দময়ন্তীর আধ্যাত্মিকতার বীজ (Damoyontir Adhyatmikotar beej)

চন্দনা সেনগুপ্ত

লজ্জাপটাবৃতা দুর্গাদেবী সকালে উঠেই বাসি কাপড় ছেড়ে তুলসীতলায় গোবর ছড়া দিয়ে, ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে ঘটি, কলসী নিয়ে পুকুরে যেতেন স্নান সারতে। তারপর চলতো তার পূজাপাঠ – জপতপ।

বাংলাদেশের সাধিকা বিধবা মা নিষ্ঠা ভাবে চন্দন ঘষতেন, তুলসী তুলে, ফলফুল কেটে প্রাসাদের থালি সাজাতেন। গাঁদা, মালতী, চম্পা, টগর, বেলী – যখন যা ফুল ফুটতো তাঁর আঙ্গনে তাই সাজিয়ে ধুপ জ্বেলে পূজা উপাচার সংগ্রহ করে, হরিনামের মালাটি হাতে নিয়ে একমনে চোখ বুজে জপ করে চলতেন, – “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”। তাঁর সেই পূজারিণী রূপটি ছিল বড় সুন্দর। ছেলের বউ এলিজাবেথ প্রায় এসে ছোট্ট কন্যা “দময়ন্তীকে” নিয়ে গ্রামের বাড়িতে শাশুড়ির কাছে থাকতেন, সেখানে তাঁর সময় কাটতো এক অদ্ভুত অনাবিল আনন্দে। শিশু কন্যা তার ঠাকুমার মন্ত্র উচ্চারণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতাপাঠ শুনতো হা করে। দূর্গা দেবীর আধ্যাত্মিক সাত্ত্বিক জীবন ধারনের মানে কিছুই সে বুঝতো না, কিন্তু ধ্যান জপ অনেকক্ষন শান্ত হয়ে বসে ও চক্ষু মুদিত ওই অপূর্ব মূর্ত্তি তাকে ভীষণ আকর্ষণ করতো। ঠাকুরমার কোলে পিঠে চড়ে দাপাদাপি করার সুযোগ সে পাইনি, spirituality কাকে বলে সেকথা তখনও তার বোধগম্য হয়নি, কিন্তু এই ভাবধারাটি – অর্থাৎ শান্ত স্নিগ্ধভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে একান্ত হওয়ার গুনটি সে ঠাকুরমার থেকেই লাভ করেছিল।

“দময়ন্তীর” বাবা ‘গণপতি বাবু’ও দুর্গাপূজার সময় চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে মেতে উঠতেন নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে। ‘কলা বউ’ স্নান করতে গিয়ে গ্রামের সব লোকের সঙ্গে – আমার উমা এলো গো কিংবা অষ্টমীর দিনে আঁখ বলীর পরেই “রণ মাঝে, বন মাঝে নাচে গো উমা দিগম্বরী” গান ও খোল করতাল ঢোলকের গানের তালে একেবারে বিভোর নাচ – দেখলে কেউ বলতে পারতো না যে তিনি আমেরিকা ফেরত ইঞ্জিনিয়ার বা তাঁর স্ত্রীও বিদেশিনী।

দুবছরের কন্যা দময়ন্তীকে কাঁধে নিয়ে বিজয়ার ভাসানের সময় “চন্ডী মণ্ডপ আঁধার করে ওমা উমা আমার কোথা গেলি গো” গানের সুরে তাল মিলিয়ে দূর্গা মায়ের মূর্ত্তি বিসর্জন দিতে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত রমণীয়। জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থাকে না কিন্তু পরোক্ষভাবে চরিত্র গঠনে – ভাবনা চিন্তায় তার ছাপ পড়ে পরিণত বয়সে। সেই বিদেশিনী বধূর শেতাঙ্গিনী কন্যার জীবনেও তাই বোধহয় ভারতীয় সংস্কৃতি, কালচার ও অধ্যাত্মবাদ এবং দয়া ক্ষমা, স্নেহমমতা মাখা বাঙালী নারীর সব লক্ষণগুলির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। দুর্গাদেবী তার গ্রামের সর্বহারা চাষী, জেলে, নাপিত কিংবা অসহায় আত্মীয়স্বজনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁর পুত্র গণপতিও যে কোন লোককে আপন করে নিতে এতোটুকু কুন্ঠাবোধ করতেন না।

তাঁদের মধ্যে দময়ন্তী তাই বড় হয়ে আমেরিকার আধুনিক পশ্চিমী শিক্ষায় মানুষ হয়েও সবাইকে আপনার জন মনে করে ভালবাসবার অসাধারণ ক্ষমতাটি অর্জন করেছিলো।

তাই কলেজ পাশ করার পর সে যখন Peace Crops এ কাজ নেয়, তখন তাকে নেপালে এক অতি নগন্য গ্রামে পাঠানো হয়। পাহাড়ের কোলে “বহিনী হাউসে” পতিতালয় থেকে আগত ছোট ছোট মেয়েদের দেখাশুনো ও শিক্ষা দেওয়ার কাজে সে নিয়ত ছিল।

সেখানে গিয়ে দময়ন্তী সবচেয়ে আগে – নেপালী ভাষা শিখে নেয়। সেই বাড়িতে জল ছিল না। পাহাড়ের নিচে গিয়ে ঝর্ণার জল নিয়ে তাকে জল তুলে আনতে হতো। কোনো Modern Lifestyle, সুযোগ সুবিধা, বিলাস ব্যাসন কিছুই সে সেখানে পেতো না। সবসময় আলো থাকতো না। গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করার জন্য কোনো বন্ধু ছিল না। ওই গ্রাম্য মহিলাদের তাদের ভাষায় জীবনের পাঠ – পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে আনন্দের সঙ্গে কাজ করে যেত সে।

বাবা গণপতি সেনগুপ্তর অকাল মৃত্যু Car Accident এর ঘটনা তাকে অত্যন্ত দূঃখিত করে। কিন্তু ওই মর্মান্তিক আঘাতেও তাকে শান্ত স্নিগ্ধভাবে সবাইকে বোঝাতে দেখা যায়। তার Balanced Nature আত্মীয় বন্ধুদের অভিভূত করে দেয়।

এর পর দময়ন্তী বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে এবং Meditation ও Yoga তেই তার বেশিরভাগ সময় কাটে।

দময়ন্তীর আর এক দিদিমার অনুপ্রেরণা ও প্রভাবও বিশেষভাবে পড়তে দেখা যায়। Late Halen Dancy জীবিকায় শিক্ষিকা ছিলেন – কিন্তু Nature Lover বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি প্রকৃতি প্রেমী এবং Bird’s Watcher ছিলেন। তার বাড়ির আসে-পাশের জঙ্গলে গাছে গাছে পাখিদের অবলোকন করা ও সংখ্যা গণনা করা তাঁর এক বিশেষ কাজ ছিল।

সেই প্রকৃতি প্রেমী আমেরিকার ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বাধীনচেতা সংস্কারমুক্ত উদার মনোভাবের মহিলা। তাঁর অন্যন্ত প্রিয় নাতনি ছিলো দময়ন্তী। মেয়ে এলিজাবেথ ভারতীয় বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করে দুর্গাপুরে এসে সংসার পাতলে, তিনি মেয়েকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেন। অন্যান্য আধুনিক আমেরিকার মায়ের মতন তাকে উপেক্ষা করেননি।

যে দেশে আঠারো বছরের হয়ে গেলে বাবা মা তাদের সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন এবং আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার সাহায্য করতে ইচ্ছুক হন না, সেই দেশের মা হয়ে তিনি কন্যা এলিজাবেথকে কখনো পরিত্যাগ করেননি। জামাই গণপতিকে যেমন স্নেহ ও প্রেমের দ্বারা গ্রহণ করেছিলেন, দুই দেশের সবরকম পার্থক্য ব্যবধান তাকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি। তাই এলিজাবেথের সন্তান প্রসবকালে তিনি নিজের সব কাজ, সুখ-সুবিধা ছেড়ে সুদূর শিকাগো থেকে দুর্গাপুরে এসে তার আমাদের দেশের মায়ের মতন “আঁতুড়ের” ঘরে কন্যাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে চলে আসেন। তাঁর মতন মমতাময়ী, সুকক্ষ, কর্মকুশল মহিলা খুবই কম দেখা গেছে। নাতনি দময়ন্তী তাঁর সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করেছে। মৃত্যুকালে ওই দিদিমা Halen Dancy তাঁর অন্যান্য নাতি-নাতনি থাকা সত্ত্বেও এই স্নেহ সম্পৃক্ত মেয়েকে তাঁর সম্পত্তি দেন করে যান, কারণ তিনি জানতেন ওই উদার মনোভাবের ধার্মিক বুদ্ধপন্থী মেয়েটি তাঁর টাকা পয়সা ভালো কাজেই ব্যয় করবে।

‘দময়ন্তী’ সেই অর্থে সিয়াটলে নব নালন্দা নামে এক অপূর্ব সংস্থা গড়ে তুলেছে, সেখানে যোগা ও মেডিটেশন, বুদ্ধদেবের ধর্ম চর্চার এক সুন্দর মনোগ্রাহী কেন্দ্র তৈরী হয়েছে। তার পরিচালনায় আমেরিকার নব নালন্দা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ – স্থান গড়ে উঠেছে।

মহাপ্রয়াণ (Mohaproyan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

স্বামী অক্ষয়ানন্দের প্রতি চন্দনা সেনগুপ্তের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মহাপ্রয়াণ

হে মহাপ্রাণ, –

তব মহা প্রয়াণ, –

আমাদের মনে এনে দেয় , –

অসামান্য গভীর মূল্যদান।

জীবনভর করে গেছো তপস্যা –

চেয়েছো অপরের কল্যাণ,

সত্যাদর্শী, স্থিতপ্রজ্ঞ,

পেয়েছো সকলের সম্মান।

তোমার সাধন বার্তা করিতেছে –

ব্যাকুল আহ্বান,

মহামারী দেখাচ্ছে যে ভয়,

তবু অচঞ্চল, তোমার সন্তান।

আপন পুণ্যফলে, হরিপদে

দেবলোকে পেলে, তুমি স্থান l

দোষ ত্রুটী মার্জনা করে দিয়ে তুমি

কত দয়াবান – করিলে প্রমান।

মোহমুক্ত ছিলে চিরদিন, –

আত্মলীন, সাধক মহান।

এ জগতে, অবক্ষয়ের যুগে, রেখে গেলে তাই

গৃহ সন্যাসীর অনুপম অবদান।

শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দের মহাপ্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

