিউটার শেখাচ্ছি”।

-“হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কম্পিউটার তো আমাদের সাইবার ক্যাফের সুনীলদাকে বললেই এসে শিখিয়ে দিয়ে যাবে, তোমায় অত সময় নষ্ট করতে হবে না। যাও তৈরী হয়ে নাও তাড়াতাড়ি।

অপ্রস্তুত হয়ে ঠিকমতো শাট-ডাউন না করেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জ্যোতির্ময় বাবু। আর সেদিন থেকে ঘটে গেল কেমন যেন ছন্দ পতন।

প্রকাশ ফ্লাইট থেকে এলে এবার একদিন ঝগড়া হতে শুনলেন ছেলে-বৌয়ের। কারণ দু-দিনের জায়গায় চারদিন দেরী হওয়া। প্রকাশ বোঝাবার চেষ্টা করলো – “এয়ার ক্র্যাফট খারাপ হয়ে গিয়েছিল, দু-দিন ধরে হোটেলে বসে থাকতে আমাদেরই কি ভাল লাগছিল? কি বেকার তর্ক করছো?

চন্দ্রানীর মুখ ভার রইলো দু’দিন। পরের সপ্তাহে আবার বোম্বে থেকে ফিরে এলে সেই একই বাক বিতন্ডা।

– “তুমি আমাকে সময় দাও না, আমি ভীষণ বোর হচ্ছি”।

– “বোর হওয়ার কি আছে? বাড়িতে বাবা আছেন তোমার সঙ্গে সর্বদাই তো কথা বলছেন, রান্না করছেন, তাঁর দেখাশোনা করলেই তো সময় কেটে যাবে”। হালকা গলায় হাসি মুখে উত্তর দিয়ে যখন পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করছে প্রকাশ, ঠিক তখনি কানে এলো, সেই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া অপ্রিয় সত্যটা – যা চন্দ্রানীর মিষ্টি পিয়ানোর সুরের আওয়াজটাকে ভীষণ বেসুরো ব্যাঞ্জোর মত কর্কশ করে দিল।

“বাবা কি বুড়ো থুরথুরে, পঙ্গু কিম্বা কানা খোঁড়া নাকি? জোয়ান লোকের মতন দিব্যি সুস্থ সবল, ওনার আবার কি দেখাশোনার দরকার”?

তখনও সম্পূর্ণ ধৈর্য্য হারায়নি ছেলে একটু বিরক্ত ভরা গলায় বেশ জোরেই চেঁচিয়ে উঠল, – “সারাদিন তো মায়ের সঙ্গেও ঘুরে বেড়াচ্ছো, কোনো কিছুতেই তো মানা নেই আমাদের বাড়িতে, তাতেও খুশী নেই তোমার”? অকারণে এত ঝগড়া করছো কেন?

– “কি আমি ঘুরে বেড়াই? একথাও লাগানো হয়ে গেছে ওনার”? ক্ষুব্দ বেড়ালের মত স্বর পাল্টালো চন্দ্রানী। “বেশ করি মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই? বেশ করি। সারাদিন একটা আধবুড়ো লোক আশে পাশে ঘুর ঘুর করলে কার ভাল লাগে”।

এবার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ প্রকাশের গলায়। “স্যাট আপ, আর একটাও কথা শুনতে চাই না তোমার। ভাল না লাগে তো চলে যাও নিজের বাড়ি। I don’t want to see your face।

হতবম্ভ জ্যোতির্ময় বাবু দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মতন বাইরের বারান্দায়। নিজের সুটকেশ নিয়ে দুপদাপ আওয়াজ তুলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল চন্দ্রানী, মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই। বাধা দেবার, বোঝাবার সুযোগই পেলেন না তিনি। প্রকাশের ঘর অন্ধকার – একটা ইংরেজি গান বাজতে লাগলো সমুদ্রের ঢেউ আছাড় খাওয়ার মতন।

অনেক রাত্রে খাবার টেবিলে ঢাকা দিয়ে যাওয়া, ‘ঝি’-এর রাখা খাবারগুলো ফ্রিজে তুলতে তুলতে ভাবলেন তিনি, একী হয়ে গেল! ‘লো’ ‘বিপ’ দিয়ে টেলিফোনটা তখনই বেজে উঠল, এসটিডি-র কল বুঝে আস্তে করে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। আভার গলা – বাবা কেমন আছো? গলার কাছে জমে থাকা কান্নার ডেলাটাকে ঠেলে ভেতরে চালান করতে করতে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, জ্যোতির্ময় বাবু। কিন্তু আওয়াজ বেরুলো না। ফোনের শব্দে ওঘরে প্রকাশও তুলেছে রিসিভার। বাবাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে ফেললো –

-“হ্যালো দিদি আমি প্রকাশ বলছিরে, বাবা বোধহয় শুয়ে পড়েছেন। বলো তোমরা সব কেমন আছো?

– আমরা তো ভালোই আছি, তোরা – বাবা, তুই, চন্দ্রানী আমার কাছে কলকাতায় কবে আসছিস?

– এবার একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে জানালো প্রকাশ। “দিদি চন্দ্রানী আজ চলে গেল রে”।

– “সেকি কেন? কোথায়?

– প্রকাশ বোঝাতে লাগলো – দিদিকে বেশ অনেক্ষন ধরে, চুপচাপ শুনতে লাগলেন বাবা জ্যোতির্ময়।

– “মেয়েটা বড্ডো বোকা রে দিদি। বিয়ের দিনে যে সব পাইলট, এয়ার হোস্টেস বন্ধু-বান্ধবীরা এসেছিল তাদের হাসি, মজাক শুনেই ও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল। ওদের সুন্দর চেহারা ফ্রি মিক্সিং দেখে ওর মনে একটা inferiority complex grow করে। আর তার থেকেই আসে, insecurity।

– তুই বোঝাসনি? বেড়াতে টেড়াতে নিয়ে যাসনি?

– হ্যাঁ, দু’তিন দিন পরপর ফ্লাইট এলেই কোনো না কোনো কথায় ঝগড়া শুরু করতো। ওর অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে প্রথম প্রথম তো আমি হাসতাম, মজা পেতাম। তাতে ও আরো রেগে যেত, অহেতুক ভয়, সন্দেহের সঙ্গে এখন আবার শুরু হয়েছিল, আমি “বোর” হচ্ছি।

– সে কি রে আমাদের বাবার মতন লোক বাড়িতে থাকলে কেউ আবার বোর হয়?

– সেটা বলতেই তো আরও অশান্তি। এরকম মেয়েকে কেমন করে সহ্য করা যায় বলো দিদি। বাবাকে যে মেয়ে দুঃখ দেয়, সম্মান করতে পারে না, তাকে আমি কিভাবে স্ত্রী বলব?

প্রশ্ন, তর্ক-বাদ বিতণ্ডার সূত্রপাত তাহলে প্রথম দিন থেকেই। কুয়াশা মেঘ, ঝড়, বজ্রপাত, বর্ষণ, প্রাকৃতিক ঘটনার মতন জীবনেও তো টক, ঝাল, মিষ্টির মতন এসব মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ, ভয়-সন্দেহ সবই থাকবে, তাহলে ছাড়াছাড়ি এত তাড়াতাড়ি, তাও বাবার উপস্থিতি নিয়ে। কেমন যেন অসহায় বোধ করতে লাগলেন তিনি। এই ছয় মাসে তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহপূর্ণ ব্যবহার, মায়ের মতন নিজে হাতে মাছের চপ, রায়তা দইবড়া বানিয়ে খাওয়ানো, শিশুর মতন আনন্দে দাবা, লুডো খেলা, কম্পিউটার শেখা সব মিথ্যে হয়ে গেল একমিনিটের ঝগড়ায়, দুই স্বামী-স্ত্রীর কচকচিতে দুধে এক ফোঁটা লেবুর রস ফেলার মতন কেটে গেল! হঠাৎ কম্পিউটারের কথাটা মনে আসতেই বুঝতে পারলেন সহজ সরল মেয়েটির মানসিক ভারসাম্য ঠিক না থাকার পেছনে মায়ের একটা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। একদিন ওদের একটা কথোপকথনও শুনেছিলেন তিনি, এখন তার মানেটা পরিষ্কার হল। – “এসব আধবুড়োগুলোর আবার একটু আলুর দোষ থাকে। ‘মা’ সাবধান করছিলেন মেয়েকে।

