উপহার (Upohar)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেজ কাকীমার ন'দির দেওর খুব একটা দামী সুন্দর বিদেশী ঘড়ি উপহার দিয়েছেন নিজের বৌদিকে। তিনি আবার সেটি তাঁর আদরের বোনঝি অর্থাৎ সেজকাকীমার মেয়ে 'ঝর্ণা' কে জন্মদিনে দিয়ে দিলেন, কারণ তাঁর কাছে ওইরকম আরো একটি ঘড়ি আছে। বোনঝি বললো - আজকাল রিস্টওয়াচ পড়ার ফ্যাশন নেই আমরা মোবাইলেইতো সময় দেখে নিই। ক্যালেন্ডারও বাড়িতে টাঙায় না কেউ, সেটাও ফোনেই পাওয়া যায়। আবহাওয়ার খবর, কারো ঠিকানা, দোকানের হদিশ কিছুই আর গুগল-এর দৌলতে না পাওয়া নয়। অতএব অত কথায় কাজ নেয় ভেবে, মেয়ের মা অতি যত্ন করে আলমারীতে তুলে রাখলেন, কাউকে গিফট করবেন বলে। আমার মেয়ের বিয়ে। অতএব সুন্দর প্যাকেটে ওটি চালান হলো এরপর আমার বাড়ীতে। ব্যাপারটা আমার বাড়ীতে কেউ জানে না, ওটি ঠাঁই পেলো আমার ড্রয়ারে। প্রাণের বন্ধু সুনীলের বিবাহবার্ষিকী। সেদিন অফিস থেকে এসে মনে পড়লো, আরে কিছুই তো কেনা হয়নি। ঘড়ি বের হ'ল আমার সংগৃহিত উপহারের পেটি থেকে। বৌ একবার বললো - এতো দামী জিনিষটা বন্ধুকে দেবে?

– তাতে কি হয়েছে, কিনতে তো আর হয়নি গো, পড়েইতো আছে। ও তো আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে রুপোর সেট দিয়েছে।

– হুম, ওটাতো মণিদার ছেলের বৌভাতে দিয়ে দিয়েছি।

– এটাও হয়তো ওরা আবার কাউকে দিয়ে দেবে।

মাঝে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। হটাৎ খবর পেলাম সেজকাকীমার ন'দির সেই দেওর আমেরিকার থেকে এখানে আসছেন ছেলের বিয়ে দিতে। মেয়ে বাঙালি নয়, রাজস্থানী। উদয়পুরের কোনো হোটেল প্যালেস ভাড়া করে তারা বিয়ে দেবে।

একে বলে নাকি destination  wedding, মেয়ের বাবা বিরাট বড় বিজনেস ম্যান, পলিটিক্যাল লিডার, অতএব পুরো বাঙালি গুষ্টিকে নেমন্তন্ন করে বসেছেন সেই বিখ্যাত দেওর সাহেব। কারণ খরচ তাঁর কোনো হচ্ছে না। মেয়ের বাবায় সব arrangement  করবেন। আমেরিকান সিটিজেন জামাই। কোনো পণ নেবে না তাঁর বাবা মা, ঘর, গাড়ী, আসবাব, ফার্নিচার কিছুই দিতে হবে না, তাই আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে আছেন, ডাকা হচ্ছে, মেয়ের বাবার শান ও সৌকত দেখানোর জন্য। আমি যেহেতু দিল্লিতে থাকি, সুখে-দুঃখে সেজকাকীমা ও তাঁর দিদিদের দেখাশুনো করি তাই আমারও সুযোগ এসে গেলো। স্ত্রী বললেন, এতদিন পরে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে তো ছিঁড়লো। একটা বড়োলোকের বাড়ি ফিল্ম এক্টরদের মতন বিয়েতে তো যেতে পারব। শুরু হল নতুন জামাকাপড় জুতো কেনা। কিন্তু উপহার? আমি দেখলাম আলমারীর ওপর তাকে সুন্দর করে যত্ন সহকারে রাখা আছে একটি সুন্দর চামড়ার ব্যাগ। অবশ্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নামটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। একটা ভালো কাগজের ব্যাগে সেটা ভরে ফেললাম। দোকানে নিয়ে গিয়ে প্যাকেট করবো ভাবলাম কিন্তু সময় হল না। উদয়পুরে গিফট প্যাক হয়ে যাবে। এখন সুটকেসে ভরে ফেলো, বললাম স্ত্রীকে।

বিয়ের দিন সকালে ওখানে পৌঁছেই সব আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। হটাৎ পেছন থেকে কে যেন এসে জড়িয়ে ধরলো আমায়, চমকে উঠলাম -

– আরে সুনীল তুই? কতদিন তোর সঙ্গে দেখা নেই, তুই তো উদয়পুরে ট্রান্সফার হয়েছিলি, মনে ছিল না। কি খবর বল।

– এই হোটেলে আমার বস-এর মেয়ের বিয়ে, তাই আমরা অফিসের ক'জন বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছি। আর তুই?

– আমার এক দাদার ছেলের বিয়ে ওরা ইউ এস থেকে এসেছে।

– আরে এখানেই তো হচ্ছে সেই বিয়ে। খুব হৈ চৈ করে। গল্প-গুজব, খাওয়া দাওয়া চলতে লাগলো, হটাৎ সে বললে - একটু বাজারে যাব রে একটা গিফট প্যাক করতে। চল না আমার সঙ্গে, গাড়ীতে যাবি আর আসবি।

– স্ত্রী আমার হাতে একটা চিমটি কেটে বললেন, আমাদেরটাও প্যাক করিয়ে আনো, ঐরকম ভাবে দেওয়া যায় নাকি এতো বড় লোকের বাড়ীতে। যখন হাতে নিয়ে ঢুকবো তখন তো ভিডিও তুলবে।

– হাঁ হাঁ ঠিক বলেছো, আমাদেরটাও নিয়ে এসো। দুই বন্ধুতে একটা বড় দোকানে গেলাম। নানা ধরণের  কাগজ ও সোনালী রুপোলী ফিতে কাপড় দেখাতে লাগলো তারা। ব্যাগটা বেশ বড়, সেটি আমার হাত থেকে নিয়ে ওরা ভেতরে চলে গেলো। বন্ধুর গিফটটা ছোট একটা বাক্স। মনে হয় ঘড়ি। আরে হ্যাঁ, আমার দেওয়া সেই রিস্ট ওয়াচটা। সুন্দর সোনালী মোড়োকে আরও সুন্দর হয়ে গেল সেটি। কিন্তু ততক্ষনে আমার চক্ষু চড়ক গাছ। আরে এটা তো সেই বিদেশী তোফা ন'দির অনাবাসিক ইউ এস এ নাগরিক-এর দেওর থেকে সেজকাকার মেয়ে সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমার গৃহে এবং পরে সুনীলের বৌয়ের হাত ঘুরে আবার খোদ মালিকের ছেলের বৌ-এর কাছে পৌঁছে গেল। বাহ্ রে ভাই ঘড়ির ভাগ্য।

গিফট প্যাক নিয়ে যখন নিজের স্ত্রীর হাতে দিলাম তিনি কনুইয়ে এবার জোরে চিমটি কেটে বললেন - ওই ব্যাগটা সুনীল দেখতে পায়নি তো  গো? আরে ওটা তো ওরই দেওয়া উপহার মনে নেই তোমার। প্রচন্ড হাঁসির দমক থামাতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম আমি।

সেই মেয়েটি (Shei Meyeti)

Sei Meye ti , a story of an unknown girl. 

