চন্দনা সেনগুপ্ত
ভূতেদের প্রবেশ মঞ্চে এই গানটি গাইতে গাইতে –
চল চল চল, রাতের আঁধারে ভূতের দল,
হারাস নে রে মনের বল,
দুঃখে শোকে হয়ে পাগল, কাটাস নে রে পল।
চল চল চল।
ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত,
আমরা ঘুচাবো ভেদ জাত পাত,
একে অপরের ধরিব হাত
বিশ্বাস সম্বল।
নব জীবনের গাহিয়া গান,
বাড়াবো সকল ভূতের মান
মানব জাতির করিতে ত্রাণ,
টুটাব মিথ্যে ছল।
চলরে নও জোয়ান, শোনরে ভূতের গান,
মহামারী করে দুয়ারে দুয়ারে মৃত্যুকে আহ্বান,
ভাঙ রে ভাঙ আগল, ঢালরে ঠান্ডা জল –
চল চল চল।
(মঞ্চটি আলো আঁধারিতে ঢাকা, পেছনে আকাশ ও মেঘের দৃশ্য। নিচে একটি পৃথিবীর মানচিত্র আঁকা গ্লোব। কালো পাজামা কুর্তা, কিন্তু পেছনে সাদা কাপড়ের চাদর, ভেসে আসার মতন হেলে দুলে চলবে।)
কুশীলব পাত্র পাত্রী – মহামারী ভূত, প্রলয় ভূত, সৈন্য ভূত, প্রেতাত্মা ও একজন বৃদ্ধ জ্ঞানী দাদু ভূত, বিজ্ঞানী ভূত এবং দুজন এলিয়েন (অন্য গ্রহ থেকে আগত)
ভূতেদের মধ্যে একজন বাঁকুড়ার ভাষায় ও একজন বাঙালি ভাষায় বলবে, একজন একটু তোতলাবে ও একজন নেতার মতন ভাষণ ঝাড়বে।
প্রথম মহামারী ভূত – ওহে ভূতের দল, অমনি করে খোস মেজাজে গান গেয়ে খোলা আকাশে ঘুরে বেড়ালেই চলবে?
দ্বিতীয় জন – কেন শোনো নাই, মাষ্টার মশাই কইলেন – ভূতের কেত্তন ক্যান করস?
তৃতীয় জন (মুসলিম) – কি আমাদের তোমরা কীর্তন করতে বলছো? আমরা কি হিন্দু যে খোল করতাল নিয়ে কীর্তন গাইবো?
প্রথম জন – তবে ‘কাওয়ালী’ গাইবো নাকি? সূফীগান?
দ্বিতীয় জন – না ভাই, আমরা কীর্তন ও জানি না আর কাওয়ালীও গাইতে পারি না, তবে খ্রিসমাসে যীশুখৃষ্টের ক্যারোল গাইতে পারি। –
তৃতীয় জন – তবে যার যা ইচ্ছে গাও না, কে মানা করবে এখানে? পণ্ডিত, মৌলভী, পাদ্রীরা কেউ তো নেই, যে গোল করবে।
প্রথম জন – ভজ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গের নাম – – – – –
দ্বিতীয় জন – কাওয়ালীর সুরে – আ — আ — কানে হাত দিয়ে তালি বাজিয়ে আল্লাহ হু – হু – হু
তৃতীয় জন – জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল বেল, জিঙ্গেল অল দি ওয়ে – – –
জ্ঞানী – (জোর গলায় সবাইকে থামিয়ে দেন) চোপ! চুপ সব। বোকা ভূতের দল। তোদের আবার এখন ধম্ম আছে নাকি? মানুষ জন্মের কথা এখানে মনে করে এমন হল্লা করছিস কেন রে তোরা?
প্রথম জন – আকাশটাকেও মাছের বাজার করে দিল। বাপরে কি শোরগোল !