‘জ্যোতির্ময় বাবু’ ভেবেছিলেন বোধহয় কোনো বাসযাত্রীর সম্বন্ধে কথা হচ্ছে বা দোকানে বাজারে ধাক্কাধাক্কি করা মেয়েদের গায়ে পড়া কোনো লোকের সম্বন্ধে মেয়েলি আলোচনা চলছে তাদের। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল, “আধবুড়ো” বলতে তাকেই উল্লেখ করেছিলেন মা। মাথা কান গরম হয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল তাঁর, ঘুমের ওষুধ খেয়েও দু চোখের পাতা এক করতে পারলেন না তিনি।

আলো জ্বালিয়ে ‘স্ত্রীর’ ছবির দিকে তাকাতেই হু হু করে বন্যার জল যেন হঠাৎই ছাপিয়ে এলো, চোখের দুই কিনারা বেয়ে। -“তুমি তো ওপর থেকে দেখছো মিনু, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তোমার ছেলে-মেয়ের সংসারটা শুধু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। জীবনের শেষ সময়ে এসে শেষে এমনি করেই কাঁচের বাসনের মতন সব ঝনঝনিয়ে ভেঙে যাবে? “তোমার পরিবারের সব শ্রী” এমনি করে “বিশ্রী” হয়ে যাবে? আমি কি এমনি হতচ্ছাড়া?

দ্বিতীয় অধ্যায়

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। কী একটা ছুটির জন্য স্কুল কলেজ বন্ধ! রাস্তা ঘাটও ফাঁকা। প্রকাশ চেন্নাই গেছে ‘দু’ দিন হল, আজ বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। অন্য দিনের মতন সন্ধ্যা এসে সব বাসন মেজে ঘর মুছে চলে গেছে। বিকেলে এসে রুটি তরকারি বানিয়ে দেবে। এ বেলায় একটু দলিয়ার খিচুড়ি চাপিয়ে দেবেন তিনি সব সব্জি ফেলে দিয়ে। রোজকার মতন স্নান করতে যাবার আগে ডাস্টার হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাড়া বাড়ি একা একা। টিভি, কম্পিউটার, কাঁচের আলমারী, টেলিফোন, ডাইনিং টেবিলের সানমাইকা চকচকে করার পর ফটোগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। প্রকাশ আর চন্দ্রানীর হাসিমুখ দুটো ওদের বেডরুমের দেওয়ালে এখনও শোভা পাচ্ছে পাশাপাশি। চন্দ্রানীর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ কী মায়া। এতো লাবণ্যময়ী সরলতা যার, সে কেমন করে এমনভাবে নিজের সংসার ছেড়ে হটাৎ চলে যেতে পারলো, কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেন না তিনি। ওদের ঘরের দরজাটা টেনে দিয়ে স্ত্রীর ছবিটা মুছতে লাগলেন অত্যন্ত আদরের সঙ্গে। মনে পড়ল, এই ডাস্টিং করা নিয়ে কমলমণি কত খেপতেন। ছুটির দিন সকালে রুটি আলুরদমের জল খাবার খাওয়া শেষ হলেই ঝুলঝাড়া আর ঝাড়ন হাতে ধরিয়ে বলতেন “ঐ দেখো কত ধুলো, তোমার ঝারণের স্পর্শ পাওয়ার জন্য কাঁদছে”। তিন ছেলেমেয়েই টিকটিকি দেখে ভয় পেতো ছোটবেলায়। তাই ঝাঁটার ডগায় ডিমের খোলা লাগিয়ে সারা বাড়ির দেওয়াল টিকটিকি শূন্য করাও তাঁর একটা বিরাট কাজ ছিল। সারাক্ষণই বাড়ির কাজ করা, মাসকাবারী তোলার আগে তাক পরিষ্কার করা কৌটো কাটা মুছে, তেলচিটে জালি ফ্যান সাফ করায় সময়টা বেশ ভালোই কেটে যেত স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। রান্না ঘরে এসে চায়ের প্যাকেট থেকে চা পাতা ঢালতে লাগলেন তিনি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। ভাবছেন তিল তিল করে গড়ে তোলা এতো সুন্দর সংসারটা কার কাজে লাগবে। ছেলে-বৌয়ের মধ্যে যদি মিল না থাকে, নাতি-নাতনিদের কলকলানিতে বাড়ি যদি মুখর না হয়; রকমারি রান্নার গন্ধে এক্সজস্ট ফ্যান-এর হওয়াটা যদি পাশের বাড়িতে খবর না পৌঁছে দেয় যে হিং দিয়ে ডাল সাতলাচ্ছে প্রকাশের বৌ কিম্বা পাঁচফোড়ন ভেজে সুক্তোতে ঢালা হ’ল তাহলে আর বাঙালিদের বাড়ি কী হ’ল। শীতের দিনে খেজুর গুড়ের পায়েস বানিয়ে যখন কমলমণি টেবিলে এনে রাখতেন তখন সারা ঘর যেন অপূর্ব মিষ্টি গন্ধে ‘ম’ ‘ম’ করতো। এই ক’মাস চন্দ্রানীও লাফিয়ে বেরিয়েছে –

“বাবা এত সুন্দর টেস্ট হয়েছে না হাত চাটতে ইচ্ছে করছে তরকারী খেয়ে”।

প্রকাশ একদিন বলেছিল – “মা চলে গেলেও বাবা কোনোদিন আমাদের খাওয়ার কষ্ট পেতে দেননি”। মাংস-বিরিয়ানি খেয়ে সেদিন চন্দ্রানীর বাবাও বললেন – “এবার বেয়াইমশাই আপনি একটা হোটেল খুলুন”। আপনার এখানে এলে জিভের স্বাদই পাল্টে যায়। ভদ্রলোক খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মোটা হয়ে যাচ্ছেন বলে বাড়িতে স্ত্রী বড্ড ধরা কাট করেন। ওনার ভালোর জন্যই। চন্দ্রানীও খুব বকুনি দেয় বাবাকে বাচ্চার মতন; জ্যোতির্ময় বাবুর বেশ মজা লাগে।

জানলা দিয়ে বাইরের আকাশে থরে থরে জমে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে, এবার ঘরে আসতেই মনে পড়ল বৌ-এর পেছনে ঘুর ঘুর করা, আর রান্না ঘরের কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকার “হবি” নিয়ে বন্ধু বান্ধবেরাও কত সময় ঠাট্টা করতো তাঁকে। কিন্তু স্ত্রী প্রেসারের রুগী তারপর হার্টের অসুখ টা ধরা পড়ল, যখন একটু কাজ করলেই হাপাতে লাগলেন তখন থেকেই গৃস্থলীর কাজে আরও বেশি করে লেগে পড়েছিলেন তিনি। “ভাঁড়ার” গোছানোর কাজ, কখন কি আনতে হবে, কোন কোম্পানীর তেল, সাবান নীল আনলে ভাল হয়, কোন হ্যাঙ্গারে কোথায় কাপড় মেললে শার্ট, প্যান্ট, জিন্স এর জ্যাকেট তাড়াতাড়ি শুকোবে সব তার খেয়াল থাকতো। ছেলেমেয়েদের ইউনিফর্মগুলোও রাত্রি বেলায় ইস্ত্রি করতে উদ্যত হতেন। ছেলে মেয়েদের পড়া, গান বাজনা, সাঁতার শেখা, কম্পিউটার ট্রেনিং নেওয়াতে ব্যস্ত থাকতে হতো তবে বাবা মায়ের সাথে তারাও সর্বদায় সহযোগিতা করেছে। কখনও কোল্ড ড্রিঙ্কস, আইসক্রিম খাবার ঝোঁক পর্যন্ত তারা করেনি। খুব সহজে ও স্বাভাবিকভাবে আদর স্নেহ ও value education দিয়ে দুজনে মিলে মানুষ করেছিলেন।

তাঁর তিন সন্তানকে মায়ের চারিদিকে গোল হয়ে বসে তারা সবাই একসঙ্গে পিঠে গড়েছে, সিঙ্গাড়ার পুর ভরেছে, গাজর কুরে দিয়েছে গাজরের হালুয়া খাবার জন্য। বাংলাদেশে না থেকেও তারা ছুটির দিনে মাকে মোচা ছাড়িয়ে বা নারকেল কুড়ে দিয়ে বাঙালি ট্রেডিশনটা বজায় রাখতে পেরেছে। তাই মডার্ন আবহাওয়ায় থাকলেও প্রকাশ এখনও ছুটির দিনে লাউ ডাটা চচ্চড়ি চিবুতে চায়। তবে কাজের মেয়েদের হাতে কি আর সে রকম স্বাদ হয়! “ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং একটানা টেলিফোনের সুতীব্র আওয়াজে এবার নস্টালজিয়ার সূত্রটা ছিড়ে গেল, তাড়াতাড়ি উঠে রিসিভারটা কানে দিলেন তিনি। – হ্যালো।

