চন্দনা সেনগুপ্ত

‘জননীর প্রতিনিধি’ – কর্মভারে অবনত – অতি ছোট এক ‘দিদি’কে নিয়ে রবিঠাকুর যে ছোট্ট কবিতার মধ্যে এক অববদ্য তথ্য ব্যক্ত করেছেন, তা পড়ে বিশ্বের সমস্ত ভগিনীর প্রতিচ্ছবি পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

প্রত্যেক গৃহে আমাদের বাংলায় শুধু নয়, ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে লক্ষ লক্ষ বোন ও দিদিরা তাঁদের ভাই-বোনদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কর্ত্তব্য পরায়ণতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। মাতা-পিতার সঙ্গে সঙ্গে বড় দিদিদের আন্তরিক আদর যত্ন ও আত্মত্যাগের বহু উজ্জ্বল কাহিনী আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত রূপে হাজির হয়।

পূর্ণিমার আলো যেমন এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায় রাত্রির অন্ধকারকে শুভ্র জোছনায় ভরিয়ে দেয়, পরিবারে একজন বড় দিদি থাকলে তার স্নেহ মমতায় ছোট ভাই-বোনদের জীবনেও ঠিক সেইরকম কোমল পরশ বুলিয়ে দেয়।

মায়ের হাতে হাতে কাজ করা, বাবার ছোটোখাটো সব প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা, ভাই-বোনদের স্নান, খাওয়া, পড়ানো, পোশাক-পরিচ্ছদে সাজানো, খুব দুধের শিশুদের কোলে পিঠে নিয়ে ঘোরা, ঘুম পাড়িয়ে তবে দিদির ছুটি হয়।

গরীবের ঘরে বাসন মাজা বা কাপড় কাচা, রান্নায় সাহায্য করা সবই দিদিরা করে থাকে। ধনী পরিবারেও দিদি লক্ষ রাখে ভাইটির রেজাল্ট ভাল হওয়া বা চারিত্রিক গঠনের প্রতি। বাবা – মা তাঁদের অর্থ উপার্জন বা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় দিদি খেয়াল রাখে ভাই – বোন কি ধরণের বন্ধুদের সাথে মিশছে, কোন পথে যাচ্ছে। তার স্বভাব ও অভ্যাস ভাল হচ্ছে কিনা। স্কুলে, কলেজে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঠিকমত আচার আচরণ করছে কিনা। দিদির দায়িত্ব পরিবারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 সারু দিদি

মায়ের বাড়ি ছিল, বাঁকুড়া জেলার জয়রাম বাটিতে। তাঁর দরিদ্র পিতার দেহাবসানের পর ছোট ছোট ভাইদের রক্ষণাবেক্ষনের ভার তিনি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন। ছোট ভাই অক্ষয়কে ডাক্তারি পড়তে কলকাতায় পাঠানো হয়, কিন্তু তরুণ বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে ঘরে অল্প বয়সী ভাতৃবধূ তখন অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুতে সে পাগল হয়ে যায়। তাঁর কন্যা জন্মায় সেই রাধিও প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে থাকে। সারদা-মা অতি ধৈর্য্য সহকারে তাদের লালন পালন করতে থাকেন। একদিকে তাঁর সাধক স্বামী ও অন্যদিকে ছোট ভাইয়ের সংসার। সমান সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দুইদিকেই সামাল দিতে থাকেন। গ্রামের অন্য ভাইরা আবার ক্রমশঃ স্বার্থান্বেষী হয়ে ওঠে। মা কে কষ্ট দিতে থাকে। নিজেদের মধ্যে জমি জমা নিয়ে লাঠালাঠি মারামারি করতে থাকে। মা কত বোঝান কিন্তু তারা কথা শোনে না। দিদির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মা যে কত ভাবে হেনস্থা বা অপদস্থ হন, কষ্ট ভোগ করেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। নিজে এত বড় একজন মহীয়সী মহিলা, সাধিকা তথা বিবেকানন্দের মতন শিষ্যদের মা হয়েও বড় বোনের কর্ত্তব্য পালনে তিনি কোন ত্রূটি করেননি। ভাইয়ের মেয়েদেরও তিনি বিয়ের ব্যবস্থা করেন, বিপদে আপদে সাহায্য করা অথবা প্রয়োজন হলে দুঃখী ভাইঝিদের নিজের কাছে এনে রাখার ব্যবস্থা করে চলেন নির্ধিদ্বিধায়।

