চন্দনা সেনগুপ্ত
আমি উষা। বয়স ৩৬ বছর। ছোট থেকেই জ্যেঠিমার কাছে মানুষ হয়েছি। বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আমার মা ও আমাকে জ্যেঠিমার কাছে নিয়ে আসা হল। কিছুদিন পরে মা ও মারা গেলেন, জ্যাঠামশাই বাইরে চাকরী করতেন, রাশভারী মানুষ ছিলেন, তাঁকে আমরা বেশি কাছে পেতাম না। দাদা দিদিরা সবাই পড়াশুনাতে ভালো ছিলেন, তাঁরা নিজের নিজের স্কুল কলেজে ব্যস্ত থাকতেন। ছোটবেলায় পোলিও হয়ে আমার পা টি ছোট হয়ে যায়, তাই বিয়ের কোনও প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়নি, তাই ঠাকুমা, জ্যেঠিমা ও মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজেই আমি ব্যস্ত থাকতাম। অবসর সময়ে সেলাই, বড়ি দেওয়া বা আচার দেওয়া, বাড়ির বড়দের সেবা শুশ্রষাতেই সময় কেটে যেত। জীবনটা খুব স্বাভাবিক ছন্দেই বয়ে চলতো। কোনোদিন নিজের সংসার না হওয়ার জন্যে মনে খেদ বা দুঃখ বোধও ছিল না। বাড়ির পরিবেশটি সুন্দর করে রেখেছিলেন, আর একজন মানুষ। জ্যেঠিমার বৌমা, আমার প্রিয় বৌদি।
দাদা ডাক্তার হওয়ায় খুব ব্যস্ত থাকতেন হাসপাতাল ও নিজের রুগীদের নিয়ে। আমাদের সময়ে বড়দের সামনে একসঙ্গে বসে অল্পবয়সী স্বামী-স্ত্রীকে গল্প করতে বা হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকতে কেউ দেখতে পেতেন না। প্রত্যেকেই সংসারে নিজের নিজের কর্ত্বব্য নিদৃষ্ট করে দেওয়া দায়িত্বতে ও কাজে মন নিবেশ করতে ভালবাসতেন।
জ্যেঠিমার ছোট ছেলে আমার ছোট দাদা আর্মিতে চলে যান এবং বরাবরই বাড়ির বাইরে থাকেন। তাঁর স্ত্রীও বাঙালি নন, তাই তাঁর সঙ্গে পরিবারের বন্ধন ক্রমশঃ ছিন্ন হয়ে এসেছে। অতএব বাড়ির সর্বময়ী কর্তৃ বৃদ্ধা ঠাকুমা, প্রৌঢ়া শাশুড়ি, নিজের শ্বশুর, স্বামী ও তিন ছেলে মেয়ে সবাইকার দেখাশোনা, গৃহ কর্ম পরিচালনার ভার ওই বৌদিদির ওপরে। আমি সবসময় তাঁর হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিই বলে, আমাকে ছাড়া তার একপাও চলেন না। সর্বদা কানে তাঁর ডাক শুনতে পাই আমি – ”উষা, উষি – এ্যাই উষশী গেলি কোথায় মুখপুড়ি, বিকেল গড়িয়ে গেল যে, ছাদের থেকে কাপড়গুলো তুলে নিয়ে আয়, কাপড় ছেড়ে সন্ধ্যেটা দিয়ে দে না রে বোন, আমি ঠাম্মা কে সাবু সেদ্দ খাইয়ে আসি।”
ওদিকে জ্যেঠিমা ডাক দিলেন, – “ও মা উষি চুলটা বেঁধে দিয়ে যা, বাতের ব্যাথাটা বড় বেড়েছে হাতটা যে নাড়তে পারছিনা মা।”
ছুটে ছুটে কাজ করতে করতে আমার ভালো লাগে। আজ নিজের ডাইরী লিখতে বসে মনে হল, নিজের কথা ছেড়ে আমার বৌদির কথা লিখতে পারলে আমি ধন্য হয়ে যাব।
ঠাকুমার খুব পেট খারাপ, বারেবারে কাপড়ে চোপড়ে পায়খানা হয়ে যাচ্ছে। বৌদি সেগুলি কেচে, ঠাম্মাকে পরিষ্কার করিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিচ্ছেন। কখনও সস্নেহে চিড়ে দই খাওয়াচ্ছেন, গামছা ভিজিয়ে মুখ মুছিয়ে আবার তাঁর ফোকলা মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। সেদিন ভোরবেলায় উঠে জ্যাঠামশাই প্রাতঃ ভ্রমণে বেরুতে যাচ্ছেন, দেখতে পেলেন ঠাকুমার ঘরের সামনে এক দলা ‘গু’ পড়ে আছে। ডাক দিলেন, ‘বৌমা দেখোতো এখানে বেড়াল, কুকুরে পায়খানা করে রেখেছে না কি?’ বৃদ্ধা ঠাম্মা লজ্জা পেয়ে ঘর থেকে বেশ জোরে আওয়াজ দিলেন – ‘ওরে বৌমার ছোট ছেলেটার বোধহয় পেট ছেড়েছে, দেখতো উষা কোথায় ময়লা করে ফেললো।’ আমাদের ছোট্ট ভাইপো ৭ বছরের বিট্টু তখন স্কুলে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছে, বড় ঠাম্মার দোষারোপ শুনে রেগে আগুন তেলে বেগুন হয়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল – “দেখো দেখো আমার পাছায় গু লেগে আছে কিনা? আমি এত বড় ছেলেটা এখানে ওখানে হাগু করে বেড়াবো? বড় ঠাম্মা আমার নামে কেন মিথ্যে বললো? আমি স্কুলে যাব না” – কান্না শুরু হল তার। –
এবার বৌদি আদর করে তাকে বোঝাতে বসলেন ঘরে নিয়ে গিয়ে। কি সুন্দর তার কায়দা। বললেন ,-
”জানো ৮০ বছর বয়স হলে মানুষ একেবারে শিশু হয়ে যায়। তখন তার মনের বয়স আবার শূন্য থেকে গুনতে হয়।ঠাম্মার এখন ৮৩ বছর, তাহলে তার মানসিক বয়স কত বলতো – ছেলে উত্তর দিল 3 উত্তর দিল। আর তুমি? – ৭, এখন তাহলে কে বড় তুমি নাকি ঠাম্মা? বুড়ো-বুড়িরা এখন বাচ্চা হয়ে গেছে, – তাদের কথা ধরতে নেই।
ছেলে চোখ মুছে আবার স্কুল ইউনিফর্ম পরতে পরতে বললো – ‘তাহলে আমি ঠাম্মার চেয়ে ৪ বছরের বড়। ঠিক আছে, ছোট বোনকে আজকে মাফ করে দিলাম।’
আমি বৌদির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তিনি নির্বিকারভাবে ঐ ময়লা সব পরিষ্কার করে ঠাম্মার বিছানাও পাল্টে দিলেন।
সেদিন জ্যেঠিমা ও ঠাকুমা দুই ৮৭ ও ৬৪ বছরের বৃদ্ধাদের ডাক্তারবাবু এসে বৌদির খুব প্রশংসা করে গেলেন। বড়দা কে বললেন –
”তুমি খুব ভাগ্যবান এরকম লক্ষ্মীমন্ত বৌ পেয়েছো। আজকাল ‘জেরিয়াটিক’ সাইকোলজি’ পড়েও নার্সরা বুড়ো-বুড়িকে এত সুন্দর যত্ন করতে পারে না। আমি পরে ঐ কথাটির মানে খুঁজে বেড়ালাম। শিশু মনস্তত্ব নিয়ে অনেক পড়াশোনা রিসার্চ হচ্ছে। অনেকে বই লিখেছেন, শিক্ষিকা হতে গেলে সেগুলির ব্যাপারে জানতে হয়। কিন্তু বুড়োদের জন্য যে jeriatric pycholgyটা জানতাম না, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায় প্রায় ৯০ ভাগ লোকের। হয় তারা সব ভুলে যান বা বেশি সচেতন, খিটখিটে হয়ে পড়েন। শরীরের সঙ্গে মাথার মনের স্মৃতিশক্তির যে সম্পর্ক সে বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও তাঁদের ওপরে পরিবারের লোকেরা বিরক্ত হয়ে যান, শুধু তাঁদের ধৈর্য্য না থাকার জন্য।
আমাদের এই ‘বৌদিদি’টি তার একেবারেই ব্যতিক্রমী। তাঁর আরও কয়েকটি সক্রিয় কাজের এর দৃষ্টান্ত দিলে পাঠক-পাঠিকারা আরও প্রেরণা পাবেন, এবং বয়স্কদের সেবায় ভালোভাবে নিযুক্ত হতে পারবেন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগেরদিন বৌদি বাজারে গেছেন দীনুকাকাকে সঙ্গে নিয়ে, নিজের পছন্দ মত ঠাকুর ও পুজোর সামগ্রী আনতে। প্রতিমাটি সুন্দর না হলে তাঁর মন খুঁত খুঁত করে।
আমি ,কাজের মাসী ও মণিদি তিন জন মিলে বসে গেছি, নারকেল কুরিয়ে নাড়ু বানাতে। একদিকে বানিয়ে থালায় রাখছি, একটু পরেই আমার তিন ভাইপো ভাইঝি ও এসে তা চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে। খুব জ্বালাতন হয়ে নাড়ু করা বন্ধ করে ঠাকুমার খাওয়ার রান্না করে তাঁকে খাওয়াতে গেছি – কিন্তু খুব গম্ভীর বিষণ্ণ বদনে বলে দিলেন, তাঁকে খাওয়ার দেওয়ার দরকার নেই।
বুঝলাম বৌদি না এলে খাবেন না। বৌদি এসেই আমাদের বকাবকি শুরু করলেন, “কিরে মা, ঠাকুমার এখনও খাওয়া হয়নি?”
