“নাম” তরঙ্গে (Naam Toronge)

চন্দনা সেনগুপ্ত

তোমার "নামের" তরঙ্গ" ওঠে,
হৃদ - সরোবরে 'কমল" যে ফোটে
"ভক্ত - অলিরা" এসে সেথা জোটে,
এ জীবন তটে অনু-রণণ,-
কিনারায় আছে, শ্যামল সবুজ -
সুন্দন এক চন্দন বন;-
সেখানে বহিছে, - সুগন্ধ ময়
"শ্রী রামকৃষ্ণ" মলয় পবন।
তারই অতলে, সোনা-রুপা খনি,
"মা" ও "নরেন" তোলেন, আলোড়ন।
'জপাৎ সিদ্ধ' হবে এবার "নামের" মধ্যে দর্শন।
তোমার স্পর্শে বাতাস যে কাঁদে,
হাওয়ায় লাগে সে কম্পন
"ঠাকুর" আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে,
তোমার নামের - অলিম্পন।

জবাফুল (Jobaful)

চন্দনা সেনগুপ্ত

 
"মায়ের" পায়ের "জবা" হতে, পারল না রে মন
'চন্দন' আর "তুলসী", গোলাপ হওয়ার লোভে কাটায় জীবন।
ঠাঁই পেতে চায়, "শ্রীগুরুর পায়" জপ করি তাই যখন তখন,
শাস্ত্র পাঠ সে সব ভুলে যায়, "নামের" ধুনে ভরায়, গগন।
"শ্রী শ্রী মায়ের" পানে তাকায়, - স্নিগ্ধ ভাবে মাতায় ভুবন,
সুবাস ছড়ায়, আনন্দ বায়, বইতে থাকে সারাটি ক্ষণ
ভাবছি সদা, হইবে কখন, স্থির ও শান্ত 'অবাধ্য মন',
"জবা ফুলের" মতন তখন - থাকবে না "ভুয়ো" আবরণ।

ইচ্ছা (Iccha)

চন্দনা সেনগুপ্ত

'মন্দির', 'মসজিদ', 'গির্জাতে' - যাব না গো আজ প্রাতে।
শুধু "তোমায়", থাকব ধরে। অরণ্যে বা প্রান্তরেতে -
কোথাও যাইতে মন নাহি সরে, - হৃদয় যে আজ আনন্দ পায়,
তোমার পানে সদা যে ধায়, আসি যখন তোমার দ্বারে।
"বিবেকানন্দ" শোনান বাণী, "মা" যে আছেন, মোদের জানি।
বিপদ মাঝে সাহস বাজে "গুরুর" আশীষ মাথার পরে।
কাম, ক্রোধ, লোভ ছেড়েছি গো, সব সন্দেহ পালায় দূরে।
"কথামৃতে"র "মহেন্দ্র গুপ্ত",
 নাগ মহাশয় থাকেন সুপ্ত
'গিরিশ ঘোষ'ও কান্ডারী মোর, আলো দেখান, অন্ধকারে।
"ঠাকুর" তোমায় - থাকব ধরে, 'শরণাগত' যে তোমার পরে।

ভক্তি পুষ্প (Bhokti Pushpo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ভক্তি সিক্ত কবিতা - পুষ্প - চন্দনে হোক, চর্চিত।
"শ্রী গুরুর" পায়ে, যেন স্থান পায় কাম, ক্রোধ, লোভ - বর্জিত।
অনেক কষ্টে বহু সাধনায়, বহু যুগ ধরে অর্জিত
তাঁহার "নামেতে" মুক্তি হবে রে, - শুদ্ধ হৃদয় মার্জিত।
জীবনের মাঝে, আছে নানা কাজে - থরে থরে জানি সজ্জিত -
"ঠাকুরের" কথা, অহেতুকী, - গাঁথা ভক্তি সায়রে নিমজ্জিত।।
দুর্ভাবনায় - কাঁদি, আমি হায়, বিনা কারণেই, শঙ্কিত;
তোমার "পরশ" হৃদয় মধ্যে - নানা রঙে তারা রঞ্জিত।
তোমা হতে যেন, না ফিরাই মুখ, - না থাকি লইয়া মিথ্যা সে সুখ
ক্ষুদ্র - স্বার্থ চিন্তায় বুক - ভরিলে হইগো লজ্জিত,
ঠাকুর তোমার করুণা বৃষ্টি, - অহেতুকী তব কৃপা দৃষ্টি,
রাখো মোর প্রাণে সঞ্চিত।।
"পিতার দয়া ও "মাতার" স্নেহ যে আমার বক্ষে সঞ্চিত,
করো না কখনো তোমা হতে দূর তব কৃপা হতে বঞ্চিত।
"উত্তিষ্ঠীত জাগ্রত হও", - বজ্র কন্ঠে নিনাদিত -
"বিবেকানন্দ" বাণী, আমি জানি সাহস করে যে সঞ্চারিত।

