ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা

চন্দনা সেনগুপ্ত

সেই যে দুজন, কে জানে কখন - !
বিষ বৃক্ষের ফল খেয়ে, -
প্রণয় করতে শিখেছিল - তাদের আমার প্রণাম।
ওই 'আদম - ইভের' ভ্যালেন্টাইন পর্বটি না
থাকলে তো আমরা জানতামই না।
পেতাম কি এই সুন্দর জগতে
এমন অপূর্ব জীবনের দাম?

প্রেম, প্রতীক্ষা - প্রত্যাখ্যান বা মিলন।
যুগ যুগ ধরে - মুগ্ধ - স্নিগ্ধ - ধন্য
করে রোমান্টিক ভুবন।
কবি কালিদাস-এর কাব্যে, আমাদের 
শাস্ত্রে পূরণে - কামদেব মদনের
আগমনে, মানব-মানবীর মনে
তুলেছে আলোড়ন।

রাধা - কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী -
অভিসার - বিরহ - এসবই তো 
বৈষ্ণব পদাবলীর - ছন্দে বদ্ধ,
পূর্ব যুগের ভ্যালেন্টাইন।
কথাটা হয়তো একসময় তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে
রোমান অক্ষরে লেখা হত,
কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর প্রতি ভাষায় -
বনে, কোনে, মনে -
তার মানে 'গোপন প্রেমবন্ধন'।
যীশুখৃষ্টের ধর্ম প্রচারক -
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কে
নিয়ে সূত্রপাত এই উৎসবের।

ধর্ম বিদ্ধেষী সম্প্রদায়ের কারাগারে 
বন্দী ছিলেন সেই সজ্জন -
মুখ বুজে সহ্য - করে চলেছিলেন
অকথ্য নির্যাতন, 
ঠিক তখন -
তাঁর হৃদয় মুকুরে উদ্ভাসিত এক মুখ 
জেলার কন্যার আবেগাপ্লুত -
দুই নয়ন, -
তাঁকে বারে বারে চঞ্চল করে,
তিনি কী যেন ভাবতে থাকেন, -
সারাক্ষণ, তারপর সুযোগ বুঝে 
তাঁর সেই বান্ধবীকে করেন
পত্র প্রেরণ।
কেউ জানে না কী লেখা ছিল তাতে।
কিন্তু সেই কারনে 
করতে হল তাঁকে মৃত্যু বরণ।
তারপর থেকেই 'শহীদ সাধুর' নাম
তরুণ তরুণীর দল
স্মরণীয় করে দিলেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ শতাব্দী থেকে শুরু হল
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে
নতুনভাবে প্রণয় নিবেদন।

সবাই জানে লুকিয়ে প্রেম করার মধ্যে
আছে এক শিহরণ।
তার ওপরে সব দেশেই যখনই হয় -
'বসন্তের' আগমন -
ফুলে ফুলে অলি করে পরাগ মিলন, -
পাখীরা খুঁজে বেড়ায়, তাদের প্রিয় সাথীকে,
বেড়ে যায় তাদের কলকাকলী
মধুর কুজন -
এই ঋতু বরফ গলা জলে তোলে তখন,
মৃদু হিল্লোল, হাওয়ায়,
সঙ্গীতের মূর্ছনা - চিরকালীন প্রেমিক -
প্রেমিকা করে আবাহন তীরবিদ্ধ পাখীটিকে।
গান গায় - কবির 
সুরে "প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো
দোঁহারে -
বাঁধন খুলে দাও - দাও দাও দাও" -
নতুন যুগে নতুন ভাবে এ যুগের
যুবক যুবতী ফুলের তোড়া উপহার 
নিয়ে এগিয়ে যায়। করে
প্রেম নিবেদন, -
ধন্য হয় সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের 
নির্বাসন ও আত্ম বিসর্জন।

জন্মদিনে

চন্দনা সেনগুপ্ত

জন্মদিনে আজ ভাবি বসে,
থাকি যেন সদা হেসে রসে বশে,
প্রতি লোমকূপ কাঁপে যেন মোর
'শ্রী রামকৃষ্ণ' আবেশে।

মৃত্যুর ভয় নাই আজ তাই,
থাকি আনন্দে নাচি গান গাই,
ভুলিয়া 'করোনা' - ত্রাসে।
'শ্রী শ্রী মায়ের' শীতল বক্ষে, -
ঠাঁই দিও ক্ষমাপূর্ণ চক্ষে
পাশে এসো দিন শেষে।

স্বামী-সন্তান মোরে ভালোবাসে,
তাদের নয়নে ঈশ্বর ভাসে, -
রূপ দেখি তাঁর তাই বারবার,
মুক্ত শূন্য আকাশে।





	

দেহ নিবেদন

চন্দনা সেনগুপ্ত

যেদিন জীবন হবে অবসান,
ছেড়ে যাবে মোরে আত্মা বা প্রাণ,
সেদিন অশ্রু ফেলো না তোমরা -
এই দেহখানি করে দিও দান।

বৃদ্ধ বয়সে মোর এ দেহ লাগে নাহি যদি কাজে,
শুয়ে থাকি শুধু অবশ হয়ে গো, নরম বিছানা মাঝে,
লক্ষ টাকার ওষুধ নার্স কে রেখে,জ্বালতন করে বন্ধু স্বজন কে
খরচ করো না বাজে,
উথনেসিয়া করে দিও মোরে, ছাড়ি দুখ ভয় লাজে,
পাঠিয়ে দিও গোচিকিৎসক কে,গবেষক সমাজে l

'ঋষি দধিচি' - ত্যাগে যার রুচি,
পবিত্র তার দেহ ছিল, শুচি,
দেবতার তরে অস্ত্র বানাতে করেছেন তাহা দান,
''স্বেচ্ছামৃত্যু '' অমর করিল, পরহিতে দিয়ে প্রান,-
দৃষ্টান্তটি দেখালো যে পথ
তার লাগি এল স্বর্গের রথ, 
মরন পারেও দেহ পেযে গেল,, অমুল্য় সম্মান l
 
আত্মা যখন ছাড়ি যাবে এই দেহ,
শূন্য হইবে, জীর্ণ খাঁচার গেহ -
তখন তাহারে করে দিও নিবেদন,
যদি কাজে লাগে, তখনও বিকল যন্ত্র,
পায় পুনরায়, সচল করার মন্ত্র,
বাঁচাতে পারবে, আর একটি সে জীবন l 

লোভ

চন্দনা সেনগুপ্ত

"লোভ" নামে একটা দানব আছে।
যে হাঙ্গরের মতন বিরাট হাঁ করে থাকে।
মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে চায় সেই গভীর গহ্বরে।
সেঁধিয়ে যেতে যেতে তাকে অন্ধকার হতে
আরও অন্ধকারে ভীষণ জোরে -
হটাৎ দড়াম করে নীচে দেয় ফেলে।
কোথায় যে সে ফাঁদ পেতে রাখে কে জানে।
তাই প্রলোভনের বশে মানুষ শেষ -
একেবারে তলিয়ে যায়
কোন অতলে।
'লোভ' আবার একা কখনও আসে না।
সঙ্গে বেঁধে আনে তার বন্ধুদের কে।
কাম, ক্রোধ, মোহ, মাৎসর্য্য সবাই বুঝি -
ওৎ পেতে থাকে।
টাকা টাকা টাকা আর যশের পুঁজি থাকে ঢাকা।
সম্পত্তি - প্রতিপত্তি
নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি,
তার মনে তখন করে নতুন লালসার সৃষ্টি,
তখন সে সমস্ত বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে।
কিসের অমোঘ আকর্ষণে,
দিনরাত সে অর্থ গোনে,
ডুবতে থাকে নরক পাঁকে।
কারো প্রতি হয় না যে আর
তখন করুণা বৃষ্টি,
বিনষ্ট হয় সকল শান্তি
ভালোবাসা ও আশা।

আপোষ

কতক্ষন – কতদিন ধরে চলবে?

