চন্দনা সেনগুপ্ত

ওরা নাকি মানুষ? ওদের আছে মান আর হুঁশ।

ওরা ধর্ম – কর্ম – ঘর্ম বেঁচে রকমারী অস্ত্র বানায়।

ওরা চাঁদ ধরতে চায়,

কিন্তু সুন্দর সৃষ্টির বিনাশ ঘটায়,

নানা ধরণের বোমা বানায়, –

ধ্বংস তথা বিনাশের  উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ায়,

কত রকম উপায়  !

শান্তির আকাশ ভরে দেয় কালো ধোঁয়ায়,

 কি সুখ যে ওরা পায়?

 

আমার মতন অতি ক্ষুদ্র একটা

আফ্রিকার ইঁদুরকে এইসব তথ্য –

বড় কাঁদায় আর ভাবায়।

নামটি আমার ‘ম্যাগামা’।

বাড়ি তানজানিয়ায়।

ছোট্ট একটা গ্রামে নগন্য এক অরণ্যে

মাঠে ঘাটে বনে বনে, মা বাবার সঙ্গে

আমার মতন শত শত প্রাণীরা

ঘুরে বেড়ায়।

ঠিক এইসময় সুদূর বেলজিয়াম থেকে

কে যেন আমাদের ডাক দেয় –

কী  এক মোহনীয় কাজের আহ্বান শোনায়,

এখন আমার মন তোমাদের সেই

কাহিনীটি জানাতে চাই।

 

তানজানিয়ার জঙ্গলে, বনে, মাঠে, ঘাটে মা, বাবা, ঠাকুমা, দাদু ও বন্ধু-বান্ধব ভাই বোনদের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতাম, আমরা আফ্রিকার দৈত্য ইঁদুরের দল।

অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্যাঙ্গারুর’ মতন আমার মায়ের পেটেও থলি আছে। তাই আমাদের ‘Pouched – Rat’ ও বলা হয়। ভীষণ আনন্দে নিজেদের জগতে মত্ত হয়ে ছিলাম, হটাৎ একদিন একদল লোক এসে খাঁচায় পুরে বন্দী বানালেন, আমাদের মতন বেশ কিছু ছোট ছোট ইঁদুরদের। মা বাবার থেকে আলাদা হয়ে খুব দুঃখ হল, কান্নাকাটিও করলাম, একনাগাড়ে কয়েকদিন ধরে। কিন্তু ওরা আমাদের কোনো ক্ষতি করল না। খুব ভালোভাবে আমাদের প্রিয় খাদ্য বাদাম (Peanuts) আর কলা খেতে দিল। অনেক রকম ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর সব ইঁদুরের মধ্যে থেকে আমাকে আলাদা করে দিল, আমার নাকি ঘ্রান (Sniffing ) শক্তি ভীষণ প্রবল। ওদের মনে হল, আমি খুব চটপটে আর বুদ্ধিমান তাই ওরা আমাকে একটা অদ্ভুত ধরনের গন্ধ শুঁকিয়ে বার বার করে কিছু বোঝাতে চাইল। নতুন শিক্ষন প্রণালীতে আমার খুব মজা লাগল।

আমার নাম “ম্যাগামা” (Magama) ওদের সংস্থার নাম – এপোপো (APOPO) ‘বেলজিয়াম’ নামে একটি ভারী সুন্দর দেশে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। একটা মাঠে সারাদিন ধরে চলল, আমার নতুন প্রশিক্ষণ। আমার চোখের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, তাই মাঠের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু খুঁজে বের করবার ট্রেনিং দিতে লাগলেন ওরা। ওগুলো কি প্রথমে আমি জানতাম না। পরে শুনলাম, ওগুলোকে ভূমিজ বোমা (Landmine) বলা হয়। আমার কাজ হল, জমিতে লুক্কায়িত আছে ঐরকম যেসব বোমা সেগুলো গন্ধ শুঁকে শুঁকে তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বের করে দেওযা, তাহলে ওরা আমাকে আরও অনেক বাদাম ও কলা পুরুস্কার দেবে। বেশ কিছুদিন ট্রেনিং এর পর ওরা আমাকে নিয়ে গেল কম্বোডিয়ায়।

সেখানে ভিয়েতনামের সীমান্তে এক বিশাল জায়গাজুড়ে এই সব ‘ল্যান্ড মাইন পোঁতা আছে। এটা যে কত সাংঘাতিক সেটা আমি জানতাম না, একদিন যখন একটা জায়গায় একদল মানব শিশু খেলা করছিল, তখ্ন  ওদের সামনে একটি বোমা ফাটল। আমরা একটু দূরে থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলাম, কিন্তু ওই বাচ্চাগুলির ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত দেহ, যন্ত্রনাকাতর মানুষের ক্রন্দন, চিৎকার অসহায় মর্মান্তিক অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি।

কে, কারা, কিসের জন্য এইরকম ‘মারণাস্ত্র’ মাটির নীচে পুঁতে রেখেছে, বুঝতে পারলাম না। তারা কি সব পাগল? রাক্ষস? কোনো  দানবের দল!

