খোলা চিঠি (Khola Chithi) শ্রদ্ধাঞ্জলি মানস চৌধুরীকে

চন্দনা সেনগুপ্ত

শ্রদ্ধাঞ্জলি মানস চৌধুরীকে

সরস্বতী পুজোয় ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নাচের অনুষ্ঠান করাচ্ছি। জয়া গানগুলো গাইছে হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাদের সঙ্গে। তার সুন্দর করে সাজানো “ট্যাগোর গার্ডেনের” একতলায় ড্রইংরুমে রোজ বসছে চাঁদের হাট।

আমার কোলে চার মাসের ‘রুস্তম’ এবং জয়ার কন্যা মিষ্টি, ও আমার বড় পুত্র রানা তখন ৫/৬ বছরের শিশু। বাচ্চাদের কলকাকলিতে মুখর হত হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশ। বেশ কিছুটা সন্ধ্যে গড়ালে যখন বাড়ি যাবার পালা তখন অফিস থেকে ঢুকতেন মানস দা। মাথায় খাটো কৃষ্ণকায় মাঝারি গড়নের চেহারা – কিন্তু অদ্ভুত এক প্রশান্তিমাখা মুখচ্ছবি। সর্বদায় কৌতুকপ্রিয় হাসিতে উজ্জ্বল, শান্ত স্নিগ্ধ যুবক তখন তিনি। আমরা রোজ তাঁর ঘর তছনছ করে, টেবিল চেয়ার সরিয়ে, ডেকোরেশনগুলি এধার ওধারে ফেলে নাচগান করতাম। এসেই সব গোছাতে লাগতেন তিনি।

সেবার শুধু দূরের থেকে দেখার মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। পরে ছেলে মেয়েরা একটু বড় হয়েছে। রুস্তম, রানা ও মিষ্টির সবে ৮/৯, তখন ও ‘কীর্তিনগরের মিলনী ক্লাব’ বা রাজরী গার্ডেনের পুজো প্যান্ডেল এর জন্যে ঠিক মনে নেই “খ্যাতির বিড়ম্বনা” নাটকের মহড়া দিচ্ছি ঐ প্রশস্ত বৈঠকখানায়, মানসদার মাঝে মাঝে উপস্থিতি থাকতো সেখানে খুব সম্ভব রবিবারে।

বাচ্চা বাচ্চা কুশীলবদের প্রতি আন্তরিক স্নেহ, যাঁরা শেখাচ্ছেন তাঁদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার উৎসাহ দেওয়া ও কখনও কখনও তাদের ধৈর্য ধরে ত্রুটি বলে দেওয়া – সব যেন এক মোহময় জগৎ সৃষ্টি করত। শেষ হয়ে গেলে ভাবতাম, এইরকম শৈল্পবোধ সম্পন্ন রুচিশীল বাংলা গান, কবিতা নাটকপ্রেমী নির্ভেজাল এক সাদাসিধে কিন্তু বোদ্ধা বাঙালি খুব কমই দেখেছি দিল্লীতে।

এরপর আমরা ট্যাগোর গার্ডেন ছেড়ে চলে গেলাম ময়ূর বিহারে। কিন্তু স্কুলে চাকরি করতাম ট্যাগোর গার্ডেনের হোলি চাইল্ড স্কুলে। কাজেই দুটো বাস বদলে আসতে হত সুদূর যমুনা পার থেকে ঐ ট্যাগোর গার্ডেনে।

সেখানে তখন অর্থ উপার্জনের জন্য শনিবার/রবিবার নাচ শেখাতাম আমি, কিন্তু এখন তো বাড়ি নেই, কোথায় ক্লাশ করব? ঐ ক্লাশটি বন্ধ হয়ে যাবে ! কিন্তু সহৃদয় বন্ধু দুজন পাশে এসে দাঁড়ালেন আমার। জয়া ও মানসদা খুলে দিলেন নিজেদের ঘরের দরজা, প্রতি শনিবারে ড্রয়িং রুমের চেয়ার টেবিল সরিয়ে নাচ শেখাতাম, জলখাবারও খেতাম জয়ার হাতের তৈরী। কোনোদিন সেজন্য ওঁদের স্বামী স্ত্রীর মনে এতটুকু বিরক্তি বা কিন্তু ভাব দেখিনি। অদ্ভুত এক মধুর আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে বেঁধে ফেললেন ওঁরা আমায়, মানসদা গৃহকর্তা ছিলেন – অত্যন্ত উদার ও উদাসীন তাঁর বিন্দুমাত্র ভেদভাব ছিল না কোনও। 

তারপর ওঁরা চলে গেলেন রোহিনীতে। সেখানেও জমিয়ে রাখলেন বাঙালী পরিবারদের। আসর বসালেন নানান গান বাজনা নাটকের রিহার্সাল প্রস্তুতিতে প্রত্যেক পুজোর সময়। আমরা দেখতে যেতাম তাঁদের সেই সব মঞ্চস্থ  নাটক,  শুনতাম জয়ার অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠের গান।

একবার এক নাটকে ‘মানসদা’ এক মেসের বাসিন্দা, তাঁকে সেই আশ্রয় ছাড়তে বলা হয়েছে। জয়া ‘মন্দিরার’ ভূমিকায় অভিনয় করছে। মানস দা অদ্ভুত এক মায়াময় কণ্ঠে বলে উঠলেন – “যাবো তো, কিন্তু কোথায় যাবো বলুনতো ভাইটি”, – সেই ডায়ালগটি জানিনা কেন আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল। ভীষণ মোহিত হয়ে সেই নাটকটি দেখতে দেখতে একেবারে একাত্মা হয়ে গিয়েছিলাম, ঐ চরিত্রের অসহায়তা ও সারল্যে। আর তারপর থেকেই আমি মানসদাকে আর দাদা ডাকিনি, সব সময় ‘ভাইটি’ বলতাম এবং তিনিও সেই সম্বোধন খুব পছন্দ করতেন। আমার আমুদে ভাইটি আমাদের বাড়ি এলে আমার স্বামী নির্মল বাবু প্লেনে পাওয়া ছোট ছোট মিনি বোতল খুলে দিতেন তাঁকে একটু গলা ভিজিয়ে অনেক মজার মজার কথা বলার জন্য।

আমাদের দুই দম্পত্তির বিয়ের তারিখ ছিল একই, – তাই ফেব্রুয়ারী মাসে মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গে বসতাম ও আনন্দ করতাম। একবার কুরুক্ষেত্রে গেলাম। হটাৎ সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে বসে শীতের পড়ন্ত বেলায় গ্রাম্য পরিবেশে দুটি অ-সাধারন সহজ আন্তরিক সহৃদয় মানুষ জয়া ও ভাইটির সঙ্গে যে কি অনাবিল অপার আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন, তা হয়ত আর কখনো কোথাও পাইনি। সূর্যাস্তের আলো পড়েছিল তাঁদের সরল মুখে, স্মিত হাসিতে উদ্ভাসিত সেই কুঞ্চিত চোখ ও প্রসারিত ঠোঁট আমাদের যেন কিশোর বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিনের সেই স্মৃতি আমার মনের মনিকোঠায় এখনও জ্বল জ্বল করে হীরের দ্যুতি দিতে থাকে।

ভাইটি, তুমি ঐ কোভিড দানবের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছো – আর তোমার চলে যাওয়ার পর জয়া একা স্মরণ ভেলায় ভেসে, নীরবে কোথায় – কখন ভেসে যাচ্ছে জানিনা – কিন্তু তারও যুদ্ধ চলছে প্রতি নিয়ত, প্রতি মূহুর্ত্ত এই কথা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি।

আজ তুমি তো বিদেহী আত্মা, কিন্তু তোমার সর্বগুণ সম্পন্না বিজ্ঞানী কন্যা, ভক্তিমতী স্ত্রী আত্মবিশ্বাসে সাহসে ভর করে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে যেন একে একে ছয়রিপু – কাম, ক্রোধ, লোভ, ভয়, মাৎসর্য ও মোহকে অপসারিত করতে করতে এগিয়ে চলছে। তুমিই তাদের শিখিয়েছো, অকৃত্তিম সহজ সরল স্বাভাবিক ভাবে পথ চলার ছন্দ।

তাই তোমার হাসিমাখা স্নেহে আপ্লুত ছবি তাদের মনের জোর বাড়াতে সাহায্য করছে – এ কথাও নিশ্চিতরূপে সত্য। আমরা যারা বন্ধু পরিজন দূরের থেকে তোমাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফুটবল খেলার দর্শকের মতন শুধু চিৎকার করে উৎসাহ দিতে চাইছি। তোমাদের বর্তমান রণক্ষেত্রের ভয়াবহতায় ভীত হয়ে কখন কখনও বা নিজেরাও অদ্ভুত এক দ্বিধাগ্রস্থ বিষন্ন মনে সময় কাটাচ্ছি।

নৈরাশ্য জনক দুর্দিনে মহামারীর সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হওয়া – সংগ্রামী আহত মানুষদের কথা ভেবে যখন কাতর হয়ে পড়েছি, – তখন যেন তোমার কণ্ঠস্বর আবার আমাদের জাগিয়ে তোলে, আমরা শুনতে পাই আমার ‘ভাইটি’ বলছেন, – “আরে এসবের মধ্যে দিয়েই তো চলতে হবে, ঘাবড়ে যেও না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এগিয়ে চলো।” চরৈবেতি চরৈবেতি।

তোমাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম ও জয়া এবং মিষ্টি মামনিকে অনেক ভালোবাসা জানিয়ে স্বর্গের ঠিকানায় এই পত্র পাঠিয়ে দিলাম।

অন্ত্যোদয় আশ্রম (Antyodoy Ashrom)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে,

পরশমনির খোঁজে যখন

এধার ওধার ঘুরে বেড়ায় মন,

সংসারের সংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে পড়ে জীবন

তখন –

আমার এই অন্ত্যোদয় আশ্রমে

পদার্পন।

শিশুর মহা মেলায়, সেখানে লুকিয়ে আছে –

অনেক অমূল্য ধন।

‘বলরাম করণে’র মতন একজন অসাধারন

নির্ভেজাল, অকৃত্তিম উদার

মানুষের পেলাম দর্শন।

তাঁহার কর্মযজ্ঞে – করতে গিয়ে –

আত্ম – নিবেদন

আমার হৃদয় মুগ্ধ হল,

প্রাণ আনন্দে মগন

আজ সকলকে সেই কথা ভাই

করতে চাই গো বর্ণন।

শুনুন তবে দিয়া মন,

হৃদয়বান জনগণ।

 

অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম

 

অন্ত্যোদয় – ‘অন্ত্য থেকে উদয়’ নামটি বলরামের যখন মনে আসে, তখন তার বয়স মাত্র – পঁচিশ। ১৯৯৬ – ১৯৯৭ সালে আস্তাকুঁড় থেকে খাবার খুঁড়ে খাওয়া, চায়ের দোকানে পিতা মাতা হারানো ছেলের পরিশ্রম, অসহায়তা – নির্মম মালিকের হাতে নিপীড়িত, গরম ছ্যাঁকা খাওয়া, আত্মীয় স্বজনের প্রহার বা অত্যাচার সহ্য করতে না পারা, পথে পরে থাকা দুঃখী মেয়েদের ক্রন্দন, সহ্য করতে না পেরে একেক করে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসতে থাকে। তখন তাঁর সব আত্মীয় স্বজন, ভাই বোন বন্ধুরা আশ্চর্য্য হয়ে যান। এতগুলি শিশুর ভরণ পোষণ করতে গিয়ে দেনার দায়ে তাঁর কিছু জমি এবং ওষুধের ছোট দোকানটিও বিক্রি হয়ে যায়।

তবে তাঁর স্ত্রী ছবি ও তিন কন্যা ময়না, চায়না, মনি এবং পরে তাদের তিন জামাতা তাঁকে এই আশ্রমটি গড়ে তুলতে, বড় করতে এবং পরিচালনা করতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। আর একজন পরম আত্মীয়া শ্রীমতি অলকা করন এসে বিদ্যালয়টির ভার সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে তুলে নেন। গ্রামের কিছু শিক্ষিত উদার মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তির সহযোগিতা ও অবদানের কথাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন।

২০০৪ সালের ১৬ই জুন আনন্দবাজার পত্রিকায় একটা লেখা চোখে পড়েছিল, ‘ঘরে ঘরে লক্ষীর ভাঁড় রেখে মুষ্ঠি ভিক্ষা করে’ একজন তরুণ যুবক কিছু পথ শিশুকে বাঁচিয়ে একটি ‘অনাথ আশ্রম’ তৈরী করেছেন। সেই বাচ্চাগুলোর ছবি বেরিয়েছিল, অত্যন্ত করুন সেই দৃশ্য। শীতের দিনেও গায়ে জামা নেই তাদের, আগুনের সামনে গোল করে বসে তারা হৈ হল্লা করছে। সাংবাদিক সুব্রত গুহ মহাশয় জানিয়েছিলেন তারা মুড়ি খেয়ে জীবন ধারণ করছে। ওদের ত্রানকর্তা রাস্তার থেকে তুলে এনে প্রাণ বাঁচিয়েছেন, কিন্তু নিজের বাচ্চাদের সঙ্গে তাদেরও অন্নের জোগাড় করতে গিয়ে সেই ‘বলরাম করন’ এখন দিশেহারা হয়ে গেছেন।

এই খবরে অনেক পাঠকেই অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ওই উদার যুবকের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। প্রথম যিনি ‘বলরামের’ খোঁজে লোক পাঠান, পূর্ব মেদিনীপুরের পাউশি গ্রামে। তিনি জার্মানি প্রবাসী স্বর্গীয় বিমল রায়। বলরাম তাঁর কাছে ছুটে যান, সাহায্যের আশায়, তিনি তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসাবার বদলে ধমকের সুরে বলে ওঠেন, – “তুমি কি পাগল? যদি খাওয়ানোর ক্ষমতা না থাকে, তো এতগুলো বাচ্চাকে পথ থেকে তুলে এনেছিলে কেন?”