চন্দনা সেনগুপ্ত

আগ্নেয় গিরি থেকে যেমন করে
'লাভা' উদ্গীরণ হয়,
ঠিক তেমনি ভাবে মেদিনী নয়,
আমাদের সমাজ ভূমি ভেদ করে
ঘটলো বিস্ফোরণ।
বাঙালী জাতির জীবন - হৃদয় - দেহ - মন
সব অদ্ভুত এক কালো ধোঁয়ায় দিল ঢেকে।
কী ভীষণ লজ্জার আবরণ।
করাপশন - করাপশন - করাপশন
শব্দটা ইংরেজী হলেও আর বিদেশী
ভাষার কোষে আবদ্ধ নয়।
কাপ - ডিশ - টেবিল - চেয়ার - পেন - পেন্সিলের
মতন একেবারে খাঁটি বাঙালীর রক্তে
মজ্জায় মিশে হল -
দুর্নীতির অভিনব সংস্করণ।
ব্যাভিচার - অত্যাচার - অন্যায় - অবিচার
কথা গুলো এক হয়ে করলো -
স্বার্থপর মানুষের কার্যকলাপের
নতুন নামকরণ।
আগে সিঁদ কেটে লোকেদের ঘরে ঢুকতো চোর।
বাক্স, প্যাটরা ভেঙে করতো মারধোর।
ডাকাতেরা রণ পা পরে আসতো -
লুঠ তরাজে তারা ছিল সিদ্ধ হস্ত, -
ধরা পড়লে কখনও কখনও খেত
গণ ধোলাই, -
আর কেউ না আটকালে মুখে পড়তো
দুধ মালাই।
কিন্তু এখন? -
চোরের মায়ের বড় গলা, লজ্জা শরমের
নেই কো বালাই।
কারণ, তাদের ছেলেমেয়েদের আর কোনও
রকম প্রাণ বা মান খোয়ানোর
ঝুঁকি নিতে হয় না,
পিস্তল, ছোরা, চাকু, বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে
রাতের আঁধারে বেরুনোর আর
কোন দরকার পড়ে না।
রাজা, উজির, সৈন্য-সেনাপতির সামনে -
নাকের ডগা দিয়ে তস্করের দল -
বুক ফুলিয়ে রাস্তা দিয়ে দিনের
আলোয় করেন সর্বত্র বিচরণ।
ব্যাঙ্ক, এটিএম আর করতে হয় না লুন্ঠন।
কারণ? -
দেশের গরীব অসহায় মানুষেরা দলে দলে এসে
কষ্টোপার্জিত আয় চোর ডাকাত ঠগীদের
হাতে হাঁসতে হাসতে করেন অর্পণ।
বাপ ঠাকুরদার জমি বেচে, মা বৌদির
ভাঁড়ার ছেঁচে, বোনের বিয়ে বা
ভাইয়ের পড়া, দাদার ক্যান্সারের চিকিৎসা
ভুলে নেচে নেচে, হেঁচে হেঁচে তারা চলে -
রক্ষক - ভক্ষক - তথা তক্ষক নামে
যক্ষ রাজাদের পায়ে টাকার থলি করতে
সমর্পন -
তবু কেন? -
আমরা সমগ্র দেশবাসী আর
অবাক হই না তাতে?
এতই কি সহ্যশক্তি বেড়ে গেছে
মানব প্রকৃতিতে।
'দুর্নীতির' সঙ্গে "আপোষ" করতে করতে -
অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, - অশিক্ষিত -
শিক্ষিত মানুষ সমস্ত?
তাই কি যেখানে তাকাই -
ক্রেতা, বিক্রেতা, মুচি, মেথর, শিক্ষক, নেতা
আজ সবাই শুধু করে চলেছে সমঝোতা,
আপোষ।
আদর্শ্যহীন মূল্যবোধ শূন্য
দিশাহারা হয়ে পাগলামি করছে
তরুণ, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ আপামর
জন সাধারণ?
তাদের ছেলের ভবিষ্যৎ, মেয়ের স্বপ্ন
ভেঙ্গে চুরে চুরমার হতে দেখেও
তারা সম্পূর্ণ নির্বাক, মুক, বধির
অন্ধ না হয়েও কলুর বলদ
মাতা গান্ধারীর মতন
চোখ বেঁধে প্রতিবাদের ভাষা ভুলে
স্তাবকতায় করছেন নিজেদের
মনোরঞ্জন ?
আর চৌর্যবৃত্তি যাদের করে না
ক্ষুধা নিবৃত্তি, লোভ চরিতার্থের জন্য
যারা নির্বল, নির্বোধের অশ্রু
পান করে চলেছেন অনুক্ষণ
তাদেরকে নিয়েই মাতামাতি আজ
২৪ ঘন্টা ধরে -
বিভিন্ন চ্যানেলে শেয়ালের মত
হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, কুছ নেহী হুয়া, কুছ নেহী . . .
ক্রমাগত বলে চলেছেন আমাদের দূরদর্শন।
অবাধে হচ্ছে নৈতিকতার হনন।
মানবিকতার নাম নিশানা মুছে দিয়ে
স্নেহ - ভালোবাসা, আস্থা - শ্রদ্ধা পায়ে দলন।
মনে পড়ে কথামৃতের সেই গল্পটাতে ঠাকুর
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের এক চমৎকার
কথন।
স্যাঁকরার দোকানে এসেছে নিরীহ
খরিদ্দার।
মালিক জানতে চান - ওরা কেশব?
কর্মচারী বলেন - "গোপাল" - মানে
"গরুর পাল" তারপর সেও
মালিককে প্রশ্ন করে হরি হরি?
তিনি বলেন - হর হরো।
লোকেরা ভাবেন কৃষ্ণ, গোপাল, হরি বা
শিবের নাম করছেন, তিনি।
কতই পবিত্র শুদ্ধাত্মা।
কিন্তু একদিন না একদিন মুখোশ
খুলে তার চরিত্র স্বরূপের হবে
উন্মোচন।
সর্বদা - আমাদের ভবিষ্যৎ আজ তাই তারই
প্রতীক্ষায় দিন গুনছে?
সবরকম আপোষ ছেড়ে মাটি ফুঁড়ে
যে বিপ্লবীর হবে পুনরাগমন।

লজেনচুষের লোভে

চন্দনা সেনগুপ্ত

এ যুগের দাদু পকেট রাখেন না
আর ছেলে ভোলানো
লজেনচুষ।
নারকেল দেওয়া কমলার রসে ভরপুর -
নাতির মন পেতে
তাকে দিয়ে ছোটোখাটো
কাজ করিয়ে নিতে -
তাঁর জানা ছিল ঐ একটাই
ঘুষ।
ওতে ভরা থাকতো সেই সময়ে তাদের স্নেহ,
শিশুর শৈশব যেত গলে।
আনন্দে এসে কোলে চড়তো সে -
কোনদিকে থাকতো না তার
হুঁশ।
দাদু হতেন টাট্টু ঘোড়া -
গরুর গাড়ীর বলদ জোড়া -
নাতির সঙ্গে রঙ তামাশায়,
 কাটতো জীবন
খুশির নেশায়, আদর স্নেহ ভলোবাসায়
মিষ্টি রসে টুসটুস।
এখন আর তা হয় না,
লজেনচুষ তো কেউ চোষে না,
তাদের খাবার নতুন নতুন
পাস্তা, পিজ্জা আর
 নুডুলস।
দাদু থাকেন গ্রামের ঘরে,
নাতিরা যায় সাগর পারে,
মোবাইলেই দেখা শোনা আশা
ফানুস হয় যে তাই 
 ফুস l

