স্বর্ণপদক প্রাপ্ত এক ধেড়ে ইঁদুরের অসাধারণ কীর্তি ( Swarnapadak prapto ek dhere indurer asadharon kirti )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ওরা নাকি মানুষ? ওদের আছে মান আর হুঁশ।

ওরা ধর্ম – কর্ম – ঘর্ম বেঁচে রকমারী অস্ত্র বানায়।

ওরা চাঁদ ধরতে চায়,

কিন্তু সুন্দর সৃষ্টির বিনাশ ঘটায়,

নানা ধরণের বোমা বানায়, –

ধ্বংস তথা বিনাশের  উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ায়,

কত রকম উপায়  !

শান্তির আকাশ ভরে দেয় কালো ধোঁয়ায়,

 কি সুখ যে ওরা পায়?

 

আমার মতন অতি ক্ষুদ্র একটা

আফ্রিকার ইঁদুরকে এইসব তথ্য –

বড় কাঁদায় আর ভাবায়।

নামটি আমার ‘ম্যাগামা’।

বাড়ি তানজানিয়ায়।

ছোট্ট একটা গ্রামে নগন্য এক অরণ্যে

মাঠে ঘাটে বনে বনে, মা বাবার সঙ্গে

আমার মতন শত শত প্রাণীরা

ঘুরে বেড়ায়।

ঠিক এইসময় সুদূর বেলজিয়াম থেকে

কে যেন আমাদের ডাক দেয় –

কী  এক মোহনীয় কাজের আহ্বান শোনায়,

এখন আমার মন তোমাদের সেই

কাহিনীটি জানাতে চাই।

 

তানজানিয়ার জঙ্গলে, বনে, মাঠে, ঘাটে মা, বাবা, ঠাকুমা, দাদু ও বন্ধু-বান্ধব ভাই বোনদের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতাম, আমরা আফ্রিকার দৈত্য ইঁদুরের দল।

অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্যাঙ্গারুর’ মতন আমার মায়ের পেটেও থলি আছে। তাই আমাদের ‘Pouched – Rat’ ও বলা হয়। ভীষণ আনন্দে নিজেদের জগতে মত্ত হয়ে ছিলাম, হটাৎ একদিন একদল লোক এসে খাঁচায় পুরে বন্দী বানালেন, আমাদের মতন বেশ কিছু ছোট ছোট ইঁদুরদের। মা বাবার থেকে আলাদা হয়ে খুব দুঃখ হল, কান্নাকাটিও করলাম, একনাগাড়ে কয়েকদিন ধরে। কিন্তু ওরা আমাদের কোনো ক্ষতি করল না। খুব ভালোভাবে আমাদের প্রিয় খাদ্য বাদাম (Peanuts) আর কলা খেতে দিল। অনেক রকম ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর সব ইঁদুরের মধ্যে থেকে আমাকে আলাদা করে দিল, আমার নাকি ঘ্রান (Sniffing ) শক্তি ভীষণ প্রবল। ওদের মনে হল, আমি খুব চটপটে আর বুদ্ধিমান তাই ওরা আমাকে একটা অদ্ভুত ধরনের গন্ধ শুঁকিয়ে বার বার করে কিছু বোঝাতে চাইল। নতুন শিক্ষন প্রণালীতে আমার খুব মজা লাগল।

আমার নাম “ম্যাগামা” (Magama) ওদের সংস্থার নাম – এপোপো (APOPO) ‘বেলজিয়াম’ নামে একটি ভারী সুন্দর দেশে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। একটা মাঠে সারাদিন ধরে চলল, আমার নতুন প্রশিক্ষণ। আমার চোখের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, তাই মাঠের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু খুঁজে বের করবার ট্রেনিং দিতে লাগলেন ওরা। ওগুলো কি প্রথমে আমি জানতাম না। পরে শুনলাম, ওগুলোকে ভূমিজ বোমা (Landmine) বলা হয়। আমার কাজ হল, জমিতে লুক্কায়িত আছে ঐরকম যেসব বোমা সেগুলো গন্ধ শুঁকে শুঁকে তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বের করে দেওযা, তাহলে ওরা আমাকে আরও অনেক বাদাম ও কলা পুরুস্কার দেবে। বেশ কিছুদিন ট্রেনিং এর পর ওরা আমাকে নিয়ে গেল কম্বোডিয়ায়।

সেখানে ভিয়েতনামের সীমান্তে এক বিশাল জায়গাজুড়ে এই সব ‘ল্যান্ড মাইন পোঁতা আছে। এটা যে কত সাংঘাতিক সেটা আমি জানতাম না, একদিন যখন একটা জায়গায় একদল মানব শিশু খেলা করছিল, তখ্ন  ওদের সামনে একটি বোমা ফাটল। আমরা একটু দূরে থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলাম, কিন্তু ওই বাচ্চাগুলির ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত দেহ, যন্ত্রনাকাতর মানুষের ক্রন্দন, চিৎকার অসহায় মর্মান্তিক অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি।

কে, কারা, কিসের জন্য এইরকম ‘মারণাস্ত্র’ মাটির নীচে পুঁতে রেখেছে, বুঝতে পারলাম না। তারা কি সব পাগল? রাক্ষস? কোনো  দানবের দল!

আমার শিক্ষকেরা খুব দয়ালু। আস্তে আস্তে তাঁদের সম্পর্কে অনেক জ্ঞান হল আমার।

“Anti Personnel Landmines Detection product Development On Wikkenling – Apopo জানতে পেরেছে যে আমার দ্বারা এইসব পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনগুলি বের করা সম্ভব হলে বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবেন তাঁরা।

কম্বোডিয়ায় তৎকালীন কম্যুনিস্ট গর্ভমেন্ট Khmer Rouge এবং আমেরিকা নামক সবচেয়ে উন্নত দেশের সাহায্য প্রাপ্ত ‘ভিয়েতনামের’ মানুষের কান্ড এটি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত নিজের দেশের মানুষের হত্যাকারী সরকারের নিষ্ঠূর ক্রিয়াকর্ম দেখে আমার মতন ছোট্ট একটি জন্তুও চোখে জল রাখতে পারল না l

মাওবাদী/স্টালিনবাদীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী দল এতো জঘন্য হত্যালীলা চালিয়েছে, যার বর্ণনা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। কত নিরীহ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী শান্তিকামীর  প্রাণ যায়, ঐসময় ওদের হাতে। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য ৭৫০ কিমি সীমান্তে হাতে করে এই সব ছোট ছোট একধরণের নিউক্লিয়ার বোমা পুঁতে দিয়েছিল তারা। পড়ে আরও শত শত বোমা ঠিক ঐরকম ভাবে মাটিতে পুঁতে মৃত্যু ফাঁদ বানিয়ে রাখতে কি যে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল ভিয়েতনামের মানুষ, আমার মতন রোডেন্ট ইঁদুরের চোদ্দ পুরুষেরও সাধ্য নেই তা বোঝবার।

১৯৮০ থেকে ৯০ পর্যন্ত কত যে বোমা ফাটে এবং সাধারণ গরীব শান্তিকামী মানুষের বিনাশ হয়, তার হিসেবে নেই, পাঁচ বছর ধরে কাজ করে করে একাই আমি ৭০টি ঐরকম ল্যান্ডমাইন খুঁড়ে বের করলাম। বিস্ফোরণের আগে তাদের আবিষ্কার, কত হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। আরও ৩৮টি জায়গায় ওদের লুকিয়ে রাখা মারণাস্ত্রও উদ্ধার করতে সক্ষম হলাম আমি।

ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ার যুদ্ধে চল্লিশ (৪০) হাজার লোক মারা যায় এবং ৬০ হাজার আহত হয়। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য কম্বোডিয়া হাজার হাজার ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখে তাদের প্রশস্ত সীমান্তে। ওদিকে অন্য দলও কম যায় না, তারাও আমদানী করে বহু পোর্টেবল নিউক্লিয়ার বোম! যেগুলি হাতে করে গর্ত খুঁজে খুঁজে জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা হয়। যাতে কেউ সীমান্তের এ পারে আসতে না পারে।

সেই হাত বোমাগুলি ফাটতে থাকে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত। কত হাজার গ্রাম্য শিশু, কৃষক, শ্রমিক মাঠে কাজ করতে গিয়ে মাটি খুড়বার সময় ঐসব বোমা ফেটে প্রাণ হারায়। নিরীহ মানুষ নিধনের এই গুপ্ত অস্ত্র এখনও কখনো কখনো কোনো কৃষকের লাঙ্গল লেগে মাটির ভেতর থেকে মুখ বাড়ায় এবং প্রচন্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসের মৃত্যুর লীলা খেলা দেখায়।

১৯৭৯ সালে ভিয়েতনাম এই কম্বোডিয়ার দখল নেয এবং যুদ্ধের বিভীষিকায় ভীত ত্রস্ত ক্লান্ত দেশবাসী এই ল্যান্ডমাইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। একটি সংস্থা Peace Tree পুঁতে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে প্রচেষ্ট হয়। তাদের স্লোগান হল – যেখানে যেখানে ঐ ল্যান্ডমাইনগুলি ছিল সেখানে একটি একটি করে বৃক্ষ রোপন করা। ১৫০০ জায়গায় অনেক ল্যান্ডমাইন বের করে ৮০০০ গাছ লাগানো হয়। এই উদ্যোগ অসামান্য প্রচেষ্টায় ঐ দেশের রূপ বদলাতে থাকে।

আমাকে ‘লন্ডনে’ নিয়ে গিয়ে গলায় সোনার মেডেল দেওয়া হল, অলিম্পিকের খেলোয়াড়দের মতন। আসলে এটি আমার APOPO শিক্ষক ট্রেনারদের প্রাপ্য। একদল মানুষ এখনও আছেন, যাঁরা ধ্বংস নয় সৃষ্টিতে বিশ্বাস করেন। পৃথিবীটাকে সুন্দর শান্তিপূর্ন যুদ্ধ হিংসা বিদ্বেষ হীন এক আনন্দময় জগতে পরিণত করতে চাইছেন। আমার মতন ক্ষুদ্র প্রাণীর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবেন তাঁরা কথা দিলেন আমায়। আমার জীবন ধন্য হল স্বার্থক হল।

আগুনের পরশমনি (Aaguner poroshmoni)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের লেন্সে চোখ রেখে, ঘাড় গুঁজে গবেষণা করে চলেছে ‘রণিতা’। ভাইরাসটির সঙ্গে সারা বিশ্বের প্রত্যেক গবেষণাগারে এখন ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তারা। আজ তাদের তৈরী ‘ভ্যাকসিন’ বাজারে আসছে। লক্ষ লক্ষ লোক সেই ওষুধে আবার কোভিড জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে – তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়াতে সক্ষম হবে।

গভীর আনন্দে শান্তিতে তার বন্ধু সহকর্মী ল্যাবের সব রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাত্র ছাত্রীরা আজ আবেগাপ্লুত। –

এতদিন তারা কিভাবে যে সময় কাটিয়েছেন, কি খেয়েছেন, কখন একটু ঘুমাবার চেষ্টা করেছেন, কেউ জানে না। তাঁদের উদ্দীপনা, উত্তেজনা, অসাধ্য সাধনের অদম্য প্রচেষ্টা আজ সফল হল।

আজ অনেকদিন পরে বাড়ি আসছে রণিতা। বুকের ভেতরে তার একটা অদ্ভুত খুশির বান ডেকেছে। গিয়েই প্রথমে স্নান করবে সে অনেক্ষন ধরে। তারপর খুব ভালো করে রান্না করে সে নিজের হাতে ঘর সাজাবে, এলোমেলো সংসারের হাল ধরবে। আর তার পঁচিশ বছরের জীবন সঙ্গীকে খুব যত্ন আদর দিয়ে ভরিয়ে দেবে। মনোরঞ্জন আর তার প্রেম কাহিনী তো বন্ধু মহলে বিশেষ ভাবে আলোচনার বিষয়। একমাত্র মেয়েকেও খুব ভালো ভাবে মানুষ করছে তারা। সে এখন East Cost এ ফিলাডেল ফিয়াতে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে। মায়ের কাজের সাফল্যে সেও খুব গর্বিত। স্বামী একা একা বাড়িতে work form home করছে। সারাদিন কম্পিউটার এর মধ্যে ঢুকে থাকে। মাঝে মাঝে স্পন্ডেলাইটিসে বড্ডো কষ্ট পায় সে। এবার লকডাউনে ওর জীবন একেবারে বন্দী কয়েদিদের মতন হয়ে গেছে।

রণিতা ভাবে এবারে কিছুদিন ছুটি নিয়ে শুধু মনোরঞ্জনকে সময় দেবে সে। কেমন যেন অপরাধবোধ ও কষ্ট বুকের ভেতরে এসে হৃদয়টাকে কুরে কুরে খেতে থাকে। প্রথমে দুজনেই পাঁচ বছর Phd করতে একজন আরেকজনকে কম সময় দিয়েছে। পরে মেয়ের পড়াশোনা, বিভিন্ন activity তে গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, ঘরের কাজ, বাজার দোকান ইত্যাদিতে দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত ছিল। স্বামী তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে, পরিবারের জন্য। রান্না করাটা তার একটা হবি ছিল। ভারতীয় খাবার শুধু নয়, ইটালিয়ান পাস্তা বা সবরকমের চাইনীজ ডিশ বানিয়ে মেয়েকে খুশি করতো সে। এখন দুবছর তাদের একে অপরের দিকে তাকাবার সময় পাইনি। আলাদা আলাদা কর্মক্ষেত্রে এই দুই সত্ত্বা যেন দুই দ্বীপে বাস করছে। কিন্তু কি করবে! যে মহামারী এসেছে – যে সংকটের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ এক দুঃসময়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তার প্রভাব তো তাদের ওপরও পড়তে বাধ্য।

গাড়ি বেশ জোরেই চালালো সে। হটাৎ একটা পুলিশের ভ্যান এসে সাইরেন দিয়ে হাত দেখালো, থামতে বললো। রণিতা গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করাতেই দুজন পুলিশ অফিসার এসে জানলা খুলে ID Card দেখতে চাইলেন। তারপর হাসপাতালের front line worker, scientist দেখে সেগুলি ফেরৎ দিয়ে বললেন, – ঠিক আছে যান, তবে আর speed limit cross করবেন না, পরেরবার ফাইন হয়ে যাবে। স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললো রণিতা।

বাড়ির চাবি সব সময়ই ওর কাছে একটা থাকে, যদি মনোরঞ্জন ঘুমোয় বা মন দিয়ে কাজ করে – এই ভেবে কখনও disturb করে না তাকে। আজ মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে সে স্বামীকে। ওর এই ‘ফাইজার’ কোম্পানীর সাফল্যে নিশ্চয় মনোরঞ্জন বুকে চেপে ধরবে রণিতাকে অথবা আগেকার মতন একেবারে কোলে তুলে নেবে। বুকের মধ্যে আনন্দ ধ্বনি যেন ড্রাম বাজাতে লাগল।

দরজা খুলতেই একটা ভীষণ উগ্র সেন্টের গন্ধ নাকে এল তার। ড্রইং রুমের সোফায় সম্পূর্ণ নগ্ন একটি যুবতী ঘুমে অচৈতন্য। পাশে ড্রিঙ্কস এর খালি বোতল ও দুটো গ্লাস। মনোরঞ্জন বোধহয় বাথরুমে। কাঁধ থেকে বড় ব্যাগটা পাশে আপনা আপনি খসে পড়ে গেল। দু মিনিট একদম স্তম্ভিত হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এটা কি তার নিজের বাড়ি? অন্য কোথাও এসে যায়নি তো ! মনোরঞ্জনের ডেস্কটপ কম্পিউটারটিতে তখন একটা ভিডিও চলছে, নানা ধরনের উত্তেজক দৈহিক সুখ ভোগের ক্রিয়াকলাপ, এগুলো দেখতে দেখতে শরীরের সমস্ত স্নায়ু গরম হয়ে ওঠে।

