হুজুকে ( Hujuke )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ওই ছেলেটা ভ্যাল ভ্যালেটা, বড়ই সে যে হুজুকে,
ছোট থেকেই পায়ে চাকা -
পালিয়ে যায় কোন মুলুকে,
মামার বাড়ি, বাঁশের ঝাড়ি,
ছাড়িয়ে সে দেয় কোথায় পাড়ি
সঙ্গে নিয়ে প্রাণের দোসর -
নেড়ী কুত্তা, - ভুলু - কে।

পাঠশালাতে মন লাগে না,
ঢেঁকী শালায় যায় ঢুকে,
চিঁড়ে কুটে দেয় পিসিকে
কোলে নিয়ে এক পুঁচকে কে -
ওটা যে তার পোষা বেড়াল
করে রাখে সবার আড়াল,
কখনও বা চরিয়ে বেড়ায়, সাদা গরু ধুলু কে,
কাক, চিল বা পেঁচার ছানা, 
ঘেন্না করে কেউ ছোঁয় না
গাছে চড়ে, তুলে সে দেয় দয়া মায়ায় ডুবে থাকে,
চান খাওয়া যে ক্খন সারে !
বসে থাকে নদীর ধারে, 
বানের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, - বাঁচায় বন্ধু বুলু কে।

বড় হয়েও শোধরালো না, চলন বলন এক থাকে।
উধাও হয় সে পাহাড় বনে,
কখন কোথায় সেই তা জানে, -
সাগর পারে বালুর তীরে ক্যাঁকড়া ধরে -
কোন বাঁকে।

রাতের বেলায় গ্রাম পাহারায়
"জাগতে রহো" - হাঁক হাঁকে।
যাযাবরের মতন স্বভাব, দেখে না সে নিজের কি লাভ,
পরের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে -
ঘুরে মরে কার ডাকে?
ধন-দৌলত চায় না গো সে
পয়সা তো নেই তার ট্যাঁকে,
কিন্তু আছে ভীষণ সাহস
আত্মবল যে তার বুকে।
মহামারী হলেও ভারী, মারলো তুড়ি সে তাকে,
কোভিড কেও ভয় পায় না,
মড়া পোড়ায় কোন ঝোঁকে !
সবাই তাহার কাছে আসে, -
আপন বলে ভালোবাসে,
শ্রদ্ধা জানায়, মনে মনে
হুজুকে ঐ ছোঁড়াকে।

বাবুই পাখীর বাসা ( Babui pakhir basha )

চন্দনা সেনগুপ্ত

বাবুই পাখীর বাসা, দেখতে বড় খাসা,
খেজুর পাতার সুতো দিয়ে
বুনোনি তার ঠাসা।
মুখটি যেন উল্টো কলসী
কুঁজোর মতন গলা
দরজাটি তার নয়তো বন্ধ
সদাই থাকে খোলা।
রাতের বেলায় জোনাক জ্বলে
ঠিক সে টুনি আলো।
গোবর মাটি লেপা দেওয়াল
পোকা কালো কালো।
ছানা পোনা সারাটি দিন
কিচির কিচির করে।
বাবুই পাখী তাদের তরে
পোকা মাকড় ধরে।

ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা ( Valentive er bhalobasha )

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেই যে দুজন, কে জানে কখন - !
বিষ বৃক্ষের ফল খেয়ে, -
প্রণয় করতে শিখেছিল, - তাদের আমার প্রণাম।
ওই 'আদম - ইভের' ভ্যালেন্টাইন পর্ব টি না
থাকলে তো আমরা জন্মাতামই না। 
জানতাম না,
সেই আদিম প্রেমিক প্রেমিকার নাম,
পেতাম কি এই সুন্দর জগতে
এমন অপূর্ব জীবনের দাম?
প্রেম, প্রতীক্ষা - প্রত্যাখ্যান বা মিলন।
যুগ যুগ ধরে - মুগ্ধ - স্নিগ্ধ - ধন্য
করে রোমান্টিক ভুবন।
কবি কালিদাস-এর কাব্যে, আমাদের
শাস্ত্রে পূরাণে - কামদেব মদনের
আগমনে, মানব-মানবীর মনে
তুলেছে আলোড়ন।
 
রাধা - কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী -
অভিসার - বিরহ - এসবই তো
বৈষ্ণব পদাবলীর - ছন্দে বদ্ধ,
মধ্য- যুগের ভ্যালেন্টাইন।
কথাটা হয়তো একসময় তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে
‘রোমান’ অক্ষরে লেখা হত,
কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর প্রতি ভাষায় -
বনে, কোনে, মনে -
তার মানে 'গোপন প্রেমবন্ধন'।
যীশুখৃষ্টের ধর্ম প্রচারক -
‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ কে
নিয়ে সূত্রপাত এই উৎসবের লগন,
 
ধর্ম বিদ্ধেষী রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের কারাগারে
বন্দী ছিলেন সেই সজ্জন -
মুখ বুজে সহ্য - করে চলেছিলেন
অকথ্য নির্যাতন,
ঠিক তখন -
তাঁর হৃদয় মুকুরে উদ্ভাসিত এক মুখ,
জেলার কন্যার আবেগাপ্লুত -
দুই নয়ন, -
তাঁকে বারে বারে চঞ্চল করে,
তিনি কী যেন ভাবতে থাকেন, - সারাক্ষণ তারপর সুযোগ বুঝে
তাঁর সেই বান্ধবীকে করেন
পত্র প্রেরণ।
কেউ জানে না কী লেখা ছিল তাতে।
কিন্তু সেই কারনে
করতে হল তাঁকে মৃত্যু বরণ।
তারপর থেকেই 'শহীদ সাধুর' নাম
তরুণ তরুণীর দল
স্মরণীয় করে দিলেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে
২৭০ শতাব্দী থেকে শুরু হল
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে
নতুনভাবে প্রণয় নিবেদন।
 
সবাই জানে লুকিয়ে প্রেম করার মধ্যে
আছে এক শিহরণ।
তার ওপরে সব দেশেই যখনই হয় -
'বসন্তের' আগমন -
ফুলে ফুলে অলি করে পরাগ মিলন, -
পাখীরা খুঁজে বেড়ায়, তাদের প্রিয় সাথীকে,
বেড়ে যায় তাদের কলকাকলী
মধুর কুজন -
এই ঋতু বরফ গলা জলে তোলে তখন,
মৃদু হিল্লোল, হাওয়ায়,
সঙ্গীতের মূর্ছনা - মানব হৃদয়ে তোলে
আলোড়ন, তখন
 চিরকালীন প্রেমিক -
প্রেমিকা করে আবাহন ,তীরবিদ্ধ পাখীটিকে,
গান গায় - কবির
সুরে "প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো
দোঁহারে -
বাঁধন খুলে দাও - দাও দাও দাও" -
নতুন যুগে নতুন ভাবে এ যুগের
যুবক যুবতী ফুলের তোড়া উপহার
নিয়ে এগিয়ে যায়। করে
প্রেম নিবেদন, -
ধন্য হয় সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের
নির্বাসন ও আত্ম বিসর্জন।

বর্ষ-বরণ (Borsho-Boron)

চন্দনা সেনগুপ্ত 

আমরা যারা, আজ সুখের জমিতে, শ্যামল ভূমিতে 
আনন্দে শান্তিতে বসে বসে
বর্ষবরণের গান গাইছি, মধুর স্বরে, -
সময় কাটাচ্ছি, নানান নেশার ঘোরে, -
তারা কেমন করে ভাবতে পারে?
আঠাশ দিন ধরে, একটা অপোক্ত পুরোনো নৌকা ভরে -
পঞ্চাশ জন নারী, সাতচল্লিশ জন শিশু ও 
কতিপয় দুঃসাহসিক পুরুষ নাবিক-এর ‘প্রাণ‘
নাচছে যে গভীর সাগরে।
ঢেউয়ের তালে, খিদে তেষ্টায় দিশাহারা মানুষগুলো 
কলার পাতায় আশ্রয় নেওয়া
পোকার মতন অদৃষ্ট দেবতার খেয়ালে
কোন উদ্দেশ্যে শুধু ভেসে চলেছে !
ঝড় তুফানে, সুনামির কাঁপনে, তাদের
জন্ম মৃত্যুও ক্ষণস্থায়ী, জীবন যে নাচছে শুধু
'তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ করে।
ওদিকে ডিসেম্বর - একত্রিশে, পৃথিবীর সব দেশে,
পূর্ব দিগন্ত হতে পশ্চিমের শেষ প্রান্তে,
মরুভূমি থেকে মরুদ্দেশে - বনে অরণ্যে
নগরে - শহরে বিশেষ করে সমুদ্র কিনারে 
মানুষ নেশায় মাতে,
আনন্দের ফুলঝুরি, পড়ে ঝরে ঝরে।
"ক্যালেন্ডার" পুজোয় মত্ত জনতা মহামারীকেও 
উপেক্ষা করে, জমা হয় হাজারে হাজারে।
পথ ঘাট সাজে, বাদ্যি বাজে, আগুনের মশাল জ্বলে।
বাজি পোড়ায় তারা। আকাশের কালো আঁধার চিরে
আলোর মালা দোলে।
কী অসম্ভব বৈপরীত্য - কী অস্বাভাবিক বৈসাদৃশ্য -
একধারে তুবড়ির রোশনী ঝলমলে সাগরতীরে,
আর অন্যদিকে -
জমাট ভয়ে আতঙ্কিত মানবের ভাগ্য - নৌকা ঘিরে;
সব আশা মোমবাতির মতন তখন পড়ে গলে গলে।
পাল ছেঁড়া, ইঞ্জিন বিকল হওয়া নৌকার -
উদ্বাস্তু যাত্রীদল হয়তো আর একটু পরেই 
তলিয়ে যাবে অতল সলিলে।
আকাশের তারারা শুধু মিটি মিটি করে চায়,
এই অভাবনীয় অবাঞ্ছিত দৃশ্য দেখতে হবে বলে,
এক ফালি চাঁদটাও মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়।
সময় থমকে দাঁড়ায়, সবাই নিশ্চুপ।
ঐসব শিশুগুলি - যারা এখনও প্রার্থনা করতে শেখেনি,
আল্লাহ, ঈশ্বর - কাউকেই চেনে না, বুদ্ধদেবের অহিংসার 
পরিচয় তাদের কেউ দেয়নি, কিম্বা ক্রূশবিদ্ধ যীশুর 
বাণী প্রচারকদের নামও জানে না -
শুধু একদৃষ্টে টলমলে পাল থেকে হেলে পড়া
বাঁশের দিকে ঊর্ধ মুখে তাকায়,
ডুবন্ত নৌকার অবিরাম দোলা তাদের কাঁপুনি বাড়ায়। 
'মৃত্যু' নামের ভীষণ দানবের চেহারাটা তাদের তো 
অজানা নয়। 
চোখের সামনে তাদের  বাপ, দাদারা  গুলিবিদ্ধ হয় ,
রক্তাক্ত দেহগুলো কবরের মাটি নাহি পায়,
গলিতে গলিতে কুকুর শেয়াল সেগুলি ছিঁড়ে খায়।
মা, মাসি, দিদি, বৌদিদির ওপর পাশবিক অত্যাচার, ক্রন্দন 
হাহাকার যেদিন তাদের কানের পর্দা ফাটায়, -
সেদিনও তারা ছিল, এমনই নির্বাক অসহায়।
চোখের জল ফেলার মতন ছিল না সময় বা উপায় !
এই কয়মাস ধরে তারা জীবন পাখি হাতে নিয়ে 
কেবলই এক দেশ হতে অন্যদেশে স্থল বা জলপথে 
শুধু পালিয়ে বেড়ায়।
তাদের অন্তরে অদ্ভুত বিহ্বলতা ও সীমাহীন বিস্ময়।
শন শন করে বাতাস বয়, তারা চায় একটু
‘আশ্রয়’।
মায়েরা খালি ভাবে - শিশুগুলি বুকে চেপে ধরে -
আমাদের ত্রাণকর্তা আজ কোথায়?
এদের কী অপরাধ প্রভু? অবোধ, অবুঝ বালক শিশু -
এরা কেন শাস্তি পায়!
করেছে কী এমন অন্যায়?
‘আল্লাহ’র দরবারে  তারা অভিযোগ জানায়।
শেষে, সেই ব্যাকুল মানুষের আকুল আকূতি
হয়তো ঈশ্বরের দরজা ধাক্কায়, 
তাই
একটি দ্বীপের কাছে - ইন্দোনেশিয়ায় ,
এক চকিতে সেই ডুবন্ত নাও, দৃষ্টি গোচর হয়,
মৎস্যজীবী একদল লোক চমকে ওঠে -
যখন বিদ্যুতের আলো ঝলকায়।
আর সেই মানুষদের প্রাণে ভগবান জাগায়
আত্মবিশ্বাস, তারা অনুভব করে -
'মানবিকতার' দায়।
তাদের সমস্ত সত্তাকে কেউ যেন নাড়া দেয়।
তাদের তৎপর করে, 
একমুহূর্ত দেরী করলে ভীষণ অনর্থের
সাক্ষী হবে ভেবে, তারা - চিৎকার করে -
‘ঐ প্রানগুলি বড় অমূল্য, বাঁচাতেই হবে ওদের।
তুলে আনবই, আমরা, নিরাপদ নিশ্চিন্ত ডাঙায়’ ।
‘নৌসেনার’ কাছে তারা বার্তা পাঠায়;
তাদের এই জেলেদের নৌকায় 
ধরবে না এই শতাধিক লোক,
তাই আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থা ও
সৈনিকের অসামান্য প্রচেষ্টায় 
আঠারো ঘন্টা ধরে, উদ্ধার কার্য তারা চালায়।
'রোহিঙ্গ্যার' বাস্তুহারা ছন্নছাড়ার দল
উঠে আসে সমুদ্র কিনারায l
বছরের প্রথমদিনে এতোগুলি প্রাণীর জীবনদানে 
দ্বিতীয় জন্ম দিয়ে, অবিশ্বাস্য 
দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে সেই 
দয়ালু ধীবর সম্প্রদায়।
 সার্থক হয় ওদের বর্ষ-বরণ l
সারা বিশ্বের মানবদরদী আত্মা আবার 
মনুষ্যত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
জগতের মায়েরা উদ্ধারকারীদের পাযে বারেবারে 
প্রণাম জানায়।

ডানা ভাঙা পাখী (Dana Bhanga Pakhi)

চন্দনা সেনগুপ্ত

মিস্টার ভেঙ্কট ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা দেবী চেন্নাই থেকে রওনা দিলেন সিঙ্গাপুরের দিকে। আর পাঞ্জাব থেকে দিল্লীতে এসে এয়ার ইন্ডিয়ায় সিঙ্গাপুরের ফ্লাইটে চড়ে বসলেন, মিস্টার ও মিসেস কাপুর। দুই বৃদ্ধ চাকুরী থেকে অবসর প্রাপ্ত এবং তাঁদের পত্নীদ্বয় ছেলে বা মেয়ের সাফল্যে গর্বিত গৃহবধূ। তাঁরা তাঁদের চেন্নাই ও অমৃতসরের বড় বাড়িতে গাছপালা লাগিয়ে চাকর-বাকর, মালী, ড্রাইভারদের নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছেন। তাঁদের একমাত্র নাতি ‘রাঘবের’ ১৮ বছরের জন্মদিন পালন করতে ওখানে যাত্রা করছেন। ভেঙ্কট ও বিনীতা ওর ঠাকুরদা ও ঠাকুরমা এবং কাপুর দম্পতি নানা-নানী। দুই দাদু এবং দাদী ও নানী আনন্দে একেবারে বিগলিত।

রাঘবের স্কুলের পাঠ শেষ হয়েছে। এবারে সে এয়ার ফোর্সে পাইলটের ট্রেনিং নিতে ‘কানাডায়’ চলে যাবে। তাই তার সঙ্গে আর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ আসবে না, এই জন্য মা বাবা রাঘবের আগ্রহে বড় পার্টি দিতে “সন্তোষা দ্বীপে” (Sentosa Island) একটি হোটেল বুক করেছেন। তার মা কমলেশ ও বাবা রঙ্গনাথ দুজনেই IIT এবং IBM একসঙ্গে পড়েছেন, তাদের এই প্রবাসে চাকরী জীবনে সাফল্য ও অর্থ দুটোই এনে দিয়েছে। ২০ বছর এখানে আছেন, নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন। দু’জনেই তাদের বাবা মা দের একটি করে সন্তান। কিন্তু দেশে ফিরে যেতে বা চেন্নাই অমৃতসরের জমি-জমা, সম্পত্তি, বিশাল বাড়ি ভোগ করতে ইচ্ছুক নয়।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান উৎসব – অনেক বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খুব সুষ্ঠভাবে পালিত হল, নাতি চলে গেল বিদেশে। এই বৃদ্ধ বৃদ্ধা রা তাঁদের ছেলে মেয়েদের দূরে পাঠিয়েছেন, অতএব রাঘবের বাবা মা ও  মুখে করুন হাসি টেনে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। এক সপ্তাহ পরেই দুই Grand Parentsদের চলে যাওয়ার টিকিট কাটা আছে। এমন সময় জানা গেল, চীন দেশে উদ্ভব হয়েছে, সেই ভীষণ করোনা ভাইরাস।

যার প্রকোপে – আক্রমনে (২০১৯ এর ডিসেম্বরে যার সৃষ্টি) ২০২০ জানুয়ারীতেই সিঙ্গাপুরে ভীতি দেখা দিল। এখানে বিচক্ষণ সরকার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন ঘোষণা করলেন।