ফোবিয়া (Phoebia)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ফোবিয়া এক ধরণের Irrational Nature এটা একধরণের Anxiety disorder ও বলা যায়। ছোটবেলায় অর্থাৎ শিশু বয়সে কোন কিছু থেকে ভয় পেয়ে মস্তিষ্কে একটা চিন্তার বীজ বপন হয়ে যায়, সে নিজেও তার খবর জানতে পারে না। পরবর্তীকালে হটাৎ সেই বস্তুকে দেখে বা, সেই পরিস্থিতিতে এলেই একটা আতঙ্ক ভূত যেন তাকে আক্রমণ করে, অর্থাৎ একে panic attack ও বলা যেতে পারে। তখন তাকে খুব অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। বিদেশে এইরকম বিভিন্ন ধরণের অদ্ভুত অদ্ভুত ফোবিয়ার কারনে দাম্পত্য জীবনেও ঘটে যায় বিচ্ছেদ।
এই লেখনীতে মনোবিজ্ঞানীর কথা বিশ্লেষণের অবকাশ নেই। শুধু কয়েকটি ফোবিয়ার কথা স্মরণে আসায় এবং তা নিয়ে হাস্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় - লেখিকা সেগুলি শেয়ার করে নিতে এই ভুমিকা রচনা করেছেন।
ফোবিয়ার বাংলা যদি ভয় বা 'আতঙ্ক' হয়, তাহলে বলবো সেটা যে কি ধরনের তা নিয়ে আমার অনেক সংশয় আছে।
কারো ভয় অন্ধকারকে। ছোট থেকেই সে একলা ঘরে আলো নিভে গেলেই ভয়ে একেবারে ভীষণ কেঁদে ওঠে। কাজেই তাকে ঘুমের মধ্যে ওর ঘরে আলো জ্বেলে রাখতে হয়।
কেউ বা ভয় পান ঘর বা লিফটে বন্ধ হয়ে যাওয়াকে। হঠাৎ হাওয়ায় দরজা বন্ধ হয়ে গেলে কিম্বা ১৬ তলায় যাওয়ার আগে ৭ তলাতেই লিফট আটকে গেলে সে ঘেমে, কেঁদে একেবারে হার্ট অ্যাটাকের জোগাড় হয়ে যায়।
খুব উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতে ভয় পান কেউ কেউ সেও এক ফোবিয়া। ২০ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালেই মনে হয়, এই বুঝি আমি আমার দেহকে কন্ট্রোল করে রাখতে পারব না, নিচে পড়ে যাব।
এরকম নানা ভয়ের মধ্যে পোকা মাকড়ের ভয়টা বিশেষ করে নজরে আসে। যেমন দেওয়ালে নিরীহ টিকটিকি পোকা খেয়ে বেড়াচ্ছে হঠাৎ ফুল শয্যার খাট থেকে নতুন বৌ এক লাফে নেমে দরজা খুলে বাইরে পালিয়ে গেল। নতুন বর কিছু বোঝার আগেই সে পাশের ঘরে অপেক্ষারত দিদি, দাদা বৌদিদের মাঝে ধপাস করে পড়েই কাঁপতে থাকে।
কি হয়েছে? কি হয়েছে? নতুন বৌয়ের মৃগী রোগ আছে নাকি? - এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। তখন তার সঙ্গে আসা কনে বৌয়ের ছোট ভাইটি বলে উঠল, দেখুন তো ঐ ঘরে কোন টিকটিকি আছে কিনা? টিকটিকিকে দিদির ভীষণ ভয়। হাসির ফোয়ারা উঠে সারা বিয়ে বাড়িকে মাতিয়ে দিল। তারপর প্লাস্টিকের টিকটিকি দেখিয়ে দেওর সারা বাড়ি ছুটিয়ে বেড়াতে লাগল মজা করে।
এরপরে আমার হোস্টেল জীবনের একটি ঘটনার কথা মনে পরে গেল। একবার হোস্টেলে স্নানের ঘন্টা পড়লে - একসঙ্গে ৬টা বাথরুমে ৬ জন মেয়ে স্নান করতে আরম্ভ করেছে। কেউ গান ধরেছে "আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো, ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে" - ১৫ই আগস্টের জন্য হয়তো তিনি প্রাকটিস করছেন, সাবান মাখতে মাখতে। কেউ আবার ধপা ধপ করে কাপড়ে আছাড় দিতে শুরু করেছেন, কেউ আবার মাথায় জল ঢালছেন, এমন সময় গান শোনা গেল, সংকোচের বিহ্বলতা নিজের অপমান, সঙ্কটের কল্পনাতে হইওনা ম্রিয়মান - আ - আ - আ, সকলের জলের আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা গেল এক অদ্ভুত আর্তনাদ - সেই আ - আ থেকে অ্যা, অ্যা, অ্যা. . . . . বাইরে যারা তোয়ালে ও সাবান হাতে ওয়েট করেছিলো এদের স্নান হলে বাথরুমে ঢুকবে বলে, তারা তো অবাক। ওরে কার কি হল রে? বেরো বেরো তাড়াতাড়ি দরজা খোল। দু নম্বর বাথরুমের মেয়েটি দরজা খুলেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরল। তার ঐ অবস্থা দেখে সবাই ঘাবড়ে গেল। ছুটে এলেন সুপার দিদি, অন্যান্য কাজের মাসীরা। চোখে মুখে জল দেবার দরকার ছিল না, তার তো সারা মাথায় গায়ে জল ঝরছে। তোয়ালে জড়িয়ে ড্রেসিং রুমে শোয়ানো হল, অনেক কষ্টে একটু স্বাবাভিক হয়ে সে বললে - মা - মা মাকড় - সা। একটি ফচকে ফাজিল মেয়ে তখন গান ধরেছে - বসন পরো মা - - - মাকড় - - - সার মহিমা - - ।
চোর ডাকাতদের মতো সাহসী লোকদেরও যে ফোবিয়ার স্বীকার হতে হয়, এই ঘটনাটি তারই প্রমান দেয়। একজন চোর খুব ধীরে ধীরে একজনের বাড়ির পাইপ ধরে ধরে ওপরে উঠছে, নিচে দাঁড়িয়ে আছে ওর দুজন বন্ধু। এই ছেলেটি খুব হালকা, রোগা পাতলা। ও ওই ওপরের বারান্দায় গিয়ে সিঁড়ির দরজাটা খুলে দেবে, তারপর এরা সেখানে। প্ল্যানটা এরকমই ঠিক করা ছিল। হঠাৎ ভীষণ গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরুতে লাগল তার মুখ থেকে। না পারছে পাইপটা ছাড়তে না পারছে ওপরে চড়তে। - "ক্যেয়া হুয়া, ক্যেয়া হুয়া" - বলছে নিচের বন্ধুরা। বাড়ির লোক সব উঠে পড়ল, নিচের বন্ধু দুটো পাইপ ধরে চিৎকার করতে থাকা ছেলেটাকে ছেড়ে চম্পট দিল। গেটের চৌকিদাররা সব ছুটে এল ঐ এপার্টমেন্টের নিচে। একেবারে হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড। এদিকে চোর নিজেই ভয়ে আতঙ্কে শুধু চিৎকার করে চলেছে - চ - চ - চ । এবার ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে বাড়ির কর্ত্তা হাঁক দিলেন, তাকে - "এ্যাই হতভাগা চোর, চোপ একদম  চোপ। শালা ড্রামা করতা হ্যায়? উপর আ জা। পাইপে চড়না নেহী আতা তো চোরি করনে কিঁউ করনে আয়া"?
- এবার একটু ধাতস্থ হল সে। কোনো রকমে বাড়ির রেলিং ধরে ব্যালকনির দোতালায় উঠে এল। সেই পরিবারের চাকর নিজেকে একটু হিরো মনে করে - খুব উৎসাহ নিয়ে চোরের পিঠে দু ঘা দিতে এগিয়ে এল। কর্ত্তা বাবু তাকে থামালেন। নিজের স্ত্রীকে বললেন, আগে এক গ্লাস জল খাওয়াও বেটাকে, এতো ভয়ে এখনও কাঁপছে।
কর্ত্তাবাবুর দয়া দেখে চোর যেন ধরে প্রাণ ফিরে পেল। -
চাকরদাদা প্রশ্ন করল - "চিল্লাকর পাড়া মাৎ কিউ কিয়া, শান্তি সে আ নেহী সাকতা"?
চোর উত্তর দিল - চুহা - চুহা - থা।
কর্ত্তাবাবু হাসতে হাসতে বললেন - যো এক চুহা দেখে এতো ভয় পাতা হ্যায়, সে কি কোনোদিন "সাকসেসফুল চোর" বান সাকতা।
ব্যাপারটা বুঝতেই চাকরটি ফক্কোড়ি করে একটি নেংটি ইঁদুর এর ল্যাজ ধরে এনে ধরলো সেই চোর বেচারার সামনে, চোর সঙ্গে সঙ্গে ভিরমি খেয়ে - বাবুজি বাঁচাও বলে একেবারে কুপোকাৎ।
এরপরে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে আর একটি মজার ঘটনার স্বাক্ষী ছিলাম সেটিও আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। মুখার্জীবাবুর বাড়ি অনেক লোকজন এসেছেন, মেয়ের পাকা দেখা। বড় বড় রসগোল্লা, পান্তোয়া, সন্দেশ - কতরকমের মিষ্টির সমারোহ হয়েছে। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে মেয়ে কে আনা হল, বর পক্ষের সামনে। সে একটি ট্রে তে শরবতের গেলাসগুলি নিয়ে আসতে আসতে মডেলের মতো পা ফেলে ফেলে মুচকি হেঁসে ঠিক যখন ছেলের বাবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখনি তার চোখ পড়ল মিষ্টিগুলির দিকে, থমকে দাঁড়ালো সে। কথা ছিল ট্রে টি টেবিলে নামিয়ে সবাইকার দিকে গেলাসগুলি এগিয়ে দেবার পর, ছেলের বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে, কিন্তু একি সে যে আর এগুতে চাইছে না, পিছতেও পারছে না, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঐ মিষ্টিগুলির দিকে। মেয়ের দিদি পিছনে এসে দাঁড়িয়ে একটু ঠেলা দিল তাকে। মেয়ের ট্রে উল্টালো ছেলের বাবার ওপরে, জলে শরবতে ভিজে তিনি ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, মেয়েও ততক্ষনে সেখান থেকে এক ছুটে ক্ষমা টমা না চেয়ে ঘরের মধ্যে পালিয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে মা শুধু বললেন, কয়েকটি ডেউ পিঁপড়ে রয়েছে ঐ থালায়। একবার এক কালো বড় ডেউ পিঁপড়ে ওকে কামড়েছিল সেই থেকে - - তাঁর কথা শেষ হল না, সেই রসিক শ্বশুর মশাই হো হো করে হেসে উঠলেন, আমি ভাবলাম গোখরো সাপ দেখেছে বুঝি। ভদ্রলোকরা পিঁপড়ে সরিয়ে মিষ্টিও খেয়ে গেলেন গপাগপ করে। পরবর্তীকালে মেয়েটির বর মেয়েটিকে বশে আনবার একটি ভালো উপায় খুঁজে পেল। সে কাছে আসতে না চাইলেই ভয় দেখায় - আমার কথা শুনবে না তো ঐ তোমার ডেউ পিঁপড়ে ধরে আনছি।
এইরকম একই ধরণের ফোবিয়ার জন্য এক হাস্যকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন একটি সুন্দরী তরুণী চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে। অফিসে এয়ারহোস্টেসের ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। খুব সুন্দর একটি মেয়ে চটপট সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। হঠাৎ তার মুখ চোখ পাল্টে গেল। সামনে না তাকিয়ে সে যেখানে বসে আছে সেই টেবিলের নিচে কি যেন দেখে ঘাবড়ে গেছে। মুখে চোখে আতঙ্ক। একজন বয়স্ক অফিসার কিছু আঁচ করলেন। বুঝতে পারলেন মেয়েটির মন তাদের দিকে নেই। এখন সে কোনো প্রশ্নই শুনতে পারছে না। ক্রমশ চেয়ারের এক কোনায় কাত হয়ে যাচ্ছে। 'কি হল তোমার' অসুস্থ বোধ করছো না কি'? ‘Are you not comfortable’? কোনো রকমে সে উচ্চারণ করল - স্যার, স্যার টেবিলের নিচে "আরশোলা I mean cockroach"। বেল বাজিয়ে পিওন কে ডাকলেন বড় বাবু। টেবিলের ওপরে নিচে ডাস্টিং করতে পারো না ঠিক করে - ভীষণ বকুনি খেল সে। এয়ারহোস্টেস পদে যোগ্য পাত্রী তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়েছেন। স্মার্ট মেয়ে এবার উল্টে ঐ অফিসারদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল - "প্লেনে আরশোলারা থাকবে না তো"? উত্তরটা না শুনে নিশ্চিন্ত হল সে।
তবে দুটো সুন্দর জিনিষেরও ফোবিয়ার কথা জানতে পারলাম সেদিনে। "পালক ফোবিয়া" যাকে 'Petro phobia' বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একটি পায়রার পালক হার্মলেস, হালকা সুন্দর কিন্তু সেটি গায়ে এসে পড়তেই একেবারে মনোবিকারের শিকার ছেলেটি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে অস্থির। স্কুলে, কলেজে এই অতি তুচ্ছ জিনিষের ভয় নিয়ে তাকে অনেকবার অপদস্ত হতে হয়েছে, তার জীবন সাথী বিপদটা অনুধাবন করে। ধীরে ধীরে তার পাশে বসে নানা নরম জিনিষ, পাউডারের পাফ, তুলো ও ছোট ছোট পালক এনে তার কাছে রেখে গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে ঐ ভয় মুক্ত হতে সাহায্য করে।
এবার আর একটি অতি সুন্দর জিনিষ দেখেও আতঙ্কিত হবার মতন ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়। দুটি ভিন্ন দেশের ছেলে মেয়ের বন্ধুত্ব হল, আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। একদিন পূর্ণিমার রাতে সমুদ্রের ধারে তারা বসে আছে। হঠাৎ মেয়েটি ভয়ে মুখ ঢাকলো দু হাতে। ছেলেটি অবাক। এত সুন্দর মূহুর্ত্ত। কোন খারাপ ব্যবহারও সে করেনি। মেয়েটি তখন জল খেতে চাইছে, বাড়ি যাবার জন্য কাঁদছে। তাড়াতাড়ি গাড়িতে করে বাড়ি এনে ধাতস্ত করে জানতে চাইল সে, - কি দেখেছিলে ওখানে তুমি? ভূতের ভয়, কোন কিছু কাল্পনিক দৈত্য দানব - ছায়া অশরীরী অবয়ব কি তোমাকে ভয় দেখালো? সে আলতো করে উত্তর দিল চাঁদ, তাকে নিয়ে ছেলেটি ছুটলো মনোবিজ্ঞানীর কাছে। জানা গেল ছোটবেলায় কেউ তাকে পূর্ণিমার চাঁদকে রাক্ষসের চোখ বলে ভয় পাইয়েছিল। ধীরে ধীরে প্রিয় বন্ধুর চেষ্টায় সেই selenophobia থেকে বেরিয়ে এল মেয়েটি। বিয়ের পরে চাঁদনী রাতে তাজমহল দেখে মুগ্ধও হল এবং স্বামীকে ধন্যবাদ দিল।
পৃথিবীতে সাপকে ভয় পায় না এমন লোক খুব কমই আছেন। কিন্তু সেই ভয় যখন আতঙ্কে দাঁড়ায়, তখন অনেক সময় তাকে ফোবিয়া বলা যেতে পারে। এরকম একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে পাঠকের চোখের সামনে এক লঘু পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই।
উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রায় একটি বিদুষী বাঙালী কন্যার একজন আমেরিকান ছেলের সঙ্গে প্রথম প্রণয় ও পরে পরিণয় হয়ে যায়। বিয়ের পর প্রথম সাহেব জামাই বাঙালি ললনার পিতৃগৃহে অর্থাৎ শ্বশুরবাড়ি ভ্রমণ করতে আসেন। জগতে আর কোন জাতি বা দেশের লোক জামাইকে এমন আদর করতে পারেন বলে লেখিকার জানা নেই।
জামাই বরণ অষ্টমঙ্গলায় জামাইয়ের সমাদর এবং শেষে একটি বিশেষ দিনে জামাইষষ্ঠীর উৎসব। আম কাঁঠালের সঙ্গে দই, মিষ্টি, মাছ, মাংস বা পোলাও কালিয়ার সমারোহ - আতিশয্য এই অনুষ্ঠানে দেখবার মতন।
এ ক্ষেত্রেও ঐ গোরা জামাইকে নিয়ে - সবাই যেন সার্কাসের জোকার দেখেছেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত সেই জামাইকে নিয়ে মেয়েটির গ্রামের বাড়িতে ভীষণ রকমের মাতামাতি শুরু হয়েছে। জামাইও খুব উপভোগ করছেন, সারাদিন বেশ আনন্দেই কাটল, সন্ধ্যের সময় তিনি "I will take bath now" বলে উঠোনের অপরপ্রান্তে কুয়োতলার পাশের বাথরুমে প্রবেশ করলেন। একটু পরেই তার ধুতি বগলে নিয়ে আন্ডারওয়ার পড়া জামাই স্নেক স্নেক বলে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এলেন। শ্যালক, শ্বশুর, চাকর বাকর যে যেখানে ছিল ছুটলো লাঠি সোটা নিয়ে। কাঁপতে কাঁপতে সাহেব বারান্দায় উঠে এলেন। আলো, টর্চ ফেলে ডান্ডার আওয়াজ করেও কিন্তু সাপ পাওয়া গেল না। ছোট্ট একটি বাচ্চা কুয়োর দড়িটাকে দেখিয়ে বললো, সাহেব পিশো এটাকে সাপ ভাবেনি তো। শাশুড়ি বললেন ঠিক আছে যা দেখেছে দেখুক, সাপ যখন পাওয়া যায়নি তখন ও নিয়ে আর কথা বলতে হবে না। আতংকিত জামাই এক কাপ কফি খেয়ে শুতে চলে গেলেন স্ত্রীর সঙ্গে।
মশারী টাঙানো দেখে আবার বিভ্রাট, স্ত্রী ইংরেজিতে মশা, বিছে ও পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে যে এই নেট টাঙানো হয় তা বোঝালেন।
মাঝরাতে হটাৎ শোরগোল শোনা গেল তাদের ঘর থেকে। খাট থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলো মেয়েটি। আলো জ্বালতেই দেখতে পেল মশারী ছিঁড়ে জালে আটকে পড়া বড় কাতলা মাছের মতন ছটফট করছেন সে সাহেব বর। দরজা খুলে দিলে বাড়ির বাকি লোকেরাও ঢুকে পড়লেন সেই ঘরে। কি হয়েছে? what happend? - ও মা, কি হবে গো, ওকে টেনে বের করো - ইত্যাদি আওয়াজে চিৎকারে সাহেব আরও ঘাবড়ে গেল। একটু জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে কোনরকমে স্ত্রীকে ফিস ফিস করে বললেন - snake on my hand। এবার মেয়েটি তার মাথার লম্বা বিনুনিটি দেখিয়ে বললেন, "এইটা"? সাহেব জামাই একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এবার কিরকম অপ্রস্তুত অবস্থা তার তা আপনারা সকলেই বুঝতেই পারছেন। মাঝখান থেকে সকালবেলায় স্ত্রীর মাথার বেণীটি কাটা গেল।
নিজের দেশে ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি এই ভয়ের কারণ। জানা গেল খুব ছোট বয়সে ওনার এক দুষ্টু বন্ধু ওকে রাবারের সাপ দিয়ে এমন ভয় দেখিয়েছিল যে সে অজ্ঞান হয়ে যায়।
এরপরে সেই সাহেব জামাই আর কোনোদিন ঐ গ্রামে জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলেন কিনা তা আমাদের জানা নেই।
পরে জানা গেছে নানা রকম সাইকোথেরাপী করে তিনি ঐ ফোবিয়া কাটিয়ে উঠেছিলেন। অতএব আতঙ্ক যেমন আছে তার থেকে মুক্তিও আছে।

