চন্দনা সেনগুপ্ত

মিস্টার ভেঙ্কট ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা দেবী চেন্নাই থেকে রওনা দিলেন সিঙ্গাপুরের দিকে। আর পাঞ্জাব থেকে দিল্লীতে এসে এয়ার ইন্ডিয়ায় সিঙ্গাপুরের ফ্লাইটে চড়ে বসলেন, মিস্টার ও মিসেস কাপুর। দুই বৃদ্ধ চাকুরী থেকে অবসর প্রাপ্ত এবং তাঁদের পত্নীদ্বয় ছেলে বা মেয়ের সাফল্যে গর্বিত গৃহবধূ। তাঁরা তাঁদের চেন্নাই ও অমৃতসরের বড় বাড়িতে গাছপালা লাগিয়ে চাকর-বাকর, মালী, ড্রাইভারদের নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছেন। তাঁদের একমাত্র নাতি ‘রাঘবের’ ১৮ বছরের জন্মদিন পালন করতে ওখানে যাত্রা করছেন। ভেঙ্কট ও বিনীতা ওর ঠাকুরদা ও ঠাকুরমা এবং কাপুর দম্পতি নানা-নানী। দুই দাদু এবং দাদী ও নানী আনন্দে একেবারে বিগলিত।

রাঘবের স্কুলের পাঠ শেষ হয়েছে। এবারে সে এয়ার ফোর্সে পাইলটের ট্রেনিং নিতে ‘কানাডায়’ চলে যাবে। তাই তার সঙ্গে আর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ আসবে না, এই জন্য মা বাবা রাঘবের আগ্রহে বড় পার্টি দিতে “সন্তোষা দ্বীপে” (Sentosa Island) একটি হোটেল বুক করেছেন। তার মা কমলেশ ও বাবা রঙ্গনাথ দুজনেই IIT এবং IBM একসঙ্গে পড়েছেন, তাদের এই প্রবাসে চাকরী জীবনে সাফল্য ও অর্থ দুটোই এনে দিয়েছে। ২০ বছর এখানে আছেন, নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন। দু’জনেই তাদের বাবা মা দের একটি করে সন্তান। কিন্তু দেশে ফিরে যেতে বা চেন্নাই অমৃতসরের জমি-জমা, সম্পত্তি, বিশাল বাড়ি ভোগ করতে ইচ্ছুক নয়।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান উৎসব – অনেক বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খুব সুষ্ঠভাবে পালিত হল, নাতি চলে গেল বিদেশে। এই বৃদ্ধ বৃদ্ধা রা তাঁদের ছেলে মেয়েদের দূরে পাঠিয়েছেন, অতএব রাঘবের বাবা মা ও  মুখে করুন হাসি টেনে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। এক সপ্তাহ পরেই দুই Grand Parentsদের চলে যাওয়ার টিকিট কাটা আছে। এমন সময় জানা গেল, চীন দেশে উদ্ভব হয়েছে, সেই ভীষণ করোনা ভাইরাস।

যার প্রকোপে – আক্রমনে (২০১৯ এর ডিসেম্বরে যার সৃষ্টি) ২০২০ জানুয়ারীতেই সিঙ্গাপুরে ভীতি দেখা দিল। এখানে বিচক্ষণ সরকার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন ঘোষণা করলেন।

দেশ থেকে কেউ বেরোতেও পারবে না, আবার কেউ বাইরে থেকে আসলে ১৪দিন হোটেলে ‘কোরেন্টাইনে’ থাকতে হবে। অনেক টাকা খরচ করতে এবং বার বার কোভিড টেস্টে পাশ করতে হবে।

অতএব সব বাবা মায়েদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দেশে যারা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন, তাঁদের সন্তানেরা অসহায় হয়ে – বিদেশে বসে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। এ এক বিভীষিকাময় পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নিরুপায় মানুষ নিরানন্দে জীবন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ঐ চারজন বৃদ্ধ – বৃদ্ধার অবস্থাও দাঁড়ালো যেন ঠিক চিড়িয়াখানায় আটকে রাখা জন্তুর মতন।

মেয়ে কমলেশ ও ছেলে রঙ্গনাথ বাড়িতে বসেই কাজ করেন, দিনরাত কম্পিউটারে। Work from home এই মহামারীতে তাদের জীবনটি এক নতুন খাতে বহে নিয়ে যাচ্ছে।

‘চারজন’ ভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন কালচার ধর্মাবলম্বী লোক অবসর সময়ে ছেলে তথা জামাইয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এখানে একটাই এখনও ভাল যে মাস্ক পরে নিচে সুইমিং পুলের ধারে সকাল বিকেল ঘুরতে পারছেন। সেখানেই আলাপ হল, আরও অনেক মা বাবাদের সঙ্গে, তাঁরা কেউ কলকাতা তো কেউ হায়দ্রাবাদ, কেউ পুনে তো কেউ কাশ্মীর থেকে আগত। ছেলে মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশুনো করে কেউ কম্পিউটার কোম্পানীতে, অথবা কেউ ব্যাংকে সব ভালো ভালো পদাধিকারী, ভালো মাইনে পান। কিছু প্রফেসর বা জাহাজের ক্যাপটেন, ইঞ্জিনিয়ার, সুন্দর সুন্দর এপার্টমেন্ট     (কন্ডো- তে) বাস করছেন। বৃদ্ধ বাবা মা রা তাদের নিয়ে গর্বিত। যখনই দেশ থেকে কেউ আসেন, তাঁদের নিয়ে হৈ হুল্লোড় করতে, বিভিন্ন দ্বীপে – কাছে পিঠে নিয়ে যেতে, গাড়ি করে মালয়েশিয়া বেড়াতে তাঁরা বেশ উৎসাহ দেখান। বাড়িতে প্রায় দিন রান্না করতেও হয় না। এখানের খাওয়ার দোকান food court থেকে নিয়ে বড় বড় বিভিন্ন দেশের রেস্তোরা হোটেলগুলিতে এত নতুন নতুন খাদ্য তালিকা পাওয়া যায় যা সারা বিশ্বকে আকৃষ্ট করে। তাই রোজ একঘেয়ে খাবার না খেয়ে তারা বাবা মা দের নিয়ে প্রত্যেক শনি – রবিবারে বেরিয়ে পড়েন জিভের স্বাদ বদল করতে। সামুদ্রিক মাছ, জাপানী সুশি বা চীনদেশের রকমারি খাদ্য দ্রব্যের পাশেই পাকিস্তানী কাবাব বা বাংলাদেশের বিরিয়ানি। এখানে লন্ডন – আমেরিকার মতন দেখবার দর্শনীয় স্থান খুব বেশী নেই, আমাদের ভারতের মতন ঐতিহাসিক পুরোনো সব রাজপ্রাসাদ, মন্দির – মসজিদ, তীর্থক্ষেত্র কিংবা হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতেও পাওয়া যায় না। তাই সব মনোযোগ এই দেশের খাওয়ার ওপরে। সুতরাং যখনই কেউ আসেন ছেলে মেয়েদের সঙ্গে অন্য দেশের আহার্য্য দ্রব্য তাদের নতুন নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এখানে সুযোগ ঘটে। সিঙ্গাপুরে র এই সব Food court গুলো World Heritage এর আওতাভুক্ত হয়েছে এদের বৈচিত্রের জন্য। দু-চার মাস আনন্দে কাটিয়ে তারা ফিরে যান। কখনও কখনও বা কোন কোন পিতা মাতার ভাগ্যে বালি, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বিনথাম বাথাম কিংবা থাইল্যান্ডের ফুকট, ব্যাঙ্কক ঘোরার বেশ উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা লাভ হয়ে যায়।

