চন্দনা সেনগুপ্ত
ফাঁকি কথাটার মধ্যে একটা বিরাট ফাঁক থেকে যায়। একজন আর একজনের হৃদয়ে – অন্তরের অন্থঃস্থলে উঁকি মেরে যদি দেখি, সেখানে অনেক শূন্যতা-র আভাস পাই। বাইরে থেকে হয়তো খুব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নজরে আসে, কিন্তু মন দিয়ে তার অন্দরমহলে গেলে বুঝতে পারি, অনেকগুলো ঘর তালা বন্ধ। সেখানে কেউ নেই। কিছু বস্তু/সম্পদ কি রক্ষিত আছে – না? – তালা ভেঙে দেখা যায়, তাও নেই, শুধু খালি, একেবারে শূন্যতা।
আর সেই জায়গাগুলো ভরতে গেলে অনেক অনুভবী হতে হয়, – গভীর মননশীলতা ও সহানুভূতি লাগে। – এক মানুষের মনের কষ্ট, হতাশা, দুঃখ আর একজন যখন জানবার বা বোঝবার চেষ্টা করে, তখন সবচেয়ে দরকার হয় – ভালোবাসার উষ্ণ পরশের। স্নেহ, প্রেম ও দয়া এমন এক উত্তাপ আনতে পারে – যা ভয়ঙ্কর কঠিন পাষাণকেও গলিয়ে দেয়। মানব হৃদয় তো বরফের মতন, একটু আদর পেলেই গলে জল হয়ে যায়।
পৃথিবীতে স্বামী স্ত্রীকে, বন্ধু বন্ধুকে, মালিক কর্মচারীকে বা কখনও কখনও সাধুবেশী গুরু তাঁর শিষ্যকে ছলনা করেন। প্রাপ্য প্রাপকের সম্পর্কে চিড় ধরে। কারন অল্প মাত্রায় হলেও কেউ কাউকে ফাঁকি দিলে একদিন কিন্তু তার নিজের জীবনেও এক সময়ে একটা বিরাট ফাঁক এসে যায়।
অর্থ লিপ্সা, যশ বা নামের লোভ চলার গতিকে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু পাহাড়ী নদী হটাৎ যেমন পাথরের ফাঁকে ঢুকে পড়ে, দেখে আর বেরোবার রাস্তা নেই, তখন তাকে ভীষণ খাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় – জলপ্রপাতের রূপে। ঠিক তেমনি মানব জীবনও কভু বা পথ নির্ণয় করতে না পেরে হটাৎ অন্য খাতে বইতে শুরু করে। পড়ে যায় গহ্বরের ফাঁকে। মধ্যবিত্ত ঘরের আদর্শবাদী পিতা মাতার সন্তান স্ত্রীকে খুশী করবার জন্য ঘুষ নিতে আরম্ভ করে – তার মূল্যবোধে বেশ বড় রকমের ছিদ্র হয়ে যায়।
সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত ধনী পরিবারের মেয়ে প্রথম যেদিন বন্ধুদের পার্টিতে গিয়ে মদ্যপানের স্বাদে মাতে, সেদিন তার নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার নেশা লাগে মনে।
ফাঁকি – নিয়ে লিখতে বসে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই ‘বিনু’ নামে অসুস্থ মেয়েটাকে। পঁচিশ বছর বয়সেই যাকে রোগে ধরেছিল, তার স্বামী তাকে হাওয়া বদলের জন্যে পশ্চিমে যাত্রা করেছিলেন। মাঝপথে ট্রেন বদলের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষারত ঝুমরু কুলির বৌ মহিলা যাত্রী নিবাসে ঝাড়ু লাগাতে এলে বিনু তার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করতে বদ্ধ পরিকর হয়, অনুরোধ করে – স্বামীর কাছে, তাকে টাকা দিতে। তার সেই আবদার কিন্তু রক্ষা করেননি তিনি উল্টে বকুনি দেন – সেই কুলিকে ডেকে, যাত্রীদের কাছে টাকা চাইবার জন্য। ওদিকে স্ত্রী কে বলেন, যে তিনি তার কথামতো ঐ বৌটিকে সাহায্য করেছেন। বিনু সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানায়। দুই মাস পরে যখন বিনুর মৃত্যুর পর পশ্চিম থেকে স্বামী একা ফিরছিলেন, তখন ঐ স্ত্রীকে ঠকাবার কথা ভেবে অত্যন্ত ব্যথিত ও লজ্জিত বিচলিত হয়ে ঝুমুর কুলির খবর নেন তিনি। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি, শুধু ঐ বিষম ফাঁকির অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে দংশন করতে থাকে।
এইরকমই একজন বিমলবাবু ও তাঁর পত্নী সরোজিনীর কথা আমি জানি। যিনি পেশায় ব্যাংক ম্যানেজার ও তাঁর ভালোই উপার্জন ছিল, কিন্তু স্ত্রী যখন তাঁর গরিব ভাইয়ের মেয়েটিকে পাত্রস্থ করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ বৌদির চিন্তা লাঘব করবার ইচ্ছায় তাঁর স্বামীর কাছে টাকা সাহায্যের আর্জি পেশ করেন, তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ হয়ে যায়। বিমলবাবু বলেন, – “আমি কেন দেব, যাদের মেয়ে তারা এতদিন জোগাড় করতে পারেনি?”
স্ত্রী সরোজিনী বলেন, “দেখো তোমার কত বড় চাকরী ব্যাংকে ….” কথাটা শেষ করতে না দিয়েই গর্জে ওঠেন তিনি – “তো ব্যাংকে অন্যেরা যে টাকা গচ্ছিত রাখে তা থেকে চুরি করবো না কি?”
– না না তা কেন গো, আমার তো মেয়ে নেই, ছেলেরাও…..” এবার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল তাঁর।”
-“মেয়ে নেই তো ছেলেদের পড়ার খরচ নেই? সব তোমার বাপের বাড়িতেই ঢালবো। যাদের টাকা নেই তারা মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে চাইছে কি সাহসে?” রেজিস্ট্রি বিয়ে দিতে বলো।”
সরোজিনীর চোখে জল এসে গেল, কিন্তু ছোট থেকেই তাঁর মা তাকে শিখিয়েছেন “বোবার শত্রু নেই” আর স্বামীর মুখের ওপর কথা বলার সাহসও নেই তাঁর।
প্রায় কুড়ি বছর পরে যখন মাত্র চারদিনের কোভিড-এ আক্রান্ত হয়ে সরোজিনী মারা গেলেন এবং বিমলবাবু করোনা পজিটিভ হয়ে একা ঘরে দিনের পর দিন ধরে বন্দি হয়ে আছেন, তখন ঐ শালার মেয়েটিই ছিল তাঁর একমাত্র ভরসা। দুই ছেলেই বিদেশে, মায়ের পারলৌকিক কাজেও আসতে পারলেন না, তারা দুজনেই।
স্ত্রীর ঐ ভাইঝি – সারাক্ষন থেকেছেন ৭০ বছরের অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিশেমশাইয়ের কাছে। ভাইদের সঙ্গে সবসময় ভিডিও কল করে মাকে দেখিয়েছে – শেষ যাত্রার আগে। বিমলবাবু বিবেক দংশনে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলেন। ভালো হবার পর যখন তিনি ছেলের পাঠানো ভিসা – টিকিট নিয়ে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরতে যাচ্ছেন, তখন সেই মেয়েটির দুটি হাত চেপে কেঁদে ফেললেন শিশুর মতন – “তোকে আমি বড্ডো ফাঁকি দিয়েছি মা – ক্ষমা করে দিস আমাকে।”