দেশ থেকে কেউ বেরোতেও পারবে না, আবার কেউ বাইরে থেকে আসলে ১৪দিন হোটেলে ‘কোরেন্টাইনে’ থাকতে হবে। অনেক টাকা খরচ করতে এবং বার বার কোভিড টেস্টে পাশ করতে হবে।

অতএব সব বাবা মায়েদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দেশে যারা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন, তাঁদের সন্তানেরা অসহায় হয়ে – বিদেশে বসে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। এ এক বিভীষিকাময় পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নিরুপায় মানুষ নিরানন্দে জীবন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ঐ চারজন বৃদ্ধ – বৃদ্ধার অবস্থাও দাঁড়ালো যেন ঠিক চিড়িয়াখানায় আটকে রাখা জন্তুর মতন।

মেয়ে কমলেশ ও ছেলে রঙ্গনাথ বাড়িতে বসেই কাজ করেন, দিনরাত কম্পিউটারে। Work from home এই মহামারীতে তাদের জীবনটি এক নতুন খাতে বহে নিয়ে যাচ্ছে।

‘চারজন’ ভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন কালচার ধর্মাবলম্বী লোক অবসর সময়ে ছেলে তথা জামাইয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এখানে একটাই এখনও ভাল যে মাস্ক পরে নিচে সুইমিং পুলের ধারে সকাল বিকেল ঘুরতে পারছেন। সেখানেই আলাপ হল, আরও অনেক মা বাবাদের সঙ্গে, তাঁরা কেউ কলকাতা তো কেউ হায়দ্রাবাদ, কেউ পুনে তো কেউ কাশ্মীর থেকে আগত। ছেলে মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশুনো করে কেউ কম্পিউটার কোম্পানীতে, অথবা কেউ ব্যাংকে সব ভালো ভালো পদাধিকারী, ভালো মাইনে পান। কিছু প্রফেসর বা জাহাজের ক্যাপটেন, ইঞ্জিনিয়ার, সুন্দর সুন্দর এপার্টমেন্ট     (কন্ডো- তে) বাস করছেন। বৃদ্ধ বাবা মা রা তাদের নিয়ে গর্বিত। যখনই দেশ থেকে কেউ আসেন, তাঁদের নিয়ে হৈ হুল্লোড় করতে, বিভিন্ন দ্বীপে – কাছে পিঠে নিয়ে যেতে, গাড়ি করে মালয়েশিয়া বেড়াতে তাঁরা বেশ উৎসাহ দেখান। বাড়িতে প্রায় দিন রান্না করতেও হয় না। এখানের খাওয়ার দোকান food court থেকে নিয়ে বড় বড় বিভিন্ন দেশের রেস্তোরা হোটেলগুলিতে এত নতুন নতুন খাদ্য তালিকা পাওয়া যায় যা সারা বিশ্বকে আকৃষ্ট করে। তাই রোজ একঘেয়ে খাবার না খেয়ে তারা বাবা মা দের নিয়ে প্রত্যেক শনি – রবিবারে বেরিয়ে পড়েন জিভের স্বাদ বদল করতে। সামুদ্রিক মাছ, জাপানী সুশি বা চীনদেশের রকমারি খাদ্য দ্রব্যের পাশেই পাকিস্তানী কাবাব বা বাংলাদেশের বিরিয়ানি। এখানে লন্ডন – আমেরিকার মতন দেখবার দর্শনীয় স্থান খুব বেশী নেই, আমাদের ভারতের মতন ঐতিহাসিক পুরোনো সব রাজপ্রাসাদ, মন্দির – মসজিদ, তীর্থক্ষেত্র কিংবা হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতেও পাওয়া যায় না। তাই সব মনোযোগ এই দেশের খাওয়ার ওপরে। সুতরাং যখনই কেউ আসেন ছেলে মেয়েদের সঙ্গে অন্য দেশের আহার্য্য দ্রব্য তাদের নতুন নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এখানে সুযোগ ঘটে। সিঙ্গাপুরে র এই সব Food court গুলো World Heritage এর আওতাভুক্ত হয়েছে এদের বৈচিত্রের জন্য। দু-চার মাস আনন্দে কাটিয়ে তারা ফিরে যান। কখনও কখনও বা কোন কোন পিতা মাতার ভাগ্যে বালি, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বিনথাম বাথাম কিংবা থাইল্যান্ডের ফুকট, ব্যাঙ্কক ঘোরার বেশ উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা লাভ হয়ে যায়।

কিন্তু এখন সব বন্ধ। দু/চার মাস থেকে ছয়/আট মাস বছর ও ঘুরে গেল, কিন্তু long term visa নিয়ে যে সব পিতা মাতার দল সিঙ্গাপুর বাসী হয়েছিলেন, কেউই আর ফিরে যেতে পারছেন না নিজের আরামপ্রদ চেনা পরিবেশে। কেউ তাই এখন আগেকার সময়ের মতন খুশি বা সুখী নন। দেশের গ্রামে বা শহরে কিংবা ছোট্ট নগরে যে প্রশস্ত আঙ্গন, আম, জাম কাঁঠালের বাগান, গাড়ী, ড্রাইভার কাজের লোক তাদের জন্যে অধীর আগ্রহে বসে আছে, নিজের ঘরের বারান্দা, ফুলের টব বা তুলসী গাছ, পোষা গরু, বাছুর, কুকুর – পাড়া – প্রতিবেশী, চায়ের দোকান, প্রভাতে সন্ধ্যায় আড্ডামারার সেই পার্কের কোনায় সিমেন্টের বেঞ্চ, পুরোণো বন্ধু সব পড়ে আছে দেশের মাটিতে।

‘ভেঙ্কটবাবু’  নতুন প্রতিবেশী  মিঃ দাশের সাথে কথা বলতে বলতে তাঁর অতি মোটা জোরালো গলায় কখনও দেশের প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ তো কখনও কখনও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি রাগ ব্যক্ত করেন, তাঁর স্ত্রী খুঁজে বেড়ান তামিল বান্ধবী। সময় কাটান, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ান হেল্পার কে ধোসা ইডলী শেখাতে।

একসঙ্গে দুটো বাসন থাকলে যেমন ঠোকাঠুকি লাগে, শব্দ হয়, কাঁচের পাত্র তো ভেঙে চুরমারও হয়ে যায়, ঠিক সেইরকম দুজন মানুষকে এক জায়গায় বন্দি করে রাখলে, তাদের সম্পর্কের চিড় ধরতে থাকে। এই প্রবাসী পরিবারেও সেই আনন্দময় পরিবেশের জল একটু একটু করে ঘোলা হতে শুরু হল।

ছেলের বাবা মা ধার্মিক দক্ষিনী ব্রাহ্মণ। নিরামিষ খাওয়া, তিলক কাটা, সকাল বিকাল অনেক্ষন ধরে পুজো পাঠ করতেই তাঁরা অভ্যস্ত। মেয়ের পাঞ্জাবী মা বাবা গুরুদ্বারে যান, পাঠ শুনে, কর সেবা করে, সেখানে হালুয়া প্রসাদ, কখনও বা ‘লঙ্গর’ অর্থাৎ ওদের বানানো কমন কিচেনে ডাল – রুটি খেয়ে আসেন, কখনও বা বাড়িতেই খুব পেয়াঁজ রসুন দিয়ে ডালের সুস্বাদু তড়কা বানাতে ভালোবাসেন, সব রকমের আমিষের রান্না করতে  তাঁদের আগ্রহ। মেয়ে তাদের জন্যে মুর্গা নিজেদের ওভেনে তন্দুরী করে দেন। ছেলে বাবা মায়ের জন্যে ‘আনন্দভবন’ কিংবা ‘কোমিলা বিলাসের’ মসলা ধোসা, সাম্বার অর্ডার করে আনায়।

তাদের দুজনের মধ্যে খুবই সুন্দর বোঝাপড়া আছে। যে যার মা ও বাবার খরচ বহন করে। দুজনেই তাঁদের মা বাবা দের একটি মাত্র করে সন্তান হওয়ায় নিজের নিজের মায়েদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ট। এই কোভিড-এর সময় সিঙ্গাপুরের অবস্থা অনেকটা ভালো, কিন্তু ইন্ডিয়ার খবর রোজ রোজ ক্রমশঃ খারাপের থেকে খারাপ হচ্ছে, তাই তারা বাবা মা কে ওই রোগের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেদের কাছেই খুব যত্নে ও আনন্দে রাখতে চায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে নানান সমস্যা শুরু হল। ক্রমশঃ দুই প্রদেশ থেকে আগত দুই ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন আচার এবং আচরণে, খাওয়া পরার ট্রেডিশনএ-ও কালচারে অভ্যস্ত মা বাবাদের অসুবিধেগুলো সামনে আসতে লাগল, মাত্র কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ এই বয়সে অন্য পরিবারের সঙ্গে থাকা যায়, কিন্তু মাসের পর মাস তো সম্ভব হয় না। – এটা দুই বৃদ্ধ দম্পতির মনের কথা। ভেঙ্কটবাবু ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা হাত দিয়ে ভাতে তরকারী ‘সাম্বার ডাল’ এবং তার সাথে দই মেখে বেশ সপ সপ করে মুখে আওয়াজ করে খেয়ে তৃপ্তি পান। এর মধ্যে তো লজ্জার কিছু নেই। এইভাবেই তাঁরা ছোট থেকে তেঁতুল বা নারকেলের চাটনি খেতে শিখেছেন, এতেই তাঁদের পেট ও মন ভরে। কিন্তু কমলেশ-এর মা বাবা সব সময় চামচ দিয়ে ভাতের ওপর একটু চাপ চাপ রাজমা, চানা বা ছাল শুদ্ধ মুগ / মুসুরের ডাল ছড়িয়ে খেতে ভালোবাসেন। তাঁদের যে কোন তরকারী সে ভিন্ডি(ঢেঁড়স) বা তরী(ঝিঙে) বা ঘিয়া(লাউ) হোক না কেন, বেশ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটো, লঙ্কা বা গরম মসলা দিয়ে রেঁধে খেতে তাঁরা অভ্যস্ত। করলার ভরুয়া কিংবা আরবিকেও (কচু) তাঁরা বেশ চটপটি বানাতে পারেন। তার সাথে স্যালাড বা রায়তা’তে বেশ শশা, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা দেওয়া  চাই। দুই ভদ্রমহিলাই ভাল রাঁধুনি ছিলেন নিজের নিজের পরিবারে। সুগৃহিনী রূপে নাম কামিয়েছেন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। তাঁরা বাইরে কাজ করতে যাননি, রান্নার লোক রাখেননি, নিজেরা খুব যত্ন সহকারে সংসারের খুঁটিনাটি সব জিনিষ সাজিয়েছেন, নিজেরাই মসলা পিশে, সব্জি কেটে, ধুয়ে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে ঘরের কাজ সম্পন্ন করতেন। তাই এখানে বিদেশী মেয়েদের হাতের রান্না তাদের মুখে রোচে না। দুজনেই এখন রান্না ঘরে ঢুকতে বা রান্নার তদারকিতে ব্যস্ত থাকতে চান। কিন্তু তাঁদের মেয়ে ও ছেলে মায়েদের সাবধান করে দিয়েছেন, – এখানে অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের সরকার ভীষণ কড়াকড়ি ভাবে নজর রাখে কাজের লোকেদের ও মালিকদের ওপর।

দেশে যেমন কাজের লোককে তুই বলে সম্বোধন করা যায়, বা যখন যেমন তখন তেমন ভাবে কাজ নেওয়া হয় – এখানে সে সব একেবারেই চলবে না। রোজ মাছ, মাংস, ডিম, নুডুলস, ভাত ওদের নিজেদের মুখের স্বাদের মতন বানিয়ে, যাতে ওরা খায়, সেদিকে ও খেয়াল রাখতে হবে। দুই মায়েরই এ ব্যাপারে এক মত, যে “তোমরা এদের বড্ডো বেশি প্রশ্রয় দাও।” বৌমা ছেলে খুব হাসে। – বলে ‘না হলে এখানে ফাইন লেগে যাবে। কোন একটা অভিযোগ পেলে আমরা প্রবলেমে পড়ে যাব। ঝি চাকরদের জ্বালাতন করলে শাস্তিও পেতে হয়, ওদের ত্রুটি সরকার বা ওদের ‘এজেন্সি’ একেবারে বরদাস্ত করবে না। সে রকম অভিযোগ গেলে আমাদেরকে চাকরিও খোয়াতে হতে পারে। অতএব দেশের মতন কথায় কথায় ‘ঝি-চাকরদের’ বকা ঝকা করা, দোষ দেওয়ার অভ্যাস এখানে ছাড়তে হবে। সুতরাং মায়েদের মুখে কুলুপ পড়ে গেছে। বাবারাও বেশিরভাগ সময় খেলা বা রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় সময় কাটান, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে ভেঙ্কটবাবু ভীষণ রকমের মোদী ভক্ত, হিন্দুত্ববাদকে প্রাধান্য দেন, কিন্তু কাপুর সাহেব ঠিক তার উল্টো কথা বলেন। ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে তিনি একটু বেশি সোচ্চার। পুজোপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ এসব তাঁর ধাতে পোষায় না। মেয়ে পড়াশুনোয় খুব ভাল ছিল। ইংরেজি স্কুলে পড়াশুনো করায়, পাঞ্জাবী ভাষায় কথা বলে না, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রেমালাপ বা কলহ সবই চলে তাদের ইংরেজিতে। তাই শুধু নিজের মায়ের সঙ্গেই মাতৃভাষায় কথা বলে।

কোভিড ১৯ মহামারী তাদের চারজনকে সোনার খাঁচায় সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে রাখলেও কিন্তু তাঁরা ডানা ভাঙা পাখীদের মতন ডানা ঝাপটাতে লাগলেন। দেশের জমি, বাড়ি, ঘর, টাকাপয়সা, গয়নাগাটি ও আত্মীয়দের ভালোবাসার আকর্ষণটা তাদের দিনে দিনে তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হতে লাগল।

ছেলে ‘রঙ্গনাথ’ ও মেয়ে ‘কমলেশ’ ধীরে ধীরে বিরক্ত হতে আরম্ভ করল। বাড়িতে সারাদিন বসে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়, তাদের ফোনের পর ফোন কল আসে, ঘরে চারজন বুড়ো বুড়ি ঘুরে বেড়ান, কেউ জোরে কাশেন তো কেউ তার চেয়েও জোরে হাঁচেন। কেউ যখন তখন ধুম্রপানের সঙ্গে ড্রয়িং রুমে টিভির সামনে বসে ফুল স্পীডে খবর শুনতে ভালোবাসেন তো কেউ ফোনে Youtube এ গীতাপাঠ chanting শোনেন।

যে যার নিজের ভাষায় নিজেদের মধ্যে দেশে ফিরতে না পাড়ার জন্যে বা কখনও কখনও আত্মীয়দের মৃত্যু সংবাদে উতলা হয়ে জোরে জোরে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগেন। দুই দম্পতির মধ্যে সেই আগের মতন বন্ধুত্ব বা ভদ্রতা রক্ষার বালাই নেই।

ভেঙ্কটবাবুর স্ত্রী বিনীতা বৌমার মায়ের ব্যাপারে নিজেদের ভাষায় নিন্দা, টিপ্পনী করেন। ওনার আমিষ খাওয়া, জামাই মেয়ের সঙ্গে বসে বিয়ার বা ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দেওয়া, ওড়নি (চুনরি) গায়ে না দেওয়া, জোরে জোরে হাঁসা বা কথা বলা, এসব  কিছুই পছন্দ করেন না তাঁরা।  ওদিকে কাপুর সাহেব আবার ভেঙ্কটবাবুর খাটো করে ধুতি পরা, রোজ রোজ দুবেলা ভাত খাওয়া, পুজো পাঠে সময় কাটানো নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হাসি মজাক করতে ছাড়েন না। বয়স্ক লোকেদের এই judgmental হওয়া, অন্যের দোষ দেখা, নিজের নিজের ট্রেডিশন, ধর্ম ও অভ্যাসগুলোকে ভালো, ও অন্যদেরটি খারাপ ভাবার অভ্যেস কেউই ছাড়তে পারেন না। একটা ‘ইগো’ দিয়ে ঢাকা মেঘের আচ্ছাদনে, আবরণে থাকাটাকে শ্রেয় বলে মনে করেন। তাঁদের ছেলে মেয়েরা আলাদা ভাবে নিজের নিজের মা বাবাকে বোঝাতে থাকেন, কেন তোমরা চারজনে একসঙ্গে বসে তাস কিংবা ক্যারামবোর্ড খেল না। একদিন নর্থ ইন্ডিয়ান ও একদিন সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খাও, তাহলে ওই কাজের ফিলিপিন মেয়েটার কাজ হালকা হয়ে যাবে। না দুই মা-ই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উঠবেন, নাস্তা বানাবেন, রান্না করবেন আলাদা আলাদা বাসন ব্যবহার করে। . . . .