কিন্তু এখন সব বন্ধ। দু/চার মাস থেকে ছয়/আট মাস বছর ও ঘুরে গেল, কিন্তু long term visa নিয়ে যে সব পিতা মাতার দল সিঙ্গাপুর বাসী হয়েছিলেন, কেউই আর ফিরে যেতে পারছেন না নিজের আরামপ্রদ চেনা পরিবেশে। কেউ তাই এখন আগেকার সময়ের মতন খুশি বা সুখী নন। দেশের গ্রামে বা শহরে কিংবা ছোট্ট নগরে যে প্রশস্ত আঙ্গন, আম, জাম কাঁঠালের বাগান, গাড়ী, ড্রাইভার কাজের লোক তাদের জন্যে অধীর আগ্রহে বসে আছে, নিজের ঘরের বারান্দা, ফুলের টব বা তুলসী গাছ, পোষা গরু, বাছুর, কুকুর – পাড়া – প্রতিবেশী, চায়ের দোকান, প্রভাতে সন্ধ্যায় আড্ডামারার সেই পার্কের কোনায় সিমেন্টের বেঞ্চ, পুরোণো বন্ধু সব পড়ে আছে দেশের মাটিতে।

‘ভেঙ্কটবাবু’  নতুন প্রতিবেশী  মিঃ দাশের সাথে কথা বলতে বলতে তাঁর অতি মোটা জোরালো গলায় কখনও দেশের প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ তো কখনও কখনও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি রাগ ব্যক্ত করেন, তাঁর স্ত্রী খুঁজে বেড়ান তামিল বান্ধবী। সময় কাটান, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ান হেল্পার কে ধোসা ইডলী শেখাতে।

একসঙ্গে দুটো বাসন থাকলে যেমন ঠোকাঠুকি লাগে, শব্দ হয়, কাঁচের পাত্র তো ভেঙে চুরমারও হয়ে যায়, ঠিক সেইরকম দুজন মানুষকে এক জায়গায় বন্দি করে রাখলে, তাদের সম্পর্কের চিড় ধরতে থাকে। এই প্রবাসী পরিবারেও সেই আনন্দময় পরিবেশের জল একটু একটু করে ঘোলা হতে শুরু হল।

ছেলের বাবা মা ধার্মিক দক্ষিনী ব্রাহ্মণ। নিরামিষ খাওয়া, তিলক কাটা, সকাল বিকাল অনেক্ষন ধরে পুজো পাঠ করতেই তাঁরা অভ্যস্ত। মেয়ের পাঞ্জাবী মা বাবা গুরুদ্বারে যান, পাঠ শুনে, কর সেবা করে, সেখানে হালুয়া প্রসাদ, কখনও বা ‘লঙ্গর’ অর্থাৎ ওদের বানানো কমন কিচেনে ডাল – রুটি খেয়ে আসেন, কখনও বা বাড়িতেই খুব পেয়াঁজ রসুন দিয়ে ডালের সুস্বাদু তড়কা বানাতে ভালোবাসেন, সব রকমের আমিষের রান্না করতে  তাঁদের আগ্রহ। মেয়ে তাদের জন্যে মুর্গা নিজেদের ওভেনে তন্দুরী করে দেন। ছেলে বাবা মায়ের জন্যে ‘আনন্দভবন’ কিংবা ‘কোমিলা বিলাসের’ মসলা ধোসা, সাম্বার অর্ডার করে আনায়।

তাদের দুজনের মধ্যে খুবই সুন্দর বোঝাপড়া আছে। যে যার মা ও বাবার খরচ বহন করে। দুজনেই তাঁদের মা বাবা দের একটি মাত্র করে সন্তান হওয়ায় নিজের নিজের মায়েদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ট। এই কোভিড-এর সময় সিঙ্গাপুরের অবস্থা অনেকটা ভালো, কিন্তু ইন্ডিয়ার খবর রোজ রোজ ক্রমশঃ খারাপের থেকে খারাপ হচ্ছে, তাই তারা বাবা মা কে ওই রোগের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেদের কাছেই খুব যত্নে ও আনন্দে রাখতে চায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে নানান সমস্যা শুরু হল। ক্রমশঃ দুই প্রদেশ থেকে আগত দুই ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন আচার এবং আচরণে, খাওয়া পরার ট্রেডিশনএ-ও কালচারে অভ্যস্ত মা বাবাদের অসুবিধেগুলো সামনে আসতে লাগল, মাত্র কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ এই বয়সে অন্য পরিবারের সঙ্গে থাকা যায়, কিন্তু মাসের পর মাস তো সম্ভব হয় না। – এটা দুই বৃদ্ধ দম্পতির মনের কথা। ভেঙ্কটবাবু ও তাঁর স্ত্রী বিনীতা হাত দিয়ে ভাতে তরকারী ‘সাম্বার ডাল’ এবং তার সাথে দই মেখে বেশ সপ সপ করে মুখে আওয়াজ করে খেয়ে তৃপ্তি পান। এর মধ্যে তো লজ্জার কিছু নেই। এইভাবেই তাঁরা ছোট থেকে তেঁতুল বা নারকেলের চাটনি খেতে শিখেছেন, এতেই তাঁদের পেট ও মন ভরে। কিন্তু কমলেশ-এর মা বাবা সব সময় চামচ দিয়ে ভাতের ওপর একটু চাপ চাপ রাজমা, চানা বা ছাল শুদ্ধ মুগ / মুসুরের ডাল ছড়িয়ে খেতে ভালোবাসেন। তাঁদের যে কোন তরকারী সে ভিন্ডি(ঢেঁড়স) বা তরী(ঝিঙে) বা ঘিয়া(লাউ) হোক না কেন, বেশ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটো, লঙ্কা বা গরম মসলা দিয়ে রেঁধে খেতে তাঁরা অভ্যস্ত। করলার ভরুয়া কিংবা আরবিকেও (কচু) তাঁরা বেশ চটপটি বানাতে পারেন। তার সাথে স্যালাড বা রায়তা’তে বেশ শশা, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা দেওয়া  চাই। দুই ভদ্রমহিলাই ভাল রাঁধুনি ছিলেন নিজের নিজের পরিবারে। সুগৃহিনী রূপে নাম কামিয়েছেন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। তাঁরা বাইরে কাজ করতে যাননি, রান্নার লোক রাখেননি, নিজেরা খুব যত্ন সহকারে সংসারের খুঁটিনাটি সব জিনিষ সাজিয়েছেন, নিজেরাই মসলা পিশে, সব্জি কেটে, ধুয়ে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে ঘরের কাজ সম্পন্ন করতেন। তাই এখানে বিদেশী মেয়েদের হাতের রান্না তাদের মুখে রোচে না। দুজনেই এখন রান্না ঘরে ঢুকতে বা রান্নার তদারকিতে ব্যস্ত থাকতে চান। কিন্তু তাঁদের মেয়ে ও ছেলে মায়েদের সাবধান করে দিয়েছেন, – এখানে অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের সরকার ভীষণ কড়াকড়ি ভাবে নজর রাখে কাজের লোকেদের ও মালিকদের ওপর।

