চন্দনা সেনগুপ্ত

 

জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে,

পরশমনির খোঁজে যখন

এধার ওধার ঘুরে বেড়ায় মন,

সংসারের সংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে পড়ে জীবন

তখন –

আমার এই অন্ত্যোদয় আশ্রমে

পদার্পন।

শিশুর মহা মেলায়, সেখানে লুকিয়ে আছে –

অনেক অমূল্য ধন।

‘বলরাম করণে’র মতন একজন অসাধারন

নির্ভেজাল, অকৃত্তিম উদার

মানুষের পেলাম দর্শন।

তাঁহার কর্মযজ্ঞে – করতে গিয়ে –

আত্ম – নিবেদন

আমার হৃদয় মুগ্ধ হল,

প্রাণ আনন্দে মগন

আজ সকলকে সেই কথা ভাই

করতে চাই গো বর্ণন।

শুনুন তবে দিয়া মন,

হৃদয়বান জনগণ।

 

অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম

 

অন্ত্যোদয় – ‘অন্ত্য থেকে উদয়’ নামটি বলরামের যখন মনে আসে, তখন তার বয়স মাত্র – পঁচিশ। ১৯৯৬ – ১৯৯৭ সালে আস্তাকুঁড় থেকে খাবার খুঁড়ে খাওয়া, চায়ের দোকানে পিতা মাতা হারানো ছেলের পরিশ্রম, অসহায়তা – নির্মম মালিকের হাতে নিপীড়িত, গরম ছ্যাঁকা খাওয়া, আত্মীয় স্বজনের প্রহার বা অত্যাচার সহ্য করতে না পারা, পথে পরে থাকা দুঃখী মেয়েদের ক্রন্দন, সহ্য করতে না পেরে একেক করে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসতে থাকে। তখন তাঁর সব আত্মীয় স্বজন, ভাই বোন বন্ধুরা আশ্চর্য্য হয়ে যান। এতগুলি শিশুর ভরণ পোষণ করতে গিয়ে দেনার দায়ে তাঁর কিছু জমি এবং ওষুধের ছোট দোকানটিও বিক্রি হয়ে যায়।

তবে তাঁর স্ত্রী ছবি ও তিন কন্যা ময়না, চায়না, মনি এবং পরে তাদের তিন জামাতা তাঁকে এই আশ্রমটি গড়ে তুলতে, বড় করতে এবং পরিচালনা করতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। আর একজন পরম আত্মীয়া শ্রীমতি অলকা করন এসে বিদ্যালয়টির ভার সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে তুলে নেন। গ্রামের কিছু শিক্ষিত উদার মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তির সহযোগিতা ও অবদানের কথাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন।

২০০৪ সালের ১৬ই জুন আনন্দবাজার পত্রিকায় একটা লেখা চোখে পড়েছিল, ‘ঘরে ঘরে লক্ষীর ভাঁড় রেখে মুষ্ঠি ভিক্ষা করে’ একজন তরুণ যুবক কিছু পথ শিশুকে বাঁচিয়ে একটি ‘অনাথ আশ্রম’ তৈরী করেছেন। সেই বাচ্চাগুলোর ছবি বেরিয়েছিল, অত্যন্ত করুন সেই দৃশ্য। শীতের দিনেও গায়ে জামা নেই তাদের, আগুনের সামনে গোল করে বসে তারা হৈ হল্লা করছে। সাংবাদিক সুব্রত গুহ মহাশয় জানিয়েছিলেন তারা মুড়ি খেয়ে জীবন ধারণ করছে। ওদের ত্রানকর্তা রাস্তার থেকে তুলে এনে প্রাণ বাঁচিয়েছেন, কিন্তু নিজের বাচ্চাদের সঙ্গে তাদেরও অন্নের জোগাড় করতে গিয়ে সেই ‘বলরাম করন’ এখন দিশেহারা হয়ে গেছেন।

এই খবরে অনেক পাঠকেই অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ওই উদার যুবকের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। প্রথম যিনি ‘বলরামের’ খোঁজে লোক পাঠান, পূর্ব মেদিনীপুরের পাউশি গ্রামে। তিনি জার্মানি প্রবাসী স্বর্গীয় বিমল রায়। বলরাম তাঁর কাছে ছুটে যান, সাহায্যের আশায়, তিনি তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসাবার বদলে ধমকের সুরে বলে ওঠেন, – “তুমি কি পাগল? যদি খাওয়ানোর ক্ষমতা না থাকে, তো এতগুলো বাচ্চাকে পথ থেকে তুলে এনেছিলে কেন?”