রণিতার পা দুটো কে যেন পেছন দিকে টানছে, সে ধীরে ধীরে যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনি বেরিয়ে গেল, গাড়ির চাবি ও ফোনটা হাতে ধরাই ছিল, যন্ত্রচালিত রোবোটের মতন সে তাই গিয়ে বসল আবার তার স্টিয়ারিংটি ধরে। এক্সিলেটরে চাপ দিতেই গাড়ি ছুটলো যেন দিকবিদিক শূন্য হয়ে। পশ্চিম আমেরিকার এই রাস্তাটা তার ভীষণ প্রিয়, 101, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র – সামনে নীল আকাশ, দুধারে বোগেনভিলার গাছ। এখন গরমকাল, প্রখর রোদ্রে চারিদিক ভীষণ তপ্ত, রৌদ্রের তেজে ছোট ছোট পাহাড়-টিলা একেবারে শ্যামলতা হীন, রুক্ষ শুকনো ঘাস যেন ধুলোর রঙে ধূসরিত ধূসর রঙের বিবর্ণ। কোথাও কোনও কি স্নিগ্ধতা নেই! এতদিন একটা মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে ভীষণ ভয়ানক একটা দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল তারা, সেই সাংঘাতিক লড়াই চালাতে গিয়ে অন্য কোনোদিকে তাকাবার – ভাববার বা অন্য কাউকে সময় দেবার কথা মনেও আসেনি তার। মহামারী – লকডাউন বহু Introvert একাকিত্বের শিকার নর-নারীর জীবনে কোভিড আক্রমণ ছাড়াও আরও কত রকমের বিচ্ছিন্নতা – নিরাপত্তা হীনতা ভয় প্রসূত মানসিক বিকার এনে দিয়েছে, তা হয়তো আস্তে আস্তে বোঝা যাবে। এই ভীষণ ঝড় অনেক দূরের মানুষকে যেমন কাছে এনে দিয়েছে তেমনি আবার মাত্র এক/দেড় বছরের মধ্যে অতি কাছের মানুষকেও বহু দূরে ঠেলে দিয়েছে – একথা রণিতা গভীরভাবে অনুভব করল আজ। একটা ‘ভিসতা’ পয়েন্টে যেখান থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে নীল জলের পাশে অনেক পাথর পড়ে আছে, সেখানে গাড়ি রাখার জায়গায় গাড়িটা রেখে ধীরে ধীরে নামলো রণিতা। একটা পাথরের ওপরে গিয়ে বসে রইল, পাথরের মূর্ত্তির মতন। ফোনে গান চালালো – দেবব্রতের কণ্ঠে “আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী “সুদূর বিপুল সুদু….র, তুমি…. যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশুরী” – শুনতে শুনতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রণিতার মনও সব বিস্ময় – দুঃখ – নৈরাশ্য ভুলে উধাও হয়ে যেতে লাগল দূরে – বহুদূরে – প্রখর সূর্যালোক, সমুদ্রের উদাত্ত বাতাস ও সামনে জলের ধারে উঠে আসা কিছু অটার্সের অশান্ত ভাবে খেলাধুলা করার দৃশ্য এবং বিশাল বিশাল কিছু ওয়ালরাস, সী লায়নের চলাচল দেখে মুগ্ধতার কোন গভীরে ডুবে যেতে লাগল রণিতা। কয়েকটি সিগল এসে জড়ো হয়েছে তার চারপাশে। মাছ মুখে নিয়ে একটা সাদা বক উঠে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে কতকগুলো কাঁকড়া সমুদ্রতটে পাথরের খাঁজে খাঁজে বড় বড় দাঁত নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে, এ জগৎটা কত সুন্দর – এই প্রকৃতি কত উদার, বিভিন্ন জন্তু জানোয়ার, পোকা-মাকড়, পশু-পাখিদের এই সহাবস্থান – এই সক্রিয় জীবনের ছবি তার মনকে বিভোর করে দিল। শান্ত মনে নতুন বোধদ্বয় হল। নতুন এক ছবি ফুটে উঠল তার সামনে। এত বৃহত্তর জীবনের মাঝে এসে সে – অনুভব করল যে তার অনুপস্থিতি এবং গৃহবন্দী হওয়ায় দৈহিক ক্ষুধা বা একটু আরাম সহানুভূতি আন্তরিকতা, কারো হাতের স্পর্শ, সুখ লাভের ইচ্ছের বশবর্তী হয়ে যদি ‘মনোরঞ্জন’ তার থেকে দূরে সরে যায় – তাহলে সেটাকে অস্বাভাবিক ভাবলে চলবে কেন? সেই স্কুল কলেজের সময় থেকে তারা প্রেমের বন্ধনে বাঁধা। সুন্দরভাবে সন্তান পালনের কর্ত্তব্য দুজন মিলে পালন করেছে। তাদের জীবন কি এই এক প্যানডামিকের ঝড়ে বিধ্বস্থ হয়ে যাবে। কোভিড তাদের ছুঁতে পারেনি। বাবা মায়েরা কেউ হটাৎ মারা যাননি। মেয়ে এখনও ভাল আছে – যে কাজে সে যুক্ত তাতেও তার সাফল্য লাভ হয়েছে, তাহলে কেন সে এমন মনকে অবশ বিবশ সংকীর্ণ করে ফেলে এমনভাবে নিজের বাড়ি ঘর সংসার ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তার বাবা সব সময় বলেন, “forgive and forget, নাহলে আগে এগোতে পারবে কি করে?” এগিয়ে চলাই তো জীবনের ধর্ম। 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ ঘুম এসে গিয়েছিল রাচেল নামে মেয়েটির। দরজা খুলে রণিতা চলে যাওয়ায় একটা আওয়াজ হল এবং  গরম হওয়ার ঝোঁকায় উঠে পড়ল সে। তাড়াতাড়ি হাফ প্যান্ট ও টি শার্টটি গলিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। আরও পাঁচটি জায়গায় সময়মত ডেলিভারী পৌঁছে দিতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে মালিকের কাছে। ওষুধ কোম্পানীর থেকে প্যাকেটগুলি সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় তাকে। ভীষণ গরম পড়েছে এবার ক্যালিফোর্নিয়ায়, এরকম আশ্চর্য রোদের তাপ আগে কখনও সব রাস্তা ঘাট সবুজ পার্কগুলিকে এমনভাবে ঝলসে দেয়নি। খুব ক্লান্ত হয়ে এই ভদ্রলোককে ওষুধ দিতে এসে এক বোতল ঠান্ডা জল চেয়েছিল সে। তিনি ড্রইং রুমে বসে কম্পিউটারে কিছু খুলে রেখেছিলেন। ওকে আন্তরিকভাবে ভেতরে আসতে বললেন। ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে দুটি গ্লাসে বিয়ার ঢেলে নিয়ে গল্প করতে আরম্ভ করলেন।

ছোট থেকেই সে লাস্যময়ী, শরীরের প্রতিটি খাঁজে ঢেউ তুলে হেসে কথা বলতে পারে। মেক্সিকো থেকে এখানে আসার পর থেকেই বিভিন্ন হোটেলে, রেস্টুরেন্টে কাজ করেছে সে। ১৮ বছর বয়স থেকে আলাদা থাকে, বন্ধুদের পরামর্শে কন্ট্রাসেপ্টিক ওষুধ খায়। যে কোনও জায়গায় যে কোন ধরনের মানুষের সঙ্গে সহবাস করতে তার যেমন আপত্তি নেই, তাদের কথা এক মিনিটে ভুলে যেতেও তার পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না। অতএব আজকের ঘটনাটি জলে বুদবুদ ওঠার মতন একমুহূর্ত্তে মন থেকে মুছে দিয়ে আবার সে এগিয়ে যায় অন্য পাড়ায় অন্য বাড়িতে ওষুধের ডেলিভারী দিতে। এই প্যানডামিকে বহু লোকের চাকরী চলে গেছে কিন্তু Amazon, Zomato বা আরও অনেক অনলাইন দোকানগুলির মাল বহনকারী এই ডেলিভারী বয় ও মেয়েদের কাজ অনেক বেড়েছে। কিছু বন্ধুর ‘কোভিড’ হওয়ায় সে এখন দুই শিফটে কাজ করে অনেক ওভারটাইম পায়। লকডাউন খুললে দেশে ফিরে গিয়ে সংসার পাতবার বাসনা তার বাড়ছে।

 

তৃতীয় অধ্যায়

মেয়েটির ধড়মড় করে উঠে হড়বড় করে পালিয়ে যাওয়াতে মনোরঞ্জন তোয়ালে হাতে ড্রইং রুমে এসে দাঁড়ালো। এতক্ষন সে বোধহয় কোন ঘোরে ছিল, কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। মাথায় জল ঢেলে শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। হটাৎ খোলা দরজার পাশে রণিতার বড় ব্যাগটি চোখে পড়ল। ইলেকট্রিক কারেন্ট লাগল তার শরীরে। এক মুহূর্তে মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্যতায় ভরে গেল। পায়ের তলা থেকে মাটি ক্রমশঃ সরে যেতে লাগল তার। ছোট বাচ্চার মতন বিড় বিড় করতে লাগল, – ‘হে ভগবান এখন কি হবে?’ আমি কি করে রণিতার সামনে আবার সহজভাবে দাঁড়াতে পারব। ও যদি মেয়েকে জানায়, বাবা মাকে বলে দেয়, বন্ধু বান্ধবদের কাছে নালিশ জানায়? ও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়! বা রাগে দুঃখে অভিমানে কিছু করে বসে, তাহলে? তাহলে . . . . . তাহলে . . . ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে লাগল মনোরঞ্জন। তার এতদিনের সুন্দর সংসার কি সে নিজের ভুলের জন্যে কাঁচের ফুলদানীর মতন ভেঙ্গে দিল! খোলা টেলিভিশনে হটাৎ একটা ঘোষণা শোনা গেল, – ফরেস্ট ফায়ার লেগেছে চারিদিকে। দলে দলে ঘর খালি করে পথে, মাঠে বেরিয়ে পড়েছে, হাজার হাজার লোক। সেগুলি দেখতে দেখতে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মনোরঞ্জন। সম্বিৎ ফিরে এলো দরজায় অনেক লোক, পুলিশ এসে চেঁচামেচি করেছে শুনে, কি চায় এরা, কি বলতে এসেছে? রণিতার কি কোন বিপদ হয়েছে?

ইভাকুয়েট করে তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন। পাশের বাড়ির ছাদে পাশের জঙ্গলের আগুনের ফুলকি এসে পড়েছে, আপনার কাঠের বারান্দাতেও সে আগুন পৌঁছাতে দেরী লাগবে না। বেরিয়ে আসুন শীঘ্রই. . .  ইংরেজি, স্প্যানিশ নানা ভাষায় পুলিশের মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে। ল্যাপটপ ও ওয়ালেট এবং একটা জলের বোতল হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো সে। পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে হাত নেড়ে ডাকছেন এক বৃদ্ধা। তার সামনের ঘরে আগুন ধরে যাওয়ায় বেরোনোর রাস্তা বন্ধ। মনোরঞ্জন এক লাফে বাগানের পেছন দিয়ে তাঁর গ্যারেজে ঢুকে পড়লো। এখানে সে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার দরজাটি খুঁজে পেল। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল সেটি। তাড়াতাড়ি ঐ ভীত মহিলার পাশে পৌঁছেই চ্যাং দোলা করে কোলে তুলে নিল তাকে। ধোঁয়ায় ঘর ভরে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে পারছে না তারা, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোরকমে পেছনের রাস্তা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে। বৃদ্ধাকে বাঁচিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশীরা ঘিরে ধরলো তাকে। ভীষণ জোরে একটা আওয়াজ শুনে চমকে তাকালো তারা – মনোরঞ্জনের বাড়িটি তখন জ্বলন্ত আগুনের কবলে। ফায়ার ব্রিগেড এসে গেছে, জলের ফোয়ারা ছুটেছে – সবাই দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছে। পাশের বড় বড় রেডউড গাছগুলি বাঁচাবার জন্য আরেকদল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে তাদের মুড়ে দিচ্ছে। 

দাবানল – দাবানলের ভয়ঙ্কর রূপ বাক্যহারা করে দিল। অবশ বিবশ হয়ে পথের ওপরে বসে পড়ে মনোরঞ্জন। রণিতার গাড়ি বাড়ির প্রায় কাছাকাছি আসতেই ফায়ার ফরেস্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে, ভাবতেই পারেনি তাদের ঐ কাঠের বাড়িগুলিও ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। গাড়ি থামিয়ে ছুটে এল সে। প্রথমেই মনে হল আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে মনোরঞ্জনকে খুঁজে আনবার কথা, কিন্তু বাইরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখতে পেল তার চেহারা। ওদিকের মাঠে – কৃষ্ণকায়া আফ্রিকান আমেরিকান অ্যালমা ও শ্বেতাঙ্গিনী মিসেস জন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে কাঁদছেন। কিছুদিন আগেও বর্ণ বিদ্বেষের কারণে একজন আরেকজনকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। আজ মহামারী এসেও যখন তাঁদের মিল করাতে পারেনি, আগুনের লেলিহান শিখার সামনে মিলন দৃশ্য এক অভিনব সত্যের দর্শন করিয়েছে তাঁদের।

রণিতা মনোরঞ্জনের কাছে আসতেই শিশুর মতন ফুঁপিয়ে উঠল সে। মায়ের মতন মমতায় স্ত্রী তার স্বামীর মাথাটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ও প্রণাম জানাতে লাগল বারেবারে। তাদের দুজনের বুকেই তখন গান বাজছে – “আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে, এজীবন . . . .”

 

মহাপ্রয়াণ (Mohaprayon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

স্বামী অক্ষয়ানন্দের প্রতি চন্দনা সেনগুপ্তের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মহাপ্রয়াণ
 
হে মহাপ্রাণ, -
তব মহা প্রয়াণ, -
আমাদের মনে এনে দেয় , -
অসামান্য গভীর মূল্যদান।
জীবনভর করে গেছো তপস্যা -
চেয়েছো অপরের কল্যাণ,
সত্যাদর্শী, স্থিতপ্রজ্ঞ,
পেয়েছো সকলের সম্মান।
তোমার সাধন বার্তা করিতেছে -
ব্যাকুল আহ্বান,
মহামারী দেখাচ্ছে যে ভয়,
তবু অচঞ্চল, তোমার সন্তান।
আপন পুণ্যফলে, হরিপদে
দেবলোকে পেলে, তুমি স্থান l
দোষ ত্রুটী মার্জনা করে দিয়ে তুমি
কত দয়াবান - করিলে প্রমান।
মোহমুক্ত ছিলে চিরদিন, -
আত্মলীন, সাধক মহান।
এ জগতে, অবক্ষয়ের যুগে, রেখে গেলে তাই
গৃহ সন্যাসীর অনুপম অবদান।

 

শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দের মহাপ্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

১৯৭১ এর পূর্বে যার নাম ছিল ‘পূর্ববঙ্গ’ সেখানে চট্টগ্রামের সুন্দর এক সুজলা সুফলা সবুজ গ্রাম “আনোয়ারায়” ১৯৩৪ সালের ১০ই নভেম্বর (বাংলা ২৪শে কার্ত্তিক, ১৩৪১) শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে ‘ধর পরিবারের চতুর্থ সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় অক্ষয় কুমার। শৈশব কাল থেকেই তিনি ছিলেন উদার সরল সত্যবাদী, অদ্ভুত ধর্মগত প্রাণ। চার বছর বয়সে তার বাবা-মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের গুটি বসন্ত হয়। সেই সময় খুব ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। ধীরে ধীরে দুজনারই অবস্থা খুব খারাপ হতে থাকে। সব থেকে খারাপ হয়ে যায় মায়ের শরীর। তাঁকে কলাপাতায় শোয়াতে হত। কিছুদিন পরে মা সুস্থ হলেও বাবাকে হারাতে হল। এরপরে তাঁদের বাকি সব ভাইয়েরা সমস্ত বিষয় আশয় ভাগ করে নেয় এবং তাদের কে এক দিকে রেখে দেয়। তাদের মাথার উপর সে সময় দেখাশোনার করার মতন কেউ ছিল না। বড় দাদা আর কিছু না করতে পেরে লোকের দোকানে কাজ করতে শুরু করে দেন, ছোট ভাই বোনদের মানুষ করবার জন্য। ১৬ বছর বয়সে বড় ভাই বিয়ে করেন এবং সেই বিয়েতে যা পন পান, সেই টাকা দিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন।

অক্ষয় কুমার দেখতে দেখতে ১৪ বছরে পা রাখেন। একটা জিনিস সে লক্ষ্য করতো আর খুব কষ্ট পেত যে, তাদের লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে দাদা ধীরে ধীরে সমস্ত চাষের জমি বিক্রি করে ফেলছেন। তাই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, যে আর দাদার উপরে বেশি চাপ দেওয়া যাবে না, নিজেকেই কিছু করতে হবে। তাঁর এক সমবয়সী ভাইপো ছিল, তাকে সাথে করে তিনি একদিন সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে চলে আসেন তৎকালীন ভারতে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে। শিয়ালদহ স্টেশন এর প্লাটফর্ম হয় তাদের বাসস্থান। খুব ইচ্ছা ছিল ‘রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে’র ছাত্রাবাসে থেকে সে আরও পড়াশোনা করবে কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারে সমস্ত স্থান ভর্তি হয়ে গেছে, একটি মাত্র স্থান খালি থাকায় স্বার্থশূন্য কাকা অক্ষয় কুমার তার সেই ভাইপোকে সেখানে রেখে নিজে বেরিয়ে পড়েন – জীবিকার খোঁজে।

এসে পৌঁছান জামশেদপুরে, সেখানে তার গ্রামের পরিচিত এক দাদার সাথে তার দেখা হয়ে যায়। সেই দাদার সুপারিশের ফলে টাটা স্টিল প্লান্ট এ তাঁর চাকরী হয়। দাদার কাছেই থাকতে শুরু করেন, এবং সেই সময় ব্যাঙ্ক এর সুবিধা ছিল না। সেই দাদার কাছেই মাইনের টাকা থেকে নিজে অল্প খেয়ে, অল্প খরচ করে অত্যন্ত সাধারণ দারিদ্রতার মধ্যে কাটিয়ে বাড়ির পরিবারের জন্য তিল তিল করে জমাতেন। হটাৎ একদিন বাড়ি থেকে মায়ের অসুস্থতার খবর আসে, সেই সময় তিনি  সিদ্ধান্ত নেন, বাড়ি যাবেন, কিন্তু দাদার কাছে গচ্ছিত টাকা চাইতে গেলে, একেবারে হতবুদ্ধি করে দেন তিনি তাঁকে, কোন টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। মানুষের নীচতায় বড় দুঃখ ও আঘাত লাগে তাঁর মনে। সেই দেশ থেকে চলে আসার এতো বছর পরে বাড়ি ফিরবে, কিন্তু খালি হাতে কিভাবে বাড়ি ফিরবে? ছোট ছোট ভাইপো ভাইঝি আছে, মা আছেন, কোনোরকমে ধার দেনা করে কিছু অর্থের ব্যবস্থা করে, দেশের বাড়ি রওনা হয়ে পড়েন। বাড়ি যেতেই মা তাঁর বিবাহ দেন, মনকে বন্ধনে বাঁধবার জন্য। কিন্তু তিনি ছিলেন চির উদাসীন, ঈশ্বরাভিমুখী নিরাসক্ত মানুষ। গৃহী সন্যাসীর মতন জীবন যাপনের সরলতায় নিজের নিকটজনও তাঁর প্রতি বিরক্ত হত। জটিল সংসারের নির্ভেজাল এইসব ভাল মানুষেরা  চিরটাকাল এমনিভাবেই সকলের অকারণ সমালোচনার পাত্র হন।

