চন্দনা সেনগুপ্ত

 

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের লেন্সে চোখ রেখে, ঘাড় গুঁজে গবেষণা করে চলেছে ‘রণিতা’। ভাইরাসটির সঙ্গে সারা বিশ্বের প্রত্যেক গবেষণাগারে এখন ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তারা। আজ তাদের তৈরী ‘ভ্যাকসিন’ বাজারে আসছে। লক্ষ লক্ষ লোক সেই ওষুধে আবার কোভিড জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে – তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়াতে সক্ষম হবে।

গভীর আনন্দে শান্তিতে তার বন্ধু সহকর্মী ল্যাবের সব রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাত্র ছাত্রীরা আজ আবেগাপ্লুত। –

এতদিন তারা কিভাবে যে সময় কাটিয়েছেন, কি খেয়েছেন, কখন একটু ঘুমাবার চেষ্টা করেছেন, কেউ জানে না। তাঁদের উদ্দীপনা, উত্তেজনা, অসাধ্য সাধনের অদম্য প্রচেষ্টা আজ সফল হল।

আজ অনেকদিন পরে বাড়ি আসছে রণিতা। বুকের ভেতরে তার একটা অদ্ভুত খুশির বান ডেকেছে। গিয়েই প্রথমে স্নান করবে সে অনেক্ষন ধরে। তারপর খুব ভালো করে রান্না করে সে নিজের হাতে ঘর সাজাবে, এলোমেলো সংসারের হাল ধরবে। আর তার পঁচিশ বছরের জীবন সঙ্গীকে খুব যত্ন আদর দিয়ে ভরিয়ে দেবে। মনোরঞ্জন আর তার প্রেম কাহিনী তো বন্ধু মহলে বিশেষ ভাবে আলোচনার বিষয়। একমাত্র মেয়েকেও খুব ভালো ভাবে মানুষ করছে তারা। সে এখন East Cost এ ফিলাডেল ফিয়াতে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে। মায়ের কাজের সাফল্যে সেও খুব গর্বিত। স্বামী একা একা বাড়িতে work form home করছে। সারাদিন কম্পিউটার এর মধ্যে ঢুকে থাকে। মাঝে মাঝে স্পন্ডেলাইটিসে বড্ডো কষ্ট পায় সে। এবার লকডাউনে ওর জীবন একেবারে বন্দী কয়েদিদের মতন হয়ে গেছে।

রণিতা ভাবে এবারে কিছুদিন ছুটি নিয়ে শুধু মনোরঞ্জনকে সময় দেবে সে। কেমন যেন অপরাধবোধ ও কষ্ট বুকের ভেতরে এসে হৃদয়টাকে কুরে কুরে খেতে থাকে। প্রথমে দুজনেই পাঁচ বছর Phd করতে একজন আরেকজনকে কম সময় দিয়েছে। পরে মেয়ের পড়াশোনা, বিভিন্ন activity তে গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, ঘরের কাজ, বাজার দোকান ইত্যাদিতে দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত ছিল। স্বামী তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে, পরিবারের জন্য। রান্না করাটা তার একটা হবি ছিল। ভারতীয় খাবার শুধু নয়, ইটালিয়ান পাস্তা বা সবরকমের চাইনীজ ডিশ বানিয়ে মেয়েকে খুশি করতো সে। এখন দুবছর তাদের একে অপরের দিকে তাকাবার সময় পাইনি। আলাদা আলাদা কর্মক্ষেত্রে এই দুই সত্ত্বা যেন দুই দ্বীপে বাস করছে। কিন্তু কি করবে! যে মহামারী এসেছে – যে সংকটের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ এক দুঃসময়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তার প্রভাব তো তাদের ওপরও পড়তে বাধ্য।

