চন্দনা সেনগুপ্ত
লজ্জাপটাবৃতা দুর্গাদেবী সকালে উঠেই বাসি কাপড় ছেড়ে তুলসীতলায় গোবর ছড়া দিয়ে, ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে ঘটি, কলসী নিয়ে পুকুরে যেতেন স্নান সারতে। তারপর চলতো তার পূজাপাঠ – জপতপ।
বাংলাদেশের সাধিকা বিধবা মা নিষ্ঠা ভাবে চন্দন ঘষতেন, তুলসী তুলে, ফলফুল কেটে প্রাসাদের থালি সাজাতেন। গাঁদা, মালতী, চম্পা, টগর, বেলী – যখন যা ফুল ফুটতো তাঁর আঙ্গনে তাই সাজিয়ে ধুপ জ্বেলে পূজা উপাচার সংগ্রহ করে, হরিনামের মালাটি হাতে নিয়ে একমনে চোখ বুজে জপ করে চলতেন, – “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”। তাঁর সেই পূজারিণী রূপটি ছিল বড় সুন্দর। ছেলের বউ এলিজাবেথ প্রায় এসে ছোট্ট কন্যা “দময়ন্তীকে” নিয়ে গ্রামের বাড়িতে শাশুড়ির কাছে থাকতেন, সেখানে তাঁর সময় কাটতো এক অদ্ভুত অনাবিল আনন্দে। শিশু কন্যা তার ঠাকুমার মন্ত্র উচ্চারণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতাপাঠ শুনতো হা করে। দূর্গা দেবীর আধ্যাত্মিক সাত্ত্বিক জীবন ধারনের মানে কিছুই সে বুঝতো না, কিন্তু ধ্যান জপ অনেকক্ষন শান্ত হয়ে বসে ও চক্ষু মুদিত ওই অপূর্ব মূর্ত্তি তাকে ভীষণ আকর্ষণ করতো। ঠাকুরমার কোলে পিঠে চড়ে দাপাদাপি করার সুযোগ সে পাইনি, spirituality কাকে বলে সেকথা তখনও তার বোধগম্য হয়নি, কিন্তু এই ভাবধারাটি – অর্থাৎ শান্ত স্নিগ্ধভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে একান্ত হওয়ার গুনটি সে ঠাকুরমার থেকেই লাভ করেছিল।
“দময়ন্তীর” বাবা ‘গণপতি বাবু’ও দুর্গাপূজার সময় চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে মেতে উঠতেন নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে। ‘কলা বউ’ স্নান করতে গিয়ে গ্রামের সব লোকের সঙ্গে – আমার উমা এলো গো কিংবা অষ্টমীর দিনে আঁখ বলীর পরেই “রণ মাঝে, বন মাঝে নাচে গো উমা দিগম্বরী” গান ও খোল করতাল ঢোলকের গানের তালে একেবারে বিভোর নাচ – দেখলে কেউ বলতে পারতো না যে তিনি আমেরিকা ফেরত ইঞ্জিনিয়ার বা তাঁর স্ত্রীও বিদেশিনী।
দুবছরের কন্যা দময়ন্তীকে কাঁধে নিয়ে বিজয়ার ভাসানের সময় “চন্ডী মণ্ডপ আঁধার করে ওমা উমা আমার কোথা গেলি গো” গানের সুরে তাল মিলিয়ে দূর্গা মায়ের মূর্ত্তি বিসর্জন দিতে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত রমণীয়। জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থাকে না কিন্তু পরোক্ষভাবে চরিত্র গঠনে – ভাবনা চিন্তায় তার ছাপ পড়ে পরিণত বয়সে। সেই বিদেশিনী বধূর শেতাঙ্গিনী কন্যার জীবনেও তাই বোধহয় ভারতীয় সংস্কৃতি, কালচার ও অধ্যাত্মবাদ এবং দয়া ক্ষমা, স্নেহমমতা মাখা বাঙালী নারীর সব লক্ষণগুলির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। দুর্গাদেবী তার গ্রামের সর্বহারা চাষী, জেলে, নাপিত কিংবা অসহায় আত্মীয়স্বজনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁর পুত্র গণপতিও যে কোন লোককে আপন করে নিতে এতোটুকু কুন্ঠাবোধ করতেন না।
তাঁদের মধ্যে দময়ন্তী তাই বড় হয়ে আমেরিকার আধুনিক পশ্চিমী শিক্ষায় মানুষ হয়েও সবাইকে আপনার জন মনে করে ভালবাসবার অসাধারণ ক্ষমতাটি অর্জন করেছিলো।
তাই কলেজ পাশ করার পর সে যখন Peace Crops এ কাজ নেয়, তখন তাকে নেপালে এক অতি নগন্য গ্রামে পাঠানো হয়। পাহাড়ের কোলে “বহিনী হাউসে” পতিতালয় থেকে আগত ছোট ছোট মেয়েদের দেখাশুনো ও শিক্ষা দেওয়ার কাজে সে নিয়ত ছিল।