দেশ থেকে ফিরে এসে তিনি আর ঐ জামশেদপুরে ফিরে যাননি। সেই সময় দুর্গাপুর স্টিল প্লান্ট এর কোকোভ্যান-এ তখন শ্রমিক নেওয়া হচ্ছিল, সেখানেই তিনি ১৯৬০ সালে চাকরী পান। পরিশ্রমী সৎ কর্মীরূপে নাম, যশ ও উচ্চপদস্থ অফিসার এর স্নেহের পাত্র হন, অতি অল্প সময়ের মধ্যে। এর মধ্যে তাঁর দুই কন্যা ও এক পুত্র জন্মায়।

অফিসে প্রোমোশনের সময় আসে, কিন্তু তিনি সেই পদের লোভ ছেড়ে নিজের উচ্চপদস্থ অফিসারকে অনুরোধ করে অদ্ভুত এক প্রস্তাব দেন, – তাঁর প্রমোশন মাইনে বৃদ্ধির বদলে, তাঁরা যদি তাঁর দুই শ্যালককে চাকরী দেন তাহলে খুব উপকার হয়। বাংলাদেশ থেকে আগত সেই দুই তরুণদের কাজের বড় দরকার। অফিসার এই প্রস্তাবে আশ্চর্য্য হয়ে যান, কিন্তু তাঁর একান্ত অনুরোধ ফেলতেও পারেন না। কাজ পান তারা সেখানে জামাইবাবুর বদান্যতায়l এই রকম ই পরোপকারী ছিলেন তিনি l অক্ষয়বাবুর জীবনযাত্রা এতো সাধারণ, বিলাসিতাহীন সহজসরল ছিল, যে যাঁরা তাঁকে দেখতেন তাদেরই তিনি শ্রদ্ধাভাজন হতেন।

চট্টগ্রামের সিদ্ধ সাধক ‘মুনিবাবা’ “মহর্ষি শ্রীমৎ স্বামী হরিকৃপানন্দ” মহারাজ ছিলেন তাঁর জীবনের কান্ডারী, তাঁরই এক আশ্রম তৈরী হয় আমাদের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় ব্যান্ডেলের মানসপুরে, নাম মানসপুর যোগাশ্রম। সরস্বতী নদীর কাছে এই অপূর্ব পরিবেশটিতে এসে ঈশ্বর আরাধনায় জীবন কাটাবার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে যান এবং মুনিবাবার শিষ্য শ্রদ্ধেয় “শ্রীমৎ স্বামী সূতেজানন্দ মহারাজ এর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

সারাজীবন সংসারের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন ও কর্ত্তব্য করে গেছেন তিনি, কিন্তু তাঁর ধ্যান জ্ঞান ও ঐকান্তিক নিষ্ঠা ছিল, ধর্মানুরাগের প্রতি। ছেলে মেয়েদের ও তিনি সর্বদা সৎপথে সদ্ভাবনায় ভাবিত হয়ে পরপোকারে উদ্বুদ্ধ হয়ে চলার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। চিরন্তন শ্বাশত সত্যকে ধরে জীবনে এগিয়ে যেতে সর্বদা মূল্যবোধের পাঠ পড়াতেন। সংসার সমুদ্রের উথাল পাথালে ধৈর্য ধরে গুরুর শরণাগত হয়ে থাকতে উৎসাহ দিতেন। ছোট্ট শিশু পুত্রকে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে কোলে বসিয়ে তিনি তার দীক্ষা গ্রহণ করান। সাধারণ লোকেদের কাছে সেটি আশ্চর্য জনক ব্যবহার বলে মনে হত, বহুমানুষ তাঁর এই ভক্তি প্রনোদিত ভাবে জীবন কাটানো, নিরহংকার হয়ে, নিঃস্বার্থ লোভশূন্য থাকার মানে বুঝতে পারতো না। সমালোচকদের দল তাঁর মতন শুদ্ধাত্মাকে হয়তো চিনতে ভুল করতো।

দীর্ঘ সময় ধরে ‘জনক রাজার’ মতো এক হাতে সংসার ও অন্য হাতে গুরু প্রেম ,আধ্যাত্মিকতাকে ধরে রেখে, গৃহী সন্ন্যাসী হয়ে জীবিকা অর্জনের জন্য চাকরী করে যেতে থাকেন অক্ষয়  বাবু। দুই কন্যাকে পাত্রস্থ করা, পুত্রকে গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত পড়া লেখা শেখানো, স্ত্রীর ভরণ পোষণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করে দেওয়া – সব কর্ত্তব্য এবং দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করে গেছেন তিনি। কিন্তু আন্তরিকভাবে আপন হৃদয়ের অন্তঃস্থলে পোষণ করে চলতেন অন্য এক ভাবনা l জাগতিক সুখ বিসর্জন দিয়ে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ভয় ও মাৎসর্য – এই ছয় রিপুকে সম্পূর্ণ ভাবে জয় করে, তিনি গুরু চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন, এবং গেরুয়া ধারী সন্ন্যাসী রূপে জীবন যাপন শুরু করেন l এর পূর্বের একটি ঘটনা উল্লেখনিয়, এর মধ্যে দিয়েও সেই মহান মানুষ টির মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় l

কোকোভ্যানের কর্মরত এক শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে গিয়ে একবার তাঁর ডান হাতের চারটি আঙুলের মাথা কেটে যায়। কিন্তু শারীরিক দুঃখ কষ্ট তাঁকে কখনো বিচলিত করতে পারেনি। অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী এই মানুষটি ছেলেমেয়েদের খুব সুন্দর সাবলীলভাবে জীবনের প্র্যাকটিক্যাল ব্যাপারেও উপদেশ দিতেন। অতি সরল ভাষায় ও সহজ উদাহরণের মধ্য দিয়ে।

তিনি বলতেন যে – “যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাদের থেকে নিজেকে দূরে রাখবে, কিন্তু যারা খুব স্পষ্ট কথা বলে এবং মুখের ওপর সত্যি বলার সাহস রাখে ,তাদের থেকে তোমার কোন ক্ষতি হবে না জানবে। – কখনো অলসতা করবে না, মানুষের উপকার করতে যতটা সম্ভব আপ্রাণ চেষ্টা করবে।

আধুনিকতার নামে আজকাল যে কৃত্রিমতা, ভনিতা, বিলাসিতা তথা অকাজের মাতলামী – টাকার মোহে ছুটে চলা, মানুষের প্রতি নির্দয় ব্যবহার করা, বিভিন্ন কুঅভ্যাস ও নেশায় লিপ্ত হওয়া অর্থাৎ মানবিকতার ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে, এবং স্বার্থন্বেষীদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা দেখে তাঁর দয়ালু মন অত্যন্ত ব্যথিত হত।

এই প্রজন্মের উন্নাসিকতার সঙ্গে, পার্থিব সম্পদের আতিশয্য আড়ম্বরপূর্ণ সমাজের চিন্তাধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তিনি সাত বছর চাকরী থাকা সত্ত্বেও নিজে আধ্যাত্মিক জীবনের, আসল উদ্দেশ্যকে ‘বাস্তবায়িত’ করবার জন্য জীবিকা উপার্জন ও মোহময় সংসার – পরিবার থেকে অব্যহতি নিয়ে আশ্রমবাসী হয়ে যান। সেখানে উনি যোগদান করেন ১৯৯০ সালে।

গুরুদেব শ্রীমৎ স্বামীজী সূতেজানন্দ মহারাজ – এর তিনি অতি প্রিয় পাত্র ও সমস্ত আশ্রমিকের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তিনি l

আমাদের ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের একটি উক্তি আছে – “গৃহের দুর্গে বাস করে ভগবানের সাধনা করে যাও, কর্ম যোগী হয়ে। সন্ন্যাস গ্রহনের পর গুরুদত্ত নাম পান তিনি – ‘শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দ ব্রহ্মচারী।

কিন্তু আজকের দিনে সবচেয়ে অসাধারণ একটি ঘটনা ঘটল তাঁর অন্তিম যাত্রা কালে, হয়ত স্বর্গ হতে গুরুর এটাই নির্দেশ ছিল, তাঁর প্রতি পরোক্ষভাবে। –

তিনি সংসার ছেড়েছিলেন সব জাগতিক পাশ মুক্ত করে – কিন্তু সংসার তাঁকে ছাড়েনি। তাঁর পিতৃভক্ত পুত্র, লক্ষীমন্ত সেবাপরায়ণ সুগৃহিনী – ভক্তিমতী পুত্রবধূ ও তরুণী (বিমান বলাকা – Air hostess) নাতনি এবং সর্বোপরি কিশোর প্রেমিক দয়ালু ও তাদের সন্ন্যাসী দাদুর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল নাতি কিন্তু এই সাধু মহাপুরুষকে কোনোদিন ছাড়তে পারেনি। আজকালকার দিনে এ এক অতি বিরল এবং অসামান্য দৃষ্টান্ত।

সন্ন্যাসী অক্ষয়ানন্দের দেহ যন্ত্রটি ক্রমশঃ বিকল হতে দেখে, তার পুত্র আশিস, পুত্রবধূ জয়া, নাতনি অরুনিশা ও নাতি অভ্রনীল তাঁকে ঐ আশ্রম থেকে তুলে নিয়ে আসে ছোট্ট শিশুর মতন। এই কোভিড-এর ভয় উপেক্ষা করে, নিজেদের সামান্য পুঁজির দিকে না তাকিয়ে, লকডাউন-এর বাধা অতিক্রম করে নিজেদের বাড়ি দিল্লী শহরে রাজধানীর এক ক্ষুদ্র গৃহে নিয়ে আসে। আয়তনে ঘরটি হয়ত তাদের ছোট, কিন্তু সেবার আদর্শে উজ্জ্বল – উদ্ভাসিত। যেদিন উনি ঘরে প্রবেশ করছিলেন সেদিন নাতিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলছিলেন যে এটা তো আমার স্বর্গের সিঁড়ি, এরপরে সোজা উপরে যাবো, আর নিচে নামবো না। সত্যিই আর তিনি নিচে নামেন নি। সেদিন উনি কত সত্যি কথাটা কত সহজ ভাবে বলেছিলেন।

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এই চারজনের শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ও যত্নে একেবারে আপ্লুত ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর মনে হয়, সন্তান সন্ততি বিশেষতঃ নাতি নাতনিদের এই স্নেহের মধ্যে দিয়ে তিনি ঈশ্বরের পরশ ও কৃপালাভে ধন্য হয়েছেন।

জীবনের শেষ সময়ে জাগতিক সব সুখ, মোহ মুক্ত হয়েও তাঁর মন প্রাণ অদ্ভুত এক আনন্দে স্নিগ্ধ হয়ে গেল। নাতনির মুখে হরিনাম ও পুত্র – পুত্রবধূর গীতা পাঠে তাঁর কর্ণ কুহরে সুধা বর্ষণ হতে লাগল এবং নাতির হাতের গঙ্গাজল তাঁর সব পিপাসা মিটিয়ে দিল এক অদ্ভুত অনাবিল রসে।

সজ্ঞানে গুরুর নাম জপ করতে করতে ২৪শে এপ্রিল ২০২১ (বাংলা ১০ই বৈশাখ ১৪২৯) শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন পরম শান্তিতে। সেই পুণ্যাত্মার পাদপদ্মে তাই আমাদের শতকোটি প্রণাম নিবেদন করি। আমার লেখনীর প্রতিটি শব্দপুষ্প শ্রীমৎ স্বামী অক্ষয়ানন্দের মতন কর্মযোগীর জীবনকে যদি স্পর্শ করতে পারে, তাহলে এই লেখিকা ধন্য হবেন।

পুনঃ দেহাবসানের কিছুদিন আগে তাঁর সঙ্গে ফোনে “সৎসঙ্গ” করে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ  হয়েছি।

একই পথের পথিক ( Ak e pother pothik )

চন্দনা সেনগুপ্ত

 

মাঝে মাঝেই সাইক্লোন, ঝড়, টর্নেডো আসে উড়িষ্যায় ও পূর্ব মেদিনীপুরের এই সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে। ভীষণ তান্ডবলীলায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় গ্রামগুলোকে। এইখানেই ১৯৮০ সালে জন্ম হয় অর্ণবের। কাজুবাদামের বাগান, সারি সারি নারিকেল গাছ, মাটি দিয়ে সুন্দর করে নিকোনো উঠোনে একদিকে মাদুর পাতা। তার ওপরে বড় বড় পরাতে ‘গহনা বড়ির’ সমারোহ। ভারী সুন্দর তার রূপ। আর একদিকে শীতল পাটি মাদুর তৈরির জন্যে বেশ খানিক জায়গা বরাদ্দ। বৃষ্টি না হলে সবই ঠিকঠাক চলে। আমদানি, কেনাবেচাও বেশ ভাল হয়। অন্যদিকের নিচু জমিতে নানান সব্জি লাগানো, পুকুরে টলটলে জল ও মিষ্টি মাছের চাষ। বেশ সমৃদ্ধ সচ্ছল আনন্দময় পরিবার।

কিন্তু এই ঝড়গুলো এসে সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়, সাধারন গ্রামবাসীদের। সাগরের জল ঢুকে নদী-নালা, পুকুর-জমি সব একাকার হয়ে যায়। মরে যায় কত শত মাছ, ‘গহনা বড়ি’ গুলোতে সূর্য্যের আলো না পেয়ে ছাতা ধরে যায়। মাদুর তৈরী বন্ধ থাকে।

অর্ণবের বাবা “প্রফুল্লবাবু” এইসময় কিন্তু চুপ করে বসে থাকেন না। প্রত্যেকবারই কোমর বেঁধে লেগে পড়েন “ত্রান কার্য্যে”। তাঁদের বাড়ির দোতলায় ,ছাদে আশ্রয় নেয় কত গৃহহারা অসহায় মানুষ।

গ্রামের মেয়েদের নিয়ে মা বানাতে থাকেন, হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি। সারা বছরের যত্নে তুলে রাখা মুড়ির মোয়া, সিঁড়ির অর্থাৎ ঝুড়ি বেসনের লাড্ডু কিম্বা নারকেল নাড়ু কাজুর গুড়ে মাখা তক্তি – সব বের করে অভুক্ত ভীত আতঙ্কিত বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন। বড় বড় কাঁচের জারে নানান মসলায় জারিত আচার বা আমসত্ত্ব, আমসি, তেঁতুল দিয়ে এক এক দিন চাটনিও বানিয়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র কৃপণতা বা দ্বিধা করেন না।

আসে পাশে যে আত্মীয় স্বজন থাকেন, সবাই কখনও কখনো বোঝাবার চেষ্টা করেন, – ‘সব কেন বের করছেন দিদি, নিজের ছেলে পিলেদের জন্যে রাখুন।’ মা হাসেন, বাবাও বলেন – ওদের কথায কান দিও না। এই গরীব মানুষগুলো ই  তো আমাদের আপনজন, ওরাই  তো আমার মাদুরের ব্যবসা, মাছের চাষ দেখে। গহনা বড়ি দেওয়ার অপূর্ব শিল্পকলা টাকে ওরা ই এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এই ঝড় বন্যা তো আর রোজ রোজ হয় না। এগুলো তো ঈশ্বরের পরীক্ষা।

ছোট্ট অর্ণব জিজ্ঞেস করে, “এ কেমন পরীক্ষা বাবা ভগবানের?’’

বাবা উত্তর দেন, – ‘’মানুষের ধৈর্য্যের, আর মানুষ যাচাইয়ের। দেখবি ক’দিন পরেই জলটা নেবে যাবে। কত পলি পড়বে, আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাঠি ঘাস আবার হু হু করে বেড়ে উঠবে। – চার – পাঁচ  সপ্তাহ পরে সেগুলো কেটে ঘরে আনব, জলে ভিজিয়ে রেখে এইসব গ্রামের মেয়েরা তাকে একটা একটা করে চিরে চিরে ফেঁসো বের করবে, শুকাবে এবং মাদুর বানাতে বসে যাবে, দু দিকে দুটো বাঁশ বেঁধে। এতো সামান্য সাধনে শুধুমাত্র ঘাস দিয়ে যে এতো সুন্দর শিল্প বানানো যায় তা না দেখলে তো কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।’’

গ্রামের লোকেরা বলে, এমন আদর্শবাদী সৎ দয়ালু মা-বাবার ছেলে ‘অর্ণব’, একদিন ঠিক দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

অর্ণব পড়াশোনায় খুব ভাল, অঙ্কে খুব মাথা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টারমশাই একদিন প্রফুল্লবাবুকে বললেন, – “ছেলেকে চন্ডিপুর, পুরুলিয়া. রহড়া কোন রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলে পাঠিয়ে দিন এবার। ঘরের খেয়ে আদুরে ছেলের মতন তেল চুক চুকে মাথায় পাঠশালায় গেলে তো আর ভাল মানুষ হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে, ঐ সব আশ্রমের নিয়ম শৃঙ্খলায় থেকে মূল্যবোধের পাঠ পড়লে, নিজের কাজ নিজের হাতে করার শিক্ষা ও ট্রেনিং দুটোই হবে ওর।”

– কথাটা বাবার মনেও ভাল লাগলো। প্রথম প্রথম মা, পিসি, ঠাকুমা ও কাকা কাকিমা সকলের আপত্তি ছিল, ঐ সহজ সরল আমুদে বাচ্চাটাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু ছেলেও চাইলো, ঐ ছোট স্কুলের গন্ডি ছেড়ে বড় স্কুলে চলে যেতে, সেখানে প্রতিযোগিতা নামে একটা বিশেষ ব্যাপার থাকে। সব ছাত্ররাই সেখানে পড়াশোনাতে খুব ভাল, তাই কে প্রথম হবে সেই নিয়ে বিরাট একটা রেজাল্ট ভাল করার লড়াই নাকি অন্যরকম এক নতুন পরিবেশের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

মাত্র ক্লাশ VI থেকেই শুরু হয়ে গেল, সত্যি সে যুদ্ধের পরিস্থিতি তার জীবনে।

কিন্তু সব যেন ওলোট পালট হয়ে গেল, নবম  শ্রেণীতে  এসে, তরুণ একজ্ন  ভীষণ কর্মঠ বুদ্ধিদীপ্ত, – বিবেকানন্দের আদর্শ প্রনোদিত কর্মযোগী – নিবেদিত প্রাণ হেড মাস্টারমশাই যখন এলেন, তাদের রামকৃষ্ণ মিশনের বিদ্যালয়ে। প্রথম দিনেই সব ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে তাদের গত বছরের অর্থাৎ ‘অষ্টমশ্রেণীর’ ফল অর্থাৎ রেজাল্ট কেমন হয়েছে এবং কে কাকে টপকে কতবার প্রথম হয়ে এই তিন বছরে অর্থাৎ ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টমে প্রথম স্থান অধিকার করেছে তাদের চিহ্নিত করলেন।

দেখলেন চারটি ছেলের মধ্যেই এই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়, চতুর্থ হওয়ার প্রতিযোগিতা বৃত্তাকারে ঘুরছে। এবার ওদের আলাদা করে দাঁড় করিয়ে রেখে বাকি ৩৬ জনের দিকে ঘাড় ঘোরালেন তিনি, – বেশ জোরে অনেকটা আদর কিন্তু বকুনি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, – “কি গো তোমরা কি পড়াশোনা করতে ভালোবাসো না? তোমাদের ফার্স্ট / সেকেন্ড হতে ইচ্ছে যায় না? – প্রায় সবাই চুপ, মাথা নিচু করে আছে। এবার নিজের চেয়ার টেবিল ছেড়ে ক্লাসের একেবারে মধ্যে সব বাচ্চাদের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, তিনি।

“কি হলো – বলো তোমরা, ওদের মতন নাম্বার পেতে ইচ্ছে করে না তোমাদের?”