শুক্লাদিদি ভীষণ গোছানো মহিলা, স্বামীর সব মাইনে তিনি নিজে খুব বুঝে সুঝে খরচা করেন। কখনও ছেলে মেয়ে বা স্বামীকেও হাতে টাকা দেন না। সংসারের ভালোর জন্য তিনি সবসময় নিজের কাছে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে অর্থ জমাতে থাকেন, আর শুধু টাকা পয়সা লুকিয়ে নিজের অধীনে রাখেন তা নয়, একটি শাশুড়ির আমলে তৈরী কাঠের সিন্দুকে নানা রকম বাসন, বিয়ের দান সামগ্রী সযতনে জমাতে থাকেন। বড় বড় পিতলের পিলসুজ প্রদীপ, ঘড়া, কাঁসার বাসন, রুপোর থালা, বাটি, চামচ জামাই বরণের দ্রব্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তাঁর ইচ্ছে যখন মেয়ে বড় হবে তখন সবাই অবাক হয়ে যাবে, একজন সামান্য কেরানীর পত্নীর সম্পদ প্রাচুর্য্য দেখে। সোনার গহনাও গড়াতে থাকেন একটা একটা করে, ছেলের বৌ ও মেয়ের গা সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। নিরীহ স্বামী গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় যেতে পারেন না, ছেলে স্কুলে পিকনিকে বা শিক্ষামূলক ভ্রমণে যেতে অনুমতি পায় না। মেয়ে বন্ধুর জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারে না। দামী উপহারের টাকা নেই বলে। দু জনেই তারা ভাবে সত্যি তো মা কোথা থেকে দেবেন। আমরা তো নিম্নমধ্যবিত্ত – এসব বিলাসিতা করা আমাদের সাজে না। ছোট ছোট আনন্দ উৎসব, আত্মীয় স্বজনের দুঃখে, সুখে না যেতে যেতে তারা ঘরকুনো হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে জমা হয় চাপা বিদ্রোহের ভাব। একটু রাগ দেখলেই শুক্লা বলেন, – “আমি কি নিজের জন্যে কিছু করছি, – একটা ভাল কাপড়ও পরি না, পান দোক্তা খাই না, বাপের বাড়ি যাই না, সবই তো তোদের জন্য করছি।”
পরিবারের সকলের সঙ্গে নিজেকেও ঠকাতে থাকেন তিনি। ‘ফাঁকি’ দেওয়াতেই যেন অদ্ভুত একটা আনন্দ পান, শুধু সেই দিনের অপেক্ষায় থাকেন, – যখন ছেলে মেয়ের বিয়ের সময় তাক লাগিয়ে দিতে পারবেন সবাইকে।
কিন্তু তা আর হয় না, বিষন্ন স্বামী হটাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মেয়ে পাশের বাড়ির মুসলিম প্রেমিককে বিয়ে করে দুবাইতে পালিয়ে যায়, ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে হরিদ্বারে আশ্রমবাসী হয়। আর শুক্লা বসে থাকেন তাঁর গুপ্ত সঞ্চয় নিয়ে।
একদিন শোনেন দেওয়রের মেয়ের বিয়ে। আগে যে ভদ্রমহিলা কখনও শ্বশুরবাড়ি যাবার নাম নিতেন না। একদিন তাদের জন্য হটাৎ মনটা হু হু করে ওঠে। ডেকে পাঠান ছোট জা কে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসেন তিনি। শুক্লা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, – “তোর বিয়ের দানের সব বাসন রয়েছে দেখ মা এই সিন্দুকে। তোর তত্ত্ব সাজিয়ে দেবো আমি, সব গহনাও তৈরী, নিয়ে যা মা, আমি আমার বোঝা হালকা করি।” মেয়ে এক গাল হেসে উত্তর দেয় শুক্লা