চন্দনা সেনগুপ্ত

মেয়েটিকে প্রথম দেখলাম সেদিন হাসপাতালের বারান্দায়। ভীষণ প্রাণবন্ত। সুঠাম সুন্দর চেহারা। মাথায় ছেলেদের মতন করে ছাঁটা খুব ছোট ছোট চুল, ফর্সা রঙ, ভাসা-ভাসা দুটো বড়বড় চোখ আর মুখে ঝরঝরে হাসি। একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলার আজ ছুটি হল, তাঁর দুটো ব্যাগ দুই কাঁধে ঝুলিয়ে, হাতে একটা সুটকেশ নিয়ে সাবধানে ঐ রোগীটির পাশে পাশে হাঁটছে। তাঁকে see off করতে আমি নিজের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
- আপনার মেয়ে, নাকি বোন? বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে আপনাকে? প্রশ্ন করলাম তাঁকে।
- না না ও তো আমার বেড-এ আজকেই ভর্তি হল। ও এখানে চিকিৎসা করতে এসেছে।
উত্তরটা শুনে ভীষণ অবাক হলাম আমি।
যদিও এটা আয়ুর্বেদ হাসপাতাল, খুব কঠিন অপারেশন বা হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া রোগী এখানে ভর্তি হন না, তবুও যারাই আসেন কেউ তো সুস্থ নন। হয় আর্থারাইটিস নয়তো ডায়াবেটিসে পা চলছে না, কিম্বা আমার মতন হাঁপানির রুগী, স্টেরয়েড নিয়ে নিয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, এখন নেবুলাইজার, অক্সিজেন ও ইনহেলার ছেড়ে আয়ুর্বেদের সাহায্য নিতে ভর্তি হয়েছি। এই বাগান ঘেরা সুন্দর হাসপাতালে। অতএব একজন রোগী আর একজন অচেনা রোগীকে এইভাবে সাহায্য করে - গেট পার হয়ে তাঁর গাড়িতে সব মালপত্র তুলে দিয়ে আসতে ও হাসিমুখে হাত নেড়ে টা টা বাই বাই করতে দেখে সত্যিই আশ্চর্য্য হবারই কথা।
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, ওর ফেরার অপেক্ষায়। আমার পাশের রুমেই আসতে হবে। কত আর বয়স হবে ওর ৪০/৪২, বারান্দার কোণে গিয়ে রেলিং ধরে ঝুকলাম নিচে। দেখলাম লনে, একজন অস্বাভাবিক রকমের স্বাস্থবতী মহিলাকে। হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে বাগানের বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে গেছেন নার্স, কিন্তু বোধহয় এবার ওখান থেকে উঠে আসতে চান। চেষ্টা করছেন নিজে নিজে লাঠি ধরে উঠে দাঁড়াতে। গেট দিয়ে ঢুকছিল সেই মেয়েটি, ওনাকে দেখতে পেয়ে এক ছুটে এলো তাঁর কাছে। প্রায় পড়ে যেতে যেতে মেয়েটিকে ধরে ফেলে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। মেয়েটি ধমক দিল তাঁকে। চুপচাপ বসে থাকুন আমি নার্সকে ডেকে আনছি। তারপর নার্স এলে দুজনে মিলে ধরে বসালেন, সেই মহিলাকে সাবধান হয়ে। এবার বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়ালো, বেড়াল ছানার সঙ্গে কিছুক্ষন খেলা করল সে। তারপর উদাস হয়ে কিছুক্ষন বসে রইলো দূরের আকাশের দিকে চেয়ে। এবার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল সে। তিনি আস্তে আস্তে থেরাপি রুমের দিকে বোধহয় ম্যাসাজ করতে যাচ্ছিলেন, হাতে একটা ফাইল নিয়ে। হটাৎ সেটা পড়ে গিয়ে ভেতর থেকে এক্স-রে প্লেট, ওষুধের প্রেস্ক্রিপশন ও অন্যান্য কিছু কাগজ ছড়িয়ে পড়ে গেল চারিদিকে। আবার সেই মেয়েটি এলো ছুটে। নিচু হয়ে বসে একে একে সব তুলে, গুছিয়ে ফাইল ভরে ভদ্রলোকের হাত ধরে নিয়ে গেল সে রিসেপশন এর দিকে।
ওর এইসব ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। মেয়েটি ফিরে এসে দাঁড়ালো, আমার সামনে। একমুখ হাসি নিয়ে। বড় ভালো লাগল। প্রশ্ন না করে পারলাম না।
- কি প্রবলেম তোমার মা?
- এই একটু ঘারে পিঠে ব্যাথা, বিশেষ কিছু না। ক'দিন কেরালার মেয়েদের হাতের মালিশ খাওয়ার আশায় ভর্তি হয়েছি। আপনার কি হয়েছে?
- শ্বাসকষ্ট। অনেকদিন এলোপ্যাথি খেয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, তাই –
- ভালো হয়ে যাবেন। আপনাকে দেখলে তো রুগী মনেই হচ্ছে না। কতদিন হল এখানে? কি সুন্দর মিষ্টি করে কথা বলেন আপনি।
একসঙ্গে কথাগুলো বলে পাশের বেঞ্চে বসে পড়লো সে, মনেহয় এতগুলো ব্যাগ, সুটকেশ বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
- এখানে পিওন গুলো কেমন, ব্যাগগুলো একটাও নামিয়ে দিতে পারলো না?
- না না, ওরা এদিকে ওদিকে আছে হয়তো। পাওয়া গেল না, আর ঐ আন্টিও খুব অস্থির হচ্ছিলেন, ট্যাক্সিওয়ালা বেশিক্ষন তো দাঁড়াবে না, ওলা ক্যাব করেছেন।
- তুমি তো খুব পরপোকারী মেয়ে। আজকালকার দিনে এমন একটা দেখা যায় না, আমি বললাম।
- মানুষ মানুষের জন্য করবে না তো কি করে চলবে?
- সবাই তো সেটা ভাবে না, ভগবান তোমার মঙ্গল করবেন। এই রকম বড় মন পেয়েছো তুমি, আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম, কেন জানি না, ভীষণ মায়া মাখা মুখখানা।
- আমি না করলে আর কেউ করে দিত, আমি তো উপকার করবার সুযোগ পেলাম, এটাই আনন্দের কথা।
রোজ সকালে যোগব্যায়ামের ক্লাশে আমরা একসঙ্গে যায়, মেডিটেশন ক্লাশে অনেক্ষন নিস্তব্ধে একসঙ্গে বসে থাকি। সবসময় সে চায় আমার পাশে বসতে। তখন কিন্তু সে অন্যরকম মানুষ হয়ে যায়। কোন উশৃঙ্খলতা নেই, প্রগলভতা হাসি-মজাক নয়, একটা ধ্যান গম্ভীর ভাব নিয়ে অনেক্ষন চোখ বুজে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। ক্লাশ শেষ হয়ে গেলেও অনেকক্ষণ একা-একা বসে থাকে সেই বিশান ওঁ লেখাটার সামনে।
সেদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম - "কি গো মা এতক্ষন ধরে কার ধ্যান করলে?"
- পরমাত্মার। কোন বিশেষ দেবদেবী বা রিলিজিওন আমি মানি না। স্পিরিচুয়ালিটি তে বিশ্বাস করি। আসন করে শরীরটা হালকা হয়, তারপর অনুলোম-বিলোমে অনুভব করি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে জীবন দেবতার লীলা খেলা। আর তারপর "হৃদয়েতে পথ" কাটি মনের মধ্যে আসন পাতি, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে যে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর জন্য।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে রইলাম সেই মেয়েটির দিকে। মাঝে মাঝে এমনি জীবনবোধ নিয়ে কোন এক সাধিকার মতন কথা বলে সে। একদিন আবার আমাদের গানও শোনাল। মীরার ভজন, রজনীকান্তের "তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো।" এই প্রথম মনে হয় সত্যিই মেয়েটির মধ্যে কোন মলিনতা নেই, সে যেন সহজ সরল পুন্যস্রোতা নদীর মতন।
একদিন আমার ঘরে এসে গল্প করতে করতে মা বাবার সঙ্গে অনেক ছবি দেখালো সে নিজেদের পরিবারের। তাতে দেখা গেল খুব বড় বেণী ঝুলিয়ে বা পিঠে খোলা চুল এলিয়ে ফটো তুলেছে সে। ভারী মিষ্টি লাগছে। বললাম :
- কিছু মনে করো না মা, একটা প্রশ্ন করছি, যদিও অবান্তর তবু নিজের বুড়ি বান্ধবী ভেবে মাফ করে দিও। কৌতহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করছি, - এতো সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেললে কার পরামর্শে?
- খুব ঝড় ঝড় করে হেসে ফেলল সে। উত্তর দিল - মাথায় পোকা হয়েছিল তাই ন্যাড়া হতে হয়েছে।
- বুঝলাম, উকুনের কথা বলছে। একটু লজ্জায় পরে গেলাম - বললাম কিছু মনে করলে না তো মা, আমার বোধহয় জিজ্ঞেস করা এটা উচিত হয়নি।
- না না তাতে কি হয়েছে? সত্যি কথাটা বলতে বা জানাতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না।
এত ভালো লাগল ওর সপ্রতিভ ভাব দেখে, সহজভাবে সব জিনিষকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা দেখে। ভাবলাম আহা ও যদি আমার নিজের মেয়ে হত। ভগবান আমায় মেয়ে দেননি বলে দুঃখ ছিল না। আজ ষাট বছর পরে ওকে দেখে মেয়ে সন্তান না পাওয়ার জন্য প্রথম কষ্ট পেলাম।
কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের সকলের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠলো ঐ প্রাণবন্ত মেয়েটি। কাছে এসে বসলেই মনে হত এক উজ্জ্বল আলোয় যেন ভোরে গেল ঐ জায়গাটা। নানান ধরনের গল্প করে যেত সে। ফোন থেকে বের করত হাসির হাসির দৃশ্য - কৌতুকপ্রিয় স্বভাব, তার কাছে বসলেই যেন সব দুঃখ, রোগের যন্ত্রনা পালিয়ে যেত আমাদের। শীতকাল, রোদে বসতাম সবাই গোল হয়ে, আর হাসি মজাকে সময় যে কখন পার হয়ে যেত কেমন করে, বুঝতেই পারতাম না। সবসময় মুখে তার সাকারাত্মক কথা, কোনো নেগেটিভ ফীলিং সে আনতে দিত না আমাদের। কেউ মুখ ভার করে থাকলে বা যন্ত্রনায় কাতরালে, ছুটে যেত তার পাশে, আমার ঘরে চায়ের কেটলি ও সরঞ্জাম ছিল, যখন তখন বিনা সঙ্কোচে ঘরে ঢুকে চা বানিয়ে দিত আমাদের, নিজের মেয়ের মতন।
সেদিন ওর পাশের বেডের মোবাইল ফোনটা পাওয়া যাচ্ছে না, খুব নাকি দামী ফোন সেটি। যে মেয়েটি ঘর ঝাড়ু পোছা করতে এসেছিলো প্রথমে সন্দেহটা তার ওপরই পড়ল। হাসপাতালের সুপারভাইজার, নার্স, রিসেপশনিষ্ট, থেরাপিস্ট মেয়েগুলি সবাই ভীষণ অস্থির হয়ে সব রুম সার্চ করছেন। কাজের মেয়েটিতো প্রথমে ভীষণ রেগে গেল - 'আমরা কি এখানে চুরি করতে এসেছি নাকি' পরে জেরার চোটে কাঁদতে লাগল।  ঐ মেয়েটি তখন ফিজিওথেরাপি করতে গিয়েছিলো, ফিরে এসে নিজের রুমে এত হৈ চৈ দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেল, পরে বিছানা, বালিশ ঝেড়ে, বাথরুম খুলে সব জামাকাপড়গুলো বিছানায় ফেলে মোবাইল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হটাৎ তার বমি পেতে লাগল। ডাক্তারবাবুকে বললেন তার বাড়িতে খবর দিতে, শরীর খারাপ লাগছে, সে বাড়ি যাবে। এক ঘন্টার মধ্যে তার বাবা ও দাদা এসে পড়লেন, গাড়ি করে মেয়েটি বাড়ি চলে গেল। যাবার আগে আমার ফোন নম্বরটা নিতে কিন্তু ভোলেনি।
আমার ১৫ দিনের প্যাকেজ শেষ হতেই বাড়ি ফিরে এলাম। ক'দিন পরেই ফোন এল সেই মেয়েটির।
- কেমন আছো আন্টি?
- ভালো, তুমি কেমন? সেদিন হটাৎ চলে গেলে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার। তোমার নাম্বারও আমার কাছে ছিল না, তাই খবর নিতে পারিনি।
- আমিও তো ক'দিন যোগাযোগ করতে পারিনি ব্যস্ততার কারনে। ভাবছি একদিন আসব আপনার কাছে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়, আমার বাড়ি তো এই হাসপাতালের কাছেই। ঠিকানাটা এখুনি মেসেজ করে দিচ্ছি।
পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমার স্বামী। চোখ কটমট করে ফোন রাখতে ইশারা করছেন তিনি। বললাম - আচ্ছা মা, কেউ ডাকছে, এখন ফোন রাখছি, পরে কথা বলবো। লাইনটা কাটতেই স্বামীর বকুনি খেলাম।
সবাইকার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আসো, কাউকে বাড়িতে ডাকবে না। কার মনে কি আছে তুমি জানো? আজকাল কাউকে বিশ্বাস নেই। এটা কার ফোন ছিল, সেই মেয়েটা কি? যাকে নিয়ে হাসপাতালের লোকেরা আলোচনা করছিল। একদম বাড়ীর ঠিকানা দেবে না বলে দিলাম।
এরপর যখনই ওর ফোন আসে, স্বামী কাছে থাকেন বলে আর রিসিভ করতে পারি না, কথা বলা হয় না। মনটা খারাপ লাগে। আরও দিন ১৫ পরে ওর ফোন এল, মিষ্টি গলায় সে বললে -
- আন্টি, তোমাকে ভীষণ মিস করছি। আসলে আমার মা নেই তো, তোমাকে দেখতে, ব্যবহারে আমার মায়ের মতন মমতাময়ী লেগেছিল, তাই দাদা আর বাবা বাড়ি না থাকলে ফোন করি। ওরা কারো সঙ্গে বেশি কথা বলা পছন্দ করেন না। কেন জানো?
- কেন মা?
- হাসপাতালের লোকেরাও খুব বিরক্ত করত। জানেন ওরা আমাকে চোর বলে সন্দেহ করেছে। তারপর হেসে উঠলো সে।
- মনে হলো হাসিটার মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা বিদ্রুপ মাখা। মুখে বললাম, সে কী তাই নাকি?
- হ্যাঁ, কিন্তু আন্টি তোমার কাছে আমি জানতে চাই - 'তুমিও কি সেদিন আমার হটাৎ শরীর খারাপ হয়ে চলে যাওয়াটা এক্টিং মনে করেছো?
- অরে না না, মাথা খারাপ। তোমার মতন শুদ্ধ আত্মাকে ভগবান আমায় প্রথমদিন থেকেই চিনিয়ে দিয়েছেন। যার পাঁচটা আঙুলে হীরে, নীলা, দামী গোমেদ, প্রবাল হাতে এত দামী মোবাইল, গলায় দেখে রুপো মনে হলেও আমি জানি হোয়াইট গোল্ড-এর মোটা চেন - সে যে কতবড় বাড়ির মেয়ে তা কি বুঝিনি আমি, তুমি কেন নিতে যাবে অন্যের জিনিষ?
- ওগুলো আমার ঠাম্মা সব ধারন করিয়েছেন তাড়াতাড়ি রোগমুক্তি-ভোগান্তি কম হবে বলে। আর মোবাইলটা দাদা আমায় আমার জন্মদিনের শেষ উপহার দিয়েছে।
- কথাটা খট করে কানে লাগলো। শেষ উপহার মানে? প্রশ্নটা মনে মনে করলেও আবার সেই পরিচিত ঝরঝরে হাসিতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কোনো কথা সরলো না মুখে।
- আমার তো ক্যান্সার, লিউকোমিয়া। অ্যাডভান্স স্টেজ, অলরেডি ১২টা কেমো হয়ে গেছে গত ফেব্রূয়ারি থেকে, সব চুল পড়ে গিয়েছিল, আবার বেরুচ্ছে। তাই বলেছিলাম পোকার জ্বালাতনে ন্যাড়া হতে হয়েছিল। are you listening aunty?
- আমার মুখে ভাষা নেই তাই শুধু হুঁ বেরুলো।
- সাইড এফেক্ট দূর করতে Naturecure Hospitalএ ভর্তি হয়েছিলাম, তাই তোমায় পেয়ে গেলাম।
- আমিও তোমার মতন একটা মেয়ে খুঁজে পেলাম।
একটা গানের কলি এসে বুকের দুয়ারে আঘাত করল, আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যারে... ভগবানকে দেখা যায় না, এইসব পবিত্র মানুষের মাধ্যমেই বোধহয় তিনি একটু সময়ের জন্য ধরা দেন। তাই কবি বলেন, "মাঝে মাঝে তব দেখা পাই... চিরদিন কেন..."। সে বলে চলেছে –
- আয়ুর্বেদ-এর ট্রিটমেন্ট ও Nature Cure ডিপার্টমেন্ট-এর ম্যাসেজ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ফিজিও থেরাপীর পর খুব কষ্ট হল, বমি পেল, তাই চলে আসতে হল, ক'দিন আর আছি এই পৃথিবীতে সম্ভবতঃ কয়েকটা মাস, মোবাইল চুরি করে কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখব বলো তো? যমরাজের কাপবোর্ড-এ? বলার সাথে সাথে আবার হাসি।
আমি আর কথা বলতে পারছি না। চোখ দুটো থেকে জল ঝরে পড়ছে অঝোর ঝরে।
- কি হল আন্টি তুমি কথা বলছো না যে? আমি ঠিক করেছি বাকী ক'টা দিন শুধু যাদের খুব ভালো লেগেছে, পজিটিভ থিংকিং-এর লোক মনে হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলব। আর অজানা অচেনা লোকের উপকার করবার চেষ্টা করব। নিজের আত্মীয়-স্বজনেরা বড্ড এক ঘেয়ে হয়ে গেছে, ওরা আমাকে এমন সহানুভূতির চোখে দেখে যেন ক্যান্সারের জীবাণুগুলো দেখতে পাচ্ছে। বাবাকে তো তারা ইস, আহা, কেন হল গো - শুনিয়ে শুনিয়ে আধমরা করে রেখেছে।
আস্তে আস্তে একটু নিজেকে সামলে আমি এবারে বললাম - তোমার মতন সুন্দর স্বভাবের প্রকৃত আধ্যাত্মিক মনোভাবের একজন তরুণ বন্ধু পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। জন্ম-মৃত্যু তো আমাদের হাতে নেই। এই আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি এখুনি হার্ট এট্যাক হতে পারে, রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে চলে যেতে পারি। তুমি কোয়ালিটি লাইফ স্পেন্ড করছো, কারো প্রতি অভিমান নেই, আনন্দময়ী মেয়ে ভগবান তোমাকে যে সাহস ও সহ্যশক্তি দিয়েছেন ক'জন তা পায়।
আরে এই জন্যই তো তোমাকে আমার এত ভালো লেগেছে। দেখো আমাদের বয়সের কত পার্থক্য কিন্তু মনের কত মিল। কাশির ধমক এল মেয়েটির, তাই আমার ফোনটা হটাৎ কেটে গেল। প্রথমদিনের ঐ বাক্স ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার। মোবাইলটা আবার বাজছে। ভাবলাম আবার ওই করছে - না হাসপাতাল থেকে, ওখানের সুপারভাইজার।
- দিদি কেমন আছেন আপনি? হাঁপানি কমেছে একটু? ইউক্যালিপ্টাসের পাতা দিয়ে স্টিম ভাপটা নিচ্ছেন তো? ফুট বাত নিতে রাতে ভুলবেন না কিন্তু।
ওকে হটাৎ কৌতূহল ভরে প্রশ্ন করলাম, সেই ভদ্রমহিলার মোবাইলটির হদিশ মিলেছিল কি?
হ্যাঁ তো। জানেন না আপনি? উনি ওটি যোগা ক্লাশে ম্যাট-এর তলায় রেখে ব্যায়াম করছিলেন, তারপর ভুলে চলে গিয়ে এত হাঙ্গামা করলেন। রবিবার সব ম্যাট তুলে রুম ওয়াশ করতে গিয়ে কাজের লোকেরা ওটি পায় এবং আমাকে জমা দিয়ে যায়। শুধু শুধু এতগুলো মানুষকে চোর সন্দেহ করে দুঃখ দিলেন। আমি সেই মেয়েটির মুখটা মনে করে আবার চোখের জল ফেলতে লাগলাম, একা একা বসে।