খেজুর গুড়ের গন্ধ (Khejur Gurer Gondho)

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের সামনে বেশ রোমান্টিক কায়দায় সেলফি তুলছে মিতা আর উদয়ন, ভারী সুন্দর মূহুর্ত্ত। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সোনালী আভায় সব যেন ঝলমল করছে। ঠান্ডা হাওয়ায় মন স্নিগ্ধ হয়ে গেছে। উদয়ন একজন প্রফেসর। প্যারিসের বিখ্যাত MBA কলেজ "NSEAD"-এ পড়ায়। আর মিতা আরেকটি কলেজে পি এইচ ডি করছে। জীবাণুদের ওপরে রিসার্চ করে সে। আর কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানী হবে, 'ডক্টরেট' আখ্যা পাবে।
মনের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দর দেশে, এতো মনোরম পরিবেশে, বিশ্বের নানা ধরণের লোকের মাঝে বসে থাকতে - দু জনেরই খুব ভালো লাগছে। হঠাৎ কাছে এসে দাঁড়ালো একটি ছেলে। হাতে তার অনেক ফুলের গুচ্ছ। উদয়নের দিকে এগিয়ে দিলো একটা। টিউলিপের তোড়া, ইশারায় একটু দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে দেখালো মিতাকে। অর্থাৎ ফুলের তোড়া কিনে বৌকে উপহার দেওয়ার একটা উপযুক্ত সময়, এটাই বোধহয় ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলো সে। উদয়ন পকেটে হাত রাখলো। মিতাকে জিজ্ঞেস করল, - "তোমার কাছে দেখতো খোলা 'ইউরো' আছে কিছু"?
ছেলেটি এক মুখ হেসে প্রশ্ন করলো -
"আপনারা বাঙালি"?
হ্যাঁ, তোমার বাড়ি কোথায়? মিশুকে মেয়ে মিতা কথা আগে বাড়ালো।
"আমাগো দ্যাস চিটাগাং, ইন্শাল্লাহ, আপনাগো দেইখ্যা বড় আনন্দ হইতাসে, আপা"।
"এই বিদেশে এতো কস্টলি জায়গায় শুধু ফুল বেচে তোমার চলে কি করে"? মিতার কথার সুরে খুব আন্তরিকতা ছিল।
ছেলেটি উৎসাহিত হয়ে আবেগ প্রবন হয়ে বসে পড়লো কাছের বেঞ্চে। "না গো আপা, এই এক কামে চলুম না, সকালে পেপার বিলি, পরে পিজজা ফ্যাক্টরী, বেকারির কাম, আর সন্ধ্যের পরে রেস্টুরেন্টে" -
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই উদয়ন প্রশ্ন ছুড়ে দিল, - "তাহলে ফুল কখন আনো"?
যেহেতু বিকেল ৪টা থেকে ৭টা বিশেষ কাজ থাকে না, তাই তার ঐ রেস্টুরেন্টের মালিক ফুল এনে দেন বিক্রি করবার জন্য। কমিশন পায় সে। এ কথা জানালো, ছেলেটি।
অন্যদিকে আরো বিদেশী লোকের ভীড় দেখে, ছুটলো সে ফুল বেচতে। যাবার সময় বলে গেল - যে তার নাম "আবু সৈয়দ", আপা যেন তাকে ভুলে না যায়।



এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জানুয়ারী মাস। ভীষণ শীত। কিন্তু সেদিন উজ্জ্বল রোদ উঠেছে। তাই উদয়ন ও মিতা বেশ ভালো করে ওভার কোর্ট ও টুপিতে শরীর ও মাথা ঢেকে আবার এসে হাজির হলো ঐ "আইফেল টাওয়ারের" সামনে। মিতা এদিকে ওদিকে খুঁজছে তার নতুন ভাই "আবু" কে। একটু পরেই এক মুখ হাসি নিয়ে সে এসে হাজির। পরনে কোর্টটি খুবই পুরোনো। ভালো কান ঢাকা টুপিও নেই তার মাথায়। কোনোরকমে মাফলার দিয়ে জড়ানো। এই ঠান্ডায় বেশি লোকও নেই, ফুলের বিক্রিও তেমন হচ্ছে না। আবুকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মিতার কাছে এসে সে বললো, -
"আপনার লেইগ্যে মনডা খারাপ করতাছিল আপা। ফোন নাম্বারটা একবার লইয়া যামু। কখনও সখনও বাংলায় কথা কইবার লিগ্যা মনডা কাঁদে"।
মিতা এবার ব্যাগ থেকে বের করল একটা প্যাকেট, ওর দিকে সেটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো, -
-"আমারও তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল। এই নাও এটা তোমার জন্য এনেছি খেয়ে দেখো"।
"আমার লাইগ্যা আপা খাবার জিনিষ আনতাছেন, ইনশাল্লাহ আপনারে কি কইরা সালাম দুয়া জানামু, কওনের ভাষা নাই"।
কলকাতা গিয়েছিলাম খ্রিস্টমাসের ছুটিতে। ওখান থেকে খেজুর গুড় এনেছি। তাই তোমার জন্যে খানিকটা দিলাম খেয়ো"। - মিতা সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।
আবু আনন্দে একেবারে গদ গদ হয়ে গেল।
উদয়ন জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কে কে আছেন? কতদিন পরে পরে সে দেশে যায়? কত টাকা সে জমাতে পারে ইত্যাদি নানা ঘরোয়া কথা পরম আত্মীয়ের মত।
আবু জানালো সে দুবছর হলো চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। ঐ রেস্তোরায় আরও দুজন চীন দেশের কুক, পাকিস্তানী মিস্ত্রি, ইন্ডিয়ান অফিসের কর্মীদের সঙ্গে ডরমেটরিতে থাকে। ঘরে আব্বু, খালাম্মা ও আরও দুই বোন ও এক ভাই আছে তার। মা ছোটবেলায় মারা গেছেন। বাবার সঙ্গে খালাম্মা অর্থাৎ মাসির বিয়ে হয়েছে এবং তিনিই নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি যত্নে ও স্নেহে তাকে মানুষ করেছেন। তাই তাঁকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তিনি আবার এই বিদেশে আসা নিয়ে খুব আপত্তি ও কান্নাকাটি করেছেন, কিন্তু বোনেদের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে - পাড়ার একজন চাচার সঙ্গে সে এসেছে এখানে। পানীর জাহাজে সমুদ্র পথে।
মন তার সবসময় পরে থাকে বাড়ির দিকে। এই বছর আর একটু পয়সা জমলেই বাড়ি চলে যাবে, আর আসবে না। খালাম্মার কথার অবাধ্য হবে না।