জেঠিমাকে, – “না গো মেজো-মা, আমি তো পণ নিয়ে যারা বিয়ে করে, তাদের ঘরে যাচ্ছি না, ‘রেজিষ্ট্রি’ ম্যারেজ-এর পরেই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাব, আর আজকাল কাঁসা পিতলের ভারী ভারী জিনিষ কেউ ব্যবহার করে না। এগুলো বরং বিক্রি করে কোন অনাথ আশ্রমে তুমি টাকা দিয়ে দাও, নয়তো নিজে একটু কাজের লোক রেখে আরামে থাকো। নিজের জন্যে তো কিছু করলে না।” এতদিনে ফাঁকির ফাঁকে যে ফাঁদ পাতা থাকে তা বুঝতে পারলেন শুক্লা।
প্রথমে মেয়ে হলে বাবার ভাগ্য খোলে শুনেছিলেন সন্দীপ বাবু। সত্যিই তাঁর মেয়েটি ভীষণ পয়া। রং যদিও শ্যাম বর্ণ। মায়ের মতন ফর্সা নয়, কিন্তু গালে টোল পড়ে, ভীষণ মিষ্টি হাসি তার। অনেক ভেবে নাম রাখলেন ‘মোনালিসা’ ডাকেন ‘মোনা/মনু মা বলে। ছোট থেকেই খুব বুদ্ধিমতী, তাই শহরের খুব নাম করা স্কুলে পরালেন তাকে। নাচ, গান, আঁকা, পিয়ানো, সাঁতার সব রকমের ট্রেনিং নিয়ে বড় হল সে। ব্যাঙ্গালুরুতে ‘ল’ পাশ করল সম্মানের সঙ্গে তারপর উচ্চ শীক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা। এই বাইশটা বছর মোনার বাবা মা শুধু তাকে কেন্দ্র করেই জীবন কাটিয়েছেন। তার সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া মেলামেশা করার সুযোগ পায়নি সে। হটাৎ আমেরিকার নতুন পরিবেশে নতুন পৃথিবীর পরিচয় পেল মোনা। বাবা মা একবার গিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে ভাড়া নেওয়া বাড়িতে একসপ্তাহ কাটিয়ে এলেন। সেখানে আলাদা আলাদা ঘরে বিভিন্ন দেশের চারজন ছেলে মেয়ে থাকে। রান্নাঘর একটি। যার যখন সময় সে নিজের খাওয়ার জোগাড় নিজে করে নেয়।
কেউ ‘ল’ পড়ে, কেউ ইন্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্ট কলেজে, একজন শ্রীলংকার প্রসিদ্ধ সিনেমা অভিনেত্রীর মেয়ে আবার ‘লস এঞ্জেলস’-এর কোন এক স্কুলে নাটক, নাচ ইত্যাদি শেখে – সে সন্ধ্যে থেকে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত বাইরে। চীন দেশের ছেলেটি হোটেল ম্যানেজমেন্ট-এর ছাত্র। রাত্রে যখন ঐ কমন কিচেনে তাদের সামুদ্রিক জীবজন্তুর রান্না করে, তখন অন্য রকম গন্ধে ঘর ভরে যায়। মোনা সেদ্দ ভাত বা খুচুড়ি এক হাঁড়ি করে রাখে, পাঁচদিন ধরে সেটাই খায়। ভালভাবে পড়াশোনা করতে হলে খাদ্যরসিক হলে তো চলবে না।
বাবা মা অবাক হয়ে যান এবং অখুশী মন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। মেয়ে পাশ করতেই ভাল ‘ল’ ফার্মে কাজ পায়। মা পাত্র দেখা শুরু করেন। তাঁর বোনের ভাগ্নেও আমেরিকায় থাকে, পি.এইচ.ডি শেষ করে কলেজে পড়াতে ঢুকেছে। স্বজাতি – পালিটঘর আনন্দে আত্মহারা হয়ে খবরটা জানান মোনালিসাকে। বাবা বলেন, – “তাড়াহুড়ো নেই, নিজেরা ওখানে দেখে নে, আলাপ করে নিশ্চয় ভাল লাগবে, তারপরে দুজজের একসঙ্গে ছুটি দেখে দেশে আয়, বিয়ের দিন ঠিক করব।”