গাড়ি বেশ জোরেই চালালো সে। হটাৎ একটা পুলিশের ভ্যান এসে সাইরেন দিয়ে হাত দেখালো, থামতে বললো। রণিতা গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করাতেই দুজন পুলিশ অফিসার এসে জানলা খুলে ID Card দেখতে চাইলেন। তারপর হাসপাতালের front line worker, scientist দেখে সেগুলি ফেরৎ দিয়ে বললেন, – ঠিক আছে যান, তবে আর speed limit cross করবেন না, পরেরবার ফাইন হয়ে যাবে। স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললো রণিতা।

বাড়ির চাবি সব সময়ই ওর কাছে একটা থাকে, যদি মনোরঞ্জন ঘুমোয় বা মন দিয়ে কাজ করে – এই ভেবে কখনও disturb করে না তাকে। আজ মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে সে স্বামীকে। ওর এই ‘ফাইজার’ কোম্পানীর সাফল্যে নিশ্চয় মনোরঞ্জন বুকে চেপে ধরবে রণিতাকে অথবা আগেকার মতন একেবারে কোলে তুলে নেবে। বুকের মধ্যে আনন্দ ধ্বনি যেন ড্রাম বাজাতে লাগল।

দরজা খুলতেই একটা ভীষণ উগ্র সেন্টের গন্ধ নাকে এল তার। ড্রইং রুমের সোফায় সম্পূর্ণ নগ্ন একটি যুবতী ঘুমে অচৈতন্য। পাশে ড্রিঙ্কস এর খালি বোতল ও দুটো গ্লাস। মনোরঞ্জন বোধহয় বাথরুমে। কাঁধ থেকে বড় ব্যাগটা পাশে আপনা আপনি খসে পড়ে গেল। দু মিনিট একদম স্তম্ভিত হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এটা কি তার নিজের বাড়ি? অন্য কোথাও এসে যায়নি তো ! মনোরঞ্জনের ডেস্কটপ কম্পিউটারটিতে তখন একটা ভিডিও চলছে, নানা ধরনের উত্তেজক দৈহিক সুখ ভোগের ক্রিয়াকলাপ, এগুলো দেখতে দেখতে শরীরের সমস্ত স্নায়ু গরম হয়ে ওঠে।

