চন্দনা সেনগুপ্ত
'ধাত্রী', মা তথা দাই মা ছিলেন, আমার জীবনের প্রথম দেখা নার্স। তিনি আমাকে তাঁর কর্ম সম্পর্কে কোন ধারনাই কখনও এনে দিতে পারেননি, যথক্ষণ না আমার নিজের সন্তান জন্ম নিতে আমায় প্রসব ব্যাথায় কাতর করে দেয়। শুভ্রবসনা 'সেবিকা' এসে হাত দুটি চেপে ধরে কত সাহস দেয় আমায়। আমি পাই আশ্বাস। দেবদূতের মতন, দেব দেবীর মতন মানুষকে বাঁচাবার, যত্নে শুশ্রষায় রুগীর কষ্ট লাঘব করবার ব্রতে ব্রতী সেই নার্স। তারপর দেখেছি কত আত্মীয় স্বজনের অসুখে অপারেশনে তাঁদের জীবিকার সঙ্গে মানবিকতা ও মমত্বের আবেগপূর্ণ আচরণ, আমায় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত করেছে আজীবন। বিশেষতঃ এই 'কোভিড'-এর মহামারীতে যখন মৃত্যুর মিছিল চলছে - সারি সারি, তখন তাঁদের বড় কাছ থেকে চিনলাম আবার। পরিবারের আপনজনের কাছেও অস্পৃশ্য - শত ইচ্ছেতেও যখন স্বামী, পুত্র, ভাই, বন্ধু, মা, বোন স্ত্রী ও কন্যার কারো রুগীকে ছোঁয়ার অধিকার বা উপায় নেই, - তখনও তুমি হে মহিয়সী নারী, - হে মহান পুরুষ তোমরা তোমাদের বাহু প্রসারিত করে খুলে দিলে, হাসপাতালের দ্বার। তোমার মনে থাকতে নেই একবিন্দু ভয়ের বাদল, 'করোনা ভাইরাস' ! তোমাকেও করতে পারে গ্রাস - একথা ভেবে ছড়াওনি কোন ত্রাস। কারণ, তুমি যে অঙ্গীকারবদ্ধ, শপথ নিয়েছো, ট্রেনিং শেষে - তোমার জীবন উৎসর্গিত - মানব সেবার জন্যে, রোগীর যন্ত্রনা দূর করা সময়ে সময়ে ওষুধ পত্র ইনজেকশনের বন্টনে, অক্সিজেন গ্লুকোস চড়ানোর দুরহ কাজগুলি - অনায়াসে করিলে অভ্যাস। নার্স। প্রত্যেক 'বিশ্ব-নার্স দিবসে' 'মহিলা' নার্সের ছবি দিয়ে সারা পৃথিবী কত অভিনন্দন বার্তা পাঠান, কিন্তু হাসপাতালে শুধু মহিলা নার্সই নেই, - শ'য়ে শ'য়ে হাজারে হাজারে - 'পুরুষ সেবকের' দল - ওয়ার্ডবয় নামে প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রে কর্মরত। তাঁরা কি শুধু ফেলবেন হতাশ - দীর্ঘশ্বাস। না - তাঁরা তো নিবেদিত প্রাণ। দিন রাত এক করে দিয়ে - তাঁহাদের শ্রম দিয়ে যান। মলমূত্রে, রক্তে পুঁজে ভরা বিছানা পালটান। পুরুষ রুগীটির দুর্গন্ধময় পোশাক বদলান। একশ কেজির বিশাল বপুকে শল্য চিকিৎসার পর সাবধানে তুলে ড্রসিং করান, - বিনা যন্ত্রনায় আবার শোয়ান। এঁদের নাম দিয়েছে সবাই নার্স নয় 'ওয়ার্ড বয়' একটু কোথাও ময়লা থাকলেই - তাঁরা বকুনি খান, - স্ত্রীর মৃত্যুকে সহ্য করতে না পেরে স্বামী যখন পাগল হয়ে যান, তখনও তাঁরাই তাঁদের ধরে স্বস্নেহে ঘরে পাঠান। হাসপাতালে আগত কুকুর বেড়াল তাড়ান, ডাক্তার বা নার্স দিদিদের ফরমায়েশ খাটেন - সব অপ্রিয় কাজকর্ম সামলান। ওয়ার্ড বয় ! তাঁদের যে কত কাজ - শিখে নিতে হয়। - করোনায় আক্রান্তদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় নয়, - একেবারে কাছে থেকে তাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানোয় তাঁরা ব্যস্ত রয়। এক মৃতদেহটি ঢেকে মুড়ে সযতনে শ্মশান যাত্রায় রওনা করেই - অন্য রোগীনিকে দিতে হয় অভয়, - 'এইতো একটা বেড পাওয়া গেছে' - বিছানার চাদর বদলে, দিয়ে - 'স্যানিটাইজার' ছিটোয়। কী অসামান্য তার দক্ষতা, ধৈর্য্য ও বাঁচাবার প্রয়াস, কারণ তিনি যে পুরুষ নার্স। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে এই নিবেদনে, - তাই আজ বিশ্ব দিবসে বার বার - বলি মনে মনে, - তোমাদের প্রয়োজনে, - আজি এই দুর্দিনে, প্রাণে জাগে নব চেতনার উচ্ছাস, আগামী প্রজন্মে এনে দাও - নতুন উদ্যম - ঘোরে তারা কতরূপ - জীবিকার সন্ধানে, মহামারী দূরীকরণে - আজ লেখা হল, নতুন এক ইতিহাস। মানব সন্তান বাঁচাবার তরে এই ক্ষণে শত শত প্রাণ বিসর্জনে ধন্য হলেন প্রণম্য এইসব নার্স।