চন্দনা সেনগুপ্ত

১৯৭১ এর পূর্বে যার নাম ছিল ‘পূর্ববঙ্গ’ সেখানে চট্টগ্রামের সুন্দর এক সুজলা সুফলা সবুজ গ্রাম “আনোয়ারায়” ১৯৩৪ সালের ১০ই নভেম্বর (বাংলা ২৪শে কার্ত্তিক, ১৩৪১) শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে ‘ধর’ পরিবারের চতুর্থ সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় অক্ষয় কুমার। শৈশব কাল থেকেই তিনি ছিলেন উদার সরল সত্যবাদী, অদ্ভুত ধর্মগত প্রাণ। চার বছর বয়সে তার বাবা-মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের গুটি বসন্ত হয়। সেই সময় খুব ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। ধীরে ধীরে দুজনারই অবস্থা খুব খারাপ হতে থাকে। সব থেকে খারাপ হয়ে যায় মায়ের শরীর। তাঁকে কলাপাতায় শোয়াতে হত। কিছুদিন পরে মা সুস্থ হলেও বাবাকে হারাতে হল। এরপরে তাঁদের বাকি সব ভাইয়েরা সমস্ত বিষয় আশয় ভাগ করে নেয় এবং তাদের কে এক দিকে রেখে দেয়। তাদের মাথার উপর সে সময় দেখাশোনার করার মতন কেউ ছিল না। বড় দাদা আর কিছু না করতে পেরে লোকের দোকানে কাজ করতে শুরু করে দেন, ছোট ভাই বোনদের মানুষ করবার জন্য। ১৬ বছর বয়সে বড় ভাই বিয়ে করেন এবং সেই বিয়েতে যা পন পান, সেই টাকা দিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন।

অক্ষয় কুমার দেখতে দেখতে ১৪ বছরে পা রাখেন। একটা জিনিস সে লক্ষ্য করতো আর খুব কষ্ট পেত যে, তাদের লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে দাদা ধীরে ধীরে সমস্ত চাষের জমি বিক্রি করে ফেলছেন। তাই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, যে আর দাদার উপরে বেশি চাপ দেওয়া যাবে না, নিজেকেই কিছু করতে হবে। তাঁর এক সমবয়সী ভাইপো ছিল, তাকে সাথে করে তিনি একদিন সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে চলে আসেন তৎকালীন ভারতে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে। শিয়ালদহ স্টেশন এর প্লাটফর্ম হয় তাদের বাসস্থান। খুব ইচ্ছা ছিল ‘রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে’র ছাত্রাবাসে থেকে সে আরও পড়াশোনা করবে কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারে সমস্ত স্থান ভর্তি হয়ে গেছে, একটি মাত্র স্থান খালি থাকায় স্বার্থশূন্য কাকা অক্ষয় কুমার তার সেই ভাইপোকে সেখানে রেখে নিজে বেরিয়ে পড়েন – জীবিকার খোঁজে।

এসে পৌঁছান জামশেদপুরে, সেখানে তার গ্রামের পরিচিত এক দাদার সাথে তার দেখা হয়ে যায়। সেই দাদার সুপারিশের ফলে টাটা স্টিল প্লান্ট এ তাঁর চাকরী হয়। দাদার কাছেই থাকতে শুরু করেন, এবং সেই সময় ব্যাঙ্ক এর সুবিধা ছিল না। সেই দাদার কাছেই মাইনের টাকা থেকে নিজে অল্প খেয়ে, অল্প খরচ করে অত্যন্ত সাধারণ দারিদ্রতার মধ্যে কাটিয়ে বাড়ির পরিবারের জন্য তিল তিল করে জমাতেন। হটাৎ একদিন বাড়ি থেকে মায়ের অসুস্থতার খবর আসে, সেই সময় তিনি  সিদ্ধান্ত নেন, বাড়ি যাবেন, কিন্তু দাদার কাছে গচ্ছিত টাকা চাইতে গেলে, একেবারে হতবুদ্ধি করে দেন তিনি তাঁকে, কোন টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। মানুষের নীচতায় বড় দুঃখ ও আঘাত লাগে তাঁর মনে। সেই দেশ থেকে চলে আসার এতো বছর পরে বাড়ি ফিরবে, কিন্তু খালি হাতে কিভাবে বাড়ি ফিরবে? ছোট ছোট ভাইপো ভাইঝি আছে, মা আছেন, কোনোরকমে ধার দেনা করে কিছু অর্থের ব্যবস্থা করে, দেশের বাড়ি রওনা হয়ে পড়েন। বাড়ি যেতেই মা তাঁর বিবাহ দেন, মনকে বন্ধনে বাঁধবার জন্য। কিন্তু তিনি ছিলেন চির উদাসীন, ঈশ্বরাভিমুখী নিরাসক্ত মানুষ। গৃহী সন্যাসীর মতন জীবন যাপনের সরলতায় নিজের নিকটজনও তাঁর প্রতি বিরক্ত হত। জটিল সংসারের নির্ভেজাল এইসব ভাল মানুষেরা  চিরটাকাল এমনিভাবেই সকলের অকারণ সমালোচনার পাত্র হন।

দেশ থেকে ফিরে এসে তিনি আর ঐ জামশেদপুরে ফিরে যাননি। সেই সময় দুর্গাপুর স্টিল প্লান্ট এর কোকোভ্যান-এ তখন শ্রমিক নেওয়া হচ্ছিল, সেখানেই তিনি ১৯৬০ সালে চাকরী পান। পরিশ্রমী সৎ কর্মীরূপে নাম, যশ ও উচ্চপদস্থ অফিসার এর স্নেহের পাত্র হন, অতি অল্প সময়ের মধ্যে। এর মধ্যে তাঁর দুই কন্যা ও এক পুত্র জন্মায়।

অফিসে প্রোমোশনের সময় আসে, কিন্তু তিনি সেই পদের লোভ ছেড়ে নিজের উচ্চপদস্থ অফিসারকে অনুরোধ ক’রে অদ্ভুত এক প্রস্তাব দেন, – তাঁর প্রমোশন মাইনে বৃদ্ধির বদলে, তাঁরা যদি তাঁর দুই শ্যালককে চাকরী দেন তাহলে খুব উপকার হয়। বাংলাদেশ থেকে আগত সেই দুই তরুণদের কাজের বড় দরকার। অফিসার এই প্রস্তাবে আশ্চর্য্য হয়ে যান, কিন্তু তাঁর একান্ত অনুরোধ ফেলতেও পারেন না। কাজ পান তারা সেখানে জামাইবাবুর বদান্যতায়l এই রকম ই পরোপকারী ছিলেন তিনি l অক্ষয়বাবুর জীবনযাত্রা এতো সাধারণ, বিলাসিতাহীন সহজসরল ছিল, যে যাঁরা তাঁকে দেখতেন তাদেরই তিনি শ্রদ্ধাভাজন হতেন।

চট্টগ্রামের সিদ্ধ সাধক ‘মুনিবাবা’ “মহর্ষি শ্রীমৎ স্বামী হরিকৃপানন্দ” মহারাজ ছিলেন তাঁর জীবনের কান্ডারী, তাঁরই এক আশ্রম তৈরী হয় আমাদের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় ব্যান্ডেলের মানসপুরে, নাম মানসপুর যোগাশ্রম। সরস্বতী নদীর কাছে এই অপূর্ব পরিবেশটিতে এসে ঈশ্বর আরাধনায় জীবন কাটাবার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে যান এবং মুনিবাবার শিষ্য শ্রদ্ধেয় “শ্রীমৎ স্বামী সূতেজানন্দ মহারাজ” এর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

সারাজীবন সংসারের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন ও কর্ত্তব্য করে গেছেন তিনি, কিন্তু তাঁর ধ্যান জ্ঞান ও ঐকান্তিক নিষ্ঠা ছিল, ধর্মানুরাগের প্রতি। ছেলে মেয়েদের ও তিনি সর্বদা সৎপথে সদ্ভাবনায় ভাবিত হয়ে পরপোকারে উদ্বুদ্ধ হয়ে চলার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। চিরন্তন শ্বাশত সত্যকে ধরে জীবনে এগিয়ে যেতে সর্বদা মূল্যবোধের পাঠ পড়াতেন। সংসার সমুদ্রের উথাল পাথালে ধৈর্য ধরে গুরুর শরণাগত হয়ে থাকতে উৎসাহ দিতেন। ছোট্ট শিশু পুত্রকে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে কোলে বসিয়ে তিনি তার দীক্ষা গ্রহণ করান। সাধারণ লোকেদের কাছে সেটি আশ্চর্য জনক ব্যবহার বলে মনে হত, বহুমানুষ তাঁর এই ভক্তি প্রনোদিত ভাবে জীবন কাটানো, নিরহংকার হয়ে, নিঃস্বার্থ লোভশূন্য থাকার মানে বুঝতে পারতো না। সমালোচকদের দল তাঁর মতন শুদ্ধাত্মাকে হয়তো চিনতে ভুল করতো।

দীর্ঘ সময় ধরে ‘জনক রাজার’ মতো এক হাতে সংসার ও অন্য হাতে গুরু প্রেম ,আধ্যাত্মিকতাকে ধরে রেখে, গৃহী সন্ন্যাসী হয়ে জীবিকা অর্জনের জন্য চাকরী করে যেতে থাকেন অক্ষয়  বাবু। দুই কন্যাকে পাত্রস্থ করা, পুত্রকে গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত পড়া লেখা শেখানো, স্ত্রীর ভরণ পোষণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করে দেওয়া – সব কর্ত্তব্য এবং দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করে গেছেন তিনি। কিন্তু আন্তরিকভাবে আপন হৃদয়ের অন্তঃস্থলে পোষণ করে চলতেন অন্য এক ভাবনা l জাগতিক সুখ বিসর্জন দিয়ে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ভয় ও মাৎসর্য – এই ছয় রিপুকে সম্পূর্ণ ভাবে জয় করে, তিনি গুরু চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন, এবং গেরুয়া ধারী সন্ন্যাসী রূপে জীবন যাপন শুরু করেন l এর পূর্বের একটি ঘটনা উল্লেখনিয়, এর মধ্যে দিয়েও সেই মহান মানুষ টির মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় l

কোকোভ্যানের কর্মরত এক শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে গিয়ে একবার তাঁর ডান হাতের চারটি আঙুলের মাথা কেটে যায়। কিন্তু শারীরিক দুঃখ কষ্ট তাঁকে কখনো বিচলিত করতে পারেনি। অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী এই মানুষটি ছেলেমেয়েদের খুব সুন্দর সাবলীলভাবে জীবনের প্র্যাকটিক্যাল ব্যাপারেও উপদেশ দিতেন। অতি সরল ভাষায় ও সহজ উদাহরণের মধ্য দিয়ে।

তিনি বলতেন যে – “যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাদের থেকে নিজেকে দূরে রাখবে, কিন্তু যারা খুব স্পষ্ট কথা বলে এবং মুখের ওপর সত্যি বলার সাহস রাখে ,তাদের থেকে তোমার কোন ক্ষতি হবে না জানবে। – কখনো অলসতা করবে না, মানুষের উপকার করতে যতটা সম্ভব আপ্রাণ চেষ্টা করবে।