রণিতার পা দুটো কে যেন পেছন দিকে টানছে, সে ধীরে ধীরে যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনি বেরিয়ে গেল, গাড়ির চাবি ও ফোনটা হাতে ধরাই ছিল, যন্ত্রচালিত রোবোটের মতন সে তাই গিয়ে বসল আবার তার স্টিয়ারিংটি ধরে। এক্সিলেটরে চাপ দিতেই গাড়ি ছুটলো যেন দিকবিদিক শূন্য হয়ে। পশ্চিম আমেরিকার এই রাস্তাটা তার ভীষণ প্রিয়, 101, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র – সামনে নীল আকাশ, দুধারে বোগেনভিলার গাছ। এখন গরমকাল, প্রখর রোদ্রে চারিদিক ভীষণ তপ্ত, রৌদ্রের তেজে ছোট ছোট পাহাড়-টিলা একেবারে শ্যামলতা হীন, রুক্ষ শুকনো ঘাস যেন ধুলোর রঙে ধূসরিত ধূসর রঙের বিবর্ণ। কোথাও কোনও কি স্নিগ্ধতা নেই! এতদিন একটা মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে ভীষণ ভয়ানক একটা দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল তারা, সেই সাংঘাতিক লড়াই চালাতে গিয়ে অন্য কোনোদিকে তাকাবার – ভাববার বা অন্য কাউকে সময় দেবার কথা মনেও আসেনি তার। মহামারী – লকডাউন বহু Introvert একাকিত্বের শিকার নর-নারীর জীবনে কোভিড আক্রমণ ছাড়াও আরও কত রকমের বিচ্ছিন্নতা – নিরাপত্তা হীনতা ভয় প্রসূত মানসিক বিকার এনে দিয়েছে, তা হয়তো আস্তে আস্তে বোঝা যাবে। এই ভীষণ ঝড় অনেক দূরের মানুষকে যেমন কাছে এনে দিয়েছে তেমনি আবার মাত্র এক/দেড় বছরের মধ্যে অতি কাছের মানুষকেও বহু দূরে ঠেলে দিয়েছে – একথা রণিতা গভীরভাবে অনুভব করল আজ। একটা ‘ভিসতা’ পয়েন্টে যেখান থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে নীল জলের পাশে অনেক পাথর পড়ে আছে, সেখানে গাড়ি রাখার জায়গায় গাড়িটা রেখে ধীরে ধীরে নামলো রণিতা। একটা পাথরের ওপরে গিয়ে বসে রইল, পাথরের মূর্ত্তির মতন। ফোনে গান চালালো – দেবব্রতের কণ্ঠে “আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী “সুদূর বিপুল সুদু….র, তুমি…. যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশুরী” – শুনতে শুনতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রণিতার মনও সব বিস্ময় – দুঃখ – নৈরাশ্য ভুলে উধাও হয়ে যেতে লাগল দূরে – বহুদূরে – প্রখর সূর্যালোক, সমুদ্রের উদাত্ত বাতাস ও সামনে জলের ধারে উঠে আসা কিছু অটার্সের অশান্ত ভাবে খেলাধুলা করার দৃশ্য এবং বিশাল বিশাল কিছু ওয়ালরাস, সী লায়নের চলাচল দেখে মুগ্ধতার কোন গভীরে ডুবে যেতে লাগল রণিতা। কয়েকটি সিগল এসে জড়ো হয়েছে তার চারপাশে। মাছ মুখে নিয়ে একটা সাদা বক উঠে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে কতকগুলো কাঁকড়া সমুদ্রতটে পাথরের খাঁজে খাঁজে বড় বড় দাঁত নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে, এ জগৎটা কত সুন্দর – এই প্রকৃতি কত উদার, বিভিন্ন জন্তু জানোয়ার, পোকা-মাকড়, পশু-পাখিদের এই সহাবস্থান – এই সক্রিয় জীবনের ছবি তার মনকে বিভোর করে দিল। শান্ত মনে নতুন বোধদ্বয় হল। নতুন এক ছবি ফুটে উঠল তার সামনে। এত বৃহত্তর জীবনের মাঝে এসে সে – অনুভব করল যে তার অনুপস্থিতি এবং গৃহবন্দী হওয়ায় দৈহিক ক্ষুধা বা একটু আরাম সহানুভূতি আন্তরিকতা, কারো হাতের স্পর্শ, সুখ লাভের ইচ্ছের বশবর্তী হয়ে যদি ‘মনোরঞ্জন’ তার থেকে দূরে সরে যায় – তাহলে সেটাকে অস্বাভাবিক ভাবলে চলবে কেন? সেই স্কুল কলেজের সময় থেকে তারা প্রেমের বন্ধনে বাঁধা। সুন্দরভাবে সন্তান পালনের কর্ত্তব্য দুজন মিলে পালন করেছে। তাদের জীবন কি এই এক প্যানডামিকের ঝড়ে বিধ্বস্থ হয়ে যাবে। কোভিড তাদের ছুঁতে পারেনি। বাবা মায়েরা কেউ হটাৎ মারা যাননি। মেয়ে এখনও ভাল আছে – যে কাজে সে যুক্ত তাতেও তার সাফল্য লাভ হয়েছে, তাহলে কেন সে এমন মনকে অবশ বিবশ সংকীর্ণ করে ফেলে এমনভাবে নিজের বাড়ি ঘর সংসার ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তার বাবা সব সময় বলেন, “forgive and forget, নাহলে আগে এগোতে পারবে কি করে?” এগিয়ে চলাই তো জীবনের ধর্ম। 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ ঘুম এসে গিয়েছিল রাচেল নামে মেয়েটির। দরজা খুলে রণিতা চলে যাওয়ায় একটা আওয়াজ হল এবং  গরম হওয়ার ঝোঁকায় উঠে পড়ল সে। তাড়াতাড়ি হাফ প্যান্ট ও টি শার্টটি গলিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। আরও পাঁচটি জায়গায় সময়মত ডেলিভারী পৌঁছে দিতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে মালিকের কাছে। ওষুধ কোম্পানীর থেকে প্যাকেটগুলি সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় তাকে। ভীষণ গরম পড়েছে এবার ক্যালিফোর্নিয়ায়, এরকম আশ্চর্য রোদের তাপ আগে কখনও সব রাস্তা ঘাট সবুজ পার্কগুলিকে এমনভাবে ঝলসে দেয়নি। খুব ক্লান্ত হয়ে এই ভদ্রলোককে ওষুধ দিতে এসে এক বোতল ঠান্ডা জল চেয়েছিল সে। তিনি ড্রইং রুমে বসে কম্পিউটারে কিছু খুলে রেখেছিলেন। ওকে আন্তরিকভাবে ভেতরে আসতে বললেন। ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে দুটি গ্লাসে বিয়ার ঢেলে নিয়ে গল্প করতে আরম্ভ করলেন।