কিছুক্ষন কোনো আওয়াজ নেই। আবার হ্যালো কে কথা বলছেন? এবার খুব আস্তে পাখির ডাকের মতন অদ্ভুত গলায় কে যেন বলল – “বাবা”।

– কে, আভা না প্রভা? আমেরিকা জাপান থেকে ফোন করলে আভা বা জামাইয়ের গলাও এরকম কয়েক সেকেন্ড পরে পরে ভেসে আসে, তাই একটু থেমে তিনি একটু জোরেই বললেন – “হ্যাঁ বলো মা, বাবা বলছি”। – আরও একটু বিরতি।

– “কি রে কি হলো? কেমন আছিস? কথা বলছিস না কেন আভা”? – আবার চিন্তার সুর জ্যোতির্ময় বাবুর উৎকণ্ঠিত গলার স্বরে।

– “বাবা আমি চন্দ্রানী বলছি”।

– বৌমা? তোমার আওয়াজটা এরকম লাগছে কেন মা! এত দিনে মনে পড়ল বুড়ো বাপটাকে? অভিমানের প্রচ্ছন্ন আভাস তাঁর কথায়।

– “বাবা বাবা… আমার মা এইমাত্র” গলা বুজে এলো চন্দ্রানীর। কেন যেন কথা বলতে পারছে না মেয়েটা। একটা গানের কলি হটাৎই কানে বাজলো তাঁর “হায়রে ব্যাথায় কথা/যায় ডুবে যায় যায়রে”।

– বৌমা কি হয়েছে তোমার মার? তোমার বাবা কোথায়? ওনাকে ফোন দাও।

– এবার বাক্যটা কোনোরকমে শেষ করলো চন্দ্রানী – “বাবা, মা এইমাত্র চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে”।

চিত্তরঞ্জন পার্কে পৌঁছাতে (ময়ূর বিহার থেকে “অটো” নিয়ে) প্রায় ঘন্টা খানেক লেগে গেল, নিজামুদ্দিন পুলের ওপর ট্রাফিক জ্যাম। প্রগতি ময়দানে এখনো ট্রেড ফেয়ার চলছে।

ততক্ষনে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন যারা ঐদিকে থাকেন অনেকেই এসে গেছেন। জ্যোতির্ময় বাবুকে দেখে শিশুর মতন ডুকরে কেঁদে উঠলেন চন্দ্রানীর বাবা। পাশে বসতেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁর হাতদুটো। বড় অসহায় মনে হল তাঁকে। ‘স্ত্রী’ বিয়োগ যে কি অসহনীয় দুঃখের তা জ্যোতির্ময় বাবুর চেয়ে বেশী আর কে বুঝবে। কিন্তু অকালে স্ত্রী চলে গেলেও সংসারটাকে ‘শ্রী’ হীন হতে দেননি তিনি কোনোদিনই। নিজের দুঃখ চেপে রাখার মতন অসম্ভব সহ্যশক্তি আছে তাঁর মধ্যে কিন্তু এই ষাট হয়ে যাওয়া মানুষটি অত্যন্ত সরল অপটু, স্ত্রীর ওপর এতদিন সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন তিনি। স্বামীকে এক গ্লাস জল গড়িয়েও খেতে হয়নি কোনোদিন। এক কাপ চা করেও খাননি তিনি। নিজের বই আর বন্ধুদের সঙ্গে তাস নিয়ে সময় কাটিয়েছেন এক সুরক্ষিত জগতে। এই নিষ্প্রাণ দেহের দিকে তাকিয়ে এবার জ্যোতির্ময় বাবুর বড় অদ্ভুত অনুভূতি হল। যে ভদ্রমহিলা অতি সুদক্ষ হাতে সংসারের সব কাজ সামলাতেন, চাকরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে মাছের, সব্জির বাজার আনতেন, ড্রাইভারকে বকে বকে গাড়ির চাকাগুলো পর্যন্ত চকচকে করে ধোয়াতেন, ছেলে, মেয়ে, স্বামী কি পরবে, খাবে, কোথায় যাবে, বেড়াবে, এমনকি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোবে – সে সব খুঁটি নাটি বিষয়েও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লক্ষ্য রাখতেন তিনি, এভাবে নিশ্চুপ শান্ত মুদিত নয়নে নাকে তুলো গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। মাটিতে কখনো তাঁকে বসতে দেখেননি তিনি। আজ পাড়ার লোকেরা এসে তাঁকে খাট থেকে মাটিতে একটা মাদুরে শুয়ে দিয়েছেন। চন্দ্রানী বলে খাবার পর একদিন ওর বাবাকে ফোনে ধরবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সেদিন এই ভদ্রমহিলা কত দাপটের সঙ্গে বললেন –

“আপনার ছেলের যখন আমার মেয়ের জন্য সময় নেই তখন মেয়ে আপনার বাড়িতে থেকে কি করবে? আমার কাছে থেকে সে আরো পড়াশোনা করবে”।

এই চার পাঁচ মাস আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। জ্যোতির্ময় বাবু বুঝেছিলেন বাবার যেখানে কোনো say নেই তখন লাভ হবে না বারবার ফোন করে। পাড়ার মহিলারা এবং চন্দ্রানীর মাসীও যাঁরা পাশেই B-Block এ থাকেন এসে সিঁদুর আলতা পড়াচ্ছেন। ফোলাফোলা চোখ, খোলা চুল সাধারন ছাপা শাড়ি পরনে, সকলের কথামত কখনও চন্দন পিঁড়ি, কখনও গঙ্গার জল আনতে ব্যস্ত চন্দ্রানীমাকে বড় ক্লান্ত ও অসহায় লাগছে। জানলেন কাল রাত থেকেই সবাই জেগে বসেছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই তিনি হটাৎ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একবার কাছে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা। আলতার শিশিটা খুলতে গিয়ে সারা হাতের তালুতে লেগেছে লাল রঙ। শ্বশুর আলতো করে হাতটা মাথায় রাখতেই মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। আর তার সারা মুখটা লালে লাল হয়ে গেল – যেন বিজয়ার দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন হল।

তৃতীয় অধ্যায়

শ্রাদ্ধের দিনটাতে ছেলে প্রকাশকে অনেক কষ্টে রাজী করিয়ে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলে বাবা জ্যোতির্ময়। অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে কথা বললেও চন্দ্রানী-প্রকাশকে একবারও মুখোমুখি হতে দেখেননি তিনি। এই দশদিন ধরে অনেক কথায় তাঁর কানে গেছে। সমগ্র পরিবারের ভদ্রতা সভ্যতার মুখোশও খসে পড়তে দেরী লাগেনি। যেমন চন্দ্রানীর বড় মাসী তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বেশ কয়েকটা কটূক্তি করেছেন যা তার মনে তীরের মতন বিঁধেছে।

– “কি রে এ সব মেহমানদের রোজ রোজ এসে বসে থাকার কি দরকার তা তো বুঝি না বাপু” – কিম্বা ছোট মাসীর সরাসরি প্রশ্ন – “কি রে তোদের আসল খবরটা কি বলতো? প্রকাশ ডিভোর্সের মামলা করার আগেই তুই করে দে। খোর পোষ নিতে ছাড়বি না কিন্তু। দিদি নেই, কিন্তু আমরা তো আছি”।

চন্দ্রানী ইশারায় চুপ করতে বলেছে মাসীদের কিন্তু তাঁরা মনে করেন “স্পষ্ট কথায় কষ্ট নেই”।

– “আমাদের আবার খোলামন, ঢাক গুড় গুড় একদম পছন্দ নয়, আর দিদির কাছে সবই তো শুনেছি আমরা”।

কিন্তু তবু তিনি প্রায় রোজই গেছেন ঐ বাড়িতে। বেয়াইমশাইও যেন তাঁকে দেখে অনেকটা শান্তি পান।