– “করে স্যার কিন্তু”

– “কিন্তু কি? বলো বলো বলে ফেলো তাড়াতাড়ি, কেন ওরা চারজনের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতাটা চলছে, তোমরা কেন পারছো না ঐ রকম নাম্বার নিতে?”

– “স্যার, স্যার ওদের খুব বুদ্ধি – আমাদের অতো বুদ্ধি নেই ওদের মতন, স্যারদের পোড়ানো অতো তাড়াতাড়ি আমাদের মাথায় ঢোকে না যে, কী করব?”

-“ঠিক আছে, একটা যুক্তি শুনলাম, কিন্তু জানতো, চেষ্টা করলে,অভ্যাস করতে করতে বুদ্ধি ও বাড়ে, যেমন ভালো করে ঘষে মেজে তামা বা সোনা কে ঝক ঝকে করা হয়, তেমনি  খুব অধ্যবসায় থাকলে নিশ্চয় সফল হবে তোমারাও।  এবার একদম পিছনের বেঞ্চে গিয়ে দেখলেন, কতগুলো তাস এবং কাগজের টুকরো পরে আছে। খুব চেষ্টা করেও সেগুলো লুকোতে পারেনি তারা। স্যার অর্থাৎ সেই তরুণ মহারাজ/স্বামীজী একটা একটা করে কুড়োলেন সেগুলি। তারপর যে ছেলেটির পায়ের কাছে ঐগুলি পড়েছিল তার মাথার চুলটাতে আলতো করে হাত লাগিয়ে বললেন, – “ও পেছনে বসে তাস খেলাটা খুব জমে বুঝি?” আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো করে পড়াশোনা করে একবার ওদের হারিয়ে দেখিয়ে দাও, তারপর আমরা তাস, ক্যারাম সব খেলবো।”

সবচেয়ে পেছনের সারি থেকে সব থেকে দুষ্টু ছেলেটা বলে উঠলো –

“সাধু সন্ন্যাসীরা আবার এসব খেলা করে নাকি? তাঁরা তো শুধু জপ, ধ্যান, পূজা আচ্চা করে।” – এবার নতুন স্বামীজী হেসে ফেললেন। তাই নাকি রে?”

“শুধু পুজো পাঠে মেতে থাকলে তোদের পড়াবো কেমন করে? – সমাজ সেবার মধ্যে যাবো কখন? বিবেকানন্দ কি শুধু ধ্যান করেই কাটিয়েছেন? মিশনের ছাত্র তোরা এখানের আদর্শ কি শেখাচ্ছে তোদের?”

“স্বামীজীর” মতন তেজ্স্বী তরুণ শিক্ষকের কথায়, আন্তরিকতায় ছাত্ররা খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করল। এবার সবচেয়ে শান্ত মুখচোরা ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো, “আমার খুব ফার্স্ট হতে ইচ্ছে করে স্যার, কি করে পারবো বলুন তো, সব subject এ ভালো করি, অঙ্কটা যে বুঝতেই পারি না।’

এবার সে শিক্ষক – “চল সবাই গল্প ছেড়ে একটু কাজ করি।” – বলেই নিজের চেয়ারটা বাইরে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় রেখে এলেন। সবাইকে উঠতে বলে ছাত্রদের বসবার কায়দাটা পাল্টাতে চেয়ারগুলো সব গোলাকার রেখে দশ দশ জনের একেকটা গ্রূপ তৈরী করলেন। ছাত্ররাও খুব উৎসাহের সঙ্গে লেগে পড়লো।

এবার প্রত্যেক দলে একজন করে ঐ বেশি নম্বর পাওয়া ছেলে এবং ৮ জন সাধারণ ছেলেদের বসালেন। অর্থাৎ প্রত্যেক গ্রুপে ৯ জন করে হল। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানাধিকারী ছাত্রদের নিজের টেবিলটির মাঝখানে রেখে চারটি চেয়ারে বসতে বললেন। এবার ব্ল্যাকবোর্ড-এ দাঁড়িয়ে বোঝালেন, একটি নতুন অঙ্কের অধ্যায় থেকে কয়েকটি অঙ্ক। বাকি আরও চারটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন, তারপরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, পুরো ক্লাশ রুমে। একেক গ্রুপের কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়াবার পর ফিরে এলেন, নিজের চেয়ারের সামনে। কিছুটা সময় কাটতেই ওই চারজন তাঁকে অঙ্ক দেখাতে এল। তারা সত্যিই খুব বুদ্ধিমান ও মনোযোগী ছাত্র রূপে প্রমান দিল।

এবার শিক্ষক ওদের ঐ চারজন কে পাঠালেন, চেয়ার নিয়ে একেক গ্রুপের মধ্যে বসতে এবং যতক্ষণ না ওরা সবাইকে ঐ অঙ্কগুলি বোঝাতে পারছে, ততক্ষন অপেক্ষা করলেন, অন্য আর দুটি অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে সমাধান করতে দিয়ে।

“অর্ণব” সবচেয়ে চৌখস ও বুদ্ধিমান ছেলে, আর সে, অন্যকে সাহায্য করতেও খুব আগ্রহী, বেশ সুন্দর সহজভাবে ধৈর্য্য নিয়ে সে বন্ধুদের অঙ্ক শেখাতে পেরে আজ একটা অদ্ভুত আনন্দ পেল।

স্যার বললেন, যারা খুবই দুর্বল ও অঙ্কে কাঁচা তাঁর কাছে পাঠাতে। পরের ক্লাশ সংস্কৃতের, কিন্তু সে বিষয়ের অধ্যাপক সেদিন স্কুলে আসেননি। অঙ্ক ক্লাশটা চললো এই পিরিয়ডেও। ছেলেরা কিন্তু সবাই খুশি। যেন কোন খেলার ছলে কঠিন প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে পারছে, তারা বন্ধুদের সাহায্যে। খুব যারা ভীত – দুর্বল তারা একে একে স্যারের পাশে বসে সেই অঙ্কগুলি বুঝতে চেষ্টা করছে। স্যার বলছেন,- ‘‘আমি একজন, দুজন ভাল ছাত্র চাই না। আমার ক্লাশে সবাইকেই খুব ভাল নম্বর পেতে হবে। সাফল্য তখনি আসবে. যখন একজন আরেকজনের হাত ধরে টেনে তুলবে।’

স্কুলের মাস্টারমশাই নয়, বাড়ির পরম আত্মীয়ের মতন এই সন্ন্যাসী শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ভীষণ ভাবে অর্ণবের মন আলোড়িত ও উৎসাহিত হল। উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট করার পর সে ‘ডাক্তারীর’ পড়ায় ভর্তি হ’ল। মহারাজের মাধ্যমে বিবেকানন্দের আহ্বান শুনতে পেয়েছে, সে ডাক্তার হয়ে দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে।

পাঁচ বছর পর যখন পড়া শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র কয়েক মাস। পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় হল। ২০০৩ সালের জুন মাস। চারিদিকে একটা থমথমে গুমোট ভাব। বিকেলে বৃষ্টি নামবে মনে হয়। ‘অর্ণব’ হাওড়া স্টেশনে এসে শুনলো ,আজ “দীঘা-কাঁথি” লাইনের ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে, কোন দুর্ঘটনার কারনে। অগত্যা বাসই ভরসা। একটা বাস একটু আগেই ছেড়ে গেছে, কাজেই প্যাসেঞ্জাররা সব প্রায় চলে গেছে। একজন বৃদ্ধ কাকাবাবু বললেন, “যা ভিড় ছিল, ঐ বাসে, তাই উঠতে পারিনি, পরেরটার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমিও কাঁথির দিকে যাবে নাকি? চলো তবে পরের বাসাটায় গিয়ে এখন থেকে বসি, নইলে আর সীট পাবে না।”

দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলেন, বাস ছাড়বার সময় হতেই পিল পিল করে লোক উঠতে শুরু করেছে, ধাক্কা ধাক্কি – চেঁচামেচী, কেউ কাউকে এক বিন্দু জায়গা দিতে নারাজ।

একটি মেয়ে উঠল বহু কষ্টে একখানা বড় ব্যাগ তার কাঁধে। কয়েকটি ছেলে তাকে দুদিক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলছে। ইচ্ছে করে তাকে কোন ঠাসা করে দুজন পিছনে দুজন সামনে তাকে এমন ভাবে আটকে দিয়েছে, যে সে অস্বস্তিতে বিরক্তিতে খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে, – “কী হচ্ছে কি? রাস্তা ছাড়ুন, আগে লেডিজ সীটের দিকে যেতে দিন।”

হ্যা হ্যা করে দাঁত বের করে হেসে উঠল তারা, – কি করে যেতে দেব কোলে নিয়ে নাকি?

বৃদ্ধ কাকাবাবু হঠাৎ অর্ণবের পাশ থেকে ভীষণ জোরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন – “কন্ডাক্টর – কন্ডাক্টর, রাস্তা করে দাও, আসতে দাও দিদিমনিকে এদিকে।”

টিকিটের গুচ্ছ হাতে নিয়ে সার্কাসের জোকারের মতন ভিড়ের মধ্যেও সে পয়সা টাকা নিয়ে টিকিট ধরাতে ব্যস্ত ছিল, ভদ্রলোকের চিৎকারে একটু টনক নড়লো তার।

“এই যে সরুন দাদা – একটু রাস্তা দিন, দিদি এদিকে আসুন, দিন ব্যাগটা আমাকে ধরান।” মেয়েটি অর্ণবের সীটের কাছাকাছি আসতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, বেশ জোর দিয়েই বলল, – ‘এই যে এদিকে আসুন এখানে বসুন।” কাকাবাবু একটু সরুন,বলে জানলার দিকের সীট টা দেখালো মেয়েটিকে।

সে একটু থতমত খেয়ে বলল, “না না আপনাকে উঠতে হবে না এটা তো লেডিস সীট নয়।”

– “যা বলছি শুনুন” গম্ভীর গলায় যেন আদেশ করল অর্ণব সেই মেয়েটিকে। দ্বিরুক্তি না করে সে ওই কাকাবাবুর পাশের সীটে গিয়ে বসে পড়ল। – ‘অনেক ধন্যবাদ’ বলে সলজ্জ একটা হাসি হাসলো মেয়েটি। তারপর গলার স্বর নামিয়ে ঐ ভদ্রলোককে বলল, ‘এরা অনেক্ষন থেকে আমার পিছু নিয়েছে, কতদূর যাবে কে জানে !

– ‘তুমি কোথায় যাবে মা’? জিজ্ঞেস করলেন ঐ কাকাবাবু।

-“কাঁথি, কিন্তু ওখান থেকে আমার বাড়ি অনেকটা প্রায় তিন/চার কিলোমিটার হাঁটা পথ। হঠাৎ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এই ভিড় বাসেই উঠতে হল।”

অর্ণব মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভূব করল, এত স্নিগ্ধ সুন্দর চোখের চাহনি, এমন সরল পবিত্র ভাব সারা মুখে, দেখলেই কেমন যেন মায়া অথচ শ্রদ্ধার ভাব আসে মনে।

‘মেচেদায়’ বাস থামতেই হুড়মুড় করে নেমে লোকেরা চা, বিড়ি, সিগারেট খেতে লাগল। কাকাবাবু পেট্রলপাম্পের বাথরুমে গেলেন, প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে।

অর্ণব কিছুক্ষনের জন্য বসলো ওনার খালি সীটে। জানা গেল ঐ মেয়েটির নাম ‘আহুতি’।

-“বাঃ খুব সুন্দর নাম তো আপনার। কোথায় পড়াশোনা করেন?”

– “লেডি ব্রেবোন কলেজে সংস্কৃত তে অনার্স নিয়ে পড়ি, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। – আপনি?”

-“আমি ডাক্তারি পড়ি, কলকাতা মেডিকেল কলেজে। আজকাল তো কাউকে বিশেষ সংস্কৃত নিয়ে পড়তে শুনিনা, আপনি এই বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন কি করে?” – জিজ্ঞেস করল অর্ণব।

-“ছোট থেকেই নিবেদিতা স্কুলে পড়তাম, আমাদের মাতাজী-রা অর্থাৎ সন্ন্যাসিনী শিক্ষিকাদের মুখে নানা বেদ-বেদান্ত, গীতা, উপনিষদের কথা শুনে আমারও পড়তে ইচ্ছা যেত। তাই – – –

কথাটা শুনেই হঠাৎ যেন সমস্ত বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল অর্ণবের – আরে এই মেয়েটিও তো তারই মতন সম মনস্কতার wave length নিয়ে চলছে – তাই ওর মুখের মধ্যে যেন এক আধ্যাত্মিকতা মাখানো পবিত্র ভাব।

বাস আবার চলতে শুরু করলো, বৃদ্ধ কাকাবাবু ও মেয়েটি – নানান ঘরেলু গল্প করতে করতে চলেছে, বাসের শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকালেই “শ্রী শ্রী সারদা মায়ের” মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে অর্ণবের চোখের সামনে।

‘নন্দকুমারের’ মোড়ে ভদ্রলোক নেমে গেলেন, খুব পরিচিত মানুষের মতন মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে সীট থেকে উঠতেই সে অচেনা অজানা পিতৃতুল্য মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

এবার ‘অর্ণব’ বসলো তার পাশে। ঐ ছেলেগুলিও পেছনে আসে পাশে বসে পড়েছে ততক্ষনে, কিন্তু সামনে ওদের নিয়ে টিপ্পুনি বা হাসাহাসি করে যাচ্ছে।

একবার অর্ণব ভাবলো উঠে দাঁড়িয়ে ধমক দেবে, কিন্তু তার ভদ্রতায় বিবেকে বাঁধলো, ঐ সব নিচ মন্ত্যব্যের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গিয়ে অকারণে ঝগড়া বা তর্কাতর্কিতে না জড়াতে। মনে  হল ওরা চাইছে, তার সঙ্গে লড়াই বাঁধাতে। অতএব ওদের উপেক্ষা করাই ভাল। বরং মেয়েটিকে তার গ্রামে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সন্ধ্যে হয়ে এলো। বাসটি কাঁথি বাজার পেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই বৃষ্টি শুরু হল। ঐ ছেলে চারটিও ওদেরকে ওখানে নামতে দেখে নেমে পড়ল বাস থেকে।

অর্ণব বুঝতে পারলো, এদের মতলব ভালো না। আহুতির সঙ্গেও বড় ব্যাগ তার নিজের স্যুটকেশটাও খুব ভারী – বই খাতাতে ভর্তি। আহুতিরটা কাঁধে আর নিজেরটা হাতে শক্ত করে ধরে ও এসে দাঁড়ালো সামনের চায়ের দোকানে। আহুতিও ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে মাথাটা আড়াল করে প্রায় ছুটে এল ওর পেছন পেছন।

দোকানদার তাড়াতাড়ি একটা টেবিল পরিষ্কার করে ওদের বসতে দিলেন। বেসিনে হাত পা ধুতে গিয়ে দেখলো দোকানটি বেশ বড়, ঠিক সাধারন চা সিঙ্গাড়ার দোকান নয়, বাথরুমও আছে। নিজে হাত মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আহূতিকে বলল, “যান, ওদিকে মেয়েদের একটা আলাদা টয়লেটও আছে, – আমি ততক্ষণ চায়ের অর্ডার দিচ্ছি।”

‘আহুতির’ মনে হল, যেন কত পরিচিত কোন আত্মীয় সঙ্গে রয়েছে তার। নিশ্চিন্ত হয়ে বাথরুমে ঢুকলো সে। ভাবলো, আজ ঐ কাকাবাবু বা এই ছেলেটি না থাকলে হয়তো সে বিপদে পড়তে পারতো। ছোট থেকেই সে “শ্রী শ্রী মায়ের ভক্ত” তার বাবার মতন সর্বদা তারও বিশ্বাস, – তিনি শুধু গুরু মা নন, আপন মা। তাই কোন দুঃখ কষ্ট হলেই তার হৃদয়ে সে সারদা মায়ের রূপটি কল্পনা করে এবং তাঁর শরণাগত হয়ে থাকে, কোন রকম দুর্যোগ, বিপদ, দুর্ঘটনায় সে গুন গুন করে গায়, সেই মনের জোর ও সাহস এনে দেওয়া গানটি।

“মা আছেন আর আমি আছি, –

ভাবনা কি আর আছে আমার,

মা’র হাতে খাই – পরি, মা নিয়েছেন –

আমার ভার। আমি যদি ভুলি মাকে

ভোলেন না মা একটি বার – – -“

মুখ ধুতে ধুতে মনে মনে গানটি গাইছিল সে, হঠাৎ একটি কর্কশ কণ্ঠস্বরে সব ভাবনা ছিন্ন হল।

– ‘এই যে রে মালটা পেয়ে গেছি, এখানে এসে ঢুকেছে’।

এক নিমেষে ঐ বাথরুমের কোনা থেকে এক ছুটে বেরিয়ে এল সে, অর্ণবকে বলল, “ছেলেগুলো এখানেও এসে গেল যে, কি করবেন এখন?”