জ্ঞানী ভূত – শান্ত হয়ে বসে একটা কিছু করা যাক।
প্রথম জন – একটা “অশরীরী ক্লাব” মানে সংগঠন করলে হয় না? সেখানেই গান, গল্প সব করা যাবে। সেটাই তো ভূতের কেত্তন হবে।
দ্বিতীয় জন – না হে না, আমার এখনও ওদের ওপর রাগ কমেনি। আমাকে ওরা কবর না দিয়ে মাঝপথেই পুড়িয়ে দিল। কি অন্যায় বলো তো। এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
তৃতীয় জন – আরে মশাই, আমারে তো পোড়ানোও হল না, নদীর জলে ভাসাই দিল।
প্রথম জন – আমাকে তো ভাসাতেও পারেনি, গ্রামে নদী নেই বলে জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে গেল, – কত শেয়াল, কুকুরে কামড়ে কামড়ে খেয়েছে, ও মাগো সে যে কি যন্ত্রনা – – –
জ্ঞানী ভূত – অ্যাই, হতভাগা, তখন তো তুই মরেই গেছিলি, ভূতের আবার ব্যাথা লাগে নাকি?
বিজ্ঞানী ভূত – (হটাৎ আবির্ভাব রাগত ভাবে) ওরে আহম্মকের দল মরেও তোদের শিক্ষা হল না?
জ্ঞানী ভূত – একটা করোনা – না কি কোভিড১৯ নামে অতি ক্ষুদ্র ভাইরাস এসে সারা বিশ্বের সমস্ত ধনী-দারিদ্র, সাদা-কালো, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিষ্টান-হিহুদীদের এক পংক্তিতে দাঁড় করিয়ে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তবু তোরা এখনও ধর্ম, বর্ণ, জাতপাতের লড়াই ছাড়তে পারলি না?
বিজ্ঞানী ভূত – (মাথা নেড়ে) তাই না বটে, কত কষ্ট করে পরিশ্রম ও সাধনার পরে আমরা বিজ্ঞানী, গবেষক আর ডাক্তাররা মিলে ভ্যাকসিন বানালাম, জানিনা কতটা কাজে লাগবে? তার আগে নিজেই মৃত্যুর শিকার হলাম।
জ্ঞানী ও বৃদ্ধ ভূত – (সাদা চুল দাড়ি নিয়ে প্রবেশ) – মানব দেহ তো আর নেই এখন, খাঁচা খুলে যেমন পাখি বেরিয়ে যায়, তোমরাও তাই এখন সবাই মুক্ত। এখানে এসে আবার ঝগড়া বিবাদ কেন করছো বাবা রা? (কাঁপা কাঁপা গলায়)
প্রথম ভূত – হ্যাঁ, দেখুন না দাদু, আমি আমি ‘কেত্তন’ মানে আমি বলছিলাম একটু আলাপ আলোচনা করি, পরের প্রজন্মকে কিভাবে জীবন কাটাতে শিক্ষা দেবো, তা তা তা এরা (একটু তোতলিয়ে) সব কথা কাটাকাটি, ত – – র – কো শু – – রু করে দিল।
তৃতীয় ভূত – দূর ভবিষ্যতের লোকের কি কইরা শিক্ষা দিমু। ওগো কারো জ্ঞান শোনার অভ্যাস নাই, – হ্যাঁ ওসব কথা ছ্যাড়ান দাও।
দ্বিতীয় জন – যখন বেঁচে ছিলাম তখন এই গরীবদের কথা কেউ শুনতো না আর এখন ভূতের কথা মানতে ওদের বয়ে গেছে (মুখ বেঁকিয়ে)
(অন্য দিক থেকে আরও ২/৩ জন কুশীলবদের প্রবেশ – চেহারা খুবই বিদ্ধস্ত, চুল উস্কো খুস্কো, খুব জীর্ন শীর্ন করুন অবস্থায় ধীরে ধীরে মঞ্চে আসে।)
প্রথম ভূত – তোমরা আবার কথা থেকে এলে ভাই?
তিন জন কথা বলল একসাথে – আমরা হলাম প্রলয় ভূত ! বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, সুনামির ঝরে বা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, জঙ্গলের দাবানলে প্রাণ হারিয়েছি।
দ্বিতীয় জন – ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত মানুষে ভূত হল কে জানে?
বিজ্ঞানী ভূত – কেন এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, Natural Calamity , Disaster জানো?
