পেত্নীর প্রলাপ (একাঙ্ক নাটিকা) (Petnir Prolap)

চন্দনা সেনগুপ্ত





[মঞ্চ সজ্জা – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড। একটি মহিলা বিভাগের ঘরে সারি সারি ৮টি বিছানা, পাশে নার্স দিদিমনির টেবিল ও চেয়ার পাতা। (সাদা সাদা চাদরে ঢাকা বেডে বিভিন্ন বয়সের রুগী।]

                       কুশীলব – (পাত্র - পাত্রী)

সিস্টার নার্স – (মধ্যবয়স্ক মহিলা)

উকিল দিদি – (কালো কোটটি বার বার পড়েন আর খোলেন, বেশ ব্যাসক্তিত্বপূর্ন চেহারা)

বড় দিদিমনি – (স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, নাকের ওপরে চশমা, বেশ কড়া মেজাজের বয়স্ক মহিলা)

নেতা বা সমাজ সেবিকা – সাধারণ সাদা শাড়ি পরনে, শান্ত মহিলা কিন্তু বেশ কর্ম চঞ্চল, নেত্রী (বছর ৪০–এর)

ছাত্রী – (দুজন আধুনিক পোষাকে)

লেডি পুলিশ – (হাতে লাঠি, পরনে খাঁকি প্যান্ট, কর্কশ কণ্ঠ, ধমকের সুরে কথা বলেন)

অভিনেত্রী – (খুব সাজগোজ ও সুন্দরী মডেল, ন্যাকা ন্যাকা ভাব, জিন্স ও টি–শার্ট পরে)

ঝাড়ুদারনী – (বিহারের মহিলা, সামনে আঁচল, মাথায় ঘোমটা, হাতে ঝাড়ু)

বাজনা – প্রথমে বাঁশি, সেতার ও হারমোনিয়াম

                প্রথম দৃশ্য – হাসপাতালের জেনানা ওয়ার্ড

নার্স মেট্রন – (রুগীদের দিকে এগিয়ে এসে) এই যে ম্যাডামরা, অক্সিজেন মাক্সটা ঠিক করে লাগান। আপনাদের কোভিড হয়েছে, ভুলে যাচ্ছেন কেন।

গৃহবধূ – সত্যি সিস্টার আপনাদের দেখে অবাক লাগে। এই ওষুধের গন্ধে কি করে যে থাকেন, কষ্ট হয় না?

নার্স – কষ্ট হলে সেবা করব কেমন করে ভাই। কিন্তু আপনি এখন মাস্ক খুলে কোথায় যাচ্ছেন? একদম উঠবেন না।

উকিল ম্যাডাম – ও সিস্টার একটু এদিকে আসুন তো।

নার্স – এলাম এবার বলুন কি চাই?

উকিল – আমাকে একটা ল্যাপটপ আনিয়ে দিন না। শুয়ে শুয়ে এতদিন ভী–ষ–ণ বোর হয়ে গেছি। আজকে খুব ভালো লাগছে। শরীরটা একেবারে ঝরঝরে – যেন আর কোনো রোগ জ্বালাই নেই।

নার্স – তাই নাকি? কই দেখি দেখি। অক্সিডেশন একেবারে চল্লিশের নিচে। ও মা – (দর্শকের দিকে ফিরে – উনি তো আর বেঁচে নেই)

উকিল – কি বলছেন বিড় বিড় করে? আমাকে ঠিকমত এটেন্ড না করলে এখন থেকে ছাড়া পেয়েই আপনার নাম একটা কেস ঠুকে দেব।

বড়দিদিমনি – আঃ কী আরাম। দেখো ভাই উকিল ম্যাডাম তোমার মতন আমারও আর কোনও শ্বাস কষ্ট নেই।

গৃহবধূ – আমারও তো মনে হচ্ছে সকালে উঠেই. আমি একেবারে ভালো হয়ে গেছি। তাহলে এবার আমাদের ডিসচার্জ করে দেবে মনে হয়।

উকিল – হ্যাঁ, ছুটি দিয়ে দেবে নিশ্চয়।

নার্স – এবার আপনাদের তো একেবারেই ছুটি হয়ে গেল। এখানে আর থাকতে হবে না।

অভিনেত্রী – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়) কী মজা আমাকেও ছেড়ে দেবে মনে হয়। কতগুলো ছবির শুটিং চলছে, এখানে পড়ে থাকলে চলবে না কি? সিস্টার, সিস্টার – 

নার্স – হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনিও আর জীবিত নেই। ভেন্টিলেশনটি তাইতো খুলে নেওয়া হয়েছে।

অভিনেত্রী – মানে? কি বলতে চান আপনি, আমি এখন ভূত হয়ে গেছি?

উকিল – চুপ একদম বাজে বকবে না, বললেই হল? এস আগে আমার জেরা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক ভাবে দাও, সাক্ষী নিয়ে এস, প্রমান করো যে আমি বা এঁরা কেউ বেঁচে নেই।

ছাত্রী – আরে আপনারা সবাই একটু চুপ করুন না, আমি পরীক্ষার পড়া মুখুস্ত করছি।

অন্য ছাত্রী – রাখতো তোর সবসময় ঐ পড়া পড়া খেলাটা। মুখস্ত বিদ্যা করে কি কোভিড তাড়ানো যায়? এটা হাসপাতাল।

ছাত্রী – তা আমার তো এখন জ্বর, কাশি কিছুই নেই তাই –

গৃহবধূ – তাই কি ভাই? আমারও তো সব রোগের উপশম হয়ে গেল, কত আরাম লাগছে এখন, খিদেও পাচ্ছে খুব। তারমানে আমিও ভালো হয়ে গেছি।

নার্স – না আপনারও পরপারের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

গৃহবধূ – অ্যাঁ কি বলেরে সিস্টার ! হাসপাতালের রুগীদের তোমরা মনোবল বাড়ানোর বদলে এমন নেগেটিভ কথা বলছো কেন দিদি?

দিদিমনি – আমারও এসব নেগেটিভ কথাবার্তা একদম ভালো লাগছে না। এই নার্সের নামে আমি নালিশ করব।

নার্স – যান, যেখানে খুশি যান।

নেত্রী – (এতক্ষন ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন) – হটাৎ উঠে তেড়ে এলেন নার্সের দিকে। আমি এই রাজ্যের এম এল এ। আমাকে বলুন তো কে আপনাদের জ্বালাতন করছে?

অভিনেত্রী – দেখুন না ন্যাতা ম্যাডাম –

নেত্রী – এই আমি ন্যাতা নই, নেতা – মানে নেত্রী। সমাজ সেবার জন্যই তো এখানে আসা।

উকিল ম্যাম – এই সিস্টার বলছেন যে আমরা নাকি মরে গেছি। এদিকে সাক্ষী সাবুদ কিছুই জোগাড় করেনি, কি করে মরলাম, কে মারলো, কখন –

দিদিমনি – আরে থামুন তো আপনি। আগে ডাক্তার কে ডাকুন, তিনিই পরীক্ষা করে ঠিক ঠিক রায় দেবেন।

অভিনেত্রী – (ছাত্রীকে) এই মেয়ে দেখতো ওনার নাকে হাত দিয়ে শ্বাস পড়ছে কিনা।

ছাত্রী – উকিল ম্যামের – নাঃ এনার তো নাক দিয়ে অক্সিজেন ভেতরে ঢুকছে না, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ও বেরোচ্ছে না। ইনি সত্যিই মৃত।

বড়দিদিমনি – আমি হলাম গিয়ে তোমাদের মহারানী বিদ্যালয়ের বড়দিদিমনি, কত প্রশ্নপত্র তৈরী করা এখনও বাকি। এত তাড়াতাড়ি মরলে চলবে কেন?

গৃহবধূ – কিন্তু সেটাই তো হয়েছে, আমারও নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। (নিজের নাড়ি টিপতে থাকেন বারবার)

অভিনেত্রী – দেখুন আমিও এখন আর জীবন্ত নেই। প্রাণ পাখিটা যে কোথায় উঠে গেল ! এখন আমি মুক্ত। এবার পরীর মতন উড়তে পারব।

গৃহবধূ – আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। একটু পরিবেশটা হালকা করে দাও না ভাই নায়িকা দিদি। কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা ভয় ভয় ফিলিং হচ্ছে।

অভিনেত্রী – সুচিত্রা সেন, মাধবী না সাবিত্রী কার অভিনয় দেখাবো?

ছাত্রী – ধুর, ওরা তো সব আমাদের মা – ঠাকুমার প্রিয় নায়িকা, এখনকার কিছু করো না।

গৃহবধূ – শ্রীদেবীর সেই "ম্যায় নাগিন তু সপেরা" করো না ভাই, মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

অভিনেত্রী –                গান নাঁকি সুরে –
                  অমাবস্যার রাতে, চাঁদ ধরি আঙিনাতে
                        এসো এসো নিরালাতে,
                         চুপি চুপি কথা বলি,
                        প্রেমিক নায়কের সাথে।

উকিল / বড়দিদিমনি / গৃহবধূ – ওরে বাবা এর গলার আওয়াজটা তো অন্যরকম লাগছে। ও কি পেত্নী তাহলে?

নার্স – হ্যাঁ শুধু ও নয় তোমরাও সবাই কাল রাত্রেই মারা গেছো। দেহগুলো প্লাস্টিকে পুড়ে ফেলে দিয়েছি, এখন তোমরা মিথ্যে এসব পেত্নীর প্রলাপ বকছো।

নার্স – (হঠাৎ ঘুরে) মাথায় হাত দিয়ে ও বাবা আমার কি শেষ সময় আসতে আর দেরী নেই। না আমিও মরে গেছি?

গৃহবধূ – হ্যাঁ সিস্টার, তা নইলে তুমি আমাদের মতন ভূত প্রেতদের সঙ্গে থাকবে কি করে। তোমার প্রান্তি আর দেহের মধ্যে নেই।

নার্স – না না আমি বেঁচে আছি।

অন্যেরা – একেবারেই তা সত্যি নয়। তুমিও আমাদের দলে যোগদান করে ভূত হয়েছো, তাইতো আমাদের সঙ্গে এতক্ষন ধরে বচসা করে চলেছো।

ছাত্রী – চলো তবে সবাইমিলে একটু ভূতলামী করা যাক।

দিদিমনি – সেটা আবার কি?

ছাত্রী – মদ খেয়ে যেমন মাতলামী করে, তেমনি আনন্দে আবেগে আমরা বেশী আনন্দ করব।

গৃহবধূ – হ্যাঁ, সেই ভাল, চলো একটু গল্প গুজব করি, সবাইমিলে একসঙ্গে বসি।

বড়দিদিমনি – হ্যাঁ, গল্পের চেয়ে তো তোদের 'গুজবে' বেশী মন টানে।

ছাত্রী – কেন দিদিমনি কি হয়েছে তাতে? ন্যাতা ম্যাডাম আপনি অমন গুমসুম কেন কিছু বলুন। আপনিও তো এখন পেত্নীদের সমাজসেবী হয়ে গেছেন।

উকিল – ও মনে হয় এখন জ্বালাময়ী ভাষণ তৈরী করছে। ভূতের রাজ্যেও যদি ভোট হয় তাহলে ওকে ইলেকশন লড়তে হবে।

গৃহবধূ – তার আগে দাঁড়াও আগে আমরা গুজবগুলো ছড়ায়।

ছাত্রী – কি হয়েছে বৌদি বলুন না খুলে।

নার্স – এখানে গোলমাল করবেন না আপনারা। তর্ক বিতর্ক করতে হয় তো ঐ ওদিকের শ্মশানে চলে যান।

গৃহবধূ – কেন যাবো আপনার কথায়? এই হাসপাতালটায় এখন আমাদের ঘর।

নার্স – দাঁড়ান আমি এখনই লেডি পুলিশ ডাকছি। আপনারা অসুস্থ রুগিনীদের শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছেন না।
(হৈ চৈ ঝগড়াঝাটি শুরু হয়ে গেল) (লেডি পুলিশের প্রবেশ)

পুলিশ দিদি – হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমায় এই জেনানা ওয়ার্ডে পাঠালেন, এখানে নাকি খুব গোলমাল করছে করা।

ছাত্রী – এই যে পুলিশ ম্যাডাম এদিকে আসুন। এই সিস্টার কে এখন থেকে নিয়ে যান আর আমাদের অন্য সেবিকা দিন।

পুলিশ দিদি – আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমাকে বলা হয়েছে যে তোমাদের সব বেড খালি করাতে। নয়তো এই ডান্ডার বাড়ি খাবে বলে দিলাম।