দোকানদার বললেন, – ‘ওরা কি করবে? আপনারা চা, ডিমের ওমলেট আর সিঙ্গাড়া গুলো খান। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল, এখানে ওরা প্রায়ই আসে, বেশ সমাদর করেই অন্য একটি টেবিলে বসল ওদের ঐ মালিক।

অর্ণব ও আহুতি কোনোরকমে চা ও ডিম খেয়ে পয়সা মেটাতে চাইলো দোকানদারকে ডেকে। যে ছেলেটি বিলটি নিয়ে এল একটা কুশ্রী ইঙ্গিত করে বলল, – “এই বৃষ্টিতে তো মজা আসবে, – ওপরে ঘর আছে আমাদের। আজ রাত্রি টা ওখানেই থেকে যান না, মালিক বলছেন। ঐ ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বেশ বীরত্বের ভাব নিয়ে দোকানদারের দিকে এগিয়ে গেল – “হ্যাঁ আমরাও থাকবো আজ তোর ঐ ওপরের ঘরে।

এক মুহূর্তেই ‘আহুতির’ হাতে টান দিয়ে দোকান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এল অর্ণব।

সম্পূর্ণ ভিজে যাচ্ছে তারা, কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশ থেকে যত তাড়াতাড়ি পালতে পারে তার জন্য একটা চলন্ত ট্রেকারকে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে ইশারা করলো। তাতে আরো দুজন লোক ছিল। আহূতিকে পেছনে এবং অর্ণবকে নিজের পাশে বসিয়ে জোরে চালিয়ে দিল, ড্রাইভার তার বাহনটিকে।

– “কোথায় যাবেন দাদা”?

– আপনি যতটা যাবেন চলুন, তারপরে অন্য কোন গাড়ি নেব, বৃষ্টির মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

– ‘কোন গ্রামে বাড়ি’? গ্রামের নাম বলতেই সে জানতে চাইলো – কার বাড়ি যাবেন বলুন না, পৌঁছে দেব। এরা তো একটু আগেই নেমে যাবে, আমরা তো একটু পয়সা কমানোর জন্যেই গাড়ি চালাচ্ছি, না কি?

– প্রফুল্লবাবুর বাড়ি।

– আরে আপনি “মাদুর জ্যেঠু” – গহনা জেঠির ছেলে নাকি?

– “হ্যাঁ, হেসে ফেললো অর্ণব”।

– “আরে তোমাকে তো কতবার আমি তোমার  হোস্টেলে ছেড়ে এসেছি, সেই করিম চাচা, মনে নেই তোমার”?

– “ও হ্যাঁ তাই তো আপনার ভারী গলার আওয়াজেই আমার চেনা উচিত ছিল। সেলাম চাচাজী কেমন আছেন”?

অর্ণব গল্প জুড়ে দিল ট্রেকারের মালিকের সঙ্গে। পরের গ্রামে অন্য দুজন সাওয়ারী নেমে যেতেই এসে বসলো সে আহুতির পাশে।

“আপনাকে আজ আমার বাড়ি যেতে হবে। এই দুর্যোগের রাতে আপনাকে একা তো ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”

আহুতির মনে হল ‘মা’ সরদার সে অহেতুকী কৃপা লাভ করেছে। ঘোর আঁধারে বিপদ মাঝে মা তাকে উদ্ধার করবার জন্য আজ এই দেবতুল্য ডাক্তার ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবু একটু সংশয় জাগলো মনে, এর বাড়ির লোকেরা কি মনে করবেন? এই রাত্তিরবেলায় হঠাৎ একজন মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে দেখলে গ্রামের প্রতিবেশীরাও কি নানান সন্দেহ করতে ছাড়বে? তাই একটু আবেগ মেশানো গলায় সে ঐ ড্রাইভারবাবুকে বলল, – “চাচাজী আমার গ্রামটা একটু অন্য দিকে, ওনাকে নামিয়ে দিয়ে যদি আমায় আপনি বাড়ির দিকে নিয়ে যান, তাহলে খুব ভাল হয়”।

-“না গো মা, আল্লাহর সে রকম ইচ্ছা নাই। আমার গাড়িটা রাত ৯টায় এই কাঁথিতে এনে জমা করে দিতে হবে। এটা আমার নিজের গাড়ি নয়”।

অর্ণব শান্ত কণ্ঠে বললো, – “আমি জানি একজন অচেনা অজানা যুবকের সঙ্গে হঠাৎ করে তার বাড়ি যেতে আপনার অস্বস্তি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আমাকে পর ভাবছেন কেন? আপনি যে পরিবারের সদস্য, আমিও তো তাঁদেরই একজন”।

“কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না” আহুতি আস্তে আস্তে বলল।

“আপনি নিবেদিতার ভক্ত। আর তিনি কার শিষ্য? বিবেকানন্দের। বিবেকানন্দের গুরু কে? শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ – আমিও তাঁদের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি। আমার মা বাবাও অত্যন্ত বড় এবং উদার মনের মানুষ। তাঁরা কিছু মনে করবেন না। পাড়ার লোকেদের আমি জানি বাবারই আশ্রিত অসহায় আত্মীয় স্বজন তাঁরা। কারো স্বামী নেই, কারো স্ত্রী অসুস্থ, কারো বা ছেলে বিদেশে গিয়ে আর ফেরত আসেনি, কারও কারও মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবি হওয়াতে বাবা, কাকা, দাদা সবাই মারা  গেছেন, আমাদের বাড়িটাই তাদের বাড়ি”।

-“এরকম পরিবার এখনও আছে আমাদের দেশে”?

– “শত শত, হাজার হাজার, তাই তো ভারতবর্ষ এখনও এতো সুন্দর”।

– ‘তাহলে ওই ছেলেগুলো কি?’

– ওরা সমাজের ক্ষত। চাকরী নেই, শিক্ষা দীক্ষা ঠিক মতো হয় নি। মূল্যবোধের পাঠ না পড়ে এবং রাজনৈতিক নেতাদের ও সুবিধাবাদী মানুষের কাজ করতে করতে ওরা ওদের সামনে কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। সত্যিই ওদের এই অবক্ষয় আমাদের মতন স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিককে বিশেষতঃ মেয়েদের ভয় ভীত করে তুলেছে, কিন্তু তা বলে সবাই সেরকম নয়। ওদের ঠিক করার দায়িত্বও আমাদের মতন সুস্থ মানসিকতার তরুণ সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত। তাই আশা হারালে চলবে কেন”!

কথায় কথায় সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল, তারা জানে না। করিম চাচার বাহন এসে তাদের বাড়ির দরজায় থামলো তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। গ্রামের লোকেরা এইসময় প্রায় শুতে চলে যায়। প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী কথা বলছিলেন, – ছেলের বিষয়ে।

“ডাক্তার হয়ে এলে এখানেই ওকে একটা ডিসপেনসারি খুলে বসিয়ে দেব ভাবছি,” বললেন বাবা।

– “না গো ও তো আরও পড়বে বলছে। দিল্লীতে সব বড় জায়গায় হৃদযন্ত্র অপারেশন করতে শিখবে, আমাকে বলেছিল”। – মা জানালেন।

“সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু খুব বড় ডাক্তার হলে তো শহরের হাসপাতালগুলো ওদের কিনে নেবে, বন্দী করে রাখবে তাদের নার্সিং হোমে, টাকা পয়সা অর্থ – সুন্দরী স্ত্রী এইসব লোভ দেখিয়ে। তখন কি আর সে এই গ্রামের মানুষের সেবায় লাগবে”?

ঠিক এই সময়ে বাইরের থেকে হাঁক ডাক শুরু করলেন করিম চাচা, – “মাদুর জেঠু আসুন, দেখুন কাকে নিয়ে এসেছি।

ছাতা হাতে মা বাবা ছুটে বেরিয়ে এলেন, সদর দরজার বেড়া ডিঙিয়ে, এক উঠোন জল ছপিছপিয়ে।

নেমেই পায়ের উপর ঝুঁকে প্রণাম সারলো অর্ণব। আহুতি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেকারের সামনে। অর্ণব বলল, – ‘মা এর নাম আহুতি, ওর গ্রামও অনেক দূরে, আজ আমাদের বাড়িতেই থাকবে’।

– “আহা গো বাছা ,মেয়ে আমার ভিজে একেবারে চুপড়ি হয়ে গেছে, এস মা আগে ঘরে এসে কাপড় ছাড়ো, মুখ হাত পা ধুয়ে নাও, তারপরে সব বেত্তান্ত শুনবো”।

বাবাও ওর ব্যাগটি তুলে নিলেন অক্লেশে “এসো এসো মা লক্ষ্মী, কোনো দ্বিধা করোনা”।

এমন আন্তরিকতায় কার মনে কি সংশয় থাকতে পারে!

ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। চার বোন আরাধনা, অর্চনা, আরতি ও আহুতি তারপর তাদের ভাইয়ের জন্ম দিয়েই মায়ের মৃত্যু হয়। বড় বোনেরা সর্বদা ভাইয়ের যত্নে ব্যস্ত। ঠাকুমা সংসার দেখেন। স্বামী পরিত্যক্ত মাসী রান্নাবান্না সামলান। তাঁরও দুটি ছেলে মেয়ে। আহুতি একটু একা একাই খেলা করে বেড়ায়। ঠাকুর ঘরে বসে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে সে। পাশের বাড়ির দিদি ‘নিবেদিতা’ স্কুলে পড়তেন, সেখানেই হোস্টেলে থাকতেন। তার আগ্রহেই আরতি ও আহুতি ভর্তি হল, কলকাতার বাগবাজারে গিয়ে,সেই বিখ্যাত বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আরতি চলে গেল B.Sc নার্সিং পড়তে। বড়দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল। সেই আশ্রিত মাসীর সাথে ঠাকুমার ঝগড়া হওয়ায় তিনিও তাঁর গ্রামে চলে গেলেন। ক’দিন পরেই জানা গেল, তাদের ভাই পড়াশুনো করে না, গ্রামের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে, তাই মন খুব খারাপ, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না তাই আহুতির। বিয়ে থাওয়া সংসারের প্রতি আকর্ষণ তার ক্রমশঃ কমে এসেছে। সংস্কৃত নিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যই ছিল, আমাদের ধর্মশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করা। নিবেদিতা স্কুলের মাতাজীদের আদর্শ, নিরাসক্ত, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ভাবনায় সিক্ত হয়ে আছে সে।

‘অর্ণবদের’ বাড়ি এসে বড় ভালো লাগলো তার। ভীষণ শান্তি ও আনন্দময় পরিবেশে মায়ের স্নেহপূর্ণ ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে দিল।

অর্ণব ও আহুতি যতক্ষণ ভিজে কাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুযে  এসে বাইরের খোলা বারান্দায় দাঁড়ালো, বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশে একফালি চাঁদ মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, বাগান থেকে জুঁই, চামেলী কিম্বা গন্ধরাজের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্যাঙগুলো একনাগাড়ে গান শুনিয়ে যাচ্ছে গ্যাঙোর গ্যাঙোর গ্যাঙ করে।

মা ততক্ষনে এদের জন্য গরম খিচুড়ি নামিয়ে বেগুনী ভাজছেন, তাঁদের খাওয়া দাওয়া আগেই হয়ে গিয়েছিল। বাবা পুজোর ঘরে ঠাকুরকে শয়ন করিয়ে, বাসি ফুলগুলি সরিয়ে সকালের জন্য ঘরটি পরিষ্কার করে, পূর্ব পুরুষের ছবিতে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে বেরিয়ে এলেন। প্রতিদিনই এই কাজগুলি তাঁকে নিয়ম করে করতে দেখা যায়। সকালে উঠেই আবার স্নান সেরে ঠাকুরের ফুল তুলে দেন স্ত্রীকে, পুজোর জন্য।

অর্ণবের সঙ্গে মেয়েটিকে আসতে দেখে একটু অবাক হলেও কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি জাগেনি তাঁর মনে, বরং ভালোই লাগলো, ডাক্তারি পাশ করে এইরকম একটি সঙ্গিনী যদি সে পেয়ে থাকে, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ছেলেকে সংসারী করে সফল ডাক্তার রূপে দেখতে চান তিনি। বয়স বাড়ছে তাঁর। ভাগ্নে শংকর যদিও তাঁর ব্যবসাপত্র – মাদুর তৈরী – বিক্রি ইত্যাদি ভালোই সামলে নেয়, আজকাল চাষ – বাসও ভাইয়ের ছেলেরা উৎসাহ নিয়ে করে। প্রচুর আলু ও পুকুরের মাছ তাঁকে – তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে সচ্ছলতার মধ্যেই রেখেছে। এবার একটা নাতি-নাতনি দেখার শখ জাগছে মনে। স্ত্রী কিন্তু এতো তাড়াতাড়িতে ওর সম্বন্ধ দেখতে বা বিয়ের প্রস্তাব আনতে ইচ্ছুক নন। একজন নারী হয়েও পড়াশুনো বা জ্ঞান অর্জনের উচ্চ আকাঙ্খা তাঁর প্রবল। স্কুলের গন্ডী পার হবার আগেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু পরিবারের ছেলে মেয়ে সবাইকে খুব উৎসাহ দেন , ভালো করে লেখা পড়া শিখতে। নিজের তো মেয়ে হয়নি ভাই, দেওর বা ননদদের মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের পিপাসা জাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। তারা সবাই তাঁর আগ্রহে B.A., M.A., B.Ed ইত্যাদিতে মহিষাদল কলেজে বা বর্দ্ধমান বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে। তাঁর ছেলে অর্ণব এদের সবার মধ্যে বেশি মেধাবী ছিল এবং ডাক্তারি পাশ করেও সে যেন আরও পড়াশোনা করে, বড় বড় অপারেশন করে রুগীদের বাঁচাতে পারে, সমাজের অনেক মানুষের সেবা করে – গরীব দুঃখী কে যেন ভালোবাসতে পারে – এটাই তাঁর ইচ্ছে। গ্রামের লোকেরা বলেন, এমন ‘মা’ না হলে কি আর ছেলে ‘রত্নগর্ভা’ হয়।

রান্না করতে করতে ভাবছেন তিনি, মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার কথা অর্ণব তো বলেনি কখনও। কিন্তু বড় সুন্দর মায়াময় চোখ মেয়েটির, হয়তো ওর সঙ্গে একসাথে ডাক্তারি পড়ে। ভালোই হয়, যদি পরে  তাঁর পুত্রবধূ হয়ে আসে। খিচুড়ি থালায় ঢালতে ঢালতে হাসি পেল তাঁর, আমাদের মন গুলো কেমন ! একটুতেই কত আগে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল দেওয়ার মত হল এটা। – ঠাকুরের ইচ্ছে ছাড়া তো একটা পাতাও নড়ে না – তাঁর বহু কৃপা লাভ করেছেন তিনি। এতসুন্দর স্বামী, সংসার ভরা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু প্রতিবেশীর ভালোবাসা – এ সবই তো অযাচিত ভাবে পাওয়া। এখন তাঁর প্রতি শরণাগত হয়ে থাকাটা, সবচেয়ে বড় কর্ত্তব্য। এসব নিয়ে একদম আর ভাববেন না। দেখি  না ছেলে কি বলে? মেয়েটিরই বা মনের মধ্যে কি আছে! কেমন বংশ, পরিবার, জাত, পাত, ধর্ম নিয়ে তাঁর মাথা ব্যাথা নেই, শুধু মনের মিল হওয়া চাই।

খাওয়ার ঘরে সুন্দর আসন পেতে বসালেন দুজনকে। ভারী ভদ্র মেয়েটি, ‘আপনারা খাবেন না’? জানতে চাইল সে। ‘না গো মা আমাদের খাওয়া অনেক্ষন হয়ে গেছে,’ বললেন মা, খাবারে হাত দেওয়ার আগে  ঠাকুরকে নিবেদন করলো, তারপর মুখে খাবার তুলে নিল সলজ্জভাবে। “কী সুন্দর স্বাদ, এত সুন্দর খিচুড়ি আগে কখনও এমন যত্ন করে বসে কেউ খাওয়াননি আমাকে”। অর্ণব বলল, – “আমার মায়ের হাতের বেগুনী তো খাননি এখনও, খান, একটু কামড় দিয়ে দেখুন, আরও চাইবেন। – মা আরও ‘চার ছ’টা দাও গো, এই কটাতে কি হবে আমার”।

-মা বললেন, “আজ ঝুড়িতে এই কটাই বেগুন পড়েছিল বাবা, কাল সকালে বাগানের গাছ থেকে তুলে করে দেব, মুড়ির সঙ্গে খাস”।