দেশে যেমন কাজের লোককে তুই বলে সম্বোধন করা যায়, বা যখন যেমন তখন তেমন ভাবে কাজ নেওয়া হয় – এখানে সে সব একেবারেই চলবে না। রোজ মাছ, মাংস, ডিম, নুডুলস, ভাত ওদের নিজেদের মুখের স্বাদের মতন বানিয়ে, যাতে ওরা খায়, সেদিকে ও খেয়াল রাখতে হবে। দুই মায়েরই এ ব্যাপারে এক মত, যে “তোমরা এদের বড্ডো বেশি প্রশ্রয় দাও।” বৌমা ছেলে খুব হাসে। – বলে ‘না হলে এখানে ফাইন লেগে যাবে। কোন একটা অভিযোগ পেলে আমরা প্রবলেমে পড়ে যাব। ঝি চাকরদের জ্বালাতন করলে শাস্তিও পেতে হয়, ওদের ত্রুটি সরকার বা ওদের ‘এজেন্সি’ একেবারে বরদাস্ত করবে না। সে রকম অভিযোগ গেলে আমাদেরকে চাকরিও খোয়াতে হতে পারে। অতএব দেশের মতন কথায় কথায় ‘ঝি-চাকরদের’ বকা ঝকা করা, দোষ দেওয়ার অভ্যাস এখানে ছাড়তে হবে। সুতরাং মায়েদের মুখে কুলুপ পড়ে গেছে। বাবারাও বেশিরভাগ সময় খেলা বা রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় সময় কাটান, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে ভেঙ্কটবাবু ভীষণ রকমের মোদী ভক্ত, হিন্দুত্ববাদকে প্রাধান্য দেন, কিন্তু কাপুর সাহেব ঠিক তার উল্টো কথা বলেন। ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে তিনি একটু বেশি সোচ্চার। পুজোপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ এসব তাঁর ধাতে পোষায় না। মেয়ে পড়াশুনোয় খুব ভাল ছিল। ইংরেজি স্কুলে পড়াশুনো করায়, পাঞ্জাবী ভাষায় কথা বলে না, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রেমালাপ বা কলহ সবই চলে তাদের ইংরেজিতে। তাই শুধু নিজের মায়ের সঙ্গেই মাতৃভাষায় কথা বলে।

কোভিড ১৯ মহামারী তাদের চারজনকে সোনার খাঁচায় সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে রাখলেও কিন্তু তাঁরা ডানা ভাঙা পাখীদের মতন ডানা ঝাপটাতে লাগলেন। দেশের জমি, বাড়ি, ঘর, টাকাপয়সা, গয়নাগাটি ও আত্মীয়দের ভালোবাসার আকর্ষণটা তাদের দিনে দিনে তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হতে লাগল।

ছেলে ‘রঙ্গনাথ’ ও মেয়ে ‘কমলেশ’ ধীরে ধীরে বিরক্ত হতে আরম্ভ করল। বাড়িতে সারাদিন বসে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়, তাদের ফোনের পর ফোন কল আসে, ঘরে চারজন বুড়ো বুড়ি ঘুরে বেড়ান, কেউ জোরে কাশেন তো কেউ তার চেয়েও জোরে হাঁচেন। কেউ যখন তখন ধুম্রপানের সঙ্গে ড্রয়িং রুমে টিভির সামনে বসে ফুল স্পীডে খবর শুনতে ভালোবাসেন তো কেউ ফোনে Youtube এ গীতাপাঠ chanting শোনেন।

যে যার নিজের ভাষায় নিজেদের মধ্যে দেশে ফিরতে না পাড়ার জন্যে বা কখনও কখনও আত্মীয়দের মৃত্যু সংবাদে উতলা হয়ে জোরে জোরে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগেন। দুই দম্পতির মধ্যে সেই আগের মতন বন্ধুত্ব বা ভদ্রতা রক্ষার বালাই নেই।

ভেঙ্কটবাবুর স্ত্রী বিনীতা বৌমার মায়ের ব্যাপারে নিজেদের ভাষায় নিন্দা, টিপ্পনী করেন। ওনার আমিষ খাওয়া, জামাই মেয়ের সঙ্গে বসে বিয়ার বা ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দেওয়া, ওড়নি (চুনরি) গায়ে না দেওয়া, জোরে জোরে হাঁসা বা কথা বলা, এসব  কিছুই পছন্দ করেন না তাঁরা।  ওদিকে কাপুর সাহেব আবার ভেঙ্কটবাবুর খাটো করে ধুতি পরা, রোজ রোজ দুবেলা ভাত খাওয়া, পুজো পাঠে সময় কাটানো নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হাসি মজাক করতে ছাড়েন না। বয়স্ক লোকেদের এই judgmental হওয়া, অন্যের দোষ দেখা, নিজের নিজের ট্রেডিশন, ধর্ম ও অভ্যাসগুলোকে ভালো, ও অন্যদেরটি খারাপ ভাবার অভ্যেস কেউই ছাড়তে পারেন না। একটা ‘ইগো’ দিয়ে ঢাকা মেঘের আচ্ছাদনে, আবরণে থাকাটাকে শ্রেয় বলে মনে করেন। তাঁদের ছেলে মেয়েরা আলাদা ভাবে নিজের নিজের মা বাবাকে বোঝাতে থাকেন, কেন তোমরা চারজনে একসঙ্গে বসে তাস কিংবা ক্যারামবোর্ড খেল না। একদিন নর্থ ইন্ডিয়ান ও একদিন সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খাও, তাহলে ওই কাজের ফিলিপিন মেয়েটার কাজ হালকা হয়ে যাবে। না দুই মা-ই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উঠবেন, নাস্তা বানাবেন, রান্না করবেন আলাদা আলাদা বাসন ব্যবহার করে। . . . .

হটাৎ একদিন বিনীতা দেবীর পেটে অসম্ভব যন্ত্রনা শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার দেখলেন নানা টেস্ট হল, জানা গেল,’ক্যান্সার’। আগেও তাঁর ব্রেস্ট ক্যানসারের অপারেশন হয়েছিল, বোঝা গেল পুরোনো রোগের বীজ পেটেও ছড়িয়ে গেছে। অনেক খরচ করে কেমো দিয়ে সেবা যত্নের ত্রুটি না হওয়া সত্বেও ছয় মাসের বেশী বাঁচানো গেল না তাঁকে। স্বামী ভেঙ্কটেশ বাবুর  মনে যতই কষ্ট হোক, একটা সান্ত্বনা রইল যে, তিনিও তার স্ত্রীকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই করেছেন। ছেলের ও বৌমার সেবা তো অতুলনীয়। দেশে থাকলে হয়ত কোভিড হয়ে বিনা চিকিৎসায় বিনীতা মারা যেতেন। ভেঙ্কটবাবু অসহায় হয়ে একা কি করতেন সেখানে? ভেবে পান না। এখানে মায়ের দাহ ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম ছেলে নিজের হাতে সম্পন্ন করতেও সক্ষম হল। হিন্দু ধর্মের এইসব নিয়মকানুন মা খুব মানতেন, তাই তামিলভাষী পুরোহিত, মন্দির ও সমুদ্রের মাঝে সরকার নির্দেশিত এক বিশেষ দ্বীপে গিয়ে মায়ের ভস্ম‌ বিসর্জন করে সে ও তার বাবা ভেঙ্কটবাবু খুব শান্তি পেলেন। এখন দুই বৃদ্ধই চুপচাপ গুমসুম হয়ে থাকেন। ভেঙ্কটবাবু স্ত্রীর শোকে এবং কাপুর সাহেব দেশের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে, নিজের জমির গম বিক্রির চিন্তায়। বহু কষ্টে তিনি ঐ ফলের বাগান, চাষের জমি, কাপাস তুলোর ক্ষেতগুলি একটি একটি করে কিনেছিলেন। এখন বিহার থেকে আগত সব শ্রমিকরা সে সব ছেড়ে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছেন। প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে রোজ কোন না কোন অসুখের খবর শুনতে শুনতে তিনিও যেন কেমন বোবা হয়ে গেছেন। সামনে বেয়ানের ঐ ক্যান্সারের পেছনে তাঁর মেয়ে ও জামাইয়ের প্রায় ৭০/৮০ লক্ষ টাকা খরচ হতে দেখে আরও ঘাবড়ে গেছেন। এখানে মেডিক্যালের জন্য খরচ করতে গিয়ে লোকে ফতুর হয়ে যায়। যাঁরা এখানের নাগরিক তাদের সব বিনামূল্যে হয়। কিন্তু তারা Long Term Visa নিয়ে বেড়াতে বা সন্তানের বাড়ি থাকবার ছাড়পত্র পেয়েছেন, তাঁদের সব ব্যায় ভার নিজেদেরই বহন করতে হয়। আমাদের দেশের মতন এখানে অলিতে গলিতে ডাক্তার বসে না। ‘প্যাথলজির’ জন্যে ওখানে বহু সরকারী বেসরকারী ল্যাব পাওয়া যায়। এখন আবার ওনাদের যদি কিছু হয় তো কি হবে? কেউ এবারে কোন ইন্সুরেন্স (বীমা) করে আসতেও পারেননি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য আসার ইচ্ছে ছিল তাঁদের।

