একটি “মাইক্রোস্কোপের” আত্মকথা (Ekti “Microscope” er Attokotha)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ডাঃ কল্যাণী প্রসাদের পরশে অণুবীক্ষণের যন্ত্র যখন তার আত্মাকে খুঁজে পেল

১৯৪২ সাল, ভারতছাড়ো আন্দোলনে দেশের তরুণ যুবকেরা স্কুল, কলেজ কাজ কর্ম, অফিস আদালত ছেড়ে পথে নেমেছে – চারিদিকে একটা হৈ হৈ ব্যাপার চলছে ঠিক সেই সময় এক ২৪ বছরের যুবক আমায় নিয়ে এলেন কলকাতার এক দোকান থেকে কিনে। ধুলো ধূসরিত বাঁকুড়ার বাজারে, ছোট্ট ওষুধের দোকানের এক কোনে। এক টেবিলে জায়গা পেলাম আমি। আমার লেন্সের কাঁচটি বার বার মোছেন সেই যুবক, পাশে সিরিঞ্জ, স্পিরিট, কয়েকটা লোশনের শিশি, ও তুলোর প্যাকেট। অতি নগন্য সাজ সরঞ্জাম, কিন্তু লোকেদের রক্তের ভেতরে শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকাদের দেখার, মূল মূত্র পরীক্ষা করে কৃমি বা জিয়াডিয়া, আমাশয়ের কলেরা, জন্ডিসের জীবাণুদের চেনার জন্য যথেষ্ট আয়োজন।

গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। আমার সাহায্য নিয়ে এই যুবক ডাক্তার আজ নতুন জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন ইংরেজকে ভারতছাড়ো বলে হুঙ্কার তিনি হয়তো দিতে যাননি কিন্তু মানুষের শরীর থেকে রোগের কীটাণু বিষাক্ত জীবাণুদের দূর করার সাধনায় যুক্ত হয়েছেন। আমাকেও সেই মহান কাজে নিযুক্ত করেছেন, এজন্য আমি ধন্য।

কোনো মন্দিরে মাটি, পাথর, তামা বা অষ্টধাতুর মূর্তি বানিয়ে রাখা হলেই তাকে কেউ ভক্তি করে না। কিন্তু সংস্কৃত মন্ত্র জানা সদাচারী শুদ্ধ আত্মা পন্ডিত পুরোহিত এসে যখন তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেই মৃন্ময়ী বা ধাতুময় প্রতিমা হয়ে ওঠে ‘চিন্ময়ী’ – একেবারে দেবতার রূপধারী জীবন্ত। ভক্তেরা এসে তখন তাঁর পুজো করেন। আমিও এবার যেন প্রাণ পেলাম কল্যাণী ডাক্তারের সাধনায়। এতদিন এক সামান্য যন্ত্র ছিলাম। এখন হলাম জীবন্ত। ১৬১৯ সালে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেন ‘দূরবীক্ষণ যন্ত্র’ – আকাশের নক্ষত্রদের অতি কাছে দেখার জন্য। আর আমাদের অতি ক্ষুদ্রকে বৃহৎ করে দেখার জন্য তৈরী করলেন। আমার আবিষ্কার কর্তা Antone van Leeenwenhoek Armsterdom। এই ডাচ বিজ্ঞানীর চারশ বছর কেটে গেছে, কত পাতলা লেন্স দিয়ে কত সুন্দর সুন্দর দূরবীক্ষণ যন্ত্র এখন বেড়িয়েছি, ২০১৬ তে Google ৩৮৪তম এনিভার্সারি ঘোষণা করলো আমাদের জন্ম লগনের। কিন্তু এ সবই তো হলো যন্ত্রের ইতিহাস। এই ক্ষুদ্র অণুবীক্ষণকে যাঁরা কাজে লাগাতে পারেন মানবহিতের জন্য ব্যবহার করেন তাঁরাই আসল দেবতা।

তরুণ ডাক্তার কল্যাণী প্রসাদ গুপ্ত আমাকে সেদিন অত্যন্ত অতি নিষ্ঠার সঙ্গে যেন প্রাণ দিয়ে সজীব করে তুললেন। কত শত সহস্র জীবাণুদের ছোট একটি স্লাইডে বন্দী করে আমার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলে ধরা পড়লো তাদের প্রকৃতির দোষ গুন। জীবন্ত সেই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের বীক্ষণ করা এবং দেখার জন্য অত্যন্ত দক্ষতা চাই। আমার মালিক তথা ডাক্তারবাবু আমাকে ব্যবহার করে সেই দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ঠ হলেন, কারো কোনো সাহায্য না নিয়ে।

আমি সেদিন থেকেই তাঁর সুখ দুঃখের সাথী। আমায় রোজ এসে তিনি আদর করে তাঁর স্নেহ পরশ বুলিয়ে দিতেন। তাঁর জীবনের ছোটবড় সব সুখ দুঃখের ঘটনার গল্প আমি জানি। যেদিন কোন রোগীর শরীরে বড় রকমের কোন অসুখের সন্ধান পেতেন যার ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু সেই রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক তাই রোগীকে বাড়িতে আর রাখা যাবে না, তখন তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়তো আমার লেন্সের ওপর। একবার তাঁর এক তরুণ আত্মীয় এলেন কলকতা থেকে তাঁর বড় ভাইদের সঙ্গে নিয়ে। কি হয়েছে তার  সঠিক রোগ নির্ণয় করাতে। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে জানতে পারলেন তা দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগ। এই অপ্রিয় সত্যটি ব্যক্ত করতে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিলো বারবার আমার কাঁচ মুছে দ্বিতীয়বার – তৃতীয়বার নিরীক্ষায় ক্ষান্ত হতে হল তাঁকে। ছেলেটিকে “গৌরীপুরে” কুষ্ঠাশ্রমে পাঠানো হল। পড়াশুনোয় অত্যন্ত মেধাবী হাস্যময় সতেজ যুবকটি সেখানে গেলেন, কিন্তু কয়েকদিন পরেই আত্মঘাতী হলেন। ডাক্তারবাবু সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। মনে হল সত্য ভাষণে তিনি যেন ছেলেটিকে ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন। কখনো কখনো আবার দেখেছি অন্যত্র পরীক্ষা করে খুব খারাপ রিপোর্ট দিলে সেই রোগীকে কলকাতা থেকে “ডাঃ মনি চত্রির” মতন বড় হার্টের বিশেষজ্ঞ বাঁকুড়ায় এই কল্যাণী বাবুর কাছে পাঠিয়েছেন – সেকেন্ড ওপিনিয়ন অর্থাৎ দ্বিতীয় রায় নেবার জন্য। আমার ডাক্তারবাবু অনেক্ষন ধরে সব রকম পরীক্ষা করে হাস্যমুখে তাকে জানালেন – “কে বলেছে যে তোমার রক্তে এ সব দোষ আছে? কিচ্ছু নেই। কোন ভয় নেই, নির্ভিগ্নে তুমি বাড়ি চলে যাও।”

আমার কাঁচে তাঁর সুন্দর শুভ্র দাঁতের হাসি প্রতিবিম্ব দেখে আমিও খুশি হলাম। ছোট্ট সেই দোকান থেকে একটি বড় ভাড়া বাড়িতে দুই কামরার চেম্বারে এর পর উঠে এসেছি, আমরা। দুজন তরুণ ডাক্তারবাবুর সহচর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। গোবর্দ্ধন ও সুশীল। কত যত্ন করে তাদের তিনি সুদক্ষ কম্পাউন্ডার করে তুলেছেন, ট্রেনিং দিয়ে, সাহস জুগিয়ে, তা আমি জানি। আমার অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জন্য রক্ত নেওয়া, মূল, মূত্রকে ঘেন্না না করে, স্লাইডে রাখা সবই তিনি হাতে ধরে শেখাতেন তাদের। পরে এই চেম্বার চলে যায় “পূর্ণভবনে” জেল খানার পিছনের –  বিরাট বাড়িটায়। সেখানে এসে আমার মনে হল কি সুন্দর প্রাসাদে এলাম আমি।