চন্দ্রানীর দাদা ক্যালিফোর্নিয়ার থেকে এসেছে মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এবং পরিষ্কার বলে দিয়েছে বাবাকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার স্ত্রী ডক্টরেট করছে আর তাঁরও ভীষণ খারাপ সময় চলছে এখন। ১১/৯ এর পর থেকে ওদেশে IT মার্কেট ডাউন হয়ে গেছে। প্রচুর লোকের চাকরি চলে যাচ্ছে, তাকে হয়তো কোম্পানী বাড়ি সব বদলাতে হবে, তাই চন্দ্রানী তো আছেই। বাবাকে সামলে নেবে। অথবা যদি কোনো হোমে রাখা যায়, তাই ভাবা হচ্ছে। এদিকে বাঁকুড়া থেকে চন্দ্রানীর এক কাকা এসেছেন। দাদাকে নিয়ে যাওয়ার তাঁর খুব ইচ্ছে। তাতেও চন্দ্রানীর বৌদি remark করলেন ইংরেজিতে – actually these people went to grab his property so this uncle is so much interested to look after his brother। সায় দিলেন চন্দ্রিমার মামা – “Chittarajan park is very costly now if you sell this house to the promoter they will give you crore rupees”।

জ্যোতির্ময় বাবুর পাশে বসে নিরীহ গ্রাম্য মানুষটি তখন পুরোহিত মশাইকে একটা কাগজে পিতা, প্রপিতামহদের নাম লেখাচ্ছিলেন। সব কথাই যে কাকার কানে যাচ্ছিল তা বোঝা গেল, যখন দাদার কাছে এসে ক্রুদ্ধ গলায় তিনি বলে উঠলেন – “তুমার সম্পত্তির লেইগ্যে ইখানে আসি নাই দাদা, তুমাকে ভালোবাসি বলেই আইছিলাম। যেইত্যে হবেক নাই আমার সঙ্গে – উয়াদের মতন আমরা ইংরেজি বলতে লারি ঠিক কিন্তু বুইজতে তো পারি। বৌদিদি তো কখনোই তুমার কাছকে এইসত্যে দিলেন নাই, আবার ইয়াদের কথার বহর দেখ না, ক্যানে অসটা রাখতে জায়গা লাই”।

চিত্তরঞ্জন পার্কের বেশির ভাগ লোকই পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা ছিলেন এককালে তাই এখনও তাঁদের অনেকের ভাষায় অন্যরকম টান আছে। এই কাকার হটাৎ বাঁকরে বোলি শুনে একটু অবাক লাগলো জ্যোতির্ময় বাবুর। ক্রুদ্ধ মানুষটিকে হাত ধরে শান্ত করে বাইরে নিয়ে এলেন তিনি। শিবমন্দিরের চাতালে একপাশে বসে গল্প শুরু করলেন, জয়রামবাটি, কামারপুকুরের। ইনি চন্দ্রানীর বাবার মামাতো ভাই। বিষ্ণুপুরের বনেদি পরিবার। জমি জমা, পুকুর স্বচ্ছল অবস্থা তাঁর। পিসিমা মানে চন্দ্রানীর ঠাকুমাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় এই দুই মামাতো পিসতুতো ভাই একসঙ্গে খেলেছেন পড়েছেন। চন্দ্রানীর বাবারা বাংলাদেশ থেকে চলে এলে মামা বাড়িতেই মানুষ। খ্রিষ্টান কলেজ থেকে ইংরাজি সাহিত্যে বি.এ. পাশ করে তিনি দিল্লী চলে আসেন। কারন তখন তাঁর বাবা হিন্দু কলেজে চাকরী পান। বৌদির মৃত্যুর খবর পেয়েই ঐ মামাতো কাকা ছুটে এসেছেন, দাদার শোক সন্তপ্ত পরিবারকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে। আর এভাবে সম্পত্তির লোভে আসবার নির্লজ্জ অভিযোগে সরল মানুষটা দুঃখে ক্ষোভে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। চন্দ্রানী যে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে সে কথা তিনি জানেন না। তাই তার শ্বশুর জ্যোতির্ময় বাবুকে তাঁর বড় আপন বলে মনে হল। বেয়াইমশাইও করুণ চোখে যখন বললেন, – “শ্রাদ্ধের কাজকর্ম খাওয়া দাওয়াগুলো একটু সামলে দিন দাদা”। তখন তাঁর কথা ফেলতে পারলেন না তিনি। প্রকাশের উপস্থিতিটা বেয়াইমশাইয়ের কাছে যে কত আনন্দের হয়েছে তা জ্যোতির্ময় বাবু উপলব্ধি করলেন কেননা তিনিও মেয়ের বাপ। মেয়ে জামাই-এর ছাড়াছাড়ি হলে তিনি কি স্থির থাকতে পারতেন। চন্দ্রানীর বাবাও যে এই বিচ্ছেদটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রীর ভয়ে চুপ ছিলেন সেটা বেশ পরিষ্কার বোঝা গেল সেদিন।

নিয়ম ভঙ্গের পর সবাই চলে গেল একবার চন্দ্রানী মাকে একা পেয়ে শ্বশুর প্রশ্নবানটা ছুড়ে দিলেন, “কি মা কবে যাবে নিজের বাড়ি”? মুখ নিচু করে বৌমা শুধু পাল্টা প্রশ্ন করলো শুকনো মুখে, – ” আমার বাবাকে কে দেখবে বলো”? এত স্বাভাবিক রূঢ় সত্যটার সামনে এসে আর কোনো কথা খুঁজে পেলেন না তিনি।

বাঁকুড়ার কাকাকে চন্দ্রানীর দাদা অনুরোধ করেছে আপাতত মাস ছয়েকের জন্য তাঁর কাছে গ্রামে নিয়ে গিয়ে রাখতে। চন্দ্রানী বি.এড পড়ায় চান্স পেয়েছে, সেও হোস্টেলে চলে যাবে। টাকার সমস্যা হবে না কারন মা ছেলের পাঠানো ডলারের বেশ ভালো ভাবেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অতএব নিয়ম ভঙ্গ একটা সংসারের সমস্ত নিয়ম কানুনকে ভেঙে চুরমার করে একটা বৃদ্ধ মানুষের জীবনে যেন বুলডোজার চালিয়ে দিল।

সন্ধ্যে বেলায় বেয়াইমশাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সেই ভোলা ভালা সহজ সরল অধ্যাপক মানুষটি তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন কান্নার দমকে সারা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠলো তাঁর। এই মানুষটার মায়ায় এই এগারো বারোদিন মান অপমান, অভিমান সব জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি এই বাড়িতে এসেছিলেন। আজ কেমন যেন অব্যক্ত ব্যাথায় বুকের ওপর একটা ভীষণ ভারী পাথর চেপে বসতে লাগলো প্রকাশের বাবা জ্যোতির্ময় বাবুর। বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন, অন্ধকার বারান্দায় একা বসে আছে ছেলে আকাশ ভরা তারার মাঝে নিজের অস্তিত্বের সন্ধানে। দেবব্রত বিশ্বাস গান শোনাচ্ছেন – যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝরে। রাত্রের খাওয়া দুজনে ভীষণ স্তব্ধতার মধ্যে সারলেন, নম নম করে। নীরবতার নিশ্চিদ্রতায় বাড়ির আবহাওয়াও হয়ে উঠল অদ্ভুত অস্বাভাবিক। এটাই বোধহয় সেই গানের কলির মতন সত্য – মনে হল তাঁর “ঘর ভরা মোর ‘শূন্যতা’ যে বুকের পরে”।

ক’দিন ধরে জ্বর হওয়ায় অফিসে যায়নি প্রকাশ। চুপচাপ শুয়ে আছে নিজের ঘরে। বাবার মৌনতার সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন বোবা হয়ে গেছে। কথা বলার শুধু নয়, ভাবার ক্ষমতাও যেন লুপ্ত হয়ে তার মনটা অবশ করে দিয়েছে। ছোট থেকেই বেশী ভাবুক বা আবেগ প্রবন নয় সে, খেলাধুলা, হৈ চৈ শান্তিপূর্ণ বাড়ির বাতাবরণে খুব স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দে গাছের মতন বেড়ে উঠেছে ছেলেটি। মায়ের মৃত্যু তাকে বিচলিত করলেও বাবা বা দিদিদের স্নেহ ও আদরের ছত্রছায়ায় বিশেষ ভাবে আলোড়িত করতে পারেনি এবং অভাব তাকে কখনও বুঝতে দেওয়া হয়নি। হঠাৎ এত পছন্দ হওয়া ভালো লাগা মেয়েটি যাকে সে শুধু স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেনি, প্রেয়সীর রোমান্সে আপ্লুত করতে চেয়েছিল, সারাজীবন যার রক্ষণাবেক্ষণের, ভাত কাপড়ের ভার নেবার জন্য অগ্নি সাক্ষী করে যে শপথ নিয়েছিল হটাৎ তাকে এমন করে যে হারাতে হবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