ক’দিন আগে পর্যন্ত বেয়াই ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে তর্ক করে বেশ আনন্দ উপভোগ করতেন, মিঃ কাপুর এখন স্ত্রী হারা শোকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষটিকে দেখলে বড় মায়া লাগছে তাঁর। খালি মনে হচ্ছে এই ‘কোভিড’ এর প্রকোপ কবে কাটবে এবং তারা দেশে ফিরতে পারবেন। একটা অচেনা ভয়-ভাবনা-বিষন্নতা তাঁকে পেয়ে বসেছে। যদি তাঁর স্ত্রীও এমনি করে হটাৎ চলে যান, তাহলে কে তাঁকে দেখবে? পত্নী তাঁকে সারাজীবন হাতে হাতে সব এগিয়ে দেন, সুস্বাদু রান্না করে খাওয়ান, গরমের সময় বিয়ার এনে দেন, রাত্রে ডিনারের পরে নিজেদের বারান্দায় বেডরুমে বসে তাঁরা ওয়াইন পান করেন দুজনে মিলে, ভেঙ্কটবাবুর মতন মন্ত্র বলা পুজো পাঠে মন লাগানো তাঁর পক্ষে তো সম্ভব নয় – এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁর ঘুম হয় না। বুকে ব্যাথা করে। ঠিক এসময়েই দিল্লী থেকে তাঁর ছোট ভাইয়ের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার খবর এল। এই ভাইকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন, ইনি তাঁর গ্রামে মাঝে মাঝে যেতেন, অমৃতসরের জমিজমার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাই কাপুর সাহেব কিছুটা নিশ্চিন্তেও ছিলেন, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় কোনো হাসপাতালে যেতে না পারায় ঘরের কোনে একা নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হল। তাঁর স্ত্রীও তখন পাঞ্জাবের গ্রামের বাড়িতে, অতএব পাড়ার লোক ও ডেলিভারি বয়, ফল, সব্জি দিতে এসে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। তারা ফোন দেখে গ্রামের লোককে খোঁজ করে। এখানে খবর দেয়। দিল্লীর গুরুদ্বারে খবর ফোন করে ঠিকানা দিলে তারা গিয়ে শব নিয়ে আসে। কোনো শ্বশ্মানেও তখন জায়গা খালি নেই, গুরুদ্বারের পার্কিংএ অচেনা অজানা লোকেরা তাঁকে পোড়াবার ব্যবস্থা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভীষণ শোকাহত হয়ে পড়েন কমলেশ এর বাবা মি. কাপুর। কখনও স্ত্রী কিরণ অথবা মেয়ে কমলেশ এর কোলে মুখ রেখে শিশুর মতন ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে থাকেন। তাঁকে এমনভাবে ভেঙে পড়তে বা বিচলিত হতে জীবনে কেউ দেখেনি। রাত্রে ভয় পান বলেন, এবার তোমার পালা ‘কিরণ’, তুমিও রঙ্গনাথের মায়ের মতন ছেড়ে যাবে আমায়। এই বিদেশ বিভুঁয়ে আমি একা কেমন করে থাকবো। স্ত্রী অনেক বোঝান, মেয়ে বলে, ইন্ডিয়ার অবস্থা একটু ভালো হলেই তোমায় ‘বন্দে ভারত’ প্লেনে পাঠিয়ে দেব। এখন ওখানে গিয়ে তোমাদের একজনের কিছু ঘটলে কে সামলাবে, অন্যজনও অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। দেখলে তো চাচাজীর কি অবস্থা হল, আমি এই অবস্থায় কিছুতেই পাঠাতে পারবো না।

বাড়ির পরিবেশটা ক্রমশঃ নৈরাশ্যজনক শোচনীয় হয়ে উঠলো, – এবার জামাই রঙ্গনাথও বিরক্ত হয়ে উঠলেন। একে তো তার মায়ের শোক, তার ওপর এই কান্নাকাটি, বাচ্চার মতন শ্বশুর কে বোঝানো, প্রায়ই সে বেরিয়ে যেত বাইক (সাইকেল) নিয়ে। এখানে নদী সমুদ্রের ধার দিয়ে সুন্দর সাইকেল ট্র্যাক (পথ) বানানো আছে। সারারাত ছেলে মেয়েরা সেখানে দলে দলে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের নিরাপত্তার যেমন ভয় নেই, তেমনি ভয় নেই চোর ছ্যাচড় বা ছিনতাইকারীর উৎপাত। সরকারের শাস্তি, নিয়মকানুন এতো কড়া, যে কারো কোন অপকর্ম করতে সাহসও হয় না। তারমধ্যেও যদি কেউ বাসে ট্রেনে কাউকে একা পেয়ে বিরক্ত করে, সঙ্গে সঙ্গে ধরে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেত্রাঘাতের সঙ্গে কারাবাস। রাস্তায় একটু নোংরা করা, থুতু ফেলা বা মাস্ক না পরার জন্যে, হোটেলের ঘরে কিংবা জাহাজের ‘ক্রুসে’ বসে একসঙ্গে আড্ডা মারলেও অনেক ডলার ফাইন দিতে হয়।

তাই সারাদিন Work Form Home করে রাত্রে রোদের তাপ কমলে সবাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বুড়ো-বুড়িরাও একা একা হেঁটে চলেন, আপনমনে। সেদিনও বিকেল বেলায় মিস্টার ও মিসেস কাপুর বেড়াতে বেড়িয়েছেন। কিরণ ভারী শরীর ও হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে বেশী হাঁটতে পারেন না। বাগানের বেঞ্চে বসে পড়লেন তিনি, সূর্যাস্তের সোনালী আলোয় নদীর জলও ঝলমল করছে। কাপুর সাহেব বললেন, আমি আগে ব্যারাজ পর্যন্ত হেঁটে আসছি, তুমি এখানেই বসো, সাতটা পর্যন্ত ফিরে একসঙ্গে বাড়ি যাব। কিন্তু ৭টা থেকে ৮টা/৯টা হয়ে গেলেও তাঁর দেখা নেই। স্ত্রী কিরণ বাড়ি ফিরে এলেন, যদি তিনি আগেই অন্য কোন দিক দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কিন্তু না, ১০টার পর মেয়ে ও জামাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মেরিনা ব্যারেজের দিকে। আর বেঙ্কটবাবু সুইমিং পুলের পাশে বসে থাকা যত ইন্ডিয়ান বৃদ্ধদের পেলেন, সবাইকে জিজ্ঞেস করে বেড়াতে লাগলেন, কেউ মিস্টার কাপুরকে দেখেছেন কিনা। হটাৎ একজন চৌকিদার এসে খবর দিলেন, পুলিশের গাড়ি ও একটা এম্বুলেন্স আসতে দেখেছেন তাঁরা ঐ রাস্তায়।