জুড়ি গাড়ী (Juri Gadi)

ছোটবেলায় প্রায়ই শুনতাম, মায়ের মুখে “ওপর থেকে বেশ জুড়ি বানিয়ে পাঠিয়েছে বাবা" আকাশের দিকে তাকিয়ে কে কার'জোড়ি' কেমন করে বানিয়ে যে কখনপাঠান বুঝতে পারতাম না। একটু বড় হলে লক্ষ করলাম আমার এক কাকা যিনি ভীষণ শান্ত এবং ভালোমানুষ তার স্ত্রী অর্থাৎ ধীরা কাকীমা তার নামের একেবারে বিপরীত ছিলেন, ভীষণ অধীরা, রাগী ও ডমিনেটিং ছিল তাঁর নেচার কিন্তু সংসারে তাদের কোনো অশান্তি ছিল না। ছেলে মেয়ে স্বামী সবাই তার বাধ্য, ঘরের সব কাজ স্মুথ  ভাবে হত। সব ফার্নিচার সবাইকার কাপড়-জামা এমনকি সব্জী-মাছ পর্যন্ত তারই ইচ্ছা ও পছন্দ মত আগত। অতএব নো টেনসন।

ওদিকে মামাবাড়ীতে ভোলানাথ মামা ভীষণ রকমের চালাক চতুর বড়দের কথায় ধূর্ত, ধূরন্দর) এবং বদ মেজাজী। ছেলেমেয়ে ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাইপো-ভাইঝি কেউ আমরা পারতপক্ষে তার ছায়া মাড়াতাম না। তার চেহারাও ছিল শ্রী মহাদেব ভোলানাথ শিব ঠাকুরের একেবারে উল্টো।

লম্বা, রোগা, টিকটিকে। জটা-জুটো থেকে গঙ্গা নেমে আসার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না, কারণ মাথায় ছিল বিশাল চকচকে টাক। সব সময় দাঁত খিঁচিয়ে কথা বলে বলে তাঁর সামনের দাঁতটা একটু উঁচু হয়ে গিয়েছিল। আর তাঁর বউ আমাদের "ভামিনী" মামী ছিলেন ভীষণ  ঠাণ্ডা, নিরীহ, ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানেন না; কিন্তু এ বদমেজাজী পেটরোগা ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাতেন, মামার জন্য রোজ কাঁচকলা পেঁপের ঝোল ভাত বরাদ্দ ছিল। মামী দুপুর বেলা আচ্ছা করে সর্ষে লঙ্কা বাটা দিয়ে কুচো মাছের ঝাল খেতেন। পুকুর ঘাটে গা ধুতে গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে অন্যের নিন্দা ও স্বামীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। বলতেন - “ওনার মুখটাই যা খারাপ মনটা বড় নরম।

মা, মাসীমারা মুখ টিপে হাসতেন, তাদের মুখে সেই একই কথা যেমন দেবা তেমনি দেবী। আমাদের বয়স যারা ৬০ পার করে ৭০/৮০ তে এসে গেছি তারা তো বাবা মায়ের পছন্দ মত পণ্ডিত মশায়ের কুষ্টি বিচার করার পর বরের গলায় মালা দিয়েছি এবং এ দুই দম্পতির মতন নির্দ্বিধায় সব বৈপরীত্য মেনে না নিলেও মোটামুটি একজন আর একজনকে সহ্য করে ৩০/৪০ বা ৫০ বছর কাটিয়েও দিয়েছি, আমরা সবাই এরেঞ্জ ম্যারেজ-এর শিকার ছিলাম। আমাদের “জোড়ি” ওপর থেকে না, মর্তলোকেই ঘটকালী করতে সিদ্ধহস্ত কালী খুড়ি, বৌদিদের সুবাদে অনায়াসে সমাধা হয়েছিল। কিন্তু এখনকার ছেলে মেয়েদের জোড়ি Facebook, Internet, Saadi.com বা বন্ধুবান্ধবদের দ্বারা বানানো হয়। প্রায় সব পাত্র-পাত্রীই সম পর্যায়ের, সমান ওজনের ডিগ্রী ধারী, সমান টাকার থলি (Pay pack) নিয়ে বাড়ী ফেরেন, দুজনের কাছেই লোন নিয়ে কেনা আলাদা আলাদা গাড়ি আপার্টমেন্টের চাবি থাকে, দুজনকেই বিভিন্ন সময় অফিসিয়াল আন অফিসিয়াল ডিউটিতে বাইরে ট্যুরে যেতে হয়, তাই দুজনের বক্তব্যে শোনাযায়় “ম্যায় তুমসে কম নেহী” জোড়-বিজোড়ের খেলাটা তাদের দুজনের হাতেই থাকে। সাপ লুডোর মতন ঝপ করে কারো ডিভোর্স হয়ে আবার বিয়েও হয়ে যায়, কেউ আবার বলেন _ “সিঙ্গল প্যারেন্ট হওয়া অনেক ভালো, কারুর কথায় তো উঠ বোস করতে হবে না"। তাই ভগবানের জোড়ি বানাবার প্ল্যানটা ভেস্তে যায় এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে।

এদিকে মেড সার্ভেন্টদের দাম্পত্য জীবনের দিকে আলোকপাত করলে দেখি, সেখানেও সেই বৈপরীত্য, সেই অসামঞ্জস্য, সেই ট্রাডিশন একইভাবে চলে চলেছে। মায়াবতীর বর ভম্বলালের বিয়ে নেপালের কোনো এক মন্দিরে বকরা কেটে, দশ মন চালের ভাত, বেসনের লাডডু  খাইয়ে পোখরার গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৪ বছর আগে। তারপর ১৫ বছরের সুন্দর ফুটফুটে গোলগাল মেয়েটিকে ৩২ বছরের দোজবরে (বেউ ভেগে যাওয়া) যুবক দিল্লী নিয়ে আসে, ত্রিলোকপুরীর ঝুগ্গিতে বাসা বাঁধবে বলে। ভালো কোম্পানীতে তার চৌকিদারের চাকরী। বাঁধা মাইনে। রাত জাগার উপরি ভালোই পয়সা আসে পকেটে। কিন্তু তার সব কাগজের নোটগুলোই চলে যায় মদের ঠেকায়। ঘরে এসে আবার গরম ভাত মাংস না পেলে বউ পেটাতে তার বড় আনন্দ হয়। সুতরাং স্ত্রীকে কাজ করতে হয় বাড়ী বাড়ী। ছেলে মেয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাঁচে এসে যখন থামে, - তখন পাড়া প্রতিবেশী সবাই জেনে গেছে, কিভাবে মাতাল স্বামী সহ সন্তান সন্ততি পালনের দায়িত্ব নিয়েও হাসিমুখে বাসন ধুয়ে যাচ্ছে সেই মেয়েটি। অন্যদিকে ড্রাইভার সোহন সিং বড় ভালো মানুষ। পান, বিড়ি, সিগারেট খেতেও দেখা যায়নি তাকে কখনও। তিনটি মেয়েকেই ভালোবাসে, স্কুলে পড়াচ্ছে, ঘরে গিয়ে রান্না-বান্না, কলের জল আনা _ সব কাজই তাকে নিঃশব্দে করে যেতে দেখছি সবাই। কারন তার জোড়ি প্রমীলা রানী বড় চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। কেউ কেউ বলেন, অনেক রাত্রেই সে বাড়ী থাকে না। দুবার বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সোহন সিং অসুস্থ অবস্থায় তাকে পেয়ে আবার ঘরে নিয়ে এসেছে। অসীম তার ধৈর্য্য, ক্ষমাশীল তার স্বভাব। তাই এবার আমার বলতে ইচ্ছা হয়, "ভগবান তুমি পারোও বাবা জোড়ি বানাতে।" ধন্য তোমার ঘটকালী।

