চন্দনা সেনগুপ্ত

মিসেস ভাটিয়ার পার্টিতে সমবেত ভদ্রমহিলারা একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। এ সব ক্ষেত্রে কয়েকটি ‘টপিক’ খুব কমন থাকে। কার কার স্বামীর প্রমোশন হল বা কার ছেলে মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারিতে চান্স পেল, অথবা কে কত টাকা ডোনেশন দিয়ে পড়াতে পাঠিয়েছেন ছেলেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর নইলে কার ঝি কত টাকা মাইনে নেয়, কত ছুটি করে এসব চর্চা।

আজকেও সে সবের মধ্যে জানা গেল, মিসেস গুপ্ত ট্রান্সফার হয়ে মুম্বাই চলে যাচ্ছেন, অতএব তাঁর অত্যন্ত কর্মপটু maid কমলা কাজ খুঁজছে। মিসেস রায় তো একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ওনার বিহার থেকে আগত কাজের মেয়েটি বাড়ি চলে গেছে, আর আসবার নাম নিচ্ছে না, তাই ‘কমলাকে’ তাঁর চাই-চাই। মিসেস রায়ের বাড়িতে অনেক লোক, বুড়ো শ্বশুর / শাশুড়ি, বাচ্চা, নাতি-নাতনি, ডাক্তার ছেলের বৌদের নিয়ে খুব বড় পরিবার।

বাইরের কাজের – ঝাড়াপোঁছা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজার আলাদা লোক আছে। বাগানের মালি, ড্রাইভার সবাই মিলে বেশ একটা এলাহি ব্যাপার সামলাতে হয় তাঁকে। ভীষণ বিচক্ষণ, স্মার্ট মহিলা, রাঁধুনির কাজে তাই ‘কমলাকে’ বহাল করতে ইচ্ছা। মিসেস গুপ্ত বললেন, – “খুবই ভালো কাজ করে মেয়েটা কিন্তু কিন্তু – – – – – একটু নজর রাখতে হবে আপনাকে কেননা – – – -“

– কেননা কি কোন রোগ টোগ আছে নাকি? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস রায়।

“না না শরীর স্বাস্থ্য খুব ভালো তবে – তবে ‘একটু হাত টান’ আছে, এই আর কি”।

মিসেস শ্রীবাস্তব বলে উঠলেন, – “ও বাবা, এসব চোর ছ্যাচড়দের রাখা কেন? কোনদিন ঘরে লোক ঢুকিয়ে দেবে”।

আর একজনের প্রশ্ন – “তা কি কি নিয়েছে আপনার বাড়ি থেকে?”

– “না না সেরকম বড় কিছুই নয়, তবে ওই গাছের পেঁপে, কলা, সবজির ঝুড়ি থেকে চার পাঁচটা আলু পটল – এইসব নিয়ে নিত। ঘরের জিনিস মানে টাকা পয়সা ইত্যাদিতে হাত দেয়নি অবশ্য”।

মিসেস রায়ের উক্তি – “নিজে একটু সাবধান থাকলে, নজর রাখলেই হ’ল। আজকাল টাকা তো ঘরে রাখি না, সব কেনাকাটা কার্ড দিয়েই করি। আর গয়নাগাটি লকারে। বেগুন, মূলো গুলোও ফ্রিজে চাবি দিয়ে রাখতে হবে। যা রান্না হবে তা গুনে গেথে নিজে বার করে দেবেন”।

মিসেস গুপ্তার উক্তি – “মেয়েটার কাজ বড় পরিষ্কার। আর রান্নাটাও আমি খুব ভাল করে শিখিয়েছি। রেখে দেখুন, আপনার তো সব দিকেই লক্ষ্য”।

