প্রকৃতির জয়-গান

চন্দনা সেনগুপ্ত

পাত্র-পাত্রী

স্থান: গভীর অরণ্য

সিংহ –       পশু রাজা, ও সিংহী তার পত্নী

বাঘ  –       মন্ত্রী ও বাঘিনী তার পত্নী

ভালুক  –       সেনাপতি

শেয়াল –       গুপ্তচর

হাতি –       প্রান্ত রক্ষক

বানর –       রাজ্ পেয়াদা ২/৪

হনুমান –       বীর সৈনিক ২/৪

পেঁচা, পেঁচী –       জ্ঞানী বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা

ময়ূর, ময়ূরী   –       রাজসভার নর্তক নর্তকী

হরিণ, খরগোশ, ইঁদুর, বেড়াল

সজারু, সাপ, কাঠবেড়ালি, টিয়া

ময়না ও কাঠঠোকরা   –       ক্ষুদ্র প্রাণীর দল

মানুষের দল –       শিকারী ২/৪, কাঠুরে ৩/৪

নাটকের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি

মঞ্চ সজ্জায় – ব্রাউন পেপার ও কার্ডবোর্ড, থার্মোকল দিয়ে তৈরী গাছ, সবুজ পাতার ছাউনি, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী ঘন জঙ্গল।

পিছনে পাহাড় ও নদীর দৃশ্যপট

পশু পাখিদের পোষাক, ল্যাজ, দাঁত, নখ ও শিং বা পাখিদের ডানা বা ময়ূর পেখম (কিন্তু মুখ ঢাকা থাকবে না। মাথায় টুপি পরিয়ে মুখোশ লাগাতে হবে। মুখের অভিনয় expression না দেখতে পেলে দর্শক আনন্দ পাবেন না।)

বাদ্যযন্ত্র – হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, বাঁশী, গীটার বা সিনথেসাইজার ও ঘুঙুর। (প্রথম দৃশ্যে হালকা ভাবে বাজবে। পাখিদের আনন্দের সঙ্গে ময়ূরের নাচে দ্রুতলয়ে ঝংকৃত হবে।)

বানর বা হনুমানের দল লম্ফ ঝম্ফ করে বেড়াবে, প্রথমে তাদের জন্য তবলা ও ড্রাম বাজবে, তারপর হারমোনিয়াম। হিংস্র পশুদের গর্জন, শেয়ালের ডাক, পেঁচার চিৎকার ইত্যাদি হরবোলা দ্বারা প্রয়োগ করলে, জঙ্গলের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

শেষ দৃশ্যে মানুষের আগমন, বাজনার তাল ও সুর পরিবর্তন। শিকারী ও কাঠুরের নিষ্ঠুরতার effect আনবার জন্য জুতোর শব্দ, কাঠ কাটবার কুঠারাঘাত এবং দু একবার বন্দুকের আওয়াজ দিতে হবে।

যুদ্ধের দৃশ্যে রকমারী আলোর খেলা চলবে, দ্রুত লয়ে বাদ্যযন্ত্র ঝংকৃত হবে এবং মানুষ হার স্বীকার করে “পলায়ন পলায়ন” চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যাবার পর হটাৎ সব শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং একটু পরে আনাচে কানাচে সব জায়গা থেকে সব ছোট বড় জন্তুরা একত্রিত হলে সম্পূর্ণ নতুন শুরে হারমোনিয়াম, বাঁশী ও তবলার সঙ্গে কোরাস গানটি গাওয়া হবে।

হাতিকে বেঁধে রাখার শেকলটি কাগজের হবে যাতে ছিঁড়তে সুবিধা হয়।

পোষাক – একদল শিকারী তীর ধনুক বা বর্ষা হাতে (নাগা নাচের মত) শুধু ড্রামের সঙ্গে নাচ করে কিছুক্ষন মঞ্চকে মাতিয়ে দেবে।

তারপরে প্যান্ট কোট, হ্যাট পরে বন্দুক হাতে সাহেবদের মত (পাশ্চ্যাত্য নাচের ভঙ্গিতে) শিকার করবে। সঙ্গে জন্তুদের আর্তনাদ।

চার বছরের শিশু থেকে ১৪ বছরের কিশোর বালক বালিকাদের দ্বারা নাটকটির অভিনয় করা যায়।

একেবারে ছোট শিশুদের খরগোশ, হরিণ, টিয়া, ময়না, সজারু, কাঠবিড়ালি বা বাঘ সিংহের বাচ্চা সাজানো হবে। প্রত্যেকে যেন ২/৪ লাইন করে কথা বলতে পারে – আদো আদো স্বরে। যুদ্দের দৃশ্যের বড় অভিনেতারা অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের (৮ থেকে ১২) এর বালক বালিকারা  ছোট পশু পাখিদের লক্ষ্য রাখবে এবং বাঘ, ভাল্লুক, হাতি ও সিংহ একটু বড় বাচ্চারা ১৩/১৪ সাজলে অভিনয় শেখাতে সুবিধা হবে।

বিদ্যালয়ে বা পুজো প্যান্ডেলে এই নাটকটি মঞ্চস্থ করবার সময় বাচ্চা বেশি এসে গেলে জানোয়ারের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ইঁদুর, শুয়োর, নেকড়ে, ছানারা পাখিদের সঙ্গে বাজনার তালে তালে হাত পা দুলিয়ে নাচ করতে পারে প্রথম দৃশ্যে তারপর ৮ থেকে ১৪ বছরের ছেলে মেয়েরা অভিনয় করবে। তাদের মুখে বিভিন্ন জেলার ভাষা বা উচ্চারণ পদ্ধতি দিয়ে দর্শককে আনন্দ দান করতে হবে। বাঁদরদের গা চুলকানো বা উকুন বাছার অভিনয়, ডিগবাজি খাওয়া, দাঁত খিঁচুনি – সব মিলিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করতে হবে।

আলো – প্রথমে আলো আঁধারি, পরে আস্তে আস্তে আলো বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা বাড়ানো হবে। মঞ্চে যে যখন কথা বলবে তার মুখে স্পট আলো ফেলা দরকার।

মাইক – গাছের ফাঁকে, অভিনেতার বুকে অথবা খুব নিচুতে ঝোলাতে হবে।

অভিনেতা চয়ন – অভিনেতা চয়ন খুব সচেতনভাবে করা প্রয়োজন। বাচ্চাদের চেহারা, চোখের চাহনি, নাচ বা অভিনয়ের পারদর্শিতা অনুযায়ী পার্ট দিতে হবে। মোটা সোটা ছেলে বা মেয়ে না পেলে বনরক্ষক হাতির অভিনয়ে একটু স্বাস্থবান বড় (১৫/১৬) ছেলে বা মেয়ে নেওয়া যেতে পারে।

নাটকটি শিশুদের জন্য লেখা হলেও এর মূল বক্তব্য – Conservation of forest and wild life

মূল বক্তব্য

স্বার্থপর “মানুষ” যেন ভুলে না যায় যে এই পৃথিবীটা “তার” একার নয়, গাছপালা, পশু-পাখি সবাইকেই বাঁচার অধিকার দিতে হবে।

প্রথম দৃশ্য

(গভীর জঙ্গলে প্রথমে কিছুক্ষন বাঘ সিংহের গর্জন, হায়নার হাঁসি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাবে, টুনি বাল্ব দিয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি পোকার জ্বলা ও নেভা। প্রথমে সিংহ ও পরে বাঘ এবং ভালুকের প্রবেশ।)

সিংহ – আমি পশুর রাজা, সবাইকে দিই সাজা, জন্তুগুলো পালায় কোথা? রক্ত খাবো তাজা।

বাঘ – হালুম হুলুম হালুম ! ওরে বাবারে গেলুম, জঙ্গল সব খালি হ’ল, খিদের জ্বালায় মলুম।

ভালুক – নমস্কার ! নমস্কার রাজামশাই, প্রাণটা করে আই ঢাই, হেথায় হোথায় ঘুরছি মরে, খাবার জিনিস কোথায় পাই?

(সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নি তাদের বাচ্চা ছানা পোনা নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবেন)

সিংহী – শিকার শিকার করছো ক্যানো, ছোট পশু যে হলো হাওয়া, গহন বনের আঁধার কোথায়, করবো যে আজ ওদের ধাওয়া !

বাঘিনী – সত্যি রে ভাই রানী দিদি, বাচ্চাদেরকে খাওয়াবো কি, উপোস করেই মরতে হবে, সর্বনাশ যে হল, দেখি !

সিংহী – গর্ত, গুহা নদীর বাঁকে, ছিল শাখে, পাতার ফাঁকে – চাঁদের আলোয় লুকোচুরি, ছানা পোনা লাফিয়ে গিয়ে – আসতো মুখে শিকার নিয়ে, করতো কতই বাহাদুরী।

ভালুক গিন্নি – সে সব কথা জাগায় ব্যাথা, মৌচাক সব হেথা হোথা, ঝরতো মধু সদায় সেথা; আজ সেই সব শাল কি সেগুন, ফোটায় না ফুল কোনো ফাগুন, শুনতে না পাই মৌমাছিদের, সেই সুমধুর গান গুনগুন।

বাঘ – হালুম হুলুম হুল, ভেবে না পাই কুল ! সিংহমশাই বিহিত করুন হচ্ছে কিসে ভুল?

সিংহ – আরে ভাইয়া কি যে হল, বিপদ বড়ই ঘনিয়ে এলো, জঙ্গল আর রইল না যে জন্তুরা সব হারিয়ে গেলো?

বাঘ – এখন বলুন উপায়টা কি? শেয়ালটাকে ডাকুন দেখি, গ্রাম শহরে খবর নিতে – আজকাল সে দিচ্ছে ফাঁকি।

ভালুক – শেয়াল মোদের গুপ্তচর – বনের ধারেই তার যে ঘর – পাণ্ড্যিত্ব দেখায় তো খুব এখন একটু কাজ তো কর।

গাছের ওপর একদল বাঁদরের আগমন তাদের কিচির মিচির আওয়াজে সবাই ওপরে তাকায়, সিংহী, বাঘিনী ও ভালুক গিন্নিরা – স্টেজের একদিকে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল – সিংহী এগিয়ে আসে –

সিংহী – চল চল সব ওদের পানে – লুকিয়ে পড়ি ঐ ওখানে – একটা বাঁদর ধরে খাই, বাচ্চাগুলোর প্রাণ বাঁচাই।

সিংহ (রাগত স্বরে) – আহা গিন্নি যাও বাড়ি যাও, পোকা মাকড় যা পাও খাওয়াও, এখন ওদের বড় দরকার ব্যাপারটা কি সেটা জানবার।

বাঘ – (মন্ত্রী) ওরে বাঁদর, হনু, বেবুন – একটুখানি এধারে শুন – শেয়ালটাকে আনতো ধরে, মেরেই ওকে করবো খুন।

বাঁদর – রাজামশাই, মন্ত্রীদাদা – আপনারা তো বড্ড হাঁদা – শেয়ালটাকে কোথায় পাবো? ওতো এখন ঘুমিয়ে কাদা।

ভালুক – মুখপোড়া তুই বলিস কিরে? থাকবে ওরা ঘুমের ঘোরে? বনের পশু যাচ্ছে মরে, সে কথা কি জানে না রে?