ধোন, দৌলত, গৃহ সুখ সমৃদ্ধি সবই বৃদ্ধি পেল। স্ত্রী ছেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর নিজের বয়স-ও ধীরে ধীরে বেড়ে চলল চোখের সামনে। নতুন নতুন জামাই বৌমার আসছেন, মনে হল এতো সুন্দর পরিবেশে আমার মর্য্যাদাও বেড়ে গেল। রুগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল, আমার চারপাশে লাইন দিয়ে সাজানো কত কত মানুষের শরীরের বর্জ্য পদার্থ। ঘরের বড় বড় জানলা দিয়ে আলো হাওয়া এসে স্নিগ্ধ করে দিয়েছে ল্যাবরেটরী ঘরটি। মধ্য বয়সী ডাক্তারবাবু এখন পাঁচজন সন্তানের পিতা। তাঁর সু-গৃহিনী স্ত্রী চিন্ময়ী দেবী প্রতিদিন সকাল থেকে কাজের লোকদের দিয়ে সমস্ত বাড়িটি  ধোয়া মোছা করিয়ে দেন। কত রুগীদের গাড়ি, রিক্সা এসে ভিড় করে বাড়ির সামনে। আমার গর্ব হয় মনে মনে। আমাকে ঘিরেই তো এতসব। আমি এখন সেই সাধারণ যন্ত্র নই। ধনদৌলত নাম যশ সবই বৃদ্ধি পেয়েছে ডাক্তারের কিন্তু মনে তাঁর অহংকার আসেনি বিন্দুমাত্র। বয়স বেড়েছে যত, ছেলে মেয়ে, বৌমা জামাই নাতি নাতনীতে ভরে উঠেছে বাড়িখানি। তাদের কলকাকলিতে ভরে পূর্ণভবন। ভবনের অন্দর বাহির। বাগানের মাধবীলতা, জবা, স্থল পদ্ম গাছগুলি কত বড় হয়ে ফুলের গন্ধে ভরিয়ে রেখেছে সেই বাড়ির পরিবেশ। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি আমার। অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে ১৯৯২ হয়ে গেছে, তবু কখনো তিনি আমাকে বদল করার কথা ভাবেননি।

একবার কাউকে বলতেও শুনেছি এখন কত সুন্দর নতুন ধরনের “মাইক্রোস্কোপ” বেরিয়েছে একটা আনতে পারলে আর এর ওপরে ঘাড় কাত করতে হয় না। কিন্তু নিজের সামর্থ থাকলেও তিনি তা করেননি।

আমাকে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্যাথলজির কাজ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর স্বর্গারোহনে আমার আর কদর নেই। জলের দরে বিকিয়ে গিয়েছি আমি, আমার কান্না কেউই তো শুনতে পায়নি। হটাৎ একদিন দেখি আমার অজ্ঞাতবাসের দিন শেষ হল। সেই অজ্ঞাত পরিচয় মানুষটিকে খুঁজে বের করে ২০ বছর পরে তাঁর “নাতি” আমাকে আবার নিয়ে এসেছে প্রাপ্য মৰ্য্যাদার সঙ্গে।

শ্রেয়া-রানীর কথা (Shreya-Ranir Kotha)

পরীর দেশে বাসছিল, তার
সুন্দর এক কন্যা,
দেব দেবীদের আশীষ ধন্যা
রূপের যেন বন্যা।।

নৃত্য-গীতে রাত্রে প্রাতে
কথার ছোটে ফুলঝুরি,
দুষ্টমীতেও কম যায় না সে
সবার করে মন চুরি।।

বাবাকে তার সবাই চেনে
“গৌতম স্যার" এই নামে,
বর্দ্ধমানে দেশের বাড়ী
শ্যামল সবুজ এক গ্রামে।।
সব কাজেতেই হাসি খুশী
দুধ খেতে পায় কান্না,
চাদের আলোর মতন শুভ্রা
“মা'মণি তার জোৎস্না।।

পূজো বাড়ীর অনুষ্ঠানে
নাটক-খেলা-অঙ্কনে,
যোগ দেয় সে সব বিভাগে
প্রতিভা বলে উপহার আনে।।

ঈশ্বরেরই আশীর্ব্বাদ  আজ
তার জীবনে সাফল্য দানে,
আমার প্রিয় নাতনী শ্রেয়া
পাঠাই স্নেহ তাহার পানে।।

সুন্দর বন (Sundarban)

গিয়েছিলেম, সজনে খালি, 
    দেখতে শ্যামল বন -
“হোগলা” এবং “মাতলা” নদী
       শীতল ও নির্জন। 

“বিদ্যাধরী” দোলায় তরী,
       ভরিয়ে দিল, মন। 
“সুন্দরী” আর “গরান” গাছের 
         নতুন সে ভুবন। 

কুমির চরে ডাঙ্গার ধারে -
   রোদ পোহাতে যখন - 
জলে কাদায় চমক লাগায় -
   মাছরাঙ্গা দল তখন। 

নদীর বাঁকে, ঝাঁকে ঝাঁকে - 
      জাল ফেলার ঐ লগন, 
  নৌকা  মাঝি করে এখন 
       “বন-বিবির” পূজন।  

“দক্ষিণারায়” ব্যাঘ্র তাড়ায় -
      চলছে তাঁরি ভজন, 
   ভয়ের সঙ্গে কৌতূহলে 
       উতলা হয় জীবন। 

ঢেউ-এর আঘাত ধরায়  ভাঙন,
     জোয়ার জলের শব্দে মগন 
  গাছের শাখে পাখির কুজন,
     মনের সুখে করি ভ্রমণ।

কাঠ বিড়ালী, কাঠ বিড়ালী (Kathbirali, Kathbirali)

আমার যে তুই সই,
কেমন করে উঠলি মাচায় ?
নেই তো হেথা মই!

সারাটি দিন লাফালাফি
পড়লি, না তুই বই,
যাস্‌ যে ঘেমে, আয় না নেমে,
চাস খেতে কি দই?

দেখ না এসে, ভালোবেসে
মা দিয়েছেন খই,
বারান্দাতে চড়াই সাথে
করিস নে হৈ চৈ।

তরতরিয়ে চড়লি গাছে
তর সয় না তোর।
তারিয়ে খেলি তরমুজটা,
তরল লালের ঘোর।
তোর তরে যে তারিনীদি-
তারের লাগায় দোর
তরু তলায় পাহারা দেয় -
যেই না হলো ভোর।

তেরে কেটে তাল শুনিয়ে
ছুট লাগালি জোর।
বাগান ঘুরে ফল খেলি তুই
নাম কিনলি “চোর”।

কাঠ বিড়ালী কর দালালি
ছোট্ট পাখীদের।
পোকা খেয়ে মন ভরে না,
ফল মূল খাস ঢের।
কুটুর কাটুর নেংটী ইঁদুর 
গাছের নীচে থাকে -
পাকা আমের আশায় তোকে
বারে বারে ডাকে।

ল্যাজ ফুলিয়ে উজল চোখে
এদিক ওদিক চাস,
দুই পা দিয়ে কেমন করে
বাদাম ভেঙে খাস ?

বৃষ্টি এলে লুকিয়ে গেলে
কখন পাতার তলে?
শালিখ পাখীর সঙ্গে যত
মনের কথা বলে।
সাদা ডোরায় হাত বুলিয়ে
করতে যে চাই আদর -
ধরব ওরে কেমন করে?
ব্যস্ত যে দিন ভর!

টুপুর টাপুর মধুর দুপুর _
আবেশ লাগে মনে,
কাঠবিড়ালী তোর মিতালী
হবেই আমার সনে।

হাসি রোগ (Hashi Rog)





অনেক সময় বিনা কারণেই
হাসি আসে আমার
কেন যে তার কারণ বোঝা ভার।
গভীর কথা সবাই যখন হৃদয় দিয়ে শোনে,
দারোয়ানজী বারান্দাতে, তখন হ্যাঁচ্ছ  গোনে,
হাসির দমক চেপে রাখা,
হয় যে আমার দায়, কেন গো হায়!
তখন সবাই আমার পানে
কট মটিয়ে চায়!
শোক সভাতে চোখের জলে
ভাসছে দেখি সবাই; হঠাৎ তোলেন হাই -
রুমালে মুখ ঢেকে রাখা সভাপতিমশাই
তখন হাসি চাপতে যে চাই,
অনেক কষ্ট করে- তবু বারে বারে-_
বিচিত্র সব শব্দ বেরয় হাসি থামে নারে।
টাকে ওপর দুই গোছা চুল
দাঁড়িয়ে যেন শিং
হিন্দী পড়ান হাম্বা রবে
স্যার তেওয়ারী সিং।
তখন আমার জামার তলায় পেটের ছেঁড়ে নাড়ি
গুড়গুড়িয়ে হাসির দমক, দেয় যে রে সুড়সুড়ি।
ক্লাশসুদ্ধ সবার মুখেই, ইনফেক্শন ছাড়ি -
সবাই মিলে হাসতে থাকি
নয় কি বাড়াবাড়ি ?