খাওয়া শেষে মায়ের ঘরে পাশের চৌকিতে শোবার জায়গা হল আহুতির। অর্ণব নিজের ঘরে টান টান সোজা হয়ে শুলো। সারাদিনের ঘটনা ও ধকলের কথা মনে পড়ল তার। বাবা ধীর পায়ে এসে ঢুকলেন তার ঘরে। “আজ খুব ক্লান্ত আছো, ঘুমিয়ে পড়ো বাবু, সকালে উঠে কথা হবে”।

বিছানায় বসে আহুতি শোবার আগেকার প্রার্থনাটি বলছে – চোখ বুজে – মা বিরক্ত না করে নিজের চৌকিতে উঠে বসলেন। তাঁর পায়ের শব্দ পেয়ে তাকালো আহুতি। ধীরে ধীরে এবার বলে চলল, তাদের বাসে ওঠা – ঐ ছেলেগুলির পিছু নেওয়া – বৃদ্ধ এক ভদ্রলোকের হুমকি ও অর্ণবের সক্রিয় ভূমিকায় – কি ভাবে আজ তার সম্মান রক্ষা পেয়েছে – প্রত্যেক ঘটনার কথা। বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তার। গলা বন্ধ হয়ে এল। মা উঠে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠাকুরই রক্ষা করেছেন। সময়মত তিনি আমার ছেলের মাথায় যে বুদ্ধি জুগিয়েছেন, সে তোমাকে সোজা বাড়ি নিয়ে এসেছে – খুব ভালো করেছে। আমাদের গ্রামের করিম ড্রাইভারও ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছেছে, না হলে হয়ত একটা অঘটন ঘটে যেত”। – ভয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। বার বার মাথায় দু হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানাতে লাগলেন তাঁর ইষ্ট দেবতার কাছে। যেন নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। কী অপূর্ব মমতাময়ী তাঁর রূপ। মাতৃহীনা আহুতির চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল। অনেক্ষন ঘুম এল না তার।

সকালবেলায় স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলো মায়ের সঙ্গে। মা ফুল চন্দন দিয়ে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রী শ্রী মা ও বিবেকানন্দের ছবিগুলি সাজালেন, – ঘরের গোপালকে বাতাসা জল ও একটু ফল কেটে ধুপ ধুনো জ্বেলে পুজো করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলেন ,মেয়েটি সেই একইভাবে বসে জপ করে চলেছে – তার পবিত্র মুখ, বসার ভঙ্গি, নীরব উপস্থিতি মা কে মুগ্ধ করে দিল।

একটু পরেই হটাৎ বাইরে “করিম চাচা”র গলা শোনা গেল – “মাদুর জেঠু, কেউ যাবেন নাকি গো কাঁথি শহরে? আমি যাচ্ছি এখন”।

বাবা আর অর্ণব চা নিয়ে বসে গল্প করছিল বারান্দায়। চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে উঠে গিয়ে বললেন তাকে – “ঘরে অতিথি এসেছে, ভাত না খাইয়ে তোমার জেঠিমা কি ছাড়বে ঐ মেয়েটিকে? তুমি বরং দুপুরে খেতে এলে একবার ডাক দিও। নইলে বিকেলে অর্ণব মহেশের গাড়িতে ছেড়ে আসবে”।

– “না গো জেঠু, আমিই নিয়ে যাব বিকেলে। অন্য কাউকে ডেকো না” বললো করিম।

 গ্রামের প্রতিবেশীদের কাছে ততক্ষনে অর্ণবের আগমন বার্তা বিশেষতঃ একজন মেয়ে বান্ধবী সঙ্গে নিয়ে আসার খবর বোধহয় রটে গেছে। কাকা-কাকী, পিসি ও তাদের ছেলে-মেয়েরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছে, তাদের বাড়ির উঠোনে। অবশ্য অর্ণব এলে প্রতিবারই তারা আসে, এবং হৈ চৈ, গানে কথায়, নানান গল্পে হাসিতে প্রফুল্লবাবুর বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যায়। মাদুর বোনা, বড়ি দেওয়া এমন কি চাষের কাজ  ফেলে – কাকাতো, মামাতো ভাই-বোন, ভাগ্নেরা যে যেভাবে পারে, এই আনন্দমুখর পরিবারে সক্রিয় যোগদান দেয়।

আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘ন’ টা বাজতে না বাজতেই তারা এসে সব মুড়ি চপ, পান্তাভাত, লুচি মণ্ডা-মিঠাই যার যা মন চায় তা দিয়ে জলখাবার খেয়ে পেট ভরিয়েছে এবং এন্তার হৈ চৈ করে অর্ণবের পেছনেও লেগেছে। –

“কি গো ছোড়দা ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? হটাৎ জোড়ে একেবারে এসে সবাইকে অবাক করে দেবে ভেবেছিলে”?

– “আরে চুপ, চুপ, চুপ কর তোরা। কি সব আবোল তাবোল বলছিস, উনি শুনতে পেলে কি ভাববেন বলতো”?

– পিসিমার ছেলেকে সবাই বড়দা, জেঠুর ছেলেকে মেজদা, এবং এই প্রফুল্লকাকার সবচেয়ে প্রিয় দাদাকে ‘ছোড়দা’ ডাকে, ভালোবাসে ওর মুখের মজার মজার কথা, মিশনের স্বামীজীদের নানান অলৌকিক সব গল্প ও রবীন্দ্রসংগীত শ্যামাসংগীত এবং কথামৃতের গান শুনতে। তার মতন সারা পাড়া পরিবারকে মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা আর কারো মধ্যে নেই। বড়দা মেজদার বৌ রা এসে রান্নার কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছেন। দুই কর্মচারীকে নিয়ে এক কাকা পুকুরে জাল ফেলেছেন। ঘরে কোন অতিথি এলেই এটা করেন তারা। কারণ অন্য দিন আলাদা আলাদা হেঁসেলে রান্না হলেও কেউ এলে প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রী যে সবাইকে এখানেই মাছের ঝোল ভাত খেতে বলবেন, এটা তো একটা অলিখিত ঘটনা। কেউ কাউকে নেমতন্ন বা ডাকা ডাকির প্রয়োজন মনে করেন না এখানে। মালি কলাপাতা কেটে আনে, শশী জেঠি শাক কাটেন ঝুড়ি ঝুড়ি। মদন কাকার মাচার থেকে সবচেয়ে সব চেয়ে বড় বড় কুমড়ো – লাউ ডাঁটা সমেত কেটে আনা হয়। পাশাপাশি পুকুরে গুগলি তোলেন ওরা সব শহরের লোকেদের একটু নতুন জিনিস খাওয়াবেন বলে।

শান্তি মামীর ভাণ্ডার থেকে বর্ষার জন্যে তুলে রাখা শুকনো আমসী কুল ও পুরোনো তেঁতুল বেরিয়ে পড়ে। এই রান্না ঘরে জমা করা হয় বেশ ঝাল মিষ্টি টক চাটনি হবে বলে।

সিধু ময়রার দোকানে খবর পৌঁছে যায়, আজ মাদুর জেঠুর বাড়ি অতিথি এসেছেন, রসগোল্লা ও বোঁদে পাঠাতে হবে বিকেল বেলায়। ময়রা বৌ পান চিবোতে চিবোতে জানতে চায়, “ছেলে বাড়ি এসেছে বুঝি, কলকাতা থেকে”? সঙ্গে আর ক’জন?

অর্থাৎ প্রতিবারই অর্ণব তার কলকাতার ডাক্তারি পাঠরত হোস্টেলবাসী সহপাঠীদের নিয়ে আসে। তারা অনেকেই এরকম গ্রাম, পুকুর, নদী, মাদুর বোনার কৌশল, মাছ ধরার এতো বিশাল জাল দেখেনি কখনও। সেই সব বন্ধুরা বলে ‘প্রফুল্লবাবু ও তাঁর স্ত্রীর আপ্যায়নের কথা, এখানকার আত্মীয়-স্বজন, সহজ সরল মানুষগুলোর কথা তারা তাদের জীবনে হয়তো কখনও ভুলতে পারবে না।

– কিন্তু এবারে যে একেবারে অন্য ব্যাপার। অর্ণবের সঙ্গে বান্ধবী তাও অতি সুন্দরী সুশীলা। তাকে তো আলাদা ভাবে সমাদর করতে হবে।

অর্ণব কত চেষ্টা করছে – বোঝাতে চাইছে যে, কাল বাসেই এই মেয়েটিকে সে প্রথম দেখলো কিন্তু কে তার কথা শোনে। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে আহূতিকে। সে অবাক হলেও, লজ্জা পেলেও এই বাড়ির মজাদার উজ্জ্বল পরিবেশ, সকলের স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক ব্যবহার তার মন ছুঁয়ে গেছে। নিজেদের পরিবারে তো কখনও সে এরকম পায়নি। এমন মায়ের স্নেহে কোন সংসার যে এত স্নিগ্ধ শীতল হয়, পিতার গাম্ভীর্য্যময় কিন্তু প্রশান্ত ব্যক্তিত্ব – সমস্ত গ্রামের মানুষকে যেন এক করে রাখতে পেরেছে। তিনি যেন তাদের মাথার ছাতা। কাজেই বিকেলে যখন সবাই সমবেত ভাবে চাইলো – “না না আজ তোমার যাওয়া চলবে না, সন্ধ্যে বেলায় গান বাজনার আসর বসাবো আমরা। তবলা, হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, খঞ্জনী, একটা পুরোনো বেহালা সব বেরিয়ে এল। শতরঞ্চির ওপরে সাজানো হল একের পর এক।

আজ প্রফুল্লবাবুর মনও ভীষণ আনন্দে ভরে গেছে নিজের কাঠের একটা পুরোনো বাক্স খুলে তাঁর ‘ব্যাঞ্জো’টা বের করে আনলেন এবং ভাল করে মুছে দেখতে লাগলেন ,ওটা এখনও বাজছে কিনা। ভাই বেহালা বাজান, ভাগ্নেরও খোল বাজানোর হাতটি বড় সুন্দর। গ্রামের কীর্তনে তাকে সবাই ডেকে নিয়ে যায়।

প্রফুলবাবুর বাড়িতেও প্রতি পূর্ণিমায় কীর্তন এবং অমাবস্যায় শ্যামাসংগীত গাইতে আসে গ্রামের ছেলেরা, আজ বড় ভাল লাগছে – ছেলে বাড়ি আসায়, বিশেষ করে ঐ মেয়েটির উপস্থিতি তার মনকেও বোধহয় একটা নতুন স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে।

সন্ধ্যে বেলায় শুরু হল তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান। প্রথমে পিসিমার নাতি কবিতা শোনালো – সৎপাত্র – যেটা বলে সে এবার স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেয়েছে। বড়দার মেয়ে চুমকি “লক্ষ্মীর পরীক্ষা” নাটকে ক্ষীরো ঝি-এর ভূমিকায় অভিনয় করে খুব নাম কুড়িয়েছে, সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে। ছোট্ট সেই মেয়েটির চোখ মুখ ঘুরিয়ে অভিনয় দেখে বাড়ি সুদ্ধ লোক তো হেসে অস্থির। এরপর অর্ণব গলা ছেড়ে গান ধরল – ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’। কাকা বেহালায় অদ্ভুত মায়াময় সুর তুললেন। প্রফুলবাবুও আজ বেশ ছেলে মানুষের মতন একটা লোকগীতির তান শোনালেন। সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। এক বৌদি গাইলো “দাড়াও আমার আঁখির আগে”।

এবারে আহুতির পেছনে পড়ল তারা। তোমাকে শোনাতেই হবে কিছু। তোমার জন্যেই আজ সকলে এত উৎসাহে চঞ্চল।

সে চোখ বুজে শ্রী শ্রী মাকে স্মরণ করে প্রথমে তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো ও পরে গান ধরলো ,

“সকলি তোমার ইচ্ছা,

ইচ্ছাময়ী তারা তুমি,

তোমার কর্ম তুমি করো মা,

লোকে বলে করি আমি।”

অন্যরা খোল ও হারমোনিয়াম বাজালো তার সাথে। এতো সুন্দর এক পবিত্র পরিবেশ রচনা হল যা অর্ণবের মনে ভীষণ ভাবে দোলা লাগলো। বেশ কিছুক্ষন সে চুপ করে বসে রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে সে গান গেয়ে চলল, একের পর এক। অন্যরা সব যে যার বাড়ি চলে গেছেন, মা বাবা ও আহুতি নিস্তব্ধে বসে আছে। অর্ণব গেয়ে চলেছে ,একের পর এক গান, প্রথমে ই বিবেকানন্দের সেই অসামান্য গান, – মন চলো নিজ নিকেতনে- —

তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত, আজি যত তারা তব আকাশে, সবি মোর প্রাণ ভরি বিকাশে।

– জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, এই লভিনু সঙ্গ তব …… ,

পরদিন সকালবেলায় করিম চাচার ট্রেকারে বসে আহূতিকে তার গ্রামে ছাড়তে যাবার সময় হটাৎ অর্ণব বলল – “আপনি এখানে কপালকুন্ডলার কালী মন্দিরটিতে গেছেন কখনও?”

– আহুতি ঘাড় নেড়ে জানালো – না সে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

অর্ণব করিম চাচা কে বললে – ‘চাচা চলুন একটু ওদিকটা ঘুরে যাই’। “বঙ্কিমচন্দ্রের গল্পের নায়ক নবকুমার এইখানে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে কাপালিকের হাতে পড়েছিলেন। সমুদ্র কিনার  থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই কালী মন্দিরে কপালকুন্ডলার সঙ্গে তাঁর দেখা। পরে তপস্বিনী কপালকুন্ডলার সারল্য ও ত্যাগের কাহিনী পড়েছেন, তাঁরা।এই গল্পের  সেই বিখ্যাত উক্তি তার খুব ভালো লাগে, “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই উক্তি সব সময় মনে ভাবে সে, আজ এখানে নির্জনে বসে দুজনে কিছুক্ষন কোন কথা খুঁজে পেল না।

নীরবতা তাদের মধ্যে অনেক কথার তরঙ্গ প্রবাহ সঞ্চালিত করলো। ধীরে ধীরে একসময় অর্ণব বলল, –

– “আহুতি আপনাকে আমার মা বাবা পরিবারের সকলের খুব ভাল লেগেছে।

– আহুতি সলজ্জ্ব হেসে জানালো, তারও ওদের সবাইকে ভীষণ ভালো লেগেছে। এতো সুন্দর পরিবার সে আগে কখনও দেখেনি। অর্ণব আরও যদি কিছু বলে বসে – কোন প্রস্তাব – কোন ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেলে, তার আগেই তাকে বলে দেওয়া ভালো –

‘আমি – সারদা মঠে সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চাই। শ্রদ্ধেয়া অজয় প্রানা মাতাজীর মতন মেয়েদের কল্যানে, সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে – ঐ সারদা মঠের কোন বিদ্যালয়ে ‘শিক্ষিকা’ রূপে জীবন কাটাতে শপথ নিয়েছি’।

অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে এবার খুব সপ্রতিভ ভাবে হাসি মুখে বলল, আমারও তো একই পথ, আমিও যে বেলুড়ে ব্রহ্মচারী হবার জন্যে নাম লিখিয়ে এসেছি। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ডাক্তারের প্রয়োজন খুব বেশি। চারিদিকে নানা ধরণের বড় বড় হাসপাতাল খোলা হয়েছে।

মহারাজরা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে সেগুলি চালনা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ছেন। দেরাদুনের চোখের হাসপাতাল, সারগাছির ডিসপেনসারি দেখে আমার এই কথাই মনে হয়েছে। ডাক্তার সন্ন্যাসী হয়ে ঐ সেবাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর চিকিৎসায় জীবন দানের কথা। – “যাক আপনি আমায় বাঁচালেন, বাবা – মায়ের মতন আপনার মনেও যদি অন্য এক স্বপ্ন – কল্পনা বাসা বাঁধতো তাহলে আমি বড্ড মুশকিলে পড়ে যেতাম। আপনাকে কিভাবে না করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। – মা বাবাকে মানিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু আর পাঁচজনের মতন বিয়ে করে ঘর সংসার করা আমাদের দুজনের জন্যেই নয়। ঠাকুরের কৃপায় আমরা একই পথের পথিক হলেও আমাদের যাত্রা তো ভিন্ন দিকে, ঠিক করে রেখেছেন ঠাকুর। –

অদ্ভুদ বিচ্ছেদ ব্যাথা এসে তীর বিদ্ধ করলো আহুতির বুকে। তার নারী সত্তা চমকে উঠলো,- প্রণাম জানালো, সে ভবিষ্যতের তরুণ সন্ন্যাসীকে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে এলো সমুদ্রের ধারে। করিম চাচা কিছু লোক ভরে ট্রেকার নিয়ে পাশের গ্রামে ছাড়তে গেছেন। খুব সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা বসবার জন্য। একসারি নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে প্রভাতের সূর্য দেখা যাচ্ছে। মাঝিরা মাছ ধরার ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে জলে ভেসেছে – আকাশে কালো সাদা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ভেসে চলেছে। চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে আছে – দুই তরুণ – তরুণী, – ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অর্ণবই প্রথম কথা শুরু করল – রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা খুব মনে পড়ছে –  এইসময়ে – জানেন? – ‘এই যে তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ।’ আহুতি ঘাড় নাড়লো – ‘না শুনেছি তবে কথাগুলো মনে নেই’। –

– ওতে একটা লাইন আছে, –

“এই যে মধুর আলস  ভরে, –

মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে, –

এই যে বাতাস দেহে করে –

অমৃত ক্ষরণ”।

এই “অমৃত ক্ষরণের” কথা গুরুদেব – রবীন্দ্রনাথ যে কি ভাবে ভাবলেন তা আমার মনে হলে খুব অবাক লাগে। –

আহুতি ‘ক্ষরণ’ মানে টা ধরতে চাইল, কিন্তু পারলো না।

অর্ণব বলল, – ‘‘ডাক্তারি শাস্ত্রে তো অনেকবার রক্ত ক্ষরণ শুনেছি, – যে চুঁয়ে চুঁয়ে দেহ থেকে যখন রক্ত বেরিয়ে যায়। কিন্তু বাতাসের স্পর্শে হৃদয় আত্মা থেকে অমৃত – সুধা যখন বেরিয়ে আসে, তখন তা কতখানি মধুর ও পবিত্র হয় , তা ভাবতে পারেন?’’