বাঘ – আগে মোরা সন্ধ্যাবেলা করতে যেতুম শিকার খেলা শেয়ালেরা গান শুনিয়ে, খুলতো মোদের কানের তালা। সিংহ বইতো কত গানের ভেলা, শুনতে পেতুম যাত্রা পালা।

ভালুক – সত্যি ভায়া যা বলেছো, ছিল বড়ই সুখের দিন, – চাঁদের আলো হলেই ক্ষীণ হরিণ, চিতল, বুনো শুয়োর নাচতো কেমন তা ধিন ধিন।

বাঘ, ভালুক, সিংহ (তিনজনে একসঙ্গে সুর করে) – আহা সে কি সুখের দিন, সন্ধ্যে হলেই ঝিঁ ঝিঁর বীন, – বাদল হলেই নাচতো ময়ূর – পেখম তুলে তা থৈ তিন।

সিংহী – বনরক্ষক হাতিরা সব শুঁড় দুলিয়ে কোথায় যায়? নেকড়ে শেয়াল ‘রা’ কাড়ে না, কেন এমন পালিয়ে বেড়ায়?

বাঘিনী – রাজপেয়াদা বানরগুলো, করছে দেখো ফোক্কড়ি, (সুর টেনে) ঘোর – “কলি যুগ” এলো বুঝি ওমা মোরা কি যে করি !

বাঘ (রাগত স্বরে) – বেগম, তুমি চুপ করবে? নাকে কান্না বন্ধ হবে? চলুন রাজা নদীর ধার, সাঁতার কেটে যায় উস পার, এই জঙ্গলটা হলো খালি, চারি ধারে ধুলো বালি।

সিংহী – তাই চলো ভাই, আমরা সবাই, পূর্ব হতে পশ্চিমে যাই, ভেবে ভেবে কূল নাহি পাই, কেন কাল কাটাই?

ভালুক (বিজ্ঞের মতন মাথা নেড়ে নেড়ে) – ওপারটারে দূরের থেকে, দেখতে কিন্তু লাগে ভালো, কাছে গিয়ে দেখবে শুধু, শহর বাজার আগুন আলো।

সবাই মিলে (হিংস্র পশুরা সবাই চলে যায়) – তবু চলো, দেখি চলো, . . . .হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই তাই চলো যাই।

বাঁদরদল (ওপর থেকে বাঁদরেরা ইয়ার্কির সুরে) – শ্যামল সবুজ নেইকো কোথাও, গাছপালা উদাও হল, নীল আকাশে ধোঁয়া কালো, ঘাস হীন মাঠ শুকনো ধুলো।       

হনুমানেরা – গাছের ফলে পেট ভরে না, তাই চলে যাই তীর্থস্থান, গণেশজীকে দুধ খাওয়াতে, ভক্ত মানুষ করছে গান। মোদের নামে ঠাকুর বানায়, লাড্ডু বোঁদে নিজেরা খায়, কদলী কি গাজর মুলী, ভুলেও কভু করে না দান।

একটা ছোট বাঁদর – ক্যামনে বাঁচে আমাগো জান, কি খায় বলো পোলা পান?

খালি স্টেজে এবার ধীরে ধীরে বাঁদরদের সঙ্গে অন্য ছোট পশুদের আগমন হয়। একধারে ময়ূর, হরিণ, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীদের প্রবেশ। প্রথমে ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক উঁকি মারে এবং তারপর সবাই গোল হয়ে দাঁড়ায়। বাজনা বাজতে থাকে তালে তালে সবাই দুলে দুলে গান গায়। মেঘ ডাকে মাঝখানে ময়ূরের নাচ শুরু হয়।

গান (লোকগীতির সুরে – ত্রি-তাল)

আমরা ছোটো জন্তু ভাই, –

এসো সবাই নাচি গাই,

বাঘ সিংহ পালিয়ে গেল,

আর তো কোনো চিন্তা নাই।

(খোল মৃদঙ্গ বাজবে)

ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই ধপ্পড়, ধাঁই –

এসো ঠুংরি টপ্পা গাই,

হিংস্র পশু ওপার গেছে –

আমরা সবাই নাচি তাই।

নাচের তাল – তা থৈ থেই তাৎ,

আ থৈ থই তাত –

তিক দা তিকি তিকি তেই,

(কত্থকের তালে নৃত্য ৫ মিনিট)

(তারপর ভরত নাট্যমের তালে)

তই অম তাত্ তা, তই অম তা –

আ বৃষ্টি ঝেঁপে আ

মেঘ দেখে মন নাচেরে গা –

আয়রে তোরা তাল মেলা।

(প্রথমে মিউজিক দ্রুত হয় তারপর ধীরে ধীরে আওয়াজ প্রায় থেমে আসে, নাচ থেমে যায়।) স্টেজের দু দিক দিয়ে দুটি খরগোশ ছুটে আসে। সব পশুপাখি তখন পিছনে সেমি সার্কেলে দাঁড়িয়ে পড়ে।

খরগোশ (হাঁপাতে হাঁপাতে) – ও ভাই তোমরা নাচছো ক্যানো? সামনে বিপদ আসছে জেনো, খুশির সব ভুলে যাও, মোদের কথা একটু শোনো।

হরিণ, ইঁদুর – কেন কেন ব্যাপার কিরে? বাঘ ভাল্লুক আসছে ফিরে?

সবাই মিলে – সিংহ রাজাও আসছে বুঝি? গেলো তো সব নদীর পারে।

খরগোশ – না গো দাদা জন্তু নয়, ওদের দেখে লাগছে যে ভয়, নল – বন্দুক, ঘাড়ে নিয়ে, দুই পায়ে তো দাঁড়িয়ে রয়।

ময়ূর – ও মা গো মা, “মানুষ” ওরা, মহা পাঁজী হতচ্ছাড়া, ল্যাজ ধরে সব টানবে মোদের, সুযোগ পেলেই পাগল পারা।

ছোট্ট বাঁদর (সামনে এগিয়ে এসে) – শহর গঞ্জে গ্রামে থাকে, কাপড় দিয়ে দেহ ঢাকে, দয়া মায়া নেইকো মোটে, মানুষ নামে ওদের ডাকে।

(পাখিরা ভয় পেয়ে পেঁচা পেঁচীকে আওয়াজ করে জাগায়) ওপর দিকে তাকিয়ে –

টিয়া, ময়না – পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি, তাড়াতাড়ি নিচে আয়, সংকট আজ বড় মোদের, মানুষ বুঝি এসেই যায়।

পেঁচা (পেঁচা-পেঁচী গাছের থেকে নিচে নামে)       – নাতি নাতনিরা ক্যান চেঁচাস? কারণ বিনাই মাথা যে খাস ! কি হইস্যে বল তোদের? বনে আগুন লাগল কি ফের?    

ছোট্ট পাখি (সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে) – কিচিরমিচির ট্যাঁ ঠ্যাঁ, হর্ন বাজছে প্যাঁ প্যাঁ, ঢুকছে গাড়ি মানুষ নিয়ে এবারে কি হবে এ্যা এ্যা…..

বড় পাখি (বড় পাখিরাও কান্নার সুরে) – এ্যা এ্যা এ্যা এ্যা,  ভরবে খাঁচায় মোদের ছানা, কাটবে বড় পাখির ডানা, রাত দুপুরে ওদের হানা – কেমন করে করবো মানা, ঘৃণ্য যে কাজ ছ্যা ছ্যা ছ্যা মরতে হবে এবার তবে এ্যা এ্যা এ্য।

খরগোশ – মানুষেরা এলো বনে, জানোয়ারকে মারতে – চামড়া খুলে, মাংস খাবে, পারবে না কেউ বাঁচাতে।

পেঁচা – আগে ওরা আসতো শুধুই – করতে শিকার খেলা, এখন আসে অস্ত্র হাতে কাটতে যে গাছপালা।

বানর – ও মা – সে কি ! গাছ কাটবে? লাগবে ওদের কত ব্যাথা !

পাখিরা সবাই – ভাঙবে বাসা, টুটবে আশা, ডিম্ আমরা পারবো কোথা?

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে) – বাঘ, ভাল্লুক তো অনেক ভালো, খিদে পেলে তবেই খায়। ঘর পরিবার শেষ করে দেয় ! এরা যে মোদের মেরে মজা পায় !

হনুমান (বৃদ্ধ হনুমানের গম্ভীর আওয়াজে কটূক্তি – ক্রোধিত স্বরে) – এরা কি শুধুই পশু মারে? ভীষণ নিঠুর কুটিল প্রাণী, ভাই ভাইকে হত্যা করে – নিত্য এদের হানা-হানি। জায়গা জমি, টাকার তরে – আগুন লাগায় স্বজন ঘরে – ধর্ম নামের দোহায় দিয়ে – রক্ত ঝরায় নিজেও মরে।

(সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে উদাস হয়ে)

ছোট্ট ইঁদুর একবার ছুটে এদিকে একবার ওদিক করে দর্শকদের জানায় –

ইঁদুর – এক্ষুনি ভাই দেখে এলাম, আজব ব্যাপার খানা, – হাতি মামা বইছে মানুষ – করছে নাতো মানা। কাঠ কেটে সব মোট বেঁধেছে, পিঠে কাঠের বোঝা ঠাসা, বনরক্ষক ওদের চাকর, ওকে মানিয়েছে বেশ খাসা।

ময়না, টিয়া – দেখেছিলাম মোরাও সেদিন, ওদের যাওয়া আসা, বসিয়ে পিঠে জন্তু মানুষ, হাতির ভালোবাসা।

পেঁচা – দিনের বেলা চক্ষে কানা, এসব কথা নেই তো জানা, বুঝতে হবে ব্যাপারখানা, করছে না “সে” কেন মানা?