সমন্বয় (Shomonnoy)

চন্দনা সেনগুপ্ত

দুই আর দুয়ে চার হয়,
তিন আর তিনে ছয়, -
ঠাকুর বলেন এটাই সত্য -
"সর্ব ধর্ম সমন্বয়।"
হিন্দু করে জাতের বড়াই
শৈব শক্তি বৈষ্ণবের,
ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় যে -
রাখছে দূরে শূদ্রদের।
মুসলমানের সিয়া সুন্নি,
বৌদ্ধ ধর্মে হীন মহা,
নিজের স্বার্থে ঘা লাগলেই
ধর্ম যুদ্ধ, রক্ত বহা।
খ্রিষ্টানদের ঘৃনার শিকার
হলেন হাজার ইহুদি জন
সারা বিশ্বে অকারণে
মতবিরোধ সারাক্ষন
"শ্রী রামকৃষ্ণ" বলেন মোদের -
"কারো পথই নয়তো ভুল"
বিশ্বাসকে হারায় যদি,
গুনতে হবে তার মাশুল।
জল, পানি আর ওয়াটার তো
"এ্যকোয়ার" ই চারটি নাম
ঈশ্বর আল্লাহ গুরুবাদের
ঝগড়া চলছে উদ্দাম।
সর্ব ঘটে, সকল জীবে,
ভগবানের বিরাজ হয়।
ভালোবাসা ভক্তি দিয়ে,
করতে যে হয়, চিত্ত জয়।
"বিবেক" জাগান "নরেন্দ্রনাথ,"
সম্মুখে তবে আছেন ঈশ্বর -
দয়া, প্রেম ও সেবার দ্বারা
"মানব ধর্ম" পালন কর।
"শ্রী শ্রী মায়ের" অমোঘ বাণী,
কেউ নয় পর, আপন সব
কর্ম করো সংসারেতে
ছাড়ো নিন্দা কলরব।
ঠাকুরের কথা স্মরণ মনন,
কাম, ক্রোধ, ভয়, লোভের ক্ষয়,
কারো বিস্বাসে আঘাত হেনো না,
সর্ব ধর্ম সমন্বয়।

জোনাকির আলো (Jonakir Alo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কেঁদে কেঁদে বেড়াই যত, আমরা জোনাক দল,
কেমন করে বাঁচবো মোরা, জায়গা কোথায় বল?
অন্ধকারের স্নিগ্ধ নরম কালো,
আমাদের যে লাগতো ভীষণ ভালো।
ইলেক্ট্রিকের উজালাতে লুকায় রাতের তারা,
ভয়ে ভয়ে থাকতে যে হয়, তাই তো দিশাহারা।
গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে বেড়াই, নগর বনের ধারে -
বড় বড় গাছ খুঁজে যাই, সরোবরের পারে।
একটু খোলা জায়গা পেলেই,
মানুষ বানায় রাস্তা বাড়ি, -
চোখ ধাঁধানো আলো জ্বালায়, তীব্র বেগে চলা গাড়ি।
একদিন এক বাবুই পাখি খেজুর গাছের উঁচু মাথায়
উল্টো কলসী বাসা বাঁধে, সরু সরু বুনে পাতায়।
ঝুলন্ত সেই বাসা দেখি, নির্জনেতে বসে,
লুকিয়ে থাকি ঝোপে ঝাড়ে, আঁধার হবার আশে।
হটাৎ তাদের পড়লো চোখে মোদের ছোট্ট দেহ,
সন্ধ্যে হতেই জ্বালায় আলো, নেই তাতে সন্দেহ।
মা বাবুই আর বাবা বাবুই খপখপিয়ে ধরে,
একেক করে মুখে নিয়ে চললো তাদের ঘরে।
বসিয়ে দিল মোদের সেথায়, তাদের দেওয়াল পরে
খেতে দিল গুবরে পোকা, অনেক আদর করে।
রাতের বেলা পাখির বাসা আলোতে ঝলমল
নতুন করে বাঁচতে পেরে জোনাকি চঞ্চল।
পরের উপকারে লেগে, জীবন হল ধন্য
আপন আলোর গর্ব করি, পোকা তুচ্ছ বন্য।

পাখিটা (Pakhita)

চন্দনা সেনগুপ্ত

অনেক দিনের পরে আমি জানলা খুলে,
বাইরে দিলাম উঁকি।
মুকুল ভরা আমের ডালে দেখি, -
ছোট্ট একটি পাখি।
কি হ'ল কে জানে,
বললাম তারে ডাকি,-
"এই ছোট্ট পাখি,
এতদিন কোথায় ছিলি?
বিদেশ থেকে এলি নাকি?
"করোনা"র মতন তুই ও কি ফরেনার?"
"- ওমা সেকি?
আমি তো বরাবরই এই গাছটাতেই থাকি।
তোমরা সব ব্যস্ত থাকো,
আমাকে দাও ফাঁকি।"
উত্তর দিলে সে,
একটু ব্যাঙ্গের হাসি হেসে।
"- ওই তো ঐ টা আমার বাসা,
কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে থাকি,
আনন্দেতে খাসা।
তোমার সময় হয়নি
কভু বারান্দাতে আসা।
আকাশ পানে চেয়ে দেখা,
সাদা মেঘের ভেলায় ভাসা।"
ময়না, টিয়া, কাক, পায়রার
দুঃখ সুখে কাঁদা হাসা,
তাই তো! এর চেয়ে সত্যি
যে আর নাই তো।
এরপর বলার কিছুই
রইলো না আর বাকী।
নৈঃশব্দ এসে আজি
দিলো নতুন শিক্ষা।
স্নিদ্ধ হাওয়াই লাগলো পরশ,
হৃদয়ে তাই জাগলো হরষ।
ছুটে চলার মোহ হতে,
করলো কে আজ রক্ষা।
প্রকৃতি ও ঈশ্বর আজ,
নিচ্ছেন বুঝি পরীক্ষা।
ফুলের গন্ধ জাদুর ছোঁয়া,
বুলিয়ে দিলো প্রাণে,
একমুহূর্তে বদলে দিলো,
জীবন বোধের মানে।
ছোট্ট পাখি ফুড়ুৎ করে
উড়লো যে কোনখানে,
ভালোবাসার কথা সে যে,
শুনিয়ে গেলো কানে।

কালু দাদা (Kalu Dada)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেনগুপ্ত বাবুদের গ্রামের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা সমস্ত দায়িত্বই কালুদার ওপর ন্যস্ত। তিনিই একাধারে ম্যানেজার, কৃষিকর্মের সঞ্চালক, পুকুরে মাছের চাষ, জাল ফেলার জেলে, ধবলী শ্যামলী গরুর পরিচালক রাখাল, বাগানের মালী, আবার বাড়ির শিশুদের মনোরঞ্জক। সুঠাম তার চেহারা। মনে হয় যেন দক্ষিণ ভারতের কালো কোষ্ঠি পাথরের কৃষ্ণ মূর্তি। সদা হাস্যময়, কাজ পাগল এক নির্ভেজাল মানুষ।

পূজোর সময় বাড়ি ভরে আত্মীয়স্বজন থাকেন, তাদের সকলের ভুরি ভোজন, শোয়ার ব্যবস্থা, ঘরদোর গোছানো, ধানের মারাই বাঁধা সবই নানান লোক ডেকে তিনি করান। কর্তা মা বা তাঁর ছেলেমেয়েদের কোনো চিন্তাই থাকে না।

এ বাড়ির বড় ছেলে ডাক্তার হয়ে জামুরিয়াতে কোলিয়ারির হাসপাতালে চলে গেছেন, কালুর তত্ত্বাবধানে মা, বৌ ও দুই বাচ্ছা রেখে। কালুদা ভীষণ খুশি। বাড়ির বড় বৌমা খুব ভোরে উঠেছেন।তুলসী তলায় গোবর লেপে, দরজায় আলপনা ঘট বসিয়েছেন তিনি। আজ ষষ্ঠীর দিন সকাল সকাল স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের টিপটা গোল করে আঁকছেন। বাচ্ছারা উঠোনে খেলা করছে। কাকারা কলা বৌ চান করাতে গেছেন ঢাক বাদ্যির সঙ্গে আনন্দ করে নাচতে নাচতে, কেউ গান ধরেছে-