ছোট থেকেই সে লাস্যময়ী, শরীরের প্রতিটি খাঁজে ঢেউ তুলে হেসে কথা বলতে পারে। মেক্সিকো থেকে এখানে আসার পর থেকেই বিভিন্ন হোটেলে, রেস্টুরেন্টে কাজ করেছে সে। ১৮ বছর বয়স থেকে আলাদা থাকে, বন্ধুদের পরামর্শে কন্ট্রাসেপ্টিক ওষুধ খায়। যে কোনও জায়গায় যে কোন ধরনের মানুষের সঙ্গে সহবাস করতে তার যেমন আপত্তি নেই, তাদের কথা এক মিনিটে ভুলে যেতেও তার পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না। অতএব আজকের ঘটনাটি জলে বুদবুদ ওঠার মতন একমুহূর্ত্তে মন থেকে মুছে দিয়ে আবার সে এগিয়ে যায় অন্য পাড়ায় অন্য বাড়িতে ওষুধের ডেলিভারী দিতে। এই প্যানডামিকে বহু লোকের চাকরী চলে গেছে কিন্তু Amazon, Zomato বা আরও অনেক অনলাইন দোকানগুলির মাল বহনকারী এই ডেলিভারী বয় ও মেয়েদের কাজ অনেক বেড়েছে। কিছু বন্ধুর ‘কোভিড’ হওয়ায় সে এখন দুই শিফটে কাজ করে অনেক ওভারটাইম পায়। লকডাউন খুললে দেশে ফিরে গিয়ে সংসার পাতবার বাসনা তার বাড়ছে।

 

তৃতীয় অধ্যায়

মেয়েটির ধড়মড় করে উঠে হড়বড় করে পালিয়ে যাওয়াতে মনোরঞ্জন তোয়ালে হাতে ড্রইং রুমে এসে দাঁড়ালো। এতক্ষন সে বোধহয় কোন ঘোরে ছিল, কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। মাথায় জল ঢেলে শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। হটাৎ খোলা দরজার পাশে রণিতার বড় ব্যাগটি চোখে পড়ল। ইলেকট্রিক কারেন্ট লাগল তার শরীরে। এক মুহূর্তে মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্যতায় ভরে গেল। পায়ের তলা থেকে মাটি ক্রমশঃ সরে যেতে লাগল তার। ছোট বাচ্চার মতন বিড় বিড় করতে লাগল, – ‘হে ভগবান এখন কি হবে?’ আমি কি করে রণিতার সামনে আবার সহজভাবে দাঁড়াতে পারব। ও যদি মেয়েকে জানায়, বাবা মাকে বলে দেয়, বন্ধু বান্ধবদের কাছে নালিশ জানায়? ও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়! বা রাগে দুঃখে অভিমানে কিছু করে বসে, তাহলে? তাহলে . . . . . তাহলে . . . ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে লাগল মনোরঞ্জন। তার এতদিনের সুন্দর সংসার কি সে নিজের ভুলের জন্যে কাঁচের ফুলদানীর মতন ভেঙ্গে দিল! খোলা টেলিভিশনে হটাৎ একটা ঘোষণা শোনা গেল, – ফরেস্ট ফায়ার লেগেছে চারিদিকে। দলে দলে ঘর খালি করে পথে, মাঠে বেরিয়ে পড়েছে, হাজার হাজার লোক। সেগুলি দেখতে দেখতে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মনোরঞ্জন। সম্বিৎ ফিরে এলো দরজায় অনেক লোক, পুলিশ এসে চেঁচামেচি করেছে শুনে, কি চায় এরা, কি বলতে এসেছে? রণিতার কি কোন বিপদ হয়েছে?