বাঁদর – হ্যাঁ ভাই চলো, করি গো খোঁজ, হাতি কেন ওঠাচ্ছে বোঝ।

হনুমান – সিংহ রাজায় খবর দে – সময় যে নাই, করতে মৌজ।

ময়ূর – হ্যাঁ ভাই সবাই, তাই চলো, এই খবরটা ওদের বলো – বনবাসী যে মোরা তাই – সবার বিপদ ঘনিয়ে এলো।

সবাই – আমরা যত পশু-পাখী ছোট বড় প্রাণী, বনের মধ্যে মিলে মিশে থাকতে সবাই জানি। হিংশ্র জন্তু, বিরাট ভীষণ – বাঘ সিংহ কাঁপায় যে বন, মোদের ওরা ভক্ষক হন, তবু ওদের “গুরু” মানি।

(সব পশুরা লাইন করে মঞ্চের এক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় আবার অন্য দিক দিয়ে প্রবেশ করে। মঞ্চ কয়েক মিনিটের জন্য অন্ধকার হয় এবং সেই সময় একটি বড় সাপ গাছ থেকে ঝুলে পড়ে – মুখে স্পট লাইট দেওয়া হয়। নেপথ্যে গান। গানের সুরে – “মন ডোলে মেরা তন্ ডোলে” হিন্দি গানের সুরেও গাওয়া যেতে পারে।)

সাপ – কোথা যাবি ভাই সব, বন কোথা পাবি রে? মানুষের জঙ্গলে পিষে মরে যাবি রে। মোরা এতো বিষধর, তবু নেই ভয় ডর, দেখলেই লাঠি মারে কেন এই অনাদর?

(সাপুড়ের বাঁশি ও বাজনা বাজবে, দুই হাত মাথার ওপর ফনার মতন তুলে মঞ্চে শুয়ে বসে মাথা দুলিয়ে সাপের নৃত্য চলবে দু মিনিট তারপর প্রস্থান এরপর বন বিড়ালী ও নেকড়ের প্রবেশ গালে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে বসা। ধীরে ধীরে পশুদের প্রবেশ – খরগোশ, হরিণ ও বাঁদর বনবিড়ালীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করে –

বাঁদর – বন বিড়ালী, বিল্লী মাসি একলা ক্যানো আছো বসি?

খরগোশ – উদাস বড় লাগছে তোমায়, কোথায় গেল মুখের হাসি?

বিল্লী – আমাদের মেরে ফেলে, লোম চামড়া নিচ্ছে খুলে থাকবো না আর এই বনেতে, মনের দুঃখে যাচ্ছি চলে।

নেকড়ে – মোদের লোমে পড়ে জামা, জুতো টুপি দস্তানা, মারলো মানুষ আমার মিত্র, কোথায় যে যাই? নেই ঠিকানা। গুন্ডা ওরা, ঘোরায় ছোড়া মাস্তানদের মস্তানা। ভবিষ্যৎ কি নেই জানা?

খরগোশ – মোদের সঙ্গে চলুন মশাই, রাজ দরবার যাচ্ছি সবাই, তাঁরা সতেজ বলশালী তাই, বিহিত একটা হবেই ভাই।

সবাই প্রস্থান করতে করতে – এসো মোরা আজ সব, করি কিছু অভিনব। কোরো না গো কলরব, দুঃখ হোক অনুভব।

(খালি মঞ্চে শুধু কটি গাছ। ভোরের আলো ফুটলে কয়েকটি মৌমাছি এবং প্রজাপতির আগমন)

মৌমাছি – প্রজাপতি, প্রজাপতি, কেন তোর দ্রুতগতি? দাঁড়া নারে একটুখানি, ফুলে ফুলে উড়ে যাবো, দুজনাতে মধু খাবো, বাগানের মোরা যে রানী।

প্রজাপতি – মৌচাকে ঢিল পড়লো এবার, মোম, মধু সব নিলো চোরে – মৌমাছি তুই এখনো ভাই, আছিস কেন ঘুমের ঘোরে?

মৌমাছি – করছে যারা সর্বনাশ, বল না কোথায় তাদের বাস? হুল ফুটিয়ে কুপোকাৎ, করবো আমি বাজি মাৎ।

প্রজাপতি – চল তবে দলে দলে, পশু সব যেথা চলে, গাছহীন শ্মশানে, মানুষের বনে বনে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

(দিনের আলো – বনের খোলা চত্বর – গাছ-পালা দূরে সরিয়ে মঞ্চে একদিকে ছোট পশুদের বসার জায়গা অন্যদিকে একটি উঁচু পাথরের ওপর রাজার সিংহাসন, ফুল পাতায় সাজানো, তারপাশে মন্ত্রী বাঘমশাই ও সেনাপতি ভালুক দাঁড়িয়ে আছে।)

বাঘ – হুঁ, তাহলে দেখি ব্যাপার স্যাপার বড়ই গুরুতর সবাই মিলে একসঙ্গে, বসে কিছু উপায় করো।

ভালুক – বন কেটে আজ মানুষ জাতি, বানিয়ে নিল শহর ঘর, বৃষ্টি বন্ধ, মাটি ফাটে, আসছে শুধুই ধুলোর ঝড়। পাহাড় মাথায় পাথর শুধু, মাঠের ওপার মরু ধু ধু – মৌচাকেতে নেইকো মধু, কী হবে এরপর?

হনুমান – তাই তো মোরা হেথায় এনু, দেখে শুনে ভয় যে পেনু, আমি এতো মোটা হনু, মানুষগুলো শীর্ণ তনু – তবু ওদের বন্দুক যে বাড়িয়ে দিল, মনের ডর।

খরগোশ – ঝোপ ঝাড় নেই  নদীর পাশেই, দালান বাড়ি গ্রাম শহর, ঝর্ণাগুলোও শুকিয়ে গেল, জল পাওয়া যে হয় দুষ্কর।

(সিংহের প্রবেশ – সবাই উঠে দাঁড়াল, ছোটরা রাজার পায়ে পড়ে গেল)

একসঙ্গে (হৈ চৈ হট্টগোল) – প্রণাম, প্রণাম, জয় মহারাজ, আমাদেরকে বাঁচাও হে আজ, ছোট্ট মোরা নিরীহ যে, বন বাঁচাতে দাও তবু কাজ।

সিংহ – আরে আরে থামো সব। কেন করো কলরব? দুঃখ কি বল তোমরা, করি আমি অনুভব।

(ছুটতে ছুটতে শেয়ালের প্রবেশ, সবাইকে একসঙ্গে দেখে ঘাবড়ে যায়, মঞ্চের সামনে এসে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে। শেয়ালের ডাক হুয়া হুয়া হুক্কা হুয়া)

শেয়াল – (তারপর রাজার দিকে ফিরে) একী দৃশ্য অভিনব! বড় ছোট এক হলো সব, কিসের তরে এ উৎসব – করেন রাজা সভা? ডেকে পাঠান আমায় কেন, বিপদ আভাস পেল যেন, বনের প্রান্তে লাগলো আগুন, আকাশে লাল আভা। এই যে হুজুর সেলাম সেলাম ! একটু আগেই খবর পেলাম, আপনি আমায় তলব দেছেন, তাইতো ছুটে এলাম।

সিংহ (রাগতভাবে) – গর্ত্তে কেন সেঁধিয়ে থাকো? শত্রুদের কি খবর রাখো? জানোয়ারদের বিপদ কত, সে কথাটি জানো না কো?

বাঘ – গুপ্তচর যে পশুর তুমি, ছাড়লে কেন বনের ভূমি? গানের রেওয়াজ করছো না আর বানলে চেলা জানি না কার? ভুললে কি ভাই সবুজ বনের, কোমল নরম জমি? জানো না কি এ অরণ্য আজকে কত দামি!

শেয়াল – মন্ত্রী, রাজা কোরো না রোষ – বিচার করো দিও না দোষ। যেথায় সেথায় মরি ঘুরে, মানুষ সদাই তাড়াকরে কুকুর ভয়ে লুকিয়ে থাকি – বাচ্চা কাচ্চা গেল, মরে। দুঃখ জানাই কেমন করে? করছি শুধু আফশোষ। সিংহ রাজা ক্ষমা করো, রেখো না হে আক্রোশ।

(খরগোশ হঠাৎ আবেগ প্রবন স্বরে রাজার সামনে লুটোপুটি খায়)

খরগোশ – রাজামশাই মোদের কে খাও, তুমি তোমার জোর বাড়াও তারপরেতে ঝাঁপিয়ে পড়ো মানুষগুলো তাড়িয়ে দাও।

হরিণ – হ্যাঁ মহারাজ আমাকে খাও, বাচ্চাদের তো তুমি বাঁচাও।

পাখী – ডিমগুলো তো ফুটতে দাও, কাঠুরেকে মেরে খাও।

পেঁচা – গাছপালা সব সাবাড় হলে, ঘর বংশ থাকবে না তাও।

ভালুক – আগে চলো হাতির কাছে, দেখি কি যে উপায় আছে! বিশাল দেহের শক্তি কেন, ক্ষয় করে সে মানুষ পিছে।

বাঘ – হাতি মোদের বন রক্ষক, এমন শক্তিশালী তাকেও ওরা বশ করেছে, বোঝা সে বয় খালি।

সিংহ – মানব জন্তু এই পৃথিবীর, সবচেয়ে অধিক বুদ্ধিমান, অস্ত্র হতে ক্যামনে আমি, বাঁচাই তোদের কোমল জান?

হনুমান – হে মা তুমি বনদেবী, রাখো সকল পশুর মান। সবাই মিলে একসঙ্গে, যুদ্ধ করে বাঁচাবো প্রাণ।

সবাই একসঙ্গে – চলো সবাই মিছিল করে, প্রথমে যাই হাতির কাছে, নখ, দাঁত, শিং বাগিয়ে ধর – যার যা কিছু অস্ত্র আছে।

(পশু-পাখী চলে গেছে এবার গাছপালার গান ধরে। শারীরিক বেশি স্বাস্থবান শিশু বা যে কোনো কারণে যারা মঞ্চে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের এই সব গাছ পালার অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। গানের সুরে – রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদী বা দিজেন্দ্রগীতি। শ্যামাসংগীতের সুরেও হতে পারে।)

বড় গাছ – কী আনন্দ কী আনন্দ, উঠল জেগে, আমার মন, পশু-পাখী জানোয়ার, হ’ল সব সচেতন। আমরা যত গাছ-পালা, হলাম বড় আজ উতলা, দাঁড়িয়ে থাকি – আঁকড়ে মাটি, মনের কথা হয় না বলা।

ছোট গাছ – কাটছে মানুষ সারাক্ষন, কাঠের লোভে অরণ্য বন, এই প্রকৃতি সদায় ভোলা, জানে না কে আপনজন।

বড় গাছ – মূক করেছেন. ভগবান, দেছেন, অসীম শক্তি দান, ভুলেই গেছে মানব বুঝি – মোদের বুকেও আছে যে প্রাণ। আমরা যে দিই শুদ্ধ হাওয়া – অক্সিজেনে ভরা, আমরা করি শ্যামল কোমল, স্নিগ্ধ সবুজ ধরা। ইচ্ছে করে এ ডাল দিয়ে, আঘাত হানি জোরে। পশু-পাখীর সঙ্গে গিয়ে শেষ করি শত্রুরে। মা, মা গো মা গো বিনাশ হতে বাঁচাও তুমি – রক্ষা করো মোদের সবারে।

সবাই একসঙ্গে – বাঁচাও অরণ্যেরে।

তৃতীয় দৃশ্য

(হাতি বনের এক প্রান্তে শেকল দিয়ে বাঁধা আছে এবং বার বার শুঁড় দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে তার দুঃখ ব্যক্ত করে। করুন বাঁশির সুর আবহ সংগীতে)

হাতি (মোটা গলায় গান) – হে ভগবান রাজার রাজা, আমাকে দাও এ কোন সাজা? মানব ছিল, তোমার প্রজা, আজ ধরণী রাজ করে – নিষ্ঠূর সে, অবুঝ প্রাণী, পশুর পরে আঘাত হানি, বনের থেকে আনলো টানি – বশ করে বা চাবুক মেরে।

(বাঘ সিংহের প্রবেশ)

সিংহ – নমস্কার নমস্কার হাতি মামা, এ কী হল তোমার হাল? চোখের জলে শুঁড় ভেসে যায় – কোথায় গেল মত্ত চাল?