আধুনিকতার নামে আজকাল যে কৃত্রিমতা, ভনিতা, বিলাসিতা তথা অকাজের মাতলামী – টাকার মোহে ছুটে চলা, মানুষের প্রতি নির্দয় ব্যবহার করা, বিভিন্ন কুঅভ্যাস ও নেশায় লিপ্ত হওয়া অর্থাৎ মানবিকতার ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে, এবং স্বার্থন্বেষীদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা দেখে তাঁর দয়ালু মন অত্যন্ত ব্যথিত হত।

এই প্রজন্মের উন্নাসিকতার সঙ্গে, পার্থিব সম্পদের আতিশয্য আড়ম্বরপূর্ণ সমাজের চিন্তাধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তিনি সাত বছর চাকরী থাকা সত্ত্বেও নিজে আধ্যাত্মিক জীবনের, আসল উদ্দেশ্যকে ‘বাস্তবায়িত’ করবার জন্য জীবিকা উপার্জন ও মোহময় সংসার – পরিবার থেকে অব্যহতি নিয়ে আশ্রমবাসী হয়ে যান। সেখানে উনি যোগদান করেন ১৯৯০ সালে।

গুরুদেব শ্রীমৎ স্বামীজী সূতেজানন্দ মহারাজ – এর তিনি অতি প্রিয় পাত্র ও সমস্ত আশ্রমিকের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তিনি l

আমাদের ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের একটি উক্তি আছে – “গৃহের দুর্গে বাস করে ভগবানের সাধনা করে যাও, কর্ম যোগী হয়ে। সন্ন্যাস গ্রহনের পর গুরুদত্ত নাম পান তিনি – ‘শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দ ব্রহ্মচারী।

কিন্তু আজকের দিনে সবচেয়ে অসাধারণ একটি ঘটনা ঘটল তাঁর অন্তিম যাত্রা কালে, হয়ত স্বর্গ হতে গুরুর এটাই নির্দেশ ছিল, তাঁর প্রতি পরোক্ষভাবে। –

তিনি সংসার ছেড়েছিলেন সব জাগতিক পাশ মুক্ত করে – কিন্তু সংসার তাঁকে ছাড়েনি। তাঁর পিতৃভক্ত পুত্র, লক্ষীমন্ত সেবাপরায়ণ সুগৃহিনী – ভক্তিমতী পুত্রবধূ ও তরুণী (বিমান বলাকা – Air hostess) নাতনি এবং সর্বোপরি কিশোর প্রেমিক দয়ালু ও তাদের সন্ন্যাসী দাদুর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল নাতি কিন্তু এই সাধু মহাপুরুষকে কোনোদিন ছাড়তে পারেনি। আজকালকার দিনে এ এক অতি বিরল এবং অসামান্য দৃষ্টান্ত।

সন্ন্যাসী অক্ষয়ানন্দের দেহ যন্ত্রটি ক্রমশঃ বিকল হতে দেখে, তার পুত্র আশিস, পুত্রবধূ জয়া, নাতনি অরুনিশা ও নাতি অভ্রনীল তাঁকে ঐ আশ্রম থেকে তুলে নিয়ে আসে ছোট্ট শিশুর মতন। এই কোভিড-এর ভয় উপেক্ষা করে, নিজেদের সামান্য পুঁজির দিকে না তাকিয়ে, লকডাউন-এর বাধা অতিক্রম করে নিজেদের বাড়ি দিল্লী শহরে রাজধানীর এক ক্ষুদ্র গৃহে নিয়ে আসে। আয়তনে ঘরটি হয়ত তাদের ছোট, কিন্তু সেবার আদর্শে উজ্জ্বল – উদ্ভাসিত। যেদিন উনি ঘরে প্রবেশ করছিলেন সেদিন নাতিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলছিলেন যে এটা তো আমার স্বর্গের সিঁড়ি, এরপরে সোজা উপরে যাবো, আর নিচে নামবো না। সত্যিই আর তিনি নিচে নামেন নি। সেদিন উনি কত সত্যি কথাটা কত সহজ ভাবে বলেছিলেন।

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এই চারজনের শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ও যত্নে একেবারে আপ্লুত ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর মনে হয়, সন্তান সন্ততি বিশেষতঃ নাতি নাতনিদের এই স্নেহের মধ্যে দিয়ে তিনি ঈশ্বরের পরশ ও কৃপালাভে ধন্য হয়েছেন।

জীবনের শেষ সময়ে জাগতিক সব সুখ, মোহ মুক্ত হয়েও তাঁর মন প্রাণ অদ্ভুত এক আনন্দে স্নিগ্ধ হয়ে গেল। নাতনির মুখে হরিনাম ও পুত্র – পুত্রবধূর গীতা পাঠে তাঁর কর্ণ কুহরে সুধা বর্ষণ হতে লাগল এবং নাতির হাতের গঙ্গাজল তাঁর সব পিপাসা মিটিয়ে দিল এক অদ্ভুত অনাবিল রসে।

সজ্ঞানে গুরুর নাম জপ করতে করতে ২৪শে এপ্রিল ২০২১ (বাংলা ১০ই বৈশাখ ১৪২৯) শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন পরম শান্তিতে। সেই পুণ্যাত্মার পাদপদ্মে তাই আমাদের শতকোটি প্রণাম নিবেদন করি। আমার লেখনীর প্রতিটি শব্দপুষ্প শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দের মতন কর্মযোগীর জীবনকে যদি স্পর্শ করতে পারে, তাহলে এই লেখিকা ধন্য হবেন।

পুনঃ দেহাবসানের কিছুদিন আগে তাঁর সঙ্গে ফোনে “সৎসঙ্গ” করে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ  হয়েছি।

ভস্মাসুর কোভিড (Bhosmasur Covid)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথ থেকে কে আনলো ডেকে
দানবটা এই কোভিড উনিশ?
কে জানতো তার মুখে, বুকে, দাঁতে
আছে মৃত্যু বিষ।
 
পুরাকালের মহিষাসুর, বাইবেলের ঐ
শয়তান,
করোনা রূপে পেল কি প্রাণ?
রক্ত বীজের মতন যে তার
অযুত নিযুত শত হাজার।
লক্ষ লক্ষ কীটাণুতে -
মানব জাতিকে করে প্রহার।
 
ধনী নির্ধন, সুখী দুঃখী জন,
তরুণ, বৃদ্ধ, যুবক, সুজন,
মালিক, শ্রমিক, দার্শনিক -
সবাই তাহার শিকার হন।
কোন দেবতার বর পেয়ে সে
ভস্মাসুরের মতন ধায় -
কোনো দেশের নর নারী কোনও ভাবেই
ছাড়া না পায়।
সূক্ষ্ম রূপে চুপে চুপে, নিঃশ্বাসে সে
ঢুকে যে যায়,
ফুসফুসকে আঁকড়ে ধরে
বংশ বাড়ায় নীরবে হায়।।
 
পুরাকালের দানব যেমন
যার মাথাতে রাখতো হাত,
জ্বলে পুড়ে ছাই  হতো সে -
মাথার উপর বজ্রপাত।
নারায়ণকে তখন স্মরণ
করল ব্যাকুল জগৎ জন,
বিপদকালে এলেন 'হরি', -
আসার আলো দেখে ভুবন।
মোহিনী বেশ ধারণ করে
নারী রূপে ভোলান মন,
অসুর তাহার মোহে বিবস -
অদ্ভুত তাঁর আকর্ষণ।
কাছে এসে বলেন তিনি ,
কল্লোলিনী রমণী -
"দানব রাজা তোমায় দেখে
কাঁপছে শিরা ধমনী।
আমায় তুমি করতে বিয়া,
চাও যদি গো - বরণী,
নিজের মাথায় হাত দিয়ে আজ
শপথ করো এখ্খুনি"।
 
উল্লাসেতে নৃত্যরত, আবেশ বশে ভস্মাসুর,
যেই না দিল মস্তকে হাত
উত্তেজনায় ভরপুর -
অমনি তাহার বিশাল দেহ
দহন তাপে ভস্যচুর।
স্বর্গ মর্ত্ত হতে তখন
বিদায় নিল সে শত্তুর।।
 
মানব জীবন ত্রাহি ত্রাহি করছে
কোভিড এসে অবধি
পতন তাহার হবেই হবে,
এটাই কবির উপলব্ধি।
নতুন যুগে -
ঈশ্বর আজ আবার ফিরে
আসেন যদি,
নারায়ণের কৃপাবৃষ্টি সৃষ্টি করে
দয়ার নদী, -
 
তাহলে কি দমন হয় না -
ভীষণ দৈত্য করোনা
'ভ্যাকসিন' হয় 'ব্রহ্মাস্ত্র' -
মিথ্যা সে নয় কল্পনা, -
শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বানিয়ে দেবেন যোজনা,
বিষে বিষে বিষক্ষয়ের
মানুষ শুনবে মন্ত্রণা।
 
স্নিগ্ধ শান্ত রোগমুক্ত হবে আবার এই জগৎ।
হানাহানি বন্ধ করে সকল মানব হবে মহৎ।
থাকবে না আর ভয়ে ভয়ে,
বন্দি থাকার নহবৎ,
কোভিড হবে পরাজিত
এটাই হবে হকীকৎ।

মাতৃদিবস (Matridibas)

চন্দনা সেনগুপ্ত

যেদিন প্রথম জন্ম নিলাম, এই ধরণীর পরে, -
'দু' চোখ মেলে দেখতে পেলাম -
'মা' রয়েছেন, - কোলে আমায় ধরে।
তাঁহার পরম স্নিগ্ধ হস্ত পরশ আমায় করে, -
তাঁহার স্তন্য সুধায় মধুর -
অমৃত রস ঝরে।
মায়ের হাসি মিষ্টি কথায়, হৃদয় গগন ভরে,
মায়ের আদর ভালোবাসায়
ভয়ের বাদল সরে।
'মা' যে আমার ঈশ্বর আর 'মা' যে শ্রেষ্ঠ গুরু।
হাত ধরে তাই চলতে শেখা, -
পথ চলা মোর শুরু।
'মা' বিশাল বটবৃক্ষ, আমরা কোমল তরু,
'মা' যে আমার পূজার গৃহ, চন্দন অগুরু।
'মা' তো মাথার ছত্রছায়া, শীতল সে আশ্রয় -
মায়ের কাছে সকল শান্তি, পালায় সকল ভয়।
মা যে করেন সকল ক্লান্তি -
দুঃখ কষ্ট লয়,
মায়ের বুকে নিরাপত্তা সবচেয়ে প্রিয়
আলয়।
প্রত্যেকদিন  "মাতৃ দিবস" -
বাৎসরিক তা নয়,
সারা জীবন মায়ের পুজো বন্দন যেন হয়,
মায়ের আশীর্বাদেই সকল -
বিঘ্ন বাধার ক্ষয়, -
মায়ের চরণ তলে এলেই -
সন্তান পায় জয়।