বলরাম তো হতভম্ব। ‘এ কী রে বাবা গ্রাম থেকে ডেকে আনলেন, – তাঁকে এইভাবে ভর্ৎসনা করবার জন্যে’, ভাবছে সে। মুখে কথা সরছে না। তখন তিনি নরম হয়ে জানালেন, – যে তিনিও একদিন অনাথ অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়ে পথে নেমেছিলেন, বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তাই আজ এই শিশুগুলির জন্য কিছু করতে চান।

এরপর তাঁর বদান্যতায় অনাথ আশ্রমের বাড়ি, ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা হোস্টেল এবং যদি কোন সজ্জন ঐ আশ্রমের শিশুদের জন্যে কোনও কাজ করতে, ট্রেনিং দিতে যান, তাদের জন্যে একটি সুন্দর অতিথিশালা তৈরী হয়ে গেল একবছরের মধ্যে।

আনন্দবাজারের এই খবরটি কলকাতা, দিল্লী থেকেও অনেক মানুষকে বলরাম করনের কাছে টেনে নিয়ে আসে। তাঁদের মধ্যে যেমন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের কোনও জেনেরাল ম্যানেজার আছেন, তেমনি লন্ডনের কোন ডাক্তার, হাওড়ার লোহা ব্যবসায়ী, অথবা অতি সাধারন শিক্ষক শিক্ষিকা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক অফিসার কিম্বা কর্পোরশেনের দলবদ্ধ দায়বদ্ধ সংস্থা, ব্যারাকপুরের মহিলা সমিতি – বহু সমাজ সেবী আছেন।

যাঁরাই এখানে এসেছেন, তাঁরাই বলরাম ও তার তিন কন্যা, স্ত্রী ও অন্যান্য সহৃদয় আত্মীয় বা গ্রামবাসীদের আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। এখানে পাউশি গ্রামটির অপূর্ব শ্যামল সবুজ পরিবেশ, নদী, পুকুর, বাগান, সব্জির চাষ, আগত মানুষের হৃদয় কেড়ে নেয়। আর সঙ্গে বাচ্চাদের অপূর্ব কল – কাকলি, নাচ, গান, নাটকের মহড়া, খেলাধুলা, পরবর্তীকালে, সরস্বতী পুজো, দুর্গাপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী সব অনুষ্ঠানে আগ্রহ দেখে অতিথিরা অত্যন্ত আকৃষ্ট হন। তাঁরা এই আনন্দলাভের খবরটি মুখে মুখে এবং পরে – ফেসবুক, ইন্টারনেট, ইউটিউব অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও বহু লোকেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তাঁদের এখানে আসতে অনুরোধ জানায়। বিদেশ থেকেও কোনও কোনও ছাত্র ছাত্রী অধ্যাপকের দল এসে ঘুরে পরিদর্শন করে যান অন্ত্যোদয় আশ্রমটি।

ইতিমধ্যে বলরাম করনকে নানান সম্মানে ভূষিত করেন সরকারি বেসরকারি নানান সংস্থা, “দাদাগিরিতে” আহ্বান জানান সৌরভ গাঙ্গুলি। জেলাশাসকবৃন্দ যে যখন আসেন বলরামের আশ্রমের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতারই – প্রিয় মানুষ এই বলরাম। প্রথমে সি পি এম দলের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ থেকে শুরু করে পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেস বা ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী বা নেতারা সবাই তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে এম এল এ, এম পি রা সকলেই একবাক্যে বলরামের অবদান শিকার করেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ এটাই যে, তিনি প্রকৃত সমাজ সেবক কোন রাজনীতি মতবাদ আঁকড়ে নিয়ে নয় ঐ শিশুগুলির জীবনের উন্নতি সাধনে, বছরের পর বছর তাদের নানা ভাবে নানা ক্ষেত্রে সাহায্য করে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাতেই দিন রাত প্রাণপাত করেন। যে সব কন্যারা ১৮ পার হয়ে যায়, দায়গ্রস্থ চিন্তিত পিতার মতন তাদের জন্য পাত্র খুঁজে বেড়ান। বিভিন্ন বড় মানুষের কাছে ভিক্ষা করে তাদের পাত্রস্থ করেন, পরে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া এমনকি জামাইষষ্ঠীর দিনে নেমন্তন্ন করে স্নেহময় শ্বশুর পিতার ভূমিকা পালনেও উদ্যোগী হন।

যে সব মেয়েরা আরও পড়াশুনো করতে বা নার্সিং ট্রেনিং-এ যেতে চান, যতদিন না তারা চাকরী পাচ্ছেন ততদিন তাদের ব্যয় ভারও বহন করতে দ্বিধা করেন না। ছেলেদের নানা ধরনের ট্রেনিং ITI শিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। যারা পড়াশোনায় ভালো তাদের গ্রাজুয়েশন করিয়ে তবে শান্ত হন। শুধু যে আশ্রমিক ছাত্র-ছাত্রী শিশুদের প্রতি তার কর্ত্তব্যবোধ প্রকাশ পায় তা নয়, যারা এখানে কাজ করছেন, বাচ্চাদের দেখাশুনো প্রতিপালনে সাহায্য করছেন, – বাগানে সব্জি ফলাচ্ছেন বা চিংড়ি অথবা মাছের চাষ করছেন, তাঁদের প্রতিও তাঁর অসীম দরদ। কারো অসুখ বিসুখ হলেও বলরাম করন তাদের চিকিৎসা বা সেবার বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেন না। কর্মীবৃন্দের বেশিরভাগ মহিলাই অসহায় স্বামীহারা। এঁদের পিতৃ পরিত্যক্ত অসহায় সন্তানেরাও বলরামের নিজের তিন কন্যা ও এক পুত্রের সঙ্গে সমভাবে লালিত পালিত হন। তারা বড় হয়ে কেউ উবের ওলা গাড়ির মালিক, চালক, কেউ অন্য কোনো হাতের কাজ শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েরা এখন বলরামকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আর এইসমস্ত দায়িত্ব পালন করতে তাঁকে সাহায্য করে যারা এই আশ্রমের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করে চলেছেন, তাঁরাও যেন ধীরে ধীরে আশ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। কেউ মা, বাবা, কেউ জ্যেঠু, কাকু, পিসিমনি, মাসিমনি, দিদিভাই, দাদাভাই হয়ে নিজেদের ঐ আশ্রমের সুখে – দুঃখে প্রত্যেক পর্বে নিজেদের যুক্ত করে ধন্য বোধ করছেন। আশ্রমিকদের ঐ মিষ্টি মধুর সম্বোধন তাঁদের বলরামের নিকট আত্মীয় – স্বজন, প্রিয় বন্ধু তথা শুভাকাঙ্খী হয়ে বাঁচার অধিকার এনে দিয়েছে।

দিঘা মন্দারমণী অঞ্চলে প্রায় ঝড় ঝঞ্ঝা বা বন্যায় অনেক গ্রাম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। গত কয়েকবছরের মধ্যে নিশা, আমফান, যশ ইত্যাদি ঘূর্ণি ঝরে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। তখন বলরামের পাশে এসে দাঁড়ায় ঐসব প্রাক্তন ছাত্রের দল। ত্রাণকার্য্যে তাদের অবদানে গ্রামবাসীরা উপকৃত হন।

অতি ছোট ছোট শিশুগুলি দূরের পাঠশালায় যেতে পারবে না বলে বলরামবাবু তাঁর স্বর্গত পিতার স্মরণে ঐ আশ্রমেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলেন। “খগেন্দ্র শিশু নিকেতন”। গ্রামের কিছু শিক্ষিত তরুণ তরুণী অতি সামান্য হাত খরচের অর্থ গ্রহণে সন্তুষ্টি হয়ে সুন্দর ভাবে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে থাকেন। বর্তমানে সেটি সরকারের অনুমোদন লাভ করে এবং শিক্ষকের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পায়। এছাড়া গ্রামের অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা, দুস্থ পরিবারের মেয়েদের ‘সমূহ-বিবাহ’ অনুষ্ঠান করাও তাঁর বিশেষ সৎকর্ম রূপে চিহ্নিত করা যায়।

 

গত সতেরো বছর ধরে আমি এই অন্ত্যোদয় আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রী আশ্রমিক কর্মীবৃন্দ, করন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রতিদিনের সংগ্রামের এবং প্রতিনিয়ত সহৃদয় ব্যক্তিদের দয়া-দাক্ষিণ্যে জীবন ধারনের লড়াই – সম্পর্কে অবগত আছি। ২০০৪ থেকে ২০২১ এর জুন মাস পর্যন্ত তাদের জীবনের মান অনেকটা উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘কোভিড’ ১৯ এর ‘মহামারী’ পৃথিবীর সব দেশ, জাতি ও সমাজের সবকিছু ওলোট পালট করে দিয়েছে।

যেসব সংস্থা নিয়মিত ভাবে আর্থিক আনুকূল্য দান করে এসেছেন তাদের অনেকেরই নিজেদের কাজ – কর্মও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। যে সব অদূর ও সুদূর প্রবাসী অতিথি শুভাধ্যায়ী প্রত্যেক বছরে নানা ভাবে আশ্রমে এসে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, তাদের সন্তানের জন্মদিন, বিবাহ অনুষ্ঠানে অকারণে আড়ম্বর – বিলাসিতা বর্জন করে এই শিশুদের মাঝে উপস্থিত হয়ে তাদের জন্যই ব্যয় করতে ভালোবাসতেন, তাঁরাও লকডাউন-এর জন্য এখন প্রায় ২ বছর ধরে আসতে পারছেন না। মন্দারমণী, দিঘা ভ্রমণের সঙ্গে এই আশ্রমের মনোরম শিশু উদ্যানে অবসর কাটিয়ে যেতে আগ্রহী হতেন কিছু ট্যুরিস্ট, তাঁরাও এই দুবছর গৃহবন্দী। যে সব বিদেশী ছাত্র সমাজ বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ পাঠ নিতে বলরামের অনুমতি নিয়ে এই সুন্দর অনাথালয়ে শিশুদের সঙ্গে কিছুদিন মূল্যবান সময় কাটিয়ে যাবার সুযোগ পেতেন এবং বাচ্চাদের প্রতিভা অনুযায়ী কখনও রোবট বানানো, কখনও কম্পিটার ট্রেনিং দিতে সক্ষম হতেন, তারাও এখন অনুপস্থিত। কিছু শিক্ষিকা এখানে এসে মহানন্দা গেস্ট হাউসে (বিমল রায়ের মায়ের নামে নির্মিত) বাচ্চাদের পড়াশুনো, সংগীত, নৃত্য, সেলাই – ফোঁড়ায়, ক্রাফটের কাজ ইত্যাদি শেখানোর মধ্যে দিয়ে নিজেরাও আনন্দ পেতেন এবং অনাথ শিশুগুলির জীবন রামধনুর সাতটি রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যেতেন তাঁরা সব যেন আবার আসতে পারেন। তাদের সমবেত প্রচেষ্টা অন্ত্যোদয়-এ মানুষ গোড়ার কারখানায় – শিবজ্ঞানে জীব সেবায় আরও বহু মানুষের আগমন হোক – বলরামের থেমে যাওয়া প্রজেক্টগুলি আবার সুচারু রূপে নব নব সৃজনশীলতায় কার্যকরী হোক – এই আমাদের মতন শুভাকাঙ্খীদের একান্ত কাম্য।

এই আশ্রমের প্রতিটি তৃণ, ফুল বা ফলের গাছ, জল টলটলে পুষ্করিণী, শুদ্ধ হাওয়া, বলরাম সহ সব শিশুদের আন্তরিক ভালোবাসা ও আতিথেয়তায় আমরা ধন্য ও আপ্লুত হয়ে – এই লেখনীর মাধ্যমে আরও অনেক শিল্প প্রেমী ও সমাজ সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই আপনাদের পত্রিকায় এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে। শুধু অর্থ সাহায্য নয় – এমন অনেক লেখক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, চলচিত্র অভিনেতা আছেন, যাঁরা তাঁদের উপস্থিতিতেও কলাকৃতি দেখিয়ে আশ্রমিকদের জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে দেন।

একজন পুলিশে কর্মরত ব্যক্তিকে একবার দেখলাম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আশ্রমে এসেছেন। তাঁর হবি ম্যাজিক দেখানো – তাই দেখিয়ে শিশুদের, স্টাফদের এবং আরও অনেক গ্রামবাসীর মনোরঞ্জন করছেন।

কয়েকজন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকা এখানে এসে হায়ার সেকেন্ডারী ও অন্যান্য পরীক্ষার দু-মাস আগে এসে রোজ তিন বেলা নিয়মিত ভাবে ছাত্রদের অঙ্ক, ইংরেজী বা অন্যান্য বিষয়ে পড়াতেন। স্কুলের পড়া না বুঝতে পারা ছাত্র-ছাত্রীরা ঐ দু মাসের অতিরিক্ত অধ্যয়নে বোর্ডের পরীক্ষায় খুব ভালো ফল পেতেন। রাহুল মান্নার মতন ভালো বুদ্ধিমান ছেলে অঙ্কে ১০০/১০০ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুরস্কার এনেছে। ৭ জন মেয়ে এখন থেকে পাশ করে বিখ্যাত সব হাসপাতালে নার্সের কাজ করছে। তাদের গর্বে বলরাম আজ গর্বিত। একজন সহৃদয় ব্যক্তি আশ্রমকে একটি এম্বুলেন্স দিয়েছেন, কেউ আশ্রমের সংগ্লনগ্ন জমি খণ্ডটি কিনে বলরামকে সব্জি লাগাতে, মাশরুম চাষ করতে, পুকুরে মাছের চাষ করে বাচ্চাদের খাওয়ার কষ্ট দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন। এঁদের সবাইকে আমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার মহাশয়ের ‘পরাণের পদ্মবনে’ গ্রন্থে এই আশ্রমের কথা লেখা আছে, যা পরে অনেক পাঠকের মনে ইচ্ছে জাগে এই আশ্রমটি পরিদর্শন করতে।

সবাই যেন ধনী বা বিদেশী প্রতিষ্ঠিত সন্তানের দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত পিতা মাতা তা কিন্তু নয়, এমন গরীব বা মধ্যবিত্ত সাধারণ ব্যক্তিও তাঁদের যৎসামান্য রোজগারের এক অংশ পাঠান এই শিশুদের উপকারে লাগবে বলে। হাওড়া হাটে মাত্র কয়েকশো টাকার জামা কাপড় ফেরিওলাকেও দেখেছি কিছু গামছা ও বাচ্চাদের গেঞ্জি বা মেয়েদের (নাইটি) ছিটের ফ্রক নিয়ে এসেছেন পুজোর আগে। এগরার প্রাক্তন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই বাজারে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে অনুরোধ জানাচ্ছেন এই নির্ভেজাল দয়াবান বলরামকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান দিতে। বিভিন্ন স্কুলের তরুণ ও প্রতিভাবান ছাত্র এবং মাস্টারমশাইকে অনুপ্রাণিত তথা উৎসাহিত করছেন, অন্ত্যোদয়-এর আশ্রমিকদের যোগব্যায়াম, অঙ্কও অন্যান্য খেলাধুলা শেখাতে।

আমাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি অতি মহত্ত্বপূর্ণ, ব্যবহারযোগ্য ও আনন্দময় হয়ে উঠেছে এই আশ্রমের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সুদক্ষ ছেলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছে, এখানে এক একটি শিশুকে স্পনসর করে – প্রতি মাসে তাদের খরচ পাঠাতে। নিজেদের আনন্দের দিনগুলিতে পার্টি না করে বা পিতা মাতার স্বর্গারোহনে শ্রাদ্ধতে অতিরিক্ত লোক দেখানো খরচ না করে তারা এই সব অসহায় শিশুদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এক নতুন ভাবনার পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছে। একজনকে দেখে আর একজন অনুসরণ করছে।

বিশেষত এই ‘কোভিডে’ – পরলোক গমন করার পর যখন কিছু তরুণ তরুণীকে দেখলাম সুদূর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড – সিঙ্গাপুর থেকে এসে বাবা-মা বা ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের শ্রাদ্ধ করতে আসতে পারলো না, তখন বলরামদা কে টাকা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছে তাদের পিতৃ তর্পনের নামে ঐ শিশুদের কাজে অর্থ ব্যয় করতে। – এই সব ছেলে মেয়েদের সমবেদনা জানিয়ে যাই আশ্রমের পক্ষ থেকে।

এমনও একজন চাল, ডাল, তেল, মসলার ব্যবসায়ী এই আশ্রমের কথা জানার পর থেকে নিয়মিত তাঁর দোকান থেকে ঐ সব দ্রব্য সামগ্রী পাঠিয়ে যাচ্ছেন – নিজের নাম ঠিকানা গোপন রেখে। এটা বোধহয় ঠাকুরের ভোগ নিবেদনের তাঁর প্রকৃত প্রয়াস।

বলরাম ভালোভাবে শিক্ষা, দীক্ষা, মূল্যবোধের পাঠ পড়াতে আর একটি দিকে বিশেষভাবে সচেতন, তাঁর ধর্ম – নিরপেক্ষতা। পূর্ব মেদিনীপুরে অনেক মুসলিম গ্রাম আছে – মোসলন্দপুরের মাদুর ব্যাবসায়ী থেকে মন্দারমণীর গুড় – বড়ি – মুড়ি – কাজু ব্যবসায়ী গরীব ও বড়লোক, সমৃদ্ধশালী চাষী থেকে জমিহীন শ্রমিক – সবাই এই মানুষটির পাশে এসে দাঁড়ান। বিপদে আপদে ত্রাণকার্যে সমূহ বিবাহ সম্পন্ন করতে তাঁরা সর্বদা এই আশ্রমের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। কারন বলরাম সব জাতের, সব সম্প্রদায়ের, সব ধর্মের লোকেদের সমান ভাবে শ্রদ্ধা, স্নেহ ও সম্মান করেন। তাই সে সকলের প্রিয় পাত্র। বলরামের মতন মানুষের আজ আমাদের বাঙালির গর্ব একথা অনস্বীকার্য।

“মরণ”রে – তুঁহু মম (Moron’re – Tuhu momo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'মৃত্যু' এখন জল ভাত আর, একটা বাড়তি সংখ্যা।
'মৃত্যু' এখন মরণ দোলায় বাজায় বসে ডঙ্কা।
ভয় দেখাতো কতই না সে, ভয়াল ছিল রূপ।
এখন সে যে ল্যাজ গোটানো, ভিজে বেড়াল চুপ।