হাতি – কী আর তোদের বলবো রে হায় – কেমনভাবে দিন কেটে যায়, সারা দেহে মারের আঘাত – মরছি আমি যন্ত্রনায়।

পাখীর দল-পেঁচা – তাইতো আহা হাতি দাদা, তোমা গো এই দশা! দুঃখ মোদের রাখমু কোথা? পায় না খুঁজে ভাষা।

হাতি – দেখো, আমার পায়ে শেকল, শরীরে নাই আর কোনো বল, কাঠের বোঝা চাপিয়ে পিঠে – পাচ্ছে মজা মানুষ দল।

ভালুক – আমরা তোমার সমব্যাথী, তাই তো সবাই হলাম সাথী, মুক্ত করবো যেমন করেই হোক, তারপরেতে কাল প্রভাতে বনের পশু সব একসাথে, মারবো যত কুটিল বোকা লোক।

বাঘ – বেকার কথাই সময় কাবার – রাজা, আপনি আদেশ করুন, শিকারী ও কাঠুরে কে জব্দ করবো, কখন বলুন?

সিংহ – আগে এস সবাই মিলে, হাতি মামাকে দিই খুলে, তারপর প্রস্তুত হও, যার আছে যা অস্ত্র লও।

(সেনাপতি ও মন্ত্রী একসঙ্গে আদেশ দেয় – মার্চের সুরে বাজনা বাজবে চল-চল-চল গান। সাবধান, বিশ্রাম। সাবধান, আগুয়ান। সবাই লাইন করে দাঁড়ায় এবং বাজনার তালে তালে শেকল খোলা হয়।)

বাঘ, সিংহ – জোর লাগাকে

ছোট পশুর দল – হেঁ-ই-সা

বড়রা – শেকল হোক না

ছোটরা – ক্যায়সা

বড় – হাতি মামাকে

ছোট – মুক্ত কর

বড় ও ছোটরা মিলে – আগে ছিল জ্যায়সা। হেঁ-ই-ও মারো হেঁ-ই-সা, জোর লাগাকে হেঁ-ই-সা…)

(হাতি মুক্ত হয়ে যায়। পশুরা সবাই আনন্দে হাততালি দেয়। এবারে সবাই সিরিয়াস হয়ে দাঁড়ায়।)

সিংহ – সেনাপতি ভালু দাদা – কোথায় গেল রাজ পেয়াদা?

বাঁদর – (স্যালুট করে পা ঠুকে আগে এসে দাঁড়ায়) পশুদের মর্যাদা রাখবো যে মোরা সদা।

(বাজনা দ্রুত হয় এবং জন্তুরাও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়)

হাতি – বড় বড় দাঁতগুলো ভগবান যদি দিল, কেন তারে রাখি শুধু সাজিয়ে, শত্রু যে দিনে দিনে আমাদের নিল কিনে, আজ দেব তার ভুঁড়ি ফাটিয়ে।

হরিণ – সুন্দর দাঁত মোর চোখে যেন লাগে ঘোর, কাজে কেন এতদিন লাগেনি? নিজ মনে করি বাস, খাই লতা পাতা ঘাস, রাগ দ্বেষ মনে কভু জাগেনি, এই শিঙে দেব ধার, তেড়ে যাব বার বার – থেমে যাবে মানুষের বকুনি।

বাঘ – গদা সম থাবা মম হবে তার যম রে – শিকারীকে চিৎপাত, করে নেবো দম হে।

একসঙ্গে – শিঙ সব করি ধার –

তিনজনে – দাঁত সাজিয়ে রাখবো না আর,

বাঁদর – মল্ল যুদ্ধ করব আমি, মাথায় চাঁটি মারবো কার?

বাঘ – দয়া মায়া করব না রে, ঘাড় মটকে দেব এবার।

পেঁচা – ঠোকর খেয়ে মানবে হার,

পেঁচী – যমের দুয়ার হবে যে পার।

(বাঁদর, হনু জুডো ক্যারাটের ভঙ্গি করে সবাই খুব এক্সসাইটেড হয়ে ওঠে)

হরিণ – বোকা ভাবে আমাদের? গুঁতো খেলে পাবে টের।

বন বিড়ালী – নখ দিয়ে আঁচড়াবো, তেজ দেখো নখুনের।

সাপ – দংশনে যাবি জ্বলে, বিষ তাতে দেব গুলে, বিদ্রোহী হবি আয়, ভালো কথা যা রে ভুলে।

সিংহ – জিতে যায় ওরা সদা, বুদ্ধি ও ছলে বলে, মোরা যদি এক হই – লড়ে যাই কৌশলে – দুর্ব্বল মানুষের তাহলে কি আর চলে? আলোড়ন আজ তুলে, পশু চলে দলে দলে।

হাতি – ছোট বড় সক্কলে, যদি এক জোট হলে তাড়াতাড়ি চলো – তবে, হেরে যাবো দেরী হলে।

(বড় পশুরা পিছিয়ে যায় ছোটদের দল এগিয়ে আসে)

খরগোশ – সজারুর এই কাঁটাগুলো, ফুটিয়ে দেব ওদের পায়ে,

বাঁদর – ল্যাজ দিয়ে  আজ জোরে জোরে, মারবো ঝাপট সারা গায়ে।\

পেঁচা – চাঁচা ঠোঁটে ফুটো করি, টাক – মাথা – তালু আয়,

হরিণ – অক্কা পাবে শিকারী দল, করবে মানুষ হায় হায়।

ভালুক – চুপ চুপ কথা নয়, আসছে যেন কারা, লুকিয়ে পড়ো ঝোপে ঝাড়ে, ডাকলে দিও সাড়া।

(কেউ কেউ তখুনি গা ঢাকা দেয়, কেউ বা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে জায়গা খোঁজে)

খরগোশ – সেনাপতি বললেন লুকিয়ে পড়ো, ঐ গাছটাতে তোমরা চড়ো।

বাঁদর – চুপ চুপ একদম কেউ না ন’ড়ো, বুঝে সুঝে কাজ করো, বিপদ যে বড়ো

(মঞ্চ অন্ধকার, শুধু টুনি বাল্ব দিয়ে পশুদের চোখ জ্বলবে নিভবে। তার মধ্যে গলা শোনা যাবে -)

শেয়াল – মানুষগুলো রাতকানা ভাই, গাঢ় আঁধার হলে কালো, দেখতে পায় না মোদের মতন, নেইতো ওদের চোখের আলো।

সিংহ – করো নাকো ফিস ফাস, ধীরে ধীরে নাও শ্বাস, শত্রু যে বুঝে যাবে, পশুদের কোথা বাস। অতি চালু জেনো ওরা, দিও না হে অবকাশ, গুলি গোলা ছুঁড়ে দিলে, সাঙ্গ যে হবে আশ।

(মঞ্চ নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়)

ছোট্ট একটা পাখী – আমার বড় ভয় করছে, আমি যে রাত কানা। পেঁচা দাদা, পেঁচী দিদি কোথায় তোমার ডানা?

পেঁচা – চুপ চাপ সরে আয়, ডাকা ডাকি করো না, শোনা যায় শব্দ যে, মানুষের আনা গোনা।

চতুর্থ দৃশ্য

(জানোয়ারের দল মঞ্চে নেই, বন্দুক ও কুঠার হাতে শিকারী ও কাঠুরিয়াদের দল)

গান

কাঠুরে – এসেছি আজ কুঠার হাতে, পড়েছি এই সাজ, গাছ কাটবো, বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ।

শিকারী – জঙ্গলের এই পশুগুলি – মরবে সবাই খেয়ে গুলি – মানুষ জাতিই করবে শুধু, এই জগতে রাজ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মোদের কাজ)

দু দল – প্রাণী মারতে, ডাল কাটতে – নেই কো মোদের লাজ, শক্তিশালী, আমরা যে তাই, বাঁচবো শুধু আজ, মানুষ জাতির জয়ের ধ্বজা – উড়বে জগৎ মাঝ।

(গাছ কাটবো বন ভাঙবো – এটাই মুখ্য কাজ।)

(তালে তালে নৃত্য, বাজনার তাল দ্রুত। গাছ কাটবার আওয়াজও শোনা যাবে। সবাই অর্ধ গোলাকারে দাঁড়াবে, এক একজন আগে এগিয়ে এসে কথা বলবে।)

প্রথম শিকারী – রাত্রি বেলা আমরা আসি, মারতে পশু ভালোবাসি, নিরীহ বা হিংস্র সবই – অস্ত্র দিয়ে আজ বিনাশী।

দ্বিতীয় শিকারী – আহম্মক সব বৈজ্ঞানিক, যতই মোদের জ্ঞান ট্যান দিক – উড়িয়ে যে দিই, আমরা হাসি। চামড়া, শিঙ আর লোম, দাঁত, নখ বিক্রি করে হিসেব কষি।

তৃতীয় জন – সবচেয়ে বড় অর্থ বল, বনছে নতুন যাঁতার কল, তাই এসেছি এই জঙ্গল – ধরতে জন্তু আজ সবল, চিড়িয়াঘর কি সার্কাসে, শিশু বুড়োর দল আসে, আনন্দেতে সব ভাসে, পয়সা বানায় অবিরল।

চতুর্থ জন – ভালুক, বাঁদর, সাপ নাচাই – রাস্তা ঘাটে দু পয়সা পাই, ওদের নামেই অন্ন খাই – (হাঃ হাঃ হাঃ) আমরা বড়োই দুষ্টু ভাই।

প্রথম জন – কাঠের গুঁড়ি, বানায় বাড়ি – আসবাব আর রেলের গাড়ি, দরজা, জানলা, চেয়ার টেবিল – নৌকা, ছড়ি, মই ও সিঁড়ি।

দ্বিতীয় জন – তাইতো কাটি হাজার বৃক্ষ, বন বিনাশে নেইকো দুঃখ, এই ধরণীর ভূমি রুক্ষ – হবে খুবই তাড়াতাড়ি।

তৃতীয় জন – জন্তু যত বন্য, ভরা এ অরণ্য, মোদের সুখের জন্য, করত জীবন দান।

চতুর্থ জন – পন্থা নেব অন্য, বন যে হবে শূন্য – গাছ-পালা নগন্য হারাবে সব প্রাণ।

প্রথম ও দ্বিতীয় (একসাথে গান গেয়ে) – বলছে যারা মোদের বোকা, লাগবে চোখে তাদের ধোকা, করবো জমি বাগান ফাঁকা – গাইব তবে জয়ের গান। বাস করব আমরা একা, সিমেন্ট কাঠে শহর ঢাকা, ঘুরবে শুধুই গাড়ির চাকা, পশু পাখীর নেই কো ত্রাণ।

(মানুষের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পেছন থেকে সিংহের গর্জন)

সিংহী – হাতিয়ার ধরে সব হয়ে যাও সাবধান। নখ, দাঁত সব বের করো, হও সবে আগুয়ান।

(মানুষ হতচকিত হয়ে এধার ওধার ছুটোছুটি করতে থাকে – হাতি প্রথমে প্রবেশ করে শুঁড় দুলিয়ে বলতে থাকে)

হাতি – গাছ-পালা হীন এ সংসারে – বাঁচবি ওরে কেমন করে? জল হাওয়া সব ফুরিয়ে যাবে! বৃষ্টি বাদল বন্ধ হবে! ভগবানের প্রকৃতিকে – কেন রে তুই করবি ক্ষয়?