ঠাকুমার ঝুলি

চন্দনা সেনগুপ্ত

ঠাকুমা দিদিমাদের এখন গল্প বলার যুগটা
শেষ।
তাই তাঁরাও আছেন এখন খোস মেজাজে
বেশ।
টিভি সিরিয়ালে চোখ রেখে
সোফায় গা এলিয়ে থেকে
সময় কাটান। মনে লেগে থাকে
নানা রকম ঘটনার
রেশ।
কারণ?
নাতি - নাতনিরা হোমওয়ার্কের দুরুন্ত নদী
পার হয়ে একটু ছুটি পায় যদি -
তখন সুযোগ পেলে
প্রাণ মন সব ঢালে, -
রসালো কার্টুনে।
হাজার হাজার উদ্ভাবনে, -
রোমাঞ্চ, রহস্য, রোবট, ডাইনোসর এলিয়েনে,
নিজেদের একাত্ম করে, -
কিসের অমোঘ আকর্ষণে,
কল্পনার স্রোতে তারা বহে চলে !
রাক্ষস খোক্ষস দত্যি দানা।
পক্ষিরাজের উড়ন্ত ডানা, -
কিম্বা - রাজপুত্র, পরমা সুন্দরী রাজকন্যা -
সবাই এখন বিলুপ্ত।
শিশুরা যখন থাকে ঘুমের দেশে সুপ্ত
স্বপ্ন ভেলায় তলিয়ে যায় -
কোন অতলে, -
তখন ঠাকুমারা তাদের কাছে এসে
অপেক্ষা করেন ঝুলি খুলে,
কিন্তু তারা জাগে না কোনও
রুপোর কাঠি সোনার কাঠি ছুঁলে।

বড় দি

চন্দনা সেনগুপ্ত

বাংলার ঘরে ঘরে অনেক প্রতিমা, মিনতি, রমা দিদি দেখেছি। যাঁরা ভাই-বোনদের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। পরিবারের বৃদ্ধ, শিশু, নারী, পুরুষ সকলের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখতে গিয়ে নানাভাবে ত্যাগ স্বীকার করে এসেছেন।

একটি সেইরকম পরিবারের গল্প এটি। অনিমা, প্রতিমা, অসীমার পরে মায়ের কোলে এল ঘর আলো করা এক ভাই, সঞ্জয়। কিন্তু জন্মের একমাসের মধ্যে তাদের মা হটাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা গেলেন।

১২, ৮, ৬ ও ঐ দুধের শিশুটি নিয়ে অবিনাশবাবু পড়লেন একেবারে সমস্যা সংকুল সমুদ্রের মাঝে। আত্মীয় স্বজন, শ্বশুর শাশুড়ির কথায় তিনি আবার ‘দার পরিগ্রহ’ করলেন, তার বিবাহ যোগ্য দূর সম্পর্কের শ্যালিকাকে। স্ত্রী তাঁর থেকে অনেক ছোট, কিন্তু কন্যা দায়গ্রস্থ বাঙ্গালী মা-বাবা বড় জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে একেবারেই দ্বিধা করলেন না। সেও জেনেছিল, তার কালো রং, অর্থসংকট পিতা-মাতাকে পাত্র পেতে খুবই অসুবিধায় ফেলেছে তাই বিনা দ্বিধায় তিনি ঐ চারটি সন্তানের পিতাকে বিবাহ করে তাদের পালন পোষনের ভার গ্রহণ করলেন। পরের দুই বছরে তাঁরও দুটি সন্তানের জন্ম হল, একটি পুত্র ও একটি কন্যা।

১৬ বছরে বড় মেয়ে অনিমা তখন ঐ পাঁচ ভাই বোনের স্নেহময়ী বড়দি। তার তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে উঠতে লাগল তারা। নতুন মা তার থেকে মাত্র ছয় বছরের বড়। দুজনের মধ্যে আন্তরিক প্রীতির সম্পর্ক। মা রান্না ঘরের সমস্ত কাজ নিজে হাতে করেন এবং তাঁর লক্ষ্মী শ্রী অবিনাশ বাবুর সংসারে শ্রী ফিরিয়ে এনেছে। আর অনিমার স্নেহে শাসনে শিক্ষায় সযতনে পালিত হচ্ছে তাদের পাঁচজন ছোট ভাইবোন।

এক প্রতিবেশী বলেন, “উনি তোর সৎ মা – এর, এসব লোক দেখানি ব্যবহার” – তখন বড় মেয়ে জোর গলায় জবাব দেয়। – ‘সৎ’ বলেই এমন ভালোবাসেন, তোমার মতন ‘অসৎ’ মা হলে কু-শিক্ষা দিতেন। নতুন মা ওর চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে খিল খিল করে হাসেন।

দশ বছর পার হল অনিমা স্কুলে কাজ পেয়েছে। প্রতিমা নার্স। অসীমা খুব ভাল পড়াশোনা করছে। ছোট দুই ভাই ও সবচেয়ে কনিষ্ঠা মেয়েটিও স্কুলের পড়া, নাচে গানে আনন্দে মেতে আছে, দিদির তত্ত্বাবধানে। হঠাৎ অবিনাশ বাবুর ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসা করতে করতে সব জমানো পুঁজি শেষ হয়ে গেল তাঁর। কিন্তু দু বছরের বেশি জীবিত রইলেন না তিনি। নতুন মা কে মনের জোর বাড়াতে, বাবার অফিসেই কম্পেন্সেশন গ্রাউন্ডে কাজ নিতে সাহস যোগালেন ঐ বড়দি অনিমা। মা দশটা – পাঁচটার কাজ নিলেন, সংসারে অনিমার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। প্রতিমা নার্সিং করে কিছু সাহায্য দিত সংসারে কিন্তু তারও একটা সহকর্মীর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতেই অনিমা তাড়াতাড়ি হাসপাতালের সেই যুবক কম্পাউন্ডার এর সঙ্গে বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করল। ওর ছোট ভাই বোন দুটি খুব আদরে আবদারে মানুষ হচ্ছিল এতদিন, এখন সংসারের অবস্থাটা খারাপ হওয়ায় তাদের সব চাহিদা পূরণ করতে না পারায় তারা ক্রমশঃ বেয়ারা হয়ে উঠল। কথায় কথায় ঝগড়া মারামারি লেগেই থাকে তাদের। যে ভাইটির জন্মের পরেই মা মারা গেছেন, সেই সঞ্জয় খুব নিরীহ ও শান্ত। তার সব জিনিস কেড়ে নেয় ঐ ছোট দুজন, খুব জ্বালাতন করে তাকে। তাই নিরুপায় হয়ে অনিমা সঞ্জয়কে ভর্তি করে পুরুলিয়ার সৈনিক স্কুলে। ছোট দুজন তন্ময় ও মধুশ্রী প্রায় মামাবাড়ি বেড়াতে যায়, সেখানে কুশিক্ষা দেওয়ার মতন এক মামী ছিলেন, যিনি ওদের বোঝালেন ‘বড়দি ওর অন্য ভাই বোনেদের বেশি ভালোবাসে।’ তাদের ব্যবহার ও মানসিকতা পাল্টাতে লাগল, এদিকে নতুন মা চাকরি স্থলে গিয়ে এক নতুন জীবনের স্বাদ পেলেন। তাঁর সাজ সজ্জা, সিনেমা, পিকনিকে যাওয়া, সহকর্মী অফিসারদের সঙ্গে বাইরে খাওয়ার সময় বেড়ে যেতে লাগল।

বড়দি অনিমার জীবনেও এইসময় একজন যুবকের আবির্ভাব হল। সে সরকারী ব্যাঙ্কে ভাল চাকরী করে। ভীষণভাবে অনিমার প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু সাড়া পায় না কোনোরকম। একদিন একা পেয়ে প্রস্তাব দিয়ে বসলো বিয়ের। কিন্তু অসীমা তখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে দুর্গাপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পেয়েছে। তার পড়া শেষ হলে, সে চার বছর পরে একটা ভালো চাকরী পেলে তারপর নিজের চিন্তা করবে। শুভময় নামে যুবকটির পক্ষে এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না, বিয়ে হয়ে গেল তার।

এদিকে ছোট ভাই তন্ময় ‘জিম’ জয়েন করে শরীর মজবুত করার দিকে মন দিয়েছে, ছোট বোন মধুশ্রী সারারাত প্রায় ফেসবুকে বন্ধু বানায়, বিউটি পার্লারের কাজ শিখেছে, ফ্যাশন করতে তার খুব ভাল লাগে। নতুন মা ওদের খুব প্রশ্রয় দেন। মাঝে মাঝে ভাই বোনের চালচলন নিয়ে বোঝাতে গেলে তিনি বলেন, “তুই এখনও নিজের পুরোনো খেয়াল নিয়েই রইলি। জমানা, যুগ, বাচ্চাদের ইচ্ছে সব বদলে গেছে। পুরোনো ধারণা পাল্টে ফেল।”

কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা উৎশৃঙ্খল হয়ে উঠতে লাগল। তন্ময় এখন তাদের পাড়ার নামকরা মস্তান, সব রাজনীতি নেতারাই তাকে যখন তখন ডাকাডাকি করতে থাকেন এবং নিজেদের দলের স্বার্থে তাকে ব্যবহার করেন। মারামারি করতে টাকা ধরিয়ে দেন, তার মজবুত শরীরের দিকে লক্ষ্য অনেকেরই। একথা ভাইকে বোঝাতে গেলে মুখের ওপরে কথা বলে সে। “বড়-দি তুমি আমার ব্যাপারে নাক গলিও না please।” ছোট বোন মধুশ্রী ফেসবুকের মাধ্যমে আলাপ হওয়া বড়লোক বন্ধুদের গাড়ি চড়ে বেড়িয়ে বেড়ায়। বাধা দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, নতুন মা ওদের হয়ে সবসময় সালিশি মারেন। এটাই তো বয়স, একটু হৈ হুল্লোড় করবে না ! তার অকাট্য যুক্তি বড়দি অনিমার মূল্যবোধকে ফিকে করে দেয়।

একভাবে কেটে যায় আরও কতগুলো বছর। অসীমা খুব ভালো করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে। GRE দিয়ে সে তার সহপাঠী সুজয়ের সঙ্গে আমেরিকা পাড়ি দেয়, মাস্টার ডিগ্ৰী হাসিল করতে। বড়দি চোখের জল লুকিয়ে তার স্যুটকেস গুছিয়ে দেয়। ওদিকে সঞ্জয় পুরুলিয়ায় সৈনিক স্কুল থেকে পাশ করে NDA তে জয়েন করে সে পুনার পাশে ‘খাগড়াসলা’ চলে যায়। তিন বছর পরে আর্মি অফিসার হয়ে সে বড়দিকে তার কাছে নিয়ে চলে যাবে এই প্রতিশ্রুতি দেয়। খুব আনন্দ হয় অনিমার সন্তানতুল্য ঐ দুই ভাই বোনের সাফল্যে। চুলে পাক ধরেছে তার। নতুন মা চুলে রঙ করেন পার্লারে গিয়ে রূপ চর্চা করেন। ছয় বছরের ছোট হয়েও অনিমাকে তার থেকে বড় মনে হয়।

হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে বাড়িতে তার মা ও ছোট বোন কথা কাটাকাটি ও কান্নাকাটি করছে দরজা বন্ধ করে। কিছু একটা অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত ব্যাপার হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অনিমা ইদানীং নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে, কাউকে কিছু বলে না, কি হয়েছে জানতেও চায় না। প্রায় ভাবে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে।আজও নিজের জন্য দুটি রুটি আর আলু পেয়াঁজ ভাজা করে খেতে বসেছে, হটাৎ নতুন মা চিৎকার করে ডাক দিলেন তাকে। অনিমা দেখো কি কান্ড করেছে মধু, ছুটে গিয়ে হতভম্ভ হয়ে গেল বড়দি।

একটা ওড়না নিয়ে গলায় জড়িয়ে ফাঁস লাগাচ্ছে বোনটি, মা তার হাত ধরে আছেন। অনিমা এক চড় মারল তাকে এবং মা কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওড়না টা টান দিয়ে কেড়ে নিল তার হাত থেকে এবং গলার ফাঁসটি খুলে তাকে খাটে শুইয়ে দিল জোর করে। ‘কী ড্রামাবাজি হচ্ছে এসব? কি হয়েছে বল আমাকে। এবারে – বড়দি বড়দি বলে কেঁদে জড়িয়ে ধরলো সে, মুখটা তার বুকে গুঁজে দিয়ে।

নতুন মা রাগে দুঃখে হাঁফাচ্ছিলেন – বললেন – “মুখে কালি মেখে বাড়ি এসেছেন মহারানী – আজকে বমি করছে দেখেই সন্দেহ হল। কিন্তু এই ক’মাস কেমন লুকিয়ে রেখেছে দেখ, সর্বনাশী মেয়ে।

অনিমা বলল – ‘তুমি ও ঘরে যাও, একটু চোখে মুখে জল দাও। শান্ত হও। আমি দেখছি। বোনকে আদর করে অনেকক্ষন দু হাত দিয়ে জাপ্টে ধরে রাখলো। সময় দিল কাঁদবার। সে স্বাভাবিক হলে, শুধু জিজ্ঞেস করলো – “এখন কয় মাস চলছে? তুই কি করতে চাস?” – “পাঁচমাস দিদি।” এতদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম যার বাচ্চা সে যদি বিয়ে করতে রাজী হয়। কিন্তু – – – – আবার ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। অনিমা জানতে চাইলো না যে সে কে, শুধু ভাবতে লাগল এই মা ও সন্তানকে বাঁচাতে হলে কি করা উচিৎ তার।

স্কুলের এক বান্ধবীকে ফোন করল। ক’দিন ধরেই বলছিল যে এবারে গরমের ছুটিতে তার সঙ্গে রাঁচীতে তাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। প্ল্যান বানিয়ে ফেলল, তার সাথে বোনকে নিয়ে যাবার। ছয় মাসের ছুটি নিল স্কুলে। ঝাড়খণ্ডের অচেনা অজানা পরিবেশে এক অখ্যাত ছোট হাসপাতালে মধুশ্রীর বাচ্চা প্রসব হল। চমৎকার ফুটফুটে এক মেয়ে। একটু সুস্থ হলে বোনকে ঐ গ্রাম থেকে পাঠিয়ে দিল, রাঁচী শহরে ঐ বান্ধবীর আন্তরিক সাহায্য পেল সে এই কাজে। নতুন করে কলেজে ভর্তি হয়ে বোন পড়ানো শুরু করল, বড়দির তত্ত্বাবধানে সেদিন থেকে তার জীবনে এল, এক বিরাট পরিবর্তন। নিজের পায়ে দাঁড়াবার অঙ্গীকার নিয়ে সময় নষ্ট করা ছেড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানান ভোকেশনাল ট্রেনিং নিতে আরম্ভ করল মেয়েটি।

সদ্যঃ জাত শিশু কন্যাটির জন্য আগেই সে যোগাযোগ করেছিল রাঁচির এক মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তারা ফেলে যাওয়া শিশুদের রাখে আবার adoption এর জন্যেও অনেকে বাচ্চা দত্তক নেয়, সেখান থেকে। সেখানকার সিস্টার সুন্দর কন্যাকে সাগ্রহে গ্রহন করলেন।

হঠাৎ শুরু হল কোভিড মহামারী। করোনার প্রকোপে বিনা নোটিশে সারা দেশে “লক ডাউন” ঘোষণা হল, বাস, ট্রেন, প্লেন সব বন্ধ হয়ে গেল।

অনিমাকে সিস্টার অনুরোধ জানালেন, – “আপনাকে এখানেই থাকবার ঘর দিচ্ছি আমরা। আমাদের ট্রাইবাল মেয়েদের স্কুলে শিক্ষিকা খুব কম। থেকে যান না আপনি আমাদের সঙ্গে।”

“বড়দি, বড়দি please তুমি ওখানেই থেকে যাও, এটাই হয়ত ঠাকুরের ইচ্ছে।” ফোন করলো ছোট বোন মধুশ্রী। – “ক’টা বছর আমাকে দাও। একটু নিজের পায়ে দাঁড়াই তারপরে মেয়েকে আমি আবার নিজের কাছে নিয়ে আসবো, শুধু দেখো, ওকে যেন অন্য কেউ দত্তক নিয়ে চলে না যায়।”

বোনের ও ঐ সিস্টার (নান) অ্যালিসার কথা যেন সত্যি অনিমার ঈশ্বরের নির্দেশ বলে মনে হল। সে থেকে গেল ঐ ছোট পাহাড়ঘেরা আদিবাসীদের গ্রামের মিশনারী আশ্রমের স্কুলে। মনে হল যেন জীবনে একটা নতুন আশার আলো দেখতে পেল সে। বাঁচবার জন্য অসহায় অনুন্নত কন্যাদের হাতগুলি চেপে ধরল সে। সিস্টারও তার মতন একজন বুদ্ধিমতী স্নেহময়ী হাউস মাদার – টিচার তথা সেবিকাকে সাথী হিসাবে পেয়ে খুব খুশী হলেন।

