চন্দনা সেনগুপ্ত
শ্রদ্ধাঞ্জলি মানস চৌধুরীকে
সরস্বতী পুজোয় ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নাচের অনুষ্ঠান করাচ্ছি। জয়া গানগুলো গাইছে হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাদের সঙ্গে। তার সুন্দর করে সাজানো “ট্যাগোর গার্ডেনের” একতলায় ড্রইংরুমে রোজ বসছে চাঁদের হাট।
আমার কোলে চার মাসের ‘রুস্তম’ এবং জয়ার কন্যা মিষ্টি, ও আমার বড় পুত্র রানা তখন ৫/৬ বছরের শিশু। বাচ্চাদের কলকাকলিতে মুখর হত হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশ। বেশ কিছুটা সন্ধ্যে গড়ালে যখন বাড়ি যাবার পালা তখন অফিস থেকে ঢুকতেন মানস দা। মাথায় খাটো কৃষ্ণকায় মাঝারি গড়নের চেহারা – কিন্তু অদ্ভুত এক প্রশান্তিমাখা মুখচ্ছবি। সর্বদায় কৌতুকপ্রিয় হাসিতে উজ্জ্বল, শান্ত স্নিগ্ধ যুবক তখন তিনি। আমরা রোজ তাঁর ঘর তছনছ করে, টেবিল চেয়ার সরিয়ে, ডেকোরেশনগুলি এধার ওধারে ফেলে নাচগান করতাম। এসেই সব গোছাতে লাগতেন তিনি।
সেবার শুধু দূরের থেকে দেখার মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। পরে ছেলে মেয়েরা একটু বড় হয়েছে। রুস্তম, রানা ও মিষ্টির সবে ৮/৯, তখন ও ‘কীর্তিনগরের মিলনী ক্লাব’ বা রাজরী গার্ডেনের পুজো প্যান্ডেল এর জন্যে ঠিক মনে নেই “খ্যাতির বিড়ম্বনা” নাটকের মহড়া দিচ্ছি ঐ প্রশস্ত বৈঠকখানায়, মানসদার মাঝে মাঝে উপস্থিতি থাকতো সেখানে খুব সম্ভব রবিবারে।
বাচ্চা বাচ্চা কুশীলবদের প্রতি আন্তরিক স্নেহ, যাঁরা শেখাচ্ছেন তাঁদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার উৎসাহ দেওয়া ও কখনও কখনও তাদের ধৈর্য ধরে ত্রুটি বলে দেওয়া – সব যেন এক মোহময় জগৎ সৃষ্টি করত। শেষ হয়ে গেলে ভাবতাম, এইরকম শৈল্পবোধ সম্পন্ন রুচিশীল বাংলা গান, কবিতা নাটকপ্রেমী নির্ভেজাল এক সাদাসিধে কিন্তু বোদ্ধা বাঙালি খুব কমই দেখেছি দিল্লীতে।
এরপর আমরা ট্যাগোর গার্ডেন ছেড়ে চলে গেলাম ময়ূর বিহারে। কিন্তু স্কুলে চাকরি করতাম ট্যাগোর গার্ডেনের হোলি চাইল্ড স্কুলে। কাজেই দুটো বাস বদলে আসতে হত সুদূর যমুনা পার থেকে ঐ ট্যাগোর গার্ডেনে।
সেখানে তখন অর্থ উপার্জনের জন্য শনিবার/রবিবার নাচ শেখাতাম আমি, কিন্তু এখন তো বাড়ি নেই, কোথায় ক্লাশ করব? ঐ ক্লাশটি বন্ধ হয়ে যাবে ! কিন্তু সহৃদয় বন্ধু দুজন পাশে এসে দাঁড়ালেন আমার। জয়া ও মানসদা খুলে দিলেন নিজেদের ঘরের দরজা, প্রতি শনিবারে ড্রয়িং রুমের চেয়ার টেবিল সরিয়ে নাচ শেখাতাম, জলখাবারও খেতাম জয়ার হাতের তৈরী। কোনোদিন সেজন্য ওঁদের স্বামী স্ত্রীর মনে এতটুকু বিরক্তি বা কিন্তু ভাব দেখিনি। অদ্ভুত এক মধুর আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে বেঁধে ফেললেন ওঁরা আমায়, মানসদা গৃহকর্তা ছিলেন – অত্যন্ত উদার ও উদাসীন তাঁর বিন্দুমাত্র ভেদভাব ছিল না কোনও।
তারপর ওঁরা চলে গেলেন রোহিনীতে। সেখানেও জমিয়ে রাখলেন বাঙালী পরিবারদের। আসর বসালেন নানান গান বাজনা নাটকের রিহার্সাল প্রস্তুতিতে প্রত্যেক পুজোর সময়। আমরা দেখতে যেতাম তাঁদের সেই সব মঞ্চস্থ নাটক, শুনতাম জয়ার অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠের গান।