বলরাম তো হতভম্ব। ‘এ কী রে বাবা গ্রাম থেকে ডেকে আনলেন, – তাঁকে এইভাবে ভর্ৎসনা করবার জন্যে’, ভাবছে সে। মুখে কথা সরছে না। তখন তিনি নরম হয়ে জানালেন, – যে তিনিও একদিন অনাথ অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়ে পথে নেমেছিলেন, বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তাই আজ এই শিশুগুলির জন্য কিছু করতে চান।

এরপর তাঁর বদান্যতায় অনাথ আশ্রমের বাড়ি, ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা হোস্টেল এবং যদি কোন সজ্জন ঐ আশ্রমের শিশুদের জন্যে কোনও কাজ করতে, ট্রেনিং দিতে যান, তাদের জন্যে একটি সুন্দর অতিথিশালা তৈরী হয়ে গেল একবছরের মধ্যে।

আনন্দবাজারের এই খবরটি কলকাতা, দিল্লী থেকেও অনেক মানুষকে বলরাম করনের কাছে টেনে নিয়ে আসে। তাঁদের মধ্যে যেমন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের কোনও জেনেরাল ম্যানেজার আছেন, তেমনি লন্ডনের কোন ডাক্তার, হাওড়ার লোহা ব্যবসায়ী, অথবা অতি সাধারন শিক্ষক শিক্ষিকা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক অফিসার কিম্বা কর্পোরশেনের দলবদ্ধ দায়বদ্ধ সংস্থা, ব্যারাকপুরের মহিলা সমিতি – বহু সমাজ সেবী আছেন।

যাঁরাই এখানে এসেছেন, তাঁরাই বলরাম ও তার তিন কন্যা, স্ত্রী ও অন্যান্য সহৃদয় আত্মীয় বা গ্রামবাসীদের আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। এখানে পাউশি গ্রামটির অপূর্ব শ্যামল সবুজ পরিবেশ, নদী, পুকুর, বাগান, সব্জির চাষ, আগত মানুষের হৃদয় কেড়ে নেয়। আর সঙ্গে বাচ্চাদের অপূর্ব কল – কাকলি, নাচ, গান, নাটকের মহড়া, খেলাধুলা, পরবর্তীকালে, সরস্বতী পুজো, দুর্গাপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী সব অনুষ্ঠানে আগ্রহ দেখে অতিথিরা অত্যন্ত আকৃষ্ট হন। তাঁরা এই আনন্দলাভের খবরটি মুখে মুখে এবং পরে – ফেসবুক, ইন্টারনেট, ইউটিউব অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও বহু লোকেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তাঁদের এখানে আসতে অনুরোধ জানায়। বিদেশ থেকেও কোনও কোনও ছাত্র ছাত্রী অধ্যাপকের দল এসে ঘুরে পরিদর্শন করে যান অন্ত্যোদয় আশ্রমটি।

ইতিমধ্যে বলরাম করনকে নানান সম্মানে ভূষিত করেন সরকারি বেসরকারি নানান সংস্থা, “দাদাগিরিতে” আহ্বান জানান সৌরভ গাঙ্গুলি। জেলাশাসকবৃন্দ যে যখন আসেন বলরামের আশ্রমের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতারই – প্রিয় মানুষ এই বলরাম। প্রথমে সি পি এম দলের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ থেকে শুরু করে পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেস বা ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী বা নেতারা সবাই তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে এম এল এ, এম পি রা সকলেই একবাক্যে বলরামের অবদান শিকার করেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ এটাই যে, তিনি প্রকৃত সমাজ সেবক কোন রাজনীতি মতবাদ আঁকড়ে নিয়ে নয় ঐ শিশুগুলির জীবনের উন্নতি সাধনে, বছরের পর বছর তাদের নানা ভাবে নানা ক্ষেত্রে সাহায্য করে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাতেই দিন রাত প্রাণপাত করেন। যে সব কন্যারা ১৮ পার হয়ে যায়, দায়গ্রস্থ চিন্তিত পিতার মতন তাদের জন্য পাত্র খুঁজে বেড়ান। বিভিন্ন বড় মানুষের কাছে ভিক্ষা করে তাদের পাত্রস্থ করেন, পরে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া এমনকি জামাইষষ্ঠীর দিনে নেমন্তন্ন করে স্নেহময় শ্বশুর পিতার ভূমিকা পালনেও উদ্যোগী হন।