হটাৎ একদিন বিনীতা দেবীর পেটে অসম্ভব যন্ত্রনা শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার দেখলেন নানা টেস্ট হল, জানা গেল,’ক্যান্সার’। আগেও তাঁর ব্রেস্ট ক্যানসারের অপারেশন হয়েছিল, বোঝা গেল পুরোনো রোগের বীজ পেটেও ছড়িয়ে গেছে। অনেক খরচ করে কেমো দিয়ে সেবা যত্নের ত্রুটি না হওয়া সত্বেও ছয় মাসের বেশী বাঁচানো গেল না তাঁকে। স্বামী ভেঙ্কটেশ বাবুর  মনে যতই কষ্ট হোক, একটা সান্ত্বনা রইল যে, তিনিও তার স্ত্রীকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই করেছেন। ছেলের ও বৌমার সেবা তো অতুলনীয়। দেশে থাকলে হয়ত কোভিড হয়ে বিনা চিকিৎসায় বিনীতা মারা যেতেন। ভেঙ্কটবাবু অসহায় হয়ে একা কি করতেন সেখানে? ভেবে পান না। এখানে মায়ের দাহ ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম ছেলে নিজের হাতে সম্পন্ন করতেও সক্ষম হল। হিন্দু ধর্মের এইসব নিয়মকানুন মা খুব মানতেন, তাই তামিলভাষী পুরোহিত, মন্দির ও সমুদ্রের মাঝে সরকার নির্দেশিত এক বিশেষ দ্বীপে গিয়ে মায়ের ভস্ম‌ বিসর্জন করে সে ও তার বাবা ভেঙ্কটবাবু খুব শান্তি পেলেন। এখন দুই বৃদ্ধই চুপচাপ গুমসুম হয়ে থাকেন। ভেঙ্কটবাবু স্ত্রীর শোকে এবং কাপুর সাহেব দেশের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে, নিজের জমির গম বিক্রির চিন্তায়। বহু কষ্টে তিনি ঐ ফলের বাগান, চাষের জমি, কাপাস তুলোর ক্ষেতগুলি একটি একটি করে কিনেছিলেন। এখন বিহার থেকে আগত সব শ্রমিকরা সে সব ছেড়ে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছেন। প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে রোজ কোন না কোন অসুখের খবর শুনতে শুনতে তিনিও যেন কেমন বোবা হয়ে গেছেন। সামনে বেয়ানের ঐ ক্যান্সারের পেছনে তাঁর মেয়ে ও জামাইয়ের প্রায় ৭০/৮০ লক্ষ টাকা খরচ হতে দেখে আরও ঘাবড়ে গেছেন। এখানে মেডিক্যালের জন্য খরচ করতে গিয়ে লোকে ফতুর হয়ে যায়। যাঁরা এখানের নাগরিক তাদের সব বিনামূল্যে হয়। কিন্তু তারা Long Term Visa নিয়ে বেড়াতে বা সন্তানের বাড়ি থাকবার ছাড়পত্র পেয়েছেন, তাঁদের সব ব্যায় ভার নিজেদেরই বহন করতে হয়। আমাদের দেশের মতন এখানে অলিতে গলিতে ডাক্তার বসে না। ‘প্যাথলজির’ জন্যে ওখানে বহু সরকারী বেসরকারী ল্যাব পাওয়া যায়। এখন আবার ওনাদের যদি কিছু হয় তো কি হবে? কেউ এবারে কোন ইন্সুরেন্স (বীমা) করে আসতেও পারেননি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য আসার ইচ্ছে ছিল তাঁদের।

ক’দিন আগে পর্যন্ত বেয়াই ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে তর্ক করে বেশ আনন্দ উপভোগ করতেন, মিঃ কাপুর এখন স্ত্রী হারা শোকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষটিকে দেখলে বড় মায়া লাগছে তাঁর। খালি মনে হচ্ছে এই ‘কোভিড’ এর প্রকোপ কবে কাটবে এবং তারা দেশে ফিরতে পারবেন। একটা অচেনা ভয়-ভাবনা-বিষন্নতা তাঁকে পেয়ে বসেছে। যদি তাঁর স্ত্রীও এমনি করে হটাৎ চলে যান, তাহলে কে তাঁকে দেখবে? পত্নী তাঁকে সারাজীবন হাতে হাতে সব এগিয়ে দেন, সুস্বাদু রান্না করে খাওয়ান, গরমের সময় বিয়ার এনে দেন, রাত্রে ডিনারের পরে নিজেদের বারান্দায় বেডরুমে বসে তাঁরা ওয়াইন পান করেন দুজনে মিলে, ভেঙ্কটবাবুর মতন মন্ত্র বলা পুজো পাঠে মন লাগানো তাঁর পক্ষে তো সম্ভব নয় – এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁর ঘুম হয় না। বুকে ব্যাথা করে। ঠিক এসময়েই দিল্লী থেকে তাঁর ছোট ভাইয়ের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার খবর এল। এই ভাইকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন, ইনি তাঁর গ্রামে মাঝে মাঝে যেতেন, অমৃতসরের জমিজমার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাই কাপুর সাহেব কিছুটা নিশ্চিন্তেও ছিলেন, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় কোনো হাসপাতালে যেতে না পারায় ঘরের কোনে একা নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হল। তাঁর স্ত্রীও তখন পাঞ্জাবের গ্রামের বাড়িতে, অতএব পাড়ার লোক ও ডেলিভারি বয়, ফল, সব্জি দিতে এসে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। তারা ফোন দেখে গ্রামের লোককে খোঁজ করে। এখানে খবর দেয়। দিল্লীর গুরুদ্বারে খবর ফোন করে ঠিকানা দিলে তারা গিয়ে শব নিয়ে আসে। কোনো শ্বশ্মানেও তখন জায়গা খালি নেই, গুরুদ্বারের পার্কিংএ অচেনা অজানা লোকেরা তাঁকে পোড়াবার ব্যবস্থা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভীষণ শোকাহত হয়ে পড়েন কমলেশ এর বাবা মি. কাপুর। কখনও স্ত্রী কিরণ অথবা মেয়ে কমলেশ এর কোলে মুখ রেখে শিশুর মতন ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে থাকেন। তাঁকে এমনভাবে ভেঙে পড়তে বা বিচলিত হতে জীবনে কেউ দেখেনি। রাত্রে ভয় পান বলেন, এবার তোমার পালা ‘কিরণ’, তুমিও রঙ্গনাথের মায়ের মতন ছেড়ে যাবে আমায়। এই বিদেশ বিভুঁয়ে আমি একা কেমন করে থাকবো। স্ত্রী অনেক বোঝান, মেয়ে বলে, ইন্ডিয়ার অবস্থা একটু ভালো হলেই তোমায় ‘বন্দে ভারত’ প্লেনে পাঠিয়ে দেব। এখন ওখানে গিয়ে তোমাদের একজনের কিছু ঘটলে কে সামলাবে, অন্যজনও অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। দেখলে তো চাচাজীর কি অবস্থা হল, আমি এই অবস্থায় কিছুতেই পাঠাতে পারবো না।

বাড়ির পরিবেশটা ক্রমশঃ নৈরাশ্যজনক শোচনীয় হয়ে উঠলো, – এবার জামাই রঙ্গনাথও বিরক্ত হয়ে উঠলেন। একে তো তার মায়ের শোক, তার ওপর এই কান্নাকাটি, বাচ্চার মতন শ্বশুর কে বোঝানো, প্রায়ই সে বেরিয়ে যেত বাইক (সাইকেল) নিয়ে। এখানে নদী সমুদ্রের ধার দিয়ে সুন্দর সাইকেল ট্র্যাক (পথ) বানানো আছে। সারারাত ছেলে মেয়েরা সেখানে দলে দলে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের নিরাপত্তার যেমন ভয় নেই, তেমনি ভয় নেই চোর ছ্যাচড় বা ছিনতাইকারীর উৎপাত। সরকারের শাস্তি, নিয়মকানুন এতো কড়া, যে কারো কোন অপকর্ম করতে সাহসও হয় না। তারমধ্যেও যদি কেউ বাসে ট্রেনে কাউকে একা পেয়ে বিরক্ত করে, সঙ্গে সঙ্গে ধরে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেত্রাঘাতের সঙ্গে কারাবাস। রাস্তায় একটু নোংরা করা, থুতু ফেলা বা মাস্ক না পরার জন্যে, হোটেলের ঘরে কিংবা জাহাজের ‘ক্রুসে’ বসে একসঙ্গে আড্ডা মারলেও অনেক ডলার ফাইন দিতে হয়।

তাই সারাদিন Work Form Home করে রাত্রে রোদের তাপ কমলে সবাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বুড়ো-বুড়িরাও একা একা হেঁটে চলেন, আপনমনে। সেদিনও বিকেল বেলায় মিস্টার ও মিসেস কাপুর বেড়াতে বেড়িয়েছেন। কিরণ ভারী শরীর ও হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে বেশী হাঁটতে পারেন না। বাগানের বেঞ্চে বসে পড়লেন তিনি, সূর্যাস্তের সোনালী আলোয় নদীর জলও ঝলমল করছে। কাপুর সাহেব বললেন, আমি আগে ব্যারাজ পর্যন্ত হেঁটে আসছি, তুমি এখানেই বসো, সাতটা পর্যন্ত ফিরে একসঙ্গে বাড়ি যাব। কিন্তু ৭টা থেকে ৮টা/৯টা হয়ে গেলেও তাঁর দেখা নেই। স্ত্রী কিরণ বাড়ি ফিরে এলেন, যদি তিনি আগেই অন্য কোন দিক দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কিন্তু না, ১০টার পর মেয়ে ও জামাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মেরিনা ব্যারেজের দিকে। আর বেঙ্কটবাবু সুইমিং পুলের পাশে বসে থাকা যত ইন্ডিয়ান বৃদ্ধদের পেলেন, সবাইকে জিজ্ঞেস করে বেড়াতে লাগলেন, কেউ মিস্টার কাপুরকে দেখেছেন কিনা। হটাৎ একজন চৌকিদার এসে খবর দিলেন, পুলিশের গাড়ি ও একটা এম্বুলেন্স আসতে দেখেছেন তাঁরা ঐ রাস্তায়।

কিছুক্ষন পরে জানা গেল কমলেশের বাবা মিস্টার কাপুর হটাৎ হার্ট অ্যাটাক করে রাস্তায় পড়ে ছিলেন, পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায় – কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি তারা। কারণ ফোনটিও সঙ্গে  নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছেন তিনি। কারোর সঙ্গে শেষ দেখাও তাঁর আর হল না। স্ত্রী চলে যাওয়ার আতঙ্কে থাকতে থাকতে সুস্থ সবল মানুষটি নিজেই এরকমভাবে হটাৎ চলে যাবেন, – এ কথা কেউ ভাবতেও পারেনি। এই আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বাড়িটা শোকে দুঃখে একেবারে শোকাচ্ছন্ন হয়ে রইল। কয়েক মাসের মধ্যে ছেলেটি মা কে এবং মেয়েটি বাবাকে হারিয়ে ভাষাহারা নির্বাক মূর্ত্তি হয়ে বসে রইল। কাজ কিন্তু তাদের বন্ধ রাখা চলবে না।

এই মহামারী এখন সারা বিশ্বকে শিখিয়েছে, বিষাদ ভাবনা ভুলে কিভাবে বিপদের মধ্যেও স্থির হয়ে কাজ করে যেতে হয়। Work form home, online dealing, বিদেশী কোম্পানির ব্যাঙ্কে বা আমদানি রপ্তানির কেনা বেচার কাজ তো বন্ধ থাকবে না। এই দেশটার তো নিজের কোনো ক্ষেত বা জমি, চাষ আবাদ নেই, খাদ্য বস্তু – আনাজ, সব্জি ও ফল সবই আসে, যায় অন্য অন্য দেশ থেকে, তাই পণ্যবাহী জাহাজের আসা যাওয়া বন্ধ নেই। সুতরাং অনলাইন-এ সব বাণিজ্য টাকার লেন/দেন সবই চলতে থাকে।

যাঁরা ‘ম্যানেজার’ বা অফিসের ও জাহাজের কর্মী তাঁরা দিনরাত বাড়িতে বসেই কম্পিউটারে কাজ করে যান। তাই রঙ্গনাথ ও কমলেশ আবার ব্যস্ত হয়ে যেতে বাধ্য হলেন। শুধু ভেঙ্কট ও কিরণ দূরত্ব বজায় রেখে কোনোরকমে দিন কাটাতে লাগলেন। একই ব্যাথার ব্যাথী হয়ে জীবনসঙ্গী হারানোর দুর্দমনীয় কষ্ট বুকে চেপে – দুই দিকে দুই দেওয়ালে মুখ ঘুরিয়ে তাঁদের দিন কাটছে, এমন সময় জানা গেল, এই বড় প্রশস্ত এপার্টমেন্টটি ছাড়তে হবে তাঁদের। বাড়িওয়ালা ইন্দোনেশিয়ান বড় ট্যুরিস্ট গেস্ট হাউসের মালিক কিন্তু কোভিড-এ তাদের ওই ট্যুরিজিমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ভ্রমণ বিলাসীদের থেকে তাদের রমরমা ছিল। এখন এক বছর ধরে সব বন্ধ, কেউ আর কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন না। বর্ডারও সীল করে দেওয়া হয়েছে। তাই সিঙ্গাপুরের সিটিজেনরা সব দলে দলে চলে আসছেন বালি বা কম্বোডিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড থেকে। রঙ্গনাথ বহু চেষ্টা করেও কোথাও একটি বড় এপার্টমেন্ট জোগাড় করতে পারলেন না। শেষে ছোট ছোট দুটি ফ্ল্যাট পাওয়া গেল। কাজেই ভেঙ্কটবাবু ও কিরণ দেবী বাধ্য হলেন, এক সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে আস্তানা বাঁধতে। খুবই অসুবিধা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়লেন দুজনে।

ঠিক এইসময়ে তাঁদের নাতি রাঘবের আবার আবির্ভাব হল সিঙ্গাপুরে। সরকার একবছরের ট্রেনিং এর পর তাদের ফিরিয়ে এনেছে ১৪ দিন করেন্টাইনে থাকার পর সব পাইলট ট্রেনি ছেলেদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। তারপর তারা বাড়ি এসে দেখা করতে ও বাবা মায়ের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে আবার এয়ারফোর্স হোস্টেলে ফিরে যাবে। দূর থেকে সে সব খবরই পেয়েছে, মন খারাপও হয়েছে ক’দিন, কিন্তু আকাশে ওড়ার আনন্দ, পড়াশোনা ও নানা ব্যায়াম, খেলা ধুলায় ও শরীর চর্চার মধ্যে থাকে বলে মনটিকেও তার হালকা ঝরঝরে, বিষাদমুক্ত, নৈরাশ্যশূন্য আনন্দময় রাখতে হয়। গোটা বিশ্ব জগতের সব সম্প্রদায় বা বয়সের মানুষ গৃহবন্দী হয়ে এখন হতাশায় ভুগছেন। কিন্তু তাঁদের সবসময় শেখানো হচ্ছে যে পজেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গী নিয়ে চলতে হবে। জীবনের স্রোত তো থেমে থাকবে না। তাই এখানে দুই অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধার কাছে সে নতুন যুগের নতুন বার্তা বহন করে নিয়ে এল।

এ যুগের ছেলে মেয়েরা এত সুন্দর সহজ, কুসংস্কার মুক্ত, উদার যে তাদের সঙ্গ অদ্ভুত আলোড়ন তোলে, আগের জেনারেশন এর মানুষের মনে। তারা কোনও বাঁধা নিষেধ মানতে রাজী নয়। আবার জাত – পাত – ভাষা – ধর্ম – বর্ণ নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের সংকীর্ণ পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে অবিহিত করে। নিজেদের আবেগ ইচ্ছে ও পছন্দকে প্রাধান্য দেয় সবসময়। অন্যেরা কে কি ভাবছে বা ভাববে – সেই নিয়ে কখনও মাথা ঘামায় না। যে প্রফেশন অর্থাৎ জীবিকায় যেতে তাদের আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে, সেটি ছোট থেকেই ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং সেই interest ও skill নিয়ে আগে চলতে চায়, যে কোন ঘরে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে রুমমেট হয়ে থাকে। আলাদা আলাদা সময়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিজেদের খাবার বানায়, নিজের রুচি, ইচ্ছে অনুযায়ী এবং যা হাতের কাছে পেয়ে যায় তার ওপর নির্ভর করে। কেউ সিঙ্গাপুরের, কেউ কানাডা বা নিউজিল্যান্ড, হংকং বা ফ্রান্স – জার্মানির বাসিন্দা। এই সহ অবস্থানে তাদের কোন সমস্যাও হয় না, কেউ কারুর ব্যাপারে কখনও নাক গলায় না কিম্বা মন্তব্য – সমালোচনা বা কটূক্তিও করে না।

এই শিক্ষাই সে আজ দিতে চাইলো এই ভিন্ন মতাবিলম্বী ভিন্ন ধরণের খাওয়া পরায় অভ্যস্থ, দুই বৃদ্ধ দম্পতিকে। ছোট থেকেই সে প্রত্যেক বছর স্কুল ছুটি হলে মায়ের সঙ্গে পাঞ্জাবে ও বাবার সঙ্গে মাদ্রাজের গ্রামে গিয়ে খুব আনন্দে কাটিয়েছে। দুদিকের ‘কাজিন’ ভাই বোনেদের সবাই এখন হিন্দি সিনেমা দেখে মোটামুটি হিন্দি বোঝে ও বলে, ইংরেজি তো সবাই ভালোই জানে, তাই তাদের অসুবিধে হয় না। দুই দাদুই তার সাথে খুব খেলাধুলা করেছেন, তাঁদের জমি, বাগানে বেড়াতে, ট্রাক্টর চালাতে, মাছ ধরতে নিয়ে গেছেন। তার দুই দিদা’ (বা তাতা/ঠাকুমা/নানী) তাকে কতরকমের আচার, মিষ্টি ও রান্নায় মুখের স্বাদ বদলাতে ব্যস্ত থাকতেন।