উদয়ন ও মিতা ওকে নিয়ে একটা রেস্তোরায় এল। ভাইয়ের মত সম্মান দিয়ে মন খুলে গল্প করতে লাগল তার সঙ্গে। মিতার মনে হল, সত্যিই যেন এক নিজের মামা কাকার ছেলেকে খুঁজে পেয়েছে বিদেশে। আর আবু সৈয়দ তো মুগ্ধ হয়ে গেল, এতো শিক্ষিত দুজন সম্ভ্রান্ত মানুষের সঙ্গে বসে একই টেবিলে খাবার খেতে খেতে ও নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে। "ইনশাল্লাহ আজ যে কি আনন্দ হইতাছে, কইতে পারুম না"।
কলকাতার পাটালি গুড়ের গন্ধে তার মন খুশিতে ভরে গেছে। উদয়নের হাত দুটি চেপে ধরে স্বজল নয়নে সে বললো, "আবার কহন দ্যাখুম আপনাগো"? মিতা বললে, "এই নাও ঠিকানাটা মেসেজ করে দিলাম, একদিন চলে আসবে আমাদের বাড়ি"।
আনন্দে আবেগে তার চোখের কোনায় জল এসে গেল।
ক'দিন পর থেকেই উদয়নের জ্বর, কাশি ও মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট শুরু হল। বুক ধড়ফড়ানি বেশি হতেই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেল সে, মিতার হাত ধরে। তখনও তারা জানে না, একটা বিরাট সাইক্লোন, টর্নেডোর চেয়েও ভয়ঙ্কর আঁধি রুপী মহামারী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে সমস্ত পৃথিবীকে।
প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে উদয়নকে পাঠানো হল সরকারি টেস্টিং সেন্টারে। সেখানে গিয়ে তো অবাক হয়ে গেল তারা। বহুলোক এসে জমা হয়েছে সেখানে। একই রকম সিম্পটম তাদের, জ্বর, শুকনো কাশি ও নিউমোনিয়ার মতন বুকে কষ্ট। এতলোক একসঙ্গে সংক্রামিত একই রোগে, খুব আশ্চর্য ব্যাপার মনে হল।
হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডাক দিল - "আপা গো একি হইলো? দাদা গো ধরছে এই রোগে? আমাগো চাইনিজ রুমমেট দ্যাশে যাইয়া নিউ ইয়ার কইরা, জ্বর লইয়া আইছে, ওগো থেইক্যা আমাগো কুক, মালিক, মিস্ত্রি কেউই বাদ যায় নাই, 'করোনা ভাইরাস' সবারে ধরছে"।
কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এবার উদয়ন ভর্ত্তি হল সরকারি হাসপাতালে। যমে মানুষে যুদ্ধ চলছে তার। বাড়িতে একা মিতা দিন রাত ঠাকুরকে ডাকছে, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে। এই দুর্দিনে দু বেলা ফোন করে তার মনের জোর বাড়িয়েছে তার আবু ভাই। সেও পড়ে আছে হাসপাতালের এক কোনে। কিন্তু ফোনে আপাকে সাহস জুগিয়েছে। "দ্যাখবেন, দাদা এক্কেরে ঠিক হইয়া যাইবেন"। সত্যিই হয়তো তার দুয়া কাজে লাগল উদয়নের। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তার জ্বর ছেড়ে গেল। এখন সে আর ভয় পায় না এই মহামারণ রোগকে। ল্যাবে গিয়ে ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানাতে, এই রোগের জন্য পরীক্ষা করতে সে নিজের রক্ত, প্লাজমা দান করল। তার ওপর টেস্ট করতে দিল নানান ওষুধ। যেমন কুইনিওন, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি। করেন্টাইনের ১৪ দিন সে ভলেন্টারি সার্ভিস দিতে লাগল, সেই হাসপাতালে। একদিন এইসব গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে সে খুঁজে বেড়াতে লাগল আবুকে। মিতাও জানালো যে তার ফোন আসছে না। প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে কোনার ঘরে চোখ পড়তেই দেখতে পেলো আবুকে। তার বিছানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখল সে। "আবু ভাই দেখো আমি ভাল হয়ে গেছি। তুমিও এই যুদ্ধে ঠিক জয়ী হবে, চোখ খোলো"।
শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন কম পড়ে গেছে। বড় বড় লোকেরাই পাচ্ছে না, আর এত এক অতি নগন্য "মাইগ্রেটেড লেবার"। অন্য এক অতি ছোট্ট দেশের থেকে জলের জাহাজের ডেকে বসে এই দেশে এসেছে পয়সা কমাতে। তার ওপরে অতিরিক্ত পরিশ্রমে, ভাল খাদ্য না খেয়ে, ইমিউনিটি পাওয়ারটাও গেছে একেবারে কমে। কি করে লড়বে সে ঐ 'কোরোনার' সঙ্গে।
ক্ষীণ হয়ে আসছে তার গলার আওয়াজ। কিন্তু এতদিন সে যেন উদয়নের অপেক্ষাতেই দিন গুনছিল। মিতা বলেছিলো একদিন, সে তখন গবেষণাগারে পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত ছিল। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাস বিজ্ঞানীরা স্যালাইভা, রক্ত, মাংস নিয়ে পরীক্ষা করেছে।
"না গো দাদা, আমারে জন্নত থেইক্যা আমাগো আম্মা লইত্যে আইসত্যাছেন। তবে আমার আর কোন দুঃখ হইব না, কারন তোমার দ্যাখা পাইছি শ্যাষ সময়ে। সারাডা দিন ধইরা আল্লাকে ডাকতাছি। একবার তোমারে য্যান পাঠায়ে দ্যান। আমার আর্জি শুনছেন তিনি"।
"বলো আবু কি করতে পারি আমি তোমার জন্যে। এই নাও কথা বলো আমার ফোনে তোমার খালাম্মার সঙ্গে"। - উদয়ন আন্তরিকভাবে ওর হাতটা চেপে ধরলো।
"আমি দুই সাল ধইরা যত কামাইছি এই থলিটাতে রাখা আছে। আমাগো দুই বোনের শাদি হইয়াও ঘর বানাইবার ট্যাকা থাকবো খালাম্মার হাতে। এহন এইগুলা আপনারে দিয়া যামু। একডা সোনার চেইনও কিনছি খালাম্মার লাইগ্যা। ছোড ভাইডারে এই ফোনটা দিবেন। কথা কওনের আর সময় নাই"।
উদয়ন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণ বন্ধুটির মাথায় হাত রাখলো। বললো - "আমি আর তোমার আপা নিজেরা চট্টগ্রামে তোমার বাড়ি যাব, খালাম্মার সাথে দেখা করব, আর তোমার বোনেদের বিয়ের জন্যে উপহার নিয়ে যাব। এখন থেকে তারাও আমাদের ভাই বোন"।
আবু আস্তে আস্তে তার ঐ বালিশের নিচে থেকে থলিটি বের করে উদয়নের হাতে দিল। কষ্ট করে চোখ খুলে দেখতে পেল, সেটি তার ঐ আল্লা প্রেরিত মসিহা, যত্ন করে একবার মাথায় ঠেকিয়ে আবার রাখছে, যেমন করে হিন্দু ভক্তরা পুজোর ফুলকে শ্রদ্ধাভরে রাখে। এবার অন্য হাতে ধরে রাখা আরেকটি ছোট্ট প্যাকেট নাকের মাস্ক সরিয়ে শুঁকতে লাগল প্রাণ ভরে।
"আঃ কী সুন্দর। খেজুর গুড়ে আমার দ্যেসের খুশবু - খালাম্মার গায়ের গন্ধ আসতেছে"। পরম আনন্দে, শান্তিতে চোখ বুজলো সে চিরতরে।

বেল সাহেবের গলি (Bell Saheber Goli)