ঘুমের বড়ি (Ghumer Bori)

চন্দনা সেনগুপ্ত

হাঁপানীতে কামারের হাপর, সদা করে হাঁসফাঁস।
ডায়াবেটিসে বহুমূত্রে জ্বালাতন।
হাই ব্লাডপ্রেসারে মাথা ঘোরায়,
নার্ভের কারো বা হাত পা কাঁপায়।
চোখে-ছানির পর্দা পড়ে, পায়ের হাঁটুতে বাত ধরে।
কানে কম শোনা যায়, কভু বা দাঁত কনকনায়।
ঠান্ডা-গরম, শক্ত-নরম, ভাজা-ভুজি বন্ধ থাকে।
তেলের রান্না ছেড়ে গলা ভাত খিচুড়ি
দালিয়া, দই, চিঁড়ে বা তরল সুজি,
বুড়ো-বুড়ির বরাদ্দ।
নিজেরাও সাবধান হয়ে যান সবাই,
এই বয়সে, দুপুরে তারা চেয়ারে বসে কাটায়।
রাতে যদি ঘুম না আসে,
সেই ভাবনায় সারাটাদিন নষ্ট হয়ে যায়।
সব দেশে - সব মানুষে সবাই একই ভাষায় কথা কয়।
আর কতদিন টানতে হবে রে বাবা?
যে শক্তি এতদিন করেছিলে সঞ্চয়,
আজ তার সবটুকু হয়ে গেল ক্ষয়।
ইনহেলার, ইন্সুলিন, স্টেরয়েড, রে কিম্বা কেমো
থেরাপি চলে, ওষুধ সৈন্যরা দেহের দুর্গকে
রক্ষা করতে চায়, কখনও বা জয়ের বাণীও শোনায়।
তুমি বলেছিলে, - বস্ত্র জীর্ণ হলে যেমন পরিত্যজ্য হয়,
তেমনি নড়বড়ে - ঝড়ঝড়ে এই খাঁচা ভেঙে তুমি
পালিয়ে যাবে। কিন্তু তা হতে দেয় না বিজ্ঞানী।
আত্মীয় স্বজন ভীরুমন কাঁদে, কী হবে উপায়?
"ঘুমের বড়ি" - তুমিই তাই পরম বন্ধু এখন
একমাত্র সহায়, তোমাতে আশ্রয় নিতে মন চায়।

হাত টান (Hat Taan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মিসেস ভাটিয়ার পার্টিতে সমবেত ভদ্রমহিলারা একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। এ সব ক্ষেত্রে কয়েকটি ‘টপিক’ খুব কমন থাকে। কার কার স্বামীর প্রমোশন হল বা কার ছেলে মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারিতে চান্স পেল, অথবা কে কত টাকা ডোনেশন দিয়ে পড়াতে পাঠিয়েছেন ছেলেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর নইলে কার ঝি কত টাকা মাইনে নেয়, কত ছুটি করে এসব চর্চা।

আজকেও সে সবের মধ্যে জানা গেল, মিসেস গুপ্ত ট্রান্সফার হয়ে মুম্বাই চলে যাচ্ছেন, অতএব তাঁর অত্যন্ত কর্মপটু maid কমলা কাজ খুঁজছে। মিসেস রায় তো একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ওনার বিহার থেকে আগত কাজের মেয়েটি বাড়ি চলে গেছে, আর আসবার নাম নিচ্ছে না, তাই ‘কমলাকে’ তাঁর চাই-চাই। মিসেস রায়ের বাড়িতে অনেক লোক, বুড়ো শ্বশুর / শাশুড়ি, বাচ্চা, নাতি-নাতনি, ডাক্তার ছেলের বৌদের নিয়ে খুব বড় পরিবার।

বাইরের কাজের – ঝাড়াপোঁছা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজার আলাদা লোক আছে। বাগানের মালি, ড্রাইভার সবাই মিলে বেশ একটা এলাহি ব্যাপার সামলাতে হয় তাঁকে। ভীষণ বিচক্ষণ, স্মার্ট মহিলা, রাঁধুনির কাজে তাই ‘কমলাকে’ বহাল করতে ইচ্ছা। মিসেস গুপ্ত বললেন, – “খুবই ভালো কাজ করে মেয়েটা কিন্তু কিন্তু – – – – – একটু নজর রাখতে হবে আপনাকে কেননা – – – -“

– কেননা কি কোন রোগ টোগ আছে নাকি? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস রায়।

“না না শরীর স্বাস্থ্য খুব ভালো তবে – তবে ‘একটু হাত টান’ আছে, এই আর কি”।

মিসেস শ্রীবাস্তব বলে উঠলেন, – “ও বাবা, এসব চোর ছ্যাচড়দের রাখা কেন? কোনদিন ঘরে লোক ঢুকিয়ে দেবে”।

আর একজনের প্রশ্ন – “তা কি কি নিয়েছে আপনার বাড়ি থেকে?”

– “না না সেরকম বড় কিছুই নয়, তবে ওই গাছের পেঁপে, কলা, সবজির ঝুড়ি থেকে চার পাঁচটা আলু পটল – এইসব নিয়ে নিত। ঘরের জিনিস মানে টাকা পয়সা ইত্যাদিতে হাত দেয়নি অবশ্য”।

মিসেস রায়ের উক্তি – “নিজে একটু সাবধান থাকলে, নজর রাখলেই হ’ল। আজকাল টাকা তো ঘরে রাখি না, সব কেনাকাটা কার্ড দিয়েই করি। আর গয়নাগাটি লকারে। বেগুন, মূলো গুলোও ফ্রিজে চাবি দিয়ে রাখতে হবে। যা রান্না হবে তা গুনে গেথে নিজে বার করে দেবেন”।

মিসেস গুপ্তার উক্তি – “মেয়েটার কাজ বড় পরিষ্কার। আর রান্নাটাও আমি খুব ভাল করে শিখিয়েছি। রেখে দেখুন, আপনার তো সব দিকেই লক্ষ্য”।

শহরের নাম করা উকিল সুজয় রায়ের স্ত্রী এই মিসেস রায়ের নাম – মানসী দেবী। তাঁর বাড়িতেই বহাল করা হল কমলাকে – মাসের ১৫ তারিখেই। সত্যিই মেয়েটির কাজ খুব ভালো। বেশ খুশি মনেই দিন কাটাচ্ছিলেন মানসী দেবী, কিন্তু সব সময় একটু সন্দেহের কাঁটাটা ফুটে থাকতো মনের মধ্যে। ভাবতেন কে জানে কখন কি নিয়ে পালাবে সে। একদিন সন্ধ্যেবেলায় রান্নাবান্না সেরে কমলা বাড়ি যেতে উদ্যত হয়েছে, মানসী দেবী হটাৎ লক্ষ্য করলেন ওঁর কোঁচড়ে কিছু বাঁধা, পেটের কাছে শাড়িটা যেন ফুলে আছে মনে হল। মানসী দেবীর নাতি ১৪ বছরের ছেলে বাইরের ঘরে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়া করছে। বাগানের মালী, গেটের দারোয়ান এবং আরও দুজন কাজের মেয়েও ঘর বাড়ি ধুয়ে মুছে বাড়ি যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। উকিলবাবুর মায়ের জন্য নার্স আছে। সে সেই বৃদ্ধাকে wheel chair -এ করে ঘোরাচ্ছে। হঠাৎ মানসী দেবীর গলার স্বর শোনা গেল। –

“অ্যায় কমলি, দাঁড়া, দাঁড়া বলছি, দেখা কি নিয়ে যাচ্ছিস লুকিয়ে?”

– ‘কিছু তো নয় গিন্নি মা’ – কমলার কাচু মাচু মুখে কথা আটকে গেল।

“নয় মানে? তোর পেটটা ওরকম ফুলে আছে কেন? – বলেই -তার কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। রেগে গেলে তাঁর মাথার ঠিক থাকে না। সামনে, পেছনে কে কোথায় আছে দেখেন না তিনি, মুখের ভাষাও এক মুহুর্ত্তে তাঁর বদলে যায়।

– “হারামজাদী, নচ্ছার মাগী দেখা কি চুরি করে পালানো হচ্ছে, এই কথাগুলি চিৎকার করে বলে সকলের সামনে তার শাড়ির আঁচল ধরে এক টান মারলেন।

কোঁচড়ে বেঁধে রাখা অমূল্য বস্তুটি মাটিতে পরে গেল। অপমানে, লজ্জায় তার চোখে জল এসে গেল। বাড়ির লোকেরা সবাই ঘিরে ধরলো তাকে। মাটিতে পড়া প্লাস্টিকের প্যাকেটটি হাতে করে তুললেন তিনি, – কয়েকটি রুটি মাত্র।

– ঐ শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মহিলা কিন্তু ক্ষান্ত হলেন না। কমলিকে এক ধাক্কা দিয়ে বললেন, –

“তাই ভাবি রোজ রোজ এতক্ষন ধরে কেন রুটি করা হয়। ভাত রুটি মা লক্ষী তাকে গৃহস্থের বাড়ি থেকে সন্ধ্যেবেলায় চুরি করে নিয়ে যেতে লজ্জা করে না তোর?” আজ রুটি, কাল ঘটি বাটি, – তারপর সোনার আংটি, চোর মাগী তোর সাহস তো কম নয়।”

কাপড়টা প্রায় খুলে মাটিতে লুটাচ্ছে, কমলা ভাবছে ধরণী দ্বিধা হও। ওর সঙ্গের কর্মীরা দাঁড়িয়ে মজা দেখছে।

হটাৎ মাষ্টারমশাই বেরিয়ে এলেন বৈঠকখানা থেকে গম্ভীর গলায় বৃদ্ধ শিক্ষকের যেন হুঙ্কার শোনা গেল।

“ম্যাডাম যেতে দিন ওকে। একজন গরিব অসহায় মহিলা কেন দুটো রুটি নিয়ে যেতে চায়, সেটা তো জানতে চাইলেন না ওর কাছে? সবাইকার সামনে এভাবে অপদস্ত করা কি ঠিক?”

গেটে উকিলবাবুর গাড়ি ঢুকলো, তিনি একটু অবাক হয়ে গেলেন বাড়ির দরজায় চাকর বাকরদের ভিড় ও স্ত্রীর রুদ্র মূর্তি দেখে, ভালো একটা ঝামেলার আভাষ পেলেন তিনি।

মানসী দেবী এবার কমলাকে ছেড়ে – মাস্টারমশাইয়ের ওপর বাক্যবাণ শুরু করলেন। “আপনাকে আর কাল থেকে পড়াতে আসতে হবে না। আমার বাড়ির ব্যাপারে ২ টাকার টিউশন টিচারের নাক গলানো আমি একদম পছন্দ করি না, আর বরদাস্তও করব না।”

উকিল বাবু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, – “কি হয়েছে কি বলবে তো তোমরা?”

