ঠাকুরের জন্ম দিনে (Thakurer Jonmodine)

চন্দনা সেনগুপ্ত

"ধনী" দাই মা, ধন্য তুমি, প্রসব করালে ভগবানে।
তাই তো তাঁহার কৃপায় হলে, ভিক্ষা মা -
তাঁর উপনয়নে।
ধাত্রী তুমি সেবা কর্মী, - তোমার মতন -
কে আছে ভুবনে !
ভূমিষ্ট যে করলে যত্নে -
"চন্দ্র মনির" সু সন্তানে।
ছাই চাপা এক আগুন তিনি, -
বুঝিয়ে দিলেন সর্ব জনে।
ভগবানের মানুষ জন্ম জানিয়ে দিলেন, -
সু লক্ষণে।
কুষ্ঠি বিচার করলেন তাঁর -
মহা পন্ডিত বিচক্ষণে।
শঙ্খধ্বনি বাজলো তখন, ব্রাহ্ম মুহূর্তে -
শুভ ক্ষণে।
গনক ঠাকুর - নাম দেন তাঁর "শম্ভুচন্দ্র" প্রথম দিনে,
পিতা ক্ষুদিরামের স্বপ্নে, বিষ্ণু এলেন
তাঁর ভবনে।।
বাল্যকালে আকাশতলে শুভ্র বকের সারি দেখে -
কেউ জানে না, আত্মশূন্য হলেন শিশু কি কারণে !
"ভূতির খালে" ছুটে গেলেন, জ্ঞান হারালেন -
সেই শ্মশানে,
বিশালাক্ষী মন্দিরেতে ভাব সমাধি দিব্য জ্ঞানে।
'কামার পুকুর' বাসী সবাই মুগ্ধ শিশুর
রূপ দর্শনে।
লালাবাবুর ভালোবাসা, স্নেহ প্রেমের কল্যানে, -
গদাধরের অন্নপ্রাশনে, আনন্দেরই বন্যা আনে।
গ্রামের লোকে থাকতো মেতে, তাঁহার অভিনয়ে গানে।
অন্ন চিন্তা ছিল না তাঁর প্রতিবেশীদের অবদানে।
শিব সাজালে যাত্রাদলে সমাধিস্থ মঞ্চস্থানে,
অসাধারণ বালক ইনি, জানলো সবাই সেই প্রাঙ্গনে।
দাদার সাথে, কোলকাতাতে গেলেন জীবিকা সন্ধানে।
"রানী রাসমণি" বরণ তাঁরে, করেন ভক্তি সম্মানে।।
ভবতারিনীর আশীর্বাদে ভরলো জীবন নতুন স্বাদে,
মায়ের নামটি করেন কেবল, আকুল ব্যাকুল ক্রন্দনে।
বায়ুরোগে পাগল বুঝি, ছোট ঠাকুর হলেন আজি,
মথুরবাবু পাঠিয়ে দিলেন আপন গাঁয়ে গৃহাঙ্গনে।
বিয়ের জন্যে সহধর্মিনী, কন্যা খোঁজেন মা জননী,
গদাই নিজে বলে দিলেন, পাত্রী আছেন কোনখানে।
পাঁচ বছরের সারদাকে, নারায়ণকে সাক্ষী রেখে, -
জীবন সাথী বানিয়ে নিলেন, অপূর্ব এক শুভ লগনে।
'কেনারামের' শক্তি দীক্ষা, তোতাপুরীর বেদান্ত শিক্ষা,
কাম-কাঞ্চন ত্যাগী, যোগী, মগ্ন আত্ম নিবেদনে।
ব্রাহ্মীনি মার স্নেহধন্য 'অবতার' রূপে হলেন গণ্য -
দক্ষিনেশ্বর পঞ্চবটিতে অষ্টপাশের বর্জনে।
লজ্জা, ঘৃণা, কূল, শীল, ভয়, মান বা জাতি অভিমানে,
ত্যাগ দিয়ে সেই সাধক পেলেন, অভিনব সাধন ধনে।
সঙ্গে ছিলেন সারদামনি, জ্ঞানদায়িনী বীণাপানি,
তাঁদের মতন পতি-পত্নী, দেখেনি কেউ ত্রিভুবনে।।
অন্য ধর্মে হও সহিষ্ণু বলেন "শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ"
শরণাগত প্রভুর প্রতি, ঈশ্বরেতে শুধু মতি,
-কথামৃতের আস্বাদনে।
'সত্যের আঁট থাকবে ধরে, ছেড়ে কামিনী কাঞ্চনে', -
দয়া, ক্ষমা, প্রেমের ধর্ম - প্রচার করেন ভক্তগনে।
দূর-দূরান্তে, দেশ-দেশান্তে তাঁহার বাণীর স্পন্দনে,
ঘর-বাড়ি সব ফেলে এলেন, জুড়াইতে প্রাণ শ্রীচরণে।
'বিবেকানন্দ' প্রধান শিষ্য, জাগিয়ে দিলেন সারা বিশ্ব,
নতুন ভাবের জাগরনে, -
শত শত ভক্ত কত পার্ষদ করে মাথা নত,
দক্ষিণেশ্বর অঙ্গনে।
বিশ্বাস করা নয়তো শক্ত, সরল সত্য করেন ব্যক্ত,
দলে দলে এলেন চলে, তাই তো জীবন অর্পনে।
রসে বসে ছিলেন তিনি, এলেন মানব উদ্ধারণে -
সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের বাণী শোনান -
অচৈতন্যে।
প্রণাম জানাই বারে বারে, আজকে তোমার জন্মদিনে, -
যুগ শ্রেষ্ঠ গুরু তুমি, প্রাণ করে হায়
তোমা বিনে।
শ্রী শ্রী মা ও শ্রী রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ -
"ত্রিদেব" জ্ঞানে, -
জগৎ বাসী বসায় আজি তাঁদের
হৃদয় সিংহাসনে।
আনন্দ ও শান্তি আসে, তাঁদের স্মরণে,
মোদের প্রাণে।