চন্দনা সেনগুপ্ত

সারা পৃথিবী জুড়ে তখন চলছে ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভারতের রাজনীতি ১৯৪২ সালের "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে আলোচিত, উদ্বেলিত। গান্ধীজীর ডাকে হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে এসেছে ইংরেজের তৈরী কারাগারে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি বানাতে বানাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রুজি রুটি কামানোর আশায় গ্রাম ত্যাগ করে আসা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের ভিড় বাড়াতে শুরু করেছে, দিল্লী শহরের অলিতে গলিতে। আকাশ ছোঁয়া জিনিষের দাম, দৈনন্দিন জীবন যাত্রার মানকে করে দিয়েছে নিম্নগামী। দিন আনা দিন খাওয়া শুধু নয়, 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয়' - এই কথাটির সত্যতা যাচাই করতে করতে ক্লান্ত গৃহকর্তা 'বাসুদেব' বাবু যখন তিন মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে "বেল সাহেবের" গলিতে এসে বাসা বাঁধলেন, তাঁর স্ত্রী তখন অন্তস্বত্তা।
"কাশ্মীরি গেটের" বাস আড্ডাতে তখন 'বাস' নয়, ঘোড়া গাড়িরা আড্ডা দেয়। যমুনার তীরে এখনকার মতন চওড়া "রিং" রোড নেই, দুপাশে গাছের সারি। "নিকলসন রোড" পেরিয়ে কুর্সিয়া গার্ডেন। সাহেবদের মালিরা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। বড় বড় কয়েকটি তালগাছও এখনো সাক্ষী দিচ্ছে, রাজধানীর পরিবর্তনশীল সেই ইতিহাসের।
শীতকাল, পৌষ মাসের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, "গোবিন্দ" তখন সাত বছরের। তাকে ধরলো জ্বরে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই - চিকিৎসা করার সুযোগ না দিয়েই প্রচন্ড মাথার যন্ত্রনায় অর্থাৎ "ম্যানেঞ্জাইটিসে" সে মারা গেলো। দিল্লীতে বোমা পড়তে পারে। চাঁদনী চকের দোকান বাজার বন্ধ হয়ে গেলো, বিনা নোটিসে। লাহোর থেকে মেডিকেল স্কুল পাস করে "বাসুবাবু" তখন "সেন" কোম্পানীর বড় ডাক্তারবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট। পয়সার অভাব, সংসার চালাবার দায়িত্বে হতবুদ্ধি মানুষটাকে পুত্রশোকে যখন কাতর করে দিয়েছে, ভাবছেন, আবার মুর্শিদাবাদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে - তখন একদিন আবার শাঁখ বেজে উঠল, তাঁর ছোট্ট ঘরে - জন্ম নিলো আর একটি পুত্র সন্তান "মঙ্গল"।
"বাসুবাবুর" মা একা গ্রামে থাকতে পারেন না, মাঝে মাঝে জমির ধান বিক্রি করতে যান এবং ফিরে আসেন শাড়ির আঁচলে কিছু টাকার পুটলি বেঁধে। বৌমা 'পোয়াতি' জেনে এবারেও পুজোর পরেই চলে এসেছেন, যদিও সাতবছরের তরতাজা নাতি হারানোর বেদনা তাঁর বুকে তীরের মতন বিঁধতে থাকে, তবু তিনি বৌমাকে স্বান্তনা দেন - ভগবানের ধন ভগবানই নিয়েছেন, দেখো আবার ঠিক তিনিই ফিরিয়ে দেবেন।
কাজেই নতুন নাতির জন্মে সবচেয়ে খুশি তিনি। মুড়ির মোওয়া, নারকেল নাড়ু - দেশ থেকে যা বানিয়ে এনেছিলেন সব বিলি করে দিলেন পাড়া প্রতিবেশীর মধ্যে। সকালে উঠে বাসি কাজ সেরে বৌমাকে সাবু সেদ্ধ খাইয়ে আসেন। চান করে সেই পুরোনো মটকার কাপড়খানা পরে বড় হাঁড়িতে ভাত বসান। চাপ চাপ অড়হরের ডাল ভাতে মেখে সব বাচ্চাদের একসঙ্গে বসিয়ে একই থালা থেকে গরম গরম ভাত তুলে দেন, ছোট ছোট হাঁ গুলিতে। এবার ধান খুব ভালো হয়েছে দেশে দেখে এসেছেন তিনি। তাই মনটা খুব খুশী। বাসুদেবও সারাদিন লোকের বাড়ি বাড়ি ইনজেকশন দিয়ে আপাতত দু টাকা আনছে ঘরে, আর আঁতুড়ের কোণে 'মঙ্গল' বাড়ছে পূর্ণ চন্দ্রের মতন।
"সুশীলা বালা" দেবীর গায়ের রঙ সোনার মতন, অন্যান্য নাতি নাতনিরা বেশ ফর্সাই হয়েছে, কিন্তু এ ছেলেটা যেন বৃন্দাবনের কেষ্ট ঠাকুর। শ্যামলা রঙের মোটা মোটা গড়ন, এক মাথা কালো চুল বড় সুন্দর উজ্জ্বল দুটি চোখ।
১৯৪৭ এ স্বাধীনতা এবং দেশভাগ। দলে দলে মুসলমান প্রতিবেশী চলে যাচ্ছে ওপারে নতুন জন্মানো দেশ পাকিস্তানে, পাকিস্তান মানে নাকি পবিত্র স্থান কিন্তু একি হানাহানি, কাটাকাটি, রক্তপাতে স্নাত দুই দেশের তিন ধর্মের মানুষ - হিন্দু, মুসলমান, শিখ একে আরেকজনের পরিবারের বৃদ্ধ তরুণ শিশুকে কচুকাটা করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করছে না। একি স্বাধীনতা? বন্ধু আত্মীয় সম প্রতিবেশীদের হারানোর দুঃখ, অহরহ নিরাপত্তার অভাব - রাজধানী দিল্লীর সব সম্প্রদায়ের মানুষকেই ভয় ভীত করে রেখেছে।
কিন্তু কাশ্মীরি গেটের ভেতরে মৌরী গেট, তার ভেতরে গন্ধ নালা এবং তার পাশেই ছোট্ট সরু হলেও পরিচ্ছন্ন এক রাস্তা। যার মোড়ে এক সাহেবের বাংলো বাড়ি, ইংরেজ সরকারের এক বড় অফিসার বেল সাহেবের বাড়ি। তাই ঐ রাস্তাটার নামও হয়ে গেছে বেল সাহেবের গলি, স্বাধীনতার আগে সেখানে কত সাহেব মেমের আসা যাওয়া ছিল, ঘোড়া ছুটিয়ে বাচ্চাদের কুর্সিয়া গার্ডেন-এ ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হত। গলির ভারতীয় বাচ্চারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত তাদের দিকে, অবাক বিস্ময় ছিল তাদের ঐ বাড়ির মালিকের প্রতি।
বৌমা বলেন - "বার বার বার্লি সাগু তো আর খেতে পারছি না মা" শাশুড়ির চোখে জল আসে। "কি করবো বলো বাছা, গ্রামে তো আমার গরু ছিল, নারকেল গাছে অত ডাব, পুকুরের মাছ - তোমাদের তো সেখানে থাকার ইচ্ছে নেই, এখানে কচি বাচ্চার মাকে আমি কি খেতে দেব? - না না ওটুকু সাগু খেয়ে নাও, বুকের দুধ নামবে কি করে বাছা।"
ছেলের লক্ষণ বড় ভালো, দু এক বছর যেতে না যেতেই আর একটি ভাই ডেকে আনলো সে। যুদ্ধ থামলো। ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। বেল সাহেবের অনেক পুরোনো লোকই চলে গেল, আর বাসুবাবুর পরিবারও বৃদ্ধি হল। ঠাকুমা বললেন, "মঙ্গলের পয়ে বাপের উন্নতি হয়েছে, দেখবে ও ছেলে বড় হলেও খুব নাম কামাবে।"
কিন্তু ওপরে চারজন এবং পরে আরও তিনজন ভাই বোন হয়ে যাওয়ায় 'মধ্যম' কুমারের দিকে মা বাবা, ঠাকুমার নজর দেওয়ার সময় হয় না, আর সাত আট বছর থেকেই সে তাই সর্বদা একটা নিজের জগতে বাস করে। বড় দিদিরা তখন কিশোরী। ঘরের রান্না, কাপড় কাঁচা, স্কুলে যাওয়া, সেলাই ফোঁড়ায়, উল বোনা, বান্ধবীদের সঙ্গ ও মায়ের সদ্য প্রসব করা ভাই বোনদের দিকে লক্ষ্য করতেই তাদের সময় কেটে যায়। বড় ছেলে খুব সাদাসিদে, পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলো ও গল্প শোনায় তার মন বেশি। একটু পেট ভরে খাওয়া আর পরিপাটি করে তেল চুকচুক চুল আঁচড়ে দিদিদের পায়ে পায়ে বাধ্য ভাইটি হয়ে ফায় ফরমাশ খাটতে তার খুব ভাল লাগে। ঝগড়াঝাটি মারামারিতে সে নেই, একা একা বাড়ির বাইরে ঘুরে বেড়াতেও তার ভয় লাগে।
মঙ্গল হয়েছে সম্পূর্ণ নিজের মত, হাট্টাকাট্টা চেহারা, দুষ্টু দুষ্টু চাহুনি, ভয়ডরহীন স্বভাব। কারও সঙ্গে তার ভাব নেই, আবার কারও কথা শুনতেও সে রাজী নয়। বাড়িতে যতক্ষণ সে থাকে কারোর সঙ্গে কোনো তর্কাতর্কি গল্প আড্ডায় কিম্বা কোনায় বসে লুডো, তাস, কেরাম খেলায়ও বেশি বসতে দেখা যায়নি তাকে। একা একাই ঘুরে বেড়াই সে বেল সাহেবের গলির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।
অনেক পরিবার, অনেক জীবন কাহিনী জড়ানো ভাঙা পুরোনো দালানের ছাদেই বেল সাহেবকে নিয়ে কিশোর বয়সে অনেক কল্পনার জাল বোনে মঙ্গল। তাঁর বেশভূষা, আচার ব্যবহার, শিক্ষা দীক্ষা, ঘোড়ার গাড়িতে মেমসাহেবকে ও গোড়া শিশুদেরকে নিয়ে 'কন্যাট' প্লেসে ঘুরতে যাওয়া - সবই তার মনকে আকৃষ্ট করে। এরাও তো তাদের মত মানুষ কিন্তু এদের জীবন যেন পরীর দেশের গল্পের মত। আর এ পাড়ার অন্যেরা বাস করে কত দুঃখ কষ্ট, অসহায়তার মধ্যে দিয়ে। কে জানে মঙ্গল কবে এই বেল সাহেবের গলির বাইরে গিয়ে থাকতে পারবে, এই সব ভাবতে ভাবতে সময় কাটে আকাশকুসুম কল্পনাতে।
তার জগৎ। মানুষের জীবনের চলমান ছবি দেখে আর জানবার চেষ্টা করে সে। প্রকৃত অর্থে তারা কে কেমন ভাবে বেঁচে আছে। বাঙালীরা তখন খুব বেশী দিল্লী আসেননি এবং যারা এসেছেন, তারা প্রায় সবাই সরকারী কাজ পেয়ে জীবিকার তাগিদে। রেলের কর্মচারীরা যারা স্টেশনের কাছে থাকতে চান তারা অনেকেই বাসা বেঁধেছেন ঐ কাশ্মীরি গেটের অলি গলিতে। 'মঙ্গল' ভাবে যার নামে এই গলিটা সেই বেল সাহেব এখন কোথায়? কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? যে বাড়িতে থাকতেন, সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোন দেশে তাঁর বাড়ি? কোনদিন সে সেখানে দেবে পাড়ি - কে জানে কখনও ঐ গলির বাইরেও সে যেতে পারবে কি না। গলির মাঝখানে এই বাড়িটাতে পাঁচটা পরিবারে মোট একত্রিশ জন লোক। ছাদের এক কোনায় শুধু একটা মাত্র বাথরুম। পায়খানার বিবরণ গল্প গাথায় লেখাটা অশোভনীয় হলেও আজ সেকথা জানাবারও একটা প্রয়োজন আছে। কারন এযুগের ছেলে মেয়েরা তা ভাবতেও পারবে না। শুধু ঐ সাহেবের বাড়িটা ছাড়া আর সব জায়গাতেই অন্যরকম বাথরুম। বেল সাহেবের বাড়ির ভেতরটা সে কোনোদিন দেখতে পায়নি। দুটো পাথরের পাদানির নীচে বিরাট গর্ত্তে রাশি রাশি মলমূত্র জমা হয় রোজ সারাদিন ধরে। পরদিন ভোরবেলায় হরিজনদের একজন, যাকে বলা হয় ‘মেথর’ আসেন বিনা ক্লেশে, বিনা দ্বিধায় নাকে কাপড় না দিয়েই বড় বড় টিনের মধ্যে সেই ময়লা তোলেন এবং মাথায় করে নিয়ে যান। খুব কষ্ট হয় মঙ্গলের। এরাও তো মানুষ, তবে কেন এই অত্যাচার তাদের ওপর। অনেকদিন পরে গান্ধীজীর আপ্রাণ চেষ্টায় ঐ "হরিজনদের" মুক্তি দেওয়া হয় ঐ নোংরা কাজের দুর্বিসহ যন্ত্রনা থেকে।
মঙ্গলের ছোটবেলায় সবচেয়ে জরুরী কাজটি হল, সকালে পায়খানা ধুয়ে দেওয়া হলেই প্রথমে ছুটে গিয়ে সে ঢুকে যায়, পরিষ্কার বাথরুমটা কে আগে দখল করতে পারে, সে নিয়ে রোজই প্রতিযোগিতা চলে তাদের মধ্যে।
বাড়িতে প্রায়দিনই তরকারি কম হলে, ডাল না পেলে সব ভাইবোনেরা নালিশ জানায়, কান্নাকাটি করে। মঙ্গলের বাড়িতে যখন ডাল তরকারি হয় না, রুটি, তেল, নুন ও লঙ্কা পেঁয়াজ খেয়ে চুপচাপ সে উঠে যায় বিনা দ্বিধায়। কারও প্রতি কখনও কোনও অভিযোগ সে করে না। স্কুলে যাবার জামা প্যান্ট একখানা, রোজ কাচলে শুকোবে না, তাই রুমালে একটু সাবান লাগিয়ে নিয়ে পকেটের আর কলারের ময়লাটা ঘষে ঘষে উঠিয়ে দেয় সে। রান্নার পরে নিবু নিবু উনোনের আঁচে ঘটিটা গরম করে কুঁচকানো ভিজে পকেটের ওপর ধরে, রাত্রে বিছানার নীচে ভাঁজ করে রেখে দিলেই ইস্ত্রি করা 'ইউনিফর্ম' হয়ে যায় তার। বাড়িতে গদী, তোষক নেই সবার জন্য, মাদুর শতরঞ্জি পেতে, ঠাকুমার হাতের তৈরী কাঁথা গায়ে দিয়ে শুতেই তারা অভ্যস্থ।
বেল সাহেবের গলির মাথায় বেশ কয়েকজন বড়লোক 'মুসলমান' পরিবার ছিলেন, স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত, সেখানে এখন যাদের বাস তারাও সব বড় বড় ব্যবসাদার। ছোটবেলা থেকেই ঐ বাড়িগুলির লোকজনদের একটু অন্য জগতের মনে হয় গলির অন্য সব বাচ্চাদের। সেখান থেকে ভেসে আসা বিরিয়ানির গন্ধ নাকে লেগে থাকে, চোখ ঝলসানো জামা কাপড়, ঘোড়া গাড়ির অদ্ভুত আওয়াজ 'মঙ্গলের' মনকে টানে, ভাবে সে - কবে যে তাদের বাড়িতেও ঐ রকম রান্নাবান্না জাঁকজমক হবে। কখনও কখনও আবার উল্টোটাও মনে হয় তার, - "ওদের পোলাও মাংসের গন্ধ যেমন আমাদের ভালো লাগে, আমাদের ঠাম্মার হাতের হিং দেওয়া অড়হরের ডালের গন্ধে নিশ্চয় ওদের জিভে জল আনে।"
রবিবারের দিনটা আসে আনন্দের আমেজ নিয়ে। গ্রাম থেকে আগত মামা কাকা বা দাদাবৌদি বিশেষতঃ বাচ্চাদের "লজেঞ্চুস" বিলি করা "পিসেমশাই" আসবেন স্নেহময়ী পিসিমাকে সঙ্গে নিয়ে, বাবা, ঠাম্মাকে ঘিরে বসবেন সবাই। চা পকোড়া মুড়ি খেতে খেতে কত ধরনের গল্প হত। মুর্শিদাবাদের কোন কোন গ্রাম "পূর্ব পাকিস্তানে" চলে গেলো, কোন খানে মহামারী কী বন্যা হয়েছে, "গান্ধী" হত্যার মামলায় আর কার কার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল, জাপানের অবস্থা এখন কেমন, নিউক্লিয়ার বোমে হিরোশিমা নাগাসাকির পর আর কোন দেশ কে ধ্বংস করতে পারে তার ভীতিপ্রদ কল্পনা। তখন টিভি ছিল না, রেডিও সকলে কিনতে পারতো না, মঙ্গলদের বাড়িতে নিত্য খবরের কাগজ আসত না, খবরের একমাত্র উৎস ছিল মানুষের মুখ নিঃসৃত সত্য কাহিনী, তারপর তার সঙ্গে রং চড়িয়ে কত কল্পনার পাহাড় করে দিয়ে ঘরে বা পথে, ঘাটে, চায়ের দোকানে, রেলের স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডে ছড়িয়ে যেত রকমারি গল্প। তাই এক শহরের কোন অবাঞ্চিত ঘটনা ঘটলে তার রেশ পৌঁছে যেত অন্য গ্রামে গঞ্জে। বেল সাহেবের গলির মোড়ে যারা থাকতেন, বিহারীলাল কাটরার লোকেরা কেউই হয়তো বেল সাহেবকে দেখেনি কিন্তু তার সম্বন্ধে নানান প্রচলিত কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলতে ছাড়ত না তারা। তিনি নাকি ৬ ফুটের বেশি লম্বা ছিলেন, তাঁর বাড়িতে আয়া খানসামাদের খুব ভালোবাসতেন। ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াতে যেতেন।
ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল মঙ্গল ও তার সব ভাই বোনেরা। মেয়ের বিয়ের পাত্র দেখতে গিয়ে অন্যের বাড়িতে হার্ট অ্যাটাক হল তার পিতার, গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই ঐ পুত্র মঙ্গলের কোলেই তিনি ঢলে পড়লেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
সমস্ত সংসারের দ্বায়িত্ব এসে পড়লো এবার এই মঙ্গলের ওপর। একটা সিগরেট ফ্যাক্টরিতে সে চাকরি করে, প্রাইভেট কোম্পানি, তারপর নানা রকম চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে হটাৎই সে চাকরি পেয়ে গেল, ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসে নিজের চেষ্টায়। টাকা পয়সার অভাব দূর হল তার মায়ের। এবার তারা বেরিয়ে এল ঐ বেল সাহেবের গলি থেকে লক্ষী নগরে নিজেদের বাড়ি করে। দুটি ভাই শঙ্কর ও শিবুও পড়াশোনা শেষ করে সরকারী চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। বড়দা আগেই চাকরি পেয়েছিলেন অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। এবার তিন বোনের বিয়ে দিয়ে সংসার পাতল সে। ছেলেরা তার পড়াশোনায় খুব ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং করে সোজা পাড়ি দিল আমেরিকায়। মঙ্গলবাবু এখন পঞ্চাশোর্ধের মধ্য বয়স্ক বড় ম্যানেজার, ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে ঐ মৌরি গেটের গন্ধ নালায় তাঁর শৈশব কেটেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্রি টিকিট নিয়ে বিজনেস ক্লাসে চড়ে তিনি স্বস্ত্রীক পাড়ি দিলেন ইউএসএ। আমেরিকা, গ্রাম, শহর ন্যাশনাল পার্কগুলি চষে বেড়াতে লাগলেন ছেলেদের দৌলতে। ভ্রমণের আনন্দে যেন মশগুল হয়ে গেলেন প্রৌঢ় মঙ্গলবাবু। ছেলে নতুন গাড়ি কিনেছে তাতে বসে তাঁরা চললেন, ওদেশের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে।
খরস্রোতা নদীতে পাহাড় কেটে কেটে, হাওয়ায় ক্ষয় হয়ে যাওয়া পাথরের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে আছে নানা রহস্য। সূর্য্যের আলোয় তার রং বদলাচ্ছে পাথরের ওপর প্রতিবিম্বিত হয়ে। ভারী সুন্দর দৃশ্য। ছেলে বলল - বাবা হেলিকপ্টারে চড়ে সফর করো, একেবারে ঐ ক্যানিয়নের নীচে ওপরে ভেতরে বাইরে - সব ঘুরিয়ে আনবে তোমাদের। আনন্দে বিগলিত হয়ে হেলিকপ্টারে পাইলটের পাশে গিয়ে বসলেন তিনি। স্ত্রী পুত্র পিছনে অন্য যাত্রীর সঙ্গে।
পাইলট আমেরিকান ভদ্রলোকটি ছিলেন ভীষণ রসিক। চালাতে চালাতেই গল্প শুরু করলেন, - কোথা থেকে এসেছেন - ভারতবর্ষ - দিল্লী শুনেই লাফিয়ে উঠল তার মন। বললেন আরে আমি তো আমার শৈশবের দশবছর ঐখানে কাশ্মীরি গেটের একটা গলিতে কাটিয়েছি। গলিটার নাম দেওয়া হয়েছিল - 'বেল সাহেবের গলি'। আমার দাদুর নামে।
চমকে উঠল মঙ্গলবাবুর সমস্ত সত্তা, এরকম একজন লোকের সাক্ষাৎ পেয়ে। যাদের দরজার সামনে তিনি ছোট বয়সে কখনও যাওয়ার সাহস পাননি, আজ তার পাশে বসে যাচ্ছেন তিনি।
পাইলট বললেন - তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু, তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী শিক্ষিত ইংরেজ আর্মি অফিসার। কিন্তু ১৯১৯ সালে যখন তাঁকে জেনারেল ডায়ার অমৃতসরে নিয়ে যেতে চান নিরীহ ভারতবাসীকে হত্যার উদ্দেশ্যে, তখন তিনি তাঁর কথা শুনতে চাননি, তর্ক করেন তাঁর বসের সঙ্গে - এটা অন্যায়, এটা পাপ, কিন্তু তিনি আজ্ঞাবাহী না হলেও তোমাদের দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক সরকারের খোসামুদে সিপাই প্রোমোশনের লোভে পড়ে চলে যায় অমৃতসরে এবং তাদের গুলিতে মারা যায় নিরপরাধ অসহায় জনতা। আমার দাদু তখন চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসে আমেরিকায়। এই দেশটাও কম যায় না ১৯৪৫ সালে বোমা ফেলে জাপানীদের দুই শহরে। মারা যায় কত লক্ষ নিরীহ মানুষ।
২০ মিনিট ঘুরে যখন ফিরে আসে হেলিকপ্টার তখন সম্বিত ফিরে পান তিনি। সুদূর ভারতবর্ষের সঙ্গে এই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বেল সাহেবের নাতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি মাটিতে পা দেন।
বেল সাহেবের গলির মালিকের সঙ্গে তাঁর ভাগ্য যে এমন জড়িয়ে যাবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
চলমান জীবনের স্রোত মানুষকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়। কোন মোড়ে যে আবার কার দেখা মেলে সে কথা কেউ জানতে পারে না। সবই ওপরওয়ালার অদৃশ্য লীলাখেলা - যার অর্থ খুঁজে পাওয়া ভীষণ দুষ্কর মানুষের পক্ষে।
এবারে ঐ পাইলটের সঙ্গে তিনি পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক বললেন - আমার এখনও ঐ বেল সাহেবের গলিতে ছুটে চলে যেতে মন চাই। ওখানকার কাজের লোকগুলোর সঙ্গে কুর্সিয়া গার্ডেনে যেতে ইচ্ছে করে। পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে কিন্তু আর যাওয়া হয়ে উঠল না।
মঙ্গলবাবু অনুরোধ করলেন, - "এসো না একবার দিল্লী, যদিও এখন সেখানে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হবে তোমার। সব পাল্টে গেছে। কাশ্মীরি গেটের বাগান মাঠ কিছুই নেই, সেখানে এক বিরাট বাস আড্ডা।"
তাই না কি? একবার শৈশবের খেলাঘরে দাদুর নামের ঐ গলিতে নিজের ছেলেদের নিয়ে যেতে ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ছেলেরা সব অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার সঙ্গে আমার ইচ্ছায় তাঁরা তো কোথাও যাবে না।
তুমি তো খুব লাকি, তোমার ছেলে এতো টাকা টিকিট কেটে দেশ থেকে ইউএসএ আনিয়েছে, হেলিকপ্টারে চড়িয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ঘোরাচ্ছে, নিশ্চয় এই রাস্তায় লস ভাগ্যাসও দেখিয়ে আনল। আর আমার ছেলে আজ কথা শোনে না।
মঙ্গল বললেন - হ্যাঁ, সত্যি ভগবানের অশেষ কৃপা যে বেল সাহেবের গলিতে ওয়ান রুম সেট ঘরে জন্ম নিয়েও আজ ছেলেদের দৌলতে সারা আমেরিকা চষে বেড়াচ্ছি। আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে মঙ্গলবাবু বলে যাচ্ছেন - জানো আমরা ইয়েলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কও ঘুরে এলাম।
সেই প্রৌঢ় পাইলট কিন্তু মঙ্গলের কথা শুনতে পাচ্ছেন না, সূর্য্যাস্তের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে মুখে বিড় বিড় করে বলছেন - "বেল সাহেবের গলি" কি সুন্দর নাম। আমার যে ঐ সরু রাস্তাটার জন্য বড় মন কেমন করছে। চোখের কোনায় জল চিক চিক করছে তাঁর।
এবার বিদায় নেওয়ার পালা। হস্তমর্দন করতে করতে তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, - তোমার ছেলে তোমাকে কত ভালোবাসে। আমার ছেলে আমায় ছেড়ে চলে গেছে। এখন শুনছি সে gun নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ড্রাগস্ মাফিয়াদের সঙ্গে জীবন কাটায়। বেল সাহেবের গলিতে থেকে তুমি ছেলেকে কত সুন্দর মানুষ করেছো আর এত ধনী সমৃদ্ধ দেশে এতো সব সুযোগ সুবিধা পেয়েও আমাদের সন্তানেরা কেন এমন বিপথে চলে গেল, বলতে পারো? You are lucky man you are fortunate -
বৃদ্ধ আমেরিকান পাইলটের আবেগে আপ্লুত কণ্ঠস্বরে ভারতীয় মঙ্গলবাবুরও চোখে জল এসে গেল। এ অশ্রু দুঃখের, আনন্দের না জয়লাভের তিনি বুঝতে পারলেন না।