হটাৎ কমলি বাবুর পায়ের কাছে পড়ে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল। –

“ছেলেটার খুব জ্বর গো বাবু, ঘরে আটা নেই, তাই আমার সকালের জল খাবারের রুটি দুটো আমি না খেয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম।”

মানসী দেবী রগে ফুঁসে উঠলেন, – “তাই বলে তুই চুরি করবি? চেয়ে নিতে পারতিস না? ধরা পড়ে এখন বাবুদের সিম্প্যাথি কারবার চেষ্টা হচ্ছে? বদমাইসি বের করছি তোমার, পাড়ায় আর কারো বাড়িতে যাতে কাজ না পাস, তার জন্যে দেখ আমি কি করতে পারি।”

এবার অপমানিত নিত মাষ্টারমশাই ও লজ্জিত, লাঞ্চিত অসহায় কমলাদিদির মাঝে এসে দাঁড়ালো তাঁদের ১৪ বছরের নাতি ‘সমীরেন্দ্র’।

– “চাইলেই কি তুমি দিতে ঠাম্মা? ওদের বাচ্চাদের খাবার দাও না বলেই তো ওকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে, তাও নিজের ভাগের খাবার। নিজে মুখে না দিয়ে সে – – -“

– “চুপ করো খোকন তুমি। একদম বড়দের মাঝে কথা বলবে না।”

-“ও তো ঠিকই বলছে। বড় হচ্ছে – ওরা ন্যায় অন্যায় বুঝতে শিখেছে। যাও মা, কমলা তুমি বাড়ি যাও।”

সমীর এসে তার রুটির প্যাকেট টা তুলে নিল, রান্না ঘরে গিয়ে নিজের ভাগের চারটে রুটিও ভরে দিল তার মধ্যে। তারপর দাদুর দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে জানালো, –

“কাল থেকে যদি তোমরা কাজের লোকদের ভালো করে খেতে না দাও, ওদের বাচ্চাদের খবর না নাও, অপমান করো, আমিও তাহলে এবাড়ির খাবার খাবো না।”

আর মাষ্টারমশাই কাল থেকে আমি আপনার বাড়িতে পড়তে যাব। যে বাড়িতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আপনাকে নীচু করা হল, সে বাড়িতে কেন আসবেন আপনি? ঠাম্মা কে উপেক্ষা করে এগিয়ে এল সে।

– চলো কমলাদিদি তোমার ছেলেকে দেখে আসি। দাদু আমাকে টাকা দাও ওর ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাস্টারমশাইয়ের চোখে জল এসে গেল। জড়িয়ে ধরলেন তিনি তাঁর ছাত্রকে। – বিবেকানন্দ তো এইরকম বিবেকবান ছেলেদের আত্মবিশ্বাস জাগাতে চেয়েছিলেন।

দাদু একটা ১০০ টাকার নোট বের করে নাতির হাতে দিলেন, আর বললেন, “I am proud of you।”

রূপোর থালা (Rupor Thala)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মলিনাদেবীর ছোট ছেলের বিয়ে, আত্মীয় স্বজনে বাড়ি ভরে গেছে, বিরাট ধুমধাম। কাঠের বড় সিন্দুক থেকে পিতলের সব পুরোনো আমলের পিলসুজ, প্রদীপ, তামার কোষাকুষি বের হয়েছে। সেগুলি তেঁতুল দিয়ে ঘষে মেজে পরিষ্কার করা হচ্ছে। নান্দীমুখ, পৈতে তে ভট্টাচার্য্য মশাই নারায়ণ আনবেন। দশকর্মা ভান্ডার থেকে নানারকম সামগ্রী আনা হয়েছে। আর সেগুলি প্যাকেট খুলে সুন্দর করে থালায় সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘মলিনাদেবীর’ পিসতুতো জা ‘রমাকে’। বাঁকুড়া শহরের পাশেই রাজগ্রাম থেকে যে কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানেই তিনি এসে কোমর কোষে কাজে লেগে যান, বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করে। পৈতের পর আইবুড়ো ভাত, গায়ে হলুদ, বিয়ে এবং বিয়েতে কখন কি দরকার লাগে, সব তাঁর নখদর্পনে। বরণ ডালায় কি কি জিনিষ সাজাতে হবে কতগুলি পান সুপারী লাগবে, পিঁড়ি গুলোয় কেমন নক্সা আঁকা হবে, পুরুতমশাইয়ের কাছে কখন মধু, ঘি, দুধ, দই, গোমূত্র, কলা বা হোমের কাঠ, ইঁট সব গুছিয়ে রাখতে হবে, – এ সব ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী।

মলিনাদেবীর বড় ছেলের ও মেয়ের বিয়েতেও ‘রমা’ এসেই পায়েস রান্না থেকে বিয়ের যাবতীয় খুঁটিনাটি কাজে তাঁকে সাহায্য করেছেন। এই ছোট ছেলের বিয়েটা হয়ে গেলে এখন আর শুভ কাজ নেই তাঁর বাড়িতে। তাই এবার আয়োজন ও আড়ম্বর একটু বেশিই মনে হচ্ছে। মলিনাদেবীর বয়স হয়েছে, শরীরও ভারী হয়ে যাওয়ায় হাঁটু ব্যাথা ইত্যাদিতে কষ্ট পাচ্ছেন। তাই রমাকেই যত ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে। বসে বসে পান খাচ্ছিলেন আর নিজের বোনেদের সঙ্গে গল্প করছিলেন মলিনাদেবী। হঠাৎ মনে হল, আরে বৌমা এলে এ বাড়ির রীতি অনুযায়ী বৌভাতের দিন যে ‘রূপোর থালায়’ খাবার দেওয়া হবে, সেটি তো বের করা হয়নি। কাঠের আলমারিতে তো নেই সেটি, তাহলে কোথায় রেখেছেন, তিনি। ডাকলেন রমাকে।

-“তোমার মনে আছে রমা সেই সাবেকী আমলের রূপোর বড় থালাটার কথা?”

– হ্যাঁ, যেটা মন্টির বিয়ের সময় ‘কোলগেট’ দিয়ে ঘষে নতুনের মতন করে দিয়েছিলাম, আমি? – ওটা তো এই পুজোর বাসনের সঙ্গে তোলা হয়নি, – আপনি আপনার গোদরেজ আলমারীর নীচের তাকে রাখিয়েছিলেন।

– ‘আলমারী তে?’ চলো তো দেখি। সত্যিই কাপড়ের নীচের থেকে বেরিয়ে এল সেই অপূর্ব কারুকার্য খচিত বিরাট বড় সুন্দর থালাটি। খুব খুশি হলেন মলিনা। ওটি হাতে নিয়ে বললেন, “বাঃ রমার স্মরণ শক্তি তো খুব তীক্ষ্ণ। ছয় বছর আগেকার কথা মনে রেখেছে।”

রমা মিষ্টি হাসি হেসে বললেন, “দিন আমাকে ভালো করে চকচকে করে আনি।”

মসৃন সুন্দর ফুলপাতা খোদাই করা ১০০ ভরি রূপোয় বানানো থালাটি হাতে করে মলিনাদেবী প্রতিবারের মতন এবারেও একটু ভাবুক হয়ে পড়লেন।

রমা যদিও এই দুষ্প্রাপ্য অমূল্য থালার ইতিহাস জানেন তবুও আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে মলিনা তাঁকে ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে বললেন –

এটি প্রায় দুশো বছর আগের তৈরী। আমার দিদিমা স্বর্গীয়া রাধারানী দেবীর বিয়েতে বর্ধমানের রাজবাড়ী থেকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। থালায় রাখাছিল আসল সোনার জরির কাজ করা শাড়ী, সিঁদুর কৌটো ও একটি চাবির গোছা। মা একমাত্র কন্যা হওয়ায় সেগুলি তাঁর কাছে আসে এবং মলিনাদেবীর ভাই লন্ডনে পড়তে গিয়ে আর ফেরত না আসায় তাঁর সিন্দুকেই স্থান পায় ঐসব রূপোর বাসন ও অন্যান্য দ্রব্য।

বৌভাতের দিন বিরাট এক শতরঞ্জির ওপর বসলেন বাড়ির মেয়েরা। রূপোর থালায় পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে বৌকে খেতে দেওয়া হল। পায়েস রাঁধলেন অন্য বারের মতন এবারেও রমা কাকীমা।

খাওয়া শেষ হলে বৌমাকে নিয়ে দেওর ননদেরা হাসি মস্করা করছে, ছবি তোলা হচ্ছে নানান কায়দায় এমন সময় বাইরে বেশ বড় বড় দুটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। কেউ একজন ভেতরে এসে চেঁচিয়ে বলে গেল – “ফুলশয্যার তত্ত্ব নিয়ে এসেছে বৌমার বাপের বাড়ি থেকে। সঙ্গে সঙ্গে হৈ হৈ করে ঢুকলো একদল ছেলে মেয়ে ফল ও ফুলের টুকরী নিয়ে। তাদের পেছনে লাইন দিয়ে নানান শৈল্পিক কুশলতায় বানানো অনেক রকমের দ্রব্য সামগ্রী। ট্রে তে করে নমস্কারীর শাড়ী, বরের শার্ট – প্যান্ট, পাঞ্জাবী – পাজামা, শাল ইত্যাদিতে ভরা চোখ ধাঁধানো সব সম্ভার।

মলিনাদেবী মধুকাকুকে ডেকে বললেন – “চাকর বাকরদের ডেকে তাড়াতাড়ি এই শতরঞ্জীটা উঠিয়ে ফেলো। চারজন মিলে ওটি গুটিয়ে নিয়ে আবার সেই কাঠের সিন্দুকে রাখতে নিয়ে গেল। মাটিতে মাছ, ফুল, মিষ্টি ফুলশয্যার তত্ত্বগুলি রেখে কনের বাড়ির লোকেরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলেন।

সন্ধ্যেবেলায় সবাই সাজ গোজ করতে ব্যস্ত মলিনাদেবী রমাকে ডেকে বললেন, – রমা রূপোর থালাটা ধুয়ে নিয়ে এসেছে কি খ্যান্তমনি? তাহলে ওটি এখন ঠাকুরঘরে রেখে ঘরটা চাবি দিয়ে দাও।”

রমা ঠাকুরঘরে রূপোর থালাটির খোঁজ করতে গিয়ে সেটি দেখতে পেলেন না। খ্যান্তমনি ঝি বললেন, – “বৌমনির খাওয়ার পর ওটা ধুয়ে এখানেই তো রেখে দিয়ে গেনু। গেল কোথা”?