আজ সকাল থেকেই ভাবছে দিদিকে একবার ফোন করবে কিন্তু বিছানা ছেড়ে বাইরে বসে চা খেয়েও আবার শুতে ইচ্ছে করলো তার। কিছু ভালো লাগছে না, খবরের কাগজ নিয়ে তাই গা এলিয়ে দিল সে সোফায়।

স্বর্গীয় শাশুড়ির কাজের দিনে কেবল বাবার কথাতেই কি প্রকাশ শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল! না চন্দ্রানীর জন্য ভীষণ মন কেমন করছিল তার। কিন্তু ওদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে সারাদিনে একবারও ওকে সে একা পায়নি। একবার চোখাচোখি হলেও মেয়েটা কাছে আসেনি, কেমন যেন ভয়, লজ্জা বেদনা বিদুর সেই চোখ দুটো বারেবারে মনে পড়ছে তাই। সেই ঝকমকে সেজে থাকা, বাড়িতেও লিপস্টিক লাগানো গোলাপি ঠোঁট ফুলিয়ে যখন তখন অভিমান করা, একটু তর্কবাগিনী মায়ের মুখের ঝাল খাওয়া, সন্দেহ আর অশান্তির দোলায় অকারণে দোল খাওয়া মেয়েটা মায়ের মৃত্যুটাতে ভীষণ ভাবে আঘাত পেয়েছে। তার বিব্রত, নৈরাশ্য পীড়িত চেহারা অনেকটা ডানাকাটা পাখির মতন অসহায়। তার বিষন্নতা, যন্ত্রচালিতের মতন কাজ করে যাওয়া, বাবাকে ওষুধ খাওয়ানো, আত্মীয় স্বজন প্রবাসী দাদা সবাইকেই যথারীতি সম্মান দেওয়া, শ্রাদ্ধবাসরে পুরোহিত মশাইকে ঠাকুর ঘর থেকে কখনও গঙ্গাজল, কখনও চন্দন কাঠ ইত্যাদি যোগান দেওয়া, সবই সে করে যাচ্ছে দম দেওয়া পুতুলের মতন। মাসী-পিসি, দূর সম্পর্কীয় দিদি বৌদিদের একই প্রশ্নের একই রকম উত্তর আবেগহীন গলায় দিয়ে যাচ্ছে, অনেকটা টেপরেকর্ডে ধরে রাখা একই গতে। “মা’ কেমন করে কখন অসুস্থ হলেন ,কোন হাসপাতালে কখন কি ধরণের চিকিৎসা হ’ল, ক’টার সময় মারা গেলেন? এইসব একই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত কেউ কেউ তার ব্যক্তিগত জীবন, ভবিষ্যৎ নিয়েও খোঁচা দিতে ছাড়ছেন না, হয়ত সেই কারনেই বেশ গম্ভীর মুখে কাজ করে যাচ্ছে সে, কাঁদার অবকাশ নেই। শ্বশুরমশাই প্রকাশের হাত দুটো ধরে একটু চাপ দিয়েছিলেন শুধু। প্রণাম তিনি কোনোদিনই করতে দেননি জামাইকে। একটু ঝুঁকলেই হাত দুটো ধরে নিজের বুকে টেনে নিতেন। আজ আর ঠিক সেইভাবে বুকে টানতে অসমর্থ বৃদ্ধ অধ্যাপক। প্রকাশের উপস্থিতিতে কেমন যেন এক দিশেহারা বিহ্বল হয়ে পড়লেন, কিন্তু সবাইকার চোখ তাঁর ঐ সুদর্শন জামাইয়ের দিকে থাকায় মুখে কিছু বলতে পারলেন না, শুধু হাতের ওপর চাপটা অনুভব করে প্রকাশের মনে হল – আঙুলেরা বোধহয় কখনও কখনও কথা বলে। একটু পরশ সামান্য উত্তাপ জমাট বরফের মধ্যেও বুঝি এমনি করে ফাটল ধরায়। আর স্নেহমমত্বের তথা ব্যাকুল আবেগের ফল্গু স্রোত কঠিন পাথরের মতন স্তব্ধ জলের মধ্যে সৃষ্টি করে তরল কোমল ঝর্ণার। যা খুব ধীরে ধীরে ঝির ঝির করতে করতে বেরিয়ে আসে স্বপ্ন ভঙ্গ নির্ঝরের মতন। মুখ নিচু করে সে ভাবতে লাগলো, স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে প্রথমে হালকাভাবে পরে সিরিয়াস হয়ে অনেক কথা কাটাকাটি করেছে সে। আত্ম অভিমান, অহং বোধ বা দাম্ভিকতা কিনা জানে না, কিন্তু সম্মানে আঘাত লাগায় অনেক অপ্রিয় কথা শোনাতেও বাধ্য হয়েছে সে কিন্তু এই শিশুর মতন বৃদ্ধ শ্বশুরের সঙ্গে কোনোদিনই মুখোমুখি তার কোনো তর্ক বিতর্ক হয়নি। আজকে কেমন যেন অপরাধী লাগছে নিজেকে। এনার কথা তো একবারও ভাবেনি, এনার অসহায়তা, প্রতিবাদ করার অক্ষমতা, অসম্ভব সারল্য ও স্ত্রীর প্রতি নির্ভরতার কথা আজ সে অন্য দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে পারলো। কেননা এই বৃদ্ধ শিশুটিতো সব সময় তাঁর জামাইকে ‘বাবা’ বলেই সম্বোধন করতেন। আর ওঁদের বাড়ি যখন ও গেছে, খাওয়া হয়ে গেলেই নিজে তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মেয়েকে বলতেন – “ওরে ওকে কিছুক্ষন বিশ্রাম করতে দে। কতদূর ফ্লাই করে এসেছে”। প্রকাশের ইচ্ছে করছিলো ওনাকে আজ বাচ্চার মতন আদর করে বুকে টেনে নিতে।

এবারে লক্ষ্য করলো সে রান্নার লোকেদের কাছে একটা চেয়ারে বসে থাকা নিজের বাবাকে। একজন গ্রাম্য মতন মামা বা কাকার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলছেন তিনি। সর্বদা সোজা হয়ে বসেন তিনি। কিন্তু আজ তাঁর ঋজু দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে, কপালে বারবার হাত যাচ্ছে। খুব সম্ভব মাথা ব্যাথা হচ্ছে। সবসময় ধপধপে জামা-কাপড় পরার অভ্যাস তাঁর। আজকের পাজামা-পাঞ্জাবীটি ময়লা, চুলও রুক্ষ এলোমেলো। ক্রমাগত দশদিন ধরে রোজ আসছেন তিনি এই বাড়িতে। প্রথমে খবরটা পেয়ে প্রকাশ বুঝে উঠতে পারেনি কি করা উচিৎ তার। যে স্ত্রীর সঙ্গে এই ক’মাস ধরে যোগাযোগ নেই, সম্ভবতঃ তাকে অক্ষম স্বামী সাজিয়ে ওরা ডিভোর্সের কেস করবে অথবা বাবার থেকে আলাদা করে নেবার পরিকল্পনা চলছে তাদের বাড়িতে। অভিসন্ধি করা হয়েছে তাকে “ময়ূর বিহার” ছেড়ে “গুরগাঁও” বা পালাম বিহারে আলাদা বড় ফ্লাট নেওয়ার জন্য। ঈস্বরতুল্য বাবার সম্বন্ধে মন বিষানোর চেষ্টাও কম হয়নি। সেখানে কেন যাবে সে? তাদের বাড়িতে কে মরলো বা বাঁচলো প্রকাশের জানবার ইচ্ছে নেই। কিন্তু যখন বাবা বললেন – “সব সময় মনে রাগ অভিমান পুষে রাখতে নেই বাবা। আজ একবার মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো তোমার কর্তব্য। এখনও তো ডিভোর্স হয়নি তোমাদের। তখন গিয়েছিল সে তাদের বাড়িতে। সেই শাশুড়ির মৃত্যু যিনি প্রথমে মায়ের অভাব পূর্ণ করবার ভান করেছিলেন, প্রথম তিন মাস প্রকাশ প্রকাশ করে পাগল হয়ে যেতেন, জামা-কাপড়, জিনিষ উপহারে ভরিয়ে দিতেন বাড়ি। তিনিই যখন একদিন আদো আদো গলায় বললেন – “তোমাদের বাড়িটা পুরোনো দিনের এর পরিবেশটাও কেমন যেন সব লোয়ার মিডল ক্লাস লোকের বাস। তুমি এত ভাল এয়ার লাইন এ চাকরী করো, এত টাকা মাইনে পাও, এদিকে সাউথ দিল্লীতে একটা ফ্লাট নাও”। তখন প্রকাশ নয় চন্দ্রানীও বলে উঠেছিল – “না না আমাদের পাড়াটা খুব ভালো। আর বাবার অনেক কষ্টের তৈরী বাড়ি। মায়ের স্মৃতি জড়ানো, ওখান থেকে যাবার কথা তো ভাবতেই পারি না”।