গৃহবধূ – অ্যাঁ, মগের মুলুক নাকি? মারলেই হলো? (দর্শকের দিকে ফিরে) কতদিন পরে সংসার থেকে একটু ছুটি পেয়ে এখানে সাদা বিছানায় আরাম করছিলাম, আর উনি বললেই খালি করে দিতে হবে।

উকিল – বেশী জ্বালাতন করলে তোমার নামে এমন একখানা কেস ঠুকে দেবো না, বুঝবে তখন বাছাধন – কত ধানে কত চাল।

ছাত্রী – থামুন তো ম্যাডাম। আপনাকে আর কেস ঠুকতে হবে না, আগে নিজে বেঁচে থাকাটা প্রমান করুন দেখি।

নেত্রী – সমবেত ভদ্রমহোদয়া গণ, এখন আমার কথাটা মন দিয়ে শুনুন।

নার্স – আপনারা কেউ আর ভদ্রমহোদয়া নেই সব পেত্নী হয়ে গেছেন। সেই কথাটা কিছুতেই বুঝতে কেন পাচ্ছেন না কেন বলুন তো।

অভিনেত্রী – আমার কিন্তু বেশ বিশ্বাস হচ্ছে। কারণ মনটা বড় ফুরফুরে লাগছে।

বড়দিদিমনি – আমিও গীতার সেই স্থীতপ্রজ্ঞের মতন শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেছি। দুঃখে সুখে বিচলিত হচ্ছি না। তার মানে আমিও আর মানবী নেই মনে হয়।

পুলিশ – ছাত্রীকে তাড়া করতে করতে চলুন বাইরে চলুন। কিন্তু ওদের গায়ে ডান্ডা কেন লাগছে না। – অন্যদিকে গৃবধূকে – আয় তোকে চুলের মুঠি ধরে বের করে নিয়ে যাব।

গৃহবধূ – ধরো তো দেখি।

পুলিশ – এ কি রে বাবা এরও তো চুল দেহ কিছুই নেই শুধুই ছায়া।

নার্স – ঐ উকিল ম্যাডাম কে আগে নিয়ে যাও, আর ওদিকের ঐ ন্যাতা ম্যাম কে। ওরাই বেশী হল্লা করছেন এতক্ষন ধরে।

       (পুলিশ ধরতে যাওয়ার অভিনয়ে স্টেজে একটু লুকোচুরি খেলা)

সিস্টার, সিস্টার সত্যি করে বলুন তো এরা কি মানবী নন?

নার্স – সেই কথাটাই তো বলছি এতক্ষন ধরে।

পুলিশ – (ভয়ে আর্তনাদ করে) ওরে বাবারে আমি ভূত – পেত্নীদের মাঝে এসে পড়েছি, বাঁচাও, বাঁচাও।

                     (সবাই মিলে চেপে ধরে) –

উকিল ম্যাম – তাহলে তুমিই বা বাদ যায় কেন? সিস্টারের মতো এসো আমাদের দলে ভিড়ে যাও।

পুলিশ – সিস্টার আপনিও তাহলে –

নার্স – হ্যাঁ, পেত্নীরে আমিও এখন পেত্নী।

গৃহবধূ – চলো তাহলে সবাই মিলে একটু পিকনিক করি। ঐ দেখো পাশের হোটেলের ডাস্টবিনে কত মাছের আঁশ ফেলে দিয়েছে। চলো আমরা মুচমুচে করে ঐ আঁশগুলো ভেজে খাই।

ছাত্রী – তারসঙ্গে একটু গান বাজনাও চলুক।

                  (অভিনেত্রী এগিয়ে এসে নাচের তালে)

                        আমরা যত পেত্নী কত
                          আনন্দেতে আছি
                        যেমন খুশি থাকছি এখন
                          মরেও সুখে বাঁচি।
                        ঝুট ঝামেলা নেই এখানে
                         নেই রে কাজের তারা
                        মরণ পারে নতুন জীবন
                          জাগাই প্রাণে সারা।

দিদিমনি – ভূতের কেত্তন করতে করতে ঐ দেখো কতজন পুরুষ আসছে এদিকে।

ছাত্রী – অনেকদিন জেনানা ওয়ার্ডে আছি পুরুষ মানুষ দেখিনি। আজ ওদেরকে দেখে কি ভালো লাগছে যে – (ন্যাকা ন্যাকা গলায়)

দিদিমনি – আরে ওরা মানুষ নয়, পুরুষও নয় ওরা ভুতুষ। তাই ওদের জন্যে অপেক্ষা করে লাভ নেই।

অভিনেত্রী – না না ওদের না হলে চলে নাকি? দাঁড়াও একটু মেকআপ করে নি আগে – শাড়িটা পেঁচিয়ে পরি।

নার্স – তোমার তো এখন শরীরই নেই। এতো সাজের ঘটা কেন বাবা। ওই যে ন্যাতা ম্যাডাম আবার কি বলেন শুনি।

ন্যাতা – বান্ধবীগণ – আসুন আজ আমরা এক নতুন অঙ্গীকার করি। পেত্নী হলেও আমরা তো নারী জাতি। তাই সকল রমণীর হয়ে আমরা পুরুষের একচেটিয়া অধিকার থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন হই।

দিদিমনি – এখন আর অত কথায় কাজ নেই। আমরা সবাই বরং ঐ গঙ্গার জলে গিয়ে ঝাঁপাই।

ছাত্রী – হ্যাঁ, আমাদের ছায়া জলের সঙ্গে ঘুলে মিলে এক হয়ে যাক।

উকিল – আমরা আবার পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাই।

নার্স – তাহলে এবার পেত্নীদের প্রলাপ বন্ধ হোক। –

ছাত্রীরা – 
                   পেত্নী প্রলাপ বন্ধ করে
                     পালাই চলো সবে।
                  নাকে কান্না কাঁদলে মোদের
                      উদ্ধার কি হবে?
                   ওপর হতে ডাক এসেছে,
                     শোনো গো সব ভূত
                  মরণ দোলায় দুলতে দুলতে
                      হয়েছি অদ্ভুত।

                  মানব সমাজ আজ ছেড়েছি
                      আমরা যে অচ্ছুৎ
                    পেত্নী মোরা ভূতের পত্নী
                      করবো না খুঁত খুঁত।
                      সব অদ্ভুত কিম্ভূত।

                (নাচতে নাচতে পেত্নীদের প্রস্থান)




ভুতুষের ভূতলামী (একাঙ্ক নাটক) (Bhutusher Bhutlami)

চন্দনা সেনগুপ্ত

[একদল ডাকাত ও একজন ভুতের রাজা। তার অনেক প্রেতের প্রজা, আলেয়ার আলো, ফসফরাসের গ্যাসে শ্মশানে বাস করে কিছু জোনাকি ব্রহ্মদত্যি।]

ভুতের রাজা – আমি হলাম ভুতের রাজা।

দিন রাত খাই কাষ্ঠ ভাজা,

ভয় দেখতে পাই যে মজা –

আমার আছেন অনেক প্রজা।

কেউ বা ছিলেন নামী দামী,

কেউ বা ভীষণ আলসে কুঁড়ে,

কেউ বা থাকেন গাছের মাথায়

কেউ বা ওঠেন মাটি ফুঁড়ে।

চারিদিকেই শহর বাজার

ভিড় ভাড়াক্কা, শব্দ দূষণ,

এইখানেতেই শান্তি আছে,

অন্ধকার যে মোদের ভূষণ।

গ্রামের শেষে ছোট্ট নদী,

জল থাকে না সেথায় যদি,

পচা কুকুর, বেড়াল, গরু,

পড়ে থাকে কাদার গদি।

ওরাও মোরে ভুত হয়েছে

মোদের রাজ্য ঘিরে আছে।

শেয়াল, শকুন জ্যান্ত শুধু

ঘোরে তাদের কাছে কাছে।

ডাকাত সর্দার – এই কে রে ওখানে? ভারী সাহস দেখি! এই মধ্য রাতে আধো অন্ধকারে, দুর্গন্ধে ভরা পচা পাতা উইপোকাদের ঢিবি পেরিয়ে ওই ওখানে বসে কথা বলছিস ফিসফিস করে। কে তুই?

প্রথম ডাকাত – সর্দার এখানে যে ভীষণ দুর্গন্ধ, এখানে কেন নিয়ে এলে? দম বন্ধ হয়ে আসছে যে।

সর্দার – উঃ কি আমার নন্দ দুলাল রে? দম বন্ধ হয়ে আসছে (মুখ ভেঙ্গিয়ে) দেখছিস না কত মাল লুটেছি, কোথায় বসে ভাগাভাগি করব?

দ্বিতীয় ডাকাত – মাল পাওয়ার আগেই যে মোরে ভূত হয়ে যাব, এই পচা গ্যাসের মধ্যে থাকা যায় নাকি?

তৃতীয় ডাকাত – আর তা ছাড়া কি ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে মাটি, কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে। আমি তো আর এগুতে পারব না। যদি চোরা বালি থাকে? একদম ওর মধ্যে সেঁধিয়ে যাব যে, প্রাণটিও খোয়াবো আর মালটিও হারাবো।

প্রথম ডাকাত – (চিৎকার) সর্দার, সর্দার আমি গর্তে পড়ে গেছি, আমাকে সাপে কামড়ালো মনে হচ্ছে, উঃ মা গো – – – -। না না একটা ক্যাকড়া, আঙ্গুলগুলো যে ব্যাথায় টনটন করছে। সর্দার ফিরে চলো এখন থেকে।

সর্দার – আরে ওদিকে গ্রামের লোক সব উঠে গেছে। জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করা কি চাট্টিখানি কথা নাকি হে?

দ্বিতীয় ডাকাত – হ্যাঁ, বড় রাস্তায় পুলিশের গাড়ি ছুটছে, সাইরেন বাজিয়ে। কি হবে এখন?

তৃতীয় ডাকাত – (কাঁদতে আরম্ভ করলো) ও মা গো, ও বাবা গো, ওদিকে ওটা কিসের আলো? দপ করেই নিভে গেল।

প্রথম ডাকাত – ভুত – ভু – – ত –, ভুত – পালাও এখন থেকে, ভূতের চোখ জ্বল জ্বল করছে অন্ধকারে।

সর্দার – আরে চুপ সব ভীতু, আহম্মক ছোঁড়া। তোরা ডাকাতের দলে যোগ কেন দিলি বলতো। এতই যদি প্রাণের ভয় তো যা বৌয়ের আঁচল ধরে বসে থাক। এই সোনা দানা আর পেতে হবে না।

এমন সময় দূরে সত্যিই আলো জ্বলেই আবার নিভে গেল।

ডাকাতরা সবাই মঞ্চের এক কোণে বসে রাম নাম জপতে লাগল। – – রাম – – রাম – – রাম – – রাম

ভূতের রাজা – এঁ্যা এঁগুলো আবার কেঁ রেঁ? জ্যান্তো মানুষেরা আমাদের রাজ্য দখল করতে এঁয়েছে বুঝি?

প্রজা ভুতের দল – ঘাড় মটকে দেব না কি?

ভুতের রাজা – আরে নাঁ নাঁ, তোদের কিছুই করতেঁ হবেঁ নাঁ, ওরা ভয়েই মরেঁ যাবেঁ।

প্রজা ভুত – তাহলে বেশ হবে। আমাদের এই রাজ্যে ভুতের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে।

ভুতের রাজা – নাঃ আঁমরা তো বেঁশ আছি, এঁখানে আর ওঁদের ভিঁড় বাঁড়িয়ে দরকার নেই। ওদের এখানে লুকানো বের করছি। এখন থেকে তাড়াতেই হবে।

প্রজা – ডাক তো পেত্নী রানী কে – ঐ ডাকাতগুলোর সামনে একটু নাচ গান করলেই ওরা ওদের পেছন পেছন চলে যাবে।

দুজন পেত্নীর প্রবেশ – রাজা মশাই নমস্কার। আপনি আঁমাদের ডেকেছেন?

রাজা – হ্যাঁ, ঐ গাছের তলায় কজন জীবন মানুষ লুকিয়ে আছে, ওদের একটু ভয় দেখতে হবে, যাতে ওরা পালিয়ে যায়।

দুই পেত্নী –                                          হি – – হি – – হি – –

আমরা ভুতের ঝি – ।

পুরুষ মানুষ বশ করব –

শক্ত এমন কি?

হি – – হি – –  হি – ।

বাজনার সঙ্গে নৃত্য

দুলে দুলে তালে তালে –

চলো যাই পা ফেলে,

মোরা সবে দলে দলে

বসি গিয়ে পিঠে কোলে।

সহজে কি শ্মশানে তে

মানুষের দেখা মেলে?