রমা এবার ঘাবড়ে গেলেন। পার্টিতে যাওয়া মাথায় উঠলো তাঁর। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে লাগলেন বারান্দায় – যেখানে বাসন মাজা হয় – পুজোর বাসন, তত্ত্বের ট্ৰে, ফুল সব সরিয়ে। কিন্তু কোথাও সেটির চিহ্ন নেই। চাকর বাকরেরা বলছেন – “দেখিনি তো। অতজন লোক তত্ত্ব নিয়ে ঢুকলেন হুড়মুড় করে – আমরা তো বাইরে পালালাম সবাই। কোন বিষয়ে হটাৎ উত্তেজিত হওয়া তাঁর স্বভাব নয়, তাই মনিলাদেবীকে ওই অতিথিদের মধ্যে গিয়ে কিছু না বলে কাজের লোকগুলির কাছে গেলেন। একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। পুরোনো মাসী – খ্যান্তদিদি সবাই মিলে খোঁজা শুরু হল এদিকে ওদিকে – কাপড় চোপড় ফুলের ঝুড়ি খাটের তলা কিন্তু কোথাও তার হদিস মিললো না।

রমাকাকীমা দেখেছেন বৌমার খাওয়ার অনুষ্ঠানের পরে ওটি ধুয়ে আনা হয়েছে এবং এই শতরঞ্চির ওপরে যেখানে মেয়েরা বসে হাসি ঠাট্টা করছিল সেখানে রাখাও ছিল। তারপর হুড়মুড় করে মেয়ের বাড়ির লোকেরা এসে পড়ায় কেউ আর খেয়াল করেননি, রমাও ঠিক তখনিই ঠাকুরঘরে গিয়েছিলেন; ভট্টাচার্য মশাই নিজের থলি, গামছা, দক্ষিণার টাকা সব ভুলে ফেলে যাওয়াতে রমা সেগুলি নিয়ে বৃদ্ধ পন্ডিতমশাইকে দেওয়ার জন্যে ছুটেছিলেন গেটের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলছিলেন পাঁচ মিনিটের জন্যে। পন্ডিতমশাই তাঁর ওপর খুব খুশী। প্রতিবারই রমা এতো সুন্দরভাবে সকলের অজান্তে কারো প্রশংসার অপেক্ষা না করে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে নিষ্ঠা ভরে সাহায্য করেন তা লক্ষ্য করে তিনি তাঁকে মন প্রাণ দিয়ে আশীর্বাদ করেন। আজও তাঁর থলি তুলে দিয়ে রমা দেবী তাঁকে প্রণাম করে ফিরে এলেন ঐ বড় ঘরে, তখন সেখানে বাসনপত্র বা শতরঞ্চি কিছুই ছিল না শুধু ফুল, ফল, মাছ ইত্যাদি – – – –  তাহলে ঐ সাবেকী কালের কারুকার্য খচিত “রূপোর থালাটি” গেল কোথায়? চিন্তা ভাবনায় অস্থির রইলেন তিনি।

বাড়ির সবাই বৌভাতের ভোজের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত। হৈ চৈ আনন্দে নানা কোলাহলে, নাচ, গান, হাসি মস্করায় – আসর জমজমাট। শুধু রমা কাকীমা, খ্যান্তমাসী, বাসন মাজার বাউরী বৌ সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সেই রূপোর থালাটি।

পরের দিন সকালে কথাটা কানে গেল মলিনাদেবীর। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুললেন তিনি। সব চাকর বাকর এবং আত্মীয় স্বজন তটস্থ। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে সেই পুরোনো আমলের অমূল্য থালা। নতুন বউও ঘাবড়ে গিয়ে একদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। খ্যান্তমাসী তার ঘরে ঢুকে এবার ফুলের মালা সাজানো খাটের চারপাশে ঘুরে এলেন একবার যদি কেউ নিয়ে গিয়ে থাকে।

বাউরী বৌ কাঁদতে লাগল। রমাকাকীমা বললেন, ‘তুই কেঁদে মরছিস কেন? তোকে তো আমি এইখানে এনে রাখতে দেখেছি। তারপর তত্ত্ব এলো – – -‘।

একজন আত্মীয়া বলে উঠলেন যে ছোঁড়া গুলো ফুলের টুকরী, মাছ, ফলের ঝুড়ি এনেছিল তাদের কারো কাজ হতে পারে।

“ওরা সবাই তো বৌমার ভাই, বোন, বন্ধু ছিল। তারা তো ঐ সব জিনিষগুলি রাখার পর গিন্নিমা ওদের ড্রয়িং রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন, মিষ্টি, শরবত খাওয়ানো হল। যাওয়ার সময় সবাই তো খালি হাতেই চলে গেল”। – বললেন মধু কাকা, তিনি ওদের আপ্যায়নে নিযুক্ত ছিলেন।

“তাহলে কি অতবড় থালাটা কর্পূরের মতন উবে যাবে”? গিন্নিমার ধ্যৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। হটাৎ বললেন – মধু তুমি যাও তো পন্ডিতমশাইয়ের বাড়ি, যদি ওনার সঙ্গে চলে গেছে।

রমা কাকীমা বললেন – “না না ওনার কাছে যেও না, উনি তো নিজের গামছা ধুতি ফল গুলোও না নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, আমিই তো ওনার থলেটা গেটে গিয়ে ওনার হাতে ধরালাম”।

মলিনাদেবী বললেন – “তুমি চুপকর রমা, যাক মধু একবার ওনার বাড়ি, বুড়োমানুষের ভীমরতি ধরতে পারে, সকালেও তো একবার বাড়ি গিয়েছিলেন”।

মধু কাকা তখুনি গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন, ভট্টাচার্য্য মশাইয়ের বাড়ি।

পন্ডিতমশাই খুব শান্ত জ্ঞানী মানুষ। তিনি শুধু বললেন, – “সেকি কথা, ওটা তো শতরঞ্চি ওপরেই রাখা ছিল, কোথায় হারালো”?

– ভট্টাচার্য্য মশাইয়ের মুখরা স্ত্রী কিন্তু চুপ করে ঐ অপমানটা হজম করলেন না। তিনি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, – “পন্ডিতমশাইয়ের বাড়ি রূপোর থালা খুঁজতে এসেছেন? এতো বড় আস্পর্দ্ধা আপনাদের। বড় লোক বলে নিজেদের কি মনে করেন আপনারা? একজন সৎ ব্রাহ্মণ পূজারীকে এইভাবে অসম্মান করলেন, আর কোনোদিন কোন কাজে ওনাকে ডাকতে আসবেন না। অভদ্র ছোটোলোক সব”।

মধু কাকাও বুঝলেন মলিনা বৌদির কথায় এরকমভাবে চলে আসা তাঁর উচিত হয়নি।

আশ্চর্য্য রূপোর থালা হাওয়া। হটাৎ রমা কাকীমার দিকে নজর পড়ল ধনী বড় যা মলিনাদেবীর। যে ঘরে রমাদেবী নিজের স্যুটকেসটি রেখেছিলেন সেখানে ঢুকে ঐদিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর পেছনে পেছনে বাড়ি সুদ্ধ লোক। বললেন – “রমা স্যুটকেসটা খোলো তো একবার”।

রমা কাকীমা একেবারে হতভম্ব। তাঁকে যে কেউ সন্দেহ করতে পারে এ কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না তিনি। অঞ্চল থেকে স্যুটকেসের চাবিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে হন হন করে। মলিনাদেবী সেদিকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে খুললেন সেই স্যুটকেস। কাপড়-জামা সামান্য ছিল। ব্লাউজ, নিচের জামা, গায়ের চাদর সব ঘাঁটতে লাগলেন তিনি। রমা কাকীমা ততক্ষনে নিজের পরনের কাপড়টা একটু ঠিকঠাক করে, পায়ে চপ্পল গলিয়ে একেবারে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। পেছনে কে বা কারা তাকে ডাকছে সে দিকে কান না দিয়ে একটা অটো রিকশায় চেপে বসেছেন। লজ্জা, ঘেন্নায় বা রাগে দুঃখে নয় অদ্ভুত একটা জ্বালায় তাঁর সারা শরীর জ্বলছে। আর কোনদিন তিনি যে আগ্রহ করে বিয়ের কাজ করতে যাবেন না – সে বিষয়ে যেমন প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হ’ল, তাঁর মনে তেমনি অভিমান হল ভগবানের ওপর। “ঠাকুর কী বিচার তোমার? যে তোমাকে ভালোবাসে বিয়ে, পৈতেতে মানুষের বাড়ি গিয়ে সাহায্য করে, শুভকার্য্যে পন্ডিতমশাইয়ের হাতে হাতে তোমার পূজোর ফুল সামগ্রী অর্চনার বস্তু এগিয়ে দিয়ে আনন্দ লাভ করে, তাঁকে আজ সবাইকার সামনে তুমি এতো ছোট করলে”! চোখ দিয়ে জল নয় যেন আগুন বেরুতে লাগল।

প্রায় দশ বছর পরে মলিনাদেবীর স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে আবার আত্মীয় স্বজনেরা উপস্থিত হয়েছেন সেই বাড়িতে। রমা দেবী, মধু কাকা ও পুরোনো ভট্টাচার্য্য মশাই সেখানে নেই। কাঠের সিন্দুক খুলে আবার তামা পিতলের বাসন বেরুলো এবং সেই শতরঞ্জিটি যা এই দশ বছর ধরে গোটানো ছিল সেটিকে খুলে ধুলো ঝেড়ে আবার পাতবার নির্দেশ দেওয়া হল। আর তখনি অবাক হয়ে সবাই দেখলো তারমধ্যে সেই রূপোর থালাটি এতদিন লুকিয়ে ছিল।

ফুলশয্যের তত্ত্ব আসায় না দেখে চাকর বাকরেরা ঐ শতরঞ্জিটি গোটানোর সময় “থালাটিও” ওর মধ্যে ঢুকে যায়।

“রূপোর থালা” খুঁজে পাওয়ার আনন্দে নাকি রমার মতন ভালো বোনকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলার জন্যে জানেন না – অনুশোচনায়, দুঃখে মলিনাদেবী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সবাই ভাবলো স্বামীর শোকে বোধহয় কাঁদছেন তিনি।

শরীর ও মন (Shorir O Mon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শরীর ও মন, একে অপরের পরিপূরক,
একে অপরের ওপর নির্ভরশীল,
সারাটি ক্ষণ।
দেহের যন্ত্রনা ঘটায়, মানসিক বিপর্যয়।
ধ্বস নামে।
কী যে হয়ে গেল, কী যে হয় ! এবারে কি হবে?
কোথায় গিয়ে কেমন করে জীবনের
গাড়ী থামে !
কে জানে হঠাৎ কখন আসবে প্রলয়।
করোনা ভাইরাস এসে অদ্ভুৎ আক্রোশে
মানুষের ওপর ঝাঁপায়।
প্রিয়জনের হতাহত হয় বিনা বাধায়,
কুল কিনারা হারিয়ে যায়,
ডাইনে বামে।
যারা রুগী নয় তারাও হতভম্ব।
খুঁজে পায় না বাঁচার উপায়।
দূরত্ত্ব বজায় রাখে, একে ওপরের শুধু,
মোবাইলে ডাকে।
শুধু একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা কেটে
বিনা দামে।
অন্ধকার গুহায়, ঘরের কোনায় কে তাঁহাদের কাঁদায়।
শীতের দিনেও চিন্তা ভাবনায়
হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।
আতঙ্কে ভয়ে তুষারপাতেও তারা
অকারনে ঘামে।
অবশ হৃদয়ে তারা বসে থাকে ঈশ্বরের আশায়।
প্রভাতের পরেই আবার সন্ধ্যা নামে।