‘আমার উমা এলো গো, চণ্ডীমণ্ডপ

আলো করে উমা এলো গো’।

হটাৎ দরজায় পিয়নদাদা এসে হাজির একটি টেলিগ্রাম নিয়ে। তখনকার দিনে ফোন আসেনি গ্রামে, ইলেক্ট্রিক ও ছিল না। এই “টরে টাক্কাই” ছিল একমাত্র জরুরি খবর পৌঁছানোর মাধ্যম। এতো সকালে কে করতে পারে টেলিগ্রাম। মনে হয় মেজোকাকার পরিবার জামশেদপুর থেকে কোন ট্রেনে আসবেন, তাই জানিয়েছেন। কালু টেলিগ্রামটা পিয়নদাদাকে পড়ে দিতে বলে। তিনি খুলে বললেন, “চান্ডিমন্ডপে গিয়ে এ বাড়ির দাদাদের হাতে দিয়ে এস গে তাড়াতাড়ি। আমার বয়স হয়েছে ভালো করে পড়তে পারছি না”। ওনার মুখটা দেখে ঘাবড়ে যায় কালু, ছুটে যায় বাইরে।

আর তারপর শুধু চিৎকার, হাহাকার, আর্তনাদ করতে করতে একে একে সবাই এসে জড়ো হতে থাকে বাড়ির উঠোনে।

– বড়দা, মানে মাত্র ২৩ বছরের তরুণ ডাক্তার ওই নির্জন কোলিয়ারির হাসপাতালে মাথায় জ্বর উঠে গিয়ে অর্থাৎ “ম্যানেঞ্জাইটিসে” মারা গেছেন, গতকাল রাতে। সমস্ত গ্রাম শোকে দুঃখে কাতর আর তাঁর ঊনিশ বছরের তরুণী স্ত্রী পাথর হয়ে গেছেন।

কর্তা মা তো পাগলের মতন করছেন – তাঁকে সামলানো যাচ্ছে না, দিন পনেরো পেরোলো না বৃদ্ধা মার্ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে গেলো, তিনিও দেহত্যাগ করলেন।

কাকারা সব কলকাতা, বোম্বে বা জামশেদপুর – যে যার কর্মক্ষেত্রে চলে গেলেন। বড় বৌমা, মানে শুদ্ধাচারিনী বিধবা মা ঠাকুরুণ ও তাঁর দুই ছেলে মেয়ে গ্রামেই থেকে গেলেন মতি পিসি, বাউরি বৌ ও কালুদার তত্ত্বাবধানে। শিশু সন্তান দুটিকে সারাক্ষণ বুকে আগলে রাখেন কালুদা। পুকুরে বন-বাদাড়ে যেতে দেন না। বাড়িতে কুঁয়োর জল তুলে চান করান। রোজ পাঠশালায় দিয়ে আসেন ও নিয়ে আসেন। বাগানে সবজি তুলতে, মেলা দেখাতে নিয়ে যান। মা ঠাকুরুণের হনুমান সে, সীতামাতার মতন মনে করেন।

দিন কাটতে থাকে, বছর ঘুরে যায়। কন্যাটি ডাগর হয়ে ওঠে। কাকা কাকিমারা নিয়ে যান তাকে কলকাতায়। অন্যান্য বোনদের সঙ্গে সে বিবাহযোগ্যা হয়ে যায় এবং অল্পবয়সেই সু পাত্রে তাকে পাত্রস্থ করেন তাঁরা। পাঠশালা শেষ করে গ্রামের স্কুলে ভাই পড়াশোনা করতে থাকে। শুদ্ধাচারিনী মায়ের সাথে সেও ওই আতপ চালের ভাত, আলু-কুমড়ো সেদ্ধ একটু গাওয়া ঘি মেখে খেয়ে নেয়। রবিবার দিন কালু দা উঠোনের একপাশে কাঠের উনুনে মাটির হাড়িতে ডিম সেদ্দ বসায়, বলে – “ভাই রে আজ তুমাকে হাঁসের ডিম খাওয়াবেক কালু দা”। বারো তেরো বছরের ভাই আনন্দে একেবারে গলে যায়। কালুদার গা ঘেঁষে বসে ঐ হাঁড়ির জল ফোটা দেখে, আর ভাবে কালুদাটা কত ভালো।

সত্যি এরকম অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে বোধহয় কেউ দিতে পারেনি। তাই সে কালুদাকেই তার জীবনের ‘কান্ডারী’ মনে করে। তার সঙ্গে থাকতে থাকতে কর্মঠ, সহিষ্ণু, নির্লোভ ও স্নেহশীল এক পূর্ণাঙ্গ কিশোর রূপে সে বেড়ে উঠতে থাকে। গরমের দুপুরে নামতা মুখস্ত করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়লে, কালুদা তাকে হাওয়া করে যায়, যতক্ষণ না তার ঘুম ভাঙ্গে।

রাত্রে দুটো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে জোরে জোরে পড়া করে সে। কাকা তাকে একটা গ্লোব উপহার দিয়েছেন। সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কালুদাকে দেশ চেনাতে থাকে। কালুদা অবাক হয়ে যায়। ইতিহাসের যুদ্ধ, বিজ্ঞানের ফোটোসিনথেসিস ব্যাপারগুলো গো গ্রাসে গেলবার সময় ভায়ের জন্যে গর্বে বুকটা ভোরে ওঠে তার। মা ডাকেন – ও কালু চা নিয়ে যা, সে চেঁচিয়ে উত্তর দে – “একটুকুন সবুর করুন গো মা, গাছগুলা অখনও সূয্যি দ্যাবতা থেকে আগুন নিয়ে মাটির রস ফুটায়ে খাবার বানাচ্ছে, সব বেতান্তটা শুনে নিয়ে যাব”।

মায়ের কাছে বসে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে আবার – “হ্যাঁ গো মা জননী – ইটা সত্যি বঠে? পাতার ভিতরে একরকম সবুজ সবুজ মশলা থাকে? আমরা যেমন লুন হলুদ দিই, গাছগুলাও কি উগুলা দিয়ে খাবার বানায়”?

মা ঠাকুরুণ বলেন – “হ্যাঁ রে বাবা ভাই যখন বই থেকে পড়েছে, তখন তো সব সত্যি। ওই থেকেই তো ফল ফুল হয়”। এরপর ভাই ম্যাট্রিক-এ প্রথম বিভাগে পাশ করলো। কালুর তখন সে কি আনন্দ। ধামা ধামা মুড়ি, বাতাসা, বাগানের আম বিলি করে এলো সে গ্রামের লোকেদের।

বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে ভর্তি হওয়ায় ভাই চলে গেল। টিনের বাক্সে জামাকাপড় গুছিয়ে তাকে ছেড়ে আসার পর কালু বলে বেড়ালো – “আমার ভাইয়ের মাথা ট তে কত্ত বুদ্ধি বটে, কত্ত বড় কলেজটাতে পড়ে।” পিতৃহারা সন্তানটির জন্য মা উদাস হয়ে বসে থাকলে তাকে আশ্বাস দেয় সে,- “উয়াকে লিয়ে আর ভাবতে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ, উ একদিন অনেক বড় কাজ করবেক।”

সত্যিই কালুর ভাইকে নিয়ে আর কাউকে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। আই এস সি পাশ করে সে চলে গেছে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং তারপর সেখান থেকে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার্থে। যেদিন সে চলে গেল, মা সেদিন সারাক্ষণ জপ আর পাঠে কাটাতে লাগলেন। তুলসী তলায় প্রদীপ দিতে এসে তাঁর খেয়াল হলো বিকালের চা দেওয়া হয়নি কালুকে। গরুর জন্য বিচালি কাটছিলো সে। কাটছে তো কেটেই যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কাঁধে ফেলে রাখা গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। নিজের দুঃখ হতাশায় কখনো তিনি কাবু হননি। আজ হবেন না সংযমের বাঁধ যেন না ভেঙে যায় তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা বড় গেলাসে চা করে বাটিতে মুড়ি নিয়ে ডাক দিলেন কালুকে, –

“মন খারাপ করিস না কালু, ওখানে তো ভাই পড়তে গেছে, কত জ্ঞান অর্জন করে বড় চাকরি নিয়ে ফিরে আসবে সে।”

পরেরদিন দুপুরে কালুর জন্যে রাঁধলেন কলাই ডাল, পোস্ত আর আমড়ার ঝাল চাটনি। কালু হাত চাটতে চাটতে বলল, – তুমার হাতের ব্যাজনটা যে খায় নাই, সেকি বুঝবেক উয়ার স্বাদ কি?” – বাটি থালা সব খালি হয়ে গেল এক নিমেষে। “আর একটুকুন দাও গো মা।”