যে সব মেয়েরা আরও পড়াশুনো করতে বা নার্সিং ট্রেনিং-এ যেতে চান, যতদিন না তারা চাকরী পাচ্ছেন ততদিন তাদের ব্যয় ভারও বহন করতে দ্বিধা করেন না। ছেলেদের নানা ধরনের ট্রেনিং ITI শিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। যারা পড়াশোনায় ভালো তাদের গ্রাজুয়েশন করিয়ে তবে শান্ত হন। শুধু যে আশ্রমিক ছাত্র-ছাত্রী শিশুদের প্রতি তার কর্ত্তব্যবোধ প্রকাশ পায় তা নয়, যারা এখানে কাজ করছেন, বাচ্চাদের দেখাশুনো প্রতিপালনে সাহায্য করছেন, – বাগানে সব্জি ফলাচ্ছেন বা চিংড়ি অথবা মাছের চাষ করছেন, তাঁদের প্রতিও তাঁর অসীম দরদ। কারো অসুখ বিসুখ হলেও বলরাম করন তাদের চিকিৎসা বা সেবার বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেন না। কর্মীবৃন্দের বেশিরভাগ মহিলাই অসহায় স্বামীহারা। এঁদের পিতৃ পরিত্যক্ত অসহায় সন্তানেরাও বলরামের নিজের তিন কন্যা ও এক পুত্রের সঙ্গে সমভাবে লালিত পালিত হন। তারা বড় হয়ে কেউ উবের ওলা গাড়ির মালিক, চালক, কেউ অন্য কোনো হাতের কাজ শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েরা এখন বলরামকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আর এইসমস্ত দায়িত্ব পালন করতে তাঁকে সাহায্য করে যারা এই আশ্রমের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করে চলেছেন, তাঁরাও যেন ধীরে ধীরে আশ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। কেউ মা, বাবা, কেউ জ্যেঠু, কাকু, পিসিমনি, মাসিমনি, দিদিভাই, দাদাভাই হয়ে নিজেদের ঐ আশ্রমের সুখে – দুঃখে প্রত্যেক পর্বে নিজেদের যুক্ত করে ধন্য বোধ করছেন। আশ্রমিকদের ঐ মিষ্টি মধুর সম্বোধন তাঁদের বলরামের নিকট আত্মীয় – স্বজন, প্রিয় বন্ধু তথা শুভাকাঙ্খী হয়ে বাঁচার অধিকার এনে দিয়েছে।

দিঘা মন্দারমণী অঞ্চলে প্রায় ঝড় ঝঞ্ঝা বা বন্যায় অনেক গ্রাম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। গত কয়েকবছরের মধ্যে নিশা, আমফান, যশ ইত্যাদি ঘূর্ণি ঝরে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। তখন বলরামের পাশে এসে দাঁড়ায় ঐসব প্রাক্তন ছাত্রের দল। ত্রাণকার্য্যে তাদের অবদানে গ্রামবাসীরা উপকৃত হন।

অতি ছোট ছোট শিশুগুলি দূরের পাঠশালায় যেতে পারবে না বলে বলরামবাবু তাঁর স্বর্গত পিতার স্মরণে ঐ আশ্রমেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলেন। “খগেন্দ্র শিশু নিকেতন”। গ্রামের কিছু শিক্ষিত তরুণ তরুণী অতি সামান্য হাত খরচের অর্থ গ্রহণে সন্তুষ্টি হয়ে সুন্দর ভাবে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে থাকেন। বর্তমানে সেটি সরকারের অনুমোদন লাভ করে এবং শিক্ষকের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পায়। এছাড়া গ্রামের অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা, দুস্থ পরিবারের মেয়েদের ‘সমূহ-বিবাহ’ অনুষ্ঠান করাও তাঁর বিশেষ সৎকর্ম রূপে চিহ্নিত করা যায়।

 

গত সতেরো বছর ধরে আমি এই অন্ত্যোদয় আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রী আশ্রমিক কর্মীবৃন্দ, করন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রতিদিনের সংগ্রামের এবং প্রতিনিয়ত সহৃদয় ব্যক্তিদের দয়া-দাক্ষিণ্যে জীবন ধারনের লড়াই – সম্পর্কে অবগত আছি। ২০০৪ থেকে ২০২১ এর জুন মাস পর্যন্ত তাদের জীবনের মান অনেকটা উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘কোভিড’ ১৯ এর ‘মহামারী’ পৃথিবীর সব দেশ, জাতি ও সমাজের সবকিছু ওলোট পালট করে দিয়েছে।