একবার এক নাটকে ‘মানসদা’ এক মেসের বাসিন্দা, তাঁকে সেই আশ্রয় ছাড়তে বলা হয়েছে। জয়া ‘মন্দিরার’ ভূমিকায় অভিনয় করছে। মানস দা অদ্ভুত এক মায়াময় কণ্ঠে বলে উঠলেন – “যাবো তো, কিন্তু কোথায় যাবো বলুনতো ভাইটি”, – সেই ডায়ালগটি জানিনা কেন আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল। ভীষণ মোহিত হয়ে সেই নাটকটি দেখতে দেখতে একেবারে একাত্মা হয়ে গিয়েছিলাম, ঐ চরিত্রের অসহায়তা ও সারল্যে। আর তারপর থেকেই আমি মানসদাকে আর দাদা ডাকিনি, সব সময় ‘ভাইটি’ বলতাম এবং তিনিও সেই সম্বোধন খুব পছন্দ করতেন। আমার আমুদে ভাইটি আমাদের বাড়ি এলে আমার স্বামী নির্মল বাবু প্লেনে পাওয়া ছোট ছোট মিনি বোতল খুলে দিতেন তাঁকে একটু গলা ভিজিয়ে অনেক মজার মজার কথা বলার জন্য।
আমাদের দুই দম্পত্তির বিয়ের তারিখ ছিল একই, – তাই ফেব্রুয়ারী মাসে মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গে বসতাম ও আনন্দ করতাম। একবার কুরুক্ষেত্রে গেলাম। হটাৎ সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে বসে শীতের পড়ন্ত বেলায় গ্রাম্য পরিবেশে দুটি অ-সাধারন সহজ আন্তরিক সহৃদয় মানুষ জয়া ও ভাইটির সঙ্গে যে কি অনাবিল অপার আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন, তা হয়ত আর কখনো কোথাও পাইনি। সূর্যাস্তের আলো পড়েছিল তাঁদের সরল মুখে, স্মিত হাসিতে উদ্ভাসিত সেই কুঞ্চিত চোখ ও প্রসারিত ঠোঁট আমাদের যেন কিশোর বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিনের সেই স্মৃতি আমার মনের মনিকোঠায় এখনও জ্বল জ্বল করে হীরের দ্যুতি দিতে থাকে।
ভাইটি, তুমি ঐ কোভিড দানবের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছো – আর তোমার চলে যাওয়ার পর জয়া একা স্মরণ ভেলায় ভেসে, নীরবে কোথায় – কখন ভেসে যাচ্ছে জানিনা – কিন্তু তারও যুদ্ধ চলছে প্রতি নিয়ত, প্রতি মূহুর্ত্ত এই কথা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি।
আজ তুমি তো বিদেহী আত্মা, কিন্তু তোমার সর্বগুণ সম্পন্না বিজ্ঞানী কন্যা, ভক্তিমতী স্ত্রী আত্মবিশ্বাসে সাহসে ভর করে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে যেন একে একে ছয়রিপু – কাম, ক্রোধ, লোভ, ভয়, মাৎসর্য ও মোহকে অপসারিত করতে করতে এগিয়ে চলছে। তুমিই তাদের শিখিয়েছো, অকৃত্তিম সহজ সরল স্বাভাবিক ভাবে পথ চলার ছন্দ।
তাই তোমার হাসিমাখা স্নেহে আপ্লুত ছবি তাদের মনের জোর বাড়াতে সাহায্য করছে – এ কথাও নিশ্চিতরূপে সত্য। আমরা যারা বন্ধু পরিজন দূরের থেকে তোমাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফুটবল খেলার দর্শকের মতন শুধু চিৎকার করে উৎসাহ দিতে চাইছি। তোমাদের বর্তমান রণক্ষেত্রের ভয়াবহতায় ভীত হয়ে কখন কখনও বা নিজেরাও অদ্ভুত এক দ্বিধাগ্রস্থ বিষন্ন মনে সময় কাটাচ্ছি।
নৈরাশ্য জনক দুর্দিনে মহামারীর সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হওয়া – সংগ্রামী আহত মানুষদের কথা ভেবে যখন কাতর হয়ে পড়েছি, – তখন যেন তোমার কণ্ঠস্বর আবার আমাদের জাগিয়ে তোলে, আমরা শুনতে পাই আমার ‘ভাইটি’ বলছেন, – “আরে এসবের মধ্যে দিয়েই তো চলতে হবে, ঘাবড়ে যেও না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এগিয়ে চলো।” চরৈবেতি চরৈবেতি।
তোমাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম ও জয়া এবং মিষ্টি মামনিকে অনেক ভালোবাসা জানিয়ে স্বর্গের ঠিকানায় এই পত্র পাঠিয়ে দিলাম।