ইভাকুয়েট করে তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন। পাশের বাড়ির ছাদে পাশের জঙ্গলের আগুনের ফুলকি এসে পড়েছে, আপনার কাঠের বারান্দাতেও সে আগুন পৌঁছাতে দেরী লাগবে না। বেরিয়ে আসুন শীঘ্রই. . .  ইংরেজি, স্প্যানিশ নানা ভাষায় পুলিশের মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে। ল্যাপটপ ও ওয়ালেট এবং একটা জলের বোতল হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো সে। পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে হাত নেড়ে ডাকছেন এক বৃদ্ধা। তার সামনের ঘরে আগুন ধরে যাওয়ায় বেরোনোর রাস্তা বন্ধ। মনোরঞ্জন এক লাফে বাগানের পেছন দিয়ে তাঁর গ্যারেজে ঢুকে পড়লো। এখানে সে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার দরজাটি খুঁজে পেল। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল সেটি। তাড়াতাড়ি ঐ ভীত মহিলার পাশে পৌঁছেই চ্যাং দোলা করে কোলে তুলে নিল তাকে। ধোঁয়ায় ঘর ভরে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে পারছে না তারা, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোরকমে পেছনের রাস্তা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে। বৃদ্ধাকে বাঁচিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশীরা ঘিরে ধরলো তাকে। ভীষণ জোরে একটা আওয়াজ শুনে চমকে তাকালো তারা – মনোরঞ্জনের বাড়িটি তখন জ্বলন্ত আগুনের কবলে। ফায়ার ব্রিগেড এসে গেছে, জলের ফোয়ারা ছুটেছে – সবাই দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছে। পাশের বড় বড় রেডউড গাছগুলি বাঁচাবার জন্য আরেকদল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে তাদের মুড়ে দিচ্ছে। 

দাবানল – দাবানলের ভয়ঙ্কর রূপ বাক্যহারা করে দিল। অবশ বিবশ হয়ে পথের ওপরে বসে পড়ে মনোরঞ্জন। রণিতার গাড়ি বাড়ির প্রায় কাছাকাছি আসতেই ফায়ার ফরেস্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে, ভাবতেই পারেনি তাদের ঐ কাঠের বাড়িগুলিও ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। গাড়ি থামিয়ে ছুটে এল সে। প্রথমেই মনে হল আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে মনোরঞ্জনকে খুঁজে আনবার কথা, কিন্তু বাইরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখতে পেল তার চেহারা। ওদিকের মাঠে – কৃষ্ণকায়া আফ্রিকান আমেরিকান অ্যালমা ও শ্বেতাঙ্গিনী মিসেস জন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে কাঁদছেন। কিছুদিন আগেও বর্ণ বিদ্বেষের কারণে একজন আরেকজনকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। আজ মহামারী এসেও যখন তাঁদের মিল করাতে পারেনি, আগুনের লেলিহান শিখার সামনে মিলন দৃশ্য এক অভিনব সত্যের দর্শন করিয়েছে তাঁদের।

রণিতা মনোরঞ্জনের কাছে আসতেই শিশুর মতন ফুঁপিয়ে উঠল সে। মায়ের মতন মমতায় স্ত্রী তার স্বামীর মাথাটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ও প্রণাম জানাতে লাগল বারেবারে। তাদের দুজনের বুকেই তখন গান বাজছে – “আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে, এজীবন . . . .”

 

Leave a comment