চন্দনা সেনগুপ্ত

বিহারের এক অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ী অঞ্চলে এই অ্যালুমিনিয়ামের ফ্যাক্টরীটি স্থাপিত হয়েছিল, প্রায় ৭০বছর আগে। স্বাধীনতার ঠিক পরে পরে সারা দেশের উৎসাহী যুব সম্প্রদায় বিশেষতঃ গুজরাটি – মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবী কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু মিলে তৈরী করেছিলেন, এই অ্যালুমিনিয়ামের কারখানা। হাঁড়ি কুড়ি, কড়াই, মগ বা নিত্য ব্যবহার্য্য আরো নানান ধরণের দ্রব্য তৈরী হয় এখানে। দেশকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করার এই অদম্য বাসনা তাঁদের পূর্ণও হয়েছিল। ছোট ছোট পাহাড়ের কোলে রাঁচি জামশেদপুর থেকেও কিছুটা দূরে নানানরকম মেশিন বসানো হল, চারিদিকে ঘর-বাড়ি কোয়াটার তৈরী হবার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট, কুয়ো, পুকুর, মন্দির মসজিদ, গুরুদ্বারা, বাজার দোকান, হাসপাতাল, একটি নগর পত্তনের জন্য যা যা দরকার সবই নির্মাণ করা হতে লাগল। তখন মালিক গোয়েঙ্কা সাহেবের প্রিয় সহচর টেকনিশিয়ান ওরফে পিয়ন, ওরফে কেরানী ছিলেন মদনলাল গুপ্তা, যৌবনের সমস্ত উদ্যম ও পরিশ্রম দিয়ে বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ফ্যাক্টরীকে বড় করতে তাঁর অবদান কিছু কম ছিল না। সবাই ভালোবাসতেন, তার কাজের দক্ষতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখে। ওপরের সব ম্যানেজার ও অফিসার যেমন তাঁর সততা ও কর্ম ক্ষমতায় মুগ্ধ ছিলেন, নিচের শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীরা তাঁকে ততটাই সমীহ করতেন এবং ভয়ও পেতেন। কারন তাঁর মতন গম্ভীর স্বল্পবাক কঠোর মনোভাবের লোক ঐ ফ্যাক্টরীতে আর দ্বিতীয় ছিল না। তাঁর নাম দিয়েছে সবাই নারকেলবাবু। বাইরেরটা  ভীষণ শক্ত আর ভেতরটা নরম কোমল। নিজের কোন কাজে যেমন ত্রুটি হতে দিতেন  না সহজে, সামান্যতম ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আবার সেটাকে ঠিক নিখুঁত ভাবে সম্পূর্ণ করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে লেগে পড়তেন। অন্যদেরও তেমনি ধৈর্য ধরে কাজ শেখাতেন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন সবাইকে। কাজই তাঁর ধর্ম, কর্ম, জ্ঞান ছিল। নিত্য নতুন টেকনোলজি শিখতে, পড়তে, জানতে তাঁর আগ্রহ দেখে মালিক তাঁকে বেশ কয়েকবার বিদেশেও পাঠান। মাত্র স্কুল পাশ করে তিনি তাঁর সঙ্গে এখানে এসেছিলেন, আর পরে মালিক তাঁকে B.Sc., M.Sc. পাশ করান, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে স্পেশাল ট্রেনিং নিতে জার্মানী, ফ্রান্সে ও ঘুরে এসেছেন তিনি। পঞ্চাশ বছরে তাঁকে দেখা যায় এম.বি.এ, ও লেবার ‘ল’ পড়তে। জীবনে উন্নতি করার অদম্য ইচ্ছাটা তার নিজের জন্য নয়, সমস্ত ধ্যান জ্ঞান উৎসাহ ও প্রচেষ্টায় তিনি এই ফ্যাক্টরীরও সমৃদ্ধি ও সুনাম বাড়িয়ে তুলতে চেয়েছেন। পঞ্চান্ন বছরেই তাঁকে তাই জেনারেল ম্যানেজারের পদটি দেওয়া হল।

 