তিনবছর কেটে গেল। সারা গ্রামে গুঞ্জন শোনা গেল, কালুর বিদ্বান ভাই মেম বিয়ে করেছে। বাড়িতে মায়ের কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ভিড় জমালেন। কেউ বললেন, – কী এই বিধবা মায়ের কাছে ম্লেচ্ছ বৌ আনবে? আমরা থাকতে তা কিছুতেই হতে দেব না। কেউ আবার পরামর্শ দিলেন – আপনি তো অর্ধেক সময় উপোস, পুজো আচ্ছা নিয়ে থাকেন, এবার অনশন ধর্মঘট করুন। আমরা সবাই অবস্থান ধর্মঘট করবো। এয়ারপোর্ট থেকেই ভাগিয়ে দেব ঐ মেমসাহেব কে। কেউ আবার এও বললেন – “এখানে যেমন ছেলেধরা থাকে, ওসব দেশে সেরকম মেয়েগুলো ছেলে ধরবার কাজ করে, এলে একেবারে এমন হেস্তনস্ত করব, পালাবার পথ পাবে না।” একটি ছোট মেয়ে টিপ্পনি কাটল, তার মা ঠাকুমার কথার খেই ধরে – “মেয়ের চোখে লংকার গুঁড়ো ছুড়ে দেব” – হাঁউ মাউ চাউ করে কেটে পড়বে রাক্ষুসীটা। বাঙালি ছেলেকে ধরার মজাটা টের পাবে তখন।”

কালুদা কিন্তু ভীষণ খুশি, তার ভাই বৌ নিয়ে বাড়ি আসছে, এর চেয়ে বেশি আনন্দের কি হতে পারে? বৌ কোন দেশের, কোন জাতের, কোন ভাষার বা কেমন দেখতে অতশত সাত পাঁচ ভেবে লাভ কি তার? ভাই যে ফিরে আসছে সেটাই তার কাছে সবথেকে সুখের কথা। ভাই নিজে যখন পছন্দ করেছে, তখন সেও যে ভাইয়ের মতনই সুন্দর মনের মানুষ হবে এটাই তার বিশ্বাস, তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোই তার প্রধান কর্তব্য।

শুরু হল বাড়িঘর পরিষ্কার করে সাজিয়ে সারিয়ে তোলার কাজ। শহর থেকে মিস্ত্রি আনিয়ে তৈরী হল সেপটিক ট্যাঙ্ক, পায়খানা, বাথরুম। ভাই তাকে এটি করার জন্য আগেও অনেকবার বলেছে কিন্তু মা ঠাকুরুণ সকাল সকাল নদীতে নাইতে যান, পুকুরে গিয়ে গা ধুয়ে আসেন আর পাঁচজন গ্রামের মহিলার সঙ্গে তাই এতো দিন কালুর খেয়াল হয়নি। কলাগাছ কেটে দরজার দুপাশে লাগলো, কুমোর বৌকে ডেকে মাটির ঘটে বসালো, গ্রামের পটুয়াকে দিয়ে ঘটগুলিকে উঠোনের পাশের আঙিনায় রেখে চিত্র অঙ্কন করলো। বামুনদিদির মেয়েদের দিয়ে চারিদিকে দালানে দাওয়াতে আলপনা দেওয়ালো। নাপিত বৌকে আলতা পরানোর বায়না দিয়ে এলো। সে কি ধুম লেগেছে তার। তাঁতির ঘর থেকে এলো নতুন নতুন চাদর। কবেকার পুরোনো বালিশ তোষক বিদায় নিল বাড়ি থেকে। তার হৈ চৈ করা দেখে গ্রামের সহজ সরল চাষী বাসী, জেলে, বাউরি, বাগদী বৌরাও এসে হাজির হল বাড়িতে। কায়েত গিন্নি, রায় বৌদি, সাহা কাকিমাদের বাড়ির এয়োদের ধরে আনলো বৌ বরণের জোগাড় করতে।

আত্মীয় স্বজনের কথা তীক্ষ্ণ বাণে জর্জরিত মা প্রথমে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে বৌকে কিভাবে আপ্যায়ন করবেন, কেউ নেমন্তন্ন খেতে আসবে কি না ভেবে পাচ্ছিলেন না। গ্রামের পন্ডিত, পরিবারের বয়স্ক লোকেদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এবার কালুর উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে তাঁর মনের মেঘ সব যেন দূরে কোথাও উড়ে পালিয়ে গেলো। ঘরে এলেন সেই বিদেশিনী। বৌকে ছেলে আগেই কাজ চালাবার মতো একটু আধটু বাংলা শিখিয়ে এনেছে। ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় বিদ্যাশিক্ষার আলোকে মেয়েটির মুখ জ্বল জ্বল করছে। মাকে পায়ে হাত দিতে নিচু হতেই বামুন দিদি ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন – “ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা বাছা, মাকে আবার এই অবেলায় চান করতে হবে।”

কালুদা রেগে উঠলো – “হলে হবেক। মা চান করবেক আর একবার, তা বলে বৌ এর পেন্নামটা লিবেক আবার নাই?”

ভাই বৌ নিয়ে চলে গেল তার কর্মক্ষেত্রে, একবছর পরেই ওদের কোল আলো করে এলো ফুটফুটে দেবশিশুর মতন এক কন্যা। বাবার মতন মুখ, মায়ের গায়ের রং। এখন বাড়িতে এলেই তার জায়গা হয় কালুকাকুর কোলে কাঁধে।

মেয়ে যখন তিন বছরের তখন ছয় মাসের জন্য ভাইকে আবার বিদেশ যেতে হলো কোনো ট্রেনিং এর জন্য। বৌ এবং মেয়েকে সে রেখে গেল, গ্রামের বাড়িতে কালুদার জিম্মায়। ঠাম্মার সঙ্গে ভালো ভাব জমবে বলে। সেই ছয় মাস বোধহয় কালুর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

মা তার বিদেশিনী বৌমা ও নাতনিকে কোনোদিনই অনাদর করেননি, কিন্তু পুজো পাঠ, বার ব্রত, একাদশী, নির্জলা উপবাস ভুলে গিয়ে সর্বদা বুকে টেনে আদর করতেও পারতেন না। তাই তাদের সবকিছু প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত ছিল ওই কালু। ছোট্ট সরস্বতীর মতন গৌরাঙ্গী তখন আদো আদো স্বরে কাকু কাকু বলে ডাকতে শুরু করেছে, কাকু তাকে কাঁধে নিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে সারা গ্রাম। পুকুরপাড়ে ছাগলের সঙ্গে খেলা করতে, বাগানে কাঠবেড়ালি তাড়াতে, জাল ফেলে মাছ ধরা দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগে। সকাল বিকেল গরুর দুধ দোওয়ানো দেখে তার শিশু মন অপার আনন্দে ভরে যায়। ধান ক্ষেতের আল ধরে কালুকাকু তাকে কাঁধে নিয়ে চলে। চাষী বন্ধুরা জমির কলাইশুটি, কুমড়ো, লাউ এনে হাতে দেয়। কালু এনে ঢেলে দেয় মা ঠাকুরুণের সামনে।

সহজ সরল, নির্ভেজাল এই মানুষটির সান্নিধ্যে ওই ছোট্ট কন্যাকে ছাড়তে তার ওই মা বা বৌদিমনি কারুর মনেই কোনো দ্বিধা আসে না। বিদেশিনী বৌমা ভাবেন, – নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন কত শহরে কতধরনের লোকের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন, কিন্তু এমন একজন নিখাদ সোনার মতন অতি স্বাভাবিক অথচ উচ্চ মানসিকতার মানুষ তিনি আর দুটি দেখেনি। যে কোনো বিষয়ে তার থ্যাংক ইউ বলা অভ্যেস। কালু জেনেছে মা ঠাকুরুণের কাছে তার মানে। একদিন হাসতে হাসতে বলে – “তুমার অতগুলা থ্যাংক্যু এই কালুর প্যাটে হজম হবেক লাই গো বৌ মনি। সন্ধ্যেবেলায় যখন যাব একেবারে বলে দিও। এতো মিষ্টি কথা শুনলে কালুর মনটা কেমন যেন আটুপাটু করে।” সেই থেকে ছোট মেয়েটাও শিখেছে – “আমার ও মনটা আটুপাটু করছে মা কালু কাকুর মতন। সবাই হেসে ওঠে তার কথা শুনে।

