চন্দনা সেনগুপ্ত
গাছের চারা লাগাই আমি বড় বাবুদের বাগানে। ছোট ছোট গাছগুলির জন্যে সবচেয়ে আগে, সেখানে তৈরী করি মাটি, ঝরঝরে উর্ব্বর। পরিবেশ ভাল না পেলে অঙ্কুর কি বেরোতে পারে! ওরা বাড়তে পরে সর সর তারপর খাদ্য সার দেওয়া, সময়মত গোড়ায় জল ঢালা। আশে পাশের আগাছা তুলে ফেলে তাদের বড় করার পালা। বাঁশের বেড়া লাগিয়ে ঘিরে দিই তাদের নইলে ছাগলে খাবে মুড়িয়ে, - গরু মোষে দেবে পাড়িয়ে। সবুজ সবুজ নরম কোমল পাতা ছোট ছোট পাখিদের ভীষণ প্রিয় জানি। তাদের থেকেও তো বাঁচাতে হবে, ওদের কচি কচি মুখ খানি, কাগজের টুপি পরিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখি, বসে থাকি ঠায়, খুঁজি উপায়, তাড়াই পাখি। ধীরে ধীরে তারা বড় হয়ে যায়, যখন দোলে একটু বেশি হাওয়ায়, - তখন কাঠি পুঁতে দিই, সোজা রাখতে। রোদের তাপে মুরঝে যায় যদি, দিই না তাপ লাগাতে, পোকা লাগলে ভয় লাগে, ওষুধ দিই, যদি বাঁচাতে না পারি, - মায়ার অন্জন মাখি, সারাক্ষণ ওদেরকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। অনেক ধৈর্য্য ও যত্ন লাগে, গাছগুলিকে বড় করতে করতে, মাস থেকে বছর ঘুরে যায়। তারপর সেথায়, কলি ধরে বুঝি, ফুল ফুটতে আর নেই বাকি। প্রজাপতির রঙে, মৌমাছিদের ঢঙে, ভোমরার গুনগুন গানে ও সৌরভে বাগানটি যেন খিল খিল করে হেসে ওঠে। আমি মনে মনে আনন্দের আল্পনা আঁকি। ঠিক এমনি করে পরের বাড়ির কচি কাচাদের দেখাশোনা করেন, - পদ্ম, লতা, কমলা, মঙ্গলা ঝি’দের দল। মা বাবারা তাদের ব্যস্ত ভীষণ, পড়াশোনায় বড় বড় কঠিন কাজে, অর্থ উপার্জন। দিনরাত তারা বাইরে থাকেন, ঘরে এলেও কানে 'ডাক' শোনে, ফোন আসে, অফিসের সারাক্ষণ। কাজের মাসি, দিদি, পিসি এঁরাই তাঁদের সহায়। যত্ন করে বুকে ধরে করেন শিশু পালন। মনে থাকে না, নিজের বাড়ির কথা, - ভুলে যেতে থাকেন, স্বামী হারানোর ব্যথা। কেউ কেউ আবার বিয়ে করার চিন্তা মনেও আনে না কখনও। গ্রামে টাকা পাঠানো, পিতৃহারা ভাইবোন মায়ের কর্তব্য পুরো করতে তাঁর, বিদেশে আগমন। বাগানের ঐ মালীর মতন করে - আগলে রাখেন, বড় করে দেন ঐ বড়লোকের আদুরে, চঞ্চল, অভিমানী বাচ্চাদের। কোন অভিযোগ নেই কারো প্রতি, নেই কোনো অনুযোগ। রোজগারের টাকা নিয়েও করেন না ভোগ। শুধু ওরা বড় হয়ে যখন সম্মান দেয়, বলে - আমায় উনি মানুষ করেছেন, - আনন্দে আবেগে চোখের জলে ভাসেন, তখন।