ওদিকে নতুন ফোনে জানালেন যে ভাই সঞ্জয় দুই দলের গুন্ডাদের কাছেই প্রচন্ড মার খেয়ে, হাত পা ভেঙ্গে বিছানায় শয্যাশায়ী। বড়দির কাছে সে ক্ষমা চেয়েছে। নতুন মায়ের অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। এই মহামারী তাকেও অনেক বড় শিক্ষা দিল। মা ও ছেলের জীবন এবার নতুন ধাতে বইতে শুরু করেছে। তারা দুজনেই আবার স্বাভাবিকভাবে আর পাঁচজন ঘরোয়া পরিবারের মতন করে সময় কাটাতে শিখেছে। মা ছেলে দুজনেই রান্না ও পরিশ্রম করতে ভালোবাসতো। আগের মতোই দুজনে মিলে বাড়িতে রান্না করে এবার ঘরে টিফিন সার্ভিস দিতে শুরু করল। এটাও বড়দি অনিমার বুদ্ধিতে হল। বিশেষ করে কোভিড রুগীদের কেউ দেখার নেই, তাই ফোনে App অ্যাপ বানিয়ে ঐ ছোট শহরের বহু পরিচিত ও অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলল তন্ময়। ভাইকে একটা বাইক কিনে দিল অনিমা ঐ দূর থেকে গুগল পে-এর মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে। মা কে আমাজন থেকে অর্ডার করে বড় বড় কুকার ও অনেকগুলি টিফিন বক্স কিনে দিল, যা দিয়ে এই ব্যবসা সুন্দর করে চলতে লাগল তাদের।

আজ মনে অদ্ভুত আনন্দ, শান্তি ও সফলতার গর্ব অনুভব করল অনিমা। আমাদের মতন লেখক/পাঠকদের মনে হল – অসাধ্য সাধন করেছেন এই “বড় দিদি”। এ যুগেও এরকম অনেক দিদি পাওয়া যায় বহু ঘরে ঘরে।

দিদি

চন্দনা সেনগুপ্ত

‘জননীর প্রতিনিধি’ – কর্মভারে অবনত – অতি ছোট এক ‘দিদি’কে নিয়ে রবিঠাকুর যে ছোট্ট কবিতার মধ্যে এক অববদ্য তথ্য ব্যক্ত করেছেন, তা পড়ে বিশ্বের সমস্ত ভগিনীর প্রতিচ্ছবি পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

প্রত্যেক গৃহে আমাদের বাংলায় শুধু নয়, ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে লক্ষ লক্ষ বোন ও দিদিরা তাঁদের ভাই-বোনদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কর্ত্তব্য পরায়ণতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। মাতা-পিতার সঙ্গে সঙ্গে বড় দিদিদের আন্তরিক আদর যত্ন ও আত্মত্যাগের বহু উজ্জ্বল কাহিনী আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত রূপে হাজির হয়।

পূর্ণিমার আলো যেমন এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায় রাত্রির অন্ধকারকে শুভ্র জোছনায় ভরিয়ে দেয়, পরিবারে একজন বড় দিদি থাকলে তার স্নেহ মমতায় ছোট ভাই-বোনদের জীবনেও ঠিক সেইরকম কোমল পরশ বুলিয়ে দেয়।

মায়ের হাতে হাতে কাজ করা, বাবার ছোটোখাটো সব প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা, ভাই-বোনদের স্নান, খাওয়া, পড়ানো, পোশাক-পরিচ্ছদে সাজানো, খুব দুধের শিশুদের কোলে পিঠে নিয়ে ঘোরা, ঘুম পাড়িয়ে তবে দিদির ছুটি হয়।

গরীবের ঘরে বাসন মাজা বা কাপড় কাচা, রান্নায় সাহায্য করা সবই দিদিরা করে থাকে। ধনী পরিবারেও দিদি লক্ষ রাখে ভাইটির রেজাল্ট ভাল হওয়া বা চারিত্রিক গঠনের প্রতি। বাবা – মা তাঁদের অর্থ উপার্জন বা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় দিদি খেয়াল রাখে ভাই – বোন কি ধরণের বন্ধুদের সাথে মিশছে, কোন পথে যাচ্ছে। তার স্বভাব ও অভ্যাস ভাল হচ্ছে কিনা। স্কুলে, কলেজে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঠিকমত আচার আচরণ করছে কিনা। দিদির দায়িত্ব পরিবারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 সারু দিদি

মায়ের বাড়ি ছিল, বাঁকুড়া জেলার জয়রাম বাটিতে। তাঁর দরিদ্র পিতার দেহাবসানের পর ছোট ছোট ভাইদের রক্ষণাবেক্ষনের ভার তিনি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন। ছোট ভাই অক্ষয়কে ডাক্তারি পড়তে কলকাতায় পাঠানো হয়, কিন্তু তরুণ বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে ঘরে অল্প বয়সী ভাতৃবধূ তখন অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুতে সে পাগল হয়ে যায়। তাঁর কন্যা জন্মায় সেই রাধিও প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে থাকে। সারদা-মা অতি ধৈর্য্য সহকারে তাদের লালন পালন করতে থাকেন। একদিকে তাঁর সাধক স্বামী ও অন্যদিকে ছোট ভাইয়ের সংসার। সমান সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দুইদিকেই সামাল দিতে থাকেন। গ্রামের অন্য ভাইরা আবার ক্রমশঃ স্বার্থান্বেষী হয়ে ওঠে। মা কে কষ্ট দিতে থাকে। নিজেদের মধ্যে জমি জমা নিয়ে লাঠালাঠি মারামারি করতে থাকে। মা কত বোঝান কিন্তু তারা কথা শোনে না। দিদির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মা যে কত ভাবে হেনস্থা বা অপদস্থ হন, কষ্ট ভোগ করেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। নিজে এত বড় একজন মহীয়সী মহিলা, সাধিকা তথা বিবেকানন্দের মতন শিষ্যদের মা হয়েও বড় বোনের কর্ত্তব্য পালনে তিনি কোন ত্রূটি করেননি। ভাইয়ের মেয়েদেরও তিনি বিয়ের ব্যবস্থা করেন, বিপদে আপদে সাহায্য করা অথবা প্রয়োজন হলে দুঃখী ভাইঝিদের নিজের কাছে এনে রাখার ব্যবস্থা করে চলেন নির্ধিদ্বিধায়।

তাঁর মতন অসামান্য দিদির চরিত্র আমাদের মাথা নত করে দেয়। ভাইয়েরা বা তাদের পরিবারগুলি তাঁর দেবীত্ব মহানুভবতা উদার ভাবটি তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণের জ্ঞানী, তপস্বী শিক্ষিত সন্তানদের তিনি সংঘ জননী নন, দীক্ষা দাত্রী গুরুমা ছিলেন। গ্রামের মানুষেরা কিন্তু সেই সারু কে অসাধারণ এক দিদি বলেই জানে।

এই ধরণের নিরাসক্ত ঠাকুর ভক্ত – স্বাত্তিক ভাবাপন্ন মহিলাদের অবদান আমাদের সমাজে অনেক পরিবারেই পাওয়া যায়। “শ্রী শ্রী মা সারদা” তো এঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্টা।

মাধবীলতা – বড়দি

আমার বাবার বয়স যখন মাত্র দুই/আড়াই বছরের তখন তাঁর মা মারা যান তাঁর বড়দিদি মাধবীলতা তখন মাত্র ১৩ তে পা দিয়েছেন এবং ১৯ বছরের স্বামীর মৃত্যুর পর বাপের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। বাবা ডাক্তার পূর্ণচন্দ্র কিন্তু আর বিয়ে করেননি। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে মাধবীলতার থেকে ছোট।