প্রথমে মেয়ে উত্তর দেয় না। খুব পীড়াপীড়ি করলে বলে, – “এখন ব্যস্ত আছি রবিবারে কথা বলবো।”
রবিবার দুপুরে দিবানিদ্রা দিচ্ছেন মা, বাবা ম্যাগাজিন পড়ছেন, এমন সময় তার ফোন আসে, ঘড়ি দেখে তাড়াতাড়ি মোবাইলের ভিডিও কলটি খোলেন তিনি। মোনা বলে বাবা এখন ভিডিও করছিনা, খুব দরকার একবার মাকে দাও। বাবা ঘাবড়ে যান। এমন তো কখনও হয় না, প্রথমে তাঁর সঙ্গেই পড়া, কাজ, টাকা ইত্যাদি নিয়ে বেশ অনেক্ষন কথা বলার পর তো সে তার মায়ের সঙ্গে রোজ একই প্রশ্নের জবাব দেয়। – ‘কি রান্না করলি, আজ কি খেলি? ওই ছেলেটির ই মেল পেলি কিনা? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলি? কবে দেশে ফিরতে ছুটি পাবি?- – – ইত্যাদি ইত্যাদি, আজ প্রথমে মায়ের ডাক, নিজেকে একটু উপেক্ষিত মনে হল, সন্দীপবাবুর।
স্ত্রীকে হাঁক দিলেন, “ওঠো গো – মেয়ের ফোন” – এই সময়ে? সে কি এখন তো ওদের ওখানে অনেক রাত? – হ্যাঁ মামনি, বলরে, কেমন আছিস? এতো রাতে জেগে আছিস কেন?”
-“মা, মা শোনো, তোমাকে একটা জরুরী কথা বলছি, একটু ধৈর্য্য ধরে শোনো।”
-“হ্যাঁ বল মা।”
-“আমি আমি বলছি, আমি প্রেগনেন্ট।” খুব কেটে কেটে শান্ত গলায় বললো মোনা।
-“কী, কি বলছিস তুই, কাকে, কাকে বিয়ে করেছিস? এই সব কি হয়ে গেল?” চমকে উঠলেন সন্দীপ বাবু স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে।
– না মা বিয়ে এখনও হয়নি, আমরা লিভিং টুগেদার করি।
-কে, কে সে? – ম্যাক্স(Max) – আমেরিকান ছেলের সঙ্গে থাকতিস তুই? সন্দীপ বাবু ওর মায়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন। “ঠিক আছে আমরা আসছি তোর কাছে, ওর সাথে কথা বলতে, অথবা ইন্ডিয়াতে আয় দুজনে, বিয়ের অনুষ্ঠান তো একটা করতে হবে।” হটাৎ মনে হল, ওদিকে মেয়ের আর একটা ফোন আসছে, মা, বাবার লাইনটা কেটে গেল।
মোনালিসার মা কাঁদতে আরম্ভ করলেন – এ কী শুনলেন তিনি। সন্দীপ বাবুর কেমন যেন পুরো শরীরটা কাঁপছে। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে না ভয়ে ঠিক বুঝতে পারছেন না তিনি। মেয়েটা এমন করে ওদের সব আশা আনন্দে জল ঢেলে দিতে পারলো ! মা শুধু বলতে লাগলেন ‘এখন কি হবে, মেয়ে এমন একটা ঘটনা ঘটালো লজ্জায় সমাজে মুখ দেখাবো কি করে?’
এবার নিজেই ফোনটা মেলালেন তিনি, মেয়ে তুলছে না। মেসেজ করলেন কাঁপা কাঁপা হাতে, – “যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি ঐ গোরা বন্ধুকে নিয়ে দেশে চলে আয়।”
-“বাবা আমার পেটটি এখন খুব বড় হয়ে গেছে, আর ম্যাক্সও এখন যেতে রাজি নয়। তুমি বরং মাকে নিয়ে বাচ্চা হওয়ার সময় এসে যাও, তিন মাস পরে।”
এতো স্বাভাবিকভাবে এমন একটা গভীর সমস্যার কথা কিভাবে বলতে পারছে মোনা কে জানে – মা বললেন, “আইবুড়ো মেয়ের বাচ্চা হবে তাতে লজ্জা করছে না ওর মা কে আসতে বলতে?”