দ্বিতীয় পর্ব

মালিক দেহ রেখেছেন। এখন তাঁর ছেলেই কোম্পানীর মালিক। মদনলালবাবুকে সেও খুব মানে বা তার ওপরেই সব দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, পঁয়ত্রিশ বছরের টেকনিক্যাল ও ম্যানেজেরিয়াল দক্ষতা, শ্রমিক পরিচালনার সুকৌশল ও ফ্যাক্টরীর নিরাপত্তার জন্য তাঁর খ্যাতি দুর্দান্ত, বিশেষজ্ঞের সর্ব্বোচ্চ তালিকায় তারা তাকে রেখেছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেকটি দুর্নামও তিনি পেয়েছেন, বড় ‘পারফেকশনিস্ট।’ তাঁর একগুঁয়েমি জেদী স্বভাব তাঁকে যেমন ক্যারিয়ারের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে – এই এক রোখা, আপাতদৃষ্টিতে রাগী ও খুঁতখুঁতে, কাজের মান উঁচু রাখার জন্য শ্রমিক কর্মচারীদের বকা ঝকা করা, আদর্শবাদ ও মূল্যবোধের সঙ্গে কিছুতেই সমঝোতা না করতে পারা, – ইদানিং কালের অধঃস্তন কর্মচারীদের, জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার বা অফিসারদের ভালো লাগে না। বাইরে কঠিন ব্যবহার, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য নামটি তারা ঠিকই দিয়েছে ‘কোকোনাট স্যার’। ইউনিয়ানের নেতারাও এখন নানা রকম সমালোচনা করে। মালিকপক্ষের যা কিছু ত্রুটি তাদের চোখে পড়ে – সবকিছুর জন্যই তারা মদনলাল গুপ্তকেই দায়ী করেন, কারণ তিনি জেনারেল ম্যানেজার, আবার কর্মচারী অর্থাৎ নীচু স্টাফ, শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে, তাদের বোনাসের টাকা, কোয়াটার মেরামত, যানবাহন বা নিত্য নৈমিত্যিক বস্তু ঠিক সময় হাজির করার দাবী নিয়ে যখন তিনি মালিকদের দরবারে আর্জি করেন, তখন সেখানেও অপ্রিয় হয়ে যান। এই পঁয়ত্রিশ বছরে বহু পরিবর্তন এসেছে ফ্যাক্টরীর পরিবেশে।

আগে এখানে সমস্ত প্রদেশ থেকে লোক নেওয়া হত, এখন প্রাদেশিকতা জাতপাতের বিভেদ মাথা তুলেছে। স্থানীয় নেতাদের প্রাধান্যও বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে এই ফ্যাক্টরীগুলিতে। তার ওপরে ব্যবসায়িক সমস্যা। প্লাস্টিকের চল বাড়ছে। বাজারে অ্যালুমিনিয়াম স্টিলের পরিবর্তে সব জিনিষই পলিয়েস্টর – মোটা ধরনের প্লাস্টিকে তৈরী করে কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

অনুন্নত দেশগুলি ‘চীন’ দেশের দ্রব্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায়, রপ্তানীও কমে গেছে। লোক ছাঁটাই করার ইচ্ছে না থাকলেও ধীরে ধীরে কর্মীসংখ্যা কমানোর নির্দেশ এসে গেছে। – তিনি কাউকেই ছাড়তে পক্ষপাতী নন।

মাদনলালবাবু আজকাল প্রায় মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। আগে কর্মচারীরা যদি কাজে গাফিলতি করতো বা তাদের চারিত্রিক দোষ পাওয়া যেত, তাহলে সহজেই তাকে ডেকে বকুনি দিতে – বোঝাতে তথা শুধরাতে চেষ্টা করতেন তিনি এবং তার কথা মন দিয়ে শুনতো সে, কিন্তু এখন যুগটা কেমন পাল্টে গেল, কাউকে ভালোভাবে বসিয়ে কাজ শেখাতে গেলে সে বলে, ‘হ্যাঁ আমি জানি’ অর্থাৎ আপনার আর জ্ঞান দেওয়ার দরকার নেই। মালিকের ছেলেরা নতুন মনোভাব নিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চাই। মিনিস্টার, এম.এল.এ, এম.পিদের সন্তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত। মালিকের জামাই হংকং থেকে পড়াশোনা করে এসেছে, সে এখানে ফ্যাক্টরীর খরচ কমিয়ে চীন দেশ থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল আমদানী করে এখানে বড় বড় হোটেলে সাপ্লাই করতে চায়।