'মৃত্যু', ওগো সুন্দর সেই অন্তিম দিন সাথী,
তোমার তরে জ্বলতো ঘরে ফানুস স্বর্গ বাতি।
শ্মশান ছিল তোমার ভূমি, শ্রেষ্ঠ দেবালয়,
এখন সেথায় শেয়াল কুকুর, লুকোতে ভয় পায়।
 
মৃত্যু এখন 'কোভিড' সঙ্গে বেঁধেছে গাঁঠছড়া, -
সুখের স্মৃতি মাটির তলায়, বন্ধ মোহর ঘড়া।
অনেক বছর পরের যুগে যখন পাবে খুঁড়ে -
মানুষগুলোর নাম পদবী কোভিড সঙ্গে জুড়ে।
 
মহামারী, অতিমারী যে নামই তার দাও না,
'মৃত্যু' তোমার গরিমাকে করেছে সে আয়না।
তোমায় নিয়ে তাণ্ডব এক নির্মম এই খেলা,
জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, সয় না অবহেলা।

মরণ ছিল শ্যামের সমান প্রভুর সঙ্গে লীলা,
আজকে সবাই দেখছি হেথায় 'প্রহসনের' পালা।
'মৃত্যু' তুমি পরম প্রিয়, আবার এস ফিরে।
সসম্মানে শোকসভা যে করব ঘরে ঘরে।

জীবাত্মারই মিলন লাগি পরমাত্মার ডাক,
মৃত্যু তোমার মধ্যে দিয়ে মানব শুনতে পাক।
তুমিই যে গো চরম 'সত্য' এই কথা হোক সোজা,
"মৃত্যু" তোমায় শ্রদ্ধাভরে করব আবার পূজা।

প্রলয় দিনের বন্ধু – ডেলিভারী বয় (Proloy diner bondhu – Delivery boy)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মহামারী বলিহারী - ঢেউ এর পাহাড় এসে,
ভাসিয়ে দিল জীবন তরী দস্যু ছদ্মবেশে।
ডুবিয়ে দিল আশার ভেলা, কোথায় পাব ঘাট !
হারিয়ে গেল অরণ্য আজ ঢাকলো ধুলোয় মাঠ।
বাহির হয় না কেউ পথে আর, দোকান বাজার বন্ধ,
ভাইরাস টা ঢুকলো বুঝি সর্বদা এই সন্দ।
আতঙ্কেতে ত্রস্ত সবাই, হারালো আনন্দ,
হাসপাতালেও বিছানা নেই, ওষুধ নিয়েও দ্বন্দ্ব।।

ভ্যাকসিনটা লাগবে কবে, প্রশ্ন সবার মনে,
কোভিড উনিশ দমন করবে কখন যে কে জানে !
হাজার লক্ষ্য লোকের মাঝেও সবাই এখন একা,
দ্বীপের মধ্যে বন্দি থাকি বুদ্ধিমান ও বোকা।
বন্ধ দরজা সামনে রাখে, দুধ, সবজির ঝাঁকা।
'ডেলিভারী' এনে সে দেয়, হাত বাড়ালেই বন্ধু,
নির্জন এই লকডাউন-এ তুমিই কৃপাসিন্ধু।।

দুধ, ডিম আর পাউরুটি দেয়, ডাল, চাল, তেল, নুন, -
বেল বাজিয়ে পালিয়ে সে যায়, গাইছি যে তার গুণ।
ওষুধ আনে ঠিক সময়ে, চায় না কভু পয়সা,
অনলাইন এ পেমেন্ট করি, পাই না যেতে ভরসা।
'ডেলিভারী' ছেলের মুখটি দেখতে যে মন চায়, -
মুখটি ঢেকে নীরবে সে দ্রব্য রেখে যায়।
প্রলয় দিনে তোমায় চিনে, রেখেছি আজ আমি,
তোমার অবদানের কথা সবচেয়ে হবে দামী।।

সতর্ক নাগরিক (Sotorko Nagorik)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোভিড-১৯ সারা বছর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে,
হয়ত ছিল ঘুমন্ত কিছুক্ষন।
যে কোন সময়েই আবার করতে পারে
পেছন হতে সে কাউকে আক্রমণ;
কেউ তো করে নি এই নাগরিক কে সে বিষয়ে
সতর্ক বা সচেতন !
রাজনীতিবিদদের - ক্ষমতা - লিপ্সা -
শিল্পপতি ব্যবসাদারের অর্থ পিপাসা,
ভুলিয়ে রেখেছিল মিথ্যা স্তোকে কিছুক্ষন।
'মাস্ক' না পরে আবার নির্ভয়ে পথে বেড়িয়েছেন,
সাহসী অবোধ জনসাধারণ।
আহম্মক - নির্বোধের অদূরদর্শিতা, না
অযোগ্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসন?
ভুল করে চলল একের পরে এক যখন তখন;
সাবধানতার বদলে তারা শুনিয়ে গেল
বৃথা অহমিকার আস্ফালন।
বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানী ডাক্তার, যে যেখানে ছিলেন
জগতের শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
হলেন হতবাক বিস্মিত
সাবধান করতে চাইলেন, যত মনীষী বিচক্ষণ।
হাসপাতালে হাসপাতালে আবার রুগীর ভিড়,
শয্যা নেই, ওষুধ নেই, নেই কোন ভ্যাকসিন।



নার্স ডাক্তার সবাই খাচ্ছেন হিমসিম,
প্রাণহীন দেহ হল শীতল,
অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর কবলিত
শরীর নিথর হিম।
হাজার হাজার মানুষের মৃতদেহে
ঢেকে গেল শ্মশানের ভূমি,
প্রিয়জনের ক্রন্দনে, আর্তনাদে
ফেটে গেল ভারতের সকল প্রদেশের
রক্তাক্ত জমি।
কে এর জন্যে দায়ী?
কিছু মানুষের দায়িত্ব জ্ঞানের অভাব !
মৃত্যু নিয়েও কারচুপি, কালোবাজারির দল -
উঠিয়ে নিল লাভ।
রাজা প্রজা সবাই কিন্তু পাবে একদিন সাজা !
যারা দলে দলে করেছিল ভোটের র়্যালি,
তারা আজ ডেকে আনলো বিপর্যয় -
কোভিড এর পায়ে দিল অকারণে -
শত শত নিরীহ মানুষের নরবলি।
দেশের এই চরম দুর্দিনেও শিক্ষা হল না কারও।
ঈশ্বর আরাধনার মুখোশ পরে যারা ধর্মের
নামে  অপপ্রচার করে ,- অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে বাহবা দিয়ে
মঠ মন্দিরে ধ্বজা ওড়ায়, মন্ত্র উচ্চারণ করে উচ্চস্বরে -
তারা নামলো শাহী স্নানের নামে, -
হরিদ্বারের গঙ্গা জলে, হাজারে হাজারে
পুন্য় লাভের  তরে !

কোভিড দিনে তব শরণ্যে (Covid din e tobo shorone)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঈশ্বর, মোর জাগুক শুধু গভীর -
অনুরুক্তি -
রাত্রি দিনে লইব চিনে -
তোমার স্নেহ আনব ছিনে,
অস্ত্র যে মোর একমাত্র -
অগাধ শ্রদ্ধা ভক্তি,
ঝিনুক হতে বেরিয়ে আসে -
নরম কোমল শুক্তি, -
তেমনি আমি খোলস ছেড়ে -
আসতে যে চাই তোমার দ্বারে, -
'কোভিড' দিনে স্মরণ করি -
কথামৃতের উক্তি, -
শরণাগত থাকতে হবে, তোমায় শুধু ডাকতে হবে, -
বৃথা সময় নষ্ট যে হয়,
করলে তর্ক যুক্তি।
এই জীবনে ঘুচিয়ে দিল,
সকল চাওয়া পাওয়া
মিথ্যে কেন ছুটে চলা, অর্থ পিছে ধাওয়া, -
'ঠাকুর' তোমায় ডাকতে আমার -
নেই শুধু বিরক্তি,
মৃত্যুর ভয় করবো গো জয় -
পাইব পরশ মুক্তি।

অঞ্জলী (Anjaly)

চন্দনা সেনগুপ্ত

অষ্টমীতে পুজো বাড়ি যেতে যেতে 
যাওয়া হয়ে উঠল না আর l
বান্ধবী বলেছিলেন, -
“সিঙ্গাপুরের  দোকান বাজার 
কিছুই তো চেনো না, তাই -
সঙ্গে থাকবো আমি।
লিটিল ইন্ডিয়ায়, সব পাওয়া যায়
কিন্তু একটু দামী l

প্রবাসে, এই সাগরপারে, ভারতীয়দের ঘরে ঘরে 
নিত্য নতুন পূজার তরে, -
মালা, চন্দন, ধুপ অগুরু
ডাব নারকেল সারে  সারে  -
নানান রকম সামগ্রী সব
সাজানো হয়, দোকান পরে।
কিনিয়ে দেব - আমি”। -

- ‘সঙ্গে কত টাকা নেব?’
প্রশ্ন ছিলো আমার,

‘পাঁচশ ডলার’ নিলেই হবে।
ভোগের টিকিট,
মায়ের শাড়ী, ফল-মিষ্টি, দক্ষিনা আর
ট্যাক্সি ভাড়া, সব মিলিযে কুলিয়ে যাবে

টাকাটা তো 'ডলার' হেথায় 
মূল্য যে তার অনেক গুনে,-
ভাবলে সেটা চলবে না তো ,-
যখন যেথায় থাকতে হবে,
খরচ করতে হবেই, ততো।
চলতে হবে সেসব জেনে।
পুজোটা তো দিতেই হবে
হিন্দু রীতি নীতি মেনে।

সাজ গোজ করে  বেরোতে যাবো,
ফোনটি বাজলো ঠিক সেই খনে,
রোডিথ নামে কাজের মেয়েটি উঠল কেঁদে জোরে 
তারই ভাইয়ের সংবাদটি শুনে, -
সাংঘাতিক এক ধাক্কা লাগল মনে।
তরুণ শ্রমিক 'ম্যানিলাতে' কোভিড আক্রমনে
মৃত্যু কোলে পড়ল ঢলে -
কখন যে তা কে জানে।
ক'মাস আগেই দেশে যখন ‘করোনার’ই প্রকোপে 
একের পর এক প্রিয় স্বজন
স্বর্গ ধামে চলে গেল -
এই মেয়েটি তখন সেদিন 
কেঁদে কেটে আকুল হল
কেমন করে আজকে তারে -
পুজোর নামে একলা ঘরে,
আমরা যেতে পারি ফেলে।
ভাবতে কেন পারবো না গো 
তাকে আমার কন্যা বলে?
ভাইয়ের শীতল দেহ খানি
পড়ে আছে, তার  হাসপাতালে।
‘ছাড়পত্র’ মিলবে না তাঁর
পাওনা গন্ডা না চুকালে।

নিজের মেয়ের মতন সে যে  করছে মোদের সেবা
এই বিদেশে ভলোবেসে করে তাহা কে বা
জড়িয়ে ধরলো সে আমারে,
স্বান্তনা দিই, কে কাহারে !
শিশুর মতন ফুঁপিয়ে কাঁদে
ভাইয়ের শোকে বারে বারে।
‘ও দূর্গা মা’, করো ক্ষমা,
যাব না আজ তোমার দ্বারে,
'বিবেক' কাঁটা বিঁধছে যে গো, -
আয় না মা গো, তুই এবারে,
মণ্ডপের ঐ বিলাস ছেড়ে, 
সোজা হেথায় আমার ঘরে।

পুজোর টাকা তাকেই দিতে
আদেশ দিলেন, "মহামায়া"
মৃন্ময়ী আজ চিন্ময়ী যে 
মানব তরে অপার দয়া।
গরীব চাষী, শ্রমিক সাজে -
আবির্ভূত জগৎ মাঝে, -
মাটির পুতুল, পাথর মূর্ত্তি -
শুধু জানি তাহার ছায়া,
জীবের দুঃখে, ক্লেশ ও লাজে
 কাঁসর, ঘন্টা, শঙ্খ বাজে,
সর্বভূতে 'মা জননী' ছড়িয়ে দেন যে 
তাঁরই মায়া।

মিথ্যা মন্ত্রে উচ্চ স্বরে, ডাকি সবাই বারে বারে,
ভন্ডামী আর আড়ম্বরে, হারিয়ে ফেলি
যখন তারে -
তখন তিনি এক ধাক্কায় নামিয়ে আনেন,
পথের ধুলায় -
মানুষ মাঝে বেড়ান ঘুরে 
জগতের এই পারাবারে।
জীবন্ত এক 'মা দূর্গার' দেখতে পেলাম
করুন মুখ, -
যুগ যুগান্তে গৃহের প্রান্তে -
এসে, মনে দেন যে সুখ,-
ভক্ত প্রাণে মমতা এনে - মুগ্ধ করেন কৃপা দানে,
শান্তি সুধায়, ভরান যে বুক।
অসহায়ের পাশে দাঁড়ান,
বিশ্বাস আর সাহস বাড়ান,
ভুলিয়ে দিতে সকল দুখ।

 মন্ত্র ,তন্ত্র উপোস ব্রত  আজকে  দিলাম  জলাঞ্জলী
'মা' যে নিজে হাত পাতিলেন,
নিলেন তুলে  মোর, ‘অঞ্জলী।’

একই পথের পথিক ( Ek e pother pothik )

চন্দনা সেনগুপ্ত

মাঝে মাঝেই সাইক্লোন, ঝড়, টর্নেডো আসে উড়িষ্যায় ও পূর্ব মেদিনীপুরের এই সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে। ভীষণ তান্ডবলীলায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় গ্রামগুলোকে। এইখানেই ১৯৮০ সালে জন্ম হয় অর্ণবের। কাজুবাদামের বাগান, সারি সারি নারিকেল গাছ, মাটি দিয়ে সুন্দর করে নিকোনো উঠোনে একদিকে মাদুর পাতা। তার ওপরে বড় বড় পরাতে ‘গহনা বড়ির’ সমারোহ। ভারী সুন্দর তার রূপ। আর একদিকে শীতল পাটি মাদুর তৈরির জন্যে বেশ খানিক জায়গা বরাদ্দ। বৃষ্টি না হলে সবই ঠিকঠাক চলে। আমদানি, কেনাবেচাও বেশ ভাল হয়। অন্যদিকের নিচু জমিতে নানান সব্জি লাগানো, পুকুরে টলটলে জল ও মিষ্টি মাছের চাষ। বেশ সমৃদ্ধ সচ্ছল আনন্দময় পরিবার।

কিন্তু এই ঝড়গুলো এসে সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়, সাধারন গ্রামবাসীদের। সাগরের জল ঢুকে নদী-নালা, পুকুর-জমি সব একাকার হয়ে যায়। মরে যায় কত শত মাছ, ‘গহনা বড়ি’ গুলোতে সূর্য্যের আলো না পেয়ে ছাতা ধরে যায়। মাদুর তৈরী বন্ধ থাকে।

অর্ণবের বাবা “প্রফুল্লবাবু” এইসময় কিন্তু চুপ করে বসে থাকেন না। প্রত্যেকবারই কোমর বেঁধে লেগে পড়েন “ত্রান কার্য্যে”। তাঁদের বাড়ির দোতলায় ,ছাদে আশ্রয় নেয় কত গৃহহারা অসহায় মানুষ।

গ্রামের মেয়েদের নিয়ে মা বানাতে থাকেন, হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি। সারা বছরের যত্নে তুলে রাখা মুড়ির মোয়া, সিঁড়ির অর্থাৎ ঝুড়ি বেসনের লাড্ডু কিম্বা নারকেল নাড়ু কাজুর গুড়ে মাখা তক্তি – সব বের করে অভুক্ত ভীত আতঙ্কিত বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন। বড় বড় কাঁচের জারে নানান মসলায় জারিত আচার বা আমসত্ত্ব, আমসি, তেঁতুল দিয়ে এক এক দিন চাটনিও বানিয়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র কৃপণতা বা দ্বিধা করেন না।

আসে পাশে যে আত্মীয় স্বজন থাকেন, সবাই কখনও কখনো বোঝাবার চেষ্টা করেন, – ‘সব কেন বের করছেন দিদি, নিজের ছেলে পিলেদের জন্যে রাখুন।’ মা হাসেন, বাবাও বলেন – ওদের কথায কান দিও না। এই গরীব মানুষগুলো ই  তো আমাদের আপনজন, ওরাই  তো আমার মাদুরের ব্যবসা, মাছের চাষ দেখে। গহনা বড়ি দেওয়ার অপূর্ব শিল্পকলা টাকে ওরা ই এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এই ঝড় বন্যা তো আর রোজ রোজ হয় না। এগুলো তো ঈশ্বরের পরীক্ষা।

ছোট্ট অর্ণব জিজ্ঞেস করে, “এ কেমন পরীক্ষা বাবা ভগবানের?’’