তাঁর মতন অসামান্য দিদির চরিত্র আমাদের মাথা নত করে দেয়। ভাইয়েরা বা তাদের পরিবারগুলি তাঁর দেবীত্ব মহানুভবতা উদার ভাবটি তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণের জ্ঞানী, তপস্বী শিক্ষিত সন্তানদের তিনি সংঘ জননী নন, দীক্ষা দাত্রী গুরুমা ছিলেন। গ্রামের মানুষেরা কিন্তু সেই সারু কে অসাধারণ এক দিদি বলেই জানে।

এই ধরণের নিরাসক্ত ঠাকুর ভক্ত – স্বাত্তিক ভাবাপন্ন মহিলাদের অবদান আমাদের সমাজে অনেক পরিবারেই পাওয়া যায়। “শ্রী শ্রী মা সারদা” তো এঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্টা।

মাধবীলতা – বড়দি

আমার বাবার বয়স যখন মাত্র দুই/আড়াই বছরের তখন তাঁর মা মারা যান তাঁর বড়দিদি মাধবীলতা তখন মাত্র ১৩ তে পা দিয়েছেন এবং ১৯ বছরের স্বামীর মৃত্যুর পর বাপের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। বাবা ডাক্তার পূর্ণচন্দ্র কিন্তু আর বিয়ে করেননি। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে মাধবীলতার থেকে ছোট।

নিরামিষী আহারে অভ্যস্ত সাদা থান পরা, সেই মেয়েটি তার চারটি ছোট ভাই-বোনের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বাবা ডাক্তার। সাঁকতোড়িয়া হাসপাতালে রুগীদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়ে যখন বাড়িতে আসেন তখন পুজো-পাঠে মন দেন। ছেলেদের পড়াশোনা দেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। বড় মেয়ে তাদের যত্ন ও দেখাশোনার ভার নেওয়ায় পিতা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন। 

ধীরে ধীরে ভাইরা বড় হয়ে উঠতে থাকে, ছোট বোন দুর্গার বিয়ে দেওয়া হয় এক তরুন ডাক্তারের সঙ্গে কিন্ত সে ও দিদির মতই খুব অল্প বয়সে স্বামী কে হারিযে ঘরে ফিরে আসেন,তার জীব্নে ও এই দিদি মাযের মতন স্নেহ দিযে তাকে সন্গ্রাম করতে সাহাজ্য করেনl  বড় ভাই ডাক্তার, মেজো ভাই কোলিয়ারীতে বড় ইঞ্জিনিয়ার ও ছোট ভাইটিও ডাক্তার হয়ে বিবাহযোগ্য হন। দিদি ভাই-এর বৌদের হাতে সংসার তুলে দেন। বাবার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ ভাবে সংসারের দায় হতে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং ঠাকুর ঘরের গিরিধারীর পূজা অর্চনায় তাঁর সময় কাটান।  সংসারের প্রতি এই মোহহীন ‘সাধিকা’ দিদিকে পরে সবাই ‘ঠাকুর ঘরের দিদি’ আখ্যা দেন। এরকম অনেক সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়েও অসাধারণ নিরাসক্ত কামকাঞ্চন ত্যাগী নারী চরিত্র আমাদের শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থে আমরা বহু পেয়ে থাকি।

ভগিনী নিবেদিতা

এই বিদেশিনী দিদিকে সবাই Sister Nivedita বলেই জানে, বাঙ্গালী বোনেদের জীবনে তিনি আসেন, জ্ঞানের আলো জ্বালাতে। বিবেকানন্দ, ও শ্রী শ্রী মায়ের কৃপা লাভ করে, এই মহিয়সী নারী আপন দিদির মতন যত্ন নিয়ে তার বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিধবা ও অসহায় বহু কন্যা শিক্ষা লাভ করে ধন্য হন, এখনও সেই স্কুল কত সন্ন্যাসিনী মাতাজীদের তৈরী করে সারদা মঠে পড়া লেখার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নারীকে আদর্শের ও মূল্যবোধের পাঠ পড়াচ্ছেন। দেশে প্লেগ মহামারী এলে নিজের প্রান তুচ্ছ করে মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতে দ্বিধা বোধ করেননি, এই রকম দিদি পেয়ে আমরা মুগ্ধ্য হয়েছি।