শহরের নাম করা উকিল সুজয় রায়ের স্ত্রী এই মিসেস রায়ের নাম – মানসী দেবী। তাঁর বাড়িতেই বহাল করা হল কমলাকে – মাসের ১৫ তারিখেই। সত্যিই মেয়েটির কাজ খুব ভালো। বেশ খুশি মনেই দিন কাটাচ্ছিলেন মানসী দেবী, কিন্তু সব সময় একটু সন্দেহের কাঁটাটা ফুটে থাকতো মনের মধ্যে। ভাবতেন কে জানে কখন কি নিয়ে পালাবে সে। একদিন সন্ধ্যেবেলায় রান্নাবান্না সেরে কমলা বাড়ি যেতে উদ্যত হয়েছে, মানসী দেবী হটাৎ লক্ষ্য করলেন ওঁর কোঁচড়ে কিছু বাঁধা, পেটের কাছে শাড়িটা যেন ফুলে আছে মনে হল। মানসী দেবীর নাতি ১৪ বছরের ছেলে বাইরের ঘরে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়া করছে। বাগানের মালী, গেটের দারোয়ান এবং আরও দুজন কাজের মেয়েও ঘর বাড়ি ধুয়ে মুছে বাড়ি যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। উকিলবাবুর মায়ের জন্য নার্স আছে। সে সেই বৃদ্ধাকে wheel chair -এ করে ঘোরাচ্ছে। হঠাৎ মানসী দেবীর গলার স্বর শোনা গেল। –

“অ্যায় কমলি, দাঁড়া, দাঁড়া বলছি, দেখা কি নিয়ে যাচ্ছিস লুকিয়ে?”

– ‘কিছু তো নয় গিন্নি মা’ – কমলার কাচু মাচু মুখে কথা আটকে গেল।

“নয় মানে? তোর পেটটা ওরকম ফুলে আছে কেন? – বলেই -তার কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। রেগে গেলে তাঁর মাথার ঠিক থাকে না। সামনে, পেছনে কে কোথায় আছে দেখেন না তিনি, মুখের ভাষাও এক মুহুর্ত্তে তাঁর বদলে যায়।

– “হারামজাদী, নচ্ছার মাগী দেখা কি চুরি করে পালানো হচ্ছে, এই কথাগুলি চিৎকার করে বলে সকলের সামনে তার শাড়ির আঁচল ধরে এক টান মারলেন।

কোঁচড়ে বেঁধে রাখা অমূল্য বস্তুটি মাটিতে পরে গেল। অপমানে, লজ্জায় তার চোখে জল এসে গেল। বাড়ির লোকেরা সবাই ঘিরে ধরলো তাকে। মাটিতে পড়া প্লাস্টিকের প্যাকেটটি হাতে করে তুললেন তিনি, – কয়েকটি রুটি মাত্র।

– ঐ শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মহিলা কিন্তু ক্ষান্ত হলেন না। কমলিকে এক ধাক্কা দিয়ে বললেন, –

“তাই ভাবি রোজ রোজ এতক্ষন ধরে কেন রুটি করা হয়। ভাত রুটি মা লক্ষী তাকে গৃহস্থের বাড়ি থেকে সন্ধ্যেবেলায় চুরি করে নিয়ে যেতে লজ্জা করে না তোর?” আজ রুটি, কাল ঘটি বাটি, – তারপর সোনার আংটি, চোর মাগী তোর সাহস তো কম নয়।”

কাপড়টা প্রায় খুলে মাটিতে লুটাচ্ছে, কমলা ভাবছে ধরণী দ্বিধা হও। ওর সঙ্গের কর্মীরা দাঁড়িয়ে মজা দেখছে।

হটাৎ মাষ্টারমশাই বেরিয়ে এলেন বৈঠকখানা থেকে গম্ভীর গলায় বৃদ্ধ শিক্ষকের যেন হুঙ্কার শোনা গেল।

“ম্যাডাম যেতে দিন ওকে। একজন গরিব অসহায় মহিলা কেন দুটো রুটি নিয়ে যেতে চায়, সেটা তো জানতে চাইলেন না ওর কাছে? সবাইকার সামনে এভাবে অপদস্ত করা কি ঠিক?”