ডাকাত সর্দার – (কোনা থেকে সাহস করে বেরিয়ে আসে একটা চাকু হাতে নিয়ে, তার মুখে আলো পড়বে)

(ভূতেদের নাচে নীল আলো ও সেটার বাদন চলছিল, এবার ডাকাতটি এগিয়ে আসবে -)

বুঝেছি এ ব্যাটারাও সব আর একদল ডাকাত, আমাদের মতোই এখানে লুকিয়ে আছে, আর আমাদের তাড়াবার জন্য ভুত সেজেছে। (হাতের লাঠি চাকু ঘুরিয়ে) – অ্যাই মেয়েগুলো আয় আমার সামনে, দেখি তোরা ছদ্মবেশী পুলিশ – না আমার মতোই চোর ডাকাতের বৌ মেয়ে।

(পেত্নীদের অন্তঃধান) –

(এবার ভুতের রাজার প্রবেশ) অন্ধকারে –

রাজা – কিঁ রে ডাকু সর্দার ! তোঁর সাহস তো কম নয়, আমাদের এলাকায় এসে আমার লোকেদের মানছিস না। দেখবি আমাদের কত শক্তি?

(তার শরীরের ওপরে আলো পড়বে। একটা কঙ্কাল লাগানো কালো জামার ওপরে সাদা কাগজ দিয়ে তৈরী)

ভুতের রাজা – আয় সামনে আয়, বড় যে তোর সাহস। এখনও প্রাণ আছে বলে দেখি এত আস্পর্দ্ধা। দেখ দেখি আমি ভুতের রাজা, নই মানুষ ডাকাত।

(তার চেহারা দেখে সকলে ভীত হয়ে পলায়ন, – সকলে ও বাবারে, ও মা রে – লুটের মাল সব থাকুক পড়ে)

এমন বিকট ভুতের মূর্তি

আগে কভু দেখিনি রে।

জীবন নিয়ে পালিয়ে যা রে।

আসবো না আর ভুতের দ্বারে।

(বলতে বলতে পলায়ন)

রাজা ও প্রজা ভুত আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। –

(পিছনে ড্রাম, তবলা, হারমোনিয়াম বাজতে থাকে। ভূতেরা ব্রেক ডান্স এর মতো নাচতে শুরু করে -)

প্রথম ভুত –                                         ভুতের সঙ্গে চালাকি?

আমরা ভীষণ ভয়াভয়

এ খবরটি যেন না কি?

দ্বিতীয় ভুত – স্যাঁতস্যাঁতে এই আস্তাকুড়ের পাশে

ঘাপটি মেরে থাকি শিকার আশে

গভীর রাতে ঝোপে ঝাড়ে

মরা প্রাণীর সঙ্গে থাকি।

মোদের সঙ্গে চালাকি?

তৃতীয় ভুত – মানুষ ভাবে পৃথিবীতে –

ওরাই করবে বাস,

আওয়াজ করে, আলোয় ভরে –

তাইতো ছড়ায় ত্রাস।

রাজা ভুত – কিন্তু মোরাও কম যায় না –

                 ভুতের যত ছানা পোনা,

                 নিজের রাজ্য পাহারা দিই

                 সব দিকেতেই লক্ষ্য রাখি।

                 ভুতের সঙ্গে চালাকি?

হটাৎ ধপ করে একটা আলো জ্বলে আবার নিভে যায়। ভূতেরাও ভয় পেয়ে যায়। একদিকে সবাই একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সবাই একসাথে — ওরে বাবা এটা আবার কি? নতুন কোন ম্যাজিশিয়ান মোদের ম্যাজিক দেখাচ্ছে নাকি?

(মঞ্চের একপাশে আবার দপ দপ করে আলো জ্বলে)

রাজা ভুত – (গম্ভীরভাবে) ব্যাপারটা তো খুঁটিয়ে দেখতে হচ্ছে? ওখানেও কি বদমাস, মানুষ, চোর, ছ্যাঁচোড়গুলো লুকিয়ে আছে নাকি? ধরা পড়ার ভয়ে?

প্রজা ভুত – রাজা মশাই, আঁমি একবার পরীক্ষা করে আঁসি।

রাজা – একা যাবি নে। অ্যাই, তোরাও সঙ্গে যা না।

(শেয়ালের ডাক – হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ। পেঁচার হুট হুট, বাদুড়ের দানা ঝাপটানোর আওয়াজে একটু ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি। শন শন হওয়ার শব্দ।)

(প্রজা ভুত সাহস করে মঞ্চের একপাশে গিয়ে আওয়াজ দেয়।)

প্রজা ভুত – কে কে ওঁখানে? ঘাপটি মেরে বসেঁ থাকা বের করছি, আঁয় বের হয়ে আয় বের হয়ে আঁয়। রাজার সামনে হাজির করি।

[মাথায় টুনি বাল্ব জ্বলছে আর নিভছে, একদল জোনাকি পোকার দল এসে হাজির] [জোনাকিদের নৃত্য বাজনার তালে তালে]

জোনাকির দল – আমরা জোনাকি পোকার দল গো ভুত মশাই। আমরা তো এই ঘন গাছের পাতায় অন্ধকারে লুকিয়ে থাকি। তোমরা আমাদের চেনো না কি?

প্রজা ভুত – ও জোনাকি কি সুখে ওই

                   ডানা দুটি মেলেছো – – – -।

                     – – – – গান – – – ।

জোনাকি – ওমা এই ভুতটা আবার রবীন্দ্রসংগীতও গাইতে পারে। কি সুন্দর গলা।

প্রজা ভুত – কেন পারবো না, আমি যখন বেঁচে ছিলাম তখন শান্তিনিকেতন-এ তো পড়তাম। সব মানুষগিরি ভুলে গেছি কিন্তু ঐ গুরুদেবের গানগুলি ভুলতে পারিনি।

জোনাকি – তা বেশ, তা বেশ, কিন্তু তোমাদের রাজা এমন ভয় পেয়ে গেছেন কেন?

প্রজা ভুত – ওই কী একটা আলোর ঝলক উঠেই নিভে গেল না, তাই ভাবলাম এখানেও কোন ইলেকট্রিক লাইট লাগাচ্ছে নাকি?

জোনাকি – ও ওটা আলেয়া।

ভুত – সে আবার কি?

জোনাকি – ও তো এই স্যাঁতস্যাঁতে মরা পঁচা আবর্জনার মধ্যে ওঠা একটা গ্যাস। ও তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। ও একরকমের ভুত। গাছের তো প্রাণ ছিল তাদের ভুত।

প্রজা ভুত – আলেয়ার সৃষ্টি কি করে হয় ভাই?

জোনাকি – গাছপালা পচনের ফলে যে মার্শ গ্যাসের সৃষ্টি হয়, সেই মিথেন গ্যাস দাহ্য ফসফিনের PH3 ও ফসফরাস ডাই হাইড্রেড P2Hq থেকে।

প্রজা ভুত – তা কি করে হয়?

জোনাকি – পঁচা পাতা পলি মাটি থেকে মিশ্রিত মিথেন গ্যাস বাতাসের সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। তাই ওই আগুন দপ দপ করতে দেখা যায়।

প্রজা ভুত – জীবনানন্দের ঝরা পালকে – লেখেন –

“প্রান্তরের পারে তব তিমিরের খেয়া

নীরবে যেতেছে, দুলে নিদলী আলেয়া।”

জোনাকি – তাই অনেক লোক আলেয়া ভুত ও বলেন।

প্রজা ভুত – ওঃ তাই বলো। আমরা হই মানুষ মরে। আর ওদের সৃষ্টি পঁচা গাছের পরে। তাহলে তো ওদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।

রাজা ভুত – যাক বাবা বাঁচলাম। কিন্তু আমরা সব ভূতেরাই তো কথা বলতে পারি, আলেয়া কথা বলে না কেন রে?

প্রজা ভুত – গাছেরও তো মূক বধির। কিন্তু তাদের তো প্রাণ আছে। তাই তারা মরে পঁচে গর্তে বাস করে আর আলেয়া ভুত হয়ে যায়।

শাকচুন্নির প্রবেশ – (পা দুটি বেঁকিয়ে) আমি তো ওই আলেয়ার কাছ থেকেই আসছি। যে সব মহিলা শাঁখা পরেন, আমি তাদের ঘাড়ে গিয়ে চাপি। কিন্তু ঐ জীবন্ত মানুষেরা ওঝা এনে আমায় ঝাঁটা পেটা করে। ধুনোর ধোঁয়ায় চোখে মুখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, তাই শাকচুন্নি, পেত্নী নামে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। এখানে এসে এতজন ভুত পেত্নীদের পেয়ে খুব ভাল লাগছে।

মামদো ভুত – (মোটা গলায়) আমি ঐ মুসলমানদের গোরস্থানে মানে কবরে থাকি। যত মৌলবী ফকিরদের সঙ্গে বসে নামাজ পড়ি।

রাজা ভুত – তা ভালোই করো, নিজের ট্রেডিশন, কালচার কখনও ছাড়া উচিৎ নয়।

গেছো ভুত – ঐ দেখো স্কন্ধ কাটা। রেলে মাথা দিয়ে মরেছে বলে ওর ঐ দেহে ঘাড় পর্যন্ত রয়েছে। তাই ওকে দেখে সবাই ভয় পায়।

মেছো ভুত – এই নদী খাল বিল গুলোতে খুব মাছ ছিল আগে। তাই খেয়ে খেয়ে আমাদের নামটায় মেছো ভুত হয়ে গেছে।

প্রজা ভুত – বাবারে বাবা এত রকমের ভুতের কথা তো আমরা সব ভূতেরাই জানি না। কিন্তু একজন ভূতকে সবাই জানি।

রাজা ভুত – আমাকে ছাড়া আর কাউকে মানবি না বলে দিচ্ছি, তাহলে তোদের মজা দেখিয়ে দেব।

প্রজা ভুত – তুমি দেখলে তোমারও শ্রদ্ধা হবে। তিনি হলেন সব ভূতেদের সেরা ব্রহ্মদত্যি। জ্ঞানী গুণী ব্রাহ্মণেরা অপঘাতে মারা গিয়ে এই মহান ভুতের উদয় হয়।

শাকচুন্নি – তেনার কিন্তু খুব দয়া মায়া। সহজে কারুর ক্ষতি করেন না। ভালো ভালো কথা বলেন।

নেতা ভুত – কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো – মানুষেরা বাচ্চারা আজকাল আর ভুত/টুতে বিশ্বাস করে না।

প্রজা ভুত – সূর্য্যি দেবের কাছে তো আমরা সবাই জব্দ, তাপও একদম সহ্য করতে পারি না।

রাজা ভুত – আজকাল সূর্য্য দেবের আলো থেকে শক্তি নিয়ে রাত্রে সোলারের আলো জ্বালাচ্ছে সর্বত্র। তাহলে কোথায় গিয়ে মুখ লুকাই বলতো? ব্রহ্মদত্যি দাদা কে বরং ডাকা যায় এই সভায়। তিনি কি রায় দেন দেখি। সবাই মাইল প্রার্থনা –

হে ব্রহ্মদত্যি দাদা একবার দেখা দাও। আমাদের জীবনে মানে এই মরে বেঁচে থাকার ব্যাপারটা শেষ করা যায় কি না, একটু বলে দাও। আমরা সব ভুতের দল বড় টেনশন এ আছি। একটা কিছু উপায় করো।

ব্রহ্মদত্যির আগমন – (গম্ভীরভাবে ধীরে ধীরে আলখাল্লা বা সন্যাসীর মতন কাপড় পরনে তার প্রবেশ) – বন্ধুগণ এসো, এবার সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, আল্লা বা ভগবানের দরবারে আমরা আর্জি করি। আমাদের ভুতুড়ে সম্প্রদায়কে শেষ করে তিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করুন।

“হে ঈশ্বর, আল্লা, প্রভু,

কাছে কেন হে আসো না কভু?

মোদের দশা শোচনীয়

আসবে না কি এখনও তবু?