কিছুক্ষন পরে জানা গেল কমলেশের বাবা মিস্টার কাপুর হটাৎ হার্ট অ্যাটাক করে রাস্তায় পড়ে ছিলেন, পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায় – কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি তারা। কারণ ফোনটিও সঙ্গে  নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছেন তিনি। কারোর সঙ্গে শেষ দেখাও তাঁর আর হল না। স্ত্রী চলে যাওয়ার আতঙ্কে থাকতে থাকতে সুস্থ সবল মানুষটি নিজেই এরকমভাবে হটাৎ চলে যাবেন, – এ কথা কেউ ভাবতেও পারেনি। এই আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বাড়িটা শোকে দুঃখে একেবারে শোকাচ্ছন্ন হয়ে রইল। কয়েক মাসের মধ্যে ছেলেটি মা কে এবং মেয়েটি বাবাকে হারিয়ে ভাষাহারা নির্বাক মূর্ত্তি হয়ে বসে রইল। কাজ কিন্তু তাদের বন্ধ রাখা চলবে না।

এই মহামারী এখন সারা বিশ্বকে শিখিয়েছে, বিষাদ ভাবনা ভুলে কিভাবে বিপদের মধ্যেও স্থির হয়ে কাজ করে যেতে হয়। Work form home, online dealing, বিদেশী কোম্পানির ব্যাঙ্কে বা আমদানি রপ্তানির কেনা বেচার কাজ তো বন্ধ থাকবে না। এই দেশটার তো নিজের কোনো ক্ষেত বা জমি, চাষ আবাদ নেই, খাদ্য বস্তু – আনাজ, সব্জি ও ফল সবই আসে, যায় অন্য অন্য দেশ থেকে, তাই পণ্যবাহী জাহাজের আসা যাওয়া বন্ধ নেই। সুতরাং অনলাইন-এ সব বাণিজ্য টাকার লেন/দেন সবই চলতে থাকে।

যাঁরা ‘ম্যানেজার’ বা অফিসের ও জাহাজের কর্মী তাঁরা দিনরাত বাড়িতে বসেই কম্পিউটারে কাজ করে যান। তাই রঙ্গনাথ ও কমলেশ আবার ব্যস্ত হয়ে যেতে বাধ্য হলেন। শুধু ভেঙ্কট ও কিরণ দূরত্ব বজায় রেখে কোনোরকমে দিন কাটাতে লাগলেন। একই ব্যাথার ব্যাথী হয়ে জীবনসঙ্গী হারানোর দুর্দমনীয় কষ্ট বুকে চেপে – দুই দিকে দুই দেওয়ালে মুখ ঘুরিয়ে তাঁদের দিন কাটছে, এমন সময় জানা গেল, এই বড় প্রশস্ত এপার্টমেন্টটি ছাড়তে হবে তাঁদের। বাড়িওয়ালা ইন্দোনেশিয়ান বড় ট্যুরিস্ট গেস্ট হাউসের মালিক কিন্তু কোভিড-এ তাদের ওই ট্যুরিজিমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ভ্রমণ বিলাসীদের থেকে তাদের রমরমা ছিল। এখন এক বছর ধরে সব বন্ধ, কেউ আর কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন না। বর্ডারও সীল করে দেওয়া হয়েছে। তাই সিঙ্গাপুরের সিটিজেনরা সব দলে দলে চলে আসছেন বালি বা কম্বোডিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড থেকে। রঙ্গনাথ বহু চেষ্টা করেও কোথাও একটি বড় এপার্টমেন্ট জোগাড় করতে পারলেন না। শেষে ছোট ছোট দুটি ফ্ল্যাট পাওয়া গেল। কাজেই ভেঙ্কটবাবু ও কিরণ দেবী বাধ্য হলেন, এক সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে আস্তানা বাঁধতে। খুবই অসুবিধা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়লেন দুজনে।

ঠিক এইসময়ে তাঁদের নাতি রাঘবের আবার আবির্ভাব হল সিঙ্গাপুরে। সরকার একবছরের ট্রেনিং এর পর তাদের ফিরিয়ে এনেছে ১৪ দিন করেন্টাইনে থাকার পর সব পাইলট ট্রেনি ছেলেদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। তারপর তারা বাড়ি এসে দেখা করতে ও বাবা মায়ের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে আবার এয়ারফোর্স হোস্টেলে ফিরে যাবে। দূর থেকে সে সব খবরই পেয়েছে, মন খারাপও হয়েছে ক’দিন, কিন্তু আকাশে ওড়ার আনন্দ, পড়াশোনা ও নানা ব্যায়াম, খেলা ধুলায় ও শরীর চর্চার মধ্যে থাকে বলে মনটিকেও তার হালকা ঝরঝরে, বিষাদমুক্ত, নৈরাশ্যশূন্য আনন্দময় রাখতে হয়। গোটা বিশ্ব জগতের সব সম্প্রদায় বা বয়সের মানুষ গৃহবন্দী হয়ে এখন হতাশায় ভুগছেন। কিন্তু তাঁদের সবসময় শেখানো হচ্ছে যে পজেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গী নিয়ে চলতে হবে। জীবনের স্রোত তো থেমে থাকবে না। তাই এখানে দুই অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধার কাছে সে নতুন যুগের নতুন বার্তা বহন করে নিয়ে এল।

এ যুগের ছেলে মেয়েরা এত সুন্দর সহজ, কুসংস্কার মুক্ত, উদার যে তাদের সঙ্গ অদ্ভুত আলোড়ন তোলে, আগের জেনারেশন এর মানুষের মনে। তারা কোনও বাঁধা নিষেধ মানতে রাজী নয়। আবার জাত – পাত – ভাষা – ধর্ম – বর্ণ নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের সংকীর্ণ পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে অবিহিত করে। নিজেদের আবেগ ইচ্ছে ও পছন্দকে প্রাধান্য দেয় সবসময়। অন্যেরা কে কি ভাবছে বা ভাববে – সেই নিয়ে কখনও মাথা ঘামায় না। যে প্রফেশন অর্থাৎ জীবিকায় যেতে তাদের আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে, সেটি ছোট থেকেই ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং সেই interest ও skill নিয়ে আগে চলতে চায়, যে কোন ঘরে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে রুমমেট হয়ে থাকে। আলাদা আলাদা সময়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিজেদের খাবার বানায়, নিজের রুচি, ইচ্ছে অনুযায়ী এবং যা হাতের কাছে পেয়ে যায় তার ওপর নির্ভর করে। কেউ সিঙ্গাপুরের, কেউ কানাডা বা নিউজিল্যান্ড, হংকং বা ফ্রান্স – জার্মানির বাসিন্দা। এই সহ অবস্থানে তাদের কোন সমস্যাও হয় না, কেউ কারুর ব্যাপারে কখনও নাক গলায় না কিম্বা মন্তব্য – সমালোচনা বা কটূক্তিও করে না।

এই শিক্ষাই সে আজ দিতে চাইলো এই ভিন্ন মতাবিলম্বী ভিন্ন ধরণের খাওয়া পরায় অভ্যস্থ, দুই বৃদ্ধ দম্পতিকে। ছোট থেকেই সে প্রত্যেক বছর স্কুল ছুটি হলে মায়ের সঙ্গে পাঞ্জাবে ও বাবার সঙ্গে মাদ্রাজের গ্রামে গিয়ে খুব আনন্দে কাটিয়েছে। দুদিকের ‘কাজিন’ ভাই বোনেদের সবাই এখন হিন্দি সিনেমা দেখে মোটামুটি হিন্দি বোঝে ও বলে, ইংরেজি তো সবাই ভালোই জানে, তাই তাদের অসুবিধে হয় না। দুই দাদুই তার সাথে খুব খেলাধুলা করেছেন, তাঁদের জমি, বাগানে বেড়াতে, ট্রাক্টর চালাতে, মাছ ধরতে নিয়ে গেছেন। তার দুই দিদা’ (বা তাতা/ঠাকুমা/নানী) তাকে কতরকমের আচার, মিষ্টি ও রান্নায় মুখের স্বাদ বদলাতে ব্যস্ত থাকতেন।