নিরামিষী আহারে অভ্যস্ত সাদা থান পরা, সেই মেয়েটি তার চারটি ছোট ভাই-বোনের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বাবা ডাক্তার। সাঁকতোড়িয়া হাসপাতালে রুগীদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়ে যখন বাড়িতে আসেন তখন পুজো-পাঠে মন দেন। ছেলেদের পড়াশোনা দেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। বড় মেয়ে তাদের যত্ন ও দেখাশোনার ভার নেওয়ায় পিতা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন। 

ধীরে ধীরে ভাইরা বড় হয়ে উঠতে থাকে, ছোট বোন দুর্গার বিয়ে দেওয়া হয় এক তরুন ডাক্তারের সঙ্গে কিন্ত সে ও দিদির মতই খুব অল্প বয়সে স্বামী কে হারিযে ঘরে ফিরে আসেন,তার জীব্নে ও এই দিদি মাযের মতন স্নেহ দিযে তাকে সন্গ্রাম করতে সাহাজ্য করেনl  বড় ভাই ডাক্তার, মেজো ভাই কোলিয়ারীতে বড় ইঞ্জিনিয়ার ও ছোট ভাইটিও ডাক্তার হয়ে বিবাহযোগ্য হন। দিদি ভাই-এর বৌদের হাতে সংসার তুলে দেন। বাবার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ ভাবে সংসারের দায় হতে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং ঠাকুর ঘরের গিরিধারীর পূজা অর্চনায় তাঁর সময় কাটান।  সংসারের প্রতি এই মোহহীন ‘সাধিকা’ দিদিকে পরে সবাই ‘ঠাকুর ঘরের দিদি’ আখ্যা দেন। এরকম অনেক সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়েও অসাধারণ নিরাসক্ত কামকাঞ্চন ত্যাগী নারী চরিত্র আমাদের শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থে আমরা বহু পেয়ে থাকি।

ভগিনী নিবেদিতা

এই বিদেশিনী দিদিকে সবাই Sister Nivedita বলেই জানে, বাঙ্গালী বোনেদের জীবনে তিনি আসেন, জ্ঞানের আলো জ্বালাতে। বিবেকানন্দ, ও শ্রী শ্রী মায়ের কৃপা লাভ করে, এই মহিয়সী নারী আপন দিদির মতন যত্ন নিয়ে তার বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিধবা ও অসহায় বহু কন্যা শিক্ষা লাভ করে ধন্য হন, এখনও সেই স্কুল কত সন্ন্যাসিনী মাতাজীদের তৈরী করে সারদা মঠে পড়া লেখার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নারীকে আদর্শের ও মূল্যবোধের পাঠ পড়াচ্ছেন। দেশে প্লেগ মহামারী এলে নিজের প্রান তুচ্ছ করে মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতে দ্বিধা বোধ করেননি, এই রকম দিদি পেয়ে আমরা মুগ্ধ্য হয়েছি।

বৌদি

চন্দনা সেনগুপ্ত

আমি উষা। বয়স ৩৬ বছর। ছোট থেকেই জ্যেঠিমার কাছে মানুষ হয়েছি। বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আমার মা ও আমাকে জ্যেঠিমার কাছে নিয়ে আসা হল। কিছুদিন পরে মা ও মারা গেলেন, জ্যাঠামশাই বাইরে চাকরী করতেন, রাশভারী মানুষ ছিলেন, তাঁকে আমরা বেশি কাছে পেতাম না। দাদা দিদিরা সবাই পড়াশুনাতে ভালো ছিলেন, তাঁরা নিজের নিজের স্কুল কলেজে ব্যস্ত থাকতেন। ছোটবেলায় পোলিও হয়ে আমার পা টি ছোট হয়ে যায়, তাই বিয়ের কোনও প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়নি, তাই ঠাকুমা, জ্যেঠিমা ও মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজেই আমি ব্যস্ত থাকতাম। অবসর সময়ে সেলাই, বড়ি দেওয়া বা আচার দেওয়া, বাড়ির বড়দের সেবা শুশ্রষাতেই সময় কেটে যেত। জীবনটা খুব স্বাভাবিক ছন্দেই বয়ে চলতো। কোনোদিন নিজের সংসার না হওয়ার জন্যে মনে খেদ বা দুঃখ বোধও ছিল না। বাড়ির পরিবেশটি সুন্দর করে রেখেছিলেন, আর একজন মানুষ। জ্যেঠিমার বৌমা, আমার প্রিয় বৌদি।

দাদা ডাক্তার হওয়ায় খুব ব্যস্ত থাকতেন হাসপাতাল ও নিজের রুগীদের নিয়ে। আমাদের সময়ে বড়দের সামনে একসঙ্গে বসে অল্পবয়সী স্বামী-স্ত্রীকে গল্প করতে বা হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকতে কেউ দেখতে পেতেন না। প্রত্যেকেই সংসারে নিজের নিজের কর্ত্বব্য নিদৃষ্ট করে দেওয়া দায়িত্বতে ও কাজে মন নিবেশ করতে ভালবাসতেন।

জ্যেঠিমার ছোট ছেলে আমার ছোট দাদা আর্মিতে চলে যান এবং বরাবরই বাড়ির বাইরে থাকেন। তাঁর স্ত্রীও বাঙালি নন, তাই তাঁর সঙ্গে পরিবারের বন্ধন ক্রমশঃ ছিন্ন হয়ে এসেছে। অতএব বাড়ির সর্বময়ী কর্তৃ বৃদ্ধা ঠাকুমা, প্রৌঢ়া শাশুড়ি, নিজের শ্বশুর, স্বামী ও তিন ছেলে মেয়ে সবাইকার দেখাশোনা, গৃহ কর্ম পরিচালনার ভার ওই বৌদিদির ওপরে। আমি সবসময় তাঁর হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিই বলে, আমাকে ছাড়া তার একপাও চলেন না। সর্বদা কানে তাঁর ডাক শুনতে পাই আমি – ”উষা, উষি – এ্যাই উষশী গেলি কোথায় মুখপুড়ি, বিকেল গড়িয়ে গেল যে, ছাদের থেকে কাপড়গুলো তুলে নিয়ে আয়, কাপড় ছেড়ে সন্ধ্যেটা দিয়ে দে না রে বোন, আমি ঠাম্মা কে সাবু সেদ্দ খাইয়ে আসি।”

ওদিকে জ্যেঠিমা ডাক দিলেন, – “ও মা উষি চুলটা বেঁধে দিয়ে যা, বাতের ব্যাথাটা বড় বেড়েছে হাতটা যে নাড়তে পারছিনা মা।”

ছুটে ছুটে কাজ করতে করতে আমার ভালো লাগে। আজ নিজের ডাইরী লিখতে বসে মনে হল, নিজের কথা ছেড়ে আমার বৌদির কথা লিখতে পারলে আমি ধন্য হয়ে যাব।

ঠাকুমার খুব পেট খারাপ, বারেবারে কাপড়ে চোপড়ে পায়খানা হয়ে যাচ্ছে। বৌদি সেগুলি কেচে, ঠাম্মাকে পরিষ্কার করিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিচ্ছেন। কখনও সস্নেহে চিড়ে দই খাওয়াচ্ছেন, গামছা ভিজিয়ে মুখ মুছিয়ে আবার তাঁর ফোকলা মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। সেদিন ভোরবেলায় উঠে জ্যাঠামশাই প্রাতঃ ভ্রমণে বেরুতে যাচ্ছেন, দেখতে পেলেন ঠাকুমার ঘরের সামনে এক দলা ‘গু’ পড়ে আছে। ডাক দিলেন, ‘বৌমা দেখোতো এখানে বেড়াল, কুকুরে পায়খানা করে রেখেছে না কি?’ বৃদ্ধা ঠাম্মা লজ্জা পেয়ে ঘর থেকে বেশ জোরে আওয়াজ দিলেন – ‘ওরে বৌমার ছোট ছেলেটার বোধহয় পেট ছেড়েছে, দেখতো উষা কোথায় ময়লা করে ফেললো।’ আমাদের ছোট্ট ভাইপো ৭ বছরের বিট্টু তখন স্কুলে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছে, বড় ঠাম্মার দোষারোপ শুনে রেগে আগুন তেলে বেগুন হয়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল – “দেখো দেখো আমার পাছায় গু লেগে আছে কিনা? আমি এত বড় ছেলেটা এখানে ওখানে হাগু করে বেড়াবো? বড় ঠাম্মা আমার নামে কেন মিথ্যে বললো? আমি স্কুলে যাব না” – কান্না শুরু হল তার। –