প্রলয় ভূত – সবাই বলছে মানুষই নাকি তার জন্য দায়ী।
তৃতীয় ভূত – হ হ আমিও শুনছি, গাছপালা কাইট্যা ওরা পৃথিবী মা রে শূন্য কইরা দিতেছে। পাহাড় ভাঙ্গত্যাসে, নদীরে বাইধ্যাঁ দিয়া যা মন চায় যা মন চায় করত্যাসে তাই তো এরকম হইলো।
জ্ঞানী ভূত – ঠিক বলেছো। পলিউশন এর জন্য এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং।
প্রথম ভূত – সেটি আবার কি গো জ্ঞানী বাবা?
দ্বিতীয় ভূত – আরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং মানে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি। দেখছো না উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর বরফ কেমন করে গলছে।
প্রথম ভূত – ওই জীবন্ত মানুষগুলোর মাথায় এই প্রদূষণ ব্যাপারটা ঢোকেনি এখনও। (নাঁকি সুরে – কি যে হবেঁ ওঁদের)। চলো না সবাই মিলে কিছু করি।
(এবার একটা যুদ্ধের বাজনা, সব ভূতেরা সচকিত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ায়। মার্চ করতে করতে একদল লোকের প্রবেশ।)
যুদ্ধে নিহত ভূতেরা মার্চ করতে করতে আসবে –
“কদম কদম বাঢ়ায়ে যা –
নতুন পথে আগায়ে যা –
স্বর্গ নরক কোথা আছে
খুঁজতে খুঁজতে গান গা –
কদম কদম বাঢ়ায়ে যা – – – – ।
তারপরে লেফট রাইট লেফট রাইট এটেনশন বলে স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়াবে।
তৃতীয় ভূত – ওরে বাবা খাই সে রে, এ ডা আবার কে ডা আইতাসে?
বাঁকুড়ার ভূত – একবার তো ভগবান মারলেক, ইয়ারা কি দুবার করে মারত্যে আইছে নাকি?
প্রথম সৈন্য ভূত – আরে আরে ঘাবড়াচ্ছো কেন, আমরাও তো তোমাদের মতোই ভূত গো।
দ্বিতীয় সৈন্য ভূত – মহামারী শেষ না হতেই বোকা মানুষেরা আবার যুদ্ধ লাগিয়ে দিল, হতভাগারা কেউ শান্তি চায় না।
প্রথম সৈন্য – সৈনিক বিভাগে নাম লিখিয়েছিলাম কত আশা ভরসা আর সাহস নিয়ে, কিন্তু এমন বেঘোরে প্রানটা যাবে, তখন কে ভেবেছিল?
জ্ঞানী ভূত – (এগিয়ে এসে) এসো ভাই এখানে ভূতের রাজ্যে ওসব গলা বারুদ, প্যাটন ট্যাঙ্ক নেই, অপার শান্তি আর আনন্দ।
প্রথম সৈন্য – শুধু গোলাবারুদ বন্দুক? ওই যুদ্ধবাহী জাহাজ এরোপ্লেন, মিশাইল এগুলো কে যে বানায় আর কেন যে বানায়। শালা ঘাড় মটকে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব? কিন্তু কি করে করি বলুন তো ভাই সব?