পৃথক পৃথকভাবে তাঁরা দুজনেই খুব ভালো, সৎ, আদর্শবাদী, ট্রেডিশন বজায় রেখে জীবন কাটিয়েছেন, এবং দুই দম্পতিই ভীষণ স্নেহপ্রবণ – এটাই হয়তো grand parentsদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ। নাতির জন্য তাঁরা সবকিছু দিয়ে দিতে প্রস্তুত সবসময়। নিজেদের ছেলেমেয়েদের ব্যবহারে হয়ত ক্ষুন্ন হন, মান অভিমানের পালা চলে তাদের মধ্যে, কারন পিতা পুত্র বা মাতা কন্যার কাছে একটা expectation একটা চাওয়া/পাওয়া আশা আকাঙ্খার কথা থাকে। কিন্তু নাতির সঙ্গে অন্য সম্পর্ক, তার জন্য আলাদা এক জায়গা সৃষ্টি হয়েছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মনে।

তাই ‘রাঘব’ সিঙ্গাপুরে এসে তার বাবা মা কে জানালো – সে ঐ নানী – দাদার এপার্টমেন্ট-এ থাকবে ক’টা দিন। খাওয়া দাওয়া সবাই মিলে একসঙ্গে করবে, নতুন নতুন দেশের ডিশ বানিয়ে। ওদের ওই বিষন্ন – গুমোট – হতাশাব্যাঞ্জক ঘরের পরিবেশটি তাকে বদলে দিয়ে যেতেই হবে। এ জন্য সে একটা প্রজেক্ট প্ল্যানও বানিয়ে ফেলল।

প্রথমে জানতে চেষ্টা করলো – কি কি বিষয়ে দাদু ও নানীর মিল আছে। দেখলো দুজনেই বসে একা একা সময় কাটান তাসের কার্ড নিয়ে। কারন, দুজনেই অল্প বয়সে তাস খেলা জানতেন। তারপর তাঁরা দুজনই বাগান করতে, বেড়াতে ভালোবাসেন, রাঘব এবার নিজের এক বন্ধুকে নিয়ে এল একদিন সবাই মিলে তাসের ম্যাজিক দেখাতে। ভালো সিনেমা দেখার জন্য  NETFLIX ,আমাজন লাগিয়ে দিল। দুজনকেই YouTube এ নানান অনুষ্ঠান, গান, নাটক ও আলোচনা শুনতে উৎসাহ দিল। দুজনের জন্যই ভাল দুটো ‘আই প্যাড’ এবং কানে লাগিয়ে শোনবার জন্য  কিনে নিয়ে এল ‘এয়ার ফোন’। তাতে অনেকটা সময় সকাল সন্ধ্যে তারা নিজের নিজের ভাষায় spiritual আলোচনা শুনতে শিখলেন। কিরণ কাপুর ৬৫ বছর বয়সে আবার পাকিস্তানী নাটক ও গুরুদ্বারের বানী,/প্রবচণ ও ‘শবদ-কীর্তণ’ শুনতে লাগলেন, মন দিয়ে। ‘ভেঙ্কটবাবু’ গীতা chanting করতে লাগলেন, তামিল ভাষায় তার অর্থ অনুধাবনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। মাঝে মাঝে ট্যাক্সি ডেকে নাতি তাঁদের নানা Indian Temple ও গুরুদ্বারা ঘোরালো। এরপর রাঘবের এক বাঙালি বান্ধবীর মা বাবার সঙ্গে ভেঙ্কট ও কিরণকে একদিন সে নিয়ে গেল ”রামকৃষ্ণ মিশনে।”

সিঙ্গাপুরে এমন একটি সুন্দর প্রার্থনার কেন্দ্র আছে, যেখানে তামিল, হিন্দি ও ইংরেজীতে এতো সুন্দর করে শ্রী রামকৃষ্ণ, শ্রীশ্রী মা ও বিবেকানন্দের কথা আলোচনা হয়, তাঁদের সম্বন্ধে লেখা বই পাওয়া যায়, ভজন, আরতি এবং একাদশীর দিনে রাম নাম সঙ্কীর্তণ শোনা যায় – কথামৃতের বাণী আলোচনা হয় – তা তাঁদের জানা ছিল না। এইসব পেয়ে মনের জানালাগুলো যেন খুলে যেতে লাগল, দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার। একই বাড়িতে রুমমেটের মতন নতুন ভাবে থাকার এক অন্য অধ্যায় শুরু হল, তাঁদের জীবনে। দুই ডানা ভাঙা পাখী খাঁচা খুলে বাইরে এলো। ক’দিন পরেই নাতি চলে গেল, দুজনের জীবনে অদ্ভুৎ এক ‘ধামাকা’, করে, যেন তাঁদের হৃদয় মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়ে আবার কানাডায় তার ট্রেনিংয়ে।

এদিকে উড়তে না পারলেও দাঁড়ে বসে তারা যেন পোষা তোতার মতন আপন আপন জগতে সুখে জীবন কাটানোর পদ্ধতিটা একটু একটু শিখতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ‘রাঘবের’ বাঙালি বান্ধবীর বাবা রোজ এসে ভেঙ্কটবাবুর সঙ্গে morning walk এবং evening walk এ যান। মাও কিরণ কাপুর আর পাঁচজন প্রায় সমবয়সী বন্ধু মহিলার সঙ্গে বাগানে বেড়াতে যান। দেশে কখনও একসঙ্গে মনিটর লিজার্ড বা গোসাপ, কচ্ছপ, বন্য মোরগ ঘুরে বেড়াতে দেখেননি। অটার্স বা ভোঁদড়ের মতন প্রাণী যে নির্ভয়ে সমুদ্র নদী থেকে বেরিয়ে বাগানের বৃষ্টির জলে ভরা পদ্ম পুকুরে লাফায় – ঝাপায়, সাঁতার কাটে কচ্ছপদের সঙ্গে, আগে কখনও জানতেনও না। গাছের তলায় অজস্র আমলকী, কুল, কামরাঙ্গা ও তাল পড়ে থাকে, অনেক মহিলা কুড়িয়ে নিয়ে যান। পাঞ্জাবের গ্রামে এসব গাছ বা ফলের স্বাদ তিনি কখনও পাননি। তাই প্রকৃতির মাঝে যেন এক কিশোরী বালিকা হয়ে গেছেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে একই দিনে চাররকমের ঋতুর লীলা চলে। সকালে ঠিক বসন্ত কালের মতন কোকিল ডাকে তো বিকেলে বর্ষায় ব্যাঙের গান শোনা যায়। দুপুরে একটু গরম, রাত্রে একটু ঠান্ডা হাওয়া বয়। তাদের ঐ পাঞ্জাবের মতন extreme climate অত্যন্ত অসহ্য লু’চলা গরম বা হাঁড় কাঁপানো শীতের উগ্রতা বা তীব্রতাও নেই এখানে। আস্তে আস্তে জায়গাটা ভালও লাগতে আরম্ভ হল ঐ পাঞ্জাবের মায়ের।

কোভিড ১৯ এর আরম্ভে জীবন যতটা অসহনীয় বোঝা হয়ে উঠেছিল, এখন আর তা মনে হয় না। ভেঙ্কটের সঙ্গে বেয়াই /বেয়ান সম্পর্কের বাঁধনটা আলগা হয়ে যাচ্ছে। আকাশের ভাসমান কালো সাদা মেঘের মতন তাঁরাও দুই বন্ধু  ভাসতে ভাসতে মোহনার দিকে ধীরে ধীরে ক্রমশঃ এগিয়ে চলতে লাগলেন নতুন খেয়া বেয়ে।