ডানপিটে ছেলে (Daanpite Chele)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ছেলেটাকে নিয়ে বাড়িসুদ্ধ লোক একেবারে ব্যাতিব্যস্থ - অস্থির। একেবারে সেই ছোট্ট থেকেই সে অসম্ভব চঞ্চল। সবসময় দেখ দেখ ধর ধর। চার থেকে ছয়ে যখন এল, তখন স্কুলে নিয়ে যাওয়া এক বিরাট সমস্যা। তার ইচ্ছেমতো সে থাকতে ভালোবাসে, কোনোদিন যদি যায়ও অন্য বাচ্চাদের মেরে ধরে, মাস্টারমশাই দিদিমনিদের জ্বালাতন করে অতিষ্ঠ করে দেয়। মা কাঁদে, বাবা মারে, দাদু লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে, ঠাকুমা হৈ হৈ করে চেঁচিয়ে ওঠেন, - ওরে আমার তেলের শিশিটা ভেঙ্গে দিল, কাকিমা সারা বাড়ি ছুটে বেড়ান ওর পেছনে পেছনে - এক হাঁড়ি রসগোল্লা একাই শেষ করে দিচ্ছে, কি রাক্ষস ছেলেরে বাবা খেতেও পারে। কাকুতি, মিনতি, বকুনি, গালাগাল, মার - সবই ওর কাছে তুচ্ছ - অবান্তর বলে মনে হয়। রসগোল্লাগুলো খেয়ে রসের হাঁড়িটা বারান্দায় দুম করে ফেলে ভেঙ্গে দিয়ে এক ছুটে পালালো বাড়ির বাইরে।
ছেলেটা যখন বারোতে পড়লো। 