আমরা হলাম প্রেত আত্মা –

তুমি শ্রেষ্ঠ পরমাত্মা

তোমার হাতের পুতুল সবাই

মানব, শিশু, জীবাত্মা।

আকাশবাণী

“এসো এসো সব অমৃত পুত্র।

জীবন মরণ বাঁধা যে সূত্র –

বৃষ্টি ধারায় ধুয়ে যায় আজ,

উদ্ভিদ রূপী পুষ্প পত্র।

পরিবর্তন নিয়ম মানিয়া,

পুনরায় যায় জগতে ফিরিয়া,

আকাশ হোক মাথার ছত্র।

ভূতের কেত্তন (একাঙ্ক নাটক) Bhuter Ketton

চন্দনা সেনগুপ্ত

ভূতেদের প্রবেশ মঞ্চে এই গানটি গাইতে গাইতে –

চল চল চল, রাতের আঁধারে ভূতের দল,

হারাস নে রে মনের বল,

দুঃখে শোকে হয়ে পাগল, কাটাস নে রে পল।

চল চল চল।

ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত,

আমরা ঘুচাবো ভেদ জাত পাত,

একে অপরের ধরিব হাত

বিশ্বাস সম্বল।

নব জীবনের গাহিয়া গান,

বাড়াবো সকল ভূতের মান

মানব জাতির করিতে ত্রাণ,

টুটাব মিথ্যে ছল।

চলরে নও জোয়ান, শোনরে ভূতের গান,

মহামারী করে দুয়ারে দুয়ারে মৃত্যুকে আহ্বান,

ভাঙ রে ভাঙ আগল, ঢালরে ঠান্ডা জল –

চল চল চল।

(মঞ্চটি আলো আঁধারিতে ঢাকা, পেছনে আকাশ ও মেঘের দৃশ্য। নিচে একটি পৃথিবীর মানচিত্র আঁকা গ্লোব। কালো পাজামা কুর্তা, কিন্তু পেছনে সাদা কাপড়ের চাদর, ভেসে আসার মতন হেলে দুলে চলবে।)

কুশীলব পাত্র পাত্রী – মহামারী ভূত, প্রলয় ভূত, সৈন্য ভূত, প্রেতাত্মা ও একজন বৃদ্ধ জ্ঞানী দাদু ভূত, বিজ্ঞানী ভূত এবং দুজন এলিয়েন (অন্য গ্রহ থেকে আগত)

ভূতেদের মধ্যে একজন বাঁকুড়ার ভাষায় ও একজন বাঙালি ভাষায় বলবে, একজন একটু তোতলাবে ও একজন নেতার মতন ভাষণ ঝাড়বে।

প্রথম মহামারী ভূত – ওহে ভূতের দল, অমনি করে খোস মেজাজে গান গেয়ে খোলা আকাশে ঘুরে বেড়ালেই চলবে?

দ্বিতীয় জন – কেন শোনো নাই, মাষ্টার মশাই কইলেন – ভূতের কেত্তন ক্যান করস?

তৃতীয় জন (মুসলিম) – কি আমাদের তোমরা কীর্তন করতে বলছো? আমরা কি হিন্দু যে খোল করতাল নিয়ে কীর্তন গাইবো?

প্রথম জন – তবে ‘কাওয়ালী’ গাইবো নাকি? সূফীগান?

দ্বিতীয় জন – না ভাই, আমরা কীর্তন ও জানি না আর কাওয়ালীও গাইতে পারি না, তবে খ্রিসমাসে যীশুখৃষ্টের ক্যারোল গাইতে পারি। –

তৃতীয় জন – তবে যার যা ইচ্ছে গাও না, কে মানা করবে এখানে? পণ্ডিত, মৌলভী, পাদ্রীরা কেউ তো নেই, যে গোল করবে।

প্রথম জন – ভজ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গের নাম – – – – –

দ্বিতীয় জন – কাওয়ালীর সুরে – আ — আ — কানে হাত দিয়ে তালি বাজিয়ে আল্লাহ হু – হু – হু

তৃতীয় জন – জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল অল দি ওয়ে – – –

জ্ঞানী – (জোর গলায় সবাইকে থামিয়ে দেন) চোপ! চুপ সব। বোকা ভূতের দল। তোদের আবার এখন ধম্ম আছে নাকি? মানুষ জন্মের কথা এখানে মনে করে এমন হল্লা করছিস কেন রে তোরা?

প্রথম জন – আকাশটাকেও মাছের বাজার করে দিল। বাপরে কি শোরগোল !

জ্ঞানী ভূত – শান্ত হয়ে বসে একটা কিছু করা যাক।

প্রথম জন – একটা “অশরীরী ক্লাব” মানে সংগঠন করলে হয় না? সেখানেই গান, গল্প সব করা যাবে। সেটাই তো ভূতের কেত্তন হবে।

দ্বিতীয় জন – না হে না, আমার এখনও ওদের ওপর রাগ কমেনি। আমাকে ওরা কবর না দিয়ে মাঝপথেই পুড়িয়ে দিল। কি অন্যায় বলো তো। এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

তৃতীয় জন – আরে মশাই, আমারে তো পোড়ানোও হল না, নদীর জলে ভাসাই দিল।

প্রথম জন – আমাকে তো ভাসাতেও পারেনি, গ্রামে নদী নেই বলে জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে গেল, – কত শেয়াল, কুকুরে কামড়ে কামড়ে খেয়েছে, ও মাগো সে যে কি যন্ত্রনা – – –

জ্ঞানী ভূত – অ্যাই, হতভাগা, তখন তো তুই মরেই গেছিলি, ভূতের আবার ব্যাথা লাগে নাকি?

বিজ্ঞানী ভূত – (হটাৎ আবির্ভাব রাগত ভাবে) ওরে আহম্মকের দল মরেও তোদের শিক্ষা হল না?

জ্ঞানী ভূত – একটা করোনা – না কি কোভিড১৯ নামে অতি ক্ষুদ্র ভাইরাস এসে সারা বিশ্বের সমস্ত ধনী-দারিদ্র, সাদা-কালো, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিষ্টান-হিহুদীদের এক পংক্তিতে দাঁড় করিয়ে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তবু তোরা এখনও ধর্ম, বর্ণ, জাতপাতের লড়াই ছাড়তে পারলি না?

বিজ্ঞানী ভূত – (মাথা নেড়ে) তাই না বটে, কত কষ্ট করে পরিশ্রম ও সাধনার পরে আমরা বিজ্ঞানী, গবেষক আর ডাক্তাররা মিলে ভ্যাকসিন বানালাম, জানিনা কতটা কাজে লাগবে? তার আগে নিজেই মৃত্যুর শিকার হলাম।

জ্ঞানী ও বৃদ্ধ ভূত – (সাদা চুল দাড়ি নিয়ে প্রবেশ) – মানব দেহ তো আর নেই এখন, খাঁচা খুলে যেমন পাখি বেরিয়ে যায়, তোমরাও তাই এখন সবাই মুক্ত। এখানে এসে আবার ঝগড়া বিবাদ কেন করছো বাবা রা? (কাঁপা কাঁপা গলায়)

প্রথম ভূত – হ্যাঁ, দেখুন না দাদু, আমি আমি ‘কেত্তন’ মানে আমি বলছিলাম একটু আলাপ আলোচনা করি, পরের প্রজন্মকে কিভাবে জীবন কাটাতে শিক্ষা দেবো, তা তা তা এরা (একটু তোতলিয়ে) সব কথা কাটাকাটি, ত – – র – কো শু – – রু করে দিল।

তৃতীয় ভূত – দূর ভবিষ্যতের লোকের কি কইরা শিক্ষা দিমু। ওগো কারো জ্ঞান শোনার অভ্যাস নাই, – হ্যাঁ ওসব কথা ছ্যাড়ান দাও।

দ্বিতীয় জন – যখন বেঁচে ছিলাম তখন এই গরীবদের কথা কেউ শুনতো না আর এখন ভূতের কথা মানতে ওদের বয়ে গেছে (মুখ বেঁকিয়ে)

(অন্য দিক থেকে আরও ২/৩ জন কুশীলবদের প্রবেশ – চেহারা খুবই বিদ্ধস্ত, চুল উস্কো খুস্কো, খুব জীর্ন শীর্ন করুন অবস্থায় ধীরে ধীরে মঞ্চে আসে।)

প্রথম ভূত – তোমরা আবার কথা থেকে এলে ভাই?

তিন জন কথা বলল একসাথে – আমরা হলাম প্রলয় ভূত ! বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, সুনামির ঝরে বা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, জঙ্গলের দাবানলে প্রাণ হারিয়েছি।

দ্বিতীয় জন – ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত মানুষে ভূত হল কে জানে?

বিজ্ঞানী ভূত – কেন এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, Natural Calamity , Disaster জানো?

প্রলয় ভূত – সবাই বলছে মানুষই নাকি তার জন্য দায়ী।

তৃতীয় ভূত – হ হ আমিও শুনছি, গাছপালা কাইট্যা ওরা পৃথিবী মা রে শূন্য কইরা দিতেছে। পাহাড় ভাঙ্গত্যাসে, নদীরে বাইধ্যাঁ দিয়া যা মন চায় যা মন চায় করত্যাসে তাই তো এরকম হইলো।

জ্ঞানী ভূত – ঠিক বলেছো। পলিউশন এর জন্য এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং।

প্রথম ভূত – সেটি আবার কি গো জ্ঞানী বাবা?

দ্বিতীয় ভূত – আরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং মানে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি। দেখছো না উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর বরফ কেমন করে গলছে।

প্রথম ভূত – ওই জীবন্ত মানুষগুলোর মাথায় এই প্রদূষণ ব্যাপারটা ঢোকেনি এখনও। (নাঁকি সুরে – কি যে হবেঁ ওঁদের)। চলো না সবাই মিলে কিছু করি।

(এবার একটা যুদ্ধের বাজনা, সব ভূতেরা সচকিত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ায়। মার্চ করতে করতে একদল লোকের প্রবেশ।)

যুদ্ধে নিহত ভূতেরা মার্চ করতে করতে আসবে –

“কদম কদম বাঢ়ায়ে যা –

নতুন পথে আগায়ে যা –

স্বর্গ নরক কোথা আছে

খুঁজতে খুঁজতে গান গা –

কদম কদম বাঢ়ায়ে যা – – – – ।

তারপরে লেফট রাইট লেফট রাইট এটেনশন বলে স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়াবে।

তৃতীয় ভূত – ওরে বাবা খাই সে রে, এ ডা আবার কে ডা আইতাসে?

বাঁকুড়ার ভূত – একবার তো ভগবান মারলেক, ইয়ারা কি দুবার করে মারত্যে আইছে নাকি?

প্রথম সৈন্য ভূত – আরে আরে ঘাবড়াচ্ছো কেন, আমরাও তো তোমাদের মতোই ভূত গো।

দ্বিতীয় সৈন্য ভূত – মহামারী শেষ না হতেই বোকা মানুষেরা আবার যুদ্ধ লাগিয়ে দিল, হতভাগারা কেউ শান্তি চায় না।

প্রথম সৈন্য – সৈনিক বিভাগে নাম লিখিয়েছিলাম কত আশা ভরসা আর সাহস নিয়ে, কিন্তু এমন বেঘোরে প্রানটা যাবে, তখন কে ভেবেছিল?

জ্ঞানী ভূত – (এগিয়ে এসে) এসো ভাই এখানে ভূতের রাজ্যে ওসব গলা বারুদ, প্যাটন ট্যাঙ্ক নেই, অপার শান্তি আর আনন্দ।

প্রথম সৈন্য – শুধু গোলাবারুদ বন্দুক? ওই যুদ্ধবাহী জাহাজ এরোপ্লেন, মিশাইল এগুলো কে যে বানায় আর কেন যে বানায়।  শালা ঘাড় মটকে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব?

বিজ্ঞানী ভূত – এটোমিক এনার্জি দিয়ে কত ভালো ভালো কাজ করা যায়। আর এরা নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে পৃথিবীটার কি হাল করে দিল। ঈশ্বর জানেন কি করে এর প্রকোপ কমবে

(ওয়ার ভিক্টিম) – একটু কাঁদো কাঁদো সুরে মঞ্চের সামনে এসে – আমরা মহামারীতেও মরিনি, যুদ্ধেও যায়নি। গ্রামে চাষ আবাদ করছিলাম। কাদের জানি না একটা মিসাইল এসে আমাদের বাড়ি, ঘর, জমি, ছেলে-মেয়ে, পাঠশালা, হাসপাতাল সব ভেঙ্গে চুরে শেষ করে দিল। ওরা আমাদের সুন্দর একটা নামও দিয়েছে “ওয়ার ভিক্টিম” – অসহায় নাগরিকরা আজ তাই ভূত হয়ে তোমাদের ‘কেত্তন’ – আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছে।

তৃতীয় ভূত – অহন বিচার তর্ক ছাইড়্যা কিছু করন লাইগবো।

নাকি সুরে সবাই – হ্যাঁ হ্যাঁ এখন কিঁ কঁরা যাঁয় ভাঁব দেঁখি সঁবাই।

জ্ঞানী ভূত – বিশ্বের সমস্ত ভূত এবার এক হও।

বিজ্ঞানী ভূত – আমাদের এখন থেকে আর কিছুই করতে হবে না। ওরা নিজেরাই খাওয়া-খায়ি, মারামারি হিংসা করে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনবে। তার আর দেরী নেই।

(হটাৎ মঞ্চের পেছন দিক থেকে একজন প্রেতাত্মা ভূতের আবির্ভাব)

প্রেতাত্মা – অ্যাই কি হচ্ছে এইসব? এ তো যেমন তেমন নয়, এ যে বিরাট ভূতের সভা হচ্ছে দেখছি। (শুঁকে শুঁকে) নাঃ তোমাদের গা থেকে তো এখনও মানুষ মানুষ গন্ধটাই গেল না দেখছি। ঘাড় মটকানো, আক্রমণ, লুন্ঠন, লড়াই, ঝগড়া এসব তো মানুষ নেতাদের কাজ।

তৃতীয় ভূত – তুমি কে ডা? আমাগো বুদ্ধিমান জ্ঞানী দাদুরও জ্ঞান ঝাড়ত্যাসো?