একদিন মিসেস কিরণ কাপুর east coast এ ভোর বেলায় বেড়াতে গিয়ে দেখলেন ষাট উর্ধের বয়স্ক মেয়েরা যোগ ব্যায়াম করছেন। সূর্যাস্তের আলোয় তাঁদের মুখ চুলে সোনালী রং ধরেছে। সমুদ্রের শীতল হাওয়ায় দেহ মন স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জলের স্রোতে পণ্যবাহী জাহাজগুলি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল,  তিনি তো মাত্র পঁয়ষট্টি, কত ৭৫/৮০ বছরের মহিলারা একসঙ্গে প্রাণায়াম ও ব্যায়াম করছেন, আগ্রহভরে তাঁকেও ঐ দলে যুক্ত হতে হবে। কাছে গিয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করতেই সাদরে আহ্বান জানালেন তাঁরা।

দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেল কিরণের। একটা নতুন ভালোলাগা ও উদ্যম জাগলো তাঁর মনে। এদিকে ঘরে তরুণ নাতি রাঘবের প্রাণচাঞ্চল্য তার সমস্ত হতাশা কাটিয়ে দিতে সাহায্য করল ভেঙ্কটেশ বাবুর। বৌমা কমলেশও খুশি হলেন তাঁদের পরিবর্তন দেখে।  ভেঙ্কটপ্রসাদ তাঁর ছেলের সাইকেলটি নিয়ে চালাতে চালাতে নদীর ধার দিয়ে বহুদূরে চলে যেতে যেতে এক মুক্তির স্বাদ পেতে থাকেন। প্রথম দিনেই নাতি তাঁকে সাবধান করেছিল, বিনা হেলমেটে সাইকেল না চালাতে, কিন্তু তিনি সেই কথাটি ভুলে যান। একদিন রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা একটি  বন্য মোরগ দেখে অণ্যমনস্ক হতেই পড়ে গেলেন, মাথায় চোট লাগল ভীষণ জোরে। কিছুক্ষন যেন বুঝতেই পারলেন না, কি হল, পড়ে উঠতে চেষ্টা করেও পারলেন না। পকেট থেকে ফোন বের করে একটি ছেলেকে মেলাতে দিলেন। প্রথমে ছেলে রঙ্গনাথকে ডাকতে চেষ্টা করলেন, অফিসের অন কল-এ সে এখন ব্যস্ত আছে। বৌমা কমলেশের ফোনটিও এই সময়ে Silent mode এ থাকে। সারা রাত সে আমেরিকার অফিসের সঙ্গে zoom এ মিটিং করে, তাই সকালে একটু ঘুমোয়। ডাকলে পাওয়া যাবে না। একটু সংকোচ হলেও ফোন করলেন বেয়ান কিরণ দেবীকে।

কিছুক্ষনের মধ্যে তিনি তাঁর যোগা / ব্যায়াম গ্রূপের লোক জন দের  নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলেন সেখানে। ততক্ষনে আরও অনেক সাইকেল আরোহী ও পথচারী তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে, পাশের ঘাসে শুইয়ে দিয়ে জল খাইয়ে কিছুটা সুস্থ করেছে। বাঁ চোখে ভীষণ ব্যাথা করছে তাঁর, চোখ খুলতেও পারছেন না। একজন তরুণ ছেলে রুমালটা তাঁর কপালে চেপে ধরে আছে, মনে হয় কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়েছে।

মেরিনা ব্যারাজ ও কালাং নদী ধরে সবসময় সরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা ব্যাটারি চালিত গাড়ি নিয়ে টহল দিতে থাকেন। পথচারীরা মাস্ক না পরলে সাবধান করেন, ছবি তুলে নেন। তাদের একটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, ভেঙ্কটবাবুর সামনে। পথচারী দের সাহায্য করা তাঁদের কাজ।

কিরণদেবী এসেই তাঁকে ঐ গাড়িতে তুলে নিলেন কয়েকজন যুবকের সাহায্যে তারপর ‘কালান- মলের’ প্রায় কাছাকাছি এসে সিকিউরিটির লোকেদের অনুরোধ করলেন এম্বুলেন্সকে খবর দিতে। মেয়ে বা জামাইকে বিরক্ত না করে তাঁকে প্রথমেই কোনো ডাক্তারখানায় – হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফার্স্টএইড দেওয়াটা বেশী প্রয়োজন মনে হল তাঁর। তিনি বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও স্মার্ট। পাঞ্জাবের জমিতে ট্র্যাক্টর ও চালিয়েছেন, নিজের বাগানে কোদাল দিয়ে মাটিও কুপিয়েছেন। শরীর ও তাঁর খুব পুষ্ট এবং মনের বল যে অন্যান্য ভারতীয় গৃহবধূর থেকে বেশী আজ এই সক্রিয় ভূমিকায় তাঁর প্রত্যুৎমন্নমতি ব্যবহারে সেটা প্রকাশ পেল। যন্ত্রনা কাতর অসহায় ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ভেঙ্কট বাবু আজ সেটা বুঝতে পারলেন। ঐ সিকুরিটি গার্ড তাঁর ছেলেকেও মেসেজ করে দিলেন এবং ওনাদের সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলেন। প্রথমেই তাঁরা কপালের কাটাটিতে স্টিচ করলো, কারণ রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। তারপরে চোখের ওপরেও একটা কালো পট্টি লাগিয়ে দিল টেপ দিয়ে, ডাক্তারবাবু সেখানেও হেমারেজ লক্ষ করেছেন। ডান হাত ও বাঁ পায়ের গোড়ালীতে ভীষণ ব্যাথা শুরু হয়েছে। কুনুইটি ফুলে উঠেছে, গলার সঙ্গে বেঁধে ডাক্তার বললেন, X-ray করাতে। কিরণদেবী ওনার সঙ্গে সঙ্গে চললেন। হুইল চেয়ারে করে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় তাঁকে নিয়ে এল, সেই X-ray ডিপার্টমেন্টে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তাঁকে, কিরণ ততক্ষনে পাশের ক্যান্টিন থেকে চা ও বিস্কুট এনে খাওয়ালেন, তাঁর বেয়াইকে। নিজেও একটা কেক ও কফি খেলেন। কেকে ডিম থাকায় ঐ নিরামিষী খেতে অভ্যস্থ ভেঙ্কটকে দিলেন না। আজ তিনি ঐ ভদ্রমহিলার উপস্থিত বুদ্ধি ও মমতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন দুর্ঘটনায় আহত বৃদ্ধ মানুষটি। কিছুক্ষন পরে রিপোর্ট এলে দেখা গেল কনুইয়ের হাঁড় সরে গেছে এবং পায়ের পাতার ঠিক গোড়ালীর কাছটায় লিগামেন্ট  ফেটে যাওয়ায় অত ব্যাথা হচ্ছে। হাতে প্লাস্টার চড়ল পায়ে একটা ব্যাথা কমানোর চওড়া টেপ লাগল। ততক্ষণে তাঁর ছেলে রঙ্গনাথও এসে গেল। একদিকে কোভিড-এর ভয়, অন্যদিকে এই দুর্ঘটনা, কয়েকমাসের মধ্যেই দুজন বাবা মায়ের মৃত্যু – সব যেন কেমন গোলমেলে করে দিল তাঁদের সবাইকার জীবন।