পৃথক পৃথকভাবে তাঁরা দুজনেই খুব ভালো, সৎ, আদর্শবাদী, ট্রেডিশন বজায় রেখে জীবন কাটিয়েছেন, এবং দুই দম্পতিই ভীষণ স্নেহপ্রবণ – এটাই হয়তো grand parentsদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ। নাতির জন্য তাঁরা সবকিছু দিয়ে দিতে প্রস্তুত সবসময়। নিজেদের ছেলেমেয়েদের ব্যবহারে হয়ত ক্ষুন্ন হন, মান অভিমানের পালা চলে তাদের মধ্যে, কারন পিতা পুত্র বা মাতা কন্যার কাছে একটা expectation একটা চাওয়া/পাওয়া আশা আকাঙ্খার কথা থাকে। কিন্তু নাতির সঙ্গে অন্য সম্পর্ক, তার জন্য আলাদা এক জায়গা সৃষ্টি হয়েছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মনে।

তাই ‘রাঘব’ সিঙ্গাপুরে এসে তার বাবা মা কে জানালো – সে ঐ নানী – দাদার এপার্টমেন্ট-এ থাকবে ক’টা দিন। খাওয়া দাওয়া সবাই মিলে একসঙ্গে করবে, নতুন নতুন দেশের ডিশ বানিয়ে। ওদের ওই বিষন্ন – গুমোট – হতাশাব্যাঞ্জক ঘরের পরিবেশটি তাকে বদলে দিয়ে যেতেই হবে। এ জন্য সে একটা প্রজেক্ট প্ল্যানও বানিয়ে ফেলল।

প্রথমে জানতে চেষ্টা করলো – কি কি বিষয়ে দাদু ও নানীর মিল আছে। দেখলো দুজনেই বসে একা একা সময় কাটান তাসের কার্ড নিয়ে। কারন, দুজনেই অল্প বয়সে তাস খেলা জানতেন। তারপর তাঁরা দুজনই বাগান করতে, বেড়াতে ভালোবাসেন, রাঘব এবার নিজের এক বন্ধুকে নিয়ে এল একদিন সবাই মিলে তাসের ম্যাজিক দেখাতে। ভালো সিনেমা দেখার জন্য  NETFLIX ,আমাজন লাগিয়ে দিল। দুজনকেই YouTube এ নানান অনুষ্ঠান, গান, নাটক ও আলোচনা শুনতে উৎসাহ দিল। দুজনের জন্যই ভাল দুটো ‘আই প্যাড’ এবং কানে লাগিয়ে শোনবার জন্য  কিনে নিয়ে এল ‘এয়ার ফোন’। তাতে অনেকটা সময় সকাল সন্ধ্যে তারা নিজের নিজের ভাষায় spiritual আলোচনা শুনতে শিখলেন। কিরণ কাপুর ৬৫ বছর বয়সে আবার পাকিস্তানী নাটক ও গুরুদ্বারের বানী,/প্রবচণ ও ‘শবদ-কীর্তণ’ শুনতে লাগলেন, মন দিয়ে। ‘ভেঙ্কটবাবু’ গীতা chanting করতে লাগলেন, তামিল ভাষায় তার অর্থ অনুধাবনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। মাঝে মাঝে ট্যাক্সি ডেকে নাতি তাঁদের নানা Indian Temple ও গুরুদ্বারা ঘোরালো। এরপর রাঘবের এক বাঙালি বান্ধবীর মা বাবার সঙ্গে ভেঙ্কট ও কিরণকে একদিন সে নিয়ে গেল ”রামকৃষ্ণ মিশনে।”

সিঙ্গাপুরে এমন একটি সুন্দর প্রার্থনার কেন্দ্র আছে, যেখানে তামিল, হিন্দি ও ইংরেজীতে এতো সুন্দর করে শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রীশ্রী মা ও বিবেকানন্দের কথা আলোচনা হয়, তাঁদের সম্বন্ধে লেখা বই পাওয়া যায়, ভজন, আরতি এবং একাদশীর দিনে রাম নাম সঙ্কীর্তণ শোনা যায় – কথামৃতের বাণী আলোচনা হয় – তা তাঁদের জানা ছিল না। এইসব পেয়ে মনের জানালাগুলো যেন খুলে যেতে লাগল, দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার। একই বাড়িতে রুমমেটের মতন নতুন ভাবে থাকার এক অন্য অধ্যায় শুরু হল, তাঁদের জীবনে। দুই ডানা ভাঙা পাখী খাঁচা খুলে বাইরে এলো। ক’দিন পরেই নাতি চলে গেল, দুজনের জীবনে অদ্ভুৎ এক ‘ধামাকা’, করে, যেন তাঁদের হৃদয় মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়ে আবার কানাডায় তার ট্রেনিংয়ে।

এদিকে উড়তে না পারলেও দাঁড়ে বসে তারা যেন পোষা তোতার মতন আপন আপন জগতে সুখে জীবন কাটানোর পদ্ধতিটা একটু একটু শিখতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ‘রাঘবের’ বাঙালি বান্ধবীর বাবা রোজ এসে ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে morning walk এবং evening walk এ যান। মাও কিরণ কাপুর আর পাঁচজন প্রায় সমবয়সী বন্ধু মহিলার সঙ্গে বাগানে বেড়াতে যান। দেশে কখনও একসঙ্গে মনিটর লিজার্ড বা গোসাপ, কচ্ছপ, বন্য মোরগ ঘুরে বেড়াতে দেখেননি। অটার্স বা ভোঁদড়ের মতন প্রাণী যে নির্ভয়ে সমুদ্র নদী থেকে বেরিয়ে বাগানের বৃষ্টির জলে ভরা পদ্ম পুকুরে লাফায় – ঝাপায়, সাঁতার কাটে কচ্ছপদের সঙ্গে, আগে কখনও জানতেনও না। গাছের তলায় অজস্র আমলকী, কুল, কামরাঙ্গা ও তাল পড়ে থাকে, অনেক মহিলা কুড়িয়ে নিয়ে যান। পাঞ্জাবের গ্রামে এসব গাছ বা ফলের স্বাদ তিনি কখনও পাননি। তাই প্রকৃতির মাঝে যেন এক কিশোরী বালিকা হয়ে গেছেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে একই দিনে চাররকমের ঋতুর লীলা চলে। সকালে ঠিক বসন্ত কালের মতন কোকিল ডাকে তো বিকেলে বর্ষায় ব্যাঙের গান শোনা যায়। দুপুরে একটু গরম, রাত্রে একটু ঠান্ডা হাওয়া বয়। তাদের ঐ পাঞ্জাবের মতন extreme climate অত্যন্ত অসহ্য লু’চলা গরম বা হাঁড় কাঁপানো শীতের উগ্রতা বা তীব্রতাও নেই এখানে। আস্তে আস্তে জায়গাটা ভালও লাগতে আরম্ভ হল ঐ পাঞ্জাবের মায়ের।

কোভিড ১৯ এর আরম্ভে জীবন যতটা অসহনীয় বোঝা হয়ে উঠেছিল, এখন আর তা মনে হয় না। ভেঙ্কটের সঙ্গে বেয়াই /বেয়ান সম্পর্কের বাঁধনটা আলগা হয়ে যাচ্ছে। আকাশের ভাসমান কালো সাদা মেঘের মতন তাঁরাও দুই বন্ধু  ভাসতে ভাসতে মোহনার দিকে ধীরে ধীরে ক্রমশঃ এগিয়ে চলতে লাগলেন নতুন খেয়া বেয়ে।

একদিন মিসেস কিরণ কাপুর east coast এ ভোর বেলায় বেড়াতে গিয়ে দেখলেন ষাট উর্ধের বয়স্ক মেয়েরা যোগ ব্যায়াম করছেন। সূর্যাস্তের আলোয় তাঁদের মুখ চুলে সোনালী রং ধরেছে। সমুদ্রের শীতল হাওয়ায় দেহ মন স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জলের স্রোতে পণ্যবাহী জাহাজগুলি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল,  তিনি তো মাত্র পঁয়ষট্টি, কত ৭৫/৮০ বছরের মহিলারা একসঙ্গে প্রাণায়াম ও ব্যায়াম করছেন, আগ্রহভরে তাঁকেও ঐ দলে যুক্ত হতে হবে। কাছে গিয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করতেই সাদরে আহ্বান জানালেন তাঁরা।

দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেল কিরণের। একটা নতুন ভালোলাগা ও উদ্যম জাগলো তাঁর মনে। এদিকে ঘরে তরুণ নাতি রাঘবের প্রাণচাঞ্চল্য তার সমস্ত হতাশা কাটিয়ে দিতে সাহায্য করল ভেঙ্কটেশ বাবুর। বৌমা কমলেশও খুশি হলেন তাঁদের পরিবর্তন দেখে।  ভেঙ্কটপ্রসাদ তাঁর ছেলের সাইকেলটি নিয়ে চালাতে চালাতে নদীর ধার দিয়ে বহুদূরে চলে যেতে যেতে এক মুক্তির স্বাদ পেতে থাকেন। প্রথম দিনেই নাতি তাঁকে সাবধান করেছিল, বিনা হেলমেটে সাইকেল না চালাতে, কিন্তু তিনি সেই কথাটি ভুলে যান। একদিন রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা একটি  বন্য মোরগ দেখে অণ্যমনস্ক হতেই পড়ে গেলেন, মাথায় চোট লাগল ভীষণ জোরে। কিছুক্ষন যেন বুঝতেই পারলেন না, কি হল, পড়ে উঠতে চেষ্টা করেও পারলেন না। পকেট থেকে ফোন বের করে একটি ছেলেকে মেলাতে দিলেন। প্রথমে ছেলে রঙ্গনাথকে ডাকতে চেষ্টা করলেন, অফিসের অন কল-এ সে এখন ব্যস্ত আছে। বৌমা কমলেশের ফোনটিও এই সময়ে Silent mode এ থাকে। সারা রাত সে আমেরিকার অফিসের সঙ্গে zoom এ মিটিং করে, তাই সকালে একটু ঘুমোয়। ডাকলে পাওয়া যাবে না। একটু সংকোচ হলেও ফোন করলেন বেয়ান কিরণ দেবীকে।

কিছুক্ষনের মধ্যে তিনি তাঁর যোগা / ব্যায়াম গ্রূপের লোক জন দের  নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলেন সেখানে। ততক্ষনে আরও অনেক সাইকেল আরোহী ও পথচারী তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে, পাশের ঘাসে শুইয়ে দিয়ে জল খাইয়ে কিছুটা সুস্থ করেছে। বাঁ চোখে ভীষণ ব্যাথা করছে তাঁর, চোখ খুলতেও পারছেন না। একজন তরুণ ছেলে রুমালটা তাঁর কপালে চেপে ধরে আছে, মনে হয় কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়েছে।

মেরিনা ব্যারাজ ও কালাং নদী ধরে সবসময় সরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা ব্যাটারি চালিত গাড়ি নিয়ে টহল দিতে থাকেন। পথচারীরা মাস্ক না পরলে সাবধান করেন, ছবি তুলে নেন। তাদের একটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, ভেঙ্কটবাবুর সামনে। পথচারী দের সাহায্য করা তাঁদের কাজ।

কিরণদেবী এসেই তাঁকে ঐ গাড়িতে তুলে নিলেন কয়েকজন যুবকের সাহায্যে তারপর ‘কালান- মলের’ প্রায় কাছাকাছি এসে সিকিউরিটির লোকেদের অনুরোধ করলেন এম্বুলেন্সকে খবর দিতে। মেয়ে বা জামাইকে বিরক্ত না করে তাঁকে প্রথমেই কোনো ডাক্তারখানায় – হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফার্স্টএইড দেওয়াটা বেশী প্রয়োজন মনে হল তাঁর। তিনি বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও স্মার্ট। পাঞ্জাবের জমিতে ট্র্যাক্টর ও চালিয়েছেন, নিজের বাগানে কোদাল দিয়ে মাটিও কুপিয়েছেন। শরীর ও তাঁর খুব পুষ্ট এবং মনের বল যে অন্যান্য ভারতীয় গৃহবধূর থেকে বেশী আজ এই সক্রিয় ভূমিকায় তাঁর প্রত্যুৎমন্নমতি ব্যবহারে সেটা প্রকাশ পেল। যন্ত্রনা কাতর অসহায় ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ভেঙ্কট বাবু আজ সেটা বুঝতে পারলেন। ঐ সিকুরিটি গার্ড তাঁর ছেলেকেও মেসেজ করে দিলেন এবং ওনাদের সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলেন। প্রথমেই তাঁরা কপালের কাটাটিতে স্টিচ করলো, কারণ রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। তারপরে চোখের ওপরেও একটা কালো পট্টি লাগিয়ে দিল টেপ দিয়ে, ডাক্তারবাবু সেখানেও হেমারেজ লক্ষ করেছেন। ডান হাত ও বাঁ পায়ের গোড়ালীতে ভীষণ ব্যাথা শুরু হয়েছে। কুনুইটি ফুলে উঠেছে, গলার সঙ্গে বেঁধে ডাক্তার বললেন, X-ray করাতে। কিরণদেবী ওনার সঙ্গে সঙ্গে চললেন। হুইল চেয়ারে করে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় তাঁকে নিয়ে এল, সেই X-ray ডিপার্টমেন্টে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তাঁকে, কিরণ ততক্ষনে পাশের ক্যান্টিন থেকে চা ও বিস্কুট এনে খাওয়ালেন, তাঁর বেয়াইকে। নিজেও একটা কেক ও কফি খেলেন। কেকে ডিম থাকায় ঐ নিরামিষী খেতে অভ্যস্থ ভেঙ্কটকে দিলেন না। আজ তিনি ঐ ভদ্রমহিলার উপস্থিত বুদ্ধি ও মমতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন দুর্ঘটনায় আহত বৃদ্ধ মানুষটি। কিছুক্ষন পরে রিপোর্ট এলে দেখা গেল কনুইয়ের হাঁড় সরে গেছে এবং পায়ের পাতার ঠিক গোড়ালীর কাছটায় লিগামেন্ট  ফেটে যাওয়ায় অত ব্যাথা হচ্ছে। হাতে প্লাস্টার চড়ল পায়ে একটা ব্যাথা কমানোর চওড়া টেপ লাগল। ততক্ষণে তাঁর ছেলে রঙ্গনাথও এসে গেল। একদিকে কোভিড-এর ভয়, অন্যদিকে এই দুর্ঘটনা, কয়েকমাসের মধ্যেই দুজন বাবা মায়ের মৃত্যু – সব যেন কেমন গোলমেলে করে দিল তাঁদের সবাইকার জীবন।

এদিকে কাজের মেয়েটি হটাৎ গভমেন্টের ‘MOM’ বিভাগ থেকে নোটিশ পেল তখুনি বাড়ি ছেড়ে গিয়ে সরকারী কোরেন্টাইনে সেন্টারে গিয়ে পৌঁছাতে, ১৪ দিন তাকে আলাদা থাকতে হবে। তিনবার কোভিড টেস্ট হবে। রবিবার সে যে migrated labourদের সাথে সময় কাটিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে। অতএব তার সংশ্রবে যারা যারা এসেছিল, তাদের চিহ্নিত করে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে এইসব কাজের লোকেদের ওপর খুব খেয়াল রাখে সরকারী দপ্তর। তাদের ওষুধ ইনজেকশন সময়মত দেওয়া হয়। ৬ মাস অন্তর pregnancy টেস্ট হয়। নজর রাখা হয়, তারা ছুটির দিন কোথায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইনস ও শ্রীলংকা থেকে এরা আসেন। মালিক কেমন ব্যবহার করেন, ফল, দুধ, মাছ, মাংস খেতে দেন কিনা, সেদিকেও সরকারী দপ্তর ও বিভিন্ন এজেন্সী খবর নেয়। এখন দু সপ্তাহ তার ছুটি ।সরকারী খরচে সরকারি  জায়গায় আরামেই থাকবে সে।

অতএব এখন রান্না-বান্না, ও ভেঙ্কটবাবুকে খাওয়ানো দেখাশোনা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন কমলেশের মা। ছেলে রঙ্গনাথ তাঁকে বাথরুম পায়খানা করানোর কাজটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সুষ্ঠ ভাবে করতে লাগল। মা হারানোর পর বাবাকে সে আরো বেশী করে ভালোবাসতে শিখলো। বৌমা কমলেশ তাঁকে রোজ স্পঞ্জ করে দেয়। তাঁর বিছানার চাদর ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, ভ্যাকুম করে ধুলো শূন্য করা বা সব্জি, ফল, দুধ, ব্রেড ইত্যাদি যাবতীয় সামগ্রী অর্ডার দেওয়া, সেগুলি এলে ভালোভাবে সোডার বা গরম জলে ধোয়া বাইরে রোদে দিয়ে তারপর ফ্রিজে তোলার কাজটিতে মন দিল। প্রত্যেকটি দ্রব্য সামগ্রীকে সে স্যানেটাইজ করে, যাতে কোন জীবাণু না থাকে তাতে। তার সেবা, নিষ্ঠা ভরে কাজ করা গোছানো এবং পুরো পরিবারের খুঁটিনাটি সব প্রয়োজন পূরণ করা – অর্গানাইজ করার দক্ষতা দেখে ভেঙ্কট, কিরণ এবং তার স্বামী রঙ্গনাথও ভীষণ অবাক হয়ে গেল।

ভীষণভাবে বিস্মিত হল তাদের প্রতিবেশী যারা একই এপার্টমেন্টে বাস করেন এবং এতদিন ঐ দক্ষিণ ভারত উত্তর ভারতের চার বৃদ্ধ – বৃদ্ধা, ছেলে, মেয়ে, নাতি – সকলের একসঙ্গে বাস করা নিয়ে তাঁরা সবাই আলোচনা করতেন, ও কৌতুক বোধ করতেন। একটা বিরাট ঢেউ বা ঝড়ের ধাক্কায় আজ যখন সকলে এক হয়ে আনন্দে একসাথে বসবাস করছেন, তখন বিস্ময়ে তাঁরা হতবাক হয়ে গেলেন।