সেখানে গিয়ে দময়ন্তী সবচেয়ে আগে – নেপালী ভাষা শিখে নেয়। সেই বাড়িতে জল ছিল না। পাহাড়ের নিচে গিয়ে ঝর্ণার জল নিয়ে তাকে জল তুলে আনতে হতো। কোনো Modern Lifestyle, সুযোগ সুবিধা, বিলাস ব্যাসন কিছুই সে সেখানে পেতো না। সবসময় আলো থাকতো না। গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করার জন্য কোনো বন্ধু ছিল না। ওই গ্রাম্য মহিলাদের তাদের ভাষায় জীবনের পাঠ – পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে আনন্দের সঙ্গে কাজ করে যেত সে।
বাবা গণপতি সেনগুপ্তর অকাল মৃত্যু Car Accident এর ঘটনা তাকে অত্যন্ত দূঃখিত করে। কিন্তু ওই মর্মান্তিক আঘাতেও তাকে শান্ত স্নিগ্ধভাবে সবাইকে বোঝাতে দেখা যায়। তার Balanced Nature আত্মীয় বন্ধুদের অভিভূত করে দেয়।
এর পর দময়ন্তী বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে এবং Meditation ও Yoga তেই তার বেশিরভাগ সময় কাটে।
দময়ন্তীর আর এক দিদিমার অনুপ্রেরণা ও প্রভাবও বিশেষভাবে পড়তে দেখা যায়। Late Halen Dancy জীবিকায় শিক্ষিকা ছিলেন – কিন্তু Nature Lover বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি প্রকৃতি প্রেমী এবং Bird’s Watcher ছিলেন। তার বাড়ির আসে-পাশের জঙ্গলে গাছে গাছে পাখিদের অবলোকন করা ও সংখ্যা গণনা করা তাঁর এক বিশেষ কাজ ছিল।
সেই প্রকৃতি প্রেমী আমেরিকার ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বাধীনচেতা সংস্কারমুক্ত উদার মনোভাবের মহিলা। তাঁর অন্যন্ত প্রিয় নাতনি ছিলো দময়ন্তী। মেয়ে এলিজাবেথ ভারতীয় বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করে দুর্গাপুরে এসে সংসার পাতলে, তিনি মেয়েকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেন। অন্যান্য আধুনিক আমেরিকার মায়ের মতন তাকে উপেক্ষা করেননি।
যে দেশে আঠারো বছরের হয়ে গেলে বাবা মা তাদের সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন এবং আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার সাহায্য করতে ইচ্ছুক হন না, সেই দেশের মা হয়ে তিনি কন্যা এলিজাবেথকে কখনো পরিত্যাগ করেননি। জামাই গণপতিকে যেমন স্নেহ ও প্রেমের দ্বারা গ্রহণ করেছিলেন, দুই দেশের সবরকম পার্থক্য ব্যবধান তাকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি। তাই এলিজাবেথের সন্তান প্রসবকালে তিনি নিজের সব কাজ, সুখ-সুবিধা ছেড়ে সুদূর শিকাগো থেকে দুর্গাপুরে এসে তার আমাদের দেশের মায়ের মতন “আঁতুড়ের” ঘরে কন্যাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে চলে আসেন। তাঁর মতন মমতাময়ী, সুকক্ষ, কর্মকুশল মহিলা খুবই কম দেখা গেছে। নাতনি দময়ন্তী তাঁর সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করেছে। মৃত্যুকালে ওই দিদিমা Halen Dancy তাঁর অন্যান্য নাতি-নাতনি থাকা সত্ত্বেও এই স্নেহ সম্পৃক্ত মেয়েকে তাঁর সম্পত্তি দেন করে যান, কারণ তিনি জানতেন ওই উদার মনোভাবের ধার্মিক বুদ্ধপন্থী মেয়েটি তাঁর টাকা পয়সা ভালো কাজেই ব্যয় করবে।
‘দময়ন্তী’ সেই অর্থে সিয়াটলে নব নালন্দা নামে এক অপূর্ব সংস্থা গড়ে তুলেছে, সেখানে যোগা ও মেডিটেশন, বুদ্ধদেবের ধর্ম চর্চার এক সুন্দর মনোগ্রাহী কেন্দ্র তৈরী হয়েছে। তার পরিচালনায় আমেরিকার নব নালন্দা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ – স্থান গড়ে উঠেছে।