এরকম অপুর্ব ভালো  আলোচনায় তাদের সময় কাটতে লাগলো।

আহুতি জিজ্ঞেস করল অর্ণবের দিকে তাকিয়ে – ‘আপনি শ্রীমদ স্বামী আত্মস্থানন্দজীর দর্শন পেয়েছেন? ওনাদের পরিবারের মানে পূর্বাশ্রমের কথা জানেন?”

– ‘হ্যাঁ, পড়েছি ওনার সম্বন্ধে আর স্কুল থেকে একবার বেলুড়ে নিয়ে গিয়েছিল, বিবেকানন্দের জন্মদিনে, – Youth Day, 12th January, তখন কাছে গিয়ে কথা শোনার ও প্রণাম করার সুযোগ হয়েছিল। জানেন মুর্শিদাবাদের ঐ গ্রাম থেকে ওনার দুই বোন সারদা মঠে ও ভাই রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছেন।  এরকম অসাধারন সব  পরিবার আরো অনেক আছে , যেখানে বাবা ঠাকুরের কাছে নিবেদন করেছেন ,তার পুত্র সন্তান কে তিনি যেন পায়ে স্থান দেন, পরে সেই ছেলে টি ও সন্যাসী হয়েছেন l খুব ভালো লাগছে অর্ণবের ঠিক সম মনস্কতার একজন বন্ধু র সঙ্গে কথা বলতে,  উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সে বলে চললো ‘‘স্বামী গহনানন্দজী মহারাজের এক দাদা প্রভানন্দ মহারাজ শিলং এর দুস্থ বঞ্চিত ,অবহেলিত  গরীব ছেলে মেয়েদের জন্যে চেরাপুঞ্জি র মতন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়  গড়ে তোলেন ,বহু কষ্ট সাধন করে, এবং  মাত্র ৩৭ বছরে তিনি শরীর ত্যাগ করেন, এইসব মহান মানুষদের পথে যেতে চাই আমি।

আহুতির মনে হলো ত্যাগের মন্ত্রে সে যেন আজ দীক্ষা গ্রহণ করলো ,এক অভিনব ঘটনার মধ্যে ,এক অসাধারন তারুণ্যের মাধ্যমে। নিজের জীবনের উদ্যেশ্য সফল করতে অনুপ্রেরণা পেলো আরো জোর বাড়লো তার, একই পথের পথিক কে প্রনাম জানালো  মনে মনে।

অর্ণব ঘড়ি দেখলো, করিম চাচার আসতে দেরী হচ্ছে। আপন মনে সে গুন গুন করছে, – ‘চিন্তয় মম মানস হরি’,এই গানটা স্বামী সর্বজ্ঞানন্দজী মহারাজের গলায় শুনেছিল দেওঘরে। উনি সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অদ্ভুত গানের গলা ও ভক্তি যুক্ত চেহারা, ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক স্নেহ। এঁদের মতন পথ পরিদর্শক মহারাজদের দেখে এখনও কত ছেলে ঠাকুরের সেবায়, বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মিশনে নাম লেখাচ্ছে। অনেকেই জানেন না সুদূর অরুণাচলে পাহাড়ের কোলে অরণ্যানীর মাঝে ঈশত্মানন্দজী মহারাজের তত্ত্বাবধানে কী সুন্দর বিশাল এক শিক্ষা – শিক্ষন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষন দুজনেই তারা চুপ। হটাৎ অর্ণব জানতে চাইলো, – ‘আসাম সাইডে বেড়াতে গেছেন কখনও? ‘আহুতির পরিবারে কেউ ভ্রমণে উৎসাহ পায় না। সে মাথা নাড়লো।

অরুণাচলে মাতাজীদের পরিচালিত আশ্রমে একবার ঘুরে আসুন খুব শান্তি পাবেন এবং অনেক কিছু জ্ঞানলাভ হবে।

আহুতি জানতে চাইল – ‘আর কোথায় কোথায় ঘুরেছেন বলুন না শুনতে খুব ভালো লাগছে’।

“রাজস্থানের ক্ষেত্রীতে গিয়ে ভীষণ অনুপ্রেরণা পেয়েছি। রাজা মঙ্গল সিং  সিং-এর কথা আলোয়াড়ের সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে?”

– হ্যাঁ, বিবেকানন্দকে যখন তিনি পুতুল পুজোর মানে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন রাজবাড়ীর দেওয়াল থেকে তিনি তাঁদের বাবা বা দাদু অর্থাৎ পূর্ব পুরুষের তৈল চিত্রটি পেড়ে মাটিতে রাখতে বললেন এবং রাজাকে বললেন ওর ওপরে পা দিতে। রাজা এবং তার সভাসদগন অবাক – “তা  কি করে হয়, এটি আমাদের মহারাজের প্রতিকৃতি, পা দিলে অপরাধ হবে না?”

– কিন্তু উনি এখন তো আর ঐ ছবির মধ্যে বিরাজমান নেই। তাহলে? নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, – মানুষ নিজের ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়ে পুতুলকে মৃন্ময় থেকে চিন্ময় করে নিতে পারে, তাই সে ঐ পাথরের মূর্ত্তিতেও ঈষ্টকে দর্শন ও পূজন করে। গল্পটিতে এই অকাট্য যুক্তি রাজাকে মুগ্ধ করে।

অর্ণব আরও বলে চলল, ‘আর জানেন তো রাজস্থানের  ক্ষেত্রীর রাজ বাড়িতে   আমাদের বিবেকানন্দের এক বোধদয় হয়। আহুতি অবাক হয়ে তরুণ ডাক্তারকে দেখতে লাগলো।

সেখানে বাঈজী -ময়নাবাই যখন রাজার সভায় গান গাইতে বসেছেন তখন বিবেকানন্দ নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকার জন্যে আসর পরিত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকেন। এমন সময় গায়িকা তার সুরেলা কণ্ঠে গান ধরেন, –

“প্রভু মেরে অবগুন চিতে না

ধরো – সমদর্শী হ্যায় নাম  তাহার “,

সেই গানটি শুনে বিবেকানন্দের বিবেক জাগ্রত হয়, তিনি মাতৃ জাতির প্রতি অবহেলা করে লজ্জিত হন এবং ক্ষমা চেয়ে নেন ঐ রমণীর কাছে নত – মস্তকে।

এবার করিম চাচার ডাক শোনা গেল – “এসো গো মা, এবারে চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে আসি।” তখনও অর্ণব বলে চলেছে, “রাজস্থানের এই ময়নাবাঈয়ের জীবনেও এক আমূল পরিবর্তন আসে স্বামীজিকে দেখার পর থেকে, তাঁকে আর রাজাদের রাজসভায় গান গাইতে শোনা যায়নি।

করিম চাচার গাড়ীতে বসে একটু দ্বিধাগ্রস্থ কুন্ঠিত গলায় আহুতি বলল – একটা অনুরোধ করব, যদি কিছু মনে না করেন, –

– “আরে আমরা দুজন তো এখন একই পথের পথিক, অনুরোধ নয় স্বচ্ছন্দ্যেই বলে ফেলুন।”

– “করিম চাচার সঙ্গে আমিই চলে যাই আপনি বরং বাড়ি ফিরে যান, বাড়িতে সবাই আপনাকে পেয়ে কত খুশি হয়েছেন।”

একটু গভীর দৃষ্টিতে অর্ণব তাকালো, তার দিকে, মনে হল যেন মনের ভেতরে কি লেখা আছে তা পড়া হয়ে গেল তার।

-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, করিম চাচা আমাকে কাঁথি বাজারের এই মোড়টাতেই নামিয়ে দাও। বাবার ওষুধগুলো কিনতে হবে। তুমি এনাকে একেবারে ঘরের দরজা পর্যন্ত দিয়ে এসো, টাকা বাড়ি এসে নিয়ে নিও।

ওদের গ্রাম বা বাড়ির পরিবেশ যে অন্যরকম তা বুঝতে অসুবিধা হল না অর্ণবের।

বাড়ি ফিরতেই মা ডাক দিলেন, চান করে রান্না ঘরে এসে বোস, আমার কাছে পিঁড়ি পেতে রেখেছি। গরম গরম মাছ ভাজা খাবি আয়।

আজ বাড়ি একদম খালি, বাবা মাদুরের ঘাস কাটতে মাঠে গেছেন, সারাদিন ভাগ্নে ভাইপোদের সঙ্গে ওখানেই কাটাবেন। মা লুচি তরকারি, মিষ্টি বানিয়ে সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। সাথে এক কান্দি কলা, নারকেলও আছে। অর্ণব বুঝলো মা আজ অনেকদিন পরে তাকে একা পেয়ে গল্প করতে চাইছেন। ভালোই হল তারও মন খুলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা জানাতে হবে আজ।

পাতে ডাল, ভাত, চচ্চড়ি ও মাছ ভাজা। “তোমাকেও আমার সঙ্গে বসতে হবে মা, তা না হলে আমি ভাতে হাত দেব না।” বলল অর্ণব।

“হ্যাঁ রে বাবা বসছি, তুই আগে শুরু কর না, আর কয়েকটা ভেজে নিই।”

– “না বসো তুমি আগে, নামাও কড়াইটা, ছ্যাং ছ্যাং করলে কথা বলব কি করে, তুমি শুনতে পাবে না যে।”

খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে হাত ধুয়ে এসে মায়ের কাছ টা তে পিঁড়ি টা টেনে নিয়ে সে বলতে আরম্ভ করলো – “মা আমি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে চাই।

– “আমি বুঝে গেছি, এই মেয়েটিকে তোর ভালো লেগেছে তাই না? তোর বাবা ও আমারও আহূতিকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এই রকমই একটি মেয়ের . . . .

মায়ের কথাটা শেষ করতে দিল না, অর্ণব – হ্যাঁ, মা আহুতি ভালো লাগার মতোই মেয়ে, কিন্তু আমাদের দুজনের পথ যে দু দিকে চলে যাচ্ছে।

– ‘সে আবার কি রকম কথা? ওদের বাড়ির লোকের আপত্তি হবে মনে হচ্ছে?’

– না না ওদের বাড়ি তো আমি যাই নি।

– ও তাহলে আমরা মাহিষ্য,ওরা  ব্রাহ্মণ তাই আপত্তি বলছিস?

– আরে তোমরা তো আগেই অনেক অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছো।

– আমাদের মধ্যে সেরকম কোন ব্যাপার হয় নি, আর হবার সম্ভাবনাও নেই কারন

– আরে আমরা এখনই বলছি না, তোর তো এখন তেইশ আরও দুবছর যাক – তারপর না হয় —

– এবার বেশ গম্ভীরভাবে অর্ণব জানালো, “মা আমি – আমি মিশনে নাম লিখিয়েছি ব্রহ্মচারী হবার জন্য।”

– “সে কী, তাহলে তোর ডাক্তারি করা হবে না? বিয়ে থাওয়া নিয়ে বাবা যে স্বপ্ন দেখছেন সে সব. . .” আর কথা বলতে পারলেন না তিনি, গলাটা ধরে এল। –

– “ডাক্তার তো হবোই মা, দিল্লীর AIIMS -এ সুযোগ ও পেয়ে গেছি সার্জারী শল্যবিদ্যায় MS করবার, কিন্তু মিশনের মাধ্যমে, বিবেকানন্দের আদর্শে – শ্রী শ্রী মা ও ঠাকুরের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে আমি – সন্ন্যাসী জীবন যাপন করতে চাই গো মা।”

-‘ত্যাগের মন্ত্রে যখন দীক্ষা নিয়েছো, ধীরে ধীরে ধরা গলায় বললেন অর্ণবের মা – তখন আমি তো এতে বাধা দিতে পারি না বাবা, তবে.. . ‘-

‘তবে আর কিছুই নেই মা, বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার, প্রথমে কষ্ট পেলেও একদিন তাঁর মনেও শান্তি এনে দিতে পারবো আমি, আমার সেবার কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষা, সংস্কার ও প্রকৃত মূল্যবোধেরই তো পরিচয় পাবে সকলে। তিনি নিশ্চয় আমাকে আশীর্বাদ দেবেন।”

আসতে আসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনের ধারে পুকুর পারে গিয়ে চুপ করে বসে রইল অর্ণব।

মা এঁটো হাতে কতক্ষন একভাবে কাটিয়ে দিলেন জানেন না।

সন্ধ্যে বেলায় শাঁখে ফু দিতে দিতে লক্ষ্য করলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের ছবিটা আজ যেন আরও জ্বলজ্বল করছে। তাঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন তিনি। সারদা মা তাঁর ভক্তদের বলতেন, – “মন তো নয় মা যেন মত্ত হাতি” তাকে বশ করার সবচেয়ে বড় উপায় হল জপ করা, – ‘জপাৎ সিদ্ধ’। আর কারও যদি জপ করতে মন না লাগে তাহলে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতে বলতেন তিনি।

আজ অর্ণবের সন্ন্যাস গ্রহণের শুভ অভিপ্রায় জানার পর থেকে মা কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এই এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন ঠাকুরের ছবির দিকে।

ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের দুই চোখের দৃষ্টি দুই রকমের। আগে কখনও এমন ভাবে লক্ষ্য করেননি তিনি।

এক চক্ষু প্রায় বুজে এসেছে, শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাধিস্থ। অন্যটি বড় অদ্ভুত। কখনও মনে হচ্ছে হাসছেন। স্মিত অপূর্ব সে হাসি তো ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকে, চোখের তারাও কি তাতে দ্যুতি লাভ করে। পরক্ষনেই মনে হল সেই নয়ন তারা যেন নড়ে উঠলো আর তার দৃষ্টি হৃদয় ভেদ করে অন্তরের অন্তস্থলকে একটি মৃদু আলোয় ভরিয়ে দিল।

সেই আলোকে মনের সব ময়লা, ক্লেশ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা – যা এতক্ষন অন্ধকারে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, সব একনিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল, অকারণ ভয় ভাবনা।

বাইরের বারান্দায় বাবার সামনে বসে অর্ণব গান ধরেছে –

“আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়

ধুইয়ে দাও, মনের কোনের

মলিনতা সব দীনতা ধুইয়ে দাও,

নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও. . . .”

এবার সন্ধ্যে আরতি। বাবা যথারীতি কাকাকে খোল মৃদঙ্গ আনতে বলে হারমোনিয়ামটা অর্ণবের সামনে রাখলেন। নিজে খঞ্জনীটা হাতে নিলেন। মা পঞ্চ প্রদীপ জ্বেলে আরতি শুরু করলেন। তার মায়ের মতন ভক্তিমতী সরল স্বার্থ ত্যাগী মানুষ যখন ঠাকুরের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁকে সাধারন মানবী নয় যেন দেবী মনে হয়। বহুদিন ধরেই পুজোর সময় তাঁর পরনে থাকে লাল পাড় সাদা শাড়ী, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ্, ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি। কখনও ভ্রু কুঁচকে থাকে না তাঁর। কখনও বিরক্তি ভাব দেখেনি কেউ আজও সব বিষন্নতা ছেড়ে ফেলে আরতি করছেন তিনি শ্রী শ্রী মা, ভগবান ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের তিনটি ছবিতেই মালা পড়ানো, ধুপ ধুনোর সুগন্ধে গৃহের পবিত্র পরিবেশ যেন মঠ-মন্দিরে উন্নীত হয়ে গেছে।

অর্ণব হাত জোর করে কপালে ঠেকালো বেশ কিছুক্ষন পরে শুরু করল হারমোনিয়ামে সুর তুলতে –

“খন্ডন ভব বন্ধন, বন্দন বন্দি তোমায়

নিরঞ্জন নর রূপ ধর, নির্গুণ নিরাময়. . .

মোচন অঘদূষণ . . .”