কিরণ তাঁকে নিজের বড় ভাই মনে করছে, ছেলের বৌ একেবারে মেয়ে তথা কন্যারুপী নার্স হয়ে তাঁকে সবসময় এমন যত্নে রেখেছে, যেন তিনি বৃদ্ধ নন, একটি ছোট্ট শিশু। ছেলে যেভাবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে তার ডাইপার পাল্টাচ্ছে – মলমূত্র পরিষ্কার করছে – অবলীলাক্রমে তা তাঁকে এক স্বর্গীয় আনন্দধামে পৌঁছে দিয়েছে। কিরণ এখন টিভি দেখার সময় পান না, সব সময় তাঁকে গীতা chanting কিম্বা সদ্গুরুর ভাষণ শোনাবার জন্যে ল্যাপটপে ইউটউব চালিয়ে তাঁর কানে এয়ার ফোনটি লাগিয়ে দিয়ে যান। ঠিক সময়মত ওষুধ পত্র – জল – ফল সব খাওয়াতে থাকেন। ভেঙ্কটবাবুর মনে হয় অনেকদিন পরে তিনি যেন এদের মধ্যে দিয়ে নিজের শৈশবের সেই একান্নবর্তী পরিবারে মা, বাবা ও বোনের কাছে আবার ফিরে গেছেন।

একদিন মনে হল শুধু গীতা পড়ে – সাধুদের প্রবচন শুনে কি হবে – তা যদি নিজেদের জীবনে পরিবারের, প্রতিবেশী সমাজের আর পাঁচজন মানুষের জন্য কার্যকরী না করা যায়। Theory যুক্ত জ্ঞান গর্ভ বক্তৃতা বা পাঠ অধ্যয়ন ধর্ম পুস্তকের বিদ্যা অওড়ালে তো চলবে না প্রতিটি অধ্যায় জীবনের প্রত্যেক পর্বে সেই সব বক্তব্যকে Implement করলে তবেই তো স্বাক্ষরতা আসবে।

লকডাউন-এ দুর্ঘটনাতে ও মৃত্যশোকে তাঁর আজ এক নতুন বোধোদয় হ’ল। দেশে তাঁর যত বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা, সম্পত্তি আছে সব তিনি দূঃস্থ গরিব মানুষের সেবায় লাগাবেন, বিভিন্ন অনাথ আশ্রম হাসপাতাল, গ্রামের বিদ্যালয়ে দান করবেন ঠিক করলেন। কিরণ একদিন জানালেন তাঁর সব জমি জমা গরিব কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সু অভিপ্রায়ের কথা।

চোখ ভালও হয়ে গেল, কিন্তু পায়ের ব্যাথা তখনও কমেনি, হাতের প্লাস্টারটিও খোলা হয়নি, কিরণ মেয়েকে একটি হুইল চেয়ার অর্ডার করতে বললেন। অতি সাবধানে সেটিতে বসিয়ে রোজ সকালে বিকেলে ভেঙ্কটবাবুকে বাইরে নদীর ধারে, বাগানে ঠেলে ঠেলে বেড়াতে শুরু করলেন তিনি। ঠিক যেন দুই ভাই বোন। স্বর্গ থেকে বিনীতা দেবী ও মিস্টার দলবীর কাপুর তাঁদের হয়তো আশীর্বাদ পাঠালেন।

ছেলে রঙ্গনাথ ও মেয়ে কমলেশ শান্তিতে আনন্দিত মনে কাজে মন দেয়, Without pay ছুটি তো আর বেশী দিন দেবে না অফিস থেকে। প্রভাতে কোকিলের কুজন ও বিকেলে বৃষ্টির পরে ব্যাঙের গান শুনতে শুনতে তারা দুজন এগিয়ে চলেন ধীর পদক্ষেপে, আবার কখনও সমুদ্রের ধারে বসে রোমণ্থণ করেন, তাঁদের দীর্ঘ জীবনে সুখ দুঃখের কথা। অতীত আর ভবিষ্যতে র চিন্তা তাঁদের আর ভাবায় না , ‘বর্তমান’ সময় তাঁদের প্রকৃতির নতুন পরিবেশে  আজ এক জীবনের নতুন পাঠ পড়িয়েছে। সংগ্রাম ও দুঃখের আগুনে শুদ্ধ হয়ে তাই এই দুই ডানা ভাঙা পাখী এখন স্থিথপ্রজ্ঞ মানব হয়ে শান্ত সমাহিত ভাবে দিন কাটাতে লাগলেন।

বানপ্রস্থ (Banprostho)

চন্দনা সেনগুপ্ত

বিহারের এক অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ী অঞ্চলে এই অ্যালুমিনিয়ামের ফ্যাক্টরীটি স্থাপিত হয়েছিল, প্রায় ৭০বছর আগে। স্বাধীনতার ঠিক পরে পরে সারা দেশের উৎসাহী যুব সম্প্রদায় বিশেষতঃ গুজরাটি – মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবী কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু মিলে তৈরী করেছিলেন, এই অ্যালুমিনিয়ামের কারখানা। হাঁড়ি কুড়ি, কড়াই, মগ বা নিত্য ব্যবহার্য্য আরো নানান ধরণের দ্রব্য তৈরী হয় এখানে। দেশকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করার এই অদম্য বাসনা তাঁদের পূর্ণও হয়েছিল। ছোট ছোট পাহাড়ের কোলে রাঁচি জামশেদপুর থেকেও কিছুটা দূরে নানানরকম মেশিন বসানো হল, চারিদিকে ঘর-বাড়ি কোয়াটার তৈরী হবার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট, কুয়ো, পুকুর, মন্দির মসজিদ, গুরুদ্বারা, বাজার দোকান, হাসপাতাল, একটি নগর পত্তনের জন্য যা যা দরকার সবই নির্মাণ করা হতে লাগল। তখন মালিক গোয়েঙ্কা সাহেবের প্রিয় সহচর টেকনিশিয়ান ওরফে পিয়ন, ওরফে কেরানী ছিলেন মদনলাল গুপ্তা, যৌবনের সমস্ত উদ্যম ও পরিশ্রম দিয়ে বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ফ্যাক্টরীকে বড় করতে তাঁর অবদান কিছু কম ছিল না। সবাই ভালোবাসতেন, তার কাজের দক্ষতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখে। ওপরের সব ম্যানেজার ও অফিসার যেমন তাঁর সততা ও কর্ম ক্ষমতায় মুগ্ধ ছিলেন, নিচের শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীরা তাঁকে ততটাই সমীহ করতেন এবং ভয়ও পেতেন। কারন তাঁর মতন গম্ভীর স্বল্পবাক কঠোর মনোভাবের লোক ঐ ফ্যাক্টরীতে আর দ্বিতীয় ছিল না। তাঁর নাম দিয়েছে সবাই নারকেলবাবু। বাইরেরটা  ভীষণ শক্ত আর ভেতরটা নরম কোমল। নিজের কোন কাজে যেমন ত্রুটি হতে দিতেন  না সহজে, সামান্যতম ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আবার সেটাকে ঠিক নিখুঁত ভাবে সম্পূর্ণ করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে লেগে পড়তেন। অন্যদেরও তেমনি ধৈর্য ধরে কাজ শেখাতেন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন সবাইকে। কাজই তাঁর ধর্ম, কর্ম, জ্ঞান ছিল। নিত্য নতুন টেকনোলজি শিখতে, পড়তে, জানতে তাঁর আগ্রহ দেখে মালিক তাঁকে বেশ কয়েকবার বিদেশেও পাঠান। মাত্র স্কুল পাশ করে তিনি তাঁর সঙ্গে এখানে এসেছিলেন, আর পরে মালিক তাঁকে B.Sc., M.Sc. পাশ করান, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে স্পেশাল ট্রেনিং নিতে জার্মানী, ফ্রান্সে ও ঘুরে এসেছেন তিনি। পঞ্চাশ বছরে তাঁকে দেখা যায় এম.বি.এ, ও লেবার ‘ল’ পড়তে। জীবনে উন্নতি করার অদম্য ইচ্ছাটা তার নিজের জন্য নয়, সমস্ত ধ্যান জ্ঞান উৎসাহ ও প্রচেষ্টায় তিনি এই ফ্যাক্টরীরও সমৃদ্ধি ও সুনাম বাড়িয়ে তুলতে চেয়েছেন। পঞ্চান্ন বছরেই তাঁকে তাই জেনারেল ম্যানেজারের পদটি দেওয়া হল।

 

দ্বিতীয় পর্ব

মালিক দেহ রেখেছেন। এখন তাঁর ছেলেই কোম্পানীর মালিক। মদনলালবাবুকে সেও খুব মানে বা তার ওপরেই সব দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, পঁয়ত্রিশ বছরের টেকনিক্যাল ও ম্যানেজেরিয়াল দক্ষতা, শ্রমিক পরিচালনার সুকৌশল ও ফ্যাক্টরীর নিরাপত্তার জন্য তাঁর খ্যাতি দুর্দান্ত, বিশেষজ্ঞের সর্ব্বোচ্চ তালিকায় তারা তাকে রেখেছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেকটি দুর্নামও তিনি পেয়েছেন, বড় ‘পারফেকশনিস্ট।’ তাঁর একগুঁয়েমি জেদী স্বভাব তাঁকে যেমন ক্যারিয়ারের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে – এই এক রোখা, আপাতদৃষ্টিতে রাগী ও খুঁতখুঁতে, কাজের মান উঁচু রাখার জন্য শ্রমিক কর্মচারীদের বকা ঝকা করা, আদর্শবাদ ও মূল্যবোধের সঙ্গে কিছুতেই সমঝোতা না করতে পারা, – ইদানিং কালের অধঃস্তন কর্মচারীদের, জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার বা অফিসারদের ভালো লাগে না। বাইরে কঠিন ব্যবহার, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য নামটি তারা ঠিকই দিয়েছে ‘কোকোনাট স্যার’। ইউনিয়ানের নেতারাও এখন নানা রকম সমালোচনা করে। মালিকপক্ষের যা কিছু ত্রুটি তাদের চোখে পড়ে – সবকিছুর জন্যই তারা মদনলাল গুপ্তকেই দায়ী করেন, কারণ তিনি জেনারেল ম্যানেজার, আবার কর্মচারী অর্থাৎ নীচু স্টাফ, শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে, তাদের বোনাসের টাকা, কোয়াটার মেরামত, যানবাহন বা নিত্য নৈমিত্যিক বস্তু ঠিক সময় হাজির করার দাবী নিয়ে যখন তিনি মালিকদের দরবারে আর্জি করেন, তখন সেখানেও অপ্রিয় হয়ে যান। এই পঁয়ত্রিশ বছরে বহু পরিবর্তন এসেছে ফ্যাক্টরীর পরিবেশে।

আগে এখানে সমস্ত প্রদেশ থেকে লোক নেওয়া হত, এখন প্রাদেশিকতা জাতপাতের বিভেদ মাথা তুলেছে। স্থানীয় নেতাদের প্রাধান্যও বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে এই ফ্যাক্টরীগুলিতে। তার ওপরে ব্যবসায়িক সমস্যা। প্লাস্টিকের চল বাড়ছে। বাজারে অ্যালুমিনিয়াম স্টিলের পরিবর্তে সব জিনিষই পলিয়েস্টর – মোটা ধরনের প্লাস্টিকে তৈরী করে কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

অনুন্নত দেশগুলি ‘চীন’ দেশের দ্রব্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায়, রপ্তানীও কমে গেছে। লোক ছাঁটাই করার ইচ্ছে না থাকলেও ধীরে ধীরে কর্মীসংখ্যা কমানোর নির্দেশ এসে গেছে। – তিনি কাউকেই ছাড়তে পক্ষপাতী নন।

মাদনলালবাবু আজকাল প্রায় মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। আগে কর্মচারীরা যদি কাজে গাফিলতি করতো বা তাদের চারিত্রিক দোষ পাওয়া যেত, তাহলে সহজেই তাকে ডেকে বকুনি দিতে – বোঝাতে তথা শুধরাতে চেষ্টা করতেন তিনি এবং তার কথা মন দিয়ে শুনতো সে, কিন্তু এখন যুগটা কেমন পাল্টে গেল, কাউকে ভালোভাবে বসিয়ে কাজ শেখাতে গেলে সে বলে, ‘হ্যাঁ আমি জানি’ অর্থাৎ আপনার আর জ্ঞান দেওয়ার দরকার নেই। মালিকের ছেলেরা নতুন মনোভাব নিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চাই। মিনিস্টার, এম.এল.এ, এম.পিদের সন্তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত। মালিকের জামাই হংকং থেকে পড়াশোনা করে এসেছে, সে এখানে ফ্যাক্টরীর খরচ কমিয়ে চীন দেশ থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল আমদানী করে এখানে বড় বড় হোটেলে সাপ্লাই করতে চায়।

মদনবাবুর ইচ্ছে তরুণ কিছু ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠিয়ে ঐ কাজটির প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে। তারপরে আরও কিছু অন্য ধরনের মেশিন কিনে ওনাদের ফ্যাক্টরীতেই সেগুলি তৈরী করতে। কিন্তু তাঁর কথা মানতে কেউই রাজী নয়। কাউকে মোটা টাকার ঘুষ খাইয়ে একটি কোম্পানীর অ্যালুমিনিয়াম পাত লাগানোর টেন্ডারটি হাসিল করার কথাও একদিন তিনি জানতে পারলেন। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বড়বাবুর দয়ায় সে আজ এই পদে বসেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ক্ষমতা কমিয়ে আনা হচ্ছে। অসৎ লোকেদের পাশে বসতে হচ্ছে। স্ত্রী সবিতা মাঝে মাঝেই বলেন, এবারে কাজ ছেড়ে দাও, চলো আমরা দূরে কোথাও নিরিবিলি জায়গাতে গিয়ে বসবাস করি। ছেলে মেয়ে নেই তাঁদের। ঝাড়া ঝাপ্টা মানুষ, স্ত্রী বাগান করা নিয়ে এবং তিনি ফ্যাক্টরী নিয়েই ব্যস্ত, সারাটা জীবন কাজে কাজেই কেটে গেল।

কর্মচারীদের বাসগৃহগুলি মেরামত করা দরকার। নালিগুলি অনেকদিন পরিষ্কার হয়নি, ফ্যাক্টরীর আসে পাশের জঙ্গল, ঝোপ ঝাড় ঠিক সময় মালীরা কাটছে না। সেখানে নাকি সাপের উপদ্রপ বেড়েছে, কেউ যেতে চাইছে না। তাদের ওপর চেঁচামেচি করতে কাজ বন্ধ করে দিল তারা, সেই নিয়ে তরুণ মালিকের ইংরেজি ভাষণ ও সমালোচনা শুনতে হল মদনবাবুকে। ইউনিয়নকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করলেন তিনি। কয়েকজন বয়স্ক কর্মী নিয়ে সেখানে গেলেন মদন লাল, নিজে হাতে ‘কার্বলিক অ্যাসিড’ ঝোপে ছিটিয়ে সাপ তাড়ালেন। বাইরে থেকে ভাড়া করা গরীব মজদুর দিয়ে সব জায়গা ঝকঝকে তকতকে করলেন। ফ্যাক্টরীর রূপ সুন্দর হলে শুধু তাঁরই যেন লাভ। তবু কেন বারে বারে তাঁর মনে হয়, এই ‘কর্ম ভুমি’ তার কাছে এক দেবালয়, প্রান দিয়ে তাকে ভালোবাসার নামই পুজা বা সাধনা l

এদিকে ক্যান্টিনের খাওয়া দাওয়া নাকি ক্রমশঃ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একদিন একদল যুবক থালা বাটি ছুঁড়ে না সেদ্দ হওয়া মাংস ডাস্টবিনে ফেলে ভীষণ হৈ চৈ বাঁধিয়ে দিল। ক্যান্টিন ম্যানেজারকে ডেকে পাঠালেন, জেনেরল ম্যানেজার মদনলাল, – তিনি আঙ্গুল দেখালেন রাঁধুনিদের দিকে। প্রধান রাঁধুনী বেশ জোর গলায় জানালেন যে, – এটা তাদের দোষ নয় – যে এনেছে, সেই বাজার সরকারকে ধরুন, – তিনি জানালেন এবারে মাংস বিক্রেতার দোষ। মাংসের দোকানে লোক ছুটল, জানা গেল, দর কম দেওয়াতে বাসি মাংস দিয়েছে। কেন? টাকা ঠিকমত দেওয়া হয় নি? সে দিল ক্যাশিয়ার বাবুর নাম। মদনলাল তাকে যখন তলব করলেন তিনি শুধু মালিকের রুমের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিল যে সে কিছু জানে না, ওখানে জিজ্ঞেস করুন। এদিকে ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিল, ধর্মঘট হল, – উৎপাদন নেই, যেখানে অ্যালুমিনিয়ামের দ্রব্যাদি যাওয়ার ছিল, সেখানে সময়মতো সেগুলিকে সরবরাহ করা গেল না। জেনারল ম্যানেজার মদনলালের ওপর সমস্ত দায়িত্ব ছিল, অতএব বলির পাঁঠার মতন তাকেই – এই সমস্ত সমস্যা, বিভ্রাট অব্যবস্থা তথা বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হল।

মালিকপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন কেউই ছেড়ে কথা বলার লোক নন। ওপর থেকে অপমানসূচক চিঠি ও নীচে থেকে অকথ্য গালাগাল খেয়ে ঘেরাও হয়ে অসম্ভব টেনশন এর মধ্যে কাটালেন তিনটে দিন। ভাবলেন এবার চাকরীটা সত্যিই ছেড়ে দেবেন তিনি। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না।

 