চন্দ্রানী বলল – “ছাদটাও বড় সুন্দর মা, আমার তো খুব ভালো লাগে”। আবার ক’দিন পরে শুরু হলো, অন্য যুক্তি – বাবা ওখানেই থাকবেন, তবু ভবিষ্যতের জন্যে তোমাদের তো একটা আলাদা প্রাইভেসি চাই, ওখানে তো খুব ভালো স্কুলও সেরকম নেই। বাচ্চা-কাচ্চা হলে পড়াবে কোথায়? এর জবাবও চন্দ্রানী দিয়েছিল – “না মা, এখানে ডিপিএস কলম্বাসের বাস শুধু নয়, সব বড় স্কুলের বাস আসে। আর আমাদের বাড়ির কাছেই তো ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমস হবে। মেট্রো ট্রেনও এসে যাবে। বাড়িতে বাবা কত সুন্দর বাগান করেছেন, আমার তো খুব ভালো লাগে”।

কিন্তু তার ক’মাস পরে ওনার মনে হতে লাগলো – “দেখো প্রকাশ তোমার এত কাজ, মাসের মধ্যে এতবার আউট অফ স্টেশন যাও, চন্দ্রা তো বোর হয়ে যায়, তাছাড়া বয়স্ক লোকের সঙ্গে কতক্ষন আর কি গল্প করবে। ওকে বরং MBA তে ভর্ত্তি করে দাও”।

– “হ্যাঁ, পড়ুক না যত ইচ্ছে পড়াশোনা, খেলাধুলো, গান-বাজনা, সেলাই আরো কম্পিউটার কোর্স শেখা সবকিছুর জন্য, সব হবির জন্যই বাবার খুব উৎসাহ আছে আর আমার তরফ থেকেও কোনো বাধা নেই”।

উনি আবার আন্তরিকতা ভরা গলায় বললেন – “না, সাউথ দিল্লীতে না থাকলে কি ভালো কোনো কলেজ পাবে? তাই বলছিলাম কি আমার বাড়ির কাছেই একটা খুব সুন্দর ফ্লাট আছে, যদি তুমি ভাড়া নাও…”। এবার কথাটা শেষ করতে দেয়নি প্রকাশ। – “না, সেটা একেবারেই সম্ভব নয়”। ধীরে ধীরে চন্দ্রানীর সুরও বদলাতে লাগলো। প্রকাশ ফ্লাইট-এ গেলেই ওর মাসীর বাড়ি, মামীর বুটিকে বা সিনেমা থিয়েটারে যাওয়া চাই মায়ের সঙ্গে।

বাবার সম্বন্ধে কটূক্তি সহ্য করা সেই অসহ্য মহিলা আজ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর জন্যেও মনটা কেন এমন খারাপ লাগছে প্রকাশের। যাঁর ছবিতে প্রণাম করতে পারলো না, কিন্তু কেমন যেন মনে হল সেও কি একটু বেশী নিষ্ঠুরভাবে উদ্ধত হয়ে কথা বলেনি তাঁর সঙ্গে। একটু অবুঝ – সন্তান স্নেহে অন্ধ, মেয়ের প্রতি কনফিডেন্স হারানো ওভার প্রোটেক্টিভে বা খুব বেশী পোসেসিভ ছিলেন তিনি কিন্তু ‘মা’ তো ছিল চন্দ্রানীর, আর জামাইকে ভালোবাসতেও তিনি তো কোনো কার্পণ্য করেননি, তবে অনেক লোক থাকে যারা নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে – স্নেহে অন্ধ হয়ে তাই এই মহিলার প্রতিও তার আজ কেমন যেন একটা মায়া জন্মাচ্ছে। মানুষ ভাবে সবকিছু তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটবে কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হয়ে যায়। আজ মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জাগছে প্রকাশের। ভাবছে একটু নরম হয়েও তো সে বোঝাতে পারতো, অনেক ঘটনা ভেসে আসছে চোখের সামনে। প্রকাশকে ভালো ভালো রান্না করে খাওয়ানো, নামি দামী কাপড়ের জামা-কাপড়, স্যুট বানিয়ে পরানো, একটু শরীর খারাপ হয়ে গেলে ছুটে আসা, নিজে ফল কেটে খাওয়ানো, কোনো কারনে প্লেনের কোনো গোলমাল শুনে ভীত হওয়া। বারবার ফোন করার মধ্যে যে অকৃত্রিম উদ্বেগ ও স্নেহের প্রকাশ ছিল তার কথা তো কোনোদিন ভাবেনি সে। একটা মানুষের সবটাই তো অভিনয় বা খারাপ অভিপ্রায় হতে পারে না। তাই শ্রাদ্ধে নিয়ে আসার জন্য বাবাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল সে। বিপদের দিনে যে সে চন্দ্রানীর কাছে আসতে পেরেছে এটাতে কেমন যেন একটা হালকা আত্মতুষ্টির উপলব্ধি জাগলো তার মনে।

চন্দ্রানীর কথা ভাবলো প্রকাশ। তার তো মা। তার এই ক্ষতি তো অপূরণীয়। শেষ দিন যখন ফোনে ঝগড়া হয় তখন চন্দ্রানীর মা রেগে মেগে বলেছিলেন – “তোমার বাবার ঝি গিরি করার জন্য তো চন্দ্রাকে আমি রেখে যাবো না। হয় তুমি ফ্লাইট ছেড়ে গ্রাউন্ড-এর অফিসে কাজ চেঞ্জ করো, নয় আমার কাছাকাছি আলাদা বাড়ি নাও”। তখন সেও খুব চেঁচিয়ে জবাব দিয়েছিল – “সব জেনেশুনেই তো বিয়ে দিয়েছিলেন, এখন ফ্লাইটের চাকরী পছন্দ হচ্ছে না কেন? আপনার মেয়ের এখানে থাকতে অসুবিধে হচ্ছে তো নিজের কাছে নিয়ে যান, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না”। একটু পরেই চন্দ্রানীর ফোন আসে – “তুমি আমার মাকে অপমান করেছো, তোমার সঙ্গে আমি কথা বলতেও চাই না”। – “বলো না, থাকো তোমার মায়ের আঁচলের তলায়, don’t disturb me, you fool woman”। ফোনের তারটা খুলে দিয়েছিলো প্লাগ থেকে, বিরক্তি আর ঘেন্নায়।

এরপরে ক’মাস কোনো কথাই হয়নি। আজ চন্দ্রানীর শুকনো মুখটা দেখে কিন্তু বড় মায়া লাগলো প্রকাশের। মা হারানোর বেদনা কি তা সে নিজে অনুভব করেছে মর্মে মর্মে, মায়ের মতন স্নেহ পরায়ন প্রিয় বন্ধু এই মেয়েটার জীবনে কেউ ছিল না। সন্তানকে দুঃখ বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য যিনি এত ব্যস্ত থাকতেন তার ছত্র ছায়া এইভাবে হটাৎ সরে গেল, মেয়েটা কি করবে।

বিষন্নতা, চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে প্রকাশের কেমন যেন অসহায় বিপন্ন মনে হতে লাগলো নিজেকে। কি করবে সে, কি তার করা উচিৎ কিছুই ভেবে কুল কিনারা পেল না অথচ চন্দ্রানীর জলভরা কালো চোখের “চাউনি” টা বুকের ভেতরে বেহালার “ছড়ি” হয়ে বার বার মোচড় দিল সুরের মূর্ছনায়।