কিছুদিন পরে ভাই ফিরে এলো এবং কয়েকদিন খুব হৈ চৈ আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়ে ফিরে গেল রাঁচিতে তাঁর কর্মস্থলে। যাওয়ার আগে কালু দাদার জন্যে নিয়ে আসা একটি দামী ঘড়ি বেঁধে দিল তাঁর হাতে। প্রথমে সে তো লজ্জায় আবেগে গলায় নতুন কলার পড়া পোষা প্রাণীটির মতন হেঁসে নেচে গ্রামের সবাইকে দেখিয়ে এলো, তারপর আবার সেটি ভালো করে বাক্সে বন্দি করে বললে, – “হাতটা কনকনায় গেলরে ভাই, ইটা আমার কলাই রাখতে লারবেক (অর্থাৎ পারবেক নেই)। সূয্যির আলো ঐ উঠানে মারাইতে, পিয়ারা গাছে পড়লে উয়ার ছায়াতেই বুঝা যাই দণ্ড কত হল। ইটা অন্য কাউকে দিয়ে দাও ভাই।

ছোট্ট সরস্বতী তার কালো কেষ্ট ঠাকুরের কোল থেকে কিছুতেই নামবে না। জোর করে তাকে গাড়িতে বসিয়ে কালু দা বলল – “পরীর মতন মেয়েটাকে একটুকুন, সাবধানে রাখবে গো বৌরানী।” ভাই এবার তার হাতটা ধরে তাতে একটু চাপ দিয়ে বলল – “এবার খুব বড় বাংলো কোয়াটার পেয়েছি গো কালুদা, তোমাকে আর মাকে নিয়ে গিয়ে রাখব। বাগান করার মেলা জায়গা, তুমি লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে যা ইচ্ছে লাগবে।

– বটে বটে? ক্যানে যাবো নাই ভাই তুমি যিখানটায় লিয়ে যাবে শিখানকেই যাবো। মাঠাকুরুণ এই কালুকে ছাড়া থাকতে পারবেক নাই। লিচ্ছই যাবেক তুমার কালুদা।” সরস্বতী মাকে নিয়ে সে এই কয়মাস কুমীর কুমীর খেলত। কালু উঠোনে কুমীর হয়ে বসত তার ঐ শ্বেত পরী সিঁড়ি থেকে একটু নেমে তার আদো আদো সুরে বলল – “কুমীর তোর জলকে লেবেচি।” আধবুড়ো কুমিরটা তাকে ধরতে গেলে সে ছুটে সিঁড়ির উপর চড়ে যেত এক লাফে। আর তার সঙ্গে খলখলিয়ে হাততালি দিয়ে হাসি। বড় ভালো লাগতো কালুর।

ক’দিন ধরেই দেখছে বামুনপাড়ার কিছু মুরুব্বি আসছেন মায়ের কাছে। তারা দশজন মহিলাকে তীর্থ করতে নিয়ে যাবেন কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী। তারই তোর জোর চলছে। ভাই কে পোস্ট কার্ড লিখে অনুমতি আনিয়েছেন মা ঠাকুরুণ। কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করার কথাটা কেউ ভাবেনি। যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই হাঁউমাঁউ করে কেঁদে পায়ের কাছে বসে পড়লো কালু – “যেথ্যে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ। অতদূরে।”

মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন – তাঁর প্রৌঢ় শিশুটির দিকে। সত্যিই তো তার খুব ভুল হয়ে গেছে কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

“তুমি তো ঘরকে বস্যে বস্যে সারাক্ষণ পূজা পাঠে ল্যাগ্যে থাক্ক্য, উয়ারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বুলে, হাঁটা চলার অভ্যাস আছে। দোকানে বাজারে খাবার খাবেক, তুমি তো – ” কালুর কান্না দেখে মনে হচ্ছে যেন পিতা পুত্রী কে দূরে শ্বশুর বাড়ি পাঠাচ্ছে। কিন্তু এতো টাকা দেওয়া হয়ে গেছে – এতজনের সঙ্গে ট্রেন গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলেছে, গ্রামের অন্যান্য সব মহিলাও রাজি হবেন না মাকে ছাড়া যেতে। অতএব তীর্থ যাত্রায় বেরিয়ে পড়লো যাত্রীরা দলবল বেঁধে।

বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে। হরিদ্বার থেকে একটা পত্র এসেছে শুধু। কালু সেদিন বাগানে কাজ করছে। হটাৎ একজন এসে বললে – “ও কালুয়া তু এখনও ঘর যাস নাই রে? – দ্যাখ গা যা তোদের ঘরকে কত লোক আইছে।”

– “আরে অমন ভ্যাল ভ্যালায়ে তাকাই আছুস ক্যানে রে, খারাপ কিছু ঘটে নাই। গাঁয়ের মায়েরা তীর্থ করে ফিরত আইছে। তোদের উঠোনেই তো সব জড়ো হইচ্যে গো। বৌ বিটিরা উনাদের পেন্নাম করত্যে যাবেক নাই? তীর্থের ধূলা উনাদের পায়ে, ঘটিতে গঙ্গাজল। চল চল কালু জলদি চল। মোচ্ছব লেগ্যে যাবেক উখানে।”

কালু হন্তদন্ত হয়ে ঘরের কপাট গোড়ায় পৌঁছেই হতভম্ব একেবারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কিছুক্ষণের জন্য। এ কী চেহারা হয়েছে মা ঠাকুরুণের, অতসুন্দর সোনার প্রতিমা যেন শীর্ণকায় তামাটে আর সবচেয়ে দুঃখের বা কালুর কাছে আশ্চর্যের বিষয় মাথা ন্যাড়া। বামুনঠাকুররা ও তাঁদের আত্মীয় স্বজন খোল কর্ত্তাল বাজাচ্ছে, এতগুলি বিধবাকে চারধাম যাত্রা করানোর পুণ্যফল তাঁদের কোন খাতায় লেখা হচ্ছে কে জানে। কিন্তু কালুর ছায়া এরা মাড়ান না, তাই ভিজে গামছাটা কাঁধে থেকে কোমরে বেঁধে আবার ছুট লাগলো মাটি কোপাতে। বিকেল গড়িয়ে গেছে – কালু মাটিতে কোদাল চালাচ্ছে আর বলছে – “ইয়াকে আবার ধম্ম বলে? কচি বৌ টা বেধবা হতেই তার সব চুড়ি হার খুলে নিয়ে সাদা থান পরায়ে দিলেক। ইয়ারা ভদ্দর নোক বটে। ইয়াদের চ্যায়ে আমাদের ছোট জাতেই ভালো বিধবার বিয়াও হয়, তারা সব খায়ও। ধুস শালা তোদের অমন ধম্মের নিকুচি করেছে কালু।”

কদিন থেকেই শ্রাবনের জলধারা থামছে না। ভাই তো আসতেই পারছে না ট্রেন বাস ভালোমত চলছে না বলে। কালু হাটে গেছে। কিছুক্ষণ ধরে গরু দুটো বড় চেঁচাচ্ছে। মা তাড়াতাড়ি করে গোয়ালের পেছনে শুকনো খড় বের করতে গেলেন। হটাৎ কিসে যেন পা টা আঘাত পেয়ে কেটে গেল। ঘরে এসে খানিকটা গাঁদাপাতা লাগিয়ে দিলেন, একটা কাপড়ের ফালি ছিঁড়ে বেঁধে দিতেই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু পরদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না, পা ফুলে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। জ্বর এসেছে তাঁর।

কালু কবিরাজ মশাইকে নিয়ে এল, তিনি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, – “পা টা যে সেপটিক করে ফেললে বৌমা। কিসে কেটেছে নিশ্চয় লোহায়। তারপর তাঁর মধ্যে মাটি গোবর সব ঢুকেছে। এখানে তো ফেলে রাখা যাবে না, শহরে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ির ব্যবস্থা করো কালু।” কালু ছুটলো দিকবিদিক শূন্য হয়ে।

গ্রামে সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না। একটা বাসে চড়ে দুর্গাপুরে গিয়ে বোস বাবুদের ছোট বেটা যখন গাড়ি নিয়ে এল, তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে।