দ্বিতীয় ভূত – হুঁ হুঁ তুমাকে আর বাক চাতুরী করত্যে হবেক লাই। লাও একটা বিড়ি দাও তো বাপু। একটু টান দিই।

প্রথম ভূত – আরে বুদ্ধু বিড়ি জ্বালাতে গেলে আগুন চাই না, ওটি এখানে কোথা পাবে বাপধন?

প্রেতাত্মা – আমি প্রেতাত্মা ভূত। নেতাদের কথাই বাড়ির লোকের জ্বালাতনে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছি। এখানে এসে আবার সভা আর লেকচারের বাহাদুরী। এখন কি আর করি। বিষও নেই যে পান করে দু-বার আত্মহত্যা করবো।

প্রথম ভূত – হ্যাঁ ভাই, এবার আমার হাসি পাচ্ছে, হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ – মানুষকে শিক্ষা দেবে ভূতে? ওর জন্যে কত চিন্তা করতে হয়, মাথা ঘামাতে হয়।

তৃতীয় ভূত – হুঁ আমাগো মাথাই নাই, সব ঘিলু যখন শুকাই গ্যালো তখন প্ল্যান বানাই কেমন কইরা?

দ্বিতীয় ভূত – আমরা তো ওখানেও শ্রকিক ছিলাম। লেবারদের আবার কোনো মূল্য আছে নাকি? খেটে খেটে আধমরা হয়ে যেতাম, তখন কেউ শিক্ষা দিতে আসতো ‘ভূতের বেগার খাটছিস কেন’?

তৃতীয় ভূত – তা ঐ ব্যা গ্যার ব্যাপার টা কি এখানেও করতে হবে না কি?

সৈন্য ভূত – (লেফট রাইট – লেফট রাইট করে গোটা মঞ্চ ঘুরে বেড়ালো) ও হো প্যারেড করছি কেন? আমার তো এখন বন্ধুক ঘাড়ে নেই, কেউ অর্ডারও দিচ্ছে না। দেখি ওদিকে এদিকে ঘুরে যদি একজন মনের মত পেত্নী জোগাড় করতে পারি।

জ্ঞানী ভূত – দেখো কান্ড ! মানুষ গিরি করাটা আর ছাড়তে পারলি না তোরা? এখানে এসেও সঙ্গিনীর খোঁজ, যত্তসব !

দ্বিতীয় ভূত – হঁ খুঁজত্যে হবেক লাই মোরে গেছি বলে কি শখ সাধ থাইকতে লাই?

(সব ভূত হেসে ওঠে হা হা হা হো হো হো)

বিজ্ঞানী ভূত – তেনারা যতক্ষণ না আসেন ততক্ষনই ‘কেত্তন’ করতে পারো। এলেই তো গোলমাল বাঁধিয়ে দেবেন।

প্রথম ভূত – হঁ বাবা আবার সেই গোলামী করা, মন জুগিয়ে চলা, পেছন পেছন ঘোরা –

দ্বিতীয় ভূত – ইত্য পেত্নী প্রীতি কেনে ভাই? চলো বেড়াতে যাই।

(মঞ্চে একটা বাক্সের মতো গাড়ি ঢুকবে অন্ধকারে। হঠাৎ একটা বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। কেঁপে উঠবে ভিষণ আওয়াজ।)

ভূতেদের মধ্যে একজন – ও বাবা এ যে দেখি একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত।

(গম্ভীর গলায় কে যেন সেই বাক্স বাহনটির থেকে বেরিয়ে এল আর বলল-)

এলিয়েন ভূত – ওরে মানুষ ভূতের দল, আকাশে এসে এতো গোলমাল করছো কেন হে তোমরা?

বিজ্ঞানী – তুমি কে ভাই? একদম অন্যরকম দেখতে লাগছো। কোথা থেকে এলে এখানে?

প্রথম ভূত – ও মনে হয় স্বর্গের দূত। ভালো লোকেদের মানে ভূত – আত্মাদের নিতে এসেছে।

দ্বিতীয় ভূত – আর ঐ দেখো ওর সঙ্গে মাথায় হেলমেট এন্টিনা লাগানো আর জন রয়েছো, ও বোধহয় যমরাজের দূত।

তৃতীয় ভূত – হঃ আমাগো মনে হয় জান্নাত থেইক্যা পয়গম আইসতেছে। দেখি কারে কারে লইয়া যায়?

দ্বিতীয় ভূত – হঁ তা হবেক, উয়ারা মারকুটটা, বদমায়েশ গুলাকে লিয়ে যাবেক।

তৃতীয় ভূত – অ্যাই তরা চুপ করবি? যমদূত কো আর দ্যাবদূত ওগো কথা কোষের চান্সটা দেওন লাইগব।

এলিয়েন – আমরা অন্য গ্রহের বাসিন্দা এখনও বেঁচে আছি। তবে আমাদের স্পেস শিপটি এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কাছে আসতেই হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যে ফিরে যেতে না পারলে, আমরাও তোমাদের মতন ভূত হয়ে যাব।

যমদূত এর মতন এলিয়েনটা – ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো আমি এই ধোঁয়া আর ধুলোর পলিউশনে ঢাকা পৃথিবীতে থাকবো না গো। আমি আমার নিজের গ্রহে কেমন করে যাব, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ।

প্রলয় ভূত – কেঁদো না সোনা, কেঁদো না। আমাদের জ্ঞানী দাদু আর বিজ্ঞানী জ্যেঠু নিশ্চয় একটা উপায় বের করবেন।

জ্ঞানী ভূত – (বৃদ্ধ দাদু এগিয়ে এসে) আমি জানি তোমাদের মতন এলিয়েনরা আমাদের পৃথিবীতে আগেও এসেছেন, আমি সুইস লেখক দার্শনিক “ভন দানিকেনের” লেখায় পড়েছি – Gods are from outer space, দেবতারা কি অন্য গ্রহের মানুষ ছিলেন, তাই নিয়ে উনি অনেক কথাই বলেছেন, “পুষ্পক রথ” যে Space ship এ বিষয়ে আমাদের আজ আর কোনো সন্দেহ নেই।

এলিয়েন – আমরাও আসছিলাম মানুষের জন্য কিছু ভালো দৃষ্টান্ত নিদর্শন রেখে যেতে কিন্তু তা আর পারলাম না।

যমদূত নামে এলিয়েন – আমাকে যমদূত বলে দূরে সরে যাচ্ছো কেন? তোমরা তো ভারী অদ্ভুত!

মহামারী প্রলয় ভূত – না গো আমরা অদ – ভূত নই। একেবারে সত্যিকারের দেহহীন অশরীরী আত্মা, ভেজালহীন প্রেত। শুধু ভেসে ভেসে বেড়াই।

(এবার সেই বিজ্ঞানী ভূত এগিয়ে আসেন এবং গম্ভীরভাবে বলেন)

তোমরা সবাই গোলমাল থামাও, আমি যদি একবার তোমাদের রকেট মানে ঐ স্পেস শিপটা দেখি, আপত্তি আছে কি?

এলিয়েন – না, না আপনি আসুন না দাদা, প্লিজ, আপনি যদি এস্তোফিজিক্স পরে থাকেন, তাহলে নিশ্চই হেল্প করতে পারবেন।

বিজ্ঞানী – হ্যাঁ, আমি NASA তে কাজ করেছি, এস্টোনোটদের মঙ্গোল গ্রহে – চাঁদে পাঠাই – দেখি একবার চেষ্টা করে। (তিনি মেশিনটা পরীক্ষা করতে লাগলেন)

অন্য ভূতেরা তাঁকে ঘিরে গান করতে লাগলো –

“ভূত হয়েছে বলে কি ভাই বুদ্ধি গেছে মরে?

সরিয়ে দেব অন্য গ্রহের যন্ত্রটি ঠিক করে।

মানবজাতির আত্মা মোরা বড়ই শক্তিধর।

সবাই মিলে ধাক্কা দেব বাহন চালু কর।”

গাড়ি যেমন ঠেলে তেমনি অ্যাকশন করে এবং মানুষ ভূতের চেষ্টায় স্পেস শিপটি চালু হয়ে যায়। সবাই মিলে হাততালি দিয়ে আনন্দ করতে থাকে।

এলিয়েন – ধন্যবাদ ভূত বন্ধুরা। তোমরা যে শুধু বুদ্ধিমান ও প্রতিভাশালী তা নও, তোমাদের মত দয়ালু পরোপকারী প্রাণী আর অন্য কোনো গ্রহে আমরা কখনও দেখিনি।

তৃতীয় ভূত – কি কইত্যাসেরে, আমাগো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূতের এওয়ার্ড দেওন লাইগবো।

দ্বিতীয় ভূত – নিজের বড়াই করত্যে হবেক লাই, বিজ্ঞানী দাদা বুঝাই দিলেক মানুষ জাতটো কেমন বট্যে।

এলিয়েন – চলো কে কে তোমরা আমাদের সঙ্গে অন্য গ্রহে পাড়ি দেবে।

প্রলয় ভূত – না ভাই, যতই ঝঞ্জা, আঁধি, তুফান, বন্যা, খরা হোক। জগৎজননী ছেড়ে আমরা কোথাও যাবো না।

সৈন্য ভূতেরা – এটেনশন, এস ভূত ভাইয়েরা এলিয়েনদের বিদায় দাও। বিদায় বন্ধু বিদায় –

জ্ঞানী ভূত – শ্যামল ধারার দিকে তাকাও কী সুন্দর ঝলমল করছে। এস এখন সবাই মিলে শান্তির গান গাই। পৃথিবীর জীবন্ত লোকেদের মনে আসার বার্তা শোনাই।

হও প্রেমে সবে ধীর,

হও কর্মেতে বীর,

সত্যেতে থাকো স্থির

নাহি ভয়।

থামাও গো প্রদূষণ !

বাঁচাও প্রকৃতি ধন

ভাইরাস অগণন হোক ক্ষয়।

নাই ভাষা, নাই ভেদ, নাই পরিধান,

এ বিশ্ব মাঝে তাই ভূতেরা মহান,

দেখিয়া জগৎ হবে লজ্জায় ম্লান,

ভূতেরা গাহিছে ওগো শান্তির গান।

দেহ খাঁচা ছেড়েছি যে নই পরাধীন

যত রোগজীবাণুরা হল আজি ক্ষীণ,

ভূতেরা সবাই কাম, ক্রোধ, লোভ হীন,

জীবন্ত লোক অজ্ঞান

ভূতেদের করো সম্মান।

[ শেষ গান গাইতে গাইতে ড্রপসিন পড়বে। ]

ফাঁকি ( Fanki )

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফাঁকি কথাটার মধ্যে একটা বিরাট ফাঁক থেকে যায়। একজন আর একজনের হৃদয়ে – অন্তরের অন্থঃস্থলে উঁকি মেরে যদি দেখি, সেখানে অনেক শূন্যতা-র আভাস পাই। বাইরে থেকে হয়তো খুব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নজরে আসে, কিন্তু মন দিয়ে তার অন্দরমহলে গেলে বুঝতে পারি, অনেকগুলো ঘর তালা বন্ধ। সেখানে কেউ নেই। কিছু বস্তু/সম্পদ কি রক্ষিত আছে – না? – তালা ভেঙে দেখা যায়, তাও নেই, শুধু খালি, একেবারে শূন্যতা।

আর সেই জায়গাগুলো ভরতে গেলে অনেক অনুভবী হতে হয়, – গভীর মননশীলতা ও সহানুভূতি লাগে। – এক মানুষের মনের কষ্ট, হতাশা, দুঃখ আর একজন যখন জানবার বা বোঝবার চেষ্টা করে, তখন সবচেয়ে দরকার হয় – ভালোবাসার উষ্ণ পরশের। স্নেহ, প্রেম ও দয়া এমন এক উত্তাপ আনতে পারে – যা ভয়ঙ্কর কঠিন পাষাণকেও গলিয়ে দেয়। মানব হৃদয় তো বরফের মতন, একটু আদর পেলেই গলে জল হয়ে যায়।