বাবা উত্তর দেন, – ‘’মানুষের ধৈর্য্যের, আর মানুষ যাচাইয়ের। দেখবি ক’দিন পরেই জলটা নেবে যাবে। কত পলি পড়বে, আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাঠি ঘাস আবার হু হু করে বেড়ে উঠবে। – চার – পাঁচ  সপ্তাহ পরে সেগুলো কেটে ঘরে আনব, জলে ভিজিয়ে রেখে এইসব গ্রামের মেয়েরা তাকে একটা একটা করে চিরে চিরে ফেঁসো বের করবে, শুকাবে এবং মাদুর বানাতে বসে যাবে, দু দিকে দুটো বাঁশ বেঁধে। এতো সামান্য সাধনে শুধুমাত্র ঘাস দিয়ে যে এতো সুন্দর শিল্প বানানো যায় তা না দেখলে তো কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।’’

গ্রামের লোকেরা বলে, এমন আদর্শবাদী সৎ দয়ালু মা-বাবার ছেলে ‘অর্ণব’, একদিন ঠিক দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

অর্ণব পড়াশোনায় খুব ভাল, অঙ্কে খুব মাথা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টারমশাই একদিন প্রফুল্লবাবুকে বললেন, – “ছেলেকে চন্ডিপুর, পুরুলিয়া. রহড়া কোন রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলে পাঠিয়ে দিন এবার। ঘরের খেয়ে আদুরে ছেলের মতন তেল চুক চুকে মাথায় পাঠশালায় গেলে তো আর ভাল মানুষ হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে, ঐ সব আশ্রমের নিয়ম শৃঙ্খলায় থেকে মূল্যবোধের পাঠ পড়লে, নিজের কাজ নিজের হাতে করার শিক্ষা ও ট্রেনিং দুটোই হবে ওর।”

– কথাটা বাবার মনেও ভাল লাগলো। প্রথম প্রথম মা, পিসি, ঠাকুমা ও কাকা কাকিমা সকলের আপত্তি ছিল, ঐ সহজ সরল আমুদে বাচ্চাটাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু ছেলেও চাইলো, ঐ ছোট স্কুলের গন্ডি ছেড়ে বড় স্কুলে চলে যেতে, সেখানে প্রতিযোগিতা নামে একটা বিশেষ ব্যাপার থাকে। সব ছাত্ররাই সেখানে পড়াশোনাতে খুব ভাল, তাই কে প্রথম হবে সেই নিয়ে বিরাট একটা রেজাল্ট ভাল করার লড়াই নাকি অন্যরকম এক নতুন পরিবেশের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

মাত্র ক্লাশ VI থেকেই শুরু হয়ে গেল, সত্যি সে যুদ্ধের পরিস্থিতি তার জীবনে।

কিন্তু সব যেন ওলোট পালট হয়ে গেল, নবম  শ্রেণীতে  এসে, তরুণ একজ্ন  ভীষণ কর্মঠ বুদ্ধিদীপ্ত, – বিবেকানন্দের আদর্শ প্রনোদিত কর্মযোগী – নিবেদিত প্রাণ হেড মাস্টারমশাই যখন এলেন, তাদের রামকৃষ্ণ মিশনের বিদ্যালয়ে। প্রথম দিনেই সব ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে তাদের গত বছরের অর্থাৎ ‘অষ্টমশ্রেণীর’ ফল অর্থাৎ রেজাল্ট কেমন হয়েছে এবং কে কাকে টপকে কতবার প্রথম হয়ে এই তিন বছরে অর্থাৎ ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টমে প্রথম স্থান অধিকার করেছে তাদের চিহ্নিত করলেন।

দেখলেন চারটি ছেলের মধ্যেই এই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়, চতুর্থ হওয়ার প্রতিযোগিতা বৃত্তাকারে ঘুরছে। এবার ওদের আলাদা করে দাঁড় করিয়ে রেখে বাকি ৩৬ জনের দিকে ঘাড় ঘোরালেন তিনি, – বেশ জোরে অনেকটা আদর কিন্তু বকুনি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, – “কি গো তোমরা কি পড়াশোনা করতে ভালোবাসো না? তোমাদের ফার্স্ট / সেকেন্ড হতে ইচ্ছে যায় না? – প্রায় সবাই চুপ, মাথা নিচু করে আছে। এবার নিজের চেয়ার টেবিল ছেড়ে ক্লাসের একেবারে মধ্যে সব বাচ্চাদের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, তিনি।

“কি হলো – বলো তোমরা, ওদের মতন নাম্বার পেতে ইচ্ছে করে না তোমাদের?”

– “করে স্যার কিন্তু”

– “কিন্তু কি? বলো বলো বলে ফেলো তাড়াতাড়ি, কেন ওরা চারজনের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতাটা চলছে, তোমরা কেন পারছো না ঐ রকম নাম্বার নিতে?”

– “স্যার, স্যার ওদের খুব বুদ্ধি – আমাদের অতো বুদ্ধি নেই ওদের মতন, স্যারদের পোড়ানো অতো তাড়াতাড়ি আমাদের মাথায় ঢোকে না যে, কী করব?”

-“ঠিক আছে, একটা যুক্তি শুনলাম, কিন্তু জানতো, চেষ্টা করলে,অভ্যাস করতে করতে বুদ্ধি ও বাড়ে, যেমন ভালো করে ঘষে মেজে তামা বা সোনা কে ঝক ঝকে করা হয়, তেমনি  খুব অধ্যবসায় থাকলে নিশ্চয় সফল হবে তোমারাও।  এবার একদম পিছনের বেঞ্চে গিয়ে দেখলেন, কতগুলো তাস এবং কাগজের টুকরো পরে আছে। খুব চেষ্টা করেও সেগুলো লুকোতে পারেনি তারা। স্যার অর্থাৎ সেই তরুণ মহারাজ/স্বামীজী একটা একটা করে কুড়োলেন সেগুলি। তারপর যে ছেলেটির পায়ের কাছে ঐগুলি পড়েছিল তার মাথার চুলটাতে আলতো করে হাত লাগিয়ে বললেন, – “ও পেছনে বসে তাস খেলাটা খুব জমে বুঝি?” আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো করে পড়াশোনা করে একবার ওদের হারিয়ে দেখিয়ে দাও, তারপর আমরা তাস, ক্যারাম সব খেলবো।”

সবচেয়ে পেছনের সারি থেকে সব থেকে দুষ্টু ছেলেটা বলে উঠলো –

“সাধু সন্ন্যাসীরা আবার এসব খেলা করে নাকি? তাঁরা তো শুধু জপ, ধ্যান, পূজা আচ্চা করে।” – এবার নতুন স্বামীজী হেসে ফেললেন। তাই নাকি রে?”

“শুধু পুজো পাঠে মেতে থাকলে তোদের পড়াবো কেমন করে? – সমাজ সেবার মধ্যে যাবো কখন? বিবেকানন্দ কি শুধু ধ্যান করেই কাটিয়েছেন? মিশনের ছাত্র তোরা এখানের আদর্শ কি শেখাচ্ছে তোদের?”

“স্বামীজীর” মতন তেজ্স্বী তরুণ শিক্ষকের কথায়, আন্তরিকতায় ছাত্ররা খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করল। এবার সবচেয়ে শান্ত মুখচোরা ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো, “আমার খুব ফার্স্ট হতে ইচ্ছে করে স্যার, কি করে পারবো বলুন তো, সব subject এ ভালো করি, অঙ্কটা যে বুঝতেই পারি না।’

এবার সে শিক্ষক – “চল সবাই গল্প ছেড়ে একটু কাজ করি।” – বলেই নিজের চেয়ারটা বাইরে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় রেখে এলেন। সবাইকে উঠতে বলে ছাত্রদের বসবার কায়দাটা পাল্টাতে চেয়ারগুলো সব গোলাকার রেখে দশ দশ জনের একেকটা গ্রূপ তৈরী করলেন। ছাত্ররাও খুব উৎসাহের সঙ্গে লেগে পড়লো।

এবার প্রত্যেক দলে একজন করে ঐ বেশি নম্বর পাওয়া ছেলে এবং ৮ জন সাধারণ ছেলেদের বসালেন। অর্থাৎ প্রত্যেক গ্রুপে ৯ জন করে হল। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানাধিকারী ছাত্রদের নিজের টেবিলটির মাঝখানে রেখে চারটি চেয়ারে বসতে বললেন। এবার ব্ল্যাকবোর্ড-এ দাঁড়িয়ে বোঝালেন, একটি নতুন অঙ্কের অধ্যায় থেকে কয়েকটি অঙ্ক। বাকি আরও চারটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন, তারপরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, পুরো ক্লাশ রুমে। একেক গ্রুপের কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়াবার পর ফিরে এলেন, নিজের চেয়ারের সামনে। কিছুটা সময় কাটতেই ওই চারজন তাঁকে অঙ্ক দেখাতে এল। তারা সত্যিই খুব বুদ্ধিমান ও মনোযোগী ছাত্র রূপে প্রমান দিল।

এবার শিক্ষক ওদের ঐ চারজন কে পাঠালেন, চেয়ার নিয়ে একেক গ্রুপের মধ্যে বসতে এবং যতক্ষণ না ওরা সবাইকে ঐ অঙ্কগুলি বোঝাতে পারছে, ততক্ষন অপেক্ষা করলেন, অন্য আর দুটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে সমাধান করতে দিয়ে।

“অর্ণব” সবচেয়ে চৌখস ও বুদ্ধিমান ছেলে, আর সে, অন্যকে সাহায্য করতেও খুব আগ্রহী, বেশ সুন্দর সহজভাবে ধৈর্য্য নিয়ে সে বন্ধুদের অঙ্ক শেখাতে পেরে আজ একটা অদ্ভুত আনন্দ পেল।

স্যার বললেন, যারা খুবই দুর্বল ও অঙ্কে কাঁচা তাঁর কাছে পাঠাতে। পরের ক্লাশ সংস্কৃতের, কিন্তু সে বিষয়ের অধ্যাপক সেদিন স্কুলে আসেননি। অঙ্ক ক্লাশটা চললো এই পিরিয়ডেও। ছেলেরা কিন্তু সবাই খুশি। যেন কোন খেলার ছলে কঠিন প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে পারছে, তারা বন্ধুদের সাহায্যে। খুব যারা ভীত – দুর্বল তারা একে একে স্যারের পাশে বসে সেই অঙ্কগুলি বুঝতে চেষ্টা করছে। স্যার বলছেন,- ‘‘আমি একজন, দুজন ভাল ছাত্র চাই না। আমার ক্লাশে সবাইকেই খুব ভাল নম্বর পেতে হবে। সাফল্য তখনি আসবে. যখন একজন আরেকজনের হাত ধরে টেনে তুলবে।’

স্কুলের মাস্টারমশাই নয়, বাড়ির পরম আত্মীয়ের মতন এই সন্ন্যাসী শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ভীষণ ভাবে অর্ণবের মন আলোড়িত ও উৎসাহিত হল। উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট করার পর সে ‘ডাক্তারীর’ পড়ায় ভর্তি হ’ল। মহারাজের মাধ্যমে বিবেকানন্দের আহ্বান শুনতে পেয়েছে, সে ডাক্তার হয়ে দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে।

পাঁচ বছর পর যখন পড়া শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র কয়েক মাস। পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় হল। ২০০৩ সালের জুন মাস। চারিদিকে একটা থমথমে গুমোট ভাব। বিকেলে বৃষ্টি নামবে মনে হয়। ‘অর্ণব’ হাওড়া স্টেশনে এসে শুনলো ,আজ “দীঘা-কাঁথি” লাইনের ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে, কোন দুর্ঘটনার কারনে। অগত্যা বাসই ভরসা। একটা বাস একটু আগেই ছেড়ে গেছে, কাজেই প্যাসেঞ্জাররা সব প্রায় চলে গেছে। একজন বৃদ্ধ কাকাবাবু বললেন, “যা ভিড় ছিল, ঐ বাসে, তাই উঠতে পারিনি, পরেরটার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমিও কাঁথির দিকে যাবে নাকি? চলো তবে পরের বাসাটায় গিয়ে এখন থেকে বসি, নইলে আর সীট পাবে না।”

দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলেন, বাস ছাড়বার সময় হতেই পিল পিল করে লোক উঠতে শুরু করেছে, ধাক্কা ধাক্কি – চেঁচামেচী, কেউ কাউকে এক বিন্দু জায়গা দিতে নারাজ।

একটি মেয়ে উঠল বহু কষ্টে একখানা বড় ব্যাগ তার কাঁধে। কয়েকটি ছেলে তাকে দুদিক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলছে। ইচ্ছে করে তাকে কোন ঠাসা করে দুজন পিছনে দুজন সামনে তাকে এমন ভাবে আটকে দিয়েছে, যে সে অস্বস্তিতে বিরক্তিতে খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে, – “কী হচ্ছে কি? রাস্তা ছাড়ুন, আগে লেডিজ সীটের দিকে যেতে দিন।”

হ্যা হ্যা করে দাঁত বের করে হেসে উঠল তারা, – কি করে যেতে দেব কোলে নিয়ে নাকি?

বৃদ্ধ কাকাবাবু হঠাৎ অর্ণবের পাশ থেকে ভীষণ জোরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন – “কন্ডাক্টর – কন্ডাক্টর, রাস্তা করে দাও, আসতে দাও দিদিমনিকে এদিকে।”

টিকিটের গুচ্ছ হাতে নিয়ে সার্কাসের জোকারের মতন ভিড়ের মধ্যেও সে পয়সা টাকা নিয়ে টিকিট ধরাতে ব্যস্ত ছিল, ভদ্রলোকের চিৎকারে একটু টনক নড়লো তার।

“এই যে সরুন দাদা – একটু রাস্তা দিন, দিদি এদিকে আসুন, দিন ব্যাগটা আমাকে ধরান।” মেয়েটি অর্ণবের সীটের কাছাকাছি আসতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, বেশ জোর দিয়েই বলল, – ‘এই যে এদিকে আসুন এখানে বসুন।” কাকাবাবু একটু সরুন,বলে জানলার দিকের সীট টা দেখালো মেয়েটিকে।

সে একটু থতমত খেয়ে বলল, “না না আপনাকে উঠতে হবে না এটা তো লেডিস সীট নয়।”

– “যা বলছি শুনুন” গম্ভীর গলায় যেন আদেশ করল অর্ণব সেই মেয়েটিকে। দ্বিরুক্তি না করে সে ওই কাকাবাবুর পাশের সীটে গিয়ে বসে পড়ল। – ‘অনেক ধন্যবাদ’ বলে সলজ্জ একটা হাসি হাসলো মেয়েটি। তারপর গলার স্বর নামিয়ে ঐ ভদ্রলোককে বলল, ‘এরা অনেক্ষন থেকে আমার পিছু নিয়েছে, কতদূর যাবে কে জানে !