যেসব সংস্থা নিয়মিত ভাবে আর্থিক আনুকূল্য দান করে এসেছেন তাদের অনেকেরই নিজেদের কাজ – কর্মও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। যে সব অদূর ও সুদূর প্রবাসী অতিথি শুভাধ্যায়ী প্রত্যেক বছরে নানা ভাবে আশ্রমে এসে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, তাদের সন্তানের জন্মদিন, বিবাহ অনুষ্ঠানে অকারণে আড়ম্বর – বিলাসিতা বর্জন করে এই শিশুদের মাঝে উপস্থিত হয়ে তাদের জন্যই ব্যয় করতে ভালোবাসতেন, তাঁরাও লকডাউন-এর জন্য এখন প্রায় ২ বছর ধরে আসতে পারছেন না। মন্দারমণী, দিঘা ভ্রমণের সঙ্গে এই আশ্রমের মনোরম শিশু উদ্যানে অবসর কাটিয়ে যেতে আগ্রহী হতেন কিছু ট্যুরিস্ট, তাঁরাও এই দুবছর গৃহবন্দী। যে সব বিদেশী ছাত্র সমাজ বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ পাঠ নিতে বলরামের অনুমতি নিয়ে এই সুন্দর অনাথালয়ে শিশুদের সঙ্গে কিছুদিন মূল্যবান সময় কাটিয়ে যাবার সুযোগ পেতেন এবং বাচ্চাদের প্রতিভা অনুযায়ী কখনও রোবট বানানো, কখনও কম্পিটার ট্রেনিং দিতে সক্ষম হতেন, তারাও এখন অনুপস্থিত। কিছু শিক্ষিকা এখানে এসে মহানন্দা গেস্ট হাউসে (বিমল রায়ের মায়ের নামে নির্মিত) বাচ্চাদের পড়াশুনো, সংগীত, নৃত্য, সেলাই – ফোঁড়ায়, ক্রাফটের কাজ ইত্যাদি শেখানোর মধ্যে দিয়ে নিজেরাও আনন্দ পেতেন এবং অনাথ শিশুগুলির জীবন রামধনুর সাতটি রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যেতেন তাঁরা সব যেন আবার আসতে পারেন। তাদের সমবেত প্রচেষ্টা অন্ত্যোদয়-এ মানুষ গোড়ার কারখানায় – শিবজ্ঞানে জীব সেবায় আরও বহু মানুষের আগমন হোক – বলরামের থেমে যাওয়া প্রজেক্টগুলি আবার সুচারু রূপে নব নব সৃজনশীলতায় কার্যকরী হোক – এই আমাদের মতন শুভাকাঙ্খীদের একান্ত কাম্য।

এই আশ্রমের প্রতিটি তৃণ, ফুল বা ফলের গাছ, জল টলটলে পুষ্করিণী, শুদ্ধ হাওয়া, বলরাম সহ সব শিশুদের আন্তরিক ভালোবাসা ও আতিথেয়তায় আমরা ধন্য ও আপ্লুত হয়ে – এই লেখনীর মাধ্যমে আরও অনেক শিল্প প্রেমী ও সমাজ সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই আপনাদের পত্রিকায় এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে। শুধু অর্থ সাহায্য নয় – এমন অনেক লেখক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, চলচিত্র অভিনেতা আছেন, যাঁরা তাঁদের উপস্থিতিতেও কলাকৃতি দেখিয়ে আশ্রমিকদের জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে দেন।

একজন পুলিশে কর্মরত ব্যক্তিকে একবার দেখলাম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আশ্রমে এসেছেন। তাঁর হবি ম্যাজিক দেখানো – তাই দেখিয়ে শিশুদের, স্টাফদের এবং আরও অনেক গ্রামবাসীর মনোরঞ্জন করছেন।

কয়েকজন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকা এখানে এসে হায়ার সেকেন্ডারী ও অন্যান্য পরীক্ষার দু-মাস আগে এসে রোজ তিন বেলা নিয়মিত ভাবে ছাত্রদের অঙ্ক, ইংরেজী বা অন্যান্য বিষয়ে পড়াতেন। স্কুলের পড়া না বুঝতে পারা ছাত্র-ছাত্রীরা ঐ দু মাসের অতিরিক্ত অধ্যয়নে বোর্ডের পরীক্ষায় খুব ভালো ফল পেতেন। রাহুল মান্নার মতন ভালো বুদ্ধিমান ছেলে অঙ্কে ১০০/১০০ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুরস্কার এনেছে। ৭ জন মেয়ে এখন থেকে পাশ করে বিখ্যাত সব হাসপাতালে নার্সের কাজ করছে। তাদের গর্বে বলরাম আজ গর্বিত। একজন সহৃদয় ব্যক্তি আশ্রমকে একটি এম্বুলেন্স দিয়েছেন, কেউ আশ্রমের সংগ্লনগ্ন জমি খণ্ডটি কিনে বলরামকে সব্জি লাগাতে, মাশরুম চাষ করতে, পুকুরে মাছের চাষ করে বাচ্চাদের খাওয়ার কষ্ট দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন। এঁদের সবাইকে আমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার মহাশয়ের ‘পরাণের পদ্মবনে’ গ্রন্থে এই আশ্রমের কথা লেখা আছে, যা পরে অনেক পাঠকের মনে ইচ্ছে জাগে এই আশ্রমটি পরিদর্শন করতে।