বিজ্ঞানী ভূত – এটোমিক এনার্জি দিয়ে কত ভালো ভালো কাজ করা যায়। আর এরা নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে পৃথিবীটার কি হাল করে দিল। ঈশ্বর জানেন কি করে এর প্রকোপ কমবে
(ওয়ার ভিক্টিম) – একটু কাঁদো কাঁদো সুরে মঞ্চের সামনে এসে – আমরা মহামারীতেও মরিনি, যুদ্ধেও যায়নি। গ্রামে চাষ আবাদ করছিলাম। কাদের জানি না একটা মিসাইল এসে আমাদের বাড়ি, ঘর, জমি, ছেলে-মেয়ে, পাঠশালা, হাসপাতাল সব ভেঙ্গে চুরে শেষ করে দিল। ওরা আমাদের সুন্দর একটা নামও দিয়েছে “ওয়ার ভিক্টিম” – অসহায় নাগরিকরা আজ তাই ভূত হয়ে তোমাদের ‘কেত্তন’ – আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছে।
তৃতীয় ভূত – অহন বিচার তর্ক ছাইড়্যা কিছু করন লাইগবো।
নাকি সুরে সবাই – হ্যাঁ হ্যাঁ এখন কিঁ কঁরা যাঁয় ভাঁব দেঁখি সঁবাই।
জ্ঞানী ভূত – বিশ্বের সমস্ত ভূত এবার এক হও।
বিজ্ঞানী ভূত – আমাদের এখন থেকে আর কিছুই করতে হবে না। ওরা নিজেরাই খাওয়া-খায়ি, মারামারি হিংসা করে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনবে। তার আর দেরী নেই।
(হটাৎ মঞ্চের পেছন দিক থেকে একজন প্রেতাত্মা ভূতের আবির্ভাব)
প্রেতাত্মা – অ্যাই কি হচ্ছে এইসব? এ তো যেমন তেমন নয়, এ যে বিরাট ভূতের সভা হচ্ছে দেখছি। (শুঁকে শুঁকে) নাঃ তোমাদের গা থেকে তো এখনও মানুষ মানুষ গন্ধটাই গেল না দেখছি। ঘাড় মটকানো, আক্রমণ, লুন্ঠন, লড়াই, ঝগড়া এসব তো মানুষ নেতাদের কাজ।
তৃতীয় ভূত – তুমি কে ডা? আমাগো বুদ্ধিমান জ্ঞানী দাদুরও জ্ঞান ঝাড়ত্যাসো?
দ্বিতীয় ভূত – হুঁ হুঁ তুমাকে আর বাক চাতুরী করত্যে হবেক লাই। লাও একটা বিড়ি দাও তো বাপু। একটু টান দিই।
প্রথম ভূত – আরে বুদ্ধু বিড়ি জ্বালাতে গেলে আগুন চাই না, ওটি এখানে কোথা পাবে বাপধন?
প্রেতাত্মা – আমি প্রেতাত্মা ভূত। নেতাদের কথাই বাড়ির লোকের জ্বালাতনে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছি। এখানে এসে আবার সভা আর লেকচারের বাহাদুরী। এখন কি আর করি। বিষও নেই যে পান করে দু-বার আত্মহত্যা করবো।
প্রথম ভূত – হ্যাঁ ভাই, এবার আমার হাসি পাচ্ছে, হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ – মানুষকে শিক্ষা দেবে ভূতে? ওর জন্যে কত চিন্তা করতে হয়, মাথা ঘামাতে হয়।
তৃতীয় ভূত – হুঁ আমাগো মাথাই নাই, সব ঘিলু যখন শুকাই গ্যালো তখন প্ল্যান বানাই কেমন কইরা?
দ্বিতীয় ভূত – আমরা তো ওখানেও শ্রকিক ছিলাম। লেবারদের আবার কোনো মূল্য আছে নাকি? খেটে খেটে আধমরা হয়ে যেতাম, তখন কেউ শিক্ষা দিতে আসতো ‘ভূতের বেগার খাটছিস কেন’?
তৃতীয় ভূত – তা ঐ ব্যা গ্যার ব্যাপার টা কি এখানেও করতে হবে না কি?
সৈন্য ভূত – (লেফট রাইট – লেফট রাইট করে গোটা মঞ্চ ঘুরে বেড়ালো) ও হো প্যারেড করছি কেন? আমার তো এখন বন্ধুক ঘাড়ে নেই, কেউ অর্ডারও দিচ্ছে না। দেখি ওদিকে এদিকে ঘুরে যদি একজন মনের মত পেত্নী জোগাড় করতে পারি।
জ্ঞানী ভূত – দেখো কান্ড ! মানুষ গিরি করাটা আর ছাড়তে পারলি না তোরা? এখানে এসেও সঙ্গিনীর খোঁজ, যত্তসব !
দ্বিতীয় ভূত – হঁ খুঁজত্যে হবেক লাই মোরে গেছি বলে কি শখ সাধ থাইকতে লাই?