জোয়া (Joya)

মন বলে তুই লেখ কবিতা,
নাচ্না রে ভাই আঁক ছবি,
জোয়া রাণী নাতনী ধনি,
খুল্‌লো ঘরে সুখ চাবি।

আকাশ ভাসে, আলোর স্রোতে 
নামলো রথে প্রভাত রবি-
পরীর দেশের কন্যা এলো,
ভুল্‌লো হৃদয় দুঃখ-সবি।

চোখের তারায় হীরের দ্যুতি
হাসিতে তার মুক্তো ঝরে।
জীবন্ত এক দেবীর মতন
পবিত্র ভাব সে মুখ পরে।

আমরা সবাই মন্ত্র মুগ্ধ,
“সারদা” মার অশেষ বরে।
অপূর্ব এক আনন্দ ধুপ-
দিল সবার জীবন ভরে।

প্রেম সলিলে আজ ভাসালে,
পেলাম মধুর সিগ্ধ ছোওয়া,
তোমার পানে তাকিয়ে মনে,
ন্মেহ-কুসুম বীজটি বোওয়া।

হিমালয়ের নদীর মতন,
জীবন তোমার খরতোয়া
ভগবানের আশীষ ধন্যা
জন্ম নিলো মোদের “জোয়া”।

প্রেম বন্ধন (Prem Bondhon)

“যত মত , তত পথ “- সমন্বয়ের এ মন্ত্র 
শেখালেন যে মহাপুরুষ ,-
তিনি যন্ত্রী , আমি যন্ত্র। 
জল কে বলো - পানী বা নীর ,-
একোয়া এবং ওয়াটার ;
শ্রী রামকৃষ্ণ দূর করলেন,-
মানব মর্ণের অন্ধকার। 
ভেদাভেদের রাজনীতিতে
ধর্মে ধর্মে ভাব বিরোধ ,-
এই জগতেই সর্গ মত্ত -
জীবনের ঋণ পরিশোধ। 
সত্য প্রেম অহিংসা যে সবার গ্রন্থে স্থান
হিন্দু , বৌদ্ধ, জৈন, শিখ  বা -
    মুসলমান  ও খ্রিষ্টান। 
 কেউ ছোট নয় কারো থেকে , সবাই সবার আপনজন 
সাদা কালোর বিভেদ ভুলে -
এক সাথে হোক ধনী - নির্ধন। 
নানক - কবির - মুহম্মদ ও খীপ্ত খ্রিস্ট অবতার ,-
যাঁর কথাতেই চলো নাকো 
করবেন তিনি উদ্ধার। 
জীবনপ্রেমের মদ্ধ দিয়ে বানবে সেতু বন্ধন ,-
দয়া মায়া সেবা দিয়ে -
মোছাও  দুখীর ক্রন্দন।।

কথামৃত (Kothamrito)

“কথামৃতের" রচয়িতা “মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত-”
তোমার জীবন মাঝে আছে, - ভক্তি মন্ত্র - সুপ্ত।
“দক্ষিণেশ্বর” “বেলুড়” - তীর্থে - জীবন হইল, দীপ্ত -
গঙ্গা কিনারে ঠাকুরের ঘরে - সব দুঃখ যে লুপ্ত।
খণ্ডিত হল, ভব বন্ধন, - জ্ঞানের আলোকে তপ্ত -
ভজনানন্দে সঙ্গীত বোল, - করল হৃদয় শান্ত।
“কথামতের” গান ও গল্পে মন আজ পরিতৃপ্ত
“গীতা”, “রামায়ণ”, “বেদ বেদান্ত” সব - সার এতেও আছে অনন্ত,-
এই গ্রন্থের অনুরক্ত - আমি এক অতি ক্ষুদ্র ভক্ত।।

খোলা চিঠি (শ্রীজাতকে মা) (Khola Chithi – Srijat ke Maa)