তৃতীয় পর্ব

দু বছর পরে, তাঁর কাছে ওয়েল ফেয়ার অফিসার একজন ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। কর্মচারীদের ফ্যাক্টরীতে আনবার জন্য বাস চালায় সে। প্রায় মদ খায় ভীষণ বদ মেজাজী, কাউকে মানে না। জি.এম. সাহেব যেন চার্জশীট দেন তাকে। ডেকে পাঠালেন লোকটিকে। সত্যিই তার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। পান চেবাতে চেবাতে এল সে মুখ থেকে মদের গন্ধ ঢাকতে। দোষ করেও মাথা নীচু করে না। কদর্য ভাষায় সহকর্মীদের সাথেও কথা বলে। মদনলালবাবু তাকে সাবধান করে দিলেন, দ্বিতীয়বার এরকম করলে তাকে বরখাস্ত করা হবে, – সে কথাও বেশ জোরের সঙ্গে শুনিয়ে দিলেন।

অনেক দিন ধরে নানান ঝামেলায় তিনি একটু ক্লান্ত ও বিব্রত হয়ে পড়েছেন, ভালো লাগছে না আর কথা কাটাকাটি করতে নীচের অফিসারকে বললেন, এরপরেও যদি না শোনে তোমরা কোন অ্যাকশন নিও। এসব লোকেদের আমার কাছে আর পাঠিয়ো না।

পরের সপ্তাহে ঐ গুন্ডা প্রকৃতির লোকটি ঠিক সময়ে বাস নিয়ে কর্মীদের না আনায় এবং মদ খেয়ে গাড়ি চালানোর জন্য ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার তাকে সাসপেন্ড করল। লোকটিকে তার বন্ধুরা জানালো, “জি.এম. তোর নোকরী খেয়ে নিল।” কাল থেকে আর আসতে হবে না তোকে। আজ বাসটা গ্যারেজে পার্ক করে চলে যেতে বলেছেন বড়বাবু।’

মদনলাল তার সুন্দর অফিসরুমে খুব কম সময়েই বসেন, সারাদিন ফ্যাক্টরীর এ ডিপার্টমেন্ট থেকে ও ডিপার্টমেন্ট ঘুরে বেড়ান। আজও স্টোর পরিদর্শন করে আর একজন জুনিয়র ম্যানেজার এর সঙ্গে গেটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, হটাৎ উল্টো দিক থেকে ফ্যাক্টরীর খালি বাসটি তীব্র বেগে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে লাফিয়ে পাশে সরতে গিয়ে পড়ে গেলেন, সবাই ছুটে এল, খুব প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি, কিন্তু অন্যরা মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটল বাস ড্রাইভারকে ধরতে। সে এদিক ওদিক আঁকা বাঁকা চালিয়ে সোজা গিয়ে ধাক্কা মারল সামনের বাউন্ডারী দেওয়ালে। সবাই ভাবলো বাসের ব্রেক ফেল করেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। লোকটিকে বাস থেকে বের করে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মদনলালবাবু কিন্তু এক নজরে দেখেছিলেন ওই চালককে, কিন্তু কাউকে কিছু জানতে দিলেন না l

ছয়মাস পার হয়ে গেল, এবার বেশ কিছু টেকনিশিয়ান নেওয়া হবে ফ্যাক্টরীতে। প্রথম পরীক্ষায় যারা পাশ করেছে, তাদের ইন্টারভিউ হয়ে যাওয়ার পর কাকে কাকে নেওয়া হবে তার লিস্ট তৈরী হচ্ছে। মালিক তাঁর স্থানীয় নেতাদের প্রভাবে ও অনুরোধে ঠিক করে নিয়েছেন ,কার কার নাম প্যানেলে রাখা হবে। মদনবাবুকে শেষে পাঠানো হল, সাইন করবার জন্য। তিনি প্রতিবারের মতন এবারেও জানতে চাইলেন যে স্টাফদের কোনো ছেলে আছে কিনা। জুনিয়র অফিসার জানালেন যে একটি ছেলে খুব ভাল পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু তার নামটি ওঠেনি। ওর চাকরী হওয়া খুবই দরকার। কারণ ওদের বাড়ির অবস্থা খুবই শোচনীয়। সেই স্টাফের স্ত্রী অফিস এসে রোজ পা হাত ধরছে কিন্তু আমরা কি করব বলুন স্যার? বোর্ড মেম্বারের কিছু করার নেই। বললেন ঐ জুনিয়র।

‘‘স্টাফটি মারা গেছে? তাহলে তো ‘কমপেনশেশন গ্রাউন্ডে’ নিতে পারা যায়’’ – মদনলাল বাবু বললেন। ‘না না স্যার তার দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে।’ এক্সিডেন্টে পা দুটি এমনভাবে থেতলে যায়, যে ডাক্তারবাবু এমপুট করতে বাধ্য হয়েছেন। সে কিছু করতে পারে না। তার বড় ছেলেটি মানসিক ও শারীরিকভাবে অক্ষম। পাগল শুধু নয়, নিজে নিজে খেতে পরতেও পারে না। মেয়েকে অনেক পণ দিয়ে বিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু শশুরবাড়ির লোকেরা তাকে পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল, তার মুখ হাত সব পোড়া, সেও বাবার কাছে ফিরে এসেছে। এই ছেলেটিই মায়ের ভরসা। পড়াশোনা ও ব্যবহারে খুব ভাল, বুদ্ধিমান। কিন্তু আমরা কি করবো বলুন, এর নাম সবচেয়ে পেছনে। দুবছরেও চাকরী পাবে কিনা সন্দেহ। ততদিনে প্যানেল ক্যান্সেল হয়ে যাবে।

জি.এম. মদনলাল আবার সেই লিস্ট তৈরী করালেন, নিজে ঐ বোর্ডের সব মেম্বারদের নিয়ে। সেই লিস্টে সবচেয়ে আগে তিনি ঐ ছেলেটির নাম রাখলেন। স্টাফেরা এখানে রক্ত জল করে কাজ করছে, আর তাদের ছেলেদের চাকরী হবে না। হবে, ঐ বড়লোকের ছেলেদের! – দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের ভাই, ভাগ্নে বাড়ির লোকেরা পাবে চাকরী?

একসপ্তাহ পরে একদিন তাঁর পি.এ. বললেন, স্যার, একজন ভদ্রমহিলা আর ঐ দু পা কাটা স্টাফ এসেছে, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। দুই বগলে স্ক্র্যাচ নিয়ে ধীরে ধীরে লোকটি ঢুকল ঘরে। পেছনে ঘোমটা মাথায় একজন মহিলা। ঢুকেই সে স্ক্র্যাচ ফেলে দিয়ে হুমড়ি খেয়ে মদনবাবুর পায়ের উপর পড়ল। আরে ওঠো ওঠো, পি.এ. এবং তিনি নিজে ঝুঁকে তুলে ধরে চেয়ারে বসালেন। লোকটির দুচোখে জলের ধারা বইছে, – “স্যার আপনাকে আমি বাসে চাপা দিয়ে মারতে চেয়েছিলাম, আর আপনি আমার ছেলেকে চাকরী দিয়ে আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে দিলেন, ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।”

পরদিন সকালেই তাঁকে জানানো হল যে মালিকের কথামত কাজ না করায় বরখাস্ত করা হয়েছে জি.এম. মদনলাল গুপ্তকে। কিন্তু সমস্ত শ্রমিক কর্মচারী, বয়স্ক, তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অফিসার বা পিয়ন এমন কি ক্যান্টিনের রাঁধুনী, চাকর, দারোয়ান সবাই এসে ধর্ণা দিল মালিকের ঘরের সামনে। “জি.এম. সাহেবকে ফিরিয়ে দাও নইলে ফ্যাক্টরীতে তালা দাও। আমাদের দাবী মানতে হবে – নইলে গদী ছাড়তে হবে।”  ইউনিয়নের কথা শুনতেই হল তাদের। বরখাস্তের নোটিশ লেটার ছিঁড়ে ফেলা হল।

মদনলাল বাবু সাধারণ মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে ধীর পদক্ষেপে ফিরে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে। অদ্ভুত একটা আনন্দে মনটা শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেল। মেন গেটে প্রবেশ করতেই দেখলেন, তার বাগানের পাশের লনে বাক্স, বিছানা, ও নানা ব্যাগ, সুটকেস সব সারি দিয়ে রাখা আছে। তাঁর স্ত্রী এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে বললেন, জীবনে এক একটা সময় আসে যখন সব আকর্ষণ  কাটিয়ে আমদের এগিয়ে যেতে হয়, অনেক কাজের মোহ মানুষকে  workaholic করে তোলে, এবার সেটা ছাড়তে হবে তোমায়, আমিও অকারণে এই ঘর, দোর নিয়ে ভুতের বেগার খেটে মরছি, আর নয়, আমরা এখন গঙ্গার ধারে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি, সেখানে এখন থেকে আমাদের ‘বানপ্রস্থের’ শুরু।

মুড়ি (Muri)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তুমি আমার জীবন সঙ্গী
শৈশব হতে বন্ধু 
তোমার শুভ্র চিকন শরীরে -
রয়েছে প্রেমের সিন্ধু।
প্রথম যখন মাড়িতে আমার
বেরুল, দুইটি  দাঁত,
তখন থেকেই তোমার সামনে 
পেতে ছিলাম হাত।
কুট কুট করে খেতাম তোমায়
দিতে দিতে হামাগুড়ি l
বাল্য বয়সে নারকেল কোরা 
চিনি গুড় মাখা মুড়ি,
ভাবলে তোমার সে স্বাদের কথা 
জিভে দেয় সুড়সুড়ি।
ছোলা ভাজা আর মোটর সেদ্দ 
 শশা, লঙ্কার  ঝুড়ি,
মুড়ি দিয়ে জল খাবারে কখনো
বাড়ে না কারোর  ভুঁড়ি,
পেট রোগা ওই অফিসের বাবু
তাই খান রোজ মুড়ি l
পান্তা ভাতেতে সর্ষের তেল,
লেবু চটকায় বুড়ি,
মুড়ি মেখে নেয়, স্বাদ করে খায়
পিসি, মাসী, দিদা, খুড়ি।

অম্বল জ্বরে মুড়ি খেলে পরে
রোগ যায় সেরে সত্য।
মুড়ি গুঁড়ো দিয়ে চপ ভাজা হয়,
দোকানি বানায়  নিত্য।
মুম্বাইবাসী করে ভেলপুরি
মেশায় তাহাতে বেসনের ঝুরি 
তার মধ্যেও প্রধান দ্রব্য
আমি জানি, তুমি মুড়ি।
গুড়ের মধ্যে পাক দিয়ে করে
মুড়ি মোয়া, শত কুড়ি,
নদী ধারে বসে খুকী খায় হেসে.
হাতে তার লাল চুড়ি।
ট্রেনের কামরা সরব হয় যে 
ছেলে বেচে ঝালমুড়ি
'যাত্রীরা' সব কেনে আনন্দে,
খান দাদু, ছোঁড়া-ছুঁড়ি।
বাঙালীরা আজ তব অবদানের 
খুঁজে নাহি পায় জুড়ি,
পাস্তা, পিজ্জা, নুডুলস পেলেও 
মুড়ি খায় দিয়ে তুড়ি।
ঘুঘনি ও মুড়ি বিক্রী করে যে
পায় ভালো টাকাকড়ি
জয় জয় গায়, মুখ ভরে খায়
আহারে আমার মুড়ি।

বাগানের মালী (Baganer Mali)

চন্দনা সেনগুপ্ত

গাছের চারা লাগাই আমি বড় বাবুদের বাগানে।
ছোট ছোট গাছগুলির জন্যে সবচেয়ে আগে, সেখানে 
তৈরী করি মাটি, ঝরঝরে উর্ব্বর।
পরিবেশ ভাল না পেলে অঙ্কুর কি বেরোতে পারে!
ওরা বাড়তে পরে সর সর
তারপর খাদ্য সার দেওয়া,
সময়মত গোড়ায় জল ঢালা।   
আশে পাশের আগাছা তুলে ফেলে
তাদের বড় করার পালা।
বাঁশের বেড়া লাগিয়ে ঘিরে দিই তাদের
নইলে ছাগলে খাবে মুড়িয়ে, -
গরু মোষে দেবে পাড়িয়ে।
সবুজ সবুজ নরম কোমল পাতা
ছোট ছোট পাখিদের ভীষণ প্রিয় জানি।
তাদের থেকেও তো বাঁচাতে হবে, ওদের কচি কচি মুখ খানি,
কাগজের টুপি পরিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখি,
বসে থাকি ঠায়, খুঁজি উপায়, তাড়াই পাখি।
ধীরে ধীরে তারা বড় হয়ে যায়,
যখন দোলে একটু বেশি হাওয়ায়, -
তখন কাঠি পুঁতে দিই, সোজা রাখতে।
 রোদের তাপে মুরঝে যায় যদি, দিই না তাপ লাগাতে,
পোকা লাগলে ভয় লাগে, ওষুধ দিই,
যদি বাঁচাতে না পারি, - মায়ার অন্জন মাখি,
সারাক্ষণ ওদেরকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি।
অনেক ধৈর্য্য ও যত্ন লাগে, গাছগুলিকে
বড় করতে করতে, মাস থেকে বছর ঘুরে যায়। তারপর সেথায়,
কলি ধরে বুঝি, ফুল ফুটতে আর নেই বাকি।
প্রজাপতির রঙে, মৌমাছিদের ঢঙে,
ভোমরার গুনগুন গানে ও সৌরভে
বাগানটি যেন খিল খিল করে হেসে ওঠে।
আমি মনে মনে আনন্দের
আল্পনা আঁকি।
 
ঠিক এমনি করে পরের বাড়ির
কচি কাচাদের দেখাশোনা করেন, -
পদ্ম, লতা, কমলা, মঙ্গলা ঝি’দের দল।
মা বাবারা তাদের ব্যস্ত ভীষণ,
পড়াশোনায় বড় বড় কঠিন কাজে,
অর্থ উপার্জন। দিনরাত তারা বাইরে থাকেন,
ঘরে এলেও কানে 'ডাক' শোনে,
ফোন আসে, অফিসের সারাক্ষণ।
কাজের মাসি, দিদি, পিসি এঁরাই তাঁদের সহায়।
যত্ন করে বুকে ধরে করেন শিশু পালন।
মনে থাকে না, নিজের বাড়ির কথা, -
ভুলে যেতে থাকেন, স্বামী হারানোর ব্যথা।
কেউ কেউ আবার বিয়ে করার চিন্তা
মনেও আনে না কখনও।
গ্রামে টাকা পাঠানো, পিতৃহারা ভাইবোন
মায়ের কর্তব্য পুরো করতে তাঁর,
বিদেশে আগমন।
বাগানের ঐ মালীর মতন করে - আগলে
রাখেন, বড় করে দেন ঐ
বড়লোকের আদুরে, চঞ্চল, অভিমানী বাচ্চাদের।
কোন অভিযোগ নেই কারো প্রতি,
নেই কোনো অনুযোগ।
রোজগারের টাকা নিয়েও করেন না ভোগ।
শুধু ওরা বড় হয়ে যখন সম্মান দেয়, বলে -
আমায় উনি মানুষ করেছেন, - আনন্দে আবেগে
চোখের জলে ভাসেন, তখন।

ব্যাকুল মিনতী (Byakul Minoti)

চন্দনা সেনগুপ্ত

হে ঈশ্বর!
তোমার সৃষ্ট আমাদের মানব দেহ,
এক বিশাল, জটিল যন্ত্র।
তুমি যে কী ভাবে, কী উদ্দেশ্যে বানালে, -
কারো জানা নেই।
কিন্তু কত রকম উপায়ে তুমি সতত
এর রক্ষনাবেক্ষন করে চলেছো স্বতন্ত্র।
তার কোন তুলনা হয় না।
অপূর্ব তোমার গরিমা ,তাই এই পৃথিবীর
দেহধারী প্রাণীদের তুমি
পাহারা দিযে  চলেছো অতন্দ্র।
এতোটুকু ময়লা জমতে পায়না সেখানে।
খাদ্যবস্তুর নির্যাস টেনে নিয়ে বানাও
সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, লাল তরল রক্ত -
তাই কর্ম করে চলেছো, অহরহ, দিবারাত্র।
সব আবর্জনা শরীর হতে আপনা আপনি
বের করার জন্য বানিয়ে দিলে
শত শত দ্বার দেহের সর্বত্র।
কখনো ঘাম, শ্বেদ বিন্দু ঝরে পড়ে
লোমকূপের মধ্যে দিয়ে যত্র তত্র।
ব্যবস্থা তোমার অতি সুন্দর, সুনির্দিষ্ট।
ক্লেদাক্ত জল, আগ্রহন যোগ্য বস্তু
বাহির হয় অন্য দুই পথে
যত ময়লা মলমূত্র।
হে ভগবান !
মনের অভ্যন্তরে জমিয়ে রাখা
অখাদ্য পশুত্বের বীজ,
মানব যে জমিয়ে রাখে,
লুকিয়ে রাখে স্তরে স্তরে,
গোপন কোন গহবরে !
সেগুলি বহিষ্কারের উপায় নেই কি কোনো?
তখন কেন শোনে না সে
তোমার দেওয়া কোনই সুমন্ত্র?
ধর্মের নামে হানাহানি, হত্যার লীলা খেলায় মত্ত,
মস্তিষ্কে জল্পনা কল্পনা করে
সর্বদা অহরাত্র।
তাহার বিহিত হয় না কেন বলো?
নারীর শরীরের প্রতি কামনাতুর
লোলুপ দৃষ্টিতে তারা দূষিত
অপবিত্র।
সেই সমস্ত নোংরা কদর্য ভাবনা -
কেন হয় না দেহের মলমূত্রের মত
অনায়াসে নিষ্কাষিত?
যখন কোন নিধনের -ধ্বংসের বা অত্যাচারের
বীজ বপন হয় কারো  মনে -
তখনই কেন অন্যায় কার্যকরী করার পূর্বেই
তুমি করে দাও না তারে , বর্জ্য শুকনো পত্র।
হে ঠাকুর !
এসো, - রচনা করো, অভিনব তব কৌশল তন্ত্র।
তোমার নতুন নিয়মে নিষ্ঠূরতার হোক বিনাশ;
প্রতিজ্ঞা করেছিলে, তুমি মনে করে দেখো,
"সম্ভবামী যুগে যুগে" - অতএব বিনীত মিনতি
এই শোনো - নিয়ে এসো,
অভিনব আর এক অবতার, শুনাও নব জাগরনের বানী,
নিযে এসো, নতুন উদ্ধার সূত্র।