ঠাকুরের প্রতি (Thakurer Proti )

চন্দনা সেনগুপ্ত

নিত্য শুদ্ধ বন্ধন মুক্ত ইশ্বরেরই অবতার।
লোক-কল্যাণ সাধন লাগিয়া,
আসিলে জগৎ পারাবার।
সর্ব - ধর্ম সত্য জানিলে, যত মত তত পথ সবার,
কর্মযোগী করিতে চাহিলে,
ভক্তগণকে গৃহের মাঝে।
বিষয় বুদ্ধি ত্যাজিয়া ডুবিলে
ভাব তরঙ্গে বারংবার।
তোমার লীলা, নতুন খেলা মহিমা অপার চমৎকার।
ঠাকুর গুরুদেব আমার।
তোমার বাণী আসল মানি, নকল ছাড়িয়া
হবো উদার।
'জন্মতিথিতে' প্রণাম হাজার - নিলাম
আমি যে অঙ্গীকার।
যখন যেথায় যে ভাবেই থাকি,
তুমি যেন সাথে রহো আমার।
জয় জয় গান গাহি যেন সদা
নিত্য শুদ্ধ অবতার।

প্রার্থনার ফল (Prarthonar phol)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ঠাকুর',-
তোমার অশেষ কৃপা - ও প্রেম
আমার মাথার পরে,
শ্রী শ্রী মায়ের দয়া স্নেহ -
নানান ভাবে পড়ছে ঝরে।
সদাই তুমি রক্ষা করো, কতই বিপদ হতে, -
দুঃখ সাগর পার করে দাও -
হাতটি ধরো পথে।
তোমার পরশ পাই যে আমি -
হাসপাতালের ঘরে।
সেবক সেবিকাদের যত্ন, পাই যে বারে বারে।
বিজ্ঞানেরই খেলায় লীলায় দিনে রাতে,
দেখতে পেলাম তোমার মুখ যে -
দেহের যন্ত্রণাতে।
প্রণাম তোমায় শত শত, এলাম আজি দ্বারে।
দাঁড়িয়ে আছি চক্ষু মুদে, -
আনন্দে মন ভরে।
সূর্যোদয়ের পানে তাকাই - যখন আবার প্রাতে,
তোমার ছবি দেখি উজ্জ্বল -
হৃদয় আঙিনাতে।
প্রভু, তোমার অপার দয়া, রাখব কোথায় ধরে !
আমার হিয়া কাঁপে যেন -
মুগ্ধতারই ঘোরে।
শ্রী শ্রী মায়ের স্নিগ্দ্ধ মূর্ত্তি, যায় না কভু সরে,
আঁখির আগে দাঁড়ান তিনি
রাত্রি, দিনে, ভোরে।।

