চন্দনা সেনগুপ্ত

তাঁতী বৌ যখন বিধবা হল, তখন তার বয়স মাত্র বাইশ, ছেলেটি দুই বছরের। উকিল বাবুর বাড়িতে কাজ নিল সে, সঙ্গে ছেলেকে আনতে হয়, দেখাশোনা করবার কেউ নেই তার। সারাদিন থাকে সেখানে, বাবুদের বাগানে খেলা করে বাচ্চা আপনমনে। ন্যাংটো থাকে সবসময়ে। গিন্নি মা বলেন, ‘ও তাঁতী বৌ একটা প্যান্ট পরাতে পারিস নে’?

– ‘অখন ত্যাখন মুতে দেয় যে, কতক্ষন থাকবেক উয়ার পরানে’।

বামুন দিদি বলেন, – ‘চান করিয়ে দে লো মাগী ! ছেলাটাকে, দ্যাখ কত ধুলা মাখছে’।

তাঁতী বৌ একগাল হাসে – ‘একটুকুন মাটি মাখা ভালো দিদি, উয়াতে কুছু হবেক লাই।’

অবেলায় পুকুরে একটা ডুব দিতে গিয়ে ছেলেটাকেও চান টান করিয়ে গোল বারান্দায় বসিয়ে দেয়, তাঁতী বৌ। এক বাটি মুড়ি বাতাসা দিয়ে। খেতে খেতে সে শুনতে থাকে বাবুদের ছেলেমেয়ের পড়া, কিম্বা নামতা মুখস্ত করা।

ভারী ভাল লাগে তাঁতী বৌ-এর। বারবার মা ভাদু/তুসু বা ধর্ম ঠাকুরের কথা স্মরণ করে, সে মনে মনে বলে, – “হুই মা, যত দেব-দেবীরা তুমাদের খ্যানে কুছু চাই নাই, আমার ব্যাটাকে একটুন ‘পড়াকু’ কইরে দাও”, –

অলখ্যে শোনেন, তাঁর কথা ঐসব বাঁকুড়াবাসীর – ‘ঘরোয়া দেবতারা’।

ওর ছেলেটা সত্যি সুর করে করে মুখস্ত করে ওই  , ক এ যফলা – ঐক্য; –

বাবুর ছেলেদের বলেন, গৃহ শিক্ষক অজয় মাষ্টার – ‘দেখ দেখ কেমন মন ঐ ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটার।’

ওর হাতে খড়িটা দিয়ে দিলেই তাকে চক খড়ি আর শ্লেট কিনে দেবেন তিনি।

– তাঁতী বৌ গিন্নীমায়ের বাড়িতে সরস্বতী পুজোর দিনে পুরুতমশাইকে ওর ছেলের হাতে খড়ি দেবার জন্য অনুরোধ জানায়। খুব খুশী হন তিনি। বাড়ির নগেন দারোয়ান একবার ঠাট্টা করে ,

“হ্যাঁরে তাঁতী বৌ তোর ছিলাটাকে জজ, ম্যাজিস্টর বানাতে হবেক নাকি’?

তাঁতী বৌ সেই সহজ সরল হাসিটা হেসে উত্তর দেয় –

“না গো নগেন দাদা অতোটা লয়। পাঠশালার ম্যাস্টার হলেই চলবেক। আমার মতন মুখ্যু সুখ্যু মায়ের ছিল্যাকে লয়তো সবাই ঠগাই লিবেক”।

স্কুলে ভর্তি হল ছেলেটা যার নাম তাঁতী বৌ রেখেছিল ‘পবনকুমার’। কিন্তু ক’দিন পরেই সে পাড়া-প্রতিবেশী এবং বাবুঘরের সকলের কাছে পরিচিত হল একটি নতুন নামে ‘পড়াকু’।

সত্যিই অসাধারণ তার জ্ঞান পিপাসা, যেখানে যা পায় বানান করে করে পড়ে সে। খবরের কাগজটা বাবুমশাইকে দেবার আগেই বাগানে বসে পাঁচ মিনিট ধরে হেড লাইনগুলো বানান করে পড়ে ফেলে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতেই ঐ বাড়ির বাচ্চাদের জন্য আগত শুকতারা পত্রিকা এলে কেউ দেখার আগেই সে পড়ে নেয়।

দশ বছর বয়সেই বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয় পবন কুমার গোটা বাঁকুড়া জেলার মধ্যে। আনন্দে তাঁতী বৌ কাঁদতে থাকে। কিন্তু সেবার বাবুদের বাড়ির বড় ছেলে দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। তাঁতী বৌকে সবাই কেমন যেন অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। আট বছর ধরে মন প্রাণ ঢেলে কাজ করলেও কোন দোষে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, বুঝতে পারে না মা ও ছেলে, হঠাৎ সেই গৃহশিক্ষক অজয় মাষ্টারমশাই পিছন থেকে ডাক দেন তাদের। “ও তাঁতী বৌ, চল মা আমার ঘরে, এদের মতন বেশী পয়সা তো দিতে পারবো না, তবে ওকে পড়িয়েই আমার বড় আনন্দ হবে। ঐ গাধাগুলোকে এতদিন ধরে পিটিয়ে ঘোড়া করবার বৃথা চেষ্টা করলাম, আর নয়। এখন ঐ পক্ষীরাজ ঘোড়াটাকে আমার আকাশে ওড়াতেই হবে, – পার করিয়ে দিতে হবে সাত সাগর আর তেরো নদী, কিম্বা হিমালয়ের ওধারে। পারবি না রে তুই পড়াকু? আমার স্বপ্ন পূরণ করতে।’’

তাঁতী বৌ রাস্তাতেই গড় হয়ে একটা দণ্ডবৎ করলো তাকে, আর ছেলেটা হটাৎ লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালো, তার পেছনে। তার ঐ মিষ্টি হাসিতে বলে দিল, যে সে নিশ্চই পারবে, তার ঐ ‘পড়াকু’ নামটি স্বার্থক করতে।

Leave a comment