হটাৎ তার দাদু মারা গেলেন গাড়ি চাপা পড়ে। দাদুর মুখে আগুন লাগানো ব্যাপারটা একদম ভালো লাগলো না ওর। ছেলেটার বাবা শ্মশানে মুখাগ্নি করতে গেলে রেগে উঠলো সবাইকার ওপরে। কেন এমনি করে পুড়িয়ে দেবে দাদুকে। সেই জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে তেড়ে গেল অন্যান্য লোকজনদের দিকে। তারা বলে উঠলেন, "এই পাগল ছেলেকে কেন এনেছেন, ভাইকে ডাকুন," - "কী আমি পাগল? তোমরা পাগল, তোমরা ছাগল - যাও ঘাস খাও বসে বসে," হন হন করে বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।



সেখানেও তো তখন বীভৎস সব দৃশ্য। নাটক চলছে - ঠাকুমার চুড়ি খোলা, সিঁদুর মোছা, বুক চাপড়ানো কান্না, প্রতিবেশী মাসী-পিসিদের ভিড়। ছেলেটার দিকে লক্ষ্য নেই কারো। রান্নাঘরে ঢুকে এক থালা পান্তাভাত নুন লঙ্কা মেখে হপ হপ করে খেয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল ছেলেটা।
চলছে তো চলছেই কোথায় কোন দিকে তা সে নিজেই জানে না। গ্রামের বাইরে একবারই শহরে গেছে তার বাবার সঙ্গে, আজ একাই চলেছে যেন কিসের ঘোরে। বেশ অনেকটা পথ চলে সে একটা রেল স্টেশন দেখতে পেল। সেখানে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল। একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামল এসে, কিছু না ভেবেই উঠে পড়ল তাতে। চলন্ত ট্রেনের খোলা জানলার হাওয়ায় একটু পরেই ঘুমিয়েও পড়ল সে।
পরদিন সকালে একটা বড় স্টেশনে বহু লোকজনের ওঠা নামা দেখে তারও নামতে ইচ্ছে হল। পেটে ভীষণ খিদে, ক্লান্ত দেহ, পকেটে পয়সা নেই। কি করবে সে ভেবে পাচ্ছে না কিছুই। হটাৎ নজর পড়ল কয়েকজন ভিখারী হাতে একটা করে শাল পাতার ঠোঙায় লুচি ও আলুর তরকারী নিয়ে আসছে। তাদের অনুসরণ করে দেখল স্টেশনের পিছনেই একটা মন্দির। সেখানেই খাওয়ার দেওয়া হচ্ছে, কোনো পুজো আছে। সকলের সাথে সেও খাওয়ার খেতে বসে পড়ল একটা বড় পাথরের ওপরে। দোকানদার বললে - এই ছেলেটা কাজ করবি? এই বাসনগুলো ধুয়ে ফেল তাহলে আরও খেতে দেব।



জীবনে কখনও কিছু কাজ করেনি সে। মা কাকিমাদের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। কতরকম ভাবে তারা তার অত্যাচার সহ্য করেছেন, এখন মা হয়ত তাকে দেখতে না পেয়ে খুব কান্নাকাটি করছেন। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল তার। আর কি ফিরে যেতে পারবে সে নিজের বাড়িতে?
অন্যমনস্ক হয়ে হাতে ধরে থাকা বাসনগুলো পড়ে গেল ঝনঝন করে মাটিতে। ভেঙ্গে গেল বেশ কয়েকটা কাঁচের গেলাস। দোকানদার উঠে এসে এলোপাথাড়ি চড় চাপড় মারতে লাগলো তাকে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রাস্তায়। ভীষণ রাগ এসে গেল তার, কিন্তু অচেনা অজানা জায়গায় সাহস হল না তার, ঘুরে গিয়ে তাকে মারতে।
জীবনে বার টা বছর পরে এই প্রথম সে অনুভব করলো যে, এটা বাড়ি নয়। সবাই তার অত্যাচার সহ্য করবে না। এবার থেকে ডানপিটে স্বভাব, অকারণে জ্বালাতন করা, অন্যকে উত্তক্ত করা আর চলবে না। ধুলো ঝেড়ে উঠে সে মন্দিরের সিঁড়িতে এসে বসে পড়ল।
মন্দিরের পেছনে একটা বড় ঘরে পাথর ভাঙ্গার আওয়াজ হচ্ছে, বেশ কয়েকজন লোক হাতে হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে পাথর কেটে মূর্ত্তি বানাচ্ছেন। হাঁ করে তাদের শিল্প কর্ম দেখতে লাগল ছেলেটা। একজন বৃদ্ধ শিল্পী অনেক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন তাকে। ইশারায় কাছে ডাকলেন। ধীরে ধীরে উঠে তাঁর কাছে এল সে। - "আমায় একটু সাহায্য করবে সোনা বাবু"? বেশ গম্ভীর কিন্তু মায়াময় গলায় তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। সে বুঝতে পারল না, সে কেমন করে ওনাকে সাহায্য করবে।
এই দেখো না আঙুলে হাতুড়ির ঘা লেগে আমার বুড়ো আঙ্গুলটা কেমন থেঁতলে গেছে। এই পাথরটাকে এইভাবে ছেনি দিয়ে একটু একটু করে ঘষতে আর কাটতে হবে। পারবে তো?
অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভব করল হটাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া সেদিনের সেই দুষ্ট ছেলেটা, হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে কাজ শুরু করে দিল তার। কয়েকদিন ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে সে। অদ্ভুত নেশায় যেন পেয়ে বসেছে তাকে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীও অবাক হয়ে গেছেন তার নিষ্ঠা ও মূর্ত্তি তৈরির আগ্রহ দেখে। মূর্ত্তিটা ছিল শিবের। জটাজুট ধারী দেবাদিদেবের সাপটা গলায় জড়ানো থাকে। বেশ গভীর মনোযোগ দিয়ে সে সেটা বানাবার চেষ্টা করছে। এমন সময় কয়েকজন ক্রেতা এলেন সেখানে। এরা মূর্ত্তি তৈরির অর্ডার দিয়ে যান এদের। তারাও ছেলেটির প্রশংসাতে পঞ্চমুখ হয়ে গেলেন। "আরে ভাস্কর জী, এই বাচ্চাটা আপনার নাতি নাকি? কি দারুন হাত এর"। শিল্পী বললেন, হ্যাঁ, এই কিশোরের হাতে জাদু আছে, কোনো উপযুক্ত ট্রেনিং ছাড়াই সে যে ভাবে কাজ করছে আমি তো তাজ্জব বোনে গেছি।



ডানপিটে দুষ্টু ছেলেটাকে কেউ কোনোদিন কোনো ব্যাপারে ভালো বলেনি। আজ সে নিজের পাঁচ পাঁচ দশ আঙ্গুলকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে শুধু কাজ ভণ্ডুল করতে ওস্তাদ, আজ সেই যে এমন মূর্ত্তি তৈরির কাজে দক্ষতা দেখাবে তা সে সত্যি ভাবতেই পারছে না।
একজন ভদ্রলোক দু-চার মাস পরে আবার এলেন কিছু মূর্ত্তির অর্ডার নিয়ে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীকে বললেন, "এই ছেলেটিকে উড়িষ্যায় ভাস্কর মেলায় নিয়ে যাব? সমুদ্রের ধারে পাথর আর ছেনি নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হবে ১২ থেকে ১৮ বছরের উৎসাহী ছেলেদের। স্কুল থেকেও আসবে বিভিন্ন সব জায়গার বাচ্চারা। যে প্রথম হবে সে অনেক টাকা পুরস্কার পাবে। শিল্পী বললেন, "নিয়ে যাবেন? আবার এনে দেবেন তো? বড্ড মায়া পরে গেছে আমার ওর ওপরে।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। কিন্তু এর মা বাবা কোথায়? বাড়ি যায় না?
কিছুই বলতে চায় না ও। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে বলে, "মা দেখো আমি কেমন মূর্ত্তি গড়ি, আর আমায় ডানপিটে, পাগল, দুষ্টু ছেলে বলবে না তো"? মনে হয় কোন অভিমানে এ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন গ্রাম শহরের নাম কিছুই মনে করতে পারছে না।
পরদিন ছোট একটা টিনের বাক্স গুছিয়ে বৃদ্ধশিল্পী ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিলেন উড়িষ্যার কোনার্কে।
সেখানে প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান পেল। 