মদনবাবুর ইচ্ছে তরুণ কিছু ইঞ্জিনিয়ারকে পাঠিয়ে ঐ কাজটির প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে। তারপরে আরও কিছু অন্য ধরনের মেশিন কিনে ওনাদের ফ্যাক্টরীতেই সেগুলি তৈরী করতে। কিন্তু তাঁর কথা মানতে কেউই রাজী নয়। কাউকে মোটা টাকার ঘুষ খাইয়ে একটি কোম্পানীর অ্যালুমিনিয়াম পাত লাগানোর টেন্ডারটি হাসিল করার কথাও একদিন তিনি জানতে পারলেন। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বড়বাবুর দয়ায় সে আজ এই পদে বসেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ক্ষমতা কমিয়ে আনা হচ্ছে। অসৎ লোকেদের পাশে বসতে হচ্ছে। স্ত্রী সবিতা মাঝে মাঝেই বলেন, এবারে কাজ ছেড়ে দাও, চলো আমরা দূরে কোথাও নিরিবিলি জায়গাতে গিয়ে বসবাস করি। ছেলে মেয়ে নেই তাঁদের। ঝাড়া ঝাপ্টা মানুষ, স্ত্রী বাগান করা নিয়ে এবং তিনি ফ্যাক্টরী নিয়েই ব্যস্ত, সারাটা জীবন কাজে কাজেই কেটে গেল।

কর্মচারীদের বাসগৃহগুলি মেরামত করা দরকার। নালিগুলি অনেকদিন পরিষ্কার হয়নি, ফ্যাক্টরীর আসে পাশের জঙ্গল, ঝোপ ঝাড় ঠিক সময় মালীরা কাটছে না। সেখানে নাকি সাপের উপদ্রপ বেড়েছে, কেউ যেতে চাইছে না। তাদের ওপর চেঁচামেচি করতে কাজ বন্ধ করে দিল তারা, সেই নিয়ে তরুণ মালিকের ইংরেজি ভাষণ ও সমালোচনা শুনতে হল মদনবাবুকে। ইউনিয়নকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করলেন তিনি। কয়েকজন বয়স্ক কর্মী নিয়ে সেখানে গেলেন মদন লাল, নিজে হাতে ‘কার্বলিক অ্যাসিড’ ঝোপে ছিটিয়ে সাপ তাড়ালেন। বাইরে থেকে ভাড়া করা গরীব মজদুর দিয়ে সব জায়গা ঝকঝকে তকতকে করলেন। ফ্যাক্টরীর রূপ সুন্দর হলে শুধু তাঁরই যেন লাভ। তবু কেন বারে বারে তাঁর মনে হয়, এই ‘কর্ম ভুমি’ তার কাছে এক দেবালয়, প্রান দিয়ে তাকে ভালোবাসার নামই পুজা বা সাধনা l

এদিকে ক্যান্টিনের খাওয়া দাওয়া নাকি ক্রমশঃ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একদিন একদল যুবক থালা বাটি ছুঁড়ে না সেদ্দ হওয়া মাংস ডাস্টবিনে ফেলে ভীষণ হৈ চৈ বাঁধিয়ে দিল। ক্যান্টিন ম্যানেজারকে ডেকে পাঠালেন, জেনেরল ম্যানেজার মদনলাল, – তিনি আঙ্গুল দেখালেন রাঁধুনিদের দিকে। প্রধান রাঁধুনী বেশ জোর গলায় জানালেন যে, – এটা তাদের দোষ নয় – যে এনেছে, সেই বাজার সরকারকে ধরুন, – তিনি জানালেন এবারে মাংস বিক্রেতার দোষ। মাংসের দোকানে লোক ছুটল, জানা গেল, দর কম দেওয়াতে বাসি মাংস দিয়েছে। কেন? টাকা ঠিকমত দেওয়া হয় নি? সে দিল ক্যাশিয়ার বাবুর নাম। মদনলাল তাকে যখন তলব করলেন তিনি শুধু মালিকের রুমের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিল যে সে কিছু জানে না, ওখানে জিজ্ঞেস করুন। এদিকে ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিল, ধর্মঘট হল, – উৎপাদন নেই, যেখানে অ্যালুমিনিয়ামের দ্রব্যাদি যাওয়ার ছিল, সেখানে সময়মতো সেগুলিকে সরবরাহ করা গেল না। জেনারল ম্যানেজার মদনলালের ওপর সমস্ত দায়িত্ব ছিল, অতএব বলির পাঁঠার মতন তাকেই – এই সমস্ত সমস্যা, বিভ্রাট অব্যবস্থা তথা বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হল।

মালিকপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন কেউই ছেড়ে কথা বলার লোক নন। ওপর থেকে অপমানসূচক চিঠি ও নীচে থেকে অকথ্য গালাগাল খেয়ে ঘেরাও হয়ে অসম্ভব টেনশন এর মধ্যে কাটালেন তিনটে দিন। ভাবলেন এবার চাকরীটা সত্যিই ছেড়ে দেবেন তিনি। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না।

 