গেটে উকিলবাবুর গাড়ি ঢুকলো, তিনি একটু অবাক হয়ে গেলেন বাড়ির দরজায় চাকর বাকরদের ভিড় ও স্ত্রীর রুদ্র মূর্তি দেখে, ভালো একটা ঝামেলার আভাষ পেলেন তিনি।

মানসী দেবী এবার কমলাকে ছেড়ে – মাস্টারমশাইয়ের ওপর বাক্যবাণ শুরু করলেন। “আপনাকে আর কাল থেকে পড়াতে আসতে হবে না। আমার বাড়ির ব্যাপারে ২ টাকার টিউশন টিচারের নাক গলানো আমি একদম পছন্দ করি না, আর বরদাস্তও করব না।”

উকিল বাবু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, – “কি হয়েছে কি বলবে তো তোমরা?”

হটাৎ কমলি বাবুর পায়ের কাছে পড়ে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল। –

“ছেলেটার খুব জ্বর গো বাবু, ঘরে আটা নেই, তাই আমার সকালের জল খাবারের রুটি দুটো আমি না খেয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম।”

মানসী দেবী রগে ফুঁসে উঠলেন, – “তাই বলে তুই চুরি করবি? চেয়ে নিতে পারতিস না? ধরা পড়ে এখন বাবুদের সিম্প্যাথি কারবার চেষ্টা হচ্ছে? বদমাইসি বের করছি তোমার, পাড়ায় আর কারো বাড়িতে যাতে কাজ না পাস, তার জন্যে দেখ আমি কি করতে পারি।”

এবার অপমানিত নিত মাষ্টারমশাই ও লজ্জিত, লাঞ্চিত অসহায় কমলাদিদির মাঝে এসে দাঁড়ালো তাঁদের ১৪ বছরের নাতি ‘সমীরেন্দ্র’।

– “চাইলেই কি তুমি দিতে ঠাম্মা? ওদের বাচ্চাদের খাবার দাও না বলেই তো ওকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে, তাও নিজের ভাগের খাবার। নিজে মুখে না দিয়ে সে – – -“

– “চুপ করো খোকন তুমি। একদম বড়দের মাঝে কথা বলবে না।”

-“ও তো ঠিকই বলছে। বড় হচ্ছে – ওরা ন্যায় অন্যায় বুঝতে শিখেছে। যাও মা, কমলা তুমি বাড়ি যাও।”

সমীর এসে তার রুটির প্যাকেট টা তুলে নিল, রান্না ঘরে গিয়ে নিজের ভাগের চারটে রুটিও ভরে দিল তার মধ্যে। তারপর দাদুর দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে জানালো, –

“কাল থেকে যদি তোমরা কাজের লোকদের ভালো করে খেতে না দাও, ওদের বাচ্চাদের খবর না নাও, অপমান করো, আমিও তাহলে এবাড়ির খাবার খাবো না।”

আর মাষ্টারমশাই কাল থেকে আমি আপনার বাড়িতে পড়তে যাব। যে বাড়িতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আপনাকে নীচু করা হল, সে বাড়িতে কেন আসবেন আপনি? ঠাম্মা কে উপেক্ষা করে এগিয়ে এল সে।

– চলো কমলাদিদি তোমার ছেলেকে দেখে আসি। দাদু আমাকে টাকা দাও ওর ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাস্টারমশাইয়ের চোখে জল এসে গেল। জড়িয়ে ধরলেন তিনি তাঁর ছাত্রকে। – বিবেকানন্দ তো এইরকম বিবেকবান ছেলেদের আত্মবিশ্বাস জাগাতে চেয়েছিলেন।

দাদু একটা ১০০ টাকার নোট বের করে নাতির হাতে দিলেন, আর বললেন, “I am proud of you।”

Leave a comment