নৈঃশব্দের গান (Noishobder Gaan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

নৈঃশব্দের গান (Noishobder Gaan)
             "স্বর্গীয় মিঠুর উদ্দেশ্যে"
               চন্দনা সেনগুপ্ত
 
জীবনটাকে রসিয়ে রসিয়ে
          তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা নয়,
শুধু স্থির এক প্রদীপ শিখার মতন
          নিঃশব্দে প্রজ্জ্বলিত রাখা -
অভিনব ধৈর্য্য, সাহস ও অসীম আশায়
          প্রিয়জনের মুখপানে
                 ফিরে ফিরে দেখা
তোমার চোখের তারায়
          আজ অনেক কথাই আছে লেখা।
 
স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত
                 সন্তানের শ্রদ্ধা, গুরুজনের স্নেহচ্ছায়ায়
      সর্বদা এইভাবে আপ্লুত হয়ে থাকা -
অতল মহাসাগরের গভীরে -

                 মুক্তসম ঝিনুক মনে,
          নির্লিপ্তভাবে, আপনাকে এই ঢাকা
আশ্চর্য এক অহেতুকী কৃপারই পরিচায়ক
          যা শুধু ঈশ্বরের আশীর্বাদ মাখা।।
 
দখিনা হওয়ার ঝোঁকায়
          আপন মনে উড়ে এল
                 সবুজ রঙের পাখী চন্দনা
তোমার জানলা দিয়ে ঢুকল সেদিন একা
          বিছানার পিছনে আছে যেখানে
                 রকমারি যন্ত্রপাতি সব
শরীরের প্রতিটি অঙ্গে লাগানো
          নল আর পাইপগুলি ঝুলছে সব এঁকা ব্যাঁকা।
 
মনে হল,
          ভীষ্মের শর শয্যায়
                 "মা লক্ষ্মী" শুয়ে আছেন যেন
"মনসা দেবীর" সাপেদের হাতে পায়ে
          জড়িয়ে ধরে -
                 চারিদিকে ইলেকট্রিক তারে
          বহু বিচিত্র আলপনা আঁকা।।
 
"মিঠুরে" - "চন্দনাটা" বলে,
          ভালোবেসে ফিসফিসিয়ে হেসে হেসে -
"দে ভাই, আমাকেও একটু ধার দে,
          তোর অসাধারণ স্মরণশক্তি,
          বুদ্ধি, বিশ্বাস ও ভক্তি
মুখর হয়ে নয়, নিঃশব্দের সাধনায়
          আমি এবার মেলব আমার অবুঝ পাখা।।
 
এখানে -
          পাখির মতন, কলকাকলি নয় -
                 ভ্রমরের গুনগুন ধুন, তাল লয়,
সব ভুলে তোমার ঐ পদ্মফুলের মতন চোখে
                 মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা -
বন্ধুত্বের উত্তাপ আনন্দ সুগন্ধ
          ছড়িয়ে দিতে দিতে, শুধু জানাই -
নতুন বছরের শুভেচ্ছা নিয়ে
          ধীরে ধীরে এগিয়ে যাক -
                 সময়ের চাকা।।

স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

চন্দনা সেনগুপ্ত

"বুদু-মামা"
স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের
প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
চন্দনা সেনগুপ্ত

ছোটবেলায় চিনাকুড়ির বাড়ীতে
বসতো চাঁদের হাট ।
সেই আনন্দমেলায় মেজ জ্যাঠামশাই
দিতেন মোদের মূল্যবোধের পাঠ ।
মেজ জ্যেঠিমার সারল্যে মাখা -
ছিল সেথায় বাগান ঘেরা -
অপূর্ব এক বাট ।
সেই খানেতে আসতে যেতে -
দেখেছিলেম তাঁরে -
গভীর বোদ্ধা জ্ঞানের ভারে, অবনত -
বিনয়ী এক ঋষি ।
নেই কোন তাঁর অহংকার -
নকল বাবুর ঠাঁট ।।
 