হনুমান – আহা কি ওর বুদ্ধি বহর! গড়বে নগর, গ্রাম ও শহর? চিবিয়ে খাবে শুধুই পাথর – করিস যদি প্রাণের লয়; লতা-পাতা ফুল না রবে! এই পৃথিবী কে সাজাবে? ফল ওষুধি কোথায় পাবে? সময় শুধু অপচয়। এই জগতে নিষ্ঠুরদের কখনও কি হয় রে জয়?

বাঘ, ভালুক – বড় ছোট জোট বেঁধেছি – আর তো তোদের করি না ভয় –

হরিণ, খরগোশ (একসঙ্গে হটাৎ প্রবেশ করে) – মানুষ তোমায় হারিয়ে দেব, “বনদেবীর” হবেই জয়।

ভালুক (সেনাপতির আদেশ শোনা যায়) – আক্রমণ, আক্রমণ! ঝাঁপিয়ে পড়ো পশুগণ,নিষ্ঠুর তুই মানুষ জন্তু, এলো যে তোর মরণ ক্ষণ।

(মঞ্চে দুই ভাগে মানুষ ও পশুর অবস্থান। মানুষ আত্মরক্ষার সুযোগ পায় না, লড়াই করতে অসমর্থ হয়ে পালাতে থাকে। একই জায়গায় ছোটার অভিনয় – চিৎকার শোনা যায়)

পশুর দল – আক্রমণ ! আক্রমণ !

মানুষ দল – পলায়ন – পলায়ন ….

(এই যুদ্ধটি মঞ্চে সব অভিনেতাদের সরিয়ে বড় পর্দায় পেছনে ছায়া নৃত্যে অ্যাকশন দেখানো যেতে পারে। বারবার লড়াইয়ের অভিনয় এবং কাঠুরে ও শিকারীর পলায়ন) মানুষের প্রস্থান –

পশুদের গান – আমরা সবাই বন্য প্রাণী – বনের মধ্যে বাস, বন রক্ষার পণ করেছি – বন দেবীর দাস। গাছ আমাদের মাতা পিতা, গাছের মতন বন্ধু নাই। অরণ্যকে রাখতে সজীব, সবাই মিলে লড়বো ভাই।

পাখীর গান – রোধ করব এই পৃথিবীর – পরিবেশের যত দূষণ, লতা পাতায় সাজবে – ধরা, পরবে ফুলের নতুন ভূষণ। বনের মর্ম, আসল ধর্ম, অবুঝ মানব জানবে যখন – শুদ্ধ হবে, জল হাওয়া সব, ধন্য হবে মোদের জীবন।

সবাই মিলে – মানুষ জন্তু হারল আজি, আর তো মোদের নেইকো ভয়, জয় জয় আজ বৃক্ষ মায়ের জয় জয় “বন রাজের” জয়।

সমাপ্ত

নীরব অভিসার (Nirob Abhisar)

চন্দনা সেনগুপ্ত



হাতে "ডোনেশন" বাক্স নিয়ে ঘুরছিলাম সমুদ্রের ধারে। দেখা হল, সেই ছেলেটির সঙ্গে। শান্ত স্নিগ্ধ চেহারা, একটু তামাটে রঙ, মাথায় কোঁকড়ানো থাক থাক চুল। পশ্চিমে মুখ করে স্থির হয়ে বসে সে, বোধহয় সূর্য্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্যে। সমুদ্রের নীল জলে তখন আলোর আল্পনা। রোদের তেজ কমে এলেও চোখের গগলসটা খোলেননি তিনি। কী যেন একটা আকর্ষণ আছে ঐ বুদ্ধিদ্বীপ্ত চেহারার মধ্যে, বারবার চোখ চলে যায় তার দিকে, "বন্দর" পাহারারত "নৌ সেনাদের" একটি হেলিকপ্টার মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে খুব কাছে চলে এল, বোধহয় তার শব্দ শুনেই ওপরে তাকালেন, মুখ তুলে। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ্য করলেন, ঐ যন্ত্র পাখিটার ওড়বার গতিপথ।
একটু পরে বিশাল এক মালবাহী জাহাজ ধীর গতিতে এগিয়ে এল, এই "সানফ্রান্সিসকো" বন্দরের ঘাটে, নোঙর ফেলবার জন্যে। তার ধাক্কায় বিরাট কয়েকটা দানবী ঢেউ আছড়ে পড়ল পাথরের বাঁধানো - দেওয়ালটার ওপর। জানি না, শব্দ করে উঠল কিনা 'ছলাৎ ছলাৎ ছল' - কিন্তু আমার মনে হল হাস্য মধুর সুরে ওরা যেন ডাক দিল. - 'বল, বল না কথা বল'। এটা অবশ্য আমার অনুমান, কারন ঐ তরঙ্গ বা হাওয়ার শনশনানি কোনোটাই তো আমি শুনতে পাই না। ওরা যতই আমায় ওদের সভায় গাইতে বলুক, আমি তো গাইতে পারিনে এক কলিও। কারন আমি যে বধির মূক। অবশ্য বোবা কালা হওয়ার জন্য দুঃখ নেই আমার কোনো। মা বলেন, এটা নাকি শব্দ দূষণের যুগ। বাস, ট্রেন, প্লেন বা মোটর বাইকের শব্দে নাকি তাঁদের কান ঝালা পালা হয়ে গেছে।
সব চেয়ে অবাক লাগে যখন লাল আলোর ঝলকানি তুলে পুলিশের গাড়ি কিম্বা অ্যাম্বুলেন্সগুলো যায় তখন অনেক বুড়ো বুড়িকে দেখি কানে হাত চাপা দিতে। ওদের 'সাইরেন' ভীষণ কান ফাটানো আওয়াজ তোলে। আমি কিন্তু ওদের কাজের 'গুরুত্ব' অনুভব করে তীব্র বেগে ছুটে চলার গতি দেখে খুব উৎসাহ অনুভব করি।
'ডোনেশন বাক্স'তে চাঁদা সংগ্রহ করতে বেরিয়ে আজ কেমন যেন একটা লজ্জা ভাব আসছে মনে। আমাদের চেয়েও তো কত অসহায় দুঃখী মানুষ আছেন, এ সংসারে তাদের কথাই মনে পড়ছে। যদিও এ চাঁদার অর্থ আমাদের বোবা-কালা স্কুলের দুস্থ ছাত্রদের জন্যই ব্যয় করা হবে, তবু অনেকের কাছেই এটাতো একটা ভিক্ষাবৃত্তি। তবুও কেউ কেউ এক দু ডলার ফেলে যাচ্ছেন আমাদের কৌটোতে এবং আমি ওদের বুকে লাগিয়ে দিচ্ছি ছোট্ট একটা 'পতাকা'। স্মিত হাসি দিয়ে মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের।
ধীরে ধীরে ছেলেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে সে বলল - হাই, কিন্তু দানপাত্র সামনে তুলে ধরতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিছুই না দিয়ে। চাঁদা না দেওয়ার জন্যে নয়, একজন তরতাজা যুবকের কাছ থেকে উপেক্ষা পেয়ে মনটা ভীষণ কুঁকড়ে গেল। মনে হল বোবা বলেই বোধহয় এমন ব্যবহার পেলাম।
বাড়ি এসে মাকে বললাম ঐ অভদ্র ছেলেটার কথা - ইশারাতে। মাও তার হাত মুখ নেড়ে শব্দহীন ভাষায় বোঝাবার চেষ্টা করলেন, অত অল্প সময়ে কাউকে দেখেই বিচার করা ঠিক নয়, হয়তো ওর পকেটে খুচরো ছিল না, তাই লজ্জাই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। - সত্যিই! এই কথাটা তো মাথায় আসেনি আমার। অযথা এমন রাগ করা উচিত হয়নি আমার।
পরেরদিন আবার বেশ সেজে গুজে বেড়াতে গেলাম সমুদ্রের ধারে। পড়ন্ত সূর্য্যের আলোয় সাগরের ঢেউগুলি মাথায় পড়েছে লাল, বেগুনি রঙিন মুকুট। সাদা সাদা সীগল বলাকা আর হাঁসেরা ভিড় জমিয়েছে, সাগর তটের "ম্যাক্সিকান" মাছ বিক্রেতার সামনে। ফুটপাতের ধারে কেউ বিক্রি করছে মুক্ত মালা, কেউ বা হাতে বোনা দস্তানা, টুপি। আমি অন্য দিনের মতন লোকের মেলা দেখতে বসেছি, চোখ কিন্তু খুঁজে চলছে অন্য একজনকে।
হ্যাঁ, ঐ তো, ঐ তো সে ওখানে দাঁড়িয়ে। জেটির পাশে, যেখানে দুটি "ল্যাটিন আমেরিকান" ছেলে বাঁশি আর গিটারের তালে নাচ, গান অভিনয় দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে - সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন ঐ পথ শিশুদের। আর তারপর পকেট থেকে নোট বের করে মেলে ধরলেন তাদের সামনে। আবার রাগ ধরলো আমার। 'বা, বা এদের বেলায় তো বেশ উন্মুক্ত হস্ত, মূক বধিরদের প্রতি তোমার যত অবহেলা।
অচেনা অজানা যুবকের প্রতি এমন অভিমানের কারন খুঁজে পাচ্ছি না, কিন্তু মন টানছে বারে বারে ওঁরই দিকে। ভিড়ের সঙ্গে মিশে একেবারে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ঠিক সেদিনের মতো বললেন - "হাই" কিন্তু অন্য যুবকদের মত আলাপ করতে চাইলেন না। বাড়ি ফিরে এসে মনে হল, আমার এই নিঃস্তব্ধ জগতে আমি তো নীরব নই - কত কাজে ব্যস্ত থাকি, বই পড়ি, সাঁতার কাটি, শান্তির জন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে পুরুস্কার পাই। ছোট থেকেই মা আমাকে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সেই ওয়াশিংটনের "গ্যালন্ডট" (Gallandet) থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাবার জন্য ভর্ত্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে শিখেছি (Gestuno) 'গেসটুনো' ইঙ্গিত ভাষা। বিশ্ব সম্মেলনে জ্ঞানী-গুণীদের সমারোহতে মূক বোধির বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিম্বা শিল্পীরা তাদের বিভিন্ন কাজ বা জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। (Lixicalize design) লেক্সিকালাইজ সেই চিহ্ন ভাষাতেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করায়, "আঙ্গুলের" মাধ্যমে অনেক অব্যক্ত শব্দহীন বাণীতে অর্থাৎ অভিব্যক্তির সাহায্যে আমি তো কথা বোঝাতেও পারি, কিন্তু এইসব আমার মূক বধিরদের সঙ্গে communicate অর্থাৎ যোগাযোগ করবার জন্য। 