মায়ের শরীরে ‘ধনুষ্টঙ্কার’ রোগ গোটা দেহটাকে বেঁকিয়ে দিচ্ছে। পাশের গ্রামের ডাক্তারবাবু এসে ইনজেকশন দিয়েছেন। জীবনের এতগুলো বছর যে কালু মাকে ছুঁয়ে প্রণাম করেনি, আজ সে মাকে চেপে ধরে বসে আছে। যন্ত্রনায় শরীরটা দুমড়ে যাচ্ছে, কাতরাচ্ছেন তিনি। কালু বলছে – “ভাইকে তার করে দিয়েছে, সে চলে আসবেক বাঁকুড়া হাসপাতালে।”

ঠিক গাড়ি ছাড়বার আগে মা একবার কোনওরকমে চোখ খুলে কালুর দিকে তাকালেন। অতি কষ্টে বলতে পারলেন, “গরুটার বাচ্চা হবে কালু ওকে ছেড়ে…” – কথাটা শেষ হবার আগেই তাঁর শিরদাঁড়ায় যন্ত্রনা শুরু হলো, শরীর আবার বেঁকে যেতে লাগলো তাঁর। দুজন দুদিক দিয়ে ধরে আছে তাকে গ্রামের দুই কাকা, ড্রাইভার কে বললেন একজন – “তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও গো ভাই। বর্ষাকাল, রাস্তাঘাটও ভালো নয়। বাঁকুড়া সদর হাসপাতাল তো আর এখানে নয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাবে।”

মায়ের কথা আজ পর্যন্ত কালু অমান্য করেনি, মা তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন না, দুঃখে অভিমানে হতাশায় হতবুদ্ধি হয়ে কালু বসে পড়লো রাস্তার ওপর। পাঁচসিকে মানসিক করলো মা দুর্গার কাছে। ভগবান, ঠাকুর দেবতা কিছুই সে জানে না, মানেও না, কিন্তু তার মনে হল, গাঁয়ের লোকেরা তো মানসিক করে পুজো ও চড়ায় মা ঠাকুরুণ ভালো হলে তাকে সে ও ঘরে একটা বড় রকম “মোচ্ছব” করবে। চারদিন পরেই খবর এল, তার মা ঠাকুরুণ আর এ জগতে নেই।

সারা গ্রামের বিধবা সধবা কচিকাঁচার দল যারা দুপুরবেলায় রোজ আসতো এই ঘরের বড় বারান্দায় মা ঠাকুরুণের রামায়ন বা মহাভারত পাঠ শুনতে, তারা সবাই এসে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে বাড়ির উঠোনে। চন্দনের তিলক কাটা যে বোষ্টম-বোষ্টমী রোজ প্রভাতে এসে “রায় জাগো – রায় জাগো” বলে গান শুনিয়ে যেত তারা ফকির, বাউল, শ্মশান ঘাটের কালী সেবক লাল সিঁদুরে টিপ আঁকা, – কেউ বাকি নেই। ভজা পাগল যখন তখন এসে “খেতে দিবি নাই” বলে ডাক ছাড়তো, সেও হাঁকডাক করতে করতে ঘরে ঢুকেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে গোয়ালে গিয়ে চিৎকার জুড়েছে, “আই শালা কালু বল তোর মা কুথায় পালাইছে, অখন আমায় খ্যাতে কে দিবেক।” পাড়ার আত্মীয় স্বজন ছেলে বুড়ো বৌ ঝি রা কাঁদছে হাউহাউ করে। কালুর চোখে শুধু জল নাই। সে তো বিশ্বাসই করেনি এখনও তার দেবী মা আর কখনো আসবেন না। ওদিকে গরুর প্রসব বেদনা উঠেছে, কালু মন দিয়ে তাকে দেখাশুনা করতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে।

মায়ের শ্রাদ্ধ গ্রামেই হবে। তাই স্বস্ত্রীক কন্যা সহ ভাই এসেছে রাঁচি থেকে। কালুর তো কারুর সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। কাঙালি ভোজনের জোগাড় করা থেকে শুরু করে নিয়ম ভঙ্গের দিন পর্যন্ত জ্ঞাতি গুষ্টির মৎস মুখ করতে পুকুরের মাছ ধরা সবই তার দায়িত্ব। এ সময় একবার ও তার ভায়ের সঙ্গে কথা হয়নি, মনে মনে রাগও পুষেছে সে, “ঘরের নকখী (লক্ষী) চল্ল্যে গেলেক, আর ইয়াদের খাওয়া দাওয়ার ধুম লাগাইছে। পন্ডিতগুলা খাট, বিছানা, ছাতা লিয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে চলছে যেন – শালা ঘরের জামাই বটে। ছ্যা ছ্যা ইটা তুমাদের কোন ধম্ম কেউ বলতে পারবেক এই মুখ্য সুখ্য কালুকে?” আত্মীয় স্বজন সবাই চলে যাবার পর “স্বরস্বতী পরীকে” নিয়ে খেলা করছিলো সে, নতুন বাছুরটাও বড় সুন্দর – মনটা হালকা হল শিশুর সঙ্গে খানিকক্ষণ কাটিয়ে। ভাই ডাকলেন খুব মায়াময় স্বরে।

“কালুদা একটু কাছে বসো।” হাতে তার কতগুলো কাগজ। – “এটা রাখো তোমার কাছে যত্ন করে।” – “কি বটে ভাই ইটা? আমাকে দিতে হবেক নাই, হারাই যাবে, তুমার ঠায়ে লিয়ে যাও।”

– না গো কালুদা, এটা তোমার। আমাদের জমি, পুকুর, বাগান আমি সব তোমার নাম করে দিয়েছি। বসত বাটিটা থাক, কাকার ছেলেরা পূজোর সময় এসে থাকবে।

– “ক্যানে ভাই?”

-“তাহলে তোমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তাই। আর তোমাকে বলার সময় পায়নি, আমরা এ দেশে আর থাকছি না। অনেক বড় চাকরি পেয়েছি, বৌমনিও তোমার ডাক্তারি পড়তে ঢুকবে। আমরা আমেরিকায় চলে যাচ্ছি।” কথাটা শেষ করতে দিলো না কালু। তার চোখে তখন বিদ্যুতের ঝলক। ভীষণ জোরে একটা বাজ পড়ার মতন আওয়াজ করে সে চিৎকার করে উঠল – “আমার চাই নাই গো, তুমরা সবাই আমাকে ফ্যালে চল্যে যাব্যে? কার ল্যাগে ই গুলা আগুলে কালু পড়ে থাকবেক?

কাল বৈশাখীর ঝড়ের মতন ভীষণ শন শন হওয়ার বেগে কালু দরজা খুলে ছুটে পালিয়ে গেল, একবারও তাকালো না পিছনে ফিরে।

আন্দামান অভিযান (Andaman Ovijan)