এবার বাবা বোঝালেন, “সবাইকে বলবে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে ওখানে, কে দেখতে যাবে ওখানে? তারপর পরিবেশের গম্ভীরতা কমাবার জন্য বললেন, ভালোই তো হবে – ঝুম্পালাহিনীর মতন আমেরিকান সাহেব জামাই দেখে মন ভুলে যাবে তোমার। দেখ তখন তুমিই আর ছাড়বে না ওদের।”
এবার মোক্ষম মেসেজটা এলো মেয়ের কাছ থেকে, “বাবা ম্যাক্স তো গোরা সাহেব নয়, “আফ্রিকান আমেরিকান।”
মা কি সাংঘাতিক জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “শেষে তোমার মেয়ে একটা কালো ভূত নিগ্রো বিয়ে করলো? ছি ছি ছি।” বাবার মুখে কথা বন্ধ হয়ে গেল। পরদিন মেয়ের ফোন এলো –
“মা, বাবা তোমরা আসছো তো?” দশ বছরের ভিসা তো আছেই তোমাদের। আমি টিকিট পাঠাচ্ছি।
ফোনটা বাবার হাতে ধরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন তিনি। সন্দীপ কি উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না, “তোর মায়ের শরীরটা খারাপ, এখন কি পারবে যেতে !” দেখি . . . . । যেন কোনো অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।
-“সেকি তোমরা আসবে না? ম্যাক্স ও তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথম থেকেই সে বাচ্চা নষ্ট করতে বলেছে, কিন্তু আমি রাজী হইনি। এখন আমাকে avoid করছে। ঐ সময় জ্যামাইকা চলে যাচ্ছে – please বাবা – মা কে নিয়ে এসো।” কান্নায় ভেঙে পড়ল মোনালিসা।
-“তুই একটা কালো ছেলের সঙ্গে শেষে . . .” গলা বুজে এলো বাবার – অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ কিসের আবেগে আর কিছুই বলতে পারলেন না তিনি।
“ওঃ তাহলে এটাই তোমাদের প্রবলেম। কালো বিয়ে না করে সাদা চামড়ার জামাই হলে তোমরা সব মেনে নিতে? কিন্তু বাবা আমার রঙ ও কালো। ও রা না হয় আমার চেয়ে একটু বেশী। তাহলে আমার জীবনের প্রথম সন্তান আসছে আর তোমরা আমার কাছে আসবে না?”
মা ও ঘর থেকে চিৎকার করছেন – “এইরকম মেয়ে পেটে ধরেছিলাম – রে আমি? মর মর মরগে – যা – জাহান্নমে যা, আমি ওর মা নই। ঠাকুর ! আঁতুর ঘরেই কেন মরে গেল না এমন সর্বনাশী মেয়ে !” ফোনটা কেটে দিল মোনা। তারপর তিনমাস অনেক চেষ্টা করেও আর কথা বলতে পারেননি সন্দীপবাবু। স্ত্রীকেও যেতে রাজী করাতে পারেননি। কী করতে পারেন তিনি, এরা দুজনেই যা জেদী।
খবরটা দিল ভারতীয় দূতাবাস থেকে। – আপনার মেয়ে মোনালিসা আত্মহত্যা করেছে। তার একটি ছেলে জন্ম নিয়েছিল, সেটি এক দত্তক কেন্দ্রকে দান করে দিয়েছে সে।”
– মেয়েটি বাবা মা কে ধোঁকা দিল না বাবা মা ফাঁকি দিলেন, এর বিচার পাঠক করবেন।