Khola Chithi ( Srijato ke Ma) , An open letter to a NRI son in USA by his old ma

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ফেইসবুক' – নাম মানে "বদন পুস্তকে" -
তোর কবিতা পড়ে
খুশি হলাম রে খোকা।
আজকাল যে কি হ'ল,
পোস্টাপিস গুলো, -
বিলি করে না, চিঠিপত্র আগের মত।
'ডাকিয়া' কেই আসতে দেখি না রোজ,
পথ চেয়ে থাকি, -
কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে -
কেউ আর কাগজে এখন -
চিঠি লেখে না গো জেঠিমা,
কম্পুটার শেখো,-
'ফেজ বুকে' ছেলেকে দেখো।
শিখেছি রে হতভাগা,
ছেলের সোনামুখ দেখতে
সব শিখে নিলাম ধীরে ধীরে।
শ্রীকৃষ্ণ যেমন মুখ হাঁ করে অর্জুনকে
ব্রহ্মান্ড দর্শন করিয়েছেন,-
তেমনি এক একটা জানলা খুলে
বিশ্ব দর্শন করায় কোলে ধরে
রাখা ল্যাপটপ - ছোট যন্ত্র-টা।
আমরা ভারতীয় 'মা' রা
অনেক পরিবর্তন দেখলাম -
এই একশ বছরে -
নিজেরাও পাল্টে গেলাম
একটু একটু করে।
তোর ঠাকুরদার সময়ে -
এক গলা ঘোমটা টেনে,
হেঁশেল ঠেলতে ঠেলতে,
গোয়ালে গরুর গোবর তুলে
ঘুঁটে লেপ্তে লেপ্তে ও
"আশাপূর্ণার" মতন পড়া করেছি।
'সুবর্ণলতা' হয়ে তোর দিদিকে
বেথুনে পড়তে পাঠিয়েছি।
শুনেছিলাম সেখানে এক কালে
বিবেকানন্দ - রবীন্দ্রনাথের দিদিরা -
পড়েছেন।
মেয়ে আমার মুখ রেখেছে।
স্কুল পাশ করে - ডাক্তারি -
তারপর বিয়ের পরেও
লন্ডনে গিয়ে FRCS পড়েছে।
গ্রাম তো অনেকদিনই ছেড়ে এসেছিলাম, -
এবার কলকাতা পিছে ফেলে -
দিল্লী চলে এলাম, -
তোর বাবার চাকরীর সুবাদে।
তুই পড়া করলি নাম করা
বড় ইংরাজি স্কুলে।
তারপর আই আই টি,
আই এ এমের গন্ডি পেরিয়েও
থামলি না, তাই -
'স্টানফোর্ডই, ওয়ারটেন।
অনেক দূরে সেই সুদূরে
নিউ ইয়র্ক শহরে - তোকে
টেনে নিয়ে গেল তোর দ্রুতগামী
"কেরিয়ার" ট্রেন।
তোদের ব্যাস্ত ছড়ানো জীবন,
এখন -
অন্য খাতে - অন্য জগতে, - বয়ে চলে।
অন্য ধাতে, রকম মারি
খেলনা, বাড়ি, গাড়ি -
নিয়ম - অনিয়মের বেড়া জালে ঘেরা,
ভিন্ন ঘাটে, অচেনা মাঠে, হাটে,
বাঁধে নতুন ডেরা। -
নানা সমস্যা, -
আশা, নিরাশা, -
নিরাপত্তার অভাবে ঘেরা।
নিত্য নতুন সম্পর্কের ভাঙাগড়া -
উত্তেজনা, উন্মাদনা আবার
কখনও কখনও উন্নাসিকতায় ভরা।
যৌবন শেষ হয়ে এলো, তোর
খোকা, তুই এখন পঞ্চাশ উর্ধের প্রৌঢ় -
'বানপ্রস্থের' প্রস্তুতিতে চঞ্চল।
আমি তোকে আমেরিকায় পাঠাতে
পেরেছি, - তুই কেন
পারবি না রে চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহের
দিকে এগিয়ে দিতে!
তোর সন্তানকে।
"চরৈবেতি - চরৈবেতি -"
এই মন্ত্রই তো তোকে
শিখিয়েছি বাবা।
এগিয়ে চলাটাই তো
'পরিবর্তনশীল' জগতের নীতি।
জীবনের স্রোতে তীব্র বেগে বয়ে চলা -
সন্তান সন্ততিদের মধ্যে -
যে সব মা ঘুরে বেড়ান, -
কন্যা ও পুত্রবধূর প্রসব বেদনায়
যিনি পাশে থাকেন,
পুত্র ও জামাইকে সদ্যজাত -
নাতি বা নাতনিটি হাসপাতালের
ঘরে হস্তান্তরিত করেন,
তাদের দুঃখে সুখে কাঁদেন, হাসেন,
সমানভাবে ভাগ করে নেন,
তাদের চাকরীর উত্তরণ বা
অবতরণের টেনশন,
সেই সব মায়েদের দলে আছি -
আমি।
জাতকের উন্নতি - শ্রী বৃদ্ধির জন্য
তোমার নাম রেখেছিলাম শ্রীজাত
আজ তোমার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে আমি গর্বিত।
ওরে খোকা, সোনা আমার -
গাঁটের ব্যাথাটা কেমন আছে -
রোজ খবর নিতে না পারলেও
আমি জানি, তোর মন এখনও
এই বুড়ি মায়ের কথা ভেবে কাঁদে।
কবিতার প্রতিটি শব্দ প্রস্তরে
সময় পেলেই কালো অক্ষরে
লিখতে থাকিস বাবা মায়ের কথা।
তাই শুধু নয়, হাঁটু জলে ভরা -
সাদা বালির কিনারায় মোড়া
দারকেশ্বর নদী ধারে সেই
'বাঁশি' গাঁয়ের নামও
শুনি তোর গদ্য কবিতায়।
যেখান থেকে একদিন তোর
বাবা বেরিয়ে এসেছিলেন,
পড়া, চাকরি ও ছেলে মেয়ে মানুষ
করার তাগিদে, -
আর ফিরে তো
যেতে পারেননি, কোনোদিনও।
অথবা তাঁকে যেতে দেয়নি, -
আমার উচ্চাকাঙ্খী মাতৃ মনও।
হ্যাঁরে, বাবু, আজ মনে পড়ে -
কতবার কেমন করে আমি
আটকে ছিলাম, -
স্বামীর ক্ষুব্ধ - গ্লানি, বিধ্বস্ত -
ক্লান্ত সত্তাকে।
এখন বুঝতে পারছি তোর মতন
তাঁর হৃদয়ও রক্তাক্ত হয়েছিল।
বুকে মাথায় হাত বোলালেও
স্বস্তি পেতেন না তিনি।
পায়ের নখ কাটতে কাটতে বলতেন -
ছোটবেলায় মা আমার পা টা
কোলে নিয়ে নখ কেটে দিতেন।
বেল কাঁটা ফুটলে -
প্রদীপের আলোটা
কাছে ধরে সেপ্টিপিন দিয়ে
ধীরে ধীরে বের করে দিতেন সেটা।
এখন মা কে একবার . . .।
থামিয়ে দিতাম আমি।
"কি করে যাবে? খোকার জয়েন্ট
এন্ট্রাস-এর পরীক্ষা এসে গেল,
বিভিন্ন স্কুলে সময়মতো কে
তাকে পৌঁছে দেবে?"
তারপর একদিন তোর কাকার চিঠিতে
জানতে পারলাম 'মা' অসুস্থ।
আর যে সে রোগ নয়, -
নাকের ডগাটা ফুলে লাল,
হয়েছিল, শরীরে একটা অস্বস্তি
থাকায় রক্ত পরীক্ষা করেন -
"বাঁকুড়ার কল্যাণ ডাক্তার,"
এই ব্যাপারে ভীষণ
অভিজ্ঞতা তাঁর, এসব রোগের
ধ্বন্বন্তরী তিনি।
স্নিগ্ধ স্বরে বলেছিলেন, -
ওনার ছেলেকে একবার আসতে বলতে হবে
রোগটা আজকাল সেরে
যায়, ভয় পাবার কিছু নেই,
তবে সামাজিক কুসংস্কারে, -
লোকের মানসিকতা তো এখনও
বদলাই, নি তাই -
তোমার কাকা বুঝে গেছিলেন,
আর একদিনও দেরী না করেই
ঠাকুমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন
গৌরীপুর "কুষ্ঠাশ্রমে"।
তোর বাবা খবরটা শুনেই ছুটে চলে
যেতে চেয়েছিলেন,
তাঁর মায়ের কাছে, -
আমি সাহস পাইনি।
রোগীকে নয় রোগকে
আমার ভীষণ ভয়।
এমনকি, আজ তোর কাছে
স্বীকার করতে লজ্জা নেই
মায়ের পোস্টকার্ড এলেও
পড়েই পুড়িয়ে দিতাম।
পাছে তোদের ঐ রোগের জীবাণুরা কখনও
আক্রমণ করে।
তোর ঠাকুমা কিন্তু কখনও দুঃখ অভিমান
রাগ করে পত্র লেখেননি।
সর্বদা জানাতেন, -
"আমি ভালো আছিরে মনু -
এখানে নার্সদের বাচ্চাগুলোর
ভার নিয়ে নিয়েছি, -
ওদের পড়াই, গান শেখায়।
আর যারা খুব অসুস্থ চলৎশক্তিহীন
সেইসব দুস্থ রোগীদের পাশে বসে
গল্প শোনাই, খুব ভালো লাগে।"
থাক ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা
আদরের খোকন, বাবা,
বুকের যন্ত্রনাটা আর
বাড়তে দিস না যেন,
ডাক্তার দেখা, আর কিছুদিন
বৌ বাচ্চাদের নিয়ে -
"হাওয়াই" কিংবা "বালি"
বেড়িয়ে আয়, - মনটা ভাল হয়ে যাবে
আমার কাছে না আসতে
পারার জন্য কোন -
'গিলটি' মানে - অনুশোচনা,
অনুতাপ - পরিতাপ - দুঃখ বা
ক্লেশ রাখিস না মনে।
নিজেকে দোষারোপ -
করিস না সোনা -
ডিপ্রেশন হয়ে যাবে, ফুরিয়ে
যাবে তোর নিত্য নতুন -
টেকনোলজি - 'প্রোগ্রাম'
বানাবার ক্ষমতা, একাগ্রতা কমে গেলে
নিজেকে হারিয়ে ফেলবি ধীরে ধীরে।
আমি তো সব সময়ই -
তোর পাশে আছি রে।
'সময়' বড় নিষ্ঠূর আর
কঠোর শিক্ষক।
তার নিয়ম নিষ্ঠা, রীতি
নীতিকে মেনে চলাটাই
তো জীবনকে স্রোতস্বিনী -
রাখা, তবেই তো আসে -
সাফল্য।
শুধু কেরিয়ার নয়, জীবিকাকে
আঁকড়ে সোপানে চড়া নয় -
আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশী
সকলের সঙ্গে সম্পর্ক
বাঁচিয়ে রাখার জন্যে
প্রতি মুহূর্তে ছিঁড়ে
যাওয়া তার জোড়া দিতে
গিয়ে তোদের এ যুগের
ছেলেমেয়েদের অনেক চাপ সহ্য
করতে হয়, এই অজানা প্রবাসে।
নানান সমস্যা ও মানুষের
দাবী মেটাতে গিয়ে অহরহ
তোদের এই ছুটে চলা -
অবিশ্রাম ফোনে কথা বলা
আমাকে ব্যথিত করে, কাঁদায়,
ভাবায়। তোদের অবস্থা যারা -
অনুভব করতে পারে না -
তারা তোদের অনেকরকম
সমালোচনা করেন। না রে খোকা
আমি কিন্তু তাদের দলে নেই।
অকারণে আবেগপ্রবন হতে গিয়ে
তোর কাছে যেন ভুল
না হয়ে যায় বাবা।
আমার জন্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে
কোন চিড় না ধরে।
ঘরে ঘরে এখন সানাই এর
চেয়েও ডিভোর্সের বাঁশি বেশি বাজে।
ছোট ছোট শিশুরা
হাঁ করে মা বাবার ঝগড়া
শোনে, আর সারাদিন
ঢুকে যায় "আই প্যাড" এর আড়ালে,
নেটের জগতে - অন্য এক
স্বপ্নময় রহস্যপূর্ণ গুহায়।
তাই তোর মায়ের মাথায়
সব সময় চিন্তা -
সন্তানের সুখের নীড় যেন
ভেঙে না যায়। তারা যেন
শান্তিতে আনন্দে সময় কাটায়।
আর আমার খোকার যদি
ভুলভ্রান্তিও হয়েই থাকে কোন
কর্তব্যবোধ, আদর্শ, মূল্যবোধে যেন
ভাঁটা না পড়ে -
এই আমাদের কাম্য।
মা মানেই তো 'ক্ষমা'
উদারতার আকাশে বিচরণ করা।
তোর মতন প্রবাসী বিদেশী
ছেলে মেয়েদের জন্য আমি আজ
গর্বিত রে খোকা।
নিজেদের চেষ্টায়, সাধনায়,
পরিশ্রমে তোরা বড় হয়েছিস,
দুর্নীতি পরায়ন নেতাদের
পায়ে ধরে, খোশামোদের
জোর দিয়ে নয়।
মানুষ ঠকানোর ব্যবসা
তোরা করিস না
তোরা চোরা গলির পথ দিয়ে
উচ্চতার শিখরে পৌছোসনি,
লোভী, স্বার্থপর দানব হয়ে
দেশপ্রেমের মুখোশ পড়ে বেড়াসনি কখনও
দয়া, মায়া, স্নেহ, ভালোবাসায় -
তোদের মন, বাপ-ঠাকুরদার মতন
এখনো কোমল আছে।
জাত পাতের গন্ডি ছাড়িয়ে
ধনী নির্ধনের ভেদাভেদ ভুলে
সাদা কালো, ইহুদি মুসলমান
সবাইকে বুকে জড়িয়ে
ধরতে পারিস তোরা।
মানুষের মতন মানুষ হবার -
শিক্ষা গ্রহণ করে
জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিস ঘরে
এটাই আমাদের সবচেয়ে
বড় আনন্দ ও শান্তি।
তোকে আমি আশীর্বাদ করি তাই
বারে বারে জানাই, স্নেহাদর প্রানভরে।
হাতের স্পর্শ দিয়ে বুকের যন্ত্রনা
যদি দূর করতে নাও পারি, -
তবু জানবি - আমার আত্মা
সর্বদা ছুঁয়ে যেতে চায় -
তোর অমলিন সত্তা।
স্নিগ্ধ হাওয়ায় বার্তা পাঠায়,
আমার বাস্প হয়ে যাওয়া অশ্রু।
আর মেঘদূতের মতন এই মন
সর্বদাই তোর কাছে ধায়।
তোর মা তোর কাছে
কৃতজ্ঞ রে খোকা,
তোর পাঠানো টাকা
আমার দক্ষিণেশ্বরে ফ্ল্যাট
কিনে দেয়,
বাবার গ্রামের বাড়ি সারায়।
দুঃখী বিধবা পিসির -
মেয়ের বিয়ের গয়না গড়তে
আমার সাহায্য করে।
তোর পাঠানো স্কলারশিপের টাকায়
বিদেশের পাঠরত অসহায় ছেলেটির
উচ্চ শিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়।
ছোটবেলাকার গৃহ শিক্ষকের ক্যান্সার শুনে
কেমো বা রেডিয়েশন এর খরচ পাঠাতে
বিন্দুমাত্র দেরী করিস নে তুই।
এমনকি কাজের মাসির পাগল ছেলের
চিকিৎসা করাতে পারি আমি প্রতিমাসে,
কেননা - 'ডলারে' আমার হাত খরচা আসে।
তোর মতন আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি কিম্বা
অস্ট্রেলিয়া বাসী এরকম আরও অনেক
ছেলে মেয়েরা যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে
বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, সুনামি বা
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে
দেশবাসীর পাশে এসে দাঁড়ায়
তাদের দান ও টান আবেগে আপ্লুতো
করে দেয় মা বাবাদের,
এখনকার সমাজে মোদের সম্মান বাড়ায়।
যত "চোখে আঙ্গুল দাদা" বিদেশে কর্মরত
দু চার জন ব্যতিক্রমী স্বার্থান্বেসীকে ধরে
উদাহরণ দেয়, পত্রপত্রিকায়, গল্পে, নাটকে
শুধু লিখে যান 'ন-কারাত্মক' খবর।
কিন্তু আমি জানি তোরা এখনো হারিয়ে ফেলিসনি
তোদের ভাষা সাহিত্য বা ঐতিহ্যকে।
সর্বদায় তোরা মুক্ত মন নিয়ে যুক্ত আছিস
দেশবাসীর সুখে দুঃখে।
আর সেকথা বোঝাতেই তো শ্রীজাত
বাবা- তোকে লিখছি এই খোলা চিঠি।
ডাক্তার জ্যেঠুকে মনে আছে তোর?
তিনি কি বলেন জানিস?
"এরাই তো তোমার রবিঠাকুরের সেই
বীরপুরুষের দল।"
তারপর সেই অসাধারণ লাইন জুড়ে দেন
তোর সম্বন্ধে -
"পাড়ার লোকে সবাই বলতো শুনে,
ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের সনে।"
আজ আমার অকপটে স্বীকার করতে
ইচ্ছে হয়, জীবনে তুই পাশে না থাকলে,
আমি হতাম নেহাৎই এক দুঃখিনী
মা - অতি নগন্য।
সুজাতা ও শ্রীকান্তের পুত্র
বাবা শ্রীজাত, তোদের মতন
ছেলে মেয়েরাই তো মায়েদের জীবনকে
করেছে ধন্য।
ইতি টানার আগে বুকভরা
স্নেহাশীষ ও ঠাকুরের কাছে
কুশল প্রার্থনা জানাই
তোমার জন্য।
মা

