চন্দনা সেনগুপ্ত

অষ্টমীতে পুজো বাড়ি যেতে যেতে 
যাওয়া হয়ে উঠল না আর l
বান্ধবী বলেছিলেন, -
“সিঙ্গাপুরের  দোকান বাজার 
কিছুই তো চেনো না, তাই -
সঙ্গে থাকবো আমি।
লিটিল ইন্ডিয়ায়, সব পাওয়া যায়
কিন্তু একটু দামী l

প্রবাসে, এই সাগরপারে, ভারতীয়দের ঘরে ঘরে 
নিত্য নতুন পূজার তরে, -
মালা, চন্দন, ধুপ অগুরু
ডাব নারকেল সারে  সারে  -
নানান রকম সামগ্রী সব
সাজানো হয়, দোকান পরে।
কিনিয়ে দেব - আমি”। -

- ‘সঙ্গে কত টাকা নেব?’
প্রশ্ন ছিলো আমার,

‘পাঁচশ ডলার’ নিলেই হবে।
ভোগের টিকিট,
মায়ের শাড়ী, ফল-মিষ্টি, দক্ষিনা আর
ট্যাক্সি ভাড়া, সব মিলিযে কুলিয়ে যাবে

টাকাটা তো 'ডলার' হেথায় 
মূল্য যে তার অনেক গুনে,-
ভাবলে সেটা চলবে না তো ,-
যখন যেথায় থাকতে হবে,
খরচ করতে হবেই, ততো।
চলতে হবে সেসব জেনে।
পুজোটা তো দিতেই হবে
হিন্দু রীতি নীতি মেনে।

সাজ গোজ করে  বেরোতে যাবো,
ফোনটি বাজলো ঠিক সেই খনে,
রোডিথ নামে কাজের মেয়েটি উঠল কেঁদে জোরে 
তারই ভাইয়ের সংবাদটি শুনে, -
সাংঘাতিক এক ধাক্কা লাগল মনে।
তরুণ শ্রমিক 'ম্যানিলাতে' কোভিড আক্রমনে
মৃত্যু কোলে পড়ল ঢলে -
কখন যে তা কে জানে।
ক'মাস আগেই দেশে যখন ‘করোনার’ই প্রকোপে 
একের পর এক প্রিয় স্বজন
স্বর্গ ধামে চলে গেল -
এই মেয়েটি তখন সেদিন 
কেঁদে কেটে আকুল হল
কেমন করে আজকে তারে -
পুজোর নামে একলা ঘরে,
আমরা যেতে পারি ফেলে।
ভাবতে কেন পারবো না গো 
তাকে আমার কন্যা বলে?
ভাইয়ের শীতল দেহ খানি
পড়ে আছে, তার  হাসপাতালে।
‘ছাড়পত্র’ মিলবে না তাঁর
পাওনা গন্ডা না চুকালে।

নিজের মেয়ের মতন সে যে  করছে মোদের সেবা
এই বিদেশে ভলোবেসে করে তাহা কে বা
জড়িয়ে ধরলো সে আমারে,
স্বান্তনা দিই, কে কাহারে !
শিশুর মতন ফুঁপিয়ে কাঁদে
ভাইয়ের শোকে বারে বারে।
‘ও দূর্গা মা’, করো ক্ষমা,
যাব না আজ তোমার দ্বারে,
'বিবেক' কাঁটা বিঁধছে যে গো, -
আয় না মা গো, তুই এবারে,
মণ্ডপের ঐ বিলাস ছেড়ে, 
সোজা হেথায় আমার ঘরে।

পুজোর টাকা তাকেই দিতে
আদেশ দিলেন, "মহামায়া"
মৃন্ময়ী আজ চিন্ময়ী যে 
মানব তরে অপার দয়া।
গরীব চাষী, শ্রমিক সাজে -
আবির্ভূত জগৎ মাঝে, -
মাটির পুতুল, পাথর মূর্ত্তি -
শুধু জানি তাহার ছায়া,
জীবের দুঃখে, ক্লেশ ও লাজে
 কাঁসর, ঘন্টা, শঙ্খ বাজে,
সর্বভূতে 'মা জননী' ছড়িয়ে দেন যে 
তাঁরই মায়া।

মিথ্যা মন্ত্রে উচ্চ স্বরে, ডাকি সবাই বারে বারে,
ভন্ডামী আর আড়ম্বরে, হারিয়ে ফেলি
যখন তারে -
তখন তিনি এক ধাক্কায় নামিয়ে আনেন,
পথের ধুলায় -
মানুষ মাঝে বেড়ান ঘুরে 
জগতের এই পারাবারে।
জীবন্ত এক 'মা দূর্গার' দেখতে পেলাম
করুন মুখ, -
যুগ যুগান্তে গৃহের প্রান্তে -
এসে, মনে দেন যে সুখ,-
ভক্ত প্রাণে মমতা এনে - মুগ্ধ করেন কৃপা দানে,
শান্তি সুধায়, ভরান যে বুক।
অসহায়ের পাশে দাঁড়ান,
বিশ্বাস আর সাহস বাড়ান,
ভুলিয়ে দিতে সকল দুখ।

 মন্ত্র ,তন্ত্র উপোস ব্রত  আজকে  দিলাম  জলাঞ্জলী
'মা' যে নিজে হাত পাতিলেন,
নিলেন তুলে  মোর, ‘অঞ্জলী।’

One thought on “অঞ্জলী (Anjaly)

Leave a comment