পৃথিবীতে স্বামী স্ত্রীকে, বন্ধু বন্ধুকে, মালিক কর্মচারীকে বা কখনও কখনও সাধুবেশী গুরু তাঁর শিষ্যকে ছলনা করেন। প্রাপ্য প্রাপকের সম্পর্কে চিড় ধরে। কারন অল্প মাত্রায় হলেও কেউ কাউকে ফাঁকি দিলে একদিন কিন্তু তার নিজের জীবনেও এক সময়ে একটা বিরাট ফাঁক এসে যায়।

অর্থ লিপ্সা, যশ বা নামের লোভ চলার গতিকে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু পাহাড়ী নদী হটাৎ যেমন পাথরের ফাঁকে ঢুকে পড়ে, দেখে আর বেরোবার রাস্তা নেই, তখন তাকে ভীষণ খাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় – জলপ্রপাতের রূপে। ঠিক তেমনি মানব জীবনও কভু বা পথ নির্ণয় করতে না পেরে হটাৎ অন্য খাতে বইতে শুরু করে। পড়ে যায় গহ্বরের ফাঁকে। মধ্যবিত্ত ঘরের আদর্শবাদী পিতা মাতার সন্তান স্ত্রীকে খুশী করবার জন্য ঘুষ নিতে আরম্ভ করে – তার মূল্যবোধে বেশ বড় রকমের ছিদ্র হয়ে যায়।

সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত ধনী পরিবারের মেয়ে প্রথম যেদিন বন্ধুদের পার্টিতে গিয়ে মদ্যপানের স্বাদে মাতে, সেদিন তার নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার নেশা লাগে মনে।

ফাঁকি – নিয়ে লিখতে বসে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই ‘বিনু’ নামে অসুস্থ মেয়েটাকে। পঁচিশ বছর বয়সেই যাকে রোগে ধরেছিল, তার স্বামী তাকে হাওয়া বদলের জন্যে পশ্চিমে যাত্রা করেছিলেন। মাঝপথে ট্রেন বদলের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষারত ঝুমরু কুলির বৌ মহিলা যাত্রী নিবাসে ঝাড়ু লাগাতে এলে বিনু তার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করতে বদ্ধ পরিকর হয়, অনুরোধ করে – স্বামীর কাছে, তাকে টাকা দিতে। তার সেই আবদার কিন্তু রক্ষা করেননি তিনি উল্টে বকুনি দেন – সেই কুলিকে ডেকে, যাত্রীদের কাছে টাকা চাইবার জন্য। ওদিকে স্ত্রী কে বলেন, যে তিনি তার কথামতো ঐ বৌটিকে সাহায্য করেছেন। বিনু সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানায়। দুই মাস পরে যখন বিনুর মৃত্যুর পর পশ্চিম থেকে স্বামী একা ফিরছিলেন, তখন ঐ স্ত্রীকে ঠকাবার কথা ভেবে অত্যন্ত ব্যথিত ও লজ্জিত বিচলিত হয়ে ঝুমুর কুলির খবর নেন তিনি। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি, শুধু ঐ বিষম ফাঁকির অপরাধবোধ তাঁকে কুরে  কুরে দংশন করতে থাকে।

এইরকমই একজন বিমলবাবু ও তাঁর পত্নী সরোজিনীর কথা আমি জানি। যিনি পেশায় ব্যাংক ম্যানেজার ও তাঁর ভালোই উপার্জন ছিল,  কিন্তু স্ত্রী যখন তাঁর গরিব ভাইয়ের মেয়েটিকে পাত্রস্থ করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ বৌদির চিন্তা লাঘব করবার ইচ্ছায় তাঁর স্বামীর কাছে  টাকা সাহায্যের আর্জি পেশ করেন, তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ হয়ে যায়। বিমলবাবু বলেন, – “আমি কেন দেব, যাদের মেয়ে তারা এতদিন জোগাড় করতে পারেনি?”

স্ত্রী সরোজিনী বলেন, “দেখো তোমার কত বড় চাকরী ব্যাংকে ….” কথাটা শেষ করতে না দিয়েই গর্জে ওঠেন তিনি – “তো ব্যাংকে অন্যেরা যে টাকা গচ্ছিত রাখে তা থেকে চুরি করবো না কি?”

– না না তা কেন গো, আমার তো মেয়ে নেই, ছেলেরাও…..” এবার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল তাঁর।”

-“মেয়ে নেই তো ছেলেদের পড়ার খরচ নেই? সব তোমার বাপের বাড়িতেই ঢালবো। যাদের টাকা নেই তারা মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে চাইছে কি সাহসে?” রেজিস্ট্রি বিয়ে দিতে বলো।”

সরোজিনীর চোখে জল এসে গেল, কিন্তু ছোট থেকেই তাঁর মা তাকে শিখিয়েছেন “বোবার শত্রু নেই” আর স্বামীর মুখের ওপর কথা বলার সাহসও নেই তাঁর।

 প্রায় কুড়ি বছর পরে যখন মাত্র চারদিনের কোভিড-এ আক্রান্ত হয়ে সরোজিনী মারা গেলেন এবং বিমলবাবু করোনা পজিটিভ হয়ে একা ঘরে দিনের পর দিন ধরে বন্দি হয়ে আছেন, তখন ঐ শালার মেয়েটিই ছিল তাঁর একমাত্র ভরসা। দুই ছেলেই বিদেশে, মায়ের পারলৌকিক কাজেও আসতে পারলেন না, তারা দুজনেই।

স্ত্রীর ঐ ভাইঝি – সারাক্ষন থেকেছেন ৭০ বছরের অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিশেমশাইয়ের কাছে। ভাইদের সঙ্গে সবসময় ভিডিও কল করে মাকে দেখিয়েছে – শেষ যাত্রার আগে। বিমলবাবু বিবেক দংশনে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলেন। ভালো হবার পর যখন তিনি ছেলের পাঠানো ভিসা – টিকিট নিয়ে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরতে যাচ্ছেন, তখন সেই মেয়েটির দুটি হাত চেপে কেঁদে ফেললেন শিশুর মতন – “তোকে আমি বড্ডো ফাঁকি দিয়েছি মা – ক্ষমা করে দিস আমাকে।”

শুক্লাদিদি ভীষণ গোছানো মহিলা, স্বামীর সব মাইনে তিনি নিজে খুব বুঝে সুঝে খরচা করেন। কখনও ছেলে মেয়ে বা স্বামীকেও হাতে টাকা দেন না। সংসারের ভালোর জন্য তিনি সবসময় নিজের কাছে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে অর্থ জমাতে থাকেন, আর শুধু টাকা পয়সা লুকিয়ে নিজের অধীনে রাখেন তা নয়, একটি শাশুড়ির আমলে তৈরী কাঠের সিন্দুকে নানা রকম বাসন, বিয়ের দান সামগ্রী সযতনে জমাতে থাকেন। বড় বড় পিতলের পিলসুজ প্রদীপ, ঘড়া, কাঁসার বাসন, রুপোর থালা, বাটি, চামচ জামাই বরণের দ্রব্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তাঁর ইচ্ছে যখন মেয়ে বড় হবে তখন সবাই অবাক হয়ে যাবে, একজন সামান্য কেরানীর পত্নীর সম্পদ প্রাচুর্য্য দেখে। সোনার গহনাও গড়াতে থাকেন একটা একটা করে, ছেলের বৌ ও মেয়ের গা সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। নিরীহ স্বামী গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় যেতে পারেন না, ছেলে স্কুলে পিকনিকে বা শিক্ষামূলক ভ্রমণে যেতে অনুমতি পায় না। মেয়ে বন্ধুর জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারে না। দামী উপহারের টাকা নেই বলে। দু জনেই তারা ভাবে সত্যি তো মা কোথা থেকে দেবেন। আমরা তো নিম্নমধ্যবিত্ত – এসব বিলাসিতা করা আমাদের সাজে না। ছোট ছোট আনন্দ উৎসব, আত্মীয় স্বজনের দুঃখে, সুখে না যেতে যেতে তারা ঘরকুনো হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে জমা হয় চাপা বিদ্রোহের ভাব। একটু রাগ দেখলেই শুক্লা বলেন, – “আমি কি নিজের জন্যে কিছু করছি, – একটা ভাল কাপড়ও পরি না, পান দোক্তা খাই না, বাপের বাড়ি যাই না, সবই তো তোদের জন্য করছি।”

পরিবারের সকলের সঙ্গে নিজেকেও ঠকাতে থাকেন তিনি। ‘ফাঁকি’ দেওয়াতেই যেন অদ্ভুত একটা আনন্দ পান, শুধু সেই দিনের অপেক্ষায় থাকেন, – যখন ছেলে মেয়ের বিয়ের সময় তাক লাগিয়ে দিতে পারবেন সবাইকে।

কিন্তু তা আর হয় না, বিষন্ন স্বামী হটাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মেয়ে পাশের বাড়ির মুসলিম প্রেমিককে বিয়ে করে দুবাইতে পালিয়ে যায়, ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে হরিদ্বারে আশ্রমবাসী হয়। আর শুক্লা বসে থাকেন তাঁর গুপ্ত সঞ্চয় নিয়ে।

একদিন শোনেন দেওয়রের মেয়ের বিয়ে। আগে যে ভদ্রমহিলা কখনও শ্বশুরবাড়ি যাবার নাম নিতেন না। একদিন তাদের জন্য হটাৎ মনটা হু হু করে ওঠে। ডেকে পাঠান ছোট জা কে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসেন তিনি। শুক্লা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, – “তোর বিয়ের দানের সব বাসন রয়েছে দেখ মা এই সিন্দুকে। তোর তত্ত্ব সাজিয়ে দেবো আমি, সব গহনাও তৈরী, নিয়ে যা মা, আমি আমার বোঝা হালকা করি।” মেয়ে এক গাল হেসে উত্তর দেয় শুক্লা জেঠিমাকে, – “না গো মেজো-মা, আমি তো পণ নিয়ে যারা বিয়ে করে, তাদের ঘরে যাচ্ছি না, ‘রেজিষ্ট্রি’ ম্যারেজ-এর পরেই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাব, আর আজকাল কাঁসা পিতলের ভারী ভারী জিনিষ কেউ ব্যবহার করে না। এগুলো বরং বিক্রি করে কোন অনাথ আশ্রমে তুমি টাকা দিয়ে দাও, নয়তো নিজে একটু কাজের লোক রেখে আরামে থাকো। নিজের জন্যে তো কিছু করলে না।” এতদিনে ফাঁকির ফাঁকে যে ফাঁদ পাতা থাকে তা বুঝতে পারলেন শুক্লা।

প্রথমে মেয়ে হলে বাবার ভাগ্য খোলে শুনেছিলেন সন্দীপ বাবু। সত্যিই তাঁর মেয়েটি ভীষণ পয়া। রং যদিও শ্যাম বর্ণ। মায়ের মতন ফর্সা নয়, কিন্তু গালে টোল পড়ে, ভীষণ মিষ্টি হাসি তার। অনেক ভেবে নাম রাখলেন ‘মোনালিসা’ ডাকেন ‘মোনা/মনু মা বলে। ছোট থেকেই খুব বুদ্ধিমতী, তাই শহরের খুব নাম করা স্কুলে পরালেন তাকে। নাচ, গান, আঁকা, পিয়ানো, সাঁতার সব রকমের ট্রেনিং নিয়ে বড় হল সে। ব্যাঙ্গালুরুতে ‘ল’ পাশ করল সম্মানের সঙ্গে তারপর উচ্চ শীক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা। এই বাইশটা বছর মোনার বাবা মা শুধু তাকে কেন্দ্র করেই জীবন কাটিয়েছেন। তার সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া মেলামেশা করার সুযোগ পায়নি সে। হটাৎ আমেরিকার নতুন পরিবেশে নতুন পৃথিবীর পরিচয় পেল মোনা। বাবা মা একবার গিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে ভাড়া নেওয়া বাড়িতে একসপ্তাহ কাটিয়ে এলেন। সেখানে আলাদা আলাদা ঘরে বিভিন্ন দেশের চারজন ছেলে মেয়ে থাকে। রান্নাঘর একটি। যার যখন সময় সে নিজের খাওয়ার জোগাড় নিজে করে নেয়।