(সব ভূত হেসে ওঠে হা হা হা হো হো হো)
বিজ্ঞানী ভূত – তেনারা যতক্ষণ না আসেন ততক্ষনই ‘কেত্তন’ করতে পারো। এলেই তো গোলমাল বাঁধিয়ে দেবেন।
প্রথম ভূত – হঁ বাবা আবার সেই গোলামী করা, মন জুগিয়ে চলা, পেছন পেছন ঘোরা –
দ্বিতীয় ভূত – ইত্য পেত্নী প্রীতি কেনে ভাই? চলো বেড়াতে যাই।
(মঞ্চে একটা বাক্সের মতো গাড়ি ঢুকবে অন্ধকারে। হঠাৎ একটা বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। কেঁপে উঠবে ভিষণ আওয়াজ।)
ভূতেদের মধ্যে একজন – ও বাবা এ যে দেখি একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত।
(গম্ভীর গলায় কে যেন সেই বাক্স বাহনটির থেকে বেরিয়ে এল আর বলল-)
এলিয়েন ভূত – ওরে মানুষ ভূতের দল, আকাশে এসে এতো গোলমাল করছো কেন হে তোমরা?
বিজ্ঞানী – তুমি কে ভাই? একদম অন্যরকম দেখতে লাগছো। কোথা থেকে এলে এখানে?
প্রথম ভূত – ও মনে হয় স্বর্গের দূত। ভালো লোকেদের মানে ভূত – আত্মাদের নিতে এসেছে।
দ্বিতীয় ভূত – আর ঐ দেখো ওর সঙ্গে মাথায় হেলমেট এন্টিনা লাগানো আর জন রয়েছো, ও বোধহয় যমরাজের দূত।
তৃতীয় ভূত – হঃ আমাগো মনে হয় জান্নাত থেইক্যা পয়গম আইসতেছে। দেখি কারে কারে লইয়া যায়?
দ্বিতীয় ভূত – হঁ তা হবেক, উয়ারা মারকুটটা, বদমায়েশ গুলাকে লিয়ে যাবেক।
তৃতীয় ভূত – অ্যাই তরা চুপ করবি? যমদূত কো আর দ্যাবদূত ওগো কথা কোষের চান্সটা দেওন লাইগব।
এলিয়েন – আমরা অন্য গ্রহের বাসিন্দা এখনও বেঁচে আছি। তবে আমাদের স্পেস শিপটি এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কাছে আসতেই হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যে ফিরে যেতে না পারলে, আমরাও তোমাদের মতন ভূত হয়ে যাব।
যমদূত এর মতন এলিয়েনটা – ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো আমি এই ধোঁয়া আর ধুলোর পলিউশনে ঢাকা পৃথিবীতে থাকবো না গো। আমি আমার নিজের গ্রহে কেমন করে যাব, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ, অ্যা়ঁ।
প্রলয় ভূত – কেঁদো না সোনা, কেঁদো না। আমাদের জ্ঞানী দাদু আর বিজ্ঞানী জ্যেঠু নিশ্চয় একটা উপায় বের করবেন।
জ্ঞানী ভূত – (বৃদ্ধ দাদু এগিয়ে এসে) আমি জানি তোমাদের মতন এলিয়েনরা আমাদের পৃথিবীতে আগেও এসেছেন, আমি সুইস লেখক দার্শনিক “ভন দানিকেনের” লেখায় পড়েছি – Gods are from outer space, দেবতারা কি অন্য গ্রহের মানুষ ছিলেন, তাই নিয়ে উনি অনেক কথাই বলেছেন, “পুষ্পক রথ” যে Space ship এ বিষয়ে আমাদের আজ আর কোনো সন্দেহ নেই।
এলিয়েন – আমরাও আসছিলাম মানুষের জন্য কিছু ভালো দৃষ্টান্ত নিদর্শন রেখে যেতে কিন্তু তা আর পারলাম না।
যমদূত নামে এলিয়েন – আমাকে যমদূত বলে দূরে সরে যাচ্ছো কেন? তোমরা তো ভারী অদ্ভুত!