জ্যেঠিমা মাথা ধরেছে বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, – ঠাকুমা তাঁর কথা শোনেন না, শুধু তাঁর নাত-বৌ কে মানেন, ভেবে তাঁর দুঃখ হয়েছে, কারন আমারদের হাত থেকে খাবার থালা নিয়ে তিনি তাঁর বুড়ি শাশুড়িকে খাওয়াতে গিয়েছিলেন, কিন্তু অকারণে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বুড়ি মা। “আমার আর খাওয়ার দরকার নেই, তিন কাল গিয়ে এক কাল ঠেকেছে, এবার গেলেই বাঁচি।”
বৌদি চারিদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর হেসে বললেন – “দে এবার আমায় থালাটা। আমাদের বানিয়ে রাখা এক মুঠো সাদা নারকেল কোরা তুলে একটা বাটিতে নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন, -“ঠাম্মা দেখো কি এনেছি।” ফোকলা দাঁতে একমুখ হাসি হেসে তিনি থালার দিকে চেয়ে ভীষণ খুশী হয়ে গেলেন। ঠিক যেন পাঁচ বছরের কন্যা। জ্যেঠিমা এবার মুখ খুললেন। “ও এইজন্যই বুড়ির এত রাগ।”
এমনিতে কানে কম শোনেন, কিন্তু ঐ ‘বুড়ি’ কথাটা ঠিক কানে গেল।
“কি বললে বৌমা, আমি বুড়ি?” তুমি বুড়ি হও নাই? তুমিও নাতির ঠাকুমা হয়েছো?” তারপর আদর করে বললেন, “নাতবৌ কেমন বুঝতে পারে – কখন কি চাই। ছেলে পুলেরা সবাই নারকেল খাচ্ছিল, আমায় তো দিলে না। বড় খোকাও একটা টুকরো নিয়ে কডর মডর করে চিবিয়ে খেলে, আমার কি দাঁত আছে?”