চতুর্থ অধ্যায়

প্রকাশের মতন সুন্দর বর হবে – সেকথা চন্দ্রানী ভাবতেও পারেনি। একটু শ্যামলা রঙ, গোল গাল মোটাসোটা মেয়ে সে। লম্বাও সেরকম নয়। ভালো গান জানা কিম্বা কোনো প্রফেশনাল ডিগ্রি নিয়ে পাশ করা বা চাকুরিরতাও সে নয়। বি. এ. পাশ আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই সে। মা বলেন, না বলতেন – “বড় বেশি সরল আর বোকা তুই তাই তোর জন্যই চিন্তা”। দাদা ভীষণ বুদ্ধিমান আর শান্ত, কলোম্বাসে পড়ত, অনেক প্রাইজ আনতো ঘরে, কিন্তু সে পড়েছে রাইসিনা স্কুলে, বরাবরই সেকেন্ড ডিভিশন, কিন্তু তার মুখটা নাকি ভীষণ মিষ্টি আর অদূরে ভাব বলে স্কুলে, পাড়ায়, বাড়িতে সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। কেউ কখনো বকেনি। মারা তো দূরের কথা। আজ যে স্বামীকে সে মন প্রাণ সব সঁপে দিয়েছিল, তাকে এমনভাবে হারাতে হবে, একথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে যে তাকে বলতে পারে, “থাকতে হবে তোমায় আমাদের বাড়ি, get lost,” একথা প্রায় অবিশ্বাস্য। আজ আবার মায়ের শ্রাদ্ধের দিনে প্রকাশকে দেখে সারা বুকের রক্ত যেন উছলে উঠল। জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ যেমন কিনারায় আছড়ে পড়ে ঠিক তেমনি করেই সব সুখের স্মৃতিগুলো মনের তীরে আছড়ে ভেঙে পড়তে লাগলো। গানটা মনে পড়ল – “হটাৎ দেখা পথের মাঝে কান্না তখন থামে না যে, ভোলার তলে তলে ছিল, অশ্রুজলের পালা… যখনই ভাঙলো ভাঙলো মিলনমেলা ভাঙলো”। কিন্তু এতো লোকের সামনে সে কাঁদবে না, এই দশদিন ধরে অনেক কেঁদে নিয়েছে, অনেক রূঢ় বাস্তবের ‘সত্য’ তার সামনে প্রকাশ পেয়েছে। দাদা যে শুধু টাকা দিয়ে কর্তব্য করতে চায় – মামা মাসীরা বড় বড় উপদেশ দিয়ে পাশ কাটাচ্ছেন, কৌতুহলী প্রতিবেশীরাও কাটা ঘায়ে নুন ছেটাতে দ্বিধা বোধ করছে না – এসব কথা আগে কখনও সে এমন করে বুঝতে পারেনি। জীবনের চলার পথটা যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ, মানুষ যে নিজের জালে কতটা জড়িত তা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। বাবার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, সংসারের কত কাজ, হিসেব নিকেশ, একটা মানুষের চলে যাওয়ায় কারুর কিছুই আটকায় না কিন্তু তার জায়গা নেবার জন্য আর একজনকে যখন বাধ্য করা হয় – তখন তার থেকে পরিত্রান পাওয়ার উপায় কি সে জানে না।

প্রকাশের প্রতি বিদ্বেষ, রাগ, অভিমান, ঝগড়া সে যত করেছে সবই যে মায়ের সমর্থনে তা তো নয়। নিজের মনের কোনেও কি তার স্বার্থ-অন্বেষণ, সন্দেহ বা একা থাকার লুপ্ত বাসনা কাজ করেনি। ‘মা’র সঙ্গে বসে মাসী-মামীদের মতন নিন্দে চর্চায় সময় নষ্ট করা, শুধু সাজগোজ, সিনেমা থিয়েটারের আর অকারণ শপিংয়ের নেশায় সেও কি পাগল ছিল না। নিজেকে প্রশ্ন করতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে ‘মা’ যদি তাকে প্রভোক করে থাকে সেও তবে কম ভুল করেনি। মাকে তার সম্মান দিয়ে যথাযত কর্ত্তব্য পালন করেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে “দখল” দেবার “অধিকার” অন্যকে সে কেনো দিলো, আজ সে কথা ভীষণ বিচলিত করছে। সংসারকে অসার লাগছে। শ্বশুরের প্রতি এতো শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সে “উপেক্ষা” কেমন করে করেছে, আজ সে কথা বুঝে উঠতে পারছে না।

মা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়েছে, ঐ বৃদ্ধ মানুষটিকে সবচেয়ে আগে খবর দিতে হবে। উনি এলেই যেন ভরসা পাবেন বাবা এবং সে নিজেও। মার যে হটাৎ এমন করে “হার্ট এট্যাক” হবে, একথা কেউ বুঝতে পারেনি। প্রকাশকেও মা খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন, কিন্তু ঐ এক দোষ ছিল তাঁর কাউকে নিজের মনে করলেই ভীষণভাবে অধিকার জমাবার চেষ্টা করতেন। ভাবতেন আমি তো তার ভালো চাইছি, সে নিশ্চই পরে বুঝতে পারবে আমার কথা। কিন্তু সবাই প্রায় ভুল বুঝতো মাকে। অবশ্য চন্দ্রানী এটা ভাবছে অন্যরা তো তাঁর নিজের সন্তান নয়। অন্যরা বলতে প্রকাশ। কিন্তু প্রকাশ কি সত্যিই চেয়েছিল চন্দ্রানী চলে যাক। বাবাকে নিয়ে কথা বললে সে কেন বিরক্ত হবে না। তারপর এরকম বাবা যাঁকে দেবতার চেয়েও বড় মনে হয় চন্দ্রানীর। কিন্তু মা ভুল বলেছেন জেনেও তার প্রতিবাদ করার মতন সাহস জোগাতে পারেনি সে। ছোট থেকেই মা যা পড়তে বলেছেন পড়েছে, মা নিজে যেটা খেতে ভালোবাসতেন তাই খেয়েছে, যে ভাবে সাজাতেন সেভাবে সেজেছে, মায়ের মত ছাড়া সে যে একা তার নিজের ভালো চাইতে পারে বা কিছু করতে পারে একথা সে কখনও ভাবতে পারেনি। মায়ের মৃত্যুতে তাই প্রথমে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলো সে। মা মাছ, মাংস ডিম ছাড়া ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার কিছুই খাওয়াতেন, না সর্বদা বলতেন – “আমার ছেলে মেয়েদের মাছ, মাংস ডিম না থাকলে গলা দিয়ে খাবার নামবে না”। কিন্তু এই দশদিন ধরে তারা নিরামিষ সেদ্দ ভাত খাচ্ছে, তার কাজটা ৪ দিনে হয়ে গেলেও দাদার জন্যে রোজই সে হবিষ্যি রান্না করেছে। কারণ বৌদি আসতে পারেননি। আর আলু সেদ্দ, ডাল সেদ্দ ভাত দুই ভাই বোনে বসে ঘি দিয়ে খেতে কত ভালো লাগছে।

জীবনের মানেটাই যেন এই ক’দিনে পাল্টে গেল। মনে হল এতদিন যেন সে একটা ঘোরে ছিল, রঙিন চশমার আড়ালে সবকিছুই রঙিন। অন্যের দোষ ধরার আনন্দ যতখানি সে পেয়েছে আজ নিজের ভুল ত্রুটিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠায় তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ তাকে খোঁচা মারতে লাগলো। বিশেষ করে এই দশদিনে ক্রমাগত শ্বশুরমশাই-এর আসা যাওয়া। বাবাকে সামলানো, মামা, কাকা ইত্যাদি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অতি পরম সুহৃদের মতন ব্যবহার – চন্দ্রানী-প্রকাশের চিড় ধরাটা যাতে কারুর চোখে না পড়ে তার আপ্রাণ চেষ্টা চন্দ্রানীকে মুগ্ধ ও অভিভূত তথা কৃতজ্ঞ করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রাদ্ধের দিন প্রকাশের আগমন যেন তার দেহ-মনের প্রতিটি অনু-পরমাণুকে রোমাঞ্চিত করেছে, কিন্তু লজ্জায় দুঃখে আর হতাশায় গ্লানিতে কিভাবে কথা বলবে ভেবে পায়নি সে।

আজ সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, উদাস বাতাস আর শিশুর মতন সরল বাবার ব্যাকুল হুতাশ তার মনকে ভীষণ ভাবে কাঁদাচ্ছে। কিছুতেই কোনো কাজে মন লাগাতে পারছে না সে, আবার তার অল্প বুদ্ধি তাকে রাস্তাও দেখতে পারছে না, এর থেকে মুক্তির।