সবাই যেন ধনী বা বিদেশী প্রতিষ্ঠিত সন্তানের দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত পিতা মাতা তা কিন্তু নয়, এমন গরীব বা মধ্যবিত্ত সাধারণ ব্যক্তিও তাঁদের যৎসামান্য রোজগারের এক অংশ পাঠান এই শিশুদের উপকারে লাগবে বলে। হাওড়া হাটে মাত্র কয়েকশো টাকার জামা কাপড় ফেরিওলাকেও দেখেছি কিছু গামছা ও বাচ্চাদের গেঞ্জি বা মেয়েদের (নাইটি) ছিটের ফ্রক নিয়ে এসেছেন পুজোর আগে। এগরার প্রাক্তন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই বাজারে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে অনুরোধ জানাচ্ছেন এই নির্ভেজাল দয়াবান বলরামকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান দিতে। বিভিন্ন স্কুলের তরুণ ও প্রতিভাবান ছাত্র এবং মাস্টারমশাইকে অনুপ্রাণিত তথা উৎসাহিত করছেন, অন্ত্যোদয়-এর আশ্রমিকদের যোগব্যায়াম, অঙ্কও অন্যান্য খেলাধুলা শেখাতে।

আমাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি অতি মহত্ত্বপূর্ণ, ব্যবহারযোগ্য ও আনন্দময় হয়ে উঠেছে এই আশ্রমের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সুদক্ষ ছেলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছে, এখানে এক একটি শিশুকে স্পনসর করে – প্রতি মাসে তাদের খরচ পাঠাতে। নিজেদের আনন্দের দিনগুলিতে পার্টি না করে বা পিতা মাতার স্বর্গারোহনে শ্রাদ্ধতে অতিরিক্ত লোক দেখানো খরচ না করে তারা এই সব অসহায় শিশুদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এক নতুন ভাবনার পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছে। একজনকে দেখে আর একজন অনুসরণ করছে।

বিশেষত এই ‘কোভিডে’ – পরলোক গমন করার পর যখন কিছু তরুণ তরুণীকে দেখলাম সুদূর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড – সিঙ্গাপুর থেকে এসে বাবা-মা বা ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের শ্রাদ্ধ করতে আসতে পারলো না, তখন বলরামদা কে টাকা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছে তাদের পিতৃ তর্পনের নামে ঐ শিশুদের কাজে অর্থ ব্যয় করতে। – এই সব ছেলে মেয়েদের সমবেদনা জানিয়ে যাই আশ্রমের পক্ষ থেকে।

এমনও একজন চাল, ডাল, তেল, মসলার ব্যবসায়ী এই আশ্রমের কথা জানার পর থেকে নিয়মিত তাঁর দোকান থেকে ঐ সব দ্রব্য সামগ্রী পাঠিয়ে যাচ্ছেন – নিজের নাম ঠিকানা গোপন রেখে। এটা বোধহয় ঠাকুরের ভোগ নিবেদনের তাঁর প্রকৃত প্রয়াস।

বলরাম ভালোভাবে শিক্ষা, দীক্ষা, মূল্যবোধের পাঠ পড়াতে আর একটি দিকে বিশেষভাবে সচেতন, তাঁর ধর্ম – নিরপেক্ষতা। পূর্ব মেদিনীপুরে অনেক মুসলিম গ্রাম আছে – মোসলন্দপুরের মাদুর ব্যাবসায়ী থেকে মন্দারমণীর গুড় – বড়ি – মুড়ি – কাজু ব্যবসায়ী গরীব ও বড়লোক, সমৃদ্ধশালী চাষী থেকে জমিহীন শ্রমিক – সবাই এই মানুষটির পাশে এসে দাঁড়ান। বিপদে আপদে ত্রাণকার্যে সমূহ বিবাহ সম্পন্ন করতে তাঁরা সর্বদা এই আশ্রমের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। কারন বলরাম সব জাতের, সব সম্প্রদায়ের, সব ধর্মের লোকেদের সমান ভাবে শ্রদ্ধা, স্নেহ ও সম্মান করেন। তাই সে সকলের প্রিয় পাত্র। বলরামের মতন মানুষের আজ আমাদের বাঙালির গর্ব একথা অনস্বীকার্য।