রাধা (Radha)

চন্দনা সেনগুপ্ত

চব্বিশ পরগনার বাসন্তী গ্রামে গরীব চাষীর ঘরে জন্ম রাধার। অনেকগুলি ভাই বোন তারা। বড় দিদির বিয়ে হয়েছে, ‘জামাইদাদা’ নদীর ধারে একটা মুড়ি চপের দোকান চালায়, দিদিও তার সাহায্য করে। ছোট ছোট দুই ভাই, মা প্রায় অসুস্থ থাকেন, কেউ জানে না পেটে কি হয়েছে। বাবাও সারাদিন মজুরী করেন, অন্যের জমিতে পরিশ্রম করে ধান বোনেন, সব্জি লাগান। দিদির বাচ্চা হবে বলে রাধা এসেছে, জামাইবাবুর দোকানে আলু সেদ্দ মেখে, চপ ভাজার জোগাড় করতে, পিঁয়াজির জন্যে পেঁয়াজ কাটতে। নদী ঘাটে খেয়া এসে ভিড়লে বেশ লোকজন হয়। সুন্দরবনের দিকে যেতে হলে এই পথ দিয়েই লোকেরা চলে, তাই ভীড় হয় ভালোই। ষোলো বছরের রাধা বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। মুখখানা তার ঢলঢলে শ্যামলা রঙের, খুব তাড়াতাড়ি বুঝি যৌবন এসে গেছে। দিদি সাবধান করে, বাইরে বেশি যাবি না। লাল ফিতে দিয়ে বেড়া বিনুনি বেঁধে, চোখে কাজল লাগিয়ে যখন সে দোকানের আসে পাশে ঘুরে বেড়ায়, তখন পথ যাত্রীদের চোখে পড়ে যায়।

স্টিমারের কর্মচারী ৩০/৩২ বছরের ‘দাশরথী প্রসাদ’ প্রায়ই এসে এই দোকানের বেঞ্চে বসে, চা ও মুড়ি চপ খায়, পেটের খিদের চেয়েও চোখের খিদে তার বেশী। ধূর্ত ধূর্ত দৃষ্টিতে খুঁজতে থাকে কিশোরী রাধাকে। একদিন বাগে পেয়ে ইশারা করে একটু আড়ালে যাবার জন্য, জামাইবাবু মুদির দোকানে গেছেন, চিনি আনতে, দিদি বাড়িতে মা ও বাচ্চার সেবায় ব্যস্ত। আদর করে চেপে ধরে রাধাকে দাশরথী গাছের আড়ালে, বলে “আমার সঙ্গে যাবি, খুব সুখে রাখব। এই দিদি জামাইবাবুর বেগার খেটে মরছিস, বোকা মেয়ে।” সেদিন হাত ছাড়িয়ে ভয়ে লজ্জায় ছুটে পালায় মেয়েটা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মা মারা গেল, বাপ ভাইদের রান্না বান্না সব কাজ করতে করতে হয়রান হয়ে গেল সে, একদিন দিদির রান্নাঘর থেকে চাল নিয়ে যাওয়ায় জামাইদাদা চুলের মুঠি ধরে পিঠে একটা ভীষণ জোরে কিল বসিয়ে দিল, খুব রাগ ধরে গেল তার l

সেদিন কাঁদতে কাঁদতে এক কোনে বসে দোকানের কাজ করছিল রাধা। মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল, এমন সময় সুযোগ বুঝে তার অবদমিত ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে দিল, ‘দাশরথী’l একটা সুন্দর লাল  সালোয়ার কামিজ  ও চুড়ি দিয়ে গেল তাকে, একটা প্যাকেটে করে। সন্ধ্যেবেলা সেগুলো পরে ঘরের বাইরে একটা নতুন অজানা জগতে পা দিল রাধা, দাশরথীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল অজানা উত্তেজনার তাড়নায়।

একটা ‘অটো আগে থেকেই ভাড়া করে রেখেছিল, রাধাকে নিয়ে সোজা কোলকাতা, সেখান থেকে ট্রেনে করে বিহারের এক গ্রামে। ছোট্ট একটা স্টেশন, হিন্দীতে নাম লেখা, পড়তে পারল না সে। সেই গ্রামে প্রথমেই দাশরথী নিয়ে গেল তাকে এক মন্দিরে, সেখানে ওর মাথায় সিঁদুর পরিয়ে, ওড়নি দিয়ে ঘোমটা টেনে নিয়ে গেল নিজের বাড়ি। এখানে এসে রাধা বুঝতে পারলো, আর এক বৌ বাচ্চা কাচ্চা সব আছে দাশরথীর, কাজেই কেউই সাদর সম্ভাষণ করল না তাকে বরং দুটো গালি দিয়ে বলল, – “অন্যের মেয়ে নিয়ে এসেছিস আমরা খাওয়াতে পারব না, এখানে জায়গা হবে না, শহরে গিয়ে রাখ। এসব মেয়ে আমাদের দেহাতী ভাষা, আদপ কায়দা জানে না, এখানে ডাল গলবে না।”

ভোজপুরী না কি একটা ভাষায় তাদের খুব ঝগড়া চলতে লাগল। কোন রকমে মোটামোটা রুটি ও লংকার তরকারী খেয়ে দিন কাটালো সে। দাশরথী এবার তাকে নিয়ে এল পাটনায়, এক বন্ধুর বাড়ি। তার সাহায্যে ফ্যাক্টরীতে কাজ জুটলো স্বামীর। কিন্তু সব আশা আনন্দ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল মেয়েটার। রাত্রে মদ খেয়ে দাশরথী ও তার বন্ধু বান্ধবদেরও নিত্য খেলার বস্তু হয়ে উঠল সে। সতেরো বছরেই একটা মরা মেয়ে হল তার। রোজ রাত্রে চলতে লাগল অকথ্য নির্যাতন এবং সারাদিন রাজ্যের কাজ। বাড়ির কথা ভেবে মন খুব খারাপ করে তার, কিন্তু কাঁদবার উপায় নেয়, তাহলে আরও মার পড়ে। এই এক ছোট্ট জীবনে এতো বিরাট একটা ভুল কেন করল ভেবে পায় না সে। খালি মনে হয় কখন এখান থেকে পালতে পারবে। দুর্গাপুজো, দীপাবলী কেটে গেল, এল বিহারের ‘ছট’ পুজোর সময়। মেয়েরা সব ব্রত করে দলে দলে চলেছে নদীর ঘাটে। পাড়ার বৌদের সঙ্গে রাধাও উপোস করে হাতে পুজোর থালা, ফল মূল নিয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে এক গলা ঘোমটা টেনে। এই দুই বছরে সে ভোজপুরী বা হিন্দী কোন ভাষায় শিখতে পারেনি, কারন কারোর সাথে মিশতেই দেওয়া হয় না তাকে। বেশ কিছুটা আসতেই চোখে পড়ল পাটনা রেল স্টেশনটা। কত ট্রেন আসছে যাচ্ছে, কত মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, আস্তে আস্তে দলছাড়া হল রাধা। পেছন দিক দিয়ে লাইন পার হয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মে চড়ল। একটা ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে, একটি বাঙালি পরিবার ট্রেন থেকে নামলেন বাংলায় কথা বলতে বলতে। রাধা তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে শুধু জানতে চাইলো ‘কোলকাতা’? তারা একটু অবাক হয়ে বলল – “হ্যাঁ কোলকাতা থেকে আসছি আমরা।” রাধার মনে যেন ঢাক বাজতে লাগল। ট্রেনটা ছাড়ছে। অজ্ঞ এবং অল্পশিক্ষিত মেয়েটি ভাবলো এই সুযোগ, উঠে পড়ল ট্রেনে, তার বাড়ির থেকে আসছে যখন, আবার ওখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তাকে, এই একই গাড়ি। কোনোরকমে বাথরুমের পাশে বসে পড়ল রাধা। সব সীটেই তো লোক। খাঁচা খুলে বন্দি পাখী বাইরের জগতে এসে ভীষণ শান্তি আরাম অনুভব করল, এবং ঘুমিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। –

সকালবেলায় এমন করে মাটিতে মুখ ঢেকে একটা মেয়ে শুয়ে আছে দেখে, টিকিটবাবু বিরক্ত করলেন না, বেলায় রাধা উঠে বসে রইল জানলার দিকে চলমান জগতের দিকে তাকিয়ে সময় কেটে গেল। সঙ্গে কেউ নেই, কোথায় যাচ্ছে, কি হবে এরপর কিছুই ভাবতে পারছে না সে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে শুধু। আবার কতক্ষন সে এইভাবে কাটালো, কত লোক প্রতি স্টেশনে উঠল নামল কে জানে!

কামরাতে বেশীর ভাগই মাথায় পাগড়ি বাঁধা লোক, তারা যে পাঞ্জাবী সর্দার সেটা বুঝতে পারলেও – ‘তুসি’, ‘তুয়াড্ডে’ – তেনু কি হোইয়া? এসব ভাষা বোধগম্য হলো না তার। শেষ গন্তব্য স্থান এসে গেল – ‘অমৃতসর’। সবাই নেমে গেল। রাধা বসে রইল একটা বেঞ্চে। এই ট্রেনটা যখন কোলকাতা থেকে আসছে, তখন আবার নিশ্চয় কলকাতাতেই ফিরে যাবে, অতএব নামবে না সে।

কামরা পরিষ্কার করে, পাখা লাইট চেক করে দেখতে রেলের কর্মচারীরা উঠলেন, পাঞ্জাবী ভাষায় ওকে নেমে যেতে বলল। ট্রেন ভোর বেলায় ছাড়বে, এখন অন্যদিকের লাইনে লাগানো হবে, কেউ যে এখানে থাকতে পারবে না সেটা খুব জোর দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলো। কারো কথাই শুনতে চাইছে না মেয়েটা। এবার স্টেশনের পুলিশ এসে টেনে নামালো তাকে। প্লাটফর্মে যেন নাটক দেখতে লোক জমে গেল। রাধা কোনও পুরুষকে দেখলেই চিৎকার করে, রাগে দুঃখে মাথার চুল ছেঁড়ে, নিজের কথা বলতে চায়, কেউ শোনে না। এরপর মেয়ে পুলিশ এসে তাকে হাত ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু শান্ত করল, কিন্তু নিজের ভাষায় তার সহকর্মী ও অফিসারদের জানালো – মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে। গায়ে মারের দাগও রয়েছে। পুলিশের হেফাজতে রাখাটা ঠিক হবে না, অতএব পাগলাগারদে পাঠিয়ে দেওয়াটাই বিবেচ্য হল।

রাধা কাঁদতে আরম্ভ করল – “আমি বাড়ি যাবো গো – আমাকে ছেড়ে দাও গো তোমরা।”  তার রুদ্র চন্ডী মূর্তি দেখে পুরুষ কর্মীরা ভয় পেয়েছিল। এই শিশুর মতন চিৎকার করে কাঁদতে দেখে মহিলারা চোখের জল রোধ করতে পারলো না। ওর ভাষা জড়িয়ে গেছে, মাটিতে আছাড় কাছাড় খাচ্ছে, কত কত ভাবে বলতে চেষ্টা করছে ও কি চায়; কিন্তু এক প্রদেশের লোক যে ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের মানুষের কাছে তার পরিচয় বা ইচ্ছে কিছুই জানতে সক্ষম নয়, – কেউ কারো মুখের কথা ভাষা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না, – সে কথা কি কেউ জানে!

অমৃতসরের বিখ্যাত সরকারী মানসিক ব্যাধিগ্রস্থদের রাখার লুনাটিক এ্যসাইলাম “বিদ্যাসাগর মেন্টাল হসপিটাল” থেকে মহিলা ওয়ার্ডেন ডাক্তার ও নিরাপত্তা কর্মচারীরা এসে রাধাকে জোর করে তুললেন হাসপাতালের এম্বুলেন্সে।

অনেকজন মহিলার মাঝে বসে রাধা একটু চুপ হল, ভাবলো এরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। ঐ ভ্যানটি এসে পৌঁছালো দেওয়াল ঘেরা এক নতুন ধরনের জায়গা, জেলখানা নয়  – ‘জেনানা পাগল খানা।’

দুজন দুদিকে ধরে ধরে ওকে নামালো গাড়ি থেকে। যেন চোর ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কয়েদীদের মতন করে। গেট পেরিয়ে বাগান, বেশ সুন্দর জায়গাটা, বড় বড় গাছে ঘেরা। জেল খানার মতন ঠিক লাগছে না তো রাধার। এরপর একটা বড় দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। সেখানে চারিদিকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব মেয়ে বসে শুয়ে কিম্বা দাঁড়িয়ে নানানরকম ভঙ্গী করছে। কেউ কাঁদছে, কেউ বিড়বিড় করে কী সব বলে চলেছে, কেউ আবার হাত পা নেড়ে দেওয়াল বা খাম্বার সাথে ঝগড়া করছে। একজন বেশ শান্ত হয়ে বসেছিল বারান্দার এক কোনে। হাত নেড়ে ইশারা করে ডাকলো রাধাকে, একমুখ হাসি নিয়ে, যেন নিজের আপনজনকে দেখতে পেয়েছে অনেকদিন পরে। যে দুজন মহিলা রাধার সঙ্গে আসছিলেন, তারা টেবিলে বসে থাকা একজন সুন্দর জামা ও কাপড় পরা দিদির কাছে কিছু লেখাচ্ছিল, একজন আদর করে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যায়া নাম হ্যায় বেটা তুমহারা?’ প্রশ্ন হিন্দীতে হলেও সে বুঝতে পারল, এবং উত্তর দিল, ‘রাধা রানী দাস’। তাকে তখন ওরা ছেড়ে দিয়ে তার চেহারা হাব ভাব লক্ষ্য করতে লাগল। যে মেয়েটি বার বার ফিক ফিক করে হেসে ওকে কাছে আসবার জন্য ইশারা করছে, তার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল – রাধা। প্রায় ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সে ভীষণ জোরে একটা গেলাস ছুড়ে মারলো, রাধার দিকে, তার রূপ ও চেহারা একনিমেষে বদলে গেল, চিৎকার করে গালাগালি দিতে লাগল সে। সবাই ছুটে এল তার কাছে, রাধার বিশেষ লাগেনি অন্য দিকে পড়েছে গ্লাসটা, ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে এল সে। মেয়েটা হয়তো তাকে তাড়া করতে পারে। বদ্ধ পাগল। কিন্তু আসতে পারল না। রাধাকে ছুটতে দেখে আবার তার মূর্ত্তি বদলে গেল, হাঁসতে লাগল হি হি করে। সেই দেখে অন্য দিকে একটা মেয়ে জোরে জোরে হাততালি দিতে লাগলো। তিন চারজন এসে ঘিরে ধরলো রাধাকে। কেউ জামা টানছে, তো কেউ চুল, তারা যেন কোন নতুন খেলনা পেয়েছে খেলবার জন্য। একজনকে ঝটকা দিয়ে ছাড়াতেই সে দিল ওর হাতে কামড়। ভীষণ জোরে চিৎকার করে রাধা ছুটে পালতে লাগল, বারান্দার অপরপ্রান্তে। সেখানে দুজন  খুব মোটাসোটা লম্বা চওড়া পুরুষালী চেহারার মহিলা ঝাড়ু লাগাচ্ছিলেন, তারা চেপে ধরলেন রাধাকে। সে জোরে জোরে বলল “আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও, আমি পাগল নই গো।”

কিন্তু কে তার কথা শোনে ! এবার গেটের দিকে পালাবার জন্য ওদের থেকে ছাড়া পেতে হাত পা ছুড়তে লাগল সে, বন্দিদশা ঘোচাতে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল তার। অন্য দিক থেকে খুব দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন এক মধ্যবয়সী সুন্দরী মহিলা – জড়িয়ে ধরলেন রাধাকে, – “শান্ত হো যা বিটিয়া, দেখ ম্যায় তেরী মা হুঁ।”

তাঁর বড় বড় করুনা মাখা চোখ, নরম হাতের ছোঁয়ায় কোন জাদু ছিল হয়ত, রাধা তাঁর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, – “মা মা মা আমি বাড়ি যাব।” হটাৎ একজন নার্স তাকে একটা ইনজেকশন দিল, ধীরে ধীরে সারা শরীর অবশ হয়ে গেল তার, ওরা ধরে একটা ঘরে সুন্দর সাদা চাদর পাতা বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘুমিয়ে পড়ল রাধা।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল মাথাটা ভার হওয়ায় অনেকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে ভাবতে লাগল কেমন করে এখানে এসেছে সে। সেই সুন্দর মহিলা ডাক্তার আবার প্রবেশ করলেন, তাদের প্রেসার চেক করতে, তাঁর হাসিমুখ দেখে একটু যেন ভরসা পেল রাধা। তিনি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘অব ঠিক হো বেটা, মেরী রাধারানী।” কালকের পাগলের কামড়ের জায়গাতে ওষুধ লাগিয়ে বললেন, – “শান্ত রহনা বেটা, কোই কুছ নেহী করেগা, উধার নেহী জানা, উধার বাগ মে যা, বহ ঔরৎ সব ঠিক হো গয়া, উন লোগো কে সাথ যাকে বৈঠনা। কোই তঙ্গ করে তো মুঝে বাতা দেনা, ম্যায় ফির আঁউঙ্গী।” সব কথা বোধগম্য না হলেও রাধা যেন ভীষণ শান্তি পেল।