এবার বৌদি আদর করে তাকে বোঝাতে বসলেন ঘরে নিয়ে গিয়ে। কি সুন্দর তার কায়দা। বললেন ,-

”জানো ৮০ বছর বয়স হলে মানুষ একেবারে শিশু হয়ে যায়। তখন তার মনের বয়স আবার শূন্য থেকে গুনতে হয়।ঠাম্মার এখন ৮৩ বছর, তাহলে তার মানসিক বয়স কত বলতো – ছেলে উত্তর দিল 3  উত্তর দিল। আর তুমি? – ৭, এখন তাহলে কে বড় তুমি নাকি ঠাম্মা? বুড়ো-বুড়িরা এখন বাচ্চা হয়ে গেছে, – তাদের কথা ধরতে নেই।

ছেলে চোখ মুছে আবার স্কুল ইউনিফর্ম পরতে পরতে বললো – ‘তাহলে আমি ঠাম্মার চেয়ে ৪ বছরের বড়। ঠিক আছে, ছোট বোনকে আজকে মাফ করে দিলাম।’

আমি বৌদির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তিনি নির্বিকারভাবে ঐ ময়লা সব পরিষ্কার করে ঠাম্মার বিছানাও পাল্টে দিলেন।

সেদিন জ্যেঠিমা ও ঠাকুমা দুই ৮৭ ও ৬৪ বছরের বৃদ্ধাদের ডাক্তারবাবু এসে বৌদির খুব প্রশংসা করে গেলেন। বড়দা কে বললেন –

”তুমি খুব ভাগ্যবান এরকম লক্ষ্মীমন্ত বৌ পেয়েছো। আজকাল ‘জেরিয়াটিক’ সাইকোলজি’ পড়েও নার্সরা বুড়ো-বুড়িকে এত সুন্দর যত্ন করতে পারে না। আমি পরে ঐ কথাটির মানে খুঁজে বেড়ালাম। শিশু মনস্তত্ব নিয়ে অনেক পড়াশোনা রিসার্চ হচ্ছে। অনেকে বই লিখেছেন, শিক্ষিকা হতে গেলে সেগুলির ব্যাপারে জানতে হয়। কিন্তু বুড়োদের জন্য যে jeriatric pycholgyটা জানতাম না,  বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায় প্রায় ৯০ ভাগ লোকের। হয় তারা সব ভুলে যান বা বেশি সচেতন, খিটখিটে হয়ে পড়েন। শরীরের সঙ্গে মাথার মনের স্মৃতিশক্তির যে সম্পর্ক সে বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও তাঁদের ওপরে পরিবারের লোকেরা বিরক্ত হয়ে যান, শুধু তাঁদের ধৈর্য্য না থাকার জন্য।

আমাদের এই ‘বৌদিদি’টি তার একেবারেই ব্যতিক্রমী। তাঁর আরও কয়েকটি সক্রিয় কাজের এর দৃষ্টান্ত দিলে পাঠক-পাঠিকারা আরও প্রেরণা পাবেন, এবং বয়স্কদের সেবায় ভালোভাবে নিযুক্ত হতে পারবেন।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগেরদিন বৌদি বাজারে গেছেন দীনুকাকাকে সঙ্গে নিয়ে, নিজের পছন্দ মত ঠাকুর ও পুজোর সামগ্রী আনতে। প্রতিমাটি সুন্দর না হলে তাঁর মন খুঁত খুঁত করে।

আমি ,কাজের মাসী ও মণিদি তিন জন মিলে বসে গেছি, নারকেল কুরিয়ে নাড়ু বানাতে। একদিকে বানিয়ে থালায় রাখছি, একটু পরেই আমার তিন ভাইপো ভাইঝি ও এসে তা চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে। খুব জ্বালাতন হয়ে নাড়ু করা বন্ধ করে ঠাকুমার খাওয়ার রান্না করে তাঁকে খাওয়াতে গেছি – কিন্তু খুব গম্ভীর বিষণ্ণ বদনে বলে দিলেন, তাঁকে খাওয়ার দেওয়ার দরকার নেই।

বুঝলাম বৌদি না এলে খাবেন না। বৌদি এসেই আমাদের বকাবকি শুরু করলেন, “কিরে মা, ঠাকুমার এখনও খাওয়া হয়নি?”

জ্যেঠিমা মাথা ধরেছে বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, – ঠাকুমা তাঁর কথা শোনেন না, শুধু তাঁর নাত-বৌ কে মানেন, ভেবে তাঁর দুঃখ হয়েছে, কারন আমারদের হাত থেকে খাবার থালা নিয়ে তিনি তাঁর বুড়ি শাশুড়িকে খাওয়াতে গিয়েছিলেন, কিন্তু অকারণে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বুড়ি মা। “আমার আর খাওয়ার দরকার নেই, তিন কাল গিয়ে এক কাল ঠেকেছে, এবার গেলেই বাঁচি।”

বৌদি চারিদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর হেসে বললেন – “দে এবার আমায় থালাটা। আমাদের বানিয়ে রাখা এক মুঠো সাদা নারকেল কোরা তুলে একটা বাটিতে নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন, -“ঠাম্মা দেখো কি এনেছি।” ফোকলা দাঁতে একমুখ হাসি হেসে তিনি থালার দিকে চেয়ে ভীষণ খুশী হয়ে গেলেন। ঠিক যেন পাঁচ বছরের কন্যা। জ্যেঠিমা এবার মুখ খুললেন। “ও এইজন্যই বুড়ির এত রাগ।”

এমনিতে কানে কম শোনেন, কিন্তু ঐ ‘বুড়ি’ কথাটা ঠিক কানে গেল।

“কি বললে বৌমা, আমি বুড়ি?” তুমি বুড়ি হও নাই? তুমিও নাতির ঠাকুমা হয়েছো?” তারপর আদর করে বললেন, “নাতবৌ কেমন বুঝতে পারে – কখন কি চাই। ছেলে পুলেরা সবাই নারকেল খাচ্ছিল, আমায় তো দিলে না। বড় খোকাও একটা টুকরো নিয়ে কডর মডর করে চিবিয়ে খেলে, আমার কি দাঁত আছে?”

ঠাকুমা কে শান্ত করে এবার জ্যাঠামশাই ও জ্যেঠিমা কে বাটি ভরে শুক্তো, মাছের ঝাল সাজিয়ে ভাত বেড়ে দিলেন। তাঁরাও খুশী হয়ে পান চিবুতে চিবুতে দিবা নিদ্রায় গেলেন।

বৌদি আমাদের সঙ্গে রান্না ঘরে হাঁড়ি কুড়ি সব নিয়ে খেতে বা খাওয়াতে বসতেন। বারবার করে তাঁর ঐ আন্তরিকতায় মুগ্ধ হতাম আমরা – “উষা আর একটা মাছ ভাজা নে, তুই তো আবার ঝাল দেওয়াটা খাবি না। মাসি দু হাতা ভাত নাও, চাটনি মেখে খেও শেষ পাতে, মনি তুই ডাল মাখ না, এতো শুকনো শুকনো খাচ্ছিস কেন?” ইত্যাদি কথায় গল্পে আমাদের সকলের সারাদিনের পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দিতেন তিনি। লক্ষ্মী শ্রী বোধহয় একেই বলে। শুধু বাড়ির লোকদের নয়, বাইরেও তাঁর দয়ালু পরোপকারী মনটা সর্বদা সবদিকে লক্ষ্য রাখতো। সেদিন বৌদির সঙ্গে ডাক্তারখানায় ওষুধ আনতে গেছি, দেখলাম একটি ঘোমটা টানা গ্রাম্য বৌ ছেলে কোলে নিয়ে একধারে বসে আছে, আর কয়েকটি লোক তার পাশে এসে বসবার বা কথা বলার চেষ্টা করছে।

