চন্দনা সেনগুপ্ত 

আমরা যারা, আজ সুখের জমিতে, শ্যামল ভূমিতে 
আনন্দে শান্তিতে বসে বসে
বর্ষবরণের গান গাইছি, মধুর স্বরে, -
সময় কাটাচ্ছি, নানান নেশার ঘোরে, -
তারা কেমন করে ভাবতে পারে?
আঠাশ দিন ধরে, একটা অপোক্ত পুরোনো নৌকা ভরে -
পঞ্চাশ জন নারী, সাতচল্লিশ জন শিশু ও 
কতিপয় দুঃসাহসিক পুরুষ নাবিক-এর ‘প্রাণ‘
নাচছে যে গভীর সাগরে।
ঢেউয়ের তালে, খিদে তেষ্টায় দিশাহারা মানুষগুলো 
কলার পাতায় আশ্রয় নেওয়া
পোকার মতন অদৃষ্ট দেবতার খেয়ালে
কোন উদ্দেশ্যে শুধু ভেসে চলেছে !
ঝড় তুফানে, সুনামির কাঁপনে, তাদের
জন্ম মৃত্যুও ক্ষণস্থায়ী, জীবন যে নাচছে শুধু
'তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ করে।
ওদিকে ডিসেম্বর - একত্রিশে, পৃথিবীর সব দেশে,
পূর্ব দিগন্ত হতে পশ্চিমের শেষ প্রান্তে,
মরুভূমি থেকে মরুদ্দেশে - বনে অরণ্যে
নগরে - শহরে বিশেষ করে সমুদ্র কিনারে 
মানুষ নেশায় মাতে,
আনন্দের ফুলঝুরি, পড়ে ঝরে ঝরে।
"ক্যালেন্ডার" পুজোয় মত্ত জনতা মহামারীকেও 
উপেক্ষা করে, জমা হয় হাজারে হাজারে।
পথ ঘাট সাজে, বাদ্যি বাজে, আগুনের মশাল জ্বলে।
বাজি পোড়ায় তারা। আকাশের কালো আঁধার চিরে
আলোর মালা দোলে।
কী অসম্ভব বৈপরীত্য - কী অস্বাভাবিক বৈসাদৃশ্য -
একধারে তুবড়ির রোশনী ঝলমলে সাগরতীরে,
আর অন্যদিকে -
জমাট ভয়ে আতঙ্কিত মানবের ভাগ্য - নৌকা ঘিরে;
সব আশা মোমবাতির মতন তখন পড়ে গলে গলে।
পাল ছেঁড়া, ইঞ্জিন বিকল হওয়া নৌকার -
উদ্বাস্তু যাত্রীদল হয়তো আর একটু পরেই 
তলিয়ে যাবে অতল সলিলে।
আকাশের তারারা শুধু মিটি মিটি করে চায়,
এই অভাবনীয় অবাঞ্ছিত দৃশ্য দেখতে হবে বলে,
এক ফালি চাঁদটাও মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়।
সময় থমকে দাঁড়ায়, সবাই নিশ্চুপ।
ঐসব শিশুগুলি - যারা এখনও প্রার্থনা করতে শেখেনি,
আল্লাহ, ঈশ্বর - কাউকেই চেনে না, বুদ্ধদেবের অহিংসার 
পরিচয় তাদের কেউ দেয়নি, কিম্বা ক্রূশবিদ্ধ যীশুর 
বাণী প্রচারকদের নামও জানে না -
শুধু একদৃষ্টে টলমলে পাল থেকে হেলে পড়া
বাঁশের দিকে ঊর্ধ মুখে তাকায়,
ডুবন্ত নৌকার অবিরাম দোলা তাদের কাঁপুনি বাড়ায়। 
'মৃত্যু' নামের ভীষণ দানবের চেহারাটা তাদের তো 
অজানা নয়। 
চোখের সামনে তাদের  বাপ, দাদারা  গুলিবিদ্ধ হয় ,
রক্তাক্ত দেহগুলো কবরের মাটি নাহি পায়,
গলিতে গলিতে কুকুর শেয়াল সেগুলি ছিঁড়ে খায়।
মা, মাসি, দিদি, বৌদিদির ওপর পাশবিক অত্যাচার, ক্রন্দন 
হাহাকার যেদিন তাদের কানের পর্দা ফাটায়, -
সেদিনও তারা ছিল, এমনই নির্বাক অসহায়।
চোখের জল ফেলার মতন ছিল না সময় বা উপায় !
এই কয়মাস ধরে তারা জীবন পাখি হাতে নিয়ে 
কেবলই এক দেশ হতে অন্যদেশে স্থল বা জলপথে 
শুধু পালিয়ে বেড়ায়।
তাদের অন্তরে অদ্ভুত বিহ্বলতা ও সীমাহীন বিস্ময়।
শন শন করে বাতাস বয়, তারা চায় একটু
‘আশ্রয়’।
মায়েরা খালি ভাবে - শিশুগুলি বুকে চেপে ধরে -
আমাদের ত্রাণকর্তা আজ কোথায়?
এদের কী অপরাধ প্রভু? অবোধ, অবুঝ বালক শিশু -
এরা কেন শাস্তি পায়!
করেছে কী এমন অন্যায়?
‘আল্লাহ’র দরবারে  তারা অভিযোগ জানায়।
শেষে, সেই ব্যাকুল মানুষের আকুল আকূতি
হয়তো ঈশ্বরের দরজা ধাক্কায়, 
তাই
একটি দ্বীপের কাছে - ইন্দোনেশিয়ায় ,
এক চকিতে সেই ডুবন্ত নাও, দৃষ্টি গোচর হয়,
মৎস্যজীবী একদল লোক চমকে ওঠে -
যখন বিদ্যুতের আলো ঝলকায়।
আর সেই মানুষদের প্রাণে ভগবান জাগায়
আত্মবিশ্বাস, তারা অনুভব করে -
'মানবিকতার' দায়।
তাদের সমস্ত সত্তাকে কেউ যেন নাড়া দেয়।
তাদের তৎপর করে, 
একমুহূর্ত দেরী করলে ভীষণ অনর্থের
সাক্ষী হবে ভেবে, তারা - চিৎকার করে -
‘ঐ প্রানগুলি বড় অমূল্য, বাঁচাতেই হবে ওদের।
তুলে আনবই, আমরা, নিরাপদ নিশ্চিন্ত ডাঙায়’ ।
‘নৌসেনার’ কাছে তারা বার্তা পাঠায়;
তাদের এই জেলেদের নৌকায় 
ধরবে না এই শতাধিক লোক,
তাই আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থা ও
সৈনিকের অসামান্য প্রচেষ্টায় 
আঠারো ঘন্টা ধরে, উদ্ধার কার্য তারা চালায়।
'রোহিঙ্গ্যার' বাস্তুহারা ছন্নছাড়ার দল
উঠে আসে সমুদ্র কিনারায l
বছরের প্রথমদিনে এতোগুলি প্রাণীর জীবনদানে 
দ্বিতীয় জন্ম দিয়ে, অবিশ্বাস্য 
দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে সেই 
দয়ালু ধীবর সম্প্রদায়।
 সার্থক হয় ওদের বর্ষ-বরণ l
সারা বিশ্বের মানবদরদী আত্মা আবার 
মনুষ্যত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
জগতের মায়েরা উদ্ধারকারীদের পাযে বারেবারে 
প্রণাম জানায়।