যে আমার দিকে তাকাচ্ছেই না, আজ তাকে কেমন করে ডাকব আমি, ভিড় পাতলা হলে ছেলেটি একটু এগিয়ে হটাৎ থামলো, পকেট থেকে বার করলো তার "সাদা ছড়িটি" আর পাথরের ওপরে লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে গেল, রাস্তা পার হবার জন্য। চমকে উঠল আমার সমস্ত সত্তা। ছেলেটি অন্ধ। অনেক্ষন একা বসে রইলাম, সাগরের নীল জল আর আকাশ যেখানে এক হয়ে গেছে সেই দিগন্তের পানে তাকিয়ে। এতো সুন্দর পৃথিবী - এই সফেগ্ন উর্মিমালা, পাথরের পায়ে মাথা কুটছে। সদাই - ছোট ছোট তরঙ্গের খেলা। এই "সূর্য্যাস্তের" আলোয় রক্তিম, বর্ণালী ছটা - শ্যামল সবুজ শ্যাওলা কিম্বা নানা ধরণের হাজার পোষাক পরা মানুষের মিছিল - কিছুই তো দেখতে পায় না উনি।
পরদিন থেকে রোজ আগে ভাগে এসে বসে থাকি, ওঁর প্রিয় জায়গাটাতে। বিকেল ৬টা বাজলেই হয়, তাঁর আগমন - আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে, ছড়ি খুলে ধীর পায়ে উঠে যান, হাসি মুখে এবং যাবার আগে বলেন 'বাই'। আমি তো যথারীতি নিরুত্তর।
কিন্তু বাড়ি এসে শুরু হয়, আমার অদম্য প্রচেষ্টা নতুন এক 'সাধনা'। যুবকটির প্রতি গভীর ভালোবাসা।
দিনে দিনে আমার আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে বাড়িয়ে, ওঁর কাছে - আপন মনের অব্যক্ত ভাবনাকে একদিন প্রকাশ করতেই হবে আমায়, তাই আমি শিখতে শুরু করেছি - "ব্রেল লিপি"। কম্পিউটার খুলে বসে গেছি - আমি নতুন রকমের পড়াশুনোয়। নিঃস্তব্ধ জগৎ আমার হয়ে উঠেছে, আরও বাঙময়। আর জ্ঞান সাধনার সঙ্গে সঙ্গে চলছে আমার "নীরব অভিসার"। সে দিনটা ছিল রবিবার। মা ও আমি বেড়াতে এসেছি বন্দরের ধারে। 'আল্যাস্কা' থেকে আগত এক বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ এসে দাঁড়ালো জেটিতে। সেখান থেকে এবার নানা পোষাক পরা নানা ধরণের বিচিত্র সব মানুষ নেমে আসছে, সারিবদ্ধভাবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তাদের দিকে। বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ চোখ পড়ল ভিড় ঠেলে অতি সন্তর্পনে সাদা ছড়ি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁকে দেখতেই অদ্ভুত একটা যেন বিদ্যুতের প্রবাহ ছুটে গেল, দেহে মনে।
'মা'কে ইশারায় দেখলাম মানুষটিকে, আমার রক্তিম লজ্জা জড়ানো মুখের চেহারা লক্ষ্য করে প্রথমে স্মিত হাসিতে ভরে গেল তাঁর মুখ কিন্তু ওঁর হাতের "সাদা ছড়ি"-টির দিকে তাকিয়ে কুঞ্চিত কপালে চিন্তার ছাপ পড়ে গেল এক নিমেষে। ঝলমলে সূর্য্যকে এক চিলতে কালো মেঘ যেমন করে ঢেকে দেয়, তেমনি বিষাদময় হয়ে উঠল মায়ের দৃষ্টি। ভীষণ অসহায় লাগলো আমার। বাবাকে অকালেই হারিয়েছি। আমার মতন বোবা কালা মেয়েকে নিয়ে অনেক দুঃখে অনেক কষ্ট সহ্য করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে সংসারে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাঁর মন সর্বদায় চাইছে, আমার কোনো প্রকৃত বন্ধু বা জীবন সঙ্গীকে দেখতে - সে ইচ্ছেটা এবার হয়তো পূর্ণ হবে ভেবেছিলেন কিন্তু এখন ভীষণ হতাশ লাগলো তাঁকে। জীবনের কোন সমস্যা আঘাতেও তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি কিন্তু দৃষ্টিহীন প্রেমিকের প্রতি আমার এই একতরফা প্রেমের উচ্ছাস আবেগ তাঁকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্থ করে দিল। কি ভাবে এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াবো ভাবছি, ঠিক সেই সময় উল্টো দিক থেকে একটি তরুণ ছেলে পায়ে স্কেটিং এর চাকা পরে এগিয়ে এল দ্রুতবেগে। সামনে আগত ভিড় দেখে আস্তে করার চেষ্টা করলো হটাৎ, আর ঠিক তখনই নিজেকে সামলাতে না পেরে সজোরে ধাক্কা মারলো সাদা ছড়ির ভদ্রলোককে। দু'জন দুদিকে ছিটকে পড়ল তারা। হৈ হৈ করে ছুটে গেল অনেক লোক একসঙ্গে। আমি চিৎকার করে কিছু বলতে গেলাম, মুখ দিয়ে শুধু আওয়াজ বেরোলো আ...। আমি ছুটে গেলাম তাঁর দিকে। এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়তে চাইলেন তিনি, এবং প্রথমেই খোঁজ নিলেন অন্য ছেলেটির। সেও উঠে পড়ে হাতের ছড়িটা ধরিয়ে দিয়ে 'সরি' বলল তাঁকে এবং বোধহয় জিজ্ঞেস করল লেগেছে কিনা। তিনি হেসে কিছু উত্তর দিলেন, ঠোঁটের ভাষা পড়ে আশ্বস্ত হলাম আমি। না বেশি লাগেনি তবে ডান হাতের তালুটা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। এবার মা গিয়ে তাঁকে বাঁ হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। অন্য দু একজন ঝেড়ে দিল তাঁর জামা প্যান্ট, আমি ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলাম। ডান হাতের তালুটা কেটে রক্ত পড়ছে দেখে। মা তখন ওর বাঁ হাতটা ধরে ফুটপাতের কফি শপে বসালেন। হাসি মুখে বারে বারে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন তিনি। এবারে আমার দিকে ফিরে কোন প্রশ্ন করলেন, আমার হয়ে মা উত্তর দিতে লাগলেন ধীরে ধীরে। শব্দগুলো শুনতে না পারলেও বুঝতে পারলাম, কথা হচ্ছে আমাকে নিয়ে। টেবিলের ওপর অসার হয়ে পড়ে থাকা আমার হাতের "দশটা আঙ্গুল" যেন অবাধ্য হয়ে উঠতে চাইল। একবার তাদের দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, একবার কোলে রাখছি, আর কেঁপে কেঁপে উঠছে তারা অসংযতভাবে। কেমন একটা আবেগের উচ্ছাসে চোখের পাতা নত হয়ে আসছে, তিনি আমার চোখে চোখ মেলাতে অসমর্থ জেনেও সোজাসুজি তাকাতে পারছিনা আমি। অনর্গলভাবে কথা বলে যাওয়ার সুযোগে মা হয়তো শুনিয়ে যাচ্ছেন আমাদের জীবন কাহিনী।
এই কয়মাস ধরে রোজ এসে বসেছি, তাঁর পাশে। কিন্তু ব্যক্ত করতে পারিনি নিজের মনের ভাব। বুঝতে পেরেছি, "ভালোবাসা কারে কয়"। আর সে যে কেবলি যাতনাময় - তা আমার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ অনুভব করতে পারেনি কোনোদিন। 'বোবা' মেয়ের ভালো লেগেছে অন্ধ ছেলেকে। সহানুভূতি দেখানোর জন্য নয়, অদ্ভুত একটা আকর্ষণে সে ক্রমশঃ তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভালোলাগা - ভালোবাসা জানবার অদম্য ইচ্ছেটাকে চাপতে চাপতে বুকের ভেতরে যেন এতদিনে একটা ব্যাথার পাহাড় জমা হয়ে গেছে তাই আজ সেই সৌম্যকান্তি রূপ আমারই আলোচনায় মগ্ন অদ্ভুত একটা আনন্দবীণা ঝংকৃত হল সমস্ত সত্তা জুড়ে, কফি শেষ হলে এবার আমার হাতের ওপর হাত রাখলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে শিরা উপশিরা ধমনীতে ধমনীতে বয়ে গেল যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ। মা তাঁর ব্যাগ খুলে ছোট্ট নোটবুকটা বের করে লিখলেন, ওনার ফোন এবং ইমেল নম্বর। উনি মন দিয়ে শুনলেন আমাদের ইমেল ঠিকানা, ধন্যবাদ জানালেন। হাসিমুখে হাঁসতে হাঁসতে একসঙ্গে তিনজনে রাস্তা পার হলাম আমরা। রাস্তার ওপারেই ওনার এপার্টমেন্ট, সেখানে গেটের পাশে বাঁধা ছিল এক সুন্দর শুভ্র কুকুর। কাছে যেতেই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাত চাটতে ল্যাজ নাড়তে লাগল, তার সেই প্রিয় সঙ্গী।
সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে এলাম আমরা অসম্ভম ভালো লাগার আবেশ নিয়ে। মাকে জড়িয়ে ধরলাম গদ গদ হয়ে, মা তো আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন আমার মনের অবস্থাটা। আমাকে দুই গালে চুমু খেয়ে ইশারায় ঠোঁট নেড়ে বললেন - তোকে চিনতে পেরেছেন উনি, তুই যে ওর পাশে রোজ এসে বসতিস নিঃশব্দে তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ওনার। আমি অবাক হয়ে মাথা নাড়লাম - না না তা কি করে সম্ভব। বিস্ময় প্রকাশ পায় আমার চোখে মুখে। মা হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের দিকে। সেখানে রাখা "সুগন্ধি শিশিটা" অর্থাৎ আমার নিত্য ব্যবহার্য্য "পারফিউমটা" তুলে এনে দেখালেন উনি হেসে - 'এটার গন্ধে', এবার পরিচয় দিলেন ছেলেটির।
সুদূর ভারত থেকে ছেলেটির নাম কৃষ্ণ রাও। "গুগল" কোম্পানীতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তিনি, বয়স ৩৫, মনের মতন গার্ল ফ্রেন্ড না পাওয়ায় বিয়ে করেননি এখনও। সবদিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। কেউ তাকে সহানুভূতি দেখাতে এলে তার কাছ থেকে সরে যান তিনি। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরও মন চঞ্চল হয়েছে। বিশেষতঃ আমার 'নীরবতা' ভীষণভাবে তাঁকে বিচলিত করেছে, একথাও জানাতে দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানের অতুলনীয় সংমিশ্রণ, আন্তরিক কথাবার্তা এক ঘন্টার মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছে, মায়ের সব ভাবনা চিন্তা ও ভয়ের মেঘ, আমি তো আনন্দের সাগরে যেন ডুব দিয়ে উঠেছি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সকালে উঠেই প্রথম ইমেল পেলাম কৃষ্ণ রাও-এর কাছ থেকে - আমি তোমার জুঁই ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা পাগল। বন্ধু হবে নাকি আমার, একটু সময় দিলে শিখে নিতে পারি, তোমার "ইশারার ভাষা"। আমার হাতের মুদ্রা তখন কথা বলবে তোমার সঙ্গে। মধুর পরশ ধন্য করেছে আমায় - জবাব দিলাম আমি - শুধু বন্ধু নয়, জীবন সাথী হতে চাই - সুযোগ দেবে কি তুমি?
সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট-এ আমার উত্তর এল তার কাছ থেকে। "ভীষণ ভাল লাগছে তোমার ছোট্ট ইমেল পেয়ে, কেমন করে "হ্যাঁ" বললে, তুমি শুনতে সরি বুঝতে পারবে বলো তো আমার "জেসমিন"?
এবার ব্রেল লিপিতে বড় চিঠি লিখে ফেললাম আমি। প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেলাম দুজনে।