– ‘তুমি কোথায় যাবে মা’? জিজ্ঞেস করলেন ঐ কাকাবাবু।

-“কাঁথি, কিন্তু ওখান থেকে আমার বাড়ি অনেকটা প্রায় তিন/চার কিলোমিটার হাঁটা পথ। হঠাৎ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এই ভিড় বাসেই উঠতে হল।”

অর্ণব মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভূব করল, এত স্নিগ্ধ সুন্দর চোখের চাহনি, এমন সরল পবিত্র ভাব সারা মুখে, দেখলেই কেমন যেন মায়া অথচ শ্রদ্ধার ভাব আসে মনে।

‘মেচেদায়’ বাস থামতেই হুড়মুড় করে নেমে লোকেরা চা, বিড়ি, সিগারেট খেতে লাগল। কাকাবাবু পেট্রলপাম্পের বাথরুমে গেলেন, প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে।

অর্ণব কিছুক্ষনের জন্য বসলো ওনার খালি সীটে। জানা গেল ঐ মেয়েটির নাম ‘আহুতি’।

-“বাঃ খুব সুন্দর নাম তো আপনার। কোথায় পড়াশোনা করেন?”

– “লেডি ব্রেবোন কলেজে সংস্কৃত তে অনার্স নিয়ে পড়ি, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। – আপনি?”

-“আমি ডাক্তারি পড়ি, কলকাতা মেডিকেল কলেজে। আজকাল তো কাউকে বিশেষ সংস্কৃত নিয়ে পড়তে শুনিনা, আপনি এই বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন কি করে?” – জিজ্ঞেস করল অর্ণব।

-“ছোট থেকেই নিবেদিতা স্কুলে পড়তাম, আমাদের মাতাজী-রা অর্থাৎ সন্ন্যাসিনী শিক্ষিকাদের মুখে নানা বেদ-বেদান্ত, গীতা, উপনিষদের কথা শুনে আমারও পড়তে ইচ্ছা যেত। তাই – – –

কথাটা শুনেই হঠাৎ যেন সমস্ত বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল অর্ণবের – আরে এই মেয়েটিও তো তারই মতন সম মনস্কতার wave length নিয়ে চলছে – তাই ওর মুখের মধ্যে যেন এক আধ্যাত্মিকতা মাখানো পবিত্র ভাব।

বাস আবার চলতে শুরু করলো, বৃদ্ধ কাকাবাবু ও মেয়েটি – নানান ঘরেলু গল্প করতে করতে চলেছে, বাসের শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকালেই “শ্রী শ্রী সারদা মায়ের” মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে অর্ণবের চোখের সামনে।

‘নন্দকুমারের’ মোড়ে ভদ্রলোক নেমে গেলেন, খুব পরিচিত মানুষের মতন মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে সীট থেকে উঠতেই সে অচেনা অজানা পিতৃতুল্য মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

এবার ‘অর্ণব’ বসলো তার পাশে। ঐ ছেলেগুলিও পেছনে আসে পাশে বসে পড়েছে ততক্ষনে, কিন্তু সামনে ওদের নিয়ে টিপ্পুনি বা হাসাহাসি করে যাচ্ছে।

একবার অর্ণব ভাবলো উঠে দাঁড়িয়ে ধমক দেবে, কিন্তু তার ভদ্রতায় বিবেকে বাঁধলো, ঐ সব নিচ মন্ত্যব্যের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গিয়ে অকারণে ঝগড়া বা তর্কাতর্কিতে না জড়াতে। মনে  হল ওরা চাইছে, তার সঙ্গে লড়াই বাঁধাতে। অতএব ওদের উপেক্ষা করাই ভাল। বরং মেয়েটিকে তার গ্রামে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সন্ধ্যে হয়ে এলো। বাসটি কাঁথি বাজার পেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই বৃষ্টি শুরু হল। ঐ ছেলে চারটিও ওদেরকে ওখানে নামতে দেখে নেমে পড়ল বাস থেকে।

অর্ণব বুঝতে পারলো, এদের মতলব ভালো না। আহুতির সঙ্গেও বড় ব্যাগ তার নিজের স্যুটকেশটাও খুব ভারী – বই খাতাতে ভর্তি। আহুতিরটা কাঁধে আর নিজেরটা হাতে শক্ত করে ধরে ও এসে দাঁড়ালো সামনের চায়ের দোকানে। আহুতিও ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে মাথাটা আড়াল করে প্রায় ছুটে এল ওর পেছন পেছন।

দোকানদার তাড়াতাড়ি একটা টেবিল পরিষ্কার করে ওদের বসতে দিলেন। বেসিনে হাত পা ধুতে গিয়ে দেখলো দোকানটি বেশ বড়, ঠিক সাধারন চা সিঙ্গাড়ার দোকান নয়, বাথরুমও আছে। নিজে হাত মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আহূতিকে বলল, “যান, ওদিকে মেয়েদের একটা আলাদা টয়লেটও আছে, – আমি ততক্ষণ চায়ের অর্ডার দিচ্ছি।”

‘আহুতির’ মনে হল, যেন কত পরিচিত কোন আত্মীয় সঙ্গে রয়েছে তার। নিশ্চিন্ত হয়ে বাথরুমে ঢুকলো সে। ভাবলো, আজ ঐ কাকাবাবু বা এই ছেলেটি না থাকলে হয়তো সে বিপদে পড়তে পারতো। ছোট থেকেই সে “শ্রী শ্রী মায়ের ভক্ত” তার বাবার মতন সর্বদা তারও বিশ্বাস, – তিনি শুধু গুরু মা নন, আপন মা। তাই কোন দুঃখ কষ্ট হলেই তার হৃদয়ে সে সারদা মায়ের রূপটি কল্পনা করে এবং তাঁর শরণাগত হয়ে থাকে, কোন রকম দুর্যোগ, বিপদ, দুর্ঘটনায় সে গুন গুন করে গায়, সেই মনের জোর ও সাহস এনে দেওয়া গানটি।

“মা আছেন আর আমি আছি, –

ভাবনা কি আর আছে আমার,

মা’র হাতে খাই – পরি, মা নিয়েছেন –

আমার ভার। আমি যদি ভুলি মাকে

ভোলেন না মা একটি বার – – -“

মুখ ধুতে ধুতে মনে মনে গানটি গাইছিল সে, হঠাৎ একটি কর্কশ কণ্ঠস্বরে সব ভাবনা ছিন্ন হল।

– ‘এই যে রে মালটা পেয়ে গেছি, এখানে এসে ঢুকেছে’।

এক নিমেষে ঐ বাথরুমের কোনা থেকে এক ছুটে বেরিয়ে এল সে, অর্ণবকে বলল, “ছেলেগুলো এখানেও এসে গেল যে, কি করবেন এখন?”

দোকানদার বললেন, – ‘ওরা কি করবে? আপনারা চা, ডিমের ওমলেট আর সিঙ্গাড়া গুলো খান। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল, এখানে ওরা প্রায়ই আসে, বেশ সমাদর করেই অন্য একটি টেবিলে বসল ওদের ঐ মালিক।

অর্ণব ও আহুতি কোনোরকমে চা ও ডিম খেয়ে পয়সা মেটাতে চাইলো দোকানদারকে ডেকে। যে ছেলেটি বিলটি নিয়ে এল একটা কুশ্রী ইঙ্গিত করে বলল, – “এই বৃষ্টিতে তো মজা আসবে, – ওপরে ঘর আছে আমাদের। আজ রাত্রি টা ওখানেই থেকে যান না, মালিক বলছেন। ঐ ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বেশ বীরত্বের ভাব নিয়ে দোকানদারের দিকে এগিয়ে গেল – “হ্যাঁ আমরাও থাকবো আজ তোর ঐ ওপরের ঘরে।

এক মুহূর্তেই ‘আহুতির’ হাতে টান দিয়ে দোকান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এল অর্ণব।

সম্পূর্ণ ভিজে যাচ্ছে তারা, কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশ থেকে যত তাড়াতাড়ি পালতে পারে তার জন্য একটা চলন্ত ট্রেকারকে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে ইশারা করলো। তাতে আরো দুজন লোক ছিল। আহূতিকে পেছনে এবং অর্ণবকে নিজের পাশে বসিয়ে জোরে চালিয়ে দিল, ড্রাইভার তার বাহনটিকে।

– “কোথায় যাবেন দাদা”?

– আপনি যতটা যাবেন চলুন, তারপরে অন্য কোন গাড়ি নেব, বৃষ্টির মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

– ‘কোন গ্রামে বাড়ি’? গ্রামের নাম বলতেই সে জানতে চাইলো – কার বাড়ি যাবেন বলুন না, পৌঁছে দেব। এরা তো একটু আগেই নেমে যাবে, আমরা তো একটু পয়সা কমানোর জন্যেই গাড়ি চালাচ্ছি, না কি?

– প্রফুল্লবাবুর বাড়ি।

– আরে আপনি “মাদুর জ্যেঠু” – গহনা জেঠির ছেলে নাকি?

– “হ্যাঁ, হেসে ফেললো অর্ণব”।

– “আরে তোমাকে তো কতবার আমি তোমার  হোস্টেলে ছেড়ে এসেছি, সেই করিম চাচা, মনে নেই তোমার”?

– “ও হ্যাঁ তাই তো আপনার ভারী গলার আওয়াজেই আমার চেনা উচিত ছিল। সেলাম চাচাজী কেমন আছেন”?

অর্ণব গল্প জুড়ে দিল ট্রেকারের মালিকের সঙ্গে। পরের গ্রামে অন্য দুজন সাওয়ারী নেমে যেতেই এসে বসলো সে আহুতির পাশে।

“আপনাকে আজ আমার বাড়ি যেতে হবে। এই দুর্যোগের রাতে আপনাকে একা তো ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”

আহুতির মনে হল ‘মা’ সরদার সে অহেতুকী কৃপা লাভ করেছে। ঘোর আঁধারে বিপদ মাঝে মা তাকে উদ্ধার করবার জন্য আজ এই দেবতুল্য ডাক্তার ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবু একটু সংশয় জাগলো মনে, এর বাড়ির লোকেরা কি মনে করবেন? এই রাত্তিরবেলায় হঠাৎ একজন মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে দেখলে গ্রামের প্রতিবেশীরাও কি নানান সন্দেহ করতে ছাড়বে? তাই একটু আবেগ মেশানো গলায় সে ঐ ড্রাইভারবাবুকে বলল, – “চাচাজী আমার গ্রামটা একটু অন্য দিকে, ওনাকে নামিয়ে দিয়ে যদি আমায় আপনি বাড়ির দিকে নিয়ে যান, তাহলে খুব ভাল হয়”।

-“না গো মা, আল্লাহর সে রকম ইচ্ছা নাই। আমার গাড়িটা রাত ৯টায় এই কাঁথিতে এনে জমা করে দিতে হবে। এটা আমার নিজের গাড়ি নয়”।

অর্ণব শান্ত কণ্ঠে বললো, – “আমি জানি একজন অচেনা অজানা যুবকের সঙ্গে হঠাৎ করে তার বাড়ি যেতে আপনার অস্বস্তি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আমাকে পর ভাবছেন কেন? আপনি যে পরিবারের সদস্য, আমিও তো তাঁদেরই একজন”।

“কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না” আহুতি আস্তে আস্তে বলল।

“আপনি নিবেদিতার ভক্ত। আর তিনি কার শিষ্য? বিবেকানন্দের। বিবেকানন্দের গুরু কে? শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ – আমিও তাঁদের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি। আমার মা বাবাও অত্যন্ত বড় এবং উদার মনের মানুষ। তাঁরা কিছু মনে করবেন না। পাড়ার লোকেদের আমি জানি বাবারই আশ্রিত অসহায় আত্মীয় স্বজন তাঁরা। কারো স্বামী নেই, কারো স্ত্রী অসুস্থ, কারো বা ছেলে বিদেশে গিয়ে আর ফেরত আসেনি, কারও কারও মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবি হওয়াতে বাবা, কাকা, দাদা সবাই মারা  গেছেন, আমাদের বাড়িটাই তাদের বাড়ি”।

-“এরকম পরিবার এখনও আছে আমাদের দেশে”?

– “শত শত, হাজার হাজার, তাই তো ভারতবর্ষ এখনও এতো সুন্দর”।

– ‘তাহলে ওই ছেলেগুলো কি?’

– ওরা সমাজের ক্ষত। চাকরী নেই, শিক্ষা দীক্ষা ঠিক মতো হয় নি। মূল্যবোধের পাঠ না পড়ে এবং রাজনৈতিক নেতাদের ও সুবিধাবাদী মানুষের কাজ করতে করতে ওরা ওদের সামনে কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। সত্যিই ওদের এই অবক্ষয় আমাদের মতন স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিককে বিশেষতঃ মেয়েদের ভয় ভীত করে তুলেছে, কিন্তু তা বলে সবাই সেরকম নয়। ওদের ঠিক করার দায়িত্বও আমাদের মতন সুস্থ মানসিকতার তরুণ সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত। তাই আশা হারালে চলবে কেন”!

কথায় কথায় সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল, তারা জানে না। করিম চাচার বাহন এসে তাদের বাড়ির দরজায় থামলো তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। গ্রামের লোকেরা এইসময় প্রায় শুতে চলে যায়। প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী কথা বলছিলেন, – ছেলের বিষয়ে।

“ডাক্তার হয়ে এলে এখানেই ওকে একটা ডিসপেনসারি খুলে বসিয়ে দেব ভাবছি,” বললেন বাবা।

– “না গো ও তো আরও পড়বে বলছে। দিল্লীতে সব বড় জায়গায় হৃদযন্ত্র অপারেশন করতে শিখবে, আমাকে বলেছিল”। – মা জানালেন।

“সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু খুব বড় ডাক্তার হলে তো শহরের হাসপাতালগুলো ওদের কিনে নেবে, বন্দী করে রাখবে তাদের নার্সিং হোমে, টাকা পয়সা অর্থ – সুন্দরী স্ত্রী এইসব লোভ দেখিয়ে। তখন কি আর সে এই গ্রামের মানুষের সেবায় লাগবে”?

ঠিক এই সময়ে বাইরের থেকে হাঁক ডাক শুরু করলেন করিম চাচা, – “মাদুর জেঠু আসুন, দেখুন কাকে নিয়ে এসেছি।

ছাতা হাতে মা বাবা ছুটে বেরিয়ে এলেন, সদর দরজার বেড়া ডিঙিয়ে, এক উঠোন জল ছপিছপিয়ে।

নেমেই পায়ের উপর ঝুঁকে প্রণাম সারলো অর্ণব। আহুতি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকারের সামনে। অর্ণব বলল, – ‘মা এর নাম আহুতি, ওর গ্রামও অনেক দূরে, আজ আমাদের বাড়িতেই থাকবে’।

– “আহা গো বাছা ,মেয়ে আমার ভিজে একেবারে চুপড়ি হয়ে গেছে, এস মা আগে ঘরে এসে কাপড় ছাড়ো, মুখ হাত পা ধুয়ে নাও, তারপরে সব বেত্তান্ত শুনবো”।

বাবাও ওর ব্যাগটি তুলে নিলেন অক্লেশে “এসো এসো মা লক্ষ্মী, কোনো দ্বিধা করোনা”।

এমন আন্তরিকতায় কার মনে কি সংশয় থাকতে পারে!

ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। চার বোন আরাধনা, অর্চনা, আরতি ও আহুতি তারপর তাদের ভাইয়ের জন্ম দিয়েই মায়ের মৃত্যু হয়। বড় বোনেরা সর্বদা ভাইয়ের যত্নে ব্যস্ত। ঠাকুমা সংসার দেখেন। স্বামী পরিত্যক্ত মাসী রান্নাবান্না সামলান। তাঁরও দুটি ছেলে মেয়ে। আহুতি একটু একা একাই খেলা করে বেড়ায়। ঠাকুর ঘরে বসে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে সে। পাশের বাড়ির দিদি ‘নিবেদিতা’ স্কুলে পড়তেন, সেখানেই হোস্টেলে থাকতেন। তার আগ্রহেই আরতি ও আহুতি ভর্তি হল, কলকাতার বাগবাজারে গিয়ে,সেই বিখ্যাত বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আরতি চলে গেল B.Sc নার্সিং পড়তে। বড়দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল। সেই আশ্রিত মাসীর সাথে ঠাকুমার ঝগড়া হওয়ায় তিনিও তাঁর গ্রামে চলে গেলেন। ক’দিন পরেই জানা গেল, তাদের ভাই পড়াশুনো করে না, গ্রামের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে, তাই মন খুব খারাপ, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না তাই আহুতির। বিয়ে থাওয়া সংসারের প্রতি আকর্ষণ তার ক্রমশঃ কমে এসেছে। সংস্কৃত নিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যই ছিল, আমাদের ধর্মশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করা। নিবেদিতা স্কুলের মাতাজীদের আদর্শ, নিরাসক্ত, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ভাবনায় সিক্ত হয়ে আছে সে।

‘অর্ণবদের’ বাড়ি এসে বড় ভালো লাগলো তার। ভীষণ শান্তি ও আনন্দময় পরিবেশে মায়ের স্নেহপূর্ণ ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে দিল।

অর্ণব ও আহুতি যতক্ষণ ভিজে কাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুযে  এসে বাইরের খোলা বারান্দায় দাঁড়ালো, বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশে একফালি চাঁদ মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, বাগান থেকে জুঁই, চামেলী কিম্বা গন্ধরাজের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্যাঙগুলো একনাগাড়ে গান শুনিয়ে যাচ্ছে গ্যাঙোর গ্যাঙোর গ্যাঙ করে।

মা ততক্ষনে এদের জন্য গরম খিচুড়ি নামিয়ে বেগুনী ভাজছেন, তাঁদের খাওয়া দাওয়া আগেই হয়ে গিয়েছিল। বাবা পুজোর ঘরে ঠাকুরকে শয়ন করিয়ে, বাসি ফুলগুলি সরিয়ে সকালের জন্য ঘরটি পরিষ্কার করে, পূর্ব পুরুষের ছবিতে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে বেরিয়ে এলেন। প্রতিদিনই এই কাজগুলি তাঁকে নিয়ম করে করতে দেখা যায়। সকালে উঠেই আবার স্নান সেরে ঠাকুরের ফুল তুলে দেন স্ত্রীকে, পুজোর জন্য।

অর্ণবের সঙ্গে মেয়েটিকে আসতে দেখে একটু অবাক হলেও কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি জাগেনি তাঁর মনে, বরং ভালোই লাগলো, ডাক্তারি পাশ করে এইরকম একটি সঙ্গিনী যদি সে পেয়ে থাকে, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ছেলেকে সংসারী করে সফল ডাক্তার রূপে দেখতে চান তিনি। বয়স বাড়ছে তাঁর। ভাগ্নে শংকর যদিও তাঁর ব্যবসাপত্র – মাদুর তৈরী – বিক্রি ইত্যাদি ভালোই সামলে নেয়, আজকাল চাষ – বাসও ভাইয়ের ছেলেরা উৎসাহ নিয়ে করে। প্রচুর আলু ও পুকুরের মাছ তাঁকে – তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে সচ্ছলতার মধ্যেই রেখেছে। এবার একটা নাতি-নাতনি দেখার শখ জাগছে মনে। স্ত্রী কিন্তু এতো তাড়াতাড়িতে ওর সম্বন্ধ দেখতে বা বিয়ের প্রস্তাব আনতে ইচ্ছুক নন। একজন নারী হয়েও পড়াশুনো বা জ্ঞান অর্জনের উচ্চ আকাঙ্খা তাঁর প্রবল। স্কুলের গন্ডী পার হবার আগেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু পরিবারের ছেলে মেয়ে সবাইকে খুব উৎসাহ দেন , ভালো করে লেখা পড়া শিখতে। নিজের তো মেয়ে হয়নি ভাই, দেওর বা ননদদের মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের পিপাসা জাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। তারা সবাই তাঁর আগ্রহে B.A., M.A., B.Ed ইত্যাদিতে মহিষাদল কলেজে বা বর্দ্ধমান বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে। তাঁর ছেলে অর্ণব এদের সবার মধ্যে বেশি মেধাবী ছিল এবং ডাক্তারি পাশ করেও সে যেন আরও পড়াশোনা করে, বড় বড় অপারেশন করে রুগীদের বাঁচাতে পারে, সমাজের অনেক মানুষের সেবা করে – গরীব দুঃখী কে যেন ভালোবাসতে পারে – এটাই তাঁর ইচ্ছে। গ্রামের লোকেরা বলেন, এমন ‘মা’ না হলে কি আর ছেলে ‘রত্নগর্ভা’ হয়।

রান্না করতে করতে ভাবছেন তিনি, মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার কথা অর্ণব তো বলেনি কখনও। কিন্তু বড় সুন্দর মায়াময় চোখ মেয়েটির, হয়তো ওর সঙ্গে একসাথে ডাক্তারি পড়ে। ভালোই হয়, যদি পরে  তাঁর পুত্রবধূ হয়ে আসে। খিচুড়ি থালায় ঢালতে ঢালতে হাসি পেল তাঁর, আমাদের মন গুলো কেমন ! একটুতেই কত আগে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল দেওয়ার মত হল এটা। – ঠাকুরের ইচ্ছে ছাড়া তো একটা পাতাও নড়ে না – তাঁর বহু কৃপা লাভ করেছেন তিনি। এতসুন্দর স্বামী, সংসার ভরা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু প্রতিবেশীর ভালোবাসা – এ সবই তো অযাচিত ভাবে পাওয়া। এখন তাঁর প্রতি শরণাগত হয়ে থাকাটা, সবচেয়ে বড় কর্ত্তব্য। এসব নিয়ে একদম আর ভাববেন না। দেখি  না ছেলে কি বলে? মেয়েটিরই বা মনের মধ্যে কি আছে! কেমন বংশ, পরিবার, জাত, পাত, ধর্ম নিয়ে তাঁর মাথা ব্যাথা নেই, শুধু মনের মিল হওয়া চাই।

খাওয়ার ঘরে সুন্দর আসন পেতে বসালেন দুজনকে। ভারী ভদ্র মেয়েটি, ‘আপনারা খাবেন না’? জানতে চাইল সে। ‘না গো মা আমাদের খাওয়া অনেক্ষন হয়ে গেছে,’ বললেন মা, খাবারে হাত দেওয়ার আগে  ঠাকুরকে নিবেদন করলো, তারপর মুখে খাবার তুলে নিল সলজ্জভাবে। “কী সুন্দর স্বাদ, এত সুন্দর খিচুড়ি আগে কখনও এমন যত্ন করে বসে কেউ খাওয়াননি আমাকে”। অর্ণব বলল, – “আমার মায়ের হাতের বেগুনী তো খাননি এখনও, খান, একটু কামড় দিয়ে দেখুন, আরও চাইবেন। – মা আরও ‘চার ছ’টা দাও গো, এই কটাতে কি হবে আমার”।

-মা বললেন, “আজ ঝুড়িতে এই কটাই বেগুন পড়েছিল বাবা, কাল সকালে বাগানের গাছ থেকে তুলে করে দেব, মুড়ির সঙ্গে খাস”।

খাওয়া শেষে মায়ের ঘরে পাশের চৌকিতে শোবার জায়গা হল আহুতির। অর্ণব নিজের ঘরে টান টান সোজা হয়ে শুলো। সারাদিনের ঘটনা ও ধকলের কথা মনে পড়ল তার। বাবা ধীর পায়ে এসে ঢুকলেন তার ঘরে। “আজ খুব ক্লান্ত আছো, ঘুমিয়ে পড়ো বাবু, সকালে উঠে কথা হবে”।

বিছানায় বসে আহুতি শোবার আগেকার প্রার্থনাটি বলছে – চোখ বুজে – মা বিরক্ত না করে নিজের চৌকিতে উঠে বসলেন। তাঁর পায়ের শব্দ পেয়ে তাকালো আহুতি। ধীরে ধীরে এবার বলে চলল, তাদের বাসে ওঠা – ঐ ছেলেগুলির পিছু নেওয়া – বৃদ্ধ এক ভদ্রলোকের হুমকি ও অর্ণবের সক্রিয় ভূমিকায় – কি ভাবে আজ তার সম্মান রক্ষা পেয়েছে – প্রত্যেক ঘটনার কথা। বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তার। গলা বন্ধ হয়ে এল। মা উঠে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠাকুরই রক্ষা করেছেন। সময়মত তিনি আমার ছেলের মাথায় যে বুদ্ধি জুগিয়েছেন, সে তোমাকে সোজা বাড়ি নিয়ে এসেছে – খুব ভালো করেছে। আমাদের গ্রামের করিম ড্রাইভারও ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছেছে, না হলে হয়ত একটা অঘটন ঘটে যেত”। – ভয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। বার বার মাথায় দু হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানাতে লাগলেন তাঁর ইষ্ট দেবতার কাছে। যেন নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। কী অপূর্ব মমতাময়ী তাঁর রূপ। মাতৃহীনা আহুতির চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল। অনেক্ষন ঘুম এল না তার।

সকালবেলায় স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলো মায়ের সঙ্গে। মা ফুল চন্দন দিয়ে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রী শ্রী মা ও বিবেকানন্দের ছবিগুলি সাজালেন, – ঘরের গোপালকে বাতাসা জল ও একটু ফল কেটে ধুপ ধুনো জ্বেলে পুজো করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলেন ,মেয়েটি সেই একইভাবে বসে জপ করে চলেছে – তার পবিত্র মুখ, বসার ভঙ্গি, নীরব উপস্থিতি মা কে মুগ্ধ করে দিল।

একটু পরেই হটাৎ বাইরে “করিম চাচা”র গলা শোনা গেল – “মাদুর জেঠু, কেউ যাবেন নাকি গো কাঁথি শহরে? আমি যাচ্ছি এখন”।

বাবা আর অর্ণব চা নিয়ে বসে গল্প করছিল বারান্দায়। চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে উঠে গিয়ে বললেন তাকে – “ঘরে অতিথি এসেছে, ভাত না খাইয়ে তোমার জেঠিমা কি ছাড়বে ঐ মেয়েটিকে? তুমি বরং দুপুরে খেতে এলে একবার ডাক দিও। নইলে বিকেলে অর্ণব মহেশের গাড়িতে ছেড়ে আসবে”।

– “না গো জেঠু, আমিই নিয়ে যাব বিকেলে। অন্য কাউকে ডেকো না” বললো করিম।

 গ্রামের প্রতিবেশীদের কাছে ততক্ষনে অর্ণবের আগমন বার্তা বিশেষতঃ একজন মেয়ে বান্ধবী সঙ্গে নিয়ে আসার খবর বোধহয় রটে গেছে। কাকা-কাকী, পিসি ও তাদের ছেলে-মেয়েরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছে, তাদের বাড়ির উঠোনে। অবশ্য অর্ণব এলে প্রতিবারই তারা আসে, এবং হৈ চৈ, গানে কথায়, নানান গল্পে হাসিতে প্রফুল্লবাবুর বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যায়। মাদুর বোনা, বড়ি দেওয়া এমন কি চাষের কাজ  ফেলে – কাকাতো, মামাতো ভাই-বোন, ভাগ্নেরা যে যেভাবে পারে, এই আনন্দমুখর পরিবারে সক্রিয় যোগদান দেয়।

আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘ন’ টা বাজতে না বাজতেই তারা এসে সব মুড়ি চপ, পান্তাভাত, লুচি মণ্ডা-মিঠাই যার যা মন চায় তা দিয়ে জলখাবার খেয়ে পেট ভরিয়েছে এবং এন্তার হৈ চৈ করে অর্ণবের পেছনেও লেগেছে। –

“কি গো ছোড়দা ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? হটাৎ জোড়ে একেবারে এসে সবাইকে অবাক করে দেবে ভেবেছিলে”?

– “আরে চুপ, চুপ, চুপ কর তোরা। কি সব আবোল তাবোল বলছিস, উনি শুনতে পেলে কি ভাববেন বলতো”?

– পিসিমার ছেলেকে সবাই বড়দা, জেঠুর ছেলেকে মেজদা, এবং এই প্রফুল্লকাকার সবচেয়ে প্রিয় দাদাকে ‘ছোড়দা’ ডাকে, ভালোবাসে ওর মুখের মজার মজার কথা, মিশনের স্বামীজীদের নানান অলৌকিক সব গল্প ও রবীন্দ্রসংগীত শ্যামাসংগীত এবং কথামৃতের গান শুনতে। তার মতন সারা পাড়া পরিবারকে মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা আর কারো মধ্যে নেই। বড়দা মেজদার বৌ রা এসে রান্নার কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছেন। দুই কর্মচারীকে নিয়ে এক কাকা পুকুরে জাল ফেলেছেন। ঘরে কোন অতিথি এলেই এটা করেন তারা। কারণ অন্য দিন আলাদা আলাদা হেঁসেলে রান্না হলেও কেউ এলে প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী যে সবাইকে এখানেই মাছের ঝোল ভাত খেতে বলবেন, এটা তো একটা অলিখিত ঘটনা। কেউ কাউকে নেমতন্ন বা ডাকা ডাকির প্রয়োজন মনে করেন না এখানে। মালি কলাপাতা কেটে আনে, শশী জেঠি শাক কাটেন ঝুড়ি ঝুড়ি। মদন কাকার মাচার থেকে সবচেয়ে সব চেয়ে বড় বড় কুমড়ো – লাউ ডাঁটা সমেত কেটে আনা হয়। পাশাপাশি পুকুরে গুগলি তোলেন ওরা সব শহরের লোকেদের একটু নতুন জিনিস খাওয়াবেন বলে।

শান্তি মামীর ভাণ্ডার থেকে বর্ষার জন্যে তুলে রাখা শুকনো আমসী কুল ও পুরোনো তেঁতুল বেরিয়ে পড়ে। এই রান্না ঘরে জমা করা হয় বেশ ঝাল মিষ্টি টক চাটনি হবে বলে।

সিধু ময়রার দোকানে খবর পৌঁছে যায়, আজ মাদুর জেঠুর বাড়ি অতিথি এসেছেন, রসগোল্লা ও বোঁদে পাঠাতে হবে বিকেল বেলায়। ময়রা বৌ পান চিবোতে চিবোতে জানতে চায়, “ছেলে বাড়ি এসেছে বুঝি, কলকাতা থেকে”? সঙ্গে আর ক’জন?