(১)
ছটফটে সেই ছেলেটা, যার নাম হ'ল তুফান,
বাবা মায়ের সঙ্গে যাবে ঘুরতে আন্দামান।
দেখার আশায় সাগর ঘেরা, অপূর্ব এক স্থান
খিদিরপুরের ডকে গিয়ে চাপলো জলযান।
জাহাজ ভাসে, ফেনা হাসে বালুর সূর্যস্থান,
ঢেউ এর তালে শরীর দোলে জুড়িয়ে গেল প্রাণ।
নীল সবুজের গভীর জলে শোনে সে আহ্বান, -
তুফান চলে, দুলকি চালে, সুদূর আন্দামান।
(২)
দূরের থেকে দ্বীপের আলো ভরালো দু নয়ান,
আস্তে কাছে উত্তেজনায় দাঁড়ালো টান-টান,
আনন্দেতে হয় আটখান, তুফান ধরে তান।
ভীস্মলোচন শর্মা তখন, চেঁচিয়ে করে গান।
আশে পাশে বন্ধ হাসে, ধরলো চেপে কান, _
জাহাজ হতে ঝাঁপ দিতে তার প্রাণ করে আনচান।
পাহাড় ঘেরা, মুক্ত ঝরা সবুজ আন্দামান,
তুফান ভাবে, পালিয়ে যাবে, করবে অভিযান।
(৩)
জমির পরে থরে থরে নারিকেলের সারি -
দারুচিনি গাছের পাশে লবঙ্গ সুপারি।
পেঁপের পাতা দোলায় ছাতা তাল তমালের ঝাড়ি।
জলের ধারে চার কিনারে - শুভ্র বালিয়াড়ি।
শোর গোল বা হল্লা সাথে হেথায় সবার আড়ি।
আঁকা-বাঁকা রাস্তা ফাঁকা, নেই কো প্রাসাদ বাড়ি।
ছুটিয়ে নিয়ে যাবে সেথায়, ভ্রমণ যাত্রি গাড়ী।
শান্তি পেতে দাও ছুটিতে, আন্দামানে পাড়ি।
(৪)
সাগর পারে প্রাচীর ধারে বানানো উদ্যান,
“পোর্ট-ব্লেয়ারে" ইতিহাসের কাহিনী অম্লান।
“বৃদ্ধ বট বৃক্ষ” শোনায় অত্যাচারের গান।
বন্দি ছিল “সৈলুলরে” সংগ্রামী সন্তান।
ভারতমাতার মুক্তি লাগি জীবন বলিদান।
কালাপাণির কারাগারে "শহীদ" হারায় প্রাণ।
কত ফাঁসির সাক্ষি ছিল, নীরব আন্দামান।
“স্বাধীনতার বীর" কে তুফান জানালো সম্মান।
(৫)
“জলী বয়ের” দ্বীপ বিচিত্র, শুনেছে সে আগে,
কাচের নৌকা চেপে যেতে বিস্ময়ে যে জাগে, -
ডুবুরিদের কাছে সে তাই মুখোশ চশমা মাগে,
প্রবাল দ্বীপের অভিযানে স্টীমার চলে আগে।
“সজীব-কোরাল" দেখার আশায় পরম অনুরাগে ।
উৎসাহ আর কৌতুহল তো মনে কামান দাগে।
হাজার রঙের বাহার দেখে, চোখে চমক লাগে।
নরম প্রবাল ছুঁতে সে চায়, সুতীব্র আবেগে।
(৬)
ডুব সাঁতারে গিয়ে দেখে নীল সাগরের তল,
সুন্দরতায় বিভোর শিশুর মন হ'ল বিকল,
অপরূপা ময়ূর পাখা করছে যে ঝলমল,
স্থল পদ্ম ফুটল বুঝি, আসল না নকল।
কোথাও প্রবাল রামধনু রঙ, কোথাও সে অনল,
তারই পাশে করছে খেলা, রঙিন মাছের দল।
ঝিনুক শাঁখের ছড়াছড়ি স্ফটিক স্বচ্ছ জল,
ঢেউ-এর সাথে মিতালীতে তুফান কাটায় পল।
(৭)
নতুন জগৎ দেখার নেশায় পাগল যে মন প্রাণ, -
হঠাৎ জলের ঘূর্ণি টানে, ঘুরতে থাকে তুফান।
অক্সিজেনের মুখোশ ঢিলে, ধরলো বুকে টান।
রহস্যময় জলের নীচে প্রায় হ'ল অজ্ঞান।
তীরে ফেরার তরে সাতার কাটে সে আপ্রাণ,
মৃত কোরাল কাঁটায় আটকে বেঘোরে যায় জান।
ঠিক সে সময় উদয় হ'ল করতে পরিত্রাণ, _
জলের দেবতা কূর্মাবতার, করলো জীবন দান।
(৮)
প্রবাল দ্বীপের বালুর বুকে ওদের সবার বাস,-
'কচ্ছপ'দের দলটি সেথায় থাকে বারোমাস।
জলের ভেতর খেলায় মাতে, পেলেই অবকাশ।
ভালোবাসে আন্দামানের অসীম নীলাকাশ।
তুফান যখন ডুবছে জলে, ফুরিয়ে এল শ্বাস,
“কাছিম বন্ধু" দলটি গেল, সাঁতরে তারই পাশ।
ধাক্কা দিয়ে তুললো ডাঙায় ভয় করলো নাশ।
তুফান বাবুর মিটলো তখন রোমাঞ্চকর-আশ।
(৯)
নীল সাগরের তীরে বসে, স্নিগ্ধ সবার মন, -
সাদা ফেনায় সফেন হল, বেতের উপবন।
“জারোয়াদের”" বন্য জীবন দেখবে সে কখন!
ভাবছে যখন, করছে তখন, সবাই লঞ্চে ভ্রমণ।
“কার-নিকোবর” সবুজ দ্বীপে আছেন পরিজন, -
এয়ার ফোর্সে কর্মরত কাকুর বন্ধুগণ।
শ্যাওলা জলে, রৌদ্রছায়ায়, মেঘের মায়ায় মগন,
পৌছে গেল, সেথায়, যখন, তারায় ভরা গগন।
(১০)
রাত বারোটায় “ সান্টাক্লজের হঠাৎ আগমনে,
নৃত্যগীতে মাতলো সবাই মাদল, বাঁশির সনে।
“খৃষ্টমাসের" এই উৎসবেতে ভীষণ খুশী মনে,
কেউ বা আবার চার্চে গিয়ে যীশুর গান যে শোনে।
বাবা, কাকা 'বড়দিনে' ভোজের নিমন্ত্রণে, -
মা কাকীরা গল্প করেন, তাকিয়ে টিভির পানে।
তুফান খেলে, লুডো, ক্যারাম, পাশের ঘরের কোনে,
সাগর তটে জেলেরা সব হাত সেঁকে আগুনে।
(১১)
পরের দিনে প্রভাত বেলায়, সাগর কিনারায়, -
অদ্ভত এক দৃশ্য দেখে, তুফান ছুটে যায়;
সমুদ্র জল যাচ্ছে সরে, পিছন পানে হায় !
সাগর গর্ভ শূন্য একী ! ঘর বাড়ীকে দোলায় !
ভূমিকম্পে কাঁপছে ভুবন, সবাই কোথায় ধায়?
হঠাৎ দূরে, ভীষণ জোরে আসছে পাহাড় প্রায়।
"সুনামি" ঢেউ দানব যেন হাওয়াতে গর্জায়।
দিশাহারা ভীত মানব পালায় ছুটে ডাঙায়।
(১২)
এক নিমেষে সবাই ভাসে, প্রবল সে ধাক্কায়।
গাড়ী বাড়ী রাস্তা দোকান ডুবলো যে বন্যায়।
লোনা জলের স্বাদে অবশ বিবশ দেহটায় -
প্রাণ আছে, তাই তুফান গাছের ডালটিকে আঁকড়ায়,
একটি ছোটো কচ্ছপ সে হাতের কাছে পায়, -
জড়িয়ে ধরে বুকে তারে আবার ধাক্কা খায়।
ঢেউ-এর দাপট একটু কমে, মাঝিরা সাতরায়,
আবার আসে, ভয়ানক সে, কে কাকে বাঁচায় !
(১৩)
সেই সে ক্ষণে, তাহার সনে ঝুলছে ডালে সাপ,
মরা বিড়াল মাছ ধরা জাল, নতুন চশমা খাপ।
গ্যাসের উনুন, স্টীলের বাসন, নেই তাতে উত্তাপ,
সেলাই মেশিন, ভাঙা বেসিন, কাঠের সিঁড়ির ধাপ,
শাড়ি হাড়ি উল্টো গাড়ী চা দোকানের ঝাঁপ।
মুরগি খাচা, বাঁশের মাচা, ফুলদানী, প্লেট, কাপ।
ভাসছে জলে, সবাই মিলে, দিলে, মরণ ঝাঁপ,
ভাবছে, মানুষ, পাপের ফানুস, ঝরছে অভিশাপ।
(১৪)
বিপদ মাঝেও শান্ত ছেলে, জ্বাললো আশার আলো,
গাছের মাথায় তেষ্টা ক্ষুধায়, দিন রাত কাটালো।
স্মরণ করে ঈশ্বর সে ভয় যে তাড়ালো।
বুদ্ধিবলে, সুকৌশলে সাহস জাগালো।
ছোট্ট ভীরু কাছিম সঙ্গে বন্ধু পাতালো,
ভাসমান এক কুকুর ছানার প্রাণটি বাঁচালো;
“আমার ঘরে রাখবো তোরে “আদর জানালো।
দশ বছরের মাথাটি তার শান্ত সে রাখলো।
(১৫)
তৃতীয়দিন, শরীর যে ক্ষীন, হাত পা অচল প্রায়,
তবু তুফান বলছে কথা, উৎসাহ না হারায়,
নারকেল ডাব যাচ্ছে ভেসে আনলো টেনে তায়।
তারই জলে, তখন তুফান পিপাসা মেটায়।
প্রলয় এখন থেমে গেছে, কিন্তু ডাঙা কোথায় ?
মায়ের মুখটি পড়ছে মনে, ফিরবে কবে হায় !
ঠিক তখনই “হেলিকপ্টার” দেখতে তাকে পায়।
উদ্ধার হয় বীর বাহাদুর, ফিরলো কলকাতায়।