গুঁজিভাঙ্গা মা (Gunjibhanga Maa)

চন্দনা সেনগুপ্ত

শ্রী শ্রী মা যে ছিলেন মোদের
গুঞ্জিভাঙ্গা মা -
কোন বাঁধা, গণ্ডি, নিষেধ
কিছুই তিনি মানতেন না।
তার এক বিশেষ উদাহরণ
স্বামীর মৃত্যুর চারদিন পরে
দক্ষিনেশ্বর দর্শন।
 
লক্ষীমণি ভাইজি তাঁহার
যখন তাঁকে বলেন -
"তোমার এখন চলছে অশৌচ কাল"
'মা' মানতে নারাজ ছিলেন তাহা,
তাঁর মতে তো শুচি অশুচি
মনেরই জঞ্জাল।
 
ঠাকুর তাঁকে থান পরতে দেন নি
খুলতে দেননি হাতের বালা-চুড়ি -
লাল নরুন পার শাড়িতে ঘোমটা টেনে,
লজ্জা পটাবৃতা মা -
চলেন, রীতি মেনে।
কিন্তু শরীরে বা মনে,
হননি তিনি বুড়ি।
 
মা-সারদা - স্বরস্বতী, চোখে মুখে
জ্ঞানের জ্যোতি,
ছিলেন যিনি অতিসাধারণ
'রামলালের' ঐ খুড়ি।
 
"গুঞ্জিভাঙ্গা" কথার মানে,
বোঝার মতন লোক সেকালে
ছিলেন না তো কোনখানে।
মুসলমানের এঁটো তোলেন,
মাতাল ডাকাত জাত না মেনে।
মা বলে যে ডাকেন তাঁকে -
তারেই তিনি নেন যে টেনে।
গিরীশ, রাখাল, শরৎ, নরেন
মা বলে তো তাঁকেই চেনে।
আদেশ পালন করেন তাঁহার
ভক্তি করেন, মনে প্রাণে।
 
স্বর্গলোকের পরপারে
দেবী মা তো নন তিনি।
নিজের ঘরের আপন মা যে
সহজ সরল গৃহিনী।
মোদের ঠাকুর হন অবতার
দেবতা মোরা তাঁরে মানি,
সারদা মা ও নিত্যশুদ্ধা
ছিলেন স্বামীর পূজারিণী
সেবার ব্রতে ব্রতী হয়েও
ছিলেন গ্রাম্য রমণী
সংসারেতে সফল হতে
প্রচার করেন সহজ বাণী।
 
দূর-দূরান্ত হতে আসতো কতই ভক্তদল,
সঙ্গে থাকতো পুত্রকন্যা, করতো কোলাহল,
মায়ের হাতের রান্না প্রসাদ পেয়ে
বাড়ত তাদের সুখ শান্তি, জাগত মনে বল।
বিদায় দিতে গিয়ে মায়ের
ঝরতো অশ্রুজল।
মুখে থাকতো বুলি,
- "আহা বাচ্চাগুলি,
কত কষ্ট পেল হেথায়
আসতে গিয়ে বল"?
মা যে ছিলেন দয়াময়ী,
দীক্ষা নিয়ে ভক্ত পেত
তাই তো পুণ্যফল।
 
নারীমুক্তি সাধন তরে, শিক্ষা দানের লাগি,
'নিবেদিতা' কে মেয়েদের স্কুল
করতে, দিলেন উৎসাহ, -
শ্বেত পদ্মের মতন খুকী পেলেন তাঁহার
অপার স্নেহ।
বিদেশ হতে হেথায় এসে
ধন্য হল তাঁহার গেহ।
মায়ের আশীষ মাথায় নিয়ে
সামর্পিল মন ও দেহ।
 
"বেলুড় মঠে"র সংঘমাতা,
কিন্তু তো নন সন্যাসী
তবু লোকে ছুটে যে যায়,
তাঁর দর্শন প্রত্যাশী।
সহজ সরল জীবন কাটান
আপন হাতে ঝেঁটিয়ে উঠান,
কুটনো কোটেন, পানও সাজেন
মুখে নিয়ে মধুর হাসি।
 
ধনী নির্ধন সুখী-দুঃখী জন,
জড়ো হ'ল তাঁর গৃহে আসি,
গুরু রূপে চুপে চুপে,
পুজেঁ মাকে ভালোবাসি।
ঠাকুর তাঁকে রেখে গেলেন,
মোদের তরে এই জগতে
শিখিয়ে দিয়ে গেলেন গৃহীর ধর্ম,
শরণাগত থাকার কথা বুঝিয়ে দিতে
মা শেখালেন নাম জপেরই মর্ম।
দোষ দেখো না অন্য কারোর
করে যে যায় কর্ম
সব অবস্থায় মানিয়ে নিতে
পরো নামের বর্ম।
 
'সা' মানে সান্নিধ্য আর 'র' মানে রক্ষাকর্ত্তি
'দা' মানে দান করে যাও স্বরস্বতী জ্ঞানদাত্রী।
"সারদা" মা অপার দয়া, আমরা তোমার কৃপা পাত্রী,
নিজের আসল রূপ লুকায়ে, রাখো মাগো জগদ্ধাত্রী
গণ্ডি ভেঙ্গে এগিয়ে গেলে
ভক্ত তোমার পথের যাত্রী
তাই তো নিত্য প্রণাম জানাই
স্মরণ করি দিবারাত্রি।

“আমি’র” – পাগলামি (“Ami’r” Paglami)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমি চলে যাই, হয়ে "মীরাবাঈ",
শুধু গান গাই, "গিরিধারীর"
কৃষ্ণের প্রেমে - মাতোয়ারা হয়ে -
ছাড়ি তনু - মন - ধন ও শরীর।
"পাঞ্জাব" পথে "মারদানা" সাথে "রাবাব বাজিয়ে নানক" পন্থী,
হরি নাম গাই, অমৃতসরে "হরমন্দিরে" হবো যে গ্রন্থি।
"আজমীরের ঐ শরীফে" পৌঁছে - চাদর চড়াই আল্লাহ কে স্মরি -
"সুফী" ফকির হবার নেশায় বন-অরণ্যে বেড়াই ঘুরি।
'বারাণসীর' 'গঙ্গার' তীরে আবার আমার নৌকা ভিড়ে
'কবীরে'র দোহা গানে, এ মন আনন্দেতে যায় যে ভরে।
নবদ্বীপের "শ্রী চৈতন্য" পুরী ধামে গিয়ে করেন লীলা
ভক্তি প্রেমে - আকুল হয়ে - সাগর কূলে, কাটাই বেলা।
"বৌদ্ধ গয়া"- তে "বুদ্ধদেবের" স্তুপে গিয়ে যবে  ঠেকাই মাথা,
অহিংসা ও সত্যের বাণী - ভুলিয়ে দিল যে সব শোক ব্যথা।
"সব তীর্থ" পার হয়ে শেষে এলাম মায়ের স্নেহচ্ছায়।
ধন্য জীবন হেথায় এসে - "জয়রামবাটি আঙিনায়"।
"রামকৃষ্ণ" লীলা প্রসঙ্গ জুড়িয়ে দিল, প্রাণ ও অঙ্গ
ভুল ভ্রান্তি হইল ভঙ্গ - "কামার পুকুর বাটিকায়"।
তীর্থ ঘোরার নেশা হল শেষ
আসল সাধক পাগল দেখে
'মা' ও ঠাকুর, মর্ত্তে এলেন
গৃহী যাতে সাধন শেখে।
তাঁদের মতে সরল পথে - সঙ্গে রেখে সত্য - মাথে, -
কাম কাঞ্চন ত্যাগী হয়ে - চলব নিয়ে কৃপা সাথে।
ঘুচিয়ে দিও, সব পাগলামি - তোমার নাম-ই 'সবচেয়ে দামী'।
সুরক্ষিত দুর্গ-মাঝে, ব্যস্ত থাকি, গৃহ কাজে
লোভ, ক্রোধ-এলে মরি লাজে, ভুল করিলে দুঃখ বাজে -
তাই তো কৃপা মাগি স্বামী
"ঘুচাও আমি'র  সব পাগলামি"।।

স্বর্গের পথে (Swarger Pothe)