তৃতীয় পর্ব

দু বছর পরে, তাঁর কাছে ওয়েল ফেয়ার অফিসার একজন ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। কর্মচারীদের ফ্যাক্টরীতে আনবার জন্য বাস চালায় সে। প্রায় মদ খায় ভীষণ বদ মেজাজী, কাউকে মানে না। জি.এম. সাহেব যেন চার্জশীট দেন তাকে। ডেকে পাঠালেন লোকটিকে। সত্যিই তার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। পান চেবাতে চেবাতে এল সে মুখ থেকে মদের গন্ধ ঢাকতে। দোষ করেও মাথা নীচু করে না। কদর্য ভাষায় সহকর্মীদের সাথেও কথা বলে। মদনলালবাবু তাকে সাবধান করে দিলেন, দ্বিতীয়বার এরকম করলে তাকে বরখাস্ত করা হবে, – সে কথাও বেশ জোরের সঙ্গে শুনিয়ে দিলেন।

অনেক দিন ধরে নানান ঝামেলায় তিনি একটু ক্লান্ত ও বিব্রত হয়ে পড়েছেন, ভালো লাগছে না আর কথা কাটাকাটি করতে নীচের অফিসারকে বললেন, এরপরেও যদি না শোনে তোমরা কোন অ্যাকশন নিও। এসব লোকেদের আমার কাছে আর পাঠিয়ো না।

পরের সপ্তাহে ঐ গুন্ডা প্রকৃতির লোকটি ঠিক সময়ে বাস নিয়ে কর্মীদের না আনায় এবং মদ খেয়ে গাড়ি চালানোর জন্য ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার তাকে সাসপেন্ড করল। লোকটিকে তার বন্ধুরা জানালো, “জি.এম. তোর নোকরী খেয়ে নিল।” কাল থেকে আর আসতে হবে না তোকে। আজ বাসটা গ্যারেজে পার্ক করে চলে যেতে বলেছেন বড়বাবু।’

মদনলাল তার সুন্দর অফিসরুমে খুব কম সময়েই বসেন, সারাদিন ফ্যাক্টরীর এ ডিপার্টমেন্ট থেকে ও ডিপার্টমেন্ট ঘুরে বেড়ান। আজও স্টোর পরিদর্শন করে আর একজন জুনিয়র ম্যানেজার এর সঙ্গে গেটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, হটাৎ উল্টো দিক থেকে ফ্যাক্টরীর খালি বাসটি তীব্র বেগে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে লাফিয়ে পাশে সরতে গিয়ে পড়ে গেলেন, সবাই ছুটে এল, খুব প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি, কিন্তু অন্যরা মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটল বাস ড্রাইভারকে ধরতে। সে এদিক ওদিক আঁকা বাঁকা চালিয়ে সোজা গিয়ে ধাক্কা মারল সামনের বাউন্ডারী দেওয়ালে। সবাই ভাবলো বাসের ব্রেক ফেল করেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। লোকটিকে বাস থেকে বের করে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মদনলালবাবু কিন্তু এক নজরে দেখেছিলেন ওই চালককে, কিন্তু কাউকে কিছু জানতে দিলেন না l

ছয়মাস পার হয়ে গেল, এবার বেশ কিছু টেকনিশিয়ান নেওয়া হবে ফ্যাক্টরীতে। প্রথম পরীক্ষায় যারা পাশ করেছে, তাদের ইন্টারভিউ হয়ে যাওয়ার পর কাকে কাকে নেওয়া হবে তার লিস্ট তৈরী হচ্ছে। মালিক তাঁর স্থানীয় নেতাদের প্রভাবে ও অনুরোধে ঠিক করে নিয়েছেন ,কার কার নাম প্যানেলে রাখা হবে। মদনবাবুকে শেষে পাঠানো হল, সাইন করবার জন্য। তিনি প্রতিবারের মতন এবারেও জানতে চাইলেন যে স্টাফদের কোনো ছেলে আছে কিনা। জুনিয়র অফিসার জানালেন যে একটি ছেলে খুব ভাল পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু তার নামটি ওঠেনি। ওর চাকরী হওয়া খুবই দরকার। কারণ ওদের বাড়ির অবস্থা খুবই শোচনীয়। সেই স্টাফের স্ত্রী অফিস এসে রোজ পা হাত ধরছে কিন্তু আমরা কি করব বলুন স্যার? বোর্ড মেম্বারের কিছু করার নেই। বললেন ঐ জুনিয়র।