বৌদি রুখে দাঁড়ালেন – “কি ব্যাপার তোমরা এদিকে কেন? বাইরে বেঞ্চিতে গিয়ে বসতে পারছো না? তোমাদের তো ওষুধ নেওয়া হয়ে গেছে।” ছেলেগুলি বাইরে গেল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ভাল নয় দেখে, বৌদি সেই মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে রিক্সা করে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলেন। কিন্তু সে সবে শহরে এসেছে, ঠিকানা বলতে পারছে না, খুব ভয় পেয়ে গেছে। তার স্বামী দোকানে রান্না করে। ডাক্তারখানায় বসিয়ে দিয়ে গেছে, ছেলেটার জ্বরের ওষুধ নিতে। একঘন্টা পরে আসবে বলেছিল কিন্তু তিনঘন্টা হয়ে গেছে। চেম্বার বন্ধ করে ডাক্তারবাবু বাড়ি যাচ্ছেন, এই অবস্থায় ঐ বৌটিকে নিয়ে খুঁজে খুঁজে তার স্বামীর দোকান বের করে তাকে ডেকে ঐ বৌটিকে সঁপে দিয়ে বকুনি ও কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি এলেন বেশ অনেক রাত্রে। লোকটিকে তার রেস্টুরেন্ট এর মালিক ছাড়েনি, বহু খরিদ্দার খাবার খেতে আসায়। সে ঘড়ি দেখেনি মুখ বুজে তন্দুরি রুটি বানিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের বৌদি না পৌঁছে দিলে, ঐ বৌ টি যে কত রকম বিপদে পড়তো, ঐ অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে, সে বিষয়ে তাদের ধারণাই ছিল না। বাড়িতে দেরী করে ফেরার জন্য শাশুড়িকে মিথ্যে কথাও বলতে হল।

– ‘এতক্ষণ দেরী কেন বৌমা?’

– ‘ডাক্তারবাবুর কাছে আজ বড় ভিড় ছিল মা, ওষুধ দিতে খুব দেরী করলেন তাই

– আমি হাসতে হাসতে বললাম, – ‘বৌদি তুমি দেখি বেশ বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতেও পারো

– ‘আরে এগুলো সব “সফেদ ঝুট,” কারো কোনো উপকার করলে বলে বেড়াতে নেই। তাছাড়া এঁরা বয়স্ক মানুষ, ঐ ঘটনা – গুন্ডাদের থেকে একটি অসহায় গ্রাম্য মেয়েকে বাঁচানো – এ সব ওরা বুঝবেন না, শুধু শুধু টেনশন করবেন, আমাকে বকুনি দেবেন, কেন মোড়লি করতে গেছি ভেবে। তাই একটু আধটু মিথ্যে বলি, মাঝে মাঝে। তারপরে আমার মাথার পেছনে আলতো করে চাটি মেরে বললেন – “উষা তোকে ট্রেনিং দিচ্ছি ,আমি যখন বুড়ো হবো তুই  ও বলিস আমাকে।”

‘সত্যি বৌদি পারোও বটে’,- বলে অন্য কাজে মন দিতেই শুনতে পেলাম জ্যাঠামশাই এর চেঁচামেচী।

-“আমার চামচ, আমার চামচটা কোথায় নিয়ে গেল, হতভাগা দিনুটা? উষা, উষি – – –

আমি ভাবলাম তিনি তাঁর গ্যাসের এ্যাসিডিটির জন্য চামচ দিয়ে লিকুইড ডাইজিন খাবেন, ওনার বিছানার পাশের টেবিলে সব রাখা থাকে, ওটা হয়তো কেউ সরিয়েছে। তাই ছুটে গেলাম রান্নাঘর থেকে একটা চামচ ধুয়ে নিয়ে। সেটি দেখে তো উনি আরও রেগে গেলেন, “ঐটা চেয়েছি? ইয়ার্কি হচ্ছে?” বৌদি ছুটে এলেন, এক মুহূর্ত শ্বশুরের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেললেন তাঁর মনের কথা। তাড়াতাড়ি টেবিলের নিচে পড়ে থাকা তাঁর পড়বার চশমাটি তুলে হাতে দিলেন। কারণ তাঁর হাতে রাত্রে পড়বার ‘কথামৃত’ বইটি ধরা ছিল।

খুব খুশী হলেন, “তাইতো বৌমা ওটা পড়ে গিয়েছিল।” আমরা সবাই হাসতে লাগলাম।

পরের দিনও বাজার থেকে ফিরে যখন থলিটি নামালেন, দেখা গেল সব উল্টোপাল্টা করেছেন – কলার জায়গায় মূলো, তোয়ালে আনতে তুলো এনেছেন কিনে। আর বৌমা কে বলছেন, “আমার চশমা, ছাতা কোথায় গেল বৌমা?”

বৌদি ছুটে বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে তাঁর ঘরে পরার চপ্পল, গামছা ও লুঙ্গি নিয়ে। ডাক্তার স্বামীকে বললেন, – বাবার স্মৃতিভ্রংশ অসুখ কি যেন নাম – ডিমনোশিয়া শুরু হয়েছে। ওনাকে আর বাজারে, ব্যাংকে যেতে দিও না।

বড় প্রশংসাপূর্ন চোখে তাকালেন স্বামি, ও অতি কৃজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে স্বীকার করলেন, আমি তো এতো রুগী দেখি, কিন্তু তুমি এই তিনজন বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে এতো সুন্দরভাবে শিশুর মতন করে লালন পালন করছো, তাদের রোগের পূর্বাভাস দিচ্ছো – যা দেখে সত্যিই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।

পনেরো বছর পার হয়ে গেল, এই ভাবে নানা সমস্যার সমাধান করতে করতে। আমি এখন ৫২ আর বৌদি ৬০ বছরের প্রৌঢ়া মহিলা।

ঠাকুমা, জ্যেঠিমা, জ্যাঠামশাই সবাই গত হয়েছেন। তিন ভাইপো ভাইঝি সবাই দেশের বাইরে। এখন পাসপোর্ট ভিসা করে তাঁকে প্রায় ই আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই ছুটতে হয়, নাতি-নাতনিদের মুখ দেখবার জন্য ৬ মাস করে তাদের দেখাশোনা করতে। কিন্তু ঠিক ফিরে আসেন বারবার তাঁর এই শ্বশুরের ভিটায়, খুব শান্তি ও আনন্দে সময় কাটে তাঁর – পাড়া প্রতিবেশী ও ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজনের মধ্যে। তবে আমাকে না হলে চলে না বৌদির, – বলেন ভাগ্যিস তুই বিয়ে করিসনি আমার কাছে পড়ে আছিস – অন্ধের যষ্টি হয়ে। ঠাকুর আমার ঊষার মঙ্গল করুন।

এবারে বিদেশ থেকে এসেই ভর্তি হলেন স্পোকেন ইংলিশ ক্লাসে। ইংরেজী না বলতে পারলে নাতি নাতনিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা মুশকিল হবে। তারা সবাই তো ইংরেজীতেই পড়াশোনা করেছে। এতগুলো বছর বুড়ো-বুড়িদের সঙ্গে কেটেছে এবং নিজেকে পাল্টে  ফেলতে সময় নিলেন না আমার প্রিয় বুদ্ধিমতী বৌদি। ছেলে ল্যাপটপ এবং মেয়ে আই প্যাড কিনে দিয়েছে। তাই তার সদ্ব্যবহার করতে শিখে ফেললেন, ই-মেল করা, মেসেজ পাঠানো, NETFLEX বা You Tube খুলে গান শোনা ও সিনেমা দেখা। সালোয়ার কামিজ পরে যোগব্যায়ামের ক্লাসে যাওয়া ও মর্নিং ওয়াক করা শুরু হল এবার, কিন্তু লক্ষ্মীপুজো, সত্যনারায়ণ পুজো, গীতা পড়া, রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে কাজ করা সবই বজায় রইল তাঁর। পূর্ব – পশ্চিম, অতীত ও বর্তমানকে মেলাতে মেলাতে বৌদির জীবন হয়ে উঠতে লাগল আরও অর্থপূর্ণ ও গতিময় এবং সুন্দর।  

ধন্য  আমার  বৌদি।