অর্থাৎ প্রতিবারই অর্ণব তার কলকাতার ডাক্তারি পাঠরত হোস্টেলবাসী সহপাঠীদের নিয়ে আসে। তারা অনেকেই এরকম গ্রাম, পুকুর, নদী, মাদুর বোনার কৌশল, মাছ ধরার এতো বিশাল জাল দেখেনি কখনও। সেই সব বন্ধুরা বলে ‘প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রীর আপ্যায়নের কথা, এখানকার আত্মীয়-স্বজন, সহজ সরল মানুষগুলোর কথা তারা তাদের জীবনে হয়তো কখনও ভুলতে পারবে না।

– কিন্তু এবারে যে একেবারে অন্য ব্যাপার। অর্ণবের সঙ্গে বান্ধবী তাও অতি সুন্দরী সুশীলা। তাকে তো আলাদা ভাবে সমাদর করতে হবে।

অর্ণব কত চেষ্টা করছে – বোঝাতে চাইছে যে, কাল বাসেই এই মেয়েটিকে সে প্রথম দেখলো কিন্তু কে তার কথা শোনে। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে আহূতিকে। সে অবাক হলেও, লজ্জা পেলেও এই বাড়ির মজাদার উজ্জ্বল পরিবেশ, সকলের স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক ব্যবহার তার মন ছুঁয়ে গেছে। নিজেদের পরিবারে তো কখনও সে এরকম পায়নি। এমন মায়ের স্নেহে কোন সংসার যে এত স্নিগ্ধ শীতল হয়, পিতার গাম্ভীর্য্যময় কিন্তু প্রশান্ত ব্যক্তিত্ব – সমস্ত গ্রামের মানুষকে যেন এক করে রাখতে পেরেছে। তিনি যেন তাদের মাথার ছাতা। কাজেই বিকেলে যখন সবাই সমবেত ভাবে চাইলো – “না না আজ তোমার যাওয়া চলবে না, সন্ধ্যে বেলায় গান বাজনার আসর বসাবো আমরা। তবলা, হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, খঞ্জনী, একটা পুরোনো বেহালা সব বেরিয়ে এল। শতরঞ্চির ওপরে সাজানো হল একের পর এক।

আজ প্রফুল্লবাবুর মনও ভীষণ আনন্দে ভরে গেছে নিজের কাঠের একটা পুরোনো বাক্স খুলে তাঁর ‘ব্যাঞ্জো’টা বের করে আনলেন এবং ভাল করে মুছে দেখতে লাগলেন ,ওটা এখনও বাজছে কিনা। ভাই বেহালা বাজান, ভাগ্নেরও খোল বাজানোর হাতটি বড় সুন্দর। গ্রামের কীর্তনে তাকে সবাই ডেকে নিয়ে যায়।

প্রফুলবাবুর বাড়িতেও প্রতি পূর্ণিমায় কীর্তন এবং অমাবস্যায় শ্যামাসংগীত গাইতে আসে গ্রামের ছেলেরা, আজ বড় ভাল লাগছে – ছেলে বাড়ি আসায়, বিশেষ করে ঐ মেয়েটির উপস্থিতি তার মনকেও বোধহয় একটা নতুন স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে।

সন্ধ্যে বেলায় শুরু হল তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান। প্রথমে পিসিমার নাতি কবিতা শোনালো – সৎপাত্র – যেটা বলে সে এবার স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেয়েছে। বড়দার মেয়ে চুমকি “লক্ষ্মীর পরীক্ষা” নাটকে ক্ষীরো ঝি-এর ভূমিকায় অভিনয় করে খুব নাম কুড়িয়েছে, সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে। ছোট্ট সেই মেয়েটির চোখ মুখ ঘুরিয়ে অভিনয় দেখে বাড়ি সুদ্ধ লোক তো হেসে অস্থির। এরপর অর্ণব গলা ছেড়ে গান ধরল – ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’। কাকা বেহালায় অদ্ভুত মায়াময় সুর তুললেন। প্রফুলবাবুও আজ বেশ ছেলে মানুষের মতন একটা লোকগীতির তান শোনালেন। সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। এক বৌদি গাইলো “দাড়াও আমার আঁখির আগে”।

এবারে আহুতির পেছনে পড়ল তারা। তোমাকে শোনাতেই হবে কিছু। তোমার জন্যেই আজ সকলে এত উৎসাহে চঞ্চল।

সে চোখ বুজে শ্রী শ্রী মাকে স্মরণ করে প্রথমে তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো ও পরে গান ধরলো ,

“সকলি তোমার ইচ্ছা,

ইচ্ছাময়ী তারা তুমি,

তোমার কর্ম তুমি করো মা,

লোকে বলে করি আমি।”

অন্যরা খোল ও হারমোনিয়াম বাজালো তার সাথে। এতো সুন্দর এক পবিত্র পরিবেশ রচনা হল যা অর্ণবের মনে ভীষণ ভাবে দোলা লাগলো। বেশ কিছুক্ষন সে চুপ করে বসে রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে সে গান গেয়ে চলল, একের পর এক। অন্যরা সব যে যার বাড়ি চলে গেছেন, মা বাবা ও আহুতি নিস্তব্ধে বসে আছে। অর্ণব গেয়ে চলেছে ,একের পর এক গান, প্রথমে ই বিবেকানন্দের সেই অসামান্য গান, – মন চলো নিজ নিকেতনে- —

তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত, আজি যত তারা তব আকাশে, সবি মোর প্রাণ ভরি বিকাশে।

– জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, এই লভিনু সঙ্গ তব …… ,

পরদিন সকালবেলায় করিম চাচার ট্রেকারে বসে আহূতিকে তার গ্রামে ছাড়তে যাবার সময় হটাৎ অর্ণব বলল – “আপনি এখানে কপালকুন্ডলার কালী মন্দিরটিতে গেছেন কখনও?”

– আহুতি ঘাড় নেড়ে জানালো – না সে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

অর্ণব করিম চাচা কে বললে – ‘চাচা চলুন একটু ওদিকটা ঘুরে যাই’। “বঙ্কিমচন্দ্রের গল্পের নায়ক নবকুমার এইখানে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে কাপালিকের হাতে পড়েছিলেন। সমুদ্র কিনার  থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই কালী মন্দিরে কপালকুন্ডলার সঙ্গে তাঁর দেখা। পরে তপস্বিনী কপালকুন্ডলার সারল্য ও ত্যাগের কাহিনী পড়েছেন, তাঁরা।এই গল্পের  সেই বিখ্যাত উক্তি তার খুব ভালো লাগে, “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই উক্তি সব সময় মনে ভাবে সে, আজ এখানে নির্জনে বসে দুজনে কিছুক্ষন কোন কথা খুঁজে পেল না।

নীরবতা তাদের মধ্যে অনেক কথার তরঙ্গ প্রবাহ সঞ্চালিত করলো। ধীরে ধীরে একসময় অর্ণব বলল, –

– “আহুতি আপনাকে আমার মা বাবা পরিবারের সকলের খুব ভাল লেগেছে।

– আহুতি সলজ্জ্ব হেসে জানালো, তারও ওদের সবাইকে ভীষণ ভালো লেগেছে। এতো সুন্দর পরিবার সে আগে কখনও দেখেনি। অর্ণব আরও যদি কিছু বলে বসে – কোন প্রস্তাব – কোন ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেলে, তার আগেই তাকে বলে দেওয়া ভালো –

‘আমি – সারদা মঠে সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চাই। শ্রদ্ধেয়া অজয় প্রানা মাতাজীর মতন মেয়েদের কল্যানে, সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে – ঐ সারদা মঠের কোন বিদ্যালয়ে ‘শিক্ষিকা’ রূপে জীবন কাটাতে শপথ নিয়েছি’।

অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে এবার খুব সপ্রতিভ ভাবে হাসি মুখে বলল, আমারও তো একই পথ, আমিও যে বেলুড়ে ব্রহ্মচারী হবার জন্যে নাম লিখিয়ে এসেছি। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ডাক্তারের প্রয়োজন খুব বেশি। চারিদিকে নানা ধরণের বড় বড় হাসপাতাল খোলা হয়েছে।

মহারাজরা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে সেগুলি চালনা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ছেন। দেরাদুনের চোখের হাসপাতাল, সারগাছির ডিসপেনসারি দেখে আমার এই কথাই মনে হয়েছে। ডাক্তার সন্ন্যাসী হয়ে ঐ সেবাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর চিকিৎসায় জীবন দানের কথা। – “যাক আপনি আমায় বাঁচালেন, বাবা – মায়ের মতন আপনার মনেও যদি অন্য এক স্বপ্ন – কল্পনা বাসা বাঁধতো তাহলে আমি বড্ড মুশকিলে পড়ে যেতাম। আপনাকে কিভাবে না করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। – মা বাবাকে মানিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু আর পাঁচজনের মতন বিয়ে করে ঘর সংসার করা আমাদের দুজনের জন্যেই নয়। ঠাকুরের কৃপায় আমরা একই পথের পথিক হলেও আমাদের যাত্রা তো ভিন্ন দিকে, ঠিক করে রেখেছেন ঠাকুর। –

অদ্ভুদ বিচ্ছেদ ব্যাথা এসে তীর বিদ্ধ করলো আহুতির বুকে। তার নারী সত্তা চমকে উঠলো,- প্রণাম জানালো, সে ভবিষ্যতের তরুণ সন্ন্যাসীকে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে এলো সমুদ্রের ধারে। করিম চাচা কিছু লোক ভরে ট্রেকার নিয়ে পাশের গ্রামে ছাড়তে গেছেন। খুব সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা বসবার জন্য। একসারি নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে প্রভাতের সূর্য দেখা যাচ্ছে। মাঝিরা মাছ ধরার ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে জলে ভেসেছে – আকাশে কালো সাদা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ভেসে চলেছে। চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে আছে – দুই তরুণ – তরুণী, – ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অর্ণবই প্রথম কথা শুরু করল – রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা খুব মনে পড়ছে –  এইসময়ে – জানেন? – ‘এই যে তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ।’ আহুতি ঘাড় নাড়লো – ‘না শুনেছি তবে কথাগুলো মনে নেই’। –

– ওতে একটা লাইন আছে, –

“এই যে মধুর আলস  ভরে, –

মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে, –

এই যে বাতাস দেহে করে –

অমৃত ক্ষরণ”।

এই “অমৃত ক্ষরণের” কথা গুরুদেব – রবীন্দ্রনাথ যে কি ভাবে ভাবলেন তা আমার মনে হলে খুব অবাক লাগে। –

আহুতি ‘ক্ষরণ’ মানে টা ধরতে চাইল, কিন্তু পারলো না।

অর্ণব বলল, – ‘‘ডাক্তারি শাস্ত্রে তো অনেকবার রক্ত ক্ষরণ শুনেছি, – যে চুঁয়ে চুঁয়ে দেহ থেকে যখন রক্ত বেরিয়ে যায়। কিন্তু বাতাসের স্পর্শে হৃদয় আত্মা থেকে অমৃত – সুধা যখন বেরিয়ে আসে, তখন তা কতখানি মধুর ও পবিত্র হয় , তা ভাবতে পারেন?’’

এরকম অপুর্ব ভালো  আলোচনায় তাদের সময় কাটতে লাগলো।

আহুতি জিজ্ঞেস করল অর্ণবের দিকে তাকিয়ে – ‘আপনি শ্রীমদ স্বামী আত্মস্থানন্দজীর দর্শন পেয়েছেন? ওনাদের পরিবারের মানে পূর্বাশ্রমের কথা জানেন?”

– ‘হ্যাঁ, পড়েছি ওনার সম্বন্ধে আর স্কুল থেকে একবার বেলুড়ে নিয়ে গিয়েছিল, বিবেকানন্দের জন্মদিনে, – Youth Day, 12th January, তখন কাছে গিয়ে কথা শোনার ও প্রণাম করার সুযোগ হয়েছিল। জানেন মুর্শিদাবাদের ঐ গ্রাম থেকে ওনার দুই বোন সারদা মঠে ও ভাই রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছেন।  এরকম অসাধারন সব  পরিবার আরো অনেক আছে , যেখানে বাবা ঠাকুরের কাছে নিবেদন করেছেন ,তার পুত্র সন্তান কে তিনি যেন পায়ে স্থান দেন, পরে সেই ছেলে টি ও সন্যাসী হয়েছেন l খুব ভালো লাগছে অর্ণবের ঠিক সম মনস্কতার একজন বন্ধু র সঙ্গে কথা বলতে,  উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সে বলে চললো ‘‘স্বামী গহনানন্দজী মহারাজের এক দাদা প্রভানন্দ মহারাজ শিলং এর দুস্থ বঞ্চিত ,অবহেলিত  গরীব ছেলে মেয়েদের জন্যে চেরাপুঞ্জি র মতন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়  গড়ে তোলেন ,বহু কষ্ট সাধন করে, এবং  মাত্র ৩৭ বছরে তিনি শরীর ত্যাগ করেন, এইসব মহান মানুষদের পথে যেতে চাই আমি।

আহুতির মনে হলো ত্যাগের মন্ত্রে সে যেন আজ দীক্ষা গ্রহণ করলো ,এক অভিনব ঘটনার মধ্যে ,এক অসাধারন তারুণ্যের মাধ্যমে। নিজের জীবনের উদ্যেশ্য সফল করতে অনুপ্রেরণা পেলো আরো জোর বাড়লো তার, একই পথের পথিক কে প্রনাম জানালো  মনে মনে।

অর্ণব ঘড়ি দেখলো, করিম চাচার আসতে দেরী হচ্ছে। আপন মনে সে গুন গুন করছে, – ‘চিন্তয় মম মানস হরি’,এই গানটা স্বামী সর্বজ্ঞানন্দজী মহারাজের গলায় শুনেছিল দেওঘরে। উনি সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অদ্ভুত গানের গলা ও ভক্তি যুক্ত চেহারা, ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক স্নেহ। এঁদের মতন পথ পরিদর্শক মহারাজদের দেখে এখনও কত ছেলে ঠাকুরের সেবায়, বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মিশনে নাম লেখাচ্ছে। অনেকেই জানেন না সুদূর অরুণাচলে পাহাড়ের কোলে অরণ্যানীর মাঝে ঈশত্মানন্দজী মহারাজের তত্ত্বাবধানে কী সুন্দর বিশাল এক শিক্ষা – শিক্ষন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই তারা চুপ। হটাৎ অর্ণব জানতে চাইলো, – ‘আসাম সাইডে বেড়াতে গেছেন কখনও? ‘আহুতির পরিবারে কেউ ভ্রমণে উৎসাহ পায় না। সে মাথা নাড়লো।

অরুণাচলে মাতাজীদের পরিচালিত আশ্রমে একবার ঘুরে আসুন খুব শান্তি পাবেন এবং অনেক কিছু জ্ঞানলাভ হবে।

আহুতি জানতে চাইল – ‘আর কোথায় কোথায় ঘুরেছেন বলুন না শুনতে খুব ভালো লাগছে’।

“রাজস্থানের ক্ষেত্রীতে গিয়ে ভীষণ অনুপ্রেরণা পেয়েছি। রাজা মঙ্গল সিং  সিং-এর কথা আলোয়াড়ের সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে?”

– হ্যাঁ, বিবেকানন্দকে যখন তিনি পুতুল পুজোর মানে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন রাজবাড়ীর দেওয়াল থেকে তিনি তাঁদের বাবা বা দাদু অর্থাৎ পূর্ব পুরুষের তৈল চিত্রটি পেড়ে মাটিতে রাখতে বললেন এবং রাজাকে বললেন ওর ওপরে পা দিতে। রাজা এবং তার সভাসদগন অবাক – “তা  কি করে হয়, এটি আমাদের মহারাজের প্রতিকৃতি, পা দিলে অপরাধ হবে না?”

– কিন্তু উনি এখন তো আর ঐ ছবির মধ্যে বিরাজমান নেই। তাহলে? নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, – মানুষ নিজের ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়ে পুতুলকে মৃন্ময় থেকে চিন্ময় করে নিতে পারে, তাই সে ঐ পাথরের মূর্ত্তিতেও ঈষ্টকে দর্শন ও পূজন করে। গল্পটিতে এই অকাট্য যুক্তি রাজাকে মুগ্ধ করে।

অর্ণব আরও বলে চলল, ‘আর জানেন তো রাজস্থানের  ক্ষেত্রীর রাজ বাড়িতে   আমাদের বিবেকানন্দের এক বোধদয় হয়। আহুতি অবাক হয়ে তরুণ ডাক্তারকে দেখতে লাগলো।

সেখানে বাঈজী -ময়নাবাই যখন রাজার সভায় গান গাইতে বসেছেন তখন বিবেকানন্দ নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকার জন্যে আসর পরিত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকেন। এমন সময় গায়িকা তার সুরেলা কণ্ঠে গান ধরেন, –

“প্রভু মেরে অবগুন চিতে না

ধরো – সমদর্শী হ্যায় নাম  তাহার “,

সেই গানটি শুনে বিবেকানন্দের বিবেক জাগ্রত হয়, তিনি মাতৃ জাতির প্রতি অবহেলা করে লজ্জিত হন এবং ক্ষমা চেয়ে নেন ঐ রমণীর কাছে নত – মস্তকে।

এবার করিম চাচার ডাক শোনা গেল – “এসো গো মা, এবারে চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে আসি।” তখনও অর্ণব বলে চলেছে, “রাজস্থানের এই ময়নাবাঈয়ের জীবনেও এক আমূল পরিবর্তন আসে স্বামীজিকে দেখার পর থেকে, তাঁকে আর রাজাদের রাজসভায় গান গাইতে শোনা যায়নি।

করিম চাচার গাড়ীতে বসে একটু দ্বিধাগ্রস্থ কুন্ঠিত গলায় আহুতি বলল – একটা অনুরোধ করব, যদি কিছু মনে না করেন, –

– “আরে আমরা দুজন তো এখন একই পথের পথিক, অনুরোধ নয় স্বচ্ছন্দ্যেই বলে ফেলুন।”

– “করিম চাচার সঙ্গে আমিই চলে যাই আপনি বরং বাড়ি ফিরে যান, বাড়িতে সবাই আপনাকে পেয়ে কত খুশি হয়েছেন।”

একটু গভীর দৃষ্টিতে অর্ণব তাকালো, তার দিকে, মনে হল যেন মনের ভেতরে কি লেখা আছে তা পড়া হয়ে গেল তার।

-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, করিম চাচা আমাকে কাঁথি বাজারের এই মোড়টাতেই নামিয়ে দাও। বাবার ওষুধগুলো কিনতে হবে। তুমি এনাকে একেবারে ঘরের দরজা পর্যন্ত দিয়ে এসো, টাকা বাড়ি এসে নিয়ে নিও।

ওদের গ্রাম বা বাড়ির পরিবেশ যে অন্যরকম তা বুঝতে অসুবিধা হল না অর্ণবের।

বাড়ি ফিরতেই মা ডাক দিলেন, চান করে রান্না ঘরে এসে বোস, আমার কাছে পিঁড়ি পেতে রেখেছি। গরম গরম মাছ ভাজা খাবি আয়।

আজ বাড়ি একদম খালি, বাবা মাদুরের ঘাস কাটতে মাঠে গেছেন, সারাদিন ভাগ্নে ভাইপোদের সঙ্গে ওখানেই কাটাবেন। মা লুচি তরকারি, মিষ্টি বানিয়ে সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। সাথে এক কান্দি কলা, নারকেলও আছে। অর্ণব বুঝলো মা আজ অনেকদিন পরে তাকে একা পেয়ে গল্প করতে চাইছেন। ভালোই হল তারও মন খুলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা জানাতে হবে আজ।

পাতে ডাল, ভাত, চচ্চড়ি ও মাছ ভাজা। “তোমাকেও আমার সঙ্গে বসতে হবে মা, তা না হলে আমি ভাতে হাত দেব না।” বলল অর্ণব।

“হ্যাঁ রে বাবা বসছি, তুই আগে শুরু কর না, আর কয়েকটা ভেজে নিই।”

– “না বসো তুমি আগে, নামাও কড়াইটা, ছ্যাং ছ্যাং করলে কথা বলব কি করে, তুমি শুনতে পাবে না যে।”

খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে হাত ধুয়ে এসে মায়ের কাছ টা তে পিঁড়ি টা টেনে নিয়ে সে বলতে আরম্ভ করলো – “মা আমি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে চাই।

– “আমি বুঝে গেছি, এই মেয়েটিকে তোর ভালো লেগেছে তাই না? তোর বাবা ও আমারও আহূতিকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এই রকমই একটি মেয়ের . . . .