‘‘স্টাফটি মারা গেছে? তাহলে তো ‘কমপেনশেশন গ্রাউন্ডে’ নিতে পারা যায়’’ – মদনলাল বাবু বললেন। ‘না না স্যার তার দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে।’ এক্সিডেন্টে পা দুটি এমনভাবে থেতলে যায়, যে ডাক্তারবাবু এমপুট করতে বাধ্য হয়েছেন। সে কিছু করতে পারে না। তার বড় ছেলেটি মানসিক ও শারীরিকভাবে অক্ষম। পাগল শুধু নয়, নিজে নিজে খেতে পরতেও পারে না। মেয়েকে অনেক পণ দিয়ে বিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু শশুরবাড়ির লোকেরা তাকে পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল, তার মুখ হাত সব পোড়া, সেও বাবার কাছে ফিরে এসেছে। এই ছেলেটিই মায়ের ভরসা। পড়াশোনা ও ব্যবহারে খুব ভাল, বুদ্ধিমান। কিন্তু আমরা কি করবো বলুন, এর নাম সবচেয়ে পেছনে। দুবছরেও চাকরী পাবে কিনা সন্দেহ। ততদিনে প্যানেল ক্যান্সেল হয়ে যাবে।

জি.এম. মদনলাল আবার সেই লিস্ট তৈরী করালেন, নিজে ঐ বোর্ডের সব মেম্বারদের নিয়ে। সেই লিস্টে সবচেয়ে আগে তিনি ঐ ছেলেটির নাম রাখলেন। স্টাফেরা এখানে রক্ত জল করে কাজ করছে, আর তাদের ছেলেদের চাকরী হবে না। হবে, ঐ বড়লোকের ছেলেদের! – দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের ভাই, ভাগ্নে বাড়ির লোকেরা পাবে চাকরী?

একসপ্তাহ পরে একদিন তাঁর পি.এ. বললেন, স্যার, একজন ভদ্রমহিলা আর ঐ দু পা কাটা স্টাফ এসেছে, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। দুই বগলে স্ক্র্যাচ নিয়ে ধীরে ধীরে লোকটি ঢুকল ঘরে। পেছনে ঘোমটা মাথায় একজন মহিলা। ঢুকেই সে স্ক্র্যাচ ফেলে দিয়ে হুমড়ি খেয়ে মদনবাবুর পায়ের উপর পড়ল। আরে ওঠো ওঠো, পি.এ. এবং তিনি নিজে ঝুঁকে তুলে ধরে চেয়ারে বসালেন। লোকটির দুচোখে জলের ধারা বইছে, – “স্যার আপনাকে আমি বাসে চাপা দিয়ে মারতে চেয়েছিলাম, আর আপনি আমার ছেলেকে চাকরী দিয়ে আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে দিলেন, ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।”

পরদিন সকালেই তাঁকে জানানো হল যে মালিকের কথামত কাজ না করায় বরখাস্ত করা হয়েছে জি.এম. মদনলাল গুপ্তকে। কিন্তু সমস্ত শ্রমিক কর্মচারী, বয়স্ক, তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অফিসার বা পিয়ন এমন কি ক্যান্টিনের রাঁধুনী, চাকর, দারোয়ান সবাই এসে ধর্ণা দিল মালিকের ঘরের সামনে। “জি.এম. সাহেবকে ফিরিয়ে দাও নইলে ফ্যাক্টরীতে তালা দাও। আমাদের দাবী মানতে হবে – নইলে গদী ছাড়তে হবে।”  ইউনিয়নের কথা শুনতেই হল তাদের। বরখাস্তের নোটিশ লেটার ছিঁড়ে ফেলা হল।

মদনলাল বাবু সাধারণ মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে ধীর পদক্ষেপে ফিরে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে। অদ্ভুত একটা আনন্দে মনটা শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে গেল। মেন গেটে প্রবেশ করতেই দেখলেন, তার বাগানের পাশের লনে বাক্স, বিছানা, ও নানা ব্যাগ, সুটকেস সব সারি দিয়ে রাখা আছে। তাঁর স্ত্রী এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে বললেন, জীবনে এক একটা সময় আসে যখন সব আকর্ষণ  কাটিয়ে আমদের এগিয়ে যেতে হয়, অনেক কাজের মোহ মানুষকে  workaholic করে তোলে, এবার সেটা ছাড়তে হবে তোমায়, আমিও অকারণে এই ঘর, দোর নিয়ে ভুতের বেগার খেটে মরছি, আর নয়, আমরা এখন গঙ্গার ধারে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি, সেখানে এখন থেকে আমাদের ‘বানপ্রস্থের’ শুরু।

Leave a comment