কেউ ‘ল’ পড়ে, কেউ ইন্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্ট কলেজে, একজন শ্রীলংকার প্রসিদ্ধ সিনেমা অভিনেত্রীর মেয়ে আবার ‘লস এঞ্জেলস’-এর কোন এক স্কুলে নাটক, নাচ ইত্যাদি শেখে – সে সন্ধ্যে থেকে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত বাইরে। চীন দেশের ছেলেটি হোটেল ম্যানেজমেন্ট-এর ছাত্র। রাত্রে যখন ঐ কমন কিচেনে তাদের সামুদ্রিক জীবজন্তুর রান্না করে, তখন অন্য রকম গন্ধে ঘর ভরে যায়। মোনা সেদ্দ ভাত বা খুচুড়ি এক হাঁড়ি করে রাখে, পাঁচদিন ধরে সেটাই খায়। ভালভাবে পড়াশোনা করতে হলে খাদ্যরসিক হলে তো চলবে না।

বাবা মা অবাক হয়ে যান এবং অখুশী মন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। মেয়ে পাশ করতেই ভাল ‘ল’ ফার্মে কাজ পায়। মা পাত্র দেখা শুরু করেন। তাঁর বোনের ভাগ্নেও আমেরিকায় থাকে, পি.এইচ.ডি শেষ করে কলেজে পড়াতে ঢুকেছে। স্বজাতি – পালিটঘর আনন্দে আত্মহারা হয়ে খবরটা জানান মোনালিসাকে। বাবা বলেন, – “তাড়াহুড়ো নেই, নিজেরা ওখানে দেখে নে, আলাপ করে নিশ্চয় ভাল লাগবে, তারপরে দুজজের একসঙ্গে ছুটি দেখে দেশে আয়, বিয়ের দিন ঠিক করব।”

প্রথমে মেয়ে উত্তর দেয় না। খুব পীড়াপীড়ি করলে বলে, – “এখন ব্যস্ত আছি রবিবারে কথা বলবো।”

রবিবার দুপুরে দিবানিদ্রা দিচ্ছেন মা, বাবা ম্যাগাজিন পড়ছেন, এমন সময় তার ফোন আসে, ঘড়ি দেখে তাড়াতাড়ি মোবাইলের ভিডিও কলটি খোলেন তিনি। মোনা বলে বাবা এখন ভিডিও করছিনা, খুব দরকার একবার মাকে দাও। বাবা ঘাবড়ে যান। এমন তো কখনও হয় না, প্রথমে তাঁর সঙ্গেই পড়া, কাজ, টাকা ইত্যাদি নিয়ে বেশ অনেক্ষন কথা বলার পর তো সে তার মায়ের সঙ্গে রোজ একই প্রশ্নের জবাব দেয়। – ‘কি রান্না করলি, আজ কি খেলি? ওই ছেলেটির ই মেল পেলি কিনা? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলি? কবে দেশে ফিরতে ছুটি পাবি?- – – ইত্যাদি ইত্যাদি, আজ প্রথমে মায়ের ডাক, নিজেকে একটু উপেক্ষিত মনে হল, সন্দীপবাবুর।

স্ত্রীকে হাঁক দিলেন, “ওঠো গো – মেয়ের ফোন” – এই সময়ে? সে কি এখন তো ওদের ওখানে অনেক রাত? – হ্যাঁ মামনি, বলরে, কেমন আছিস? এতো রাতে জেগে আছিস কেন?”

-“মা, মা শোনো, তোমাকে একটা জরুরী কথা বলছি, একটু ধৈর্য্য ধরে শোনো।”

-“হ্যাঁ বল মা।”

-“আমি আমি বলছি, আমি প্রেগনেন্ট।” খুব কেটে কেটে শান্ত গলায় বললো মোনা।

-“কী, কি বলছিস তুই, কাকে, কাকে বিয়ে করেছিস? এই সব কি হয়ে গেল?” চমকে উঠলেন সন্দীপ বাবু স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে।

– না মা বিয়ে এখনও হয়নি, আমরা লিভিং টুগেদার করি।

-কে, কে সে? – ম্যাক্স(Max) – আমেরিকান ছেলের সঙ্গে থাকতিস তুই? সন্দীপ বাবু ওর মায়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন। “ঠিক আছে আমরা আসছি তোর কাছে, ওর সাথে কথা বলতে, অথবা ইন্ডিয়াতে আয় দুজনে, বিয়ের অনুষ্ঠান তো একটা করতে হবে।” হটাৎ মনে হল, ওদিকে মেয়ের আর একটা ফোন আসছে, মা, বাবার লাইনটা কেটে গেল।

মোনালিসার মা কাঁদতে আরম্ভ করলেন – এ কী শুনলেন তিনি। সন্দীপ বাবুর কেমন যেন পুরো শরীরটা কাঁপছে। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে না ভয়ে ঠিক বুঝতে পারছেন না তিনি। মেয়েটা এমন করে ওদের সব আশা আনন্দে জল ঢেলে দিতে পারলো ! মা শুধু বলতে লাগলেন ‘এখন কি হবে, মেয়ে এমন একটা ঘটনা ঘটালো লজ্জায় সমাজে মুখ দেখাবো কি করে?’

এবার নিজেই ফোনটা মেলালেন তিনি, মেয়ে তুলছে না। মেসেজ করলেন কাঁপা কাঁপা হাতে, – “যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি ঐ গোরা বন্ধুকে নিয়ে দেশে চলে আয়।”

-“বাবা আমার পেটটি এখন খুব বড় হয়ে গেছে, আর ম্যাক্সও এখন যেতে রাজি নয়। তুমি বরং মাকে নিয়ে বাচ্চা হওয়ার সময় এসে যাও, তিন মাস পরে।”

এতো স্বাভাবিকভাবে এমন একটা গভীর সমস্যার কথা কিভাবে বলতে পারছে মোনা কে জানে – মা বললেন, “আইবুড়ো মেয়ের বাচ্চা হবে তাতে লজ্জা করছে না ওর মা কে আসতে বলতে?”

এবার বাবা বোঝালেন, “সবাইকে বলবে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে ওখানে, কে দেখতে যাবে ওখানে? তারপর পরিবেশের গম্ভীরতা কমাবার জন্য বললেন, ভালোই তো হবে – ঝুম্পালাহিনীর মতন আমেরিকান সাহেব জামাই দেখে মন ভুলে যাবে তোমার। দেখ তখন তুমিই আর ছাড়বে না ওদের।”

এবার মোক্ষম মেসেজটা এলো মেয়ের কাছ থেকে, “বাবা ম্যাক্স তো গোরা সাহেব নয়, “আফ্রিকান আমেরিকান।”

মা কি সাংঘাতিক জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “শেষে তোমার মেয়ে একটা কালো ভূত নিগ্রো বিয়ে করলো? ছি ছি ছি।” বাবার মুখে কথা বন্ধ হয়ে গেল। পরদিন মেয়ের ফোন এলো –

“মা, বাবা তোমরা আসছো তো?” দশ বছরের ভিসা তো আছেই তোমাদের। আমি টিকিট পাঠাচ্ছি।

ফোনটা বাবার হাতে ধরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন তিনি। সন্দীপ কি উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না, “তোর মায়ের শরীরটা খারাপ, এখন কি পারবে যেতে !” দেখি . . . . । যেন কোনো অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।

-“সেকি তোমরা আসবে না? ম্যাক্স ও তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথম থেকেই সে বাচ্চা নষ্ট করতে বলেছে, কিন্তু আমি রাজী হইনি। এখন আমাকে avoid করছে। ঐ সময় জ্যামাইকা চলে যাচ্ছে – please বাবা – মা কে নিয়ে এসো।” কান্নায় ভেঙে পড়ল মোনালিসা।

-“তুই একটা কালো ছেলের সঙ্গে শেষে . . .” গলা বুজে এলো বাবার – অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ কিসের আবেগে আর কিছুই বলতে পারলেন না তিনি।

“ওঃ তাহলে এটাই তোমাদের প্রবলেম। কালো বিয়ে না করে সাদা চামড়ার জামাই হলে তোমরা সব মেনে নিতে? কিন্তু বাবা আমার রঙ ও কালো। ও রা না হয় আমার চেয়ে একটু বেশী। তাহলে আমার জীবনের প্রথম সন্তান আসছে আর তোমরা আমার কাছে আসবে না?”

মা ও ঘর থেকে চিৎকার করছেন – “এইরকম মেয়ে পেটে ধরেছিলাম – রে আমি? মর মর মরগে – যা – জাহান্নমে যা, আমি ওর মা নই। ঠাকুর ! আঁতুর ঘরেই কেন মরে গেল না এমন সর্বনাশী মেয়ে !” ফোনটা কেটে দিল মোনা। তারপর তিনমাস অনেক চেষ্টা করেও আর কথা বলতে পারেননি সন্দীপবাবু। স্ত্রীকেও যেতে রাজী করাতে পারেননি। কী করতে পারেন তিনি, এরা দুজনেই যা জেদী।

খবরটা দিল ভারতীয় দূতাবাস থেকে। – আপনার মেয়ে মোনালিসা আত্মহত্যা করেছে। তার একটি ছেলে জন্ম নিয়েছিল, সেটি এক দত্তক কেন্দ্রকে দান করে দিয়েছে সে।”

– মেয়েটি বাবা মা কে ধোঁকা দিল না বাবা মা ফাঁকি দিলেন, এর বিচার পাঠক করবেন।

বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ( Boshonto Jagroto Dar e)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শীতের শেষে যখন পৃথিবী মায়ের অবগুন্ঠন -
হয় উন্মোচন,
ঝাপসা কুয়াশায় ওড়না ঢাকা মুখ খানি তার উঁকিমারে, 
ধীরে ধীরে তখন,
পশুর দল যারা এতদিন ছিল ঘুমন্ত -
অন্ধকার গুহায় -
তাদের জাগায় সূর্যকিরণ।
মাটির গর্তে, পাহাড়ে, পাথরের খাঁজে, ঘন বনে,
গাছের কোটরে যারা করেছিল আত্মগোপন, -
তারা আড়মোড়া ভেঙে বাইরে আসতে চায় -
শুনতে পায়, কার যেন আবাহন।
বসন্তরাজ এসে বুঝি  ধাক্কা দেন, তাদের দরজায়,
চঞ্চল হয়ে ওঠে, পাতা ঝরা গাছগুলির প্রাণমন।
কিশলয়ের - রক্তিম আভায়, - শ্যাওলার শ্যামলিমায় -
লাগে নবজাগরণ।
বড় বড় পাখীরা স্বস্তির নিঃশাস ফেলে,
ডানা ঝাপটায় - ধরণী
কলকাকলিতে ভরে যায়; ধ্বনিত হয় -
ছোট পাখীদের মধুর কুজন, ও ভ্রমরের গুঞ্জন l
 
বসন্তের আবির্ভাব কিন্তু একই সময়ে
দেখা যায় না, জগতের সব জায়গায়।
উত্তরায়ণে - ওই গোলার্দ্ধে যখন সূর্য্যের রশ্মি পড়ে -
তখন উত্তর মেরুতে হয় উষ্ণায়ন।
সেখানে গলে বরফ়,
সাদা আর বাদামি ভালুকেরা নেমে আসে,
শীতল নদীর জল ধারায়,
মাছের খোঁজে দলে দলে করে অবগাহন।
সবুজের রেখা ধরে সাগর কিনারায় -
জমাট সরোবরে ঢেউ-এর কম্পন।
রোদের আলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছেরা ঘুরে বেড়ায় -
সামুদ্রিক প্রাণীরা খুশী মনে
করে সন্তরণ।

একেবারে এই ভূলোকের নিচের দিকে
দক্ষিণ মেরুতে কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডা তখন।
দখিনা হাওয়া সেই মরুদেশে পৌঁছাতে পারে না -
'বসন্ত' করে না গমন, -
ছয় মাস পরে আলো উত্তাপ নিয়ে সে হাজির হবে -
করতে অতি ঠান্ডা দমন।
পেঙ্গুইনের দল কালো সাদা কোর্ট পরে চলবে, হেলে দুলে,
বরফ ভরা আঙিনায়,
সাগর বলাকা তার সাথে হয়ত ফিসফিসিয়ে
কথা কইবে, নতুন  বসন্তের হবে, আলাপন।

আবার জগতের মধ্যভাগে - চির শ্যামল অঞ্চলে
সারা বছর ধরে সারাদিন গরম ও বিকেলে চলে,
ঝরঝর বরিষণ।
তাই সেথায় সকালে কোকিল ডাকে, ময়না টিয়া ঘুঘু গায় গান,
আর সন্ধ্যায় শুরু হয়, পোকা মাকড় ব্যাঙবাবাজীর
সরব কীর্তন।
'বসন্তবাবু'কে তাদের নিত্য প্রয়োজন। তাই আলাদা করে
প্রকৃতি করেন না, তাকে বিশেষ সম্ভাষণ।