এদিকে কাজের মেয়েটি হটাৎ গভমেন্টের ‘MOM’ বিভাগ থেকে নোটিশ পেল তখুনি বাড়ি ছেড়ে গিয়ে সরকারী কোরেন্টাইনে সেন্টারে গিয়ে পৌঁছাতে, ১৪ দিন তাকে আলাদা থাকতে হবে। তিনবার কোভিড টেস্ট হবে। রবিবার সে যে migrated labourদের সাথে সময় কাটিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে। অতএব তার সংশ্রবে যারা যারা এসেছিল, তাদের চিহ্নিত করে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে এইসব কাজের লোকেদের ওপর খুব খেয়াল রাখে সরকারী দপ্তর। তাদের ওষুধ ইনজেকশন সময়মত দেওয়া হয়। ৬ মাস অন্তর pregnancy টেস্ট হয়। নজর রাখা হয়, তারা ছুটির দিন কোথায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইনস ও শ্রীলংকা থেকে এরা আসেন। মালিক কেমন ব্যবহার করেন, ফল, দুধ, মাছ, মাংস খেতে দেন কিনা, সেদিকেও সরকারী দপ্তর ও বিভিন্ন এজেন্সী খবর নেয়। এখন দু সপ্তাহ তার ছুটি ।সরকারী খরচে সরকারি  জায়গায় আরামেই থাকবে সে।

অতএব এখন রান্না-বান্না, ও ভেঙ্কটবাবুকে খাওয়ানো দেখাশোনা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন কমলেশের মা। ছেলে রঙ্গনাথ তাঁকে বাথরুম পায়খানা করানোর কাজটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সুষ্ঠ ভাবে করতে লাগল। মা হারানোর পর বাবাকে সে আরো বেশী করে ভালোবাসতে শিখলো। বৌমা কমলেশ তাঁকে রোজ স্পঞ্জ করে দেয়। তাঁর বিছানার চাদর ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, ভ্যাকুম করে ধুলো শূন্য করা বা সব্জি, ফল, দুধ, ব্রেড ইত্যাদি যাবতীয় সামগ্রী অর্ডার দেওয়া, সেগুলি এলে ভালোভাবে সোডার বা গরম জলে ধোয়া বাইরে রোদে দিয়ে তারপর ফ্রিজে তোলার কাজটিতে মন দিল। প্রত্যেকটি দ্রব্য সামগ্রীকে সে স্যানেটাইজ করে, যাতে কোন জীবাণু না থাকে তাতে। তার সেবা, নিষ্ঠা ভরে কাজ করা গোছানো এবং পুরো পরিবারের খুঁটিনাটি সব প্রয়োজন পূরণ করা – অর্গানাইজ করার দক্ষতা দেখে ভেঙ্কট, কিরণ এবং তার স্বামী রঙ্গনাথও ভীষণ অবাক হয়ে গেল।

ভীষণভাবে বিস্মিত হল তাদের প্রতিবেশী যারা একই এপার্টমেন্টে বাস করেন এবং এতদিন ঐ দক্ষিণ ভারত উত্তর ভারতের চার বৃদ্ধ – বৃদ্ধা, ছেলে, মেয়ে, নাতি – সকলের একসঙ্গে বাস করা নিয়ে তাঁরা সবাই আলোচনা করতেন, ও কৌতুক বোধ করতেন। একটা বিরাট ঢেউ বা ঝড়ের ধাক্কায় আজ যখন সকলে এক হয়ে আনন্দে একসাথে বসবাস করছেন, তখন বিস্ময়ে তাঁরা হতবাক হয়ে গেলেন।

কিরণ তাঁকে নিজের বড় ভাই মনে করছে, ছেলের বৌ একেবারে মেয়ে তথা কন্যারুপী নার্স হয়ে তাঁকে সবসময় এমন যত্নে রেখেছে, যেন তিনি বৃদ্ধ নন, একটি ছোট্ট শিশু। ছেলে যেভাবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে তার ডাইপার পাল্টাচ্ছে – মলমূত্র পরিষ্কার করছে – অবলীলাক্রমে তা তাঁকে এক স্বর্গীয় আনন্দধামে পৌঁছে দিয়েছে। কিরণ এখন টিভি দেখার সময় পান না, সব সময় তাঁকে গীতা chanting কিম্বা সদ্গুরুর ভাষণ শোনাবার জন্যে ল্যাপটপে ইউটউব চালিয়ে তাঁর কানে এয়ার ফোনটি লাগিয়ে দিয়ে যান। ঠিক সময়মত ওষুধ পত্র – জল – ফল সব খাওয়াতে থাকেন। ভেঙ্কটবাবুর মনে হয় অনেকদিন পরে তিনি যেন এদের মধ্যে দিয়ে নিজের শৈশবের সেই একান্নবর্তী পরিবারে মা, বাবা ও বোনের কাছে আবার ফিরে গেছেন।

একদিন মনে হল শুধু গীতা পড়ে – সাধুদের প্রবচন শুনে কি হবে – তা যদি নিজেদের জীবনে পরিবারের, প্রতিবেশী সমাজের আর পাঁচজন মানুষের জন্য কার্যকরী না করা যায়। Theory যুক্ত জ্ঞান গর্ভ বক্তৃতা বা পাঠ অধ্যয়ন ধর্ম পুস্তকের বিদ্যা অওড়ালে তো চলবে না প্রতিটি অধ্যায় জীবনের প্রত্যেক পর্বে সেই সব বক্তব্যকে Implement করলে তবেই তো স্বাক্ষরতা আসবে।

লকডাউন-এ দুর্ঘটনাতে ও মৃত্যশোকে তাঁর আজ এক নতুন বোধোদয় হ’ল। দেশে তাঁর যত বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা, সম্পত্তি আছে সব তিনি দূঃস্থ গরিব মানুষের সেবায় লাগাবেন, বিভিন্ন অনাথ আশ্রম হাসপাতাল, গ্রামের বিদ্যালয়ে দান করবেন ঠিক করলেন। কিরণ একদিন জানালেন তাঁর সব জমি জমা গরিব কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সু অভিপ্রায়ের কথা।

চোখ ভালও হয়ে গেল, কিন্তু পায়ের ব্যাথা তখনও কমেনি, হাতের প্লাস্টারটিও খোলা হয়নি, কিরণ মেয়েকে একটি হুইল চেয়ার অর্ডার করতে বললেন। অতি সাবধানে সেটিতে বসিয়ে রোজ সকালে বিকেলে ভেঙ্কটবাবুকে বাইরে নদীর ধারে, বাগানে ঠেলে ঠেলে বেড়াতে শুরু করলেন তিনি। ঠিক যেন দুই ভাই বোন। স্বর্গ থেকে বিনীতা দেবী ও মিস্টার দলবীর কাপুর তাঁদের হয়তো আশীর্বাদ পাঠালেন।

ছেলে রঙ্গনাথ ও মেয়ে কমলেশ শান্তিতে আনন্দিত মনে কাজে মন দেয়, Without pay ছুটি তো আর বেশী দিন দেবে না অফিস থেকে। প্রভাতে কোকিলের কুজন ও বিকেলে বৃষ্টির পরে ব্যাঙের গান শুনতে শুনতে তারা দুজন এগিয়ে চলেন ধীর পদক্ষেপে, আবার কখনও সমুদ্রের ধারে বসে রোমণ্থণ করেন, তাঁদের দীর্ঘ জীবনে সুখ দুঃখের কথা। অতীত আর ভবিষ্যতে র চিন্তা তাঁদের আর ভাবায় না , ‘বর্তমান’ সময় তাঁদের প্রকৃতির নতুন পরিবেশে  আজ এক জীবনের নতুন পাঠ পড়িয়েছে। সংগ্রাম ও দুঃখের আগুনে শুদ্ধ হয়ে তাই এই দুই ডানা ভাঙা পাখী এখন স্থিথপ্রজ্ঞ মানব হয়ে শান্ত সমাহিত ভাবে দিন কাটাতে লাগলেন।

Leave a comment