তার বিশেষ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন বিচারক ও দর্শক বৃন্দ। যে মূর্ত্তিটি সে বানিয়েছে তার রূপ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সবাই। এক অপূর্ব মাতৃ মূর্ত্তি।
বিচারক প্রাইজ দেবার সময় তাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, "কার মূর্ত্তি বানিয়েছো গো খোকা? কোন দেবী"। সে মুখ নিচু করে জবাব দিল, "আমার মায়ের"।
টেলিভিশনে এই খুদে শিল্পী ভাস্কর নিজের পরিচয় দিতে পারছে না অনেকেই তাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ছেলেটি যেন তার ঐ বানানো মূর্ত্তির মতন নির্বাক। কেন যে সে নিজের বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারে না, সে বুঝতে পারে না।
আরও সাত বছর কেটে গেল তার জীবনের। ২১ বছরের ছেলেটা ভীষণ গম্ভীর ও শান্ত। দিল্লীতে অক্ষরধাম মন্দির তৈরী হচ্ছে, শিল্পীরা কাজ করে সেখানে। অনেক সুন্দর সুন্দর মূর্ত্তি, হাতি, সিংহ, বাঘ ও দেব দেবতাদের কাহিনী পাথরে খোদাই করে বানানো হচ্ছে। অনেক বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের সেই ছেলেটা যে এখন এক সুন্দর সুঠাম ধীর স্থির যুবক সে কাজ করছে এক মনে।
একদল তীর্থযাত্রী বাসে করে হরিদ্বার বৃন্দাবন ঘুরে এসেছেন, দিল্লী ভ্রমণ করতে। তারা ঐ মূর্তিগুলির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন প্রৌঢ় মহিলাকে দেখে ঐ ছেলেটি কেমন যেন টান অনুভব করল। দলটির পিছন পিছন যেতে লাগল সে। তারা কোথা থেকে এসেছে জানতে চাইলে, তারা বললেন পূর্ব মেদিনীপুর। পশ্চিমবঙ্গের "পাউশী গ্রাম" থেকে। এক মুহূর্তে বিদ্যুতের যেন ঝলক এনে দিল ছেলেটির মনে। সে এক ছুটে প্রথমে মন্দিরের পিছনে তাদের ঘরে গেল। সেখানে নিজের সেই প্রথম প্রাইজ পাওয়া মায়ের মূর্ত্তিটি বের করে আনল। ঐ ভ্রমণ যাত্রী দলের লোকদের দেখিয়ে বলল - "দেখুন তো আমার এই মূর্ত্তির মতন দেখতে কেউ কি এই দলে আছেন"? তখন একজন চিৎকার করে বলে উঠলো, "হ্যাঁ, এই তো সেই দুষ্টুর মা"।
এক মিনিট ও আর দেরী না করে সে তখন তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রণাম করল পায়ে হাত দিয়ে। ভদ্রমহিলা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর "ওরে আমার দুষ্টু রে, তুই এতদিন কোথায় ছিলি" বলে কেঁদে ফেললেন ঝর ঝর করে করে। এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না তীর্থ যাত্রীর দল। পাড়ার লোকেরা যারা তার সঙ্গে ছিলেন তারা ঐ ডানপিটেটার গুনের খবরে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। অত দুষ্টুমীর মধ্যেও যে এতোবড় প্রতিভা লুকিয়ে থাকতে পারে তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল।

সংবাদ – সমীক্ষা ও একটি আবেদন (Shongbaad – Shomikkha O Ekti Abedon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

কোথাও জ্বলছে ভয়ঙ্কর আগুন,
কেমন করে লাগলো কে জানে!
কেউ কেউ বলে ধরা পড়েছে, তত্ত্ব-বিজ্ঞানে,
ধ্বংস হলো কত বিশাল অরণ্য।
পশুপক্ষী, কীট, পতঙ্গ, নিরীহ প্রাণী
ও শ্যামল সবুজ বনানী
যারা ছিল অসহায় ও বন্য -
পুড়ে ছারখার হল, পৃথিবীর উষ্ণায়নে।
কোয়ালা, ক্যাঙ্গারুদের বিচিত্র দেশ
অস্ট্রেলিয়া একেবারে হয়ে গেল, পশু শূন্য।
আবার তারপরেই এল প্রবল বৃষ্টি -
বাড়ি, ঘর, শস্য, প্রান্তর সব ভেসে গেল বানে।
আবার ওদিকে ফিলিপাইনের গিরি -
পর্বতের মুখ গহবর গেল খুলে,
শুরু হল হঠাৎ ভীষণ অগ্নুৎপাত।
লোকজন পালাবার পথ পেল না,
ধরণীর বুক চিরে, তপ্ত লাভা-সুপ্তি ভেঙে উঠল জেগে।
গলিত ধাতব ফোয়ারা ছুটল, ভীষণ তীব্র বেগে।
শহর, নগর, জমি উর্বর ভস্য কামান দেগে,
আকাশ বাতাসকে ধূলি ধূসরিত করে দিল,
পরিবেশ বিষাক্ত হল, প্রদূষণের ছোঁয়া লেগে।
মনে হল, প্রকৃতি মা গেছেন যেন
ভীষণ রকম রেগে।
আর আগ্নেয়গিরির কালো জল ধরণীকে
কলুষিত করল সেই ক্রোধের আবেগে।
ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, সুনামি, ঢেউ এসে,
বারে বারে এই রকম ভাবে
এ বারে জগতের ফুসফুস -
"অ্যামাজন" -
যে এতদিন ধরে করে চলেছিল -
অক্সিজেন সরবরাহ আমাদের কে 
নৃসংশ ভাবে কেটে কেটে শেষে,
বৃক্ষ শূন্য করে দিল মানুষ।
ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে নিজেরা
দহন করল বিশাল বিশাল গাছ,
কেননা, সেখানে তারা নগর বানাবে।
নির্বোধের দল শুধু স্বার্থকে ভালোবেসে
চারিদিকে শুধু নিজেদের আস্তানা বানায় -
নিজের সুখের আশে।
পাহাড় কেটে, পাথর এনে, সৌধ বানায়,
মনের উল্লাসে।
নদীর গতি বদলে দেয়, বাঁধ বেঁধে দিয়ে
কত স্রোত ক্ষীণ হয়ে আসে।
জগৎ বাসীর বুক ভরে যায়
রাসায়নিক বিষাক্ত সব গ্যাসে।
বিশ্বসংবাদ পাতায় পাতায় ছাপে,
এমনতর খবর প্রত্যহ,
মুখরোচক করে গল্প শোনায়
নানান ছবি সহ।
কিন্তু আজ আর শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়
কিম্বা মরণের কথা নয়,
সে সবই তো ঈশ্বরের মার,
মানুষ বহন করে চলেছে সেই সব ভার।
সে জানে যতই বাড়ায় ভয়, তবুও 
প্রকৃতি আপনা থেকেই আবার
শান্ত হয়।
নিজের আবর্তনে, বিবর্তনে জলে আগুনে 
খেলা চলে, আসে পরিবর্তন,
আসে প্রলয়, বিনাশ ও ক্ষয়।
কিন্তু তারপরেই সে দেখায় তার নতুন রূপ।
ধারণ করে নব কলেবর,
মানুষের কাছে দেয় নতুন পরিচয়।
সমুদ্রের নিচে থেকে এমনি করেই 
একদিন উঠে আসে হিমালয়।
আবার বৃহৎ কোন অরণ্য 
সাগরে তলিয়ে বিলীন হয়ে যায়।
তাই - আজ
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান মানবজাতি,
তোমার প্রতি এই আবেদন -
এই সতর্কবাণী সোচ্চারিত হয়,
শুধু তোমারই বাঁচার অধিকার নেই এখানে।
অন্য প্রাণীকেও ভালোবেসে,
স্বাচ্ছন্দে জায়গা ছেড়ে দিতে কয়।
মানব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে,
একে অপরকে সহ্য করে -
আনন্দে, সহাবস্থানে দাও আশ্বাস
ও অভয়,
আমরা জানি, 'যে সয় সে রয়'
তাই আজ আর অহংকার ও
ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
জাগুক নতুন অনুভব -
হিংস্র দানবিকতার
হোক চরম পরাজয়।
এবার এসেছে সময়।
আমাদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে 
করো আত্ম বিশ্লেষণ -
হৃদয়ে করো অপরিমেয়
শক্তির সঞ্চয়।
প্রত্যেক নর নারীর মনে হোক সঞ্চার -
গভীর মমত্ব বোধ ও দয়ার।
পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকে রক্ষা করবার 
নিক সে অঙ্গীকার।
প্রতিদিনই তো কতভাবে শুনতে পায় সে
মৃত্যুর হাতছানি,
তাহলে প্রকৃতিকে সবুজ শূন্য করে 
কেন ডেকে আনতে চায় এই
সুন্দর গ্রহের বিনাশ?
তার জীবনে হোক, প্রকাশ
নতুন এক আশার। শুরু হোক,
সবচেয়ে প্রথমে, 'বৃক্ষ রোপন অভিযান'।
মাটির নিচে থেকে উঠে আসুক -
রবিঠাকুরের বর্ণিত - সেই প্রবল প্রাণ।
ধূলিরে ধন্য করে সে মরু বিজয়ের
ওড়াক কেতন।
পৃথিবীর হাওয়া, জল, মাটি হোক শুদ্ধ
আর মানুষের মন কোমল
পবিত্র ও সুমহান,
শোনো শোনো মানব, আকাশে বাতাসে সেই 
আহ্বান - গান।

ধ্যান (Dhyaan)

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঠাকুর তোমার মূর্ত্তিতে আমার শরীর মন
আত্মাকে এক মুখী করে যখন বসে যাই চোখ বুজে,
তোমার ওই চুল, কপাল
সুন্দর স্মিত হাসি -
দুই খোলা ঠোঁটের মাঝে দাঁত
আর তার মধ্যে একটুখানি ফাঁক,
আমাকে তখন কে যেন দেয় ডাক।
শুধু তোমার কথা একাগ্র মনে
ভাবতে আমি ভালোবাসি।
তবে চঞ্চল হৃদয় কখনও কখনও
উন্মনা হয়।
লোহার মত শক্ত সে তাকে কিছুতেই
নোওয়ানো যায় না।
তখন একদৃষ্টে তোমার চোখের
দিকে তাকাই সাহস করে।
দেখি তোমার খোলা চোখ যেন
চুম্বক হয়ে যায়।
আমি তার মধ্যে আটকে থাকি।
তোমার আকর্ষণ আমাকে
নমনীয় রমনীয় করে দেয়।
অন্য চোখের পাতা দুটি
তখন তোমার অর্ধনির্মিলিত।
কারন তুমি ভাবে বিভোর
সমাধিস্থ, পরমাত্মার সঙ্গে লীন।
ধ্যানের মধ্যে তোমার ঐ রূপ
আমাকে স্তব্ধ স্নিগ্ধ ও
মোহিত করে দেয় -
আমি ভুলে যাই, কে আমি,
কথা হতে এসেছি যে।
ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে আসে আমার।
এবার দৃষ্টি নামিয়ে আনি -
তোমার 'গলায়'।
নয়ন মুদে দেখতে পাই সেই
পরম "তীর্থ ক্ষেত্র" কে।
আমাদের মত শত শত
পাপী তাপীর রোগ নিয়ে
বিষ পান করেছিলে তুমি,
জমিয়ে রেখেছিলে নিজের জন্য -
পুঁজ রক্ত ক্যান্সারের কোষে।
তাই তোমায় আমি বলি -
"নীলকণ্ঠ অবতার"।
তোমার অহেতুকী কৃপায়
কত দুঃখী জনকে করলে
পঙ্ক থেকে উদ্ধার।
কত যন্ত্রনা তুমি সহ্য করেছিলে
অক্লেশে -
তারমধ্যেও বলেছিলে কত কথা
হেসে হেসে।
উপদেশ দিতে নয়, ভক্তকে পান
করতে অমৃতের সুধা,
আন্তরিকভাবে আপন পিতার মতন
ভালোবেসে।
চোখ আর একটু নামলে দেখতে পাই
তোমার গলার নিচে উঁচু হয়ে থাকা
হাড়টির ওপরে এসে।
তোমার নরলীলা উপভোগ করতে করতে
নয়নের তারা নেমে আসে -
সুঠাম দুই বহু, কাঁধ ও বক্ষদেশে,
তারপর পেয়ে যায় সেই চরণ কমল দুটি।
সেখানে মাথা ঠেকিয়ে, আমার জন্ম স্বার্থক হয় শেষে।