মায়ের কথাটা শেষ করতে দিল না, অর্ণব – হ্যাঁ, মা আহুতি ভালো লাগার মতোই মেয়ে, কিন্তু আমাদের দুজনের পথ যে দু দিকে চলে যাচ্ছে।

– ‘সে আবার কি রকম কথা? ওদের বাড়ির লোকের আপত্তি হবে মনে হচ্ছে?’

– না না ওদের বাড়ি তো আমি যাই নি।

– ও তাহলে আমরা মাহিষ্য,ওরা  ব্রাহ্মণ তাই আপত্তি বলছিস?

– আরে তোমরা তো আগেই অনেক অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছো।

– আমাদের মধ্যে সেরকম কোন ব্যাপার হয় নি, আর হবার সম্ভাবনাও নেই কারন

– আরে আমরা এখনই বলছি না, তোর তো এখন তেইশ আরও দুবছর যাক – তারপর না হয় —

– এবার বেশ গম্ভীরভাবে অর্ণব জানালো, “মা আমি – আমি মিশনে নাম লিখিয়েছি ব্রহ্মচারী হবার জন্য।”

– “সে কী, তাহলে তোর ডাক্তারি করা হবে না? বিয়ে থাওয়া নিয়ে বাবা যে স্বপ্ন দেখছেন সে সব. . .” আর কথা বলতে পারলেন না তিনি, গলাটা ধরে এল। –

– “ডাক্তার তো হবোই মা, দিল্লীর AIIMS -এ সুযোগ ও পেয়ে গেছি সার্জারী শল্যবিদ্যায় MS করবার, কিন্তু মিশনের মাধ্যমে, বিবেকানন্দের আদর্শে – শ্রী শ্রী মা ও ঠাকুরের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে আমি – সন্ন্যাসী জীবন যাপন করতে চাই গো মা।”

-‘ত্যাগের মন্ত্রে যখন দীক্ষা নিয়েছো, ধীরে ধীরে ধরা গলায় বললেন অর্ণবের মা – তখন আমি তো এতে বাধা দিতে পারি না বাবা, তবে.. . ‘-

‘তবে আর কিছুই নেই মা, বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার, প্রথমে কষ্ট পেলেও একদিন তাঁর মনেও শান্তি এনে দিতে পারবো আমি, আমার সেবার কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষা, সংস্কার ও প্রকৃত মূল্যবোধেরই তো পরিচয় পাবে সকলে। তিনি নিশ্চয় আমাকে আশীর্বাদ দেবেন।”

আসতে আসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনের ধারে পুকুর পারে গিয়ে চুপ করে বসে রইল অর্ণব।

মা এঁটো হাতে কতক্ষন একভাবে কাটিয়ে দিলেন জানেন না।

সন্ধ্যে বেলায় শাঁখে ফু দিতে দিতে লক্ষ্য করলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের ছবিটা আজ যেন আরও জ্বলজ্বল করছে। তাঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন তিনি। সারদা মা তাঁর ভক্তদের বলতেন, – “মন তো নয় মা যেন মত্ত হাতি” তাকে বশ করার সবচেয়ে বড় উপায় হল জপ করা, – ‘জপাৎ সিদ্ধ’। আর কারও যদি জপ করতে মন না লাগে তাহলে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতে বলতেন তিনি।

আজ অর্ণবের সন্ন্যাস গ্রহণের শুভ অভিপ্রায় জানার পর থেকে মা কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এই এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন ঠাকুরের ছবির দিকে।

ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের দুই চোখের দৃষ্টি দুই রকমের। আগে কখনও এমন ভাবে লক্ষ্য করেননি তিনি।

এক চক্ষু প্রায় বুজে এসেছে, শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাধিস্থ। অন্যটি বড় অদ্ভুত। কখনও মনে হচ্ছে হাসছেন। স্মিত অপূর্ব সে হাসি তো ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকে, চোখের তারাও কি তাতে দ্যুতি লাভ করে। পরক্ষনেই মনে হল সেই নয়ন তারা যেন নড়ে উঠলো আর তার দৃষ্টি হৃদয় ভেদ করে অন্তরের অন্তস্থলকে একটি মৃদু আলোয় ভরিয়ে দিল।

সেই আলোকে মনের সব ময়লা, ক্লেশ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা – যা এতক্ষন অন্ধকারে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, সব একনিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল, অকারণ ভয় ভাবনা।

বাইরের বারান্দায় বাবার সামনে বসে অর্ণব গান ধরেছে –

“আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়

ধুইয়ে দাও, মনের কোনের

মলিনতা সব দীনতা ধুইয়ে দাও,

নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও. . . .”

এবার সন্ধ্যে আরতি। বাবা যথারীতি কাকাকে খোল মৃদঙ্গ আনতে বলে হারমোনিয়ামটা অর্ণবের সামনে রাখলেন। নিজে খঞ্জনীটা হাতে নিলেন। মা পঞ্চ প্রদীপ জ্বেলে আরতি শুরু করলেন। তার মায়ের মতন ভক্তিমতী সরল স্বার্থ ত্যাগী মানুষ যখন ঠাকুরের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁকে সাধারন মানবী নয় যেন দেবী মনে হয়। বহুদিন ধরেই পুজোর সময় তাঁর পরনে থাকে লাল পাড় সাদা শাড়ী, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ্, ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি। কখনও ভ্রু কুঁচকে থাকে না তাঁর। কখনও বিরক্তি ভাব দেখেনি কেউ আজও সব বিষন্নতা ছেড়ে ফেলে আরতি করছেন তিনি শ্রী শ্রী মা, ভগবান ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের তিনটি ছবিতেই মালা পড়ানো, ধুপ ধুনোর সুগন্ধে গৃহের পবিত্র পরিবেশ যেন মঠ-মন্দিরে উন্নীত হয়ে গেছে।

অর্ণব হাত জোর করে কপালে ঠেকালো বেশ কিছুক্ষন পরে শুরু করল হারমোনিয়ামে সুর তুলতে –

“খন্ডন ভব বন্ধন, বন্দন বন্দি তোমায়

নিরঞ্জন নর রূপ ধর, নির্গুণ নিরাময়. . .

মোচন অঘদূষণ . . .”

বাবা, কাকা, কাকিমা ও অন্যান্য ভাই বোন প্রতিবেশী, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমার দল খোলের আওয়াজেই আসতে শুরু করেছিলেন – তাঁরাও সবাই গলা মেলালেন এক সাথে। শেষে রামকৃষ্ণ শরণ্যে …  তালি দিয়ে দিয়ে।

রাতে খাবার সময় অর্ণব জানালো কাল ভোরেই সে ট্রেন ধরবে কলকাতার উদ্দেশ্যে। করিম চাচা তাকে নিয়ে যাবেন তমলুকে  ছাড়তে।

খুব চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল সে, ব্যাগ গোছাতে। রাত্রে বিছানায় শুতেই গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোক দুটো হটাৎ মনে পড়লো এখানে দৈবী শক্তির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে –

“অভয়ং . . . .আবর্জবম এবং অহিংসা . . .  হ্রীরচাপলম্। –

ভয়শূন্য হয়ে কিভাবে সরল অন্তঃকরণে ইন্দ্রিয় সংযম করে ভগবানের নাম করতে হয় স্বাত্ত্বিকভাবে। সে কথা লেখা এখানে, স্বত্ব ভাবের গুন গুলি বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু কায়মনোবাক্যে কাহাকেও কষ্ট না দেওয়ার কথাও তো বলা হয়েছে, পরবর্তী শ্লোকে। তাহলে? মা বাবাকে কিভাবে কষ্ট দেবে সে ! সারা রাত ঘুমাতে পারছে না সে, মা, বাবা কে দুঃখ দিয়ে কি ভাবে সে নতুন জীবন শুরু করবে? তারাই তো আসল দেবতা, তারাই তো তার প্রথম গুরু। কী করা উচিত তার, বুঝে উঠতে পারছে না।

ভোরে উঠেই সে দেখলো তার বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাগজে লেখা, – “আমাদের সম্মতি দিলাম, তোমাকে ঠাকুরের পদে সঁপে দিলাম। –

আশীর্বাদ – বাবা ও মা।

মুক্তির স্বাদ (Muktir shad)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ছোটবেলা থেকেই বন্দি ছিলাম আমি
সোনার খাঁচায়।
বৃদ্ধ বয়সে অন্তিম অধ্যায়ে এসে,
বুঝতে পারলাম, -
এ জগৎ টা এক বিশাল বড় - হ্রদ।
এখানে এসে মিলিত হয়েছে,
আবার উৎপন্নও হয়েছে, -
অনেক নদী ও নদ।
 
আত্মীয় পরিজন বন্ধু স্বজন
সহকর্মীর ভালোবাসা, -
আত্ম-তৃপ্তি, নিরাপত্তা, নানান রঙিন আশা -
সেই গভীর জলের তলায় -
থরে থরে সাজানো।
চুনী-পান্না, হীরে মাণিক্য -
মুক্ত ভরা সুক্তি দিয়ে ঠাসা।
এরই মধ্যে ডুবিয়ে রেখে, -
ঠাকুর যে নেন, নিত্য
আমার পরীক্ষা।
 
এতোগুলো দিন তো ছিল,
হিসেবে করে চলা, -
গুনে গুনে, ধীরে ধীরে, মেপে মেপে
পা ফেলা,
অকারণে কাজে কথায়
সময়ের প্রতি অবহেলা,
শ্রী শ্রী মা দেন
মোহ লোভ ও চঞ্চলতা জয়ের -
'লক্ষ্মী শ্রী' বাড়িয়ে তুলে,
নিন্দাবান্দা লয়ের
অভিনব এক দীক্ষা,
অন্যদিকে স্বামীজী দেন, কর্ম যোগের শিক্ষা।
 
তাঁদের বাণী কার্যকরী করে -
জীব প্রেমের সেবার মন্ত্র ধরে -
জীবন এখন করছে শুধু তোমারই অপেক্ষা।
এসো প্রভু তুমি এসে,
অকারণে ভালোবেসে, -
তলিয়ে গিয়ে গভীর জলে,
দাও আমারে মুক্তির স্বাদ -
বন্দি হবার ভয় হতে আজ
করিও গো রক্ষা।।

দময়ন্তী – পয়মন্তী (Damayonti – Payomanti)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফুটফুটে সেই লাবণ্যময়ী সবার প্রিয় কণ্যা।
তুষার শুভ্র বরণ তাহার রূপের যেন বন্যা
রাঙা ধুলোর পথে পথে, কালু দাদুর সাথে সাথে,
কখনো বা কাঁধে পিঠে, চড়ে বেড়ায় সোহাগ রথে,
নয় তো সে মেয়ে নগন্যা।
 
কুমড়ো সেদ্ধ আলু ভাতে পোস্ত হলে রান্না,
সরস্বতীর মতন সাত্ত্বিক অন্য কিছু-ই খান না।
দামী দামী খেলনা পুতুল, ঐশ্বর্য্য আছে অতুল,
কখনও তিনি আবেগ বশে, অসার বস্তু চান না।
ছোট্ট থেকেই "দময়ন্তী" তাইতো অসামান্যা।
 
"ঠাকুমার" ঐ কোণের ঘরে, চুপটি করে উঁকি মারে -
জপ, ধ্যান আর পুজো দেখলে, বসে থাকে দু পা মেলে,
সাধিকা সেই মেয়ে তখন কোথাও যেতে চান না।
সবাই তারে ভালোবাসে, খলখলিয়ে সদায় হাসে, -
দেবলীনা শিশুকন্যা, শুনিনি তার কান্না।
 
সবার সঙ্গে একাত্ম হয়, কিশোরীটির নেই লোভ ভয়,
মিষ্টি সুরে কথা সে কয়, হতাশ প্রাণে দেয় যে অভয়,
বড় হয়ে "বুদ্ধদেবের" স্তুপে দিলেন ধর্ণা।
অপূর্ব কোন অনুভূতি, হৃদয় বীণায় ভক্তিগীতি,
স্বর্ণোজ্বল সেই সে স্মৃতি, বইতো প্রেমের ঝর্ণা।
 
মাত্র অর্ধ-শতাব্দীতে কঠিন রোগের জীবাণুতে, -
আক্রমিলো দেহ যে তার, পেলো "কেমোর" যন্ত্রনা।
যদিও তার অপার আনন্দ নষ্ট করতে পারলো না।
"স্বর্গ দুয়ার" খুলে নিজে, প্রভু এলেন তাহার খোঁজে
'মুক্ত' আত্মা চললো সেথায়, কারো অপেক্ষা করলো না।
 
ভিক্ষু কাঁদেন বৌদ্ধ-বিহারে, স্বজন মিত্র বহু দূরে -
অশ্রুনদী বাঁধ মানে না, জানায় সবে সমবেদনা,
অশুড়িয়া, আমেরিকা, নেপালি বন্ধু বসে একা -
স্মরণচিহ্ন পটে আঁকা - হৃদয় তাদের মেঘে ঢাকা।
ভারাক্রান্ত অন্তরেতে দুঃখ বরফ গললো না।
 
'এলিজাবেথ' মাতা তাঁহার, স্তব্ধ শান্ত - পাথর মূর্ত্তি,
তাঁকে দেখে সবার মনেই জাগে প্রবল প্রীতি ভক্তি,
পুত্র এবং পুত্রবধূ সদায় থাকেন তাঁহার পাশে,
পিতা গণপতির মৃত্যু - দৃশ্য তাদের চক্ষে ভাসে -
বিষন্নতার বাদল হতে বৃষ্টি বারি ঝরলো না।
 
মিটিয়ে দিলে সকল শ্রান্তি, ঘুচিয়ে দিলে ভুল ও ভ্রান্তি
করিল জীবাত্মা কত সুকৃতি, পেলে আজ তাই চরম শান্তি।
এই জগতে বিরল যে অতি, তোমার তুল্য তুলনা।
ধন্য তুমি দময়ন্তী, বুদ্ধপন্থী পয়মন্তী,
ঈস্বরে ছিল তব সদা মতি, -
প্রিয় জনের পরান হতে, পাষান প্রাচীর সরলো না।