বাবা, কাকা, কাকিমা ও অন্যান্য ভাই বোন প্রতিবেশী, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমার দল খোলের আওয়াজেই আসতে শুরু করেছিলেন – তাঁরাও সবাই গলা মেলালেন এক সাথে। শেষে রামকৃষ্ণ শরণ্যে …  তালি দিয়ে দিয়ে।

রাতে খাবার সময় অর্ণব জানালো কাল ভোরেই সে ট্রেন ধরবে কলকাতার উদ্দেশ্যে। করিম চাচা তাকে নিয়ে যাবেন তমলুকে  ছাড়তে।

খুব চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল সে, ব্যাগ গোছাতে। রাত্রে বিছানায় শুতেই গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোক দুটো হটাৎ মনে পড়লো এখানে দৈবী শক্তির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে –

“অভয়ং . . . .আবর্জবম এবং অহিংসা . . .  হ্রীরচাপলম্। –

ভয়শূন্য হয়ে কিভাবে সরল অন্তঃকরণে ইন্দ্রিয় সংযম করে ভগবানের নাম করতে হয় স্বাত্ত্বিকভাবে। সে কথা লেখা এখানে, স্বত্ব ভাবের গুন গুলি বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু কায়মনোবাক্যে কাহাকেও কষ্ট না দেওয়ার কথাও তো বলা হয়েছে, পরবর্তী শ্লোকে। তাহলে? মা বাবাকে কিভাবে কষ্ট দেবে সে ! সারা রাত ঘুমাতে পারছে না সে, মা, বাবা কে দুঃখ দিয়ে কি ভাবে সে নতুন জীবন শুরু করবে? তারাই তো আসল দেবতা, তারাই তো তার প্রথম গুরু। কী করা উচিত তার, বুঝে উঠতে পারছে না।

ভোরে উঠেই সে দেখলো তার বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাগজে লেখা, – “আমাদের সম্মতি দিলাম, তোমাকে ঠাকুরের পদে সঁপে দিলাম। –

আশীর্বাদ – বাবা ও মা

বিশ্ব নার্স দিবস (Bishwa Nurse Divas)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ধাত্রী', মা তথা দাই মা ছিলেন,
আমার জীবনের প্রথম দেখা নার্স।
তিনি আমাকে তাঁর কর্ম
সম্পর্কে কোন ধারনাই কখনও
এনে দিতে পারেননি, যথক্ষণ না
আমার নিজের সন্তান জন্ম নিতে
আমায় প্রসব ব্যাথায় কাতর করে দেয়।
শুভ্রবসনা 'সেবিকা' এসে হাত
দুটি চেপে ধরে কত সাহস দেয় আমায়।
আমি পাই আশ্বাস।
দেবদূতের মতন, দেব দেবীর মতন
মানুষকে বাঁচাবার, যত্নে শুশ্রষায়
রুগীর কষ্ট লাঘব করবার
ব্রতে ব্রতী সেই নার্স।
তারপর দেখেছি কত আত্মীয় স্বজনের
অসুখে অপারেশনে তাঁদের
জীবিকার সঙ্গে মানবিকতা ও মমত্বের
আবেগপূর্ণ আচরণ,
আমায় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও
কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত করেছে আজীবন।
বিশেষতঃ এই 'কোভিড'-এর মহামারীতে
যখন মৃত্যুর মিছিল চলছে -
সারি সারি,
তখন তাঁদের বড় কাছ থেকে
চিনলাম আবার।
পরিবারের আপনজনের কাছেও
অস্পৃশ্য - শত ইচ্ছেতেও যখন
স্বামী, পুত্র, ভাই, বন্ধু, মা, বোন
স্ত্রী ও কন্যার কারো রুগীকে
ছোঁয়ার অধিকার বা উপায় নেই, -
তখনও তুমি হে মহিয়সী নারী, -
হে মহান পুরুষ তোমরা তোমাদের
বাহু প্রসারিত করে খুলে দিলে,
হাসপাতালের দ্বার।
তোমার মনে থাকতে নেই একবিন্দু
ভয়ের বাদল, 'করোনা ভাইরাস' !
তোমাকেও করতে পারে গ্রাস -
একথা ভেবে ছড়াওনি কোন ত্রাস।
কারণ, তুমি যে অঙ্গীকারবদ্ধ,
শপথ নিয়েছো, ট্রেনিং শেষে -
তোমার জীবন উৎসর্গিত -
মানব সেবার জন্যে,
রোগীর যন্ত্রনা দূর করা
সময়ে সময়ে ওষুধ পত্র ইনজেকশনের
বন্টনে, অক্সিজেন গ্লুকোস
চড়ানোর দুরহ কাজগুলি -
অনায়াসে করিলে অভ্যাস।
নার্স।
প্রত্যেক 'বিশ্ব-নার্স দিবসে' 'মহিলা'
নার্সের ছবি দিয়ে সারা পৃথিবী
কত অভিনন্দন বার্তা পাঠান,
কিন্তু হাসপাতালে শুধু মহিলা
নার্সই নেই, -
শ'য়ে শ'য়ে হাজারে হাজারে -
'পুরুষ সেবকের' দল - ওয়ার্ডবয় নামে
প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রে কর্মরত।
তাঁরা কি শুধু ফেলবেন হতাশ -
দীর্ঘশ্বাস।
না - তাঁরা তো নিবেদিত প্রাণ।
দিন রাত এক করে দিয়ে -
তাঁহাদের শ্রম দিয়ে যান।
মলমূত্রে, রক্তে পুঁজে ভরা বিছানা
পালটান।
পুরুষ রুগীটির দুর্গন্ধময়
পোশাক বদলান।
একশ কেজির বিশাল বপুকে শল্য চিকিৎসার পর
সাবধানে তুলে ড্রসিং করান, -
বিনা যন্ত্রনায় আবার শোয়ান।
এঁদের নাম দিয়েছে সবাই নার্স নয়
'ওয়ার্ড বয়'
একটু কোথাও ময়লা থাকলেই -
তাঁরা বকুনি খান, -
স্ত্রীর মৃত্যুকে সহ্য করতে না পেরে
স্বামী যখন পাগল হয়ে যান,
তখনও তাঁরাই তাঁদের ধরে স্বস্নেহে
ঘরে পাঠান।
হাসপাতালে আগত কুকুর বেড়াল
তাড়ান, ডাক্তার বা নার্স
দিদিদের ফরমায়েশ খাটেন -
সব অপ্রিয় কাজকর্ম সামলান।
ওয়ার্ড বয় !
তাঁদের যে কত কাজ -
শিখে নিতে হয়। -
করোনায় আক্রান্তদের কাছ থেকে
দূরত্ব বজায় নয়, -
একেবারে কাছে থেকে তাদের
অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানোয়
তাঁরা ব্যস্ত রয়।
এক মৃতদেহটি ঢেকে মুড়ে সযতনে
শ্মশান যাত্রায় রওনা করেই -
অন্য রোগীনিকে দিতে হয় অভয়, -
'এইতো একটা বেড পাওয়া গেছে' -
বিছানার চাদর বদলে, দিয়ে -
'স্যানিটাইজার' ছিটোয়।
কী অসামান্য তার দক্ষতা,
ধৈর্য্য ও বাঁচাবার প্রয়াস,
কারণ তিনি যে পুরুষ
নার্স।
জীবনের মায়া তুচ্ছ করে এই নিবেদনে, -
তাই আজ বিশ্ব দিবসে বার বার -
বলি মনে মনে, -
তোমাদের প্রয়োজনে, - আজি এই দুর্দিনে,
প্রাণে জাগে নব চেতনার উচ্ছাস,
আগামী প্রজন্মে এনে দাও -
নতুন উদ্যম -
ঘোরে তারা কতরূপ - জীবিকার সন্ধানে,
মহামারী দূরীকরণে -
আজ লেখা হল, নতুন এক ইতিহাস।
মানব সন্তান বাঁচাবার তরে
এই ক্ষণে শত শত
প্রাণ বিসর্জনে ধন্য হলেন প্রণম্য এইসব নার্স।

বিনীত প্রার্থনা (Binito Prarthona)

(ঠাকুর ভগবান শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কে)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঠাকুর!

তোমার চোখের দিকে চাই বারে বারে।

পাই যদি দেখিবারে, সেই সমাহিত - দৃষ্টি।

যার মধ্য দিয়ে করে চলো তুমি

ভক্তকে কৃপা বৃষ্টি।

একটি আঁখির পলক পড়ে না,

আমার হৃদয় ঝাঁকে,

 দীপ্ত আলোকে দূর করে দেয় -

মনের অন্ধকার কে।

জমা যত ভয়, করে দেয় ক্ষয়

উজ্জ্বল করে রাখে।

প্রচন্ড তার উত্তাপ এসে

অন্তরগ্লানি মেলায় ভস্যে

শুদ্ধ করিতে থাকে।

আর এক নয়ন সদাই মগন,

ডুবে আছে সমাধিতে,

আধো খোলা আর আধো আধো বোঁজা,

লীন হয়ে আপনাতে।

তোমার চরণে মিনতী আমার -

মতি থাকে তব পথে,

দাঁড়াও জীবন পথে, রোহো যেন মম সাথে।

অন্তিম ক্ষণে দেখা যেন পাই. -

কাঁদি আমি দিন রাতে,

তব নয়নের সম্মুখে মোর

আনন্দে মন মাতে।

শত কর্মেও ভুলিও না কভু হে, -

নাম জপে শুধু স্মরি,

হৃদয় মধ্যে পদ শতদল,

জীবনে যে সুখ ভরি।

কাম, ক্রোধ, লোভ সকল ছাড়িয়া 

তোমারেই থাকি ধরি।

শ্রীরামকৃষ্ণ ক্ষমো অবগুণ

অপরাধ মোর হরি।

দুই আঁখি হতে ঝরে কৃপা বারি

সদা প্রমান পাই।

জগতের মাঝে ঘুরি নানা কাজে -

তোমাকেই শুধু চাই।

জীবে প্রেম আর সেবার মন্ত্রে 

আপনারে তাই জাগাই।

তুমি খুশী হলে জন্ম ধন্য

আর তো চিন্তা নাই।

বারে বারে যদি যেতে চাই দূরে -

ছেড়ো নাহে তুমি মোরে,

'বেড়াল ছানার' মত ধরে থেকো 

ভীষণ শক্ত করে।

তুমি তো আমার পিতা, গুরু, সখা

ভার দেবো তোমা পরে

হে ঠাকুর, আমি অধম অবুঝ 

ভালোবেসো দয়া করে।

কাঁদি সদা তব তরে।

বিবাহ বার্ষিকী (Bibaho Barshiki)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দিনের সূর্য প্রদীপ্ত, রাতের তারারা
করে ঝিকিমিকি।
"ঊনপঞ্চাশ"(৪৯) টি বৎসর হল পার, -
তোমাদের জীবন আধার চমৎকার,
মন হল বিস্মিত, উঠিলো চমকি !
এ কী !
এখনও পৃথিবীর প্রতি এতো মায়া -
এতো টান, অকারণ আকর্ষণ,
এখনও যখন তখন দপ দপ করে,
জ্বলে আর নেবে আলেয়া -
হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকারে দেখতে পাও -
"ইচ্ছে-জোনাকি"।
স্বামীর স্নেহ, - সন্তানের শ্রদ্ধা -
বন্ধু স্বজনের ভালোবাসায়
বড় মোহময় - স্নিগ্ধ বাতাবরণ, -
আকাশ, বাতাস, ফুল, পাখী -
নিকট দূরের বন্ধু স্বজন সবাই করে -
ডাকাডাকি।
কোথাও নেই,- অসম্পূর্ণতা অতৃপ্তি,
সবই তো সুন্দর।
মায়ার জগতে তারা আজ কেমন - শক্ত হাতে
রয়েছে আঁকড়ি, আমরাও -
আকুল আবেগে যে যেমন তাকে, -
সব প্রতিবেশী - ছদ্মবেশী -
আসল, নকল - প্রত্যেক মানুষকেই
আপন করে ধরে - থাকি।
তবুও সব কিছুর মাঝে কি যেন
ব্যাথা বাজে !
প্রিয়জন হারানোর দুঃখ জমাট করে
ওরে, জমিয়ে রাখি -
চিন চিন করে বেদনার তারে, বারেবারে -
মৃদু ঝংকারে কে গান ধরে -?
টন-টনে কষ্ট হৃদয়ের তলা থেকে উঠে আসে
ঠিক বুকের মাঝে -
কান্নার বাঁধ এবার অকস্মাৎ -
ভাঙবে নাকি !
হতাশার পরশ, বার্ধক্যের অলস অবশ -
ভাবের ছোয়ায় - অন্তরে বিষাদ ভরে,
বিদায় - বিচ্ছেদের প্রস্তুতি চলে, -
সন্ধ্যার মেঘমালা দলে দলে -
দিগন্তে যায় ঢলে, -
বিয়ের পরদিনে - কনে শ্বশুরবাড়ি
যাবার সময় যেমন পিছন পানে চেয়ে -
একবার থমকে দাঁড়ায় - সুর শুনে -
সানাই এ ঠিক সেই মোচড় দেওয়া
ধূন টা বাজলো কি?
কি জানি কেন এখনও -
চাওয়া পাওয়ার দোলনা দোলায় -
প্রাণ কেন যে নিত্য ভোলায় !
একটুখানি মিষ্টি কথায়,
একটুখানি স্নিগ্ধ চোখের চাওয়ায় -
হই - সুখী।
অল্পেতে মন বিগলিত, -
আবেগের বশে বসে বসে - স্মৃতির পর্দা যবে তুলি,
দেখি কত পরিচিত মুখ - দেয় উঁকি।
প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, -
দুইটি তরুণ তরুণী -
বসেছিল একাসনে, সাজানো সিংহাসনে,
সুসজ্জিত গৃহের আঙ্গনে তুলেছিল আলোড়ন,
এঁকেছিল স্বপ্নের আল্পনা
নানা রঙের কত আঁকি বুকি।
তাদের একত্রে বেঁধেছিল এক দৃঢ় বন্ধনে, -
উল্লসিত নতুন জীবনে।
তারপর থেকে প্রতিবার আসে -
আনন্দ অভিলাষে -
বিবাহ-বার্ষিকী। -
জানাতে চায় কতটা অটুট তাদের প্রেম।
বোঝাতে চায়, - 'নদীর স্রোতের প্রায়
সময় চলিয়া যায়' -
কেন করো এখনও হায়।
খুনসুটি, ঝগড়া বিরোধ কোষাকোষি
চেঁচামেচি, হাঁকাহাঁকি?
এতোদিন যখন সহ্য করে নিলে
একে অপরের দোষ ত্রুটি -
ছেড়ে দাও এবার সকল মান-অপমান
ছলনা - অভিমানের নকল -
মিথ্যে বুজরুকি।
অপার শান্তিতে কেটে যাক - আরও ক'টা দিন।
এ জীবনে যতটুকু রস আছে -
এখনও বাকি, -
আস্বাদন করে নাও, নিজেদের
দিও নাকো ফাঁকি।
এসো এখন শুধু - ঈশ্বরকে একসঙ্গে স্মরণ করি -
দুজন দুজনের হাত ধরি - প্রভু কে ডাকি, -
"আমারে তুমি অশেষ করেছো" - এ কথা জানিয়ে
জীবন - দেবতাকে যেন নমন করতে থাকি।

সমীরদাকে চিঠি (Samir da ke chithi)

 

সমীরদাকে চিঠি

 

১লা মার্চ, ২০২১

সিঙ্গাপুর

প্রিয় বনু ও শ্রীচরণেষু সমীর দা, –

তোমরা দুজনে ঠিক ঊনপঞ্চাশ বছর আগে, বিয়ের ঠিক পরে পরে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে শান্তিনিকেতনের বিড়লা হোস্টেলে। বনুর পরনে ছিল হলুদ সিল্কের শাড়ি, লাল পাড়ে দেহের ভাঁজে ভাঁজে তুলেছিলো হিল্লোহ, মুখে ঝরঝরে হাসি, কপালে জ্বলজ্বলে সিঁদুর। সমীরদার পরনে নীল শার্ট ও (অফ হোয়াট) ঘিয়ে ঘিয়ে মাখন রঙের প্যান্ট। ফর্সা সুন্দর মুখে অপূর্ব সুন্দর প্রেমময় দীপ্তি। আমার বন্ধুরা যখন জানলা দিয়ে দেখেছে, তখন তাদের সে কী আনন্দ – যেন উত্তম সুচিত্রা এসেছে তাদের হোস্টেলের গেটে। একজন মন্তব্য করলো – “দেখ দেখ দাদা বৌদিকে কী সুন্দর মানিয়েছে”। ‘আমি মুখ বাড়িয়ে দেখি আমার গেস্ট – এ্যাই তোরা একদম কিছু বলবি না’ – বলেই আমি ছুট লাগলাম নিচের visitor রুমের দিকে। তাও কি ওরা থামে – ‘আ-হা-হা এমন সুদর্শন মোহনকান্তি কার্ত্তিক ঠাকুরের মতন বর আমাদের কবে জুটবে রে?’

সেই দিনের ছবিটা আজ চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠল আমার। তোমাদের অনেক অনেক শুভকামনা ও শ্রদ্ধা এবং আন্তরিক প্রীতি ভালোবাসা জানাই।

মুকুলিকা –

করোনার করুনায় (Coronar Korunay)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফসকে গেল সুযোগগুলো,
খসকে গেল সুসময়, -
টসকে গেল মিথ্যা গর্ব
উসকে গেল মৃত্যু ভয়।
 
চটকে দিল শান্তির ঘুম
মটকে দিল শক্ত ঘাড়
লঠকে দিল ফাঁসির কাঠে
ঝটকে দিল সবার বাড়।
 
অঙ্কে রইলো বিয়োগ শুধু
পঙ্কে রইলো প্রিয়র লাশ,
ব্যাঙ্কে রইলো শূন্য মধু
ট্রাঙ্কে রইলো হাহুতাশ।
 
মনটা হল পাগলা হাতি,
প্রাণ হল নিরুদ্দেশ,
জ্ঞানটা হল লুপ্ত কোথায়
মানটা হল কখন শেষ।

পদস্খলন (Padoskholon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমাদের সবার পা সরে গেল, মাটির তলা থেকে।
'নরসিংহের' কোলে বসে, তোমায় যাচ্ছি ডেকে।
জলে, স্থলে, পাতালে নয়, ধ্বংস তোমার হাতে,
নিপাৎ করতে হুকুম সে দেয়, সকাল, সন্ধ্যা, রাতে।
কার যে কখন আসবে শমন, কেউ জানি না তাহা,
প্রথম প্রথম হাহাকার তার শুনতে পেতাম, - আহা!
ধীরে ধীরে নিত্য খবর কে কার তরে কাঁদে?
পরিবারে কে কাহারে রাখতে পারবে বেঁধে?
ওর বাড়িতে বাবা গেলেন, পাশের বাড়ির দিদি,
ছোট্ট খোকন সোনা গেল অবাক নয়ন মুদি
কোলের শিশু স্তন্য পানে ছিল যে নিশ্চিন্ত
মায়ের তখন শ্বাসরুদ্ধ, ছিড়লো ফুলের বৃন্ত।
শেষ হল সব জ্ঞানের কথা, তর্ক বিচার পুঁজি, -
'কোভিড' এসে বললো, শান্তি কোথায় পাবি খুঁজি?