চন্দনা সেনগুপ্ত

শীতের শেষে যখন পৃথিবী মায়ের অবগুন্ঠন -
হয় উন্মোচন,
ঝাপসা কুয়াশায় ওড়না ঢাকা মুখ খানি তার উঁকিমারে, 
ধীরে ধীরে তখন,
পশুর দল যারা এতদিন ছিল ঘুমন্ত -
অন্ধকার গুহায় -
তাদের জাগায় সূর্যকিরণ।
মাটির গর্তে, পাহাড়ে, পাথরের খাঁজে, ঘন বনে,
গাছের কোটরে যারা করেছিল আত্মগোপন, -
তারা আড়মোড়া ভেঙে বাইরে আসতে চায় -
শুনতে পায়, কার যেন আবাহন।
বসন্তরাজ এসে বুঝি  ধাক্কা দেন, তাদের দরজায়,
চঞ্চল হয়ে ওঠে, পাতা ঝরা গাছগুলির প্রাণমন।
কিশলয়ের - রক্তিম আভায়, - শ্যাওলার শ্যামলিমায় -
লাগে নবজাগরণ।
বড় বড় পাখীরা স্বস্তির নিঃশাস ফেলে,
ডানা ঝাপটায় - ধরণী
কলকাকলিতে ভরে যায়; ধ্বনিত হয় -
ছোট পাখীদের মধুর কুজন, ও ভ্রমরের গুঞ্জন l
 
বসন্তের আবির্ভাব কিন্তু একই সময়ে
দেখা যায় না, জগতের সব জায়গায়।
উত্তরায়ণে - ওই গোলার্দ্ধে যখন সূর্য্যের রশ্মি পড়ে -
তখন উত্তর মেরুতে হয় উষ্ণায়ন।
সেখানে গলে বরফ়,
সাদা আর বাদামি ভালুকেরা নেমে আসে,
শীতল নদীর জল ধারায়,
মাছের খোঁজে দলে দলে করে অবগাহন।
সবুজের রেখা ধরে সাগর কিনারায় -
জমাট সরোবরে ঢেউ-এর কম্পন।
রোদের আলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছেরা ঘুরে বেড়ায় -
সামুদ্রিক প্রাণীরা খুশী মনে
করে সন্তরণ।

একেবারে এই ভূলোকের নিচের দিকে
দক্ষিণ মেরুতে কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডা তখন।
দখিনা হাওয়া সেই মরুদেশে পৌঁছাতে পারে না -
'বসন্ত' করে না গমন, -
ছয় মাস পরে আলো উত্তাপ নিয়ে সে হাজির হবে -
করতে অতি ঠান্ডা দমন।
পেঙ্গুইনের দল কালো সাদা কোর্ট পরে চলবে, হেলে দুলে,
বরফ ভরা আঙিনায়,
সাগর বলাকা তার সাথে হয়ত ফিসফিসিয়ে
কথা কইবে, নতুন  বসন্তের হবে, আলাপন।

আবার জগতের মধ্যভাগে - চির শ্যামল অঞ্চলে
সারা বছর ধরে সারাদিন গরম ও বিকেলে চলে,
ঝরঝর বরিষণ।
তাই সেথায় সকালে কোকিল ডাকে, ময়না টিয়া ঘুঘু গায় গান,
আর সন্ধ্যায় শুরু হয়, পোকা মাকড় ব্যাঙবাবাজীর
সরব কীর্তন।
'বসন্তবাবু'কে তাদের নিত্য প্রয়োজন। তাই আলাদা করে
প্রকৃতি করেন না, তাকে বিশেষ সম্ভাষণ।

কিন্তু মরুদেশ ও বিষুব রেখার মাঝখানে, এ ধরায় -
আমাদের জন্মস্থান, নাম 'ভারত ‘- ভবন।
এখানে আসে, পাঁচটি বিচিত্র ঋতুর পরে -
মহাসমারোহে সর্বশ্রেষ্ঠ সময়, মানবের করে মনোরন্জন,
আসেন, বসন্ত, তার আগমন, আনে আমাদের দেশে -
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীতের পরে অপূর্ব মোহময় লগন।
রূপ, রস, গন্ধে, ছন্দে মোহিত করা রঙিন দুটি মাস -
পলাশ, শিমূল, চম্পা, বকুল আর তার সঙ্গে
আমের মুকুল বাতাসে  ভরায়  সুবাস,
বুঝিয়ে দেয়,  তিনি করলেন এখানে পদার্পন,
বনে বনে তখন
লেগেছে আগুন ভরা ফাগুন।
নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় - নৃত্যে, গীতে নতুন ছন্দে
নাম না জানা ফুল করে
আল্পনা অঙ্কন, তারা সবাই 
মানব মনে তোলে কিসের অমোঘ আকর্ষণ, -
চলে আনন্দ - অনুরণন -
বসন্ত জাগ্রত দ্বারে - হল যে 
‘ঋতুরাজের ’-
আগমন, সব দুখ ভুলে সেই সুন্দর রাজন কে 
এসো করি অভিবাদন 
জানাই, অভিনন্দন l

Leave a comment