চন্দনা সেনগুপ্ত

এতো তাড়াতাড়ি স্বর্গ থেকে রথ
তাদের নিতে আসবে -
তা জানতো না তারা।
ইন্দ্রের সভায় তাঁর প্রিয়
বাহন ঐরাবত ও নৃত্যপটীয়সী
অপ্সরা উর্বশীর বন্ধুত্ব হয়েছিল,
সবার অলক্ষ্যে।
দুজনে ঘুরতে যায়, নদী তীরে উদ্যানে,
একজন নাচে, অন্যজন শুঁড় দুলায়।
একজন স্নান সারে - সাঁতার কাটে
অন্যজন ফোয়ারায়
হিল্লোল তোলে।
হাসে খেলে, আনন্দে মাতে।
দেবতাদের রাজার সভায় আসতে
দেরী হয়ে যায় তাদের।
শাস্তিপায় তারা, একজন ৬ মাসের
অন্যজন ৮ মাসের জন্য।
কেরালার হস্তিনী মায়ের গর্ভে -
স্থান পায় ঐরাবত।
আর
উর্বশী দিল্লীর পাশে নয়ডা
শহরে এক রমণীর জঠরে।
পৃথিবী নাকি স্বর্গের চেয়েও সবুজ,
ধরিত্রী মায়ের কোমল ঘাসে
শীতল নীল জলে নাকি
অপরিসীম শান্তি -
শুনেছিলো সে, জন্ম নেবার -
না না জন্ম তো সে
নিতেই পারেনি -
ভ্রূণ হবার আগে -
স্বর্গবাসী দেবকন্যাদের মুখে।
আর ঐ নৃত্যশীলা সুন্দরী নারী
জেনেছিল এখানে ভারতবর্ষের
ঘরে ঘরে রাগিনী, পদ্মিনী
বৈজয়ন্তীমালা, কিম্বা
মাধুরী দীক্ষিত, হেলেন প্রমুখ
কত শত রমণী নাচের তালে -
সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়।
উর্বশীও মানুষের কাছে নতুন নাচ
শিখে আসবে, স্বর্গসভাকে
চমকিত করতে।
কিন্তু দুজনেরই মায়ের আর্তনাদ
বুকফাটা চিৎকার -
যন্ত্রনা, হতাশা, সন্তানকে -
রক্ষা করতে না পারার
হাহাকার শুনেছে
ওরা পেটের মধ্যে বসে।
"এ" কোথায় এসেছে তারা
এ তো এক অভিশপ্ত
ঘৃণ্য নিষ্ঠূর জগৎ।
এখানে ঐরাবতের ছয় মাসের জীবন
আনারস বোমে জ্বলে
পুড়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়।
অন্যদিকে নয়ডায় করোনা
আক্রান্ত - কোভিডের রুগী ভেবে
তার মা হাসপাতালের
দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়ান,
চিৎকার করে বলেন -
আমাকে নিশ্বাস বন্ধ
করে শেষ করে দিলে -
ক্ষতি নেই, শুধু আমার
৮ মাসের তরতাজা নিরীহ
সন্তানকে জঠর মুক্ত করো।
বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দাও।
ওগো নিঠুর স্বার্থপর -
মান আর হুঁশ খোয়া নো মানুষ,
তোমাদের নির্দয়তার আর কত জঘন্য
দৃষ্টান্ত রেখে যাবে তোমরা?
একটু দয়া করো।
কিন্তু গরীব মা এক দোর থেকে অন্য দোরে
এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে
শুধু ছোট ছুটি করাই
সার হয়েছে তাঁর।
উর্বশী আর সুযোগ পেলো না
বাইরে আসবার।
ঐরাবতের মা যেমন এক বুক
জলে তাঁর চোখের অশ্রু
মিশিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন
জঠরের পুত্রের কাছে -
মানুষের মাতাও তেমনি
নিষ্ফল আক্রোশে -
ভগবানকে নালিশ জানিয়েছেন।
- "এই কী তোমার
সুবিচার প্রভু ?
এখন আমরা দুই বন্ধু গর্ভাশয়ে মৃত্যু
বরণ করে ফিরে যাচ্ছি আবার
স্বর্গের পথে।
পৃথিবীতে আর কখনো না আসবার
শপথ মনে নিয়ে।

প্রভু তোমার সনে (Probhu tomar sone)

চন্দনা সেনগুপ্ত

যখন তোমায় স্মরণ করি, যেমন ভাবে আঁকড়ে ধরি,
যেথায় তোমার সঙ্গে ঘুরি,
ভয় থাকে না মনে।
যারা তোমায় ভালোবাসে,
দুঃখ মাঝে কাঁদে হাসে কাটিয়ে ওঠে ,
বিপদ ত্রাসে সদা থাকি তাদের সনে।
এই পৃথিবীর সবুজ কোলে নানান রঙের পুষ্প দোলে,
নদী সাগর ঢ়েউ যে তোলে,
পশু পাখি ঘন বনে।
আমার পরাণ আনন্দে তে, জোয়ার জলে উঠছে মেতে,
ঈশ্বরেরই দয়া পেতে, চমক লাগে ক্ষনে ক্ষনে।

মুকুলের বাসনা

চন্দনা সেনগুপ্ত

দেহের খাঁচা জীর্ণ হলো যবে –
আহার বিহার ভুলতে হবে,
ইচ্ছে তখন থাকবে না আর –
করতে বিনোদন,
জানবে তখন ভিতর হতে
পরিণত এক মন।
মুকুলিকা করবে যতন, খুঁজতে অতুল রতন,
বুড়িয়ে দিয়ে, গুঁড়িয়ে দিয়ে –
সুন্দর এই জীবন,
করবে না সে কষ্টে সৃষ্টে
অলস সময় যাপন।
হাতের আঙুল অবশ হলে,
অন্তরেই সোনা গলে
গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধতে চালিয়ে যাবে সাধন।
অন্যের মন চাইবে ছুঁতে,
প্রেরণা ও উৎসাহতে
ভরিয়ে দেবে বন্ধু স্বজন,
দুঃখী জনের মন।
মুকুলিকার জগৎ নেহাৎ ক্ষুদ্র সাধারণ,
হৃদয় কিন্তু খোলা তাহার,
থাকতো সারাক্ষন।
করতো সেথায় চেনা অচেনা
কতই অতিথিজন,
সবার তরে প্রেম যে ঝরে
সবাই তাহার আপন
আনন্দের সাগর মাঝে
নিত্য অবগাহন।
এই একান্ত বাসনা তার, পবিত্র হোক ভুবন।

জপ-যজ্ঞ (Jopo Jogyo)

চন্দনা সেনগুপ্ত

যোগ করা হল, অগ্নি মধ্যে ঘি, ধুপ, বেলপাতা,
অন্ন পুষ্প ঢাললেন, তাতে, ঋষি "সাগ্নিক" - "তিনি হোতা"।।
পবিত্র হল যজ্ঞের স্থল,
আগুনের শিখা হল, উজ্জ্বল।
"ওঁ" "স্বহাঃ" ধ্বনি করে বিহ্বল, স্তব্ধ ধরণী মাতা।।
"জপ যজ্ঞে" তে অগ্নি জ্বলেনি।
সামগ্রী নেই হাতে।
"যজ্ঞ-পাবক" উত্তাপ-হীন, মন ঢেলে দেন, তাতে।
অন্তর হতে কাম, ক্রোধ, ভয়, লোভ, মোহ, মাৎসর্য-
বিষয় বাসনা, ভস্ম করিয়া
বাকি রাখি, শুধু ধৈর্য্য।।
স্থির হয়ে বসি, - চক্ষু মুদিয়া. -
প্রদীপের তৈল-ভক্তি, "শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ" যজ্ঞ-অগ্নি-
"মা" যে দাহিকা - শক্তি।
করি এক মনে, "ঠাকুরের" নাম, ভুলে যাই যত যাতনা।
কাম, কাঞ্চন ত্যাজিয়া করিব - জপাৎ সিদ্ধি সাধনা।
শরণাগত হয়ে "গুরু" প্রতি, ভেসে যাব, ভাব স্রোতে-
অশ্রু বিন্দু ঝরে অবিরল, হৃদ নির্ঝর হতে।
প্রণাম তোমায় প্রণাম ঠাকুর - আজই সুন্দর প্রাতে
তোমার মূর্ত্তি শুধু জেগে রয় - হৃদয়ের আয়নাতে।।

উন্মেষণ (Unmeshon)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে -
আমার ক্ষুদ্র জীবন নীড়ে -
তোমার মূর্ত্তি উন্মোচন, -
"ঠাকুর" আমার -
"মন - মন্দিরে" তব ভবনের উদ্ঘাটন।
তোমার লীলা ভবের খেলা, -
প্রভাত, সন্ধ্যা, রাত্রিবেলা, -
নতুন পথের প্রদর্শন।
মায়ের মিষ্ট বচন, কথন,
আলোক বর্ষা করে বর্ষণ।
এ জগতে আছে যত দুঃখীজন,
তাহাদের মনে, আশা বর্দ্ধন -
"শিব" জ্ঞানে সেবা, মহান কর্ম,
"নরেন" করেন সম্পাদন।
"কথামৃতের" সরল বাণী আত্মাকে করে আকর্ষণ, -
তাই তো সদাই তোমার "নামের"
ব্রত করি উদযাপন।
এলো বুঝি সেই শুভ লগন,
এসেছে আজিকে শুভক্ষণ,
'ঠাকুর মা' ও 'বিবেকানন্দ' করেন,
কী এক "সম্মোহন" -
শত দুঃখেও রহিনু মগন, -
নব নব ভাব - উদ্ভাবন, -
ছড়ালো নতুন উন্মাদন।
বাংলা মায়ের কোলে আজ হ'ল
এই "ত্রয়" "দেব" - সম্মেলন
বঙ্গের ভূমি ধন্য তাই তো
"মানব" "ধর্ম" - উন্মেষণ।

শরণাগত ভক্ত (Shoronagoto Bhokto)

চন্দনা সেনগুপ্ত

আসিলে তিমির - আবার শিশির - হই যে "ভক্তি বিন্দু"
পাতার উপর জন্ম নিই, গো - এসো, তুমি কৃপাসিন্ধু।
ব্যাকুল হইয়া ডাকি বারে বারে - উদ্ধারিতে এসো গো আমারে।
"ঠাকুর - মা"-র বিরহ এ মন, জানাইবে, বলো করে?
হারাবার ভয় করিল ছিন্ন, -
এঁকে দিল, "গুরু" পদচিহ্ন, গৃহ দুর্গের উপরে -
শ্রী রামকৃষ্ণ সূর্য কিরণ, - আসিয়া পড়িল দুয়ারে।
শেষের সুদিনে অন্তিম ক্ষণে কৃপা করো তুমি মোরে।
শরণাগত ভক্ত তোমার পড়ে আছে তব দ্বারে।।