ঠাকুমা কে শান্ত করে এবার জ্যাঠামশাই ও জ্যেঠিমা কে বাটি ভরে শুক্তো, মাছের ঝাল সাজিয়ে ভাত বেড়ে দিলেন। তাঁরাও খুশী হয়ে পান চিবুতে চিবুতে দিবা নিদ্রায় গেলেন।
বৌদি আমাদের সঙ্গে রান্না ঘরে হাঁড়ি কুড়ি সব নিয়ে খেতে বা খাওয়াতে বসতেন। বারবার করে তাঁর ঐ আন্তরিকতায় মুগ্ধ হতাম আমরা – “উষা আর একটা মাছ ভাজা নে, তুই তো আবার ঝাল দেওয়াটা খাবি না। মাসি দু হাতা ভাত নাও, চাটনি মেখে খেও শেষ পাতে, মনি তুই ডাল মাখ না, এতো শুকনো শুকনো খাচ্ছিস কেন?” ইত্যাদি কথায় গল্পে আমাদের সকলের সারাদিনের পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দিতেন তিনি। লক্ষ্মী শ্রী বোধহয় একেই বলে। শুধু বাড়ির লোকদের নয়, বাইরেও তাঁর দয়ালু পরোপকারী মনটা সর্বদা সবদিকে লক্ষ্য রাখতো। সেদিন বৌদির সঙ্গে ডাক্তারখানায় ওষুধ আনতে গেছি, দেখলাম একটি ঘোমটা টানা গ্রাম্য বৌ ছেলে কোলে নিয়ে একধারে বসে আছে, আর কয়েকটি লোক তার পাশে এসে বসবার বা কথা বলার চেষ্টা করছে।
বৌদি রুখে দাঁড়ালেন – “কি ব্যাপার তোমরা এদিকে কেন? বাইরে বেঞ্চিতে গিয়ে বসতে পারছো না? তোমাদের তো ওষুধ নেওয়া হয়ে গেছে।” ছেলেগুলি বাইরে গেল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ভাল নয় দেখে, বৌদি সেই মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে রিক্সা করে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলেন। কিন্তু সে সবে শহরে এসেছে, ঠিকানা বলতে পারছে না, খুব ভয় পেয়ে গেছে। তার স্বামী দোকানে রান্না করে। ডাক্তারখানায় বসিয়ে দিয়ে গেছে, ছেলেটার জ্বরের ওষুধ নিতে। একঘন্টা পরে আসবে বলেছিল কিন্তু তিনঘন্টা হয়ে গেছে। চেম্বার বন্ধ করে ডাক্তারবাবু বাড়ি যাচ্ছেন, এই অবস্থায় ঐ বৌটিকে নিয়ে খুঁজে খুঁজে তার স্বামীর দোকান বের করে তাকে ডেকে ঐ বৌটিকে সঁপে দিয়ে বকুনি ও কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি এলেন বেশ অনেক রাত্রে। লোকটিকে তার রেস্টুরেন্ট এর মালিক ছাড়েনি, বহু খরিদ্দার খাবার খেতে আসায়। সে ঘড়ি দেখেনি মুখ বুজে তন্দুরি রুটি বানিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের বৌদি না পৌঁছে দিলে, ঐ বৌ টি যে কত রকম বিপদে পড়তো, ঐ অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে, সে বিষয়ে তাদের ধারণাই ছিল না। বাড়িতে দেরী করে ফেরার জন্য শাশুড়িকে মিথ্যে কথাও বলতে হল।
– ‘এতক্ষণ দেরী কেন বৌমা?’
– ‘ডাক্তারবাবুর কাছে আজ বড় ভিড় ছিল মা, ওষুধ দিতে খুব দেরী করলেন তাই
– আমি হাসতে হাসতে বললাম, – ‘বৌদি তুমি দেখি বেশ বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতেও পারো
– ‘আরে এগুলো সব “সফেদ ঝুট,” কারো কোনো উপকার করলে বলে বেড়াতে নেই। তাছাড়া এঁরা বয়স্ক মানুষ, ঐ ঘটনা – গুন্ডাদের থেকে একটি অসহায় গ্রাম্য মেয়েকে বাঁচানো – এ সব ওরা বুঝবেন না, শুধু শুধু টেনশন করবেন, আমাকে বকুনি দেবেন, কেন মোড়লি করতে গেছি ভেবে। তাই একটু আধটু মিথ্যে বলি, মাঝে মাঝে। তারপরে আমার মাথার পেছনে আলতো করে চাটি মেরে বললেন – “উষা তোকে ট্রেনিং দিচ্ছি ,আমি যখন বুড়ো হবো তুই ও বলিস আমাকে।”
‘সত্যি বৌদি পারোও বটে’,- বলে অন্য কাজে মন দিতেই শুনতে পেলাম জ্যাঠামশাই এর চেঁচামেচী।
-“আমার চামচ, আমার চামচটা কোথায় নিয়ে গেল, হতভাগা দিনুটা? উষা, উষি – – –
আমি ভাবলাম তিনি তাঁর গ্যাসের এ্যাসিডিটির জন্য চামচ দিয়ে লিকুইড ডাইজিন খাবেন, ওনার বিছানার পাশের টেবিলে সব রাখা থাকে, ওটা হয়তো কেউ সরিয়েছে। তাই ছুটে গেলাম রান্নাঘর থেকে একটা চামচ ধুয়ে নিয়ে। সেটি দেখে তো উনি আরও রেগে গেলেন, “ঐটা চেয়েছি? ইয়ার্কি হচ্ছে?” বৌদি ছুটে এলেন, এক মুহূর্ত শ্বশুরের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেললেন তাঁর মনের কথা। তাড়াতাড়ি টেবিলের নিচে পড়ে থাকা তাঁর পড়বার চশমাটি তুলে হাতে দিলেন। কারণ তাঁর হাতে রাত্রে পড়বার ‘কথামৃত’ বইটি ধরা ছিল।
খুব খুশী হলেন, “তাইতো বৌমা ওটা পড়ে গিয়েছিল।” আমরা সবাই হাসতে লাগলাম।
পরের দিনও বাজার থেকে ফিরে যখন থলিটি নামালেন, দেখা গেল সব উল্টোপাল্টা করেছেন – কলার জায়গায় মূলো, তোয়ালে আনতে তুলো এনেছেন কিনে। আর বৌমা কে বলছেন, “আমার চশমা, ছাতা কোথায় গেল বৌমা?”