আমার প্রিয় ভাই শিবু (Amar Priyo Bhai Shibu)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শুভ বিদায়

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রিয় ভাই শিব প্রাসাদ , তুমি আর নেই  দুনিয়ায়,
কত তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেললে
এই জীবনের স্বাদ।
তোমাকে হারানোর বেদনা, অন্তহীন, ভাষাহারা,
কাউকে বোঝানো যাবে না।
ছিলে তুমি সকলের প্রাণের চেয়েও প্রিয়।
মনে জাগে দুঃখ ও খেদ,
কেন যে হল এ বিচ্ছেদ !
'আত্মনির্ভর' স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারও মুখাপেক্ষী
ছিলে  না কোনোদিনও !
কারো দ্বারস্থ, হও  নি কখনো !
পরিবারের প্রত্যেক সদস্য তোমার স্নেহে প্রেমে
শ্রদ্ধায় তৃপ্ত, ছোটদের ছিলে তুমি সতত নমস্য।
তোমার সহজ সরল উদার মনোভাব, -
সর্বদা সাকারাত্মক, খেলোয়াড়ের স্বভাব।
আজ শুধু মনে পড়ে যায়, সংসার সংগ্রামে
ছিল কত নির্ভীক, সৎ পথে চলে যেতে ঠিক ঠিক সদাই,
মানো নি তো নি কোনো বাধাই  !
রক্ষা করে, আগলে ধরে, আদর ভরে -
এতদিন যারে রেখেছিলে কাছে,
সেই জীবন সঙ্গিনী একাকিনী আজ
এখানেই পড়ে আছে।
এটাই যে প্রকৃতির রীতি, বিধাতার অমোঘ বিধান।
না চাহিলেও মেনে নিতে হয় -
দেহের খাঁচা ত্যাগ করে যায়, -
সকল মানব প্রাণ।
জীবাত্মা তব মিলায়েছো আজ পরমাত্মার সাথে -
মুক্তির ক্ষণে ঈশ্বরের আশীষ ঝরুক যাত্রা পথে।

আমার প্রিয় ভাই শিবু

চন্দনা সেনগুপ্ত

খোলা চিঠি এক অসাধারণ সুদক্ষ গোলরক্ষক কে :-

একেবারে মায়ের জঠরে থাকতেই শিশু খেলোয়াড় পেটের মধ্যে এমন পা চালাতো, লাথি ছুঁড়তো যে মা ‘বিদ্যুতরানী’ অস্থির হয়ে পড়তেন। বাবা বলতেন হাসতে হাসতে – “ভালো ফুটবলার হবে গো তোমার ছেলে। মোহনবাগানের ক্লাবে খেলতে নামবে একদিন”। ভবিষ্যতে দেখা গেল যে সত্যিই ছেলেটা স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় ক্লাবে এবং পরে দিল্লীর বড় বড় নাম করা দলে বল পায়ে নিয়ে সারা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে “গোল রক্ষক” হিসাবে খুব নাম যশ হল তার। খেলা দেখে নর্দান রেলের বড় বাবু ও কোচ বাড়ি এসে চাকরী দিলেন তাঁকে।

বাবার মৃত্যুর পর এই দক্ষ খেলোয়াড় আমাদের শিবু নিজের চেষ্টায় ও পরিশ্রমের জোরে সংসারে অর্থ সাহায্য করতে লাগল অতি অল্প বয়স থেকে। তাঁর যমজ বোন দূর্গা ও পরের দুই ছোট বোন জয়া বাচ্চু এবং অসুস্থ মায়ের প্রতি কর্তব্য করতো সে অন্য দাদাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

মা কে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বোনেদের ছোট ছোট চাহিদা মেটানো, বৌদিদের ও ভাইপো ভাইঝিদের আন্তরিকভাবে যেকোন ব্যাপারে সাহায্য করা, বিনোদন করা ছিল তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ।

পরিবারেও সে যেন গোল রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলতো। তাই শেষ সময়ে অত্যন্ত সুষ্ঠভাবে দুই কন্যার বিবাহ, নাতি নাতনির প্রতি যথাযথ কর্ত্তব্য পালন করে সে আমাদের পরিবারের নাট্যমঞ্চ হতে বিদায় নিল সকলের আগে।

কোভেট-১৯ দানবটা সজোরে ‘বল’ মেরে গোল করবার চেষ্টা করেও সফল হল না। আমাদের ছোট ভাই সেই বল তথা করোনা ভাইরাসের পদাঘাত বুকে ধরে নিল নিজের। গোল রক্ষকের সক্রিয় ভূমিকায় সে অন্তিম শ্বাস পর্যন্ত অভিনয় করে গেল। তাই আজ শিবু প্রসাদ তোমাকে স্যালুট ও সশ্রদ্ধ নমষ্কার জানাই।

স্বর্গীয় বাসুদেব সেনগুপ্ত শ্রীরামপুর গ্রাম, ভগীরথপুর থানা, মুর্শিদাবাদ জেলা নিবাসী পরবর্তী কালে ভারতের রাজধানী দিল্লী প্রবাসী একজন অতি সজ্জন উদার, পরপোকারী মানুষ ছিলেন। তৎকালীন লাহোরের এক মেডিকেল স্কুল থেকে পাশ করে দিল্লীর “চাঁদনীচকের” বিখ্যাত বাঙালি ডাক্তার অনিল সেন এর কাছে কাজ করতেন তিনি। যুদ্ধের বাজারে অনেকগুলি ছেলেমেয়ে ‘কাশ্মিরী গেট তথা গন্ধ নালার মন্দিরওয়ালা গলিতে তাঁর বাস ছিল। নন্দ, আরতি, মঞ্জুর পরে তাঁর পুত্র গোবিন্দ জন্মায়। কিন্তু মাত্র ৭ বছর বয়সেই ‘মেনেঞ্জাইটিস’ রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। তারপর নিতাই মঙ্গল ও শংকর জন্মায়। অর্থাৎ এই ছয়জন পুত্র কন্যা নিয়ে যখন তিনি অতি দরিদ্রতার মধ্যে কোনোরকমে দিনগত পাপক্ষয় করছেন, তখন ভারত স্বাধীন হয়। তাঁর ওই গ্রামটি সেই সময় পাকিস্তানে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গুজব রটেছে। সীমান্ত ভাগে বিচ্ছিন্ন বিভক্ত দুই দেশের সব জাতি ধর্ম ও বয়সের লোকেরা বিভ্রান্ত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আনন্দ কীভাবে যে দেশের মানুষ উপভোগ করবে, ভিটে মাটি হারানোর দুর্ভাবনাগ্রস্থ লোকেরা কখন কোথায় কোনদিকে পা বাড়াবে বুঝতে পারছে না।

রাজধানী দিল্লীতে হিন্দু মুসলমানের হানাহানি, মারামারি, হিংসা, দ্বেষ তখন চরমে উঠেছে। জাপানে নিউক্লিয়ার বোমের ভয়াবহতা হিরোশিমার আক্রমণের বিভীষিকা প্রত্যেক দেশের মানুষকেই আতংকিত করে দিয়েছে। দিল্লী শহরেও বোমা পড়তে পারে সেই ভয়ে দলে দলে লোক বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কোন রকমে প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছে।

বাসুবাবুও ঐ ছয় সন্তানসহ তাঁর শ্রীরামপুরের ভিটায় মা সুশীলা বালা দেবীর কাছে এসে হাজির হলেন। বেশ কয়েকবছর কেটে গেল। বাসুদেব বাবুর স্ত্রী বিদ্যুৎরানী আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। পুজোর সময় ঠাকুর দালানে দেখে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর পেটের আকার এতো বড় যে আত্মীয় ও প্রতিবেশী গণ চিন্তিত হলেন। বিজয়ার দিন সিঁদুর খেলা খেলে এসে হাঁসফাঁস করতে লেগেছেন তিনি, গোয়ালের পাশে খড়ের গাদার ওপর শতরঞ্চি চাদর পেতে আঁতুর ঘর তৈরী করলেন – শাশুড়ী বৌ মিলে। ডাক্তার স্বামী বাড়ি নেই, রোগীর খবর নিতে, ওষুধ ইনজেকশন পথ্যের ব্যবস্থা করতে অন্য গ্রামে গেছেন। তখনকার দিনে আমাদের বঙ্গদেশে মেয়েদের প্রসবকালে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

একাদশীর দিন সকাল থেকে উঠল ভীষণ বেদনা। তারমধ্যেও সংসার গুছিয়ে রেখে বৌমা ঢুকলেন আঁতুড়ঘরে একা। শাশুড়ী মাতা পাড়ার ছেলেকে পাঠালেন পাশের গ্রামে ‘ভগীরথপুর’ থেকে ‘দাই মা’ কে ডাকতে। দাই মা জানালেন, তিনি দুপুরের আগে আসতে পারবেন না, বাড়ির বাচ্চাদের জন্য ভাত রান্না করে, ভিজে কাপড় শুকোলে তারপরে আসতে পারবেন। গরীব দাই মা কত প্রসূতির প্রাণ বাঁচিয়েছেন, গ্রামে কত শিশু তাঁর হাতে নির্বিঘ্নে জন্ম গ্রহণ করলো কিন্তু সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাঁর। দারিদ্রের ভারে জর্জরিত মহিলার কাছে মাত্র একখানি শাড়ী, যা পরে তিনি বাইরে যেতে পারেন। আজ সকালে ওটি কেচে ফেলেছেন আর শতছিন্ন একটি কাপড় জড়িয়ে তিনি উনুনে ঘুঁটে সাজাচ্ছিলেন। বললেন, – “গিন্নি মা কে বলো খুব ব্যাথা উঠলে বৌমাকে আঁতুড়ে নিয়ে যেতে, আর গরম জল, নরম পুরোনো কাপড় সব ঠিক করে রাখতে। আমি একটু পরেই ছুটতে ছুটতে এসে যাব”।