জ্যেঠিমারই ভাই যে তিনি,
মোদের বুদু মামা, -
বিষ্ণুপুরের শিক্ষক এক -
গবেষক খ্যাতনামা ।
শিশুসুলভ মুখে তাঁহার -
সদাই থাকতো হাসি,
প্রাচীন গ্রন্থ পেলেই যেন,
আনন্দেতে ভাসি, -
মোহিত হয়ে টেরাকোটা মন্দিরেরই কথা, -
বলতে বলতে ভুলে যেতেন,
নিজের দুঃখ ব্যাথা ।
খুঁজে বেড়ান, পুরাণ পুঁথি, -
ছোটেন হেথা - হোথা, -
দিন রাত্তির সে সব তথ্যে -
ঘামিয়ে যেতেন মাথা।।
 
পঞ্চাশটি বছর পরে আবার গেলাম বিষ্ণুপুরে -
তাঁর দর্শন পেলাম আমি, -
পুস্তকেতে ঠাসা ঘরে ।
মামা মামীর যুগল মূর্ত্তি, দেখতে পেলাম -
খাটের পরে ।
মনে হল, জীবন্ত দুই দেব দেবীর রূপ ধরে
বসে আছেন, দুইটি শিশু
শান্তি সুখে হৃদয় ভরে ।
এমন মানুষ বিরল অতি -
এই জগতে একেবারে ।
হৃদয় সেদিন ধন্য হল, যুগল মূর্ত্তি
প্রণাম করে ।।
 
"মল্লভূমের" চিত্তজয়ী চিত্ত করেন রঞ্জন,
তাঁহার মতন "স্থিতপ্রজ্ঞ" ব্যক্তি
আজি মেলে ক'জন?
সবার প্রতি স্নেহের সুধা নিত্য করিয়া বর্ষণ
মুগ্ধ করে রেখেছিলেন -
আছেন যত প্রিয়জন ।
রত্ন-তুল্য-সন্তান তাঁর, "বাপ্পা"
প্রবাসে, - করে ক্রন্দন, -
সমবেদনার পুষ্প পাঠায় -
শোকাচ্ছন্ন সব পরিজন ।
গৃহলক্ষ্মী বড় মামীমার
হারিয়ে গেল যে নারায়ণ, -
স্বামীর স্মৃতি - শোনায় গীতি -
'আত্মা অমর নেই তো মরণ' ।
নশ্বর এই দেহ ছাড়ি - অন্যলোকে বিচরণ,
পঁচানব্বই পরে তিনি -
পেলেন ঈশ্বর দর্শন ।।

অগ্নি বলয় (Agni Boloy)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
'মাতৃ হৃদয়' তো করুণাসিক্ত কোমল,
একটুতেই গলে যায় -
দয়া, মায়া, ক্ষমা দিয়ে গড়া,
কিন্তু আজ কি হল !
খবরের কাগজের নিত্য বিবরণ
প্রতিদিন মর্মান্তিক যত
নারী নির্যাতন, -
তার ভেতরে জ্বালানো আগুন।
মনের গহ্বরে চলছে যেন
গলিত লাভার দহন।
আগ্নেয় গিরি হয়ে উঠল আমার
ক্রুদ্ধ বিক্ষুব্ধ ব্যথিত মন।
ভারতবর্ষের প্রতিটি মা, - শুধু আমি না -
দিদি, বৌদি, মাসী, কাকীরাও
এখন রাগে ফুঁসছে।
ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গা -
কৃষ্ণা-কাবেরী থেকে বিপাশা
ঝিলাম -
ভরে গেল যে এদেশের কন্যাদের
চোখের জলে, -
অসম্ভব আক্ষেপে, হতাশা মনে পুষছে।
উত্তর প্রদেশ থেকে রাজস্থান
হাত্রাস কিংবা কোন মরুদ্যানে -
নিরীহ অসহায় অচ্ছুৎ কন্যার দেহ
লালসার ঘৃণ্য জিহ্বায় কারা
চুষছে।
ওদের নির্লজ্য চেহারা দেখে
কোভিড উনিশ
হার মানছে আজ
তাদের দাঁতের বিষ
তাই আমাদের ক্ষমতার
প্রবৃত্তিকে সব শুষছে।
সেই ভাগ্যহীন কন্যারা বারে বারে
করে আর্তনাদ
কার কানে যায় সেই কান্না
পিতা মাতার হাতে
তাদের মৃতদেহও তুলে দেয় না তারা
অন্তিম ক্রিয়াতেও সাধে বাদ।
রক্ষাকর্ত্তা নীরব,
রাজনীতি - দুর্নীতি - গদি - প্রীতি
ভুলিয়ে দেয় আদর্শ সব।
বিচারকও ঘুমন্ত
বুদ্ধিমানেরা বধির অন্ধ
সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ
বিবস-নিত্য - ভয় ভীত।
তাই এবার আসুক প্রলয়
মায়েদের মনে।
আগ্নেয়গিরি হতে ছুটে যাক
ক্রোধের অগ্নি বলয়।
গলিত লাভায় ভস্ম করে দিক
ঐ দানব মানবের
নিশ্চিন্ত আলোয়।
আমাদের মুখনিঃসৃত অভিশাপ
পুড়িয়ে দিক ওদের এই সাহস পাপ,
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে
বাকরুদ্ধ করে দিক ওদের প্রতাপ।
বিচারের বাণী আর নিভৃতে নির্জনে
করে না যে অশ্রুপাত,
দুর্গার ত্রিশূলে ছেদন করা দেহ
হয়ে যাক শরীরের
রক্তের উত্তাপ।
নিজেদের কন্যাকে হারিয়ে করুক
হাহাকার সন্তাপ।