পঞ্চম অধ্যায়

সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল। জ্যোতির্ময় বাবু বেশ অনেক্ষন ধরেই লক্ষ্য করছেন, ছেলের হাবভাব। একভাবে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে সে চুপচাপ। ঘুমোয়নি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে পেপার পড়ছে, কখনও কখনও টিভি চ্যানেল পাল্টাচ্ছে, কোনো কিছুই দেখছে না, আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ছে, শুধুই আঙ্গুল মটকে যাচ্ছে একের পর এক। মনের অস্থিরতা চেপে রাখতে পারছে না ঐ activity গুলো।

ড্রইংরুমে এসে ডাকলেন, “কি রে বাবু ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? আয় আমার কাছে একটু বোস, চা করে এনেছি, নে ধর”।

তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গিয়ে হালকা হ’ল প্রকাশ। চোখে মুখে জল দিয়ে কিছুটা আরাম পেল, তারপর বাবার হাতের তৈরী চায়ে চুমুক দিয়েই বলে উঠল – “আঃ”। জ্যোতির্ময়বাবু উঠে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিলেন। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ। বাবার বুক সেল্ফটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। কত সুন্দর করে রবীন্দ্র, শরৎ, বিভূতি বা সত্যজিতের রচনাবলী সাজানো। মায়ের ছবিতে শুকনো গাঁদা ফুলের মালা, বেশ ক’দিন পাল্টানো হয়নি। আলমারি, টেবিলে কোথাও একটুও ধুলো জমে নেই। ঘরের কোনে নেই একরত্তি ঝুলও। পর্দার প্লিট, বিছানার চাদর, নীল পাপোশ সবই কত সুন্দর করে সাজানো। মনে পড়লো, মা বলতেন – “তোর বাবাতো লক্ষী পুরুষ, এতো অল্প পয়সার মধ্যেও কেমন সুন্দর করে আমাদের ঘর কন্না গুছিয়ে দিয়েছেন, বলতো? কোনো একটা জিনিষও এলোমেলো রাখতে দেননি কোনোদিন”।

প্রকাশকে স্বর্গীয় মায়ের ছবির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাবার চোখের কোনায় দু ফোঁটা জল চিকচিকিয়ে উঠল শিশির বিন্দুর মতন। কাছে এসে ছেলের চুলে হাত বোলাতে লাগলেন তিনি, তারপর ভরাট গাঢ় গলায় ধীরে ধীরে বললেন, –

“জিনিষপত্রের সাজ সরঞ্জামে এই সংসারটাতো অনেক গোছালাম রে বাবাই, কিন্তু তোদের দুটো সুন্দর জীবন কেন এমনভাবে অগোছালো হয়ে গেল বলতো? আমি কি এতো অযোগ্য বাপ”! প্রকাশ বাবার হাতটা টেনে নিলো নিজের কোলে – ‘এরকম কেন বলছো বাবা, আমাদের ভুলের জন্য আমরাই দায়ী।

বাবা বললেন – “জীবনটা তো কোনো কাঁচের বাসন নয়রে বাবু, যে ঠোক্কর লাগলেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে বা কোনোদিন জোড়া লাগানো যাবে না”? এর উত্তর তো আজ সারাদিন ধরে প্রকাশও খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠিক এইসময় ফোনটা বেজে উঠল, হটাৎ চমকে উঠলেন দুজনেই।

প্রকাশ উঠে ফোন ধরলো – “হ্যালো”, কোনো উত্তর নেই, আবার “হ্যালো” কে বলছেন? ধীরে ধীরে আওয়াজ এলো বহু দূর হতে ভেসে আসা বাঁশির সুরের মতন, – “বাবা আছেন”? চন্দ্রানীর দ্বিধা জড়িত কণ্ঠস্বরে প্রকাশ বাবাকে ধরালো রিসিভারটা।

– “হ্যাঁ, বলো মা, কি হয়েছে বেয়াইমশাই এর”?

– “বাবার ভীষণ জ্বর, তার মধ্যে ভুল বকছেন, তোর মাকে ডাক, কি করছে ও ঘরে। আমি বুঝতে পারছি না কি করব”।

– তোমায় কিছু করতে হবে না মা, আমরা এখুনি আসছি আর তোমাদের নিয়ে আসছি আমাদের কাছে।

– “বাবা”? কান্নায় আপ্লুত হয়ে গেল চন্দ্রানীর গলার আওয়াজ!

– “হ্যাঁ, মা সত্যি বলছি এবার থেকে তোমরা আমার কাছেই থাকবে। আমরা দুই বুড়ো তাস খেলবো, মর্নিং ওয়াক করতে যাব, রামকৃষ্ণ মিশনে ঠাকুরের আরতি দেখতে যাবো, অক্ষরধামের ক্যান্টিনে গিয়ে গুজরাতি প্রসাদ খাব। স্বর্গীয় মায়েরা বেঁচে থাকতে কখনও ‘মলে’ যায়নি। দুই বুড়ো ‘মলে’ খুব সময় কাটাব। গরমকালের দুপুরে ঘরে এয়ারকন্ডিশন চালাব না। আবার শীতের দিনে কলকাতা, বাঁকুড়া, সুন্দরবনে ঘুরতে যাব আরও বুড়োদের সঙ্গে হৈ হৈ করে। শুধু তোমরা দুটি মিলে মিশে আনন্দে থেকো, কাঁচের গেলাসের মতন সংসারটা ভেঙ্গে দিও না।

চন্দ্রানী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল – “বাবা তুমি সত্যিই লক্ষিপুরুষ”।

চুম্বকাকর্ষণ (Chumbokakorshon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তাঁর প্রতি আগ্রহ অনুরাগ - "নিষ্ঠা - ভক্তি" কে -
বাড়িয়ে না তুললে - ঈশ্বর কে কেমন করে পাব,
কঠিন তপস্যা, - ঘরের মধ্যে -
সংসারে - গৃহ দুর্গে - বাস করেও ঠাকুরের প্রতি -
ব্যাকুল আবেগ ও ভালোবাসা, - না থাকলে,
বলো কেমন করে আমি "বিকর্ষণের" গান গাব?
"ঠাকুর" মোর "চুম্বক"।
লৌহ হৃদয়ে ধুলো কাদা - মেখে রাখলে কেমন করে -
তাঁর আকর্ষণ অনুভব করতে পারব?
সারাটি দিন - কাজের নামে পারের কড়ি গুনে -
সময়াভাবের দোহাই দিয়ে পাগলামিতে মাতলে, কি করে
"ঠাকুর" তোমায় ফিরে পাব !

মন্ত্র (Montro)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"মন" তোর - হল দীক্ষা নিয়ে -
"জপ" করে যাই আঙ্গুল গুনে,
"অং" "বং" "চং" করিস নে আর -
কাজ নেই মোর - 'গীতা' 'কোরানে'!
মন্দির আর গির্জা ঘরে, মসজিদে ও গুরুদ্বারে।
রইলি পড়ে রাত্রি দিনে, হৃদয় মাঝেই আছেন তিনি,
"ভক্তিবীজ" যে সে যায় বুনে।
আমি 'মুকুল' - মালঞ্চিকা,
জবাফুলে চিত্ত ঢাকা,
গঙ্গা মাটির - তিলক আঁকা,
কাটাব কাল - বাঁশীর ধুনে।।

উপদেশ (Upodesh)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"ঠাকুর" বলেন, গৃহের দুর্গে - রক্ষিত থেকে যুদ্ধ করো।
'মা' বলেছেন - সকল কর্মে ঠাকুরের নাম মনে ধরো।
'মোহ' মায়া আর কাম, কাঞ্চন ভঙ্গে, ক্রোধ, ভয়, লোভ, ঈর্ষা
শত্রুরা সব প্রস্তুত আছে, - লড়াই চলুক তাদের সঙ্গে।
ভক্তির রসে ডুবে তুমি শেষে 'মা' কে ডাকো গো -
তব প্রাণ ভরে - তিনিই তোমায় - উদ্ধার করে -
উঠাবেন জেনো, অনেক ওপরে।
'ঈষ্ট' সাকার - হোক নিরাকার কালী বা কৃষ্ণ শিব কি ব্রহ্ম -
মন প্রাণ তারে ঢেলে দিতে হবে। (ওরে) ছাড়িয়া সকল মিথ্যা দম্ভ।