একজন নার্স এসে তাকে দাঁত মাজার ব্রাশ, মাজন, তোয়ালে সব দিয়ে গেল। বড় বড় কেটলিতে চা নিয়ে এল একজন সঙ্গে বিস্কুট। বেশ আরাম বোধ করল সে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে জানলা দিয়ে দেখতে পেল একজন পাগলিনীকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে ভীষণ কাঁদছে ও চিৎকার করছে, কিন্তু প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে চললো চারজন মেয়ে কর্মচারী। সে অনেক গালাগালিও দিচ্ছে, থুতু ছুঁড়ছে, দাঁত খিঁচাচ্ছে এবং একটা কথাতেই জোর দিচ্ছে – “No Shock, No Electric Shock Please, মুঝে শক নেহী দে না, ছোড় দো, ছোড় দো।” ভয়ে শরীরে কাঁটা দিল তার অবস্থা দেখে, চা টা পড়ে গেল হাত থেকে। কাপটা ভেঙ্গে গেল। এক্জন ম্যাডাম বকে উঠলেন, তেড়ে এলেন যেন মারবেন তাকে, – “ঠিক সে পকড় নেহী সকতি?” ঘাবড়ে গিয়ে খাট থেকে লাফিয়ে অন্য দিকে চলে গেল রাধা। “মেরো না, আমাকে মেরো না।” কান্না শুরু করে দিল সে, স্বামীর ও তার বন্ধুদের অত্যাচার ও মারগুলো মনে পড়ে গেল। এখানেও কি অমনি করে আবার মারামারি শুরু করবে এরাও। সেই নার্স আবার একটা ইনজেকশন নিয়ে এগিয়ে আসতেই ছুট লাগালো সে বাইরে, যেখানে বেশ ক’জন নির্বিকারভাবে বসে সোয়েটার বুনছে, সেলাই করছে, একজন আরেক জনের উকুন বেছে দিচ্ছে। তারা কেউ হল্লা করছে না দেখে ওদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল সে। ইনজেকশন হাতে দিদিটিও এখানে এসে হাজির – রাধা বোঝাবার চেষ্টা করল যে সে পাগল নয়। কিন্তু ঐ মেয়েগুলিও তাকে চেপে ধরতেই প্যাঁট করে ছুঁচটা ফোটালো সেই ম্যাডাম। ওকে ওর কাটা ঘা টা দেখিয়ে বললেন, “ইয়ে টিটেনাস ইনজেকশন হ্যায় বেটা – ডাক্তার ম্যাডাম নে বোলা লাগানে কে লিয়ে, নেহী তো তেরা ঘা শুখেগা নেহী, সেপটিক হো জায়েগা।” সবটা বুঝতে না পারলেও একটু শান্ত হল সে এদের মধ্যে এসে।

পাগলের আড্ডায় ভীষণ অসহায় হয়ে বসে রইল রাধা। কিন্তু এখানে ওয়ার্ডার হরজিন্দর ম্যাডাম এলেই তার মন আনন্দে ভরে যায়। ওনার মুখ দেখলে, হাতের ছোঁয়া পেলে যেন জাদু হয়ে যায়। আজও তিনি এসেই রাধাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, – “খানা খায়া?” মাথা নাড়ল সে। “তকলিফ – কষ্ট তো নেহী হ্যায় পুত্তর?” সে কষ্ট কথাটা বুঝে আবার মাথা নাড়ল। অন্য দুটি পাগলিনী এসে হাত ধরে টানাটানি শুরু করতেই রাধা হরজিন্দর ম্যামের পেছনে গিয়ে লুকাতে চাইল। ম্যাডাম ঐ মেয়ে দুটিকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন একজন নার্স দিদিকে।

তারপর রাধার হাত ধরে স্টোর রুমে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে অনেকে কাজ করছে, কেউ চাদর পাট করে রাখছে, কেউ ওষুধ পত্রগুলি ট্রেতে সাজাচ্ছে, কেউ তোয়ালে গুনছে। তাদের একজনকে ডেকে বললেন, – ‘ইসকো ভী কুছ কাম দো’। পাশের রুমে চায়ের কাপ ও জল খাবারের বাসন ধুচ্ছিল একজন কর্মী, ওনাকে নিজের পাঞ্জাবী ভাষায় জানালো যে, আজ বাসন মাজা ও মুছে মুছে তোলার কর্মচারী অনুপস্থিত আছে, ওই মেয়েটিকে ওর সাহায্য করতে পাঠাতে। ‘হরজিন্দর’ ম্যাম ওকে ইশারায় দেখালেন ওগুলি ধুয়ে মুছে তাকে কিভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে। কাজ করতে রাধা ছোট থেকেই খুব উৎসাহী ও পটু। লেগে পড়লো আনন্দের সঙ্গে নিঃশব্দে।

এরপর নার্স দিদিদের পায়ে পায়ে ঘোরে সে, কখন কাকে সহায়তা করবে, কিভাবে অসুস্থ পাগল মেয়েগুলির কাপড় বদলে দেবে, চুল আঁচড়ে দেবে, বিছানার চাদর পাল্টাতে হবে – সবসময় সে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এক মাস যেতেই দেখা গেল, রাধা সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছে। মুখে তার কথা নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে ভীষণ লক্ষ্য। স্বাভাবিক ভাবেই এইরকম একটি মেয়ে যে এখানে সকলের চোখের মণি হয়ে উঠবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এতো সুন্দর ভাবে নিয়মমত সময়ে খাওয়া দাওয়া, স্নানের জল, নরম তোয়ালে পাওয়া, পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরার সৌভাগ্য তার বাড়িতে কখনও হয়নি। সেই চুলায় কাঠ বা ঘুটে জ্বেলে কোনরকমে একটু ভাত, একটু শাক কখনও গামছা দিয়ে ধরে পুঁটি মাছের ঝোল, শামুক গুগলীর তরকারী খেতো তারা। স্বামীর ঘরে মোটা মোটা রুটি বানাতো আর পেঁয়াজ চিবিয়ে রুটি খাওয়া। এখানে এতো সুন্দর ব্যবস্থা, শুধু স্বাধীনতা নেই আর সঙ্গী সাথীদের মানসিক বিপর্যয় অসহায়তায় মনটা ভারাক্রান্ত থাকায় মাঝে মাঝে ভীষণ বিষন্নতায় ভোগে, রাত্রে ঘুম হয় না, কারো চিৎকার, বুক ভাঙ্গা কান্নার আওয়াজ শুনতে শুনতে মনে হয় দেওয়াল ভেঙ্গে পালিয়ে যায়। কিন্তু কোথায়? কার কাছে যাবে সে? বাইরের জগৎটা তো আরও ভয়াবহ।

ধীরে ধীরে সাত বছর পার হয়ে গেল। এখন রাধা এদের কথা বুঝতে পারে। সকালের জল খাবারে পুরী ছোলে বা আলুর পরোটার স্বাদ তার ভীষণ ভালো লাগে। দুপুরের রাজমা চাওল, রায়তা ইত্যাদি খেতে খেতে একেবারে পাঞ্জাবী মেয়েদের মতন আনন্দ করে রাধা। রাত্রে ভিন্ডি, তরী, লাউয়ের তরকারী, তড়কা ডালের গন্ধে তার মন খুশীতে ভরে যায়। এখানের রুটিনে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

একদিন সেখানে একদল সমাজসেবী সংস্থার দল এলেন, মেন্টাল হাসপাতাল পরিদর্শন করতে এবং তাদের case study নিয়ে আলোচনা করতে। তাঁদের দলে ছিলেন একজন বাঙালী মনোবিজ্ঞানী। হরজিন্দর ম্যাডাম অন্যান্য ওয়ার্ডার দের সঙ্গে তাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মহিলার কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করাচ্ছেন। এরা এখানে কত আনন্দে আছে বোঝাবার জন্য সবাইকে গোল করে বসিয়ে গান বাজনা নাচ করতে উৎসাহ দিলেন।

রাধাকে ডাকতেই সে এসে বাংলায় গান শুরু করলো। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে”। সবাই খুব হাততালি দিল। ওকে তখন ওই বাঙালী দিদি কাছে ডেকে আদর করে তার বাড়ির ঠিকানা, খবর জানতে চাইলেন। বললেন খোঁজ নিয়ে তাকে একদিন তার বাড়ি পৌঁছে দিতে ইচ্ছুক তিনি। কিন্তু রাধা খুব একটা উৎসাহ দেখালো না। কারন নিজের বাপের বাড়ি থেকে সে পালিয়ে গিয়েছিল, তাই সেখানে ফিরে যাওয়ার তার মুখ নেই। আর পাটনায় স্বামীর কাছে তো সে কিছুতেই যেতে রাজী নয়।

এখানে যাঁদের বাড়ির লোকেরা পাগল রুগীকে রেখে যায়, তাঁরা ভাল হয়ে যাওয়া মা বোন বা স্ত্রীকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অনুরোধ করে, এখানের কর্তৃপক্ষ। কয়েকদিন আগে কমলা দেবীকে পাঠিয়ে দেওয়া হল, তাঁর পুত্রের বাড়ি কিন্তু কেউ তাকে উপযুক্ত সম্মান ও আদরে গ্রহণ করলো না। সবসময় তাঁকে শুনতে হত, আরে পাগলীকে কি জিজ্ঞেস করছো, – ওকে এসব কাজের ভার দিও না, বাচ্চা কে কোলে দিও না, ও  ফেলে দেবে ইত্যাদি।  ধীরে ধীরে সে বিষণ্ণ হয়ে গেল, তার মানসিক ব্যাধি আগের মতই দেখা দিল, আর এই হাসপাতালে আবার  আসতে বাধ্য করল তাকে।

তাঁকে ফিরে পেয়ে পুরানো বন্ধুদের সবাইকার কী আনন্দ! এই পাগলখানায় মানসিক ভারসাম্য হারানো মানুষগুলি সবাই কিন্তু নিজেদের সত্তা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেনি, একজন আরেকজনকে চুল আঁচড়ে দেয়, পাজামার দড়ি বেঁধে দেয়, বেশী অসুস্থ থাকলে বিছানায় গিয়ে খাবার খাইয়ে আসে। যারা বিষন্নতায় ভোগে, বিমর্ষ থাকে ‘হরজিন্দর ম্যাম’ তাদের মুড ভালো করার জন্য গান বাজনা করান, যারা একটু ভালো হয়ে গেছে এবং হৈ হুল্লোড় করতে ভালোবাসে তাদের দিয়ে। রাধা নিজের মনে গুন গুন করে সব সময় গান গায়, তাই তাকে মোবাইলে গান চালিয়ে নাচতে বলেন তিনি। সবাই হাততালি দেয়।

প্রত্যেক আবাসিক (inmate) দের বাড়ির লোকের খোঁজ করে একটি সরকারী বিভাগ থেকে। রাধার জন্যও ওই বাঙালী দিদিমনি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার বাসন্তীতে পুলিশের ‘খোঁজ বিভাগের লোক পাঠালেন, কিন্তু তার জামাইবাবু বলে দিলেন, ওই পলাতকা মেয়ের ওপর তাদের কারো কোন দুঃখ দরদ বা সহানুভূতি নেই, তার বাবা মারা গেছেন, ভাইরাও কলকাতায় অন্যের বাড়ি চাকরের কাজ করে, কাজেই কেউ তার ভার নিতে অসমর্থ। এবার পাটনার ঐ অঞ্চলে গিয়ে বিভিন্ন ফ্যাক্টরীতে রাধার ছবি দেখিয়ে তার স্বামী দাশরথীর খোঁজ পাওয়া গেল। তাকে যখন বলা হল যে, – ‘রাধা অমৃতসরের মহিলা পাগলখানায় আছে এবং এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, তখন সে খুব আগ্রহ দেখালো, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। নির্দিষ্ট দিনে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হল সেখানে।

রাধাকে বলতেই সে যেন চমকে উঠল। কিন্তু মনের কোন একটা আশার আলোও জ্বলে উঠল, সে হারিয়ে যাওয়াতে দাশথীর মনে নিশ্চয় অনুতাপ হয়েছে, এবং তার প্রতি এখনও কিছু ভালোবাসা জমে আছে তার মনের কোনায়। বুকটা কেমন কেঁপে উঠল তার, মেয়ে মানুষের এই দুর্বলতা কেন যে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন কে জানে। এই সাত বছরে সে অনেক পরিণত হয়ে গেছে। হিন্দি – পাঞ্জাবী ভাষাও ভালোই বুঝতে পারে যদিও দরকার না হলে নিজের মুখ খোলে না। নার্স দিদি ওয়ার্ডার ম্যামের পায়ে পায়ে ঘুরতে, হাতে হাতে কাজ করতে তার সময়টা খুব ভালোই কাটে। আগে ঘুমের ওষুধ দিত তাকে, এখন সারাদিন ঘোরাঘুরি কাজ করায় শুলেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে সে।

সেদিন সকালে তাকে হরজিন্দর ম্যাম অফিসে নিয়ে এলেন। দাশরথীর হাতে সঁপে দেওয়া হল রাধাকে, সমস্ত কাগজ পত্রে সই করিয়ে নিয়ে। সেখানে লেডী ডাক্তার তাকে আর একবার পরীক্ষা করে যেতে দিতে অনুমতি দিলেন। হরজিন্দর ম্যাম কানে কানে বলে দিলেন, – “কোই তাকলীফ হো তো মুঝে ফোন কর না, নাম্বার তেরী ব্যাগ মে লিখকর রাখ দিয়া ম্যায় নে।” অনেকদিন পরে যেন জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে রাধার ভীষণ কান্না পেল, আনন্দে না দুঃখে কেউ বুঝতে পারলো না।

একটা ট্যাক্সিতে বসিয়ে ওকে নিয়ে যেতে যেতে দুই বন্ধু কথা শুরু করল। যার মানে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না রাধার –

খুব সুন্দর ভরা যৌবন এসেছে মেয়েটির। দাশরথী তুই খুবই ভাগ্যশালী যে এরকম বৌকে ফিরে পেলি। এবার টাকা নিয়ে কথা চলল। দরাদরি শুরু হল। দিল্লীর বাজারে Red Light এর দেহ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিলে কত টাকা পাওয়া যাবে তার হিসেবে নিকেশ করতে লাগল তারা। দেখতে দেখতে অমৃতসর স্টেশন এসে গেল। স্টেশনের প্লাটফর্মে টিকিট কাটছে তার বন্ধু, দাশরথী রাধাকে দেখছে আর তার বিশ্রী পান খাওয়া দাঁত বের করে হাঁসছে। ট্রেন এসে গেল – ট্রেনে তারা ওঠার মুহূর্তেই ঠিক আগের মতোই চিৎকার ও বিকট জোরে কান্না শুরু করে দিল রাধা। কেউ তার হাত ধরতে এলেই মারপিট, থুতু ছোঁড়া, চুল ছেঁড়া, মাটিতে আছাড় খাওয়ার পুরোরাবৃত্তি হল, আবার সাত বছর পরে। সঙ্গে লেডী পুলিশ চারজন মিলে চেপে ধরে তাদের গাড়িতে তুলে সোজা পাগল খানায়।

হরজিন্দর ম্যাম ছুটে এলেন, সঙ্গে ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ডারদের দল। ইনজেকশন নিয়ে ফোঁটাতে এলেন তাকে শান্ত করতে। রাধা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল, “ম্যাম, ম্যায় বিলকুল ঠিক হুঁ।” মানসিক হাসপাতালের কর্মচারী, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডার, রাঁধুনী, জমাদারনী কারো বুঝতে বাকী রইল না যে সে ঐ স্টেশনে পাগলের অভিনয় করেছে, এখানে ফিরে আসবার জন্য। আনন্দের জোয়ার এসে গেল সেখানে।

প্রথমেই হরজিন্দর ম্যাম জড়িয়ে ধরলেন রাধাকে। নিরাপত্তার অভাবে বাইরের জগতের নিষ্ঠূরতা মেয়েটিকে যে এখানে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পেরেছে, সেটা ভেবে চোখে জল এসে গেল তার। পাগলের জেলখানায় এসেও যদি কেউ শান্তিতে আনন্দে সরকারের দেওয়া খাবার খেয়ে, কাপড় পরে, অসুখে বিসুখে ওষুধ পত্র সেবন করে – কাজকর্মে সেবার মধ্যে জীবন কাটাতে চায়, তাহলে ক্ষতি কি? ফাইলে তার নাম পাগলের সঙ্গে নথিবদ্ধ হোক না কেন, কার তাতে কি এসে যায় !

রাধা আবার স্টোরে ঢুকলো তার পাগলের উনিফর্মটি পরে নতুন ওয়ার্ডার ম্যামদের সঙ্গে সাদা বিছানার চাদর ও কম্বলগুলি সাজাতে লাগল টেবিলের ওপরে গান গাইতে গাইতে –

যদি সবাই ফিরে যায়/ওরে ওরে ও অভাগা কেউ ফিরে না চায়,/তবে পথের কাঁটা . . . . আপন . . .  গানের কলিগুলো খেই হারিয়ে ফেললো। আনন্দের অশ্রু বন্যায় ভেসে গিয়ে।