ভক্ত বন্ধু (Bhokto Bondhu)

চন্দনা সেনগুপ্ত

এখানে, - দেরাদুনে, -
অপূর্ব এক শান্তি মনে,
দূর্গা পুজোর পুন্যক্ষণে,
এলাম আমরা ক'জনে।
 
প্রৌঢ়ত্বের সীমানায়,
বার্দ্ধক্যের দোর গোড়ায় -
আমরা এলাম যখন হেথায় -
তখন হঠাৎ খুঁজে পেলাম, -
এই জীবনের নতুন মানে।
কে জানে! আজ কোনখানে?
হাসি-কান্না, - চুনী-পান্না,
আনলো, চমক তাই জীবনে,
ভক্ত বন্ধু জুটলো শত,
'কথামৃতের' গল্প যত -
ধন্য করলো আমাদেরকে,
তাই তো কত কৃপা দানে।
 
মুগ্ধ হ'ল, হৃদয় সবার -
স্বামীজীদের আপ্যায়নে।
আশ্রমের এই বাগান ঘেরা,
মন্দিরেরই প্রাঙ্গনে।
 
শ্রী শ্রী মায়ের মূর্ত্তি হেথায়
মোদের সবার কল্যানে, -
আপন মায়ের মতন যেন
তাকিয়ে আছেন ভক্ত পানে।
শান্ত সমাধিস্থ 'ঠাকুর' -
বসে আছেন তাঁর আসনে, -
ধূপ, ধুনো আর পুষ্প গন্ধে -
পুন্য সভা এই লগনে।
মুগ্ধ হলাম, হাজার হাজার -
ভক্ত জনের আগমনে।
প্রতিবছর আসতে যে চাই -
'মা' দুর্গার আবাহনে।

দেরাদুনে এসে (Deradune Ese)

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় -
বার্দ্ধক্যের দোর গোড়ায়
নতুন এক অদ্ভুত সময় - অধ্যায়ে এসে -
নতুন ভক্ত বন্ধু লাভ, -
বদলে দিল,
জীবনের মানে।
কে জানে ! কোনখানে জমা ছিল,
এতো হাসি-কান্না, চুনী-পান্না।
কে যেন হটাৎ বলে, - বুড়ো তো
হই নি এখনও।
ফিরে এসেছি আবার সেই শৈশবে।
আজকে তাই, পাল্টে গেল স্বভাব।
 
সম পর্যায়ের সম মনস্কতার -
সম ভাবনায় পোষা।
সন্তানের সাফল্যে গর্বিত আনন্দিত,
সমান মূল্যবোধে পালিত।
সম ধর্ম ধারণায়, বিশ্বাস ও চেতনায়
আপ্লুত কয়েকটি মানুষ -
যখন হন একত্রিত,
তখন তাঁদের মনে প্রাণে
লাগে আর এক নতুন রঙ।
খুলে যায়, কৃত্রিমতার আবরণ।
 
উজ্জ্বল এক আলোকে
হৃদয়ের উন্মোচন।
যখন -
ভাগ করে নেওয়া হয়,
সব দুঃখ সুখ,
স্মিত হাস্যে আবেগে আশায়
উদ্ভাসিত হয় সকলের মুখ।
 