মহামারী প্রলয় ভূত – না গো আমরা অদ – ভূত নই। একেবারে সত্যিকারের দেহহীন অশরীরী আত্মা, ভেজালহীন প্রেত। শুধু ভেসে ভেসে বেড়াই।
(এবার সেই বিজ্ঞানী ভূত এগিয়ে আসেন এবং গম্ভীরভাবে বলেন)
তোমরা সবাই গোলমাল থামাও, আমি যদি একবার তোমাদের রকেট মানে ঐ স্পেস শিপটা দেখি, আপত্তি আছে কি?
এলিয়েন – না, না আপনি আসুন না দাদা, প্লিজ, আপনি যদি এস্তোফিজিক্স পরে থাকেন, তাহলে নিশ্চই হেল্প করতে পারবেন।
বিজ্ঞানী – হ্যাঁ, আমি NASA তে কাজ করেছি, এস্টোনোটদের মঙ্গোল গ্রহে – চাঁদে পাঠাই – দেখি একবার চেষ্টা করে। (তিনি মেশিনটা পরীক্ষা করতে লাগলেন)
অন্য ভূতেরা তাঁকে ঘিরে গান করতে লাগলো –
“ভূত হয়েছে বলে কি ভাই বুদ্ধি গেছে মরে?
সরিয়ে দেব অন্য গ্রহের যন্ত্রটি ঠিক করে।
মানবজাতির আত্মা মোরা বড়ই শক্তিধর।
সবাই মিলে ধাক্কা দেব বাহন চালু কর।”
গাড়ি যেমন ঠেলে তেমনি অ্যাকশন করে এবং মানুষ ভূতের চেষ্টায় স্পেস শিপটি চালু হয়ে যায়। সবাই মিলে হাততালি দিয়ে আনন্দ করতে থাকে।
এলিয়েন – ধন্যবাদ ভূত বন্ধুরা। তোমরা যে শুধু বুদ্ধিমান ও প্রতিভাশালী তা নও, তোমাদের মত দয়ালু পরোপকারী প্রাণী আর অন্য কোনো গ্রহে আমরা কখনও দেখিনি।
তৃতীয় ভূত – কি কইত্যাসেরে, আমাগো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূতের এওয়ার্ড দেওন লাইগবো।
দ্বিতীয় ভূত – নিজের বড়াই করত্যে হবেক লাই, বিজ্ঞানী দাদা বুঝাই দিলেক মানুষ জাতটো কেমন বট্যে।
এলিয়েন – চলো কে কে তোমরা আমাদের সঙ্গে অন্য গ্রহে পাড়ি দেবে।
প্রলয় ভূত – না ভাই, যতই ঝঞ্জা, আঁধি, তুফান, বন্যা, খরা হোক। জগৎজননী ছেড়ে আমরা কোথাও যাবো না।
সৈন্য ভূতেরা – এটেনশন, এস ভূত ভাইয়েরা এলিয়েনদের বিদায় দাও। বিদায় বন্ধু বিদায় –
জ্ঞানী ভূত – শ্যামল ধারার দিকে তাকাও কী সুন্দর ঝলমল করছে। এস এখন সবাই মিলে শান্তির গান গাই। পৃথিবীর জীবন্ত লোকেদের মনে আসার বার্তা শোনাই।
হও প্রেমে সবে ধীর,
হও কর্মেতে বীর,
সত্যেতে থাকো স্থির
নাহি ভয়।
থামাও গো প্রদূষণ !
বাঁচাও প্রকৃতি ধন
ভাইরাস অগণন হোক ক্ষয়।
নাই ভাষা, নাই ভেদ, নাই পরিধান,
এ বিশ্ব মাঝে তাই ভূতেরা মহান,
দেখিয়া জগৎ হবে লজ্জায় ম্লান,
ভূতেরা গাহিছে ওগো শান্তির গান।
দেহ খাঁচা ছেড়েছি যে নই পরাধীন
যত রোগজীবাণুরা হল আজি ক্ষীণ,
ভূতেরা সবাই কাম, ক্রোধ, লোভ হীন,
জীবন্ত লোক অজ্ঞান
ভূতেদের করো সম্মান।
[ শেষ গান গাইতে গাইতে ড্রপসিন পড়বে। ]