কিন্তু পেটের মধ্যে তখন বৌমার খেলোয়াড় সন্তান পা চালাতে শুরু করে দিয়েছে, সেকি দাই মা, ডাক্তার, নার্সদের অপেক্ষা করবে? বাইরের জগতে তাকে ঠিক সেই সময়ে বেরিয়ে আসতে হবে, বিধাতা তার জন্য যে ‘শুভক্ষণ’টি ঠিক করে রেখেছেন। অতএব শুরু হল নাটকের চরম মূহুর্ত্ত। বৌমার একটা আর্তনাদ শোনা গেল – “মা মাগো বাঁচাও আমায়” আর যে সহ্য করতে পারছেন না তিনি। শাশুড়ী দেখে প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, কিন্তু ভীষণ তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি ছিল তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা শক্ত বেতের ঝুড়ি বৌমাকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বৌমা এই ঝুড়িটা বুকের তলায় ধরে জোর দাও জল ভেঙে গেছে, মাথা বেরিয়ে এসেছে। দম দাও, দম দাও ধৈর্য হারিও না”। ঝপ করে সুন্দর ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান বেরিয়ে এল, মায়ের জরায়ু থেকে। কিন্তু তারপরেও আবার ভীষণ জোরে তীব্র যন্ত্রনার ঢেউ উঠল।

শাশুড়ী মা চিৎকার করে উঠলেন, “হাল ছেড়ো না বৌমা, আর একটি বাচ্চা আসছে। বৌমা বৌমা শক্ত হও, জোর দাও – পরেরটাকে বেরিয়ে আসতে দাও,” এক হাতে সদ্য প্রসব হওয়া নবজাতটা সরিয়ে দিলেন মা।

ঠাকুর কী অসাধারণ অদম্য প্রাণ শক্তি তাঁকে দিয়েছেন আজ। যমজ দুই সন্তানের মা, যেমন করেই হোক একা একাই দুটি শিশুকে তাঁর দেহ থেকে আলাদা করতে পেরে – প্রচন্ড উত্তেজনায় আবেগে হাঁপিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে রইলেন, সারা চাদর রক্তে লাল। পরেরটি এক অপরূপা কন্যা।

শাশুড়ী মা আনন্দে কাঁদছেন, আর উঠোনে, ঘরে জমা হওয়া প্রতিবেশী কে চিৎকার করে বলছেন, ওগো তোমরা শাঁখ বাজাও আমার ঘরে শিব দূর্গা এসেছেন, আজ একাদশীর দিনে। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাঁপাতে হাঁপাতে ‘দাই মা’ এসে হাজির। নাড়ী কাটা বাচ্চাদের পরিষ্কার করার কাজগুলি আনন্দের সঙ্গে সমাধা করলেন।

একটু বড় হতে দেখা গেল সত্যিই তার পায়ে জাদু আছে। বল খেলতে সে ভীষণ ভালোবাসে। ১৯৬৮ সালে যখন তার বাবা হটাৎ হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন, তখন মাথায় যেন বাজ পড়ল তাদের ঐ পরিবারের ওপর। ‘কিরোরী মাল’ কলেজে পড়া কালেই শিবুর ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ হল এবং দিল্লীর বিভিন্ন ফুটবল ক্লাব তাকে নিয়ে মাতামাতি করতে লাগল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মতন দলের বিরুদ্ধেও খেলবার সুযোগ পেল সে জীবনে, এবং খেলার জোরেই “নর্দান রেলওয়ে” তে টিকিট চেকারের পদে নিযুক্ত হল সে। পরবর্তীকালে সেখানে ক্যাপ্টেন ও পরে কোচ হয়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করল।

শুধু যে খেলায় ভাল ছিল তা নয়, তার মধুর ব্যবহারে পরিবারের সব সদস্য, প্রতিবেশী চাকুরী ক্ষেত্রে বন্ধু বান্ধব, প্রথমে কাশ্মিরী গেটে ও পরে লক্ষ্মী নগরের সমস্ত বাঙ্গালী ক্লাবের সব সদস্যরা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।

শিবুর ওপরে তিন দাদা ও তিন দিদি ছিলেন কিন্তু কোনদিন সে কারোর কাছে হাত পাতে নি, মুখ ফুটে কিছু চায় নি, সদা সর্বদা তার মুখে হাসি লেগে থাকতো। নিজে পছন্দ করে অতি সুন্দর স্নিগ্ধ স্বভাবের সহজ সরল ভক্তিমতী কন্যা নীলিমাকে বিবাহ করে সে কোনো পণ না নিয়ে এবং তাদের কোনো প্রকার খরচ না করিয়ে। পত্নীও পেয়েছে সে অত্যন্ত সুলক্ষণা, সুগৃহিনী, দুঃখে কষ্টে জীবন সংগ্রামের সহধর্মিনী। দুই কন্যা ও জামাতারাও ঈশ্বরের কৃপায় অত্যন্ত সুযোগ্য এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। সরস্বতীর মতন গুনবতী নাতনি ও গণপতির মতন মঙ্গলদায়ক এক নাতিকে নিয়ে তার পরিপূর্ণ সুন্দর পরিবার। –

সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছিল, হটাৎ কোথা থেকে “করোনা ভাইরাস” এসে তাকে আক্রমণ করল এবং এক অতি পুন্যদিনে সে সজ্ঞানে স্বর্গারোহন করল প্রকৃত সাহসী কুশল এক খিলাড়ির মতন।

শিবপ্রসাদ সেদিন কাউকে সঙ্গে না নিয়ে একাই চড়লো অ্যাম্বুলেন্স-এ এবং কোন আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ছাড়াই অন্তিম যাত্রায় শয়ন করল নির্ভীক ভক্ত পথিকের মতন।

তাঁর পুন্য আত্মার শেষ কৃত্য শ্রাদ্ধানুষ্ঠানটিও সম্পন্ন হল আর এক পুন্য একাদশীতে। তাঁর বিদেহী আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে বিলীন হয়ে শান্তিধামে বিরাজমান এবং সেখান থেকেই তাঁর সারা পরিবারের ওপর বর্ষণ করে চলেছে স্নেহাশীর্বাদ – এ কথা আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।

অচ্ছু্ৎ কন্যা (Achyut Konya )

চন্দনা সেনগুপ্ত

সমস্ত জগৎবাসীর কাছে আজ আমার দেশ জননী
হলেন, “অচ্ছু্ৎ কন্যা”
'ভারতবর্ষ' 'কোভিড' আক্রান্ত অস্পৃশ্য - কেউ তাকে
তাই ছুঁতেই চাই না।
মায়ের চোখে ঝরছে অবিরল জল,
বিষন্ন বদনে, সারা বিশ্বের পানে -
দু হাত পেতে তাকিয়ে আছেন - তিনি হয়ে আজ নিতান্ত অসহায় দুর্বল।
অন্ন-বস্ত্র বাসস্থান, অর্থ কিম্বা কোনো সম্মানপত্র
দান কিম্বা ধন সম্পদ নয়, - কোথায় পাবে? কোন খানে
একটু বিশুদ্ধ হাওয়া, অক্সিজেন সিলিন্ডার?
শুধু সন্তানের প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশায়, তাঁর বইছে অশ্রু বন্যা।।
 
কত সুন্দরভাবে গত একবছরের বিভীষিকা কাটিয়ে
ঝড় প্রায় থেমে এসেছিল।
সবই নরমাল, শহরে, নগরে, গ্রামে গঞ্জে -
পথে বেরিয়ে পড়েছিল নর-নারী -
এইতো সেদিন।
বন্ধ দোকান খুলে, আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল
বেচাকেনা প্রতিদিন।।
 
নিত্য খেটে খাওয়া মজদুরের ঘরে আবার জ্বলে উঠেছিল চুলা
ভাঙাচোরা বাহন নিয়ে রিকশাওয়ালারা পুনরায়
গামছায় ঘাম মুছে, হয়ে উঠেছিল সচল।
ঘরে বসে কাজ করতে করতে বন্ধুহীন ইঞ্জিনিয়ার
হাত পা ঝেড়ে অফিসের জামা কাপড়
পরে ট্রেনে বাসে হয়ে উঠেছিল চঞ্চল।।
 
ডাক্তারবাবুরা এবার 'ক্যান্সার' রোগীদের কেমো
নেবার জন্য হাসপাতালে নির্ভয়ে আসতে
আহ্বান জানিয়েছিলেন, উঠে গেছে লক ডাউনের অবরোধ।
দাঁত, কান, চোখের ডাক্তারবাবু চেম্বার
পরিষ্কার করে নিজের সহযোগী কর্মচারীদের
কাজে আসতে করেছিলেন অনুরোধ।।
 
যে শ্রমিকের দল ১২০০ কিলোমিটার
হেঁটে বিহারে, পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে প্রাণ
বাঁচিয়েছিলেন, তারাও স্বরস্বতী পুজোর পরই
ট্রেনের টিকিট কেটে এখন ফিরতে শুরু
করেছিলেন দিল্লী - বোম্বে আমেদাবাদ
কারখানায়। ছেলে পিলেদের কতদিন আর
না খাইয়ে রাখা যায়।।
 
যাঁরা বিয়ে বাড়ির ভোজ রান্নার ক্যাটারার,
ট্রাকে করে সব্জি, ফল আনে ভরে -
সরব করে মন্ডি বাজার -
তারা সবাই নতুন উদ্যোগে, লোকসানের
দুঃখ ভুলে, আবার শুরু করেছিল ব্যাপার।।
 
ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ লাগিয়েই
আনন্দে আত্মহারা দেশবাসী,
'ফেসবুকে' ছবি ছাপালো রাশি রাশি।
দূরদৃষ্টির অভাব নেতাদের টেনে আনলো
পথে ঘাটে ময়দানে।।
বিনা মাস্ক পরে ৱ্যালি করলো হাসি হাসি।
মানুষের জীবনের চেয়ে এখানে দামী
ক্ষমতা অধিকারের।
ভোট ব্যাঙ্কের অভাবনীয় রেশারেশি।।
 
ধর্মীয় গুরু মহা সিদ্ধ পুরুষেরা দলে দলে
নামলেন গঙ্গা জলে, -
গুহায় বসে ধ্যান জপ করা
ছেড়ে 'করোনা' দানবের পরাক্রম ভুলে।
দেশের তৈরী ওষুধ ইঞ্জেকশান উদার ভাবে করা হল
বিতরণ।
ধন্য ধন্য করল প্রতিবেশী দেশের মানুষজন।।
 
কিন্তু কে জানতো তখন !
ভূমি ফাটিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে রঙ্গমঞ্চে
আবার করবে অবতরণ -
সে ধেয়ে এল সাংঘাতিক ঝড়ের মতন।
ছিন্ন ভিন্ন হল আমাদের দেশ মাতৃকার বদন।
লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃতদেহে  ভরে গেল
যত ছিল শ্মশান ভূমি।।
 
হাহাকারে আর্তনাদে বিদীর্ণ হল নরম জমি।
দেশের মানুষের অমার্জনীয় ভুল ! না ঐ
প্রকৃতির প্রতিশোধ নিতে উদ্যত বিধাতার
রোষ ডেকে নিয়ে এলো দ্বিতীয় বার
"কোভিড সুনামী"।।