বৌদি ছুটে বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে তাঁর ঘরে পরার চপ্পল, গামছা ও লুঙ্গি নিয়ে। ডাক্তার স্বামীকে বললেন, – বাবার স্মৃতিভ্রংশ অসুখ কি যেন নাম – ডিমনোশিয়া শুরু হয়েছে। ওনাকে আর বাজারে, ব্যাংকে যেতে দিও না।
বড় প্রশংসাপূর্ন চোখে তাকালেন স্বামি, ও অতি কৃজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে স্বীকার করলেন, আমি তো এতো রুগী দেখি, কিন্তু তুমি এই তিনজন বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে এতো সুন্দরভাবে শিশুর মতন করে লালন পালন করছো, তাদের রোগের পূর্বাভাস দিচ্ছো – যা দেখে সত্যিই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।
পনেরো বছর পার হয়ে গেল, এই ভাবে নানা সমস্যার সমাধান করতে করতে। আমি এখন ৫২ আর বৌদি ৬০ বছরের প্রৌঢ়া মহিলা।
ঠাকুমা, জ্যেঠিমা, জ্যাঠামশাই সবাই গত হয়েছেন। তিন ভাইপো ভাইঝি সবাই দেশের বাইরে। এখন পাসপোর্ট ভিসা করে তাঁকে প্রায় ই আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই ছুটতে হয়, নাতি-নাতনিদের মুখ দেখবার জন্য ৬ মাস করে তাদের দেখাশোনা করতে। কিন্তু ঠিক ফিরে আসেন বারবার তাঁর এই শ্বশুরের ভিটায়, খুব শান্তি ও আনন্দে সময় কাটে তাঁর – পাড়া প্রতিবেশী ও ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজনের মধ্যে। তবে আমাকে না হলে চলে না বৌদির, – বলেন ভাগ্যিস তুই বিয়ে করিসনি আমার কাছে পড়ে আছিস – অন্ধের যষ্টি হয়ে। ঠাকুর আমার ঊষার মঙ্গল করুন।
এবারে বিদেশ থেকে এসেই ভর্তি হলেন স্পোকেন ইংলিশ ক্লাসে। ইংরেজী না বলতে পারলে নাতি নাতনিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা মুশকিল হবে। তারা সবাই তো ইংরেজীতেই পড়াশোনা করেছে। এতগুলো বছর বুড়ো-বুড়িদের সঙ্গে কেটেছে এবং নিজেকে পাল্টে ফেলতে সময় নিলেন না আমার প্রিয় বুদ্ধিমতী বৌদি। ছেলে ল্যাপটপ এবং মেয়ে আই প্যাড কিনে দিয়েছে। তাই তার সদ্ব্যবহার করতে শিখে ফেললেন, ই-মেল করা, মেসেজ পাঠানো, NETFLEX বা You Tube খুলে গান শোনা ও সিনেমা দেখা। সালোয়ার কামিজ পরে যোগব্যায়ামের ক্লাসে যাওয়া ও মর্নিং ওয়াক করা শুরু হল এবার, কিন্তু লক্ষ্মীপুজো, সত্যনারায়ণ পুজো, গীতা পড়া, রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে কাজ করা সবই বজায় রইল তাঁর। পূর্ব – পশ্চিম, অতীত ও বর্তমানকে মেলাতে মেলাতে বৌদির জীবন হয়ে উঠতে লাগল আরও অর্থপূর্ণ ও গতিময় এবং সুন্দর।
ধন্য আমার বৌদি।