পউশি গ্রামের অনাথাশ্রমে (Poushee Gramer Onathashrome)

দেখে এলেম, পউশী গ্রাম,
রসুল নদীর ধার।
“অনাথ শিশুর” আনন্দ ধাম,
সবুজ ক্ষেতের পার।

সাগর হাওয়া হয় উদ্দাম _
নারিকেলের সারে।

শিশুর তানে মুখর গৃহ -
ছোট্ট  পুকুর পাড়ে।

থাকেন, সেথা “শ্রী বলরাম”
বিশাল পরিবারে -
কাজ করে যান, রোজ অবিরাম,
"অন্তদদ্বয়ে ” তরে।

পাঠশালা এক উঠল গড়ে
আঙিনারি পরে।
“আশ্রমিকের' বাড়ে সুনাম -
দারিদ্র্যে না হারে।

'শিক্ষকেরা' তরুণ সুঠাম
ছাত্র-ছাত্রী পড়ে।
পারিশ্রমিক পান না ভালো
“সস্তোষে' মন ভরে।

গ্রামবাসীদের প্রধান ধরম,
অন্ন যে দান করে
তাদের স্নেহের দাক্ষিণ্যে
শিশুর ক্ষধা হরে।

ছোট্ট ছোট্র শিশুরা সব
আনন্দ গান ধরে -
সতা পথে চলার মন্ত্রে -
জীবন ধন্য করে।

পরিশ্রমের সুফল ফলে,
শান্তি আসে ঘরে -
স্নেহ প্রেমে ভরা গ্রামে
“ঈশের” আশীষ ঝরে।।

পুজোর ছড়া (Pujor Chora)

পূজো বাড়ী, পূজো বাড়ী, কী মজা আহারে;
ছোটো বড়ো সবাই সাজে, কম বেশী বাহারে।।
ঠাকুমা-দিদিমারা, ষষ্ঠীর সকালে, 
স্নান সেরে সাজি হাতে, শিউলী যে কুড়ালে,
সপ্তমী প্রভাতে কলা বৌ স্নান সারে
তালে তালে নেচে নেচে, ঢাকে কাঠি, ঢাকি মারে।
খিচুড়ী চচ্চড়ি/ল্যাবড়ার সু-স্বাদে,
গ্রাম বাড়ী চোখে ভাসে, মন ভরে আহ্লাদে।
মা-মাসী, পিসিমুনি, আলপনা দেয় দোরে,
বৌমনি, দিদিরাণী, বাজালেন, শাখ জোরে।।
জ্যাঠাবাবু, কাকু, মামু, নাটকের মহড়ায়
জমিদার বাবু সেজে, কৌচা ধরে গান গায়।
ছেলে ছোঁড়া ব্যস্ত যে, প্যাণ্ডেল সাজাতে,
নাড়ু খান, বুড়ো খুড়ো, মাঠের মেলাতে।
কিশোরী খুকু বেবী, চুড়িদার কামিজে,
ফিন্মের হিরোইন, মডেলের মত সাজে।।
অষ্টমী পূজো রাতে সকলেই ঊজ্জ্বল ,
মাও বুঝি হাসছেন; আলোতে ঝলোমল।
নবমীর দিনটিতে, পোলায়ের ভোগপাতে
বিদায়ের গন্ধ যে, ধুনুচির ধোওয়াতে,
দসমীতে বিজয়া যে, সিঁদুরের রঙে লাল,
বৌমাও শাশুড়ীর রাঙিয়ে দিলো ভাল,
জয় মা জয় মা বলে, বিসর্জনে চলে |
পূজো শেষ হয়ে গেলে বিষাদে মন ভরে।

প্রতিদান (Protidan)

Protidan , a children story on two tribal boys and an elephant.

মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করতে ভিন্দু আর ভিসা দুই ভাই জঙ্গলের একেবারে গভীরে পৌঁছে গেল সেদিন। ভিন্দু ১৬ বছরেই খুব তাড়াতাড়ি গাছে চড়তে পারে, তাই ভিসা কে ঠিক নিচে দাঁড় করিয়ে পৌঁছে গেল গাছের একেবারে মগডালে। মৌচাকটা নিচে থেকে খুব ভালো দেখা যাচ্ছিলো – এখন পাতার আড়ালে ডালের পেছনে ঠিক ঠাওর করতে পারছে না সে। হটাৎ দেখলো দূরে গাছপালা ডাল কাটতে কাটতে কিছু বন্দুকধারী লোক এই জঙ্গলে ঢুকছে। নিশ্চয় এরা পশুচোর, মৌচাক পাড়া ছেড়ে সে এবার বেশ উঁচু থেকে দেখবার চেষ্টা করল, কোন দিকে যাচ্ছে তারা। ওই তো ওদের লক্ষ্য ঐ হাতিদের দিকে। সুন্দর সুন্দর সাদা সাদা দাঁতের দিকে তাদের নজর। ভয়ে বিস্ময়ে প্রথমটা সে কিংকর্ত্ত্যব বিমূঢ় হয়ে পড়ল। তারপর ভিসাকে নিচে চিৎকার করে বলল – ভাই তাড়াতাড়ি ছুটে যা, বাবা, কাকা আর বনরক্ষী দাদাদের ডেকে আন। জঙ্গলে পশুচোর এসেছে। বন্ধুকধারী লোকগুলো ধীরে ধীরে এই বড় গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালো। বন্দুক বাগিয়ে ধরে আর একটু এগোলেই তারা ঐ হাতির দলকে পেয়ে যাবে। আপন মনে ওরা গায়ে ধুলো কাদা মাখছে। যতই দেহ ওদের বড় হোক, যতই শক্তিশালী হোক ওরা ভিন্দু জানে বন্দুকের ঐ গুলি ঢুকলে মৃত্যু অবধারিত। একটা কিছু তাকে করতেই হবে। সে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে এবার মৌচাকটা দেখতে পেল। এক নিমেষে একটা বুদ্ধি খেলে গেল, সে তার হাতের লাঠিটা দিয়ে মৌচাকটাতে একটা খোঁচা মারল। ফেলে দিল সেটি ঐ লোকগুলোর মাথায়। আর সঙ্গে সঙ্গে মৌমাছিদের তীব্র দংশনে  ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল তারা। ততক্ষনে ভিসা তার ছোট ভাই এক ছুটে গিয়ে তার বাবা, দাদু, কাকা, জ্যাঠা ও বনরক্ষক বাহিনীকে ডেকে এনেছে। সবাই মিলে ধরে ফেলল পশুচোরদের। ওদিকে হাতির দলটি বেঁচে গেল সেবারের মতন।

পরদিন আবার নতুন মৌচাকের সন্ধানে জঙ্গলে গিয়ে হাজির হল। ঠিক যখন চাক ভেঙে মধু নিচ্ছে তখন মধুর গন্ধে সেখানে হাজির হল এক বিরাট কালো ভালুক তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে। গাছের ওপর থেকে দাদা চিৎকার করে বলে – “ভাই ভালুক পালিয়ে যা।” কিন্তু তখন আর পালাবার সময় নেই, ভিসা লুকিয়ে গেলো ঝোপের মধ্যে। ভালুকটি তার বাচ্চাদের চাকভাঙা মধু পেট ভরে খাওয়ালো, তারপর কি ভেবে ঝোপের আশেপাশে গন্ধ শুঁকতে লাগল। ছোট ভাই ভিসা ভাবছে “আজ বুঝি আমার শেষ দিন, ভালুকের পেটেই যাব এবার।” ঠিক তখনই একটা হাতির চিৎকার শোনা গেল গাছের পিছন দিকটায়। ভালুকটা ভয় পেয়ে বাচ্চাদের নিয়ে পালালো সেখান থেকে। ভিন্দু নেমে এলো গাছ থেকে, ভিসাও ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে চেপে ধরলো দাদাকে। ঠিক তখনই গাছের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলো এক হাতি। প্রথমে দুজনে খুব ভয় পেল, বন্য হাতির পাল পেছনেই আছে ভেবে। কিন্তু না এটি তো নেহাৎই ছোট্ট এক হাতির বাচ্চা। জোরে জোরে আওয়াজ করে মাকে খুঁজছে সে। দল ছাড়া হয়ে গেছে। চোখে তার জল দেখে দুই ভাইয়ের খুব দুঃখ হল। তারা তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে শুঁড় ধরে আদর করতে লাগল, গায়ে পিঠে হাত বোলাতে লাগল। গতকাল পশুচোরদের তাড়া খেয়ে এই বাচ্চাটা দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বনরক্ষী ও জঙ্গলের আদিবাসীদের শোরগোলে বড় হাতিরা অন্য বনে চলে গেছে। এ যেতে পারেনি। ভিসা আর তার দাদা সেই বাচ্চা হাতিটিকে বাড়ি নিয়ে এল। যত্ন করে বোতলে ভরে ভেড়ার দুধ খাওয়ালো। নিজেদের কাছে খড়ের ঘরের ভেতরেই একপাশে আশ্রয় দিল তাকে। বাবা মাও খুব খুশি হলেন হাতিটির জীবন বাঁচানোর জন্য। ঘরের চারিদিকে শক্ত করে বেড়া দেওয়া হল। দুই ভাইয়ের সাথে হাতি পরম আনন্দে বাস করতে লাগল তাদের বাড়িতে।

একটু বড় হতেই মাঝে মাঝে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় তাকে, যদি সে নিজের জাতের কোনো বন্ধু খুঁজে পায়। একদিন সকালে গিয়ে আর সে ফিরে আসে না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তাদের।

বেশ কয়েকবছর কেটে গেছে, দুই ভাই এখন বড় হয়ে জঙ্গল রক্ষকদের কাজে নিযুক্ত হয়েছে। সরকার থেকে মাইনে পায় তারা। খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ পত্র কিছু জামা কাপড় সবই আছে তাদের। ঘরে ছাউনি, মাটির দেওয়াল অনেক পোক্ত হয়েছে। আদিবাসী সবাই এখন আগেরমতন একসঙ্গেই থাকে। গান-বাজনা, পুজো অর্চনা সবই আগের মতন করে, তাদের আর শুধু মৌচাক ভেঙে, কাঠ কুড়িয়ে জীবন কাটাতে হয় না।

সেদিন ভীষণ গরম, সকাল থেকেই গায়ে জামা কাপড় রাখা যাচ্ছে না। রিজার্ভ ফরেস্টে এখন তাদের অনেক রকম কাজে লেগে থাকতে হয়। কখনো নতুন গাছের চারা লাগায়, কখনো ঝড়ে পরে যাওয়া গাছ কেটে কাঠগুলো পাঠাতে হয় সরকারের গুদামে। দুই ভাই একসঙ্গে থাকে সবসময়। হটাৎ শুনতে পেল জঙ্গলে আগুন লেগেছে, পালাও সবাই। কোথায় কোনদিকে আগুন লাগল? কেমন করে পালাবে এই সুন্দর শান্তিপ্রিয় পরিবেশ ছেড়ে? ঘরে বুড়ি ঠাকুমা, একেবারেই চলতে পারে না। বাবা মায়েরও বয়স হয়েছে। তবু ছুটে গিয়ে সবাইকে কুটির থেকে বের করে পালাবার রাস্তা খোঁজে। জানোয়ারদের চিৎকার। বাঁদর পাখিদের গাছ পালা ডাল ভেঙে এধার থেকে ওধারে ঝাঁপানো – চারিদিকে এক বিশৃঙ্খলা, ভয়াবহ দৃশ্য।

আগুন ক্রমশ এগিয়ে এসে গ্রাস করে নিচ্ছে তাদের জঙ্গল, ঘরবাড়ি। মুরগি, ভেড়াগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, তারা যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।

ঠাকুমাকে ভিন্দু পিঠেতে বেঁধে নিয়েছে। মা বাবার সঙ্গে কিছুটা এগিয়ে গেছে ভিসা, হাতে তার একটা কুঠার। ডাল পালা কাটতে কাটতে পথ করতে হচ্ছে তাকে। হটাৎ পিছনে ভীষণ একটা হুঙ্কার। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। ওরাও ভীত, কিন্তু পেছন ফিরে ওদের দেখবার আগেই ঠাকুমাকে কে যেন তার পিঠ থেকে টেনে তুলে নিল। শুঁড়ে পেঁচিয়ে রাখা ঠাকুমার ঝুলন্ত চেহারা দেখে ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠলো ভিন্দু। কিন্তু কি আশ্চর্য হাতিটা অত্যন্ত সাবধানে যত্নের সঙ্গে তাকে পিঠে বসালো। এরপর ভিন্দুকে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরতেই সে বুঝতে পারলো এতো তার সেই পুরোনো বন্ধু। তাকে আদর করতে করতে চোখে জল এসে গেল তার। পিঠে বসিয়ে অন্য একদিকে ছুটতে লাগল ঐ হাতিটি। ওরা জানে জঙ্গলের কোন দিক থেকে আগুনের ঝলক আসছে। বাইরে একেবারে গ্রামের কাছে যখন দাঁড়ালো তারা, তখন সমস্ত বনটা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ভিন্দুকে হাতির পিঠে চড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে আদিবাসীদের পরিবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। জঙ্গলের আশ্রয় হারিয়ে হাতিও এসে গেল তাদের গ্রামের বাড়িতে।

– চন্দনা সেনগুপ্ত