কিন্তু মরুদেশ ও বিষুব রেখার মাঝখানে, এ ধরায় -
আমাদের জন্মস্থান, নাম 'ভারত ‘- ভবন।
এখানে আসে, পাঁচটি বিচিত্র ঋতুর পরে -
মহাসমারোহে সর্বশ্রেষ্ঠ সময়, মানবের করে মনোরন্জন,
আসেন, বসন্ত, তার আগমন, আনে আমাদের দেশে -
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীতের পরে অপূর্ব মোহময় লগন।
রূপ, রস, গন্ধে, ছন্দে মোহিত করা রঙিন দুটি মাস -
পলাশ, শিমূল, চম্পা, বকুল আর তার সঙ্গে
আমের মুকুল বাতাসে  ভরায়  সুবাস,
বুঝিয়ে দেয়,  তিনি করলেন এখানে পদার্পন,
বনে বনে তখন
লেগেছে আগুন ভরা ফাগুন।
নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় - নৃত্যে, গীতে নতুন ছন্দে
নাম না জানা ফুল করে
আল্পনা অঙ্কন, তারা সবাই 
মানব মনে তোলে কিসের অমোঘ আকর্ষণ, -
চলে আনন্দ - অনুরণন -
বসন্ত জাগ্রত দ্বারে - হল যে 
‘ঋতুরাজের ’-
আগমন, সব দুখ ভুলে সেই সুন্দর রাজন কে 
এসো করি অভিবাদন 
জানাই, অভিনন্দন l

এক অনুভব ( Ak onubhob )

চন্দনা সেনগুপ্ত

জীবন যখন থেমে থাকে কোনো বদ্ধ জলার ফাঁকে
ঈশ্বর নামে স্রোত বহে এনো, বন্ধ রেখো না তাকে।
চরৈবেতিরে - চলো চলো আগে মুক্তি পথের পানে,
নিজেরে বেঁধোনা, কোনো বন্ধনে, বহে চলো তাঁর টানে।
দয়া, ক্ষমা, সেবা প্রেমভাব আর ভক্তি ও বিশ্বাস,
অন্তরে তিনি আছেন জানিয়া করো তাঁর কৃপা আশ।
ভক্তি এবং অনুরক্তি  যেন হৃদয়ে বাজায় সুর,
সৎকর্মের মাঝে যেন থাকি, শুনি যেন সে নুপুর।
কত ভুল আর ভ্রান্তির মাঝে ঘুরে মরি সদা পাঁকে,
তবু যেন তিনি সারা দেন শুধু, ভক্ত প্রাণের ডাকে।
স্বামী সন্তান বন্ধু স্বজন, সকলেই যাবে ছেড়ে,
তাহাদের মোহে জড়ায়ে পড়িলে, ধর্ম যে নেবে কেড়ে।
মন্ত্র, তন্ত্র, ভজন, অর্চন, কিছুই চান না তিনি,
শুধু মন বীনা তাঁর গান করে, তাহাদেরি লও চিনি।
পরমপিতা হে তোমার আশিসে ধন্য জন্ম মোর,
স্নিগ্ধ পরশে শান্তি জাগাও আসুক নতুন ভোর।

ওই সায়াহ্নে ( Oi Sayanhe )

চন্দনা সেনগুপ্ত

গামছা নিঙড়ানোর মতন করে
আমার শৈশব, যৌবন ও 
বার্ধক্যকে দুমড়ে, মুচড়ে দেখতে
পেলাম নতুন রঙের জল।
জমাট বাদল কেটে জীবন হল সরল,
মিষ্টি তেঁতো ভালোবাসার স্বাদ হল 
তরল।  পুরাতন -
অভিজ্ঞতায় সিক্ত সময় মনে এনে
দিল বল।
ভবিষ্যতের টান নেই, তাই
অন্তিম অধ্যায়ে সূর্যাস্তে সেই
ফিরে যাওয়ার পথটি অনুজ্জ্বল,
সন্ধ্যা তারার মতন আকাশে 
ফিকে হয়ে আসা রঙ
জীবনকে স্নিগ্ধ করে। এ এক 
নতুন ঢং।
সায়াহ্নের আলো বড় পবিত্র নির্মল।
কাজ শেষ; ফিরে যেতে মন হল চঞ্চল।

মায়ের গান ( Maa er gaan )

চন্দনা সেনগুপ্ত

জয় মা, জয় মা, জয় জয় মা, -
জানিতে পারিনি, মা গো -
তোমার মহিমা।
এই অতি মূঢ়মতি, নির্বোধ নারী প্রতি,
কেন ঝরে অকারতে -
তব কৃপা ক্ষমা।

বহিয়া চলিছে মোর জীবন প্রবাহ -
গতিময় রাখিতেছো তুমি অহরহ,
বুকে থাকো, তাই মোর ধন্য এ দেহ,
করুণা সলিলে তব ভেসে যায় গেহ।

হৃদয়ের শতদল চুমে তব পদতল,
কৃপা করি বাড়াইলে তাই মোর মনোবল,
স্নিগ্ধতা শান্তির নাহি পরিসীমা।

মোহনার কাছে এসে
প্রেমের সাগরে মেশে,
জীবন বুঝিতে চায়, তোমার গরিমা।

যুগল তীর্থে যাই, জয়রামবাটী ধাই,
কামারপুকুর পাই ভক্তি সাগর ,
সেখানে ডুবিয়া মোর, জীবনে আসিল ভোর,
তব দয়া নির্ঝর নাহি তার সীমা।

জয় মা, জয় মা, জয় জয় মা . . . মা।

ঠাকুরের গান ( Thakurer Gaan )

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ঠাকুর'
তোমার লীলা প্রসঙ্গে -
কথামৃতের কথায় রঙ্গে
মন মেতে থাকে মায়েরই সঙ্গে -
হৃদয় আমার তৃপ্ত।

নিন্দা করে গো, লোকে নানা ছলে,
অশ্রদ্ধা যে নানা কৌশলে,
তোমারে অবতার নাহি বলে, -
চিত্ত হয় যে ক্ষিপ্ত।

শ্রী শ্রী সারদা বাণী কানে আসে,
বিবেকের জ্ঞান অন্তরে ভাসে,
বুক কাঁপে মোর দুখে, লাজে, ত্রাসে,
তর্কে হই না লিপ্ত।

শান্তি সুখেতে পরশন পাই,
সময় নষ্ট করে লাভ নাই,
জীবে প্রেম মাঝে তোমারেই পাই,
অন্তর রেখো দীপ্ত।

"ত্রিদেব" স্মরণে আজ মনে মনে 
আঁখি হল মোর সিক্ত,
হৃদয় করিলে তৃপ্ত ঠাকুর বন্ধন
করো মুক্ত।

‘পড়াকু’র – হাতে খড়ি ( Porakur haate khori )

চন্দনা সেনগুপ্ত

তাঁতী বৌ যখন বিধবা হল, তখন তার বয়স মাত্র বাইশ, ছেলেটি দুই বছরের। উকিল বাবুর বাড়িতে কাজ নিল সে, সঙ্গে ছেলেকে আনতে হয়, দেখাশোনা করবার কেউ নেই তার। সারাদিন থাকে সেখানে, বাবুদের বাগানে খেলা করে বাচ্চা আপনমনে। ন্যাংটো থাকে সবসময়ে। গিন্নি মা বলেন, ‘ও তাঁতী বৌ একটা প্যান্ট পরাতে পারিস নে’?

– ‘অখন ত্যাখন মুতে দেয় যে, কতক্ষন থাকবেক উয়ার পরানে’।

বামুন দিদি বলেন, – ‘চান করিয়ে দে লো মাগী ! ছেলাটাকে, দ্যাখ কত ধুলা মাখছে’।

তাঁতী বৌ একগাল হাসে – ‘একটুকুন মাটি মাখা ভালো দিদি, উয়াতে কুছু হবেক লাই।’

অবেলায় পুকুরে একটা ডুব দিতে গিয়ে ছেলেটাকেও চান টান করিয়ে গোল বারান্দায় বসিয়ে দেয়, তাঁতী বৌ। এক বাটি মুড়ি বাতাসা দিয়ে। খেতে খেতে সে শুনতে থাকে বাবুদের ছেলেমেয়ের পড়া, কিম্বা নামতা মুখস্ত করা।

ভারী ভাল লাগে তাঁতী বৌ-এর। বারবার মা ভাদু/তুসু বা ধর্ম ঠাকুরের কথা স্মরণ করে, সে মনে মনে বলে, – “হুই মা, যত দেব-দেবীরা তুমাদের খ্যানে কুছু চাই নাই, আমার ব্যাটাকে একটুন ‘পড়াকু’ কইরে দাও”, –

অলখ্যে শোনেন, তাঁর কথা ঐসব বাঁকুড়াবাসীর – ‘ঘরোয়া দেবতারা’।

ওর ছেলেটা সত্যি সুর করে করে মুখস্ত করে ওই  , ক এ যফলা – ঐক্য; –

বাবুর ছেলেদের বলেন, গৃহ শিক্ষক অজয় মাষ্টার – ‘দেখ দেখ কেমন মন ঐ ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটার।’

ওর হাতে খড়িটা দিয়ে দিলেই তাকে চক খড়ি আর শ্লেট কিনে দেবেন তিনি।

– তাঁতী বৌ গিন্নীমায়ের বাড়িতে সরস্বতী পুজোর দিনে পুরুতমশাইকে ওর ছেলের হাতে খড়ি দেবার জন্য অনুরোধ জানায়। খুব খুশী হন তিনি। বাড়ির নগেন দারোয়ান একবার ঠাট্টা করে ,

“হ্যাঁরে তাঁতী বৌ তোর ছিলাটাকে জজ, ম্যাজিস্টর বানাতে হবেক নাকি’?

তাঁতী বৌ সেই সহজ সরল হাসিটা হেসে উত্তর দেয় –

“না গো নগেন দাদা অতোটা লয়। পাঠশালার ম্যাস্টার হলেই চলবেক। আমার মতন মুখ্যু সুখ্যু মায়ের ছিল্যাকে লয়তো সবাই ঠগাই লিবেক”।

স্কুলে ভর্তি হল ছেলেটা যার নাম তাঁতী বৌ রেখেছিল ‘পবনকুমার’। কিন্তু ক’দিন পরেই সে পাড়া-প্রতিবেশী এবং বাবুঘরের সকলের কাছে পরিচিত হল একটি নতুন নামে ‘পড়াকু’।

সত্যিই অসাধারণ তার জ্ঞান পিপাসা, যেখানে যা পায় বানান করে করে পড়ে সে। খবরের কাগজটা বাবুমশাইকে দেবার আগেই বাগানে বসে পাঁচ মিনিট ধরে হেড লাইনগুলো বানান করে পড়ে ফেলে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতেই ঐ বাড়ির বাচ্চাদের জন্য আগত শুকতারা পত্রিকা এলে কেউ দেখার আগেই সে পড়ে নেয়।

দশ বছর বয়সেই বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয় পবন কুমার গোটা বাঁকুড়া জেলার মধ্যে। আনন্দে তাঁতী বৌ কাঁদতে থাকে। কিন্তু সেবার বাবুদের বাড়ির বড় ছেলে দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। তাঁতী বৌকে সবাই কেমন যেন অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। আট বছর ধরে মন প্রাণ ঢেলে কাজ করলেও কোন দোষে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, বুঝতে পারে না মা ও ছেলে, হঠাৎ সেই গৃহশিক্ষক অজয় মাষ্টারমশাই পিছন থেকে ডাক দেন তাদের। “ও তাঁতী বৌ, চল মা আমার ঘরে, এদের মতন বেশী পয়সা তো দিতে পারবো না, তবে ওকে পড়িয়েই আমার বড় আনন্দ হবে। ঐ গাধাগুলোকে এতদিন ধরে পিটিয়ে ঘোড়া করবার বৃথা চেষ্টা করলাম, আর নয়। এখন ঐ পক্ষীরাজ ঘোড়াটাকে আমার আকাশে ওড়াতেই হবে, – পার করিয়ে দিতে হবে সাত সাগর আর তেরো নদী, কিম্বা হিমালয়ের ওধারে। পারবি না রে তুই পড়াকু? আমার স্বপ্ন পূরণ করতে।’’

তাঁতী বৌ রাস্তাতেই গড় হয়ে একটা দণ্ডবৎ করলো তাকে, আর ছেলেটা হটাৎ লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালো, তার পেছনে। তার ঐ মিষ্টি হাসিতে বলে দিল, যে সে নিশ্চই পারবে, তার ঐ ‘পড়াকু’ নামটি স্বার্থক করতে।