আমার শিক্ষকেরা খুব দয়ালু। আস্তে আস্তে তাঁদের সম্পর্কে অনেক জ্ঞান হল আমার।

“Anti Personnel Landmines Detection product Development On Wikkenling – Apopo জানতে পেরেছে যে আমার দ্বারা এইসব পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনগুলি বের করা সম্ভব হলে বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবেন তাঁরা।

কম্বোডিয়ায় তৎকালীন কম্যুনিস্ট গর্ভমেন্ট Khmer Rouge এবং আমেরিকা নামক সবচেয়ে উন্নত দেশের সাহায্য প্রাপ্ত ‘ভিয়েতনামের’ মানুষের কান্ড এটি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত নিজের দেশের মানুষের হত্যাকারী সরকারের নিষ্ঠূর ক্রিয়াকর্ম দেখে আমার মতন ছোট্ট একটি জন্তুও চোখে জল রাখতে পারল না l

মাওবাদী/স্টালিনবাদীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী দল এতো জঘন্য হত্যালীলা চালিয়েছে, যার বর্ণনা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। কত নিরীহ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী শান্তিকামীর  প্রাণ যায়, ঐসময় ওদের হাতে। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য ৭৫০ কিমি সীমান্তে হাতে করে এই সব ছোট ছোট একধরণের নিউক্লিয়ার বোমা পুঁতে দিয়েছিল তারা। পড়ে আরও শত শত বোমা ঠিক ঐরকম ভাবে মাটিতে পুঁতে মৃত্যু ফাঁদ বানিয়ে রাখতে কি যে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল ভিয়েতনামের মানুষ, আমার মতন রোডেন্ট ইঁদুরের চোদ্দ পুরুষেরও সাধ্য নেই তা বোঝবার।

১৯৮০ থেকে ৯০ পর্যন্ত কত যে বোমা ফাটে এবং সাধারণ গরীব শান্তিকামী মানুষের বিনাশ হয়, তার হিসেবে নেই, পাঁচ বছর ধরে কাজ করে করে একাই আমি ৭০টি ঐরকম ল্যান্ডমাইন খুঁড়ে বের করলাম। বিস্ফোরণের আগে তাদের আবিষ্কার, কত হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। আরও ৩৮টি জায়গায় ওদের লুকিয়ে রাখা মারণাস্ত্রও উদ্ধার করতে সক্ষম হলাম আমি।

ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ার যুদ্ধে চল্লিশ (৪০) হাজার লোক মারা যায় এবং ৬০ হাজার আহত হয়। ভিয়েতনামকে আটকাবার জন্য কম্বোডিয়া হাজার হাজার ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখে তাদের প্রশস্ত সীমান্তে। ওদিকে অন্য দলও কম যায় না, তারাও আমদানী করে বহু পোর্টেবল নিউক্লিয়ার বোম! যেগুলি হাতে করে গর্ত খুঁজে খুঁজে জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা হয়। যাতে কেউ সীমান্তের এ পারে আসতে না পারে।

সেই হাত বোমাগুলি ফাটতে থাকে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত। কত হাজার গ্রাম্য শিশু, কৃষক, শ্রমিক মাঠে কাজ করতে গিয়ে মাটি খুড়বার সময় ঐসব বোমা ফেটে প্রাণ হারায়। নিরীহ মানুষ নিধনের এই গুপ্ত অস্ত্র এখনও কখনো কখনো কোনো কৃষকের লাঙ্গল লেগে মাটির ভেতর থেকে মুখ বাড়ায় এবং প্রচন্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসের মৃত্যুর লীলা খেলা দেখায়।

১৯৭৯ সালে ভিয়েতনাম এই কম্বোডিয়ার দখল নেয এবং যুদ্ধের বিভীষিকায় ভীত ত্রস্ত ক্লান্ত দেশবাসী এই ল্যান্ডমাইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। একটি সংস্থা Peace Tree পুঁতে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে প্রচেষ্ট হয়। তাদের স্লোগান হল – যেখানে যেখানে ঐ ল্যান্ডমাইনগুলি ছিল সেখানে একটি একটি করে বৃক্ষ রোপন করা। ১৫০০ জায়গায় অনেক ল্যান্ডমাইন বের করে ৮০০০ গাছ লাগানো হয়। এই উদ্যোগ অসামান্য প্রচেষ্টায় ঐ দেশের রূপ বদলাতে থাকে।

আমাকে ‘লন্ডনে’ নিয়ে গিয়ে গলায় সোনার মেডেল দেওয়া হল, অলিম্পিকের খেলোয়াড়দের মতন। আসলে এটি আমার APOPO শিক্ষক ট্রেনারদের প্রাপ্য। একদল মানুষ এখনও আছেন, যাঁরা ধ্বংস নয় সৃষ্টিতে বিশ্বাস করেন। পৃথিবীটাকে সুন্দর শান্তিপূর্ন যুদ্ধ হিংসা বিদ্বেষ হীন এক আনন্দময় জগতে পরিণত করতে চাইছেন। আমার মতন ক্ষুদ্র প্রাণীর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবেন তাঁরা কথা দিলেন আমায়। আমার জীবন ধন্য হল স্বার্থক হল।

Leave a comment