তখন "ঠাকুর" বলেন, -
"এই তো তোমাদের মাঝে
এই যে অদ্ভুত প্রেম বন্ধন,
এই যে স্নেহ মমতা, ভালোবাসার
আলিঙ্গন, -
এই যে পাহাড় ঘেরা,
পুষ্পে ভরা শ্যামল
সবুজ প্রাঙ্গন, -
এখানে এই হাজার হাজার
শত শত কত ভক্ত
স্বজনের আগমন,
এতেই জাগবে -
উদ্দীপন"।
 
গৈরিকধারী ত্যাগী সন্যাসীদের সঙ্গে
তোদের আবার বিচরণ,
রৌদ্রে স্নাত, সুন্দর পরিবেশে
দূর্গা মায়ের রূপ বর্ণন,
সানাইয়ের সুরে, শিশুদের ঝংকারে -
অপূর্ব এক অনুরণন - এর
মধ্যেই তো আমার আগমন।
 
একে অপরকে ছুঁয়ে দেখো -
অন্তরে অন্তরে সেতু বন্ধন।
এতেই পাবে, -
আমার পরশন।
হবে অকাতরে আশীষ বর্ষণ
আর চলবে সবার তরে
প্রেম বিতরণ।

দেরাদুনের আশ্রমে (Deraduner Ashrome)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দেরাদুনের এই আশ্রমে, -
শারদীয়ার উৎসব।
প্রভাত হতেই স্নিগ্ধ হাওয়া
কলকাকলির কলরব।
অরুণোদয় সোনার রথে,
আলো ঝলমল পুষ্প সব।
আধ্যাত্মিক আবহাওয়াতে -
মনে শান্তি অনুভব।
এই মাটিতে ত্যাগের মন্ত্র,
হয়েছে তাই উদ্ভব।
অপূর্ব এই পরিবেশে
আমরা ক'জন আজকে এসে -
পেলাম খুশি অভিনব।

মরীচিকা (Morichika)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ -
চক চক করে ওঠে, দেখা দেয় জল।
পথ হারানো পথিকের হৃদয়ে -
জাগায় অদ্ভুত আকর্ষণ,
প্রাণে আনে তাই বল।
তার টানে ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে থাকে,
মোহচ্ছন্ন মন,
জীবন হয় তখন অকারণ উদ্দীপনায়
আবেগে চঞ্চল।
যত কাছে আসে সেই জলাশয়,
দূরে দূরে যায় সরে।
ধীরে ধীরে আশা ক্ষীণ হতে থাকে -
জাগে ভয়, চিত্ত হয় বিহ্বল।
শুকিয়ে যায় গলা, -
পিপাসায় তেষ্টায় ছাতি ফাটে।
অতি কষ্টে কাটায় সে
তার প্রতিটি পল।
না - সব যে মিথ্যে হল
জমাট বাঁধা দৃঢ় আশায়
সত্যের উত্তাপ লাগে, পুনরায়
সব 'ভ্রম' হয়ে যায় তরল
অলীক স্বপ্ন গুলো এবার হালকা মেঘ হয়ে
উড়ে যেতে থাকে।
এতক্ষন ধরে যাকে মনে হয়েছিল -
নদী বা সরোবর - অবিকল,
সে তো ভ্রান্ত - পথ শ্রান্ত মানুষকে
কে যেন বুঝিয়ে দেয়,
অদৃশ্য কোন জাদুকরের ছল
সোনার হরিনের পিছনে
ছুটে চলে মানব - ঠিক এই ভাবে
টাকা টাকা টাকা - মুদ্রা গোনে,
মাটিতে অর্থ পোঁতে - গাছ বোনে
আরো অর্থ পাওয়ার লোভে
চেষ্টা চালায় নিষ্ফল।
অন্তিম সময়ে ভুল ভাঙে তার -
ক্রমশঃ যার দিকে সে এগিয়েছিল
ধনরত্নের নেশায় উচ্ছল -
সে তো ঐ 'মরীচিকা'র মতোই সত্য নয়।
শুধু মিথ্যার ঘোরে -
এতক্ষন অমূল্য জীবন নষ্ট - করলো নির্বোধ
মানুষ জ্ঞানী হয়েও ছিল -
তাই, বদ্ধ পাগল।